Monday, June 13, 2022
ছোট গল্প - মরণকূপ || লেখক - ঈশিতা বিশ্বাস চৌধুরী || Short story - Moronkup || Written by Isita Biswas Choudhary
Sunday, June 12, 2022
উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -6
রন্টুনা মায়ের মন্দিরে গিয়ে আমায় বলল, জানিস রমা অনেক দিন পর গ্রামে এজুম পূজো দেখতে। তোদের অবস্থা সুমন্তর কাছে শুনেছিলুম প্রথমত আমি বিশ্বাস। করতে পারিনি ওর কথা। কোন মানুষ যে এই অবস্থায় পড়ে ছেলেকে ডাক্তারী পড়াবেন। জামার কল্পনাতীত। তোর বাবার মতো ব্যক্তি এদেশে বিরল। শত কষ্ট স্বীকার করে। ছেলের ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে প্রয়াসী হয়েছেন। বলতো রমা এইরূপ ত্যাগ স্বীকার। করে ক'জনই করতে পারেন। তোদের এইরূপ অবস্থা দেখে সংকল্প করেছি তোদের এই দুঃখের আমি অংশীদার হতে চাই। এই মায়ের মন্দিরে শপথ করছি তোকে আমি নিজের বোনের মতো দেখবো। রন্টুদার চোখের সামনে করুণ ছায়া নেমে এলো। পুনরায় আর্দ্র গলায় বলতে শুরু করলো, তোর দাদার সাথে মাত্র একটি বছর ডাক্তারী পড়ার সুযোগ পেয়েছিলুম, কিন্তু ভাগ্যবিড়ম্বনার জন্য সব কিছু হারিয়ে ফেললুম, অর্থাৎ নিজস্ব অর্থ না থাকলে এই বর্তমান যুগে কোন কাজেই সম্ভব নয়। মাসীমার অপার করুণায় ডাক্তারী পড়লুম। তাও কপালে সইলো না। এক বৎসর পরেই ডাক্তারী পড়ায় ইস্তফা দিতেও হলো।
রন্টুদা গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, সে অনেকবারে। তবে তোর মতো বোনকে লাভ করে আমি ধন্য হয়েছি। কারণ, দেখলাম রন্টুদার চোখ দুটো বাষ্পাকূল হয়ে গেলো। বার কয়েক ঢোক গিলে পুনরায় দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। ওর ঐরূপ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে কেমন যেন হয়ে গেলাম। মনটা বড় আকূল হয়ে উঠলো। মনের মধ্যে প্রশ্ন জেগে উঠলো, হঠাৎ রন্টুদার এ অবস্থা হবার কারণ কি!
আমি জিজ্ঞাসা করার আগে বলল, আজ বহুদিন পর আমার হারানো বোনকে ফিরে পেলাম।
ওকথা শুনে আরো কৌতূহল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছি।
বলল, জানিস রমা, দেখতে সে তোর মতই ছিলো। তোর চেহারার মধ্যে অনেকটা সাদৃশ্য ছিলো। ওকে বড় ভালোবাসতাম রে। কিন্তু হতভাগী যে অকালেই চলে যাবে ভাবতে পারিনি। তার অকাল বিয়োগ আমাকে পাগল করে তুলেছিলো ও বিধাতার এই নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে আমি বিদ্রোহী হয়েছিলুম।
স্থির হয়ে তার কথাগুলো শুনছিলাম। দাদা অনেক আগে আমাদের কাছ হতে সরে গিয়ে পাড়ারই এক ছেলের সাথে গল্পে মেতেছিলো। আমার তার দিকে মোটেই খেয়াল ছিল না। রন্টুদার মলিন মুখ দেখে বেদনায় আকূল হয়েছিলাম। রন্টুদা বলে চলেছে। তখন হতে কোন পল্লী অঞ্চলে যেতে চাই না। কারণ পল্লী অঞ্চলেই হারিয়েছিলুম বোনকে। এখানে না আছে কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্র না আছে কোন চিকিৎসার সুব্যবস্থা। এমনকি একটা ডাক্তার পর্যন্ত থাকে না। যদি সে ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে মনে হয় বোনকে হারাতাম না। তোর বাবা উপযুক্ত কাজ করেছেন। সুমন্ত ডাক্তারী পড়ার কারণ আমি সব শুনেছি। সুমন্ত ডাক্তারী পাশ করলে তোদের গ্রামে অনেক উপকার হবে। পল্লী গ্রামের চিকিৎসা অপ্রতুলতায় আমার বোনের জীবনদ্বীপ যে অকালে নির্বাপিত করে দিয়েছে। হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো আমার,
কি করে হারালো রন্টুদা?
