Monday, October 17, 2022

রাজ্যে আবার ব্যাঙ্ক অফ বরোদা তে বিপুল পরিমাণে কর্মী নিয়োগ || Bank Of Boroda recruitment 2022 || WB BOB Recruitment 2022


 


দেশে বেকার সমস্যার সমাধান করতে বিভিন্ন সংস্থা কাজের সুযোগ নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন দফতরে বিজ্ঞপ্তি প্রায়ই প্রকাশিত হচ্ছে। এইরকম একটি নতুন সুযোগ নিয়ে এসেছে ব্যাঙ্ক অফ বরোদা। ব্যাঙ্ক অফ বরোদা এর তরফ থেকে অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এ আগামী 30 সেপ্টেম্বর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত করা হয়েছে।
 শূন্য পদ কত, পদ গুলি কি কি, কোন পদের জন্য কি শিক্ষাগত যোগ্যতার দরকার, বয়সসীমা, আবেদন পদ্ধতি, নিয়োগ পদ্ধতি,  নিয়োগ স্থান, আবেদন করার শেষ সময়, এইসব সম্পূর্ণ বিবরণ নীচে আলোচনা করা হল।



পদের নাম :- এই নিয়োগে মোট চারটি ভিন্ন ভিন্ন পদ রয়েছে। এই চারটি ভিন্ন পদে শূন্য পদ রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন। পদ গুলি হল :-

1. সিনিয়র রিলেশনশিপ ম্যানেজার

2. ই রিলেশনশিপ ম্যানেজার

3. গ্রুপ সেলশ হেড

4. অপারেশন হেড ওয়েলথ



প্রতিটি পদের বিবরণ-

1. সিনিয়র রিলেশনশিপ ম্যানেজার :-

শিক্ষাগত যোগ্যতা :- আপনাকে অবশ্যই স্নাতক বা গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি থাকতে হবে।


বয়স সীমা :-  24 বছর থেকে 40 বছর এর মধ্যে হতে হবে।

শূন্যপদ :-  মোট 320 টি।



2. ই রিলেশনশিপ ম্যানেজার :-

শিক্ষাগত যোগ্যতা :-  স্নাতক বা গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি।


বয়স সীমা :-  23 বছর থেকে 35 বছর মধ্যে থাকতে হবে।

শূন্য পদ :- মোট 24 টি।


3. গ্রুপ সেলস হেড :-

শিক্ষাগত যোগ্যতা :-  স্নাতক বা গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি থাকতে হবে।


বয়স সীমা :-  31 থেকে 45 বছর এর মধ্যে হতে হবে।


শূন্যপদ :- মোট - ১টি।


4. অপারেশন হেড অয়েলথ:-

শিক্ষাগত যোগ্যতা : -  স্নাতক বা গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি কমপ্লিট থাকতে হবে সাথে এমবিএ ডিগ্রী কমপ্লিট করে থাকতে হবে।


বয়স সীমা :-  35 থেকে 50 বছর এর মধ্যে হতে হবে।


শূন্যপদ :- মোট ১টি।



আবেদন পদ্ধতি:-
শুধু মাত্র অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আপনাকে যে ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে সেগুলি হল:-

1. সর্বপ্রথম ব্যাঙ্ক অফ বরোদা এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে যেতে হবে

2. রেজিস্ট্রেশন করতে হবে

3. সমস্ত নির্ভুল তথ্য দ্বারা ফরমটি পূরণ করতে হবে

4. আপনার একটি পাসপোর্ট সাইজের রঙ্গিন ছবি স্ক্যান করে আপলোড করতে হবে

5. আপনার স্বাক্ষরের স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে

6. ফাইনাল সাবমিট করতে হবে

7. পেমেন্ট করতে হবে

8. তাদের দেওয়া রেফারেন্স নাম্বার টির একটি প্রিন্ট আউট বের করে নিতে হবে



আবেদনের ফী:- জেনারেল দের জন্য ৬০০ টাকা এবং অন্যান্য সংরক্ষিত প্রার্থীদের জন্য ১০০ টাকা।


টাকা প্রদানের মাধ্যম:- অনলাইন


নিয়োগ পদ্ধতি:- লিখিত পরীক্ষা, দলগত আলোচনা, ব্যক্তিগত ইন্টারভিউ।


আবেদন শুরু - 30 সেপ্টেম্বর 2022

আবেদন শেষ -  20 অক্টোবর 2022 




নিয়োগ স্থান :-

 আমাদের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতাতে ব্যাঙ্ক অফ বরোদা এর শাখাগুলিতে।



OFFICIAL NOTICE: 



APPLY NOW: 


Sunday, October 16, 2022

ছোট গল্প - হাঁস নিয়ে হইচই || লেখক - চিরঞ্জিৎ সাহা || Written by Chirenjit Saha || Short story - Hans niye khela



                   হাঁস নিয়ে হইচই

                           চিরঞ্জিৎ সাহা 



সকাল থেকেই কৈলাস জুড়ে আজ মহাকেলেঙ্কারি। স্নান সেরে নিজের বই, খাতা সযত্নে ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে স্কুলে যেতে প্রস্তুত সরস্বতী কিন্তু খোঁজ নেই তার বাহন হাঁসের। একেই আগামীকাল মাঘ-পঞ্চমী তিথিতে মামাবাড়ি যাওয়ার কথা মেয়েটার , স্কুলটা কামাই হবে দু'দিন ; তার ওপর আজও যদি স্কুলে যেতে না পারে , বড় দিদিমণি রাগ করবেন ভীষণ। মেজাজ খারাপ থাকলে গার্জেন কলও করে দিতে পারেন। সবমিলিয়ে মুখেই বীণা বাজিয়ে ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিল চিন্তিত সরস্বতী। 





হাঁসের হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ঘন্টাদুয়েক আগে সর্বপ্রথম নজরে আসে মা দুর্গার। তিনি তখন সবে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাচ্ছিলেন। রোজকার অভ্যেসমতোই একবার উঁকি দেন পাখিদের থাকার ঘরে। সেখানে পেঁচাকে বেঘোরে ঘুমোতে দেখলেও ময়ূর কিংবা হাঁসের দেখা পাননি তিনি। অবশ্য ব্যাপারটিকে তেমন আমলও দেননি। আসলে এ ঘটনা আজ নতুন নয়। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার তোয়াক্কা না করে ফিগার কনসাস ময়ূর নিয়ম করে রোজ মর্নিং ফ্লাইটে যায় ভোর পাঁচটায়। তারপর কয়েক কিলোমিটার এদিক ওদিক উড়ে ফিরতে ফিরতে বেলা আটটা। হাঁসটাও ময়ূরকে সাথ দেয় মাঝেমধ্যেই ; তবে ভারী ডানা নিয়ে বেচারি উড়তে পারে না বেশিদূর , এক ঘন্টার মধ্যেই ফিরে আসতে বাধ্য হয় মর্নিং ফ্লাইট থেকে। এসব ঊষাকালের ওড়াওড়িতে অবশ্য পেঁচা নেই কোনোকালেই ; সারারাত ধরে গোটা ভূ-কৈলাস চষে বেরিয়ে সে ঘুম থেকে ওঠে বেলা এগারোটায়। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা আজ আটটা ছুঁলেও হাঁসের দেখা নেই। ময়ূরটাও ফেরেনি এখনও। এদিকে সরস্বতীর কান্নার স্বর ডেসিবেল আইন ভাঙার মুখে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মা দুর্গাও বেজায় বিরক্ত। সোজা পাখিদের ঘরে গিয়ে ডানা ধরে টেনে তুললেন পেঁচাকে ---



--- "ওই পেঁচা! ওঠ! ওঠ! গায়ে জল ঢেলে দেব কিন্তু! দিদিমণি স্কুলে যেতে পারছে না, আর উনি নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছেন। "


--- " কিঃ! কিঃ! কি হয়েছে? " --- দুড়দাড় করে ঘুম থেকে ওঠে পেঁচা। 


--- " কি হয়নি সেটা বল! বেলা বাজে আটটা। হাঁসের দেখা নেই। সরস্বতী স্কুল যাবে কি করে? ময়ূরটারও তো দেখছি আজ ফেরার নাম নেই। "


--- " সে কি! ওরা ফেরেনি এখনও? "


--- " তা কি আমি তোকে মিরাক্কেলের জোকস শোনাচ্ছি? ভোরবেলা ওরা কি তোকে কিছু বলেছিল? ঠিক করে মনে করে বল! "


--- "না কত্তামা! কোনো কথা হয়নি। কাল রাতে তো আমার নামের আগে চন্দ্রবিন্দুই পড়ে যাচ্ছিল। একটা সাপকে ধরতে গিয়ে উড়তে উড়তে ভুল করে সোজা ঢুকে পড়েছিলাম মর্ত্যে। আসলে গাছগাছালির মধ্যে ঠিক খেয়াল করে উঠতে পারিনি কিনা! হঠাৎ দেখি সামনে মর্ত্যের ওই চোরা শিকারিগুলোর জাল। অনেক কষ্টে ডানাটাকে স্টিয়ারিংয়ের মতো মোচড় মেরে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এসেছি। উফফ! বাপ রে বাপ! "


--- " তার সাথে কথা বলার কি সম্পর্ক রে হতচ্ছাড়া? তোর ভোকাল কর্ড তো এখনও খসে যায়নি , দেখছি। "


--- "ওরে বাবা রে বাবা! তারপর ওদের পাশ কাটিয়ে ইউটার্ন নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে কৈলাসে ফিরে সোজা বিছানায়। " 


---" ওরা তখন ঘরে ছিল? "


--- "হ্যাঁ। বিলক্ষণ। ময়ূরটা ভসভসিয়ে নাক ডাকছিল আর হাঁসটা বেজার মুখে পড়েছিল ঘরের এক কোণে। "


--- " হাঁস কাল রাতে ঘুমোয়নি? "


--- " তাই তো ! এটা তো আগে ভেবে দেখিনি। ঘুমকাতুরে হাঁস কাল রাতে জেগে বসেছিল কেন কত্তামা? "







ইতিমধ্যেই উড়তে উড়তে হাজির ময়ূর। তাকে দেখেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন মা দুর্গা --- " হতভাগা! কটা বাজে? ওনার এখন ফেরার সময় হল! কোন রাজকাজে ছিলেন আপনি? "


--- " ফেরার পথে শনিদেবের বাহন শকুনের সাথে হঠাৎ দেখা । একথা সেকথায় দেরি হয়ে গেল । আর আগে ফিরেই বা করবটা কী ? আপনার হিরের টুকরো ছেলে কার্তিক বারোটার আগে কোনদিন ওঠে ঘুম থেকে ? আমার আর কাজ কী সকালে, শুনি ! কাজে ফাঁকি পেলে কৈফিয়ৎ চাইবেন, দেব । তার আগে নয় ! "


নিজের রূপের রংবাহার আর পাখিদের রাজা হওয়ার কারণে ময়ূরের ঠাঁটবাট আসলে একটু বেশিই । ইঁদুর , পেঁচা বা হাঁস দেবদেবীদের ভয়ে তটস্থ থাকলেও ময়ূর চলে তার নবাবি চালে , পক্ষীকুলের রাজা বলে কথা ! দেবী দুর্গাও তাকে ঘাটান না খুব একটা । 


" তোর ঘোরা তুই ঘোর বাবা ! আমি কি বারণ করেছি ? কিন্তু হাঁসটাকে তো আগে আগে পাঠিয়ে দিবি । সরস্বতীর মর্নিং স্কুল । হাঁসটার জন্য আজ স্কুলটা কামাই হয়ে গেল । ওকে তো তোর আটটার মধ্যে পাঠানো উচিত ছিল, নাকি ! " --- বিনয়ী শোনায় দেবী দুর্গার গলা । 


