Tuesday, October 29, 2024

ধূসর জীবন - অরুণ কুমার সরকার || Dhusar jibon - Arun kumar Sarkar || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

      ধূসর জীবন 

                      অরুণ কুমার সরকার 


এখন আর 'ভালো আছি' কথাটা বলতে পারি না;

আবার 'খারাপ আছি' তাও ঠিক বলা যায় না 

বরং একটা সমতা রেখে এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটা শব্দ বেছে নিয়ে

সবটার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি এখন;

এতে সাপও মরে, আবার লাঠিও ভাঙে না।


আমার এখন ধূসর জীবন-

'মোটামুটি আছি' কিংবা 'এই চলে যাচ্ছে' শব্দেও

ধূসরতা ক্রমশ যেন আরও ফিকে হয়ে আসে;

আগামীর স্বপ্নগুলো ছাই রঙ মেখে মেখে 

মৃত্যুর প্রহর গোনে যেন।


হৃদয় কুলুঙ্গিতে সাজিয়ে রাখা কিছু সুখ-স্মৃতি

ক্রমশ ঝাপসা হতে হতে 

বাহ্যিক চাকচিক্যের ঘুণ ধরা সমাজের কলুষ স্রোতে

কখন যে তিস্তা তোর্ষায় গিয়ে মেশে 

তা কেউ জানে না।


তবুও বেঁচে আছি,

কিংবা বলা ভালো, টিকে আছি আজও যেন এক ধূসর 

পান্ডুলিপি হয়ে....

পরিকল্পিত তথ্য - কেতকী বসু || Porikolpita tothho - ketaki Basu || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 পরিকল্পিত তথ্য 

        কেতকী বসু


প্রহরীর স্বতন্ত্র বার্তায় মনও পাখি হয়ে যায়

চোখ বন্ধ রেখে রুমাল চুরি খেলা দেখি

বসে থাকি নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষায়


যে অদৃশ্য চোরা পথের সামিল হয়ে

জাল বুনে মজার ছড়া কাটছ,

একদিন অজান্তেই ধরা পড়ে যাবে

সেই ঘূরণ চন্ডি খেলায়।


ভাতের দানা ছড়িয়ে ভাগ দেওয়া অলীক স্বপ্নে

সময় ও কথা বলে,

তাই যথার্থ প্রশ্নের উত্তর দায়িত্ববানের হাতে,

চোর আর চুরির পার্থক্য বুঝতে কয়েদ খানা যথেষ্ট নয়,

সাদা কাঁচ বলে দেয়,বিবেক আর সম্ভ্রমের গুরুত্ব

মার্জিত রূপরেখার বাইরের দৃষ্টি ধারালো

তাই গুণ আর গুণফলের সাথে ভাজ্য বা ভাজকের গুরুত্ব কম নয়।

ঘুমলতা - রহিত ঘোষাল || Ghumlota - Rohit ghosal || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 ঘুমলতা

রহিত ঘোষাল 



তোমারই কল্পনা আক্রান্ত পথ

আমাকে কখনো বিশ্রাম দিতে পারেনি


কত দেবতা জাফরি দিয়ে 

আমাদের দেখেছে গভীর সন্দেহ নিয়ে


বীরভূম একা রাত্রি জাগার প্রস্তুতি নিয়ে

ঝাঁপ দিয়েছে অদ্ভুত ঘুমে 

ধুঁকে ধুঁকে স্বপ্ন এসেছে তার কাছে

আমাদেরই চিত্রকল্প এসেছে চুঁইয়ে চুঁইয়ে

যে স্পর্শের প্রত্যাশা ছিল 

তার কথাই বলাবলি করে সখীরা

অনুতাপ শয্যা হিম হয়ে আছে 

স্মৃতির পুঁজ হিলতোলা পায়  

কোথায় ফেলেছ আজ মনে নেই তোমার

কপালের পিদিমে খরস্রোত- ঘুমলতা

 


ধারা একশোচুয়াল্লিশ - চয়ন দত্ত || Dhara Ekshochualish - Chayan Dutta || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 ধারা একশোচুয়াল্লিশ

       চয়ন দত্ত



রাস্তা দিয়ে একটা কুকুর হেঁটে গেল

অবলা বলে তুমি তাকে

দুটো বিস্কুট দিলে , 

রাস্তা দিয়ে একটা বৃদ্ধ ,

হাঁটতে পারে না ,

তাকে তুমি দোকান থেকে লাঠি কিনে দিলে 


এভাবেই গেল কাক , বালক ও অন্ধ ভিখারী


ফাঁকতাল বুঝে আমিও হাত নাড়লাম ,

দেখি ওমা ! 

