হোটেল থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি করে একটা মোড়ে এসে নামলাম। মোড়ের চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম। স্থানে স্থানে লোক জামায়েত রয়েছে। কতকগুলো মেয়ে পুরুষদের সাথে নানা ঢঙে কথা বলছে। হঠাৎ কানে একটা অশালীন কথা ভেসে এলো। কে যেন বলে উঠলো, কি লো রজনী বেশ তো সেজেগোছে রাতের নাগরদের জন্য দাঁড়িয়ে। আছিস, বলি নাগরকে কাছে পেয়েছিলি?
Monday, July 18, 2022
উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -11
Thursday, July 14, 2022
উপন্যাস - লাস্যময়ীর ছোবল || সিদ্ধার্থ সিংহ || Lashamayir Chobol by Sidhartha Singha || Fiction - Lashamayir Chobol part -10 ||অন্তিম পর্ব
Wednesday, July 13, 2022
ছোট গল্প - আয়না || লেখক - রোহিত দাস || Short story - Aayna || Written by Rohit das
আয়না
রোহিত দাস
বৃষ্টি পড়ছিল চরম। তারপর তখন আবার রাত। বান্ধবী রীতু র
এই ধারণা আমার জন্মেছে চেয়ে গত ছ'মাস আগে। সব ঠিক ছিল কিন্তু জামাই লিপস্টিক এর দাগ বেশ কয়েকদিন ধরে দেখার পর আর কাজের মেয়ের সাথে কথায় আমাকে এসব..।এসব কথা ভাবতে কখন যে হারিয়ে গেছি জানিনা হুশ ফিরতেই দেখি আমরা একটা পুরনো বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি গাড়ি থেকে নামতে রাজিব নামলো। বাড়িটার দিকে তাকালেই যেন মনে হবে কোন এক ভয়ঙ্কর কান্ডকারখানায় জ্বলে পুড়ে গেছে। রাজিব বাড়িটার দরজার কাছে এগিয়ে যেতেই আমি বলে উঠলাম কার বাড়ি জানিনা, কেউ থাকে কিনা জানিনা,কি আছে এখন ভেতরে তাও জানি না ঢুকলেই হলো নাকি ? রাজিব দরজাটা ঠেলেতে লাগলো।হালকা চাপ দিতেই খুলে গেল। রাজিব ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে আমিও ভেতরে ঢুকলাম।মোবাইলের টর্চ জ্বেলে এদিকে ওদিকে দেখার চেষ্টা করলাম কোন কিছুই দেখা যাচ্ছে না আমার কাঁধের ব্যাগে একটা বড়ো টর্চ পড়ছিল সেটা বের করে জ্বালিয়ে এদিক-ওদিক দেখতে থাকলাম। সামনের জায়গাটা বিশাল।মেঝেতে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ধুলো পড়ে আছে সামনের দিকে চলে গেছে দোতলার সিঁড়ি।বারান্দায় একটা আয়না আর পাশেই একটা টেবিল।এতক্ষণে ভয় কাটিয়ে বললাম বাহ!! চমৎকার বেশ ভালোই হলো ভেতরে এলাম।এখানে বসেই রাতটা পার হয়ে যাবে, কাল সকালে বাড়ির জন্য রওনা দেওয়া যাবে। রাজিব গাড়িটা বাড়ীর ভেতরে নিয়ে চলে এল।আর একটা পুরনো কাপড় দিয়ে বেশ কিছুটা জায়গা ঝেড়ে ঝুড়ে বসার মত উপযোগী করে তুলল। গাড়ির সিটের নিজ থেকে দেড় হাত লম্বা একটা ট্রিপল বের করে সেটা মেঝেতে পেতে নিজে বসে আমায় বলল "কি বসবে না।" আমিও গিয়ে বসে পড়লাম রাজিব রুমাল দিয়ে মাথা মুছতে লাগলো। জামা কাপড় একেবারে প্রায় ভিজে গেছে। কি আর করব এখানে শুকনো জামাকাপড় পাওয়া যাবে না সেগুলো পড়েই বসে থাকলাম। রাজিব জামাটা খুলে খালি গেঞ্জি পড়ে বসে আছে। ইতিমধ্যে ঝড়ের আর জলের বেগ আরো বেড়েছে। দরজা দিয়ে জলের ছিটে ক্রমশ ভেতরে আসছে। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া শরীরের প্রত্যেকটা হারকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজিব আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। ও ভিষন ঘুমকাতুরে। 10 মিনিটের মধ্যেই দেখি ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আমার ঘুম এলো না। দু চোখ যেন অজানা ভয় বন্ধ হতে চাইছিল না।যত সময় কাটতে লাগলো ঝি ঝি পোকার ডাক আর ঠান্ডা কনকনে হাওয়ায় পরিবেশটা ভীষণ ভয়ংকর হতে লাগল। গাড়ির হেডলাইটের আলোই একমাত্র সম্বল তাও কিছুটা জায়গায় আলো করে রেখেছে, বাকি চারপাশ ভীষণ অন্ধকার। হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় দরজাটা বিকট আওয়াজ করে একবার খুলে গিয়ে আবার কিছুটা বন্ধ হয়ে গেল। আমি বসে থাকতে পারছিলাম না। কোল থেকে রাজিবের মাথাটা নামিয়ে উঠে পরলাম মোবাইলের লাইট আর টর্চ লাইট নিয়ে এদিক-ওদিক টা একটু ঘুরে দেখবো ভাবলাম।
বারান্দায় আসবাবপত্র কিছুই নেই শুধু হয়ে আয়না আর টেবিল টা আমি আস্তে আস্তে সে দিকেই এগিয়ে গেলাম। আয়নাটা বেশ পুরনো ধুলো জমেছে অনেক তবে দেখে বোঝা যায় এটা বেশ সুন্দর দেখতে। টেবিল টা মোটা মেহগনি কাঠের। আয়নাটা খুব লম্বা নয়, আমার হাটু পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে হাত দিয়ে আয়নাটার ধুলোগুলো একটু পরিষ্কার করলাম। এবার আয়নাটার দিকে তাকাতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম।আয়নাটা আমায় দেখাচ্ছেনা ,দেখাচ্ছে অন্য কিছু। আমি যা দেখলাম তার বর্ণনায় নিজের মুখে কতটা ঠিক করে দিতে পারব জানি না। হতবুদ্ধি সম্পূর্ণ আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরোটা শুধুই দেখেই গেলাম। দেখলাম একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ি যেখানে থাকেন এক ভদ্রলোক তার স্ত্রী ও তার ছেলে। বেশ ভালই চলছিল তাদের সংসার। কিন্ত তাদের সাংসারিক জীবনে যেন শনির দৃষ্টি হঠাৎই পড়ে গেল। ঘটনাটা যেন একটু তাড়াতাড়ি ঘটে যাচ্ছিলো কোন মোর ঘোরানোর চেষ্টায়।একদিন হঠাৎ ছেলেকে স্কুলে থেকে আনার সময় স্ত্রীটি দেখল তার স্বামী একটা বছর তিরিশের নারীর সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। সে ভাবল তার স্বামী দিনমজুরের কাজ করে এখানে কি করছে। এভাবেই সপ্তাহ দুয়েক ধরে মাঝেমধ্যেই সে দেখতে পেত তার স্বামীকে সেই জায়গায় সেই মহিলাটির সাথে। কিন্তু ঘরে ফিরে তাকে জিজ্ঞাসা করলেও সে কোন উত্তর দিতো না। এমনই একদিন সে হাতেনাতে ধরবে বলে স্কুল থেকে ফেরার পথে যখন দেখতে পেল না সে খুব হতাশ হয়েছিল। বাড়ির দিকে আসতেই সে দেখতে পেল সেই মহিলাটি তার বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে। সে