--- " সে কি ! হাঁস ঘরে নেই ? ও তো আজ বেরোয়ইনি আমার সাথে । "


-- " কি বলছিস কি তুই ? ও যায়নি ? " 


--- " না । "


--- " কাল রাতে কি ও তোকে কিছু বলেছিল ? "


--- " না । তবে মন খারাপ করে বসেছিল মাটিতে । আমাকে একবার ডেকেছিল বটে কিন্তু আমি তেমন পাত্তা দিইনি । আসলে ওর ওই এক ডিপ্রেশনের গল্প আমার আর ভালো লাগে না । হাঁসের যুক্তি --- ওর না আছে আমার মতো রূপ , না পারে পেঁচার মতো উড়তে । তাই এই পক্ষীকুলে ও নাকি অপাংক্তেয় । ওর নাকি নিজেকে শেষ করে ফেলা উচিত । ওর জন্যই নাকি এই পক্ষীকুলের শ্রী কমছে । "


--- " ও কবে থেকে এসব বলা শুরু করেছে তোকে ? "


--- " অত মনে নেই মা । তবে বলে তো প্রায়ই । বিশেষ করে যেদিন রাতে নন্দীদা ভিঙ্গিদার ছিলিমে চুপিচুপি টান দিয়ে আসে , সেদিন আরও বেশি বেশি করে বলে আর ফিচফিচ করে কাঁদে । "


--- " কিঃ ! হাঁস তামাক খায় ? " 


--- " ওই মাঝেসাঝে । বাদ দিন । আমাকে ছাড়ুন । আপনাদের ঝামেলা আপনারা বুঝুন । আপনাদের হাঁসকে খুঁজুন আপনারাই । আমি ফেদার শেভ করতে একটু সেলুনে যাব । রাতে শকুনের বাড়ি নেমন্তন্ন আছে । চললাম । "--- দম্ভের সাথে ঝাঁঝিয়ে ময়ূর বেরিয়ে গেল ঘর থেকে । 





ওদিকে সরস্বতীর কান্নার বৈচিত্র্য ও বাহুল্য --- দুই-ই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পেঁয়াজের দামের চেয়েও বেড়ে চলেছে দ্রুতবেগে । উপচে পড়া বাঁধের জলের মতোই অশ্রুধারাও ছিটকে পড়ছে এদিক ওদিক । তারই ফলশ্রুতিতে মর্ত্যে সেদিন প্রবল বৃষ্টি । প্রখ্যাত শিল্পী রমেন পাল নবদ্বীপ হিন্দু স্কুলের ঠাকুর নিয়ে পড়েছেন মহাফ্যাসাদে । আজ বাদে কাল সরস্বতী পুজো কিন্তু ঠাকুরের কাঁচা রং যেন শুকোতে চাইছে না কিছুতেই । একথা তিনি নিজেও অস্বীকার করতে পারেন না যে প্রতিমা তৈরির কাজে এবার হাত দিয়েছেন খানিক দেরিতে ; কিন্তু বিগত দিনে সাতদিনের মধ্যে দুর্গামূর্তি গড়ার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে আর এ তো সামান্য স্কুলের সরস্বতী । বাইরে বৃষ্টির তোড় বেড়ে চললেও ড্রায়ার আর হিটারের নিখুঁত ব্যবহারে রমেনবাবু শুকিয়ে ফেললেন গোটা ঠাকুরের কাঁচা রং কিন্তু শাড়ি পরিয়ে শোলার গয়নায় মাকে সাজাতে গিয়েই মনটা গেল খারাপ হয়ে । মায়ের চোখের কাছের ভেজা ভাবটা কেটেও যেন কাটছে না কিছুতেই । ড্রায়ার , হিটারের পর ব্লটিং --- আস্তিনের সর্বশেষ তাসটি ব্যবহারের পরও রয়েই গেল সেই জলের ছাপ , জায়গাটা যে পুরোপুরি ভেজা --- দূর থেকে দেখেই তা বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট । বেলা পাঁচটা নাগাদ ঢাক-ঢোলসমেত হিন্দু স্কুলের ছেলেরা নাচতে নাচতে এসে হাজির হল রমেন পালের বাড়িতে । উৎসাহের আতিশয্যে তারা খেয়ালই করল না প্রতিমার চোখের নীচের ভেজা অংশ , আসলে মৃৎশিল্পীর পর্যবেক্ষণে প্রতিমা গঠনের যে ত্রুটি ধরা পড়ে অনায়াসে , সাধারণ মানুষের চোখ তা এড়িয়ে যায় অতি সহজেই । স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে কোনোরকম অতৃপ্তি না দেখে বেশ খুশিই হলেন রমেনবাবু ; যদিও কাল সকালে রোদ উঠলেই এই খুঁতটুকু মুছে যাওয়ার ব্যাপারে একশো শতাংশ আশাবাদী তিনি । 







পাখিদের ঘর থেকে বেরিয়ে মহাদেবের কাছে যাওয়ার পথে চক্ষু চড়কগাছ মা দুর্গার । রান্নাঘরের সামনে চাপ চাপ রক্তের ছাপ ! দেখামাত্রই চন্দ্রযানের বেগে ছুটে প্রেসার কুকারের চেয়েও তারস্বরে গর্জন করে দেবী দুর্গা এসে থামলেন দেবাদিদেব মহাদেবের সামনে --- " ময়ূর , ইঁদুর , পেঁচা --- ওরা তো আর হাঁসকে মারবে না । আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি , এ কাজ সিংহেরই । তাছাড়া মর্ত্যে থাকতে ও তো মাংস খেতে অভ্যস্তই ছিল । নিরীহ হাঁসটাকে একা পেয়ে আর লোভ সামলাতে পারেনি । রান্নাঘরের সামনেই ব্যাটা দিয়েছে হাঁসের ঘাড় মটকে । " সকাল থেকে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ নিজের বরের কাছে পেশ করার পর শেষ পাঁচটি লাইন এক নিঃশ্বাসে শেষ করে থামলেন দেবী পার্বতী । পার্বতীর চিৎকারে কেঁপে উঠলেন স্বয়ং দেবাদিদেব , হাতের ছিলিম ছিটকে ভেসে গেল মহাশূন্যে । নন্দী সবেমাত্র স্পেশাল করে সেজে দিয়েছিল তামাকটা ; তামাক হাতছাড়া হওয়ার রাগে মহাদেব ত্রিশূল হাতে এলোপাথাড়িভাবে পেটাতে শুরু করলেন সিংহকে । বেচারা তখন ঘুমিয়েছিল দেবাদিদেবের হাত তিনেক দূরে । কাল রাতে ভালো ঘুম না হওয়ায় সকালের চা টা খেয়ে এসেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে। পার্বতীর গর্জনে ঘুম না ভাঙলেও ধড়মড়িয়ে ওঠে সে মহাদেবের মারে --- " কিঃ ! কিঃ ! কি হয়েছে প্রভু ! অমন মারছেন কেন ? "


--- " মারবে না তো কি আদর করবে ? বল, হাঁসকে মারলি কেন ? " -- রক্তচক্ষু নিয়ে প্রবল হুংকার দেবী দুর্গার । 


--- " হাঁস ? কোন হাঁস ? কিসের হাঁস, মা ? কোন হাঁসকে মেরেছি আমি ? হ্যাঁ , মর্ত্যে থাকতে মেরেছি কয়েকটাকে । কিন্তু সে তো প্রায় বছর তিরিশ আগের কথা । স্বর্গে আসার পরীক্ষায় পাশ করার পর থেকে আমি ফুল ভেজ । " 


--- "শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করিস না সিংহ ! সত্যি করে বল , সরস্বতীর হাঁসকে মারলি কেন ? " 


--- " সে কি বলছেন মা ? সরস্বতী দিদির হাঁস বেঁচে নেই ? " --- কেঁদে ফেলে সিংহ । 


--- " স্টপ ! স্টপ ! স্টপ ! এটা যাত্রাপালার মঞ্চ নয় । গুল দিয়ে ভুল ঢাকা যায় না সিংহ । এতে শাস্তি বাড়বে বই কমবে না । " 


--- " বিশ্বাস করুন মা , আমি হাঁসকে মারিনি । হাঁস তো আমার ছোটো ভাইয়ের মতো । কেন মারব আমি হাঁসকে ? "--- কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে গড়াগড়ি দেয় সিংহ । 







ইতিমধ্যেই ভুঁড়ি দোলাতে দোলাতে গণেশ হাজির সেখানে --- " কি হচ্ছে কি মা ? এত চেঁচামেচি কিসের ? বেলা বাজে বারোটা । এখনও সকালের খাবারটা অবধি পেলাম না আর তুমি এখানে দাঁড়িয়ে মাথামোটা সিংহটার সঙ্গে বকে চলেছো ? খালি পেটে কি আর ভালো কাজ হয়, মা ? মহাভারত পার্ট টু-টা সবেমাত্র লিখতে বসেছি । তার মধ্যেই যদি এমন হইচই , অনাহার , চিৎকার চলে; আগের বারের মতো হিট স্টোরি লিখব কি করে আমি ? "


--- " চুপ কর তুই । রান্নাবান্না সব বন্ধ এবার থেকে কৈলাসে । সিংহ সরস্বতীর হাঁসকে খুন করে খেয়ে ফেলেছে । " --- কড়া ধমক পার্বতীর ।


--- " কিঃ ! " -- রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে ছোট্ট গণেশ ।


--- " বিশ্বাস করো গণুদাদা , আমি সরোদিদির হাঁসকে মারিনি । দাদা , তুমি তো পড়াশোনা করো ; তুমিই বলো , আমি মারলে তো আমার হাতে গন্ধ থাকত । " --- সিংহের কেশর দোলানো কান্না যেন থামছে না কিছুতেই । 


--- " হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুলে কি আর গন্ধ থাকে বাপু ! "-- সিংহের গালে সজোরে থাপ্পড় পার্বতীর ।


--- " মা , তুমি বুঝলে কি করে যে সিংহ হাঁসকে খেয়ে নিয়েছে ? হাঁস তো কোথাও বেড়াতে গিয়েও থাকতে পারে । "--- শুঁড় দুলিয়ে প্রশ্ন করে গম্ভীর গণেশ । 


--- " হাঁস ওর ভারী ডানা নিয়ে বেশিদূর উড়তে পারে না রে গণু । তাছাড়া এর আগে তো কখনও হয়নি এমন , আর ও তো তেমন বেরোয়ও না । আমি নিজের চোখে রান্নাঘরের সামনে রক্তের ছাপ দেখেছি । পেঁচা , ইঁদুর বা ময়ূর তো আর হাঁসের মাংস খায় না । এ কাজ আসলে সিংহেরই , এ বিষয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশই নেই । "


--- " ওই সস তো আমি সকালে ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুটে মাখাতে গিয়ে ফেলেছি রান্নাঘরের সামনে আর সেটাই পরে পায়ে লেগে মেঝেতে ছড়িয়ে গেছে রক্তের মতো । " --- হো হো করে হেসে ওঠে গণেশ । 






চতুর্দিক চৌচির করা চিৎকার আর হরেনডাস হইচইয়ের চোটে কার্তিক , গণেশ , লক্ষ্মী ---- সবাই বাহন সমেত হাজির হয়েছে মহাদেবের পর্বতের সামনে । সরস্বতীও এসেছে কাঁদতে কাঁদতে । তবে ও এখন বাহনহারা । স্বর্গের সেরা রিপোর্টার নারদও মাইক হাতে উপস্থিত সেখানে ।






