Tuesday, October 29, 2024

মেঘমানুষ - সোমনাথ বসু || Meghmanush - Somnath Basu || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

     মেঘমানুষ

               সোমনাথ বসু 



     অবচেতনে নয়

     চেতনার রঙে রঙিন চারাগাছ

     শিকড় ছড়াবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম

     চেয়েছিল স্বপ্নের ফেরিওয়ালা.... 


     সারাটা দিন বিষন্নতা চেয়েছে একটা

     জলভরা মেঘ, 

     চোখের কোণ ভিজেছে স্বপ্ন ভাঙার

     অকাল বোধনে .... 


      দু:স্বপ্নের সকাল

      কালস্বর্প দোষে কেপে উঠলো

      নিয়তির বেনিয়মে .... 

      উত্তরণের আচমকা খেয়ালে! 


       যে বীজ দেখে ছিল মেঘ-বৃষ্টি-রোদ, 

       সিক্ত মাটির রিক্ত ভবিষ্যৎ, 

       শুধু চেয়েছিল আগামীর স্নিগ্ধ হাসি, 

      তবু হৃদ্যহীন হল বোধনের বাদ্যির আগে! 


      

লক্ষ তিলোত্তমা - রঞ্জনা ঘোষ (সেন) || lokhhi Tilottama - Ranjana ghosh (sen) || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

লক্ষ তিলোত্তমা

    রঞ্জনা ঘোষ (সেন) 


আড়াল হবে যতো অপরাধ

এগিয়ে চলবে ততো প্রতিবাদ। 

অপরাধীরা পাবে না ক্ষমা

বিচার পাবেই তিলোত্তমা।


যেখানেই থাকুক রক্তবীজের বংশ

এবার তাদের করতেই হবে ধ্বংস। 

খাটবে না আর শকুনির ছল

যাজ্ঞসেনীরা বেঁধেছে দল। 


কান পাতলেই শোনা যায় লাশকাটা ঘরে

অপূর্ণ স্বপ্নগুলো গুমরে কেঁদে মরে ! 

পাপের ঘড়া পূর্ণ এবার সব পড়েছে জমা

এক অভয়া জন্মদিল লক্ষ তিলোত্তমা ।


মোমবাতি ছেড়ে মশাল নিয়েছে হাতে

প্রতিবাদে গর্জে চলেছে গলি থেকে রাজপথে। 

আটকে রাখা যাবে না আর কিছুতে

ধর্ম বর্ণ ভাষা চিহ্ন সব মিশে গেছে একসাথে। 


ছুটে চলেছে সব বিচার বেদীর পানে

দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভয় শঙ্কা নেই কারো মনে।

নেভেনি আগুন এখনো জ্বলছে চিতা শ্মশানে

নিভে গেলে মশাল জ্বালাবে সেই চিতার আগুনে। 


জমে থাকা ক্ষোভ রূপ নিয়েছে প্রতিবাদে

ঘরের কোণে পড়ে থাকবে না কেউ অবসাদে। 

বিচার না পাওয়া অবধি যাবে নাতো থামা 

এক অভয়া জাগিয়ে দিল লক্ষ তিলোত্তমা।

Friday, October 25, 2024

অচেনা অতিথি - শচীদুলাল দাস || Ochena Atithi - Sajhidulal Das || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

        অচেনা অতিথি 

           শচীদুলাল দাস



বাইরের দরজাটা হাট করে খোলা। বুকটা ধড়পড় করে উঠল। কি হলো? তাহলে কি সব চুরি হয়ে গেছে? টাকা পয়সা!গয়নাগাঁটি সবকিছু! খারাপ কিছু ভেবে আস্তে আস্তে দরজার দিকে পা বাড়ালেন।



মানব জীবনে সম্পদের প্রতি টানটা খুব সহজাত। সবাই তা আগলে রাখার লড়াই করে চলেছে প্রতিনিয়ত। রোজগারের সাথে সম্পদ বাড়ানোর ইঁদুর দৌড়ে দৌড়াচ্ছে সবাই। কেউ কেউ দারুন ভাবে সফল। আবার কেউ কম সফল হয়ে হতাশায় দিন কাটায়। কিন্তু একটা সময় এসবের কোন প্রয়োজন হবে না,সবকিছু তেমনি থাকবে পড়ে - খালি হাতে বিদায় নিতে হবে এই ধরাধাম থেকে। তবুও আকাশের চাঁদকে ধরতে, অনিশ্চিয়তার বন্ধুর পথে অন্ধকারে হাতড়ে চলছে সবাই।



অরিন্দম দাস অবসর নেওয়ার পর, গ্রামের জায়গা জমি ভাইদের দেখাশোনার ভার দিয়ে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন কয়েক বছর ধরে।একমাত্র মেয়ে মধুপর্ণাও পড়াশোনা বেড়ে ওঠা এইখানে।সে ছাত্র- জীবনের এক সফল সৈনিক।সে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্গালোরে কর্মরত। বেতন কাঠামো ও মনের মত। এখন মা বাবাকে ছেড়ে একাই থাকে সেখানে।



প্রায় দেড় দু মাস হলো অরিন্দমবাবু স্ত্রী অপর্ণাকে নিয়ে মেয়ের কাছে ব্যাঙ্গালোরে গেছেন। সেখান থেকে কন্যাকুমারী, পণ্ডিচেরী বেড়াতে যাবেন। মেয়ে ভালো টুরিস্ট কোম্পানির সাথে সব ব্যবস্থা বন্দোবস্ত করে রেখেছে। পণ্ডিচেরীর শান্ত- স্নিগ্ধ সাগরবেলা, ভারতীয় সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম আর অরোভিল নগরের মানব ঐক্যের জীবন্ত দৃষ্টান্ত তাদেরকে বড়ো মুগ্ধ করে।সেখান থেকে ফিরে কয়েকদিন মেয়ের কাছে জিরিয়ে নেবেন, তারপর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় ফিরবেন। এবারে মেয়ে এলে সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে বেড়াতে যাবেন।



অনেকদিন পর মেয়ে বাড়ি ফিরছে। ফ্লাইটটা কলকাতার মাটি স্পর্শ করতেই যে আনন্দটা ছিল,তা যেন হটাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ। এ আবার এক উটকো ঝামেলা! 


কিন্তু একি কান্ড! ড্রয়িং রুম পেরোতেই মনে হচ্ছে সবকিছু ঠিক আছে।


মধুপর্ণা মাকে নিয়ে, এক নিঃশ্বাসে সবগুলো ঘরের তালা খুললো। আসবাব, জিনিসপত্র কোন কিছুর কোনো নড়চড় নেই। যেমনটি রেখে গিয়েছিলেন ঠিক তেমনই আছে। অরিন্দমবাবু চটকরে আলমারী খুলে লকারটা দেখলেন। সবই ঠিক আছে। সবাই অবাক হলেন! তাহলে?


কতকগুলো রহস্যময় ‘তাহলে’ তাদের মনে খোঁচা দিতে লাগলো বারবার।



সবাই যখন তাহলের রহস্যে ঘরের ভিতরে গভীর চিন্তায় ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় এক যুবক বড় একটি পিঠের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বড় সাইজের একটি খাম।


স্যার বলে ডাক দিতেই অরিন্দমবাবু বেরিয়ে এলেন। হাতে খামটা দিয়ে, সবিনয়ে করজোড়ে নমস্কার জানিয়ে গট গট করে বেরিয়ে চলে গেল। 


আপনি কে? কিসের খাম? 


দাঁড়ান! কোন ভ্রূক্ষেপ নেই।


চটজলদি ফোনটা নিয়ে সিকিউরিটিকে ফোন করে, ছেলেটিকে আটকাতে বলেন।


নামতে নামতে থানায়ও ফোন করেন।


মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে অরিন্দমবাবু সিকিউরিটির কাছে পৌঁছালেন। ছেলেটি নির্বিকার!অবাক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে।


তাদের দেখে আবারও হাতজোড় করে নমস্কার জানাল। সিকিউরিটি জিগ্যেস করলো, “উনি কি আপনাদের আত্মীয়”?


না! “এ আমাদের কেউ নয়”!



এর মধ্যেই থানা থেকে গাড়ী এসে গেছে।


অফিসার বলেন, “এখান থেকে কে যেন ফোন করছিলেন”?


অরিন্দমবাবু বলেন, “আমি ফোন করছিলাম স্যার। দিয়ে ঘটনাটা আদ্যপান্ত বলেন”।


সবশুনে অফিসার বলেন, “আপনারা বাড়ীতে ভালো করে সবকিছু দেখুন, তারপর সন্ধ্যায় থানায় আসুন।আমাদের আরও একটা কল আছে। ছেলেটাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা না বলা পর্যন্ত ছাড়া হবে না”।


অস্বস্তি যেন কাটলো! পুলিশের রুলের ঘায়ে ঠিক সব বেরিয়ে যাবে। একরাশ স্বস্তি নিয়ে, তারা ঘরে ফিরলেন।তবুও ব্যাপারটা মনের ভিতরে যেন কিছু প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে।


এসে ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। বিছানাটা কেমন এলোমেলো। আলনায় বেশ কিছু জামা প্যান্ট ছিল, সেগুলো নেই।পাশে প্লাস্টিকের ডাস্টবিনে কিছু পার্সেল খাবারের প্যাকেট, দেশলাই কাঠি, পোড়া সিগারেটের টুকরা ছাড়া আর কিছু নেই। এরপর বাথরুমে গেলেন। তাদের জিনিসপত্র গুলো একদিকে সুন্দর করে গোছানো। গামছা একটা শুকছে। আর কোনোকিছুর কোন পরিবর্তন নেই।রহস্য যেন আরও ভাবিয়ে তুললো।



তারপর হাতে হাত রেখে চললো ঘর গোছানোর পালা। বিছানাপত্র ঝাড়াঝাড়ি হল। দেরী দেখে, কুকারে ভাতে ভাত বসিয়ে খাওয়া দাওয়া হল। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে মনের খুঁত-খুঁতানি কিছুতেই যাচ্ছে না। আবার সারা ঘরের আসবাব, গয়না, টাকা পয়সা সব মিলানো হল। তেমন কিছু হেরফের নেই। প্রায় সবই ঠিক আছে। তাহলে পুলিশের কাছে কিসের নালিশ করবেন?


শুধুমাত্র সামনের গেটে তালাটি ভাঙা। তার পরিবর্তে গোদরেজর একটি নতুন তালা রাখা। তাহলে ব্যাপারটা কি?



বিকালে চায়ের টেবিলে মধুপর্ণা মনে করলো, “বাপি! ছেলেটা একটা খাম দিয়েছিলো না”?


“হ্যাঁ রে! একদম ভুলে গেছি। সেটা ড্রয়িং রুমে বেডের নীচে রাখলাম মনে হয়। দাঁড়া নিয়ে আসছি। খামটা বেশ ভারী তো!কি আছে ওর মধ্যে? কে জানে”!


খাম খোলা হল। তাতে এল, আই, সি থেকে পাঠানো অরিন্দমবাবুর দুটো চিঠি। দশ হাজার টাকা ও হিন্দিতে লেখা একটি চিঠি।


তাহলে কি ওই চিঠিতেই এই রহস্যের চাবিকাঠি? দেখাযাক!



