Thursday, June 23, 2022

উপন্যাস - লাস্যময়ীর ছোবল || সিদ্ধার্থ সিংহ || Lashamayir Chobol by Sidhartha Singha || Fiction - Lashamayir Chobol part -7


 


সাত

টেলিফোন ভবনে ঢোকার মুখেই পর পর তিন-চারটে কয়েন-বুথ। এক টাকার কয়েন ফেলে ঋজু টপাটপ বোতাম টিপল কণিকার মোবাইলে— আমি এসে গেছি।
— কে বলছেন?
থমকে গেল ঋজু। এত দিন কথা বলার পরেও ওর গলার স্বরটা কণিকা চেনে না! — আমি।
— ও।
— কখন নামবে?
— আমি বেরিয়ে পড়েছি।
আর এক বার ধাক্কা খেল ঋজু। কয়েক দিন আগে পর্যন্ত ও প্রায় রোজই ঠিক এই সময়ে আসত। এসে, ফোন করলে কণিকা নামত। কোনও কোনও দিন পাঁচ-দশ মিনিট, আবার কখনও সখনও আধ ঘণ্টাও দাঁড়িয়ে থাকতে হত ওকে। কিন্তু কণিকা তো কোনও দিন পাঁচটার আগে বেরোয় না! তা হলে কি পাঁচটা বেজে গেছে! ও কোনও দিন ঘড়ি পরে না। সামনে দিয়ে একটা লোক যাচ্ছিল। ও তাকে জিজ্ঞেস করল, ক’টা বাজে? লোকটা বলল, পাঁচটা পঁচিশ।
মাত্র দু’দিন আসেনি সে। তাতেই এই! একটু অপেক্ষা করতে পারল না!

মুক্তাঙ্গনের ওই অনুষ্ঠানে ঋজুর অনেক বন্ধুবান্ধব এসেছিল। যাদের সঙ্গে ওর নিয়মিত যোগাযোগ আছে, তারা যেমন এসেছিল, এসেছিল তারাও, যাদের সঙ্গে ওর দেখা হয় ছ’মাসে ন’মাসে এক-আধ বার। এসেছিল বারুইপুরের হাননানও। তার সঙ্গে এসেছিল বীরেন্দ্র পুরকাইত নামে একজন। উনিও বারুইপুরে থাকেন। বারুইপুরের লোক শুনেই, অত ব্যস্ততার মধ্যেও ঋজু তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, বারুইপুরের কোথায় থাকেন?
উনি বলেছিলেন, সুবুদ্ধিপুরে।
— সুবুদ্ধিপুরে? আমি তো আগে ওখানে পড়াতে যেতাম।
— অত দূরে?
— না না, ওখানে আমাদের একটা বাড়ি আছে।
— কোথায়?
— সালেপুরে।
— তাই নাকি? আগে ওখানে থাকতেন?
— না না। আসলে, সানন্দায় আমি একটা গল্প লিখেছিলাম। সেটা নিয়ে খুব ঝামেলা হয়েছিল। সে সময় মা বললেন, যতই পুলিশ প্রোটেকশন দিক, রাজনীতির লোকেরা তো ভাল হয় না। অত রাত করে ফিরিস। কে কখন পেছন থেকে কী করে দেবে, কী দরকার? জায়গা যখন আছে, ক’টা দিন বারুইপুরে গিয়ে থাক না... তখন তিন-চার মাস ছিলাম। সকালে উঠে কী করব! সময় কাটত না। সেই সময় ওই টিউশুনিটা করতাম।
— কাকে পড়াতেন?
— তার নাম কি আর মনে আছে? ছেলেটার বাবা পুলিশে কাজ করত। ওরা তিন ভাই। ওদের বাড়িতে তিন-চারটে বকফুল গাছ ছিল।
— ও, বুঝে গেছি, বুঝে গেছি। শীতলদের বাড়ি। আমার পাশেই থাকে।
— তাই নাকি? ওরা ভাল আছে?
— হ্যাঁ হ্যাঁ, শীতলের বড় ছেলে, যার নাম লালু, সে তো এখন এল আই সি করে। মেজোটা বোধহয় উচ্চ মাধ্যমিক দেবে... কি দিয়েছে। আর ছোটটা মনে হয় এইট না নাইনে পড়ে।
— বাবা, এত বড় হয়ে গেছে? কত দিন ওদের দেখিনি!
— একদিন আসুন না গরিবের বাড়ি। ওদের সঙ্গেও দেখা করে যাবেন।

না। বীরেনবাবুর আমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য নয়, তার ক’দিন পরেই ঋজু তাঁর বাড়ি গিয়েছিল, শুধুমাত্র ওই সুযোগে তার এক সময়ের ছাত্র লালুদের বাড়িতে ঢু মারার লোভে।
লোভই তো। ছাত্রের মা, যাঁকে ও বউদি বলে ডাকত, তিনি তখন বেশ ডাগরডোগর। কেউ বলবে না, উনি তিন-তিনটে বাচ্চার মা। গায়ের রং একটু মাজা ঠিকই, কিন্তু মুখখানা খুব ঢলোঢলো। প্রথম দর্শনেই ওই মুখের মোহে পড়ে গিয়েছিল ও।
তাই, উনি যখন বলেছিলেন, আমার তিনটে ছেলেকেই পড়াবেন। বড়টা থ্রি-তে পড়ে। মেজোটা টুয়ে। আর ছোটটা তো এখনও স্কুলেই ভর্তি হয়নি। সামনের বছর হবে। ওদের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ওকেও একটু অ আ ক খ, এ বি সি ডি, এক দুই শিখিয়ে দেবেন, ব্যাস। কত দিতে হবে?
ও তখন বলেছিল, আপনার যা মনে হয়, দেবেন। আপনি যদি এক টাকাও দেন, আমি পড়াব।
উনি কী বুঝেছিলেন, কে জানে! হয়তো ভেবেছিলেন, দৈনিক এক টাকা হিসেবে পেলেও তাঁর ছেলেদের ঋজু পড়াবে। তাই পরের মাসে মাস্টারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ঝকঝকে তিনটে দশ টাকার নোট।
পড়ানোটা ছিল অজুহাত, আসলে সকালবেলায় ও ওই বাড়ি যেত শুধু বউদির মুখখানা দেখার জন্য। রবিবারও বাদ দিত না। সকাল সাতটার মধ্যে ঢুকে পড়ত। যতক্ষণ না ওদের মা, স্কুলে যাবার জন্য ওদের তাড়া লাগাতেন, ও পড়িয়ে যেত।
ছাত্রের বাবা শীতলবাবু কাজ করতেন পুলিশে। এক সপ্তাহ অন্তর অন্তর টানা ছ’দিন করে তাঁর নাইট ডিউটি পড়ত। অতটুকু-টুকু বাচ্চাদের নিয়ে বউ একা থাকবে! তাই, পাশের বাড়ির একটা ছেলেকে তাঁর বাড়িতে রাতে থাকার জন্য বলেছিলেন উনি। ছেলেটা থাকত।
একদিন বোধহয় একটু বেশি সকালেই চলে গিয়েছিল ঋজু। গিয়ে দেখে, দরজা দেওয়া। ঠক্ ঠক্ করতেই খুলে গিয়েছিল সেটা। ভিতরে ঢুকে দেখে, বারান্দার চকিতে, যেখানে ও বাচ্চাদের নিয়ে পড়াতে বসে, সেখানে শুয়ে আছে ওই ছেলেটা। আর তার পাশে বউদি। ও তড়িঘড়ি ভিতর-ঘরে চলে গিয়েছিল। সে ঘরে মশারির ভিতরে তখন তিন-তিনটে বাচ্চাই ঘুমে কাদা।
হাত কামড়েছিল ঋজু। আহা! শীতলবাবু যদি তাকে রাতে থাকার জন্য বলতেন! কিন্তু না। কোনও দিনই তার ভাগ্যে শিকে ছেড়েনি। তাই বউদি স্নান সেরে ভিতর-ঘরে ঢুকলেই, ওই ঘর আর বারান্দার মাঝখানে যে জানালাটা ছিল, তার নীচে ছিল বেশ খানিকটা ফাঁকা। ও সেখান দিয়ে বউদির শাড়ি ছাড়া দেখত। ব্লাউজের বোতাম আটকানো দেখত। এবং বেশির ভাগ দিনই দেখত, উনি বোতাম লাগাতে গিয়ে বারবারই ভুল করছেন। উপরের হুকটা নীচের ঘরে। নীচের হুকটা উপরের ঘরে। তাই বারবার খুলছেন আর আটকাচ্ছেন।

চেতলায় ফিরে আসার পর কার কাছে যেন ঋজু শুনেছিল, ওই ছেলেটার সঙ্গে বউদির অবৈধ সম্পর্কের কথাটা নাকি জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। তাই ওই ছেলেটার বাড়ির লোকেরা রাতারাতি একটা মেয়েকে ধরে তার সঙ্গে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। সেই কবেকার কথা! তার মানে বউদি এখন ফাঁকা!
বীরেনবাবুর বাড়িতে এক কাপ চা খেয়েই সেই বউদির বাড়িতে ছুটেছিল ও। বাড়িতে তখন কোনও ছেলে ছিল না। এত দিন বাদে ওকে দেখে চমকে গিয়েছিলেন বউদি। আসুন আসুন বলে ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলেন। ভিতরে ঢুকে ঋজু অবাক। ঘরদোর সব পাল্টে গেছে। অনেক জিনিসপত্র হয়েছে। কথায় কথায় ও জেনেছিল, লালু এখন আর সেই ছোট্টটি নেই। অনেক বড় হয়ে গেছে। এল আই সি করে। শেয়ার কেনাবেচা করে। বাড়ির দালালিও করে। এই জমির পাশেই একটা প্লট কিনেছে। লোন নিয়ে বাড়ি করছে। ঋজু বলেছিল, আপনি কিন্তু আগের মতোই আছেন।
উনি বলেছিলেন, তাই নাকি?


তখন বইপ্রকাশ করার জন্য তরুণ কবি-লেখকদের পশ্চিমবঙ্গ সরকার আর্থিক অনুদান দিত। সে বার ঋজু পেয়েছিল। পুরো দু’হাজার টাকা। অষ্টআশি সালের দু’হাজার টাকা মানে প্রচুর টাকা। চার ফর্মার একটা বই করতে কি অত টাকা লাগে! হাতে টাকা ছিল। টাকা থাকলে বেড়ালের বাচ্চাও কেনা যায়। তাই ঋজু যখন শুনল, তার ছাত্ররা খুব কাছ থেকে কোনও দিন প্লেন দেখেনি, তখন লালুকে ও বলেছিল, তোমাকে একদিন দমদম এয়ারপোর্টে নিয়ে যাব। ওখানে মুহুর্মুহু প্লেন নামে আর ওঠে। একদম সামনে থেকে দেখতে পারবে।
শীতলবাবু সে কথা শুনে বলেছিলেন, তা হলে ওদের মাকেও নিয়ে যান না... ও-ও তো সামনাসামনি কখনও প্লেন দেখেনি। দেখে আসতে পারবে। আমি ভাড়া দিয়ে দেবো।
ঋজু বলেছিল, আমার কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু ওদের মা যদি যায়, তা হলে ওর ওই দুই ভাই কার কাছে থাকবে? শীতলবাবু বলেছিলেন, কেন? আমার কাছে। আমার তো নাইট ডিউটি। আটটার আগে তো বেরোব না। তার আগেই তো আপনারা চলে আসবেন, না কি?
মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে দাদা যাচ্ছে শুনে, মেজো আর ছোটটাও যাবার জন্য বায়না ধরেছিল। শীতলবাবু বলেছিলেন, এখন কিছু বুঝবি? বড় হ। পরে যাবি।

