Friday, October 25, 2024

যেমন কর্ম তেমন ফল - মিঠুন মুখার্জী || Jemon kormo temon fall - Mithun Mukherjee || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

       যেমন কর্ম তেমন ফল 

                       মিঠুন মুখার্জী




মুখার্জী বাড়ির বড় ছেলের সম্পত্তি ও টাকা-পয়সার প্রতি ছিল ভীষণ লোভ। বড় বউ সুষমাও স্বামীর যোগ্য সহধর্মিনী ছিলেন। তাদের দুজনেরই একা খাওয়া একা পাওয়ার প্রবণতা ছিল প্রবল। তাই ভাই রবিনকে সবসময় তারা সবকিছু থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করতেন। বৃদ্ধ বাবা-মার কানে সবসময় ছোট ভাই সম্পর্কে বিষ ঢালতেন তারা--- যাতে তাদের কাছেও সে খারাপ হয়ে যায়। এক সময় প্রতাপশালী পিতার দাপটে বাড়িটি গমগম করত। দুই ছেলে ও বউদের বুক ঠান্ডা হয়ে যেত। এখন বৃদ্ধ পিতা-মাতা বড় ছেলে ও বউকে যমের মতো ভয় পান। কোনো কথা বলার আগে চারিপাশ দেখে নেন, ওরা কেউ আসছেন না তো। ছোট ছেলের প্রতি হওয়া অন্যায়ের কথা তারা সব জানেন, কিন্তু কিছু করতে পারেন না। অথচ এবাড়ির সমস্ত সম্পত্তি বৃদ্ধ পিতা-মাতার।

          বাবার একটা মস্ত ব্যবসা আছে। সেটাকে বাবা ও বড় ভাই মিলে দেখাশোনা করেন। ছোট ভাই বাংলায় ডাবল এম.এ করেও চাকরি পাননি। এক কথায় বেকার। বাড়িতে সামান্য কয়েকটি ছাত্রছাত্রী পড়ান। বাবার ব্যবসা বড় ছেলে ছককষে বাবার কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে লিখিয়ে নেন। একবারও ছোট ভাইয়ের কথা চিন্তাও করেন না। আত্মস্বার্থ সিদ্ধি এখনকার মানুষের মূলনীতি। বাবা-মা ছোট ভাইকে একটা সামান্য জায়গা ব্যবসা করার জন্য লিখে দিলে তারা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন। ওই জায়গাটিতে পরবর্তীকালে মনের মত বাড়ি করার স্বপ্ন ছিল তাদের দুচোখে। কিন্তু সে আশায় জল পড়ে যায়।বাবা-মা তাদের সম্পত্তি কাকে দেবেন সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু বড় বউ-ও তার স্বামী সব একা ভোগ করতে চান। প্রতিনিয়ত ভাই ও ভাই বউয়ের সাথে ঝামেলা বাঁধানোর চেষ্টা করেন তারা। ছোট ভাই রবিন বাবা-মার এই চুপচাপ থাকা দেখে ভাবেন---"বাবা-মা বেঁচে থাকতে এরা আমাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করলে, তারা না থাকলে কি করবেন!! এক মুহূর্তের জন্য তারা এ বাড়িতে  তাদেরকে থাকতে দেবেন না।"

     বাবা ও মা পড়েন ভীষণ সমস্যায়। বাবার ইচ্ছা তারা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন সংসারকে ভাঙবেন না। অর্থাৎ হাড়ি আলাদা হবে না। কিন্তু বর্তমানে এটা সম্ভব নয়। কেউ কারো কাছে নত হয়ে থাকতে চান না। একদিন ছোট ভাই রবিনের ছয় বছরের মেয়ে আ‌রাধ্যা বাড়ির সামনে বাথরুম করায় বড় বউ তার উপর প্রচন্ড রেগে গিয়ে উলফাল বলতে থাকেন। এই নিয়ে রবিনের সঙ্গে বৌদির তুমুল ঝগড়া হয়েছিল। বড় বউ সুষমার এমন মুখ, যে কেউ সাধারণত তাকে নাড়াতে চান না। পাড়ার সবাই তাকে খুব ভালো করে চেনেন। কাউকে সে মানেন না। পেয়েছিলেন তার মায়ের ধারা। তার মা-ও ছিল এমন মুখরা। সেই বিষয়টার রেশ বেশ কিছুদিন ধরে চলতে থাকে। একদিন ছোট বউয়ের একটা নতুন দামি ব্লাউজ ছিঁড়ে যায়। দেখে মনে হচ্ছিল কে যেন ব্লেড দিয়ে কেটে দিয়েছেন। এই নিয়ে ছোট বউ কান্না করেন। সে ছোট ছেলেকে জানালে, ছোট ছেলে ছেঁড়া ব্লাউজ নিয়ে গিয়ে মাকে দেখান। কারো নাম না নিয়ে তিনি বলনে---"কেউ যদি ইচ্ছা করে ব্লাউজটা কেটে থাকেন, তবে তার মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে।" বড় বউ কথাটি কোনভাবে শুনে নেন। তারপর সেই দিন বাড়িতে যা কান্ড ঘটিয়েছিলেন তা মুখে  বলার না। নিজের গায়ে মেখে নিয়ে ছোট ছেলে রবিনের সঙ্গে ঝামেলা শুরু করেন। কাঁদতে কাঁদতে রবিনের নাম ধরে সে একই অভিশাপ দেন। রবিন বলেন---"আমি কারো নাম ধরে কিছু বলিনি, আর উনি আমাকে সরাসরি অভিশাপ দিলেন!!" বিষয়টা রবিনেরও খুব খারাপ লেগেছিল। তিনি মনে মনে সংকল্প করেন, দাদাদের ছায়া পর্যন্ত মারাবেন না। বড় বউ এতই ধূর্ত ও বদমাইশ যে, রবিনের অধিকারেও হস্তক্ষেপ করতেন। পাড়ার লোকের কাছে রবিন সম্পর্কে এমন এমন কথা বানিয়ে বলতেন, যা শুনে সকলে অবাক হতেন। সুষমার পেটের মধ্যে মিথ্যা কথা ও মাথার মধ্যে শয়তানি বুদ্ধি ছিল প্রবল। সমস্ত কিছুর মধ্যে নিজের স্বামীর অবদানকে শুধু দুচোখে দেখতে পেতেন। আর কারোর কোনো ভূমিকা তার দুচোখে ঠেকতো না। এমনকি শ্বশুরের অবদানকে অস্বীকার করে বড় বউ সবাইকে বলতেন---"বাড়ি ও ব্যবসা যা দেখছন সবই আমার স্বামী করেছেন। শ্বশুরের তেমন কোন অবদান নেই। ও না থাকলে ভোদাই ছোট ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরমশাই এসব করতে পারতেন না।" নিজের মানসিকতার পরিচয় নিজেই সকলের সামনে তুলে ধরেন বড়বউ। দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে রবিনের বাবা ব্যবসার জন্য কি করেছেন, আশেপাশের সবাই তা জানেন। ফলে বড় বউ সুষমার কথা কেউ বিশ্বাস করেন না।

        কথায় বলে 'লোভে পাপ পাপে মৃত্যু'। কথাটি একেবারে মিথ্যা নয়। সম্পত্তি ও টাকার লোভ বড় বউ ও বড় ছেলেকে পাগল করে তুলেছিল। তাই কখনো কাউকে মানুষ জ্ঞান করতেন না তারা। বড় ছেলে একদিন বাবাকে বলেছিলেন---"আপনার আর ব্যবসা দেখতে হবে না। আমি একা দেখতে পারবো। আপনার তো বয়স হয়েছে। তেমন কোনো কাজেও আপনি লাগেন না। আমি না থাকলে এ ব্যবসা চলবেও না। আপনি তো তেমন টাকা পয়সা দ্যান নি। এই ব্যবসায় যা করেছি সবই আমি।" বড় ছেলের এই কথা শুনে বাবা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। মনে মনে ভেবেছিলেন---"এতদিন দুধ কলা দিয়ে কাল সাপ পুষেছি।" বাবা বুঝেছিলেন বড় ছেলের হাতে ব্যবসা ছেড়ে দিলে, তিনি এই ব্যবসা দুদিনও টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। মদ খেয়ে আর লটারি কেটে শেষ করে দেবেন। তাই ব্যবসা পুরোপুরি ছাড়েন নি। একদিন সামান্য একটি বিষয় নিয়ে বড় ছেলে ছোট ছেলেকে অকথ্য গালিগালাজ করেছিলেন। এই সকল কথা সভ্য সমাজে কখনো মুখে আনা যায় না। অহংকারের ঝাঁজ ছিল সেই সকল কথায়। ছোট ভাই রবিনকে মারতেও গিয়েছিলেন বড় বউয়ের কথায়। কিন্তু বাবা-মা ও পাড়ার লোক থাকায় তা পারেননি। কথায় বলে---"ভয় থেকে মুক্ত হলে ভাবনায় ভগবান জাগে।" রবিন একটুও ভয় পাননি। বরং মনে মনে দাদা সম্পর্কে ঈশ্বরকে বলেছিলেন--- "ওনার অহংকার যেন একদিন চূর্ণ হয় ঈশ্বর। মানুষকে উনি মানুষ জ্ঞান করেন না।" ওনার গালিগালাজ শুনলে কোনো মানুষই ওনাকে ভালো বলেন না। নিজের ছেলে-মেয়ে দুটিকে মানুষ করতে পারেননি। তারা মানুষ হবেই বা কি করে! ছোটরা বড়দের কাছ থেকেই শেখে। মাতাল বাবার সন্তানও হয়েছিল একপ্রকার নেশাখোর। কোন নেশাই তেমন বাকি ছিল না। বাবা-মাকে তোয়াক্কাই করে না সে। তেজ ও কথা বলার ধরন দেখলে সকলেরই মাথা গরম হবে। মনে হবে---"ওইটুকু ছেলের এমন আচরণ!" টেনে গালে চড় মারতে ইচ্ছে হবে। তাছাড়া ছোটবেলা থেকেই দাদু-ঠাকুমার লাই পেয়ে সকলের মাথায় উঠেছে ছেলেটি। মেয়ের মেজাজ সপ্তমে। পান থেকে চুন খসলে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করে। মাঝে মাঝেই বড় বউ স্বামীর মুখে মুখে কথা বলায় রামশ্যাম মার খান। তবুও লজ্জা হয় না। কথায় বলে না 'মরলেও স্বভাব যায় না'।

         'গায়ে মানে না আপনি মোড়ল '। পাড়ার লোকেরা দীর্ঘ সময় বড় বউকে দেখে ও ওনার সাথে মিশে মানুষ হিসেবে উনি কী রকম তা বুঝে গেছেন। তাই বেশিরভাগ মানুষই ওনাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরতে ওস্তাদ উনি। সংসারে নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী সব করার চেষ্টা করেন। নরম স্বভাবের শাশুড়িকে এতোদিন ধরে বুঝে নিয়েছেন। তাই তাঁকেও গুরুত্ব দেন না। বরং বিভিন্ন কাজ করার জন্য শাশুড়িকে আদেশ করেন। নিরীহ শাশুড়ি সংসারে অশান্তির ভয়ে মাথানত হয়ে সব কাজ করেন। 

         আজ থেকে বাইশ বছর আগে বড় বউ সুষমা এ বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিলেন। তখন রবিন অস্টম শ্রেণীর ছাত্র। প্রথম পাঁচ-ছয় বছর সুষমার আসল রূপটি কারো সামনে আসে নি। রবিনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালোই ছিল। নিজের অনেক কাজ রবিনকে দিয়ে করিয়ে নিতেন তিনি। চিরকালই অন্যকে হুকুম করতে খুব ভাল পারেন ইনি। সুষমার ছেলে সৌভিতকে স্কুলে দিয়ে আসা, নিয়ে আসা, বাড়িতে সৌভিতকে রাখা, সংসারের বিভিন্ন ফাইফরমাস খাটা, সবই করতেন রবিন। শ্বশুরের সাথে সুষমার প্রতিদিন অশান্তি হতো। মাথা গরম করে তিনি বাপের বাড়িতে গিয়ে পড়ে থাকতেন। মাথা গরম করে মুখে যা খুশি বলতেন সুষমার শ্বশুর। সেই অশান্তিও যাতে ঠান্ডা হয়ে যায় সেজন্য রবিন তার বাবাকে বোঝাতেন। যেখানেই ঘুরতে যেতেন তিনি ভাইপোর জন্য কিছু না কিছু কিনে আনতেন। পুজোর সময় পরিবারের সকলকে কিছু না কিছু উপহার দেওয়ার চেষ্টা করতেন। ইনকাম সোর্স বলতে প্রাইভেট টিউশন।

         সারা জীবন রবিনকে কম ঠকান নি এরা। বেশ কিছু বছর পর সুষমার গর্ভে জন্ম নেয় একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তান। মেয়ের নাম দেন সৃজনী। মেয়ে হওয়ার আগে থেকেই রবিনের সঙ্গে সুষমার সাংসারিক ঝামেলা বাঁধে। রবিন তার বৌদি সুষমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেন। তবুও দাদার ছেলে-মেয়ের প্রতি তার ভালোবাসা একটুখানিও কমে নি। সৃজনীর জন্যও রবিন কম করেন নি। তবে আগের থেকে সে অনেক সচেতন ছিলেন। কোলে করে নিয়ে গিয়ে ভাইজির ছবি তুলে আনা, কাজের সময় তাকে আগলে রাখা সবই করেছেন। অথচ মানুষ কত বেইমান। রবিনের  বিয়ের একবছর পর যখন মেয়ে আরাধ্যা হল,তখন সুষমা হিংসায় জ্বলে গেলেন।কারণ তার ছেলে-মেয়ের আদরে ও সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে আর একজন অংশীদার এসেছে তাই। অবাক করার বিষয়, মেয়েটিকে একদিনের জন্যও ধরেন নি সে। মায়ের ও রবিনের শত ব্যস্ততার মাঝে আরাধ্যা অবহেলায় অনাদরে বড় হয়ে ওঠে। তাছাড়া রবিনের মাও মন্দিরের কাজের চাপে বাচ্চাটির দিকে নজর দিতে পারেন নি। অথচ সুষমার দুই ছেলে-মেয়ে দাদু-ঠাকুমার ও কাকার সহযোগিতায় বড় হয়ে উঠেছিল। সুষমা ও তার স্বামীর সন্তানদের বড় করতে তেমন কোন চাপ কোনোদিন নিতেই হয় নি। অথচ বার বার ব্রাত্য রবিনের পরিবার।