মধুপর্ণা বাবার হাত থেকে চিঠিটা চিলের মত ছোঁ মেরে নিয়ে নিল। দিয়ে পড়তে শুরু করল। তার বাংলা করলে এমন হয় –


শ্রদ্ধেয় স্যার নমস্কার নেবেন। আমি যশপাল যাদব। বিহারের পাটনার কাছে একটি ছোট্টো শহরে আমার বাড়ী। আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের লাস্ট ইয়ারের ছাত্র। ইন্টার্নশিপে একমাস পাঁচ দিনের জন্য কলকাতায় পাঠানো হয়। আমি কলকাতার বিশেষ কিছু জানিনা। নাম শুনেছি মাত্র, আগে কোনদিন আসিনি।থাকার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে হন্যে হয়ে গেলাম, কিছু পেলাম না। যে সব ঘরের খবর পেলাম তা আমার সাধ্যের বাইরে। আমি অতি সাধারণ বাড়ীর ছেলে। দু রাত্রি শিয়ালদা স্টেশনে কাটিয়েছি। ভবঘুরের মত রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে এই ফ্ল্যাটটায় এলাম। দরজায় টোকা দিলাম, কোন উত্তর নেই। তারপর দেখি সামনে তালা। সিকিউরিটির কাছে আপনাদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আপনাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। শুনলাম দুমাসের জন্য বাইরে গেছেন। বেরিয়ে গেলাম। মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসল। আগেই লিখেছি আমি খুব দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছি। বাড়ীতে ছোট্টো একটা তালা সারাই ও নতুন তালার দোকান। বাবা দেখাশোনা করেন। আমি অবসর সময়ে সঙ্গ দি। তালা ভাঙা বা খোলার কাজে সিদ্ধহস্ত। বাইরে থেকে একটি নতুন তালা কিনে ফিরে এলাম। সিকিউরিটিকে বলি উনারা ডুপ্লিকেট চাবি রেখে গিয়েছিলেন। উনারা না আসা পর্যন্ত, আমাকে বাইরের ঘরটায় থাকতে বলেছেন। আমার নাম, ঠিকানা, ফোন নং নিয়ে ছেড়ে দেয়। আমি সামান্য বকসিসও দি।আর কোনদিন আটকায় নি। আমি প্রায় একমাস যাবৎ আপনাদের বাইরের ঘরটিতে আছি। অন্য কোনদিকে নজর দেওয়ার চেষ্টা করিনি। বন্ধুরা আসতে চাইলেও বারণ করি। বলি এক পরিচিতর ঘরে আছি, তাঁরা পছন্দ করেন না। গতকাল স্টাইফেন্ড বাবদ কুড়ি হাজার টাকা পেয়েছি। আপনার ঘর ভাড়া, ইলেকট্রিক ও অন্যান্য খরচ বাবদ দশ হাজার টাকা রেখে গেলাম।এই অধমের স্পর্ধা ক্ষমা করবেন।


                              নমস্কারান্তে 


                             যশপাল যাদব 


সবাই হতবাক! প্রায় দশ মিনিট কেউ কথা বলেনি। একেবারে পিন ড্রপ সাইলেন্ট। মধুপর্ণা ডান হাতে চিঠি, বাম হাত গালে দিয়ে ঘুরন্ত সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে। অপর্ণাদেবীর কথায় নীরবতা ভাঙলো। স্বামীর উদ্দেশে বললেন, “তাড়াতাড়ি থানায় গিয়ে ছেলেটাকে ছেড়ে দাও। আমাদের মধুও ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে বাসার জন্য কি হয়রানি টা পেয়েছিলো, মনে আছেতো”!


একটু থেমে দম নিয়ে অরিন্দমবাবু বললেন,


“আত্মীয় নয়! অথচ নিকট আত্মীয়ের চেয়েও ভালো কাজ করে একমাস যাবৎ ঘরটাকে পাহারা দিয়ে গেল। এর চেয়ে বড় আত্মীয় আর হয় না। ছেলেটা অনায়াসে পালিয়ে যেতে পারতো কিন্তু সে তা করেনি। সে তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত। এটাই মনুষ্যত্ত্ব বিকাশের মানদণ্ড। বর্তমান সমাজে যা বিরল”।


চটজলদি করে অরিন্দমবাবু প্যান্টটা গলিয়ে, মেয়েকে তৈরী হতে বললেন। ট্যাক্সিতে করে থানায় পৌঁছলেন। ছেলেটটার হাতে হাতকড়া। তাদের দেখে ক্ষমার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ক্ষুধা,তৃষ্ণায় চোখ মুখ বসে গেছে। হয়তো থানায় সকাল থেকে কিছু খেতে দেয়নি। অরিন্দমবাবুর পিতৃত্বের প্রদীপটা কেউ যেন উসকে দিল। চোখের কোনে টলটলে জল।


বললেন, “ওর বিরুদ্ধে আমাদের আর কোন অভিযোগ নেই। কোন ডাইরি লিখবেন না। ওকে ছেড়ে দিন”।


ছাড়া পেয়ে ছেলেটা অরিন্দমবাবু কে প্রণাম করলো।ক্ষুধা, তৃষ্ণা উপেক্ষা করে মুক্তির উল্লাসে সে বিহ্বল,যেন পিঞ্জর থেকে মুক্তি পাওয়া মুক্ত বিহঙ্গ।


বাইরে নিয়ে গিয়ে অরিন্দমবাবু তাকে ধোসা, চাউমিন খাওয়ালেন।ছেলেটি ক্ষুধায় গো গ্রাসে গিলে যাচ্ছে। তার দশ হাজার টাকা ফেরত দিলেন। সাথে আরও দুহাজার টাকা দিলেন। বাড়ীর জন্য কিছু নিয়ে যেও। কলকাতায় যদি কখনো আসো তবে আমার বাড়ীতে উঠবে। মনে থাকে যেন। তোমার জন্য দরজা খোলা থাকলো। সে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিল।


মনে হল, পরিচিত না হয়েও বুদ্ধি ও সু ব্যবহারে মনের সব গ্লানি জয় করে, এক অভিনব পরিচয় রেখে গেল।যা হয়তো স্মৃতির পাতায় হেসে খেলে বিচরণ করবে আজীবন।


                

বিসর্জন - সমীর কুমার দত্ত || Bisarjan - Samir Kumar dutta || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

     বিসর্জন 

      সমীর কুমার দত্ত

           


গোছগাছ প্রায় সমাপ্তির পথে। দুর্গাপূজো চলছে, তার মধ্যেই এই গোছগাছ। দশমীর পর দিনই সংসার ছেড়ে বিবাগী হতে হবে এমনটি নিশ্চিত হয়ে যাবার পর থেকেই তিন দিন ধরে একটু একটু করে চলেছে গোছগাছ কি কি নিতে হবে আর কি নয়। এমনিতেই কি বা নেওয়ার আছে একটা বিধবার। তবুও ঘর ছেড়ে বাইরে যাওয়া তো,কোথায় কখন কি লাগে কে বলতে পারে।নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস তো নিতেই হবে। এ ছাড়া কখন কি লাগে ভেবে ভেবে ঠিক করতে হচ্ছে। খান আষ্টেক দশেক কালো পাড় শাড়ি বা থান, কয়েকটা শায়া, ব্লাউজ টাওয়েল বা গামছা, টুথপেস্ট,এটা অবশ্য ওখান থেকেই দেওয়া হবে, আর টুথব্রাশ। এছাড়া একটা থালা, গ্লাস,বাটি। তিনি আবার পাঁচ জনের থালা,গেলাসে খেতে পারেন না। একটা ছোট আয়না যদিও আয়না সেখানে থাকবে ‌, চিরুণী,গায়ের শাল ও চাদর, একটা বিছানার চাদর বা বেড কভার, স্টীল ফ্রেমে বাঁধানো স্বামীর একটি ফটো,পান- জর্দার থলি আর মানি ব্যাগ।—এই হলো লাবণ্যময়ীর একার ঘর সংসারের টুকিটাকি জিনিস।


তিন দিন ধরে একটু একটু করে লাবণ্যময়ী গোছগাছ করে চলেন আর অতীত দিন গুলোতে হারিয়ে যান। মাঝে মাঝে ছেলে সুপ্রিয়'র মুখের দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকেন—যদি ছেলে তাঁকে সংসার ছেড়ে না যাবার জন্য অনুরোধটুকু করে এই আশায়। সুপ্রিয় কী রকম শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে! কিন্তু ওর কিছু করার নেই। করতে গেলেই ঝগড়া অশান্তি হবে। লাবণ্যময়ী যতো ভাবেন তত তাঁর চোখ জলে ভরে ওঠে। কত কষ্টে গড়ে তোলা এই সংসার সহজে কি ছেড়ে যাওয়া যায় । যদিও সবাইকেই একদিন সব ছেড়ে চলে যেতে হবে।আড়ালে চোখ মুছতে থাকেন। সুপ্রিয়'র তা নজর এড়ায় নি। আস্তে আস্তে তার ছোট বেলার স্মৃতি, মায়ের স্নেহ সব চোখের সামনে ভেসে ওঠে।


ও একবার কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। বাঁচার আশা প্রায় ছিল না বললেই হয়। ওকে বাঁচাতে ওর মা -বাবা চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখেন নি। বিশেষ করে মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে ওর চোখে জল এসে যায়। অসুখের ঘোরে ও একবার বলে ছিলো, "মা, আমি আর বাঁচবো না, মা ।" ওর মনে আছে, সঙ্গে সঙ্গে মা ওর মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে ওঠেন, " ছি বাবা, ও কথা বলতে নেই। আমি তখন কি নিয়ে বাঁচবো? আমিও মরে যাবো।" বলতে বলতে মায়ের চোখ জলে ভরে ওঠে। সে কথা সে আজও ভোলে নি।


আর একবার, তার স্পষ্ট মনে আছে, ও হারিয়ে গিয়েছিল।ছেলেধরা ধরে নিয়ে চলে যাচ্ছিলো। দুপুর থেকে রাত ৯টা ১০টা কেটে গেছে হবে মা কিছুই মুখে দেয় নি,কেবল কান্নাকাটি করেছে। মাঝে মাঝে জ্ঞান হারিয়েছে । ভাগ্যক্রমে পাড়ার এক দাদা ওকে দেখতে পেয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনে,তবে মা মুখে কিছু দিয়েছে। আজ সেই মা কে অসহায় অবস্থায় সে তার বৌ এর জন্য বাড়ি ছাড়া করছে। ওর বুক ফেটে যাচ্ছে। মুখে কিছু বলতে পারছে না। ঘন ঘন পায়চারী করছে আর আড় চোখে মায়ের গোছগাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। এক এক সময় তার মনে হয় — দৌড়ে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলে, " মা গো তুমি যেও না মা আমায় ছেড়ে।" কিন্তু পারে না স্ত্রীর শাসনে।


এতক্ষণে পাঠক মাত্রেরই জানতে বাকি নেই যে লাবণ্যময়ী তার তৈরি সংসার থেকে বিতাড়িত। স্বামী সুধাময় মারা গেছেন আজ দু বছর হলো। স্বামীর শেষ জীবন ভালো কাটেনি। তার ছেলে -বৌ তার শেষ জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলে ছিলো। বৌমা মধুরা তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে ঝি -চাকরের মতো খাটাতে থাকে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম সুপ্রিয়র সামনে শ্বশুর -শাশুড়ীর প্রতি খুব শ্রদ্ধা ভক্তি দেখায়। আর পরে পরে তার অবর্তমানে ফাই ফরমায়েশ করে খাটিয়ে মারে। মনঃপূত না হলে মুখ ঝামটা দেয়। অপমান সূচক কথা বলে। বাইরের সমস্ত কাজ শ্বশুরকে দিয়ে আর ঘরের কাজ তাঁকে দিয়ে করাতে থাকে স্বামী সুধাময় সওদাগরী অফিসে কাজ করতেন। উপায় ভালোই ছিলো। কিন্তু অবসরের পর খুব বেশি টাকা তিনি হাতে পান নি মেয়ের বিয়ের সময় প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে লোন নিতে হয়েছে বেশ খানিকটা টাকা।তারপর ব্যাঙ্কের জমানো টাকা থেকেও অনেকটা টাকা চলে গেছে।

সুতরাং শেষমেশ হাত অনেকটাই খালি হয়ে গেছে।বাকি যে টুকু বেঁচেছিল তার অর্জিত সুদ থেকে হাত খরচা চলতো। তার মধ্যে বৌমা সন্তান প্রসবের সময় প্রকারান্তরে দশ পনেরো হাজার টাকা আদায় করে নেয়। ফলত তারা খাই খরচ বাবদ ছেলের হাতে কিছুই তুলে দিতে পারে না।সংসারের গলগ্রহ হয়ে জীবন ধারণ করা ছাড়া আর গতি রইলো না। সুপ্রিয় ব্যাঙ্কে চাকরি করে।উপায় ভালোই কিন্তু হলে কি হবে, বৌমার হাতেই সব তুলে দেয়।‌বৌমা শ্বশুর -শাশুড়ির দায় না নিয়ে নিজের ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে।তা ভাবুক। ভাবতে তো হবেই কিন্তু বাবা মা কে না দেখে। উল্টে কি করে শ্বশুর-শাশুড়ির শেষ সম্বলটুকু আদায় করে নেয়া যায় সেই চেষ্টা।এই বাবা-মায়েরাই একদিন ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়েই তো আজ তাদের হাত শূণ্য। নিঃস্ব বাবা-মার দায় মানুষ হয়ে যাওয়া ছেলে মেয়েদের নয় কি।