সে অনেক কথা রমা। শুনবি?
শুনবো রন্টুদা।
রন্টুদা মুখটাকে রুমাল দিয়ে মুছে বলতে শুরু করলো। গোল বেঁধে ছিলো ওখানে যদি মামার দেওয়া জিলিপিগুলো না খেতো তাহলে মনে হয় পুনরায় মুখটা মুছলো। দেখলাম কিছুক্ষণের মধ্যে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে এলো। বেশ কিছু দিন আগে আমার মেজমামা আমাদের আনতে গিয়েছিলেন গ্রামের কীর্ত্তন উপলক্ষ্যে। আমার মামাবাড়ী পল্লী অঞ্চলে। যেখানে শুধু সবুজের সমারোহ। তাকাচ্ছে চারিদিকে আড়াল করে থাকে পুকুরকে। ভোরে কোকিলের কণ্ঠস্বর মনকে বড় মাতোয়ারা করে দেয়।
সেই পল্লী গ্রামেই ছিলো আমার মামা বাড়ী। মা'র সাথে আমিও আমার বোন, হাজির হলুম মামা বাড়ীতে। বেশ ভালো লাগছিলো গ্রামখানিকে। বহুদিন পর মামাবাড়ীতে এলুম। ছোটবেলাতে কয়েকবারই এসে ছিলুম। তারপর বয়বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মামাবাড়ীর আকর্ষণ অনেকটা হ্রাস পেয়েছিলো। কিন্তু মা'র কথা কাটতে পারলাম না। কীর্ত্তন মোটেই ভালো লাগতো না। মামাতো ভাই সুব্রতর সাথে নানান জায়গায় আড্ডা দিতাম। পর পর দুটো দিন নানা রঙে ঢঙে তামাসায় কেটে গেলো। ভাবতে পারিনি কিভাবে সময় কাটছিলো। তৃতীয় দিন আমাদের সকলের মধ্যে যে শোকের ছায়া নেমে আসবে কোন মুহুর্তের জন্য ভাবতে পারিনি। মামা বাড়ীতে যে বোনটার উজ্জ্বল শিখা নিভে যাবে তা বুঝতে পারিনি।
ঐদিন কীর্তনের শেষে আমরা সকলেই উঠানে বসে আছি। একটু পরে গ্রামের বুকে অন্ধকার নেমে এলো। মামা একসময় বড় প্যাকেটে কিছু গরম জিলাপী নিয়ে এলেন। সকলের হাতে কিছু কিছু দিলেন। বেশ হৈ হুল্লোড়ে সকলেই কিছু কিছু খেয়ে ফেললুম। ঘন্টাখানেক পর শুরু হলো এক করুণ দৃশ্য। সে দৃশ্য আমার জীবনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। খাদ্যে বিষক্রিয়া শুরু হলো। বুঝতে পারলাম, এটা নিশ্চয়ই ফুড পয়েজিং এর কেস। যারা শক্তিশালী তারা সহ্য করতে পারল কিন্তু আমার বোন বীনা ও মামাতো বোন গোপা বিষক্রিয়ায় শিকার হয়ে উঠলো। আমি পাগলের মতো ডাক্তার ডাকার জন্য চিৎকার করতে থাকলাম। কি করবো অরণ্যের রোদন করে। ঐ এলাকায় কোন ডাক্তার নেই তো গ্রামের লোকেরা কি করবে।
বীনার শেষ অবস্থা ঘনিয়ে এলো। গরুর গাড়ীতে করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাবার ব্যবস্থা করলাম। গ্রাম থেকে পাঁচ মাইল দূরে হাসপাতাল। গোপা ও বীনাকে হাসপাতালে পৌঁছাবার আগেই বীনার জীবন দ্বীপ নিভে গেলো। সে চিরদিনের মতো আমাদের ছেড়ে পরম শান্তি লাভ করলো।
