Sunday, December 5, 2021

কবিতা || মদ || তৈমুর খান

 মদ



 প্রথম ভালোলাগাটিই ছিল

 প্রথম মদ খাওয়ার মতো;

 মেয়েটি রঙিন কাচের গ্লাস

 তার যৌবন তরল স্বচ্ছ মদ।


 আমি অর্ধ-উন্মাদের মতো গ্লাসের পর গ্লাস

 নিঃশেষ করে দিই…

 হঠাৎ গ্লাসটি ভেঙে গেল বলে

 আমি এখন সম্পূর্ণ উন্মাদ!

১৯ তম সংখ্যার সম্পাদকীয়




 সম্পাদকীয়:


শীতের চাদরে ইলশেগুড়ি। মেখে নেওয়া প্রাণের উদারতা ও করুণা দায়ক বাতাস মাঝে মাঝে স্মরণ করাই তোর মধ্যে একটা কবিত্ব বোধ আছে। সুদূর হিমালয় পর্যন্ত পাড়ি দেওয়ার দরকার নেই। রাজ্য থেকে নিজ জেলা সবই প্রত্যাবর্তন এর আভাস। সবই লেখার খোরাক সাধ স্বাদ দুটোই আছে এই মায়াময় পরিবেশে। চারিদিকে ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত হতে শিখুন। বাঁচুন প্রাণ খুলে। এ জীবন সীমিত সময়ের জন্য। এই সময়ে এক মুঠো শান্তি দেয় সাহিত্যচর্চার প্রত্যাশা। তাই পড়তে থাকুন। লিখতে থাকুন। আমরা আপনার পাশে আছি আমাদের World sahitya adda ব্লগ ম্যাগাজিন নিয়ে। এটি শুধু ম্যাগাজিন নয় এটা সেই শান্তির বার্তা। তাই আমাদের পত্রিকা পড়ুন। আদরের সহিত নতুনভাবে পাঠক মনকে সৃজনশীল করুন।



                                 ধন্যবাদান্তে

               World sahitya adda সম্পাদকীয়


________________________________________________


##Advertisement (বিজ্ঞাপন)--


১)


___________________________________________________


২)



বইটি সরাসরি পেতে-- 6291121319

___________________________________________________


৩)


##উত্তরপাড়া,সিঙ্গুর এবং কোলকাতার বেহালায় এছাড়াও যে কোনো প্রান্ত থেকেই যেকোনো ক্লাসই অনলাইনে করতে পারবেন। 


এছাড়া কেউ যদি সরাসরি অফলাইন এ ভর্তি হতে চান যোগাযোগ করুন এই নাম্বারে-- 9330924937

__________________________________________________


৪)



__________________________________________________


৫)



##বইটি পাবেন- National Book house, Soma Book Store, Amor pustakaloy, Tarama Book Store , The Elegant publications(16B Sitaram Ghosh Street, kol 9.), 63no Saha book stall. এবং Amazon and Flipkart -এ।


##বইটি সরাসরি পেতে-- 9831533582 / 9433925262 দেবে।

________________________________________________


৬)


##ছাপানো জীবনী গ্রন্থের জন্য-লেখকের জীবনী সংগ্রহ করা হচ্ছে।


" লেখকদের আত্মজীবনী" গ্রন্থ তৃতীয় খন্ডের জন্য, লেখকদের কাছে থেকে জীবনী সংগ্রহ করা হচ্ছে। আপনার মূল্যবান জীবনী 300 শব্দের মধ্যে লিখে পাঠিয়ে দেন। বইটি ছাপানো অক্ষরে প্রকাশ করা হবে। কিন্তু কোন সৌজন্য কপি দিতে পারবে না।

বইটির সাথে সম্মানিক হিসাবে দেওয়া হবে।


1/ সাম্মানিক সার্টিফিকেট।* (বাঙালি লেখক সংসদের পক্ষ থেকে।)

2/ "লেখক পরিচয়পত্র কার্ড"। লেখকের ছবিসহ সংক্ষিপ্ত পরিচয় বহন করবে। (বাঙালি লেখক সংসদের পক্ষ থেকে।)


3/ সম্মানিত পদক (মেডেল)* {বাঙালি লেখক সংসদের পক্ষ থেকে।}


বইটির বুকিং মূল্য 300 টাকা দিয়ে কিনে, বাঙালি লেখক সংসদ কে অর্থনৈতিক ভাবে সাহায্য করতে হবে। ডেলিভারি সার্ভিস চার্জ আলাদাভাবে দিতে হবে না।

গ্রন্থের কভার পৃষ্ঠায় আপনার ছবি দিতে আগ্রহী হলে, যোগাযোগ করুন।

টাকা পাঠানোর একাউন্ট

শংকর হালদার

(1) ফোন পে 8926200021

(2) পেটিএম 8926200021

( 3) ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে। 


স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ( S.B.I.)

SANKAR HALDER

Account No : 34681068289

IFSC :SBIN 0015960


টাকা পাঠানোর পর রশিদের স্ক্রিনশট কপি করুন এবং জীবনী লেখা পাঠিয়ে দেবেন।

হোয়াইট অ্যাপস নম্বরে :-

 8926200021


যে কোন বিষয়ে যোগাযোগ :- শংকর হালদার শৈলবালা।  

মোবাইল :- 8926200021

বাঙালি লেখক সংসদ, দত্তপুলিয়া, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

______________________________________________


**বি.দ্র- বিজ্ঞাপন এর সব দায়িত্ব বিজ্ঞাপন দাতার।

Saturday, December 4, 2021

১৯ তম সংখ্যার সূচিপত্র (৩০ জন)

 সম্পূর্ণ সূচিপত্র:





বাংলা কবিতা ও ছড়া---


তৈমুর খান, মহীতোষ গায়েন, নীতা কবি মুখার্জী, সৌমেন্দ্র দত্ত ভৌমিক, সুমিত্রা পাল, মিঠুন রায়, জয়িতা চট্টোপাধ্যায়, অরবিন্দ সরকার, চাঁদ রায়, উদয়ন চক্রবর্তী, আশীষ কুন্ডু, সৈয়দ শীষমহাম্মদ, শেখ নজরুল, ফরমান সেখ, মিলি দাস, হরিহর বৈদ্য, নবকুমার।



বাংলা গল্প---

দীপক কুমার মাইতি, আব্দুস সাত্তার বিশ্বাস, সিদ্ধার্থ সিংহ, অমিত পাল, উম্মেসা খাতুন, রানা জামান।



বাংলা গদ্য তথা রম্য রচনা---

সত্যেন্দ্রনাথ পাইন,
অরবিন্দ সরকার।



ইংরেজি কবিতা--

Namita Basu, Pavel Rahman, Sunanda Mandal.



Photography---


Moushumi chandra, 
Sohini Shabnam.

Monday, November 29, 2021

Photography by Sohini Sabnam

 


Photography by Moushumi chandra

 


লেখক শ্যামল চক্রবর্ত্তী -এর একটি গদ্য

 দুষ্টু শংকর 

                       

        ‌‌             

শংকর শিয়ালদা স্টেশন থেকে প্রতিদিন ডানকুনি যাতায়াত করে। কয়েকজন ডেলি প্যাসেনজার। কাজের সূত্রে প্রতিদিন সকাল আটটা পাঁচ এর গাড়িতে যায়। লোকাল ট্রেন। সঙ্গে ওর অনেকগুলো বন্ধু বান্ধব। ট্রেনে প্রতিদিন যাকাতের পরিচিত বন্ধু বা গ্রুপ থাকে। একদিনের মজার ঘটনা।

একদিন দুপুর বেলা চারটে পাছে ডানকুনি লোকাল এর গ্রুপ ফিরছিল।

শংকর: অজয় আজ একটা মজার ঘটন ।


অজয়: কি ঘটনা রে?