সুধাময় যৌথ পরিবারে মানুষ। ঘরের সঙ্কুলান না হওয়ায় বিয়ের বছর ছয়েকের মধ্যে তারা সংসার থেকে বেরিয়ে আসেন তাদের দ্বিতীয় সন্তান সুমনা জন্মাবার পর। সুপ্রিয় তখন পাঁচ বছরের। লাবণ্যময়ী তখন সংসারের আর কারোর কথা না ভেবে কেবল সুপ্রিয় ও সুমনার সুখের কথা ভেবে সংসার থেকে বেরিয়ে আসেন নির্বিবাদে। অবশ‌্য তাদের বের হওয়ার একটা অকাট্য যুক্তি ছিল—ঘরের সঙ্কুলান না হওয়ায় জন্য। কিন্তু যাদের জন্য তারা এ কাজ করতে বাধ্য হয়ে ছিলেন সেই ছেলের সংসার

তাদেরই নির্মিত বাড়ি থেকে তাঁকে আলাদা করে দিতে চাইছে। নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস! তফাৎটা হলো তিনি শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন আর এখন তাঁর বৌমা তাঁদের ভিটে থেকে তাঁকে বের করে দিচ্ছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাই লাবণ্যময়ী বউ হয়ে তাঁর শাশুড়ির কাছ থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন আর এখন মধুরা বউ হয়ে শাশুড়ি লাবণ্যময়ীকে তাদেরই বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইছে।পরের জন আগের জনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে চাইছে। এই ভাবেই ভেঙেছে যৌথ পরিবার।আর তাতে স্ত্রীলোকের অগ্রণী ভূমিকা আছে। পুরুষ মৌন থেকেছে, আর 'মৌনতা সম্মতি লক্ষনম্'—

এই আপ্তবাক্যকে মেনে নিলে বলতে হয় —সংসার বিভাজনে পুরুষের পরোক্ষ ভূমিকা আছে। এই মৌনতার দুটি কারণ সম্ভব ।

প্রথমতঃ, অতিরিক্ত স্ত্রৈণতা। দ্বিতীয়তঃ, অশান্তি এড়িয়ে চলা। কারণ, যে নারী পুরুষকে বাগে আনতে পারে অসমর্থ, তারা সংসারে অশান্তির বীজ বপন করতে চায় —যা পুরুষের কাম্য নয়। যদিও সর্বক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কম হলেও কত মহীয়সী নারী এখনও আছেন উদাহরণের অপেক্ষায়। 


বর্তমানে চরম প্রতিবাদের মুখপাত্র হিসাবে আইনকে ব্যবহার করে অনেক নারীই সংসারে অশান্তির বীজ বপন করে । তাতে পুরুষটি বাগে এলে ভালো,নইলে সে নিজের কবর নিজেই খুঁড়বে। সে নারীও জানে যে তাকে আরও নিরাপত্তা ও বিসর্জন দিতে হবে। তবুও সে মরিয়া,  তার গোঁ চরিতার্থ করতে।বাল্যে মায়ের স্নেহ, ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে মায়ের আঁচল ছাড়া সন্তান আর কিছু জানে না। আবার দাম্পত্য জীবনে স্ত্রী সোহাগে বিগলিত হয়ে স্ত্রীর আঁচল ছাড়া কিছু বোঝে না। পুরুষের কাছে নারীর এই যে দ্বৈত রূপের মুন্সিয়ানা, তার কাছে পুরুষ সর্বদাই নাবালক। নারীর স্ববিরোধী সংঘাত —বাল্যে মাতৃরূপে সন্তানের ওপর, আবার যৌবনে স্ত্রীরূপে স্বামীর ওপর বেপরোয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার , এই দুয়ের জাঁতাকলে পড়ে পুরুষের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। তার তখন ' রাই রাখি না শ্যাম রাখি ' অবস্থা।তখন সে ব্যক্তিসত্ত্বাহীন, প্রাণহীন এক কলের পুতুলে পরিণত হয়।


আবার এমন অনেক বেইমান,স্বার্থপর সন্তান আছে,যারা স্ত্রীর আপত্তি সত্ত্বেও নিজের সংসারের অধিকতর সুখ -সমৃদ্ধির জন্য পিতা -মাতার কাছ থেকে সরে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় , তাদের অপার স্নেহ - ভালবাসা , আত্মত্যাগকে অস্বীকার করে। অনেকটা শিব গড়তে গিয়ে বানর তৈরি হওয়ার মতো।


নারী হলো প্রকৃতি। যা প্রকৃতির মতোই কোমল ও সুন্দর।এই  কোমল,সুন্দর নারী ফুলের সঙ্গে তুলনীয়। নারী স্বরূপ ফুল দিয়েই সংসার রূপ বাগিচা গড়ে ওঠে। আর ফুল যদি হয় বনফুল তবে তার জায়গা হয় অরণ্যে। তদ্রুপ নারী যদি হয় বনফুল তবে সংসার হয়ে ওঠে ভয়ংকর অরণ্য সদৃশ্য। নারী 'মমতাময়ী '  ' করুণাময়ী ' শব্দদুটি শুধু মাত্র তার মাতৃরূপেই ধরা পড়ে, স্ত্রীরূপে নয়। বর্তমানে আর্থ -সামাজিকতার যুগে নারীর স্ববিরোধী সংঘাত (স্ত্রী ও মায়ের ভূমিকায় বিরোধ) প্রকট হওয়ার জেরে কতো বৃহৎ সংসার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এককালে পুরুষ শাসিত সমাজ ছিল বলে নারী তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারেনি।পুরুষের প্রচেষ্টায় সংসার যৌথ থেকেছে।তখন নারী ছিল মুখোশের আড়ালে। আজ নারী স্বাধীনতার যুগে নারী তার মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়েছে তার এই স্ববিরোধী সংঘাতকে ক্রিয়াশীল করতে।


মাতৃ ঋণ অপরিশোধ্য। নারীর মাতৃরূপ স্ত্রীরূপের চেয়ে ঢের বেশি মহিমাময়।কিন্তু বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত   সন্তানকে মা সন্তান বলে চিনতে পারেন। বিয়ের পরেই সন্তানকে চিনতে তাঁর কষ্ট হয়।যেমন হচ্ছে লাবণ্যময়ীর। আজ এই মাতৃরূপের পরাজয়কে বরণ করে লাবণ্যময়ীকে তারই হাতে গড়া সংসার থেকে বিতাড়িত হয়ে এক বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে উঠতে হচ্ছে। লাবণ্যময়ীও তাঁর স্ত্রী সত্ত্বার অধিকার ফলিয়ে ছিলেন সংসার থেকে আলাদা হতে চেয়ে। তবে তফাৎ এটুকুই যে নিজের ভালো চেয়ে স্বামীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন প্রতিপক্ষ নারী অর্থাৎ শাশুড়িকে পথে বসিয়ে নয়। যেমনটি ঘটছে তাঁর নিজের জীবনে ।


লাবণ্যময়ীর নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে —বেশিদিন বাঁচার জন্য। স্বামীর আগেই তার মৃত্যু হলেই ভালো হতো। সধবা অবস্থায় পৃথিবী থেকে চলে গেলে সসন্মানেই যেতে পারতেন। তার মতো বিধবা আজ সংসারের গলগ্রহ। তার মৃত্যুতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে সংসারের সকলে, ব্যতিক্রম শুধু নাতি নাতনিরা। তারা সর্বদাই সচেষ্ট ঠাকুরদা - ঠাকুমা ও দাদামশাই - দিদিমার ভালবাসা পেতে। মাঝে মাঝে স্বামীর কথা মনে পড়ে —এ সংসারে আরও বেশিদিন বাঁচলে তাকে যে শারিরীক ও মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হতো এমন কি অর্দ্ধাহারও অসম্ভব নয়, তা লাবণ্যময়ী সহ্য করতে পারতেন না।তার চেয়ে মরে গিয়ে সে বেঁচেছে। তার বৌমা তাকে দিয়ে কি না করিয়েছে।দোকান,বাজার, নাতি টিপুকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা, বিকেল হলে পার্কে খেলতে নিয়ে যাওয়া, আবার সন্ধ্যে হলে পড়ানো, কি নয় ? জ্বর , শরীর খারাপ কোন কিছুতেই রেহাই নেই। তার ওপর একটু দুধও জোটেনি।ছেলে সুপ্রিয় সবই জানে তবুও সে মধুরার ভয়ে কিছুই বলতে পারে না। তার মতে —সংসারের সবাই খাটে, সবাইকে দুধ খাওয়াতে হলে তো পেটে আর ভাত জুটবে না।অথচ মধুরার বাপের বাড়ির লোকজন এলে ‌কি খাতির যত্নই না করে মধুরা নাম কেনার জন্য। তাও ছেলে চুপচাপ দেখে যায়। প্রতিবাদ করতে পারে না শুধু অশান্তির ভয়ে। কিন্তু শ্বশুর -শাশুড়ীকে খাওয়াচ্ছে বলে সে প্রায়ই বলে, " এই মাগ্গি- গণ্ডার বাজারে একটা লোকের আয়ের ওপর নির্ভর করে এতো গুলো পেট চালানো কি সম্ভব! এই করতে করতে মরে যাবে, সুখের মুখ আর দেখতে পাবে না।" কোন বাবা মা এসব শুনে খুশি হতে পারে। শ্বশুর -শাশুড়ীর দায় নেওয়াটাই দেখলো। শ্বশুর -শাশুড়ীর বাড়িতে থাকা, তাদের শ্রম নিঙড়ে নেওয়ার কথা ভেবে দেখার দরকার নেই। কখনও কখনও শ্বশুর -শাশুড়ীকে শুনিয়ে শুনিয়ে মধুরা বলে, " ছোট বেলায় ছেলেকে সুখে রেখেছিল বলে, তাই এখন তার শোধ তুলছে।"


সে ও তার স্বামী কেউই শুয়ে বসে খায় না। কেউই দুদণ্ড চুপ করে বসে থাকতে পারে না। একটা না একটা কাজ লেগেই আছে। তার নিজেরই কি না কম কাজ —সকালে উঠেই বিছানা ঝাড়া তারপর চা জলখাবার তৈরি, রান্নার জোগাড় করা, নাতি নাতনীর টিফিন ভরা । ওদের মায়ের‌ শুধু  স্নান করানো, খাওয়ানো আর বই পত্তর গুছিয়ে দেওয়া কাজ । সংসারের কোন কাজই বড়ো একটা করতে হয় না, নিজেদের কাপড় জামা কাচা ছাড়া। তবুও মন পাওয়া যায় না।এর ওপর আছে এটা ওটা ফরমায়েশ।এক এক সময়ে ফরমায়েশে জের বার হয়ে  হাতের একটা কাজ ফেলে অন্যটা করতে ছুটতে হয়। স্বামী এসব দেখে মর্মাহত হতো। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। তিনিও খেটে খেটে কাহিল হয়ে পড়তেন। তাঁকে চোদ্দ বার‌ দোকানে পাঠাতো বৌমা।একটু বসতে দিতো না। বেচারি আর পেরে উঠতো না, হাঁপিয়ে যেতো। এই বৃদ্ধ বয়সে এতো পরিশ্রম করে বাঁচার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়। শেষের দিকে বাঁচার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিল। লাবণ্যময়ীও মনে মনে ভাবতেন না মরলে এ সংসার থেকে মুক্তি পাবে না।কিন্তু উনি চলে গেলে লাবণ্যময়ীর দুর্গতির শেষ থাকবে না এটাও তিনি জানেন। সন্ধ্যে দেবার সময় ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেন দুজনে যেন এক সঙ্গে চলে যেতে পারেন। কিন্তু তা আর হবার নয়। কর্তা চলে যেতে তাঁর কপাল আরও পুড়লো। স্ত্রীলোকের জান সহজে যেতে চায় না। তাই বহুদিন বেঁচে থেকে এইসব সহ্য করতে হচ্ছে। ভগবান তাই বুঝি স্ত্রীলোকের সহ্য শক্তি পুরুষের চেয়ে বেশি দিয়েছেন। সুধাময় এসব দেখে সহ্য করতে পারেনি বলেই তাই পৃথিবী ছেড়ে তাড়াতাড়ি চলে গেছে।