         আজ রবিনের মেয়ের বয়স সাত বছর। অনেক কিছুই ও এখন বুঝতে পারে। তবে বাবা-মার প্রতি হওয়া ন্যায়-অন্যায় জ্ঞান এখনো ওর আসে নি। ছোট হওয়ায় বাবা-মার বারন করা সত্ত্বেও অনেক কাজ করে সে। ছোট বলে রবিনরা কিছু বলেন না। তবে মনে মনে রবিন ভাবেন, যেদিন ও বুঝতে শিখবে সেদিন থেকে তাদের অমতের কাজ অবশ্যই করবে না। সুষমা ও রবিনের দাদা আরাধ্যাকে লোক দেখানো ভালোবাসেন। এই বিষয়টি আরাধ্যর বাবা-মা দুজনেই বোঝেন। মাঝে মাঝে আরাধ্যার প্রতি রেগে গিয়ে গালাগাল করেন সুষমা ও তার স্বামী। পাড়ার লোকেরাও এই মেকি ভালোবাসার বিষয়টিও জানেন। রবিনের বাবার উপর তারা রেগে যান। কেউ কেউ বলছেন --- " রবিনের বাবার রবিনের প্রতি আচরণ দেখলে রাগ হয়। ওনার দুচোখ আছে। যার জন্য কোনোদিনও কারো কাছে একাটা কথাও  শুনতে হয় নি, সেই অবহেলিত ও মানসিক অত্যাচারিত হয় বেশি।অথচ আজ ত্রিশ বছর ধরে যে ছেলের জন্য প্রতিটি পদে পদে মানসম্মান হানি হয়েছে, বাড়িতে লোক এসে ঝামেলা করে গেছে , বাবার সঙ্গে মারামারি করেছে, লোকে মাতাল তকমা সেঁটে দিয়েছে সেই ছেলেই তার নয়নের মনি। এগুলি যোগ্য বিচার নয়।" আবার কেউ কেউ বলছেন --- "শুধু দুই ছেলে নয় দুই বউমার ক্ষেত্রেও আছে দুই চোখ। ছোট বউ শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য প্রাণপাত করলেও সংসারে তার কোনো নাম নেই। অথচ বড়বউ লোকদেখানো একটু কাজ করলেই তার প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। তাছাড়া বড়বউ এই সংসারে অনেক আগে এসে সকলকে বুঝে গেছেন। বয়সের ভাড়ে ও বুদ্ধির জোরে ছোটবউ তার কাছে শিশু।"

         ‌ বড় ছেলে রথীন ও বড় বউ সুষমার অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে ছোটছেলে রবিন একসময় আলাদা হয়ে যান। বাবাকে বলেছিলেন-- " আজ চল্লিশ বছর আপনি আমাদের চালাচ্ছেন। আজ আপনার বয়স হয়েছে। আমিও হয়তো আর বছর কুড়ি বাঁচব। তা আপনাদের বাকী জীবনটা আমাকে সেবা করার সুযোগ দিন। আজ থেকে আপনারা দুজন আমার কাছে খাবেন। আপনাকে এই আটষট্টি বছর বয়সে আর খাটতে হবে না।" বাবা রবিনের কথায় রাজি হন নি। তিনি বলেছিলেন --- " না বাবা, আমরা কোনো ছেলের কাছে খাব না। আমাদের বুড়ো-বুড়ির মন্দিরের ভোগে হয়ে যাবে। তোমরা আলাদা খেলে খাও।" রবিন বুঝেছিলেন বাবা অভিমান করে এই কথা গুলো বলছেন। তিনি চান না এই বেঁধে রাখা সংসারটা আলগা হয়ে যাক। কিন্তু রবিনের আত্মসম্মান রবিনকে হাড়ি আলাদা করতে বাধ্য করেছিল। দাদার প্রতিটি মুহূর্তে অশ্রাব্য গালাগাল মেনে নিতে পারেননি সে। এই অপমান তার মনে প্রতিটা মুহূর্তে খুবই বাজত।

       ছোটছেলে রবিনের কথাগুলো বাবা মেনে না নিলেও, বড় ছেলে রথীনের সংসারে টাকা দিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করেন। বড় বউ সুষমা বড় সুযোগ পেয়ে যান ছোটছেলে রবিনদের নামে মগজ ধোলাই করার। সব জেনে শুনেও চুপ করে থাকেন তারা। এখনকার দিনে নিজের ছেলের থেকে বউমা বেশি আপনার হয়ে যায়। বাবা-মাও কখনো কখনো ভুল করেন। কিন্তু তারা সন্তানের কাছে ধরা দেন না। বাংলার প্রতিটি সংসারে আজ একই দশা।

     রবিন বাড়ির মধ্যে চুপচাপ থাকেন। কারণ 'জোর যার মুলুক তার'। আজ রবিনের এই দশার জন্য সে তার বাবাকেও দায়ি করেন। দুটো ছেলে হওয়া সত্ত্বেও তিনি সারাজীবন বড় ছেলের কথা ভেবে গেছেন। ছোট ছেলে পড়াশোনা করে চাকরি না পেলে কি করবে -- তা ভাবেন নি। পাড়ার লোকেরাও সব জানেন। তিনি রবিনকে লঘু পাপে গুরু শাস্তি দেন। "একবার আমের সিজনে রাত এগারোটার সময় রবিনকে বাজার থেকে আম কিনে আনতে বলেন। রবিন তখন হাফপ্যান্ট পরে ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন। বাবাকে তিনি বলেন---"বাবা আমি এখন খাতা দেখছি, কালকে খাতাগুলো ছাত্র-ছাত্রীদের দিতে হবে। একটা বড় আম আছে, আপনার হয়ে যাবে।আজ আর আম আনতে হবে না।" রবিন এমন কথা বলে নিজের বিপদ ঢেকে এনেছিলেন। বাবা সকলের সামনে তাকে এমন গালাগালি দেন যে রবিন অবাক হয়ে ঘন্টা খানেক বসে ছিলেন আর দুচোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়েছিল। সাত বছর বাবা তার সঙ্গে কথা বলেননি। রবিন আজ পর্যন্ত বুঝতে পারেন না এটা কেমন পিতৃসুলভ আচরণ। সকলের সামনে ছোটছেলেকে অপমান করে আনন্দ পেতেন রবিনের বাবা। কয়েকদিন লোকজনের সামনে এমন গালাগালি তিনি দিয়েছিলেন যে মনের কষ্টে ও লজ্জায় তিনি কয়েকবার বাড়ি ছেড়ে পিসিদের বাড়ি চলে যান। নিজের ছেলেদের সঙ্গে এমন ব্যবহার কেউ করেন!!

     তাছাড়া দুটো বউকেই তিনি পছন্দ করে এ বাড়িতে এনেছিলেন। কিন্তু দুজনের সঙ্গে দুরকম ব্যবহার কেন? ছোট বউয়ের সামান্য খুঁত পেলে ধুয়ে কাপড় পড়িয়ে দেন, কিন্তু বড় বউয়ের শত অপরাধও মাপ হয়ে যায়। গত হোলির দিন বড় বউ মদ খেয়ে বাড়ির সামনের তিন রাস্তার মোড়ে বেলাল্লাপনা করেও কোনো শাস্তি পান না। আবার পাড়ায় কারোবাড়ি যাওয়ার জন্য ছোটবউকে শ্বশুর-শাশুড়ির ভৎসনা সহ্য করতে হয় বছরের পর বছর। এ কেমন বিচার! এখনকার বেশিরভাগ সংসারেই এমনটি চলছে। আজকের সংসারে যে যত তেল দিতে পারে তার আদর ও কদরটাই বেশি।

           একদিন মেঘ না চাইতে জলের মতো বড় বৌমা সুষমার ছেলে সৌভিত লাইন পাড়ের একটি মেয়েকে বিয়ে করে বাড়ি আনে। সুষমা দেখে আগুন হয়ে যান। বাড়িতে তাকে ঢুকতে দেয় না সে। কিন্তু দাদু-ঠাকুমা নাতির মুখের দিকে চেয়ে বড় ছেলে ও বড় বউকে বুঝিয়ে ঘরে তোলেন। সৌভিতের দাদু সুষমাকে বলেন---"লোক হাসিয়ে লাভ নেই। বিয়ে করেই যখন ফেলেছে, তখন মেনে নাও। কার ভাগ্যে কি আছে কেউ বলতে পারে না। তোমার ছেলের বাউন্ডুলেপনা এই মেয়েই ঠিক করে দেবে। আমরা অশান্তি চাই না। আর কদিন আমরা বাঁচব। আমার অনুরোধটি রাখো।" শশুরের কথা রেখেছিলেন সুষমা। কিন্তু মেয়েটির পরিবার ও মেয়েটিকে তার পছন্দ হয় না। কোন মতে নিজেদের মধ্যে বৌভাত সেরেছিলেন তিনি। রবিনরা এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই করেন নি। শুধু ঈশ্বরের কাছে বলেছিলেন--- " বড়বউকে যেন এই মেয়েটি উচিত শিক্ষা দেয়। এবার যেন ওনার অন্যের পিছনে লাগা বন্ধ হয়। যেমন কর্ম তেমন ফল লাভ করেন উনি।" 

            ঈশ্বর রবিনের কথা সত্যি সত্যি শুনেছিল। এক সপ্তাহ যেতে না যেতে বৌমার প্রতিটি কাজে খুঁত বের করে ঝামেলা করেন সুষমা। বৌমা চুপচাপ সব সহ্য করে চোখের জল ফেলে। সুষমা বুঝতে পারেন--- 'এই মেয়েকে সে উচিত শিক্ষা দিতে পাড়বে। এ খুবই নরম প্রকৃতির মেয়ে।' কিন্তু তার চিন্তা যে কতটা ভুল তা বুঝতে পাড়েন বিয়ের দুসপ্তাহ পর থেকে। একদিন রাতে সুষমার বৌমা তার ছেলের সাথে মায়ের এই আচরন নিয়ে তুমুল ঝগড়া করে। সে বলে--- "আমি এখনি  আত্মহত্যা করব। তোমার ভবিষ্যৎ যদি আমি নষ্ট করে দিতে না পাড়ি তবে আমিও বিপাশা নই। তোমার মা কী ভেবেছে আমাকে, আমার উপর মানসিক অত্যাচার করবে আর আমি মুখবন্ধ করে সব মেনে নেব। সেগুরেবালি। ওনাকেও আমার টাইট দিতে বেশি সময় লাগবে না। উনি 'ঘুঘু দেখেছেন ঘুঘুর ফাঁদ দেখেন নি'।" সৌভিতের চোখে জল দেখা যায়। সে বিপাশাকে বলে --- " আমি মার সঙ্গে কথা বলব। তুমি এমনটি করো না। লোকে জানলে ছিঃছিঃ করবে।" সৌভিতের কথা শুনে বিপাশা বলে --- " আমি এই দুই সপ্তাহ এসে বুঝে নিয়েছি তোমার মাকে। তাছাড়া এ পাড়ার মানুষের কাছ থেকে আমি তোমাদের সবার ইতিহাস জেনে নিয়েছি। সবার পিছনে লাগা তোমার মার অভ্যাস। অত্যন্ত লোভী ও একাসেরে মহিলা। তোমার কাকা-কাকিমার মতো মানুষের পিছনে লেগে এসেছেন চিরদিন। তারা নরম প্রকৃতির মানুষ বলে তোমার মার সঙ্গে পেড়ে ওঠেন নি। তাছাড়া শ্বশুর-শাশুড়িকে চিরকাল হাত করে সর্বস্ব দখল করার খেলায় মেতে উঠেছেন উনি। বঞ্চিত করতে চান অন্যদের। তোমার বাবাও ভালো মানুষ নন। মদ খেয়ে নিজের ও এই পরিবারের মান-সম্মান নষ্ট করেছেন বারংবার। সেও তোমার মার মতো মানসিকতার। ভাই-বোনকে ঠকিয়ে একা ভোগ করতে চান। আমি জানি, আমি লাইন পাড়ের মেয়ে বলে তোমার মা আমাকে পছন্দ করেন না। কিন্তু আমিও যে মানুষ সেটা উনি বোঝেন না।" এরপর সৌভিত বিপাশাকে বলে --- " তাহলে তুমি কী চাও? কী করব আমি?" বিপাশা বলে --- " তুমি তোমার মাকে বলে দিও উনি যেন আমার পিছনে না লাগেন, তাহলে উনাকে আমি উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব। আমি কিন্তু তোমার কাকা-কাকিমার মতো নই। তুমি ভালোকরেই জানো আমি অন্যায় সহ্য করি না।"

         ছেলের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে সবকিছু শোনেন সুষমা। বুঝতে পারেন এ মেয়ে সুবিধার নয়। এর সঙ্গে পেড়ে ওঠা যাবে না। তাই পরের দিন সকালে ছেলেকে ডেকে মনের কষ্টে বলেন ---" আজ থেকে তোরা আলাদা থাক। তোর বউয়ের সব কথা গতকাল আমি শুনেছি। ও আমাদের সঙ্গে সংসার করতে পাড়বে না। তাছাড়া ওর কথা আমি সহ্য করতে পাড়ছি না।" ছেলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সে পড়ে উভয় সংকটে। একদিকে মা, অন্যদিকে বউ। মার আচরন ও চরিত্র অবশ্য ছেলের অজানা নয়। কিন্তু সে কিছু বলতে পাড়ে না। মায়ের কথা মতো বাড়িতে কাকাদের মতো হাড়ি আলাদা করে নেয়। একমাত্র ছেলে মায়ের থেকে আলাদা হয়ে যায়। কাকা রবিন সমস্ত বিষয়টা শুনে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলেন----- " আপনি আছেন প্রভু। এই দিনটির জন্যই বসে ছিলাম। যেমন কর্ম তেমন ফল।"




ক্ষিধে - পিনাকী || Khidhe - Pinaki || Anugolpo || অনুগল্প || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

      ক্ষিধে 

       পিনাকী



চওড়া রোদ মাথায় নিয়ে , প্রায় কুড়ি জন লোক, মোটা লাঠি, চোঙ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

সলমানের বাড়ির উঠান ; দেহটা তাজা -তাজা লাশ হয়েছে। 


ওদের কাছে আগেই খবর ছিল, নিষিদ্ধ প্রাণীর মাংস ফ্রিজে লুকানো।

 আজকে রামকর্ন ঠাকুর ; প্রধান চ্যালা বিল্লু, আরো অনেকেই দল বেঁধে এসেছে।

 গণ বিক্ষোভে, গো রক্ষক বাহিনী চড়াও হয়েছিল ; সলমনের দুর্বল , বছর ষাটের দেহ, দুমড়ে মুচড়ে শুইয়ে দিলো, বুকে লাথি, মুখে ঘুঁষি এলোপাথাড়ি ; বছর দশের ছেলেটিও ছাড় পায়নি, মহিলারা বাড়ির ভিতর থেকে কাঁদছিল, বছর সাতের বাচ্চা মেয়ে দিলরুবা বলল - আব্বা!!


