Tuesday, October 29, 2024

আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি - শংকর ব্রহ্ম || Ami kirokom vabe beche achi - Sankar brahama || প্রবন্ধ || নিবন্ধ || Article

   আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি

       শংকর ব্রহ্ম




             

    “ আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ


পরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধ্যেবেলা


আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা


করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে


থাকি-তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে। আমি আক্রোশে


হেসে উঠি না, আমি ছারপোকার পাশে ছারপোকা হয়ে হাঁটি,


মশা হয়ে উড়ি একদল মশার সঙ্গে; খাঁটি


অন্ধকারে স্ত্রীলোকের খুব মধ্যে ডুব দিয়ে দেখেছি দেশলাই জ্বেলে-


(ও-গাঁয়ে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই!)


আমি স্বপ্নের মধ্যে বাবুদের বাড়িরে ছেলে


সেজে গেছি রঙ্গালয়ে, পরাগের মতো ফুঁ দিয়ে উড়িয়েছি দৃশ্যলোক


ঘামে ছিল না এমন গন্ধক


যাতে ক্রোধে জ্বলে উঠতে পার। নিখিলেশ, তুই একে


কী বলবি? আমি শোবার ঘরে নিজের দুই হাত পেকেরে


বিঁধে দেখতে চেয়েছিলাম যীশুর কষ্ট খুব বেশি ছিল কিনা;


আমি ফুলের পাশে ফূল হয়ে ফূটে দেখেছি, তাকে ভালোবাসতে পারি না।


আমি ফুলের পাশে ফূল হয়ে ফূটে দেখেছি, তাকে ভালোবাসতে পারি না।


আমি কপাল থেকে ঘামের মতন মুছে নিয়েছি পিতামহের নাম,


আমি শ্মশানে গিয়ে মরে যাবার বদলে, মাইরি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।


নিখিলেশ, আমি এই-রকমভাবে বেঁচে আছি, তোর সঙ্গে


জীবনবদল করে কোনো লাভ হলো না আমার -একি নদীর তরঙ্গে


ছেলেবেলার মতো ডুব সাঁতার?- অথবা চশমা বদলের মতো


কয়েক মিনিট আলোড়ন? অথবা গভীর রাত্রে সঙ্গমনিরত


দম্পতির পাশে শুয়ে পুনরায় জন্ম ভিক্ষা? কেননা সময় নেই,


আমার ঘরের


দেয়ালের চুন-ভাঙা দাগটিও বড় প্রিয়। মৃত গাছটির পাশে উত্তরের


হাওয়ায় কিছুটা মায়া লেগে ভুল নাম, ভুল স্বপ্ন থেকে বাইরে এসে


দেখি উইপোকায় খেয়ে গেছে চিঠির বান্ডিল, তবুও অক্লেশে


হলুদকে হলুদ বলে ডাকতে পারি। আমি সর্বস্ব বন্ধক দিয়ে একবার


একটি মুহূর্ত চেয়েছিলাম, একটি ….., ব্যক্তিগত জিরো আওয়অর;


ইচ্ছে ছিল না জানাবার


এই বিশেষ কথাটা তোকে। তবু ক্রমশই বেশি করে আসে শীত, রাত্রে


এ-রকম জলতেষ্টা আর কখনও পেতো না, রোজ অন্ধকার হাত্ড়ে


টের পাই তিনটে ইঁদুর না মূষিক? তা হলে কি প্রতীক্ষায়


আছে অদুরেই সংস্কৃত শ্লোক? পাপ ও দুঃখের কথা ছাড়া আর এই অবেলায়


কিছুই মনে পড়ে না। আমার পূজা ও নারী-হত্যার ভিতরে


বেজে ওঠে সাইরেন। নিজের দু’হাত যখন নিজেদের ইচ্ছে মতো কাজ করে


তখন মনে হয় ওরা সত্যিকারের। আজকাল আমার


নিজের চোখ দুটোও মনে হয় একপলক সত্যি চোখ। এরকম সত্য


পৃথিবীতে খুব বেশী নেই আর।”


সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।



                ৭ই সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি বাবা (কালীপদ গঙ্গোপাধ্যায়) এবং মা (মীরা দেবী)-র হাত ধরে চলে আসেন কলকাতায়। 



                   কালীপদ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতার টাউন স্কুলের শিক্ষক । সেই সূত্রে ১৯৩৮ সাল থেকেই উত্তর কলকাতায় বসবাস শুরু । চার ভাইবোনের মধ্যে সুনীলই বড় । সংসারে অনটন ছিলই সেটা আরও বাড়ল দেশভাগের পর বিশাল পরিবারে তখন কালীপদর রোজগারই ভরসা । উপার্জনের চেষ্টাতেই ব্যস্ত থাকতেন তিনি । ফলে পিতার সঙ্গে সুনীলের তেমন যোগাযোগ গড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি । সুনীলকে বই পড়ার নেশাটি ধরিয়েছিলেন মা 'মীরা দেবী' । 



              কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কিন্তু অনুঘটকের ভূমিকাটা পিতারই ছিল । সুনীল তখন টাউন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন । ছেলে যাতে বিপথে না যায় পিতা আদেশ করলেন, ছুটির কয়েকটা মাস ইংরেজি চর্চার কাজে লাগাতে হবে । টেনিসনের একটি কবিতা অনুবাদ করে প্রতিদিন তাকে দেখাতে হবে। কিছুদিন চলল এইভাবে। সুনীল লক্ষ্য করলেন , ইদানীং তাঁর পিতা আর অনুবাদ আক্ষরিক কি না , মিলিয়ে দেখছেন না । সুতরাং নিজের ঈশ্বরীকে উদ্দেশ করে নিজেই লিখতে শুরু করলেন কিছু লাইন আর সেগুলোই দেখতে দিলেন পিতাকে । এই ভাবেই কবিতা চর্চার অভ্যাস শুরু তার। 



              সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পরে লিখেছেন ,  "আমার সৌভাগ্য এই , আমার প্রথম বয়েস থেকেই আমি কোনও সাহিত্যিক গোষ্ঠীর পাল্লায় পড়িনি । আমি পূর্ববঙ্গের গণ্ডগ্রাম থেকে আগত কিশোর , কলকাতার ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম । কোনও লেখককে চোখে দেখিনি , কোনও সম্পাদককে চিনতাম না …। ” 


           ডাকযোগে লেখা পাঠানো ছাড়া আর অন্য উপায় তার জানা ছিল না ।



              পরবর্তী কালে, সিটি কলেজে অর্থনীতির ছাত্র সুনীলের বন্ধু তখন দীপক মজুমদার। কফি হাউস , দেশবন্ধু পার্কে আড্ডা জমে উঠত প্রায়ই । কমলকুমার মজুমদারের নেতৃত্বে হরবোলা ক্লাবে নাট্যচর্চাও চলত । তারই মধ্যে সিগনেট প্রেস তথা দিলীপকুমার গুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ। সিগনেট প্রেস থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং দীপক মজুমদারের যৌথ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের উদ্দেশে তারা একদিন সেই প্রস্তাব নিয়ে গেলেন দিলীপকুমার গুপ্তের কাছে। দিলীপকুমার সব শোনার পর, তাদের পরামর্শ দিলেন বই না বের করে একটি পত্রিকা প্রকাশ করার। এবং  দিলীপকুমার গুপ্তের পরামর্শ ও সহায়তা নিয়েই ‘ কৃত্তিবাসে’র পথ চলা শুরু ( শ্রাবণ,১৩৬০ বঙ্গাব্দে) হয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং দীপক মজুমদার ছিলেন সেই প্রথম সংখ্যাটির সম্পাদক।



        কলকাতার রাজনৈতিক আবহ তখন উত্তাল। প্রথম সম্পাদকীয়তে সুনীল লিখলেন ,“ বিভিন্ন তরুণদের বিক্ষিপ্ত কাব্য প্রচেষ্টাকে সংহত করলে – বাংলা কবিতায় প্রাণছন্দের উত্তাপ নতুন আবেগে এবং বলিষ্ঠতায় লাগতে পারে এবং সকলের মধ্যে প্রত্যেকের কন্ঠস্বরকেই আলাদা করে চেনা যেতে পারে । ” 