লাবণ্যময়ীর বাঁচার সান্ত্বনা একটাই। মেয়ে সুমনা ও জামাই সৌমিত্র আর ওদের সন্তান পাপা তাঁকে মাঝে মাঝেই দেখতে আসে।কিছু টাকা তাঁর হাতে দিয়ে যায় ফলমূল , হরলিক্স, ওষুধ ইত্যাদি কেনার জন্য। প্রথম প্রথম তারা এইসব কিনে নিয়ে আসতো।কিন্তু সে সব বৌমা তাঁদের একটুখানি দিয়ে সবই ছেলে মেয়েকে খাইয়ে দিতো । আর তাছাড়া ওনারা নাতি নাতনিকে না দিয়ে খেতে পারতেন না।যে ভাবেই হোক, ওনাদের‌ একা একা খাওয়া হতো না। বাবু বেঁচে থাকতে মেয়ে জামাই আসতো দেখতে। সুমনা 'বাবু' বলতে অজ্ঞান। সে বাবাকে খুব ভালবাসে। মেয়ে বাবার গলার হার। কেননা মেয়ে হবার পর সুধাময়ের চাকুরীতে খুব উন্নতি হয়।জামাই সৌমিত্রকে ওনারা ভাগ্য করে পেয়েছেন। সরকারি অফিসার। কোন অহংকার নেই। নেই কোন পিছুটান। বাবা মা সম্প্রতি মারা গিয়েছেন। তাই তো শ্বশুর -শাশুড়ীকে নিয়ে গিয়ে রাখতে চেয়েছেন নিজের কাছে।কিন্তু শ্বশুর শাশুড়ি নিজের বাড়ি ছেড়ে জামাই বাড়ি গিয়ে থাকতে চান না। যেমন ছেলের শ্বশুর শাশুড়ি করে ঠিক এর বিপরীত। বাবুর শরীর খারাপ হয়েছে শুনলে তারা পড়ি কি মরি করে ছুটে আসতো। সে কি কান্না সুমনার—" বাবা,তোমার শরীর খারাপ, তুমি আমাদের খবর দাও নি কেন। চলো আমাদের সঙ্গে।তোমার জামাই তো কতো বার বলেছে তোমাদের নিয়ে যাবার।------ইত্যাদি ইত্যাদি।" তারা যেমন জামাই পেয়েছেন তেমন বৌমা পান নি। সৌমিত্র খুব কর্তব্যপরায়ণ। মেয়ে তাদের সুখে আছে, হাজার দুঃখে একটাই সান্ত্বনা। বাবু মা'র কষ্ট হলে সুমনা দাদাকে ছেড়ে কথা বলে না, বৌদির সঙ্গে ঝগডা হয়। ওরা চলে গেলে সমস্ত ঝাল ঝাড়ে শাশুড়ির ওপর । বলে, "মেয়ের যদি এতোই দরদ কাছে নিয়ে গিয়ে রাখুগ না।" 

লাবণ্যময়ীও উত্তরে বলেন, " ওরা তো নিয়ে যেতেই চায়। তোমার শ্বশুর থাকতে থাকতেই তো কতবার বলেছে আমাদেরকে নিয়ে যাবার জন্য। নিয়ে গেলে রাজার হালে রাখবে। আমার মেয়ে জামাই তার বাবা মা'কে কত যত্ন আত্তি করতো ।

শ্বশুর শাশুড়ির সুমনাকে ছাড়া চলতোই না। সুমনা বাবাকে যেমন ভালোবাসতো তেমনি শ্বশুরকে।আজ তাঁরা স্বর্গে গেছেন । মিথ্যে বলবো না, তাঁরা কতো ভালো মানুষ ছিলেন।

আমরাই যেতে চাই নি। ছেলে থাকতে মেয়ের বাড়ি পড়ে থাকবো কেন। যাদের ছেলে নেই তাদের জামাই বাড়ি পড়ে থাকা মানায়।"

অমনি উল্টো মানে করে মধুরা বলে, "আমার বাবা মা আসেন বলে আপনি খোঁটা দিচ্ছেন?"

—মোটেই না। তোমার বাবা মা তো আসবেনই । তাঁদের ছেলে নেই। ছেলের কাজ তো তোমাদেরই করতে হবে। আমি তো তাই বলছি—তোমার বাবা মা 'র যা মানায়, আমাদের তা মানায় না। তাই যাই না।


এখন সুমনা এলে বৌদির সঙ্গে কথা বলে না। দাদা থাকলে দাদার সঙ্গে আর ভাইপো টিপুর সঙ্গে কথা বলে।ভাইঝি টিঙ্কুকে আদর করে। ওদের জন্য মাঝে মাঝে কিছু কিনে আনে।টিপু ও টিঙ্কু পিসিকে খুব ভালোবাসে। সুমনা মায়ের হাতে টাকা দিয়ে যায় কিন্তু সে টাকা সংসারেই ঢুকে যায়। সুমনা মা 'কে বলে, " কি করবো বলো।।ফলমূল দিয়ে গেলে ঠিক মতো খেতে পাবে না। টাকা দিয়ে গেলেও কিনে খেতে পারবে না , ওদের সংসারে সব ঢুকে যাবে।

আমার কাছে নিয়ে যেতে চাইলেও যাবে না। এখানে পড়ে পড়ে কষ্ট পাবে সেই ভালো।তোমার জামাই দুঃখ করে বলে, " আমি কি মায়ের ছেলে নই ,সুপ্রিয়দাই শুধু তাঁর ছেলে।


তাই সুমনা ও সৌমিত্র ঠিক করেছে মা'কে কোন বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবে। তবে তিনি যেতে চাইবেন কিনা কে জানে । সেখানে থাকলে তবু মাকে তারা দেখতে পারবে।আর পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলতে পারলে মনটাও অনেক ভালো থাকবে। অন্ততঃ ওই নরক থেকে যত তাড়াতাড়ি বের হতে পারে ততই মঙ্গল।

নইলে বাবুর মতো কষ্ট নিয়ে পৃথিবী থেকে চলে যেতে হবে তাদের মাকেও। এ ব্যাপারে দাদার সঙ্গে সুমনা কথা বলেছে। সে কিছু দিতে পারলে দেবে না পারলে না দেবে।খরচ যা লাগবে তারাই দেবে। এতে দাদা রাজীও হয়ে যায়। কারণ মাকে দেখার পূর্ণ দায়িত্ব তাকে নিতে হবে না।

হ্যাঁ যদি সুমনা কিছুটা ব‌্যয়ভার বহন করতো তাহলে সে মাকে যেতে দিতো না। কারণ মাকে রাখলে তার‌ লাভই হতো । একটা রান্নার লোক রাখতে পারতো।কিন্তু সুমনা তো তা দেবে না।

সাত পাঁচ ভেবে সুপ্রিয় বলে, " যা করার কর। তোরা আমায় ভুল বুঝিস্ না। আমি সংসারকে বাঁচিয়ে যখন যা পারবো দেবো। তবু মায়ের কষ্ট আমি আর দেখতে পারছি না। আমার কিছু করার নেই। এবার মা চলে গেলে এ সংসারের কাজ মধুরা একা সামলাতে পারবে না জানি, কাজের লোক তো আছে,এবার রান্নার লোকও রাখতে হবে। সুতরাং আমি কি আর মায়ের জন্যে বেশি কিছু করতে পারবো ?" "তুই কিছু ভাবিস্ না দাদা। আমরা তো আছি।"—সুমনা সুপ্রিয়কে আস্বস্ত করে।


এদিকে মধুরার সামনে সুপ্রিয় মাকে বলে, "মা তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে জানি, এই বয়সে তোমার এ কষ্ট করা সম্ভব নয়। কবে থেকেই তো খেটে চলেছো। দুটো ভালোমন্দ খেতেও দিতে পারি না। তার ওপর এই অশান্তি, ঝগড়া আমার সহ্য হয় না মা। তুমি চোখের জল ফেলবে তাতে কি এ সংসারের অমঙ্গল হবে না? তার চেয়ে আমি বলি কি তোমাকে এক বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসি সেখানে তুমি ভালোই থাকবে।তোমার খাটা খাটুনিটাও অনেক কমে যাবে। আমি না পারি, সুমনা সৌমিত্র ওরাই তোমার দেখাশোনা করবে। আমি যখন পারি তোমায় দেখে আসবো।যার সংসার সে এবার বুঝে নিক্।

—বৌমা কি একা পারবে। দু-দুটো বাচ্চা সামলে সংসারের কাজ করতে। টিপু ও টিঙ্কু আমাকে ছাড়া একা হয়ে পড়বে।আমায় ছেড়ে থাকতে পারবে?

—খুব পারবে মা। সেটাই ওকে বুঝতে দিতে হবে।মাথার ওপরে ছাতা না থাকলে কি হয়। ওকে আমি বলেছি। ও তোমাকে আপদ ভাবে। কাজে কাজেই আপদ দূর হলেই ভালো।

সুপ্রিয় মাকে বোঝাবার চেষ্টা করে।

—তা ছাড়া তোর কষ্ট হবে না?

—হলে কি করবো বলো? আমার কষ্ট হবে বলে তোমার কষ্ট দেখে যাবো? কষ্ট হয় হবে। তুমি আমার কথা ভেবো না মা।

বলতে বলতে সুপ্রিয়র গলা ভারী হয়ে আসে। চোখের কোণায় জল চিক্ চিক্ করে। লাবণ্যময়ী বুঝতে পারেন ছেলে নিরুপায়। ওর ভেতরটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিয়তি কেনো বাধ্যতা।লাবণ্যময়ী দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে যান।


মধুরা এটাই চেয়েছিলো তবে এতো তাড়াতাড়ি নয়।কারণ শাশুড়ির কাছে এখনও বেশ কিছু টাকা মজুত আছে।সেটাকে হাতাতে পারলে তো অনেক আগেই মধুরা শাশুড়িকে বৃদ্ধাশ্রমের দরজা দেখিয়ে দিতো। তবুও সে বলে,"হ্যাঁ হ্যাঁ সেই ভালো।এখানে আপনার কষ্ট হচ্ছে জানি কিন্তু আমাদেরও তো কিছু করার নেই। সংসারে থাকলেই কাজ, না থাকলে নয়।

আমরা বরং দেখতে যাবো। খোঁজ খবর নেবো। আপনি ভালোই থাকবেন। টিপু, টিঙ্কু আপনাকে মাঝে মাঝে দেখতে যাবে। তবে মা পূজোর কটা দিন এখানে থেকে পূজোটা কাটিয়েই না হয় যাবেন। পূজোর কটা দিন আপনাকে ছেড়ে থাকতে আমাদেরও ভালো লাগবে না।"

মধুরার সুর নরম শোনালো লাবণ্যময়ীর কানে। কিন্তু তাতে কি। আসলে পূজোর কটা দিন মেয়ে টিঙ্কুকে সকালে দু একটা ঠাকুর দেখিয়ে আনতে আর রাত্রে ঠাকুমার কাছে রেখে ঠাকুর দেখতে বের হতে হবে তো। মা বাবা বোন আসবে। শাশুড়ির ঘাড়ে সব ফেলে দিয়ে গল্প গুজব করতে হবে এই আর কি।তোমার পায়ে গড় নয়, তোমার কাজের পায়ে গড়। আর তাছাড়া পূজোর আগে বিদায় দিলে লোকে বলবে কি। সংসারের একটা কল্যাণ অকল্যাণ আছে তো। এসব কথা মাথায় রেখেই মধুরা পূজোর পর শাশুড়িকে বিদায় দিতে চেয়েছে।


মধুরার বাবা মা বোন আবার মামাতো বোন পঞ্চমীর দিন থেকেই এসে হাজির। বাড়ি গম্ গম্ করছে। খাওয়া -দাওয়ার পালা চলছে লাবণ্যময়ীর ওপর সমস্ত ভার চাপিয়ে দিয়ে। বৌমা তার বাবা, মা, দুই বোন সকলকে নিয়ে ঘরের মধ্যে চালাচ্ছে শাশুড়ির বিরুদ্ধে শলা পরামর্শ। আসলে বৌমার মা কুচক্রী মন্থরা দেবী সর্বক্ষণ মেয়ের কান ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে সংসারটাকে ভাঙতে চেষ্টা করছে। বাবাটাও ধুরন্ধর।এনারা চান জামাইয়ের মাকে সংসার থেকে সরাতে পারলেই যখন তখন আসা যাওয়া করা যাবে। আপদে বিপদে জামাইয়ের কাছে হাত পাতা যাবে।আর একটা মেয়ে আছে, তার বিয়ের দায়িত্ব জামাইয়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যাবে। শাশুড়ি থাকলে এগুলো তো করা যাবে না। তাই শাশুড়িকে সংসার থেকে বিতাড়িত করার মন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে। সুপ্রিয় অবশ্য দোকান বাজার করতেই ব্যস্ত। একদিকে চলছে আনন্দের ফোয়ারা আর অন্য দিকে বাজছে বিষাদের বাজনা । লাবণ্যময়ী মুখ বুজে রান্নাঘর সামলাচ্ছেন। শেষ কদিন সুমনা রোজই একবার করে আসে মায়ের ওপর অত্যাচারের বহরটা দেখার জন্য। এসে দেখে মা রান্নাঘরে হিমসিম খাচ্ছে।ঘেমে নেয়ে একশা।বয়স হয়েছে এই বয়েসে এত জনের রান্নার জোগাড় করা কি সোজা ব্যাপার। অথচ যার লোক এসেছে তিনি ঘরের মধ্যে গুলতানি করছেন । সুপ্রিয় দোকান বাজার করার ফাঁকে ফাঁকে সবই লক্ষ্য করছে। শ্বশুর শাশুড়ি শালীদের সামনে অশান্তি করতে হবে বলে কিছু বলতে পারছে না, আবার মাকে দেখেও কষ্ট হচ্ছে খুব। সুমনা দাদা সুপ্রিয়র দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে মায়ের হাত ধরে টেনে বের এনে বললো, " দাদা, এসব হচ্ছেটা কি? এই মানুষটার‌ একার ভরসায় কি এনাদের এনেছিস্ ? মানুষটাকে তো বাড়ি থেকে তাড়াচ্ছিস্ , শেষ সময়েও তাকে রেহাই দিবি না? এজন্য বুঝি পূজো পর্যন্ত মাকে আটকে রেখেছিস্ ?


