Saturday, March 4, 2023
20,000 টাকা বেতনে পোস্ট অফিসে গ্রুপ সি কর্মী নিয়োগ, যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণী পাশ || Post Office Recruitment 2023 || GDS Recruitment 2023
Friday, March 3, 2023
উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -38
আমার মন মেজাজ যে খারাপ তা কদিন ধরে প্রকাশ পাচ্ছে। তথাপি কাজ কর্ম কোন প্রকারে করতাম। দুপুর বেলায় রামায়ণ পাঠ করতাম মনের সুচীতাকে অটুট রাখার জন্য। অনেকে বলেন, 'পাপীরে কোরো না ঘৃণা, ঘৃণা করো পাপে।'
Tuesday, February 28, 2023
ফেব্রুয়ারি সংখ্যা ২০২৩ || February Sonkha 2023
যে মাতৃভাষার জন্য একসময় আন্দোলন গড়ে তুলতে পিছ পা হন নি, নিজের মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যারা নিজেদের জীবন বলিদান দিতেও পিছপা হয় নি, এই মাতৃভাষার জন্য আজ আমরা নিজের অস্তিত্বকে জানতে পারি, তাই তাদের বলিদান আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলা ভাষা আমার মা, আমার মাতৃভাষাতে আমার অস্তিত্ব নিহিত। তাই আপনাদের পাশে পেতে চাই, আন্দোলিত হোক ছন্দে ছন্দে আপনার লেখনী শক্তির আদলে।
বিদ্রোহী কবি নজরুল - সামসুজ জামান || প্রবন্ধ || নিবন্ধ || Article Writing
বিদ্রোহী কবি নজরুল
সামসুজ জামান
২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একবার একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল জানতে যাওয়া হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? ৩০ দিনের উপর চালানো পরিসংখ্যানে দেখা যায় শ্রোতাদের মনোনীত শ্রেষ্ঠ কুড়িজন বাঙালির তালিকায় তৃতীয় স্থানে এসেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। মানবতার কবি এবং অসাম্প্রদায়িক কবি হিসেবে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
নজরুল ইসলামের জন্ম পশ্চিমবাংলার সংযুক্ত বর্ধমান জেলার আসানসোলের কাছে চুরুলিয়া গ্রামে। বাংলা হিসেবে ১৩০৬ সালের ১১ই জ্যৈষ্ঠ , মঙ্গলবার আর ইংরেজি ২৪ শে মে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে। বাবার নাম কাজী ফকির আহমেদ এবং মায়ের নাম জাহিদা খাতুন। বাবা ফকির আহমদ স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম এবং একটি মাজারের খাদেম ছিলেন। খুবই দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই নজরুলের প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ হয়েছিল মাদ্রাসায়। কষ্টের হাত ধরে জন্ম বলে তাঁর ডাক নাম ছিল দুখু মিয়াঁ। আর খুব ছোটবেলায় বাবার মৃত্যু হয় বলে ছোটবেলা থেকেই অর্থের রোজগারের ব্যবস্থা তাকে করতে হয়েছে। তাই বেশি পড়াশোনা সম্ভব হয়নি। জীবিকার কারণে চায়ের দোকানে রুটির কারখানায় বা কারো বাড়ির খানসামা হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল তাঁকে। তবে নিজের লেখনী শক্তি থাকায় গ্রামবাংলায় ঘুরতে থাকা নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কবিতা, নাটক, লেটোগান রচয়িতা করে তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলেন।
একেবারে তরুণ বয়সে নজরুল যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের আকাঙ্ক্ষা তাঁর ভিতরে ছিল তাই তিনি ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে করাচিতে গিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে স্বাধীন করা। সশস্ত্র আন্দোলন হবে এবং তার মধ্যে দিয়ে ভারতকে স্বাধীন করতে হবে এটাই ছিল তাঁর মনের ভাবনা। সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সৈনিক হয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সৈনিকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেনাবাহিনী থেকে ফেরার পর সাংবাদিকতা কে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। এই সময় ‘ধুমকেতু-’র মত পত্রিকা জনসমাজে খুব সাড়া জাগিয়েছিল। তার “বিদ্রোহী” কবিতা তাঁকে অমর করে রেখেছে। 'ভাঙার গান' ইত্যাদি রচনা একেবারে মানুষকে উত্তাল করে দিয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে সাহিত্য রচনা করা নজরুলের জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে ছিল। তিনি কখনো এই সাম্প্রদায়িকতাকে মেনে নেন নি। তার গানের ভাষা – “হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন / কান্ডারী বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার” – অপূর্ব সুন্দর ভাবনার পরিচায়ক। তিনি অন্য কবিতায় বলেছেন- “জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত- জালিয়াত খেলছো জুয়া”। আসলে তিনি ছিলেন মানবতার কবি। তাই জাত ধর্মের বন্ধনে তাঁকে কেউ কখনো বন্দী করে রাখতে পারেনি।