        সম্পাদকের স্বপ্ন সত্য হয়েছিল । এক মলাটে সুনীলদের সঙ্গে লিখতে লাগলেন সমর সেন , জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র , শঙ্খ ঘোষ , অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তরা । সপ্তম ও অষ্টম সংখ্যা উপহার দিল আরও কয়েকটি নাম – শক্তি চট্টোপাধ্যায় , উৎপলকুমার বসু , তারাপদ রায় , শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় … । দ্বাদশ সংখ্যায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় । এই তরুণ ব্রিগেড শুধু মধ্যরাতের কলকাতাই শাসন করেননি , বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরে গিয়েছে এঁদেরই লেখনীতে । সুনীল ও শক্তির এক একটা পংক্তি বাঙালির কাছে প্রবাদে পরিণত হয়েছে । 



             সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মাত্র উনিশ বছর বয়সে ১৯৫৩ সালে থেকে 'কৃত্তিবাস' নামে একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। 



           সুনীলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ একা এবং কয়েকজন ’ প্রকাশ পায় ১৯৫৮ সালে । 


         ১৯৬২ সালে কলকাতায় এলেন মার্কিন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ । সুনীলের সঙ্গে গভীর সখ্যতা গড়ে উঠল তাঁর । পরের বছরই আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পল এঙ্গেলের আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক লেখক কর্মশালায় যোগ দিলেন সুনীল । নিউ ইয়র্কে সালভাদর দালির সঙ্গে পরিচয় হল তখনই । ফেরার পথে ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে স্টিফেন স্পেন্ডার এবং টি এস এলিয়টের সঙ্গে পরিচয় । ফরাসি বান্ধবী মার্গারিটের সঙ্গে প্যারিস ভ্রমণ । তারপর একা একাই সুইজারল্যান্ড , রোম , কায়রো হয়ে দমদম বিমানবন্দরে যখন নামলেন সুনীল তখন তার পকেটে দশ টাকা রয়েছে মাত্র ।



             বেশ কয়েক বারই ছোটখাটো চাকরি করেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , ছেড়েও  দিয়োছেন। 


              ১৯৭০ সাল থেকে পাকাপাকি ভাবে আনন্দবাজার পত্রিকার বার্তা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হলেন । তার পরে দেশ – আনন্দবাজার মিলিয়ে একাধিক বিভাগের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি । আনন্দবাজার পত্রিকার হয়ে চাসনালা খনি দুর্ঘটনা , ইন্দিরা গান্ধী হত্যা , বার্লিন প্রাচীরের পতনের মতো ঘটনা কভারও করেছেন । দু’বার আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন ।



              সুনীলের প্রথম কবিতা 'দেশ – য়ে প্রকাশিত হয় , তার প্রথম উপন্যাসও 'দেশ' পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয় । 



          তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ আত্মপ্রকাশ ’ বেরোয় ১৯৬৬ সালে। তারপর একে একে প্রকাশ পায় তাঁর লেখা 'অরণ্যের দিনরাত্রি' , 'প্রতিদ্বন্দ্বী' , 'অর্জুন' , 'জীবন যে রকম'…। 


         ১৯৭১ সালে সন্তু – কাকাবাবু সিরিজ শুরু হয়ে গিয়েছিল । আশির দশকে হাত দিলেন বৃহৎ উপন্যাসে । জন্ম নিল ‘সেই সময়‘ । ক্রমান্বয়ে রচিত হলো 'পূর্ব – পশ্চিম' , 'প্রথম আলো' …।



              এছাড়া, সুনীল গঙ্গোপাধ্যাযের উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকটি বই হল 'আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি', 'যুগলবন্দী' (শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে), 'হঠাৎ নীরার জন্য', 'রাত্রির রঁদেভূ', 'অর্ধেক জীবন', 'শ্যামবাজারের মোড়ের আড্ডা', 'অর্জুন', 'অরণ্যের দিনরাত্রি', 'ভানু ও রাণু', 'মনের মানুষ' প্রভৃতি। 



                সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উনিশ থেকে আটাত্তর বছর বয়সের মধ্যে শুধু বইয়ের সংখ্যাই আড়াইশোর বেশি । সম্পাদিত গ্রন্থ পঞ্চাশের অধিক । কবিতা , ছড়া , গল্প , উপন্যাস , ভ্রমণসাহিত্য , নাটক , চিত্রনাট্য , শিশুসাহিত্য – এতগুলি শাখায় সাবলীল বিচরণের রাবীন্দ্রিক উত্তরাধিকার ছিলেন তিনি ৷ যৌবনে রবীন্দ্র – বিরোধী বলে তকমা জুটেছিল যদিও । সুনীল কিন্তু পরে বলেছিলেন , ওঁর বিদ্রোহ রবীন্দ্রনাথের প্রতি ছিল না । ছিল , রাবীন্দ্রিকতার নামে বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে ।


              আরও দু’টি দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি ছিলেন সুনীল । বাঙালি মধ্যবিত্তসুলভ কূপমন্ডুকতা ওঁর স্বভাবে ছিল না কোনও দিন । সুনীল মানেই পায়ের তলায় সর্যে । আর , সুনীল মানেই দরজা জানলা খোলা একটা তরতাজা মন । অজস্র বিষয়ে আগ্রহ , পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে সদা সচেতন । স্পষ্টবাক , প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নিজস্ব মতামত — তা সে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়েই হোক বা রাজ্যে পরিবর্তনের হাওয়া নিয়েই হোক । 


               নীরা কে? এই প্রশ্নটি ছাড়া আর কোনও ব্যাপারে প্রশ্নকর্তাকে কখনও নিরাশ করেননি সুনীল । 



         ছাত্র বয়স থেকেই হুটহাট বেরিয়ে পড়তেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই বাউন্ডুলেপনা তাঁর কোনও দিন থামেনি । সাঁওতাল পরগণা থেকে প্যারিস , নিউ ইয়র্ক থেকে শান্তিনিকেতন , সুনীলের উৎসাহ সমান । তিনি নিজে লিখেছেন, 'আমার পায়ের তলায় সর্ষে, আমি বাধ্য হয়েই ভ্রমণকারী'


        তিনি আরও  বলতেন , লেখক হওয়ার কোনও বাসনা তাঁর ছিল না । কলেজজীবনে সুনীলের স্বপ্ন বলতে একটাই , জাহাজের খালাসি হয়ে সাত সমুদ্র পাড়ি দেওয়া । খালাসির চাকরি সুনীলকে করতে হয়নি , কিন্তু বাংলা সাহিত্য নীললোহিতকে পেয়েছে । প্রিয় বই কী , জিজ্ঞেস করলে বলতেন , মহাভারত । সেই মহাভারত লেখাতেই হাত দিয়েছিলেন । কিন্তু শেষ হল না তাঁর স্বপ্নের মহাভারত ।



          তিনি ছিলেন বিশ শতকের একজন   প্রথিতযশা জনপ্রিয় বাঙালি সাহিত্যিক। 


          ২০১২ সালে মৃত্যুর পূর্ববর্তী চার দশক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসাবে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। বাংলাভাষী এই ভারতীয় সাহিত্যিক একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসাবে অজস্র স্মরণীয় রচনা লিখেছেন। 


          সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়  আধুনিক বাংলা কবিতার জীবনানন্দ-পরবর্তী পর্যায়ের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি 'কৃত্তিবাস' পত্রিকার প্রাণপুরুষ ছিলেন।


              নীললোহিত, সনাতন পাঠক, এবং নীল উপাধ্যায় এইসব ছদ্মনাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বহু লেখা লিখেছেন পত্রিকায়।