রামকর্ন গোঁফে তা দিতে দিতে বলল - অপবিত্র কাজ করছিস! আগেই সাবধান করেছিলাম।


সবটুকু প্রাণ তখনও ফুরিয়ে যায়নি, সলমন হেঁচকি দিয়ে বলল - পানি, ব্যেটা পানি দিও। 


আফসার, বাইশ বছরের ছেলে, ছুটে গিয়ে পানি ঢেলে দিয়েছে, ঠোঁট বেয়ে জল গড়ায় ; দুহাত তুলে সলমন বলল - ম্যায় বেঈমান নেহি হু । উটা গোশত নয়।


ততক্ষণে বিল্লু , সলমনের বাড়ির মধ্যে ঢুকে , ফ্রিজ থেকে কাঁচা মাংস বের করে ফেলেছে , গন্ধ শুকছে, বলল - রেওয়াজি!




উত্তরপ্রদেশের আদালত, বিচারকের হাতে মাংসের নমুনার রিপোর্ট এসেছে - " Uttar Pradesh veterinary department said that the meat was mutton." ; খাসির মাংস ।


রামমকর্নের উকিল বলল - আমার মক্কেল, গণবিক্ষোভ থামাতে গিয়েছিল।


বিচারপতি মহাশয় , কালো মোটা ফ্রেমের চশমা পড়ে, তাকিয়ে আছেন। বললেন - গণবিক্ষোভ কিসের? 

- হুজুর, নিষিদ্ধ মাংস থাকবার কথা কেউ গ্রামবাসীদের বলেছিল, ভুলবশত হয়েছে। 

- লেকিন , ভুল খবর ছিল। রিপোর্ট আমার সামনে রয়েছে।

- ধর্মাবতার এইজন্য আমার মক্কেল দায়ী নয়। 

- জননেতা রামকর্ন, বিক্ষোভ সামাল দিতে পারেনি কেন?


রামকর্নের উকিল হেসে বলল - গাই ছিল না মানছি, কিন্তু খাসি তো ছিল? 

বিচারক ,উকিলের দিকে তাকিয়ে বললেন - এই বিক্ষোভের কারণ তাহলে কী? 


বিল্লু ওদের দিকে তাকিয়ে চকচক চোখে বলল - রেওয়াজি খাসিই ছিল, পেটভরে বহুদিন পর খাসি - চাউল খেয়েছি! ক্ষিধে, পেটে ক্ষিধে ছিল।



 সলমনের ফ্রিজের মাংসটা খাওয়ার পর, বিল্লুর পেটে আর ক্ষিধে নেই! 

বিনির সৌর খোঁজ - মনোরঞ্জন ঘোষাল || Binir Souro khojh - Monoranjan Ghoshal || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

             বিনির সৌর খোঁজ

                 মনোরঞ্জন ঘোষাল


 

ডোমস শুধু আমাকে মেরে ফেলার প্লান করেছিল এমনটা নয়। সে আমার গবেষণাকে অসম্মান করেছে। তাই আমার গবেষণাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন‍্য জেদ খানিকটা সে আমার বাড়িয়েই দিয়েছে। তার মত গবেষকদের মুখে ঝামা ঘসে দিতে আমি আবার আমার গবেষণা ভীত্তিক খোঁজ শুরু করলাম। আগে তো চাঁদের দিকে তাকিয়ে জীবের দর্শন পেয়ে ছিলাম। সেই কথা বিজ্ঞানী মহলে জানিয়ে দিয়েছি। এবারে সূর্যের দিকে একবার নজর দেব বলে মনে করছি। প্রখর আলোর জন‍্য তার দিকে তো তাকানো যায় না। তার জন‍্য এক বিশেষ ব‍্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


 


এদিকে মাইক্রোস্কোপিক দূরবিক্ষন যন্ত্রটি এখন আমার কাছে একটা মস্ত বড় হাতিয়ার। যেমনটি ছিল গ‍্যালিলিয়ের। তবে এটি গ‍্যালিলিওর টেলিস্কোপের থেকে অনেক উন্নত। আসলে আমি এটিতে অত‍্যাধুনিক প্রযুক্তি ব‍্যবহার করেছি। আমি এক বিশেষ প্রকার লেন্স ব‍্যবহার করেছি এই যন্ত্রে। যেটি সাধারণ লেন্সের কার্যকারিতা বহু গুণে বাড়িয়ে দিতে পারে। এই পদ্ধতি টিও আমার নিজস্ব।


 


এক বিশেষ সংকর লেন্স। লেন্সের কাঁচের সঙ্গে বিশেষ ধাতুর একটা শতকরা ভাগ মিশ্রিত করলে তার স্বচ্ছতার কোন পরিবর্তন ঘটে না। মানে কাঁচটি ঘোলাটে হয়ে যায় না। সেই কাঁচ দিয়ে লেন্স তৈরী করলে লেন্সের বিস্ফারিত করার ক্ষমতা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে যায়। আসলে ঐ অপদ্রব‍্যটি অর্থাৎ যেটিকে এক সামান‍্য ভাগে গলিত কাঁচে লেন্স তৈরীর সময় মেশানো হল। সেটি স্বাভাবিক কাঁচের তুলনায় অনেকটা ক্ষমতা শালী হয়ে ওঠে। সেই অপদ্রব‍্য মিশ্রিত কাঁচ দ্বারা গঠিত লেন্সের মধ‍্যে আলোর প্রতিসরণ ঘটলে তার চ‍্যুতি কোনকে বাড়িয়ে দেয় বেশ অনেকটা পরিমানে। বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর আমি এই সত‍্যটি উদ্ভাবন করতে সমর্থ হয়েছি। সেই বিশেষ ভাবে তৈরী লেন্স আমি আমার মাইক্রোস্কোপিক টেলিস্কোপে ব‍্যবহার করে অসাধারণ ফল পাচ্ছি।


 


এতদিন ওই দিয়ে আমার সৌর গবেষণাকে যাচাই করার কথা মনে আসে নি। সেটিকে গাণিতিক ভাবে আমি তাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠা করেছি। পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করা হয় নি। আজ ডোমসের ওখান থেকে প্রত‍্যাবর্তন করার এক বৎসর কাল অতিবাহিত হল। সকালে আমার হাত ঘড়িটি আমাকে স্বরণ করিয়ে দিল। আমার এই ঘড়িটি এমন স্মরনীয় ঘটনা গুলিকে ওর স্মৃতিতে ধরে রাখে। আর সময় মত আমাকে মনে করিয়ে দেয়। মোবাইল ফোনেও ঐ কাজ করা যায় তবে মোবাইলের ক্ষতিকর বিকিরণের জন‍্য আমি ওটির ব‍্যবহার প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি। বদলে একটি অন‍্য যন্ত্র তৈরী করায় মনযোগ দেবো  বলে মনে করে আছি।


 


ডোমসের ওখানে আমি ষোলোই আগস্ট গিয়ে ছিলাম। আর ফিরেছি তেইশে আগস্ট। আজও সেই তেইশে আগস্ট।


 


আজ তেইশে আগস্ট ২০১৩ সকাল দশটা। আমার অদৃশ‍্য কাঁচ ঘরটায় সৌর খোঁজে মন নিবেশ করব বলে মন স্থির করে নিলাম। সকলের দৃষ্টিকে আড়াল করে আমি আমার সাধের ল‍্যাবে প্রবেশ করলাম। সেখানে এখন অনেক কাজ করতে হবে। বিশেষ করে ক দিনের জন‍্য আমাকে টেবিলে সৌর দর্শনের যন্ত্রপাতি সব সাজিয়ে নিতে হবে। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় সব কিছু হাতের কাছেই সাজিয়ে রাখতে হবে। নইলে সময় মত সব জিনিস পত্র দরকারে পাওয়া যাবে না। আমার স্টেচিং চেয়ারের পাশে যন্ত্রপাতি সজ্জিত করতে শুরু করলাম। মাইক্রোস্কোপিক টেলিস্কোপ যন্ত্রটিকে একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করলাম। যাতে সেটি সূর্যের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমান ভাবে একই কৌনিক মাণের হারে আপনা থেকেই সরতে থাকবে। আমি তো আর সারাটা রাত আর দিন ধরে সব সময় সেই অনুবিক্ষনিক দূরবিন যন্ত্রের কাছে বসে থাকব না। মাঝে মাঝে অন‍্য কাজে সেখান থেকে সরে যেতে হতে পারে। তাই তার পর্যবেক্ষণের ছবি সে আপনা থেকেই তুলে রাখবে। আমার খোঁজের যাতে কোন রকম আসুবিধা না হয় তার পাকা পোক্ত ব‍্যবস্থা বলতে পার। এই সব জিনিস পত্র যথাযথ ভাবে সাজাতে বিকেল হয়ে গেল। সূর্য তখন দিগন্ত রেখার কাছে পৌঁছায় নি। একটি বার  যন্ত্রের নলে চোখ ঠেকিয়ে তাকালাম সেই হেলে পড়া সূর্যের দিকে। ভাল দেখতে পেলাম না। লাল রঙের বড় তরঙ্গ দৈর্ঘ‍্যের আলোক রশ্মি গুলি আকাশে ছেয়ে দৃষ্টিকে অস্পষ্ট করে তুলছে। বুঝলাম তার প্রতিরোধের ব‍্যবস্থা করতে হবে। এই নিয়ে এক সময় মনযোগ দিয়ে ছিলাম। তখন এর প্রতিকার করার জন‍্য এক বিশেষ কোটেড চশমা তৈরী করে ছিলাম। আজ তার কথা মনে পড়ে গেল। সেই তৈরী করা স্পেশাল কোটেড চশমার কথা। যেটি চোখে পরে থাকলে চোখে আছড়ে পড়া উজ্জ্বল বেগ বান আলোক রশ্মিকে বাধা দেয়। ফলে চোখকে অযথা আলোর ঝাপটা সহ‍্য করতে হয় না। ঐ নীতি প্রয়োগ করলাম আমার মাইক্রোস্কোপিক টেলিস্কোপ যন্ত্রের উপরের লেন্সে।  একটি লেয়ার সেই স্পেশাল কোট লাগিয়ে দিলাম তার ওপরে। ফলে অযথা অযাচিত আলোর ঝলকানি আর লেন্সের ভেতর দিয়ে যন্ত্রের ভেতরে প্রবেশ করতে পারল না। তাতে আমার দেখাতে কোন বাধা সৃষ্টি হল না। ফলে আমি আরামে বিনা বাধায় সব কিছু দেখতে পাচ্ছি। সেই জন‍্য আমার আলোক বিশ্লেষণটা অনেকটা সহজ হয়ে পড়ল। 


 


আলোক বিশ্লেষণ হল এক বিশেষ কৌশল। যেখানে আলোক রশ্মি গুলিকে পছন্দ মত ভাবে আলাদা করে নেওয়া যায়। আলোক রশ্মি যে কণিকার প্রবাহ তা আমরা জানি। সেই কণিকার নাম নিউটন দিয়েছিলেন ফোটন। তিনিতো আলোর কণিকা তত্ত্বের উদ্ভাবক। প্রমাণ করেছিলেন আলোকের কণিকা ধর্ম। তিনি আলো যে কণিকা সেটি বললেও সে কণিকারা যে আকার ও ভরে ভিন্ন হতে পারে তা বলেন নি। তিনি বলেছিলেন আলোর কণিকা গুলি ধর্মে অভিন্ন।


 


এই কথা সত‍্য নয়। আইন্সটাইন তার সমীকরণে সেই কথা স্পষ্ট দেখিয়েছেন। তা ছাড়া সনাতনী বলবিদ‍্যার ধারণাকে বিশ্লেষণ করলেই তা জানতে পারা যায়। সাধারণ আলো আর এক্স লশ্মির কথা ভেবে দেখ? সাধারণ আলোকের তুলনায় এক্স রশ্মির ভেদন ক্ষমতা অনেক বেশি। তা হলেই বোঝ? হয় এক্স রশ্মির কণিকা গুলোর গতিবেগ সাধারণ আলোর কণার তুলনায় বেশি। নতুবা এক্স রশ্মির কণিকা গুলো সাধারণ আলোক কণিকার তুলনায় আকারে অনেকটা ছোট। তবে সম্প্রতি প‍্যারিস-জার্মানিরর এল এইচ সির গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে যে আলোর থেকে বেশি গতি সম্পন্ন কণিকা আছে। সত‍্যেন বসুর নামে সেই কণিকা কে বোসন বলে অভিহিত করা হয়েছে। অনেকে অবশ‍্য ঈশ্বর কণা বলে সেই ক্ষুদ্রতর কণাকে অভিহিত করছেন।   ওই ক্ষুদ্রতর না ওর থেকেও ছোট ক্ষুদ্রতম কণিকার কথা আমি অনেক আগেই বলে ছিলাম। তার নাম দিয়েছিলাম একক কণিকা বা ইউনিট পার্টিকল। এটিও আমার এক অমোঘ ধারণা। আমার বস্তুবাদ তত্ত্বে এর উল্লেখ আছে।


 