সুপ্রিয় এবার চুপ করে থাকেনি। ও ইশারা করে মধুরাকে ডাকলো। মধুরা হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললো, " কি হয়েছে কি ?"

— এই এতোগুলো লোকের রান্না একা মায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তুমি ঘরে বসে গল্প করছো। মা একা খাবে , আর কেউ খাবে না? ওরা তো অতিথি , তুমিও কি তাই ?

সুপ্রিয়র কথাগুলো শুনে মধুরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো, তারপর সুমনার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, " ও বুঝতে পেরেছি, দরদের লোক এসে গেছে। তা অতই যদি দরদ তবে হাত লাগালেই তো পারো।"

কথাটা শুনে সুপ্রিয় আর ঠিক থাকতে পারলো না , বললো, " ও কেন করবে? ও কি খেতে এসেছে ? ও এসেছে মাকে দেখতে। যারা খেতে এসেছে, তারা তো হাত লাগালে পারে। "

সুপ্রিয় ওদের উদ্দেশ্যে কথাটা বলতে চায় নি ।মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। এটা বলা অবশ্যই ঠিক নয়। কারণ ওরা অতিথি, রান্না করে খাবে কেন ? সুপ্রিয় আসলে মধুরার কথা বলতে চেয়েছে ।

যেই না বলা, মধুরা ধেই ধেই করে নেচে উঠলো ।—" আমার মা, বাবা, বোনেদের খাবারের খোঁটা দিলে ? "

গণ্ডগোল শুনে মধুরার বাবা মা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। " কি হয়েছে কি? এতো হৈ চৈ কিসের?"—মধুরার বাবা জানতে চাইলেন।

" বাবা,আপনি বলুন তো, এই বুড়ো মানুষটার ঘাড়ে এতসব চাপিয়ে ঘরে বসে গল্প করাটা কি ঠিক? তোমার ঘরে লোক এসেছে আর তুমি হাত গুটিয়ে বসে আছো।"—সুপ্রিয় শ্বশুরের কাছে অভিযোগ করে।

মনের কথা মনে রেখে মধুরার বাবা বলে উঠলেন, " ঠিকই তো,বেয়ান কি বুড়ো বয়সে একা সব ঝামেলা সামলাতে পারেন। না না মধু,তুই শাশুড়ির একার ওপর ছেড়ে দিয়ে ঠিক করিস্ নি। শাশুড়ি আজ বাদে কাল চলে যাবেন, ওঁকে এ কটা দিন নাই বা খাটালি।দরকার হলে তুই মা বোনকে ডেকে নে।সবাই মিলে হাতে হাতে করে নিলেই তো হয়।"

কথাটা মন্দ বলেন নি মধুরার বাবা। মনে তার যাই থাক । মধুরা আর কথা না বাড়িয়ে গজ গজ করতে করতে রান্নাঘরে ঢুকে গিয়ে শাশুড়িকে বললো,

"যান মা যান। গিয়ে আমায় রেহাই দিন। আমি একাই করে নিচ্ছি। "


দশমীর দিন সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার। মুখ ভার বাড়ির সকলের।এ বছর পূজোটা ভালো কাটলো না বাড়ির কারোরই ।লাবণ্যময়ীর তো নয়ই। পূজোর কটা দিন তিনি প্রতিমার মুখ দর্শন পর্যন্ত করেন নি। টিপু ও টিঙ্কুও ঠাকুর দেখতে যাবার জন্য বায়না পর্যন্ত করে নি। পরিবেশ পরিস্থিতি যেন ওই বাচ্চা দুটোও বুঝে ফেলেছে। আসলে ওরা তো ঠাকুমার সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বের হয়। ওদের যা কিছু সব ঠাকুমা। টিপু টিঙ্কু ঠাকুমার কাছে শোয়। ঠাকুমা ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে ,গল্প বলে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। যে দিন থেকে কথা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে যাবার,সে দিন থেকে ওরা লক্ষ্য করছে ঠাকুমা যেন কি রকম গম্ভীর হয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই আঁচল দিয়ে চোখ মুছে চলেছে। টিপু ও টিঙ্কু ওদের ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করে, " ঠাকুমা,তোমার কি হয়েছে ?"

—কিছু না তো দাদু।

—কিছু না বললেই হবে। ওরা সব কি বলাবলি করছে, তুমি কোথায় চলে যাবে।

—কোথায় আর যাবো দাদু । যাবার আর কোন চুলোয় জায়গা আছে। যাবার তো একটাই জায়গা আছে। ভগবান আর দয়া করছেন কোথায়। সেখানেই যেতে পারলে বাঁচি।

টিপু ছোট হলে কি হবে, ঠাকুমার কথা শুনে শুনে বুঝে গেছে ঠাকুমা মরার কথা বলছে। তাই ও বলে, " ঠাকুমা, তুমি মরার কথা বলবে না তো। তুমি মরলে আমায় সঙ্গে নিয়ে যাবে।  তোমায় ছাড়া আমি এখানে থাকবো না।" লাবণ্যময়ী সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে ওঠেন, "বালাই সাট! ও কথা তুমি মুখেও আনবে না। আমি কিন্তু ভীষণ রাগ করবো।"

তাঁর অবর্তমানে এই ছেলে মেয়ে দুটোর কি অবস্থা হবে তিনি ভেবে পারছেন না।জন্ম থেকেই ঠাকুমার কাছে মানুষ।তাঁকে কি সহজে ওরা যেতে দেবে? তিনি আর ভেবে পারছেন না।একে তো এক ফাঁসির আসামীর মতো রুদ্ধশ্বাস প্রহর গুনতে গুনতে তাঁর দিন কাটছে। চূড়ান্ত সময়ের সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন।


আগে থেকেই ঠিক ছিল সুমনা বিজয়ার দিন মাকে তার বাড়ি টালা পার্কে নিয়ে যাবে।সেখান থেকে তার পর দিন অর্থাৎ একাদশীর দিন সুমনা সৌমিত্র মাকে নিয়ে সোজা চলে যাবে লেক টাউনের এক বৃদ্ধাশ্রমে।এখান থেকে পুত্র কন্যা সহ সুপ্রিয় ও মধুরা সোজা চলে যাবে ওখানে। সেই মতো বিজয়ার পর্ব চলাকালীন সময়ে সৌমিত্র তার গাড়ি নিয়ে এসে হাজির হলো। লাবণ্যময়ী প্রস্তুত হয়ে গেলেন সুমনার দেওয়া একটা নতুন শাড়ি পরে।এবার বিদায়ের পালা।আগের দিন সুমনা মাকে তার বাড়ি নিয়ে যাবার কারণ, লাবণ্যময়ী কোনদিন মেয়ের বাড়ি যান নি।অর যাওয়া হবে কি না এই ভেবে। এসময় নাতি বায়না ধরলো, " ঠাম্মা তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমি তোমার সঙ্গে যাবো ।

—না দাদু, তুমি কোথায় যাবে মা বাবাকে ছেড়ে ?

—তুমি যে যাচ্ছ।

 —আমি জানি না বাবা আমি কেন যাচ্ছি। হয়তো আমায় যেতে হবে বলেই যাচ্ছি।

লাবণ্যময়ীর চাপা দুঃখ যেন নাতির স্পর্শে বেরিয়ে আসতে চাইলো। অশ্রুপূর্ণ নয়নে নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে থাকেন, "দুষ্টুমি করোনা। সাবধানে থেকো , কেমন? বাবা মার কথা শুনবে। বোনকে দেখবে।"

টিপু বালক হলে কি হবে।পরিবেশ পরিস্থিতি তাকে যেন অনেকটাই সাবালোক করে তুলেছে। সে বুঝতে পারে তার বড়ো কাছের মানুষ ঠাম্মা তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে দুরে কোথাও। ঠাম্মাকে মা একেবারে দেখতে পারে না। শুধু ঝগড়া করে। বাবা যেন মাকে ভয় পায়।তাই কিছু বলে না। তার মায়ের ওপর ভীষণ রাগ হয়।ঠাম্মা কতো শান্ত, কতো গল্প বলে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।

— তাহলে কে আমায় গল্প শোনাবে, ঘুম পাড়িয়ে দেবে,চান করিয়ে দেবে?

টিপু হাতের চেটোর ওপর আঙুল ঘষতে ঘষতে খইনি পেশার মতো করে কথা গুলো বলতে থাকে। অর্থ হলো বড়োরা কেউ কিছু করতে পারছে না। ও নিজে বড়ো হলে দেখে নিতো। এখানে তার অসহায়ত্ব ফুটে।

লাবণ্যময়ীর গলা বুজে আসে।নাতির মুখের দিকে তাকাতে পারে না।ধরা গলায় বলেন , " কেন মা আছে তো,না হলে তুমি বড়ো হচ্ছ,একা একা করার চেষ্টা করবে। এবার থেকে সব শিখতে হবে।কখনও করোর ওপর নির্ভর করবে না দাদুভাই, বুঝলে।"

টিপু মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ে। ঠাকুমা নাতির মুখটা তুলে ধরেন,দেখেন টিপুর চোখ স্বজন হারানোর ব্যথায় জলে ভরে উঠেছে। এ কান্না একটা শিশুর বায়না নয়, এ এক গভীর জীবন বোধের কান্না, হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে অপ্রতিরোধ্য ভাবে বেরিয়ে আসা কান্না,তাই তো ও মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কাঁদছে, যেমন তার বাবা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে, ঠাম্মির কাছে আসছে না, সে কি না কেঁদে। বাবাও হয়তো কাঁদছে তার মতো । সে এক ছুটে ঘরে ঢুকে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। ওর মনে হয় ও যদি বাবার মতো বড়ো হতো, কিছুতেই ঠাম্মিকে যেতে দিতো না , সে ছোট,তাই তার কিছুই করার নেই। কিন্তু ও তো জানে না, বড়ো হলে ও বাবার মতোই হয়ে যাবে পরিস্থিতির শিকার হয়ে।

"আসুন মা"—বলে সৌমিত্র লাবণ্যময়ীর জিনিষ পত্র গাড়িতে রাখতে গেলো। বাড়ির মধ‌্যে   মৃত্যুর ভয়ঙ্কর  হিমেল হাওয়ায় মতো এক ধরনের আবহাওয়া যেন বিরাজ করতে লাগলো। কারও মুখে কোন কথা নেই।সকলেই সকলের মুখের দিকে চেয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। এমন সময় নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে সৌমিত্র ডাকলো,  "সুপ্রিয়দা, কোথায় গেলে ? এসো। আর দেরি করা যাবে না। বিসর্জনের প্রশেসন বেরিয়ে পড়বে।