ট্রেনে করে শিয়ালদায় নেমে ফর্টি ফাইভ বাস ধরে সোজা দমদম বিমান বন্দরে গিয়েছিল ওরা। দশ টাকা করে টিকিট কেটে ভিতরে। সব জায়গা ঘুরে দেখেছিল। উপরে উঠে অনেকক্ষণ ছিল। সেখানে আরও লোক। কেউ সি অফ করতে এসেছে। কেউ নিতে। ওদের মতো শুধু প্লেন দেখার জন্য বোধহয় কেউই যায়নি। যাদের ছাড়তে এসেছে, তারা দেখতে পাচ্ছে কি পাচ্ছে না কে জানে, এরা হাত নেড়ে যাচ্ছে। প্লেন উড়ে গেছে আকাশে। তখনও হাত নাড়ছে কেউ কেউ। যেন ওরা জানালা দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে এ দিকে।
ঋজু একদম সামনের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল লালুকে। কয়েক জনের পেছনে ও। ওর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বউদি। হঠাৎ ও বলে উঠল, ওই যে, ওই যে দেখুন, ওই প্লেনটা, ওটা এখন ল্যান্ড করবে। দেখুন কী ভাবে নামছে... দূরে ছোট্ট চিলের মতো উড়তে থাকা প্লেনটাকে আঙুল দিয়ে দেখাতে গিয়ে একটু ঝুঁকে পড়েছিল ঋজু। ইচ্ছে করেই বউদির শরীরের সঙ্গে নিজের শরীর একেবারে লেপটে দিয়েছিল।
প্লেনটা যখন ল্যান্ড করে গেছে। এয়ার বাস লাগানো হয়ে গেছে। যাত্রীরা একে একে নেমে আসছে সিঁড়ি দিয়ে। তখনও ও ওই একই ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল।
পেছন ফিরে ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিল বউদি। হাসিটা দেখেই ও বুঝেছিল, বউদি টের পেয়েছে।
তাই সে দিন রাস্তা পার হওয়ার সময় এক হাতে লালু আর অন্য হাতে বউদির হাত ধরেছিল অনায়াসে। রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়ার শেষে, হাত ধোয়ার পরে বউদির দিকে এগিয়ে দিয়েছিল নিজের রুমাল। কথা বলতে বলতে এক ফাঁকে ও বলে দিয়েছিল, আপনার হাসিটা কিন্তু মারাত্মক। যে কোনও পুরুষকে ঘায়েল করার পক্ষে যথেষ্ট।
— তাই বুঝি?
— কেন, আপনি বুঝতে পারেন না?
— না। বলেই, হেসে ফেলেছিলেন তিনি। সেই হাসির মধ্যেই উত্তর লুকিয়ে ছিল।
তার পরেও অনেক কথা হয়েছিল ওদের। কখনও সখনও আকার-ইঙ্গিতেও। যাতে লালু বুঝতে না পারে।
অথচ ফেরার সময় যখন শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে উঠতে যাবে, বউদি বললেন, এটায় না, এটায় না। এর পরের, পরেরটায় উঠব।
— কেন? এটা তো ফাঁকা আছে।
— না, ফাঁকার জন্য না। ও আসবে বলেছে।
— কে?
— ওই যে, আমাদের পাশে থাকে না... তুমি দেখেছ তো। ওই যে গো, যে আমাদের বাড়িতে রাতে শুতে আসে, সেই ছেলেটা।
কথাটা শুনে ওর সারা শরীর কেমন যেন শীতল হয়ে গেল।

সেই বউদি এখনও একই রকম। এতটুকু বদলাননি! ঋজু তাকিয়ে আছে।
— কী দেখছ?
— কই, কিছু না তো।
— কিছু না বললে হবে? আগে তো জানালার তলা দিয়ে খুব দেখতে। মনে আছে?
ও ঝট করে বউদির মুখের দিকে তাকাল। দেখল, বউদি ঠোঁট কামড়ে হাসছেন।
সন্ধ্যা নেমে গেছে। তবু ফেরার সময় ছেলে যে বাড়িটা করছে, সেটা দেখানোর জন্য ওকে প্রায় জোর করেই নিয়ে গেলেন বউদি। দু’তলা অবধি হয়েছে। তিন তলার কাজ চলছে। দেখে মনে হচ্ছে একটু আগেই মিস্ত্রিরা গেছে। তিন তলা দেখাতে দেখাতে একটা দেয়ালের আড়ালে যেতেই ও ঝপ করে বউদিকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেয়ে ফেলল। বউদি বললেন, ভারী দুষ্টু হয়েছ তো। কেউ দেখে ফেললে?
— কেউ দেখবে না।
— না, কিচ্ছু বলা যায় না।
— চলুন, আমরা বরং ওই সিঁড়িতে গিয়ে বসি।
— ভীষণ ময়লা।
— তাতে কী হয়েছে? রুমাল আছে তো।
সিঁড়ির একটা ধাপে পাশাপাশি বসল ওরা। এখানে কারও চোখ পৌঁছবে না। বউদিকে ও জাপটে ধরল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে বউদির শরীরের নানান জায়গায় হাত চলে যেতে লাগল ওর।

ট্রেনে আসতে আসতে ওর মনে হয়েছিল, ধ্যাৎ, কণিকা কিছুই না। তার থেকে এ অনেক ভাল। সপ্তাহে অন্তত এক বার করে যদি আসা যায়! সপ্তাহ মানে তো সাত দিন। বাকি ছ’দিন কী হবে! এত দূরে এসে পোষাবে না। তা ছাড়া এঁর তিন-তিনটে ছেলেই এখন বড় হয়ে গেছে। তারা যদি টের পায়! কণিকার মেয়েদের মতো অতটা লিবারেল তো এরা নাও হতে পারে! তখন? তার চেয়ে অফিসে ঢোকার আগে এক ফাঁকে কণিকা, মন্দ কী! কিন্তু সেই কণিকা যে তার জন্য অপেক্ষা না করে অফিস থেকে বেরিয়ে যাবে, তার গলার স্বর চিনতেই পারবে না, ঋজু ভাবতে পারেনি।
রাতে যখন বাড়িতে ফোন করল, ছোট বাবি বলল, মা খাবার গরম করছে। পরে আবার যখন করল, শুনতে পেল, মা আলমারি গোছাচ্ছে। অনেক রাতে ফের যখন করল, কণিকাই ধরল— হ্যাঁ, কী হয়েছে? বারবার ফোন করছ কেন?
— এ ভাবে কথা বলছ!
— তা হলে কী ভাবে বলব? ক’টা বাজে এখন? কেউ কোনও ভদ্রলোকের বাড়িতে কি এত রাতে ফোন করে?
— আমি আগে কয়েক বার করেছিলাম। তুমি তখন ব্যস্ত ছিলে, তাই...
— তাই কী? রাত সাড়ে এগারোটায় ফোন করতে হবে?
— তুমিই তো বলেছিলে...
— না। একদম করবে না। বলেই, লাইনটা কেটে দিল কণিকা।
পর মুহূর্তেই ফোন করল ঋজু। দেখল এনগেজড। তার পর আবার। দশ মিনিট পর আবার। এক ঘণ্টা পরেও দেখল, সেই একই। এনগেজড। এনগেজড। এনগেজড। মোবাইলে যে কথা বলবে, তারও উপায় নেই। ওটা অফ।


                                      ক্রমশ...
_____________________________________________

ষষ্ঠ পর্ব টি পড়তে নীচে দেওয়া লিংক টি ক্লিক করুন -


অষ্টম পর্ব টি পড়তে নীচে দেওয়া লিংক টি ক্লিক করুন -

Tuesday, June 21, 2022

ছোট গল্প - বোধনের রোদ্দুর || লেখক - রঞ্জিত মল্লিক || Short story - Bodhoner Roddur || Written by Ranjit Mallick


 


বোধনের রোদ্দুর

রঞ্জিত মল্লিক





                          "........শঙ্খ শঙ্খ মঙ্গল গানে
                ..........জননী এসেছে দ্বারে......."

              পুজো আসতে আর বেশী দেরী নেই। শরৎ প্রকৃতির নয়নাভিরাম রঙীন জ্যামিতি প্রতিনিয়ত ইঙ্গিত দিচ্ছে মা দশভূজার মর্ত্যে আসার আগমন। ঢাকের মাতাল করা মোলায়েম মল্লারে ভেসে আসছে আগমনীর সুর।

             তাঁর টুকরো টুকরো অণু, পরমাণু  চোখে মুখে ছড়াতেই উৎসবের আনন্দে বুকের "ভিসুভিয়াস"টা দপদপ করে উঠছে সকলের। শিরায় শিরায় ফুটন্ত হিমোগ্লোবিনে আবেগের আঁচ ধরা পড়ছে।

             শতুর পাড়ার পুজো এবারে পঞ্চাশে পড়ল। পাড়ার সকলের ব্যস্ততা বেশ তুঙ্গে। প্রতিদিনই চলছে শলা পরামর্শ। পুজোকে সার্বিকভাবে সফল করে তুলতে সকলেই দল দলে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে। আট থেকে  আশি সকলের চোখে মুখে খুশীর ঝলসানো সোনামুগ রোদ্দুরটা হামাগুড়ি  দিচ্ছে।

             পঞ্চমীর সকাল থেকেই শুরু হল নিন্মচাপের দাপুটে ব্যাটিং। সকলের  মনখারাপ,  দুর্ভোগের শেষ নেই। অনেকের চিন্তা পঞ্চাশ বছরের পূর্তির আনন্দটাই না মাটি হয়ে যায়।

                 শতু সারাদিন ঘরের মধ্যেই ছিল গল্পের বইয়ে মুখ গুঁজে। বৃষ্টির চোখ রাঙানি বাড়তেই একটু বিছানায় গাটা এলিয়ে দিল। মা ঘরে ঢুকতেই বলে  উঠল," কি রে, অবেলায় ঘুমোচ্ছিস?শরীর খারাপ?"
             "আসলে কদিন ধরেই মনটা ভাল নেই।"
              "একটু বাইরে ঘুরে আয়, দেখবি মনটা ঠিক চাঙ্গা হয়ে গেছে।"
             "মা, তুমি আবার জ্ঞান দিতে শুরু করলে। তুমি না...."

               মা আর কথা না বাড়িয়ে রান্না ঘরে চলে গেলেন। 

              পুজো আসলেই শতুর মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।  চারটে দিন নিজেকে  গৃহবন্দি রাখে। কারণ ও উৎসবের গন্ধ গায়ে মাখতে চায়না। পুরানো অতীত ওকে নাড়িয়ে দেয়। 

                       

                 সপ্তমীর দুপুরে  বাচ্চাটার চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গল। নিম্নচাপ তখনও চলছে। যদিও প্রকোপ কমেছে। কুকুরের বাচ্চাটা অতিবৃষ্টিতে  ড্রেনের গভীর  জলে পড়ে সাঁতার কাটছে। আর বাঁচার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ওর  মা  গতকালই মারা গেছে। ভারী গাড়ির নীচে চাপা পড়ে। 

                 শতু ছুটে গিয়ে বাচ্চাটাকে ঐ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে ওকে ঘরে নিয়ে আসে। ওর শরীরের সমস্ত নোংরা ময়লা পরিষ্কার করে ওকে কিছু খেতে দেয়। খাবার পেয়ে বাচ্চাটার মেজাজ ফুরফরে হয়ে ওঠে। 

              বুকের উষ্ণতায় দুবার গলা ছেডে ডেকেও ওঠে। ডাক শুনে মিতাদেবী পাশের ঘর থেকে এসেই মেয়েকে কড়া ধমক," তোর কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান আছে, এমন শুভ দিনে এই কুকুরটাকে কেউ ঘরে তোলে? ওর শরীরে কি রোগ আছে কে জানে?"
           "মা, তুমি এবার থামবে? অনেক্ষণ ধরে যা নয় তাই বলে যাচ্ছ।"
          "আমি কিছু বললেই দোষ, তাই না?"
           "মা, প্লিজ! একটু চুপ কর।"
           "আজ যদি তোর বাবা বেঁচে থাকত তাহলে কিছুতেই....."

             কথা শেষ হবার আগেই শতু মায়ের মুখের দিকে তাকায়,"মা, তুমি আজ একথা বলছ? তোমার ডেসানকে মনে পড়ে না? সেই ছোট্ট আদুরে ডেসান?"

               ডেসানের কথা উঠতেই মিতাদেবী কোথায় যেন তলিয়য়ে যান। বুকের ভিতরটা চিন চিন করে ওঠে ব্যথায়। বাচ্চাটার  দিকে একবার তাকিয়ে হঠাৎ ভেজা চোখটা নতুন শাড়ির আঁচলে মোছেন।

                সন্ধ্যের পর থেকেই বৃষ্টির বন্দিশ কমতে থাকে।  আকাশ তবুও মেঘলা। মিতাদেবী রাতে রান্নাঘরে এসে দেখেন কুকুরের বাচ্চাটা গোটা রান্নাঘরটা নোংরা করে  রেখেছে। মেজাজ গেছে সপ্তমে। তবে সেটা সাময়িক। একটু পরেই ফুটন্ত মেজাজ নিম্নচাপের বৃষ্টিতে ভিজে শীতল হতে শুরু করেছে। 

                 ..........  ......... ........  ..........

             " ........  জাগো দুর্গা.......
               .........  .........  তুমি জাগো......."

              আজ মহাষ্টমী। সকালে  ঢাকের  শব্দে ঘুম ভাঙে  শতুর। দেখে কুকুরের বাচ্চাটা ঘরে, বারান্দাতে ছোট একটা বল নিয়ে খেলছে।  নতুন জায়গাতে এসে আদর যত্ন পেয়ে  ওর মুখে খুশী ঝলসে  উঠছে। 

             অষ্টমীর অঞ্জলি শেষ হলে মিতাদেবী পুজোর পুষ্প শতু, কুকুরের বাচ্চাটার মাথায় একটু ঠেকিয়ে ওদের জন্যে মঙ্গল কামনা করেন। তারপর শতুর পড়ার ঘরে ঢুকে দেওয়ালে ডেসানের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন। 

                বাসি ফুলের মালাতে, ধুলোর চাদরে  ডেসান ফটোফ্রেমে  সদ্য ফোটা শিউলির মতন হাসছে। শতু ঘরে ঢুকেই ধুলো ঝেড়ে  ওর ছবিতে নতুন মালাটা চড়িয়ে দিল। আজ ডেসানের মৃত্যুবার্ষিকী। পুজোর আনন্দে সবাই ভুলে গেলেও মিতাদেবীর  মেয়ে   ঠিক মনে রেখেছে। 

              রান্নাঘর থেকে ডেসানের পছন্দের পদের গন্ধ ভেসে আসছে। আজ পুজোর দিন, মিতাদেবী ডেসানের কথা ভেবে হালকা কিছু বানিয়েছেন। যদিও প্রতি বছর ওর মৃত্যুদিনে ওর পছন্দের কিছু না কিছু বানানো হয়।

                ঝুপ করে সন্ধ্যে নামতেই চন্দননগরের আলোতে গোটা পাড়া ডুবে গেল। একটু পরেই সন্ধিপুজো বসবে। পাড়ার কচি কাঁচারা মণ্ডপ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ওদের হাতে ক্যাপ ফাটানো পিস্তল। ক্যাপের ফট্ ফট্ শব্দে চারিদিক মুখরিত। 

               "বাজলো তোমার.....
                ............ আলোর বেণু........"