অটোস্ট্যান্ড পেরিয়ে তোমার সে কি দৌড়

সেই যে গেলে,

একটিবার ফিরেও চাইলে না 


শহরজোড়া ভিড় ,


তবু আমার ক্ষেত্রেই যতো কারফিউ

যতো ব্ল্যাক-আউট


শুধু আমার ক্ষেত্রেই -

কখনোই কিছু দেখতে পাও না তুমি !

রক্তাক্ত হৃদয় - ইলা সূত্রধর || Roktakto Hridoy - Ila Sutradhar || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 রক্তাক্ত হৃদয় 

     ইলা সূত্রধর


নিতান্তই অনাদরে পড়ে থাকা 

একটি প্রস্তরখণ্ডের টুকরোকে 

কেটে কেটে গড়ে তুলেছো -

নিখুঁত সৌন্দর্যের মূর্তি।


কাল কোন সংগ্রহশালায়,কিংবা 

কারো ঘরে শোভাবর্ধিত করবে- 

তোমার ভাস্কর্যটি; অথবা 

নিষ্প্রাণ অস্তিত্বেও প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে।

নিষ্ঠা আর বিশ্বাসে পূজা পাবে -

জেগে উঠবে হৃদয়,

নামহীন গোত্রহীন শিলাখন্ড হয়ে উঠবে দেবী !


শিল্পের সৃষ্টিকর্তাকে 

প্রশংসায় ভরিয়ে দেবে সমাজ,

প্রচারে ছয়লাপ হয়ে উঠবে মিডিয়া।

তুমি আনন্দ ও গর্বের রসনায় তৃপ্ত হবে !


আঘাতে আঘাতে -

শুধু পাথরই জানবে 

কতটা রক্তাক্ত হয়েছে হৃদয় !

আনন্দ ধারা - বিজন বেপারী || Anondo Dhara - Bijon Bepari || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 আনন্দ ধারা

বিজন বেপারী


শরতের মেঘ শুভ্র ধবল

যায় সে অজানা দেশে

পঙ্খিরাজের রথে চেপে যায়

রাজার মতোন বেশে।


কাশ বনে হায় দোল দিয়ে যায়

দক্ষিণা সমিরণ,

মধুময় ক্ষন গোধূলি বেলায়

থাকেনা ঘরেতে মন।


বলাকার ডানা নিরবধি চলে

ওই দিগন্ত' দিকে

সামনে দাঁড়িয়ে সাঁঝের কুয়াশা

ধোঁয়ার মতোন ফিকে।


মাধুরী মিশিয়ে রাঙিয়ে নৌকা

পাল তুলে যায় মাঝি

কৃষকের মুখে রাশি রাশি হাসি

বিলাতেও আজ রাজি।


ঋতুরাণী আজ শিউলি তলায়

গলাগলি খায় সুখে

মুচকি হাসিতে খোকা খুকি আয়

আনন্দ ধারা মুখে।

ভেঙে ফেল সব - মনোরঞ্জন ঘোষাল || Venge Fel sob - Monoranjan Ghoshal || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 ভেঙে ফেল সব

মনোরঞ্জন ঘোষাল



ছিঁড়ে ফেল ওদের চক্রবূহ‍্য

ভেঙে ফেল ওদের গড়

উপড়ে পড়ুক বিষ বৃক্ষ

উঠুক এমন ঝড়।

এগিয়ে আসা রক্ত চক্ষু

থেমে যাক হুঙ্কারে

নাশ কর অমানুষিকতা

আগল তুলে দ্বারে।

ওরা অসুর মানুষের সাজে

গোপন শক্তি ভরে

তুই তবে কেন দুর্গা হবি না

ওদের মারার তরে।

আকাশ বাতাস গর্জে উঠুক

হবি নাকো তোরা ক্লান্ত

ওদের সমূলে বিনাশ করে

তবেই হবি শান্ত।

এক শানকি মুড়ি - চিরঞ্জিত ভাণ্ডারী || Eek Sanki muri - Chiranjit Bhandari || আঞ্চলিক কবিতা || Ancholic kobita || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 এক শানকি মুড়ি