চোখ মুছতে মুছতে সুপ্রিয় বেরিয়ে এলো অন্ধকার থেকে। কদিন ধরে চেষ্টা করেও যা করতে পারেনি, আজ মায়ের বিদায় লগ্নের চরম মুহুর্তে মায়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরে সুপ্রিয় কান্নায় ভেঙে পড়লো।আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলতে লাগলো , " মাগো, তুমি আমার সকল দুঃখের ভাগিদার ছিলে। আমার প্রতিমাকে আমি আজ বিসর্জন করে দিচ্ছি, সে যে আমার কি দুঃখ! সে দুঃখের বিশেষ অংশীদার আজ আর আমার কেউ রইলো না মা! আমি এমনটি চাইনি।আমায় তুমি ভুল বুঝো না।তোমার এই অধম সন্তানকে ক্ষমা করে দিও।স্বর্গ থেকে বাবাও আমার প্রতি বীতরাগ হবেন।"


লাবণ্যময়ীরও  এ সময় কথা বলার মতো অবস্থা ছিলো না। তবুও ছেলেকে আশ্বস্ত করতে থাকেন —" চূপ কর বাবা, শান্ত হ , তোর কোন দোষ নেই। এ আমার কপাল ! কপালে যা লেখা আছে তাই হবে। কপাল ভালো থাকলে তোর বাবার আগেই চলে যেতাম। ভালো থাকিস্। বৌমা ও ছেলে মেয়েকে দেখিস্ । টিপুকে একটু চোখে চোখে রাখিস্।একটু ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখিস্। ওদের  একা কোথাও ছেড়ে দিবি না। মাঝে মাঝে আমার কাছে নিয়ে যাস্।আমায় ছেড়ে থাকতে ওদের প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হবে।"

বলতে বলতে লাবণ্যময়ীর গলা বুজে এলো।

এ সময় মধুরা মাথা নিচু করে চোখের জল মুছতে মুছতে শাশুড়ির পা দুটো ধরে বলে, " মা আমার যদি কোন দোষ ত্রুটি থাকে তো ক্ষমা করে দেবেন। আমি চাইনি আপনি আপনার সংসার ছেড়ে চলে যান। "

—না বৌমা তোমার কোন দোষ নেই। বলছি না এ আমার কপাল । যাক গে, ভালোভাবে থেকো। টিপু টিঙ্কুর দিকে নজর রেখো। আমি আসি।"— বলে লাবণ্যময়ী এগিয়ে চললেন। পিছন পিছন সুপ্রিয়, মধুরা, টিপু ও টিঙ্কু গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে এলো। সুমনা মাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চললো এ বাড়ির পাট চুকিয়ে। লাবণ্যময়ী তাদের তৈরি বাড়ি ও আত্মজের দিকে শেষবারের মতো উদাস নয়নে তাকিয়ে রইলেন। টিপু টিঙ্কু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হাত নাড়লো তাদের ঠাম্মির দিকে। বাক্ রূদ্ধ হয়ে লাবণ্যময়ীও হাত নাড়লেন। গাড়ি ছেড়ে দিল।


পরের দিন সুমনা সৌমিত্র মাকে নিয়ে বিকেলে হাজির হলো বৃদ্ধাশ্রমে মায়ের নতুন ঠিকানায়। সুপ্রিয়, মধুরা টিপু, টিঙ্কুকে সঙ্গে নিয়ে আগেই এসে অপেক্ষা করছিলো। তারপর তারা সবাই বৃদ্ধাশ্রমের অফিস ঘরে এসে বসলো। বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালিকা অনামিকা খাসনবীশ, তাঁর করণীয় যা যা করার তা করে একজন সেবিকার নাম ধরে ডেকে লাবণ্যময়ীর জিনিষ পত্র দোতলার ৫ নম্বর ঘরে নিয়ে গিয়ে রাখতে বললেন। তারপর সৌমিত্রকে সই সাবুদ যা করার করে টাকা পয়সা মিটিয়ে দিতে বললেন।

অনামিকা দেবী এক এক করে সবার সাথে পরিচিত হলেন। বেশ কিছু বৃদ্ধাকে অনামিকা দেবী লাবণ্যময়ীকে দেখিয়ে বললেন, " আপনাদের নতুন সাথী। নিয়ে যান এনাকে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন।"

আর লাবণ্যময়ীকে বললেন , 

" আপনি যান এনাদের সঙ্গে। "

লাবণ্যময়ীকে দেখে বৃদ্ধাশ্রমের সকল বৃদ্ধা আবাসিক একসঙ্গে বলে উঠলেন," আসুন দিদি, বসুন। কোথা থেকে আসছেন দিদি? এরা সব কারা?" ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করে লাবণ্যময়ীর কথা মন দিয়ে শুনে তাঁর ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করলেন ।লাবণ্যময়ী কিন্তু একবারের জন্যেও বৌমার নিন্দে করেন নি। তবে এনারা অনেক অভিজ্ঞ যা বোঝবার বুঝেছেন নিশ্চয়ই । গৃহ অশান্তি না হলে কেউ বৃদ্ধাশ্রমে আসে। কারণ যাই থাক,সে নিয়ে কারও মাথা ব্যাথা নেই।তবু তো কিছু একটা বলতে হবে।কেউ বললেন, "আমরা সকলে একই পথের পথিক।" আবার কেউ বললেন, "আমাদের সকলের ভাগ্য এক সূত্রে বাঁধা।যতো দেখবো শুনবো হা হুতাশ ছাড়া আর কিছু করার নেই। আপনি চিন্তা করবেন না, আমাদের ভালোই কেটে যাবে এখানে। এটা একটা শান্তির নীড়। আপনার যেতেই ইচ্ছা করবে না এখান থেকে।


এবার সকলের বিদায় নেবার পালা। মেয়ে সুমনা উপস্থিত বৃদ্ধাদের 'মাসিমা' সম্বোধন করে বললো, " একটু দেখবেন মাকে।এখন আপনারাই ভরসা।"

বৃদ্ধারা সকলেই সুমনাকে আস্বস্ত করলেন এই বলে —" না না কিছু চিন্তা করো না। আমরা আছি তো।এখন থেকে উনিও তো আমাদেরই একজন। আমরা সকলেই পরষ্পরের ভরসা।এসে দেখো, তোমার মা খুবই ভালো আছেন।"

ইত্যবসরে বলে রাখি বৃদ্ধাশ্রমের সকলে লাবণ্যময়ীর সংসারের সকলের সঙ্গে পরিচিত হবার সময় লাবণ্যময়ীর বৌমার দিকে বিশেষ ভাবে নজর দিচ্ছিলেন। কারণ তার হাবেভাবে কিছু আভাষ পাওয়া যায় কিনা বৃদ্ধাশ্রমে শাশুড়িকে পাঠানোর ব্যাপারে।ঘরের বধূ ভালো হলে, শাশুড়িকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে সেই আগেভাগে বাধা দেবে। সে যাই হোক, সন্ধ্যা সমাগত।সবার বাড়ি ফেরার সময় এগিয়ে এলো।লাবণ্যময়ী সকলকে এগিয়ে দিতে এলেন বৃদ্ধাশ্রমের গেট অবধি। বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধাদের সকলের চোখে মুখে এক অসহায় অবস্থার অভিব্যক্তি ফুটে উঠতে দেখে ও লাবণ্যময়ীর প্রতি তাঁদের যে সহমর্মিতা ও তাঁকে আপন করে নেবার  ঐকান্তিক প্রয়াস প্রত্যক্ষ করে মধুরা তার মনের আয়নায় তার জীবনেও অনাগত বার্ধক্যের অসহায়ত্বের এক ছবি দেখতে পেলো । একটা পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলো তার অনুভূতিতে।তার মনে হলো —এদের মতো বয়স তার জীবনেও আসবে একদিন।তখন হয়তো এভাবেই আসতে হবে তাকে এইসব অচেনা মানুষগুলোকে আপন করে নিতে। সে শিউরে ওঠে। আসলে ভালো মন্দ সব মানুষেরই একটা সুমন থাকে। সেই সুমন যতক্ষণ না জেগে ওঠে ,ততক্ষণ কেউ কেউ নিজেকে চিনতে পারে না, আর পাল্টাতেও পারে না। মধুরারও সেই দশা। তাছাড়া শাশুড়ির অবর্তমানে তার যে কি অবস্থা হবে,সে কথা চিন্তা করে সে হঠাৎই কাঁদতে কাঁদতে তার স্বামী সুপ্রিয়কে মাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করতে থাকে। সুপ্রিয় বুঝতে পারে তার স্ত্রীর মনের আকাশ থেকে হিংসার কালো মেঘ কেটে গেছে। সে শাশুড়িকে মা বলে চিনতে পেরেছে। কিন্তু কিছু করার নেই —স্বার্থপর জগৎ । মধুরা শাশুড়ির পায়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য অনুনয় বিনয় করতে থাকে—

" মা, আমি কি সুমনার মতো আপনার মেয়ে নই । মেয়ে যদি ভুল করে, তার কি ক্ষমা নেই?"

—না ‌বৌমা, তুমিও আমার মেয়ের মতোই। তোমার কোন দোষ নেই।এ আমার কপালের দোষ। তুমি বাড়ি যাও মা। তোমাদের জন্য আমার ক্ষমা সবসময় আছে। আমার কাল যেমন করে হোক কেটে যাবে।


বিদায়ের চূড়ান্ত পর্বে লাবণ্যময়ী যেন কিছু আশার আলো দেখতে পেলেন। অন্ততঃ এই ভেবে যে তিনি তাদের সুখের সংসারে অশান্তির বীজ বপন করে আসেন নি বরং আত্মশুদ্ধি ঘটাতে সমর্থ হয়েছেন। কিন্তু যে জীবন নির্দিষ্ট হয়ে গেছে,তা আর ইচ্ছে করলেই বদলানো যাবে না। কারণ, জীবন আবেগে গা ভাসানোর নয়। জীবনটা একটা কঠোর বাস্তব। আবার যে কোন দিন অশান্তির কালো ধোঁয়ায় সবাই সবাইকে হারিয়ে ফেলতে পারে।

সুমনা, সৌমিত্র, সুপ্রিয়, মধুরা, টিপু, টিঙ্কু ও পাপা সদল বলে গেট থেকে বেরিয়ে সামনের পথ ধরে এগিয়ে যেতে যেতে মাঝে মাঝে পিছন ফিরে লাবণ্যময়ীর উদ্দেশ্যে হাত নাড়াতে থাকে ।লাবণ্যময়ী বৃদ্ধাশ্রমের গ্রীল ধরে স্বজনদের বিদায় জানাচ্ছেন হাত নেড়ে। তাঁর চোখ দুটো জলে ঝাপসা হয়ে আসে। আস্তে আস্তে তাঁর এতোদিনের চেনা মুখগুলো অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। আর পিছনে পড়ে থাকে একরাশ হতাশা।

লাবণ্যময়ী ফিরে এলেন বৃদ্ধাশ্রমে তাঁর নিজের ঘরে। তাঁর মন মেজাজ কিছুই ভালো নেই। অন্যান্যরা টিভি দেখে সময় কাটিয়ে দেয়। সবার অনুমতি নিয়ে লাবণ্যময়ী তাঁর বিছানায় শুয়ে পড়লেন। রাতে খাবার সময় ডাকলে তিনি জানান যে তাঁর শরীর ভালো নেই,তাই কিছু খাবেন না। ঘুম ধরে না। শুয়ে শুয়ে বাড়ির কথা ভাবতে থাকেন। এখন কিছুদিন এরূপ চলতে থাকবে।অনেকের আবার বিছানা বদল হলে ঘুম আসতে চায় না। তাঁর এমন কিছু ব্যাপার নেই। সারাদিন খাটাখাটুনি করে শুলে ঘুম ধরে যেতো। তবে কিছুদিন তো লাগবে নতুন জায়গায় মন বসাতে।কিন্তু বেশ কদিন কেটে গেলো তাঁর খাওয়া দাওয়া ঘুম সব‌ মাথায় উঠেছে । খাবারে রুচি নেই। দুপুরের দিকে চোখটা জুড়ে আসে কিন্তু পরক্ষণেই ঘুম কেটে যায়। অহরাত্র টিপু, টিঙ্কু, সুপ্রিয়র কথা মনে পড়ে। তারা কি কষ্টেই না আছে। মধুরার কাজ বেড়েছে। কি জানি ছেলে মেয়েদের ঠিক দেখতে পারছে কি না। টিপুটা কেমন আছে কে জানে। ওরা হয়তো কেউই ভালো নেই।এইসব ভাবনা চিন্তা তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে সর্বক্ষণ। লাবণ্যময়ী কারও সঙ্গে ঠিক মানিয়ে নিতে পারছেন না। আর ওনারাও লাবণ্যময়ীকে নিজের মতো থাকতে ছেড়ে দিয়েছেন। পশ্চাতে ওনাকে নিয়ে সমালোচনা করেন নিশ্চয়ই।সামনা সামনি হেসে দু একটা কথা বলে ছেড়ে দেন। মনে মনে সকলে ভাবেন, থাকতে থাকতে ওসব ঠিক হয়ে যাবে। সুমনা রোজই ছেলে পাপাকে পড়াতে দিয়ে মাকে দেখতে আসে। কিছুক্ষণ থাকে।তারপর ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরে। পাপার বয়স এই বছর পনেরো। দশ ক্লাসে পড়ে। সৌমিত্র রোজ আসতে পারে না। রবিবারে সপরিবারে শাশুড়িকে দেখতে যায়। কিছু লাগলে কিনে দিয়ে আসে।


