Monday, August 16, 2021

Photography by Amlan Lahiri

 


Photography by Arpan Chowdhury



 

Photography by Somnath Ghosh



 

Photography by Amit pal




 

Poet ‎Sunanda Mandal's one English poem

 Unhappy 

                 


The stone of pride 

Has accumulated in the chest. 

Long years have passed 

The wait is over. 


Night comes 

Pride leads to depth 

At least you would be relieved 

Life is a dream come true. 


In this life his hopes are in vain 

One sky difference between the two. 

You are on the verge of death, 

I am dying.

Poet Soumendra Dutta Bhowmick's one English poems

 UNMANLY APPETITE



Unbelievable frenzy roused hunger in front of

                                 An unknown nubile beauty.

No ban on such agitation,

No feeling for becoming guilty

Put any required caution.

Enchanting the internal sphere vigorously

All snakes of all types began to envenom,

No want of food, cloth or shelter

Now prepared that intruder of awful eyes

To reign brutally in the mind.

Sole appetite for bloody soft flesh

Made him cruel and also blind.


 

That way of special effects

That way of unfurnished sets

Turned him nothing but a weakest child!

কথাসাহিত্যিক সুদীপ ঘোষাল -এর উপন্যাস (পঞ্চম পর্ব)

   ইউরেকা ইউরেনাস




বারান্দায় তিনি ছিলেন। তখন তোতন বলল, ঠিক আছে আসুন ভদ্রলোককে তোতন বললেন, কী অসুবিধা?তোতন ভদ্রলোককে অনেক্ষণ আটকে রেখে তার গ্রাম এবং পরিবেশ সম্পর্কে জেনে নিল। ভদ্রলোক বললেন, আমার নাম নাটুবাবু। এই নামেই সকলে চেনে। 


 লোকগুলো আমাদের ওখানে একটা ভূতের উপদ্রবের গুজবে ভয় পাচ্ছে। লোকজন খুব ভয় পাচ্ছে। এটা তো আমি মানি না,কোনও মতেই। তাই আপনার সাহায্য নিতে চাই সুমন্ত বাবু আর আপনি গেলে এই রহস্যের সমাধান নিশ্চয়ই হবে তোতনন খুব উৎসাহিত হয়ে সুমন্তবাবুকে বললেন এবং ডাকলেন। তিনি এলেন। তিনি আরো বললেন ঠিক আছে আমরা যাব আগামীকাল। সন্ধ্যার মধ্যেই আমরা আপনার বাড়ি পৌঁছে যাব। আপনি ঠিকানা আর এখানে সবকিছু আপনার পরিচিতি দিয়ে যান। সুমন্তবাবু ও তোতন পরের বিকেলে ট্রেনে চাপলেন। কলকাতা থেক দূরে এক অজ পাড়াগাঁয়ে তাদের যেতে হবে। তোতন বলছে সুমন্তবাবুকে আমি গ্রামের ছেলে। ট্রেনে যেতাম স্কুলে। তারপর পায়ে হাঁটা।তোতন বলে চলেছে তার কথা, ট্রেনে যাওয়া আসা করার সময় কিছু লোক দেখতাম ট্রেনের মেঝেতে বসে থাকতেন স্বছন্দে।তাদের মত আমারও সিটে না বসে মেঝেতে বসার ইচ্ছে হতো।কিন্তু পারতাম না লোকলজ্জার ভয়ে।কি সুন্দর ওরা মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে ঘুগনি খায়।ট্রেনে হরেক রকম খাবার বিক্রি হয়।ওরা দেখতাম টুকটাক মুখ চালিয়ে যেতো।আমি জিভে জল নিয়ে বসে থাকতাম ভদ্র বাবুদের সিটে।তারা হাসতেন না।অপ্রয়োজনে কিছু খেতেন না বা কোনো কথা বলতেন না। ওদের মাঝে গোমড়া মুখে বসে মুখে দুর্গন্ধ হতো।তারপর গানের এৃক বিকেলে আমি বেপরোয়া হয়ে ট্রেনের মেঝেতে ওদের মাঝে বসলাম। লুঙ্গি পরা লোকটা গায়ে মাটির গন্ধ।বেশ হাল্কা হয়ে গেলো মনটা। লোকটা বললো,ভালো করে বসেন। কত আন্তরিক তার ব্যবহার।তারপর ট্রেনের খাবার খেতে শুরু করলাম।প্রথমেই ঝালমুড়ি।পাশের লোকটাও ঝালমুড়ি কিনলেন।খেতে লাগলাম মজা করে। তারপর এলো ঘুগনি,পেয়ারা,গজা,পাঁপড়,লজেন্স ও আরও কত কি। মনে হলো এ যেন কোনো ভোজবাড়ি।খাওয়ার শেষ নাই।যত পারো খাও। মেঝেতে বসার অনেক সুবিধা আছে।আমাদের দেশে গরীবের সংখ্যা বেশি।তাই গরীব লোকের বন্ধুও হয় অনেক।পথেঘাটে ওরা পরস্পরকে চিনে নেয় চোখের পানে চেয়ে।তাই ওদের মাঝে গরীবের দলে নাম লিখিয়ে আমি ভালো থাকি,জ্যোৎস্নায় ভিজি...