      চিরঞ্জিত ভাণ্ডারী 



ছুঁয়া মাছের পারা কেমন লুকায় গেলেক ডাঙগুলিটার খেলা

এই তো কদিন আগেরলে সজনা তলায় বসতেক পুতুলের মেলা।

মায়ের ছেঁড়া শাড়ি ছিঁড়ে পুতুলকে সাজাতম কনার সাজ্যে

পুতুল বিয়া হবেক বলে তালপাতার বাঁশিট উঠথেক দমে বাজ্যে।

কিতকিতটা খেলতম বেদম শীত রোদে উঠান মাঝে

উঠান জুড়্যে দোঁপাটি গাঁদা উঠথেক দমে লাচ্যে।

এক শানকি মুড়ি ধুস্যে ডাঙ গুলিটা খেলতম 

চিড়িক বাদ্যে 

টাপুর টুপুর বৃষ্টি মাথায় খেলতম গাঁদি কুইদ্যে। 

ছাতপাতটাও ছাড়িনাই ঠিক বসতম বিকাল হল্যে 

হারায় দিতম চুটকি মারে বাঘবন্দিটা হাতের গড়ায় পাল্যে।

বর্ষা কালে হুদক্যে উঠে গাবায় দিতম কুলি

কাগজের নৌকা জলের ঠেলায় চলত দুলি দুলি।

কুলির জলে পড়ল্যে চোখে দু একটা ডাড়কনা পুঁটি 

ঝাপায় পড়ে ততক্ষণাৎ দু ফাঁক করতম কাদামাটি।

হাঁড়ি কুনকুন লুকাচুরি বুড়ি ছুঁই খেলা হরেক রকম 

উঠান জুড়্যে পায়রা গুলান করত্য বকম বকম।

মায়ের চোখে কাপড় বাঁধ্যে বলম ছুঁ ত দেখি আস্যে 

মায়ের কাণ্ড দেখে বাবা লুটায় পড়ত্য হাস্যে।

এমন সুন্দুর ছবি গুলান দেখত্যে পাথিস যদি তোরা 

মন জুড়াত পাণ জুড়াত হৃদয় হতো হরাভরা।

এক হাঁড়িতে বহুজনা থাকত্য সুখ দুঃখের মাঝে

চায়ের কাপে সুনালি সকাল পান খিলিটা সাজ্যে।

শরৎ কথা - সোমনাথ সামন্ত || Sarot kotha - Somnath Samanta || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

      শরৎ কথা

         সোমনাথ সামন্ত


শিউলি ফুলের নোলক দিয়ে

দুগ্গা মাতা সাজে,

শরৎ এসে জানান দিলে

আলোর বেণু বাজে। 


কাশ ফুলেরা মাঠের ধারে

করছে নানান খেলা, 

নীল আকাশে ভেসে বেড়ায়

সাদা মেঘের ভেলা। 


শাপলা শালুক খুশি মনে

দীঘির মাঝে ভাসে,

শেফালিরা সবাই মিলে

তাদের কাছে আসে। 


সেজে ওঠে ক্ষেতের জমি

কনক ভরা ধানে, 

চাষা ভায়া মেতে ওঠে

মিষ্টি বাউল গানে।


হিমের পরশ লাগল যে ঐ

কামিনীদের দলে,

জুঁই মালতী দল বেঁধেছে

গল্প বলার ছলে।




স্বপ্নরূপেন - স্বাতীলেখা রায় || Swapnirupeno - Swatilekha ray || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 স্বপ্নরূপেন 

স্বাতীলেখা রায় 



এক ফুসফুস ধুলো মেখে 

কাদা খোলা ম্যানহোল পেরিয়ে 

ভাদ্রের দমফাটা রোদ ঢুকেছে চোরের মত 

আমার শরতে

তবু দেবী পক্ষের আগে

  একটা গোটা আমি

শিউলি খোঁজা ভোরে ঘুম ভেঙে 

আকাশ দেখি

যা দেবী সর্বভুতেষু স্বপ্নরূপেন সংস্থিতা 

আবারও কোনো ভরা ভাদ্রে 

ধুলোর সাথে মিশে যাওয়া যাবে 

আকাশ সাক্ষী রেখে 

স্বপ্ন বুনে যাবো 

বসন্ত আসবে বীরদর্পে 

আমাদের শরতে

মেঘমানুষ - সোমনাথ বসু || Meghmanush - Somnath Basu || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

     মেঘমানুষ

               সোমনাথ বসু 



     অবচেতনে নয়

     চেতনার রঙে রঙিন চারাগাছ

     শিকড় ছড়াবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম

     চেয়েছিল স্বপ্নের ফেরিওয়ালা.... 