দেখল তার স্বামীর জামার নিচের দিকের কয়েকটা বোতাম খোলা। এভাবেও বেশ কিছুদিন পর আবারো একই ঘটনা। ইতিমধ্যে একটা অশান্তি ঘটেছিল তাদের মধ্যে। স্বামীটাকে জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও কোন কিছুই বলতে রাজি ছিল না সে। এভাবে দ্বিতীয় দিন দেখার পর সে আর সহ্য করতে পারছিল না স্বামীকে। তার পাশে শুতে যেন তারা ঘিন্না করছিল তার।সামনে দাড়াতে তার ঘেন্না করছিল। সে ঠিক করল তাকে এভাবে ঠকানোর বদলা সে নেবে। তাকে এভাবে অপমান করার বদলা সে ঠিক নেবে। তাই ঠিক করল সে তার স্বামীকে খুন করবে। সেদিন স্কুলে ফেরার পথে তাদের দেখে সে সত্যিই খুব রেগে গেছিল। হয়তো স্বামী তাকে দেখেছে। কিন্তু কোনো কথা বলেনি। সারা দুপুরটা যেন ঝড়ের আগের শান্ত অবস্থার মধ্যে কেটে গেল। স্বামী ভাবল যেন কোন কিছুই হয়নি। রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর স্বামী ঘুমিয়ে পড়লে ছেলেকে অন্য ঘরে শুইয়ে রেখে। স্বামীর গলায় সে নরম ছুরির ফলা টেনে দিল। রক্তবন্যা বয়ে গেল সারা বিছানা জুড়ে। মেয়েটির বুকের জ্বালা এতটাই ছিল যে সে চিৎকার করে বলতে লাগল "আর যাবি সেই মেয়ে ছেলেটার কাছে যা চলে যা।" পরদিন পুলিশ এসে যখন মেয়েটিকে নিয়ে যাবার জন্য রওনা হচ্ছে,তখন সেই মেয়েটা স্ত্রীটি সামনে এসে দাড়াল।সে বললো আপনার স্বামী বড়ই ভালো মানুষ ছিলেন।আপনি এভাবে তাকে কেন মারলেন?স্ত্রীটি ক্ষিপ্ত গলায় বলে উঠলো চরিত্রহীন তুই আমার জীবনটা নষ্ট করেছিস।তোর রূপে আকৃষ্ট হয়ে আমার স্বামী আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলো তাই আমি তাকেই মেরে ফেলেছি। মেয়েটি অবাক হয়ে বললো "কি বলছেন??আমার সাথে আপনার স্বামীর কোন সম্পর্কই ছিলনা। আপনি ভুল ভাবছেন আপনি যেটা ভাবছেন সেটা হয়নি। আসলে আমার দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গেছিল। স্বামীও নিজের চাকরিটা হারিয়েছিলেন। কিভাবে সংসার চালাবে ভেবে না পেয়ে আমার খবর পেয়ে আমার সাথে দেখা করেন। আমারও কিডনির প্রয়োজন ছিল আপনার স্বামী তার একটা কিডনি আমাকে দেওয়ার জন্য রাজি হয়। আমি তাকে নগদ এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিলাম। এমন একটা সময় আপনার স্বামী আমার এত উপকার করেছিলেন।প্রথম দিন আপনার বাড়ি আসার কারণ এটাই ছিল। আপনার স্বামীর সাথে দেখা করতে এসেছিলাম তিনি আগের দিনই হাসপাতালে কিডনি ডোনেট করেছিলেন। গত 26 তারিখে আমার অপারেশন হয়। তার আগের দিনও আপনার স্বামীর সাথে আমি দেখা করি। হয়তো জামার বোতাম খোলা দেখলেই আপনি ভেবেছিলেন আপনার স্বামী পরকীয়ায় জড়িত।