শংকর: আমি আজকে প্রচুর পরিশ্রম করেছি। তুই তো জানিস আমি কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করি। আজ প্রচুর চিঠিপত্র ছিল বস্তা বস্তা চিঠি সরাতে হয়েছে। হাতটা ব্যথা কালরাত্রি ঠিক করে ঘুম হয়নি। আজ প্রচুর ক্লান্ত আর খুব ঘুম আসছে।

অজয় :তাহলে ঘুমাও, এটার কেমন কথা। এইটা আবার মজার ঘটনা নাকি?

শংকর: আরে না না আমি একটা ঘটনার, ঘটতে চলেছে দেখ না।

ওইযে ওইযে ওইযে দেখতে পাচ্ছিস যে ভদ্রলোক পাশে বসে আছে। আস্তে আস্তে!বলেছি আমি দক্ষিণেশ্বর চিনিনা দক্ষিণেশ্বর এলে আমাকে বলে দেবেন ,আমি নামবো।

ভদ্রলোক বললো হ্যাঁ দাদা দক্ষিণেশ্বরে এলে আমি বলে দেবো আপনি নেমে যাবেন।

অজয়: তুই মহা বজ্জাত তুই থাকিস ডানকুনিতে ও তোকে চেনে না ,তুই ওকে মিথ্যা কথা বললি।

আরে না না মা বলেছে প্রতিদিন তুই যখন দক্ষিণেশ্বরের পাশ দিয়ে আসবি মাকে প্রণাম করবি তোর ভালো হবে। তুই বল আমার কি অপরাধ। তুইতো বরণ করে নেবে যাবি। আমি যদি ঘুমিয়ে পরি। তাহলে আমাকে তো আর প্রণাম করা হবে না।

শংকর :ওই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কোথায় থাকেন উনি বললো আমি' জনাই' থাকি।


ইতিমধ্যে অজয় শংকর সমীর দিব্যেন্দু চারজন ছিল। দিব্যেন্দু ,সমীর ,অজয় যথাক্রমে উল্টোডাঙ্গা দমদম বড়নগর স্টেশনে নেমে গেলো।

এরইমধ্যে শংকর নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে।

এইবার বরনগর ছাড়ার পর যখন দক্ষিণেশ্বরে ট্রেন ঢুকছে,


জনাইয়ের ভদ্রলোক: ও দাদা ও দাদা আরে এত ঘুমালে হবে না। আরে আপনার স্টেশনে এসে গেল। আপনি তো নামবেন?

শংকর: (ধড়ফড়িয়ে ঘুম ভাঙলো) কি বলছেন কী বলছেন দাদা? ও দক্ষিণেশ্বর এসেছে?

জামাইয়ের ভদ্রলোক: আরে আপনার স্টেশন চলে গেলে পারবেন না।

শংকর: দাদা ঠিকই বলেছেন। অসংখ্য ধন্যবাদ। 

জনাইয়ের ভদ্রলোক: কি হলো না বলেন না? কি হলো উঠে দাঁড়িয়ে আপনি মন্দিরে প্রণাম করছেন এতবার।

শংকর: অসংখ্য ধন্যবাদ দাদা। কিছু মনে করবেন না ,আপনাকে মজা করেছিলাম। আসলে আমি আজ খুব ক্লান্ত কাল আমার ঠিক ঘুম হয়নি। আমি প্রতিদিন দুপুরবেলা যখন যাই মায়ের মন্দিরে প্রণাম করি। এইটা আমার জন্মদাত্রী মায়ের আদেশ। উনি আমায় বলে গেছেন যখনই তুই মায়ের দক্ষিণেশ্বর মায়ের মন্দিরের পাশ দিয়ে যাবি, প্রণাম করতে ভুলবি না।

আমি যদি ঘুমিয়ে পরি। তাহলে তোমাকে প্রণাম করা হবে না। ওই জন্য আপনাকে একটি মিথ্যা কথা বলেছিলাম দক্ষিণেশ্বর নামবো। এই প্রণাম করার জন্যই আপনাকে বলেছিলাম। আবার আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

জনাইয়ের ভদ্রলোক: দুনিয়ায় এমন লোক আপনার মতন দেখি নি মশাই। অসভ্য। খাবার আপনি হি হি করে হাসছে। ছি ছি এইটা আবার কেউ মজা করে।

শংকর: দাদা আমাকে মনে রাখবেন আমার নাম শংকর। অর্থাৎ আপনি ভোলেবাবা কি সাহায্য করলেন। আর আমাকে বিরক্ত করবেন না। ধন্যবাদ।


লেখক সুজিত চট্টোপাধ্যায় -এর একটি গদ্য

 দর্পনে আত্মারাম 




অন্তেষ্টিক্রিয়া শেষ করে ফিরেই , দাঁতে নিমপাতা কাটো, আগুনের তাপ নাও , লোহা স্পর্শ করে বিশুদ্ধ হও। জানা ই তো আছে নিশ্চিত , অতৃপ্ত আত্মা ঘুরঘুর করছে এখনো , এখানেই আসপাসে।

এইতো ছিল আপনজনের দেহ। ভালবাসার আকুল প্রত্যাশায় মোড়া। তাহলে ! 

সেই দেহস্থ আত্মা অতৃপ্ত , বোঝা গেল কীভাবে ? 

এইতো কথার মতো কথা । 

আরে বাবা,, নিজের সঙ্গে ধাপ্পাবাজি চলেনা। নিজের লোক। রক্তের সম্পর্ক। কোথায় ছিলে বাপধন ? কাজ গুছিয়ে সরে পরেছো। এখন রেড সিগনাল দপদপ করছে। অনুশোচনা,,,,? 

 পাপী শরীর । জ্ঞানপাপী মন। 

কর্তব্যনিষ্ঠার পাঠ মুখস্থ , কন্ঠস্থ, মগজস্থ। শুধু পালনের অনিহা। 

জীবিত কে ভয় নেই । সে বাৎসল্য বোধে ম্রিয়মাণ । কিন্তু , মৃত ভয়ানক । জীবিতের লৌকিক । মৃতের অলৌকিক । 


ক্ষমতা বড়ো লোভনীয়। শুধু নিজের জন্যে। অন্যের ক্ষমতা ঈর্ষনীয়। কর্তব্যপালন -ধর্ম , নিজের প্রতি । অন্যের প্রতি বর্জনীয়। অন্ধকার মনে সাপের বাসা। 

দেহ পুড়লেই স্মৃতি বিলুপ্ত নয় । দেনা পাওনার হিসেব , চুটকি মেরে নিকেশ হয়ে যায়না ।

 অশৌচ দেহ , অশৌচ মন। 

ভেক ধরো, সাজো। নিখুঁত অভিনয়ে প্রমাণ করো তোমার কর্তব্যপরায়ণতা।

 মালসায় হবিস্যি রাঁধো। মুখ ব্যাজার করে ঘি মাখিয়ে আলো চাল সেদ্ধ ঢোঁক গিলে নাও। মাত্র তো ক'টা দিন। খোঁচা খোঁচা চুল দাড়ি, হাঁটু পযন্ত ট্যাঁং টাঁং করা জ্যালজেলে ধুতি, উত্তরীয়র, গলায় ঝুলোনো লোহার চাবি। বগলে কুশাসন। লোকাচার শেষ । তারপর,,, 

তন্ত্রধারকের দুর্বোধ্য দেবপুঁথি উচ্চারণ কে আরও দুর্বোধ্য ক'রে হয়ে যাও শুচি শুদ্ধ। 

বিগ সাইজ পারশে মাছ সহযোগে সবান্ধবে সেরে ফ্যালো অন্তিম কর্ম।

আহা,, উনি পারসে বড্ড ভালবাসতেন । 

 ব্যাস। নিশ্চিন্দি। আর ভয় নেই। ভাবনা নেই। ঝাড়া হাত পা। আত্মা তৃপ্ত । পরমাত্মার জয়জয়কার কেত্তন। বুক ফুলে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি । 


কোথাও কী কোনও ফাঁক রয়ে গেল ? দ্যাখনদার লোকাচার কেরামতিতে ? 