     সারাটা দিন বিষন্নতা চেয়েছে একটা

     জলভরা মেঘ, 

     চোখের কোণ ভিজেছে স্বপ্ন ভাঙার

     অকাল বোধনে .... 


      দু:স্বপ্নের সকাল

      কালস্বর্প দোষে কেপে উঠলো

      নিয়তির বেনিয়মে .... 

      উত্তরণের আচমকা খেয়ালে! 


       যে বীজ দেখে ছিল মেঘ-বৃষ্টি-রোদ, 

       সিক্ত মাটির রিক্ত ভবিষ্যৎ, 

       শুধু চেয়েছিল আগামীর স্নিগ্ধ হাসি, 

      তবু হৃদ্যহীন হল বোধনের বাদ্যির আগে! 


      

লক্ষ তিলোত্তমা - রঞ্জনা ঘোষ (সেন) || lokhhi Tilottama - Ranjana ghosh (sen) || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

লক্ষ তিলোত্তমা

    রঞ্জনা ঘোষ (সেন) 


আড়াল হবে যতো অপরাধ

এগিয়ে চলবে ততো প্রতিবাদ। 

অপরাধীরা পাবে না ক্ষমা

বিচার পাবেই তিলোত্তমা।


যেখানেই থাকুক রক্তবীজের বংশ

এবার তাদের করতেই হবে ধ্বংস। 

খাটবে না আর শকুনির ছল

যাজ্ঞসেনীরা বেঁধেছে দল। 


কান পাতলেই শোনা যায় লাশকাটা ঘরে

অপূর্ণ স্বপ্নগুলো গুমরে কেঁদে মরে ! 

পাপের ঘড়া পূর্ণ এবার সব পড়েছে জমা

এক অভয়া জন্মদিল লক্ষ তিলোত্তমা ।


মোমবাতি ছেড়ে মশাল নিয়েছে হাতে

প্রতিবাদে গর্জে চলেছে গলি থেকে রাজপথে। 

আটকে রাখা যাবে না আর কিছুতে

ধর্ম বর্ণ ভাষা চিহ্ন সব মিশে গেছে একসাথে। 


ছুটে চলেছে সব বিচার বেদীর পানে

দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভয় শঙ্কা নেই কারো মনে।

নেভেনি আগুন এখনো জ্বলছে চিতা শ্মশানে

নিভে গেলে মশাল জ্বালাবে সেই চিতার আগুনে। 


জমে থাকা ক্ষোভ রূপ নিয়েছে প্রতিবাদে

ঘরের কোণে পড়ে থাকবে না কেউ অবসাদে। 

বিচার না পাওয়া অবধি যাবে নাতো থামা 

এক অভয়া জাগিয়ে দিল লক্ষ তিলোত্তমা।

Friday, October 25, 2024

অচেনা অতিথি - শচীদুলাল দাস || Ochena Atithi - Sajhidulal Das || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

        অচেনা অতিথি 

           শচীদুলাল দাস



বাইরের দরজাটা হাট করে খোলা। বুকটা ধড়পড় করে উঠল। কি হলো? তাহলে কি সব চুরি হয়ে গেছে? টাকা পয়সা!গয়নাগাঁটি সবকিছু! খারাপ কিছু ভেবে আস্তে আস্তে দরজার দিকে পা বাড়ালেন।



মানব জীবনে সম্পদের প্রতি টানটা খুব সহজাত। সবাই তা আগলে রাখার লড়াই করে চলেছে প্রতিনিয়ত। রোজগারের সাথে সম্পদ বাড়ানোর ইঁদুর দৌড়ে দৌড়াচ্ছে সবাই। কেউ কেউ দারুন ভাবে সফল। আবার কেউ কম সফল হয়ে হতাশায় দিন কাটায়। কিন্তু একটা সময় এসবের কোন প্রয়োজন হবে না,সবকিছু তেমনি থাকবে পড়ে - খালি হাতে বিদায় নিতে হবে এই ধরাধাম থেকে। তবুও আকাশের চাঁদকে ধরতে, অনিশ্চিয়তার বন্ধুর পথে অন্ধকারে হাতড়ে চলছে সবাই।