             ১০৮টা প্রদীপ জ্বলে উঠতেই শতাব্দী পুচকেটাকে কোলে করে মণ্ডপে আসল। ওকে দেখেই সবাই স্তম্ভিত।  আজ বহু বছর পরে ও মা অপর্ণার মুখ দেখল। এমনিতেই ও পুজোর দিনে নিজেকে.....

              প্রদীপের আলোতে ঝলমল করছে পুচকে "ডেনে"র  এর মুখ। "ডেন" নামটা শতাব্দীর দেওয়া। "ডেসান" এর ক্ষুদ্র সংস্করণ। "ডেসান" এর নাম, শরীরের  ভিতরেই "ডেন" এর গন্ধ লুকিয়ে আছে।

               মিতাদেবী পুজো দেখতে দেখতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন।

                              *************

               শতুর বাবা তখন বদলির চাকরি নিয়ে চলে গেলেন বোলপুরে। শতু হোস্টেলে পড়াশোনা করছে। একমাত্র ছেলে অনুষ্টুপও বৌমাকে নিয়ে চাকরি সূত্রে ব্যাঙ্গালুরুতে আছে। প্রাইভেট কোম্পানী।  ছুটি কম।  মিতাদেবী একা থাকেন। অত বড় বাড়িতে ভয় করে। 

               শতাব্দী তখন বন্ধুর কাছে খোঁজ পেয়ে ছোট্ট ডেসানকে বাড়িতে আনল। মাকে একটু সঙ্গ দেবে বলে। এর  তিন মাস পরেই অনিকেতবাবু স্ট্রোকে মারা যান। শোকের ছায়া ঘিরে ধরল গোটা পরিবারকে। 

                বাবা মারা গেলে বাবার সরকারী  চাকরিটা অনুষ্টুপ পেল। স্বার্থপরের মতন ফ্ল্যাট নিয়ে কলকাতাতে চলে এল। মিতাদেবীর একাকীত্বের জীবনে তখন থেকেই ডেসানের রোল প্লে শুরু। 

               টানা চার বছর  বিপদে আপদে আগলে রেখেছে উনাকে। ভরসার একমাত্র আশ্রয়স্থল হল এই চারপেয়ে, অবলা,প্রভুভক্ত ডেসান। মিতাদেবীর পর শতু দিদিমণিই ওকে বেশী আদর করত, ভালবাসত।  

              বহুবার চুরির হাত থেকে মিতাদেবীকে বাঁচিয়েছে। উনার শরীর খারাপ হলেই ছুটে গিয়ে চিৎকার করে পাশের বাড়ি থেকে কখনো সবিতা আন্টি, কখনো জয়া বৌদিকে ডেকে এনেছে। 

               মিতাদেবীর এখনও বেশ  মনে আছে সেইদিনটাও ছিল অষ্টমীর সকাল। সবে পুজো বসেছে। মিতাদেবী অঞ্জলির জন্যে তৈরী হচ্ছেন। বাড়িতে একা। সবাই বেরিয়েছে।  হঠাৎ শাড়িতে পা বেঁধে পড়ে উনি চোট পান। পরিস্থিতি বুঝে ডেসান  ছুটে গিয়ে সবিতা আন্টিকে ডাকতে যায়।
            
            সেই শেষবারের মত বাড়ি থেকে ওর বেরোনো।  আর ফেরেনি।  আসার পথে রাস্তা পেরোতে গিয়ে ফোর হুইলারের চাকায় পিষ্ট হয় ওর নিষ্পাপ শরীর। শতাব্দী যখন ফিরল তখন দেখে,  ডেসানের রক্তমাখা থেঁতলানো শরীর রাস্তার এক কোণে পড়ে রয়েছে। মৃত শরীরের উপর মাছি ভন ভন করছে। পথ চলতি মানুষ কেউ কেউ চোখ বড় বড় করে দেখে  পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। 

                

               বহু বছর পার হয়েছে। ডেসান চলে গেছে না ফেরার দেশে। তবে পুজো আসলেই ওর টাটকা  স্মৃতি ঝলসে ওঠে। আজ বহু দিন পরে ওর মৃত্যুবার্ষিকী আর অষ্টমী একই দিনে পড়েছে। কোইন্সিডেন্স!

              সন্ধিপুজো অনেক আগেই শেষ হয়েছে। শতাব্দীর আলতো ছোঁয়ায় মিতাদেবীর সম্বিৎ ফিরল।

"মা, আমি ডেনকে নিয়ে একটু উনিশ পল্লী আর বিদ্রোহী ক্লাবের ঠাকুরটা দেখে আসছি। সময় পেলে শক্তি নগর, পাঠক পাড়া, সীমান্ত পল্লীর ঠাকুরগুলো দেখে নেব। ফিরতে একটু দেরী হলেও হতে পারে। তুমি চিন্তা করো না।"
                "সাবধানে যাস মা, দেখিস যেন কোন বিপদ....."

             কথা শেষ হয়না। মিতাদেবী দেখেন শতাব্দীর কোলে পুচকে ডেন যেন ডেসানেরই হারিয়ে যাওয়া অতীত। 

              নিম্নচাপ কেটে গিয়ে তারায় ঝলমল করছে অষ্টমীর সন্ধ্যে। ডেনকে পেয়ে শতাব্দীর মনের উঠোনে আজ বোধনের রোদ্দুর। মিতাদেবীর চোখ থেকে নামছে পবিত্র আশ্বিনের শিশিরের নোনা চন্দন। ঠিক নিম্নচাপের মতই। তার ছিঁটে ফোঁটা মনে হল যেন ডেনের নরম, স্নিগ্ধ পশমেও পড়ল। 

             মিতাদেবী সকলের মঙ্গল কামনায় মা উমার কাছে প্রার্থনা করলেন। মায়ের মুখে কোজাগরী চাঁদের হাসি উথলে উঠছে।

            চারিদিকে আলোর বন্যায় মেখে আধুনিক গান আর মাঝে মাঝে বাজির শব্দ ভেসে আসছে। বৃষ্টি থেমে গিয়ে একটু গরমও ধরেছে। মিতাদেবী বেশ কিছুক্ষণ পরে গুটি গুটি পায়ে চ‍ৌরাস্তার দিকে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ একটা চেনা কণ্ঠস্বরে পায়ের গতি শ্লথ করলেন।

                "মিতু, অ্যাই মিতু! চিনতে পারছিস?"
                 "কে? ও মা! নন্দা! কবে এসেছিস? কতদিন পরে......"
                 "নে ধর, আইসক্রিম। যা গরম!"
       
             দুই বন্ধুর হাসি, আড্ডাতে বোধনের রোদ্দুরে যখন জোয়ারের ভরা কোটাল, তখন শতাব্দী ডেনকে নিয়ে একটার পর একটা মণ্ডপ পেরিয়ে শক্তিনগরের দিকে পা বাড়াল। 

              "দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী........
              ......... মহিষাসুরমর্দিনী জয় মা দুর্গে......."

Monday, June 20, 2022

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -7


 


তিন 




ক্রমান্বয়ে বছরের পর বছর কেটে গেলো। কিভাবে যে কাটলো তা আমি ও বাবা ছাড়া কেউ অনুভব করেনি। দাদার ডাক্তারী পড়া প্রায় শেষ হতে চলেছে। জমি জায়গা আর অবশিষ্ট নেই। উপরন্তু হেট মাস্টার মশায় সুরজিৎ বাবু কিছু টাকা ধার দিয়েছেন। এখন আর টাকার দরকার হবে না। এবার একবছর Compulsary Internship করার পর বাড়ী আসবে। কলেজে থেকে যে টাকা পাওয়া যাবে ওতে নিজের খরচা সুন্দরভাবে চালিয়ে নিতে পারবে।






 দাদার পত্র পেয়ে আমরা উভয়ই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বড় চিন্তায় ছিলাম এ কারণে বাবা কপর্দক হীন ছিলেন। সুখ যে কি জিনিস তখন ভুলে ছিলাম অতীত তো অনেক আগেই ভুলে গেছি। তাই দুঃখকে আকড়ে ধরে দিন যাচ্ছিল আমাদের দারিদ্রের অমানিশা কেটে সুখের স্বর্ণালি প্রভাতের প্রতীক্ষায় ছিলাম। অনেক সময় ভাবতাম, সেই সুখের তরীতে নিশ্চয় চড়তে পারবো। 






কিন্তু বাবার ও আমার আশা কি পূর্ণ হয়েছিলো? সত্যি বলছি, আমি এক ভোরের স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে দেখছিলাম, আমার দাদা ডাক্তারী পাশ করে গ্রামে এসে গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় একটা ছোট ডিসপেনসারি করেছে। মহামান্য গণপতি চ্যাটার্জী নানা সুগন্ধি ফুলে সাজানো ডিসপেনসারিকে উদ্বোধন করলেন। এই শুভ দিনে মাননীয় রামকমলবাবু ছেলের গৌরবজ্জ্বল জীবনের কথা স্মরণ করে বাবাকে মাল্য ভূষিত করলেন। তিনিই প্রথম ঠাকুরদার কাছে ডাক্তারী পড়াবার প্রস্তাব করেছিলেন।






 রামকমলবাবুর ভাষায় তাঁর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দিনটি গৌরবের ছটায় দীপ্ত হয়ে ফিরে এলো। দারিদ্র্যের দুঃসহ যাতনা অভাব অনটনের দারুন মর্মপীড়া সহ্য করেও বাবা যে তার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন এজন্য গ্রামের জনগণ বাবাকে অভিনন্দিত করলেন। সকলের মুখে বাবার গুনগান শুরু হলো। শুরু হলো বাবার জয়ধ্বনি। বাবার জয়ধ্বনি শুনে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো ও দেখলাম কোথাও কিছু নেই। শূন্য গৃহে বাবা তখনও ছিন্ন কম্বল জড়িয়ে ঘুমে অচেতন।








ধীরে ধীরে কলসীর কাছে গিয়ে এক গ্লাস জল খেয়ে পুনরায় আমার জীর্ণ বিছানায় লুটিয়ে পড়লাম। পরদিন ঐ মধুর স্বপ্নের পরিবর্তে আমাদের জীবন নাট্যের গভীর শোকের দুঃসহ দুঃখের কালো যবনিকা নেমে এলো। যে বার্তায় চোখের জলে সাগর হয়, যে বার্তায় মানুষের মনে এনে দেয় দিগন্ত ব্যাপ্ত অস্পষ্ট পরিবেশ।




গ্রামের পিওন সতীশবাবু বাবার হাতে যত্ন সহকারে টেলিগ্রাফের কাগজটা এনে হাজির করলেন। মেডিকেল কলেজ থেকে আসছে টেলিগ্রাফ, ওতে লেখা "Come Sharp Sumanta Serious" বাবা বজ্রাহত হয়ে পড়লেন। সেই সময় মনে হল, বাবার শরীরের সব গ্রন্থীগুলো যেন সাময়িকের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও মনে জোর এনে সুরজিৎ বাবুর কাছে দৌড়ালেন। তিনি তো বিশ্বাস করতে পারলেন না। তথাপি কাল বিলম্ব না করে কলকাতার অভিমুখে যাত্রা করলেন উভয়েই।




 তারপর?