নজরুল তাঁর দেশপ্রেমমূলক লেখা লিখে ইংরেজ রাজশক্তির বিষ নজরে পড়েছিলেন। যখন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী ছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ নজরুলের লেখায় উদ্বুদ্ধ হয়ে “বসন্ত” গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করে শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় কে জোড়াসাঁকো ডেকে পাঠিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – “জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল, তাই আমার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ওকেই উৎসর্গ করেছি”। তাঁর আরও বক্তব্য ছিল – “তাকে বোলো আমি নিজের হাতে তাকে দিতে পারলাম না ব’লে সে যেন দুঃখ না করে। আমি তাকে সমগ্র অন্তর দিয়ে অকন্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বোলো কবিতা লেখা যেন কোন কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জাগাবার কবিও তো চাই”।
ইংরেজরা তো নানাভাবেই ভারতীয়দের, বিশেষ করে নজরুলের মত লেখনি ধারণ করে যারা দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলছে তাদেরকে নানাভাবেই ঘৃণা করতেন। কিন্তু শুনলে আশ্চর্য হবার কথা সেদিন জেলখানার ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডার অবাক হয়েছিলেন যে – “টেগোর ওই ‘প্রিজনার’-কে বই ডেডিকেট করেছেন”!! আর তারপর নজরুল সেই কথা শুনে “বসন্ত” বইখানা তুলে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে, বুকে চেপে ধরেছিলেন আনন্দে, বিস্ময়ে, উত্তেজনায়! তিনি আসলে আজন্ম প্রতিবাদী তাই জেলখানায় বন্দী থাকা অবস্থায় বিভিন্নভাবে রাজবন্দীদের উপর অকথ্য অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়ে নজরুল অনশন শুরু করেছিলেন। জেলের বাইরে সে খবর ছড়িয়ে পড়লে সমস্ত মানুষ উত্তেজিত হয়েছিল প্রচন্ড পরিমাণে। রবীন্দ্রনাথ বিচলিত হয়ে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে তাঁকে অনশন তুলে নিতে বলেছিলেন। শরৎচন্দ্র উত্তেজিত হয়ে নজরুলের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অনুমতি পান নি। আর নজরুলের বন্ধু-বান্ধব বহু কবি-সাহিত্যিক সাধারণ মানুষ সকলেই নানাভাবে নজরুলের সমব্যথী হয়েছিলেন। অনশনে মরার মত হয়ে নেতিয়ে পড়েছিল শরীর তা সত্ত্বেও তিনি জেদ ধরে বসে ছিলেন- তিনি খাবেন না। এরপর ৩৯ দিনে অনশন ভঙ্গ করানো হয় অনেক চেষ্টা চরিত্র করে। এভাবেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা নজরুলের একেবার মনোধর্মের মধ্যেই ছিল।
আমাদের দুর্ভাগ্য নজরুল সুস্থ অবস্থায় মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যিক, শিল্পী-জীবন পেয়েছিলেন। যার মধ্যে ৫০০ রচনা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। এখানে ছিল ২৮৫ টি কবিতা, ১৫৭ টি গান, ৪৩ টি প্রবন্ধ ও ভাষণ, ১৪ টি গল্প, তিনটি ধারাবাহিক উপন্যাস। সুস্থ অবস্থায় নজরুলের প্রকাশিত গ্রন্থ ৪৯ টি। অসুস্থতার পরে তাঁর রচনাবলীর মধ্যে ৯৭৪ টি গান, ৬৫৩ টি কবিতা, ৭৬ টি প্রবন্ধ, ১৮ টি গল্প, ৯টি নাটক-নাটিকা, তিনটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন বই, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদিতে প্রকাশিত রচনা হিসেব করলে গান পাওয়া যাবে আড়াই হাজারেরও বেশি, কবিতা ৬৮টি-র বেশি, প্রবন্ধ আলোচনা একশোটির ও বেশি, গল্প ১৮ টি, নাটক গীতি বিচিত্রা ইত্যাদি মিলিয়ে ২৫ টি আর উপন্যাস ৩ টি। এর বাইরে নজরুলের কত লেখা যে এখানে ওখানে বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে আছে তার হিসেব পাওয়া মুশকিল।