হঠাৎ এক প্রবল প্যাঁকপ্যাঁক শব্দে মহাদেবের হেলান দেওয়া পর্বত থেকে দুটো পাথর গেল ছিটকে আর বেরিয়ে এল একজোড়া চ্যাপ্টা ঠোঁট । দেখামাত্রই চোখের জল মোছা থামিয়ে তড়িঘড়ি ঘাড় ধরে হাঁসকে সেখান থেকে টেনে বের করে আনল সিংহ --- " আমি এখানে উনার জন্য এত অপমান সহ্য করছি আর উনি বরফে ঘাপটি মেরে বসে মজা দেখছেন । আজ তোকে আমি মেরেই ফেলব । " --- হাঁসের হার্টবিট তখন সিংহের হাতে । 






--- " ছাড় সিংহ ! ওকে ছাড়! আমি যমরাজকে ডাকছি । ওকে গরম তেলের কড়াইতে ফেলে ভাজা হোক । " --- হাঁসের ঠোঁটে ট্রিমেন্ডাস টোকা দেবী দুর্গার । 


--- " তুই এতদিন ঠিকই বলতি রে… তুই সত্যিই পক্ষীকুলের লজ্জা । "--- বলতে বলতে হাঁসের ডানার কয়েকটা পালক উপড়ে ফেলে ময়ূর । 


--- " অনুমতি দেন তো এটাকে অসুরের ডেরায় পাচার করে দিই । " --- ফিসফিসিয়ে ফোড়ন কাঁটে নারদ । 


--- " আমি কিছু বলতে চাই । "--- ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদতে কাঁদতে নিচুস্বরে বলে হাঁস । 


--- " কি বলবি কি তুই ? " --- ত্রিভুবন কাঁপানো মহাদেবের তান্ডব শুরুর মুখে । 


--- " অপরাধ নেবেন না , কাল রাতে আমি ময়ূরদাকে সবটা খুলে বলতেই গেছিলাম । কিন্তু পাত্তা পাইনি । পরশু ইউটিউবে নারদ নিউজে শুনলাম যে মর্ত্যে নাকি বার্ড ফ্লু চলছে ! হাঁস-মুরগির মড়ক লেগেছে । এবার তাই আমি মাঘ পঞ্চমীতে মর্ত্যে যাব না, ঠিক করেছি । কিন্তু কাল রাতে ময়ূরদা আমার কথা না শুনেই শুয়ে পড়েছিল , শেষমেষ আর কোনো উপায় না পেয়ে মর্ত্যে যাওয়া এড়াতে আজ ভোরে চুপিসারে লুকিয়ে পড়ি বরফের মধ্যে । আরও দু'দিন লুকিয়েই থাকতাম । কিন্তু এই হাঁচিটা এসেই সব গোলমাল করে দিল । "





পিনড্রপ সাইলেন্স ভূ-কৈলাস জুড়ে । 





--- " আমি আমার দোষ মেনে নিচ্ছি । আসলে পক্ষীকুলের রাজা হিসেবে এত অন্যায় দাবিদাওয়ার মুখোমুখি রোজ হতে হয় আমাকে , দু-একটা ন্যায্য আবদারও চোখ এড়িয়ে যায় মাঝেসাঝে । হাঁস মর্ত্য থেকে ভাইরাস নিয়ে ফিরলে কেবল ও নিজেই নয় ; আমি , পেঁচা , শকুন , গরুড় --- দেবলোকের সকল পাখিই প্রাণসংশয়ে পড়ব । সুতরাং, হাঁসের দাবি ন্যায়সংগত । আমাকে ক্ষমা করিস ভাই হাঁস । আমি তোর পাশে আছি । "--- পেখম দুলিয়ে ঘোষণা করে ময়ূর । 


--- " এবার তবে তোর আর মর্ত্যে গিয়ে কাজ নেই সরস্বতী মা । " --- চিন্তান্বিত দেখায় দেবী দুর্গাকে । 


--- " ভুলেও না মা । মর্ত্যে মানুষ এমনিই এখন পড়াশোনাবিমুখ । ওখানকার নেতারা চপ, পকোড়া বেচতে বলছে শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের । বাজার এখন লক্ষ্মী-গণেশের । এর মধ্যে সরস্বতী ডুব দিলে ওর ব্র্যান্ডভ্যালু পড়ে যাবে আরও ; যেমনটা হয়েছে আমার সাথে --- কার্তিকটা হ্যাংলা , একবার আসে মায়ের সাথে আর একবার একলা । যদি সসম্মানে বাঁচতে চাস , ভুলেও মামাবাড়ি যাওয়া মিস করিস না বোন । "--- মাথা নিচু করে বিবৃতি দেয় কার্তিক । 


--- " কিন্তু যাবটা কিসে ?" -- ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে সরস্বতী । 


--- " আমার ঢেঁকিটা নিয়ে যেতে পারে সরস্বতী । তবে মর্ত্যের বর্ডারেই সরস্বতীকে নামিয়ে দেবে ঢেঁকি । বাকি রাস্তাটুকু ও না হয় হেঁটেই পার হবে । অল্পই তো ! বর্ডারের পরীগুলো খুব বদমাশ । ভিসা-পাসপোর্টের চক্করে একবার ফেললে ছয়-সাত ঘন্টা কাটিয়ে দেয় অনায়াসে । কাল দুপুরে ইন্দ্রের সভায় আবার মহালুডো যজ্ঞ আছে । সরস্বতীকে নামিয়ে দিয়ে এসে ঢেঁকি আমাকে নিয়ে যাবে সেখানে । " --- বীণার তারে হাত বোলাতে বোলাতে প্রস্তাব দেন নারদমুনি । দেবাদিদেব সম্মত হন তাতে । 





মর্ত্যে, 



ঘড়ির কাঁটায় সরস্বতী পুজোর সকাল সাতটা । হিন্দু স্কুলের হেডমাস্টার হরিপদ হুই স্কুলের পুজোর ঘরে ঢুকেই খেয়াল করলেন , সরস্বতীর মূর্তির পাশে হাঁস নেই । ইলেভেন সায়েন্সের সমস্ত ছাত্রকে ডেকে যাচ্ছেতাইভাবে অপমান করলেন তিনি । তার ধারণা ছিল যে , ছেলেরা হাঁস আনতে ভুলে গেছে কুমোরবাড়ি থেকে । কিন্তু প্রতিমা টলিতে তুলতে গিয়ে হাঁস ফেলে দেওয়ার ঘটনা শুনে রাগ গেল চড়ে সপ্তমে । সবার সামনেই দুটো ছেলের গালে বসালেন চূড়ান্ত চড় । বন্ধ করে দিতে চাইলেন পুজো । অবশেষে পুজোর দায়িত্বে থাকা বিনয় বটব্যালের হস্তক্ষেপে শান্ত হন হেডমাস্টার । শেষমেষ পুজো তো বন্ধ হয়ইনি । উপরন্তু উদ্ভূত প্রতিকূল পরিস্থিতি দারুণ বুদ্ধিমত্তায় সামলে নেন বিনয়বাবু । 






হিন্দু স্কুলের পুজোর থিমের গল্প এবার এক দুপুরেই ছড়িয়ে পড়েছে গোটা শহর জুড়ে । সন্ধ্যা হতেই নেমেছে দর্শনার্থীর ঢল । আছেন প্রধানশিক্ষক হরিপদ হুই । ভিড় সামলাতে রীতিমতো হিমসিম অবস্থা বিনয় বটব্যালের নেতৃত্বে ইলেভেনের ছাত্রদের । প্রতিমা দর্শনে এসেছেন মৃৎশিল্পী রমেন পালও । মাফলার জড়িয়ে অধোবদনে লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি । একে সরস্বতীর চোখ ভেজা , তার ওপর হাঁস নেই --- নিজের কোনো দোষ না থাকলেও একটা অজানা অপরাধবোধ ভোগাচ্ছে শিল্পী রমেনবাবুকে । সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে লাইন শেষ করে পুজোর ঘরে ঢুকতেই চক্ষু ছানাবড়া তার । মায়ের মুখের সেই ভেজা ভাবটা তো আর নেই-ই , উপরন্তু ফুটে উঠছে ভুবনমোহিনী এক অদ্ভুত হাসি যা তার তুলিরও অসাধ্য । আসলে হাজার ঝঞ্ঝাট-ঝামেলা পেরিয়ে মামাবাড়িতে আসার পর থেকে সরস্বতী মায়ের মনে আনন্দের যে অমরাবতী বয়ে চলেছে --- তা রমেন পালের পক্ষে অনুমান করা সত্যিই অসম্ভব । 






চমকের শেষ এখানেই নয় । ঘরের একপাশে প্রজেক্টরে চলছে বার্ড-ফ্লুর বিশ্লেষণ । ঘর জোড়া বার্ড-ফ্লুর কাট আউট আর মা সরস্বতীর প্রতিমার পায়ের কাছে লাল কালিতে বড়ো করে লেখা --- " বার্ড ফ্লুর দরুন হিন্দু স্কুলে এসে এবার পৌঁছতে পারেননি দেবী সরস্বতীর বাহন রাজহংস । আমরা তাই একান্ত ক্ষমাপ্রার্থী সকল দর্শনার্থীর কাছে । "







                  


                  

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -23


 


শ্যামলীদি মুখ গম্ভীর করে বলল, আজ আর কারো বাপের হিম্মৎ নেই যে আমার পথে কাঁটা ফেলবে। আর কেউ যদি সে চেষ্টা করে, তাহলে সে যোগ্য জবাব পাবে। সন্ধ্যায় আমাকে বেরুতেই হবে। তাই সাত ঘন্টা আগে বলে রাখছি, যদি কেউ কোন রকম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে তাহলে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবো। আদরী মাসী ভয়ে পিছিয়ে গেলো।


আমি শ্যামলীদির কথা শুনে ঠোঁট টিপে হাসতে লাগলাম। ভেবেছিলাম যদি শ্যামলীদির সাথে তেমন দক্ষযজ্ঞ হয়ে ওঠে তাহলে মহাদেবের সাঙ্গ-পাঙ্গর মতো আমিও ঝাঁপিয়ে পড়বো। কিন্তু এতদূর যখন গড়ালো না, তখন অনর্থক কথা খরচ করে কি লাভ। আদরী মাসী পালিয়ে যেতেই হেসে উঠলাম।


সেদিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত শ্যামলীদির চঞ্চলতার সীমা রইলো না । কেন যে চঞ্চলতা তা বুঝতে পারলাম। শুধু কারণ একটাই, প্রতিশোধ নেবার সুযোগ এসেছে। শ্যামলীদি আমাকে তৈরী হতে বলে পাশের রুমে চলে গেলো। আমি উৎফুল্ল মনে গুঞ্জরণ করতে করতে শাড়ী বদলে শ্যামলীদির রুমে প্রবেশ করতেই আমার চোখ দুটো বিস্ময় বিস্ফারিত হয়ে গেলো। এ যে অকল্পনীয় ! আমার চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। এ কি স্বপ্ন না বাস্তব! শ্যামলীদি তখন সুরাপান করে চলেছে। পুরুষের পোষাকে সজ্জিত হয়েছে। পরণে চোস্ত প্যান্ট ও সার্ট। চল্লিশ মিলিমিটার চওড়া চামড়ার বেলটে কোমরটা শক্ত করে বাঁধা। কোনদিন ঐ অবস্থায় বা ঐ পোষাকে দেখিনি শ্যামলীদিকে।


আমাকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল, কি রে পুরুষ বলে মানিয়েছে তো? আজ পুরুষের কাজ করতে হবে বুঝলি ?


পুনরায় বোতলটা মুখের কাছে নিয়ে যেতে ওকে বাধা দিয়ে বললাম - এ কি করছো শ্যামলীদি, এভাবে তোমাকে মদ খেতে তো দেখিনি?


