Sunday, July 24, 2022

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -12


 


আমি বাবার কাছে ফিরে যাবো। এই নরক যন্ত্রণার হাত হতে আমাকে মুক্ত হতে৷ ঐ লম্পটের পৈশাচিক লালসা আমাকে তিলে তিলে দগ্ধ করছে, আর এক মুহুর্তও এখানে থাকবো না। কিন্তু গৃহ হতে বেরুবার পথ না পেয়ে দমাদম ধাক্কা মারতে শুরু করলাম। কোন ফল হলো না।


 মনে হয় আমার শব্দ শুনে সেই বর্ষীয়সী গৌরবর্ণা মহিলা চোখ রগড়াতে রগড়াতে আমার কাছে এসে রুদ্র মূর্ত্তি ধারণ করে দারুন বকাবকি শুরু করলো, কি ভেবেছিস ছুঁড়ি? কপাটে ধাক্কা মারছিস কেন? ভাবছিস বেরিয়ে চলে যাবি? খবরদার এ বাড়ীর এক পা যদি বাইরে রেখেছিস তাহলে পিঠে চাবুকের দাগ বসে যাবে। ও কথা শুনে ভয়ে শিউরে উঠলাম। আমি কি ওর বাঁদী যে ওর কথাতে উঠতে বসতে হবে? 

তাই গলা হাঁকিয়ে বলার চেষ্টা করলাম, আমি কি আপনার ক্রীতদাসী যে আপনার কথা শুনতে হবে?

 হ্যাঁলো ছুঁড়ি শুনতে হবে। তোর মুখ দেখতে রোন্টার কাছে ৮০ হাজার টাকায় কিনিনি।

কি বললেন রন্টুদা আমাকে বিক্রি করেছেন? 

ভালোই তো করেছে, বাড়ীতে না খেতে পেয়ে মরতে চলেছিলি। এখানে খাবি দাবি স্ফূর্তি করবি। শোন্ আর জ্বালাস না বাপু। আজকের মতো ঐ বেঞ্চিটাতে শুয়ে পড়, কাল থেকে সব ববস্থা হবে। 

সে চলে গেলো। ওর কাছে ও কথা শুনে রন্টুদার প্রতি ঘৃণায় আমার সর্ব শরীর বিষাক্ত হয়ে উঠলো। এক অজানা আশঙ্কায় আমি দেহে ও মনে সংকুচিত হয়ে গেলাম। রাগে অভিমানে ধীরে ধীরে আমার শরীরের শিরা উপশিরাগুলো সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে থাকলো। রন্টুদা এত নীচ। এতোখানি বিশ্বাসঘাতক! সে আমাকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে এক লম্পটের হাতে! নিজের দুঃখে আক্ষেপে মনে হলো আত্মহত্যা করি। না-না এ আমি সহ্য করতে পারবো না। এর থেকে মৃত্যু অনেক ভালো। কিন্তু এই পথ তো আমি চাইনি? এভাবে নিজেকে আত্মবলি দিতে চাইনি? বিশ্বাস করে দুটো পয়সা উপার্জনের জন্য রন্টুদার সাথে-না? তাকে দাদা বলতে ঘৃণা করি। সেই বেইমান, বিশ্বাসঘাতক, তার শয়তানীর মুখোস আমি খুলে ফেলেছি। জানতে পারিনি তার হৃদয়ের অন্তরালে এতোখানি নোংরামী ছিলো। সে এতোখানি নীচ মনোবৃত্তি ব্যক্তি তা বুঝতে পারিনি।

সেই সময় মনে পড়লো পাড়ার ছেলে সমীরদার কথা। তিনি রন্টুদার অধঃপতন নিয়ে ঠিকই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন বরং আমি রন্টুদার উপচিকীর্ষার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, তবে কি জানিস রমা, এই বর্তমান যুগে মানুষ বড় পাশবিক স্তরে নেমে গেছে। যদি ওকে বিশ্বাস করিস, তাহলে ওর সঙ্গে যেতে পারিস! কারণ প্রতিবেশী হয়েও কখন এই অসময়ে কোন সহযোগিতা করার মত আমাদের ক্ষমতা নেই। গিয়ে দেখ কি চাকুরী তোকে দিচ্ছে সে। 

সেদিন সমীরদার কথাকে অবজ্ঞা করে রন্টুদাকে আমার মনের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন বুঝছি ওসব তার অন্তঃসার শূন্য ও কৃত্রিম লোক হিতৈষীতা। ভাবছি তার এই বেইমানীর প্রতিশোধ কি করে নেব। সামান্য নারী হয়ে কুখ্যাত সমাজ বিরোধীর সর্বনাশা কার্যকলাপের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো কি?

 এখন কি করবো, এই রুদ্ধ গৃহে বন্দী হয়ে পুরুষের কামাদগ্ধ হওয়ার চেয়ে আমার মৃত্যু শ্রেয়। আমি জানি একবার যে বারবনিতা, চিরকালই সে বারবনিতা। বাবার কথা মনে পড়তেই আরো মুঝড়ে পড়লাম। ঠাকুর এখন কি করি , আমাকে পথ বলে দাও, এই পথ আমার নিকট অসহ্য হয়ে উঠবে। বিবেকের তীব্র দংশনের জ্বালায় আমি ক্ষত - বিক্ষত। তুমি আমার মৃত্যু দাও ঠাকুর। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। মানুষ চেনার মনস্তাপে বার বার দেওয়ালে মাথা ঠুকতে লাগলাম। 

হঠাৎ কার স্নেহ স্পর্শে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালাম। দেখলাম, আমার চেয়ে বয়সে হয়তো তিন চার বছরের বড় হবে, শ্যামল বর্ণের হলেও আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বুঝতে পারলাম দেহের কোথাও কোথাও যেন রূপলাবণ্যের ছাপ আঁকা। আয়ত নেত্র, মসৃণ গন্ড, সুতীক্ষ্ণ নাক, গ্রীবাটিও সুন্দর। তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হয়েছিলো কোন সৌন্দর্য্যে লোক হতে জ্যোতিময়ী রমনী আমাকে এ বিপদ হতে রক্ষা করতে এসেছেন।

 তিনি নম্রকণ্ঠে বললেন, তুমি যে স্বেচ্ছায় এখানে আসোনি তা বুঝতে পেরেছি তোমার কান্না শুনে। কোন মহাপুরুষের ইঙ্গিতে এই ফাঁদে পা দিয়েছো? 

কেঁদে উঠলাম তার কথা শুনে। মুখে কোন প্রকারে বাক্য বের হতে চাইলো না। ওর ধমকে অস্পষ্ট গলায় রন্টুদার ঘৃণ্য জীবনের ইতিহাস সংক্ষেপে বললাম।


তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, এই ভাবেই আমাদের আসতে হয়রে, নইলে কেউ কি সাধ করে এই গরল পেয়ালা পান করতে চায়? নারীর দেহকে যারা ভোগ্য সামগ্রীর মতো মনে করে, যারা নারীত্বের চরম অবমাননা করে, তাদের সান্নিধ্যে কে আসতে। আমিও ঠিক তোর মতো এক পথভ্রষ্টা নারী। পুরুষের শাঠ্যের ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আমি এক গ্লানিময় জীবনে ফিরে এসেছি। তোকে তুই বলে ডাকার দুঃসাহসের জন্য আমাকে মার্জনা করিস। 

ঐ স্নেহময়ীর নারীর দুঃখ ভরা কথা শুনে বললাম, আপনি যখন আমাকে বোনের মতো মনেই করেছেন, তাহলে আমাকে এই অধঃপতিত ও কেদাক্ত জীবনের পঙ্কিলতার আবর্ত্ত থেকে মুক্ত করুন। আমার অন্তরে নারীত্বের শুভ্র শতদল বিকশিত করে তুলুন দিদি। 

তিনি আমার হাত দুটো ধরে অশ্রু ভরা নয়নে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, কোন উপায় নেই রে বোন। একবার যে নারী সতীত্বকে ধূলায় লুণ্ঠিত করে এই পাপ পথের যাত্রী হয়েছে তাকে কোন মতেই মুক্তির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেওয়া হয় না। এখানে বাবু গুন্ডা নামে এক কুখ্যাত ব্যক্তির কাছে ‘ শংকর মাছের চাবুক ' আছে, যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে এই পিঠটা দেখলে বুঝতে পারবি। 

বিলম্ব না করে ব্লাউজটা খুলে আমাকে পিঠটা দেখালেন, দেখলাম অজস্র চাবুকের দাগ। তোর মতো অসহায় নারীকে রক্ষা করতে গিয়ে বাবু গুন্ডা আমাকে অজস্র বেত্রাঘাত করেছে। জানিস ও মানুষ নয় জানোয়ার। তাই বলছি এখান হতে কোন প্রকারে মুক্তি পাবি না। বন্দী শালায় আবদ্ধ হয়ে চিরকাল অশান্তির আগুনের দগ্ধ হতে হবে। নারীদেহ লোভী হিংস্র মানুষের সে যুগ দৃষ্টি কোন মতেই এড়াতে পারবি না। এখানে পরুষের লীলা খেলা চাপল্য খেয়াল খুশীয় সবই নির্বিবাদে সহ্য করতে হবে। প্রতিবাদের কোন পথ নেই রে বোন। 

ওর কথা শুনে পনুরায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। আমার এই ধিকৃত জীবনের অভিশাপের জন্য ভগবানের নিকট অভিযোগ জানালাম। ঠাকুর এই পঙ্কিলময়, নর্দমার নরককুন্ডে কেন আমাকে নিক্ষেপ করলেন? আমি তো কোন অন্যায় করিনি যে, দন্ড স্বরূপ আমাকে এই আস্তাকুঁড়ে আশ্রয়। কান্না বাড়তে থাকলে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন সেই সুন্দরী নারী। ওরে পোড়া কপালী কেঁদে কেঁদে নিজেকে দূর্বল করিস না। শুধু তুই কেন, তোর মতো বহুনারীর জীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছে ঐ শয়তানের দল। তাই বলছি প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা কর। 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন পুনরায় বলতে পারিস, আমার কিসের অভাব ছিল? আমার দাদা একজন ডাক্তার, বাবা একজন ইঞ্জিনিয়ার। অঢেল সম্পত্তি আমাদের। তবুও ভাগ্যচক্রে ঐ শয়তানটার পাল্লায় পড়ে আমাকে বেশ্যা হতে হয়েছে। আমি কি এদের ষড়যন্ত্র ও ছদ্মবেশ জানতে পেরেছিলাম, আমার এই নারী দেহ নিয়ে ওরা ছিনিমিনি খেলা করবে এটা ভাবতে পারিনি বোন।

 ধীরে ধীরে ওর মুখখানি সিঁদুর রাঙ্গা হয়ে উঠলো। ঘন ঘন নিঃশ্বাস তার বুকটা যেন হাপরের মতো উঠানামা করতে লাগলো। তারই মধ্যে চাপা গলায় বললেন, “খবরদার কাঁদবি না, তোকে শক্ত হতে হবে, বুককে পাষাণের মতো করতে হবে। শুধু তুই কেন, বহু মেয়েরা এই পথে এসেছে। তাদের মধ্যে আমরা। প্রতিজ্ঞা কর এই ব্যভিচারী পুরুষদের মুখোস খুলে দিয়ে নারী অবমাননার চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করবি। 

কান্না থামিয়ে অতি ধীর কণ্ঠে বললাম, এতো আমি চাইনি দিদি। 

আমিও কি চেয়েছিলাম? বা অন্য মেয়েরা কি নিজেকে পাঁচের ভোগে লাগাতে চায়? এখানে যত মেয়ে আছে তাদের সকলকে তোর আমার মতো শয়তানদের ফাঁদে পড়ে আসতে হয়েছে। একবার যদি ওরা কোন প্রকারে এই দেহ বিক্রয়ের হাটে কোন নারীকে পণ্য সামগ্রীর মতো হাজির করতে পেরেছে, তাহলে আর রক্ষা নেই, মুক্তির পথ রুদ্ধ। সতীত্ব ও নারীত্ব কাঁচের জিনিষের মতো ভেঙ্গে পড়বে। অসহায় নারী করুন আর্তনাদ এই কুর্নিশ কঠোর শয়তানি কর্ণে প্রবেশ করে না। রাত অনেক হয়েছে, আমার কুঞ্জেই নিশিযাপন করবি চল।

 তিনি আমাকে ওঁর সুসজ্জিত কক্ষে নিয়ে গেলেন। বেদনার অশ্রুজলে আমি এই দয়াময়ী নারীর গৃহভ্যন্তরে বিনিদ্র রজনী যাপন করলাম।



                                 ক্রমশ...