আমাদের দেশ বিভাগের পর নানাভাবে নজরুলকে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে চিরস্থায়ীভাবে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু মন থেকে তিনি সেদিকে সাড়া দেন নি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এবং আমাদের পক্ষে এটা খুব লজ্জ্বার কথা যে নজরুল যখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন তখন আমাদের দেশের পক্ষ থেকে খুব উল্লেখযোগ্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে নজরুলের চিকিৎসার সুব্যবস্থার কথা ভেবে বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে এই কবিকে বাংলাদেশের নেবার অনুমতি চেয়ে নেয়। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ শে মে বাংলাদেশ বিমানে কবিকে সপরিবারে ঢাকা আনা হয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের একুশে পদকে ভূষিত করেন এবং তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। কিন্তু সে দেশেই তিনি ১৯৭৬ খ্রীষ্টাব্দের ২৯ শে অগাস্ট সকাল দশটা দশ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যথাযোগ্য ভাবেই বলেছিলেন – “তাঁর সক্রিয় জীবনে কবি যা লিখেছেন তা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রেখেছে। তাঁর মৃত্যু ভারত ও বাংলাদেশকে রিক্ত করে দিয়েছে”। তাঁর স্বভাব ছিল সহজ, সরল। হৈ হৈ করে সকলকে নিয়ে আনন্দ-হাসি-গানের মধ্যে দিয়ে তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। শুধুমাত্র কবি হিসেবে তাঁকে ধরে রাখা যায় না, তিনি বিখ্যাত গীতিকার, সুরকার, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, গল্পকার হিসেবেই সব সময় কাজের মধ্যে মানুষকে নিয়ে বেঁচে থাকতে এবং মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। একেবারে ছোট থেকে এত রকমের অভাব-অনটন, দুঃখ-দারিদ্র্য, ঝড়-ঝঞ্ঝা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে নজরুল কাটিয়েছেন যে তাঁর কবি-সাহিত্যিক হিসেবে এত বড় হওয়া অনেকের কাছেই খুব আশ্চর্যের বিষয় বলে মনে হয়। যত রকমের প্রতিকূল পরিবেশ অর্থাৎ বাধাবিঘ্ন তাঁকে চেপে ধরেছে, তিনি যেন ভিতর থেকে শক্তি সঞ্চয় করে তত বেশি উচ্ছল হয়ে মানুষের মাঝে তাঁর সাহিত্য, গান, কবিতাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। জেলখানায় বন্দি থেকেও নজরুলকে বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন রচনা থেকে দূরে সরানো যায় নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি নজরুলকে ‘ছন্দ সরস্বতীর বরপুত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আজও ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মত লেখনি দিয়ে তিনি নিজে সবার কাছে “বিদ্রোহী কবি” হিসেবে বেঁচে আছেন। কবির মৃত্যুর পর বাংলাদেশে এই কবিকে সমাধিস্ত করা হলেও পরে তাঁর সমাধিস্থলের মাটি নিজের জন্মভূমি চুরুলিয়া তে এনে কবি পত্নী প্রমিলা ইসলামের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। চুরুলিয়ার সেই পবিত্র মাটিতে সেই সমাধির পাশে দাড়ালে আজও আমরা যেন শুনতে পাই তিনি বলছেন- “ মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু- মুসলমান/ মুসলিম তার নয়নমণি হিন্দু তাহার প্রাণ” কিংবা “রক্ত ঝরাতে পারিনা তো একা/ তাই লিখে যাই এ রক্তলেখা”। মনে হয় তিনি যেন বলছেন তার চিরস্মরণীয় বাণী – “বিদ্রোহী রণক্লান্ত / আমি সেইদিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না.........”!!!
মিথ্যে কথার শিল্পী - সৌরভ মুখার্জী || প্রবন্ধ || নিবন্ধ || Article Writing
মিথ্যে কথার শিল্পী
সৌরভ মুখার্জী
আইফেল টাওয়ার কিনবেন? সস্তায় বিক্রি আছে!
বিশ্বাস হল না তো? না হওয়ারই কথা, কারণ আমি ভিক্টর লাস্টিগ নই। ভিক্টর লাস্টিগ এই কথাটাকেই এমনভাবে বলতেন যে আপনারা বিশ্বাস করতে বাধ্য হতেন। তিনি ছিলেন মিথ্যে কথার শিল্পী, যিনি জালিয়াতিকে আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
আর হ্যাঁ, লোকজনকে টুপি পরিয়ে সত্যি সত্যিই তিনি ফ্রান্সের জাতীয় সম্পদ আইফেল টাওয়ারকে বেচে দিয়েছিলেন। তাও, একবার নয়, দু-দু'বার।