মদ আমি খাই, তোকে জানতে দিইনি কখনো। ভেবেছিলাম আমার ঠোঁট কোনদিন মদ স্পর্শ করবে না, কিন্তু কেন খাই জানিস? মদে ভীরু সাহস পায়, দুর্বল শক্তি পায়, দুঃখীর দুঃখ-যন্ত্রণার লাঘব হয়। বোতলটা দে, আজ আর বাধা দিস না।


আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলো বোতলটা। এক নিঃশ্বাসে বোতলটা শেষ করে গম্ভীর মুখে বলল, ঠিক মতো তাকে আয়ত্তে আনতে না পারলে প্রতিশোধ নিতে পারব না পদ্মা। ঐসব নিম্নগামী, হীন পথাবলম্বী মানুষদের শিক্ষা দিতে গেলে স্বাভাবিক অবস্থায় পারা যায় না। চল আর দেরী করব না, সন্ধ্যা প্রায় হলে এলো


তখন ধরণীর বুকে সন্ধ্যার ঘন তমিস্রা ঘনিয়ে এসেছে। বস্তী হতে বেরিয়ে ফুটপাতে


এসে ট্যাক্সী ধরলাম। আমাদের গন্তব্য স্থানে পৌঁছতে বেশী সময় লাগলো না। শিবাজীদার


নির্দেশমত উপস্থিত হলাম বচন সিংয়ের ভাড়া বাড়ীতে। আমরা উপস্থিত হতেই সেলাম করে একজন নেপালী চাপরাসি বলল, আপনার নাম শ্যামলী হ্যায় ?


শ্যামলীদি ঘাড় নেড়ে তার নিজের পরিচয় দিলো।


সে আমাদের উপরে যেতে বলল। উপরে গিয়ে দেখলাম শিবাজীদা বারান্দায় পায়চারি করছে। আমাদের দেখে শশব্যস্তে হয়ে বলল, পাশের রুমে আমাদের হিতৈষী বন্ধু বন্দী অবস্থায় আছে।


শ্যামলীদি ও আমি পাশের রুমে প্রবেশ করতেই রন্টুর সাথে দৃষ্টি বিনিময় হলো। শ্যামলীদির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মুখটা তার সিঁদুরের মত হয়ে গেছে। চোখ


দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বেরুচ্ছে।


শ্যামলীদি ওর দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন আছো ?


রন্টুর মুখে কোন বাক্য নেই। হাত দুটো তার শক্ত দড়িতে বাঁধা। শ্যামলীদি আবার বলল, কথাটা শুনতে পাওনি বুঝি ? আমাদের দেখে বোবা হয়ে গেলে নাকি?


রন্টু তবুও নিরুত্তর। মনে হলো আমাদের দেখে ওর শরীরের রক্ত প্রায় শীতল হয়ে গেছে।


শ্যামলীদির ঢল ঢল চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ঠিক ভিলেনের অভিনয়ের মতো ওর কাছে গিয়ে বলল, আ-হা, পরোপকারী যুবক, একেবারে বোবা হয়ে গেলে যে! তখনি শ্যামলীদি গর্জন করে বলে উঠল, আমার প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে মিঃ পল্টু বিশ্বাস। আমাকে চিনতে পেরেছো? বলতো আমি কে? কি আমার পরিচয় ?


কোন উত্তর নেই। যেন একটা জড় পদার্থ স্তম্ভের সঙ্গে রজ্জুবদ্ধ হয়ে আছে। রন্টুর মুখে কোন কথা বেরুচ্ছে না দেখে শ্যামলীদি বজ্রকণ্ঠে বলল, এখন আর বোবা সেজো না বন্ধু, বোবা সাজলেও আর রেহাই নেই। তোমার মুখে কিভাবে কথা ফোটাতে হয় তার ওষুধ আমার কাছে আছে। বলো, কত টাকার বিনিময়ে পদ্মাকে আদরী মাসীর কাছে বিক্রি করেছো?


তবুও সে নিরুত্তর। কোন কথা মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে না দেখে সজোরে তার তলপেটে এক লাথি মারলো শ্যামলীদি। এই তো শুভারম্ভ এখনো অনেক পাওনা বাকী আছে। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিলে মেরে তোমার হাড়-পাঁজরা সব গুঁড়িয়ে দেবো। উত্তর দাও, কার প্ররোচনায় কিসের লোভে সমস্ত ন্যায়-নীতি বিসর্জন দিয়ে তুমি আমাকে বারাঙ্গনায় পরিণত করেছো? এতো সাহসই বা কোথায় পেয়েছিলে?


শ্যামলীদির রুদ্ধ কণ্ঠস্বর শুনে রন্টুর হাত-পা যেন শিথিল হয়ে আসছিলো। মনে হতে লাগলো মৃত্যুর অশুভ ইঙ্গিতে সে যেন তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার বিয়োগান্তক পরিণতি কি করুণ!


মেয়েদের নারীত্ব নিয়ে সে ছিনিমিনি খেলেছে। মনে হয় শ্যামলীদির কাছ হতে সে এবার চরম শাস্তি পাবে। ওকথা চিন্তা করা মাত্রই শ্যামলীদি বেতের চাবুকটা চালালো রন্টুর শরীরে। রন্টু চাবুকের আঘাতে মুখটা একটু উঁচু করে চোখ দুটো বন্ধ করল।


শ্যামলীদি ওর ঠোট নেড়ে বলল, বড্ড আরাম লাগলো না ? আর একটা দি তাহলে ? বলা মাত্রই চার পাঁচ বার চাবুক চালিয়ে বলল, কতগুলো মেয়েকে এই কদর্য পথে ঠেলে দিয়েছো? উত্তর দাও পল্টুবাবু। কি ভাবছো, দেবে না? উত্তর তোমাকে দিতেই হবে, নয়তো...


শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টির ধারার মতো চাবুকের আঘাত পড়তেই রন্টুর মুখ দিয়ে কথা বেরিয়ে এলো - আর মেরো না শ্যামলী, তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। শ্যামলীদি একটু থেমে বলল, এবার তাহলে কথা বেরুলো? পদ্মা, ওষুধে আমার


কাজ করেছে রে। বলো, আমাকে বিক্রি করে কত টাকা পেয়েছো? ৫০ হাজার।


মোটেই পঞ্চাশ হাজার! তাহলে আরো অধিক টাকার বিনিময়ে আমার নারীত্বকে পূর্ব মর্যাদায় ফিরিয়ে দিতে পারবে?


রন্টু নীরব। তীক্ষ্ম কণ্ঠে শ্যামলীদি বলল, যারা দশের কাছে কুমারীর কুমারীত্বকে জোর করে বিলিয়ে দিতে পারে, যারা নারীর নারীত্বকে ধূলায় মিশিয়ে দিতে পারে, তারা কেন পারবে না কুমারীত্বকে ফিরিয়ে দিতে? একে চিনতে পারছো? যে মেয়েটা সরল মনে বিশ্বাস করে দুমুঠো অন্নের সন্ধানে তোমার সাথে এই মহানগরীতে এসেছিল, সেই পূজনীয় দাদার কৃপায় শেষ পর্যন্ত এই নিষ্পাপ মেয়েটা লালসা ও প্রবঞ্চনার শিকার হলো? তোমার মতো জানোয়ারকে আমি সহজে ছাড়বো না। তোমার একমাত্র শাস্তি।


চাবুকের আঘাতে তাকে ক্ষত বিক্ষত করে তুলল। কাটা ছাগলের মতো ছটপট করতে থাকল আমাদের পূজনীয় দাদা। শ্যামলীদি তবুও ক্ষান্ত হয় না। প্রতিশোধের আগুন তখন তার শিরায় উপশিরায় ছড়িয়ে পড়েছে, রন্টুর গগনভেদী আর্তনাদে দেওয়াল যেন ফাটতে শুরু করল। একটু পরে শ্যামলীদি আমার দিকে ছুরিটা এগিয়ে দিয়ে বলল, পদ্মা, এই ছুরিটা ধর, তারপর -


ছুরিটা দেখে রন্টু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, আমাকে মেরো না শ্যামলী। আমায় ক্ষমা করো, আমি আর কখনো অন্যায় করবো না।


শ্যামলীদি অট্টহাসি হেসে বলল, পাগল নাকি! তোমার মতো মহাপুরুষকে বলি দিয়ে আমার পাপের বোঝা বাড়াতে যাবো কেন? তাছাড়া তোমাদের মতো ব্যক্তি শত শত মেয়ের উপার্জনের পথ করে দিচ্ছে, তাহলে কেন তোমাদের মতো উপকারী বন্ধুকে পৃথিবী হতে সরিয়ে দেবো?


শ্যামলীদি চকচকে ছুরিটা নিয়ে ধীরে ধীরে ওর কাছে গিয়ে জামাটা কেটে শরীর থেকে সরিয়ে দিতে সাদা ধবধবে পিঠটা মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে এলো। চাবুকের অস্পষ্ট দাগ দেখে শ্যামলীদি সান্ত্বনা দেওয়ার মত করে বলল, সত্যি, সাদা ধবধবে পিঠটা সিঁদুরে মেঘের মতো হয়ে গেছে। বড্ড লেগেছে প্রিয়তমের! না না, আর মারবো না। তবে তোমাকে যাতে ঐ পথে না এগোতে হয়, তোমার জন্য আরো মেয়ে নষ্ট না হয় তার ব্যবস্থা করে মুক্তি দেবো। কি, মুক্তি নেবে ?


রন্টু নীরব। মুক্তি কি দেবে শ্যামলীদি ওকে? সত্যি বলছি, বড় মায়া হয়েছিল ওর অবস্থা দেখে। জানি, সে আমাদের কতখানি সর্বনাশ করেছে। তবুও আমার কোমল হৃদয় ওকে মুক্তি দিতে চাইছিলো। শ্যামলীদির রক্তচক্ষু দেখে ভরসা পাচ্ছিলাম না। ওকে ক্ষমা করবে। কিন্তু ওর মুখে মুক্তি উচ্চারণ শুনে মনকে ধাক্কা দিলো। তাহলে তোমাকে মুক্তি দিই, কেমন?


রন্টু মুখটা একটুখানি উঁচু করতেই প্রবল বেগে ছুরিটার পুরো অংশটাই ওর পেটে ঢুকিয়ে দিয়ে এক পাক ঘুরিয়ে দিলো। তৎক্ষণাৎ পিচকারী ফোয়ারার মতো রক্ত বেরিয়ে এলো ক্ষতস্থান থেকে। রন্টু প্রচণ্ড বেগে চিৎকার করে উঠল। আমি ভয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে চিৎকার করে উঠলাম।


এ কি করলে শ্যামলীদি! আমি যে বিশ্বাস করতে পারিনি তুমি ওকে খুন করবে!