তারপর সব শেষ, সব কিছু ব্যর্থ হয়ে গেলো। আমাদের সাজানো বাগান শুকিয়ে গেলো। শুধু শোক আর শোক। দেখা গেলো আমাদের জীবনে আশা ভঙ্গের হাহাকার। কতই না আশা করেছিলাম, দাদা ডাক্তারী পাশ করলে আর অভাব থাকবে না। দারিদ্র ক্লিষ্ট জীবনে সুখের মধুর স্পর্হ লাভ করবো। কিন্তু বাবার সমস্ত আশা মরুভূমির মরীচিকার মতো প্রতারণা করলো। সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, দুঃসহ দারিদ্রের মধ্যে দাদার অকাল মৃত্যু অদৃষ্টের অন্ধ বিচার ছাড়া একে আর কি বলা চলে? তবে কি গরীবদের স্বপ্নই রয়ে গেলো? বাড়ীতে এসে বাবা প্রায় অর্দ্ধ পাগল হয়ে গেলেন। কারো সাথে বাক্যালাপ করেন না, কেবল চোখ দিয়ে দরদর জল ফেলতে থাকেন। দাদার মৃত্যু সংবাদ অনেক আগেই পেয়েছিলাম। কারণ ঐ সংবাদ চাপা থাকে না। দাদার মৃত্যু সংবাদ শুনে আমি স্থির থাকতে পারলাম না। বুকে যেন শেল বিদ্ধ করলো। মনে পড়লো সেই মহান অ্যাস্ট্রলজারকে। তিনি বলেছিলেন সুমন্ত ডাক্তারী পাশ করে সবল ও সুস্থ দেহে পুনরায় গ্রামে ফিরে আসবে, ভয়ের কোন কারণ নেই। ঐ দিন মহান অ্যাস্ট্রলজারকে কোটি কোটি প্রণাম জানাতে ইচ্ছে করছিলো। কারে বা দোষ দিই। হবে বা একথা ঠিক, দাদা যে কলকাতা হতে ডাক্তারী পড়া শেষ করে সুস্থ শরীরে ফিরে আসবে না তা আমার স্বপ্নেরও অগোচরে ছিল। সেই শোকের তীব্রতা আমাকেও উন্মাদ করে তুলেছিলো। কিন্তু দাদার মৃত্যু রহস্য জানার জন্য আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে ছিলাম। সুরজিৎ বাবুর কাছে শুনেছিলাম দাদার কোন এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু দাদাকে হত্যা করেছে। মৃত্যুকালে তার হত্যাকারীর নাম বলেনি। পরে জানতে পেরেছিলাম দাদার হত্যাকারী আমার আপনজন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় দাদার হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়েও পারিনি। ধীরে ধীরে সবই বুঝতে পারবেন আমার। জীবনের পটভূমিকা, শুধু একটুখানি ধৈর্য রাখুন।






সে হত্যাকারী দাদার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতায় শত্রুতা সাধন করেছিল। কলেজের প্রিন্সিপ্যালও কল্পনা করেননি এরকম কান্ড হবে। দাদা খুনীকে চিনতে পেরেছিলো কিন্তু তার এই অমানুষিকতার জন্য শাস্তির পথ উন্মুক্ত করে যায়নি। পুলিশ ইন্সপেক্টার মৃত্যু পথযাত্রী দাদাকে খুনীর নাম জিজ্ঞাসা করলেও দাদা সেই সময় নীরব ছিল। কে সে? যদি তোকে একটি বার পেতাম তাহলে— মনের রাগ মনেই চেপে ছিলাম। শুধু দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলাম।






 শোকে জর্জরিতা এক অসহায় নারীর করুণ ক্রন্দন অনেকেরই শোনা আছে। সেই ক্রন্দনের স্বরূপ বর্ণনা করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য। হয়তো কোন শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ বা ডিকেন্স ঐ করুণ কান্না শুনে থাকলে কলমে তার বর্ণনা দিতে পারতেন। সেই সময় আমাদের ভাঙ্গা ঘরের টুকরো ইঁটগুলো পর্যন্ত আমাদের এই গভীর দুঃখে সমব্যথী হয়েছিলো। দাদার এই অকাল মৃত্যুর জন্য ভগবানের নিষ্ঠুর বিধানের বিরুদ্ধে ফরিয়াদ জানিয়ে ছিলাম। কিন্তু কেউ তখন সান্ত্বনা দেবার ছিলো না। উপরন্তু বাবাকে আরো শোকাহত ও জর্জরিত করার চেষ্টা করলেন। 






সন্ধ্যের দিকে পাড়ারই বিজ্ঞ আচার্য্য মশায় লাঠির উপর ভর দিয়ে আমাদের ভগ্ন কুটিরে উপস্থিত হলেন। মনে হল, এই সময় তার জ্ঞান গর্ভ উপদেশাবলি বাবার দুঃসহ অন্তর বেদনাকে প্রশমিত করবে।






 তিনি বললেন, আমি জানি সীতাংশু, তুমি অনেক উচ্চ আশা করে ছিলে তোমার পুত্র দেশের ও দশের কাজে প্রাণ উৎসর্গ করলে তোমার আশা আকাঙ্খা পূর্ণ হতো। কিন্তু মানুষ মনে করে এক, ভগবান করেন অন্যরূপ। তাই উপনিষদে বলেছেন---




 ঈশা বাস্য মিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ


তেন ত্যক্তেন ভুঞ্চীথা মা গৃধঃ কস্যন্বিদ ধনম ।।




 এই বিশ্ব গতিশীল চলমান। সর্বদাই চলছে ও সর্বদাই পরিবর্তন হচ্ছে। মুহুর্তের জন্য এর বিরাম নেই। সেজন্য এর নাম জগৎ। এই জগতের যা কিছু আছে সে জাগতিক প্রত্যেক বস্তুই গতিশীল চলমান। কিন্তু এই চলমান জগৎ একটি অচল সত্তারই অভিব্যক্তি মাত্র। আবার ঈশ্বর সমগ্র জগৎকে আচ্ছাদন করে আছেন। অথবা বলা চলে, তিনি সকল বস্তুর অন্তরে বাস করছেন। মানুষকে এই অন্তর্যামী ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করতে হবে। বুঝতে হবে ঈশ্বরের সত্তা নিরপেক্ষ, কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। সর্বভূতে ঈশ্বরকে দর্শক করতে হবে। এই প্রকারের অনুভূতি যার হয়েছে তার পক্ষে এ জগতের কোন বস্তুর উপর কোন রূপ আসক্তি বা মোহ থাকতে পারে না।




 কিন্তু যেখানে ত্যাগ নেই আছে মোহ, আছে আসক্তি সেখানে দেখা দিবে দুঃখ দৈন্য ও অশান্তি। যিনি আসক্তি হীন তিনি স্বাধীন। মানুষকে কামনা বাসনা ত্যাগ করে জগৎকে ঈশ্বরের প্রকাশ মনে করে ভোগ করতে হবে। এই ভাবে যিনি ভোগ করতে পারেন তিনি আনন্দ লাভ করেন। তাই ঋষিরা বলেন, ‘তক্তেন ভুঞ্জীখা” ত্যাগের দ্বারা ভোগ করতে হবে।

Thursday, June 16, 2022

উপন্যাস - লাস্যময়ীর ছোবল || সিদ্ধার্থ সিংহ || Lashamayir Chobol by Sidhartha Singha || Fiction - Lashamayir Chobol part -6

 



ছয়


সানন্দায় ছাপা হয়েছিল ঋজুর ‘বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল’। সেই গল্পটার নাট্যরূপ দিয়ে এর আগে শিশির মঞ্চে নাটক করেছিল বিশ্ব ও শিল্পী সাংস্কৃতিক সংস্থার সর্বময়কর্তা সত্যজিৎ কোটাল। একদিন সে এসে জানাল, তারা আবার ওই নাটকটা করছে। স্টেজ রিহার্সালের জন্য বুক করা হয়ে গেছে মুক্তাঙ্গন। আগের শো-টার স্ক্রিপ্ট একটু অদলবদল করা হয়েছে। ওই দিন আপনাকে কিন্তু আসতেই হবে...

ঋজু জিজ্ঞেস করল, কখন?

সে বলল, আমরা তো বারোটা-সাড়ে বারোটার মধ্যে ঢুকে পড়ব। ওই দিন কোনও শো নেই। আমরা সারা দিনই থাকব।

ঋজু বলল, সারা দিন!


রিহার্সালের জন্য আর কতক্ষণ লাগে! বিকেলের মধ্যে যদি ওটা সেরে নেওয়া যায়, তা হলে তো সন্ধে থেকে একটা অনুষ্ঠান করা যায়। তাই না? কিন্তু কী অনুষ্ঠান! কী অনুষ্ঠান! কী অনুষ্ঠান! ঋজু নিজেই বলল, ধরো, আমার একটা গল্পের নাট্যরূপ দিয়ে দিলে তুমি। সেটা মঞ্চস্থ হল...

— এত তাড়াতাড়ি নাটক তোলা যাবে না দাদা...

— তা হলে... তা হলে... তা হলে... একটা কাজ করো, নাটক না তুলতে পারো, শ্রুতিনাটক তো তুলতে পারবে, না কি?

— হ্যাঁ, সেটা পারব।

— তা হলে শ্রুতিনাটকই করো। তার পর ধরো, কয়েকটা বাচ্চা আমার কিছু কবিতা আবৃত্তি করল। আমার উপরে দু’-একজন কিছু বলল...

— কে বলবে?

— বিখ্যাত কেউ। যেমন ধরো প্রদীপ ঘোষ...

— কোন প্রদীপ ঘোষ? আবৃত্তিকার প্রদীপ ঘোষ?

— হ্যাঁ।

— আসবেন?

— ওটা আমার উপরে ছেড়ে দাও।

— আর?

— পি সি সরকার।

— উনি তো মারা গেছেন।

— না না, তিনি নন। জুনিয়ার পি সি সরকার।

— আনতে পারবেন?

— চেষ্টা করে দেখি।

— আর?

— আর ধরো পবিত্র সরকার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, দিব্যেন্দু পালিত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও বলব। তার পর তুমি বলবে।

সত্যজিত্‌ বলল, আপনি যদি পাশে থাকেন, সে তো করাই যায়। কিন্তু অনুষ্ঠানের নাম কী দেবো?

— সেটা ভেবেচিন্তে ঠিক করা যাবেখ’ন।

— না, আসলে দলের সবাইকে বলতে হবে তো...

— আমি জানি। দলটল নয়, তোমার কথাই শেষ কথা।

— তাও।


তিন চারটে নাম লিখে রেখেছিল ঋজু। সত্যজিত্‌ও ভেবে রেখেছিল দুটো নাম। অবশেষে ঠিক হল, অনুষ্ঠানটার নাম দেওয়া হবে ঊষা উত্থুপ নাইট, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কিংবা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার অনুকরণে— ঋজু সন্ধ্যা।

ঠিক হয়ে গেল কী কী হবে। কাকে কাকে বলা হবে। সমস্ত মিডিয়াগুলিতে অন্তত এক সপ্তাহ আগেই আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দিতে হবে। তার ম্যাটার কী হবে, মঞ্চের ব্যাকগ্রাউন্ড জুড়ে থার্মোকল কেটে বড় বড় অক্ষরে যে ‘ঋজু সন্ধ্যা’ লেখা হবে, সেটা স্পনসরড করার জন্য ঋজুই বলে দিল কমলকে। কমল ওর ছোটবেলাকার বন্ধু। কুলিশ নামে একটি অনিয়মিত ছোট্ট পত্রিকা বার করে। পোস্টার করার জন্য বৈঠকখানা বাজার থেকে ওজন দরে এ ফোর সাইজের মতো রঙিন কাগজের ছাট আনার দায়িত্ব নিয়ে নিল সত্যজিৎ নিজেই। ও-সব জায়গা ও খুব ভাল করে চেনে। ওর বাবার একটা ছোট প্রেস আছে। সেই সূত্রে ওকে প্রায়ই ওখানে যেতে হয়। ওরা দু’ভাই এখন ওটা চালায়। ওর ভাইও নাটক করে। এটা নাকি ওরা পেয়েছে ওদের বাবার কাছ থেকে। ওদের বাবাও নাটক করতেন।

— ওই অনুষ্ঠানে আসার জন্য ঋজু সবাইকে ফোন করে করে বলছে। ফোন করল কণিকাকেও।


ওই ঘটনার ক’দিন পরেই সানন্দায় ছাপা হয়েছিল— মণিপর্ব ২৫। কণিকার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে ওকে নিয়ে অনেকগুলি কবিতা লিখেছিল ঋজু। কণিকা ছিল ওর চোখের মণি, আবার মণিমাণিক্যের মতোই মূল্যবান। তাই ওকে নিয়ে লেখা কবিতা সিরিজটার নাম দিয়েছিল— মণিপর্ব।

ঋজুদের বারুইপুরের বাগানবাড়িতে একটা মন্দির আছে। ত্রিমাতৃ মন্দির। ওর মায়ের তৈরি। সেই মন্দিরে কালী, মনসা আর শেতলার মূর্তি আছে। মহাধুমধাম করে পুজো হয়। শেতলা পুজোতে আসার জন্য কণিকাকে নেমন্ত্রন্ন করেছিল ও। কণিকাও বলেছিল, আসবে। কিন্তু শিয়ালদহ থেকে যে ট্রেন ধরে ওর আসার কথা, তার পরের ট্রেনেও ও না-আসায় বড় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল ঋজু। লিখে ফেলেছিল পঁচিশতম কবিতা— মণিপর্ব ২৫।

সেটাই সানন্দায় ছাপার জন্য মল্লিকা সেনগুপ্তকে দিয়েছিল ও। কণিকা শুনে বলেছিল, যে দিন মণিপর্ব প্রথম বেরোবে, সে দিন আমি সেলিব্রেট করব। তোমাকে বড় কোনও হোটেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়াব।

অথচ সেই কবিতাটা বেরিয়েছে তিন দিন হয়ে গেছে। ও কি দেখেনি! না, জানে না! অফিস থেকে বেরোবার সময় দেখে, দেয়াল ঘড়িতে বারোটা কুড়ি। ড্রপ কার দিতে দিতে আরও দশ মিনিট। প্রথমে সব লং রুটের দেবে। তার পরে শর্ট রুটের। একদম শেষের দিকে দেয় বেহালার গাড়ি। ও ওই গাড়িতেই ওঠে। ওকে চেতলায় নামিয়ে দিয়ে যায়। হাতে এখনও প্রচুর সময়! ও কি জেগে আছে! এক বার দেখব! বেরোতে গিয়েও, কী এক অমোঘ টানে ও টপাটপ বোতাম টিপল ফোনের। কণিকাই ধরল। বুঝতে পেরেই ঋজু বলল— মণিপর্ব বেরিয়েছে তিন দিন হয়ে গেছে। যাকে নিয়ে মণিপর্ব লেখা, সেই মেয়েটি বলেছিল, প্রথম যে দিন মণিপর্ব বেরোবে সে আমাকে খাওয়াবে। অন্য কিছু না খাওয়াক, এক কাপ চা তো খাওয়াতে পারে। সে কি খাওয়াবে?