আসলে বস্তু ছাড়া যে বস্তুর সৃষ্টি হতে পারে না সেটাকেই বলা হয়েছে সেখানে। তার সঙ্গে ইউক্লিডের জ‍্যামিতির ধারণা কে জুড়ে দিয়েছি মাত্র। শক্তি আর বস্তু আদতে এক জিনিস। বস্তুর এক বিশেষ অবস্থা হল শক্তি। বস্তুকে যেমন শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। তেমন শক্তিকে বস্তুতে রূপান্তর করা যায়। আমার ল‍্যাবে আমি তা করে দেখেছি। একটা আলোক রশ্মি থেকে ভারি কণার বস্তু গঠন করেছি। আলোক রশ্মি তো একটি কণা না। অজস্র কণার একটা স্রোত। কোয়ান্টামের ধারণায় এক ঝাঁক কণিকার সমাবেশ বলতে পার। এখন থাক সে কথা।


 


নানা বর্ণের আলোক রশ্মি আসলে নানা প্রকারের কণিকার প্রবাহ। নিউটনই আলোক রশ্মিকে প্রীজমের মধ‍্যে দিয়ে পাঠিয়ে আলাদা করে দেখিয়ে ছিলেন। চুম্বক ঐ নানা বর্ণের আলোক রশ্মির ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই যেমন লাল বর্ণের আলোক রশ্মি চুম্বক দ্বারা বেশি আকর্ষিত হয়। কারণটা খুবই সাধারণ। এতে লোহার কণা থাকে তাই। এই ভাবে বিশেষ বিশেষ পদ্ধতিতে আলোর কণা গুলিকে আলাদা করে দিয়ে আমি আমার পছন্দ মত আলোক রশ্মি টিকে কাজের জন‍্য বেছে নেবার পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকি। একেই আলোক বিশ্লেষণ বলে থাকি।


 


সন্ধ্যা হবার কিছুটা আগে যখন সূর্য অনেকটা দূরে সরে গেছে। তার থেকে নির্গত আলো বেঁকে তেরছা হয়ে ধেয়ে আসছে আমার কাছে। সে আলোর বেগ অনেক কমে গেছে। ঠিক তখনই কিছুটা আলো আমি ধরে নিলাম আমার আলোর ফাঁদ যন্ত্রে। এটি আমার তৈরী এক বিশেষ যন্ত্র। যেটিতে আলো ধরে রাখা যায়।


 


সকলেই জানে আলো প্রতিফলিত হয়। এবং দর্পণে তা অনেকটাই বেশি পরিমানে হয়ে থাকে। কতগুলো দর্পণকে বিশেষ কোনে স্থাপন করে তাতে আলো ফেললে। সেই আলো যদি সর্বদা এই সকল দর্পণের মধ‍্যে প্রতিফলিত হতে থাকে। তো সে আর কখনো প্রকৃতিতে মুক্ত হতে পারে না। তৈরী ঐ যন্ত্রে আটকা পড়ে থাকবে অনন্ত কাল। প্রয়োজন মত তুমি কোন একটি দর্পণকে সরিয়ে আলোকে ফাঁদ মুক্ত করে ব‍্যবহার করতে পারবে। আমি তাই করি। প্রয়োজন হলে আলো ধরে রাখি আর প্রয়োজনে সেই আলোকে কাজে ব‍্যবহার করে থাকি। আজ


 


দিন শেষ হবার আগে আমি কিছুটা আলো তাই ধরে নিলাম আমার আলোক ফাঁদ যন্ত্রে। এবার রাত ঘনিয়ে এল। আমি আমার অদৃশ্য কাঁচ ঘরেই সময় কাটিয়ে চলেছি। যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্র সাজিয়ে নজর দিয়ে বসে আছি। অদৃশ‍্য কাঁচ ঘর এমন কিছুই না। আলোর প্রতিফলন ধর্মকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা।


 


বস্তু থেকে আলো বেরিয়ে আমাদের চোখে এসে পড়লে আমরা সেই বস্ত টিকে দেখতে পাই। সেই আলো বস্তুর নিজের দহনের আলো হতে পারে আর হতে পারে অন‍্য কোন উৎসের আলো। যা তার গায়ে  প্রতিফলিত হয়ে ছোটে চলেছে । যখন বস্তু আলো প্রতিফলন করে এবং সেই আলো কারো চোখে ফিরে না আসে। তবে সেই বস্ত টিকে আর দেখা যাবে না। আমার কাঁচ ঘরের সূক্ষ্ম কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে আলো আনায়াসে ভেতরে চলে আসতে পারে প্রতিসৃত হয়ে। যৎ সামান‍্য যা কাঁচের দেয়ালে বাধা পেয়ে প্রতিফলিত হয় তা  চোখে মালুম হয় না। আর ঐ প্রতিসৃত আলোক রশ্মি গুলিকে দর্পন দ্বারা বিশেষ কোনে প্রতি ফলিত করে একত্রিত করে এক বিশেষ কোনে মহাকাশে মুক্ত করে দিয়ে থাকি। ফলে আসে পাশের কেউ আমার ল‍্যাব দেখতে পায় না। উপর থেকে দেখলে আগুনের গোলা বলে মনে হয় । তাই ভয় পেয়ে উড়ন্ত কোন কিছুই এখানে উপর দিয়ে যায় না। সন্দেহের বসে অনেকে সে দৃশ‍্য দেখার পর খোঁজ করতে এসেছিল কিন্তু নীচে এসে দেখলে তারা কিছুই খুঁজে পায় নি। তবে আমার যন্ত্রটি পেলে তারা খুঁজে পাবে। আমি বাহিরে কোথাও গেলে এটিকে সঙ্গে নিয়ে যাই। নইলে আমি নেজেই আর ল‍্যাব খুঁজে পাব না। এটি এক প্রকার ডিটেক্টর। ল‍্যাবের মধ‍্যে থাকা এক বিশেষ যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে বাইরে থেকে এর অবস্থান জানতে সাহায‍্য করে। অবস্থান সূচিত হবার পর আমি কম্পাসে দিক নির্ণয় করে ল‍্যাবের ভেতরে প্রবেশ করি।  ভেতরে ঢোকার পর সব কিছু দৃশ‍্যমান হয়ে পড়ে। এটি তৈরীর মেকানিজম আমি লিখছি না। তাহলে সকলে বানিয়ে আমার ল‍্যাব খুঁজে বের করবে। আমি বড় বিরক্ত বোধ করব।


 


যদিও রাতে সূর্য আলো দেওয়া বন্ধ করে দেয় না। মনে করলে আমি স‍্যাটেলাইটের দ্বারা প্রতিফলিত আলোকে গ্রহণ করে কাজে লাগাতে পারি। অনেকে একটা কথা ঠিক বুঝতে পারে না। যে আকাশে সূর্যের আলো ছড়িয়ে থাকলেও আকাশ রাতে কালো থাকে কেন? আসলে আলো প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হয়ে আমাদের চোখে না আসলে আমরা উৎস বা প্রতিফলককে দেখতে পাবো না। কারণ আলোক রশ্মিকে চোখে দেখা যায় না। তাই আকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আলোক রশ্মিগুলো কোথাও প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হয়ে আমাদের চোখে আসে না। তাই  কিছুই দেখা যায় না। সে যাক।


 


রাতে আলোর ফাঁদে থেকে আলো নিয়ে একটা আলাদা যন্ত্রে একটু নাড়াচাড়া করলাম। কোন লাভ হল না। কারণ তার সূর্যের সঙ্গে  সংযোগ সূর্য থেকে অনেক আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাই তার চলার পথ আর সূর্য পর্যন্ত বিস্তৃত নেই। সেই আলো সূর্যকে প্রত‍্যক্ষ করাতে পারছে না। এবার আর প্রতিফলিত আলোকে উৎস খোঁজায় ব্রতি হলাম না। জানি সে কাজ ভষ্মে ঘি ঢালার মত হবে। আগুনও জ্বলবে না আর ঘি টুকুও নষ্ট হবে।


 


পরের দিন সকাল হলেই আবার বসে পড়লাম টেবিলে সৌর খোঁজের কাজে। একেবারে সকাল এখনো সৌর কিরণ এখানে এসে পড়ে নি। দেখি বড় একটি মেচলার মত সূর্য সবে উঠে আসছে উপরের দিকে। যেন মনে হয় জ্বলন্ত কয়লা। একেবারে টক টকে লাল হয়ে জ্বলছে। দেখে মনে হয় না সেটি পৃথিবীর থেকে বড়। ধীরে ধীরে তাকে কাছে টেনে এনে বড় করতে থাকলাম। ক্রমে বড় হচ্ছে একটা ঘরের মত বড় হয়ে গেল। আরো বড় করতে লাগলাম। এবার একটা গোটা গ্রামের মত হয়ে পড়ল। তখন তাতে সৌর কলঙ্ক খুঁজতে শুরু করলাম। কিচ্ছু পাওয়া গেল না। তাকে আরো বড় করতে করতে  একেবারে হাতের কাছে ছুঁয়ে ফেলার মত কাছে নিয়ে চলে এলাম। এবার তার দেহে আমাদের ঘরের মত এতটুকু জায়গা দেখতে কয়েক ঘন্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এতটাই বড় করা হয়ে গেছে তার দেহটি। ভেবে দেখলাম তাহলে তো গোটা গ্রামের মত একটা অংশ স্থান পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বহু সময় লেগে যাবে! সম্পূর্ণ তার দেহের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খোঁজ করতে সারাটা জীবন লেগে যাবে! তাই তার আকার কিছুটা ছোট করে নিলাম। ছোট করতেই এক অদ্ভূত দৃশ‍্য নজরে পড়ল!


 


দেখলাম একটা আগ্নেয়গিরি! তার জ্বলা মুখ দিয়ে অগ্নুৎপাৎ হচ্ছে। কোন লাভার নির্গমন হচ্ছে না। বড় বড় জালার মত আগুনের গোলা নির্গত হয়ে ছুটে আসছে আমাদের দিকে। কয়েকটা তো আমাকে লক্ষ‍্যঃ করে ছুটে এল! আমি ভয় পেয়ে গেলাম! দেখলাম সেগুলি ঠিক যেন আমার মাথার উপর এসে আছড়ে পড়ছে। আমি জানি ওতে আমার কোন অসুবিধা নেই। আমি আমার ল‍্যাবের চারিদিকে অদৃশ‍্য লেজার শিল্ড প্রোটেকশন চালু করে রেখেছি। বড় ধুমকেতু এসে আছড়ে পড়লেও কিছু হবে না। তবে সূর্য এসে আছড়ে পড়লে কী হবে বলতে পারবো না। হয়তো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সেটি যে হবার না তা আমি ভাল মত জানি। আর আমি তো কেবল আমার কথা ভাবি না। পার্থিব সকল জীব জগতের কথা আমাকে ভাবতে হয়। ঐ আগুনের ছুটে আসা গোলা আমার কোন ক্ষতি না করলেও পার্থিব বাকি সব কিছুর ক্ষতি করছে। মনে মনে তাই খুব ভয় পেয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে ল‍্যব থেকে বাহিরে বেরিয়ে এলাম দেখার জন‍্য। এই কথা ভেবে যে ঐ ধেয়ে আসা আগুনের গোলা গুলো আসে পাশের পরিবেশের কতটা ক্ষতি করছে। বাহিরে বেরিয়ে এসে অবাক হয়ে গেলাম! কোথায় সেই ছুটে আসা আগুনের গোলা? কোথাও কিচ্ছু তো নেই! পরিবেশের এতটুকু ক্ষতি তো কোথাও হয় নি! চারি পাশে গাছ পালা জীব জন্তু সব কিছুই বহাল তবিয়তে রয়েছে।


 


বরং রৌদ্রে ঝলমল করে গাছেরা যেন খিল খিলিয়ে হাসছে। দিঘির জল  হালকা সেই রোদে তাথৈ তাথৈ নৃত‍্য করছে। পানকৌড়ী মনের আনন্দে টুপ টুপ করে জলে ডুব দিচ্ছে। প্রকৃতিতে মহা সমারোহ। এতটুকু বিমুর্ষতার চিহ্ন কোথাও চোখে পড়ল না।


 


মনে সনন্দেহ হল! তবে কী আমি যন্ত্রে ভুল দেখলাম! আমার যন্ত্র কী সঠিক দিশা দেখাতে পারছে না?মনটা ভাবনায় ভরে গেল। সমস‍্যাটি কী খুঁজে নেবার চেষ্টা করলাম। অনেকক্ষণ ভেবে একটা আন্দাজ করলাম তবে একবার পরখ না করে একেবারে নিশ্চিত হলাম না।


 


আবার গিয়ে বসলাম ল‍্যাবের ভেতরে আমার চেয়ারে। এবারে মন টাকে শান্ত করে চেয়ে দেখলাম সূর্যের দিকে তাক করে থাকা টেলিস্কোপের মুখে লাগানো স্ক্রীন টার উপর। প্রত‍্যক্ষ করলাম আবার সেই দৃশ‍্য। ঝাঁকে ঝাঁকে সেই ভাবেই আগুনের গোলাগুলো সূর্যের দেহের আগ্নের গিরির জ্বালা মুখ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসছে আমার দিকে। যেন  ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র! তখনও ঠিক ভাবে আমার মাথায় আসছিল না কেন এমন দেখতে পাচ্ছি? অনেক ভাবনা চিন্তার পর বুঝতে পারলাম আসল সত‍্য টিকে! প্রত‍্যক্ষ করলাম কোয়ান্টাম তত্ত্ব! শক্তির কণা গুলো দল বেঁধে নির্গত হয় উৎস থেকে। আর এ তো সেই ঘটনা। এগুলো আলোর কণা ফোটন। আমার ম‍্যাগনিফাইং গ্লাসে সেই অতিব সূক্ষ্ম ফোটন কণা গুলিকে এত বিশাল আকারে দেখাচ্ছে। তাই আলোর কণার নিক্ষেপকে গোলা বর্ষণ বলে মনে হচ্ছে। আমার যন্ত্রে এতটাই বর্ধিত করা সম্ভব হয়েছে যে আলোর ঐ তীব্র গতিও ক‍্যামেরায় ধীর গতি সম্পন্ন মনে হচ্ছে। সিনেমার পর্দায় যেমন স্লো মোশনে ছবি দেখা যায়। এখানে তেমন  সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে চলা আলোক কণাদের একটি সিধারণ কণার মত গতি শীল দেখাচ্ছে। কী আশ্চর্য! এমনটাও হতে পারে? তাহলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারিদিকে যে ইলেকট্রন গুলো প্রচণ্ড গতিতে ঘুরে বেড়ায় তাকেও তো একটি স্বাভাবিক গতিতে কেন্দ্রকের চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে থাকা কণার মত দেখাবে? পরমাণু পর্যবেক্ষণের একটা খুব ভাল দিক উন্মোচন হল আমার কাছে এই গবেষণা করতে গিয়ে। সেই নিয়ে আর এক সময় কাজে বসা যাবে। এই অভাবনীয় দৃশ‍্য সচক্ষে দেখে