শ্যামলীদি একটু শ্বাস নিয়ে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বলল, এতো দিন পর একটু শান্তি পেলাম রে পদ্মা। যে যন্ত্রণায় আমার ভেতরটা মর্মে মর্মে দগ্ধ হচ্ছিল তা হতে আজ আমি নিষ্কৃতি পেলাম। একটু পরে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ভাবছিস অন্যায় করলাম ? না রে পদ্মা, কোন অন্যায় আমি করিনি। ওর বেঁচে থাকার অধিকার নেই। ও বেঁচে থাকলে আমাদের মতো বহু নিষ্পাপ মেয়ের সর্বনাশ করতো।


একটু পরেই শিবাজীদা হাঁস-ফাঁস করে আমাদের কাছে হাজির হয়ে বলল, উসকো খুন কর দিয়া।


শ্যামলীদি ঘাড় নাড়লো।


তব জলদী চলো। য়্যাহা রহনা ঠিক নেহী হ্যায়। পুলিশকো মালুম হো চুকা কি


হম য়্যাহা হ্যায়।


এক রকম জোর করেই আমাকে আর শ্যামলীদিকে বাইরে নিয়ে এলেন শিবাজীদা।


পুলিশ খবর পেয়েছে শিবাজী সিং তার পুরানো আড্ডায় ফিরে এসেছে। তাই ওকে


ধরবার জন্য নিখুঁত পরিকল্পনা তৈরী করেছে।

Saturday, October 15, 2022

ফ্লিপকার্ট (Flipkart) এ কর্মী নিয়োগ || বেতন ১৫ হাজার টাকা প্রতি মাসে || Flipkart Recruitment 2022 || Flipkart Supply Chain Operations Free Training and Internship 2022


 


আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় ও ভরসা যোগ্য ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ফ্লিপকার্ট (Flipkart) নিয়ে এসেছে একটি ফ্রি ট্রেনিং এবং পেইড ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম। এটি পরিচালনা করবে ফ্লিপকার্ট, যা একটি সাপ্লাই চেইন অপারেশন একাডেমি প্রোগ্রাম। এর মাধ্যমে ই-কমার্স শিল্পের সম্পূর্ণ ডিটেলস তথা ওভারভিউ পাবেন। এর সাথেই দেওয়া হবে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের জন্য ট্রেনিং। এই প্রোগ্রামের দ্বারা প্রতিদিন পাবেন 500 টাকা করে। 


এই ফ্রি ট্রেনিং এবং পেইড ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের জন্য সব থেকে সুবিধা হল এখানে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার এর প্রয়োজন হয় না, সরাসরি মোবাইল ফোন এর মাধ্যমেই এই ফ্রী ট্রেনিংটি নিতে পারবেন। প্রোগ্রামে আবেদনের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা কি লাগবে, আবেদন কিভাবে করবেন ইত্যাদি নীচে সম্পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে, দেখুন -




পদের নাম - 

Flipkart Supply Chain Operations Free Training and Internship 2022






বর্তমান এ এই ট্রেনিং কেন দরকার -


আমরা প্রত্যেক মানুষই জানি Flipkart একটি ভারতীয় ই কমার্স কোম্পানি এবং সিঙ্গাপুরের একটি pvt লিমিটেড কোম্পানি। বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, ইলেকট্রনিক, ফ্যাশন, মুদি এবং লাইফস্টাইল বিভিন্ন আইটেম এছাড়া অন্যান্য পণ্য বিভাগগুলি এখানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে Flipkart সংস্থাটি সর্বপ্রথম অনলাইনে বই বিক্রির মাধ্যম ছিল। আজ সেই flipkart কোম্পানির নেট ওয়ার্থ $ 37 বিলিয়ন।


বর্তমানে ফ্লিপকার্ট কোম্পানি সেই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী যারা ই-কমার্স শিল্পে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তাদের জন্য নিয়ে এলো Flipkart সাপ্লাই চেন অপারেশন একাডেমি ট্রেনিং প্রোগ্রাম।


এটি সম্পূর্ণ ফ্রি ট্রেনিং। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের ই-কমার্স শিল্পের পুঙ্খানুপুঙ্খ বোঝানোর পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন অপারেশন ম্যানেজমেন্টের একটি ব্যাপক ওভারভিউ প্রদান করা হবে। এছাড়াও ইন্টার্নশিপ সময়কালে ইনডাইরেক্টিভ ভিডিও, সিমুলেশন, ডিজিটাল হ্যান্ডসআউটস, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং অত্যাধুনিক সুবিধা যুক্ত হ্যান্ডস-অন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের সুদক্ষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।


এই ট্রেনিং এর সময়সীমা হবে সর্বমোট 61 দিন, যার মধ্যে প্রথম 16 দিন ডিজিটাল লার্নিং ট্রেনিং দেওয়া হবে এবং 45 দিন ইন্টার্নশিপ চলবে। এই ট্রেনিং টি সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেওয়া হবে। 




শিক্ষাগত যোগ্যতা - 


কমপক্ষে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে থাকতে হবে। এছাড়াও ITI, গ্রাজুয়েশন, ডিপ্লোমা সহ অন্যান্য উঁচু শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীরাও আবেদন করতে পারবেন।




বয়সসীমা -

18 থেকে 57 বছর বয়স্ক সকলেই এখানে আবেদন করতে পারবেন।



প্রয়োজনীয় তথ্য -


 ট্রেনিং চলাকালীন পোর্টাল নির্দিষ্ট অবস্থানে উপস্থিত হওয়ার জন্য উপলব্ধ হতে হবে।

Flipkart সাপ্লাই চেন ট্রেনিং প্রোগ্রামের শর্ত

প্রার্থীর অবশ্যই একটি 2 GB RAM এবং 64 internal Storage যুক্ত মোবাইল ফোন থাকতে হবে।

ফোনের ব্যাটারি ক্ষমতা 5000 mAh হতে হবে।

এছাড়াও ভালো ইন্টারনেট স্পিড এবং প্রতিদিন ১ জিবি ডাটা উপলব্ধ থাকতে হবে।




Flipkart সাপ্লাই চেন ট্রেনিং প্রোগ্রামের সুবিধাঃ

(1) এই প্রোগ্রামটি শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দক্ষতা বিকাশে শিক্ষার্থীকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সহায়তা করবে।


(2) 45 দিনের ইন্টার্নশীপের পর সকলকে একটি উপবৃত্তি প্রদান করা হবে। প্রতিদিন ৫০০ টাকা।




(3) পুরো 61 দিনের প্রোগ্রাম শেষ হয়ে গেলে, ট্রেনিং শেষে একটি শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। যা বিভিন্ন ই-কমার্স কোম্পানি বা ব্যবসায় কাজে লাগবে।




 ট্রেনিং তথা ইন্টার্নশিপের বিবরণ -


16 দিনের ডিজিটাল লার্নিং শেষ হবার পর অংশগ্রহণকারীদের 45 দিনের একটি ইন্টার্নশিপের জন্য নিবন্ধিত করা হবে। তারা SMS, ইমেল বা ফোন কলের মাধ্যমে তাদের যোগদানের বিবরণ, যেমন অবস্থান, যোগদানের তারিখ, রিপোর্টিং সময় এবং রিপোর্টিং ম্যানেজার সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য পেয়ে যাবে।



ইন্টার্নশিপে চলাকালীন, অংশগ্রহণকারীদের অবশ্যই নিম্নলিখিত নথিগুলি থাকতে হবে -


১)বৈধ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তথ্য (Bank Account)

২)আধার কার্ড (Aadhaar Card)

৩)ঠিকানা এবং পরিচয় প্রমাণ

৪)প্যান কার্ড (Pan Card)



 নির্বাচন পদ্ধতি -

একটি ফ্রি অ্যাসেসমেন্ট নেওয়া হবে। এই অ্যাসেসমেন্টে বেসিক ইংলিশ, ম্যাথমেটিক্স এবং লজিক্যাল টাইপের প্রশ্ন থাকবে। অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সিলেবাস অপশন থেকে সিলেবাসটি দেখে নিতে পারেন।


এই ফ্রী অ্যাসেসমেন্টে কমপক্ষে 80% নম্বর নিয়ে উত্তীর্ণ হলে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হবে।


অ্যাপটিটিউড লার্নিং এবিলিটি এবং আপনি কেন এই ট্রেনিংটি করতে চান সেই বিষয়ের ওপর একটি সংক্ষিপ্ত ইন্টারভিউ নেওয়া হবে এবং সেখানে উত্তীর্ণ হলে আপনাকে ট্রেনিং এর জন্য কল করা হবে।


আবেদন পদ্ধতি - শুধু মাত্র অনলাইন এ।

নীচে দেওয়া অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে আবেদন করতে পারবেন।




Official Website-

Click here 🔴


Notice -

Click here 🔴


Apply Now-Now-

Click here 🔴



Friday, October 14, 2022

ছোট গল্প - অশ্বত্থের ডায়েরী || লেখক - রঞ্জিত মল্লিক || Written by ranjit mallik


 

 অশ্বত্থের ডায়েরী

          রঞ্জিত মল্লিক




      "........আশ্বিনের শারদ প্রাতে.......

......... .......... বেজে........"


            ভাদ্রমাসের চড়া রোদ পড়েছে। আশাবরী ছাদে কাপড়গুলো শুকোতে দিয়েই নীচের ঘরে আড্ডাতে যোগ দিল। পুজো আসতে এখনও কিছুদিন বাকি। 


           আকাশে নীল মেঘের টোপর, খোলা খামে বলাকার চিঠি, পদ্ম দীঘির জলে শালুক, শাপলার সরল খুনসুটি, সবুজের মখমলে কাশের জনসভা, শিউলি ভোরে শিশিরের স্যাঁতস্যাঁতে অভিমান, মাঝে মাঝে ঢাকের মাতাল করা মিষ্টি মল্লারে ভেসে আসছে আগমনী সুর।


              আড্ডা বেশ জমেছে। ঘর থেকেই ঘন ঘন চায়ের অর্ডার আসছে। নিকোটিনের গন্ধে ভরপুর আড্ডার আসর। পুজোর বেড়ানো, শপিং, ঠাকুর দেখা নিয়ে কথা হচ্ছে। 


                 একটু পরেই দুর্নিবার ধূমকেতুর মতন উদয় হয়ে নৈঋতার বিয়ে ভাঙ্গার খবরটা দিল।


              "আমি আগেই জানতাম। নৈঋতার এই বিয়েটা টিকবে না।" আশাবরী বলল।

             "আমারও সব শুনে সেটাই মনে হয়েছিল। আমি জানতাম ও পারবে না গুছিয়ে সংসার করতে।"সোমলতা বলে ওঠে।

            "আসলে ওর একটা পুরানো অতীত আছে। সেই অতীতকে ছেড়ে..............."সাম্য কথাটা শেষ না করেই সিগারেটে টান দেয়।

            "আমিও কিছুটা শুনেছিলাম।তবে অতটা গুরুত্ব দিয়নি।" রাজন্যা বলে ওঠে।

               "সামান্য আভাসও আমিও পেয়েছিলাম। আমার সাথে প্রায়ই ফোনে কথা হত।"দুর্নিবার কথাগুলো বলেই একবার সকলের দিকে গভীর দৃষ্টি ছোড়ে। 

               "একটা অসমবয়সী প্রেম সব শেষ করে দিল। দোষটা দুজনের কারোর নয়।" সাম্য বলল। "হতে পারে এটা ইনফ্যাচুয়েশান। আর সেটাই মনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে গ্রো করছে।" দুর্নিবার আবার বলে ওঠে।

                                     ***************


               নৈঋতা নিজেও ভাবতে পারেনি তার জীবনে এই রকম পরিণতি হতে পারে। শেষ বিয়েটা না টেকাতে পেরে আজকাল খুব ভেঙ্গে পড়েছে।


               সারাদিন ঘরের মধ্যে চুপ করে বসে থাকে। কোন কথা বলছে না। কিছুদিন ধরেই ভাবছে দুদিনের জন্যে কোথাও ঘুরে আসবে।


            "কি রে, সকাল থেকেই মুখ গোমরা করে বসে আছিস?" মা ঠাকুর ঘর থেকেই হাঁক পাড়ল।

           "মা, কিছুই ভাল লাগছে না। আমার আর এই জীবনে সংসার করা হবে না।" নৈঋতা বলল।

           "সবই আমার কপাল। আমাদের কপাল।একদিন দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।" মা স্বান্ত্বনা দেয়।

           "ভাবছি, একটু বাইরে যাব। স্কুল থেকে কদিন ছুটি নিয়েছি।"

          "কোথায় যাবি?"

          "মালদার চাঁচলে। আমার পুরানো স্কুলে একবার যাব।কিছু কাজ বাকি আছে। আজকেই বেরোতে হবে।"

           "আজ রাতেই যাবি?" 