Tuesday, July 19, 2022

ছোট গল্প - মর্যাদাহানি || লেখক - অমিত কুমার জানা || Short story - Marjadahani || Written by Amit kumar jana


 


মর্যাদাহানি

অমিত কুমার জানা 



সোমবার। প্রতিদিনের মতো আজও সৌভিক পৌনে দশটায় মেদিনীপুর স্টেশনে পুরুলিয়া-হাওড়া এক্সপ্রেসে উঠে পড়লো। তিনি পাঁশকুড়ার একটা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক।বিশেষ করে সোমবার অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু বেশি ভিড় থাকে। সেপ্টেম্বর মাস,নদীকূল কাশ ফুলে ভরে উঠেছে। সৌভিক ছোট থেকেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পূজারী। সে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে জানালা দিয়ে নদীকূলের অপার সৌন্দর্য ক্যামেরা বন্দী করছিলেন। এতেও তাঁর মন ভরলো না। তিনি কাশফুলের সৌন্দর্যের ভিডিও রেকর্ডিং করতে লাগলেন। তিনি মোবাইলটা বুকপকেটে রেখে ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে কিছুটা জলপান করলেন। ততক্ষণে ট্রেন খড়্গপুর ছাড়িয়ে বালিচকগামী হয়ে গেছে। 

ঠিক এই সময় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। টয়লেটের দিক থেকে বোরখা পরিহিতা এক মহিলা একজনকে চড় মারতে মারতে বলছেন, " মদ খেয়ে ট্রেনে চড়া অপরাধ আপনি জানেন না? এটা মাতলামি করার জায়গা?" সৌভিক ভালো করে তাকিয়ে দেখলো ইনি তো রসুলপুরের একটা ব্যাঙ্কের কর্মী। রসুলপুর বালিচক এবং পাঁশকুড়ার মধ্যবর্তী স্টেশন। সৌভিকদের সাথে একই কম্পার্টমেন্টে মাঝে মধ্যেই উনার দেখা হয়। সৌভিক উনাকে 'স্যার' বলে ডাকলেন কিন্তু ততক্ষণে বেশ কয়েকজন অপরিচিত যাত্রী উক্ত ব্যাঙ্ক কর্মীর উপর চড়াও হয়েছেন। উনি চড় ঘুঁসি খেয়ে বেশ কুপোকাত হয়ে গেছেন। ট্রেন বালিচক স্টেশনে এসে থামলো। দুজন রেলপুলিশ ট্রেনে উঠে উনার সামনে গিয়ে বুঝতে পারলেন উনি মদ্য পান করেছেন। উনাকে তা জিজ্ঞেস করে রেলপুলিশ কোন সদুত্তর পেলেন না। কারণ মদের নেশায় এবং পাপলিকের প্রহারে তিনি একেবারে নাজেহাল। 

কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো যে বোরখা পরিহিতা ঐ মহিলাকে ওখানে খুঁজে পাওয়া গেল না। আর তিনি রেলপুলিশের কাছে কোন অভিযোগ ও করেন নি। সৌভিক ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন ওভারব্রিজের ওপর হেঁটে যাচ্ছেন জনা তিনেক বোরখা পরিহিতা মহিলা। এই সময় ট্রেন বাঁশি বাজিয়ে রসুলপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো। ট্রেন রসুলপুরে থামলে ঐ ব্যাঙ্ককর্মীকে তাঁর দু একজন সহযাত্রী স্থানীয় চিকিৎসালয়ে ভর্তি করলেন। 


স্কুলে পোঁছে সৌভিক কিছুক্ষণ বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এটেনডেন্স খাতাটা নিয়ে তিনি ক্সাসে যাচ্ছিলেন। দোতলায় ক্লাস নাইনের ভূগোলের ক্লাস । সৌভিক সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠার সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে রিসিভ করলেন। তারপর তাঁর নজরে এলো একটা ভিডিও। ট্রেনে আসার সময় ভিডিও রেকর্ডরটা চালু ছিল। তিনি ভিডিওটি দেখে অবাক হলেন। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ঐ বোরখা পরিহিতা মহিলা ইশারা করে ঐ ব্যাঙ্ককর্মীকে ডাকছেন। টয়লেটের সামনে যেতেই ঐ দুজনকে আর দেখা যায় নি। তারপর ঐ মহিলা চড় মারতে মারতে উনাকে টয়লেট থেকে বের করছেন। ভিডিওটা দেখে সৌভিকের কেমন যেন সন্দেহ হলো ঐ মহিলার উপর। মহিলাটি ঐ ব্যাঙ্ককর্মীকে টয়লেটের দিকে ডাকছিলেন কেন? আবার তিনিই বা উনাকে মারলেন কেন? ঐ ব্যক্তি কখন মদ্যপান করলেন? এইসব কথা ভাবছিলেন সৌভিক। এমন সময় তাঁর মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে গেল সোজা গ্ৰাউন্ড ফ্লোরে। তিনি নীচে নেমে এসে দেখলেন তাঁর মোবাইল ভেঙে একেবারে অকেজো হয়ে গেছে। মনে মনে এটা ভেবে দুঃখিত হলেন যে তিনি ভিডিওটি রেল পুলিশকে দেখাতে পারলেন না। 


পরদিনের ঘটনা। সৌভিক প্রতিদিনের মতো একই সময়ে পুরুলিয়া এক্সপ্রেসে উঠে পড়লেন। ট্রেন খড়্গপুর স্টেশনগামী। এমন সময় ভিড়ের মাঝে এক যুবতী একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোককে কষিয়ে চড় মারলেন। যুবতী চেঁচিয়ে বলছেন, " ভিড়ের মাঝে মেয়ের গায়ে হাত দেওয়া! অসভ্য কোথাকার।" সৌভিক তাকিয়ে দেখলেন ইনি তো রসুলপুরের একটা হাইস্কুলের শিক্ষক। বেশ ভদ্রলোক। উনি জোর গলায় বললেন যে উনি ঐ যুবতীকে স্পর্শ ও করেন নি। তবুও উনার কথা কেউ গ্ৰাহ্য করলেন না। সৌভিক উনাকে চেনেন।উনি মনতোষ স্যার। তিনি তৎক্ষণাৎ ঐ স্যারের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং ভিড় সরিয়ে উনাকে সিটে বসালেন। 

মনতোষ স্যার সৌভিককে বললেন যে উনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। হয়তো অন্য কেউ অসভ্য লোক এই কাজটা করেছেন,যার ফল ভুগতে হলো উনাকে। 

ট্রেন বাঁশি বাজিয়ে খড়্গপুর স্টৈশনে এসে থামলো।

এক অজ্ঞাত পরিচয় যুবক সৌভিক এবং মনতোষের দিকে তাকিয়ে ক্রুর হাসি হেসে স্টেশনে নেমে পড়লেন। সৌভিক উনার কাছে যেতে উদ্যত হচ্ছিলেন, কিন্তু উনি দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে পড়লেন। সাথে সাথে খড়্গপুর থেকে ট্রেন ছেড়ে দিল। 


স্কুলে পৌঁছে সৌভিকের মন খুব ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। তার এটা মনে হল যে পরপর দুই দিনের এই দুর্ঘটনা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলেন না যে এই ঘটনাগুলো কেন ঘটছে। 


পরের সপ্তাহের সোমবার এর ঘটনা। পাঁশকুড়ায় ট্রেন থেকে নেমে সৌভিক শুনতে পেলেন যে আজ অন্য একটা কম্পার্টমেন্টে একজন স্কুল শিক্ষক বোরখা পরিহিতা এক মহিলার দ্বারা প্রহৃত হয়েছেন। ওই স্কুল শিক্ষকের নাম সঞ্জয় বেরা।সঞ্জয় বেরা নামটা শুনে সৌভিক চমকে উঠলেন।

উনি বালিচক হাই স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।


পরদিনের ঘটনাটা সৌভিককে আরো বিব্রত করে তুললো। গতকাল ট্রেনে সঞ্জয় বেরা নামক স্কুলশিক্ষককে একজন বোরখা পরিহিতা মহিলা মারধর করেছিলেন। সেই মারধরের ভিডিও আজ ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে কয়েক শত লাইক কমেন্ট পড়েছে। সৌভিক দেখলেন ভিডিওটি লাইক করেছে তারই এক পুলিশ বন্ধু কোতোয়ালি থানার এস.আই সমরেশ তিওয়ারি। সৌভিক তৎক্ষণাৎ সমরেশ তিওয়ারিকে ফোন করলেন। তারপর তিনি পার্সোনালি সমরেশ তার সঙ্গে দেখা করলেন। দেখা করে তিনি উনাকে বললেন যে ট্রেনে পরপর দুটো সোমবারে যে দুটো দুর্ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে তিনি কিছু বলতে চান। তিনি বললেন যে তিনি ওই ব্যাংক কর্মী এবং সঞ্জয় বেরাকে ভালোভাবে চেনেন। ওই দুইজন অতি পরিচিত এবং ভীষণ ভদ্রলোক। আজ পর্যন্ত উনারা কোন মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন নি। শুধু তাই নয় উনার আজ পর্যন্ত মদ্যপান ও করেন নি। সম্ভবত এটা ঐ বোরখাধারী মহিলার কাজ, হয়তো উনি বিগত কোন ঘটনার বদলা নিয়েছেন এইভাবে।


এরপর সমরেশ তিওয়ারি সৌভিকের কথার গুরুত্ব অনুভব করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিলেন। যে এই ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন তাকে উনি মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করলেন। তিনি তাকে বললেন, " আমি ইউটিউবের একটা চ্যানেল থেকে বলছি, ঐ ভিডিওটি থেকে আপনি অনেক টাকা রোজগার করতে পারবেন। আপনার মোবাইল নাম্বার দিন।" 

সমরেশ মোবাইল নাম্বার পেয়ে গেলেন। তারপর ঐ ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারলেন যে উনার নাম সুতনু। সুতনু এই ভিডিওটি নিয়েছে তার মাসির ছেলের কাছ থেকে। তার মাসির ছেলের আপত্তি সত্ত্বেও গোপনে সুতনু এই ভিডিওটি নিয়ে নেয় এবং ফেসবুকে আপলোড করে ফেলে। 


এরপর সমরেশ আইনি ভয় দেখিয়ে সুতনুকে তার সঙ্গে দেখা করতে বাধ্য করেন। সুতনু যখন জানতে পারে যে সমরেশ একজন পুলিশ অফিসার তখন সে সব কথা গড় গড় করে বলে ফেলে। সমরেশ সুতনু দেওয়া জবানবন্দি মোবাইলে ভিডিও রেকর্ডিং করে ফেলেন। 

সুতোর দেওয়া জবানবন্দিটা ছিল এইরকম:


আজ থেকে ছয়-সাত মাস আগে মার্চ মাসের ঘটনা। সুতনুর মাসি মেসোমশাই এবং তার মাসতুতো ভাই পুরুলিয়া -হাওড়া এক্সপ্রেসে হাওড়া যাচ্ছিলেন। সুতনু মাসির নাম কল্পনা নায়েক। তার মেসোমশাই ভরপুর মদ্যপান করে ট্রেনে চড়ে ছিলেন। তিনি এতটাই মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন যে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিলেন। 

সিটে বসে থাকা বেশ কয়েকজনের সঙ্গে তিনি দুর্ব্যবহার শুরু করেছিলেন। একজন তরুণী তার ব্যবহারে ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলেন কিন্তু তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে ছিলেন। ওই কম্পার্টমেন্টে বসে থাকা অনেকেই নির্বাক দর্শক হয়ে সেই ঘটনা দেখছিলেন। সেই সময় অতিষ্ঠ হয়ে ওই ব্যাংক কর্মী এবং সঞ্জয় বেরা নামক স্কুল টিচার এর তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন। ক্রমশ উনাদের সাথে সুতনুর মেসোমশাইয়ের প্রবল বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। তখন কেউ কেউ বলেন যে ঐ মাতালটাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিন। অসভ্য,অভদ্র কোথাকার! তা সত্ত্বেও ওর মেসোমশাই অভদ্রতা করেই যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় ঐ ব্যাঙ্ককর্মী এবং সঞ্জয় স্যার ওর মেসোমশাইয়ের কলার ধরে চড় লাগিয়ে দেন। এতে সুতনুর মাসিমাও সঞ্জয় স্যার এবং ব্যাঙ্ককর্মীকে চড় লাগিয়ে দেন। আসলে সুতনুর মেসোমশাই যতই খারাপ মানুষ হোক না কেন মাসিমা উনাকে খুব সম্মান করতেন, ভালবাসতেন। 

তারপর বালিচক স্টেশনে রেলপুলিশ সুতনুর মেসোমশাইকে কড়া ভাষায় গালিগালাজ করেন,কিছুক্ষণ বসিয়ে রেখে ছেড়ে দেন। তখনই সুতনুর মাসিমা প্রতিজ্ঞা করছিলেন যে যাদের জন্য তার পতির এতটা মর্যাদাহানি তাদের তিনি ছাড়বেন না। এর প্রতিশোধ তিনি নেবেন। 

এরপর সুতনুর মাসিমা বোরখা পরে নিজেকে আড়াল রেখে ব্যাগে জলের বোতলে মদ রেখে পুরুলিয়া-হাওয়া এক্সপ্রেসে উঠতেন। তারপর যেদিন সুযোগ এল সেদিন ঐ ব্যাঙ্ককর্মীকে টয়লেটে ডেকে বোতলের মদ উনার মুখে ঢেলে দিলেন। পরের সোমবার তিনি বোতলের মদ সঞ্জয় স্যারের গায়ে ঢেলে দিলেন। এইদিন তাঁর ছেলেও সেখানে উপস্থিত ছিল। যখন ভিড়ের মাঝে অনেকে সঞ্জয় স্যারের উপর চড়াও হলেন তখন উনার ছেলে সেই দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করে ফেলে। সব ঠিক ছিল কিন্তু সুতনু মাসির বাড়ি গিয়েই ঝামেলা পাকিয়ে ফেলে। ভিডিওটি ফেসবুকে আপলোড করে ফেলে।


সব শুনে সমরেশ মহিলা পুলিশ নিয়ে চলে এলেন কল্পনা নায়েকের বাড়ি। কল্পনা নায়েককে পুলিশ এরেস্ট করে নিয়ে গেলেন।

Monday, July 18, 2022

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -11


 


হোটেল থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি করে একটা মোড়ে এসে নামলাম। মোড়ের চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম। স্থানে স্থানে লোক জামায়েত রয়েছে। কতকগুলো মেয়ে পুরুষদের সাথে নানা ঢঙে কথা বলছে। হঠাৎ কানে একটা অশালীন কথা ভেসে এলো। কে যেন বলে উঠলো, কি লো রজনী বেশ তো সেজেগোছে রাতের নাগরদের জন্য দাঁড়িয়ে। আছিস, বলি নাগরকে কাছে পেয়েছিলি? 