            কী পদ্য , কী গদ্য — -ঝরঝরে সুখপাঠ্য ভাষা , ঘরোয়া কথনভঙ্গি আর অব্যর্থ জনপ্রিয়তা , সুনীলের অভিজ্ঞান চিনে নেওয়া যায় সহজেই । দেশি – বিদেশি অজস্র ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তাঁর লেখা । সত্যজিৎ রায় , মৃণাল সেন , তপন সিংহ , গৌতম ঘোষের মতো পরিচালকরা সুনীলের কাহিনি অবলম্বনে চলচ্চিত্র করেছেন । তাঁর গল্প থেকে একাধিক টেলিফ্লিম ধারাবাহিক হয়েছে । সুনীলের নিজের চিত্রনাট্যে তৈরি ছবি ‘শোধ ’ জাতীয় পুরস্কার পায় । ‘সিটি অফ জয়’ ছবির মুখ্য পরামর্শদাতা ছিলেন সুনীলই । ভালবাসতেন কবিতা পড়তে , গান গাইতে । মঞ্চে অভিনয়ও করেছিলেন । কলকাতার শেরিফ হয়েছিলেন একবার । বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপকও হয়েছিলেন । সাহিত্য অকাদেমির সভাপতির দায়িত্বও সামলাচ্ছিলেন । সুনীলের মতো মজলিসি মানুষ খুব কম দেখা যেত।



            তাঁর দাম্পত্য সঙ্গী (Spouse) ছিলেন স্বাতী বন্দোপাধ্যায়। তাঁর একমাত্র সন্তান সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় ,বর্তমানে আমেরিকায় থাকেন।



             ২২ শে অক্টোবর ২০১২ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কবি লেখক কৃত্তিবাস যুগের প্রাণপুরুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মহাপ্রয়ান ঘটে। 



তাঁর প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কার -



১). আনন্দ পুরস্কার (১৯৭২ সাল, ১৯৮৯ সাল)


২). সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৫ সাল)








          


 








অপরিচিত বিভূতিভূষন - হিমাদ্রি শেখর দাস || Oporichito Bibhutibhushan - Himadri Sekhar Das || প্রবন্ধ || নিবন্ধ || Article

    অপরিচিত  বিভূতিভূষন

     হিমাদ্রি শেখর দাস 


বিভূতিভূষণ শৈশব থেকেই গ্রাম বাংলার সব শ্যামল প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে ভালোবেসে ছিলেন তার সাহিত্যের অন্যতম উপাদান প্রকৃতি প্রেম প্রকৃতি সম্বন্ধে তার একটা পূর্ণ আর সমগ্র অনুভূতি ভালো-মন্দ সুন্দর অসুন্দর আলো অন্ধকার রমণীয়তা ভীষনতা সবকিছু নিয়ে আমাদের মহীয়সী পৃথিবী আর ধরিত্রীমাতার কোলে যে গাছপালা বন অরণ্য নদ নদী পাহাড় পর্বত সমুদ্র আর বনবাসে মানুষ রয়েছে সেই সমস্তের প্রতি তার মনে এক সদা জাগ্রত অনুভূতি আর আনন্দ এক অপর প্রীতিপূর্ণ আর অনুভূতিপূর্ণ পাঠক অনুভব করে।

বিভূতিভূষণের অনেক উপন্যাস এবং গল্প সবাই পড়লেও কিছু কাহিনী আমরা জানিনা এই প্রবন্ধে বিভূতিভূষণের অজানা কিছু জানাবো 


 *সাধারণ জীবনরসিক* 

 

বিভূতিভূষণের ছোটগল্পের বিরাট অংশ জুড়েই রয়েছে বাংলাদেশের গ্রাম্য জনপদ আর বাঙালি ঘরোয়া জীবনের চিত্র। এই গ্রাম্য, অনাদৃত, অস্পৃশ্য, অনভিজাত ব্রাত্যজনেরা কোন সাজগোজ ছাড়া  ধূলিমলিন পায়ে উঠে এসেছেন তার গল্প- উপন্যাসে।  তাই তারা এত জীবন্ত, অকৃত্রিম, আন্তরিক। বিভূতিভূষণ তার গ্রামের লোকজনের সঙ্গে খুব আন্তরিকভাবে মিশতেন, তারাও কখনও বিভূতিভূষণকে পর মনে করেনি। জীবনরসিক বিভূতিভূষণকে পাওয়া যায় তার গল্পে। বিভূতিভূষণ মানুষকে ভালোবাসতেন। তার গ্রামের মানুষরা ছিলেন তার কাছে পরমাত্মীয়ের মতো। বিভূতিভূষণের দিনলিপির পতায় পাতায় ছড়ানো রয়েছে এই ভালোবাসার নিদর্শন-"অনেকদিন পরে গোপালনগরের হাটে গিয়েছি। সেই আশ্বিন মাসের পুজোর ছুটির পর আর আসিনি। সবাই ডাকে, সবাই বসতে বলে। মহেন্দ্র সেকরার দোকান থেকে আরম্ভ করে সবজির গোলা পর্যন্ত। হাটে কত ঘরামী ও চাষি জিজ্ঞেস করে করে এলেন বাবু? ওদের সকলকে যে কত ভালোবাসি, কত ভালোবাসি ওদের এই সরল আত্মীয়তাটুকু। ওদের মুখের মিষ্ট আলাপ। কাঁচিকাটা পুল পার হয়ে খানিকটা এসেই একটা লোকের সঙ্গে আলাপ হলো। তার বয়স ষাট-বাষট্টি হবে, রঙটা বেজায় কালো, হাতে একটা পোটলা কাঁধে ছাতি। আমি বললুম- কোথায় যাবে হে? সে বললে, আজ্ঞে দাদাবাবু, ষাঁড়াপোতা ঠাকুরতলা যাব। বাড়ি শান্তিপুর গোঁসাইপাড়া। লোকটা বললে, একটা বিড়ি খান দাদাবাবু। বেশ লোকটা ওরকম লোক আমার ভালো লাগে। এমন সব কথা বলে যা সাধারণত শুনিনে।" এককম অজস্র বর্ণনা তার দিনলিপির পাতায় পাওয়া পাওয়া যায় যেখান থেকে বোঝা যায় তিনি কতো সাধারন ছিলেন ।


 *ভ্রমন পিপাসু* 

বিভূতিভূষনের মধ্যে এক ভ্রমন পিপাসু মন বাস করতো।এই ভ্রমনপিপাসু মানসিকতা সম্ভবত তিনি তাঁব  বাবার মহানন্দের কাছে পেয়েছিলেন। এই আগ্রহে স্কুলের কাজ ছেড়ে গোরঙ্গনী  সভা'র ভ্রাম্যমান প্রচারকের কাজ নিয়েছিলেন। প্রচারকের কজে পূর্ববঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, আরাকান অঞ্চলে ১৯২২ সালের শেষ পর্যন্ত অনেক ভ্রমন করেন ট্রেনে, জলপথে  অধিকাংশ পথ  পায়ে হেঁটে।


 *প্রথম গল্পপ্রকাশ* 


বিএ পাশ করার পর বিভূতিভূষন প্রথম চাকরী পেয়েছিলেন হরিনাভীর স্কুলে। একদিন স্টাফরুমে অল্পবয়সী ছেলে এসে বলল- " চলুন আমরা দুজনে মিলে একটা বই  লিখি। " কমবয়সী ছেলের রসিকতা ভেবে গুরুত্ব দেননি, মনে মনে ভেবেছিলেন বই তো অনেক দূর কোনওদিন গল্প, প্রবন্ধ লেখার কথা আমার মনে 

আসেনি ।' পরের দিনস্কুলে গিয়ে দেখেন যেখানে সেখানে সাঁটা কাগজ -" শীঘ্র প্রকাশিত হইতেছে- শীঘ্র প্রকাশিত হইতেছে উপন্যাস।" ভাবলেন নিশ্চয়ই সেই পাকা  ছেলের কাজ, এমনকি সে উপন্যাসের নাম ও করে ফেলেছে- চঞ্চলা ।  সহকর্মী শিক্ষকগন পিঠ চাপছে বললেল,-" বাঃ, মশাই।  আপনি তো বেশ গোপন রসিক দেখছি। কবে বেরোচ্ছে উপন্যাস? বিভূতিভূষন তাঁর বন্ধু ও ভ্রমনসঙ্গী যোগেন্দ্র নাথ সিংহ কে বলেছিলেন, উপন্যাস তো দূরের কথা,  তিনি আদৌ লেখক নন। বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ মিথ্যে।  সমস্যা হলো একথা তিনি কাউকে বলতে পারছেন না  । 