সুমন্তবাবু বললেন, তোর এই গুণের জন্যই তোকে ভালবাসি। তোতন বলল,হাওড়া থেকে কাটোয়া। তারপর শিবলুন স্টেশন থেকে টৌটো তে আধঘণ্টা যেতে হবে। কিংবা বড় বাস স্টপেজে নেমে ঢালাই রাস্তা ধরে নবগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিস পেরিয়ে, সর্দার পাড়া পেরিয়ে চলে এলাম ভট্টাচার্য পাড়ায়।পুরোনো মন্দির আর মসজিদ,গির্জা আমার মন টানে। কালের প্রবাহে সেগুলো অক্ষত না থাকলেও পুরোনো শ্যাওলা ধরা কোনো নির্মাণ দেখলেই আমি তার প্রেমে পড়ে যাই।অমরবাবু ছিলেন ষষ্টি তলায়। তিনি মা মঙ্গল চন্ডীর মন্দিরে নিয়ে গেলেন আমাকে।নবগ্রাম অজয় নদীর ধারে অবস্থিত। সবুজে ঘেরা এই গ্রাম।  


সুমন্তবাবু জানেন তোতন যার কাছে নিয়ে যায় তার সব খবর জেনে নেয়। তার যোগ্য সহায়ক। নাটুবাবু সময়মত টোটো নিয়ে এসে ওদের গ্রামে নিয়ে এলেন। পরেরদিন সকালে ভ্রমণবিলাসি সুমন্তবাবু বললেন, আপনার এলাকায় আজ শুধু ঘুরব। চলুন আপনি আমাদের সব চিনিয়ে দেবেন পায়ে হেঁটে। নাটুবাবু বলতে শুরু করলেন কবি এবং গাইডের মত গ্রামের পরিচয়। ইনি ভট্টাচার্য পাড়ার রঘুনাথ ব্যানার্জী। তিনি বললেন,মা মঙ্গল চন্ডীর মন্দির অতি প্রাচীন।মায়ের পুজোর পালা পাড়ার সকলের একমাস করে পড়ে।মা দুর্গার পুজোর পালা তিন বছর পর এক একটি পরিবারের দায়ীত্বে আসে।সকলে মিলে পাড়ার পুজো চালায় বছরের পর বছর।হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বাজারে পাড়ায়।এখানে,ঘোষ,পাল,মুখার্জী পরিবারের বাস। মুখার্জী পাড়ার ধ্রুবনারায়ণ বললেন,আগে মুখুজ্জে পুকুরের পাড়ে শিবপুজো হতো।মন্দির প্রায় দুশো বছরেরে পুরোনো হওয়ায় ভেঙ্গে পড়েছিলো।কৃষিকাজের সময় জল না হলে আমাদের বাবা, কাকারা শিবলিঙ্গ বাঁধ দিয়ে জলে ডুবিয়ে দিতেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ হতো ও বৃষ্টি হতো।মানুষের বিশ্বাসে সবকিছু।



নাটুবাবু বললেন, তারপর গোস্বামী পাড়ায় এলাম। সেখানে বদরী নারায়ণ গোস্বামীর সঙ্গে দেখা করি চলুন।