আবার কে যেন বলে উঠলো, মাইরি বলছি, তোমাকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারি না। কি যাদু জানো বলতো প্রিয়া?

 এরা যেন নারীকে বিলাসের উপকরণ ও ভোগ্য পণ্য রূপে ব্যবহার করেই কৃতার্থ। রন্টুদাকে জিজ্ঞাসা করবার আগে রন্টুদা বলে উঠলো, এ জায়গাটা ভালো নয়। কেদারদার বাড়ীর প্রবেশ পথ বড়ো নোংরা পরিবেশ। তাড়াতাড়ি পা ফেলে এগিয়ে চলো। রন্টুদা একটা গলির মধ্যে নিয়ে এলেন। কোন আলোর ব্যবস্থা নেই বলে একটা টর্চ বের করে এগিয়ে চললেন। আমি অনুসরণ করে চলেছি ওর পিছনে। ঐ অন্ধকারে মিনিট পাঁচের মধ্যে একটা বাড়ীতে প্রবেশ করলাম। বেশ বড় বাড়ীখানা। 

রন্টুদা বললেন, এটা টাইপ মাস্টার মশায়ের বাড়ী। আর স্কুল হচ্ছে অন্য জায়গায়। আমার বাড়ী হতে বিশেষ দূর হবে না। তুমি এখানে একটু বোস, আমি ভেতরে গিয়ে খবর নিয়ে আসছি মাষ্টার মশাই আছেন কি না। রন্টুদা প্রস্থান করলো।

 একটা বেঞ্চে বসে ঘরের চারিপাশটা দেখছি। দেওয়ালে টাঙানো বুদ্ধদেব মূৰ্ত্তি। মূর্ত্তির নীচে কালো রঙের লেখা রয়েছে, “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি”। ভাবলাম মাষ্টার মশাই বুদ্ধদেবকে প্রচণ্ড ভক্তি করেন। হঠাৎ উদয় হলো বাবার কথা। এখন তিনি কি করছেন তা কে জানে? মনে হয় ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করছেন আমাদের যাত্রা সফল হোক। বাবর জন্য চোখ দুটো ছল্‌ছল্ করে উঠলো। কোন প্রকারে নিজেকে সামলে নিলাম।

 এমন সময় কানে ভেসে এলো নারীর কণ্ঠস্বর। কি সুন্দর গান করছে মেয়েটা। মনে হয় মাষ্টার মশায়ের বৌ কিম্বা মেয়ে হতে পারে। খুব ভালো লাগছিলো। গানের অর্থ তো আমার অজানা তবুও সুরটা আমার কাছে মায়াচ্ছন্ন ছিলো। গান ভালো লাগার জন্য ক্ষণিকের জন্য সব কিছু ভুলে কান দুটোকে ওদিকে সজাগ করে রেখেছিলাম।

 হঠাৎ কপাট খোলার শব্দ পেয়ে চমকে উঠলাম। একজন মধ্য বয়সী সুঠাম পুরুষ প্রবেশ করতেই আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। তিনি বসতে বললেন। বসলাম।

 তিনি একটু দূরে চেয়ারে বসে আমাকে বললেন, তোমার কথা রন্টুর মারফৎ শুনে বড় দুঃখ পেলাম। সে বড় উপকারী যুবক। তোমাদের উপকারের নিশ্চয় সে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।

 সলজ্জে আনত মুখে বললাম, রন্টুদা কোথায়?

 তিনি বললেন, রন্টু ওর বৌদির সাথে গল্প করছে। দু - দিন সে আমাদের বাড়ীতে আসতে পারেনি বলে তার কত আফশোষ। ঐ কথা শুনে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো তাহলে বাবার সান্নিধ্যে এড়িয়ে আমিই বা কি করে এখানো থাকবো। বাবার নিয়ে চিন্তা করছি এমন সময় মাষ্টার মশায়ের জিজ্ঞাসায় আমার চিন্তা হলো। 

কতদূর পড়াশুনো করেছো? 

বললাম, মাধ্যমিক পাশ করেছি। 

তাহলে কোন চিন্তা নেই। 

আমাদের কথা চলাকালীন একজন বর্ষীয়সী গৌরবর্ণা মহিলা তাম্বুল চর্বন করতে করতে আমাদের কাছে উপস্থিত হলেন। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মাষ্টার মশায়কে বললেন , যাবার সময় দেখা করবে বাপু। আমি চললাম।

 মাষ্টার মশায় ঘাড় নাড়লেন। তিনি বললেন, তোমার নাম কি রমা? 

হ্যাঁ।

 টাইটেল খাসনবিশ না কি বলল যেন রন্টু... 

না আমার পুরো নাম রমা সিন্হা। 

বেশ, বেশ, তুমি কি কাল হতেই ক্লাস আরম্ভ করবে?

 রন্টুদাকে জিজ্ঞাসা করল ভালো হতো না?

 ঠিক আছে পরে জিজ্ঞাসা করে নেব। চলো আমার সাথে ফরম ফিলাম করতে হবে।

 এবার প্রতিবাদ করে বললাম, আর রন্টুদা? 

কোন ভয় নেই পাশের রুমে আমরা যাচ্ছি ওখানে রন্টু আছে। এসো আমার সাথে।

 পিছু নিলাম, একটা রুম পেরিয়ে ওর পিছনে গিয়ে একটা রুমের মধ্যে প্রবেশ করলাম। কোথায় রন্টুদা! আমি প্রবেশ করতেই মাষ্টার মশাই কপাটের খিলটা তুলে দিলেন।

 বললাম, কপাট বন্ধ করলেন কেন?

 কোন কথা নেই ওর মুখে। শুধু হিংস্ৰ দৃষ্টিতে তাকিয়ে পরনের জামাটা খুলে ফেললেন। লোকটার আচরণে দেখে আমি সন্দিগ্ধ হলাম। ভয়ে ম্যালেরিয়া রোগীর মতো কাঁপতে থাকলাম। তবুও জোর করে কিছু বলার চেষ্টা করবার আগেই আমাকে। তার লৌহ কঠিন বাহু দিয়ে চেপে ধরে তক্তোপশোষে শুইয়ে পরনের পোষাক গুলো ছিন্ন ভিন্ন করার চেষ্টা করলো। লম্পটের লৌহ কঠিন বাহু জাল ছিন্ন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। অপমানে ও ক্ষোভে আমি নিজের নারী জীবনকেই ধিক্কার দিলাম। এই ধিককৃত জীবনের গ্লানি কি করে সারা জীবন বয়ে বেড়াবো!

 ধীরে ধীরে তক্তপোষ হতে উঠবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারছিলাম না। মনে হলো কেউ যেন লোহার শিকল দিয়ে আমার পা দুটোকে বেঁধে রেখেছে তক্তপোষের সাথে। বহু কষ্টে উঠে ছড়িয়ে থাকা শাড়ীটা দেহে জড়িয়ে টলতে টলতে বাইরে এসে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকলাম। একি করলে ঠাকুর! আমাকে অপবিত্র করলে? না - না এর জন্য কেউ দায়ী নয়। এই দৈহিক অপবিত্রতার জন্য আমার ভাগ্য দায়ী। কিন্তু আমি যে কিছু বুঝতে পারিনি। তবে রন্টুদার সব জালিয়াতি? হ্যাঁ, হ্যাঁ, রন্টুদা ঠক প্রতারক, ওর প্রবঞ্চনা বুঝতে পারছি।



                                   ক্রমশ...

Thursday, July 14, 2022

উপন্যাস - লাস্যময়ীর ছোবল || সিদ্ধার্থ সিংহ || Lashamayir Chobol by Sidhartha Singha || Fiction - Lashamayir Chobol part -10 ||অন্তিম পর্ব


 

দশ


ঋজু বাড়ি ঢুকে দেখে বারান্দার গ্রিল ধরে ভারতী দাঁড়িয়ে আছে। এত বছর বিয়ে হয়েছে তার, ওকে কোনও দিন এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি সে। তার খাবার, টেবিলে ঢাকা দেওয়া থাকে। অফিস থেকে ফিরে ও কাউকে ডাকাডাকি করে না। হাত-মুখ ধুয়ে, চুপচাপ খেয়ে নেয়। এঠোঁ বাসন রান্নাঘরের সিঙ্কে রেখে দেয়। কিন্তু আজ হঠাৎ এমন কী হল যে, রাত পৌনে একটার সময় তার বউ এই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। জুতো খুলতে খুলতে প্রশ্ন করল ঋজু, কী হল? শোওনি?
— না।
— কেন?
— শুলে যদি ঘুমিয়ে পড়ি! তোমাকে বলার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।
— কী?
— ও ফোন করেছিল।
— কে?
— কণিকা।
— কণিকা! আকাশ থেকে পড়ল ঋজু।

বইমেলার ইউ বি আই অডিটোরিয়ামে যে দিন দীপ প্রকাশনের অতগুলি বই আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিত হল, তার দু’দিন আগেই, কী কী বই বেরোচ্ছে, তার তালিকায় চোখ বোলাতে গিয়েই একটা নামে চোখ আটকে গিয়েছিল ঋজুর। এটা কী হল! ওর বইও বেরোচ্ছে নাকি!
ঠিক তখনই মনে পড়ে গেল, তার দু’রবিবার আগেই সুবোধ সরকার ওর কাছে কণিকার ফোন নম্বর চেয়েছিলেন। ও ভেবেছিল, অন্যান্য বারের মতো এ বারও বুঝি হয় ল্যান্ড ফোন, নয়তো বি এস এন এলের ব্রড ব্যান্ড নিয়ে ওঁদের কোনও সমস্যা হয়েছে, তাই ওর নম্বর চাইছে। ও দিয়েছিল। সে দিনই সুবোধ ওকে বলেছিলেন, ভাষানগর তো এ বার খুব বড় আকারে বেরোচ্ছে, দেখো না, যদি দু’-একটা বিজ্ঞাপন জোগাড় করতে পারো।
ভাষানগর একটি অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা। সম্পাদনা করেন সুবোধ আর মল্লিকা। কিন্তু ঋজু বিজ্ঞাপন আনবে কোথা থেকে! ও ওর অপারগতার কথা জানিয়ে দিয়েছিল।
পরের রবিবার যখন গেল, সুবোধ বললেন, তোমার সঙ্গে কি কণিকার এখন যোগাযোগ আছে?
ও জিজ্ঞেস করেছিল, কেন সুবোধদা?
উনি বলেছিলেন, ও দুটো বিজ্ঞাপন এনে রেখেছে। যদি নিয়ে আসো। ওর অফিস তো তোমার অফিসের কাছেই। ঋজু বলেছিল, না, ওর সঙ্গে আমার এখন আর দেখাসাক্ষাৎ হয় না।

তালিকায় ওর নামটা দেখে ঋজু বুঝতে পারল, বিজ্ঞাপন জোগাড় করে দিয়ে সুবোধদাকে খুশি করে, সুবোধদাকে দিয়েই এই কাজটা ও করিয়েছে।