আসলে আপনার স্বামী সেলাইয়ের জায়গাটা আমি দেখে গিয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে উনার মত স্বামী বা আপনার ভাগ্যে ছিল না তাই হয়তো আপনি আজ হারিয়ে বসেলেন। কথাগুলো শোনা মাত্রই স্ত্রী মেয়েটা পুলিশের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে একছুটে ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা বন্ধ করে করে নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে নিল। পুলিশও হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে।তারাও এই বিষয়টায় অবাক। হতভম্ব পুলিশের সামনে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠলো সেই স্ত্রীটির দেহ খানি মায়ের দেহকে পড়তে দেখে ছেলেটিও মাকে জড়িয়ে ধর, আগুন লাগল তার গায়ে। আগুনের জ্বালায় ঘরে চারদিকে ছুটতে লাগল, ধরিয়ে দিলোআগুন সারা ঘরে।পুলিশ অবাক হয়ে ছুটে ঘর থেকে পালিয়ে গেল। সেই মহিলাটি ইতিমধ্যে চলে গেছে। দেখতে দেখতেই গোটা ঘরটা গেল পুড়ে।
পুরোটা দেখা মাত্রই আমি দু পা পিছিয়ে গেলাম। আমার বুকের ভেতরটা কেমন জানি করছিল।রাত এখনো অনেক বাকি। বৃষ্টিটাও একটু ধরেছে। আমি এক ধাক্কায় রাজীবকে তুলে বলতে লাগলাম "রাজিব রাজিব বৃষ্টি থেমেছে চলো আমরা এখনই এখান থেকে চলে যায়..রাজিব চলো...আমার এইখানটা ভালো লাগছেনা।চলো রাজিব।" রাজিব আমার কথা শোনা মাত্রই সে ট্রিপল গুটিয়ে গাড়ি বের করে আমায় নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো।
এরপর ছয় মাস কেটে গেছে।সেই ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। তবে তার থেকে অনেক কিছু শিখেছি । রাজীবের মেয়ের দোষ নেই সে নিজেই আমাকে একথা বলেছে। স্বীকার করেছে যে তাকে জ্বালানোর জন্য সেই কাজগুলো করেছে।আমার সুখী পরিবার আবার সুখে ভরে গেছে কিন্তু সেই দিনের শেখার জিনিস চিরতরে থেকে গেছে।
Monday, July 11, 2022
ছোট গল্প - ভিখারী || লেখক - তনিমা সাহা || Short story - Vikari || Written by Tanima Saha
ভিখারী
তনিমা সাহা
মনু রোজ ভিখারীটিকে দেখে বাড়ির উল্টো দিকে গাছটির নিচে বসে থাকতে। সবসময় কিছু যেন আড়াল করে রাখে সে। মনুকে দেখলেই সেই জিনিসটা লুকিয়ে ফেলে। মনুর বাবা-মা নেই। সে তার দাদু-দিদার সঙ্গে থাকে। দাদু বলে মনুর বাবা শিলাদিত্য একজন সামরিক বাহিনীর পদাতিক সৈনিক ছিলেন। মনুর মা বসুন্ধরা একটি আঞ্চলিক খবরের চ্যানেলে কাজ করতেন। 'সীমান্তে সৈন্য সৈকত' নামে অনুষ্ঠানের জন্য বসুন্ধরা যখন কাজ করছিলেন তখন তার শিলাদিত্যের সাথে পরিচয় হয়। সেই পরিচয়টা প্রথমে প্রণয় এবং পরে পরিণয়ে পরিনত হতে খুব বেশি একটা সময় নেয়নি। বছরখানেক বেশ ভালভাবেই কাটে ওদের। বছরখানেক পর পুজোর ছুটিতে বাড়ি এসেছিল শিলাদিত্য। শিলাদিত্য অনাথ আশ্রমে মানুষ। তাই বসুন্ধরার বাড়িতেই সে থাকতো। ছুটিতে এসে অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে, বসুন্ধরার পরিবারকে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে বেশ ভাল সময় কাটছিল। কিন্তু হঠাৎই সেসময় সীমান্ত পাড়ে কোন