বদরীবাবু বললেন,আমরা নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বংশধর। মেয়ের বংশধর,দৌহিত্র বুঝলেন।আমার কাছে বংশলতিকা আছে। আমি বললাম,বলুন, আমি শুনি।তিনি শুরু করলেন,গঙ্গামাতা, তার স্বামী ছিলেন মাধব চট্টোপাধ্যায়, তার ভিটে এটা।তারপর প্রেমানন্দ,অনন্তহরি,পীতাম্বর,গৌরচন্দ্র,লালমোহন,শ্যামসুন্দর,নিকুঞ্জবিহারী,রামরঞ্জন, বংশগোপাল, বদরীনারায়ণ,বিনোদগোপাল।তারপর তিনি মন্দিরের গাত্রে লেখা বংশলতিকা দেখালেন।আমি ছবি তুলে নিলাম।পড়া যাবে নিশ্চয়।

রাধা মাধবের মন্দিরে বারোমাস কানাই, বলাই থাকেন।অগ্রহায়ণ মাসে এই মন্দিরে রাধামাধব আসেন।তখন সারা গ্রামের লোক প্রসাদ পান।



তোতন বলছেন, আমার মনে হচ্ছে এ যেন আমার জন্মস্থান। আমার গ্রাম। স্বপ্নের সুন্দর গ্রামের রাস্তা বাস থেকে নেমেই লাল মোড়াম দিয়ে শুরু ।দুদিকে বড় বড় ইউক্যালিপ্টাস রাস্তায় পরম আদরে ছায়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে । কত রকমের পাখি স্বাগত জানাচ্ছে পথিককে । রাস্তা পারাপারে ব্যস্ত বেজি , শেয়াল আরও অনেক রকমের জীবজন্তু।.চেনা আত্মীয় র মতো অতিথির কাছাকাছি তাদের আনাগোনা । হাঁটতে হাঁটতে এসে যাবে কদতলার মাঠ। তারপর গোকুল পুকুরের জমি, চাঁপপুকুর, সর্দার পাড়া,বেনেপুকুর । ক্রমশ চলে আসবে নতুন পুকুর, ডেঙাপাড়া ,পুজোবাড়ি, দরজা ঘাট, কালী তলা । এখানেই আমার চোদ্দপুরুষের ভিটে । তারপর ষষ্টিতলা ,মঙ্গল চন্ডীর উঠোন , দুর্গা তলার নাটমন্দির । এদিকে গোপালের মন্দির, মহেন্দ্র বিদ্যাপীঠ, তামালের দোকান, সুব্রতর দোকান পেরিয়ে ষষ্ঠী গোরে, রাধা মাধবতলা । গোস্বামী বাড়ি পেরিয়ে মন্ডপতলা । এই মন্ডপতলায় ছোটোবেলায় গাজনের সময় রাক্ষস দেখে ভয় পেয়েছিলাম । সেইসব হারিয়ে যাওয়া রাক্ষস আর ফিরে আসবে না ।কেঁয়াপুকুর,কেষ্টপুকুরের পাড় । তারপর বাজারে পাড়া ,শিব তলা,পেরিয়ে নাপিত পাড়া । এখন নাপিত পাড়াগুলো সেলুনে চলে গেছে । সাতন জেঠু দুপায়ের ফাঁকে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরতেন মাথা ,তারপর চুল বাটি ছাঁটে ফাঁকা । কত আদর আর আব্দারে ভরা থাকতো চুল কাটার বেলা ।এখন সব কিছুই যান্ত্রিক । মাঝে মাঝে কিছু কমবয়সী ছেলেমেয়েকে রোবোট মনে হয় । মুখে হাসি নেই । বেশ জেঠু জেঠু ভাব ।সর্বশেষে বড়পুকুর পেরিয়ে পাকা রাস্তা ধরে ভুলকুড়ি । আর মন্ডপতলার পর রাস্তা চলে গেছে খাঁ পাড়া , কাঁদরের ধার ধরে রায়পাড়া । সেখানেও আছে চন্ডীমন্ডপতলা , কলা বা গান, দুর্গা তলার নাটমন্দির সব কিছুই । পুজোবাড়িতে গোলা পায়রা দেখতে গেলে হাততালি দিই ।শয়ে শয়ে দেশি পায়রার দল উড়ে এসে উৎসব লাগিয়ে দেয়। পুরোনো দিনের বাড়িগুলি এই গ্রামের প্রাণ 