রন্টুদা চুপ করলো। ওর চোখ দিয়ে গরম জল নির্গত হলো। লোমশ বুকের মধ্যে। হাত রেখে বার কয়েক ঢোক গিলে বলল, ওর মৃত্যুতে বড় দুর্বল হয়ে পড়েছিলুম। বিশেষ করে মা ওর শোক সহ্য করতে না পেরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। সেই রোগ শয্যা হতে তিনি আজও পর্যন্ত উঠতে পারেননি। মনে হয় আর বাঁচবেন না। বীনার মতো উনারও আয়ু শেষ হয়ে এসেছে।
রন্টুদার দীর্ঘশ্বাস পড়লো, সে অপলক নেত্রে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকলো। মনে হয় সেই শোকাবহ ঘটনা তার স্মৃতিপটে উদিত হওয়ায় সে বেসামাল হয়ে পড়েছে। পর পর দুবার ডাক দেওয়ার পর আমার কথায় সাড়া দিলো। আমি ওর কাছে গিয়ে ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, অতীতকে মনে এনে নিজেকে দুর্বল কোরো না রন্টুদা। ওর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। শুধু তোমার বোন বীনা কেন, ঐ বয়সর কত কত মেয়ে অকালে ঝরে যাচ্ছে বলে কি বিধাতার উপর দোষারূপ করবো? নিয়তিকে কেউ বাধা দিতে পারে না। জানবে আমার মধ্যে তোমার হারানো বোন ফিরে পেয়েছো। দাদা কতক্ষণ আগে যে আমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে তা লক্ষ্য করিনি। হঠাৎ ওর কণ্ঠস্বরে চমকে উঠলাম।
দাদা বলল, তোদের এই স্নেহের বন্ধন আমার মনে এক অপার্থিব আনন্দের স্পর্শ এনে দিয়েছে। রন্টু আশাহত ছেলে। ও জীবনে অনেক কিছু করবে ভেবেছিলো কিন্তু এ সমাজের নিষ্ঠুরতার ওকে বলি হতে হয়েছে। সে অনেক কথা, ওর জীবনী নিয়ে একদিন বলবো তোকে। তবে মনে রাখিস ওকে ভ্রাতৃপ্রতিম মনে করে যথেষ্ট জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিস।
বললাম, রন্টুদা আমার আপন দাদা, তাই চিরদিনই ওকে মনে রাখবো।
কি রে রন্টু, রমাকে পেয়ে তোর জীবনের ভগ্নি হারানোর শূন্যতার স্থান পূরণ করলি তো?
রন্টু ঘাড়টা নাড়লো। মিনিট খানেক পরে নীরব থাকার পর আমরা সকলে বাড়ী যাবার জন্য পা বাড়ালাম। রন্টুদা বাক্যালাপ না করে আমাদের পিছনে হাঁটতে থাকলো। বাড়ীতে গিয়ে বাবাকে রন্টুদার বোনের নিয়ে কথা বললে প্রথমতঃ তিনি দুঃখ পেয়েছিলেন।
এমনি আনন্দের মাঝে শারদীয়া পূজো কেটে গিয়ে ওদের বিদায়ের দিন ঘনিয়ে এলো। ওদের বিদায় দিতে হবে শুনে মনটা বড় কেঁদে উঠলো। মনে হলো ওদের যেন হারিয়ে ফেলছি। মন চাইছিলো ওরা যেন আজীবন আমাদের কাছে থাকে। কিন্তু কর্তব্যের অনুরোধে তাদের ছাড়তে বাধ্য হলাম। ওদের কর্তব্যে বাধা দেওয়া আমার কাম্য নয়।
রন্টুদাকে প্রণাম করে বার বার আসতে বললাম। সে সম্মতি জানালো নিশ্চয়ই আসবে দাদা বিদায়ের আগে বলল টাকা পাঠাবার জন্য। বাবা কথা দিলেন যথা সময়ে ওর নিকট পৌঁছিয়ে দেবেন ওরা বিদায় নিলো। আমি ও বাবা কিছু দূরে এগিয়ে দিয়ে বাড়ীতে ফিরে এলাম।
ক্রমশ...