একটা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় শিলাদিত্যকে অতিসত্ত্বর ছুটি বাতিল করে ফ্রন্টে ছুটে যেতে হয়। কিন্তু তারপর থেকে শিলাদিত্যের কোন খবর নেই। ততদিনে বসুন্ধরার ঔরসে চলে এসেছে বসুন্ধরা ও শিলাদিত্যের ভালবাসার চিহ্ন মণীশ মানে মনু। পাগলের মতো শিলাদিত্যের দেওয়া নম্বরে ফোন করতো বসুন্ধরা। কিন্তু কেউ ফোন ধরতো না। বসুন্ধরার বাবা অর্থাৎ মনুর দাদু তা-ও চেষ্টা করেছিলেন সীমান্ত পাড়ের সেনাবাহিনী থেকে শিলাদিত্যের খোঁজ নেওয়ার। কিন্তু নাহ্! সব চেষ্টাই যেন বিফল হয়ে গেল। একটা জলজ্যান্ত মানুষ যেন হঠাৎ হাওয়ায় উড়ে গেল। বসুন্ধরাও আস্তে আস্তে কেমন যেন চুপ মেরে গেল। মনুকে জন্ম দিতে গিয়ে ভীষণ রকম অসুস্থ হয়ে পড়ল সে। যখন মনুর ছয় বছর বয়েস তখন বসুন্ধরা ইহলোকের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেল সেই না ফেরার দেশে।
এই সবকিছুই মনু তার দাদু-দিদা থেকে শুনেছে। এমনিতে দাদু-দিদা মনুকে ভীষণ ভালবাসে। তার কোনরকম প্রয়োজন কখনও অপূর্ণ রাখেন না। কিন্তু তবুও যখন মনু দেখে যে স্কুলে স্পোর্টস-ডে বা প্যারেন্ট-টিচার মিটিংয়ে সবার বাবা-মা আসে তখন তার খুউউব কষ্ট হয়। কিন্তু সে কাউকে বুঝতে দেয় না। শুধু বাড়ি ফিরে বাবা-মায়ের ছবিটা নিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। দাদু-দিদা যদি জানতে পারে যে মনুর মনে এত কষ্ট জমা আছে তাহলে তো ওরাও খুব কষ্ট পাবে! মনু ওদের খুব ভালবাসে। তাই নিজের কষ্টটাকে লুকিয়ে রাখে।
আজ মনুর রেজাল্ট বেরোবে। মনু অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে উঠবে। রেজাল্ট নিয়ে মনুর মনে কোন ভয় নেই। সে মোটামুটি ভালই রেজাল্ট করে। কিন্তু সমস্যাটা হল অন্য জায়গায়। আজকাল স্কুলে যাওয়ার পথে কিছু ছেলে তাকে বেশ বিরক্ত করে। ছেলেগুলো বিজাপুর বস্তির। মনু দেখেছে ওই ছেলেগুলো সিগারেট খায়। ওদের হাতে সবসময় একটা ছোট আকারের বোতল থাকে। ওইসব বোতলে সাদা সাদা কী যেন ভরা থাকে সেগুলোও খায়। বড়ো দুর্গন্ধ বেরোয় তা থেকে! মনুর ওদেরকে খুব ভয় করে। অন্য কোন ঘুরপথে যে সে স্কুলে যাবে তারও উপায় নেই। স্কুলে যাওয়ার এই একটাই রাস্তা। স্কুলের সবাই মনুকে 'ভীতু, ভীতু' বলে প্রচণ্ড খ্যাপায়! আসলে মনু ভয়টা একটু বেশীই পায়। এখনও রাতে দাদু-দিদার সঙ্গেই ঘুমোয়। দাদু-দিদা এমনিতেই তাকে নিয়ে যথেষ্ঠ চিন্তায় থাকেন। এই নতুন উৎপন্ন উপদ্রবটির কথা বলে মনু ওদেরকে আর ব্যতিব্যস্ত করতে চায়নি। আর তাছাড়া আরেকটি কারণও আছে। মনু আসলে চায় যে তার নাম থেকে এই 'ভীতু'র তকমাটা মুছে যাক। তাই আরকি….।