   


সুমন্তবাবু বললেন, বাংলার সব গ্রামের রূপ এক। আমরা একতার সূত্রে বাঁধা। 


নাটুবাবু বললেন, তারপর চলে এলাম গ্রামের মন্ডপতলায়। এই গ্রামে আমার জন্ম। লেখিকা সুজাতা ব্যানার্জী এই গ্রামের কন্যা।তার দাদু ছিলেন ডাঃ বিজয় বাবু।এখনও এই বাড়িগুলো গ্রামের সম্পদ।ডানদিকের রাস্তা ধরে হাঁটলেই খাঁ পাড়া। গ্রামের মাঝে গোপাল ঠাকুরের মন্দির,কৃষ্ঞ মন্দির। তারপরেই রক্ষাকালীতলা। কত ধর্মপ্রাণ মানুষের বাস এই গ্রামে। গোপাল মন্দিরের পুজো হয় বাড়ুজ্জে পাড়ায়।গ্রামের গাছ, পাথর,আমার গান আমার প্রাণ।


            এবার নাটুবাবু টোটো ডাকলেন। সেখান থেকে অম্বলগ্রাম পাশে রেখে দু কিলোমিটার টোটো রিক্সায় এই গ্রাম। একদম অজ পাড়াগাঁ। মাটির রাস্তা ধরে বাবলার বন পেরিয়ে স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করতে হবে।তন্ময়বাবু গবেষক।এন জি ও সসংস্থার প্রধান কারিগর বনের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন। তার জগৎ।পশু,প্রাণীদের উন্মুক্ত অঞ্চল।বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে, সেখানে।মা কালীর মূর্তি আছে। কাঁচের ঘরে ইকো সিষ্টেমের জগৎ।কেউটে সাপ, ব্যাঙ থেকে শুরু করে নানারকমের পতঙ্গ যা একটা গ্রামের জমিতে থাকে। বিরাট এক ক্যামেরায় ছবি তুলছেন তন্ময় হয়ে।আমি ঘুরে দেখলাম প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে বানানো রিসর্ট।ওপেন টয়লেট কাম বাথরুম।পাশেই ঈশানী নদী।এই নদীপথে একান্ন সতীপীঠের অন্যতম সতীপীঠ অট্টহাসে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে চায় এন জি ও, নৌকায়। তন্ময়বাবু হাতে সাপ ধরে দেখালেন। শিয়াল,বেজি,সাপ,ভ্যাম আছে। তাছাড়া পাখির প্রজাতি শ খানেক।একটা পুকুর আছে। তার তলায় তৈরি হচ্ছে গ্রন্হাগার।শীতকালে বহু বিদেশী পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। তন্ময়বাবু বললেন,স্নেক বাইটের কথা ভেবে সমস্ত ব্যবস্থা এখানে করা আছে। ঔষধপত্র সবসময় মজুত থাকে।বর্ষাকালে ঈশানী নদী কিশোরী হয়ে উঠেছে।এই নদীকে মাঝখানে রেখে বেলুনের চাষিরা চাষ করছেন আনন্দে।এখানকার চাষিরা জৈব সার ব্যবহার করেন। কোনো রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেন না। এক চাষি বললেন,আমরা সকলে একত্রে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জৈব সার প্রয়োগ করেই আমরা চাষ করবো।তাতে বন্ধু পোকারা মরবে না। ফলনও হয় বেশি। এক এন জি ও সংস্থার পরামর্শে তাদের এই সঠিক সিদ্ধান্ত অন্য চাষিদের অনুকরণযোগ্য।এই এন জি ও সংস্থার যুবকরা গ্রামের ভিতর কুকুরদের নির্বিজকরণ কাজে লেগেছে।একটা লম্বা লাঠির ডগায় সূচ বেঁধে তাতে ওষুধভরে চলছে কাজ।কোনো প্রাণী আহত হলে তার সেবাশুশ্রূষা করেন যুবকবৃন্দ।সাপ ধরতে জানেন এই যুবকবৃন্দ।কোনো গ্রামে কোনো সাপ দেখা গেলে এই যুবকেরা সেটি ধরে নিয়ে এসে তাদের সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেন।এখনও এই যুবকবৃন্দ কাজ করে চলেছেন মানুষ ও প্রাণীজগতকে ভালোবেসে।বর্ষাকালে প্রচুর বিষধর সাপের আনাগোনা এই অঞ্চলে।এখানে পা দিলেই সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন এখানকার কর্মিবৃন্দ।ঘুরে দেখার জন্য গামবুট দেওয়া হয় পর্যটকদের। প্রচুর দেশি বিদেশি গাছ গাছালিতে ভরা এই প্রাঙ্গন। একটি কৃত্রিম জলাধার আছে।তার নিচে লাইব্রেরী রুম তৈরির কাজ চলছে।ওপরে জল নিচে ঘর। কিছুটা তৈরি হয়েছে। শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখি এসে হাজির হয়। সেই পাখিদের নিয়েও চলে গবেষণা। তাদের জন্য সব রকমের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।আর একটি জলাধারে বিভিন্ন ধরণের মাছ রাখা হয়। পা ডুবিয়ে জলে দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ের চামড়ার মৃত কোষ খায় এইসব বিদেশি মাছেরা। ওপেন বাথরুমে ঈশানীর জল উপলব্ধ।এই রিসর্টগুলিতে সর্বসুখের ব্যবস্থা আছে।শীতকালে অনেক বিদেশি পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। রাতে থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থাও খুব সুন্দর।বেলুন গ্রামে ঢুকতে গেলে বাবলার বন পেরিয়ে মাটির আদরে হেঁটে যেতে হবে। এখন অবশ্য শিবলুন হল্ট থেকে নেমে বেলুন যাওয়ার পাকা রাস্তা হয়েছে।টোটো,মোটর ভ্যান চলে এই রাস্তা ধরে।চারিদিকে সবুজ ধানক্ষেতে হারিয়ে যায় মন এক অদ্ভূত অনাবিল আনন্দে।বেলুন ইকো ভিলেজ কাটোয়া মহুকুমার গর্ব।