খুব রেগে ছেলেটির কলার চেপে বিভুতিভূষন জানতে চেয়েছিলেন। এসব রসিকতার কারণ কী? কোন প্রতিশোধ নেওয়ার  জন্য সে এ কাজ করলো। ছেলেটি উত্তেজিত না হয়ে বলেছিল,-- "ভেবেছিলাম দুজনে মিলে লিখে ফেলবো তাছাড়া  চঞ্চলা নামটাও তো মন্দ নয়।'


রাস্তায়, হাটে বাজারে, স্কুলে সকলের প্রশ্ন-- "কবে বেরোচ্ছে উপন্যাস? '

রাগ করে কাগজ কলম নিয়ে বসে ছোটগল্প লিখলেন এবং ঠিকানা লেখা খামে স্ট্যাম্প সেঁটে পাঠিয়ে দিলেন কলকাতার এক মাসিক পত্রিকায়।  তিনদিন পর থেকে অপেক্ষার শুরু  ।  এই বুঝি ভাম ভর্তি  মনোনীত গল্প ফিরে এলো।  তিন সপ্তাহ বাদে খাম এসেছিলো। বিভূতিভূষন ডায়েরীতে লিখেছেন --" দুঃখ তো হল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই আনন্দও হল যে  রোজকার দুশ্চিতা তো কাটল।  আমার মনের অবস্থা এমন হল যে কোন প্রিয়জন অসাধ্য রোগে মারা গিয়ে যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেল। বাড়ি ফিরে ছিনিয়ে নেয়।বাড়ি ফিরে খাম খুলে দেখেন, লেখা তো নেই। বদলে একটি চিঠি। সম্পাদক মশাই লিখেছেন, "আপনার রচনা মনোনীত হয়েছে, শীঘ্রই প্রকাশিত হবে।"

পরবর্তী কালে বিভূতিভূষণ তাঁর বন্ধুকে বলেছিলেন, ছেলেটি বোধহয় ঈশ্বরের দূত হয়ে সে দিন তাঁর কাছে এসেছিল। ওই বিজ্ঞাপন কাণ্ডটি না ঘটলে তিনি কোনও দিন লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন না।

সেই ছোকরার আসল নাম ছিল যতীন্দ্রমোহন রায়। ১৩২৮, মাঘ মাসের 'প্রবাসী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বিভূতিভূষণের প্রথম গল্প 'উপেক্ষিতা'। এই গল্পটি সেই বছর শ্রেষ্ঠ গল্পের পুরস্কারও ছিনিয়ে নেয়।



 *মায়ের খোজেঁ* 


চার পাঁচ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে কলকাতায় আসেন। দরিদ্র ব্রাহ্মন বাবার সামর্থ্য নেই ভালো ভাড়া বাড়িতে থাকার।  বাধ্য হয়ে শিশুপুত্রকে নিয়ে নিষিদ্ধ পাড়ায় বস্তিতে ঘর ভাড়া

নিয়েছিলেন। সে ঘরের পাশেই এক মহিলা প্রায়ই ছোট্ট বিভূতিকে ডেকে গল্প করতেন। কখনও টফি দিয়ে আদর করে গালও টিপে দিতেন। মা-ছাড়া বাড়িতে খুব তাড়াতাড়ি শিশু বিভূতি মহিলার স্নেহের কাঙাল হয়ে উঠল। একদিন সন্ধেবেলা জেদ ধরল, ঘরে যাবে

না, তার কাছেই রাতটা থাকবে। মহিলা যত বোঝান, বিভূতি নাছোড়।

মধ্যবয়সে মেসে থাকার সময় একদিন

বিভূতির মনে পড়ল ওই মহিলার কথা। ঠিক করলেন সেই পুরনো পাড়ায় মহিলাকে খুঁজতে যাবেন তিনি। যেমন ভাবা তেমন কাজ।

সেখানে গিয়ে তিনি যত বলেন খুঁজতে এসেছেন সেই মহিলাকে, এ ছাড়া আর অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই, অল্পবয়সি যুবতী মেয়েরা শুনতে নারাজ। একসঙ্গে চার- পাঁচ জন মেয়ে নাকি তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সকলেরই আবদার তাঁকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার।

শেষে ছুটে, দৌড়ে, পালিয়ে কোনও ক্রমে সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছিলেন  বিভূতিভূষণ।


 *মেসবাড়ি ও নীরদ চন্দ্র* 

১৯২৮ সালের এপ্রিল মাসে বিভূতিভূষণ আবার কলকাতায় ফিরে এসে ৪১ নম্বর মির্জাপুর স্ট্রিটে তাঁর পুরোনো মেসবাড়ি প্যারাডাইস লজে থাকতে শুরু করলেন। এখানে থাকতে এসে সহ-মেসবাসী হিসেবে পেয়ে গেলেন তাঁর সহপাঠী নীরোদচন্দ্র চৌধুরিকে। 

চাকরিটি ছেড়ে দেওয়ার  পেছনে একটা রোম্যান্টিক ঘটনা ছিল। ওই সময় তিনি স্কুলের কাছে একটি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন। তাঁদের একটি বিবাহযোগ্যা তরুণী কন্যা ছিল। সে আড়ালে-আভাসে বিভূতিভূষণকে খেয়াল রাখত।

বিভূতি স্কুলে চলে গেলে প্রায়শই মেয়েটি এসে তাঁর এলোমেলো ঘর সুন্দর করে  গুছিয়ে দিত। বিভূতিভূষণ সে সব বুঝতে পারতেন। কিন্তু কিছু বলতেন না। কারণ, মেয়েটিকে  

তিনি পছন্দ করতেন।  প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর কখনওই তাঁর মন-মেজাজ ভাল থাকত না। ঠিক তখনই না চাওয়াতেই এত আদর যত্ন। 

মেয়েটি নিজেকে 'আমি আপনার দাসী' সম্বোধন করে বেশ কয়েকটি চিঠিও

লিখেছিল তাঁকে। সে-চিঠি নীরদচন্দ্র দেখে বলেছিলেন, "এমন পবিত্র পত্র তিনি দেখেননি আগে।"

কিন্তু হঠাৎই বিভূতিভূষণ ওই চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে এলেন। কারণ ওই মেয়েটির উপর তিনি যতই মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠছিলেন ততই বুঝতে পারছিলেন,  মেয়েটি তাঁদের সমগোত্রীয় নয়। তাই কোনও সম্পর্ক হলে তাঁর পরিবার খুশি হবে না। আশেপাশের মানুষজন  অনেক কথা বলবে।

সবকিছু ভেবে তিনি কাউকে না জানিয়ে প্রায় লুকিয়েই কলকাতায় চলে আসেন। ফিরে এসে স্কুলে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। 


 *পথের পাঁচালী* 


প্রকাশের জন্য  ১৯২৮ সালের এপ্রিল মাসেই ‘পথের পাঁচালি’র পাণ্ডুলিপি বিচিত্রার দপ্তরে পাঠালেন বিভূতিভূষণ। সে পাণ্ডুলিপি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গৃহীত হল। বিচিত্রার পাতায় ‘পথের পাঁচালি’ জুলাই, ১৯২৮ থেকে সেপ্টেম্বর, ১৯২৯ অব্দি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘পথের পাঁচালি’কে পাঠকদের একটা বড় অংশ সাদরে গ্রহণ করেছিল, তবু, বিচিত্রায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশের পরেও কোন প্রতিষ্ঠিত প্রকাশক বই হিসেবে ‘পথের পাঁচালি’ ছাপতে রাজি হচ্ছিলেন না। সম্ভবত  নতুন লেখকের প্রথম উপন্যাস ছাপার ব্যাপারে তাঁদের জড়তা ছিল। এই সময় নীরোদচন্দ্র সজনীকান্ত দাসের সঙ্গে বিভূতিভূষণের আলাপ করিয়ে দেন। সজনীকান্ত তাঁর নতুন প্রকাশনা রঞ্জন প্রকাশালয় থেকে ১৯২৯ সালের ২রা অক্টোবর ‘পথের পাঁচালি’ প্রকাশ করেন। দিনটি ছিল মহালয়া। সঙ্গত ভাবেই বিভূতিভূষণ পিতৃতর্পণ হিসেবে তাঁর বাবার স্মৃতিতে উৎসর্গ করেন ‘পথের পাঁচালি’। সজনীকান্ত-র স্ত্রী সুধারাণীর একটি লেখা থেকে আমরা জানতে পারি, ‘পথের পাঁচালি’র প্রথম সংস্করণের জন্য সজনীকান্ত বিভূতিভূষণকে তিনশ টাকা সম্মান-দক্ষিণা দিয়েছিলেন। 