কোনও কথা নয়। ঋজু শুধু শুনেছিল, টেলিফোনের ও প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে কণিকার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। সে দিন সাড়ে বারোটা নয়, একটা পনেরোরও নয়, আড়াইটের গাড়ি ধরেছিল ঋজু। তাও দৌড়ে গিয়ে। আর কয়েক সেকেন্ড দেরি হলে ওই গাড়িটাও বেরিয়ে যেত।

পর দিন তিনটের সময় ঋজু চলে গিয়েছিল ওর অফিসে। টেলিফোন ভবনের উল্টো দিকে লাইম লাইট রেস্টুরেন্টে ওরা বসেছিল । চা খেতে খেতে কণিকা বলেছিল, আমি অরুণকে বলে দিয়েছি, ঋজু আমাকে ভীষণ ভালবাসে। আমাকে ছাড়া ও বাঁচবে না। আমি ওকে ফেরাতে পারব না। 


তার পর থেকে আবার যাতায়াত। এখানে যাওয়া। সেখানে যাওয়া। কোথায় সুন্দরবনের জ্যোতিষপুর হাইস্কুলের হীরক জয়ন্তী উত্‌সব, কোথায় ঝাড়খন্ডের সেরাইকেলায় বিশাল অনুষ্ঠান, কোথায় বাঁকুড়ার সোনামুখীতে লগ্নঊষার বার্ষিক বনভোজন, সব জায়গাতেই ওরা। একদিন কফি হাউসের সামনে ওর পুরোনো বন্ধু ভাস্কর দেবের সঙ্গে দেখা। সে নাকি নতুন একটা ট্যুর এজেন্সি খুলেছে। সামনের মাসেই সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছে। সে বলল, যাবি? ঋজু সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। দু’জনের জন্য পাঁচ-পাঁচ দশ হাজার টাকা দিয়ে কণিকাকে নিয়ে ও চলে গেল ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার।

এর মধ্যে কণিকা একদিন বলেছিল, বহু দিন আগে প্রতিদিন-এ একটা গল্প পাঠিয়েছিলাম। কী হল, খবর পেলাম না। ওখানে তোমার কোনও জানাশোনা আছে?

ঋজু বলেছিল, কোন পাতায়?

— শনিবারে যে গল্প বেরোয়, সেখানে।

— কপি আছে?

— জেরক্স আছে।

— তা হলে নিয়ে এসো। কাল তোমার অফিস ছুটির পর তোমাকে নিয়ে প্রতিদিনে যাব।


ওই পাতার বিভাগীয় সম্পাদক সুদেষ্ণা রায়। যিনি এক সময় সানন্দায় ছিলেন। পরে প্রতিদিন-এ যান। কণিকাকে দেখিয়ে ঋজু বলল, ওর একটা গল্প দিয়ে গেলাম, একটু দেখো তো।

সুদেষ্ণা জিজ্ঞেস করলেন, তুই পড়েছিস?

— হ্যাঁ।

— ঠিক আছে?

— হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ভাল গল্প। ঋজু কথা বলছে ঠিকই। কিন্তু ওর চোখ সুদেষ্ণার হাতের দিকে। লেখাটার উপরে গল্পের নাম, লেখকের নাম এবং বডি পয়েন্ট মার্ক করতে করতেই সুদেষ্ণা বললেন, এই নামেই চেক হবে তো?

ঋজু বলল, হ্যাঁ।


সেই শনিবারেই কণিকার গল্পটা ছাপা হয়ে গেল। এর ক’দিন পরেই কণিকা বলল, তোমাদের অফিসে যে সুমন চট্টোপাধ্যায় আছেন না, তাঁর সঙ্গে আমার একটু আলাপ করিয়ে দেবে?

— সুমন চট্টোপাধ্যায়! ঋজু আমতা আমতা করতে লাগল। অনেকেই মহাধন্দে। কে বড়? আনন্দবাজার না সুমন চট্টোপাধ্যায়! যাঁর নামে এক ঘাটে বাঘে আর হরিণে জল খায়, সেই সুমন চট্টোপাধ্যায়!

— দাও না গো, খুব দরকার।

— কী দরকার বলো না, আমি আগে এক বার বলে দেখি...

— না না, তুমি বললে হবে না। তুমি আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও, যা বলার আমিই বলব।

ঋজু জানে, ও যা চায়। তা না করলেই ওর মুখ ভারী হয়ে যায়। ঠিক মতো কথা বলে না। ফোন করলে ধরে না। ল্যান্ড লাইনে ফোন করলে মেয়েরা বলে, মা নেই। কিংবা বলে, ও দিকে কাজ করছে।


সে দিনই সন্ধেবেলায় করিডর দিয়ে যেতে যেতে সুমন বললেন, কাকে নিয়ে এসেছিলি? ওর অফিসের কোন এক বসের ছেলে নাকি এখানে গ্রুপ ফোরে কাজ করে। তার হয়ে বলতে এসেছিল। তাকে যাতে আনন্দবাজারে নিয়ে নিই। এ ভাবে হয় নাকি? তুই জানিস না?

তার ক’দিন পরেই কণিকা বলল, তোমার সঙ্গে কে এম ডি-র কারও সঙ্গে যোগাযোগ আছে গো?

— কেন? প্রশ্ন করতেই ও বলল, রাজারহাটে যদি একটা প্লট পাওয়া যায়, দেখো না, আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে থাকব...


ঋজু দেখেছে, দূরে কোথাও যাবার কথা হলে কিংবা রবিবার খাওয়াদাওয়ার পরেই শুতে যাবার আগে কণিকা কোনও না কোনও আবদার করে। ঋজু আমতা আমতা করলেই, তক্ষুনি কোনও মেয়েকে এ ঘরে ডেকে নেয় কণিকা। কিংবা টিভিতে কোনও সিনেমা চালিয়ে দেয়। আদর করতে গেলেই বলে, বিরক্ত কোরো না। সিনেমা দেখছি।

কিছু দিন আগে ‘চলমান শিল্প আন্দোলন’-এর তরফ থেকে কর্পোরেশন বিল্ডিংয়ের পেছনে, নিউ মার্কেটের চ্যাপলিন স্কোয়ারে আয়োজন করা হয়েছিল তিন দিন ব্যাপি এক চিত্রপ্রদর্শনী। তার সঙ্গে ছিল কবিতা পাঠের আসর। সেখানে যেমন বিভিন্ন নামী-অনামী শিল্পীরা যোগ দিয়েছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন নানান বয়সের কবিরাও।

ওখানে আমন্ত্রিত হয়েছিল ঋজু। চিঠি পাওয়ামাত্র উদ্যোক্তাদের বলে-কয়ে কণিকার নামটাও কবিদের তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আজকাল যেখানেই ওদের কবিতা ছাপা হয়, একই পাতায় পাশাপাশি ছাপা হয়। লেখালিখির জগতের প্রায় সকলেই ওদের কথা জেনে গেছে।

লক্ষ্মণ শেঠের বউ তমালিকা পন্ডা শেঠ কয়েক বছর ধরে হলদিয়ায় যে বিশ্ব বাংলা কবিতা উত্‌সব করছে, সেখানে প্রথম বছর থেকেই ঋজু যায়। উত্‌সব কমিটির সম্পাদক শ্যামলকান্তি দাশকে ধরে সেখানেও ওর কবিতা পাঠের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ঋজু। ওখানে পৌঁছনোর পরে ও ছুঁক ছুঁক করছিল কোথাও ঘর পাওয়া যায় কি না। কিন্তু কাকে বলবে সে! রিসেপশন কাউন্টারে খুব মাতব্বরি করছিল একটি ছেলে। আশিস মিশ্র। তাকে বলতে যাবার আগেই দেখে, উদ্যোক্তারা ওদের থাকার জন্য আকাশদ্বীপ হোটেলে একটা ঘর বরাদ্দ করে রেখেছে।


চলমান শিল্প আন্দোলন-এর অনুষ্ঠানেও একই দিনে ওদের দু’জনের কবিতা পড়ার কথা। কণিকাকে নিয়ে ঢুকতেই ঋজু দেখল, মাঠের এক পাশে কিছু চেয়ার নিয়ে মিহির, গণেশ, রফিক, দিশা ছাড়াও আরও কয়েক জন দল বেঁধে আড্ডা মারছে। ওরাও ওদের সঙ্গে বসে পড়ল। হঠাৎ একজন এসে ঋজুকে বলল, আপনাকে অভিজিৎদা ডাকছে। অভিজিৎদা মানে অভিজিৎ ঘোষ। যার সম্পাদিত সৈনিকের ডায়েরিতে ওর প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা তিনিই। সঙ্গে সঙ্গে ঋজু চলে গেল সেখানে। জড়িয়ে ধরল অভিজিৎকে। দু’-চার কথার পরেই উনি বললেন, তোর সঙ্গে যে মেয়েটি ঢুকল, কণিকা না?

— হ্যাঁ, তুমি চেনো নাকি?

— ও তো আগে আবৃত্তি-টাবৃত্তি করত।

— তাই নাকি?

— হ্যাঁ, আমার এক বন্ধু ওকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল। আমার বেশ কিছু কবিতা ক্যাসেটে তুলে আমাকে দিয়ে গিয়েছিল। আমার বন্ধুবান্ধবরা যে সব অনুষ্ঠান করে, সে সব জায়গায় যাতে ওকে আবৃত্তি করার সুযোগ করে দিই, সেই জন্য। কয়েক জায়গায় করেও দিয়েছিলাম। 

— তোমার বন্ধু?

— বন্ধু মানে কি, আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। আমরা দাদা ডাকতাম। টেলিফোনে কাজ করত। খুব বড় পোস্টে। ফোন খারাপ হলেই ওকে বলতাম। ও সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে দিত। ও তো কণিকার বস ছিল। কণিকা তো ওর সঙ্গেই থাকত।

— থাকত! মানে?

— মানে বুঝিস না? বয়স কত হল? তখনও ও সল্টলেকের ফ্ল্যাটটা পায়নি। মানিকতলার কাছে আমার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ছিল। আমার সেই বন্ধু ওটা কিনতে চেয়েছিল কণিকাকে নিয়ে থাকবে বলে। আমি বিক্রি করিনি। পরে শুনলাম, আমার সেই বন্ধুকে ধরেই নাকি ও অনেক কিছু বাগিয়েছে।

— তাই, কী নাম তার?

— ওই তো, সল্টলেকের ডি এন ব্লকে থাকত... কী নাম যেন... কী নাম... ও হ্যাঁ, অপূর্বকুমার সরকার। বহু দিন যোগাযোগ নেই তো... কলকাতা টেলিফোনের সবাই চেনে। কণিকার দুটো মেয়ে ছিল না! যমজ। কী যেন নাম! রুনু ঝুনু, না?

— রুনু ঝুনু!

— হ্যাঁ, ও তো তাই বলত, আমার তিন মেয়ে রুনু ঝুনু বুনু।

— বুনু!

— আসলে আমার ওই বন্ধুর মেয়ের নাম ছিল বুনু। ওর এক ছেলে এক মেয়ে। ওদের দাদু-দিদারা ওর ছেলেকে দাদুভাই আর ওর মেয়েকে বুনু বলে ডাকত। তাঁদের দেখাদেখি বাড়ির সবাই ওকে বুনু বলে ডাকতে শুরু করে। এমনকী, আমার সেই বন্ধুও।

— সে কী!

— ও যখন কণিকাকে অফিসের থ্রু দিয়ে সল্টলেকের ফ্ল্যাটটা পাইয়ে দিল, তখন আমার সেই বন্ধু তো ওই ফ্ল্যাটে গিয়েই থাকত। ওর মেয়েদের ইংরেজি শেখাত। মাঝে মাঝে স্কুটারে করে চিড়িয়াখানা, দক্ষিণেশ্বর, ডায়মন্ড হারবার, কত জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেত। ওই বাড়িতেই তো ওর প্রথম হার্ট অ্যাটাকটা হয়।

— তাই নাকি?

— শুনেছিলাম, উত্তেজনা থেকে নাকি ওটা হয়েছিল। সেটা ঝগড়ার কারণেও হতে পারে। আবার সেক্স করতে গিয়েও হতে পারে। হঠাত্‌ করেই নাকি ওর হার্টবিট খুব বেড়ে গিয়েছিল। কণিকা খুব বাঁচা বেঁচে গেছে। তখন যদি ওর কিছু হয়ে যেত, কণিকা কেস খেয়ে যেত। ওর বউ খুব জাঁদরেল মহিলা। চেনে না তো...

— উনি এখনও আছেন?

— জানি না বেঁচে আছেন কি না, বহু দিন কোনও যোগাযোগ নেই তো, তুই কিন্তু আবার বলিস না, আমি তোকে এ সব কথা বলেছি।

আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না ঋজুর। মনটা কেমন খিচ মেরে গেছে। আগের জায়গায় ফিরে এসে কণিকাকে ডেকে নিয়ে ওদের থেকে একটু দূরে সরে গেল ও। তুমি অপূর্বকুমার সরকারকে চেনো?

প্রশ্ন নয়, ঋজুর মুখে ওই নামটা শুনে ও যেন ভূত দেখল। কে বলল তোমাকে?

— যে-ই বলুক। তুমি চেনো?

— হ্যাঁ। উনি আমাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন।

— আমি তো অন্য কথা শুনলাম।

— কী শুনেছ?

— উনি নাকি তোমাকে নিয়ে থাকতেন?