Saturday, June 11, 2022
ছোট গল্প - প্রায়শ্চিত্ত || লেখক - তপন তরফদার || Short story - Praichitto || Written by Tapan Kumar Tarafdar
Friday, June 10, 2022
ছোট গল্প - হানাবাড়ি || লেখক - সন্দীপ কুমার পণ্ডা || Short story - Hanabari || Written by Sandip Kumar Panda
Thursday, June 9, 2022
উপন্যাস - লাস্যময়ীর ছোবল || সিদ্ধার্থ সিংহ || Lashamayir Chobol by Sidhartha Singha || Fiction - Lashamayir Chobol part -5
Wednesday, June 8, 2022
ছোট গল্প - আমি তো জারজ || লেখক - অষ্ট দেয়াশী || Short story - Ami to jaraj || Written by Asto deasi
আমি তো জারজ
Monday, June 6, 2022
ছোট গল্প - শত্রু-মিত্র || লেখক - সামসুজ জামান || Short story - Satru Mitra || Written by SAMSUZ ZAMAN
শত্রু-মিত্র
সামসুজ জামান
ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট এর বাইরে থেকে কাঁচ ঘেরা কেবিনের দুটো বেডের দিকে ক্রমাগত চোখ রাখছিলো জনার্দন। দুটো বেডের একটাতে তার ছেলে যতীন এবং অন্যটাতে ছোট ভাই বলরাম। চোখ থেকে টস টস করে জল পড়ছিল জনার্দনের। ভাবছিল কি করে এমন সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল?
দুটো পরিবারের মধ্যে ইদানিং কালের সম্পর্কটা খুব খারাপ অবস্থায় পৌঁছে ছিল। কিন্তু এমন সম্পর্ক তাদের মধ্যে আগে কোন দিনই ছিল না। বরং সকলেই পাড়ার মধ্যে এই দাদা ভাইয়ের একেবারে হরিহর আত্মার সম্পর্কের কথা জানত। তবে সব বদলে গেল একটা রাজনৈতিক কারণ থেকে। বলরাম, সাগর বাবুর রাজনৈতিক দলে নাম লেখানোর পর থেকেই। জনার্দন চিরকালই দীপেশ বাবুর পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী। পার্টির একজন নামকরা জান লড়িয়ে দেওয়া কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিল দীপেশ রায়ের পার্টিতে, তার ডানহাত বাঁহাত বলা হত।
বলরাম ছেলেটা সমাজকর্মী হিসেবেই পরিচিত কিন্তু সে যখন সাগর বাবুর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সঙ্গে থেকে কাজকর্ম করা শুরু করল তখন থেকেই নানাভাবে তার উপর চাপ এল। সে যেন ওই পার্টির সমস্ত কাজ থেকে নিজের নামটা তুলে নেয়। বলরাম জানতো দুর্নীতির সঙ্গে তার কোনো আপস নেই। আর সে পার্টির কাজ করবে গরিব দুঃখী জনগণের স্বার্থেই, রাজনৈতিক ধামাধরা কোন কাজ কর্মের জন্য সে পার্টিতে নাম লেখায়নি।
এক রাতে সে যখন ঘুমোচ্ছে, কেউ এসে তার নাম ধরে ডাকতেই কিছু না ভেবে সে দরজা খুলে দিয়েছিল। দীপেশ রায়ের পার্টির লোকজনরা মুখে মুখোশ পড়ে তার ঘরে এসে আক্রমণ চালাল। মোটামুটি ভাবে হুমকি দেয়া হয়েছিল,তবে মুখোশের আড়াল থেকে দু-একজন যে দুটো থাপ্পর দেয়নি তা নয়। বলরামের সেদিন থেকে যেন জেদ আরো বেশি চড়ে গেল এবং সে প্রতিজ্ঞা করল কোনভাবেই পার্টি থেকে নাম তুলে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