 *পাঁচালি-র দুর্গা* 


পাঁচশো পাতার 'পথের পাঁচালী' শেষ করে ছাপার আগে  পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে  গিয়ে আশীর্বাদ নেবেন বলে,


 সেরেস্তা থেকে ছুটি নিয়ে ভাগলপুরে হয়ে কলকাতা যাবেন। বিকেলে একা একাই ভাগলপুরের জনবিরল রাস্তায়  দেখলেন সেই নির্জন পথে দাঁড়িয়ে একটি আট-দশ বছরের মেয়ে তাঁর দিকে  তাকিয়ে। বিভূতিভূষণও দেখছেন কিশোরী কন্যাটিকে।বন্ধু যোগেন্দ্রনাথ সিংহকে পরে বলেছিলেন, "মাথার চুল উস্কো-খুস্কো, চোখে উদ্দেশহীন চাহনি, অথচ মুখে দুষ্টুমির চিহ্ন। মনে হয় স্কুল থেকে পালিয়েছে, নয়তো বাড়ি থেকে মেরে তাড়িয়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু দুষ্টুমির মতলব আঁটছে।” তাঁর মনে হয়েছিল ওই কিশোরী কন্যার  দু'চোখের ভেতর এক ব্যথাভরা জগৎ লুকিয়ে।  রবিঠাকুরের কাছে না গিয়ে সে দিনই ফিরে এসেছিলেন জমিদারির সেরেস্তায়। মনে হয়েছিল, এই মেয়েটিকে তিনি যদি তাঁর উপন্যাসে ঠাঁই না দেন, সে লেখা হবে ব্যর্থ এবং নিষ্প্রাণ। পাণ্ডুলিপি ছিঁড়ে ফেললেন।


ডায়েরিতে তাঁর বর্ণনা পাওয়া যায়- "মেয়েটিকে নিয়ে নতুন করে আবার লিখতে বসলাম। সেই মেয়েটিই পথের পাঁচালি-র দুর্গা।”




 *ভালোবাসা* 


ইছামতী নদীতে স্নান করতে গিয়ে জলে ডুবে বোন জাহ্নবীর মৃত্যু হল। আকস্মিক এই ঘটনায় বিভূতি ভেঙ্গে পড়লেন ।

তার দু'দিন পর একটি অল্পবয়সি মেয়ে এল বিভূতির কাছে অটোগ্রাফ চাইতে।

মেয়েটিকে খুব ভাল লেগে গেল তাঁর। ধীরে, ধীরে দুই অসমবয়সির বন্ধুত্বও বেশ গাঢ় হল। এক বছরের মাথায় দু'জনে বিয়ে করলেন।

পরবর্তী কালে বিভূতিভূষণ কল্যাণী দেবীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, "এখন মনে হচ্চে হয়তো অনেক জন্মের বন্ধন ছিল তোমার সঙ্গে- নয় তো এমন হয়ে কেন? কল্যাণী, তুমি আমার অনেক দিনে পরিচিতা, এ বার এত দেরীতে দেখা কেন জানি নে, আরও কিছুকাল আগে দেখা হলে ভাল হতো।"


 *অচেনা লেখক* 


কলেজ স্ট্রিটে এক প্রকাশনা দফতরে বসে আড্ডা দিচ্ছেন।

আড্ডায় তাঁর সমসাময়িক অনেক  সাহিত্যিকও ছিলেন , সেখানে উত্তরবঙ্গ  থেকে দু'জন কম বয়সী ছেলে এলো হন্তদন্ত হয়ে। তারা  জনৈক সাহিত্যিককে ধরলেন। উত্তরবঙ্গে সাহিত্যসভায়  

সাহিত্যিককে সভায় সভাপতি করতে  চায়। কিন্তু লেখকমহাশয় যাওয়ার জন্য নানারকম শর্ত আরোপ করছেন।

শুনে ছেলে দু'টির কাঁচুমাচু দশা।

তারা বারবার বলছে, তিনি না গেলে  তাঁদের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। সেকথা  বিবেচনা করেও যদি একটি বারের জন্য তিনি যান।

কিন্তু সাহিত্যিক তাঁর শর্তে অনড়। শেষে তা ছেলে দুটি নিরুপায় হয়ে ফিরতে যাবে জন হঠাৎ পিছন থেকে বিভূতিভূষণ তাঁদের ডাক দিয়ে বললেন, তিনি গেলে কি তাদের  কাজ হবে?  শুধুমাত্র একটা দ্বিতীয় শ্রেণির টিকিট হলেই চলবে।

তাদের কাছে বিভূতিভূষণের চেহারাটি একেবারে অচেনা। তাই প্রস্তাব শুনে অতি  সাধারণ পোশাক পরা ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে তাদের থতমত অবস্থা।

ইনি আবার কে?

তাঁদের কিন্তু-কিন্তু ভাব দেখে বিভূতিভূষণ বললেন, "আমার একটা বই আছে। হয়তো শুনে থাকবে, 'পথের পাঁচালী'।" শুনে ছেলে দুটির চোখ বিস্ফারিত। তারা  বললো "আপনি বিভূতিভূষণ।"

উনাকে প্রণাম করে আড়ালে গিয়ে তারা পর বললো, উনি রাজি না হয়ে ভালই হয়েছে।  আপনাকে পাওয়া গেল!

বিভূতিভূষণের এই বলার মধ্যে ছেলে দুটির প্রতি যেমন তাঁর মায়া ধরা পড়ে, প্রন তেমন কোথাও বোধ হয় একস্থান থেকে স্থানান্তরে উড়তে থাকা ডানাও ছায়া ফেলে পর যায় !


 **মনভোলা উদাসীন*  


নিজেকে ভাবতেন তলস্তয়ের 'ওয়ার অ্যান্ড পিস'-এর নায়ক বেজুকভ। নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

বাইরে নরম-কোমল মানুষট কিন্তু ভেতরে ভেতরে বেশ কঠোর ছিলেন। প্রয়োজনে খুব কাছের মানুষদের  আশ্চর্য ভাবে ভুলে যেতেন।

অনেক দিনের বন্ধু বিভূতিভূষণ সম্পর্কে এমনই ধারণা ছিল নীরদ চন্দ্র চৌধুরী-র।

স্বাধীনতার  তিন বছর  আগের কথা।  সেই সময় কলকাতায় মাঝেমধ্যেই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা চলছে।

একবার রাস্তায় দাঙ্গার মধ্যে পড়ে বিভূতিভূষণ একটি বালির বস্তার পেছনে  লুকিয়ে পড়লেন। প্রচন্ড  ভয়ে  বস্তার পিছন থেকে কেবলই বন্ধু নীরদচন্দ্রকে বলছিলেন, "আমাকে ছেড়ে যেয়ো না, ট্রামে তুলে দিয়ো।"  কিন্তু যে মুহূর্তে ট্রাম এসেছিল  নীরদচন্দ্র দেখলেন, তাঁকে রাস্তায় প্রায় ঠেলে ফেলে দিয়ে বিভূতিভূষণ ট্রামে উঠে, চলে গেলেন। ভুলেই গেলেন বন্ধু নীরদ চন্দ্র রয়েছেন,  একবার পেছন ফিরেও তাকালেন না।



তথ্য ঋণ -

১. অচেনা বিভূতি -আনন্দবাজার পত্রিকা (২০১৬)

 ২.  বিভূতিভূষণ  -সম্পাদনা,  মিনাল আলী মিয়া

৩. উইকিপিডিয়া

৪. পথের পাঁচালী ৯০( আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০১৬)




স্বাধীনতা উত্তর বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ প্রসঙ্গ - তুষার ভট্টাচাৰ্য || Sadhinota uttar Bangla sahityae deshbhagh prasanga - Tushar Bhattacharjee || প্রবন্ধ || নিবন্ধ || Article