বই প্রকাশের দিন ঋজু একটু আগেই গিয়েছিল। অনুষ্ঠান শুরুর মুখে মঞ্চের লাগোয়া গেট দিয়ে কারা যেন ঢুকল। কারা! ঋজু তাকিয়ে দেখে, কণিকা, কণিকার দুই মেয়ে, মহাদেববাবু আর একজন কে যেন!
কে উনি ! কণিকা যার সঙ্গে গড়িয়াহাটে দেখা করতে গিয়েছিল কিংবা উল্টোডাঙার গলির ভিতরের এক রেস্তোরাঁয় যার সঙ্গে পর্দা ডাকা কেবিনে দীর্ঘক্ষণ কাটিয়েছিল, এ কি সে-ই! না। এ নিশ্চয়ই সে নয়! দীপঙ্কর তার যে বর্ণনা দিয়েছিল, তার সঙ্গে তো এর কোনও মিল নেই। পরে দীপঙ্কর ফলো করে করে আরও অনেক খবর এনেছিল। বলেছিল, লোকটার নাম অভিজিৎ শেঠ। থাকে যোধপুর পার্কের কাছাকাছি, রহিম ওস্তাগার লেনে। ওর বউ স্থানীয় একটা ছোট স্কুলে পড়ায়। ওদের একটা চার-পাঁচ বছরের ছেলেও আছে। তার ডাকনাম চকাই। আর ওদের সঙ্গে থাকে ওদের কাকা। তিনি বিয়ে থা করেননি। আশপাশের লোকেরা বলে, ওই কাকার সঙ্গেই নাকি অভিজিতের বউয়ের একটা অবৈধ সম্পর্ক আছে। ও কয়েক সপ্তাহ টেলিগ্রাফে ফ্রিল্যান্স করেছিল। এখন কী করে কেউ বলতে পারে না। সে যাই হোক, তা হলে এই লোকটি কে? লোকটাকে সোজা মঞ্চে নিয়ে গেল উদ্যোক্তাদের একজন। খানিক পরেই ঋজু বুঝতে পারল, লোকটার নাম আব্দুস সাত্তার।
ইনিই তিনি, যিনি কণিকার বই করে দেওয়ার জন্য শঙ্করদাকে অনুরোধ করেছিলেন!
কিন্তু কেন? অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পরে তাঁকে ঘিরে ছোট বাবি, বড় বাবি, মহাদেববাবু আর কণিকাকে ও ভাবে আদেখলাপনা করতে দেখে, ওর কাছে পুরো ব্যাপারটাই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।

হাঁটতে হাঁটতে বইমেলা প্রাঙ্গণেই দেখা হয়ে গিয়েছিল তথ্যকেন্দ্রের অরূপ সরকারের সঙ্গে। কথায় কথায় অরূপ বললেন, তোমার কণিকার খবর কী?
দু’-চার সেকেন্ড সময় নিয়ে ঋজু বলল, ভালই।
— হ্যাঁ, সে তো দেখলামই। আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে ঘুরছে। তোমার কি দু’বছর হয়ে গেছে?
— কীসের?
— ওর সঙ্গে প্রেমের?
— দু’বছর। হ্যাঁ, তা তো হবেই। তার পর কী একটু ভেবে নিয়ে বলল, দু’বছরেরও বেশি।
— তা হলে আর আফসোস করে লাভ নেই।
— মানে!
— না, ও তো দু’বছরের বেশি কারও সঙ্গে মেশে না।
— কী বলছ?
— ওকে আমি ভাল করে চিনি।
— কই, তুমি তো আগে কখনও বলোনি।
— বললে, শুনতে? উল্টে ভাবতে আমি বুঝি ভাংচি দিচ্ছি। ও কত লোকের সঙ্গে মিশেছে তুমি জানো? ওর হয়তো নিজেরও মনে নেই। তালিকা করতে বসলে রাত কাবার হয়ে যাবে।
— তুমি তাদের কাউকে চেনো?
— দু’-তিন জনকে তো চিনিই। ওর আবার একটা হিসেব আছে। দেখবে, ও কখনও অবিবাহিত ছেলের সঙ্গে মেশে না। ও যাদের সঙ্গে মেশে তারা সবাই বিবাহিত।
— কেন?
— কারণ, হঠাৎ করে ও যদি কোনও মালদার পার্টি পেয়ে যায়, তখন যেটা আছে, সেটাকে তো কাটাতে হবে। সে যদি অবিবাহিত হয়, সে তো ঝামেলা করতে পারে। দুম করে কোনও একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু বিবাহিত হলে? এক মিনিটও লাগবে না। তার বউকে একটা ফোন করে দিলেই ল্যাঠা চুকে যাবে।
— তাই! না!
ঋজুর সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ওর যত দূর মনে পড়ল, দেখল, অরূপদা খুব একটা ভুল কিছু বলেননি। সত্যিই তো, কণিকা আজ পর্যন্ত যাঁদের সঙ্গে মিশেছে, তাঁরা সবাই বিবাহিত।

সে দিনই রাত্রিবেলায় কণিকা ফোন করেছিল ঋজুর মোবাইলে, তোমার সঙ্গে একটু দরকার ছিল, সময় হবে?
— কী দরকার? বলো।
— ফোনে বলা যাবে না। এলে বলব।
— কখন যাব?
— কাল তিনটে নাগাদ এসো। আমার অফিসে।
— ঠিক আছে।

পর দিন তিনটে নাগাদ ওদের অফিসের উল্টো দিকের ফুটপাথে, চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে কণিকা যা বলল, কোনও মেয়ে যে তার পূর্ব প্রেমিককে এমন কথা বলতে পারে, ওর ধারণাই ছিল না।
কণিকা বলল, তোমাকে মিথ্যে বলব না। তুমি যার কথা বলেছিলে, ওই যে, গড়িয়াহাটে, উল্টোডাঙায়, যার সঙ্গে আমাকে দেখেছিলে, তার সঙ্গে সত্যিই আমার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তার নাম অভিজিত্‌ শেঠ। যোধপুর পার্কে থাকে। ও যে দিন আমাকে প্রথম প্রোপোজ করল, আমি সে দিনই ওকে বলেছিলাম, আমার একজন স্ট্যান্ডিং লাভার আছে। কিন্তু তার পর থেকেই প্রত্যেক দিন ফোন করে ও এমন ভাবে কান্নাকাটি করতে লাগল, হঠাত্‌ করে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিল, আমাকে একটি বার দেখার জন্য আমার অফিসের গেটের উল্টো দিকের রাস্তায়, দিনের পর দিন ঝড়-জল-বৃষ্টির মধ্যে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে লাগল যে, আমি আর ওকে না করতে পারলাম না। ছোট বাবি বড় বাবিও বলল, উনি যখন তোমাকে এত করে চাইছে, তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া তোমার ঠিক হবে না। খাবার টেবিলে বসে মহাদেববাবুও সব শুনলেন। কিছু বললেন না। ফলে...
মাঝপথে ওকে থামিয়ে দিয়ে ঋজু বলেছিল, এগুলো আমাকে বলছ কেন?
কণিকা বলেছিল, ছোট বাবি বলল, তোমাকে বলতে। তাই বলছি। আসলে হয়েছে কি, ওর একটা ছেলে আছে।
— জানি।
— বছর পাঁচেক বয়স।
— তাও জানি।
— এই কিছু দিন আগে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাবে বলে আমার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিল। বলেছিল, দু’-তিন দিন পরেই দিয়ে দেবে। অথচ দু’মাসের ওপর হয়ে গেল...
— কত টাকা?
— দশ হাজার।
— ওর ফোন নম্বর নেই? ওকে ফোন করো।
— ফোন করলে ধরছে না। আমার নম্বর তো ওর মুখস্ত।
— অন্য কোনও নম্বর থেকে করো।
— তাও করেছিলাম।
— কী হল?
— ধরেছিল। যেই আমার গলা শুনেছে, অমনি বলল, আমি একটা কনফারেন্সে আছি। পরে করছি। কিন্তু আর করেনি।
— আবার করো।
— হ্যাঁ রে বাবা, করেছি। অন্য আর একটা নম্বর থেকে। আমার গলা যেই শুনছে, বলল, রাইটার্সে আছি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে। পরে করছি।
— করেনি তো? আবার করতে।
— আমি কি করিনি? আবার দু’দিন পরে যখন করলাম, বলল, ব্যস্ত আছি।
ঋজু বলল, তা আমি কী করব?
— তুমি এক বার দেখো না... তোমার প্রেমিকাকে কেউ ঠকাবে, তুমি কি সেটা চাও?
ঋজু বলেছিল, দেখছি। আর মনে মনে বলেছিল, আমার কণিকাকে ভাগিয়ে নেওয়া, না? এ বার দেখাচ্ছি মজা।
ওর স্পষ্ট মনে আছে, অফিস থেকে নিয়ে কণিকাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিলেও, এই লোকটার ফোন না-আসা পর্যন্ত ও ফোনের কাছেই গ্যাট হয়ে বসে থাকত। হাত-মুখ পর্যন্ত ধুত না। শাড়ি পাল্টাত না। ফোন বাজলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত।
ও কেন এ রকম করছে! থাকতে না পেরে ওর এক বন্ধুর কাছে ও একদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সেই বন্ধুই ওকে বলেছিল, তুই কোনও জ্যোতিষীর কাছে যা। হাতটা দেখা। দরকার হলে পাথর-টাথর পর। আমার মনে হয় তাতেই কাজ হয়ে যাবে। কিংবা কোনও তান্ত্রিকের কাছে যা। অনেক সময় তুকতাক ফুঁকফাকেও খুব ভাল কাজ হয়।
— তান্ত্রিকের কাছে! আমি তো তেমন কোনও তান্ত্রিককে চিনি না। কী করি বল তো?
ও-ই বন্ধুই তখন তার চেনা এক তান্ত্রিকের নাম ঠিকানা দিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, একটা ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে কালই গিয়ে এঁর সঙ্গে দেখা কর।
ও সেখানে গিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে দেখাও করেছিল। এবং তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল, এ রকম কেন হচ্ছে?
সেই তান্ত্রিক সঙ্গে সঙ্গে ওকে বলেছিলেন, হবে না? ছেলেটা তো ওকে বশীকরণ করেছে রে... রাজবশীকরণ। ওটা কাটাতে গেলে তোকে যজ্ঞ করতে হবে। অনেক টাকার ব্যাপার। অত খরচা করতে পারবি?
ও বলেছিল, পারব। কিন্তু ও আবার আমার কাছে ফিরে আসবে তো?
তান্ত্রিক বলেছিলেন, আসবে রে, আসবে।

সে দিনও রিং হতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ফোন ধরতে গিয়েছিল কণিকা। কিন্তু তার আগেই প্রায় ছোঁ মেরে ফোনটা তুলে নিয়েছিল ঋজু। ‘হ্যালো’ বলতেই ও প্রান্ত থেকে একটা পুরুষ-কণ্ঠ ওর মা-বাবা, চোদ্দোপুরুষ তুলে, দু’অক্ষর, চার অক্ষর, ছ’অক্ষরের কাঁচা কাঁচা গালাগালি দিয়ে বলেছিল, ওখানে কী করছিস রে? বন্ধুর বউয়ের পেছনে ছুঁক ছুঁক করতে খুব ভাল লাগে, না? ও তোকে কাছেই ঘেঁষতে দেবে না, বুঝেছিস? অনেক দিন ধরেই তো চেষ্টা করছিস। কিছু পেয়েছিস? ও আমার।
গজগজ করতে লাগল ঋজু। আমার, না? এ বার দেখাচ্ছি মজা। তুকতাক? সব ঘুচে যাবে। জানবি, বাবারও বাবা আছে। এমনি এমনি ওই তান্ত্রিকের এত নাম হয়নি। বুঝেছিস?
অভিজিতের যে মোবাইল নম্বরটা কণিকা ওকে দিয়েছিল, সেটা সুইচ অফ। প্রথম দিন। দ্বিতীয় দিন। তৃতীয় দিন। ওকে ধরা গেল না। দিনে দু’-তিন বার ঋজুকে ফোন করে কণিকা জানতে চাইল, কী হল, ওকে পেলে?
তাই বাধ্য হয়ে ও খোঁজ করতে লাগল, ওকে কে চেনে! ওর বাড়ি যোধপুর পার্কেই হোক কিংবা রহিম ওস্তাগার লেনে, শুধু নাম দিয়ে তো আর বাড়ি খুঁজে বার করা যাবে না। ও যখন এই লাইনে আছে, ওকে খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধে হবে না। ও ভাবতে লাগল, কে ওর বাড়ির ল্যান্ড ফোনের নম্বর দিতে পারে! একে ফোন করতে লাগল। তাকে ফোন করতে লাগল। ওকে ফোন করতে লাগল।
একজন বলল, অভিজিৎ শেঠ তো? খোঁচা খোঁচা চুল? তোমাদের টেলিগ্রাফে কাজ করত? ও তো রেনবো-তেও ছিল। তুমি তো অনেককেই চেনো। খাসখবরের কাউকে ফোন করে দেখো না...
ঋজু ফোন করল অমিতবিক্রম রানাকে। সেও খাসখবরে কাজ করত। ফোন করামাত্রই ঋজু বুঝতে পারল, ও ঠিক লোককেই ফোন করেছে। অমিত শুধু ওর ল্যান্ড নম্বরই দিল না, ওর বাড়িটা কোথায়, সেটাও একেবারে ছবির মতো বুঝিয়ে দিল। বলল ওর সম্পর্কে আরও অনেক কথাও।