          "এরপর গেলে আসল কাজটাই হবে না। অনেক দেরী হয়ে যাবে।"

           

               নাইটিতে চোখের জলটা মুছেই নৈঋতা ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। ব্যাগে পুরানো শাড়িটা ঢোকাতে গিয়েই কিছু চিঠি বেরিয়ে আসল। চিঠিগুলো দুর্জয়ের লেখা।মনটা নিমেষে ডানা মেলল দূর অতীতে।

                           

                                  *************


            ওর সাথে প্রথম বিয়ে। বিয়ের আগেই পাঁচ বছরের পরিচয় ছিল। দুর্জয়ের বাড়িতে যেদিন প্রথম পা রাখে, সেদিন ওর ঠাকুমার নৈঋতাকে দেখেই পচ্ছন্দ হয়েছিল।


               নৈঋতাও চাইছিল এই রকম এক শ্বশুড়বাড়ি। ঘরোয়া পরিবেশ। ছোট্ট সংসার।


               ধুমধাম করে বিয়ে হলেও বিয়েটা শেষাবধি টিকল না। দুর্জয় অনেক চেষ্টা করেছিল। নৈঋতাকে বোঝানোর। ও শোনেনি।


                প্রতি রাতে দুজনের ঘনিষ্ঠ হবার মুহূর্ত্যে অশ্বত্থের ছবি ভেসে আসত নৈঋতার মনে। নৈঋতা বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল সেই সম্পর্ক থেকে। পারেনি, ভিতরে গুমরে উঠত। 


                একদিন দুর্জয় বলেই ফেলল...,


             "অশ্বত্থ কে? তোমার প্রাক্তন.....?"

            "আমার শুভাকাঙ্ক্ষী।।ভাল সম্পর্ক আছে। আমাদের মধ্যে। সেটা....."

            "আজও ওকে ভালবাস ?"

             "জানিনা। হয়ত কিছুটা হলেও ভালবাসি।তা না হলে সে আমার মনের মধ্যে আসবে কেন? আসলে আমাদের রিলেশানটা এমন যে তোমাকে ঠিক বোঝানো যাবে না।"

            "আর অশ্বত্থ? সেও কি....?"

            "হতে পারে।"


            টানা চার-পাঁচ বছর সংসার করার পর দুর্জয়ের সাথে সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসে। জানেনা ও এখন কোথায় আছে। 


               ট্রেনে চেপেই ঘামে ভেজা শরীরটা চোখ বন্ধ করে জানালার গায়ে ছেড়ে দিল। 


                 এখন প্রায়ই অশ্বত্থের কথা মনে ভাসে। চাঁচলে চাকরি করতি গিয়ে ওর সাথে পরিচয়। পরে বিএড করার সময় ওর সাথে ঘনিষ্ঠতা।


                                           **********


                বাবা, মা মরা অশ্বত্থ হোস্টেলে থাকত। বাড়ি জলপাইগুড়ি। গার্জেন বলতে একমাত্র কাকা,কাকিমা। মামার বাড়ির নিকটস্থ চাঁচলের স্কুলেই পড়ত।


           অংকে ভাল নম্বর পেতে অশ্বত্থের মামা নৈঋতাকে টিউটর হিসেবে ঠিক করে। বারো ক্লাসের ছাত্র অশ্বত্থ এমনিতেই অংকে ভাল। নৈঋতা এসে উজার করে সব কিছু শেখাতে শুরু করল।


                 আসতে আসতে নৈঋতা বুজতে পারল, অশ্বত্থ কেমন যেন ওর উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।ওর জীবনের অনেক কিছুই শেয়ার করত দিদিমণির কাছে। সুন্দর বণ্ডিং ছিল দুজনের।


               এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বণ্ডিংটা আরো স্ট্রং হল। নৈঋতার ছোট ছোট কাজে অশ্বত্থ এগিয়ে আসে। বাজার হাট , ওষুধ কিনতে অশ্বত্থের ডাক পড়ত।


             নৈঋতা অসুস্থ হয়ে পড়লে, অশ্বত্থ নিজে এসে দিদিমণির রান্না করে দিয়েছে। মাথায় জলপটি দিয়েছে।

                           .......................


             "আজ শরীর কেমন আছে? জ্বরটা কমেছে দেখছি।"

             "জ্বর কমলেও শরীরে একটু ব্যথা আছে। মাথাটা পুরো ভারী হয়ে আছে।"         

         "কপালটা একটু টিপে দেব? বেশ হালকা লাগব।"

           "না, থাক।"

                                  ...........

             "অঙ্কগুলো সব হয়ে গেছে?""

             "সব হয়নি দিদিমণি। দু একটা বাকি আছে।"

              "স্কুলে কি করাল?"

               "ক্যালকুলাস।"  


                  বারো ক্লাসে হিংসে করার মতন নম্বর পেয়ে অশ্বত্থ জলপাইগুড়ির কলেজে ভর্তি হয়। ফিজিক্স অনার্স। নৈঋতার ইচ্ছে ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুক। কিন্ত আর্থিক অবস্থা ভীষণ খারাপ।নৈঋতা সব দিক ভেবে এগিয়ে আসে। অশ্বত্থকে জয়েন্টে বসতে বলে।


                  এক চান্সে জয়েন্ট উতড়ে যায়। জলপাইগুড়ির ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেই ভর্তি হয়। নৈঋতাই সব খরচ দেয়। 


               পরে ও জলপাইগুড়িতে বিএড করতে এলে সম্পর্কের নিবিড়তায় পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আরো বেড়ে ওঠে।


              নৈঋতাও বুঝতে পারে অশ্বত্থের প্রতি কেমন একটা টান চলে আসছে। সেই টান কি ভালবাসার ? না অন্য কিছু? নিজেই জানে না।


               অশ্বত্থের পড়া শেষ হতে তখনও দুই বছর বাকি। নৈঋতা মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিয়ে জলপাইগুড়ির একটা স্কুলে জয়েন করে। মাঝে মাঝে অশ্বত্থকে ডেকে তার স্টাডি কেমন চলছে খোঁজ নেই। নিজের হাতে ওর খাবার, টিফিন বক্স সাজিয়ে দেয়।


                পুরানো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখটা বুজে এসেছিল খেয়াল করেনি। বর্ধমান এসে গেছে।


                জানালার দিকে আপন মনে তাকিয়ে আছে। একটু পরেই পিছন থেকে একজন টোকা মারল। ঘাড় ঘুরিয়েই দেখে বিদর্ভ দাঁড়িয়ে।


            "তোমাকে শিয়ালদাতে উঠতে দেখেছি।"

          "কোথায় যাচ্ছ?"

         "অফিসের কাজে বালুরঘাটে যাচ্ছি।"  

                   "তুমি?"

         "মালদা। কাজ আছে। জলপাইগুড়িও যেতে পারি।"

       "বুঝেছি।"

      "কি?"

       "সেই পুরানো সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পার নি?"

      "ঠিক ধরেছ। বেরোতে না পারলে তোমাকে এত সহজে........?"

    "মন থেকে বলছ?"


                 ট্রেন ছেড়ে দিল। বিদর্ভ ওর দুটো বগির পিছনেই উঠেছে। বেশী দিন হয়নি ওদের ডিভোর্স হয়েছে।


             দুর্জয় চলে যাবার পর ঠিক করেছিল জীবনটা একাই কাটাবে। কাউকে আনবে না এই ছন্নছাড়া জীবনে। অসুস্থ মার কথা রাখতেই কেন্দ্রীয় সরকারের আধিকারিক বিদর্ভকে বিয়ে করে।


            ওকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিল। পারেনি। তার কারণও ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর অশ্বত্থ ভাল চাকরি নিয়ে ব্যাঙ্গালুরু চলে যায়। চার বছর পরে ওকে ফ্রান্সে পাঠায়।


             তখন থেকেই অশ্বত্থের সাথে যোগাযোগটা ফিকে হয়ে আসে। বিদর্ভকে অশ্বত্থের কথা বলতে হয়নি। খাঁচার পাখি অশ্বত্থকে বিদর্ভ নিজেই একদিন খাঁচাটা খুলে মুক্ত করে দিল।


           বিদর্ভ হঠাৎ একদিন জানায় যে সে এই সম্পর্ক থেকে বেরোতে চাই। কারণ এক নার্সের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে যাকে সে ভালবাসে। যদিও নার্স তার থেকে বয়সে আট বছরের বড়।


     "আমি মনামীকে ঠকাতে পারব না। তোমার আগে ও আমার জীবনে এসেছে। ও আমাকে পাগলের মত ভালবাসে।"

   "সব বুঝলাম। তাহলে আমাকে বিয়ে করলে কেন ? মার কাছে মহৎ হতে?"

     "কিছুটা তাই। তখন সিচুয়েশান অন্যরকম ছিল।"

  "এখন হঠাৎ নতুন করে পুরানো প্রেম উথলে উঠল?"

"এক্সিডেন্টের পর মনামীর স্মৃতি চলে যায়। এখন ওর স্মৃতি ফিরে এসেছে। ও আমাকে খুঁজে চলেছে।"

"বেশ তো যেদিন বলবে আমি ডিভোর্স পেপারে সই করে দেব।"


               নৈঋতা আর কথা বাড়ায়নি। বিদর্ভের দাবী মেনে নিয়েছিল। পরে চিঠি লিখে বিদর্ভকে অশ্বত্থের বিষয়ে সব জানিয়েছিল।


            ট্রেন বোলপুর ছাড়তেই ঘুমটা আবার ভেঙ্গে গেল। বোলপুরের শান্তিনিকেতনে একবার অশ্বত্থ কাকাদের সাথে এসেছিল পৌষমেলাতে। সেবারে নৈঋতা দিদিমণিকেও আসতে রাজী করিয়েছিল। ওর মনে আছে পৌষমেলাতে মাদলের সাথে পা মিলিয়েছিল। অশ্বত্থ ওকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব কিছু দেখিয়েছিল।


              আজও নৈঋতার শূন্য বুকের মাঝে একটা মাদল বাজে। সেটা আনন্দের না কষ্টের ও নিজেই জানে না। তবে সেই মাদলের তালে তালে, মাঝে মাঝে অশ্বত্থের স্পন্দনটা টের পায়।


          চোখের জলটা মুছেই আবার একটু ঘুমানোর চেষ্টা করল। ঘুম কিছুতেই আসছে না।


                     

                                   ***************


                   ট্রেন মালদা ছুঁয়েছে। চাঁচলের স্কুলের কাজ মিটতে একটু বেলা হল।


              শরৎকাল যে এসেছে প্রকৃতির সাজ দেখলেই তা বোঝা যাচ্ছে। আম বাগানের ফাঁক ফোকর দিয়ে হলদে রোদ্দুরটা আলপনা এঁকে বেড়াচ্ছে। কাশের বনে সাদা বকের জ্যোৎস্না।


               অশ্বত্থের মামার সাথে দেখা হয়েছিল। ওর খবর একটা পেয়েছে। আর তাতেই......। পুরানো স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছে। চোখ ছলছল করছে অনবরত। নিজেকে আজ ভীষণ একা মনে হচ্ছে। একটু পরেই সন্ধ্যে নামবে। চারিদিক জমাট অন্ধকারে ঘিরে ধরবে। নৈঋতার মনে হচ্ছে সেই অন্ধকার ওর সব কিছু কেড়ে নেবে। 


                                  ********


             চাঁচল থেকে জলপাইগুড়ি অনেকটা পথ। ওখানে নেমেই চোখে মুখে একটু জল দিল। ওখানের পুরানো স্কুলেও একবার যেতে হবে।


                স্কুল থেকে ফিরেই সোজা চলে আসল অশ্বত্থের বাড়ি।বাড়িটা আগের মতই আছে। সেই রকম সাজানো গোছানো। গুছিয়ে রাখার সেই মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছে না। মামার কাছে গতকালই শুনেছে ও দেশের বাইরে আছে। তবে বাড়ির মধ্যে পা ফেলেই বুঝতে পেরেছে একটা চাপা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে সাড়া বাড়িতে। 


  "অশ্বকে দেখছি না?"