এদিকে টিপু ভয়ানক মন মরা হয়ে পড়েছে। খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করে না। লেখাপড়ায়ও ভীষণ অমনোযোগী হয়ে গেছে। স্কুল থেকে প্রায়ই রিপোর্ট আসছে। কান্নাকাটি করে।কথা না শুনলে মার খায়।এ নিয়ে স্বামী স্ত্রী মধ্যে বচসা চলে। দিদা দাদু এলে ওদের অশান্তির চোটে আর থাকতে পারে না। ওরা যা ভেবে ছিলো তা হয়নি। ভেবেছিলো শাশুড়িকে সরাতে পারলে সংসারে এসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে।জামাইকে শোষণ করবে ছোট মেয়েটার বিয়ের জন্য। যাহোক, টিপুর প্রসঙ্গে আসা যাক। ছেলেটার যেন বাঁচার ইচ্ছাই চলে গেছে। একদিন ধূম জ্বর। জ্বরের ঘোরে ঠাকুমার কথা বলে। বলে তাকে নিয়ে যেতে। সে আর এ বাড়িতে থাকতে চায় না। ঠাম্মি ছাড়া এ বাড়িটা তার কাছে ভূতের বাড়ি মনে হয়। সুমনা জ্বর হয়েছে শুনে দেখতে আসে। বেশ কিছুদিন হলো জ্বর ছাড়ছে না। সুমনা দাদার সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে বলে , " জানিস দাদা, আমার মনে হয় টেনশনে হচ্ছে ঠাকুমাকে না পাওয়ায় জন্য।চেহারাটা একদম খারাপ হয়ে গেছে। ডাক্তার কি বলছে? না পারলে অন্য ডাক্তার দেখা।"

— তুই ঠিকই বলেছিস্, ওই টেনশনেই হয়েছে।এখন ঠাকুমাকে পেলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মাকে তো শোনানো যাবে না।

—না না,একেবারই না। এমনিতেই মা টেনশন করছে।


লাবণ্যময়ীর অবস্থা তথৈবচ। না খেয়ে না ঘুমিয়ে চেহারাটা অর্ধেক হয়ে গেছে।শরীর ভীষণ খারাপ। নতুন জায়গায় গেছে, ঠিক মতো শ্যুট করছে না। একটা করে ঘুমের ওষুধে কাজ হচ্ছে না। ডাক্তার দুটো করে দিতে সাহস পাচ্ছে না। একদিন ভোররাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখছেন—স্বামী সুধাময় সামনে এসে দাড়িয়েছেন,বলছেন, " তোমাকে ওরা তাড়িয়েই ছাড়লো। তোমার শবীরটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। টিপু খুব ভালো নেই। তোমাকে কাছে না পেয়ে ও খুব ভেঙে পড়েছে। ও আর বাঁচবে না।" তারপর ঘুমটা ভেঙে যায়।

তখন ভোর চারটে হবে। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। দুর্বল লাবণ্যময়ী ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে যেতে গিয়ে অন্ধকারে পড়ে দেওয়ালে খুব জোরে মাথা ঠুকে যায় । সঙ্গে সঙ্গে সবাই জেগে ওঠে।লাবণ্যময়ী জ্ঞান হারান। কন্ডিশন খুবই ক্রিটিক্যাল। হাসপাতালে ভর্তি করে সৌমিত্রকে তাড়াতাড়ি যেতে বলা হয়। সৌমিত্র যখন পৌঁছায় লাবণ্যময়ী তখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তখন ঘড়িতে ৫ টা বেজে ১৫ মিনিট।

এদিকে টিপুর অবস্থা খুব খারাপ হয়ে ওঠে। সেই দিনই ডাক্তার টিপকে হসপিটালাইজড করার কথা বলেন।কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।জ্বরের ঘোরে টিপু বলতে থাকে, " ঠাম্মি, তুমি এসেছো আমায় নিয়ে যেতে। দাঁড়াও আমি আসছি।"—বলতে বলতে চোখ ওপরের দিকে করে জাগ্রত অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। তখন ঘড়িতে বাজে সাড়ে পাঁচটা। ঠিক সেই সময় সৌমিত্রর ফোন আসে—"সুপ্রিয়দা, মা মারা গেছেন কিছুক্ষণ আগে। তুমি তাড়াতাড়ি আর জি করে চলে এসো।

—কি বলছো কি? কখন মারা গেছে? কেন?

—কেন ঠিক এখনও জানা যায়নি। তবে ৫ টা১৫ মিনিট হবে মারা গেছেন।

—এখানে টিপুও নেই। ৫ টা৩০মিনিটে সব শেষ।সকাল হলেই হাসপাতালে ভর্তি করার কথা ছিল। মারা যাবার সময় ও জ্বরের ঘোরে বলেছিল," ঠাম্মি তুমি এসেছো আমায় নিয়ে যেতে। দাঁড়াও আমি আসছি।" বলেই চোখ চেয়েই মারা যায়। ঠাকুমাই মরে গিয়ে তার স্নেহের ধন টিপুকে তার কাছে ডেকে নিয়েছে। মায়ের ছেলেকে মার কাছ থেকে আলাদা করে দিয়ে নিজের ছেলেকে চিরতরে আলাদা করে দিলো। আমি সেদিন পারিনি মধুরার অত্যাচারকে দমন করতে। যদি পারতাম তাহলে আজ এই দিনটা দেখতে হতো না।



অনুপ্রেরণা - সুভাষ সিংহ || Onupreona - Subhash Singha || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

 অনুপ্রেরণা 

    সুভাষ সিংহ 


গোটা মাঠ উপছে পড়ছে, চারিদিকে শুধু কালো কালো মাথা। আজ ফাইনাল খেলা, ফুটবলের মহাযজ্ঞে আজো গঞ্জ গ্রামে আগের মতো উন্মাদনা লক্ষ্য করা না গেলেও নিয়ামতপুরের এই প্রতিযোগিতায় এখনো আলাদা একটা ফ্লেবার কাজ করে। আশেপাশের দশটি গ্রামের সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস প্রতিযোগিতা। যারা বিজয়ী হয় তারা নগদ একলক্ষ টাকা আর সুদৃশ্য ট্রফি লাভ করে। আর তার সাথে পেয়ে যায় দশটি গ্রামের সম্মিলিত দূর্গোৎসবের দায়িত্ব। যারা ফাইনালে জেতে তাদের গ্রামেই হবে পুজোর সমস্ত আয়োজন।


এবার প্রথম থেকেই বনপুকুর একাদশ দূর্দান্ত ফুটবল খেলে সবার নজর কেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বনপুকুরের সমস্ত গ্রামবাসী জড়ো হয়েছে মাঠে। অপরদিকে অনেকটা ভাগ্যের সহায় হয়ে একক নৈপুণ্যে ভর করে ফাইনালে উঠেছে ডালিমপুর একাদশ। ডালিম পুরের নয় নম্বর সম্রাট এখন পর্যন্ত এই খেলায় একায় পাঁচটি গোল করে টপ পজিশনে আছে।


এই সম্রাটের গতকাল থেকে কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। ডালিমপুরের কোচ বারবার ঘড়ি দেখছেন যদি শেষ মুহূর্তে এসে উপস্থিত হয়, তায় প্লেয়িং একাদশে তার নামটা রেখে দিয়েছেন। রেফারি মাঠে নেমে পড়েছেন, চিৎকারে কান পাতা দায়। 


কোন উপায় না দেখে অন্তিম সময়ে পরিবর্ত নাম পাঠাতে বাধ্য হলেন কোচ। খেলা শুরু হয়েছে,

বলের পজেশনে এগিয়ে রয়েছে বনপুকুর। দুটি সুযোগ ইতিমধ্যে হাতছাড়া হলেও একুশ মিনিটে লং শটে প্রথম গোলটি করলো বনপুকুর। 

বারবার আক্রমণে নাজেহাল অবস্থা ডালিমপুরের। সব চেষ্টা বিফল করে হাফ টাইমের ঠিক আগে আরো একটি গোল খেয়ে গেল ডালিমপুর। বনপুকুরের সাপোর্টারদের যত চিৎকার বাড়ছে ততই মিইয়ে যাচ্ছে ডালিমপুর।


অন্যদিকে নিয়ামতপুরের মাঠের পেছনে দিঘির পাড়ে বসে আছে সম্রাট। ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে বনপুকুরের মেয়ে অনন্যা, যাকে প্রানের থেকেও বেশি ভালোবাসে সম্রাট। তার গ্রাম হেরে যাওয়া মানে তার ভালোবাসার হার হবে এমনটাই বুঝিয়েছিল তার প্রানের বন্ধু বনপুকুরের অয়ন।

অনন্যা সত্যিটা জানতে পেরে ছুটে এসেছে।


--তোমাকে ভুল বুঝিয়েছে অয়ন। তোমার হার মানে আমার হার, আমি তা চায়না, তাছাড়া আমি হেরোদের পছন্দ করিনা। তুমি যদি এখনই না যাও তবে সব সম্পর্ক শেষ।


হাফ টাইমের পর খেলা আবার শুরু হয়েছে, সম্রাট ফিরে এসেছে, ওকে দেখেই ডালিমপুরের খেলোয়াড় থেকে সমর্থকরা আশায় বুক বেঁধেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত সকলে হাঁ হয়ে দেখলো একটা আহত বাঘ কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। পঞ্চান্ন মিনিটে কর্নার থেকে দুরন্ত শট চকিতে বাঁক নিয়ে গোলে ঢুকে গেল। গোওওওল। আবার সেই চিৎকার ফিরে এলো বাহাত্তর মিনিটে যখন দুর্দান্ত ব্যাকভলিতে বলটা বনপুকুরের জালে ঢুকে গেল।


এই চিৎকার অনন্যার কানেও পৌঁছলে ও ঠিক করলো ওর প্রিয় মানুষের জয় দেখতে ও নিজেও মাঠে উপস্থিত হবে।

খেলা প্রায় শেষের দিকে, ২-২ অবস্থায় হয়তো ট্রাইব্রেকারে খেলা গড়াতে পারে এমন সময় পাঁচজন কে কাটিয়ে যে দৃষ্টিনন্দন গোলটা করেই সম্রাট ফ্লাইং কিস টা ছুঁড়ে দিল তার প্রেয়সীর দিকে, সমবেত জনতা চিৎকার করতে ভুলে গিয়ে সেই কিসের অনুসরণ করে খুঁজে পেল সব রহস্য।

এতলোকের দৃষ্টির সামনে লজ্জায় পালিয়ে এলো অনন্যা, ওর আর দেখা হলোনা ম্যান অফ দ্যা ম্যাচের পুরস্কার হাতে সম্রাটের হাসিটা।

ভীরু ভালোবাসা - দীনেশ সরকার || Viru Valobasha - Dinesh sarkar || Anugolpo || অনুগল্প || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

 ভীরু ভালোবাসা

                                                                                      দীনেশ সরকার  



 

  বীথি এত দেরি করছে কেন? অশোক পথের দিকে চেয়ে উস্খুস্‌ করতে লাগল। বীথিকে যে কথাটা এতদিনেও বলতে পারে নি এই গঙ্গার তীরে বসে গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে সেই কথাটা আজ বীথিকে বলবেই বলবে। মাস তিনেক আগে এক বন্ধুর বিয়েতে বাসরঘরে বীথির সাথে প্রথম আলাপ। বন্ধুর বউভাতের অনুষ্ঠানে আরও একটু ঘনিষ্ঠতা, মোবাইল নাম্বারের আদান প্রদান। কলকাতা বইমেলায় একবেলা একসঙ্গে ঘোরাঘুরি, কত কথা, কত গল্প। তারপর রবিবার হলেই চুম্বকের মতো টানে এই গঙ্গার ঘাট। বীথিও আসে, বসে, গল্প হয় কিন্তু যে কথাটা মনের মধ্যে ছট্‌ফট্‌ করে মরছে সে কথাটা অশোকের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে না। এখন সারা সপ্তাহে অফিসের কাজের মধ্যেও বীথির মুখটা অশোকের মনের অলিন্দে ঘুরপাক খায়। বীথির মনের আরও কাছে পৌঁছুতে চায়, বীথির পাশে থাকতে চায় অশোক। বীথির জন্য অশোকের মনের ভিতরে কেমন একটা অনুভূতি হয়। অশোক জানে না একে ভালোবাসা বলে কিনা। কিন্তু কিছু একটা তো বটে। তাই অশোক আজ ঠিকই করেছে, যে কথাটা মনের গোপন কুঠুরিতে ছট্‌ফট্‌ করছে তাকে আজ বীথির সামনে প্রকাশ করবেই করবে।


           হন্তদন্ত হয়ে বীথি এল, বলল, ’ও, তুমি এসে গেছো।‘


           অশোক বলল, ‘বোসো বীথি, আজ আমার অনেক কথা বলার আছে।‘


            বীথি বলল, ‘আজ যে আমার একেবারেই বসার সময় নেই অশোক। আজ আমাকে আরও চার-পাঁচ বন্ধুর বাড়ি যেতে হবে। পরে শুনব, কেমন? এই নাও।‘


           বীথি অশোকের দিকে একটা কার্ড বাড়িয়ে দিল।   


           অশোক জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কি?’