অভিজিত্‌ বাড়িতে ছিল না। ওর বউ ফোন ধরেছিল। ঋজু তাকে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে বলেছিল, ও এলে যেন আমাকে এই নম্বরে একটা ফোন করে।
কিন্তু ও আর ফোন করেনি।
পর দিন সকালে ফের ফোন করল ঋজু। অভিজিৎই ধরল।
ঋজু বলল, আপনি কণিকার টাকাটা দিচ্ছেন না কেন?
— আপনি কে?
— আমি ওর বন্ধু, ঋজু বলছি।
— ঋজু! ও, আচ্ছা। ঢোক গিলল সে। তার পরে আমতা আমতা করে বলল, ও তো টাকাটা ফেরত চায়নি।
— ও আপনাকে বহু বার ফোন করেছে। আপনি নাকি ওর ফোন ধরছেনই না? ধরলেও ওর গলা শুনে নানা অজুহাত দেখিয়ে লাইন কেটে দিচ্ছেন?
— হ্যাঁ, দিচ্ছি। কারণ, যে মেয়ে জামাকাপড়ের মতো পুরুষ পাল্টায়, তার সঙ্গে যে-ই মিশুক, আমি মিশতে পারব না। আমার সঙ্গে ওর কী না হয়েছে। দিনের পর দিন অফিস কামাই করে ও আমার সঙ্গে আমার এক বন্ধুর ফাঁকা বাড়িতে গিয়ে সারা দুপুর কাটিয়েছে। একজন স্ত্রীর সঙ্গে একজন স্বামীর যা যা হয়, ওর সঙ্গে আমার সবই হয়েছে। আর যেই একজন মন্ত্রী পেয়ে গেছে, অমনি মুখ মুছে ফেলল...
— আপনি ওর টাকাটা কবে দিচ্ছেন?
— দেখুন, ও নিজে থেকেই টাকাটা আমাকে দিয়েছিল। কথায় কথায় ওকে একদিন বলে ফেলেছিলাম, এ মাসে খুব টানাটানি চলছে। ছেলেকে ভর্তি করাতেই প্রচুর টাকা লাগবে। এখনও সব টাকা জোগাড় হয়নি। একটা বড় অ্যামাউন্টের চেক পাব কাল। কিন্তু সে তো ক্যাশ হতে হতে আরও তিন-চার দিন... তখন ও জানতে চেয়েছিল, কত টাকা লাগবে? আমি বলেছিলাম, হাজার দশেক। পর দিনই ও আমার হাতে জোর করে একটা একশো টাকার বান্ডিল গুঁজে দিয়েছিল। আমি নিচ্ছিলাম না দেখে ও বলেছিল, আচ্ছা, তোমার জায়গায় যদি আমি হতাম, তুমি আমার পাশে এসে দাঁড়াতে না? তা হলে? তোমার ছেলে মানে তো আমারও ছেলে, না কি? আমি ওর জন্য এটা দিলাম। আমি বলেছিলাম, ঠিক আছে, নিচ্ছি। কিন্তু চেকটা ক্যাশ হলেই তোমাকে নিতে হবে। ও বলেছিল, তোমাকে ফেরত দিতে হবে না।
— এই কথা বলেছিল?
— ওকে জিজ্ঞেস করে দেখুন না... যে দিন এই কথা হয়, সে দিন আমাদের সঙ্গে ছকাই মকাইও ছিল।
— ছকাই মকাই!
— ওর মেয়ে।
— ওর মেয়েদের নাম ছকাই মকাই!
বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেনি ঋজু। অদ্ভুত তো! অরূপদা অবশ্য এক বার বলেছিলেন, ও যখন যার সঙ্গে প্রেম করে, তার ছেলে বা মেয়ে, যে-ই থাকুক না কেন, একাধিক ছেলেমেয়ে থাকলেও, তার সব চেয়ে যে কাছের, তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে কণিকা তার মেয়েদের একটা মনগড়া নাম তৈরি করে নেয়। অভিজিতের ছেলের নাম চকাই। তাই কি ও তার সঙ্গে মিলিয়ে ওর মেয়েদের নাম করে নিয়েছিল ছকাই মকাই! এর আগে ও যাঁর সঙ্গে মিশত, চলমান শিল্প আন্দোলনের অনুষ্ঠানে অভিজিত্‌ ঘোষ যাঁর কথা বলেছিলেন, সেই অপূর্বকুমার সরকারের মেয়ের নাম ছিল বুনু। তাই কি কণিকা তার সঙ্গে মিলিয়ে ওর মেয়েদের নাম তখন করে নিয়েছিল রুনু ঝুনু। ওর ছেলের নাম ‘বাবি’ শোনার পর, তার সঙ্গে মিলিয়ে তেমন জুতসই কোনও নাম খুঁজে না পেয়ে, কণিকা সম্ভবত তার মেয়েদের নাম রেখেছিল ছোট বাবি, বড় বাবি। ওর অফিসের ইউনিয়ানের সেক্রেটারি, কাঁচরাপাড়ার অরুণকুমার পাল বলেছিলেন, কণিকার মেয়েদের নাম টিনা-মিনা। তা হলে কি তাঁর মেয়ের নাম ছিল বীনা! চিনা! তৃণা! হতে পারে! কিন্তু এটা ও কেন করে! কেন! কেন! কেন!
আর ভাবতে পারছে না ঋজু। ও প্রান্ত থেকে অভিজিত্‌ শেঠ এতক্ষণ যে কী বলে যাচ্ছে, ওর কানে কিছুই ঢোকেনি। যখন সম্বিত ফিরল, ঋজু বলল, টাকাটা কবে দিচ্ছেন?
ও বলেছিল, দু’-চার দিনের মধ্যে। যত তাড়াতাড়ি পারি দিয়ে দেবো।

কণিকার তখন বাড়িতে থাকার কথা নয়, সে সময় অভিজিৎ একদিন কণিকার বাড়ি গিয়ে খামে ভরে দশ হাজার টাকা দিয়ে এসেছিল। ছোট বাবির হাতে। ছোট বাবি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে সে কথা জানিয়েও দিয়েছিল ওর মাকে। ওর মা-ও সেই মুহূর্তে ফোন করে ঋজুকে জানিয়ে দিয়েছিল সে কথা। বলেছিল, সত্যি, তুমি না থাকলে কিন্তু এই টাকাটা পেতাম না, পুরো মার যেত।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের ওদের মধ্যে পুরনো সম্পর্কটা দানা বেঁধে ওঠে। তবে না, আগের মতো অতটা মাখোমাখো নয়, তবুও অনেকটাই। কণিকা বলেছিল, আব্দুস সাত্তারকে দিয়ে অনেক কাজ হবে, জানো তো। আমি আর একটা নতুন স্কিম জমা দিয়েছি। ও তো বলল, পাশ করে দেবে। যদি দেয়, প্রচুর টাকার কাজ। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকো না...
— উনি জানেন আমার কথা?
— না।
— তবে?
— তবে কী? যদি জিজ্ঞেস করে, বলব, আমার স্বামীর বন্ধু। আনন্দবাজারে কাজ করে। প্রচুর যোগাযোগ আছে। ও থাকলে আমাদের কাজ করতে অনেক সুবিধে হবে। এ সব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। এটা আমার উপরে ছেড়ে দাও। তোমার কোনও আপত্তি নেই তো?
ঋজু বলেছিল, আছে। একসঙ্গে দু’জন থাকা যাবে না।
— একসঙ্গে মানে? আমি কি রোজ রোজ ওর কাছে যাই নাকি? সপ্তাহে একদিন কি দু’দিন। আমি তো তোমারই। 
— তা হয় না।
— তা হলে আমাকে বিয়ে করে নাও।
— বিয়ে! দুম করে যে এ রকম কোনও প্রোপোজাল ও দিতে পারে, ঋজু তা কল্পনাও করতে পারেনি। বলেছিল, বিয়ে!
ঋজুকে আশ্চর্য হতে দেখে কণিকা বলেছিল, এমন করে বলছ, যেন ‘বিয়ে’ শব্দটা জীবনে এই প্রথম শুনলে!
— না, তা না। আমার তো বউ আছে!
— তাতে কী হয়েছে? ডিভোর্স করা যায় না?
— ডিভোর্স!
— হ্যাঁ, আমার কাছে ভাল উকিল আছে।
— সেটা না। মহাদেববাবু?
— ডিভোর্স করে দেবো।
— উনি ডিভোর্স দেবেন?
— আঃহা, সেটা তুমি আমার উপরে ছেড়ে দাও না... আগে বলো, তুমি কি তোমার বউকে ডিভোর্স করতে পারবে?
— না, মানে, বলছিলাম কি, আসলে, কী করে এই কথা বলব... ঋজু আমতা আমতা করছে দেখে কণিকা বলল, ও, বুঝেছি। তুমি বলতে পারবে না, তাই তো? ঠিক আছে, তোমার সঙ্গে মহাদেববাবুকে পাঠাচ্ছি। উনি তোমার মায়ের সঙ্গে, তোমার বউয়ের সঙ্গে, এ ছাড়াও এই ব্যাপারে আর যার যার সঙ্গে কথা বলার দরকার, উনি তাদের সবার সঙ্গেই কথা বলে আসবেন, তুমি রাজি?
— মহাদেববাবু! পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে ঋজুর। মহাদেববাবু! তা হলে কি কণিকা একা নয়! তার সঙ্গে মহাদেববাবুও আছেন! সঙ্গে দুই মেয়েও! তবে কি এটা একটা চক্র! আমি সেই চক্রের মধ্যে পড়ে গেছি! ঋজু বিড়বিড় করে বলল, মহাদেববাবু!
— হ্যাঁ, মহাদেববাবু। তোমার অসুবিধে কোথায়?
— না, আসলে আমার বউকে আমি ডিভোর্স দিতে পারব না।
— কেন?
— আমার বউ ভীষণ ভাল।
— ও, তা, তোমার বউ যখন এত ভাল, তা হলে বাইরে প্রেম করতে এসেছ কেন? বউ জানে না?
— জানে, মানে আন্দাজ করে, ফিল করে...
— ও... তার মানে তোমার বউ জানে না। তাই বলো...
এর পর যে ক’বারই কথা হয়েছে, প্রতিটা কথাই ছিল কাট কাট। রসকষহীন। কেমন যেন কেঠো কেঠো। নিয়মরক্ষার। ‘কেমন আছ?’, ‘কী করছ?’, ‘ছোট বাবি কেমন আছে?’, ‘ভাল তো?’ এই রকম টুকটাক।

আজ অফিস থেকে বেরোবার সময়ও কথা হয়েছে। কিন্তু কণিকা হঠাত্‌ এত রাতে ওর বাড়ির ল্যান্ড লাইনে ফোন করতে গেল কেন! ও তো ওর মোবাইল নম্বর জানে। সেখানেও করতে পারত!
ঋজু যখন খেতে বসেছে, ভারতী খাটের উপর চিত্‌ হয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং— ঋজু এসেছে? ওকে দাও তো।
ভারতী বলল, ও খাচ্ছে।
কণিকা বলল, ওকে বলো, আমি ফোন করেছি।
ভারতী ফোনের মুখ হাতের তালু দিয়ে চেপে ঋজুর দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার ফোন।
— কে?
— কণিকা।
ঋজু খেতে খেতেই বাঁ হাত দিয়ে কর্ডলেস ফোনটা ধরল, কী হয়েছে?
ও প্রান্ত থেকে কণিকার কান্না-ভেজা গলা— আমার একদম ঘুম আসছে না।
— অ্যালজোলাম নেই?
— আছে। দুটো খেয়েছি। তাও ঘুম আসছে না। তুমি আমাকে ঘুম পারিয়ে দিয়ে যাও।
— এখন!
— আমি জানি না। তোমাকে আসতেই হবে।
— একটা বেজে গেছে! কোনও গাড়িটারি তো পাব না। যাব কী করে?
— আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। তোমাকে আসতেই হবে। লক্ষ্মী সোনা আমার...
ঋজু যখন ফোনে কথা বলছে, ভারতী ওর একদম পাশে এসে দাঁড়ল। জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
— কণিকা ফোন করেছিল।
— সে তো জানি। কী বলছে?
— বলছে, ঘুম আসছে না। আমাকে ঘুম পারিয়ে দিয়ে যাও।
— যাও।
ঝট করে ভারতীর দিকে তাকাল ঋজু। যাব?
— বললাম তো, যাও।
— কিন্তু যাব কী করে? এত রাতে... সল্টলেকে কোনও ট্যাক্সিও যেতে চায় না।
— দশ-বিশ টাকা বেশি দিলেই যাবে।
— আরে, ট্যাক্সি পেলে তো...
— শ্মশানের কাছে চলে যাও, ওখানে সারা রাত লাইন দিয়ে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকে। পেয়ে যাবে।
— হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। তা হলে গিয়ে দেখি... বলেই, যে-জামাপ্যান্ট পরে ও অফিসে গিয়েছিল, সেগুলিই পরতে যাচ্ছিল, ভারতী বলল, ওগুলো তো ময়লা। থাক। আমি বার করে দিচ্ছি। বলেই, ওয়ারড্রপ থেকে চোস্তা আর পাঞ্জাবি বার করে দিল। হাতে তুলে দিল পাউডার-কেস, চিরুনি, রুমাল।
বেরোবার আগে ঋজু যখন পার্স দেখছে, ভারতী বলল, এই নাও, এটা রাখো।
ও দেখল, তিনটে একশো টাকার নোট ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে ওর বউ। ঋজু বলল, তোমার কাছে ছিল?
— আমার কাছে কোত্থেকে থাকবে?
— তা হলে এটা?
— সংসারের টাকা।
— অসুবিধে হবে না?
— ও আমি ঠিক চালিয়ে নেব।
টাকাটা নিয়ে ঋজু বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। হাঁটা দিল কেওড়াতলা শ্মশানের দিকে।