জনার্দন বেশ হাসি খুশির সঙ্গেই বাড়িতে ফিরল তবে ছোট ছেলেটার কান্না শুনতে শুনতে। তার বউ তারামণি জানাল ছেলেটা খুব কষ্ট পাচ্ছে, বারবার পেটে হাত রাখছে কিন্তু বুঝিয়ে বলতে পারছে না কি তার অসুবিধা। তার বউ আরও বলল- দেওর কে জানাব? ওদের তো এখন রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে রয়েছে। হয়তো ছেলেটার কোন ভাল ব্যবস্থা হতে পারে চিকিৎসার। কথাটা শুনেই চিৎকার শুরু করে দিলো জনার্দন। তারামণি চুপ করে গেল ভয়ে।
এখন কেউ বলরাম কে দল থেকে দূরে রাখার কথা ভাবতেই পারেনা। ছেলেটা ইতিমধ্যেই যেভাবে নাম কামিয়েছে, বিশেষ করে গরীবগুর্বো মানুষেরা বলরামদা বলতে যেন অজ্ঞান। যেকোনো ধরনের ঝামেলা, অশান্তি , অভাব-অভিযোগ, সমস্যা যাই ঘটুক না, বলরাম এক পায়ে খাড়া। আর তার বাড়ি থেকে সাহায্য সহযোগিতা ও প্রচুর মাত্রায়। বলরাম পার্টিতে নাম লেখানোর আগে ভাবেনি কিন্তু পিছন থেকে যদি স্ত্রী সুনন্দা সাহায্য সহযোগিতা না করলে সে একজন সফল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এভাবে বিবেচিত হতো না।
সমস্যাটা এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। জনার্দন কোনমতেই সহ্য করতে পারছিল না বলরামের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। গোপনে গোপনে গ্রামের ধান্দাবাজ ছেলেদের লড়িয়ে দিয়ে নানাভাবেই অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য এক পায়ে খাড়া ছিল সে। আর গত পঞ্চায়েত ভোটে সাগর বাবুর রাজনৈতিক দল জয়লাভ করার পর থেকেই জনার্দন আর বলরাম একেবারে সাপে-নেউলে। অবশ্য সেটা মূলতঃ জনার্দনের দিক থেকেই। তারা একই জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর কিন্তু এখন তাদের দুটো পরিবারকে দেখলে কেউ অন্তত একথা বলবে না।
বলরাম সেদিন আসছিল রাস্তা দিয়ে বৌদি ছুটে এসে বলল- ভাই, একটা কথা বলব,রাখবে? একটু অবাক হয়ে বলরাম বলল - বৌদি ওই ভাবে বলছ কেন? কি দরকার বল না?
- বলতে পারি কিন্তু দাদা জানলে আমার আর কিছু বাকি রাখবে না।
- তুমি নির্ভয় বলো। - উত্তর দিল বলরাম।
- ছেলেটার কি যে হচ্ছে পেটের মধ্যে, খুব অসুবিধা, অস্বস্তি, কষ্ট পায়, যন্ত্রণা ভোগ করে। তোমার দাদা তো নজরই রাখে না। অনন্ত বাবুর হোমিওপ্যাথিই ভরসা। তবে দিন দিন বাড়ছে, আমি তো মা, তাই বুঝি- বলতে বলতে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল বউদি। - একটু ব্যবস্থা করে দাও না ভাই যেমন করে হোক।
বলরাম ডক্টর সিকদার কে ফোন করে ঘটনাটা জানালো। বৌদিকে বলল তুমি যেভাবে হোক ডঃ শিকদারের কাছে নিয়ে যাও ওনার সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। উনি চিকিৎসা করাবেন কিন্তু দাদাকে আমার নাম জানিও না তাহলে চিকিৎসা করাতে দেবে বলে মনে হয় না। বউদি ওই অবস্থায়ও একটু হাসল, বলল – সে আর আমি জানি না!