স্বাধীনতা উত্তর বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ প্রসঙ্গ 

           তুষার ভট্টাচাৰ্য



১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগের পর ( বাংলা এবং পাঞ্জাবকে খণ্ডিত করে ) দেশভাগের করুণ কাহিনী তেমন ভাবে বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি উঠে আসেনি l দেশভাগের কারণে পূর্ব বাংলা থেকে প্রায় এককোটি বাঙালি ছিন্নমূল উদ্বাস্তু ( হিন্দু ) নিজেদের অনিচ্ছাসত্বেও ভিটে মাটির মায়াত্যাগ করে এপারের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন l তাঁদের নাম দেওয়া হয়েছিল -বাঙাল, রিফিউজি,জার্মান পার্টি, সমুন্দির পুত, সার্কাসের জন্তু প্রভৃতি ব্যাঙ্গার্থক শব্দে বিশেষিত করে l সেই সময়ে স্থানীয় মানুষরা ভীষণ অনুকম্পার চোখে দেখতেন পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের l এবং বিরূপ মনোভাবও পোষণ করতেন l এইরকম মনোভাবের উল্লেখ পাওয়া যায় ' রিফিউজিরা এমনিতেই বড় নোংরা, এক ঘরে গাদাগাদি করে থাকে, শোওয়ার ঘরে উনুন জ্বেলে রান্না করে ( অর্জুন উপন্যাস - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ) l ' বাঙাল নাকি তুই? কী ভাষা হাউ মাউ খাঁউ ( মাধব ও তার পারিপাশ্বিক ( শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ) l 


এই প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে সর্বস্ব হারানো বাঙালি উদ্বাস্তু মানুষদের জীবনের দুঃখ, যন্ত্রনা, বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের কথা তুলে ধরে বাংলা ভাষায় কোনও ক্লাসিক উপন্যাস কিংবা নাটক আজ পর্যন্ত লেখা হয়নি l 


যদিও সেই সময়ের বাঙালি উদ্বাস্তু জীবনের মর্মান্তিক করুণ আখ্যান কিছুটা তুলে ধরেছেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাঙালি লেখক l অমলেন্দু চক্রবর্তী তাঁর অধিরথ সূতোপুত্র নামক গল্পে উদ্বাস্তু জীবনের দুঃখের আখ্যান তুলে ধরেছেন অনায়াস নৈপুণ্যে - গল্পের নায়ক সনাতন নিজের বুকের রক্ত দিয়ে লেখে - 'বুঝিয়াছি আমার স্বদেশ নাই l স্বদেশহীন মানুষের স্থান এই মর্তভূমি কি করিয়া হইতে পারে l ' শেষে এই বোধ তাঁকে আত্মহত্যার পথে নিয়ে যায় l

অমলেন্দু চক্রবর্তীর আরেকটি গল্প' ইচ্ছামতী বহমান' গল্পেও চিত্রিত হয়েছে গল্পের নায়িকা মৃন্ময়ীর দেশভাগের যন্ত্রণা l কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ' উপায় ' গল্পেও উদ্বাস্তু জীবনের চরম দুঃখের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে l মানিকের ' সুবালা ' নামক গল্পে উদ্বাস্তু সুবলার স্বামীকে যখন পুলিশ ছিনতাইয়ের অপরাধে ধরে নিয়ে যায় তখন ধৃত স্বামী সুবলাকে বলে - ভিখ মাইগো না l আমাগো অপরাধ নাই, ভিখ মাইগা অপরাধী সাইজো না l তার চেয়ে মরণ ভাল l

এই কথা শুনে সুবলা শপথের ভঙ্গিতে বলে - 'এত বড় পৃথিবীতে মাথা গোঁজনের ঠাঁই আদায় কইরা নিমু l'

এই প্রসঙ্গেই সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'মর্যাদা ' গল্পটির কথা উল্লেখ করতে হয় l গল্পের নায়ক দরিদ্র পন্ডিত মশাই দেশ ভাগের ফলে ভিটে মাটি সব হারিয়েছেন কিন্তু নিজের আত্ম মর্যাদা হারাননি l মাঝে মাঝে দেশের কথা মনে পড়লে ছাত্রদের দুঃখ করে বলেন - আছি রে ভালোই আছি l শুধু বুড়ো বয়েসে দেশের জন্যে একটু কষ্ট হয়, আর তো কখনও পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারব না l


বাংলা সাহিত্যের বিপ্রতীপে,বিশ্ব সাহিত্য ক্ষেত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় কিন্তু প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উদ্বাস্তু মানুষদের জীবন যন্ত্রনাকে তুলে ধরে রচিত হয়েছে অনেক মানবিক উপন্যাস ছোট গল্প, নাটক প্রভৃতি l জার্মানি দু'ভাগে ভাগ হয়ে যাবার সময়কালকে পটভূমি ধরে আমেরিকান সাহিত্যিক জন স্টেইনবেক লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ' দ্য গ্রেভস অব ৱ্যাথ l যাতে লেখা হয়েছে জার্মানির উদ্বাস্তু মানুষদের জীবনের করুণ কাহিনী l পার্ল বাকের ' দ্য রিফিউজিস ' উপন্যাসেও রয়েছে উদ্বাস্তু মানুষদের বাসভূমি হারানোর বেদনার্ত কাহিনী l এরিখ মারিয়া রেমার্কের' দ্য নাইট ইন লিসবন ' উপন্যাসে হিটলার শাসিত নাৎসীদের অত্যাচারের ফলে দেশত্যাগের করুণ চিত্র আখ্যায়িত হয়েছে l

প্যালেস্টাইনের লেখক গাজি ডানিয়াল তাঁর 'তিরিশ লাখের একজন' গল্পের শুরুতেই লিখেছেন - আজ আমার নিজের দেশ বলতে কিছু নেই l ইজাজ হামমদ নামের একজন প্যালেস্টাইনের কবি তাঁর 'রাতের জেরুজালেমবাসী ' কবিতায় লিখেছেন - হে রাত্রি তুমি বল কেন ছাড়তে হল আমার সেই ছোট্ট ঘর l কবি মহমুদ দারবিশ ' একজন নির্বাসিতের চিঠি ' শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন - রেস্তোরায় কাজ করি, এঁটো ডিস ধুই /আমার দুঃখী মুখে ঝুলিয়ে রাখি কৃত্তিম হাসি l


 অন্যদিকে ভারতের হিন্দি ভাষার বিশিষ্ট সাহিত্যিক যশপাল লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত গল্প 'ঝুঠা সচ' l এই মানবিক গল্পটির পটভূমি হল লাহোর থেকে অমৃতসরে উদ্বাস্তু হয়ে চলে আসার মর্মান্তিক কাহিনী l

উর্দু লেখক রাজিন্দর সিং বেদি দেশবিভাগের করুণ আখ্যান তুলে ধরেছেন তাঁর লাজবন্তী গল্পে l সাদাত হাসান মান্টো লিখেছেন ' নিয়তি' নামের গল্প l যার পরতে পরতে রয়েছে দেশ ভাগের কারণে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়ে যাওয়া জীবনের বেদনার কাহিনী l পাঞ্জাবী সাহিত্যিক গুরুমুখ সিং মুসাফিরের খসমা গল্পেও রয়েছে উদ্বাস্তু মানুষের করুণ আত্মকথন l বলা ভাল দেশভাগ নিয়ে হিন্দি, উর্দু ভাষায় অনেক মানবিক গল্প, উপন্যাস লেখা হয়েছে l


কিন্তু দেখা যাচ্ছে দেশভাগের সুদীর্ঘ ৭৮ বছর পেরিয়ে যাওয়া সত্বেও পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশ ) ছিন্নমূল উদ্বাস্তু প্রায় এক কোটির বেশি মানুষের জীবনের করুণ স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস নির্ভর করে আজ পর্যন্ত তেমন ভাবে বাংলা ভাষায় খুব বেশি উপন্যাস, , নাটক বা কবিতা লেখা হয়নি l


যদিও কেন দেশভাগ হল, কাদের জন্য হল, সেই সব রাজনৈতিক হঠকারিতা, ক্ষমতার চক্রান্ত প্রভৃতি উল্লেখ করে লেখা হতে পারত সেই সময়ের বাস্তব ঘটনা সমন্বয়ের দলিল হিসেবে কোনও মানবিক উপন্যাস বা ছোটগল্পের আখ্যানলিপি কিংবা নাট্য সাহিত্য l