অষ্টম শ্রেণীর রেজাল্টও বেশ ভাল হয়েছে। রেজাল্ট নিয়ে মনু বেশ ভয় ভয় মনে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। রাস্তায় সেই মোড়ে যেখানে ছেলেগুলো আড্ডা দেয় সেখান মনু যাওয়ার আগে মোড়ের কোনাটা থেকে একবার উঁকি দিয়ে দেখলো যে ছেলেগুলো নেই। মনু নিশ্চিন্তে মোড়ের দিকে পা বাড়ায়। মোড়ের রাস্তাটা যেমাত্র পেরোতে যাবে ঠিক সেইসময়ই কোত্থেকে যেন ভুঁইফোড়ের মতো ওরা সামনে চলে এল। মনু বেশ জোরে আঁতকে উঠল! ওর ভয় পাওয়া মুখটা দেখে বস্তির ছেলেগুলো জোরে জোরে হাসতে লাগল।
ওদের একজন বলল, 'দেখ, দেখ নামটা হেব্বি দিয়েছে, এক্কেবারে ম্যাচিং...কী 'ভীতু'... ভীতু কী ভয় খেল নাকি।' বলে ছেলেগুলো হাসতে লাগল।
মনু এবার সত্যিই চমকে গেল। 'ভীতু' নামে তো তাকে স্কুলে ডাকা হয়। এই নামটা ওরা কিভাবে জানলো? ঠিক তখনই ওদের পেছন থেকে শয়তানের মতো হাসতে হাসতে বেড়িয়ে এল রাতুল।
মনুর ক্লাসের সবচেয়ে বখে যাওয়া ছেলে রাতুল তাকে প্রথম 'ভীতু' নামটা ধরে খ্যাপাতো। তারপর রাতুলই ক্লাসে ছড়িয়ে দেয় এই 'ভীতু' নামটা। রাতুল পরপর দুবছর ফেল করে এবার মনুদের ক্লাসে আছে। হেডস্যার যদিও রাতুলকে ওয়ার্নিং দিয়েছেন যে এবারও যদি সে ফেল করে তাহলে তাকে স্কুল থেকে রাস্টিগেট করে দেওয়া হবে। যদিও রাতুলের সে ব্যাপারে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই! সে অকারণে মনুকে বিরক্ত করেও বেশ মজা পায়। যেমন ক্লাস ফাঁকা থাকলে বিকট আওয়াজ করে মনুকে চমকে দিয়ে বা গলার আওয়াজ বিকৃত করে ভয় পাইয়ে খুব মজা পায়। তাছাড়া স্কুলে ঢোকার মুখে ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়া বা ক্লাসে মনুর বসার জায়গায় চুইংগাম চিবিয়ে চিটকে দেওয়া বা অফপিরিওডে মনুর ঠিক পেছনের বেঞ্চে বসে কলম দিয়ে ক্রমাগত খোঁচা দিতে থাকা। রাতুলের বিরুদ্ধে একবার শিক্ষকের কাছে নালিশ জানিয়েছিল মনু। ওই এক/দুদিন ঠিক ছিল। আবার যেই কে সেই! কিন্তু এবার মনু ভেবেছিল এসবের প্রতিবাদ সে করবে। এই তো সেদিনের কথা। টিফিন পিরিয়ডে মনু সবেমাত্র টিফিনবক্সটা খুলেছিল। সঙ্গে সঙ্গে রাতুল ছোঁ মেরে অর্ধেকটা টিফিনটা তুলে নিলো। এটাও প্রায় রোজেরই ঘটনা। কিন্তু এবার মনু করল কী, টিফিন বক্সের ঢাকনাটা দিয়ে রাতুলের হাতের উপর জোরে চেপে ধরল। এদিকে টিফিনবক্সের মধ্যে রাতুলের হাত এবং ওই অবস্থায় ঢাকনাটা দিয়ে মনু এতো জোরে চাপা দিয়ে আছে যে হাতটা বেশ ব্যথা করছে। এরকম বেকায়দায় রাতুল কখনও পড়েনি। মনুর দিকে তাকাতেই দেখে সে মিটিমিটি হাসছে।
দাঁতখিঁচিয়ে রাতুল বলল, 'কাজটা ভাল করলি না মনু। এর ফল একদিন তোকে ভুগতে হবে।'
এরপর রাতুল আর মনুকে বিরক্ত করতো না। মনুও খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। এরই মাঝে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়ে যাওয়ায় মনুও পড়াশোনা আর প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আজ এই বস্তির ছেলেগুলোর সাথে রাতুলকে দেখে মনুর মনে এক অশনি সংকেত দেখা দিলো।
মনুকে দেখে রাতুল বলল, 'কি রে সেদিন তো খুব হম্বিতম্বি করছিলি! আজ হঠাৎ চুপসে গেলি কেন, অ্যাঁ?'