অরিন্দম দাস অবসর নেওয়ার পর, গ্রামের জায়গা জমি ভাইদের দেখাশোনার ভার দিয়ে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন কয়েক বছর ধরে।একমাত্র মেয়ে মধুপর্ণাও পড়াশোনা বেড়ে ওঠা এইখানে।সে ছাত্র- জীবনের এক সফল সৈনিক।সে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্গালোরে কর্মরত। বেতন কাঠামো ও মনের মত। এখন মা বাবাকে ছেড়ে একাই থাকে সেখানে।



প্রায় দেড় দু মাস হলো অরিন্দমবাবু স্ত্রী অপর্ণাকে নিয়ে মেয়ের কাছে ব্যাঙ্গালোরে গেছেন। সেখান থেকে কন্যাকুমারী, পণ্ডিচেরী বেড়াতে যাবেন। মেয়ে ভালো টুরিস্ট কোম্পানির সাথে সব ব্যবস্থা বন্দোবস্ত করে রেখেছে। পণ্ডিচেরীর শান্ত- স্নিগ্ধ সাগরবেলা, ভারতীয় সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম আর অরোভিল নগরের মানব ঐক্যের জীবন্ত দৃষ্টান্ত তাদেরকে বড়ো মুগ্ধ করে।সেখান থেকে ফিরে কয়েকদিন মেয়ের কাছে জিরিয়ে নেবেন, তারপর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় ফিরবেন। এবারে মেয়ে এলে সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে বেড়াতে যাবেন।



অনেকদিন পর মেয়ে বাড়ি ফিরছে। ফ্লাইটটা কলকাতার মাটি স্পর্শ করতেই যে আনন্দটা ছিল,তা যেন হটাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ। এ আবার এক উটকো ঝামেলা! 


কিন্তু একি কান্ড! ড্রয়িং রুম পেরোতেই মনে হচ্ছে সবকিছু ঠিক আছে।


মধুপর্ণা মাকে নিয়ে, এক নিঃশ্বাসে সবগুলো ঘরের তালা খুললো। আসবাব, জিনিসপত্র কোন কিছুর কোনো নড়চড় নেই। যেমনটি রেখে গিয়েছিলেন ঠিক তেমনই আছে। অরিন্দমবাবু চটকরে আলমারী খুলে লকারটা দেখলেন। সবই ঠিক আছে। সবাই অবাক হলেন! তাহলে?


কতকগুলো রহস্যময় ‘তাহলে’ তাদের মনে খোঁচা দিতে লাগলো বারবার।



সবাই যখন তাহলের রহস্যে ঘরের ভিতরে গভীর চিন্তায় ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় এক যুবক বড় একটি পিঠের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বড় সাইজের একটি খাম।


স্যার বলে ডাক দিতেই অরিন্দমবাবু বেরিয়ে এলেন। হাতে খামটা দিয়ে, সবিনয়ে করজোড়ে নমস্কার জানিয়ে গট গট করে বেরিয়ে চলে গেল। 


আপনি কে? কিসের খাম? 


দাঁড়ান! কোন ভ্রূক্ষেপ নেই।


চটজলদি ফোনটা নিয়ে সিকিউরিটিকে ফোন করে, ছেলেটিকে আটকাতে বলেন।


নামতে নামতে থানায়ও ফোন করেন।


মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে অরিন্দমবাবু সিকিউরিটির কাছে পৌঁছালেন। ছেলেটি নির্বিকার!অবাক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে।


তাদের দেখে আবারও হাতজোড় করে নমস্কার জানাল। সিকিউরিটি জিগ্যেস করলো, “উনি কি আপনাদের আত্মীয়”?


না! “এ আমাদের কেউ নয়”!



এর মধ্যেই থানা থেকে গাড়ী এসে গেছে।


অফিসার বলেন, “এখান থেকে কে যেন ফোন করছিলেন”?