ভিক্টর লাস্টিগের (Victor Lustig) জন্ম হাঙ্গেরিতে। জীবনকাহিনী বিশদে বলছি না। তবে পড়াশোনায় তিনি ছিলেন তুখোড় আর স্কুলে অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছাত্র হিসেবে নাম করেছিলেন। পড়াশোনা প্যারিসে। বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষায় চৌকস। সঙ্গে বেশভূষা আদবকায়দা সবেতেই চোখে পড়ার মত স্মার্ট। এগুলো সবই তাঁর জালিয়াতি শিল্পের অঙ্গ। উনিশ বছর বয়স থেকে জুয়া খেলায় জোচ্চুরি করে হাত পাকান। তারপর ফ্রান্স থেকে নিউ-ইয়র্ক যাওয়ার (ট্রান্স-আটলান্টিক লাইনার্স) জাহাজকে তাঁর শিল্পের প্রথম ক্যানভাস বানিয়ে নেন।
ফ্রান্স থেকে আটলান্টিক পেরিয়ে এই জাহাজে যাতায়াত করত মূলতঃ উচ্চবিত্ত ফরাসি ও আমেরিকানরা। লাস্টিগ তাদের টার্গেট করতেন না। উচ্চবিত্তদের মধ্যেও একেবারে টপক্লাস বড়লোকেরা ছিল লাস্টিগের শিকার। তারা প্রায় মাসখানেকের ক্রূজ ভ্রমণে ধীরে ধীরে লাস্টিগের সঙ্গে পরিচিত হত। লাস্টিগও নিজেকে ওইরকমই এক টপক্লাস বড়লোক বলে পরিচয় দিতেন। বলতেন, তিনি হচ্ছেন একজন খ্যাতনামা সঙ্গীত পরিচালক। ব্রডওয়ে প্রোডাকশনের মালিক। এই নামে আদৌ কোনো কোম্পানির অস্তিত্বই ছিল না। টপক্লাস বড়োলোকেরা ভাবতেন বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি? তখন ইন্টারনেটও ছিল না, আর একমাসের জার্নিতে জাহাজে ভাসতে ভাসতে লাস্টিগের কথা যাচাই করার কোনো উপায়ও ছিল না। কেউ আবার অজ্ঞতা ঢাকতে বলেই দিত, ওহো, আপনিই তবে ব্রডওয়ের মালিক? কি সৌভাগ্য, নাইস টু মিট ইউ।
মিট যতই নাইস হত, লাস্টিগ ততই ফেনিয়ে ফেনিয়ে তাঁর কোম্পানির সুখ্যাতি করে যেতেন। বলতেন, ব্রডওয়েতে ইনভেস্ট করার জন্য বড় বড় আমেরিকান ব্যবসায়ীরা তো মুখিয়ে আছে। প্রফিট ই প্রফিট! কিন্তু আমি চাই যারা একটু শিল্প-টিল্প বোঝে এমন ইনভেস্টর আমার কোম্পানিতে টাকা ঢালুক। এই ধরুন আপনার মত। এইভাবে চাগাতে চাগাতে এক্সট্রিম পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে লাস্টিগ বলতেন, যাকগে! জাহাজ পোর্টে ভিড়লেই তো ইনভেস্টররা ছেঁকে ধরবে। তার আগে একটু রেস্ট নিয়ে নিই।
চাগা বড়লোকেরা ভাবনা-চিন্তা বন্ধ করে দৌড়ে গিয়ে কেবিন থেকে চেকবই এনে বলতেন, অ্যামাউন্টটা বলুন জাস্ট। কত ইনভেস্ট করতে পারি? লাস্টিগ তাও ইতস্তত করে বলতেন, এত বড় অংকের টাকা কি আপনি ইনভেস্ট করতে পারবেন? থাক, এখন কম করেই দিন। ধরুন এই হাজার দুয়েক ডলার। চাগা বড়লোক ব্যবসায়ী হইহই করে উঠতেন, বলেন কি মশাই, দু'হাজারে কীই বা হয়? আপনি এই পাঁচহাজারের চেকটা রাখুন। প্রফিট তো হবেই, ব্রডওয়ে বলে কথা!
আগেই বলেছি এই ব্রডওয়ে প্রোডাকশনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আর জাহাজ পোর্টে আসার সঙ্গে সঙ্গে লাস্টিগ চেক নিয়ে হাওয়া। টাকা তুলে আবার ফিরতি জাহাজে চেপে বসতেন। নতুন শিকারের অপেক্ষায়। সেই চাগা ব্যবসায়ী আমেরিকা পৌঁছনোর কিছুদিন পর লাস্টিগের স্বরূপ বুঝতে পেরে মাথার চুল ছিঁড়তে আরম্ভ করতেন। ঘটনাটা যেহেতু ফ্রান্স ও আমেরিকার মাঝে হত, তাই দুদেশের পুলিশ একে অন্যের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকত। মাঝ থেকে ভিক্টর লাস্টিগ তাঁর ব্যবসা চালিয়ে যেতেন।
ব্যবসা ভালই চলছিল, বাধ সাধলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ট্রান্স আটলান্টিক লাইনার্স তাদের জাহাজ পরিষেবাই বন্ধ করে দিল। লাস্টিগ তখন জালিয়াতির অন্য ধান্ধায় প্যারিসে এসে থিতু হলেন।
১৯২৫ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ করে ফ্রান্স তখন অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকছে। এদিকে কয়েক বছর আগে ওয়ার্ল্ড ফেয়ারের দোহাই দিয়ে ঘটা করে আইফেল টাওয়ার বানানো তো হয়ে গেছে, এখন তাকে মেন্টেন করতে কালঘাম ছুটছে সরকারের। ওই লোহার দৈত্যকে রঙ করতেও যে বিপুল খরচ হয়, প্যারিস সিটি কাউন্সিলের কাছে সে এক বিশাল অংক। শুরুতে প্ল্যান ছিল আইফেল টাওয়ারকে জং থেকে বাঁচাতে প্রতি সাত বছর অন্তর অন্তর রঙ করতেই হবে। কিন্তু অর্থাভাবে রঙ না করায় আইফেল সেই জৌলুশ হারাতে লাগল। প্যারিসের জনগণ আর বিরোধী রাজনৈতিক দল উঠেপড়ে সরকারের পেছনে লাগল, কই হে! অত আড়ম্বর করে লোহার দৈত্য বানিয়ে তাকে কি এখন না খেতে দিয়ে মারবে?