ফাঁকা রাস্তা। ফুল স্পিডে ট্যাক্সি ছুটছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণের পাশ দিয়ে যাবার সময়, ঋজুর হঠাত্‌ মনে হল, আমি কি এটা ঠিক করছি! অন্য কোনও বউ হলে তো এতক্ষণে বাড়িটাকে একটা রণক্ষেত্র বানিয়ে ছাড়ত। সেখানে ভারতী! নাঃ, এটা ঠিক হচ্ছে না। এই চক্রব্যুহ থেকে আমাকে বেরোতেই হবে। হায়াতের দিকে যখন ট্যাক্সিটা টার্ন নিচ্ছে, পেছন থেকে ড্রাইভারের পিঠে টোকা মেরে ঋজু বলল, দাঁড়ান। ব্যাক করুন। আমি চেতলায় যাব।
ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করল, কিছু ফেলে এসেছেন?
ঋজু বলল, হ্যাঁ, আমার সব কিছু।
ট্যাক্সি যখন বিজন সেতু টপকাচ্ছে, জানালা দিয়ে আসা হুহু করা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে এল ঋজুর। আঃ, কী শান্তি! কী শান্তি!  হঠাৎ বিড়বিড় করে ও বলে উঠল, এ আমি কোথায় যাচ্ছিলাম! কোথায়! ছিঃ। আমার বাড়ি তো সাতাশের এ, আলিপুর রোডে।
গাড়ি তখন রুদ্ধশ্বাসে রাসবিহারী ছাড়িয়ে, কেওড়াতলা ব্রিজ টপকে চেতলার দিকে ছুটছে।

Wednesday, July 13, 2022

ছোট গল্প - আয়না || লেখক - রোহিত দাস || Short story - Aayna || Written by Rohit das


 

আয়না 

রোহিত দাস 



বৃষ্টি পড়ছিল চরম। তারপর তখন আবার রাত। বান্ধবী রীতু র

বাড়ি থেকে ফেরার পথে আটকে পরি আমরা। ঘন জঙ্গল আর ঘন কালো রাত্রের মাঝে চারদিক যেন ডুবে গেছে। বৃষ্টিও পড়েছিল প্রবলবেগে। এময়তাবস্থায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমরা কোথায় থাকবো ভেবে না পেয়ে এগিয়ে চলেছি বাড়ি দিকে। রীতুর কথা শুনে এক রাত থেকে গেলে হত কিন্তু পারলাম না,কারণটা অবশ্য আজকাল যেন ওর মেয়েদের প্রতি আসক্তি টা একটু বেশি বেড়েছে।ও যে ভাবে তাকাচ্ছিল আমার তো তাতে সন্দেহ এমনিতেই আমি ভয় পাই ওকে। দেখতে যতটা সোজা সাপ্টা আদেও সে কি না।মন মেনে নিতে পারে না চট করে না।টিভি,প্রতিবেশীর কাছে তো শুনি কিভাবে বরেরা একের বেশি বউ নিয়ে... না এসব ভাবলেই মাথা খারাপ হয়ে যায়।
এই ধারণা আমার জন্মেছে চেয়ে গত ছ'মাস আগে। সব ঠিক ছিল কিন্তু জামাই লিপস্টিক এর দাগ বেশ কয়েকদিন ধরে দেখার পর আর কাজের মেয়ের সাথে কথায় আমাকে এসব..।এসব কথা ভাবতে  কখন যে হারিয়ে গেছি জানিনা হুশ ফিরতেই দেখি আমরা একটা পুরনো বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি গাড়ি থেকে নামতে রাজিব নামলো। বাড়িটার দিকে তাকালেই যেন মনে হবে কোন এক ভয়ঙ্কর কান্ডকারখানায় জ্বলে পুড়ে গেছে। রাজিব  বাড়িটার দরজার কাছে এগিয়ে যেতেই আমি বলে উঠলাম কার বাড়ি জানিনা, কেউ থাকে কিনা জানিনা,কি আছে এখন ভেতরে তাও জানি না ঢুকলেই হলো নাকি ? রাজিব দরজাটা ঠেলেতে লাগলো।হালকা চাপ দিতেই খুলে গেল। রাজিব ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে আমিও ভেতরে ঢুকলাম।মোবাইলের টর্চ জ্বেলে এদিকে ওদিকে দেখার চেষ্টা করলাম কোন কিছুই দেখা যাচ্ছে না আমার কাঁধের ব্যাগে একটা বড়ো টর্চ  পড়ছিল সেটা বের করে জ্বালিয়ে এদিক-ওদিক দেখতে থাকলাম। সামনের জায়গাটা বিশাল।মেঝেতে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ধুলো পড়ে আছে সামনের দিকে চলে গেছে দোতলার সিঁড়ি।বারান্দায় একটা আয়না আর পাশেই একটা টেবিল।এতক্ষণে ভয় কাটিয়ে বললাম বাহ!! চমৎকার বেশ ভালোই হলো ভেতরে এলাম।এখানে বসেই রাতটা পার হয়ে যাবে, কাল সকালে বাড়ির জন্য রওনা দেওয়া যাবে। রাজিব গাড়িটা বাড়ীর ভেতরে নিয়ে চলে এল।আর একটা পুরনো কাপড় দিয়ে বেশ কিছুটা জায়গা ঝেড়ে ঝুড়ে বসার মত উপযোগী করে তুলল। গাড়ির সিটের নিজ থেকে দেড় হাত লম্বা একটা ট্রিপল বের করে সেটা মেঝেতে পেতে নিজে বসে আমায় বলল "কি বসবে না।" আমিও গিয়ে বসে পড়লাম রাজিব রুমাল দিয়ে মাথা মুছতে লাগলো। জামা কাপড় একেবারে প্রায় ভিজে গেছে। কি আর করব এখানে শুকনো জামাকাপড় পাওয়া যাবে না সেগুলো পড়েই বসে থাকলাম। রাজিব জামাটা খুলে খালি গেঞ্জি পড়ে বসে আছে। ইতিমধ্যে ঝড়ের আর জলের বেগ আরো বেড়েছে। দরজা দিয়ে জলের ছিটে ক্রমশ ভেতরে আসছে। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া শরীরের প্রত্যেকটা হারকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজিব আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। ও ভিষন ঘুমকাতুরে। 10 মিনিটের মধ্যেই দেখি ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আমার ঘুম এলো না। দু চোখ যেন অজানা ভয় বন্ধ হতে চাইছিল না।যত সময় কাটতে লাগলো ঝি ঝি পোকার ডাক আর ঠান্ডা কনকনে হাওয়ায় পরিবেশটা ভীষণ ভয়ংকর হতে লাগল। গাড়ির হেডলাইটের আলোই একমাত্র সম্বল তাও কিছুটা জায়গায় আলো করে রেখেছে, বাকি চারপাশ ভীষণ অন্ধকার। হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় দরজাটা বিকট আওয়াজ করে একবার খুলে গিয়ে আবার কিছুটা বন্ধ হয়ে গেল। আমি বসে থাকতে পারছিলাম না। কোল থেকে রাজিবের মাথাটা নামিয়ে উঠে পরলাম মোবাইলের লাইট আর টর্চ লাইট নিয়ে এদিক-ওদিক টা একটু ঘুরে দেখবো ভাবলাম।
বারান্দায় আসবাবপত্র কিছুই নেই শুধু হয়ে আয়না আর টেবিল টা আমি আস্তে আস্তে সে দিকেই এগিয়ে গেলাম। আয়নাটা বেশ পুরনো ধুলো জমেছে অনেক তবে দেখে বোঝা যায় এটা বেশ সুন্দর দেখতে। টেবিল টা মোটা মেহগনি কাঠের। আয়নাটা খুব লম্বা নয়, আমার হাটু পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে হাত দিয়ে আয়নাটার ধুলোগুলো একটু পরিষ্কার করলাম। এবার আয়নাটার দিকে তাকাতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম।আয়নাটা আমায় দেখাচ্ছেনা ,দেখাচ্ছে অন্য কিছু। আমি যা দেখলাম তার বর্ণনায় নিজের মুখে কতটা ঠিক করে দিতে পারব জানি না। হতবুদ্ধি সম্পূর্ণ আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরোটা শুধুই দেখেই গেলাম। দেখলাম একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ি যেখানে থাকেন এক ভদ্রলোক তার স্ত্রী ও তার ছেলে। বেশ ভালই চলছিল তাদের সংসার। কিন্ত তাদের সাংসারিক জীবনে যেন শনির দৃষ্টি হঠাৎই পড়ে গেল। ঘটনাটা যেন একটু তাড়াতাড়ি ঘটে যাচ্ছিলো কোন মোর ঘোরানোর চেষ্টায়।একদিন হঠাৎ ছেলেকে স্কুলে থেকে আনার সময় স্ত্রীটি দেখল তার স্বামী একটা বছর তিরিশের নারীর সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। সে ভাবল তার স্বামী দিনমজুরের কাজ করে এখানে কি করছে। এভাবেই সপ্তাহ দুয়েক ধরে মাঝেমধ্যেই সে দেখতে পেত তার স্বামীকে সেই জায়গায় সেই মহিলাটির সাথে। কিন্তু ঘরে ফিরে তাকে জিজ্ঞাসা করলেও সে কোন উত্তর দিতো না। এমনই একদিন সে হাতেনাতে ধরবে বলে স্কুল থেকে ফেরার পথে যখন দেখতে পেল না সে খুব হতাশ হয়েছিল। বাড়ির দিকে আসতেই সে দেখতে পেল সেই মহিলাটি তার বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে। সে দেখল তার স্বামীর জামার নিচের দিকের কয়েকটা বোতাম খোলা। এভাবেও বেশ কিছুদিন পর আবারো একই ঘটনা। ইতিমধ্যে একটা অশান্তি ঘটেছিল তাদের মধ্যে‌। স্বামীটাকে জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও কোন কিছুই বলতে রাজি ছিল না সে। এভাবে দ্বিতীয় দিন দেখার পর সে আর সহ্য করতে পারছিল না স্বামীকে। তার পাশে শুতে যেন তারা ঘিন্না করছিল তার।সামনে দাড়াতে তার ঘেন্না করছিল। সে ঠিক করল তাকে এভাবে ঠকানোর বদলা সে নেবে। তাকে এভাবে অপমান করার বদলা সে ঠিক নেবে। তাই ঠিক করল সে তার স্বামীকে খুন করবে। সেদিন স্কুলে ফেরার পথে তাদের দেখে সে সত্যিই খুব রেগে গেছিল। হয়তো স্বামী তাকে দেখেছে। কিন্তু কোনো কথা বলেনি। সারা দুপুরটা যেন ঝড়ের আগের শান্ত অবস্থার মধ্যে কেটে গেল। স্বামী ভাবল যেন কোন কিছুই হয়নি। রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর স্বামী ঘুমিয়ে পড়লে ছেলেকে অন্য ঘরে শুইয়ে রেখে। স্বামীর গলায় সে নরম ছুরির ফলা টেনে দিল। রক্তবন্যা বয়ে গেল সারা বিছানা জুড়ে। মেয়েটির বুকের জ্বালা এতটাই ছিল যে সে চিৎকার করে বলতে লাগল "আর যাবি সেই মেয়ে ছেলেটার কাছে যা চলে যা।" পরদিন পুলিশ এসে যখন মেয়েটিকে নিয়ে যাবার জন্য রওনা হচ্ছে,তখন সেই মেয়েটা স্ত্রীটি সামনে এসে দাড়াল।সে বললো আপনার স্বামী বড়ই ভালো মানুষ ছিলেন।আপনি এভাবে তাকে কেন মারলেন?স্ত্রীটি ক্ষিপ্ত গলায় বলে উঠলো চরিত্রহীন তুই আমার জীবনটা নষ্ট করেছিস।তোর রূপে আকৃষ্ট হয়ে আমার স্বামী আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলো তাই আমি তাকেই মেরে ফেলেছি। মেয়েটি অবাক হয়ে বললো "কি বলছেন??আমার সাথে আপনার স্বামীর কোন সম্পর্কই ছিলনা। আপনি ভুল ভাবছেন আপনি যেটা ভাবছেন সেটা হয়নি। আসলে আমার দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গেছিল। স্বামীও নিজের চাকরিটা হারিয়েছিলেন। কিভাবে সংসার চালাবে ভেবে না পেয়ে আমার খবর পেয়ে আমার সাথে দেখা করেন। আমারও কিডনির প্রয়োজন ছিল আপনার স্বামী তার একটা কিডনি আমাকে দেওয়ার জন্য রাজি হয়। আমি তাকে নগদ এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিলাম। এমন একটা সময় আপনার স্বামী আমার এত উপকার করেছিলেন।প্রথম দিন আপনার বাড়ি আসার কারণ এটাই ছিল। আপনার স্বামীর সাথে দেখা করতে এসেছিলাম তিনি আগের দিনই হাসপাতালে কিডনি ডোনেট করেছিলেন। গত 26 তারিখে আমার অপারেশন হয়। তার আগের দিনও আপনার স্বামীর সাথে আমি দেখা করি। হয়তো জামার বোতাম খোলা দেখলেই আপনি ভেবেছিলেন আপনার স্বামী পরকীয়ায় জড়িত।আসলে আপনার স্বামী সেলাইয়ের জায়গাটা আমি দেখে গিয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে উনার মত স্বামী বা আপনার ভাগ্যে ছিল না তাই হয়তো আপনি আজ হারিয়ে বসেলেন। কথাগুলো শোনা মাত্রই স্ত্রী মেয়েটা পুলিশের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে একছুটে ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা বন্ধ করে করে নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে নিল। পুলিশও হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে।তারাও এই বিষয়টায় অবাক। হতভম্ব পুলিশের সামনে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠলো সেই স্ত্রীটির দেহ খানি মায়ের দেহকে পড়তে দেখে ছেলেটিও মাকে জড়িয়ে ধর, আগুন লাগল তার গায়ে। আগুনের জ্বালায় ঘরে চারদিকে ছুটতে লাগল, ধরিয়ে দিলোআগুন সারা ঘরে।পুলিশ অবাক হয়ে ছুটে ঘর থেকে পালিয়ে গেল। সেই মহিলাটি ইতিমধ্যে চলে গেছে। দেখতে দেখতেই গোটা ঘরটা গেল পুড়ে।
পুরোটা দেখা মাত্রই আমি দু পা পিছিয়ে গেলাম। আমার বুকের ভেতরটা কেমন জানি করছিল।রাত এখনো অনেক বাকি। বৃষ্টিটাও একটু ধরেছে। আমি এক ধাক্কায় রাজীবকে তুলে বলতে লাগলাম "রাজিব রাজিব বৃষ্টি থেমেছে চলো আমরা এখনই এখান থেকে চলে যায়..রাজিব চলো...আমার এইখানটা ভালো লাগছেনা।চলো রাজিব।" রাজিব আমার কথা শোনা মাত্রই সে ট্রিপল গুটিয়ে গাড়ি বের করে আমায় নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো।
এরপর ছয় মাস কেটে গেছে।সেই ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। তবে তার থেকে অনেক কিছু শিখেছি ‌। রাজীবের মেয়ের দোষ নেই সে নিজেই আমাকে একথা বলেছে।  স্বীকার করেছে যে তাকে জ্বালানোর জন্য সেই কাজগুলো করেছে।আমার সুখী পরিবার আবার সুখে ভরে গেছে কিন্তু সেই দিনের শেখার জিনিস চিরতরে থেকে গেছে।