মন মোমবাতি বাতাসে দুলছে। সারারাত বিনিদ্র এপাশ ওপাশ । 

অর্ধাঙ্গিনীর শাস্ত্রসম্মত সাবধানী মাঝরাতের উপদেশ,,,, 

অতো খুঁতখুঁত ক`রো না তো। বাৎসরিক কাজে পুষিয়ে দেওয়া যাবে খন। গয়া কিংবা হরিদ্বার। একটু বেড়ানোও হয়ে যাবে সেই ফাঁকে । এখন ঘুমোও দেখি । যথেষ্ট করেছো , আবার কী,,,, 


মৃত বড়ো ভয়ংকর। জীবিত নিরীহ । বাৎসল্য বোধে টইটম্বুর । 

কোথায় যেন মন্দ বাতাস বইছে । কে যেন কু গাইছে। একটা খিকখিক তাচ্ছিল্য হাসির শব্দ । ফিসফিস করে , কানের পাশে পরিচিত কন্ঠ,,,, শ্রদ্ধাহীন শ্রাদ্ধ,,, হায়রে গর্ভজাত আদরের সন্তান আমার,,, হায়,,,

কে ! কে?,,, ও,, তু,,,মি,, বিশুদ্ধ আত্মা !

লেখক অরবিন্দ সরকার -এর একটি রম্য রচনা

        রানীর দেশে

           


ইংরেজদের রানীর মত এক দেশের ,এক রাজ্যের রানী আছে। এখানে রানী সর্বময় কর্ত্রী।লণ্ডনের মত এখানেও রাস্তা জুড়ে লণ্ঠন জ্বলে। ওখানে টেমস্ নদী আর এখানে পর্বতের নদী। রানীমা ইচ্ছে বা মনে করলেই এখানকার আবহাওয়া লণ্ডনের মত হয়ে যাবে। তাঁর ইচ্ছা স্বর্গরাজ্য দখল।

মন্ত্রী পারিষদ জো হুকুম আজ্ঞাবহ রাজকর্মচারী।সব দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী তার প্রেরণার কথা উল্লেখ করেন।না করলেই তার ইস্তফা দফারফা মন্ত্রীত্বে। রাজ্যময় তার ছবিশ্রী।ছবি যেন ভালো হয় দেখতে নইলে ঐ দপ্তরের আধিকারীকদের দূরে বদলি। সংসারের মায়া ত্যাগ করে সুদূরে তার প্রাণান্তকর অবস্থা।

সরকারী পায়খানা তৈরীতে রানীমার প্রেরনা।ফিতে কেটে পায়খানার মধ্যে মন্ত্রীর বক্তব্য রানীর প্রেরনায় পায়খানা করলাম।

গণবিবাহ অনুষ্ঠান তাঁর প্রেরনায়। সিঁদুর দান,বাসরসজ্জা এগুলোও। সন্তানের দায় দায়িত্ব তাঁর প্রেরনায়।

প্রেমে উৎসাহিত করা তাঁর প্রেরনা। নিত্যপ্রয়োজনীয় মদের দাম কমানো তারই প্রেরনা। কলকারখানা ধ্বংস ও বন্ধে তার প্রেরনা।

এরোপ্লেনে প্ল্যান পরিকল্পনা , অথবা পর্বতের মাথায় শৈলনিবাসে।

দুমদাম আদর সোহাগ যাকে তাকে! রন্ধন শিল্পে পারদর্শিনী। মসজিদে নামাজ, মন্দিরে পূজো,গীর্জায় বড়দিন ছটপূজোয় দণ্ডিকাটা পালনে জয়গান। ভুলভাল মন্ত্রে পূজো, নাটুকেপনার মধ্য দিয়ে বোরখা পড়ে আচার বিধি অনুকরন।

মেলা খেলা পূজোয় মোচ্ছবে ভর্তুকি, বামের দেনা ডানে বহে কতো তার কারচুপি।

পড়াশোনায় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি।পরে নির্দ্বিধায় ডক্টরেট ডিগ্রি ত্যাগ, রাজ্যের উন্নয়নের জন্য। শিলান্যাস দেখে মনে হয় যেন শিলাবৃষ্টি হয়েছে। যত্রতত্র শিবলিঙ্গের মতো বসানো।

বহু আত্মত্যাগ করে আজ তিনি চির কুমারী রানী।

রাজা বাদশাহের প্রচুর রানী থাকে।আর রানী হলে তো রাজা থাকবেই! রাজা আছে কি নাই সেটা একমাত্র ভজাই জানে। তবে সন্তানের ব্যবস্থা হয়ে গেছে তার প্রেরনায়।তার আজ্ঞাবহ পুলিশ প্রশাসন।আইন তার তালুর মধ্যে,তাই আইন নিজেই তৈরি করেন।পরের আইন থোরাই কেয়ার।খোদা বা ঈশ্বর পর্যন্ত তাকে ভয়ে ডরাই।

খেলা হবে-- এই খেলতে গিয়েই মিছেমিছি পায়ে লাগা, পরক্ষণেই পা ভেঙে চুরমার।প্লাস্টার নিয়েই গোটা রাজ্যে খেলা খেললেন। যেমন রেফারি বললেন গো-- ল! অমনি সঙ্গে সঙ্গে পা জোড়া লেগে গেলো। কিছু ঠেলাগাড়ির লোকের কর্মসংস্থান শিকেয় উঠলো।

বিধবাদের ভাতা, কুমার কুমারীদের প্রেমভাতা,সধবাদের হাতখরচ ভাতা। বেকারদের কাজ ভুলিয়ে মদভাতা।অর্থবল থাকলে তবেই চাকুরীর সুযোগ , টাকার পঁচাত্তর পঁচিশ ভাগ কাটমানিভাতা।

সবাই যদি চাকুরী করে তাহলে রাজ্যের উন্নয়নে মজুর কোথায় পাওয়া যাবে। গরীবদের সরকারি চাকুরী করতে নেই! বেসরকারি কাজও তো কাজ।রাখাল,মজুর,দাস দাসী তো লাগবে তাই এই ব্যবস্থা।আর মন্ত্রীরা চিরদিন থাকবে রানীর দলের দলদাস। 

ঠিক কিনা? -- ঠিক ঠিক ঠিক!

প্রাবন্ধিক সত্যেন্দ্রনাথ পাইন -এর একটি প্রবন্ধ

 মৃত্যু আসলে দৃশ্যমান পটপরিবর্তন



 

মৃত্যু কোনো বেদনা নয়, পরিপূর্ণ বিশ্রাম। কর্মক্ষম মানুষ অদ্ভুতভাবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে অবধি নির্ঝঞ্ঝাট কর্মজীবন করতে ভালোবাসে। ইন্দ্রিয় সুখ, ভোগ- লালসা সবই হয় লীলায়িত মধুর।

     শৈশব, কৌমার, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব,বার্দ্ধক্য এবং জরা সবই হোলো জীবনের ঐ ক্রমবিকাশের বিবর্তন। মৃত্যু তো আর একধাপ উন্নত পর্ব মাত্র।

    ক্রমোন্নতির পথে এক শরীর অন্য শরীরের খোঁজে প্রস্তুতি নিতে গিয়েই আনে " মৃত্যু" নামক অহংকারহীন বিশ্রাম। তাই হয় দেহান্তর।

     অর্থাৎ দেহের কর্মক্ষমতা কমলেই দেহধারী জীব অন্য দেহের সন্ধান করে। যেমন কোনও কিছু জড় বস্তুও যখন আর সক্রিয় বা সচল থাকে না আমরা তাকে বদল করি নির্দ্ধিধায়। এ- ও সেই রকমই দেহের বদল দেহ নিজেই করে। আমরা যার নাম দিয়েছি-- মৃত্যু।