আসলে বাঙালি সাহিত্যিকরা ১৯৪৭এর দেশ ভাগের অপরিসীম যন্ত্রণা, প্রত্যাশা, প্রাপ্তি, স্বপ্ন, এবং স্বপ্নভঙ্গের চালচিত্র নিয়ে সম্ভবত তেমন করে লেখার কোনও আগ্রহই

দেখাননি lতাঁদের নির্লিপ্ততার জন্য বাংলা ভাষায় রচিত হয়নি কোনও দেশ ভাগের বেদনার আখ্যান l

অথচ সাহিত্য হচ্ছে সমাজের দর্পণ l এব্যাপারে কবি নাজিম হিকমত বলেছেন - ' সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে মানুষের জীবন প্রতিফলিত হয় l সেই শিল্পের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে সাংঘাত আর প্রেরণা, জয় ও পরাজয় আর জীবনের প্রতি অফুরান ভালবাসা l খুঁজে পাওয়া যাবে একজন মানুষের জীবনের সব'কটি দিক l

সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প, যা জীবন সম্পর্কে কোনও মিথ্যা ধারণা দেয় না l ' ( গ্রন্থ সূত্র :বাংলা উপন্যাসে উদ্বাস্তু জীবন - ড: তাপস ভট্টাচাৰ্য l প্রকাশক - পুস্তক বিপনী l কলকাতা ) l


 বাংলা সাহিত্যে দেশ ভাগ এবং ছিন্নমূল উদ্বাস্তু জীবনের বঞ্চনা, অবহেলা, বেঁচে থাকার লড়াই প্রভৃতি নিয়ে তেমন করে কোনও সাহসী উপন্যাস কিংবা ছোট গল্প লেখা হয়নি l এছাড়া লেখা হয়নি কোনও কাল জয়ী নাটক কিংবা কবিতা l

যদিও তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে কয়েকজন মুষ্টিমেয় ঔপন্যাসিক দেশভাগের নির্মম যন্ত্রণা নিয়ে কিছু উপন্যাস বা গল্প লিখেছেন l এব্যাপারে সর্বাগ্রে নাম উল্লেখ করতে হবে সাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের l তাঁর লেখা - নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে, অলৌকিক জলযান, ঈশ্বরের বাগান, মানুষের ঘরবাড়ি, মৃন্ময়ী, আবাদ প্রভৃতি উপন্যাসে উদ্বাস্তু জীবনের করুণ কাহিনী ফুটে উঠেছে l 'নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে ' উপন্যাসে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়   

এক জায়গায় লিখেছেন -

জেঠিমার এই মুখ দেখলে সোনা চোখের জল রাখতে পারে না l মা না খেয়ে শীতের কাঁথায় শুয়ে থাকলে তার পড়াশুনা করতে ভাল লাগে না...... l বাবার চোখ মুখের দিকে তাকানো যায় না ....... l অন্নহীন এই সংসারে সোনার নিজেকে বাড়তি লোক মনে হয় l



সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের - অর্জুন উপন্যাসের এক জায়গায় উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অর্জুন বলছে - লজ্জা পেয়েছিলাম আমি সতেরো বছর বয়েসে, কলকাতায় এসে l আমার দাদা তখন পাগল হয়ে রাস্তায় ঘোরে, দুবেলা মা আমাদের ভাত রেঁধে দিতে পারে না বলে বিরলে কাঁদে l


 শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের - মাধব ও তার পারিপার্শ্বিক, প্রফুল্ল রায়ের - নোনা জল মিঠে মাটি, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর - নিশ্চিন্তিপুরের মানুষ, অমিয়ভূষণ মজুমদারের - নির্বাস, অমলেন্দু চক্রবর্তীর - গোষ্ঠবিহারীর জীবনযাপন, জরাসন্ধের - মানস কন্যা, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের - বিপাশা, দুলালেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের - ওরা আজও উদ্বাস্তু, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের - দূরভাষিণী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের - বকুলতলা পি এল ক্যাম্প, বল্মীক, অরণ্যদণ্ডক, প্রবোধ কুমার সান্যালের - হাসুবানু, বনফুলের - পঞ্চপর্ব, ত্রিবর্ণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের - সার্বজনীন, শক্তিপদ রাজগুরুর - তবু বিহঙ্গ, সোনা ফসলের পালা, মেঘে ঢাকা তারা, শঙ্করের - স্থানীয় সংবাদ, শঙ্কর বসুর - শৈশব, সমরেশ বসুর - সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা, সরোজ কুমার রায়চৌধুরীর - নীল আগুন, লোকনাথ ভট্টাচাৰ্য'র - দু'একটি ঘর, দু'একটি স্বর প্রভৃতি উপন্যাসেও দেশভাগ জনিত বাঙালি ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের জীবনের মর্মন্তুদ কাহিনী চিত্রিত হয়েছেl


এছাড়াও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের -জাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের - আত্মপ্রকাশ, জ্যোতির্ময়ী দেবীর - এপার গঙ্গা, ওপার গঙ্গা প্রভৃতি উপন্যাসেও উদ্বাস্তু জীবনের বিভিন্ন ঘটনা এবং চরিত্রের নিপুন আলেখ্য প্রকাশিত হয়েছে l 

বাংলা উপন্যাসে দেশভাগ এবং উদ্বাস্তু প্রসঙ্গ কিছুটা উঠে এলেও, বাংলা কবিতায় খুব বেশি উদ্বাস্তু জীবনের কথা চিত্রিত হয় নি l

যদিও কবি বিষ্ণু দে'র ' জল দাও ' কবিতায় ( ১৯৪০)কবি লিখেছেন -


' এখানে - ওখানে দেখ দেশছাড়া লোক ছায়ায় হাঁপায় l পার্কের ধারের শানে পথে পথে গাড়ি বারান্দায় l

ভাবে ওরা কী যে ভাবে l

 ছেড়ে খোঁজে দেশ l

এইখানে কেউ বরিশালে কেউ বা ঢাকায় l '


বিষ্ণু দে তাঁর ' গান ' শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন -

মন চাই জ্ঞানে কাজে আপিসে

বাজারের কলে মিলে

দপ্তরেচত্বরে উল্লাসে সংকটে

গান চাই

প্রাণ চাই, গান চাই

শেয়ালদার বাস্তুহারা শেডে l

অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত - 'উদ্বাস্তু '(১৩৭২)শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন -


জলা জংলার দেশ, দেখবার আছে কী!

আসল জিনিস দেখবি ওপারে

আমাদের নিজের দেশে, নতুন দেশে,

নতুন দেশের নতুন জিনিস -মানুষ নয়,

জিনিস সে জিনিসের নাম কী?

নতুন জিনিসের নতুন নাম উদ্বাস্তু l 


কবি মণীন্দ্র রায় 'চিঠি 'কবিতায় লিখেছেন -

'পাবনায় বাড়ি তার উদ্বাস্তু রমণী

সেই বাড়ি

এত টুকু হতে যারে চিনি

আর সেই ঘর পুব দুয়ারী

সিঁদুরে আমের সেই চারা

সবই আজ পরের অধীনে '


মণীন্দ্র রায়ের ' নকসি কাঁথার কাহিনী' কবিতাতেও রয়েছে উদ্বাস্তু জীবনের অপরিসীম লাঞ্ছনার করুণ চিত্র -


'কে দেখেছে জীবনের অপচয় বেশি তার চেয়ে?

কে সয়েছে এত গ্লানি রানাঘাটে, ক্যাম্পে ক্যাম্পে, পথে

উড়িষ্যার তেপান্তরে, জনহীন দ্বীপান্তরে আর হাওড়ার স্টেশনে?

অচল পয়সার মতো পরিত্যক্ত ------

-----তবু বার বার

কে এমন ফিরে আসে, ঘর বাঁধে, কার এত আশা?