 


একবার মনে হয়েছিল এই দৃশ‍্য আমি বৈজ্ঞানিক সমাজকে প্রত‍্যক্ষ দর্শন করাব। কিন্তু সেটি যে সম্ভব না। আমার এই ল‍্যাবরেটরী আর যন্ত্রের সেটাপ ছাড়া এই দুর্লভ দৃশ‍্য দেখা অসম্ভব। সেটি যে দ্বিতীয় কোথাও সেট করা যাবে না। আর আমার ল‍্যাবের সন্ধানও কাউকে দেওয়া যাবে না। একটা প্রমাণ স্বরূপ এই লেখাটি  রাখলাম। তাতে যে যা বোঝে বুঝুক। অসত‍্য বলে মনে করে করুক। তবে কেউ কেউ সত‍্য বলে মনেও তো করতে পারে? তাদের উদ্দেশ্যে জানিয়ে রাখি আমার এই উক্তি যথার্থ সত‍্য এবং সচক্ষে দেখা বর্ণনা। এটিকে বিশ্বাস করে গবেষণায় লেগে থাকলে সাফল‍্য আসবেই।


 


এবার মনে এল আলোর কণা গুলো অগ্নুৎপাতের মত নির্গত হচ্ছে ঠিকই। তাবে তা সূর্যের দেহের সমগ্র তল থেকে নির্গত হচ্ছে না। তার দেহের কোথাও কোথাও টর্চ জ্বেলে রাখার মত এমন আগুনের গোলা বের করার আগ্নেয়গিরি রয়েছে। আর বাকি বেশির ভাগ অংশটাই ফাঁকা। আমাদের পৃথিবীর মাটির মত। সমগ্র পৃথিবীর বুকে কয়েকটা মাত্র আগ্নেয় গিরি আছে তাও আবার সব গুলি জ্বলন্ত নয়। বেশির ভাগ দেহ তলই ফাঁকা। তবে আমাদে দেহ তলের মত এতটা ফাঁকা নয় সূর্যের দেহ তল। তবে সমগ্র তল যেমন আগুনের গোলা বলে মনে হয়। সূর্যের সেই দেহ তল তেমনটি না। সেখানে পাহাড় পর্বত ঘর বাড়ি সব রয়েছে। বড় বড় গর্তও রয়েছে চাঁদের মত। যেখানে কোন আগ্নেয় গিরি নেই তাই আলো জ্বলে না। বাহিরে কোথাও থেকে আলো পৌঁছে গেলেও সে আলো আর ফিরে আসে না কোথাও। তাই কালো হয়েই থাকে সব সময়। এই কালো অংশ গুলো হল সৌর কলঙ্ক।আমরা এগুলো খুব একটা দেখতে পাই না। কারণ সৌর ঝড় আর সূর্যের আবর্তণ গতির জন‍্য।


 


সূর্যের দেহে ঝড় বয়ে চলেছে প্রবল বেগে সর্বক্ষণ। সে ঝড় আলোর কণা গুলিকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তার দেহে সর্বত্র। তাই সে দিকে তাকালে ও সব আর দেখা যায় না। শুধু জ্বলছে সারা দেহ বলে মনে হয়। যদিও এর জন‍্য বহুলাংশে দায়ী তার আবর্তণ গতি। পৃথিবীর মত সূর্যও তার নিজের অক্ষের চারিদিকে পোঁ পোঁ করে ঘুরছে। এতটাই তার বেগ যে মুহুর্তের মধ‍্যে আগ্নেয় গিরির জ্বলা মুখ আবার ঘুরে আসছে চোখের সামনে এক পাক ঘুরে। তাই সব সময় ঐ  জ্বলা মুখই আমাদের চোখে ধরা দেয়। অনেকটা চরকা বাজি মত ঘটনা বলে মনে করতে পার। চরকার মুখে আগুন জ্বেলে দিলে সে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকে। দেখে মনে হয় তার দেহের সর্বত্র দিয়েই আগুন জ্বলছে যেন। আদৌ তাই কি জ্বলে? এমন ঘোরার গতি আমাদের মনে করতে বাধ‍্য করায় তার এমন সর্ব দেহ  জ্বলমান অবস্থার কথা।


 


তাই সূর্যের সারা গায়ে আগুন জ্বলছে বলে দেখালেও আদৌ তার সারা গায়ে আগুন জ্বলছে না। তার দেহের বিস্তৃত জায়গা রয়েছে ফাঁকা পড়ে। সেখানে বাস করে সৌর মানব। আমাদের থেকে দীর্ঘাকায় ও সোনার মত তাদের গায়ের রং। সোনা রদ্দুরের দেশে বাস করে বলে হয়তো এমনটা হয়েছে। পরিবেশের প্রভাবে এমনটা হয়ে থাকে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেলানিজম বলে একটা ব‍্যাপার আছে।  আমরা অনেকেই জানি। যেখানে এক এক ইন্ডাস্ট্রি অঞ্চলে ঐ ইন্ডাস্ট্রির জন‍্য বিশেষ পরিবেশ গড়ে ওঠে। সেই পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেবার জন‍্য জীব দেহে নানা রকম পরিবর্তন ঘটে থাকে। একেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেলানিজম বলে। সূর্যের বাসিন্দাদের ঐ রকম সোনালী গড়ন হয়েছে সোনালী রদ্দুরের জন‍্য। আর দেহের আকার বড় হবার কারণ ওদের আবর্তন গতি। যেমন আমাদের বিষুব রেখার বা তার আসে পাশের অঞ্চলে থাকা লোক গুলোর আকার বেশ বড়। ততার পর অক্ষাংশ কমার কারণে আকার কমতে থাকে। অক্ষাংশ কমতে থাকলে তার আবর্তন গতিবেগ ও কম হয়। তাই বাহিরের দিকে ছিটকে যাবার বেগও কম হয়। অর্থাৎ কেন্দ্রাতিগ বল মানুষের লম্বা হয়ে বেড়ে ওঠার পক্ষে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বল যত বেশি হবে তত তাকে খাঁটো করে দেবে। এটিকে অভিকর্ষ বলা হয়। অভিকর্ষের টান কাটিয়ে মানুষ কে বড় হতে হয়। মেরু দেশে মানুষের ওপর অভিকর্ষ টান বেশি তাই তারা লম্বা বেশি হতে পারে না। তাই বলে ঐ একটি কারণ শুধু লম্বা হবার জন‍্য দায়ী তা বলা যাবে না। অনেক কারণের মধ‍্যে এটিও একটি কারণ। না হলে গোর্খা জাতিদের বেঁটে হবার কারণ আর গাণিতিক হিসাব নিয়ে সংশয় দেখা দেবে। কারণ ঐ একই অক্ষাংশে পাহাড়ের মাথায় আর ঠিক সেই পাহাড়ের নীচের মানুষদের আকারের উল্টো পরিণতি ঘটবে কেন? সেখানে তো  পাহাড়ের ওপরে বসবাসকারী গোর্খাদের লম্বা আর নীচে বসবাসকারী দের বেঁটে হবার কথা। এখানে আর একটা যে সত‍্য লুকিয়ে আছে তা বলে রাখি। তাহল অস্বাভাবিকতা। মানুষের ভর অনুযায়ী পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল তার জন‍্য বরাদ্দ আছে। সেই অঞ্চলের নীচের দিকে বা ওপরের দিকে বাস করলে তার শরীর একটা অস্বভাবিকতা অনুভব করে। ফলে সে স্বাভাবিক ছন্দে নিজেকে মেলে ধরতে পারে না। তখন তার সমস্ত চরিত্রে বৈশিষ্ট্যগত নানা পার্থক‍্য গড়ে ওঠে যেটি তাকে ঐ পরিবেশে মানিয়ে নিতে সাহায‍্য করে। এখন থাক ও কথা। কী আশ্চর্য! সূর্যের দেশে মানুষ!


 


সেখানে মানুষ দেখে উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। আরো ভাল করে খোঁজ করতে থাকলাম সেখানের মাটি। কী আশ্চর্য! তাল তাল সোনায় পাহাড় তৈরী করে রেখেছে সেখানে! আমরা একটু সোনার টুকরোর জন‍্য হাপিত্তেষ করে মরছি।আর সেখানের লোকে সোনা পা দিয়ে মাড়াচ্ছে। সোনার ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। সোনার বাড়ি তৈরী করে তাতে বাস করছে। আরো একটু লেন্সটি সরিয়ে নিয়ে গিয়ে দেখলাম সাদা কিসের যেন পাহাড় রয়েছে মনে হল। প্রথমে মনে হয়ে ছিল অভ্র। তার পরক্ষণেই বুঝলাম সেটি অভ্র না। সে তো হালকা ধাতু। তার তো ওখানে হাওয়ায় ভেসে বেড়ানোর কথা। তবে এটি কী? প্লাটিনাম নয় তো?


 


 


আলোর দ‍্যুতি পরীক্ষা করে দেখলাম যে ঠিক তাই। যা মনে ভেবেছিলাম!সেটি প্লাটিনামের পাহাড়। ওরে বাবা! এত বড় প্লাটিনামের পাহাড়! এ মুলুকে থাকলে না হয় এক ধামা নিয়ে ঘরে রেখে দিতাম। এখানে তো ওটি সহজে পাওয়া যায় না তাই বেশ দামি ধাতু। তার পর নজর পড়ল এক ঝকঝকে গাছের ওপর। ঠিক যেমন বড় দিনে আমাদের এখানে গাছকে সাজিয়ে বানানো হয় তেমন ঝকছে কিন্তু কোথায় বাতি লাগানো তা দেখতে পাচ্ছি না। বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে তবে বুঝলাম যে সেটি কোন সাজানো গাছ নয়। ওটি ওখানের স্বাভাবিক গাছ। আমাদের যেমন সবুজ পাতার গাছ হয় ওখানে তেমনই গাছ তবে তার পাতা সবুজ না। রোদের মত সোনালী।


 


সাধারণ টেলিস্কোপে এ সব কিছুই দেখা যায় না। ওরা তো দৃষ্টিকে আলোক বলয় ছাড়িয়ে ভিতরে নিয়ে যেতে পারে না। তাই ও সব টেলিস্কোপে সূর্যকে জ্বলন্ত আগুনের গোলা বলে মনে হয়। আলোক বলয় তেমন বিশেষ কিছু নয়। অপেক্ষা কৃত ভারি আলোর কণা গুলো দেহ থেকে নির্গত হয়ে বেশি দূর পর্যন্ত ছুটে যেতে পারে না। কিছুটা দূরে গিয়ে তারা একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে অবস্থান করে সূর্যের মূল দেহকে বেষ্টন করে আবর্তন করতে থাকে। ঠিক যেমন শনির বলয়। শনির বলয় তো ঘন ধুলি কণার স্তর। যেটি তার দেহের চারি পাশে বলয়ের মত ঘুরতে থাকে। নানা ভরের ছোট ছোট কণা সেখানে ভীড় করে এমন বলয় গঠন করেছে।  সূর্যের দেহের চারি পাশেও তেমন ভারি আলোর কণার স্তর  ঘুরে বেড়িয়ে আলোক বলয় গঠন করে। সূর্যের দেহ থেকে নির্গত সূক্ষ্ম আলোর কণা গুলোই প্রচন্ড গতিতে ঐ আলোক বলয় ভেদ করে বাহিরে বেরিয়ে আসে। সেই সূক্ষ্ম রশ্মিকে অনুসরণ করা সাধারণ টেলিস্কোপের ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। এমন কি হাবল টেলিস্কোপেও তাকে ধরতে পারবে না। যদি পারতো তো ওদেরকে পদ্ধতি বলে দিয়ে তা প্রত‍্যক্ষ দর্শন করাতাম।


 