      তাই না! আমাদের ' শরীরের' বৃদ্ধি যখন ক্রমশঃ হতে থাকে আমরা মানুষরা কত আনন্দ পাই; বুদ্ধির বিকাশেও আমরা নত না হয়ে উন্নত বুঝি- তেমনি হাঁটি হাঁটি পা পা করে ইন্দ্রিয় সকল বিশ্রাম পেতেই দেহান্তরে যেতে চায়। এটাই তো আমাদের মৃত্যু ভয়।

   কারণ, এই মুহূর্তে যাকে জীবন্ত দেখলাম, কথা বললাম, স্পর্শ সুখ অনুভব করলাম সেই উচ্ছ্বাস আর পাচ্ছিনা বা চিরতরে হারিয়ে গেল। অতএব, জাগতিক দুঃখ, মায়া আমাদেরকে নাস্তানাবুদ করতে শুরু করলো। কারোর মৃত্যু মানে শেষ বা সমাপ্তি নয়--+! নির্ঝঞ্ঝাট পরিবর্তন।

আমরা পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী। ভেবে দেখলে দেখা যাবে মূর্তি আরাধনা শেষে যখন তাকে( প্রতিমা) নিরঞ্জন করি তখন কি আমাদের সমপরিমাণ দুঃখ হয়!? বরং চিৎকার করে বলিনা-- " আবার হবে আসছে বছর"? কোনও দুঃখ না করেই প্রতি মাকে বিসর্জিত করি বরং। এ- ও তো সেই প্রতিমা। মৃত্যু তাকে মুক্তি দিল। অতএব সুষ্ঠুভাবে সদাচারে তাকে বর্জন করাই শ্রেয় নয় কি!?

   " ধী' ব্যক্তি মানে বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা হাসি কান্না বর্জন করে নতুন পর্বে প্রবেশের নতুন সংগা খোঁজেন। কোনও ঋতু যেমন চিরস্থায়ী নয়--- পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী তেমনই জীবনের ক্রমবিকাশে মৃত্য ও হোলো এখানে চরমতম বিবর্তন। কৌমার, যৌবন ফেলে প্রৌঢ়ত্ব ও বার্দ্ধক্য শেষে দেহান্তরে যাবার এক শ্রেষ্ঠতম পর্ব। তাই মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে, দুঃখ না করে যে বা যাঁরা বুঝতে চেষ্টা করেন তার বা তাঁদের দুঃখ ও কম।

     অবশ্য অকালমৃত্যু বা দুর্ঘটনায় মৃত্যুটা ঐ অসাবধানে হাত থেকে পড়ে কাঁচের কোনো শৌখিন বস্তুর ভেঙে যাবার মতই। যদিও কাঁচের বস্তুটি আবার সংগ্রহ করা যায় কিন্ত্ত দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা অকালে ঝরে যাওয়া মানুষ কে আর ফিরে পাবনা ভেবে মায়া বদ্ধ মানুষ কেঁদে ভাসায়। । যার অন্তিম ফল-- শূন্য। প্রশ্ন সংশয়াতীত নয়-- তবুও--!! শোক পরিহর্তব্য।।

       শিশুর জন্মলগ্ন থেকেই শিশুটির জীবন পরিধি ক্রমশঃ ক্ষয় হতে থাকে। যেমন একটা প্রভাত শেষে একটা নতুন দিন ; কিন্তু কেউ কি ভাবি ঘড়ির কাঁটারয মতোই সে পলে পলে সেকেন্ডে সেকেন্ডে শেষ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। আর একটা নতুন প্রভাত আসবে তাই।

-- জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে এই তত্ত্ব টাও খেয়াল করলে বোঝা যাবে মৃত্যু ভয়ংকর নয়। মৃত্যু জীবনের যবনিকায় শেষ পর্ব মাত্র।

  মৃত্যু আসলে--

    শরৎকালীন শিশিরের মতোই

দৃশ্যমান পটপরিবর্তন....... 

লেখিকা উম্মেসা খাতুন -এর একটি গল্প

 মৌনালির মনে দুঃখ


                     


স্বর্গীয়া ননীবালা দেবী অমিতের মা। তিনি কাঙালদের খুব ভালোবাসতেন। নিজে না খেয়ে কাঙালদের খাওয়াতেন।

তাঁর আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে অমিত তাই একটা কাঙালি ভোজের আয়োজন করেছে। প্রায় শ' খানেক কাঙাল ভোজ খেতে এসেছে। তাদের সাথে তাদের ছোট ছোট বাচ্চারাও এসেছে।

অমিত নিজ হাতে তাদের খাওয়াচ্ছে। আর মৌনালি গেটের কাছে একটা টুলে বসে রেজগি পয়সা বিতরণ করছে।

হ‍্যাঁ, খাওয়াতে খাওয়াতে অমিত একটা বাচ্চার খাওয়া দেখে আশ্চর্য হল। বাচ্চাটার গায়ে কোন কাপড় নেই। পরনে শুধু ছেঁড়া একটা হাফ প‍্যান্ট রয়েছে।

বাচ্চাটা কী সুন্দর করে খাচ্ছে! কেউ তাকে খাইয়ে দিচ্ছে না। বা খাওয়ার জন্য কেউ সাধাসাধি করছে না। আপন ইচ্ছায় সে নিজ হাতে কত সুন্দর করে খাচ্ছে, ঝাল তরকারি দিয়ে ভাত মেখে----

অথচ এই বাচ্চাটার মতন অমিতের নিজের একটা বাচ্চা রয়েছে। সে এখন ঘুমাচ্ছে।

ফ্রিজে তার জন্য কত রকমের খাবার রাখা রয়েছে। তার যখন যেটা ইচ্ছা করবে সেটা সে খাবে বলে। কিন্তু সে সব সে কিছুই খায় না। ভাত তরকারি তো মুখেই করে না। যদিওবা করে ওই দু-একবার। তারপর খুব ঝাল বলে অমনি জল চায়। পরে আর একবারও মুখে করে না। ওকে কি আর খাবার খাওয়া বলে? তাও আবার খাওয়ানোর সময় মোবাইল, খেলনা, পাখি ও আরও কত রকমের কত জিনিস দেখানোর পর। না হলে যে সেটুকুও খাবে না।

খাবার খায় না বলে ডাক্তার দেখানোও কামাই নেই। এই তো সেদিনই পাঁচশো টাকা ভিজিটের একটা ডাক্তার দেখিয়ে আনল। ডাক্তার দেড় হাজার টাকার ওষুধ দিয়েছে। সব ওষুধ খাওয়াচ্ছে তবু কোন কাজ হচ্ছে না, ভালো করে খাবার খাচ্ছে না। আর এই বাচ্চাটা?

রাত্রে অমিত মৌনালিকে কথাটা যেই বলে অমনি তার কান্না চলে আসে। ঠাকুর তাদের বাচ্চাটাকে যদি ভালো করে খাবার খাওয়া ধরাত!

হায়! মৌনালির মনে কী দুঃখ!