বস্তির ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বললো, 'এএ, সুনলাম নাকি এই হেঁদোটার মা-বাপ নাকি ফুঁকে গেছে,অ্যাঁ, ঠিক।'
দ্বিতীয়জন বলল, 'শাল্লা! অনাথের বাচ্চা হয়ে বসের সঙ্গে মাতব্বরি করছি্স।'
এবার মনু মুখ খুলল।
বলল, 'মুখ সামলে কথা বলো। অনাথ কাকে বলছো তোমরা।'
দ্বিতীয় ছেলেটি রাতুলকে বলল, 'বস! বাচ্চার মুখে দেখি কথা ফুটেছে।'
রাতুল ফস করে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বলল, 'তবে আর বলছিলাম কি! এইজন্যই তোদেরকে এর পেছনে লাগিয়েছিলাম।'
মনুর কাছে এবার ধীরে ধীরে সবকিছু পরিস্কার হতে শুরু হল যে, কেন এই বিজাপুর বস্তির বখাটে ছেলেগুলো অকারণে তাকে যাতায়াতের পথে বিরক্ত করতো। মনু দেখলো রাতুলসহ ছেলেগুলো হাতে মোটা লাঠি নিয়ে তার দিকে এগোচ্ছে। মনু বিপদের গন্ধ পেয়ে একপা দুপা করে পিছিয়ে ছুট লাগাল। ছুটতে ছুটতে মোড়ের রাস্তাটা প্রায় পেরিয়ে আসায় ছোটার গতি কমিয়ে দিল মনু। আর সেখানেই হল বিপত্তি! রাস্তায় আড়াআড়িভাবে রাখা একটা ইটের উপর হোঁচট খেয়ে মনু পড়ে গেল রাস্তায়। হোঁচট খেয়ে পড়ায় মনু দু'হাটুঁতেই বেশ চোট পেল! একটু সামলে উঠতেই দেখে সবকটি ছেলে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
রাতুল একটি চুকচুক শব্দ করে বলল, 'এখন কোথায় পালাবি রে ভীতু! এখন তোকে বাঁচাবে রে ভীতু।'
বলেই লাঠি উঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল, 'মার শালাকে ধরে।'
মনু আগাম ভবিষ্যতে কথা ভেবে হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ার পরও যেমনটা ভেবেছিল তেমন কিছুই হল না। শুধু 'উহঃ', 'আহঃ', 'স্যাত', 'ধুপ্' এই জাতীয় কিছু শব্দ ভেসে আসতে লাগল কানে। মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে মনু মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে দেখে যে, মনুদের বাড়ির সামনের সেই ভিখারীটি কোথা থেকে এসে ওদের লাঠি দিয়েই ওদেরকে মারছে। মার খেয়ে ওরা সবাই রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।
হাতের লাঠিটা রাস্তায় ঠুকে ভিখারীটি রাগতঃ দৃষ্টিতে মনুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'পেত্তিবাদ কইরতে পারিস না? নিজের জন্য এখন পেত্তিবাদ যদি কইরতে না পারিস তবে কবে আর পারবি? আমার পোলাটাও তোর মতোই হ্যাদাব্যাদাই ছিল। পড়াশুনাটা জানতো ভাল। তাই তো গতর খেটে পোলাটাকে বড়ো ইস্কুল পর্যন্ত পড়িয়েছিলাম। কিন্তু কী লাভ হল! ওই বড়োলোকের পোলাগুলো অন্যায়ভাবে মেরে ফেলল আমার পোলাটাকে। ওর মা তো সঙ্গে সঙ্গে শেষ। এই আমিই শুধু তার কাছে যেতে পারিনি। এই দুনিয়াটা বড্ড নিষ্ঠুর রে বাপ। নিজের ঘাড় শক্ত করে মাথা উঁচু করে যদি চলতে না পারিস তবে এই দুনিয়া তোকে দুমড়েমুচড়ে শেষ করে দিতে সময় নেবে না।'
মনুর চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পরছে তখন। এদিকে হয়েছে কি রাস্তার উপর এতো আওয়াজ শুনে বিশেষ করে মনুকে রাস্তায় পরে থাকতে দেখে আশেপাশের লোকজন দৌড়ে এল।
একজন বললেন, 'কী হয়েছে মনু? এরা কারা?'