          বীথি বলল, ‘আমার বিয়ের কার্ড। আগামী রবিবার বিয়ে। মা-বাবার পছন্দ করা পাত্র। হঠাৎ ঠিক হয়ে গেল। বিয়ের পর সোজা অ্যামেরিকা। বিয়েতে তুমি আসবে কিন্তু। ইনভাইট করতে আরও চার-পাঁচ বন্ধুর বাডি যেতে হবে। এখন চলি?‘


            বীথি দু-পা এগিয়ে পিছন ফিরে অশোকের দিকে তাকিয়ে বলল,’ইডিয়েট।‘ তারপর পা চালাল।


           অশোক বীথির চলে যাওয়ার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। বুকটা ফেটে যাচ্ছে। বড় ফাঁকা-ফাঁকা লাগছে। মনে মনে বলল, ’ভালো থেকো বীথি, সুখে থেকো।‘ বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে এল।   

ভেজা বৃষ্টি - অমিত কুমার সাহা || veja brishti - Amit Kumar Saha || Golpo || ছোট গল্প || short story || Bengali story

       ভেজা বৃষ্টি

    অমিত কুমার সাহা


সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে অঝোরধারায়।এখন একটু সকাল সকালই ঋতভাস বেরিয়ে যায়, অফিসের জন্য।স্টাফ স্পেশাল ট্রেনে যেতে হয়।

অন্যসময় এর দুটো ট্রেন পরে গেলেও চলে। সেজন্য বেশ ভোর থেকেই বিদীপ্তার তাড়াহুড়ো।

ঋতভাসের সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে হাতের কাছে দেওয়া, টিফিন তৈরি এইসব। ও অফিস চলে গেলে সারাটাদিন বিদীপ্তা একা।


আর পাঁচটা ফ্ল্যাটের মতো ওদের ফ্ল্যাটেও একটা ব‍্যলকনি আছে। ওটাই বিদীপ্তার খোলা মাঠ, ওটাই ওর সাধের বাগানের জায়গা।বেশ কয়েকটা গাছও লাগিয়েছে ওখানে। ছোটোবেলা থেকেই বৃষ্টি খুব ভালো লাগে বিদীপ্তার। ভালো লাগে বৃষ্টিতে ভিজতে। তবে এই শহরে এসে সেসবের পাট চুকেছে ওর।আর তাছাড়া ঋতভাস একটু

অন্যরকম,এসব রোমান্টিসিজমের ত্রিসীমানার

বাইরে।


সারাটাদিন সাংসারিক কাজকর্মে কেটে যায় বিদীপ্তার। বিকেলে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে থাকে একমনে। হঠাৎ দমকা শ্রাবণের হাওয়া এসে লাগে ওর চোখে মুখে, সাথে উড়ো বৃষ্টি।আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না ও।ছুটে চলে যায় ব‍্যলকনিতে। ওপেন ব‍্যলকনি থেকে দুহাত বাড়িয়ে নিজেকে বিলিয়ে দেয় বৃষ্টির মাঝে। বৃষ্টির বেগ আরও বাড়তে থাকে।ওর ঋতভাসের সাথে বছরতিনেকের সংসার, ভালোবাসাহীন কৃত্রিম শারীরিক উষ্ণতা, সময়ের খেলায় একসাথে বেঁধে দেওয়া সম্পর্কের অযাচিত জুটি এসব যেন এক লহমায় অতীত হয়ে যায়।বিদীপ্তা ফিরে যায় মুহূর্তেই ইউনিভার্সিটি জীবনের শেষ দিনটিতে।


সেদিনও দ্বৈপায়ন আর বিদীপ্তা একসাথে ফিরছে

ইউনিভার্সিটি থেকে,আর পাঁচটা দিনের মতো। দুজনে খুব ভালো বন্ধু।একে অন্যের চাওয়া পাওয়া, ভালো লাগা মন্দ লাগা সব জানে। সেদিন প্রায় বিকেল,এমনই এক শ্রাবণের দিন। পরিষ্কার খোলা আকাশ হঠাৎই ঢাকতে শুরু করল গাঢ় অন্ধকারে। দমকা হাওয়ায় কিছু একটা উড়ে এসে পড়ল দ্বৈপায়নের চোখে। দুজনে রাস্তার পাশে একটা বড় গাছের নিচে সরে আসল। দ্বৈপায়ন চোখ থেকে ঐ অযাচিত উড়ো জিনিসটি বের করতে চেষ্টা করলেও কিছুতেই কাজ হলো না।


"দেখি,সর্!আমায় দেখতে দে।"


"আরে তুই পারবি না!"


"বকিস না তো! দাঁড়া দেখছি।"এই বলে বিদীপ্তা

দ্বৈপায়নের চোখটা ফাঁক করে আলতো ফু দিল। নিজের ওড়নাটায় মুখের গরম ভাপ নিয়ে দ্বৈপায়নের চোখে বেশ কয়েকবার ঠেকালো।


"ছাড়্, হয়েছে।গেলো মনে হয়, ব্যথাটা করছে না আর।"এই বলে দ্বৈপায়ন বিদীপ্তার হাতটা ধরতেই বিদীপ্তার চোখ আটকে গেল ওর দুই চোখে।


"কিরে?কি দেখছিস্ এমন করে?"


বিদীপ্তা বলে ওঠে,"তোর দুচোখে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।"


দ্বৈপায়নের কাছে  বিদীপ্তার বলে ওঠা এই একটি লাইনেই বিদীপ্তার গোটা মনটা আরো অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হঠাৎ দ্বৈপায়ন আওড়ে ওঠে কয়েকটি লাইন, রবি ঠাকুরের:


"ভাষাহারা মম বিজন বেদনা

প্রকাশের লাগি করেছে সাধনা

চিরজীবনেরই বাণীর বেদনা

মিটিল দোহার নয়নে....."


"এতদিন বলিস নি কেন?"বিদীপ্তা বলে ওঠে।


দ্বৈপায়ন বলে,"বলতে পারি নি বলে!"


এমন সময় ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। বড় গাছটার

পাতাগুলো সেই বৃষ্টির জল আর ধরে রাখতে পারে না। দুজনের গায়ে পড়তে শুরু করে। সম্বিত ফেরে ওদের। তাড়াতাড়ি করে দ্বৈপায়ন ছাতা বের

করতে যায় ব‍্য।গের থেকে। বিদীপ্তা বারণ করে, বলে:


"আজ দুজনে একসাথে বৃষ্টিতে ভিজবো।আজ তো আমাদের একসাথে বৃষ্টি ভেজারই দিন।"


দ্বৈপায়ন আর দ্বিমত না করে সায় দেয় ওর প্রস্তাবে।বিদীপ্তা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে দ্বৈপায়নের হাত। রাস্তায় নেমে দুজনে ভিজতে থাকে, অঝোরধারায়।


নিখাদ বন্ধুত্বের সম্পর্ক পেরিয়ে ওরা দুজন এক নতুন সম্পর্কের দিগন্তে প্রবেশ করে।


কিন্তু এ সম্পর্কের সুখ ওদের বেশিদিন টেকেনি।

মাস দুয়েক পর হঠাৎই একদিন হার্ট অ্যাটাকে

দ্বৈপায়নের বাবা মারা যান। গোটা সংসার চালানোর বোঝা এসে পড়ে দ্বৈপায়নের কাঁধে।

তখনও মাস্টার্সের রেজাল্ট বেরোয়নি। টিউশনের ওপর ভরসা করেই টেনেটুনে চলতে থাকে ও আর ওর মা এই দুজনের সংসার। তেমন আর আগের মতো সময় দিতে পারে না বিদীপ্তাকে।

অভিমান জমা বাঁধতে শুরু করে বিদীপ্তার মনে।

ইতিমধ্যে বিদীপ্তার বাড়ি থেকে একটা ভালো ছেলের খোঁজ পেয়ে যায়।বিদীপ্তা দ্বৈপায়নকে সে

কথা জানালেও একপ্রকার বেকার দ্বৈপায়নের ঐ মুহুর্তে বিদীপ্তার দায়িত্ব নেওয়া ছিল আদতেই অসম্ভব! আরো গাঢ় হয় দ্বৈপায়নের ওপর ওর অভিমান। একপ্রকার জেদের বশেই রাজি হয়ে যায় বিদীপ্তা,পারিবারিক সিদ্ধান্তে।


আজ এই ভেজা বৃষ্টি সব কিছু যেন এক ঝটকায় মনে করিয়ে দিল বিদীপ্তাকে। ইতিমধ্যে বিকেলের আকাশ বেয়ে নেমে এসেছে গাঢ় সন্ধ্যে। তবুও যেন ব‍্যলকনিটা আজ আর একটুও ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না ওর। হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে। এখন আবার কে এলো? এতো তাড়াতাড়ি তো ঋতভাস অফিস থেকে ফেরে না!


গেট খোলে বিদীপ্তা।


"একি তুমি?আজ এতো তাড়াতাড়ি?"


"হুমমম,আজ একটু তাড়াতাড়িই অফিস ছুটি হয়ে গেল।আর বিদীপ্তা, ইনি আমাদের অফিসে কয়েকদিন আগেই জয়েন করেছেন।অনেক দূরে বাড়ি।কাল সকালে আমাদের দুজনকে মুর্শিদাবাদে একটা কাজে যেতে হবে।ভোর পাঁচটার অফিসের গাড়ি আসবে।তাই উনি আজ রাতে আমাদের বাড়িতে একটু থাকবেন।" ঋতভাস এক নিঃশ্বাসে বলে যায়।


"সে তো বুঝলাম। কিন্তু সব কথা কি বাইরে দাঁড়িয়েই বলবে?"বিদীপ্তা বলে ওঠে।


"আসুন, ভেতরে আসুন।"ঋতভাস ওর কলিগকে ভেতরে ডেকে নেয়।


"জানো বিদীপ্তা, উনি বলছিলেন রাতটা কোনো হোটেলে কাটিয়ে দেবেন।আমিই একপ্রকার জোর করে ওনাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে এলাম।"


"আচ্ছা, বেশ।যাও, তোমরা এবার ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি একটু চা আর টিফিনের ব‍্যবস্থা করতে যাই।"


"নিন্,এবার মাস্কটা খুলুন ভাই, আপনার সাথে আমার স্ত্রীর পরিচয়টা করিয়ে দি। তারপর না হয় ফ্রেশ হয়ে আসবেন।"


ঋতভাসের কথা মতো মাস্কটা উনি খুলতেই বিদীপ্তার চোখ আটকে যায় ঐ অতিথির মুখের দিকে।


"আলাপ করিয়ে দি," ঋতভাস বলে ওঠে,"উনি আমার স্ত্রী বিদীপ্তা আর ইনি দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য।"


মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খুব চেনা দুটি মানুষ, মাঝখানে ব্যবধান তিন তিনটে বছর। বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টি ভিজিয়ে দিল হঠাৎ, আবারো দুটি মন,ঠিক বছর তিনেক আগের মতো;অন‍্য দুটি চোখের আড়ালেই।