লেখক অমিত পাল -এর একটি গল্প

 রুমী

              


করালীবাবু নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসেন কুকুরটিকে৷ নাম তার রুমী৷ খাঁটি দেশী কুকুর৷ বাজার করতে গিয়ে এই কুকুরটিকে কিনে বাড়ি ফেরেন৷ দাম তিন হাজার৷


করালীবাবুর বড় মায়া পরে গিয়েছিল কুকুরটির প্রতি৷ তাই করালীবাবুর স্ত্রী রমাদেবী কুকুরটি সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেই করালীবাবু বলে ওঠেন---- 'সখের দাম লাখ টাকা৷'


হঠাৎ একদিন করালীবাবুর বাড়িতে ডাকাত পড়ে৷ কিন্তু সজাগ রুমী ডাকাতদের বাড়িতে ঢুকতেই দেয়নি৷ বাঘের মতো চেহারা হয়েছে রুমীর, দেখলেই গা ছমছম করে৷ ব্যস এরপর থেকেই করালীবাবুর স্ত্রীর কাছে রুমী সন্তনের সমান৷


বহু বছর হল করালীবাবুর ছেলে বিয়েথাওয়া করে বউ-ছেলে নিয়ে বিদেশে চলে গেছে৷ এখন এই রুমীই করালীবাবু ও রমাদেবীর একমাত্র কাছের সন্তান৷

লেখক সিদ্ধার্থ সিংহ -এর দুটি গল্প

 বিষ




গেটের মুখে জটলা। একটি মেয়ে ভেতরে ঢুকে দেখল মৃত স্বামীর মুখ থেকে গাঁজলা বেরোচ্ছে। মাথার কাছে বসে আছেন তাঁর স্ত্রী। সেই স্ত্রীকে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, আপনার স্বামী কী করে মারা গেছেন?

স্ত্রী বলল, বিষ খেয়ে।

মেয়েটি বলল, কিন্তু ওনার সারা গায়ে তো আঘাতের চিহ্ন দেখছি!

স্ত্রী বলল, বিষ খেতে চাইছিল না তো, তাই...


--------------------------


যাচ্চলে




রেস্টুরেন্টের এ টেবিলে ও টেবিলে প্রেমিকদের মুখোমুখি বসেছিল বিভিন্ন মেয়েরা। একটি ছেলে মোবাইলে বেশ জোরে জোরেই বলতে বলতে ঢুকল, তোর প্রেমিকাকে তো দেখছি এখানে অন্য একটা ছেলের সঙ্গে বসে আছে...

তার কথা শেষ হল কি হল না, দেখা গেল, যে মেয়েগুলো ওই ছেলেদের সঙ্গে বসেছিল, তারা যে যেভাবে পারল পড়ি কি মড়ি করে সোজা রেস্টুরেন্টের দরজা দিয়ে ঝটপট বেরিয়ে গেল।

এই দৃশ্য দেখে ছেলেটি শুধু বলল, যাচ্চলে!

লেখক আব্দুস সাত্তার বিশ্বাস -এর একটি গল্প

 অন্ধ সমাজ


               

                         ।। এক।।

প্রতিদিন সকাল পাঁচটার মধ্যে ঘুম ভাঙে নিহারুলের। আজকেও তার ব‍্যতিক্রম হল না। যদিও আজ তার ব‍্যতিক্রম হওয়ার কথা ছিল। শুতে যে তার অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ফলে নিহারুল ধরেই নিয়েছিল যে, আজ তার ঘুম থেকে উঠতে দেরি হতে পারে। ও আজ তার হাঁটতে বেরনো নাও হতে পারে। তারপর নিহারুল মনের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নিয়েছিল যে, একটা দিন না হাঁটলে এমন কোন অসুবিধা বা ক্ষতি হবে না। আজ তিন বছর ধরে সে তো হাঁটছে। কোন দিন হাঁটা কামাই নেই। লিভারের চর্বি কাটানোর জন্য ডাক্তারের পরামর্শে নিহারুল কাজটা করে ভালো আছে।

হ‍্যাঁ, ঘুম থেকে উঠে নিহারুল যখন হাঁটতে বেরনোর জন্য তৈরি হল অমনি তার ফোনটা বেজে উঠল। ছায়ার নম্বর থেকে ফোন। তবে কি ছায়ার লেবার পেন উঠেছে? সেটা জানাতে ফোন করেছে? কাল বিকালেই তো ছায়ার সঙ্গে তার ফোনে অনেকক্ষণ ধরে কথা হল এবং ডেট এর কথা জিজ্ঞেস করলে আগামী বাইশ তারিখের কথা বলল। আজ তো সবে বারো তারিখ হল। বাইশ তারিখ আসতে এখনও দেরি আছে। তাহলে কি অন্য কোন সমস্যা হল? ভাবতে ভাবতে নিহারুল ফোনটা ধরল," হ‍্যালো!"

" কে, ভাই?"

" কে, সজল?"

" হ‍্যাঁ।"

" কী হল, বল।"

" বুবুর লেবার পেন উঠেছে।"

" কী!" নিহারুল চমকে উঠল।

" হ‍্যাঁ। বুবুকে নিয়ে আব্বা-মা হাসপাতালে যাচ্ছে।"

নিহারুল এখন তার নিজের বাড়িতে রয়েছে। যে বাড়িতে তার বাবা বা ভাইদের কারও কোন অংশ নেই। নিজের টাকায় সে বাড়ি করেছে। বছর সাতেক আগে সে একটা লটারি জিতেছিল। প্রথম পুরস্কার, এক কোটি টাকা। ওই টাকায় জায়গা কিনে সে বাড়ি করেছে। দেখবার মতো খুব সুন্দর একটা বাড়ি। তার বাবার অনেক বিষয় সম্পত্তি থাকলেও ওই বাড়ি নেই। শুধু তার বাবার কেন? তার ভাইদেরও নেই। ফলে নিহারুল এখন খুব সুখী। কিন্তু এক সময় সে খুব দুঃখী ছিল। তার প্রথম কন্যা সন্তান 'মায়া' জন্ম নেওয়ার পর।

                             ।। দুই।।

নিহারুলরা মোট পাঁচ ভাই, বোন নেই। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে নিহারুল হল প্রথম। কিন্তু বিয়ে করে সে সব শেষে। তার সব ভাইদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর। তার সব শেষে বিয়ে করারও উপযুক্ত একটা কারণ আছে। সেটা হল, তারা কয়েক জন বন্ধু মিলে একটা স্কুল চালাত, জুনিয়র হাইস্কুল। তাদের আশা ছিল স্কুলটা হয়ে যাবে এবং সরকার তাদের কাজে খুশি হয়ে বেতন দেবে। তারপর বিয়ে করবে। করে সুখী হবে। কিন্তু বছর দশেক চালিয়েও স্কুলটা হল না। ফলে বিয়ে করতে তার দেরি হয়ে গেল।

নিহারুল যখন বিয়ে করে তার ভাইয়েরা তখন কে দুটো কে তিনটে করে ছেলের বাবা হয়ে গেছে। নিহারুল ছাড়া তারা যে কেউই লেখাপড়া করে নি। সব ক অক্ষর গো-মাংস। সুতরাং তারা কেউই বেকারের জ্বালা বোঝে নি। হাফ প‍্যান্ট পরা ছেড়ে যেই লুঙ্গি পরা শিখেছে অমনি বিয়ে করে নিয়েছে। যে কারণে নিহারুলের মতো চাকরির জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয় নি। তাও আবার নিজেরা পছন্দ করে। কিন্তু নিহারুল বিয়ে করে তার বাবার পছন্দ করা মেয়েকে। তারপরও বছর খানেক বাদে ছায়ার পেটে যখন বাচ্চা আসে তার বাবা সামির সেখ তাকে বলে," বৌমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে ওয়াশ করিয়ে আনছিস না কেন?"

নিহারুল বাবার এহেন কথার তাৎপর্য কী ঠিক বুঝতে পারে না। তাই, সে জিজ্ঞেস করে," কীসের জন্য ওয়াশ করিয়ে আনতে বলছেন?"

" ও, এখনও বুঝতে পারিস নি না!"

" না, বুঝিয়ে বলুন!"

সামির সেখ বুঝিয়ে বলে," বৌমার পেটে কন্যা সন্তান রয়েছে। কন্যা সন্তান নেওয়া যাবে না। তাই, ওয়াশ করিয়ে আনতে বলছি।"

নিহারুল এর কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সে জিজ্ঞেস করে," আপনাকে কে বলেছে?"