— একদম বাজে কথা। উনি যখন আমার বস হয়ে এলেন, তার সাত দিন পরেই তো রিটায়ার হয়ে গেলেন।

— তোমার সঙ্গে ওঁর কী সম্পর্ক ছিল?

— বললাম তো। তুমি আমাকে একদম বিশ্বাস করো না, না? বলেই, সারা মুখ ঘন মেঘে ঢেকে ফেলল। চোখ ছলছল হয়ে উঠল। ‘আমি কবিতা পড়ব না’ বলেই, হনহন করে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। পিছু পিছু ঋজুও। ওদের দু’জনের কারওরই সে দিন কবিতা পাঠ করা হল না।


মা আর আঙ্কেলের মন কষাকষি দেখে ছোট বাবি দু’কাপ কফি বানিয়ে দিয়ে যাবার সময় দরজা টেনে, ও পাশ থেকে টানটান করে পর্দা দিয়ে দিল।

শেষ চা খেয়ে রাত এগারোটা নাগাদ যখন ঋজু ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে, টা টা করার জন্য দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে কণিকা, তখন ছোট বাবি এসে বলল, আঙ্কেল, সে দিন আপনি বলছিলেন না, আজকাল পুজো সংখ্যায় আপনি কবিতা দেবেন? তা, মা’র এই কবিতাটা আমি কপি করে রেখেছি, আপনারটা যখন দেবেন, এটা দিয়ে দেবেন?

আজকাল পুজো সংখ্যা দেখেন সুব্রত সেনগুপ্ত। তাঁকে নিজের কবিতা দেওয়ার সময় ওই একই খামের ভিতরে কণিকার কবিতাটাও দিয়ে দিয়েছিল ঋজু। কিন্তু আজকাল যখন বেরোল, তাতে কণিকার কবিতা নেই। সকালেই ফোন করল ছোট বাবি— আঙ্কেল, এটা কী হল? মা’র কবিতা আজকালে নেই কেন?

ঋজু মনে মনে বলল, কী করে বলব, আমি তো ওই কাগজের সম্পাদক নই, হলে শুধু কবিতা নয়, তোমার মায়ের উপন্যাস, এমনকী জীবনীও ছেপে দিতাম। কিন্তু মুখে বলল, তাই নাকি? ঠিক আছে, আমি দেখছি। 

— আর কী দেখবেন? কাগজ তো বেরিয়ে গেছে। লেখাটা আপনি দিয়েছিলেন তো?

— মা উঠেছে? মাকে দাও।

— মা’র মনমেজাজ ভাল নেই। কারও ফোন ধরছে না।

— বলো, আমি করেছি।

— এখানে নেই। বলেই, রিসিভার নামিয়ে রাখল। ছোট বাবি যে এ রকম ব্যবহার করতে পারে, ঋজু ভাবতেই পারেনি। অথচ এই সে দিনও পুরো ব্যাপারটাই ছিল উল্টো। মনে মনে ঋজু ভাবল, ভাগ্যিস সে দিন ও রকম একটা রিস্ক নিয়েছিল সে।


পুজো সংখ্যার লাস্ট ফর্মা রেডি করে রমাপদবাবু বেরিয়ে গেছেন। লেখক তালিকা দিয়ে বিজ্ঞাপনও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। সন্ধের দিকে লেখার পুলআউটগুলি আর্টিস্ট দিয়ে পাতায় পেস্ট করাচ্ছিল ঋজু। হঠাৎ ছোট বাবির ফোন— আঙ্কেল, মা’র কবিতাটা আনন্দবাজারে যাচ্ছে তো?

আগের দিনই কথায় কথায় ছোট বাবিকে ও বলে ফেলেছিল, কাল লাস্ট ফর্মা ছাড়া হবে। লাস্ট ফর্মা মানে সূচিপত্র, দু’-চারটে বিজ্ঞাপন আর কবিতার পাতা। সব কাগজেরই ফাস্ট ফর্মাটা সবার শেষে ছাড়া হয়। এ দিন না হলে আর হবে না। যে-ভাবেই হোক, রমাপদবাবুকে ম্যানেজ করে তোমার মা’র কবিতাটা কাল ঢুকিয়ে দিতে হবে।

কিন্তু আজ রমাপদবাবুর মেজাজ একেবারে তুঙ্গে। ফলে ওনাকে কিছুই বলতে পারেনি ও। এখন ছোট বাবিকে ও কী বলবে! ওদের আঙ্কেল আমতা আমতা করছে দেখে ছোট বাবি বলল, কবিতাটা না বেরোলে কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার চিরজীবনের জন্য কাট্টি। আর মাকেও বলে দেব, যাতে আপনার সঙ্গে কথা না বলে...

শব্দ নয়, ওর মাথার উপরে কেউ যেন একটা পাহাড় চাপিয়ে দিল। কী করবে ও! কী করবে! একমাত্র উপায় যেটা, ও সেটাই করল। কিছু দিন আগে দেওয়া কণিকার কবিতাটা ওর ব্যাগেই ছিল। ও সেটা পি টি এস থেকে তড়িঘড়ি কম্পোজ করিয়ে একেবারে পুলআউট বার করে আনল। কিন্তু ঢোকাবে কোথায়! একমাত্র আনন্দবাজার পুজো সংখ্যাতেই সবচেয়ে কম কবিতা ছাপা হয়। আর যাঁদের কবিতা ছাপা হয়, তাঁরা প্রত্যেকেই বিখ্যাত। কার লেখা বাদ দেবে ও? কার? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা বাদ দেওয়া যাবে না। সমরেন্দ্র সেনগুপ্তও তাই। কমল দে সিকদার আবার খোদ আনন্দ পাবলিশার্সের বাদল বসুর ক্যান্ডিডেট, ফলে ভুল করেও ওটায় হাত দেওয়া যাবে না। শক্তিপদ মুখোপাধ্যায় ওর কলিগ। বিজ্ঞাপনে কাজ করে। সকালে-বিকালে দেখা হয়। ওর লেখা ছাপা না হলে রমাপদবাবুকে ও জ্বালিয়ে মারবে। বছরে এই একটাই কবিতা লেখে ও। এবং সেটা এখানে। তা হলে! হঠাৎ চকচক করে উঠল ঋজুর মুখ। এই তো পেয়েছি। ও দেখল, একমাত্র রত্নেশ্বর হাজরারই দাঁত নেই। নোখ নেই। সামান্যতম ক্ষতি করারও কোনও ক্ষমতা নেই তাঁর। আর তা ছাড়া, মাকে নিয়ে যে মানুষ অমন মর্মস্পর্শী কবিতার সিরিজ লিখতে পারেন, তাঁর পক্ষে কারও ক্ষতি করা তো দূরের কথা, কারও বিরুদ্ধে সামান্য অভিযোগ জানানোও সম্ভব নয়। ফলে কবিতার পাতা থেকে রত্নেশ্বর হাজরার কবিতাটা তুলে, সেখানে কণিকার কবিতাটা সেঁটে ও লাস্ট ফর্মা ছেড়ে দিল।

‘প্রকাশিত হচ্ছে’ বলে, পর দিন আনন্দবাজারে বিশাল বিজ্ঞাপন বেরোল। সকালেই ছোট বাবির ফোন— আঙ্কেল, আনন্দবাজার পুজো সংখ্যার বিজ্ঞাপন দেখলাম। সেখানে তো মা’র নাম নেই। কী হল?

— তুমি বিজ্ঞাপনে নাম দেখতে চাও, না পুজো সংখ্যায় লেখা দেখতে চাও?

— কবে বেরোবে?

— দু’-তিন দিনের মধ্যে।


যে দিন পুজো সংখ্যা বেরোল, সে দিন সকালেই রমাপদবাবুর ফোন। উনি মাঝে মাঝেই ঋজুকে ফোন করেন। এই তো ক’দিন আগে সকাল সাড়ে সাতটা কি আটটা হবে, হঠাৎ উনি ফোন করলেন। ঋজু তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। ফোন ধরতেই উনি বললেন, উঠে গেছেন?

ঘুম-চোখে ঋজু বলল, হ্যাঁ, এই উঠলাম।

উনি বললেন, তা হলে ঠিক আছে, এক্ষুনি আসতে হবে না। একটু বেলা করেই আসুন। ন’টা নাগাদ এলেও চলবে।

ন’টা! ঋজু হতভম্ব। কারণ, ও যদি তখনই ওই অবস্থাতেই রওনা দেয়, তা হলেও ন’টা নাগাদ তাঁর বাড়িতে গিয়ে ও কিছুতেই পৌঁছতে পারবে না। কারণ, ওর বাড়ি থেকে রমাপদবাবুর বাড়িতে যেতে গেলে তিনটে বাস বদল করতে হয়। যত চেষ্টাই করুক না কেন, সওয়া এক ঘণ্টা-দেড় ঘণ্টার কমে তাঁর বাড়িতে কিছুতেই যাওয়া যায় না।

তাড়াহুড়ো করে ও যখন তাঁর বাড়ি গিয়ে পৌঁছল, রমাপদবাবু ওকে কিছুই বললেন না। এমনিই টুকটাক কথা বলতে লাগলেন। ও গেলে রমাপদবাবুর স্ত্রী ওকে ডিমপোছ করে দেন। চা করে দেন। সে সব করার জন্য উনি যখন রান্নাঘরে ঢুকলেন, রমাপদবাবু অমনি রান্নাঘরের দিকটা এক বার উঁকি মেরে দেখে নিয়ে ঋজুকে ফিসফিস করে বললেন, আমার সিগারেট ফুরিয়ে গেছে। এক প্যাকেট এনে দেবেন? আমি বেরোতে গেলে আপনার বউদি আবার সন্দেহ করবে।

ঋজু অবাক। সাতসকালে ঘুম ভাঙিয়ে শুধু এই জন্য উনি ডেকে এনেছেন!

ঋজু জানত, রমাপদবাবুর সিগারেট খাওয়া তাঁর স্ত্রী একদম পছন্দ করেন না। যেমন রমাপদবাবু মোটেই পছন্দ করেন না, তাঁর বউ ঋজুকে দিয়ে নিজেদের কোনও ব্যক্তিগত কাজ করান।

অথচ তাঁর স্ত্রী মাঝেমধ্যেই ঋজুকে ফোন করেন। এটা আনতে বলেন। ওটা আনতে বলেন। এবং সেটা যাতে রমাপদবাবুকে ও কথায় কথায় বলে না ফেলে, সেটাও বলে দেন। উনি ঋজুর মায়ের চেয়েও বয়সে বড়। তাই ক’দিন আগে উনি যখন ফোন করে ঋজুকে বললেন, কয়েক হাত শায়ার দড়ি নিয়ে আসতে পারবেন? এলে দাম দিয়ে দেবো।

ঋজু বলেছিল, কালকে নিয়ে গেলে হবে?

উনি বলেছিলেন, কাল কেন? পরশু, তরশু, তার পরের দিন আনলেও চলবে।

কিন্তু ঋজু আর পরশু তরশুর জন্য ফেলে রাখেনি। পর দিনই কয়েক হাত শায়ার দড়ি কিনে নিয়ে সোজা হাজির হয়েছিল রমাপদবাবুর বাড়িতে। দরজা খুলেই রমাপদবাবু বললেন, আপনি হঠাত্‌? কী ব্যাপার?

এ রকম বহু বার হয়েছে। উনি যেতে না বললে, ও তাঁর বাড়ি গেলেই, উনি এমন ভান করেন, যেন ওকে চেনেনই না। ও যেন কোনও কোম্পানির সেলসম্যান। মালপত্র গছাতে এসেছে। এ রকম অভিজ্ঞতা পুজোর পরে বিজয়া করতে গিয়েও ওর হয়েছে।

তাই ও বলেছিল, এ দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম, আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই। যদি কোনও দরকার লাগে, তাই আর কি...

উনি দরজার সামনে দাঁড়িয়েই বললেন, না না, এখন কোনও দরকার নেই। বলেই, দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন, অমনি তাঁর স্ত্রী পেছন দিক থেকে এসে উঁকি মেরে বললেন, আরে ঋজু যে, আসুন আসুন। চা খেয়ে যান।

শুধু রমাপদবাবুই নন, তাঁর স্ত্রীও, বয়সে তাঁদের থেকে যত ছোটই হোক না কেন, সবাইকেই আপনি করে বলেন।

সে দিন যতক্ষণ না রমাপদবাবু বাথরুমে ঢুকলেন, বউদির হাতে ওই শায়ার দড়ি দেওয়ার জন্য ঋজুকে ততক্ষণ ওই বাড়িতে বসে থাকতে হয়েছিল।

কখন রিং হয়েছে ঋজু খেয়াল করেনি। ওর মা-ই বললেন, ঋজু, তোর ফোন। রমাপদবাবু করেছেন।

ফোনের কাছে যেতে যেতে ঋজুর মনে হল, আজও নিশ্চয়ই সিগারেট ফুরিয়ে গেছে! ফোন ধরতেই রমাপদবাবু বললেন, কী ব্যাপার, রত্নেশ্বর হাজরার কবিতা যায়নি?

— না মানে...