এইসব নিয়ে বেশ কিছু লেখালেখি হল প্যারিসের সংবাদপত্রে। লাস্টিগের তা চোখে পড়ল, মনেও ধরল। তখন তিনি আইফেল টাওয়ারকেই বানিয়ে নিলেন নিজের জালিয়াতি শিল্পের সবচেয়ে বড় ক্যানভাস।
জালিয়াতির প্রস্তুতি হিসাবে লাস্টিগ সরকারি স্ট্যাম্প পেপার, লেটারহেড, সিলমোহর সবকিছু নকল করলেন। তারপর প্যারিসের ভীষণ দামি একটি হোটেলে স্যুইট বুক করে এক গোপন মিটিং ডাকলেন। মিটিংয়ে আহ্বান করলেন ফ্রান্সের কিছু লোহা ব্যবসায়ীকে। নিজেকে ডাক ও টেলিগ্রাফ মন্ত্রকের ডেপুটি ডিরেক্টর হিসাবে পরিচয় দিলেন। লাস্টিগ দুঃখের সঙ্গে বললেন যে আইফেল টাওয়ারের রক্ষণাবেক্ষণ ফরাসি সরকারের পক্ষে খুব বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তাই সরকার এটিকে ভেঙ্গে লোহার দরে বিক্রি করে দেওয়ার প্ল্যান করছে। কিন্তু এই চুক্তি জনসাধারণের মধ্যে ভীষণ অসন্তোষ ডেকে আনতে পারে বলে সরকার গোপনে কাজটা সেরে ফেলতে চাইছে। বিস্তারিত বিবরণ বাইরে কোথাও প্রকাশ করা যাবে না। এই লোহার বিশাল দৈত্যকে কে ভাঙা লোহার দরে কিনবে তা ঠিক করার জন্যেই সরকার তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে। সৎ লোহা ব্যবসায়ী হিসাবে খ্যাতির কারণে লাস্টিগ তাঁদের নাম নির্বাচন করেছেন। তাঁর কথাবার্তা, আদবকায়দা, বিশেষ করে কাগজপত্রের নিখুঁত নকলের ফলে মিটিংয়ে উপস্থিত একজনও ভাবতে পারেনি লাস্টিগ একজন ঠগ। বরং তারাও লাস্টিগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলল, ভেঙে ফেলাই উচিত। প্যারিসের অন্যান্য দুর্দান্ত গথিক সৌধগুলোর সঙ্গে আইফেল এক্কেবারে বেমানান। মাঠের মধ্যে দাঁড় করানো এক পেল্লাই লোহার টাওয়ার, না আছে ছিরি, না আছে ছাঁদ!
ব্যবসায়ীদের দলের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল কে আইফেল টাওয়ার ভাঙা লোহার দরে কিনবে। সকলে দরপত্র জমা দিল। সবটাই খুব গোপনে। কিছুদিন পর তাদের মধ্যে আঁদ্রে পোইসন (André Poisson) নামের এক উঠতি ব্যবসায়ী আলাদা করে লাস্টিগের সঙ্গে দেখা করল। বলল, স্যার, সরকারি কাজ। টেন্ডারটা প্লিজ পাইয়ে দিন। দরকারে আপনাকে যদি আলাদা করে কিছু দিতে হয় সে নাহয় আমি দেব।
লাস্টিগ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কী? আমার মত একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীকে ঘুষ দিতে চাইছেন?
পোইসন থতমত খেয়ে বলল, ইয়ে, না স্যার। চটবেন না। বলতে চাইছি আপনি কত বড় পদে অধিষ্ঠিত, অথচ সরকারি নিয়মের গেরোয় তেমন বিলাসী জীবন যাপন করতে পারেন না! দেখে বড্ড খারাপ লাগে স্যার।
লাস্টিগ ধপ করে চেয়ারে বসে বললেন, সে তো বটেই, কপাল! শেষমেশ প্রারম্ভিক দাম বারো লক্ষ আর ঘুষ হিসাবে আরো সত্তর হাজার ফ্রাঙ্কে (সব মিলিয়ে আজকের দিনে প্রায় এক কোটি দশ লক্ষ ভারতীয় টাকা) রফা হল। পোইসন ভাবলেন,জলের দরে আইফেল টাওয়ার কিনে নিয়েছি! লাস্টিগ বললেন, এই টাকার পাকা বিলটা ঠিক দু'দিন পর অফিস থেকে নিয়ে নেবেন। আর হ্যাঁ, ব্যাপারটা কিন্তু খুবই গোপনীয়।
পোইসন কান এঁটো করে হেসে বলল, সে আর বলতে স্যার? বউকেও বলব না। এই আপনি আর আমি, ব্যস।
পোইসন নগদ টাকা লাস্টিগের হাতে তুলে দিল। লাস্টিগও নকল সরকারি রশিদ লিখে দিলেন।