সামির সেখ হাসে," আমাকে কে বলবে, পেট দেখে আমি বুঝতে পারছি না!"

" পেট দেখে কী করে বুঝতে পারছেন? ডাক্তার বাবুরাই তো বুঝতে পারেন না।"

সামির সেখ এর উত্তরে তখন বলে," কন‍্যা সন্তান হলে পেট বেশি মোটা আর চওড়া হয়। দেখছিস না, বৌমার পেট কত মোটা আর চওড়া!"

" কিন্তু কন‍্যা সন্তান থাকেও যদি তাকে নষ্ট করতে হবে কেন?"

" তারও কারণ আছে।"

" কী কারণ আছে?"

" কারণটা হল, আমি কন্যা সন্তান পছন্দ করি না।"

" সে কী! পছন্দ করেন না কেন?"

" পছন্দ করি না কারণ, সম্পত্তির ভাগ বেরিয়ে যাবে। আর তাছাড়া, মেয়েরা হল জঞ্জাল আর আবর্জনার স্তূপ। এরা বাপের কোন কাজে লাগে না, কোন উপকারে আসে না। স্বামী-সংসার পেয়ে গেলেই পর হয়ে যায়। এমনি তো আর আগে যুগে মানুষ কন্যা সন্তান হত্যা করত না! মেরে মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখত না! এই সব কারণের জন্য।"

শুনে নিহারুলের গা রাগে রি রি করতে থাকে, সামির সেখের টোল পড়া দু' গালে ঠাস ঠাস করে দু' চড় বসিয়ে দিতে তার ইচ্ছে করে। কিন্তু তা পারে না। বাবা বলে বেঁচে যায়। কিন্তু বলতে ছাড়ে না," মেয়ে হয় আমার হবে। তাতে আপনার কী? আপনার মনে এত বিষ ধরল কেন, শুনি!"

" শুনতেই যখন চাস, শোন তাহলে।" সামির সেখ বলে," উত্তরাধিকার সূত্রে তুই আমার কোন সম্পত্তির ভাগ পাবি না, মানে আমি তোকে আমার সম্পত্তির ভাগ দেবো না। আমার সব কিছু থেকে তোকে বঞ্চিত করব। কেননা, তোকে ভাগ দিলে তোর মেয়ে ভাগ পেয়ে যাবে। আমি সেটা কখনোই চাই না, হতে দেবো না।"

সামির সেখের মুখের উপর নিহারুল তখন বলে," আপনার মতো চিন্তার মানুষ পৃথিবীতে অনেক আছে। আগেও ছিল এবং এখনও আছে। তবে তাদের জন্য আমার কষ্ট হয় না। কষ্ট হয় আপনার জন্য। কারণ, আপনি আমার বাবা। একটা জঞ্জাল লোকের আমি ছেলে। নিজের প্রতি এর জন্য খুব ঘৃণাও হয়।"

" কী বললি, আমি জঞ্জাল!" সামির সেখ চেঁচিয়ে ওঠে।

" শুধু জঞ্জাল হলে তো ভালোই হতো, ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যেত। আপনি তার চাইতেও বেশি।"

" মুখ সামলে কথা বলবি, হারামজাদা!" সামির সেখ চিৎকার করে।

" আপনিও মুখ সামলে কথা বলবেন।" তারপর নিহারুল নিজে থেকেই থেমে যায়। কারণ, সে বুঝতে পারে যে, একটা মূর্খ লোকের সাথে তার তর্ক করা ঠিক হচ্ছে না, সে ভুল ক‍রছে। সামির সেখ যদিও মূর্খ নয়, শিক্ষিত। আগেকার উচ্চমাধ্যমিক পাশ। সে সময় সে বেশ কয়েকটা চাকরি পেয়েছিল। কিন্তু আর্থিক অবস্থা ভালো থাকার দরুন চাকরি সে করে নি। তবু অরুচিকর ব‍্যবহারের জন্য নিহারুলের চোখে সে একটা মূর্খ ছাড়া আর কিছুই নয়। এতদিন সে তার বাবাকে একটা ভদ্র, শিক্ষিত এবং মার্জিত রুচির মানুষ বলে জেনে এলেও সে যে আসলে একটা নীচ মনের মানুষ নিহারুলের কাছে তখন সেটা পরিষ্কার হয়ে যায় এবং পরে ছায়ার পেট থেকে যখন খুব সুন্দর একটা ফুটফুটে কন‍্যা শিশু সন্তান জন্ম নেয় নিহারুল খুব খুব খুশি হয়। মুখটা তার কী মায়াময়! ফলে নিহারুল তক্ষুনি তার নাম রেখে দেয় 'মায়া'।

কিন্তু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সামির সেখ তাকে বলে," কী রে, আমার কথা ঠিক হল? আমি বলেছিলাম না মেয়ে হবে, হল?"

" হল হল, তাতে আপনার কী? মেয়ে হয়েছে আমার হয়েছে। আমার মেয়ে ব‍্যাপারে আপনি একদম কোন কথা বলবেন না।"

" কথা বলব না মানে? একশো বার বলব। কারণ, যে বাড়িটায় তুই বাস করছিস ওটা আমার বাড়ি। বাপের বাড়িতে থাকতে হলে বাপের কথা শুনতে হবে, বাপের আইন মানতে হবে। তোর বউকে এক্ষুনি তোর তালাক দিতে হবে। না হলে ও বছর বছর শুধু কন‍্যা সন্তানই জন্ম দেবে। আর তোর যে কন‍্যা সন্তানটি হয়েছে তাকে মেরে ফেলতে হবে। কীভাবে মেরে ফেলতে হবে আমি তোকে দেখাচ্ছি। দুই হাতে এই ভাবে গলাটা টিপে ধরে-----" সামির সেখ দুই হাতে নিজের গলাটা আলতো ভাবে টিপে ধরে দেখায়।

নিহারুল গর্জে ওঠে," খবরদার! দ্বিতীয়বার আর ও কথা একদম উচ্চারণ করবেন না। যদি করেন, বাবা-ছেলের সম্পর্কের কথা তাহলে ভুলে যেতে বাধ্য হব।"

" কী! আমাকে চোখ রাঙানো! এই মুহূর্তে তুই আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা কুলাঙ্গার, এই মুহূর্তে তুই আমার বাড়ি থেকে-----"

" হ‍্যাঁ, তাই যাব। থাকব না আপনার বাড়ি।"

" হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ, তাই যা। তোর মতন অবাধ্য ছেলের আমার দরকার নেই। আমার আরও ছেলে আছে তারা থাকবে। আমার বিষয় সম্পত্তি সব তাদের নামে লিখে দেব।"

" তাই দিবেন। আমার দরকার নেই আপনার পাপের ওই বিষয় সম্পত্তির।"

ব‍্যস, তারপরই সামির সেখ নিহারুলের ঘরে এই মোটা একটা তালা ঝুলিয়ে দেয়। নিহারুল তার তীব্র প্রতিবাদ করতে যায়। কিন্তু তার বাপ-ভাইয়েরা সব এক দিকে হয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং তাকে সারা জীবনের মতো বাড়ি থেকে উৎখাত করে।