— একটু আগে রত্নেশ্বর আমাকে ফোন করেছিলেন। বললেন, বিজ্ঞাপনে নাম আছে, সূচিপত্রেও নাম আছে, কিন্তু বইতে তো লেখা দেখছি না। আমি খুলে দেখি, সত্যিই তাই। আর অন্য কার যেন একটা কবিতা দেখলাম, কার কবিতা? আমি তো দিইনি।

যাঃ। কবিতাটা ও পাল্টে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সূচিপত্রের কথাটা তো ওর মাথাতেই আসেনি। থতমত খেয়ে গেল ও। তবু বলল— ও, ওই কবিতাটা? ওটা তো কবিতার বাক্সে ছিল। রিকোয়েস্টের কবিতা। তা, পাতা মেক-আপ করতে গিয়ে দেখি, রত্নেশ্বরবাবুর কবিতাটা ওখানে ধরছে না। বড় হচ্ছে। অথচ পাতায় তখন ছবিটবি আঁকা হয়ে গেছে। জায়গাটা ফাঁকা যাবে! আপনি তো সব সময়ই বলেন, সবার কবিতাই সমান। উনিশ-বিশের তফাত। তাই ওই কবিতাটা কম্পোজ করে বসিয়ে দিয়েছিলাম।

— সেটা তো আমাকে বলবেন। ক’দিন ধরে পর পর এতগুলো বিজ্ঞাপন বেরোল, তা হলে সেটা কারেকশন করে দিতে পারতাম।

রমাপদবাবু ফোন রাখতেই ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল ঋজুর। যাক্ বাবা, বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। ওনার জায়গায় আজ অন্য কেউ হলে চাকরি চলে যেত।

রমাপদবাবু এই রকমই। ওর মনে আছে, ওর ছেলে তখন খুব ছোট। সাত কি আট মাস বয়স। মুখেভাত দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। অথচ হাতে কোনও টাকা-পয়সা নেই। লিখে-টিখে যা পায়, তাতে টেনে-টুনে কোনও রকমে চলে। বউয়ের পেটে বাচ্চা আসার পর থেকেই ও প্রতি মাসে এক-দুশো করে জমাচ্ছে। বিয়ের পরে পরেই ওর বউ বলেছিল, ছেলে-মেয়ে যাই হোক, আমাদের বাচ্চাকে আমরা কিন্তু নবনালন্দায় পড়াব।

ওর বাপের বাড়ির ওখানকার সব অবস্থাপূর্ণ লোকেরাই নাকি তাদের বাচ্চাদের ওখানে পড়ায়। সেখানে পরীক্ষা-টরিক্ষা যা হয়, সবই নাকি লোক দেখানো। ভিতরে ভিতরে ডোনেশন নিয়ে ভর্তি করে। সেই ডোনেশনের জন্যই ও টাকা জমাচ্ছিল।

কিন্তু স্কুলে ভর্তির ব্যাপার তো অনেক পরে, তার আগে মুখেভাত। তাই যেখানে যা ছিল, সে-সব জড়ো করে, ঘট-টট ভেঙে দেখা গেল, সাকুল্যে দু’হাজার চারশো টাকা। খাতা-কলম নিয়ে হিসেব কষে ও দেখল, নমো নমো করে মুখেভাত দিতে গেলেও কম করে সাড়ে চার-পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। এত টাকা কোথায়! কার কাছে চাওয়া যায়! কার কাছে!

ওর প্রথমেই মনে হল, রাধানাথ মণ্ডলের কথা। ও চাকরি করে আবার ব্যবসাও করে। ওর কাছে চাইলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তাই, রাধানাথের কাছে ও দু’হাজার টাকা ধার চাইল। বলল, মাসে মাসে কিছু কিছু করে দিয়ে শোধ করে দেবো।

রাধানাথ বলল, ঠিক আছে, দেবো। দেরি আছে তো...

অন্নপ্রাশনের দিনক্ষণ সব ঠিক করে ফেলল ঋজু। যখন আর মাত্র চার দিন বাকি। রাধানাথের কাছে টাকার কথা বলতেই সে বলল, দেরি আছে তো...

মুখেভাতের দু’-দিন আগে যখন চাইল, তখনও সেই একই কথা, তোমার কাজ তো পরশু। কাল নিয়ে নিও।

পর দিন অফিসে যেতেই রাধানাথ ব্যাগট্যাগ ঘেঁটে বলল, এই রে, মারাত্মক একটা ভুল হয়ে গেছে গো। তোমার জন্য আলমারি থেকে দু’হাজার টাকা বার করে খামে ভরেছিলাম। ওটা মনে হচ্ছে বিছানার ওপরেই ফেলে এসেছি। একটা কাজ করো, আমি তো কাল বারোটার মধ্যে ঢুকে পড়ছি, তোমার সুযোগ-সুবিধে মতো এক ফাঁকে এসে তুমি টাকাটা নিয়ে যেও। না-হলে কারও কাছ থেকে নিয়ে চালিয়ে নাও। পরশু দিয়ে দেবো। বলেই, আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে চার তলার ক্যান্টিংয়ে খেতে চলে গেল।

রাধানাথের কথা শুনে ওর মাথায় যেন বাজ পড়ল। চোখে-মুখে অন্ধকার দেখতে লাগল। বলবে না বলবে না করেও ইতিমধ্যে বেশ কয়েক জনকে ও নেমন্তন্ন করে ফেলেছে। এখন উপায়! পা অবশ হয়ে আসছে। ও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। রাধানাথের পাশের চেয়ারটায় ধপাস করে বসে পড়ল।

এই অফিসে এক-দেড় ঘণ্টা পর পরই ট্রলি করে চা আসে। এক কাপ চা পাঁচ পয়সা। রমাপদবাবু বসেন ঘরের একদম কোণের দিকে। এবং যত বার চা আসে, উনি প্রায় প্রতি বারই খান।

চাওয়ালা ঢুকতেই ঋজুকে দেখিয়ে রমাপদবাবু বললেন, ওখানে একটা দিন।

ছেলেটা ঋজুর সামনে চায়ের কাপ রাখতেই ঋজু সচকিত হল। বলল, না গো, এখন খাব না।

রমাপদবাবু বললেন, খান খান।

কিন্তু ঋজুর তখন যা মানসিক অবস্থা, গলা থেকে আর চা নামবে না। তাই বলল, না, থাক।

— থাক কেন? খান। রমাপদবাবুকে সবাই সমীহ করে চলে। যথেষ্ট ভয়ও পায়। ওঁর কথা অগ্রাহ্য করে, এমন লোক নেই। ঋজু অন্যমনস্ক ভাবে খুব ধীরে ধীরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগল। কাল ছেলের মুখেভাত। সাড়ে চার-পাঁচ হাজার টাকার ধাক্কা। অথচ হাতে আছে মাত্র আড়াই হাজার। এতে কী হবে! যে করেই হোক, আজকের মধ্যে তাকে কিছু টাকা জোগাড় করতেই হবে। কিন্তু কার কাছে চাইবে সে! কার কাছে!

চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াতেই রমাপদবাবু বললেন, বেরিয়ে যাচ্ছেন নাকি?

রমাপদবাবু বললেন ঠিকই, কিন্তু উনি কী বললেন, ওর কানে গেল না। ওর তখন একটাই চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছে, কার কাছে টাকা চাওয়া যায়! কার কাছে!

রমাপদবাবু ফের বললেন, যাওয়ার সময় দেখা করে যাবেন।

ও আজ আর অন্য কোথাও যাবে না। কাল ছেলের অন্নপ্রাশন। আজও আসত না। শুধু টাকার জন্যই এসেছিল। ফলে ও এখন সোজা বাড়ি চলে যাবে। তাই গুটিগুটি পায়ে রমাপদবাবুর কাছে গিয়ে বলল, আমি আসছি।

— চলে যাচ্ছেন? বলেই, ড্রয়ার খুলে একটা মোটা খাম বার করে ওর দিকে এগিয়ে দিলেন, নিন।

— কী এটা?

— বাড়ি গিয়ে দেখবেন।

বাড়ি নয়, ওই ঘর থেকে বেরিয়েই একটু আড়ালে গিয়ে খাম খুলে ঋজু দেখে, ভিতরে কড়কড়ে পঞ্চাশখানা একশো টাকার নোট। এত টাকা! উনি ওকে দিয়ে মাঝে মধ্যে টুকিটাকি কাজ করান। ইলেকট্রিক বিল দিতে দেন। কলেজ স্ট্রিট পাড়া থেকে বই আনান। এ দিকে ও দিকে পাঠান। কিন্তু ওর হাত দিয়ে কাউকে কখনও টাকা পাঠিয়েছেন বলে ওর মনে পড়ল না। কাকে দিতে হবে এটা, উনি তো সেটা বললেন না! ও ফের ঘরে ঢুকল। বলল, এটা কাকে দেবো?

উনি বললেন, কাল তো আপনার ছেলের মুখেভাত?

ও বলল, হ্যাঁ।

— এটা রাখুন। এখন কাজ চালান। পারলে, পরে শোধ করে দেবেন। 

যে লোকটা লোহার মতো নিরস, সেই লোকটা ভিতরে ভিতরে এমন! ঋজুর দু’চোখ জলে ভরে উঠল।


যে দিন আনন্দবাজার পুজো সংখ্যা বেরোল, সে দিন সকালেই তিন কপি বই কিনে কণিকা তার সি জি এম-কে এক কপি দিল। মহাদেববাবুকে দিয়ে এক কপি পাঠিয়ে দিল বেলুড়ে। ওর বাপের বাড়িতে। আর এক কপি স্কুলছাত্রীদের মতো বুকের কাছে ধরে অফিস আর বাড়ি যাতায়াত করল টানা ক’দিন।

খুব খুশি হয়েছিল কণিকা। দুই বাবিও। অথচ তার মাত্র কয়েক দিন পরেই আজকালে লেখা ছাপা হয়নি দেখে এমন কথা! ঋজু আর ফোন করেনি। সে দিন না। তার পর দিনও না। কণিকাও করেনি।

কিন্তু ‘ঋজু সন্ধ্যা’ হচ্ছে, ওকে না বললে হয়! ও কণিকার অফিসে ফোন করে ওকে মুক্তাঙ্গনে আসার জন্য নেমন্তন্ন করল।

কণিকা বলল, ওখানে গিয়ে আমি কী করব?

— আমার অনুষ্ঠান। তুমি আসবে না? ওই দিন তো তোমার ছুটি। রবিবার পড়েছে।

— দেখি। অনুষ্ঠানের দিন সকালে একটা ফোন করে মনে করিয়ে দিও।


বারোটা নাগাদ ঋজু যখন ফোন করল, মহাদেববাবু বললেন, কণিকা তৈরি হচ্ছে।

— এত তাড়াতাড়ি? অনুষ্ঠান তো বিকেলে!

বিকেল গড়িয়ে গেল। সন্ধ্যা নেমে এল। অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। কিন্তু কণিকা এল না। রাতে যখন ও ফোন করল, ছোট বাবি ধরল, মা ঘুমোচ্ছে। আচ্ছা আঙ্কেল, ঋজু সন্ধ্যা হল। এটা কি ‘ঋজু-কণিকা সন্ধ্যা’ হতে পারত না!

ঋজু থ হয়ে গেল।



                                                ক্রমশ...

______________________________________________


পঞ্চম পর্বটি পড়তে নীচে দেওয়া লিংক টি ক্লিক করুন-

Click here


সপ্তম পর্ব টি পড়তে নীচে দেওয়া লিংক টি ক্লিক করুন --

Click here 🔴

Wednesday, June 15, 2022

ছোট গল্প - কালো রঙের চাঁদ || লেখক - তৈমুর খান || Short story - Kalo Ronger Chand || Written by Taimur khan


 

কালো রঙের চাঁদ 

তৈমুর খান 



     এক. 


নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। অন্তরটা মোচড় দিয়ে উঠল। প্রায় দশ বছর হয়ে গেল এতটুকু চিড় ধরেনি মনে। নানা কাজে ভুলে গেছি হয়তো। সাংসারিক জটিলতা আর টানাপোড়েনে বিধ্বস্ত হয়েছি। কিন্তু যখনই একা হয়ে গেছি, যখনই নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি তখনই মনে পড়েছে ওকে। ওই আমার প্রথম নির্বাচিত নারী। যাকে আমি আমার জীবনের সঙ্গী করতে চেয়েছিলাম। 


       উচ্চ শিক্ষা লাভ করেও যখন চাকুরি পাচ্ছি না, শুধু টিউশানই একমাত্র ভরসা, তখন কোন্ মেয়ের বাপ আমার সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দেবে? সুতরাং বিয়ে করার ভাবনা মাথাতেই আসেনি। কোনও রকম দিন কেটে যাচ্ছে। কোথাও ঝিলিক দিচ্ছে নারীমুখ ।জ্যোৎস্না রাত হাতছানিও দিচ্ছে না তা নয়। মধ্যরাতে ঘুমও ভেঙে যাচ্ছে । স্বপ্নের ভেতর কখনও কখনও ছাত্রীরাও উঁকি মারছে। তা মারুক, কেউকেই বেশি প্রশ্রয় দিতে পারছি না। এমন সময়ই কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত করি আর জুটে যায় একটা কলেজের আংশিক শিক্ষকের চাকুরি। একে কি চাকুরি বলে! নিজেরই সন্দেহ হয়। মাস গেলে দেড় হাজার টাকা। তা হোক, টিউশানের বাজার বাড়তে থাকে। আয়ও প্রায় পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। 


        দিব্যি একটা সংসার চলবে, তুই বিয়ে কর! চা খেতে খেতে এক হাতুড়ে ডাক্তার বন্ধু পরামর্শ দেয়। নিজেও ভাবতে থাকি বয়স প্রায় তিরিশে পা দিতে চলেছে। এ সময় তো বিয়ে করা জরুরি বইকি! ভাবতে ভাবতে বলি, কিন্তু কাকে বিয়ে করব? 