বৃষ্টি হচ্ছিল কদিন থেকে প্রচুর মাত্রায়। তার মাঝেই ময়ূরাক্ষী যেন একেবারে নিজের স্রোত উজাড় করে দিল। বন্যায় গ্রামকে গ্রাম তলিয়ে যাবার জোগাড়। এমনিতেই নন্দপুরের সাধারণ মানুষের বড় বেহাল অবস্থা। এরপর থেকে গ্রামীণ মানুষগুলোর সর্বাঙ্গীণ অবস্থা খুব খারাপ পর্যায়ে পৌঁছলো। প্রথম দু-চারদিন তারা কোনমতে কষ্টেসৃষ্টে চালিয়েছিল। নিজেদের ঘরের লাউ, কুমড়ো, এঁচোড়, ইত্যাদি নিয়ে ভাগ-যোগ করে দুটো ভাত কোনরকমে তারা গিলতে পারছিল। কিন্তু ঘরের অবস্থা সবারই খারাপ। তাই বেশিদিন চালানোর মত সামর্থ্য ছিল না।
খুব তৎপর হয়ে বলরাম, সাগরবাবুর মাধ্যমে গ্রামের মানুষদের জন্য অনেক ত্রাণসামগ্রী জোগাড় করেছিল। বরাবরই সাগর বাবুর তার উপর খুবই ভরসা। বলরাম নিজের বাড়ির একটা ঘরে সেসব সামগ্রী যত্ন করে রেখে দিচ্ছিল অসহায় মানুষদের মুখের গ্রাস। মাথায় তুলে রাখার মত সম্পদ এগুলো তার কাছে। একটু একটু করে এসব তার সঙ্গী সাথী নিয়ে সে গরিবদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছিল।
সেদিন সকালবেলায় তার বাড়ির সামনের দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুনে বলরাম ছুটে বেরোতেই, মানিক বলল- দাদা, দেখেছো, তোমার ঘরের পিছন দিকের দরজা ভাঙ্গা। শুনে আঁতকে উঠল বলরাম। সে কিরে! বলিস কি? বন্যার ত্রাণসামগ্রী সব তো ওঘরেই রাখা আছে! দ্রুত সবাই মিলে ছুটল সে ঘরের দিকে। যা ভাবা তাই! ত্রাণ সামগ্রীর ছিটেফোঁটাও কোথাও নেই।
গ্রামে উত্তেজনা বাড়লো। বিরোধী দল থেকে বলাবলি শুরু হল-প্রথম প্রথম ভালো কাজ দেখিয়ে বলরাম সকলের সমীহ আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু আসলে সে একটা ফেরেববাজ, শয়তান। গোপনে এই ত্রাণের সামগ্রী বিক্রি করে তার পকেটস্থ করেছে সে।
থানা পুলিশ হল। আত্মপক্ষ সমর্থনের তেমন কোন সুযোগ তার সামনে ছিল না। সুতরাং গ্রেফতার হল বলরাম। কেস চলতে থাকলো তবে সাময়িকভাবে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হল। আরো কিছুদিন যেতে না যেতে উপযুক্ত সাক্ষী প্রমাণের অভাবে বলরাম নির্দোষ প্রমাণিত হলো। সদর থেকে গ্রামে ফিরতেই বলরাম শুনল ভাইপো যতীন কে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। তার কিডনির অবস্থা খুব খারাপ। কদিন ধরেই ছেলেটা খুব কষ্ট পাচ্ছিল। সময়ে সময়ে বলরাম ডঃ; শিকদারের কাছ থেকে সব খবরই পাচ্ছিল। রোগীর খুব অবস্থা খারাপ হওয়ায় শিকদার স্যর তাকে পাঠিয়েছেন সদর হাসপাতালে।
তার দুটো কিডনিই একেবারে অচল। খুব কষ্ট পাচ্ছে ছেলেটা। জনার্দন এসে ভাইয়ের হাত দুটো ধরে বলল- কিছু ব্যবস্থা কর। ভাইপো টা যে মরে যাবে! ভাইপোর খবর শুনেছিস? তার কিডনির খুব সমস্যা। আমার মত মানুষ পয়সা কড়ি কোথায় পাবো বলতো? কিডনি জোগাড় করা তো চাট্টিখানি কথা নয়!