                              ।।তিন।।

নিহারুল দেশে থাকে না। মনের দুঃখে চোখের জল ফেলতে ফেলতে ছায়াকে তার বাপের বাড়ি রেখে কলকাতা চলে যায়। অনেক ঘুরে ঘুরে একটা রেস্তোরাঁয় কাজ পায়। চেয়ার, টেবিল পরিষ্কার করা ও থালাবাসন ধোয়ার কাজ। যা তার যোগ‍্যতার চাইতে অনেক ছোট। তবু মাইনে খুব কম। কিন্তু খাটুনি বেশি। এই জন্য কিছু দিন করার পর কাজটা নিহারুল ছেড়ে দেয়। কিন্তু দেশে ফিরে আসে না। দেশে ফিরে এসে কী করবে? লোকের জমিতে মুনিশ খাটা ছাড়া। মুনিশ খাটা কাজটা আবার নিহারুলের কোন দিনই পছন্দ নয়। তার থেকে ব‍্যবসা করা ভালো। যে কোন ব‍্যবসা। হোক তা ছোট। তাতে শরীর, মন এবং স্বাস্থ্য সব কিছু ভালো থাকে। পাঁচটা মানুষের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়। অতএব নিহারুল শিয়ালদহ স্টেশনে 'লেবু চা' বিক্রি করা শুরু করে। প্রথম প্রথম কয়েক দিন একটু লজ্জা লাগলেও পরে ঠিক হয়ে যায়। সারাদিন কেটলি হাতে 'লেবু চা লেবু চা' আর রাতের বেলায় ফুটপাতে ঘুম।

এই ভাবে চা বিক্রি করতে করতে একদিন এক টিকিট বিক্রেতার সাথে নিহারুলের আলাপ হয়। নাম তার দীপ। বিধান নগরে বাড়ি। বিবাহিত। তারও খুব কষ্টের সংসার। ছোট একটা কুঁড়ে ঘরে তারা তিনটে প্রাণী বাস করে। তারা স্বামী-স্ত্রী দু' জন, আর তাদের একমাত্র মেয়ে। টিকিট বিক্রি করে তার সংসার চলে। তারও বাবার অবস্থা ভালো। কিন্তু বাবার অমতে নিজের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করে বলে তার এই হাল। নিহারুলও তার লাইফ হিস্ট্রিটা শোনায়। শোনার পর দীপ বলে," তোমার যে আমার চাইতেও বেশি দুঃখ, বেশি কষ্ট গো!" তারপর বলে," ও নিয়ে কোন দুঃখ বা চিন্তা করো না,একদিন দেখবে তুমিই সবার চাইতে ভালো থাকবে, জীবনে প্রচুর উন্নতি করবে। কীভাবে করবে বলতে পারব না, কিন্তু করবে।"

" তোমার কথা যেন সত্যি হয় দীপ, তোমার কথা যেন সত্যি হয়।" বলতে বলতে নিহারুল কেঁদে ফেলে।

দীপ নিহারুলের পিঠ চাপড়ে বলে," কাঁদে না,হবে।"

নিহারুল তারপর আর কাঁদে না। বলে," আমি স্বপ্নেও কোন দিন ভাবি নি যে, আমার মতো ছেলের এই হাল হবে।"

দীপ সান্ত্বনা দেয়," তুমি জানো না, ভালো ছেলেদের কপালে চিরকাল কষ্ট বেশি। সেটা ঘরে হোক অথবা বাইরে। তবে ভালো ছেলেদের জন্য ভগবান ভাবেন। নিশ্চয়ই তোমার জন‍্যও তিনি ভাববেন।"

নিহারুল বলে," তোমার সঙ্গে কথা বলে আমার বুকটা অনেক খানি হালকা হল, দীপ। মনের দুঃখ অনেক খানি লাঘব হল। বল, তুমি কী খাবে?"

দীপ বলে," একটু জল তেষ্টা পেয়েছে অনেকক্ষণ হল। একটু জল খাবো। খাবার জল আছে নাকি?"

" আছে।"

" একটু জল দাও তাহলে, খাই।"

নিহারুল একটা বিস্কুট বের করে দেয়। বিস্কুটটা দেখে দীপ বলে," আমি তো শুধু একটু জল চাইলাম। বিস্কুট কেন?"

নিহারুল বলে," কখন খেয়ে বেরিয়েছ তার ঠিক নেই, বিস্কুটটা খেয়ে জল খাও।"

দীপ নিহারুলের বলার মধ্যে এতটাই আন্তরিকতা দেখে যে, বিস্কুটটা না খেয়ে সে পারে না। তারপর এক কাপ চা খেয়ে নিহারুলকে বলে," তোমার চা, বিস্কুটের দাম কত দিতে হবে বল।"

নিহারুল বলে," দাম দিতে হবে না, আমি তোমার কাছে দাম নেব না। আমি তোমাকে এমনি খাওয়ালাম।"

দীপ তা শোনে না। বলে," এমনি খাওয়া হয়? এটা তোমার ব‍্যবসা না! বল, কত দিতে হবে।"

না, নিহারুল বলে না। দীপ তখন মনে মনে ঠিক করে যে, নিহারুলকে সে একটা টিকিট দেবে। ও অনেক টিকিটের ভিতর থেকে সে একটা টিকিট বের করে দেয়," এই টিকিটটা তুমি রাখো, নিহারুল। কপাল ভালো হলে প্রথম পুরস্কার এক কোটি টাকা পেয়ে যেতে পারো। আর হ‍্যাঁ, আমি এখন কয়েক দিন আসব না। কাল আনন্দবাজারে তুমি দেখে নিও।"

" আসবে না কেন?"

" কয়েক দিনের জন্য শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে যাব।"

" ও, আচ্ছা। কিন্তু দীপ?"

" বল।"

" আমি টিকিট কাটি না যে।"

দীপ বলে," তুমি তো কাটছো না, আমি তোমাকে নিজে থেকে দিচ্ছি। রাখো।"

নিহারুল এবার টিকিটটা হাসি মুখে গ্রহণ করে এবং পরের দিন দীপের কথা মতো টিকিটটা সে আনন্দবাজারে মিলিয়ে দেখে, প্রথম পুরস্কার এক কোটি টাকা তার নম্বরে লেগে গেছে। নিহারুল অমনি আনন্দে কেঁদে ফেলে। তারপর সে চা বিক্রি করা ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে আসে। এসে রোডের ধারে একটা জায়গা কিনে বাড়িটা বানিয়ে ফেলে। পরে নিহারুল দীপের খোঁজে অনেক বার কলকাতা গিয়েছে, স্টেশনে অনেক খোঁজা খুঁজি করেছে, অন্য টিকিট বিক্রেতাদের ধরে ধরে জিজ্ঞেস করেছে। কিন্তু দীপের সঙ্গে তার আর কোন দিন দেখা হয় নি। কেউ তার কথা বলতে পারে নি, কেউ না।

                          ।।চার।।

ছায়া নিহারুলের এই বাড়িতেই ছিল। মাস খানেক হল সে ওখানে গিয়েছে। তার বাবার বাড়ি। তার বাবা এসে নিয়ে গিয়েছে। মায়ার বেলাতেও সে এই সময় ওখানে ছিল। সেবারও তার বাবা এসে নিয়ে গিয়েছিল।

                         ।।পাঁচ।।

সজলের সঙ্গে কথা বলার পর নিহারুলের আর হাঁটতে বেরনো হল না। তক্ষুনি সে বেরিয়ে পড়ল। তাকে যে এক্ষুনি হাসপাতালে ছায়ার কাছে পৌঁছাতে হবে। ছায়া নিশ্চয়ই তাকে খুব মিস করছে। এই সময় মেয়েরা প্রিয় জনকে খুব মিস করে।

হাসপাতালে কদম গাছতলায় ছায়ার মা-বাবা বসে রয়েছে। নিহারুল হাসপাতালে পৌঁছে তাদের দেখে কাছে এগিয়ে গেল," আপনারা বাইরে কেন?"

ছায়ার বাবা বলল," ভিতরে বাড়ির লোক থাকতে দিল না, বের করে দিল। তাই, বাইরে এসে বসলাম।"

" আর ছায়া?"

" ছায়া ভিতরে আছে।"

" বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয়েছে?"

" এখনও হয় নি। হলে মাইকে ডাকবে বলেছে।"

" ডাকেনি?"

" না।"

" সে কী!" নিহারুলের চিন্তা হল।

ছায়ার মা তখন বলল," আমার খুব ভয় করছে।"

নিহারুল জিজ্ঞেস করল," কেন?"