          বন্ধুটি দ্রুত উত্তর দেয়, আমারই মামা শ্বশুরের মেয়ে আছে, নোনাডাঙা বাড়ি। এবছরই বি এ পাস করেছে। আমাকে বর খুঁজতে বলেছে। আগামি রবিবারই চল্, দেখে আসি। 


         সম্মতি না দিয়ে পারিনি। একটা বয়সে বিয়ে করার ইচ্ছা সব নারী-পুরুষেরই থাকে। আমারও ছিল। একটা বি এ পাস মেয়ে, দেখতে ভালো হলে এবং আমাদের সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারে মানিয়ে নিলে বিয়ে করতে আপত্তি কোথায়? 


       কিন্তু সেই সপ্তাহে রবিবার দিনটি আসতে বড়োই দেরি করছে আমার মনে হল। প্রতিদিনই বারের হিসেব করি আর রাত দীর্ঘ হয়ে যায়। অবশেষে বহু নির্ঘুম রাত আর প্রতীক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত রবিবারটি এসে উপস্থিত হল। বুঝতে পারলাম, বাসনা তীব্র হলে সময় তখন দীর্ঘ মনে হয়। মুহূর্তগুলিও বছরে পরিণত হয়ে যেতে পারে। 


        সকাল সকাল স্নান করে বেরিয়ে পড়লাম চুপচাপ। বন্ধুটিকে সঙ্গে নিতে হবে। ওরই পরামর্শ ছিল, কাউকে জানানোর দরকার নেই, আগে পছন্দ হোক, তারপর কথাবার্তা। বাড়ির লোকও জানবে না। 


         বাসে করে যাচ্ছি। সমস্ত রাস্তা কত রকম চিন্তা এসে ধাক্কা দিচ্ছে। কী জিজ্ঞেস করব? হ্যাঁ, কোন্ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা, ইসলাম সম্পর্কে কেমন ধারণা, সংসারে মানিয়ে নেবার ক্ষমতা আছে কিনা ইত্যাদি। কখনও আবার মনে আসছে, কী হবে ওসব জিজ্ঞেস করে? বরং মেয়েটি দেখতে কেমন হবে, কাজ করার ক্ষমতা আছে কিনা, সহিষ্ণু কিনা ইত্যাদি। বাস ছুটছে, যেন আমরা যুদ্ধ জয় করতে যাচ্ছি। তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে সেই রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছি। কী আনন্দ! মনপ্রাণ যে নাচছে, কিন্তু কেউ দেখতে পাচ্ছে না। হাওয়া এসে চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। বারবার কল্পনায় দেখে নিচ্ছি মেয়েটির চোখ। কী উজ্জ্বল! কী স্নিগ্ধ! কী বিস্ময়! 

    
         


দুই. 


যথারীতি খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে মেয়েটিকে আনা হল আমাদের সামনে। না, সাজপোশাকের কোনও বালাই নেই। যে শাড়িটি পরে সে এখানে ওখানে বের হয় কোনও অনুষ্ঠানে, সেই শাড়িটিই পরে এসে উপস্থিত হল। সকালের রোদ রং শাড়ি। অপূর্ব মানিয়েছে। সাদা সাদা বেলফুলের ছাপ সমস্ত শাড়ি জুড়ে। আরও পবিত্র ও স্নিগ্ধ করে তুলেছে ওকে। সামনে দাঁড়িয়েই সকলকে সালাম জানাল। যথারীতি সালামের উত্তরও দিলাম। তারপর বললাম, বসুন! 


     প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর করল, আমাকে "তুমি" বলুন। 

   

      বেশ, তাই হবে। তারপর মুখ তুলে তাকাল। 

মুখটি খুব সুন্দর নয়, কিন্তু বড়ো সরল ও সতেজ মনে হল। নাকের নিচে ঠোঁটের বাঁ দিকে একটা কালো তিল, কালো রঙের চাঁদের মতো চনমন করছে দেখলাম। শ্যামবর্ণ ঠোঁটের লাল আভা অস্ফুট পদ্মের লাল পাপড়ির মতো। কপালের এক গোছা চুল যেন স্থির তরঙ্গের মতো। মুখটি গোল হতে হতে শেষ পর্যন্ত আর গোল হয়নি। আঁটসাঁট শরীরের সঙ্গে বেশ মানানসই। বন্ধুটি বলেছিল, ভালো ছেলে খুঁজছে, চাকুরি না হলেও হবে। ওর বাপের যা আছে তাতে বহু বড়োলোক জামাই ও পাবে। কিন্তু তা দেবে না। সৎ, শিক্ষিত ভালো ছেলে হলেই হবে। 


       আমি এই তথাকথিত ভালো ছেলের পর্যায়ে পড়ি কিনা সে কথাই ভাবছিলাম বারবার আর ভাবতে ভাবতেই প্রশ্ন-উত্তর পর্ব শুরু হয়েছিল। 

—তোমার নাম কী? 

—খালিদা রহমান। 

—পিতার নাম? 

—হাফিজুর রহমান। 

—কত দূর লেখাপড়া করেছ? 

—বি এ পাস। 

—কী কী বিষয় ছিল? 

—বাংলা, ইতিহাস, দর্শন। 

—কোন্ বিষয় পড়তে ভালো লাগে? 

—বাংলা। 

—আচ্ছা, একটা খুব অপ্রিয় কথা জানতে চাই, আমি তো চাকুরি করি না, টিউশান করি আর কলেজের আংশিক শিক্ষক, খুব সামান্য আয় করি। তুমি সব মানিয়ে নিতে পারবে তো? 


     এবার খালিদা মাথা নামিয়ে দেয়। এতক্ষণ যত দ্রুত উত্তর দিচ্ছিল এবার যেন থেমে যায়। আবার তাড়া দিয়ে বলি, বলো, কী হল? 


       মাথা ঝুঁকিয়ে সে নীরবে সম্মতি জানায়। 


  আমার পাশে থাকা বন্ধুটি বলতে থাকে, তা হলে যাও এবার। 

     

   ওকে থামিয়েই বলি, না থামো, এদিক ওদিক তাকিয়ে খুব নিচু গলায় খালিদার কাছে জানতে চাই, আমাকে তোমার পছন্দ তো? 


       এবার জোরে হেসে ওঠে খালিদা, চোখের ভেতর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চালনা করে দেয় আর এক ছুটে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি কিছুক্ষণ। এতগুলো প্রশ্ন-উত্তর চলেছে, তার ফাঁকে খুঁটে খুঁটে দেখেছি খালিদাকে। বাঁশঝাড়ে ঘেরা তাদের গ্রাম্য মাটির বাড়িতে এক মনোরম আনন্দ আমাকে সর্বদা আকৃষ্ট করেছে। চাষি পরিবার হলেও এদের রুচিবোধ আছে, শান্তি ও সৌন্দর্য আছে। খালিদার পিতা একটা জুনিয়র হাইস্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্টার মশাই। ছোটোখাটো চেহারার মানুষ। একদণ্ড এসেই দেখে চলে গেছেন। আমাদের মুরগি পোলাও ফলমূল খাবারেরও কত আয়োজন করেছেন। একে একে সব আসতে দেখে অবাক হয়ে গেছি। মনে হয়েছে, আহা এরা কী ভালো লোক! মানুষের কদরও বোঝেন! 


    সব বুঝেসুঝেই বন্ধুটিকে সম্মতি জানিয়ে দিয়েছি। বারবার সে জিজ্ঞেস করেছে, রাজি তো? 


      আমিও বারবার বলেছি, হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ! 


    তারপর সে সব দায়িত্ব নিয়ে একাই গেছে মেয়ের পিতা অর্থাৎ তার মামা শ্বশুরের সঙ্গে কথা বলতে। আমাকে একটু দূরে সরে যেতে বলেছে। আমাদের তো বাড়ি ফেরার সময় হয়ে আসছে, যা বলার তা এখনই বলতে হবে।

       

তিন. 


—তুমি কত টাকা বেতন পাও? 

—দেড় হাজার। 

—দেড় হাজার টাকায় সংসার যাবে? 

—টিউশান করি, তাতেও হাজার পাঁচেক… 

—টিউশানের কি কোনও ভবিষ্যৎ আছে? মেয়েকে ফেলে দেওয়া হবে! তোমার সঙ্গে… 

—আমি তো আসতেই চাইনি, আপনাদেরই জামাই বলেছিল, তাই… 

—থাক্ ওসব শুনব না, সরাসরি বলাই ভালো, তোমার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছি না। 


      তারপর জামাই অর্থাৎ আমার বন্ধুটির দিকে মুখ ফিরিয়ে বলতে লাগলেন, সবই ভালো, একটা চাকুরি করা ছেলের খোঁজ এসেছে। এন ভি এফ পুলিশ। বাবার মৃত্যুর পর ডাইং হারনেসে চাকুরিটি পেয়েছে। পড়াশোনা একটু কম, ওই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। তা হোক, চাকুরি করে তো! বিয়েটা ওখানেই দেবার ইচ্ছা আছে। কী গো, ভালো হবে না? 


     বন্ধুটি উদাসীন ভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। 


    লজ্জায় অপমানে আমার দুই কান রাঙা হয়ে উঠল। সেখানে আর স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারলাম না। ঘটক বন্ধুটি অনেকক্ষণ পর ফিরে এল। শুকনো মুখে বলতে লাগল, মেয়েটির মা ও মেয়েটির খুব ইচ্ছা তোকে জামাই করার, কিন্তু ওর আব্বা চাইছে না। পাশের গাঁয়ের একটি লোক সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে ওই পুলিশ কর্মীর জন্য। 


      আমার আর কিছুই বলার নেই। ইউনিভার্সিটির ডিগ্রির ওজন যে ভীষণ হাল্কা একজন অষ্টম শ্রেণি পাস পুলিশ কর্মীর তুলনায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এতক্ষণ ধরে মাংস পোলাও যা খেয়েছি সবই বমি হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কোনও রকম ভাবে নিজেকে সামলে রাখছি। চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসছে। না, আর কোনওদিনও বিয়ে করতে চাইব না। বিয়ে করার জন্য আর কোনও মেয়েকে দেখতেও আসব না। তখনই হনহন করে ছুটছি। বন্ধুটি কী কথা বলছে পিছন থেকে বুঝতেও পারছি না, বোঝার প্রবৃত্তিও নেই। দুই কান ঝাঁ ঝাঁ করছে, কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। দুঃখী মায়ের মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। বাড়ি ফিরতে চাই, আমি দ্রুত বাড়ি ফিরতে চাই। কিন্তু এ কী! বাঁশঝাড়ের অন্যপ্রান্তে ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে আছে খালিদা। সকরুণ চোখ দুটিতে মিনতি, ক্ষমা প্রার্থনা। চমকে উঠি। কেন ও এভাবে তাকাচ্ছে? হে আল্লাহ, যেখানে ওর আব্বা এত হিসেবি মানুষ, এত অহংকারের সঙ্গে আমার মুখের উপর কথাগুলি বলে আমাকে অপমান করলেন, সেখানে তারই কন্যা কেন এরকম ভাবে আমাকে হাতছানি দিচ্ছে? কোনও প্রশ্নেরই ঠিক উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। তবে আমার অপমান, আমার পথহাঁটা যে অনেকটাই কমিয়ে দিতে পেরেছে সে সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই। মনটা কীরকম উদাসীন হয়ে গেল। সারা রাস্তা চোখের সামনে ভাসতে লাগল সেই সকরুণ মুখটি। একটাও কথা বলতে পারিনি, নীরবে যেন বহুকথাই বলে দিয়েছি। 


   চার. 


আজ যে বাস থেকে নামছি সেই বাসেই উঠতে যাচ্ছে খালিদা। নাকের পাশের তিলটি তেমনই কালো রঙেই জ্বল্ জ্বল্ করছে চাঁদ হয়ে। নামতে নামতে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। ছ্যাঁৎ করে উঠল বুক। সেই সকরুণ দৃষ্টি, সেই হাতছানি। কেমন আছ খালিদা? মুখে এনেও কথাটি বলতে পারলাম না। পেছনে জোর ধাক্কা, কী করছেন মশাই? রাস্তা ছাড়ুন! 


     মনে মনে বলতে লাগলাম, আমি তো রাস্তা কারও ঘিরে নেই, কেউ আমারই রাস্তা ঘিরে আছে! 


       বাস থেকে নেমে অনেকক্ষণ বাসের জানালায় চেয়ে থাকলাম বাসটা যতক্ষণ না ছাড়ল। খালিদাও জানালায় মুখ বাড়িয়ে দিয়েছে। তেমনই নির্বাক। তারই পাশের সিটে মধ্যবয়স্ক একজন পুরুষ। মনে হল ওর স্বামী। আমি তো ওর কেউ নই, কেনই বা আমার সঙ্গে কথা বলবে? তাহলে এমন চোখে তাকায় কেন? কী যেন হারিয়ে গেল আমার! আর নিজের অজান্তেই খুঁজতে লাগলাম। চোখের পানিতে চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে গেল। দূরে বা কাছে কিছুই দেখতে পেলাম না। শুধু একটা গোল শূন্য অস্বচ্ছ বল ওঠানামা করতে লাগল সামনের দিকে।