অনেকে বলে থাকেন সূর্যের দেহে এত উত্তাপ ওখানে জীবন থাকা সম্ভব না। তাই গাছ পালা মানুষ এ সব কিচ্ছু নেই। তারা যে এত বোকার মত কথা বলে তা বলে বোঝাতে পারবো না। আগেই তো বললাম যে সূর্যের দেহে সর্বত্র আগুন জ্বলছে না। তাই যেখানে আগুন জ্বলছে না সেখানে জীব থাকতে পারে এবং আছে তা আমি প্রত‍্যক্ষ করলাম। আগুন তো অল্প কিছু জায়গাতে জ্বলছে। সেই আগুন ঝড়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেহের অন‍্যত্র। তাই সূর্যের সমগ্র দেহ জুড়ে আগুন জ্বলছে বলে মনে হয়। সেখানের উত্তাপ যতটা মনে করা হয় ঠিক ততটা নয়। তবে আমাদের এখানের থেকে সেখানের উত্তাপ অনেক বেশি। তাই বলে ঠিক ততটাও না যতটা আমরা অনুমান করি অসহ‍্য বলে। আমরা তো জানি আগুনের কাছে পাশাপাশি  যতটা হাত নিয়ে যাওয়া যায় উপর থেকে ততটা কাছে হাত নিয়ে যাওয়া যায় না। ঘূর্ণনে অপ কেন্দ্রিক বলের কারণে ঐ ফোটন কণা গুলি ঘূর্ণন কেন্দ্রের বিপরীতে ছুটে চলে যায়। তাই উপরের দিকে হাত বেশি কাছে আনা যায় না। ঐ কণারা তাদের চলার পথে বাধা পছন্দ করে না। যদি কোন বাধা চলার পথে পড়ে তবে তাকে হয় বিদ্ধ করে ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। নতুবা সে নিজে তার গায়ে ধাক্কা মেরে প্রতিফলিত হয়ে অন‍্য দিকে চলে যায়। আরো একটা কথা বলতেই হয়। যে মরুতে বা মেরুতে জীবেরা বসবাস করতে পারবে বলে আমরা কখনো ভেবেছিলাম! না তো? অথচ সেখানে জীব রয়েছে। মরুতে বিষাক্ত বালি বোড়া সাপ। কাঁকড়া বিছে ইত‍্যাদিরা উষ্ণ বালির ভেতরে বেশ আরামেই থেকে যাচ্ছে। আর মেরুর প্রচন্ড ঠান্ডায় ক্রায়োজেনিক্স ছত্রাক আর শৈবাল তো রয়েইছে। সঙ্গে মানুষও রয়েছে। এস্কিমো। কেউ ভেবেছিল এ সব কথা! তবে এরা সকলে ঠিক আমাদের মত না। শিতের দেশের পাখি পেঙ্গুইন কে যেমন গরমের দেশে নিয়ে গেলে তাকে তার মত ব‍্যবস্থা নিয়েই নিয়ে যেতে হবে। তেমনই অস্ট্রিচ এমু এদেরকে বরফের দেশে নিয়ে যেতে গেলে তাদের তার মত পরিবেশ গড়ে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ শিতের পাখিকে গরমের দেশে নিয়ে গেলে তাকে শিতের পরিবেশ তৈরী করে সেখানে রাখতে হবে। আর গরমের পাখিকে শিতের দেশে নিয়ে গেলে তাকে গরমের বাঁসা বানিয়ে সেখানে রাখতে হবে। ঐ দুই পরিবেশের পাখি দুটি তাদের পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারলেও বিপরীত পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে না। তাই বলে গরমের পাখি কী মনে করতে পারে যে শীতের দেশে কোন পাখি বাস করতে পারে না? ওদের ক্ষেত্রেও তাই। সূর্যের দেশের জীবেরা তারা তাদের পরিবেশে বসবাস করায় অভ‍্যস্থ জীব থাকে। তারা গরম সহ‍্য করতে পারে। আবার আমরা অপেক্ষা কৃত ঠান্ডার ভূখণ্ডে বাস করি ওদের মত গরমে থাকতে পারবো না। তাই বলে ওখানে জীব থাকতে পারে না বলে আমাদের মনে করাটা কল্পনা। এটিকে বৈজ্ঞানিক সত‍্য বলে মেনে নেওয়া যাবে না। তবে বিজ্ঞান তো না দেখে সহজে বিশ্বাস করবে না। আমি দেখেছি ফলে সেটিই প্রমাণ এই কথা কেউ মেনে নেবে না। তাদেরকে হাতে নাতে দেখিয়ে দিয়ে প্রমাণ দিতে হবে যে আমার কথা সত‍্য। সেটি যে করা সম্ভব না তা আমি আগেই স্বীকার করেছি।  তাই আমার এই নিজের সচক্ষে দেখা ও তার সম্পর্কে লেখা বিবরণ সকলে বিশ্বাস করতে চাইবে না। সে যাই হোক ওরা বিশ্বাস না করে করুক তাই বলে আমার চোখের দেখা সত‍্য তো আর মিথ‍্যা হয়ে যাবে না। আরো একটু মনযোগ দিয়ে সূর্যের দেহ তল পর্যবেক্ষণ করছি। নানান দৃশ‍্যের মাঝে


 


এ বার আরো একটা অদ্ভূত দৃশ‍্য দেখতে পেলাম। সেই দৃশ‍্য আমাকে কেবল অবাক করে দিল না বরং এক বিশেষ ভাবনার মধ‍্যে ঠেলে দিল। আমি ঠিক নাস্তিক না হলেও আস্তিক বলতে পারবো না। অর্থাৎ  আমি ধর্মকে তেমন অবিশ্বাস না করলেও তেমন বিশ্বাস করি তা বলা যায় না। তাই এই দৃশ‍্য দেখে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম! তবে কী পুরাণ কাহিনী সব সত‍্য! তবে কী দেবতা আর অসুরেরা এখনো জীবিত? এখনো কী তাদের মধ‍্যে ঘটে চলেছে মহা সগ্রাম! এমন কথা মাথার মধ‍্যে ভীড় জমাতে থাকছে। যখন দেখলাম সেখানে রয়েছে দু প্রকার মানুষ!  কাল আর সাদা যেটি সোনালী দেখায়।


 


এক দল কালো যারা দল বেঁধে থাকে ঐ অন্ধকার ময় কালো গহ্বরে। আর এক দল সোনালী মানুষ যারা থাকে আলোর দিকে জড়ো হয়ে। এখন বুঝতে পারলাম তাই আলো এত উজ্বল আর অন্ধকার এতটা কালো।


 


তাকিয়ে আছি ঐ দিকে। দেখি ঘন কালো অন্ধকারে  ভিতর থেকে বিশাল দৈত্যাকার কিম্ভূত কিমাকার সব মানুষ বেরিয়ে আসছে। হাতে তাদের অস্ত্র। তারা এগিয়ে চলেছে আলোর দিকে। সেই আলোর দিকেও চলছে তোড়জোড়। আলো আর আঁধারের দুটি দল। তারা পরস্পরের শত্রু। দিন আর রাতের মত। অসুর আর দেবতাদের মত। এখনি বোধহয় বেধে যাবে যুদ্ধ যা অনন্ত কালের আলো আঁধারের বিরোধ। কেন? কিসের জন‍্য যুদ্ধ তা জানি না। বোধহয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। একে অপরকে পরাস্ত্র করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সে জগতে। তাই আঁধার আলোকে গ্রাস করতে চায় সর্বদা। আর আলো অন্ধকারকে প্রতি হত করে চলেছে সর্বদা। একজন হল ধ্বংসের প্রতীক। আর অন‍্য জন সৃষ্টির। আমি অহিংস। হিংসাকে পছন্দ করি না আর প্রশ্রয় দিই না। তাই আমার ওই যুদ্ধ দেখার আর আগ্রহ থাকলো না। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম টেলিস্কোপ থেকে।


 



কিছু পলাশের নেশা - সুমিতা চৌধুরী || Kichu Polasher nesha - Sumita Chowdhury || অনুগল্প || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

 কিছু পলাশের নেশা

   সুমিতা চৌধুরী


 শরৎ বিদায়ের পর ভোরের শিশির মাখছে সবে তৃণদল। উত্তুরে হাওয়া ফিসফিসিয়ে কথা কইছে প্রকৃতিতে। চারিদিকে নতুন আমন ধান মাথা দোলাচ্ছে আনন্দে। উৎসবেরই গন্ধ মেখে প্রকৃতি যেন গ্রাম বাংলাকে বলছে, "আসছে যে নবান্ন/ শোন, তোকেই শুধু বলি/ সাদরে বরণ করতে তাকে/ খুলিস মনের ডালি।"


  দোলাদের বাড়িতেও এবার যেন নবান্ন আরো রঙিন। পলার সদ্য বিয়ে হয়েছে, তাই নতুন আত্মীয়কুটুম্বরা সবাই নিয়ন্ত্রিত। নবান্ন শুরু হওয়ার আগে-ভাগেই দিদি, জামাইবাবু আর দিদির ছোট দেওর পলাশ এসে উপস্থিত হওয়ায় বাড়ি সরগরম হয়ে উঠল।


শহুরে পলাশদের গ্রাম দেখানোর দায়িত্ব পড়ল দোলার কাঁধেই। যদিও এ কাজ পলাই করতে পারত আজন্ম গ্রামে থাকার সুবাদে, কিন্তু তার জীবনের নতুন ফাগুন হাওয়ায় সদ্য সওয়ার সে, তাই উপরি দায়িত্ব দিতে চাইল না কেউই এই উৎসবের আবহে। অগত্যা দোলাকেই সেই দায়িত্ব পালন করতে হলো। 


পলা আর আকাশকে কিছুটা তফাতে রেখে পলাশ দোলার সাথেই গ্রাম দেখছে আজ দিন দুই/তিন। নতুন পরিবেশ, নতুন প্রকৃতির মাঝে কখন যেন তার শহুরে মনটায় গ্রামের বাউল বাতাস ফেরারী হওয়ার ডাক দিল। দোলার সাথে গ্রাম দেখার মাঝে দোলার চোখেই এ পৃথিবী দেখার অদম্য সাধ জাগলো তার। ওদিকে দোলার মনেও হেমন্তেই বসন্ত বাতাস দোলা দিয়ে গেল পলাশের অনুরাগে।


 বাতাসের কানাকানি থেকে দুই পরিবারে জানাজানি হতে বেশী সময় লাগল না। নবান্নের নতুন ধানের গন্ধের সাথেই মিশে গেল নতুন প্রেমের আতর গন্ধও। এক উৎসবের রেশ নিয়ে আরেক উৎসব সাজল অচিরেই পলাশের রাঙা নেশায়।

Thursday, October 24, 2024

এক অবিশ্বাস্য ভ্রমণ কাহিনী - শ্রাবনী আচার্য্য || Ek obishashyo kahini - Sharabani acharya || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

     এক অবিশ্বাস্য ভ্রমণ কাহিনী 

                       শ্রাবনী আচার্য্য


সাল টা ছিল ২০১৬।আমি হরিয়ানায় বি.এড এ পাঠরত ছিলাম।পুজোর ছুটিতে বাড়ি এসেই শুনলাম বাবা মা আমাকে না জানিয়েই পুরী বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।শুনে খুব খুশিই হলাম,কারণ আমি ভূগোলের ছাত্রী,বেড়াতে আমার খুব ভালো লাগে।তার ওপর বেড়ানোটা যদি পরিবারের সাথে হয়,তাহলে তো একদম সোনায় সোহাগা।যাইহোক,যথারীতি লক্ষী পুজোর পরের দিন আমরা পুরী যাওয়ার জন্য রওনা হলাম।বাসে উঠেই দেখি প্রায়৬০জন মতো রয়েছেন।সবাই বাবার পরিচিত,কেনকি বাবা ডাক্তার।তাই বাবার খাতিরে,ওনার মেয়ে এবং স্ত্রী হিসেবে আমার আর মায়ের সাথেও ওনাদের আলাপ হয়ে গেল।রাত ১০ তার সময় বাস ছাড়লো রামনগর থেকে।