দুদিনের মধ্যে পোইসন মিস্ত্রি-মজুর আর লোহা কাটার বিশাল বিশাল যন্ত্রপাতি নিয়ে আইফেলের মাঠে উপস্থিত। শুধু পাকা বিলটা পেলেই হয়। সরকারি অফিসে গিয়ে খুব গোপনে তাদেরকে বিশদে বলার পর তারা তো আকাশ থেকে পড়ল। তারা বলল, আইফেল ভাঙা তো দূরের কথা একটু চটা উঠিয়ে দেখুন কি অবস্থা করি আপনার! পোইসন বুঝল সে ভীষণভাবে ঠকে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ছুটল সেই হোটেলে যেখানে লাস্টিগ ছিলেন। হোটেল জানালো তিনি তো দুদিন আগেই চেক-আউট করে চলে গেছেন।
লাস্টিগ তখন ফ্রান্সের সীমানা পেরিয়ে জন্মভূমি অস্ট্রিয়ায় গা-ঢাকা দিয়েছেন।
লাস্টিগ জানতেন পোইসন সব ধরে ফেললেও নিজের মান আর ব্যবসা বাঁচাতে পুলিশের কাছে যাবে না। ফরাসি লোকেদের ইগো মারাত্মক। জনগণ যখন জানতে পারবে পোইসন কত বড় ধোঁকা খেয়েছে, তারা তো তাকে নিয়ে মশকরা করবে। লাস্টিগের ধারণাই সঠিক ছিল। ফ্রান্সের কোনো সংবাদপত্রে এই খবর বেরোল না। লাস্টিগ তক্কে তক্কে ছিলেন, ব্যাপারটা থিতিয়ে যেতেই আবার সন্তর্পণে ফ্রান্সে ফিরে আসেন। তারপর আবারও একই পন্থায় আরেকদল ব্যবসায়ীর কাছে আইফেল বিক্রির কাজ শুরু করেন।
দ্বিতীয়বারে আর সবকিছু প্ল্যানমাফিক হল না। এবার হাতেনাতে ধরা পড়ে গেলেন ফরাসি পুলিশের হাতে। কিন্তু লাস্টিগকে ধরা অত সহজও ছিল না। তিনি ফরাসি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে আসেন আমেরিকায়।
আমেরিকায় আগে থেকেই তিনি মোস্ট ওয়ান্টেড, কাজেই রিস্ক না নিয়ে এবার তিনি ছোটোখাটো জালিয়াতিতে মন দেন। তিনি টম শ' নামে এক খ্যাতনামা রসায়নবিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জাল ডলার বানাতে আরম্ভ করেন।
এবারেও সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু গন্ডগোল পাকালো লাস্টিগের প্রেমিকা বিলি। জালিয়াতিতে পার্টনার হলেও রসায়নবিদের স্ত্রীর প্রতি লাস্টিগ একটু আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। আর তাতেই বেজায় চটে গিয়ে বিলি পুলিশে ফোন করে সব ফাঁস করে দিল। লাস্টিগ জীবনে অজস্র মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, কিন্তু যাকে তিনি নিজে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন সেই বিলি শেষ পর্যন্ত তাঁকে পুলিশে ধরিয়ে দিল।
দেখতে দেখতে ভিক্টর লাস্টিগের সমস্ত জালিয়াতি প্রমাণ সমেত ধরা পড়ে যায়। শুরু হয় বিচারের জন্য অপেক্ষা। কিন্তু বিচারের ঠিক দু'দিন আগে অসুস্থতার ভাণ করে নিউ ইয়র্কের সুরক্ষিত জেল থেকেও পালিয়ে যান। কিন্তু এবার আর শেষরক্ষা হল না। একমাসের মধ্যেই আবার ধরা পড়লেন এবং বিচারে তাঁর কুড়ি বছরের জেল হল। তখন তাঁর বয়স মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর।
জেলে থাকাকালীন নিজেই তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি বলে গেছেন। তাঁর মতে, ধৈর্য্যশীল শ্রোতা হতে হবে। মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্মবিশ্বাস এসব নিয়ে মতভেদে যেতে নেই। সবেতেই তালে তাল মেলাতে হবে আর অপেক্ষা করতে হবে কখন উল্টোদিকের মানুষটা আপনাকে বিশ্বাস করে তার গোপন কথাগুলো নিজে থেকেই বলতে শুরু করে। ক্যালিফোর্নিয়ার আলকাট্রাজ দ্বীপে নির্বাসিত থাকাকালীন বারো বছরের মাথায় জেলেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁকে বলা হয় বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধোঁকাবাজ!
সবই তো শুনলেন। এবার থেকে বাড়িতে ফেরিওয়ালা ভাঙা লোহার জিনিস কিনতে এলে তাঁকে যখন ভাঙা বালতি কি কলের মাথা বেচবেন, দেখবেন তো একটু হলেও নিজেকে ভিক্টর লাস্টিগ মনে হচ্ছে কিনা?