Monday, July 11, 2022

ছোট গল্প - ভিখারী || লেখক - তনিমা সাহা || Short story - Vikari || Written by Tanima Saha


 


ভিখারী

তনিমা সাহা 



মনু রোজ ভিখারীটিকে দেখে বাড়ির উল্টো দিকে গাছটির নিচে বসে থাকতে। সবসময় কিছু যেন আড়াল করে রাখে সে। মনুকে দেখলেই সেই জিনিসটা লুকিয়ে ফেলে। মনুর বাবা-মা নেই। সে তার দাদু-দিদার সঙ্গে থাকে। দাদু বলে মনুর বাবা শিলাদিত্য একজন সামরিক বাহিনীর পদাতিক সৈনিক ছিলেন। মনুর মা বসুন্ধরা একটি আঞ্চলিক খবরের চ্যানেলে কাজ করতেন। 'সীমান্তে সৈন্য সৈকত' নামে অনুষ্ঠানের জন্য বসুন্ধরা যখন কাজ করছিলেন তখন তার শিলাদিত্যের সাথে পরিচয় হয়। সেই পরিচয়টা প্রথমে প্রণয় এবং পরে পরিণয়ে পরিনত হতে খুব বেশি একটা সময় নেয়নি। বছরখানেক বেশ ভালভাবেই কাটে ওদের। বছরখানেক পর পুজোর ছুটিতে বাড়ি এসেছিল শিলাদিত্য। শিলাদিত্য অনাথ আশ্রমে মানুষ। তাই বসুন্ধরার বাড়িতেই সে থাকতো। ছুটিতে এসে অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে, বসুন্ধরার পরিবারকে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে বেশ ভাল সময় কাটছিল। কিন্তু হঠাৎই সেসময় সীমান্ত পাড়ে কোন একটা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় শিলাদিত্যকে অতিসত্ত্বর ছুটি বাতিল করে ফ্রন্টে ছুটে যেতে হয়। কিন্তু তারপর থেকে শিলাদিত্যের কোন খবর নেই। ততদিনে বসুন্ধরার ঔরসে চলে এসেছে বসুন্ধরা ও শিলাদিত্যের ভালবাসার চিহ্ন মণীশ মানে মনু। পাগলের মতো শিলাদিত্যের দেওয়া নম্বরে ফোন করতো বসুন্ধরা। কিন্তু কেউ ফোন ধরতো না। বসুন্ধরার বাবা অর্থাৎ মনুর দাদু তা-ও চেষ্টা করেছিলেন সীমান্ত পাড়ের সেনাবাহিনী থেকে শিলাদিত্যের খোঁজ নেওয়ার। কিন্তু নাহ্! সব চেষ্টাই যেন বিফল হয়ে গেল। একটা জলজ্যান্ত মানুষ যেন হঠাৎ হাওয়ায় উড়ে গেল। বসুন্ধরাও আস্তে আস্তে কেমন যেন চুপ মেরে গেল। মনুকে জন্ম দিতে গিয়ে ভীষণ রকম অসুস্থ হয়ে পড়ল সে। যখন মনুর ছয় বছর বয়েস তখন বসুন্ধরা ইহলোকের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেল সেই না ফেরার দেশে। 


এই সবকিছুই মনু তার দাদু-দিদা থেকে শুনেছে। এমনিতে দাদু-দিদা মনুকে ভীষণ ভালবাসে। তার কোনরকম প্রয়োজন কখনও অপূর্ণ রাখেন না। কিন্তু তবুও যখন মনু দেখে যে স্কুলে স্পোর্টস-ডে বা প্যারেন্ট-টিচার মিটিংয়ে সবার বাবা-মা আসে তখন তার খুউউব কষ্ট হয়। কিন্তু সে কাউকে বুঝতে দেয় না। শুধু বাড়ি ফিরে বাবা-মায়ের ছবিটা নিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। দাদু-দিদা যদি জানতে পারে যে মনুর মনে এত কষ্ট জমা আছে তাহলে তো ওরাও খুব কষ্ট পাবে! মনু ওদের খুব ভালবাসে। তাই নিজের কষ্টটাকে লুকিয়ে রাখে।




আজ মনুর রেজাল্ট বেরোবে। মনু অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে উঠবে। রেজাল্ট নিয়ে মনুর মনে কোন ভয় নেই। সে মোটামুটি ভালই রেজাল্ট করে। কিন্তু সমস্যাটা হল অন্য জায়গায়। আজকাল স্কুলে যাওয়ার পথে কিছু ছেলে তাকে বেশ বিরক্ত করে। ছেলেগুলো বিজাপুর বস্তির। মনু দেখেছে ওই ছেলেগুলো সিগারেট খায়। ওদের হাতে সবসময় একটা ছোট আকারের বোতল থাকে। ওইসব বোতলে সাদা সাদা কী যেন ভরা থাকে সেগুলোও খায়। বড়ো দুর্গন্ধ বেরোয় তা থেকে! মনুর ওদেরকে খুব ভয় করে। অন্য কোন ঘুরপথে যে সে স্কুলে যাবে তারও উপায় নেই। স্কুলে যাওয়ার এই একটাই রাস্তা। স্কুলের সবাই মনুকে 'ভীতু, ভীতু' বলে প্রচণ্ড খ্যাপায়! আসলে মনু ভয়টা একটু বেশীই পায়। এখনও রাতে দাদু-দিদার সঙ্গেই ঘুমোয়। দাদু-দিদা এমনিতেই তাকে নিয়ে যথেষ্ঠ চিন্তায় থাকেন। এই নতুন উৎপন্ন উপদ্রবটির কথা বলে মনু ওদেরকে আর ব্যতিব্যস্ত করতে চায়নি। আর তাছাড়া আরেকটি কারণও আছে। মনু আসলে চায় যে তার নাম থেকে এই 'ভীতু'র তকমাটা মুছে যাক। তাই আরকি….। 




অষ্টম শ্রেণীর রেজাল্টও বেশ ভাল হয়েছে। রেজাল্ট নিয়ে মনু বেশ ভয় ভয় মনে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। রাস্তায় সেই মোড়ে যেখানে ছেলেগুলো আড্ডা দেয় সেখান মনু যাওয়ার আগে মোড়ের কোনাটা থেকে একবার উঁকি দিয়ে দেখলো যে ছেলেগুলো নেই। মনু নিশ্চিন্তে মোড়ের দিকে পা বাড়ায়। মোড়ের রাস্তাটা যেমাত্র পেরোতে যাবে ঠিক সেইসময়ই কোত্থেকে যেন ভুঁইফোড়ের মতো ওরা সামনে চলে এল। মনু বেশ জোরে আঁতকে উঠল! ওর ভয় পাওয়া মুখটা দেখে বস্তির ছেলেগুলো জোরে জোরে হাসতে লাগল। 




ওদের একজন বলল, 'দেখ, দেখ নামটা হেব্বি দিয়েছে, এক্কেবারে ম্যাচিং...কী 'ভীতু'... ভীতু কী ভয় খেল নাকি।' বলে ছেলেগুলো হাসতে লাগল। 




মনু এবার সত্যিই চমকে গেল। 'ভীতু' নামে তো তাকে স্কুলে ডাকা হয়। এই নামটা ওরা কিভাবে জানলো? ঠিক তখনই ওদের পেছন থেকে শয়তানের মতো হাসতে হাসতে বেড়িয়ে এল রাতুল। 




মনুর ক্লাসের সবচেয়ে বখে যাওয়া ছেলে রাতুল তাকে প্রথম 'ভীতু' নামটা ধরে খ্যাপাতো। তারপর রাতুলই ক্লাসে ছড়িয়ে দেয় এই 'ভীতু' নামটা। রাতুল পরপর দুবছর ফেল করে এবার মনুদের ক্লাসে আছে। হেডস্যার যদিও রাতুলকে ওয়ার্নিং দিয়েছেন যে এবারও যদি সে ফেল করে তাহলে তাকে স্কুল থেকে রাস্টিগেট করে দেওয়া হবে। যদিও রাতুলের সে ব্যাপারে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই! সে অকারণে মনুকে বিরক্ত করেও বেশ মজা পায়। যেমন ক্লাস ফাঁকা থাকলে বিকট আওয়াজ করে মনুকে চমকে দিয়ে বা গলার আওয়াজ বিকৃত করে ভয় পাইয়ে খুব মজা পায়। তাছাড়া স্কুলে ঢোকার মুখে ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়া বা ক্লাসে মনুর বসার জায়গায় চুইংগাম চিবিয়ে চিটকে দেওয়া বা অফপিরিওডে মনুর ঠিক পেছনের বেঞ্চে বসে কলম দিয়ে ক্রমাগত খোঁচা দিতে থাকা। রাতুলের বিরুদ্ধে একবার শিক্ষকের কাছে নালিশ জানিয়েছিল মনু। ওই এক/দুদিন ঠিক ছিল। আবার যেই কে সেই! কিন্তু এবার মনু ভেবেছিল এসবের প্রতিবাদ সে করবে। এই তো সেদিনের কথা। টিফিন পিরিয়ডে মনু সবেমাত্র টিফিনবক্সটা খুলেছিল। সঙ্গে সঙ্গে রাতুল ছোঁ মেরে অর্ধেকটা টিফিনটা তুলে নিলো। এটাও প্রায় রোজেরই ঘটনা। কিন্তু এবার মনু করল কী, টিফিন বক্সের ঢাকনাটা দিয়ে রাতুলের হাতের উপর জোরে চেপে ধরল। এদিকে টিফিনবক্সের মধ্যে রাতুলের হাত এবং ওই অবস্থায় ঢাকনাটা দিয়ে মনু এতো জোরে চাপা দিয়ে আছে যে হাতটা বেশ ব্যথা করছে। এরকম বেকায়দায় রাতুল কখনও পড়েনি। মনুর দিকে তাকাতেই দেখে সে মিটিমিটি হাসছে। 




দাঁতখিঁচিয়ে রাতুল বলল, 'কাজটা ভাল করলি না মনু। এর ফল একদিন তোকে ভুগতে হবে।'




এরপর রাতুল আর মনুকে বিরক্ত করতো না। মনুও খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। এরই মাঝে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়ে যাওয়ায় মনুও পড়াশোনা আর প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।




আজ এই বস্তির ছেলেগুলোর সাথে রাতুলকে দেখে মনুর মনে এক অশনি সংকেত দেখা দিলো। 




মনুকে দেখে রাতুল বলল, 'কি রে সেদিন তো খুব হম্বিতম্বি করছিলি! আজ হঠাৎ চুপসে গেলি কেন, অ্যাঁ?'