পরেরদিন ভোরবেলা আমরা নন্দনকানন এ পৌঁছলাম এবং ওখানে চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখলাম।বিকেলে আমরা পুরী পৌঁছলাম।যেহেতু আমরা ট্রাভেলার দের সাথে গেছি তাই পুরীতে থাকার জন্য আমাদের ২দিন বরাদ্দ ছিল।তারপর কোনারকের সূর্য মন্দির,খন্ড গিরি,ধবলগিরি,ভুবনেশ্বর এর লিঙ্গেস্বর মন্দির -এসব ঘোরার পর এবার আমাদের বাড়ি ফেরার পালা।৬দিন পর আমরা যখন ওড়িশা দিয়ে বাড়ি ফিরছি তখন বিকেল ৫টা বাজে।ওই রাস্তায় নাকি তারিনী মায়ের মন্দির পড়ে।বাসের সবাই বলছিলেন তারিনী মা নাকি খুব জাগ্রত,ওখানে পুজো দিয়ে বাড়ি ফিরবেন।অগত্যা বাসের ড্রাইভার কাকু ওই মন্দিরের পাশে গাড়ি দাঁড় করালেন।আমরা সবাই নেমে একে একে মন্দিরের দিকে রওনা দিচ্ছি।মন্দিরে ঢোকার মুখেই কয়েকজন ১৫-১৬বছরের ছেলে পুজোর ডালা সাজিয়ে বিক্রি করছে।একটা লাল ওড়না,একটা গোটা নারকেল,আর কিছু ফুল,বেলপাতা ও সিঁদুর ছিল ওই ডালা গুলোতে।যথারীতি আমরা একটা ডালা কিনে পুজো দেয়ার জন্য মন্দিরের মধ্যে ঢুকলাম।মন্দিরের ভেতরে ঢুকে দেখি,মন্দিরটা বিশাল জায়গা জুড়ে অবস্থান করছে।একটা ঘরের মাঝে তারিনী মায়ের মূর্তি রয়েছে,আর মায়ের চারদিকে প্রায় ১০ইঞ্চি দূরত্বে গোল করে পুরোহিতরা বসে রয়েছেন।আমরা একজন পুরোহিত কে পুজোর ডালা ধরিয়ে দিতেই উনি লাল ওড়নাটা নারকেল এর গায়ে বেঁধে দিলেন,তারপর নারকেল টাকে ফাটিয়ে তার জল টা তারিনী মায়ের গায়ে ছিটিয়ে দিলেন,আর ফুল বেলপাতা ও ওড়না জড়ানো নারকেল এর টুকরো মায়ের কাছে নিবেদন করলেন মায়ের দিকে ছুড়ে ছুঁড়ে।এরকম পুজো দেখে খুব অদ্ভুত লাগলো আমার।৫মিনিটের মধ্যে পুজোও শেষ হয়ে গেল।তারপর মন্দিরের ভেতরটা আর একটু ভালো করে ঘুরে নিয়ে, মাকে প্রণাম করে বাইরে বেরিয়ে এলাম।মন্দিরের বাইরে এসে দেখি ফুলের ডালা বিক্রেতা ছেলেটার সাথে আমাদের বাসের ড্রাইভার কাকুর কোনও কিছু নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে,আর একটু এগিয়ে  এসে শুনলাম যে-বাসের ড্রাইভার কাকুএকজন মুসলিম ধর্মের মানুষ। তাই ওকে পূজার জন্য ডালা নিতে বললে কাকুটি রেগে ওর পরিচয় দিয়ে বলেন-আমি তো মুসলিম, কি করে তোমাদের মন্দিরে পূজো দেব?তুমি ডালা রেখে দাও ভাই, আমি পূজো দেব না।আমরা কিছু না বলেই চলে এলাম এবং যথারীতি বাসে উঠে নিজেদের জায়গায় গিয়ে  বসলাম।সবাই  না এলে তো বাস ছাড়বে না,তাই অপেক্ষা করতে লাগলাম চিপস খেতে খেতে।২০-২৫মিনিটের মধ্যে সবাই  বাসের মধ্যে চলে ও এলেন।এবার বাস ছাড়ার পালা,আর কোথাও নামবার নেই, সোজা বাড়ি যাব। হালকা ঠান্ডাও পড়ছে, সন্ধ্যে হয়ে এলো।আমরা সবাই এসে গেছি,ড্রাইভার কাকুও এসে গেছেন, কিন্ত বাস ছাড়ছে না কেন?সবাই পেছনের সিট থেকে বলছেন-কি হল গাড়ী ছাড়ুন,সবাই এসে গেছে তো,আর কেউ বাকি নেই তো।কিন্ত গাড়ি ছাড়ছে না দেখে বাবা উঠে গেলেন ড্রাইভার কাকুর কাছে। কি হয়েছে, গাড়ি ছাড়ছেন না কেন জিজ্ঞেস করতেই ড্রাইভার কাকু বাবাকে বললেন- জঙ্গল এলাকা,জায়গাটা ভাল নয়,আমি তো আপনাদের নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চাইছি।কিন্ত বাস টা যে কেন স্টার্ট নিচ্ছে না বুঝতে পারছি না।এটা শুনেই তো আমাদের মাথায় যেন বাজ পড়ল।এই অচেনা অজানা জায়গায় কী এই বাসের মধ্যেই সারারাত থাকতে হবে নাকি?বাসটা আর খারাপ হওয়ার জায়গা পেলো না?এই জঙ্গলের মধ্যেই তাকে খারাপ হতে হলো?এখন কি হবে?আমরা বাড়ি যাব  কি করে?ধারে কাছে কোনও দোকান ও নেই যে কোনো মেকানিক কে ডেকে গাড়িটা সারিযে নেওয়া যায়।বাসের মধ্যে অনেক বয়স্ক মানুষ ও ছিলেন, তারা প্রায় হই হটোগোল ফেলে দিলেন চারদিকে।আবার কিছু কুসংস্কার মাখা কথাও শোনা গেল,যেমন-কেউ হয়তো অপবিত্র ছিল?বা কেউ কোনও  দোষ ত্রুটি করে ফেলেছে?তাই তারিনী মা রেগে গিয়ে গাড়ি খারাপ করে দিয়েছেন। এইসব শুনে আমার প্রথমে হাসিই পাচ্ছিল। তারপর এই হাসিটাই মিলিয়ে  গেল যখন ব্যাপার টা আরও গুরুতর হয়ে উঠল। ড্রাইভার কাকু তখন পাশেই একটা ছেলেকে ডেকে বললেন-পাশাপাশি কোন মেকানিক আছে কিনা খবর দিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে পারবে?আমরা খুব বিপদে পড়েছি।তখন ছেলেটি বলল আছেন একজন,১০-১৫মিনিট লাগবে,আমি ডেকে নিয়ে আসছি।যথারীতি ২০মিনিট বাদে একজন মেকানিক কাকু এলেন। উনি অনেকক্ষন দেখার পর বললেন-কই বাসে তো আমি কোনও সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না,বাস স্টার্ট নিচ্ছে না কেন?স্টার্ট না নেওয়ার তো কোনও কারণ নেই। উনি প্রায় ৩০মিনিট ধরে চেষ্টা করলন,কিন্ত কোনও ফল পাওয়া গেল না।তখন ওই মেকানিক কাকু হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, দাঁড়ান আমি আমার মালিক কে ডাকছি,যদি পারেন তো উনিই পারবেন,তা না হলে আর কিছু করার নেই। উনি ওনার মালিক কে ফোন করার প্রায় ২৫মিনিট পর ওনার মালিক এলেন।উনিও প্রায় ৩০মিনিট ধরে চেষ্টা করলেন, বললেন- না,বাসে কোনও সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না।বাস স্টার্ট নিচ্ছে না কেন  বুঝে উঠতে পারছি না।তারপর উনি হঠাৎই বললেন ড্রাইভার কাকুকে- যে আপনাদের কোনও ভুল ত্রুটি হয় নি তো?সবাই মায়ের পূজো দিয়েছিলেন?মা কিন্ত খুব জাগ্রত, রেগে গেলে কাউকে ছাড়েন  না।আমি তো খুব অবাক হয়ে গেলাম ওনার কথা শুনে,ভাবলাম ড্রাইভার কাকু তো পুজো দেয়নি,তাই কি মা রেগে গেছেন?তখন দেখি হঠাৎ করে ড্রাইভার কাকুর চোখে জল,উনি বলেন আমি মুসলিম, তাই আমি ফুলের ডালা কিনে মায়ের পুজো দিতে চাইনি।তাই কি মা আমার ওপর রাগ করলেন?তখন মালিক মেকানিক কাকু বললেন- আমাদের তারিনী মা,সবার মা।উনি জাতপাত মানেন না,সবাই ওনার  সন্তান। আপনি শিগগির  যান,স্নান করে ফুলের ডালা নিয়ে মায়ের পুজো দিয়ে আসুন।দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।অগত্যা  ড্রাইভার কাকু ছুটে গিয়ে পাশেই একটা নদীতে ডুব দিয়ে একটা ফুলের ডালা কিনে মন্দিরে ঢোকার ৫মিনিটের  মধ্যেই মালিক মেকানিক কাকু গাড়ি স্টার্ট দিতেই, বাস সঙ্গে সঙ্গেই স্টার্ট নিল।তখন বাসের সবাই অবাক। আমার তো গায়ে প্রায় কাঁটা দিয়ে উঠল।তারপর যথারীতি আমরা তারিনী মা কে স্মরণ করে ৭'৩০মিনিটে বাসে রওনা দিলাম। এই অবিশ্বাস্য ঘটনা আমি জীবনে ভুলতে পারবো না।আমরা অনেকে বিশ্বাস ই করি না ভগবান আছেন বলে।কিন্ত সেদিন বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিলাম যে-না,ভগবান আছেন ই।আর যে জাতপাত নিয়ে সেই সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের মধ্যে এত ভেদাভেদ, তারিনী মা আমাদের চোখের সামনে থেকে সেই ভেদাভেদ দূর করে দিলেন।তিনি জানালেন যে- "সবাই এক,সবার রক্ত এক,সবার একটাই পরিচয়-সবাই মানুষ। "


অরণ্যের প্রতিশ্রুতি - প্রণব কুমার কুন্ডু || Oronner protisruti - Pranab kumar kundu || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

                     অরণ্যের প্রতিশ্রুতি

                        প্রণব কুমার কুন্ডু 

  

সন্ধ্যার আকাশে লাল আভা যখন ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে, তখন গ্রামের সীমানায় অবস্থিত বিশাল অরণ্য যেন নিজের সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে জেগে ওঠে। সূর্যের শেষ রশ্মি গাছের পাতার উপর দিয়ে হালকা সোনালি আভায় ছড়িয়ে পড়ে, এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। অরণ্যটি ছিল গ্রামের লোকদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঠিক যেন তাদের পুরনো এক বন্ধু। অরণ্য শুধু তাদের জীবিকা নয়, তাদের রক্ষাকবচও। গাছের ছায়া, পাখির গান, আর সবুজে ভরা অজস্র প্রাণী মিলে এখানে অদ্ভুত সাম্যতা তৈরি হয়েছিল। 


গ্রামের লোকেরা প্রতিদিনের কাজ শেষে যখন অরণ্যের দিকে তাকাত, তাদের মন অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে যেত। দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে যখন তারা ঘরে ফিরত, অরণ্যের স্নিগ্ধ বাতাস তাদের সমস্ত ক্লান্তি মুছে দিত। এই অরণ্য থেকে কাঠ সংগ্রহ করা, ফল-মূল তোলা, এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে আসা ছিল তাদের রোজকার কাজ। অরণ্য তাদের অভয়ারণ্য, যেখানে দুঃখ-দুর্দশার ছায়া পড়ে না। কিন্তু সময়ের প্রবাহে, তাদের এই প্রিয় অরণ্য ঘিরে বিপদ দানা বাঁধতে শুরু করে।


শহরের দৃষ্টি পড়ল অরণ্যের ওপর। বড় ব্যবসায়ী আর আধুনিক স্থাপত্যের কারিগরদের চোখ পড়ল। একদিন, একজন ধনী ব্যবসায়ী গ্রামে এসে গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। "আপনারা জানেন, এই অরণ্য যদি কেটে ফেলা হয়, তবে এখানে বড় বড় দালান-কোঠা গড়ে তোলা যাবে। আধুনিক রাস্তা হবে, নতুন নতুন কাজের সুযোগ হবে। শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়ে যাবে। আপনারা শুধু এই সুযোগটা নিন," তিনি তাদের বোঝাতে লাগলেন। 


গ্রামবাসীরা তাঁর কথায় হতবাক হল। এতকাল ধরে তারা অরণ্য থেকে যা পেয়েছে তাতে সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু আধুনিক জীবনের প্রলোভন, আর তার সঙ্গে ব্যবসায়ীর কথার মাধুর্য, তাদের বিভ্রান্ত করল। কিছুদিন গ্রামে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলল। গ্রামবাসীদের মাঝে মতভেদ দেখা দিল। কিছু লোক ব্যবসায়ীর প্রস্তাবে রাজি হল, আর কিছু লোক দ্বিধাগ্রস্ত রয়ে গেল। 


গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি দীনেশ মশাই চুপচাপ সব শুনলেন। তিনি জানতেন, অরণ্য শুধু তাদের জীবনযাত্রার অংশ নয়, এটা তাদের ইতিহাস, তাদের পরিচয়। তিনি গ্রামবাসীদের সতর্ক করতে চাইলেন, কিন্তু গ্রামের তরুণ প্রজন্ম ব্যবসায়ীর প্রলোভনে পড়ে গেল। "আমাদের ভবিষ্যতের জন্য উন্নতি দরকার," তারা বলল। "আধুনিক শহরের সুবিধা পেলে আমরা উন্নত জীবন পাব।" তাদের কথা শুনে গ্রামবাসীরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। অরণ্য থেকে পাওয়া সেই স্নিগ্ধ বাতাস, পাখিদের গান, মাটির সুগন্ধ—সবই যেন তারা ভুলতে বসল।


দীনেশ মশাই গ্রামবাসীদের ডেকে বললেন, "তোমরা যদি অরণ্য নষ্ট করতে চাও, তবে একবার ভেবে দেখো, আমরা কী হারাব। আমাদের জীবনযাত্রার মূলভিত্তি এই অরণ্য। একে রক্ষা করতে না পারলে, ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানেরা কী নিয়ে বাঁচবে?" কিন্তু যুবকেরা তাঁর কথায় তেমন গুরুত্ব দিল না। আধুনিক জীবনের মোহ তাদের আচ্ছন্ন করল। গ্রামের বাকিরাও মনে করল, একটু উন্নত জীবন পেলে মন্দ হবে না। 


অরণ্য কেটে ফেলার কাজ শুরু হল। প্রথমে গাছগুলো কাটা শুরু হল, তারপর মাটি খুঁড়ে শিকড়গুলো তুলে ফেলা হল। ক্রমে ক্রমে অরণ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা খালি হতে লাগল। গাছগুলোর পতনে অরণ্যের প্রাণীরা উদ্বিগ্ন হল। তারা তাদের বাসস্থান হারাচ্ছিল, আশ্রয়ের অভাবে নতুন করে জীবন যাপনের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পাখিরা তাদের ছোট্ট বাসাগুলো নিয়ে দূরে উড়ে গেল, হরিণেরা অস্থির হয়ে দৌড়াতে লাগল। 


দিন গড়িয়ে মাস গেল, শহরের লোকেরা আসতে থাকল। তাদের হাত ধরে এল মেশিন, যন্ত্রপাতি, আর বড় বড় ট্রাক্টর। অরণ্য একসময় পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেল, তার জায়গায় তৈরি হতে লাগল বড় বড় দালান, রাস্তা, আর মেটালিক স্থাপত্য। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের শান্তি ও স্থিতিশীলতা হারিয়ে যেতে লাগল। 


প্রকৃতির প্রতিশোধ নেবার অভ্যাস আছে। একদিন সন্ধ্যায়, যখন গ্রামে মেঘ জমেছিল, গ্রামের লোকেরা দেখল আকাশের অদ্ভুত এক কাণ্ড। কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে, হাওয়া বইছে দ্রুত। একটু পরেই শুরু হল ঝড়-বৃষ্টি। অরণ্য তো আর ছিল না, তাই পাহাড়ের মাটি ধসে গ্রামের দিকে নেমে এলো। গ্রামের প্রায় অর্ধেক অংশ মাটির নিচে চাপা পড়ে গেল। যারা বাঁচল, তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তারা ভাবল, এত বড় বিপদ এল কোথা থেকে?


দিনের পর দিন বৃষ্টি হলো, জলের স্তর ক্রমশ বাড়ল। গ্রামের পুরোনো কাঁচা বাড়িগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করল। মাটি ধসিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও গ্রামের কিছু অংশ টিকে থাকল শুধুমাত্র পুরোনো কিছু গাছের জন্য, যারা তাদের শিকড় দিয়ে মাটি আঁকড়ে রেখেছিল। সেই গাছগুলোই মাটি ধরে রাখার শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়াল। 


যে মুষ্টিমেয় গাছ বেঁচে ছিল, তাদের যেন এক অলৌকিক শক্তি কাজ করল। বুড়ো দীনেশ মশাই, যিনি গ্রামবাসীদের সতর্ক করেছিলেন, সেই বাকি গাছগুলোর কাছে গিয়ে তাদের সেবা করতে লাগলেন। তিনি গাছের পাতায় জল ছিটিয়ে বললেন, "তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইছি, আমরা ভুল করেছি। তোমরা আমাদের প্রাণ বাঁচাও, তোমাদের ফেরানো আমাদের একমাত্র উপায়।"


গাছগুলো যেন সেই প্রার্থনা শুনল। কিছুদিন পর বৃষ্টি থেমে গেল, জলের স্তর নামতে শুরু করল। গ্রামবাসীরা অবাক হয়ে গেল। তারা ভাবতে শুরু করল, এই গাছগুলোর মধ্যে কী রহস্য লুকিয়ে আছে? তাদের জীবনের এই নতুন শুরুর জন্য তারা গাছের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে শুরু করল। 


গ্রামবাসীরা প্রতিজ্ঞা করল, এবার থেকে তারা কখনও প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা করবে না। তারা বুঝতে পারল, প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখেই তাদের জীবনযাত্রা সুখের হতে পারে। বুড়ো দীনেশ মশাই গ্রামের তরুণ প্রজন্মকে বললেন, "প্রকৃতির সঙ্গে সখ্যতা বজায় রেখেই তোমরা জীবনের উন্নতি করতে পারবে। আধুনিক জীবন গাছ কেটে অর্জন করা যায় না, প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়।" 