আবার ফিরে এলেন পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত কাটোয়া মহুৃুকুমার পুরুলিয়া গ্রামে অবস্থিত মহেন্দ্র বিদ্যাপীঠ স্কুলে প্রায় চার শতাধিক ছাত্রছাত্রী পড়াশুনা করে। এই স্কুল গৃহটির পূর্ব মালিক ছিলেন মহেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পুত্র শ্রী অতুলবাবু এই গৃহটি পিতার নামে দান করেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে।তারপর শুরু হয় কয়েকজন ছাত্র ছাত্রী নিয়ে পড়াশোনা। আজ সেই বিদ্যালয় পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ করতে চলেছে।এবারে মাধ্যমিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক বিপুল পাল। সে পেয়েছে মোট ৬৪৬নম্বর।বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে পুরস্কৃত করেছে স্বাধীনতা দিবসের দিনে। এক অখ্যাত গ্রামে এই বিদ্যালয় অবস্থিত হলেও এখানে পঠন পাঠন হয় খুব সুন্দরভাবে। প্রত্যেক শিক্ষক ও শিক্ষিকা মহাশয়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রত্যেকবার মাধ্যমিকে ভালো ফল হয়। স্কুল বিল্ডিং অনেক পুরোনো। নবসাজে সজ্জিত হওয়ার প্রয়োজন আছে।কন্যাশ্রী ক্লাব,কম্পিউটার রুম, মেয়েদের ক্যারাটে প্রশিক্ষণ,পিরামিড গঠন প্রভৃতি অনেক কিছুই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে শেখানো হয়। নানারকম অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা প্রভাত ফেরি করে।নাচগান, কবিতা আবৃত্তি ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তারা। কন্যাশ্রী ক্লাব মেম্বারের মেয়েরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বাল্য বিবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করে। মেয়েদের কোনো শারীরীক সমস্যা হলে বাড়িতে সাইকেলে চাপিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসে।এখন এই বিদ্যালয়ে নিয়মিত মিড ডে মিল খাওয়ানো হয় ঠিফিনে।আয়রন ট্যাবলেট ও স্যানিটারি ন্যাপকিন বিলি করা হয় নিয়মিত। প্রধান শিক্ষক মহাশয় শ্রী ভক্তি ভূষণ পাল। কম্পিউটার শিক্ষক শ্রী মেঘনাদ সাঁই মহাশয় ছাত্র ছাত্রীদের অতি যত্ন সহকারে পঞ্চম শ্রেণী থেকে কম্পিউটারে দক্ষ করে তোলেন। এই গ্রামে এ এক অতি পাওয়া বরের মত। যে বরে, ছাত্র ছাত্রীরা আধুনিকতার আলোয় আলোময় হয়ে ওঠে।খেলার দিদিমণি মৌ মজুমদার মহাশয়া ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে হিউম্যান পিরামিড,ক্লাপিং ডান্স,হিল পিরামিড প্রভৃতি অভ্যাস করান। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এগুলির প্রদর্শন করানো হয়। সকল শিক্ষক,শিক্ষিকা মহাশয়ের সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে স্কুলের সুন্দর পরিবেশ।শ্রী রাজীব নন্দী মহাশয় ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ উৎসব পালন করলেন মহা সমারোহে।এছাড়া শ্রী বিশ্বরঞ্জন রানো,সুবীর কুমার ঘোষ,শারদশ্রী মন্ডল,সুবীর ঘোষ,শমীক ব্রষ্মচারী,মৌসুমী বিশ্বাস,মৌমিতা বৈরাগ্য, দেবযানী বিশ্বাস,সুদীপ ঘোষাল নীরবে নিভৃতে কাজ করে চলেছেন স্কুলের স্বার্থে।অনিমা পাল,সম্পদ ভাই,নন্দিতাদি নন টিচিং স্টাফের মধ্যে আছেন। বিভাসদা ও আছেন। তারা সকলেই স্কুলের স্বার্থে কাজ করেন।স্বাধীনতা দিবসে ছাত্র ছাত্রীরা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন পিরামিড প্রদর্শন করলো।তাদের পিরামিড খুব সুন্দর দর্শনীয় এক ব্যালান্সের খেলা।স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যারা জড়িয়ে ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগ ঁহেমন্ত ঘোষাল,ঁশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,অলোকময় বন্দ্যোপাধ্যায়,শ্রী বিজয় চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন ঁধ্রুবনারায়ণ চট্ট্যোপাধ্যায়।অন্যান্য শিক্ষক মহাশয়রা ছিলেন কাশীনাথ ঘোষ,পন্ডিত মহাশয়,হরেরামবাবু,সত্যনারায়ণববু,নারায়ণবাবু,অধীরবাবু