বস্তির ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বললো, 'এএ, সুনলাম নাকি এই হেঁদোটার মা-বাপ নাকি ফুঁকে গেছে,অ্যাঁ, ঠিক।' 




দ্বিতীয়জন বলল, 'শাল্লা! অনাথের বাচ্চা হয়ে বসের সঙ্গে মাতব্বরি করছি্স।'




এবার মনু মুখ খুলল। 


বলল, 'মুখ সামলে কথা বলো। অনাথ কাকে বলছো তোমরা।'

দ্বিতীয় ছেলেটি রাতুলকে বলল, 'বস! বাচ্চার মুখে দেখি কথা ফুটেছে।' 




রাতুল ফস করে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বলল, 'তবে আর বলছিলাম কি! এইজন্যই তোদেরকে এর পেছনে লাগিয়েছিলাম।' 




মনুর কাছে এবার ধীরে ধীরে সবকিছু পরিস্কার হতে শুরু হল যে, কেন এই বিজাপুর বস্তির বখাটে ছেলেগুলো অকারণে তাকে যাতায়াতের পথে বিরক্ত করতো। মনু দেখলো রাতুলসহ ছেলেগুলো হাতে মোটা লাঠি নিয়ে তার দিকে এগোচ্ছে। মনু বিপদের গন্ধ পেয়ে একপা দুপা করে পিছিয়ে ছুট লাগাল। ছুটতে ছুটতে মোড়ের রাস্তাটা প্রায় পেরিয়ে আসায় ছোটার গতি কমিয়ে দিল মনু। আর সেখানেই হল বিপত্তি! রাস্তায় আড়াআড়িভাবে রাখা একটা ইটের উপর হোঁচট খেয়ে মনু পড়ে গেল রাস্তায়। হোঁচট খেয়ে পড়ায় মনু দু'হাটুঁতেই বেশ চোট পেল! একটু সামলে উঠতেই দেখে সবকটি ছেলে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। 




রাতুল একটি চুকচুক শব্দ করে বলল, 'এখন কোথায় পালাবি রে ভীতু! এখন তোকে বাঁচাবে রে ভীতু।' 


বলেই লাঠি উঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল, 'মার শালাকে ধরে।' 




মনু আগাম ভবিষ্যতে কথা ভেবে হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ার পরও যেমনটা ভেবেছিল তেমন কিছুই হল না। শুধু 'উহঃ', 'আহঃ', 'স্যাত', 'ধুপ্' এই জাতীয় কিছু শব্দ ভেসে আসতে লাগল কানে। মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে মনু মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে দেখে যে, মনুদের বাড়ির সামনের সেই ভিখারীটি কোথা থেকে এসে ওদের লাঠি দিয়েই ওদেরকে মারছে। মার খেয়ে ওরা সবাই রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। 




হাতের লাঠিটা রাস্তায় ঠুকে ভিখারীটি রাগতঃ দৃষ্টিতে মনুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'পেত্তিবাদ কইরতে পারিস না? নিজের জন্য এখন পেত্তিবাদ যদি কইরতে না পারিস তবে কবে আর পারবি? আমার পোলাটাও তোর মতোই হ্যাদাব্যাদাই ছিল। পড়াশুনাটা জানতো ভাল। তাই তো গতর খেটে পোলাটাকে বড়ো ইস্কুল পর্যন্ত পড়িয়েছিলাম। কিন্তু কী লাভ হল! ওই বড়োলোকের পোলাগুলো অন্যায়ভাবে মেরে ফেলল আমার পোলাটাকে। ওর মা তো সঙ্গে সঙ্গে শেষ। এই আমিই শুধু তার কাছে যেতে পারিনি। এই দুনিয়াটা বড্ড নিষ্ঠুর রে বাপ। নিজের ঘাড় শক্ত করে মাথা উঁচু করে যদি চলতে না পারিস তবে এই দুনিয়া তোকে দুমড়েমুচড়ে শেষ করে দিতে সময় নেবে না।' 




মনুর চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পরছে তখন। এদিকে হয়েছে কি রাস্তার উপর এতো আওয়াজ শুনে বিশেষ করে মনুকে রাস্তায় পরে থাকতে দেখে আশেপাশের লোকজন দৌড়ে এল। 


একজন বললেন, 'কী হয়েছে মনু? এরা কারা?' 




মনু মাথা ঘুরিয়ে ভিখারীটিকে কোথাও দেখতে পেল না। মনুকে ওরা ধীরে ধীরে উঠিয়ে দাঁড় করালে সে একে এক সব বলল। 


অন্য একজন বলল, 'আরে এরা তো সেই বস্তির ছেলেগুলো। কদিন ধরেই দেখছি এদের এই পাড়ায় আনাগোনা বেড়েছে। আর এ তো বিশ্বাস ব্যবসায়ীর ছেলে। আমার ছেলেমেয়েকেও সে প্রচণ্ড বিরক্ত করে। আজ এর হচ্ছে! একে আজ ছাড়বো না আমি।' 


এরমধ্যে কেউ পুলিশকে খবর দিয়েছে। পুলিশকে দেখে ছেলেগুলোর মুখ পাংসুবর্নের হয়ে গেল। এতদূর যে ব্যাপারটা গড়াবে ওরা ভাবতে পারেনি। মনুকে পাড়ার লোকেরাই ফার্স্টএইড করিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। ওদিকে বিশ্বাস ব্যবসায়ী পাড়ার লোকের কাছে প্রায় হাতেপায়ে ধরে ছেলের তরফ থেকে ক্ষমা চাইলেন। বাড়িতে বসে গরম গরম হলদি-দুধ খেতে খেতে মনু তার দাদু-দিদাকে রাস্তায় এবং স্কুলে ঘটা সমস্তকিছু খুলে বলল। ভিখারীর কথা শুনে মনুর দিদা বললেন, 'কয়েকমাস আগে খবরের কাগজে পড়েছিলাম বটে এমন একটা ঘটনার কথা। কলেজের প্রথম বর্ষের একটি ছাত্রকে তৃতীয় বর্ষের দুজন ছাত্র শুধু গায়ের জোর দেখাতে গিয়ে মেরে ফেলেছিল। ওই দুজন খুব বড়োলোকের ছেলে ছিল। তাই কেসটা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল।'




প্রায় এক সপ্তাহের পর আজ মনু স্কুলে এসেছে। বাড়ি থেকে বেড়োনোর সময় সে ওই ভিখারীটিকে অনেক খুঁজেছিল। কিন্তু কোথাও খুঁজে পায়নি তাকে। যেই গাছের তলায় ভিখারীটি বসতো সেখানে গিয়ে একটু খুঁজতেই মনু একটা খবরের কাগজের কাটিং দেখতে পেল যাতে লেখা ছিল 'মেধাবী ছাত্রের নৃসংশ হত্যা। টাকার জোরে পেল অপরাধীরা ছাড়া'। শিরোনামটির নিচে একটি বছর কুড়ির ছেলের ছবি। মনু বুঝতে পারল এইটাই ছিল সেই ভিখারীটির ছেলে। ছেলেটির কথা ভেবে মনুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। মনে মনে মনু একটি সিদ্ধান্ত নিলো। 




স্কুলে এসে জানতে পারল রাতুলকে তার বাবা টি.সি. দিয়ে নিয়ে চলে গেছে। তাকে নাকি কোন একটা বোর্ডিং স্কুলে দেবে। ক্লাসের সবাই তাই বেশ স্বস্থিতে আছে। আজ প্রথমদিনের ক্লাস বেশ ভাল হল। বাড়ি ফিরে মনু তার দাদুকে বললো, 'দাদু আমি ভেবেছি আর ভয় পেয়ে আমি চলবো না। তোমরাও আমার জন্য এতো চিন্তা করো না। যার বাবা-মা ফাইটার ছিল সে কী আর দুর্বল হতে পারে।'




মনুর কথা শুনে উঁনার বুকটা আজ বহুবছর পর আবার গর্বে ফুলে উঠল।




Sunday, July 10, 2022

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -10


 চার


পরদিন অশ্রুসিক্ত অবস্থায় ভাগ্যান্বেষণে কলকাতা মহানগরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা। করার জন্য বাবার কাছে সাশ্রু নয়নে বিদায় নিতে এলাম। বিদায় নেবার আগে পাড়ারই। এক পিসিমার উপর ভার দিলাম বাবাকে পরিচর্যা করার জন্য। তথাপি বাবাকে ছেড়ে যাবার আগে কি দারুন মর্মপীড়া পেয়েছিলাম তা বর্ণনাতীত। তবুও সেদিন ভবিষ্যতের রঙ্গীন আশায় ও নারীজীবনের বিপদ আপদ অগ্রাহ্য করে রন্টুদার সঙ্গে নিঃসঙ্কোচে বেরিয়ে পড়েছিলাম। 


যখন হাওড়া স্টেশনে পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যে সাতটার কাছাকাছি। হাওড়া স্টেশনে নেমে শুধু কালো কালো মাথা দেখতে পেলাম। এতো লোকের জামায়েত কখনো দেখিনি। গ্রামে অবশ্য মেলা দেখেছি, কিন্তু এভাবে বিভিন্ন আলোতে উদ্ভাসিত মানুষগুলোকে দেখিনি। একের পর এক প্রশ্ন করে , রন্টুদাকে অতীষ্ট করে তুললাম। অগণিত মানুষের ভিড়ের মাঝে আমার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। শক্ত মুষ্টিতে রন্টুদার হাতটা চেপে ধরে আছি, তবুও কত লোকের সাথে ধাক্কা সাগলো তার হিসেব নেই। বিশেষ করে আকর্ষণীয় নানান রঙের সজ্জিত বৈদ্যুতিক আলোগুলোর পানে তাকিয়ে মুখ ফেরাতে পারছিলাম না। রন্টুদার হাত ধরে কখন যে স্টেশনের। বাইরে গেছি খেয়াল ছিলো না। হঠাৎ নজরে পড়লো হাওড়া সেতুকে। বিভিন্ন প্রকার চোখ ঝলসানো আলোয় আলোকিত হাওড়া সেতু দীর্ঘ দিন ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে স্বাগত জানাচ্ছে। 

হাওড়া সেতুর ছবি বই এর পাতায় ও বড় ক্যালেন্ডারে দেখেছিলাম। এখন চাক্ষুষ দেখলাম বলে আনন্দিত হলাম। অজস্র মানুষ ওর উপর দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে দেখলাম, কিন্তু কেউ আমার মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকছে না। দূর দিগন্ত পানে তাকিয়ে দেখলাম আলোর আলোকিত শহরকে।

 রন্টুদাকে জিজ্ঞেস করতে জানতে পেরেছিলাম ঐ কলকাতা। এপারে হাওড়া, ওপারে কলকাতা। মধ্যিখানে শান্ত, নীরবতার মধ্যে “মা গঙ্গা” প্রবাহিত হচ্ছে। সহজ সরল শিশুর মতো তার গতি। সন্ধ্যের সময় কত টুকুই তার ঐতিহ্য বুঝলাম। শুধু গঙ্গার জল মাথায় নিয়ে মায়ের নিকট আশীর্বাদ চেয়েছিলাম। হঠাৎ নজরে পড়লো গঙ্গার বুক চিরে বিভিন্ন আলোয় ঘেরা একটা জলযান এগিয়ে আসছে। প্রথমে বুঝতে পারিনি ওটা ষ্টিমার, বেশ গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিলাম। রন্টুদার কথায় সম্বিৎ ফিরে পেলাম। 

রন্টুদা বললেন, এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা চলবে না রমা। আমাদের অনেকখানি পথ যেতে হবে। তার আগে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। একদিন সময় করে মহানগরীর দ্রষ্টব্য স্থানগুলো তোমাকে দেখাবো। রন্টুদার কথা শুনে আমার চোখ দুটো কৃতজ্ঞতা দীপ্তি বেরিয়ে এলো। হোটেলে এসে হাজির হলাম। হোটেলে রন্টুদা আমাকে বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্যে আপ্যায়িত করলেন। বাবার দুরাবস্থার কথা স্মরণ করে এই সময় খাবারে ছিলো না তৃপ্তি ও মনে ছিলো না শান্তি। 

রন্টুদার কথায় অতীতকে মুছে ফেলতে হলো। রন্টুদা বললেন, তোমাকে যে জায়গাতে নিয়ে যাচ্ছি, খুব সাবধানে থাকবে। কারণ আমি সর্বদা বাড়ীতে থাকবো না, প্রতিদিন রাত্রে বাড়ি ফিরি। আমার বিজনেসটাই ঐ প্রকৃতির। কোন প্রকারে বাড়ী হতে বাইরে পা দেবে না। কারো প্রলোভনে প্রলুব্ধ হবে না। কারণ কলকাতার মানুষকে চেনা বড়ই মুশকিল। দলে দলে শয়তানেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুযোগ পেলেই আর রেহাই নেই। আপাততঃ চার পাঁচ দিন বাড়ীতে বসে থাকতে হবে। আমার ইচ্ছে, তুমি টাইপ ক্লাস শেষ করে নাও, তারপর আমার বন্ধুর ফার্মে চাকরীর ব্যবস্থা করে দেবো। মেসোমশায়ের জন্য ভাবতে হবে না, মাসে মাসে টাকা পাঠিয়ে দেবো। 

কোন কথা না বলে ছলছল চোখে, রন্টুদার কৃতজ্ঞতা স্মরণ করে ছিলাম। রন্টুদা বলেছেন, তাহলে আজই টাইপ স্কুলের মাষ্টার মশাই কেদার বাবুর সাথে দেখা করে যাবো। যদি সিট খালি থাকে নতুবা পাঁচ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা হবেই। আমি বিশ্বাস রাখি ঈশ্বর আমাদের একাজে সহায় হবেন। আমি নীরব ছিলাম। ওকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা পাচ্ছিলাম না।



                                          ক্রমশ...