অনেক দৌড়ঝাপ করে বলরাম কলকাতা মেডিকেল কলেজের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভাইপো কে স্থানান্তরিত করল। দুটো কিডনিই তার অচল। সুতরাং কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন এর ব্যবস্থা না করলে এই ছেলের বাঁচার কোন সম্ভাবনাই নেই। দাদা তার হাত দুটো ধরে কেঁদে ফেলল- আমার মত মানুষের পক্ষে কি করে সম্ভব বলতো কিডনির আমি কি ব্যবস্থা করব? বলরাম বলল তুমি ভাবছো কেন তোমার ছোট ভাই তো বেঁচে আছে এখনো। এরপরের কাহিনী ইতিহাস।
ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট এর ভিতর এখন সেই দুটি প্রাণী। একটি বেডে বলরাম, অন্য বেডে ভাইপো যতীন। বলরাম খুব সানন্দে ভাইপো যতীনকে তার একটা কিডনি দানের অঙ্গীকার করেছে। সবকিছু মিলে যাওয়ায় চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেও কোন অসুবিধার সৃষ্টি হয়নি। অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে দু'ঘণ্টা কিভাবে অতিবাহিত হয়েছে তা বলে বোঝানো মুশকিল। তিনটি প্রাণী বাইরে দাঁড়ানো - দুই ভাইয়ের স্ত্রী এবং জনার্দন। একটু দূরে গ্রামের অগনিত লোকজন। সাগর বাবু নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না, দশ বার আসা-যাওয়া করছেন। অপারেশন থিয়েটার থেকে নির্বিঘ্নে বলরাম এবং যতীনকে বের করে আনা হয়েছে। তারপর থেকেই আই সি ইউ এর কেবিনে বাইরে থেকে তারা নিষ্পলক চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে। অক্সিজেন, রক্ত, স্যালাইন, কি না কি চলছে! দুটো দেহ পাশাপাশি বেডে - একজন দাতা অন্যজন গ্রহীতা।
একসময় ভিতর থেকে কাঁচের দরজা খুলে নার্স একটু উঁকি দিতেই তৎপর হয়ে দৌড়ে গেল সুনন্দা আর তারামণি - কি হয়েছে, কেমন আছে? – উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করল ওরা দুজন। নার্স জানাল- কিডনি গ্রহণ করে ছেলেটি সুস্থ হয়ে উঠছে বেশ,তবে অজ্ঞান অবস্থায় থাকবে আরও দশ বার ঘন্টা। কিন্তু কিডনিদাতার এখনো বিপদ কাটেনি, ঠিকভাবে জানতে সময় লাগবে আরও চব্বিশ ঘন্টা। -ঠাকুর, রক্ষে কর আমার ভাইকে- আর্তনাদ করে উঠল তারামণি। আর অধরটা দাঁতে কামড়ে ধরে থর থর করে কেঁপে উঠল সুনন্দা।
চোখের পলক পড়ে না দু-তিনটি প্রাণী একভাবে হাসপাতালের দরজার বাইরে অপেক্ষমান। কখন ভালো খবর আসে এই অপেক্ষায়।
– একটু জল খাও তো বোন, বলে তারামণি জলের বোতলটা জোর করেই সুনন্দার হাতে গুঁজে দিয়েছে। আর ঠিক সে সময় হঠাৎই- সরে যান, সরে যান, বলতে বলতে দু-তিন জন ডাক্তার ছুটে গেলেন ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটের ভিতরে। মুহূর্তেই যেন হাসপাতাল চত্বর টা অন্য রূপ পেল। ডাক্তার নার্সদের তড়িঘড়ি ছোটাছুটি, মুহুর্তের মধ্যে যেন পরিস্থিতি টাকে একটা উত্তেজনার শিখরে পৌঁছে দিল।