তথ্যসূত্র :
https://en.wikipedia.org/wiki/Victor_Lustig
https://www.toureiffel.paris/en
https://www.mirror.co.uk/news/world-news/super-scammer-who-sold-eiffel-24706498
https://www.smithsonianmag.com/history/man-who-sold-eiffel-tower-twice-180958370/
https://bonjourparis.com/history/how-a-con-man-sold-the-eiffel-tower/
https://www.britannica.com/topic/Eiffel-Tower-Paris-France
কোরিয়ান কবিতার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা - শংকর ব্রহ্ম || প্রবন্ধ || নিবন্ধ || Article Writing
কোরিয়ান কবিতার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা
Photography - Sikha Sengupta
ছবি পরিচিতি
1,2 নং বর্ধমান নবাবহাটের 108টি শিবমন্দির
3, 4,5 নং দরিয়াপুর ডোকরা গ্রামে ডোকরা শিল্প
5 নং গুসকরার কাছেই ওরগ্রাম ফরেষ্ট
6 নং দরিয়াপুর ডোকরা গ্রামে আমাদের মহিলাদের টিম।
(যদিও এটি মেয়েদের একদিনের বেড়ানোর কাহিনী, এর মধ্যে আমরা গিয়েছিলাম হস্তশিল্পের ডোকরা গ্রাম দরিয়াপুরে।)
মহিলাদের একদিনের শীতকালীন ভ্রমণে ডোকরার হস্তশিল্প গ্রাম দরিয়াপুরে যাওয়া।
__________
অনেক দিনের পরিকল্পনা শেষে আমাদের 50 জনের মহিলাদের গ্রুপ, গত 19শে ডিসেম্বর 2021 একদিনের জন্যে সংসারের দায়দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম দু'টো ট্রাভেলার গাড়িতে গ্রামের মুক্ত বাতাস নিতে। আমরা যাব বর্ধমানের নবাবহাটের 108 শিবমন্দির, দরিয়াপুরের ডোকরা শিল্পগ্রাম ও গুসকরার কাছে ওড়গ্রাম ফরেষ্ট। গড়িয়া, এসপ্লানেড শ্যামবাজার হয়ে গাড়িদুটি চিড়িয়া মোড় এলে আমরা ক'জন চটপট উঠে পড়লাম, এরপর দক্ষিনেশ্বর বালিঘাট থেকে মেয়েরা উঠে 50 জন পুর্ন হতেই গাড়ি হাইওয়ে দিয়ে হু হু করে ছুটতে লাগল। শীতে জানালার কাঁচ নামিয়ে দিয়ে আরামদায়ক গাড়িতে চলল মেয়েদের হাসি গল্প গান। সবার টিফিন ভাগ করে খাওয়া হল।ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে এসে গেল বর্ধমানের নবাবহাট। হাইওয়ের পাশেই একশো আটটি শিবমন্দির। বেশ ঠান্ডা হাওয়া বইছিল, আমরা শাল জড়িয়ে রাস্তার ওপারে ঝুপড়ি দোকানে মাটির খুরিতে দুধ চা খেয়ে এলাম। বেশ ভালো কোয়ালিটির স্বাদু চা। গাড়িতে চপ্পল রেখে,গেটের মুখে টেবিল পেতে বসা ভদ্রলোকের দেওয়া স্যনিটাইজার হাতে মেখে, মোজা পায়ে আমরা শান বাঁধানো 108 শিবমন্দির চত্বর পরিক্রমা করতে লাগলাম। প্রত্যেকটি মন্দিরে শিবলিঙ্গ আছে। কোন কোন মন্দিরে ধুপধুনা কাসর ঘন্টা সহযোগে পুজা হচ্ছে।আমাদের কিছু মহিলা পুজো দিলেন। বেশ অনেকটা জায়গা, গাছপালা গোলাপ বাগান, পুকুর নিয়ে বিস্তৃত এলাকা।চার পাশ দিয়ে 108 টি শিবমন্দির ঘিরে রয়েছে।এখানে খোদিত একটা ফলক থেকে জানা গেল 1788 সালে বর্ধমান রাজপরিবারের মহারানী বিষণকুমারী দ্বারা এই মন্দির স্থাপিত হয়েছিল। বাংলার টেরাকোটা মন্দিরের আদলে তৈরি এই একশো আটটি শিবমন্দির যেন লকেটসহ একশো আটটি রুদ্রাক্ষ দিয়ে তৈরি মালা।1965 সালে আবার এটিকে ভালোভাবে সংস্কার করা হয়। হালকা মিঠে সকালের রোদে এত নানারঙের গোলাপ বাগান,শিবমন্দির পরিক্রমা একটা সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে।
আমাদের ট্রাভেলার হাইওয়েতে গিয়ে স্পীড নিল।অল্প সময় পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম দরিয়াপুর ডোকরা শিল্প গ্রামে। ঢুকতেই বিশাল গেটের একপাশে পিতলের প্রমান মাপের ডোকরা শ্রমিক পরিবার,স্বামী,স্ত্রী বাচ্চা কোলে। অপর গেটে ডোকরার নানা কারুকার্য করা। ঢুকে ডানদিকে বেশ বড় তিনটি ব্রোঞ্জের মুর্তি। পাশের পাঁচিলে পিতলের ডোকরা সপরিবারে দুর্গামায়ের অসুর নিধন খোদাই করা।এমনকি