মনু মাথা ঘুরিয়ে ভিখারীটিকে কোথাও দেখতে পেল না। মনুকে ওরা ধীরে ধীরে উঠিয়ে দাঁড় করালে সে একে এক সব বলল।
অন্য একজন বলল, 'আরে এরা তো সেই বস্তির ছেলেগুলো। কদিন ধরেই দেখছি এদের এই পাড়ায় আনাগোনা বেড়েছে। আর এ তো বিশ্বাস ব্যবসায়ীর ছেলে। আমার ছেলেমেয়েকেও সে প্রচণ্ড বিরক্ত করে। আজ এর হচ্ছে! একে আজ ছাড়বো না আমি।'
এরমধ্যে কেউ পুলিশকে খবর দিয়েছে। পুলিশকে দেখে ছেলেগুলোর মুখ পাংসুবর্নের হয়ে গেল। এতদূর যে ব্যাপারটা গড়াবে ওরা ভাবতে পারেনি। মনুকে পাড়ার লোকেরাই ফার্স্টএইড করিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। ওদিকে বিশ্বাস ব্যবসায়ী পাড়ার লোকের কাছে প্রায় হাতেপায়ে ধরে ছেলের তরফ থেকে ক্ষমা চাইলেন। বাড়িতে বসে গরম গরম হলদি-দুধ খেতে খেতে মনু তার দাদু-দিদাকে রাস্তায় এবং স্কুলে ঘটা সমস্তকিছু খুলে বলল। ভিখারীর কথা শুনে মনুর দিদা বললেন, 'কয়েকমাস আগে খবরের কাগজে পড়েছিলাম বটে এমন একটা ঘটনার কথা। কলেজের প্রথম বর্ষের একটি ছাত্রকে তৃতীয় বর্ষের দুজন ছাত্র শুধু গায়ের জোর দেখাতে গিয়ে মেরে ফেলেছিল। ওই দুজন খুব বড়োলোকের ছেলে ছিল। তাই কেসটা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল।'
প্রায় এক সপ্তাহের পর আজ মনু স্কুলে এসেছে। বাড়ি থেকে বেড়োনোর সময় সে ওই ভিখারীটিকে অনেক খুঁজেছিল। কিন্তু কোথাও খুঁজে পায়নি তাকে। যেই গাছের তলায় ভিখারীটি বসতো সেখানে গিয়ে একটু খুঁজতেই মনু একটা খবরের কাগজের কাটিং দেখতে পেল যাতে লেখা ছিল 'মেধাবী ছাত্রের নৃসংশ হত্যা। টাকার জোরে পেল অপরাধীরা ছাড়া'। শিরোনামটির নিচে একটি বছর কুড়ির ছেলের ছবি। মনু বুঝতে পারল এইটাই ছিল সেই ভিখারীটির ছেলে। ছেলেটির কথা ভেবে মনুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। মনে মনে মনু একটি সিদ্ধান্ত নিলো।
স্কুলে এসে জানতে পারল রাতুলকে তার বাবা টি.সি. দিয়ে নিয়ে চলে গেছে। তাকে নাকি কোন একটা বোর্ডিং স্কুলে দেবে। ক্লাসের সবাই তাই বেশ স্বস্থিতে আছে। আজ প্রথমদিনের ক্লাস বেশ ভাল হল। বাড়ি ফিরে মনু তার দাদুকে বললো, 'দাদু আমি ভেবেছি আর ভয় পেয়ে আমি চলবো না। তোমরাও আমার জন্য এতো চিন্তা করো না। যার বাবা-মা ফাইটার ছিল সে কী আর দুর্বল হতে পারে।'
মনুর কথা শুনে উঁনার বুকটা আজ বহুবছর পর আবার গর্বে ফুলে উঠল।
Sunday, July 10, 2022
উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -10
চার
পরদিন অশ্রুসিক্ত অবস্থায় ভাগ্যান্বেষণে কলকাতা মহানগরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা। করার জন্য বাবার কাছে সাশ্রু নয়নে বিদায় নিতে এলাম। বিদায় নেবার আগে পাড়ারই। এক পিসিমার উপর ভার দিলাম বাবাকে পরিচর্যা করার জন্য। তথাপি বাবাকে ছেড়ে যাবার আগে কি দারুন মর্মপীড়া পেয়েছিলাম তা বর্ণনাতীত। তবুও সেদিন ভবিষ্যতের রঙ্গীন আশায় ও নারীজীবনের বিপদ আপদ অগ্রাহ্য করে রন্টুদার সঙ্গে নিঃসঙ্কোচে বেরিয়ে পড়েছিলাম।