অরিন্দমবাবু বলেন, “আমি ফোন করছিলাম স্যার। দিয়ে ঘটনাটা আদ্যপান্ত বলেন”।


সবশুনে অফিসার বলেন, “আপনারা বাড়ীতে ভালো করে সবকিছু দেখুন, তারপর সন্ধ্যায় থানায় আসুন।আমাদের আরও একটা কল আছে। ছেলেটাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা না বলা পর্যন্ত ছাড়া হবে না”।


অস্বস্তি যেন কাটলো! পুলিশের রুলের ঘায়ে ঠিক সব বেরিয়ে যাবে। একরাশ স্বস্তি নিয়ে, তারা ঘরে ফিরলেন।তবুও ব্যাপারটা মনের ভিতরে যেন কিছু প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে।


এসে ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। বিছানাটা কেমন এলোমেলো। আলনায় বেশ কিছু জামা প্যান্ট ছিল, সেগুলো নেই।পাশে প্লাস্টিকের ডাস্টবিনে কিছু পার্সেল খাবারের প্যাকেট, দেশলাই কাঠি, পোড়া সিগারেটের টুকরা ছাড়া আর কিছু নেই। এরপর বাথরুমে গেলেন। তাদের জিনিসপত্র গুলো একদিকে সুন্দর করে গোছানো। গামছা একটা শুকছে। আর কোনোকিছুর কোন পরিবর্তন নেই।রহস্য যেন আরও ভাবিয়ে তুললো।



তারপর হাতে হাত রেখে চললো ঘর গোছানোর পালা। বিছানাপত্র ঝাড়াঝাড়ি হল। দেরী দেখে, কুকারে ভাতে ভাত বসিয়ে খাওয়া দাওয়া হল। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে মনের খুঁত-খুঁতানি কিছুতেই যাচ্ছে না। আবার সারা ঘরের আসবাব, গয়না, টাকা পয়সা সব মিলানো হল। তেমন কিছু হেরফের নেই। প্রায় সবই ঠিক আছে। তাহলে পুলিশের কাছে কিসের নালিশ করবেন?


শুধুমাত্র সামনের গেটে তালাটি ভাঙা। তার পরিবর্তে গোদরেজর একটি নতুন তালা রাখা। তাহলে ব্যাপারটা কি?



বিকালে চায়ের টেবিলে মধুপর্ণা মনে করলো, “বাপি! ছেলেটা একটা খাম দিয়েছিলো না”?


“হ্যাঁ রে! একদম ভুলে গেছি। সেটা ড্রয়িং রুমে বেডের নীচে রাখলাম মনে হয়। দাঁড়া নিয়ে আসছি। খামটা বেশ ভারী তো!কি আছে ওর মধ্যে? কে জানে”!


খাম খোলা হল। তাতে এল, আই, সি থেকে পাঠানো অরিন্দমবাবুর দুটো চিঠি। দশ হাজার টাকা ও হিন্দিতে লেখা একটি চিঠি।


তাহলে কি ওই চিঠিতেই এই রহস্যের চাবিকাঠি? দেখাযাক!



মধুপর্ণা বাবার হাত থেকে চিঠিটা চিলের মত ছোঁ মেরে নিয়ে নিল। দিয়ে পড়তে শুরু করল। তার বাংলা করলে এমন হয় –


শ্রদ্ধেয় স্যার নমস্কার নেবেন। আমি যশপাল যাদব। বিহারের পাটনার কাছে একটি ছোট্টো শহরে আমার বাড়ী। আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের লাস্ট ইয়ারের ছাত্র। ইন্টার্নশিপে একমাস পাঁচ দিনের জন্য কলকাতায় পাঠানো হয়। আমি কলকাতার বিশেষ কিছু জানিনা। নাম শুনেছি মাত্র, আগে কোনদিন আসিনি।থাকার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে হন্যে হয়ে গেলাম, কিছু পেলাম না। যে সব ঘরের খবর পেলাম তা আমার সাধ্যের বাইরে। আমি অতি সাধারণ বাড়ীর ছেলে। দু রাত্রি শিয়ালদা স্টেশনে কাটিয়েছি। ভবঘুরের মত রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে এই ফ্ল্যাটটায় এলাম। দরজায় টোকা দিলাম, কোন উত্তর নেই। তারপর দেখি সামনে তালা। সিকিউরিটির কাছে আপনাদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আপনাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। শুনলাম দুমাসের জন্য বাইরে গেছেন। বেরিয়ে গেলাম। মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসল। আগেই লিখেছি আমি খুব দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছি। বাড়ীতে ছোট্টো একটা তালা সারাই ও নতুন তালার দোকান। বাবা দেখাশোনা করেন। আমি অবসর সময়ে সঙ্গ দি। তালা ভাঙা বা খোলার কাজে সিদ্ধহস্ত। বাইরে থেকে একটি নতুন তালা কিনে ফিরে এলাম। সিকিউরিটিকে বলি উনারা ডুপ্লিকেট চাবি রেখে গিয়েছিলেন। উনারা না আসা পর্যন্ত, আমাকে বাইরের ঘরটায় থাকতে বলেছেন। আমার নাম, ঠিকানা, ফোন নং নিয়ে ছেড়ে দেয়। আমি সামান্য বকসিসও দি।আর কোনদিন আটকায় নি। আমি প্রায় একমাস যাবৎ আপনাদের বাইরের ঘরটিতে আছি। অন্য কোনদিকে নজর দেওয়ার চেষ্টা করিনি। বন্ধুরা আসতে চাইলেও বারণ করি। বলি এক পরিচিতর ঘরে আছি, তাঁরা পছন্দ করেন না। গতকাল স্টাইফেন্ড বাবদ কুড়ি হাজার টাকা পেয়েছি। আপনার ঘর ভাড়া, ইলেকট্রিক ও অন্যান্য খরচ বাবদ দশ হাজার টাকা রেখে গেলাম।এই অধমের স্পর্ধা ক্ষমা করবেন।