দারিদ্রের কাঁটাগাছে দুরন্ত স্বপ্নের রাঙাফুল

ফোটাতে কে জানে '


কবি দীনেশ দাশ তাঁর 'পনেরই আগস্ট ' কবিতায় লিখেছেন -

এখন তো শাঁখের করাতে

দিনগুলি কেটে যায় করাতের দাঁতে

সীমানার দাগে দাগে জমাট রক্তের দাগ

কালনেমী করে লঙ্কাভাগ l 


বিশিষ্ট কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর 'স্বপ্নে দেখা ঘরদুয়ার'

কবিতায় লিখেছেন ফেলে আসা দেশের বাড়ির কথা -

পুকুর, মড়াই, সবজি বাগান,

জংলা ডুরে শাড়ি

তার মানেই তো বাড়ি l

তার মানেই তো প্রাণের মধ্যে প্রাণ,

নিকিয়ে নেওয়া উঠোনখানি

রোদ্দুরে টানটান l


কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস লিখেছেন -

তোমরা বিচার কর ভাই

কেন আমি দেশছাড়া,

আত্মীয় স্বজন হারা

কেন সে জনমভূমি

দেখিতে না পাই l



বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি শামসুর রাহমান তাঁর ' যাবার মুহূর্তে ' শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন -


নিজের নিবাস থেকে যাবার মুহূর্তে

কেন যে বার বার মনে পড়ে তার

রেকাবিতে রাখা কিছু ফুল

স্টেনলেস চায়ের চামচ, তালা,

ছাইদানি, দরজার কড়া

যারা জানবে না কোনদিন,

কোথায় সে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে এমন ?




বাংলা সাহিত্যের আরেকটি ধারা নাট্য সাহিত্যেও খুব বেশি বাঙালি উদ্বাস্তু জীবনের আখ্যান কাহিনী প্রতিফলিত হয়নি l নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের - এই স্বাধীনতায়, সলিল সেনের -নতুন ইহুদি, বিজন ভট্টাচাৰ্য'র - গোত্রান্তর, দিগিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের - বাস্তু ভিটা, মন্মথ রায়ের - ভাঙাগড়া, ঋত্বিক ঘটকের -দলিল প্রভৃতি নাটকে বাঙালি উদ্বাস্তু জীবনের অন্তহীন সমস্যা, ব্যর্থতা, হতাশার করুণ আলেখ্য চিত্রিত হয়েছে l 



বস্তুতপক্ষে দেখা যাচ্ছে যে ১৯৪৭সাল বা তার পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের জীবনালেখ্য নিয়ে বাংলা সাহিত্যের কোনও ধারাতেই তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য কালজয়ী উপন্যাস, ছোট গল্প কিংবা কবিতা আদৌ লেখা হয় নি l

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে উদ্বাস্তু জীবনের সমস্যা, বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথাও তেমন করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন নি কোনও বাঙালি লেখক, কবি নাট্যকার l

মানুষ কেন উদ্বাস্তু হয়, কাদের দোষে উদ্বাস্তু হয়, কীভাবে শাসক শ্রেণীর নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য উদ্বাস্তু হতে হয় সাধারণ ছাপোষা মানুষকে, সেইসব বাস্তুহারা ছিন্নমূল মানুষের জীবনের ব্যাথা, বেদনা, ক্ষোভ, যন্ত্রণা, পুনর্বাসনের জন্য নিরন্তর লড়াই প্রভৃতি ব্যাপার নিয়ে সম্ভবত এপারের বাঙালি লেখকরা দেশ ভাগ পরবর্তী সময়ে খুব বেশি সজাগ ছিলেন না l দেশভাগ নিয়ে সজাগ এবং সচেতন থাকলে নিশ্চয়ই ধ্রুপদী, চিরায়ত উপন্যাস, গল্প, কবিতা কিংবা নাটক লেখা হত l

এব্যাপারে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্য যথেষ্ট প্রণিধানযোগ্য l সুনীল লিখেছেন - দেশভাগ নিয়ে কোনও সার্থক উপন্যাস লেখা যায় না, কেন না সেরকম লেখা আর একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে উসকে দিতে পারে ( রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা,১৩মার্চ ১৯৮৮ )l



শরৎ রানী - মৌসুমী সিনহা ব্যানার্জ্জী || Sarat rani - Mousumi sinha Banerjee || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 শরৎ রানী

 মৌসুমী সিনহা ব্যানার্জ্জী


শিউলি ফোটার বার্তা এল

অলির গানে গানে,

শাপলা শালুক ডাক দিয়ে যায়

শরৎ রানীর কানে।


কাশফুলেরা মাথা দোলায়

শুভ্র হাসির মেলা,

তুলো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে

সোনা রোদের খেলা।


সোনালী ধান মাঠ ভরেছে,

শিশির ভেজা ঘাসে

গঙ্গা ফড়িং নেচে বেড়ায়

ধানের শীষে শীষে। 


আগমনীর সুর শোনা যায়

আকাশ বাতাস জুড়ে,

মা এসেছেন বাপের বাড়ি

সিংহের পিঠে চড়ে।


অসুর দানব যেথায় যত

নেই যাদের কিছু লাজ,

চুলের মুঠি ধরে তাদের

বিনাশ করবে মা আজ।

পূর্ণিমা - ঐশ্বর্য্য কৃষ্ণ রায়হান || Purnima - Aiswarya krishna Rayhan || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 পূর্ণিমা

            ঐশ্বর্য্য কৃষ্ণ রায়হান


সময় ফুরোচ্ছে শুধু, বৃষ্টি অবিরাম।

অনেক দিন তো হলো, ভালোবাসি বলো।

দুপুর রৌদ্রে সহস্র শতাব্দী আগে

স্থির অরণ্যের মত চুপ ছিলে।


আজ পূর্ণিমা, তুমি নেই তাই

জোনাকিরা জ্বালে না আলো।


বাড়িগুলির আলো বিলীন দ্রুত

গভীর রাত আর নিদ্রাহীন চোখ।

জঙ্গলজুড়ে কান্নার শব্দ নামে।

বৃষ্টি মত গায়ে, পাতায় জমে যাবে।

যখন শরৎ - সুব্রত ভট্টাচার্য্য || Jokhon Sorot - Subrata Bhattacharya || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 যখন শরৎ

 সুব্রত ভট্টাচার্য্য

             


কাশের বনে লাগলে পড়ে দোলা

মন-বাউল হঠাৎ গেয়ে ওঠে,

নীল আকাশে ভাসলে পড়ে ভেলা

খুশি'রা সব কেমনে যেন' জোটে।


যতই দুঃখ যতই ব্যথা

থাকনা এ'মন জুড়ে,

তবুও সে লুকানো এক কথা

বলতে চায় মধুর কোনো সুরে!


শিউলি বুঝি বুঝতে পারে তা'

তাইতো সে খিলখিলিয়ে হাসে,

এত' দিনের গোপন কবিতা

ছড়িয়ে দেয় হাওয়ার সুবাসে।


তুমিই শুধু বুঝতে পারোনা

মনখারাপি কালো বাদল মেঘে,

প্রস্ফুটিত সে' এক যন্ত্রণা

প্রেমিক মনের অবুঝ আবেগে!

দু-চোখ - শতাব্দী চক্রবর্তী || Du-chock - Satabdi chakraborty || kobita || Poetry || কবিতা || বাংলা কবিতা || poem || Bengali poetry || Bengali poem

 দু-চোখ

শতাব্দী চক্রবর্তী




সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রভুক অমাবস্যা

এই মুহূর্তে আমার চোখ যেন গান্ধারীর


একটা ঘেউ গা ঘেঁষে দাঁড়াল


অন্ধকারে সেই যেন অন্ধের যষ্টি।


সেই উলঙ্গ পাগলিটাকে শোনা যায়


বুড়িগঙ্গার ঘাটের দিকে


দেখেছি তাকে, এ পাড়ায় নতুন


প্রবঞ্চনা কাকে বলে ভালো মতো জানে সে,


অন্ধকার কাকে বলে তাও।




আমার মাথার উপরে চাঁদ নেই


থাক থাক অমাবস্যা ঝুলে আছে


নারকেলের পাতার মতো হাতছানি দেয় 


কেবল দুটো চোখ আছে আমার


চাঁদ সূর্যের বিচার করার আলোও আছে


কত শত উলঙ্গকে দেখারও


"হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল, পার করো আমারে"


ঐ তো, গাইছে গঙ্গার মতো পাড় ভাঙা গলায়


উলঙ্গ পাগলিটা


মার দু-চোখ কত কিছুই দেখে ফেলে এমন অন্ধকারেও