   "অশ্ব এখানে এখন আর থাকে না।"

   "শুনলাম আমেরিকাতে আছে?"

   "কে বলল?"

   "মামী।"

   "হ্যাঁ, ঠিক শুনেছ। ও আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে।"


           অশ্বের কথা বলতে বলতে কাকিমার চোখ ছল ছল করে উঠল। একটু থেমেই, "আর একটা দিন থেকে গেলে হত না?"

"এবারে ছুটি কম। পরে একবার আসব।"


                নৈঋতা বেরোনোর জন্যে রেডী হতেই কাকিমা ওর হাতে একটা ডায়েরী এগিয়ে দিয়ে করুণ সুরে বলল," ডায়েরীটা অশ্বত্থের। এখানে অনেক কিছু লেখা আছে। ও তোমাকে দিতে বলেছে।"


                 ডায়েরীটা হাতে নিয়ে নৈঋতা বেশ অবাক হল। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে কাকিমণির দিকে।একটু থেমে বলল,"কিন্তু কেন?"

"জানিনা, আমরা কোনদিন এর পাতা উল্টেও দেখিনি। ও চলে যাবার আগে এটা তোমাকে........"


            ডায়েরী নিয়েই নৈঋতা স্টেশনের দিকে পা বাড়াল। ছিপ ছিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। ওর চোখেও নামল শ্রাবণের ভরা কোটাল। বৃষ্টির বিন্দুগুলো পদ্মপাতার উপর পড়ে এক অপূর্ব সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি করছে।


              ট্রেনে উঠেই জানালার ধারে হেলান দিয়ে বসল। আজ মনে হচ্ছে সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছে। অশ্বত্থের মুখটা ভাসছে সদ্য ফোটা শিউলির মতন।ওর সরল হাসি, শিশুসুলভ কথাগুলো কানে বাজছে। মনে মনে ভাবছে,ভালই হয়েছে ও দূরে চলে গেছে। কেউ আর ওকে বিরক্ত করবে না।


             নৈঋতা বুঝতে পেরেছিল অশ্বত্থের কাছে ও বাঁধা পড়েছে। অশ্বত্থও একটা অজানা টান অনুভব করত ওর প্রতি। হতে পারে সেই টানটাই ভালবাসা। কিংবা ভালবাসার মতই এক শক্ত, নিখাদ বন্ধুত্ব।                     

                                   *****************


                   সময়ের খরস্রোতে ন টা বছর দেখতে দেখতে কেটে গেছে। বোধনের রোদ্দুর আবার চৌকাঠে এসে ঝলমল করছে। কদিন পরেই মা অপর্ণা সবার ঘর আলো করে আসবে।


                    "বাজলো তোমার

                      ........... আলোর বেণু......."


                    আশাবরীর বাড়িতে পুজোর আড্ডাটা আর নেই। সেখানে ঘোলাটে ভেজা অন্ধকার। তার প্রতিফলন অশ্বত্থের জলপাইগুড়ির বাড়িতে। নৈঋতার ঘরেও। কাকিমণি মারা গেছে। নৈঋতার মায়েরও বেশ বয়স হয়েছে। 


                   দুর্জয় মাঝে মাঝে নৈঋতার মা, বৃদ্ধা সবিতাদেবীর খোঁজ রাখে। ও আর বিয়ে করেনি। সিঙ্গল ফাদার হিসেবে থাকতে চায়। একটা মেয়েকে দত্তক নিয়েছে। বাবা, মেয়েতে আছে ভালই। বিদর্ভের সাথে মনামীর অসমবয়সী প্রেমটা ছাদনাতলার গন্ধ মাখলেও শেষরক্ষা হয়নি। মনামীর আবার স্মৃতি লোপ পেলে বিদর্ভ শোকে দুঃখে তিন বছরের মধ্যেই মারা যায়। 


                  আজ অষ্টমী। সন্ধিপুজো শুরু হতেই সবিতাদেবী প্রদীপ হাতে নৈঋতার ঘরে ঢুকল। প্রদীপের স্বর্ণাভ আভায় ধুলোর চাদরে মোড়া মেয়ের ছবিটা জ্বল জ্বল করছে।ঠিক যেন মা উমা!  


              ছবির ভিতর থেকে নৈঋতা মিষ্টি হেসে যেন বলছে,"মা, তোমাদের আদরের ঋতা ভাল আছে। যেখানে আছে সুখেই আছে।"


               ঐ আলোর ছটা, নৈঋতার মধুর হাসি জলপাইগুড়ির অরবিন্দ পল্লীর এক দোতলা বাড়ির ছোট্ট ঘরকেও আলিঙ্গন করল। যেখানে ভালবাসা আজও বেঁচে আছে। নৈঋতা, অশ্বত্থ যেখানেই থাকুক ওরা ভাল থাকবে।


                সন্ধিপুজো শেষ হতেই ঝির ঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। সবিতাদেবীর চোখেও নামল শ্রাবণের ভরা কোটাল।      


               "দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী......

                ..........মহিষাসুরমর্দিনী........"


               কিছু অসমবয়সী প্রেম কুসুমিত হবার পর কালের নিয়মে কেন জানিনা ঝরে যায়। কিন্তু তার রেশ আজীবন থেকে যায়। নৈঋতা, অশ্বত্থ, আর বাকিরা সেই অসম, বন্ধুর পথের কুশীলব।


                                    **************


              সেদিন চাঁচলের মামা অশ্বের সঠিক খবরটা দেয়নি। কাকার বাড়িতেও বিষয়টা চেপে রাখে। কাকিমণি জানত, শুনলে নৈঋতাও ভীষণ কষ্ট পাবে। তাই ওকে কিছু বলা হয়নি।। ও যে আসবে সেটাও ভাবতে পারেনি। তাছাড়া কাকিমণিও অশ্ব আর নৈঋতার মধ্যে নিবিড় সম্পর্কের কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল।

           

             ট্রেনে যেতে যেতে ডায়েরীর অনেকটা পড়ে নৈঋতা অশ্বত্থর মনের অনেক অজানা, না বলা কথায় জানতে পারল। যার কিছুটা অনুভব করেছিল মাত্র। হৃদয় দিয়ে। ভালবাসা দিয়ে।      


                                   *****************

          

               জলপাইগুড়ির স্কুলে কিছু বছর চাকরি করার পর প্রোমোশন পেয়ে প্রধান শিক্ষিকা হয়ে হুগলীর একটা স্কুলে যোগ দেয়। ও চেয়েছিল অশ্বত্থ জীবনে বড় হোক। রোজ ভগবানের কাছে প্রে করত। ভগবান প্রার্থনা শুনেছে। 


            অশ্বত্থ চাকরি পাবার পর ব্যাঙ্গালুরু চলে যায়। তারপর ইউরোপ। ওর সাথে যোগাযোগ একটু ঘোলাটে হতেই নৈঋতাকে একাকীত্ব গ্রাস করে। সেই সময়ই বিদর্ভ আসে জীবনে। অশ্বত্থ বিয়ের খবরটা জানল অনেক পরে।ও দিদিমণির প্রথম বিয়েটা মেনে নিতে পারেনি। হয়ত চায়নি উনি এত তাড়াতাড়ি ঘর বাঁধুক।


               দু দুটো বিয়ে ভেঙ্গে যেতে অশ্বত্থ একটু অবাকই হয়েছিল। বিদেশ থেকে ফেরার পরে অশ্বত্থও একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। অফিসের বসের মেয়ে শ্রীকে বিয়ে করে ফেলে। ততদিনে নৈঋতাও বিদর্ভের সাথে সংসার করছে। যদিও শ্রী বয়সে আট বছরের বড়, তবুও তো একটা সম্পর্ক।


               ভালবাসতে পারেনি শ্রীতমাকে। সব সময় নৈঋতার ছবি মনে ভাসত। জানত দিদিমণির একটা নতুন সংসার হয়েছে। উনি হয়ত আর ফিরে আসবেন না। ওখানেই বাঁধা পড়েছেন। 


               অশ্বত্থের কষ্টও হয়েছিল। বসের মেয়ে বলে শ্রীতমা মাঝে মাঝে অশ্বত্থকে মানসিক নির্যাতনও করত। মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব, নিত্য অশান্তি চলত।মাঝে মাঝে ও ডিপ্রেসনে চলে যেত। সেই কারণেই..

.

                                       *****************


                সেদিন ট্রেনে যেতে যেতে নৈঋতা ডায়েরীর সবটা পড়তে পারেনি। ওর ঘুম চলে এসেছিল। সারাদিনের ক্লান্তিতে। বাড়িতে ফিরে একটু ফ্রেশ হয়ে গভীর রাতে ডায়েরীর বাকি পাতা ওল্টাতেই চমকে উঠেছিল। সারা শরীর বেয়ে নেমে এসেছিল শিহরণ।


                   ডায়েরীর বেশ কিছু পাতাতে অশ্বত্থ দিদিমণির প্রতি তার ভালবাসা উগড়ে দিয়েছে। সেখানে পরিষ্কার আদরের দিদিমণির প্রতি তার চূড়ান্ত দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। সাদা কালো অক্ষরে, পেনের কালিতে তা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বেশ কিছু লাইনে অশ্বত্থ নিজেই স্বীকার করেছে যে, সে নৈঋতাকে ভালবেসে ফেলেছে। তাকে গভীরভাবে কাছে পেতে.......


                ডায়েরীর শেষ দিকের কিছু লাইনে নৈঋতার চোখ আটকে গেল। বেশ কিছু কথা এলোমেলো আর অসংলগ্ন। সেখানে ক্রমশঃ ভয়ের ভাব প্রকট। কিছু কিছু লাইন সুউচ্চ পর্বতের গভীর গিরিখাতের মতন সংকীর্ণ ঢালু হয়ে নেমে গেছে। যা অতীব ভয়ঙ্কর। 


                 নৈঋতার মনে হচ্ছে সে ঐ গভীর গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে যেন তলিয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সে তলিয়েও গেল। ডায়েরীর একেবারে শেষ লাইনগুলো তার আর পড়া হয়ে ওঠে নি। আর কোনদিন হবেও না।


                      "........জাগো দুর্গা.......

                       .......... ..........তুমি জাগো......"


                 মহালয়ার ভোর শুরু হবার আগেই নৈঋতার শোক জর্জরিত বেদনা ক্লিষ্ট শরীরখানি সিলিং থেকে ঝুলে পড়ল ভীষণ ব্যথায় আর অভিমানে। 

                                               ********** 


              সেদিন দুই বাড়ির কথা শুনে নৈঋতা বুঝেছিল অশ্ব আমেরিকাতে আছে। আসলে ও ততদিনে মারা গিয়েছিল। যেটা ওকে কষ্টে কেউ বলেনি। 


              অশ্বত্থ আমেরিকা গিয়েছিল ঠিকই। তবে ও মারা যাবার দেড় বছর আগে। আমেরিকা থেকে ফিরে এসেও শান্তি পায়নি।শ্রীতমা ওর জীবনটা দুর্বিষহ করে তুলেছিল। যার নিদারুণ পরিণতি সুইসাইড।


             মারা যাবার একমাস আগেই সব কিছু লিখে রেখেছিল ডায়েরীর পাতায়। প্রথমদিনের ক্লাস থেকে শুরু করে একটু একটু করে দিদিমণির সান্নিধ্যে আসা, বিপদে আপদে উনার পাশে এসে দাঁড়ানো, নৈঋতার অকৃপণ সাহায্যের হাত বাড়ানো, শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা কোন কিছুই বাদ রাখেনি।


                 ডায়েরীর শেষ দিকের লাইনগুলোতে অশ্ব অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেছে। দিদিমণিকে হারানোর ব্যথায় দ্বগ্ধ হয়েছে তার সবুজ মন। বারে বারে তার লেখার আকুতিতে এটা স্পষ্ট যে সে নৈঋতার কাছে ফিরে আসতে চায়। ওর এই চরম দুর্দিনে নৈঋতার আগের মতন পাশে দাঁড়ানোটা খুব প্রয়োজন।


               সময়ের জোয়ার যত সামনের দিকে এগিয়েছে অশ্বত্থ নিজেকে তত গভীর হতাশার মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে। ডায়েরীতে নিজেকে শেষ করে দেবার কথাও বলা আছে। আর সেটাই শেষ পরিণতি পেয়েছে।


              নৈঋতাও ডায়েরীটা পড়ে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। অশ্বত্থের মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেনি। 


               শেষে চরম দ্বন্দ, হতাশা, একাকীত্বের দাঁড়িপাল্লায় দুলতে দুলতে অশ্বত্থের মত ও ফিরে গেছে না ফেরার দেশে। 


                                     ************


                 নবমীর পুজো এখনও বসেনি। গতকাল সারাদিন উপোসের পর ঘুমিয়ে ছিলেন। কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভাঙ্গল। 


                দরজা খুলেই দেখে দুর্জয় মেয়ে শাল্মলীকে নিয়ে হাজির। নীল শাড়িতে ওকে অসাধারণ লাগছে। নৈঋতা নাকি ছোটতে এই রকমই ছিল। দুর্জয় প্রতিবার বিজয়াতে আসে। এই প্রথম মেয়েকে আনল। তাও আবার নবমীর সকালে। 


           "দিদুন,আমি কদিন তোমার কাছেই থাকব।"

           "মা, আসলে আমি অফিসের কাজে একটু বাইরে যাচ্ছি। শালুর হোস্টেলেও ছুটি পড়েছে। তাই ভাবলাম......."