                              নমস্কারান্তে 


                             যশপাল যাদব 


সবাই হতবাক! প্রায় দশ মিনিট কেউ কথা বলেনি। একেবারে পিন ড্রপ সাইলেন্ট। মধুপর্ণা ডান হাতে চিঠি, বাম হাত গালে দিয়ে ঘুরন্ত সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে। অপর্ণাদেবীর কথায় নীরবতা ভাঙলো। স্বামীর উদ্দেশে বললেন, “তাড়াতাড়ি থানায় গিয়ে ছেলেটাকে ছেড়ে দাও। আমাদের মধুও ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে বাসার জন্য কি হয়রানি টা পেয়েছিলো, মনে আছেতো”!


একটু থেমে দম নিয়ে অরিন্দমবাবু বললেন,


“আত্মীয় নয়! অথচ নিকট আত্মীয়ের চেয়েও ভালো কাজ করে একমাস যাবৎ ঘরটাকে পাহারা দিয়ে গেল। এর চেয়ে বড় আত্মীয় আর হয় না। ছেলেটা অনায়াসে পালিয়ে যেতে পারতো কিন্তু সে তা করেনি। সে তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত। এটাই মনুষ্যত্ত্ব বিকাশের মানদণ্ড। বর্তমান সমাজে যা বিরল”।


চটজলদি করে অরিন্দমবাবু প্যান্টটা গলিয়ে, মেয়েকে তৈরী হতে বললেন। ট্যাক্সিতে করে থানায় পৌঁছলেন। ছেলেটটার হাতে হাতকড়া। তাদের দেখে ক্ষমার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ক্ষুধা,তৃষ্ণায় চোখ মুখ বসে গেছে। হয়তো থানায় সকাল থেকে কিছু খেতে দেয়নি। অরিন্দমবাবুর পিতৃত্বের প্রদীপটা কেউ যেন উসকে দিল। চোখের কোনে টলটলে জল।


বললেন, “ওর বিরুদ্ধে আমাদের আর কোন অভিযোগ নেই। কোন ডাইরি লিখবেন না। ওকে ছেড়ে দিন”।


ছাড়া পেয়ে ছেলেটা অরিন্দমবাবু কে প্রণাম করলো।ক্ষুধা, তৃষ্ণা উপেক্ষা করে মুক্তির উল্লাসে সে বিহ্বল,যেন পিঞ্জর থেকে মুক্তি পাওয়া মুক্ত বিহঙ্গ।


বাইরে নিয়ে গিয়ে অরিন্দমবাবু তাকে ধোসা, চাউমিন খাওয়ালেন।ছেলেটি ক্ষুধায় গো গ্রাসে গিলে যাচ্ছে। তার দশ হাজার টাকা ফেরত দিলেন। সাথে আরও দুহাজার টাকা দিলেন। বাড়ীর জন্য কিছু নিয়ে যেও। কলকাতায় যদি কখনো আসো তবে আমার বাড়ীতে উঠবে। মনে থাকে যেন। তোমার জন্য দরজা খোলা থাকলো। সে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিল।


মনে হল, পরিচিত না হয়েও বুদ্ধি ও সু ব্যবহারে মনের সব গ্লানি জয় করে, এক অভিনব পরিচয় রেখে গেল।যা হয়তো স্মৃতির পাতায় হেসে খেলে বিচরণ করবে আজীবন।