বছর ঘুরতেই অরণ্য আবারও সবুজ হয়ে উঠল। গাছেরা ছায়া দিতে লাগল, বাতাসে আবারও সেই প্রাচীন শীতলতার পরশ ফিরে এল। গ্রামের বাতাসে মাটির গন্ধ ফিরল, পাখির গান শোনা যেতে লাগল। যে সবুজের অভাব গ্রামের মানুষ অনুভব করছিল, তা যেন আবার ফিরে এল। অরণ্যের মাটি শক্ত হয়ে দাঁড়াল, ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে মোকাবিলা করার শক্তি অর্জন করল। 


তবে শুধু অরণ্যই নয়, গ্রামবাসীদের মধ্যে এক নতুন বোধের জন্ম হলো। তারা অনুভব করল, প্রকৃতি তাদের অংশ, এবং এর ক্ষতি করলে তার প্রতিক্রিয়াও ভয়াবহ হতে পারে। তারা বুঝতে পারল যে প্রকৃতির দান কেবল নেয়ার নয়, তাকে সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্বও মানুষের। 


গ্রামের পুরোনো ঐতিহ্যগুলো আবারও ফিরে আসতে লাগল। উৎসবের সময়, অরণ্যের গাছগুলোকে সজ্জিত করে রাখার রীতি আবার ফিরিয়ে আনা হল। পাখির বাসার দিকে নজর রেখে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হল, যেন তারা নিরাপদে থাকতে পারে। গ্রামবাসীরা বুঝতে পারল যে শুধু নিজের লাভের জন্যই কাজ করা উচিত নয়, প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা সবার দায়িত্ব।


এক ভ্রমণকারী একদিন গ্রামে এসে পৌঁছাল। গ্রামের মাটির পথে হাঁটতে হাঁটতে সে চারপাশের প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হল। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা সবুজের ছোঁয়া, গাছের ছায়া, আর বাতাসে মিশে থাকা মাটির গন্ধ যেন তার মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটি গাছ যেন কোনো না কোনো গল্প বলছে। সে গ্রামের মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে চাইল, তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিল।


গ্রামে প্রবেশ করতেই তার চোখে পড়ল, কাঁচা রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। পাখিরা গাছে গাছে উড়ে বেড়াচ্ছে, আর বাতাসে তাদের মিষ্টি গান শোনা যাচ্ছে। ভ্রমণকারী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করল। বাতাসে একটি নিঃশব্দ নৃত্য চলছিল, পাতা ও পুষ্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট ছোট্ট প্রাণীরা যেন নিজেদের জীবনযাত্রা নিয়ে ব্যস্ত। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ এবং মাঝে মাঝে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া শুকনো পাতার আওয়াজ এক ধরনের মায়াবী অনুভূতির সৃষ্টি করছিল।


এরপর সে গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলল, যারা অরণ্যের ইতিহাস জানতেন। প্রবীণরা তাকে তাদের জীবনের গল্প শোনালেন—কীভাবে এই অরণ্য তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, আর কীভাবে তারা একসময় ভুল করে অরণ্য ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তারা বললেন, "আমাদের অরণ্য একসময় খুব বিপদে পড়ে গেছিল, আমরা বুঝতেই পারিনি কী ভুল করছিলাম। কিন্তু প্রকৃতির দয়ায় আমরা আবার সেই ভুল শুধরে নিতে পেরেছি।" 


ভ্রমণকারী সেই গল্প শুনে আবেগে আপ্লুত হল। সে গ্রামের মানুষের চোখে অরণ্যের প্রতি তাদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দেখল। গ্রামের প্রতিটি মানুষ যেন অরণ্যকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসে, তার প্রতি যত্নশীল। ছোট্ট শিশুরা গাছের নিচে খেলছে, আর বয়স্করা গাছের ছায়ায় বসে গল্প করছে—এমন দৃশ্য দেখে ভ্রমণকারীর মনে হল, সে যেন এক অন্য জগতে এসে পড়েছে, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যে এক অপূর্ব বন্ধন আছে।


ভ্রমণকারী গ্রামে আরও কিছু দিন কাটাল। প্রতিদিন সে নতুন কিছু শিখতে লাগল। সকালে যখন গ্রামের মানুষরা ঘুম থেকে উঠত, তখন তারা প্রথমেই অরণ্যের দিকে তাকাত। তারা জানত, তাদের দিন শুরু হয় অরণ্যের আশীর্বাদ নিয়ে। গ্রামের লোকেরা অরণ্যের প্রতিটি অংশকে গুরুত্ব দিত, এমনকি ক্ষুদ্র পোকামাকড়দেরও রক্ষা করার চেষ্টা করত। ভ্রমণকারী দেখল, গ্রামের শিশুরা পর্যন্ত অরণ্যের প্রতি কৃতজ্ঞ। তারা নিজেদের হাতে গাছ লাগানোর আনন্দ উপভোগ করে, আর মাটির সঙ্গে খেলে। সেই শিশুদের মধ্যে কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতির মোহ ছিল না, তারা প্রকৃতির সঙ্গেই বড় হচ্ছে। 


একদিন বিকেলে, ভ্রমণকারী গ্রামের মধ্য দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ সে দেখতে পেল, কিছু গ্রামবাসী অরণ্যের মাঝে বসে আছে। তাদের চারপাশে কিছু গাছের চারা রাখা, আর তারা সেই চারাগুলো রোপণ করছে। ভ্রমণকারী কাছে গিয়ে জানতে চাইল, তারা কী করছে। এক যুবক বলল, "আমরা নতুন গাছ লাগাচ্ছি, যাতে অরণ্য আরও সবুজ হয়ে ওঠে। আমরা বুঝেছি, অরণ্য আমাদের বাঁচিয়েছে, এখন আমাদের দায়িত্ব তাকে আরও শক্তিশালী করা।"


ভ্রমণকারী এই কাজ দেখে মুগ্ধ হল। সে ভাবতে লাগল, কীভাবে আধুনিক জীবনের প্রলোভন থেকে মুক্তি পেয়ে গ্রামবাসীরা নিজেদের প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে। সে মনে মনে ভাবল, "এটাই তো প্রকৃত উন্নতি। আমরা আধুনিকতার নামে যে ধ্বংস করছি, সেই ধ্বংসই আমাদের জীবনের ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে। এই গ্রামের মানুষরা প্রকৃতির প্রকৃত রূপ বুঝতে পেরেছে।" তার মনে হল, এই গ্রাম থেকে সে যে শিক্ষা নিচ্ছে তা সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তার। 

গ্রামে কাটানো এই ক'দিনের অভিজ্ঞতা ভ্রমণকারীকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। সে তার নোটবুকে লিখল, "এই গ্রামের মানুষরা আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা। আমরা আধুনিকতার নামে যা কিছু করছি, তা প্রকৃতির উপর এক নীরব আঘাত। কিন্তু এই গ্রামে এসে আমি শিখেছি, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকাই আসল শান্তি। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান আমাদের জীবনকে সুন্দর করে তোলে।"


ভ্রমণকারী যখন গ্রাম থেকে বিদায় নিল, তখন সে প্রতিজ্ঞা করল, সে এই শিক্ষা পৃথিবীর আরও মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে। সে তার বন্ধুদের, সহকর্মীদের এবং পরিবারের সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবে। সে বলল, "আমাদের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা তখনই আসে যখন আমরা প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকি। অরণ্য আমাদের শুধু জীবন দেয় না, আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সুন্দর করে তোলে।"


তার এই প্রতিজ্ঞা শুধু তার নিজের জীবনেই নয়, শহরের মানুষের মনেও দাগ কাটল। তারা বুঝতে পারল, প্রকৃতিকে ছাড়া জীবন কতটা অর্থহীন। তারা ঠিক করল, নিজেদের শহরেও একইভাবে প্রকৃতির সুরক্ষা করতে হবে। তারা গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিল, নতুন গাছের যত্ন নেওয়ার পরিকল্পনা করল, আর পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়ার জন্য নানা কর্মসূচি হাতে নিল। শহরের মানুষেরা প্রথমে যে সকল গাছকে উপেক্ষা করেছিল, তারা তাদের ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করল। নতুন উদ্যমে তারা একতা বজায় রেখে সেই গাছগুলোকে রক্ষা করতে উদ্যোগ নিল।


অন্যদিকে, গ্রামে ফিরে আসা ভ্রমণকারীর অনুপ্রেরণায় গ্রামের মানুষরা আরও সতর্ক হয়ে গেল। তারা নতুন উদ্যমে অরণ্যের যত্ন নিতে লাগল। তারা জানত, এই অরণ্য তাদের জীবন রক্ষা করেছে, আর তারা তা কখনও ভুলবে না। গ্রামের মানুষরা অরণ্যকে ঘিরে নানা উৎসবের আয়োজন করল। পাখির বাসার দিকে তারা আরও যত্নবান হলো, তাদের খাবার ব্যবস্থা করতে থাকল। গ্রামের শিশুদেরও অরণ্যের সুরক্ষা সম্পর্কে শেখানো হলো, যেন তারা বড় হয়ে এই অরণ্যকে আরও ভালোভাবে রক্ষা করতে পারে। শিশুরা প্রথমবার অরণ্যের অভ্যন্তরে রোপণ করা গাছগুলোর ফুল ফুটতে দেখল, এবং তাদের মুখে খুশির ঝিলিক ধরা পড়ল।


গ্রামের মানুষের এই প্রচেষ্টা শুধু তাদের জীবনেই নয়, আশেপাশের গ্রামের মানুষদেরও উদ্বুদ্ধ করল। তারা বুঝতে পারল, প্রকৃতির সঙ্গে সখ্যতা বজায় রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন উদ্যমে তারা নিজেদের গ্রামেও গাছ লাগাতে শুরু করল। তাদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি এক ধরনের মমত্ববোধ জন্ম নিল।


ভ্রমণকারীর ফিরে যাওয়ার পরেও গ্রামে নতুন নতুন মানুষ আসতে থাকল। তারা এসে বুঝতে পারল, এই গ্রাম শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থান নয়, এটি একটি জীবন্ত উদাহরণ যে কিভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করা যায়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এসে তারা এখানে প্রকৃতির অমোঘ শক্তি এবং জীবনের সত্যিকারের মানে খুঁজে পেল। গ্রামবাসীদের আন্তরিকতা, তাদের অরণ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রকৃতির প্রতি তাদের অটুট বিশ্বাস দেখে শহরের মানুষদের হৃদয়েও পরিবর্তন ঘটতে শুরু করল। 


গ্রামটি একসময় আড়ালে ছিল, কিন্তু এখন এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। আশেপাশের গ্রামের লোকেরাও এই গ্রামের অনুপ্রেরণায় নিজেদের অরণ্য রক্ষার উদ্যোগ নিতে শুরু করল। তারা বুঝতে পারল, প্রকৃতির সুরক্ষাই তাদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখার একমাত্র উপায়। গ্রামটি ধীরে ধীরে একটি প্রতীক হয়ে উঠল—একটি প্রতীক যেখানে মানুষ এবং প্রকৃতি একত্রে সহাবস্থান করতে পারে, যেখানে অরণ্য শুধু জীবিকা নয়, জীবনকেও পূর্ণতা দেয়।




অন্তরীন - অসীম কুমার সমাদ্দার || Ontorin - Ashim Kumar Samadar || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

 অন্তরীন

   অসীম কুমার সমাদ্দার



আজ ঋত্বিকের অর্থাৎ আমার সত্তর পূর্ণ হল। মালা পৃথিবী ছেড়ে গিয়েছে তাও প্রায় বছর আটেক হয়েছে । মালা এই দিনটা খুব ধুমধাম করে পালন করতো । আমার কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করতো , সারা সকাল ধরে অনেক পদ রান্না হতো আর রাতে নিজের হাতে খাওয়াতো।

 রাতে সবাই হই- হুল্লোড় করে বাড়ি ফিরে গেলে বলতো আরো একটা বছর শেষ হয়ে গেলো , কেন এতো তাড়াতাড়ি বছর শেষ হয় ! মালাকে বোঝাতাম এটাই স্বাভাবিক , ও চুপ করে থাকতো । আসলে আমার প্রতিটি ব্যাপারে ও খুব সিরিয়াস ছিল । কোন পাজামা পাঞ্জাবিতে আমাকে ভালো লাগবে , প্যান্টের সাথে ম্যাচ করে শার্ট , ভালো সুগন্ধী , খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি সবকিছুতেই ওর বিশেষ দৃষ্টি ছিল । অনেকবার আমার জন্মদিনের সময় ছেলে বরুন , ছেলের স্ত্রী শ্রী রাধা ওদের ছেলেমেয়েকে নিয়ে যখন মুম্বাই থেকে আসতো , মালার খুব আনন্দ হতো । প্রতিবছর আমার জন্মদিনের আগে ও বরুন আর রাধাকে বারবার ফোন করে আসার জন্য বলতো । একসময় ওরা আসা ছেড়ে দিল , মালার খুব কষ্ট হতো প্রথম প্রথম , শেষে আর ফোন করতো না । দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো এটা নাকি আমাদের কপাল ! আমি ওকে বোঝাতাম এত দূর থেকে একগাদা টাকা খরচা করে বাবার জন্মদিনে বারবার আসা সম্ভব না ।

 মালা সবাইকে নিয়ে থাকতে , আনন্দ করতে ভালোবাসতো । আমাদের যৌথ পরিবার যখন ভেঙে যায় , ও খুব কষ্ট পেয়েছিল । ওকে অনেক বোঝাতে হয়েছিল । ছেলে আগে বছরে তিনবার আসতো বাড়িতে , শেষে কমতে কমতে দু' বছরে একবারও হতো না । ফোনেই খোঁজখবর চলতো । মালা এতো কষ্ট পেয়েছিল যে ভিতরে ভিতরে ওর ক্ষয় শুরু হয় । আমি ওকে বাইরে ঘুরে আসার কথা বললেও যেতে চাইতো না । কেমন যেন ধীরে ধীরে নির্জীব হয়ে গেলো চোখের সামনে । শেষে একদিন চলে গেলো অভিমানে । ছেলে ওর পরিবার নিয়ে এসেছিল শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে ।

 মিটে গেলে আমি একদম একা হলাম , সেই থেকে আমি আর কোথাও যাই না , ঘরই আমার সব আর মালার স্মৃতি আমার একমাত্র অবলম্বন । ঘরেই অন্তরীন হয়ে আছি আজ প্রায় আট বছর মালার চলে যাওয়ার দিন থেকে ।