            সবিতাদেবী দুর্জয়ের কথা ঠিকমত শুনতে পায়নি। শাল্মলীর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। বাকরুদ্ধ। উনার বারান্দাতে সোনামুগ হলদে রোদের জলসা। তার অণু,পারমাণু নাতনির চোখেও।


           নৈঋতা ফিরে এসেছে। সেই সাথে মনে হল মা দশভূজাও আজ উনার ঘর আলো করে বসে আছেন। সবিতাদেবীর চোখে নিষ্পাপ আশ্বিনী শিশিরের স্পন্দন। সব দুঃখ ভুলে মনটা নতুন করে খুশীতে ভরে উঠল। 


            "শঙ্খ শঙ্খ মঙ্গল গানে......

            "জননী এসে দ্বারে........"

             

               

              

            

        

Thursday, October 13, 2022

ছোট গল্প - ভ্রান্তির ভূত || লেখক - তৈমুর খান || Short story - Vrantir vut || Written by Taimur khan


 

ভ্রান্তির ভূত 


    তৈমুর খান



আলো জ্বলা দেখে বাড়ির কাছাকাছি যাচ্ছি আর অমনি মনে হচ্ছে বাড়িটা সরে গেল। আর একটু এগিয়ে গেলে বাড়িটার কাছে পৌঁছাব। এমনি করে করে যতদূর এগিয়ে যাচ্ছি বাড়িটা সরে যাচ্ছে। গ্রামে ঢোকার রাস্তাটা দূর থেকে মনে হচ্ছে: হ্যাঁ আমাদেরই গ্রাম। রাস্তার দু'পাশে তালগাছ, গ্রাম ঢোকার মুখে বিশাল একটি বটগাছ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তেমনই ধারণা। মানিকের সাইকেল ভালো করার সেই আটচালা। বামদিকে কুতুবের চায়ের দোকান। তেমনই তো সব ঠিকঠাক আছে!


     দাদু বললেন: সকালে তো এই রাস্তা দিয়েই এসেছি! আমাদের ভুল হবার কথা নয়! কিন্তু এতটা পথ হেঁটেও এখনো পৌছালাম না কেন?


  আমিতো ভয়ে জড়োসড়ো। দাদুর বাম হাতের একটা আঙুল শক্ত করে ধরে আছি। রাস্তা কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আকাশে ঘন ঘোর মেঘ। আষাঢ় মাস। ব্যাঙের সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকারা একটানা ডেকে যাচ্ছে। মানুষের কোনো সাড়াশব্দ নেই। একটা মালগাড়ি সো সো শব্দে পেরিয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে দাদুকে বললাম: এবার আমরা ঠিক পথেই চলেছি আর ভুল হবে না।


   কিন্তু একটু পথে হেঁটেই বুঝতে পারলাম আমাদের পথটা ভুল। যে আলোটা নিকটেই মনে হচ্ছিল, এখনো সেটা তাই-ই মনে হচ্ছে। ওই যেমন বটগাছ, সাইকেল সারাইয়ের দোকান, চায়ের স্টল সবই মনে হচ্ছে আরও একটু দূরে। আমরা সেদিকেই লক্ষ্য রেখে হেঁটে চলেছি আর সেগুলিও ঠিক তেমন দূরত্বেই অবস্থান করছে।


 আর কতদূর যাব দাদু?


 আর একটু এগিয়ে যাই তারপর দেখি!


     কিন্তু আমাদের যাওয়া যে ফুরোচ্ছে না? সেই রাত দশটায় ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমেছি। বড়জোর আধঘন্টা লাগে আমাদের বাড়ি ফিরতে। ট্রেনটা লেট না করলে আমরা সাড়ে-আটটাতেই নেমে যেতাম। স্টেশন থেকে সোজা পশ্চিম দিকে মাত্র তিন কিমি রাস্তা হাঁটলেই আমাদের গ্রাম। আসার সময় পিসি বারবার বলেছিল আজ থেকে যেতে। আমারও তাই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু দাদু থাকলেন না। জমিতে এখনো ধানের বীজ পড়েনি। কোন্ সময় বৃষ্টিতে সব ভর্তি হয়ে যাবে। তাই তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরে পরের দিন সকালেই মাঠে যাবেন। স্টেশনে নামার সময় কয়েকজন মাত্র প্যাসেঞ্জার তারা এদিক ওদিকে কোথায় চলে গেল। আমি আর দাদু পশ্চিম দিক বরাবর হাঁটতে শুরু করলাম। প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল আমাদের সামনে দিয়ে কেউ এগিয়ে যাচ্ছে। হয়তো সেও আমাদের গ্রামে যাবে। তার সঙ্গ ধরার জন্য দাদু খুব জোরে হাঁটতে লাগলেন। আমি হাঁটতে না পেরে পেছনে পেছনে লাগালাম ছুট। কিন্তু লোকটাকে ধরতে পারলাম না। সে এগিয়েই গেল। তার পেছন পেছন হাঁটতে গিয়ে আমাদের এই দশা। আন্দাজ করছি তখন রাত বারোটা। কতবার আমরা একই রাস্তায় ঘুরে ফিরে বারবার একই জায়গায় পৌঁছচ্ছি। আর কেবলই মনে হচ্ছে আর একটু গেলেই আমাদের গ্রাম।


     অবশেষে আমরা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। আমি বললাম: আর হাঁটতে পারব না দাদু! পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা! চলো আবার স্টেশনে ফিরে যাই। ওই ট্রেন গেল ওই পথ দিয়েই রেললাইনে হেঁটে স্টেশনে যাব। তারপর স্টেশনেই রাতটুকু কাটিয়ে দেব।


  দাদু রাজি হলেন। বললেন: স্টেশন মাস্টার দাসবাবু, আমার খুব পরিচিত। তাকে বলে একটা আলোর ব্যবস্থা করে নেবো।


  রেললাইন মুখি আমরা তখন প্রাণপণে হাঁটছি। কিন্তু কোন্ দিকে যাচ্ছি সেটা ঠিক করতে পারলাম না। কেবলই মনে হল সামনেই রেললাইন। কিন্তু অনেকটা হেঁটেও রেললাইনের নাগাল পেলাম না। কেবল একইভাবে মনে হতে লাগল: এইতো! আর একটু গেলেই পৌঁছে যাব!


     রাত তখন প্রায় দুটো। আবার আমরা হতাশ। কতদূরে স্টেশন? কতদূর রেললাইন? কে উত্তর দেবে? চারিপাশে চেয়ে দেখি শুধু অন্ধকার। সামনে শুধু আলো জ্বলছে। পেছনে, ডাইনে-বাঁয়ে সবদিকেই টিমটিমে আলো। তবে কেউ কি আলো জ্বালিয়ে এখন অপেক্ষা করছে? কাছাকাছি গেলেই মনে হচ্ছে আর একটু দূরে। এভাবে যে রাত কেটে যাচ্ছে। দাদু, কী হবে আমাদের?


     এবার এগিয়েই যাব। একটা গ্রাম তো পাব? যেখানে মানুষ বাস করে। মানুষ থাকলেই সাহায্য পাব।


     দাদুর কথা শুনে আমিও যেতে লাগলাম। দুই পা কাঁটায়-পাথরে ও মাটির ঢেলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। কিছুই বলতে পারছি না। কতক স্থান থেকে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে আঁধারে তা অনুভব করছি। কতক্ষণে বাড়ি পৌঁছাব শুধু একটিই লক্ষ্য।


       যেতে যেতে হঠাৎ একটা বাড়ি চোখে পড়ল। ছোটখাটো একটা কক্ষ। খড় দিয়ে ছাউনি করা। একটামাত্র দরজা। দাদু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচাতে লাগলেন:


 কেউ আছো বাড়িতে? কেউ আছো? কেউ কি আছো?


 কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। ভেতরে অদ্ভুত একটা শব্দ হল। কান্নার শব্দ না হাসির শব্দ কিছুই বোঝা গেল না। দাদু আবার ডাকলেন: কেউ আছো সাড়া দাও! আমরা খুব বিপদে পড়েছি!


    হঠাৎ দরজা খুলে সামনে দাঁড়ালেন দীর্ঘদেহী এক অন্ধকার মানুষ। তার মুখের চেহারা কিছুই বোঝা গেল না। হাতদুটি এত দীর্ঘ যে হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে আছে। শুধু চোখ দুটি আগুনের ভাটার মতো লাল। এ-কি কোনো মানুষের চোখ? হতেই পারে না। দাদুকে জড়িয়ে ধরেছি ভয়ে। দাদু স্থির হয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন: গ্রামে যাব, রাস্তা ভুলে গেছি; আমাদের রাস্তা দেখিয়ে দাও!


 অন্ধকার লোকটি এক অদ্ভুত হাসির শব্দ তুলে বললেন: কোঁন্ রাঁস্তায় যাঁবি? আঁমি দেঁখিয়ে দিঁচ্ছি আঁই!


        অগত্যা তার সঙ্গে-সঙ্গে যেতে হল। না গেলে যদি অন্য বিপদ হয়!


        সে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কিছুতেই তার মাটিতে পা পড়ে না। মনে হচ্ছে যেন বাতাসে ভর করে সে উড়ে উড়ে যাচ্ছে। আমরা তার সঙ্গে অত দ্রুত হাঁটতে পারছি না। তবু দাদু আর একটা কথাও বললেন না। ওর পরিচয়ও জানতে চাইলেন না। সেদিন কতদূর এগিয়ে গেলাম তার হিসাব করতে পারিনি। আমাদের সম্বিৎ ফিরল ভোরের আযান ধ্বনিত হওয়ার পর। তখন দেখি অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে। থেকে থেকে পাখিরা ডাকছে। সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে ব্রহ্মাণী নদী। জলপ্রবাহের কুলুকুলু শব্দ কানে আসছে। স্টেশন থেকে পঞ্চাশ কিমি দূরে এক মাঠের মধ্যে এক প্রাচীন এবং এক নবীন প্রজন্ম ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে বসে পড়েছি। সারারাতের এই পরিভ্রমণ স্বপ্নের মতো মনে হল। আলো আর অন্ধকার এই দুইয়ের ভ্রান্তির শিকার আমরা।