" ছায়া ভর্তি হওয়ার পর দুটো মেয়ে প্রেসার বেড়ে খিঁচুনি হয়ে মারা গেল। ও দুটো বাচ্চা হয়ে হয়ে। ছায়ার কপালে যে কী আছে এক মাত্র খোদাই জানে!"

নিহারুলের চোখে, মুখে এতক্ষণ আতঙ্কের কোন ছাপ ছিল না। সে এতক্ষণ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ছায়ার মায়ের মুখে কথাটা শোনার পর সে কেমন হয়ে গেল। গত মাসে লাস্ট চেক আপে গিয়ে ডাক্তার তার ব্লাড প্রেসার হাই বলেছিলেন। কাঁচা নুন, ঝাল,মশলা ও চর্বি জাতীয় খাবার খেতে নিষেধ করেছিলেন। সুতরাং নিহারুলের চিন্তা বেড়ে গেল। তার কিছু হয়ে গেল না তো? তাহলে সে যে বড় একা হয়ে যাবে, বড় একা। তাদের মায়াও যে মা হারা হয়ে যাবে। তার মায়ের অভাব সে কি পূরণ করতে পারবে? পৃথিবীতে সন্তানের কাছে বাবার চেয়ে মা-ই হল বেশি আপন, বেশি প্রিয়। সে তাকে মানুষ করবে কীভাবে? মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্টে যে তার বুক ফেটে যাবে।...ভাবতে ভাবতে নিহারুলের চোখে জল চলে এল এবং খানিক বাদে ভেজা চোখ দুটো রগড়ে নিয়ে সে বলল," মায়া কোথায়?"

" মায়া বাড়িতে। ওর খালার কাছে রেখে এসেছি।"

মায়ার এই খালার নাম হল সাকিনা। তার বিয়ে হয় নি। কলেজে পড়ছে। মায়া তার এই খালার কাছে খুব থাকে। মায়াকেও সে খুব পছন্দ করে। ছায়ার কিছু হয়ে গেলে মায়ার কথা ভেবে হয়তো তাকে বিয়ে করতে হতে পারে। অতএব মায়ার ব‍্যাপারে তখনকার মতো নিহারুল নিশ্চিন্ত হলেও ছায়ার জন্য তার চিন্তা আরও বেড়ে গেল এবং ঘনীভূত হল। ছায়াকে সে একবার দেখতে পেল না। কে জানে যে এত আগে....তাহলে সে তো দু' দিন আগেই চলে এসে ছায়ার পাশে বসে থাকত। যেমন মায়ার বেলায় ছিল। ছায়ার যেন কিছু না হয়। মা ও শিশু দু' জনেই যেন খুব ভালো থাকে। দ্বিতীয় বিয়ে তাকে যেন করতে না হয়। উপর অলাকে নিহারুল স্মরণ করল। আর তখনই হাসপাতালের মাইকে ঘোষণা হল," ছায়া বিবির বাড়ির লোক কে আছেন, আসুন!"

নিহারুল অমনি ছুটতে লাগল।ছুটতে ছুটতে গিয়ে বলল," সিস্টার, আমি ছায়া বিবির বাড়ির লোক, আমি ছায়া বিবির স্বামী। কী হয়েছে, আমাকে বলুন!"

সিস্টার বললেন," আপনার মেয়ে হয়েছে।"

শোনা মাত্র নিহারুল আর ওখানে দাঁড়াল না। 'আমার মেয়ে হয়েছে, আমার মেয়ে হয়েছে' করে লাফাতে লাফাতে বাইরে বেরিয়ে চলে এল। বাইরে অধীর আগ্রহে বাড়ির লোক যারা অপেক্ষা করছিল খবরটা তখন সবার শোনা হয়ে গেল।

প্রথমটা যেহেতু কন্যা সন্তান হয়েছে নিহারুলের শ্বশুর বাড়ির মানুষের তাই এবার একটা পুত্র সন্তান কাম‍্য ছিল, মানে ব‍্যাটা ছেলে। বিশেষ করে নিহারুলের শাশুড়ি মায়ের। কিন্তু সেটা হল না বলে তার মনটা খারাপ হল। নিহারুলের সামনে তো সে বলেই ফেলল," আল্লা এবারও মেয়ে দিল! একটা ছেলে দিল না!"

নিহারুল তার শাশুড়ি মায়ের কথায় ভীষণ রেগে গিয়ে তার শাশুড়ি মাকে বলল," মেয়ে হল তো কী হল? মেয়েরা কি মানুষ নয়? আপনিও তো মেয়ে। তাহলে আপনি কি মানুষ নন? সুতরাং মেয়ে হয়েছে শুনে.... কেন আপনি?" তারপর সে সাবধান করে দিল," খবরদার! এ রকম কথা আর একদম বলবেন না। অন্তত আমি যেন শুনতে না পাই।"

নিহারুলের শাশুড়ি মা তখন বিরাট লজ্জা পেয়ে গিয়ে নিহারুলের কাছে ভুল স্বীকার করল," আমার ভুল হয়েছে, বাবা।" তারপর জিজ্ঞেস করল," মা ও শিশু কেমন আছে?"

নিহারুলের এটা জিজ্ঞেস করে আসা হয়নি। সুতরাং সে আবার ছুটল," সিস্টার, মা ও শিশু কেমন আছে?"

সিস্টার বললেন,"আপনি কি পাগল আছেন একটা?"

সিস্টারের তাকে এ রকম কথা বলার কারণ কী, নিহারুল সেটা ঠিক বুঝতে না পেরে সিস্টারের মুখের দিকে হাঁ করে তাকাল।

সিস্টার বললেন," মেয়ে হয়েছে শুনে তখন তো নাচতে নাচতে খুব ছুটলেন। একবারও জানতে চাইলেন না, মা ও শিশু কেমন আছে?"

" সরি! আমার ভুল হয়ে গেছে। এখন বলুন,মা ও শিশু কেমন আছে?"

" বাচ্চার অবস্থা ভালো নেই। বমি করছে। নোংরা খেয়ে ফেলেছে। স‍্যালাইন চলছে।"

সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে উদ্ভাসিত নিহারুলের সুন্দর মুখ খানা কেমন ফ‍্যাকাশে হয়ে গেল। তারপর কাঁদো কাঁদো হয়ে জিজ্ঞেস করল," আর মা?"

" মায়েরও স‍্যালাইন চলছে।"

তারমানে মা ও শিশু দু' জনের কেউই ভালো নেই। যার দরুন ভীষণ দুশ্চিন্তায় কেটে গেল পুরো সারাটা দিন এবং পরের দিনও। তারপরের দিন থেকে নিহারুলের মনের আকাশে যত কালো মেঘ ছিল সব আস্তে আস্তে কেটে গেল। মা ও শিশু দু' জনই এখন সুস্থ আছে, ভালো আছে।

পুনশ্চঃ নিহারুলের দুই মেয়ে হল। দুই মেয়েকেই নিহারুল মানুষের মতো মানুষ করবে। এতে তার যত টাকা লাগে সে খরচ করতে রাজি আছে। তারপর তার মেয়ে দুটো মানুষ হয়ে গেলে তার আর কোন চিন্তা থাকবে না। শুধু পুত্র সন্তানের জন্য যারা লালায়িত হয় তাদের দেখিয়ে দেবে যে, শুধু ছেলেরাই নয়, মেয়েদের প্রতি উদার মানসিকতা থাকলে মেয়েরাও মানুষ হয়। পরবর্তীতে নিহারুলের মেয়ে দুটো সত্যি সত্যি মানুষ হয়। মায়া হয় আই পি এস অফিসার। আর দ্বিতা হয় ডাক্তার। নিহারুল সেটা সমাজের মানুষদের আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ওরা দেখে না। আসলে সমাজটাই যে অন্ধ। নিহারুল এর কী ব‍্যাখ‍্যা দেবে!