,চন্ডীবাবু দীপকবাবু,সুকুমারবাবু,মৌসুমী ভট্টাচার্য্য মহাশয়া,কাকলি ম্যাডাম প্রমুখ।সিদ্ধেশ্বরবাবু, গীতা থান্দার,বৃন্দাবনবাবু ছিলেন অশিক্ষক কর্মচারীবৃন্দ।স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির আজীবন সদস্য হলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শ্রী প্রকাশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়।ঠিক সাড়ে দশটায় স্কুলের প্রার্থনা সভা শুরু হয়। ছাত্রছাত্রীরা এই সভায় নিয়মিত পিটির মাধ্যমে একটু শরীরচর্চা করে। তারপর, জনগণ মন অধিনয়ক,এই জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। তারপর যথারীতী ক্লাস শুরু হয়। ক্লাস প্রত্যেকদিন একদম শুরু থেকে শেষ অবধি হয়। সুবীর ঘোষ মহাশয়ের নিজস্ব উদ্যোগে স্কুলের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় থাকে।শ্রী বিশ্বরঞ্জন রানো মহাশয়ের অবদান অপরিসীম। এক কথায় তা প্রকাশ করা অসম্ভব।পুরুলিয়া গ্রামের আমাদের এই স্কুলটি গৌরবের শ্রেষ্ঠ চূড়ায় পৌঁছবে এই আশা রাখেন অভিভাবকবৃন্দ।