অন্যান্য পাঁচিলেও বিভিন্ন পিতলের ডোকরা শিল্পের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। ডান পাশে খড়ের ছাউনির নীচে বড় লম্বা জ্বলন্ত উনুনের মধ্যে থেকে শিল্পী মহিলা পুরুষেরা চিমটার সাহায্যে তপ্ত লাল ধাতব পদার্থ বের করে অন্য একটি লোহার দন্ডের দ্বারা নানারকম আকার দিচ্ছে,দেখে চমৎকৃত হতে হয়। ঢুকেই ঘাসজমির মাঠ, তার মাঝে উচুঁ গোল সিমেন্ট বাঁধানো বসার জায়গা। চারদিকে চারটি প্রমান মাপের ডোকরা মানব মুর্তির স্তম্ভ ছাদ ধরে রেখেছে। এবার গেলাম সামনের বিল্ডিং এর নীচে বড় হলে। সেখানে মেঝেতে শিল্পী মহিলারা তাদের ডোকরা শিল্পদ্রব্য নিয়ে বসেছেন বিক্রির জন্য।সাধারন পোষাকের ঘরোয়া এই মহিলাদের হাতের কাজ দেখলে অবাক হতে হয়। ধাতুকে আগুনে গলিয়ে অপূর্ব শিল্পসুষমামন্ডিত নিখুঁত রূপ দিয়েছেন। বলা হয় উড়িষ্যার এক আদিবাসী গোষ্ঠী এখানে বসত করে তাদের এই ডোকরা শিল্পধারা বজায় রেখেছেন। এখানে যে মহিলা শিল্পীরা বিক্রি করছেন, তারা বাঙালি, সবার পদবী কর্মকার।কত রকমের যে শিল্পদ্রব্য দেখলাম,পেঁচা,গণেশ,শ্রমিক দম্পতি, হারের লকেট,দুর্গাপ্রতিমা,গরুর গাড়ি ইত্যাদি অনেক রকম। কয়েকটি পালিশ করা শিল্প নিদর্শন একেবারে সোনার মত দেখাচ্ছে।আমরা সবাই কিছু কিছু জিনিস কিনলাম।তারা অনেক কষ্ট করেই এই শিল্পধারা ধরে রেখেছেন। এই গ্রামে আমাদের মত ট্যুরিষ্টরা যা কেনেন এবং বিভিন্ন হস্তশিল্প মেলায় বিক্রি করেই যে আয় হয় তাতে তাদের নিজেদের মোটামুটি চলে যায়।
এখান থেকে কয়েক কিমি দুরে গুসকরার কাছে ওড়গ্রাম বনভুমির মধ্যে একমাত্র রিসর্টে আমরা দুপুর দুটোর সময় পৌঁছলাম লাঞ্চের জন্যে। একতলার বড় হলে বড় বড় টেবিল ঘিরে আমরা পঞ্চাশ জন একবারে বসে পড়লাম।আগে থেকে বলা ছিল তাই তারাও গরম ভাত,শুক্তো,সবজি দিয়ে মুগ ডাল, গরম বেগুনি,পাবদা মাছ,মাটন,চাটনি, পাঁপড়,নলেন গুড়ের রসগোল্লা পরিবেশন করলেন। খেয়ে দেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে আমরা সামনের লনে বিকেলের মিঠে রোদে বিশ্রাম নিলাম।ড্রাইভার ভাই দুজনের খাওয়া হয়ে গেলে বাসে করে বনের কাঁচা মাটির পথে বনভুমি দেখতে দেখতে চললাম। বনের মধ্যে সুর্য্য অস্ত যাচ্ছে। পাহাড়, সাগরের সুর্যাস্ত থেকে এ এক স্বতন্ত্র মায়ামোহময় দর্শন।কাঁচা মাটির সংকীর্ণ পথে বাস আর যাবে না। শুনেছিলাম বন শেষ হলে একটি পরিত্যক্ত এরোড্রম আছে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এখানে বিমান ওঠানামা করত।স্থানীয় লোকেদের জিজ্ঞাসা করতে বললো,"ওই হোথা,বন শেষ হলি চাতাল।" তা চাতালই বটে!পুরোন ইট সুরকির বাঁধানো অনেকটা প্রশস্ত জায়গা,দু'পাশে ফসল কেটে নেবার পর বিশাল মাঠ দিগন্তে মিশেছে। ড্রাইভাররা এসে তাড়া দিল। সন্ধ্যা নেমে আসছে।এই বিশাল অরন্য প্রান্তরে অন্ধকারে পথ হারালে সমূহ বিপদ। তাড়াতাড়ি আমরা সবাই বাসে উঠে বসলাম। এবার ফিরতে হবে। 'মন চল নিজ নিকেতনে'। বাস হাইওয়ে এসে স্পীড নিল। শক্তিগড়ে একবার থামলো।আমরা বাড়ির জন্যে ল্যাংচা ও ছানাপোড়া মিষ্টি কিনলাম।রাত্রি পৌনে ন'টা থেকে যার যার স্টপে নামা শুরু হল। বাড়ি ফিরে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সবার খোঁজ নেওয়া হল। রাত্রি দশটার মধ্যেই সবাই নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছে গেছে।এইভাবে শেষ হল আমাদের পঞ্চাশ জনের মহিলাদলের সফল একদিনের আনন্দময় ভ্রমণ।
_____________