-কি হয়েছে, কাঁচের দরজার কাছে বিস্ময়ে ছুটে গেল সুনন্দা। - আরে সরে যান তো! কাজের ডিস্টার্ব করবেন না - বলতে বলতে একজন নার্স সুনন্দাকে প্রায় ধাক্কা মেরে ভিতরে ঢুকে গেল। কেবিনের গ্লাসে চোখ রেখে সুনন্দা আর তারামণি দেখছিল ভিতরে কি কান্ড ঘটছে। কিন্তু হঠাৎ স্ট্যান্ড দেওয়া পর্দা দিয়ে ঘিরে দেওয়া হলো বলরামের বেড টা। ভিতরে ডাক্তার নার্সদের ছুটোছুটি বাইরে থেকে দেখার আর উপায় রইল না ! এক-একটা মুহূর্ত যেন এক-একটা দিন-রাত্রি সমান।
বড় জা ছোট কে সান্তনা দিচ্ছিল - ভয় পেয়ো না বোন, সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু ধৈর্য ধরো ....... আরো কি কি বলতে যাচ্ছিল। ভিতর থেকে একজন সিস্টার বেরিয়ে এসে খবর দিলেন- কিডনি নিয়ে বাচ্ছাটা তো বেশ ভাল, খুব ভালভাবেই কিডনি নেওয়া-দেওয়া হয়েছে। তবে কিডনি দাতার অবস্থা ক্রমশঃ খারাপ হচ্ছিল আর দুর্ভাগ্য যে আমরা অনেক চেষ্টা করেও ওনাকে বাঁচাতে পারলাম না! কথাগুলো শোনা মাত্রই সুনন্দা এক মুহূর্ত চুপ করে ভাবল- সে কি ঠিক কথা শুনল? তার স্বামী সত্যি বেঁচে নেই? তারপরেই পাগলের মত চিৎকার করে উঠল- এই ডাইনি চুপ কর, বাজে কথা বলার জায়গা পাস নে!
বাইরে বেরিয়ে আসা এক ডাক্তারবাবুর পা দুটো ধরে জনার্দন তখন পাগলের মত চিৎকার করছে- আমার ভাইকে বাঁচান ডাক্তারবাবু, আমার ভাইকে বাঁচান! ওর মতো মানুষ দুটো হয় না। ওকে যা হোক করে ফিরিয়ে দিন, আমি ওর সাথে কোনদিন আর দুর্ব্যবহার করব না, আপনি যা হোক করে ওকে ফেরান ডাক্তারবাবু। ডাক্তারবাবু সান্ত্বনা দিলেন- তা কি আর হয় ভাই, যে যাবার সে চলে গেছে। তাকে ফেরানো কি আর আমাদের হাতে?
কোন কথাই শুনতে চাইছিল না জনার্দন – চিৎকার করে বলল -জানেন ডাক্তারবাবু, আমার ভাই আসলে দেবতার মত। ডাক্তার বাবু, আপনারা চেষ্টা করে ওকে ফিরিয়ে দিন যেমন করেই হোক। ডাক্তার বাবু জনার্দনের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন বাবা যা হবার হয়েছে আর তো আমাদের কিছু করার নেই। তুমি ঘরে ফিরে যাও। ভাইয়ের দেহ সৎকার করার ব্যবস্থা করো।
সাগর বাবু আর তার লোকজন সবাই তখন ভীড় করে এসে দাঁড়িয়েছে। জনার্দন ডাক্তারবাবুকে ছেড়ে ছুটে গিয়ে বৌমার পা দুটো চেপে ধরল - জানো বৌমা একদিন তোমাদের ঘর ভেঙে বন্যা ত্রাণের সামগ্রীগুলো লোকজন নিয়ে আমরা চুরি করেছিলাম, অকারনে ওকে কলঙ্কিত করতে। সে কথা বুঝতে পেরেছিল বলরাম কিন্তু প্রতিশোধ নেয়নি, এমনই দেবতার মত মানুষ আমার ভাই। তার বদলে ও নিজের কিডনি দিয়ে আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে আজ নিজে নিজে চলে গেল। বৌমা বলতো এই শাস্তি আমি কি করে মাথা পেতে নিই? কি করে সহ্য করি?
সুনন্দা তখন পাথরের মত মুখ করে ভাসুরের দিকে তাকিয়ে। ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না সে রক্তমাংসে গড়া কোন মানুষ, নাকি পাথরে গড়া কোন প্রতিমা!