সুমন্তবাবু নাটুবাবুকে অনেক ধন্যবাদ জানালেন। তারপর রাতের খাবার খেয়ে শোওয়ার ঘরে গেলেন। 

এবার তোতন বললেন, আপনার সমস্যার কথা বলুন।


নাটুবাবু বলতে শুরু করলেন, পাড়ার এক ছেলে, নাম তার মদন।মদনের মাথা ঠিক ছিল না সে পাগল ছিল কিন্তু বাড়িতেই থাকতো তাকে পাগলা গারদে যায়নি তার মা আর ছেলে থাকে আর কেউ নেই যার সংসার একদিন কি হলো ওই পাগল ছেলে একটা লাঠি নিয়ে মায়ের মাথায় মেরে দিল একবার জোরে ঘা। তখন রাত্রিবেলা কেউ কোথাও নেই আর মা তখন নিজেই পড়ে ছটফট করছে মাকে নিয়ে আমরা চারজন গেলাম হাসপাতালে সেখানে ভর্তি থাকলে দুদিন তারপরে মারা গেল। মারা যাওয়ার পর যেহেতু মার্ডার কেস এজন্য পোস্টমর্টেম হল। পোস্টমর্টেম হওয়ার পর থেকে লাশ বের করার কেউ নেই সবাই চলে গেছে যে যার নিজের জায়গায় আমি আর আমার পিসির ছেলে ছিলাম দুজনে বের করলাম বের করে কোন রকমে ভ্যানে চাপিয়ে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল। শ্মশানে গিয়ে একটা পুরোহিত ডেকে তার পিন্ডি দান করে একদম করতে নিতে দুটো বেজে গেল।রাত দুটো তাওবা অমাবস্যার রাত্রি এবার ফিরতে হবে একটা ছোট নদী পার দিয়ে ছোট নদী গুলোকে আমরা গ্রামে বলি কদর এই কাদোরে পারে বোন আছে বনে থাকে সাপ বেজি শেয়াল এইসব ছোট ছোট প্রাণী তার পাশ দিয়ে আমাদের লন্ঠন নিয়ে যেতে হবে । পিসির বাড়ি আগে তাই পিসির ছেলে চলে গেল বাড়ি আমাকে একটা লন্ঠন ধরিয়ে দিল বললো তুমি চলে যাও এখানে সাবধানে যাবে আর পারলে আমাদের বাড়িতে থাকতে পারো কিন্তু আমি থাকতে পারলাম না কারণ বাড়িতে বলে আসা হয়নি মা হতে চিন্তা করবে তার লন্ঠন হাতে নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। কান ধরে ধরে যেতে যেতে গা ছমছম করছে ভয় ভয় লাগছে কিন্তু কিছু করার নেই যেতেই হবে রাত আড়াইটা হয়ে গেল এখনও পারে কেউ নেই হঠাৎ দেখা গেল দূরে সাদা ঘুম থেকে একজন দাঁড়িয়ে আছে এবং আমাকে ডাকছে।কোন আওয়াজ নাই শুধু ইশারায় হাত দেখিয়ে ডাকছে আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম এই রাত্রিবেলা এখানে সাদা কাপড় পড়ে মেয়েদের সাজেকে দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চয়ই ভয় দেখাবে উদ্দেশ্যে।কিন্তু যখন কাছে গেলাম তখন দেখলাম না এটা ভয় দেখানো নয় সে হঠাত উঠে গেল একটা গাছের উপরে গাছের উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি সে হি হি করে হাসছে আবার লাভ মেরে জলে পড়লে বলল ঝাপাং করে। ঝপাং করে জলে পড়ে হাতে একটা সাদা মাছ নিয়ে উঠে পড়ল গাছে যে কর্ম করে কাঁচা মাছ দিয়ে খেতে লাগলো আমার খুব ভয় পেয়ে গেলাম আমি আমি সঙ্গে সঙ্গে লন্ঠন নিয়ে আস্তে আস্তে এগোতে লাগলাম যখন লাগলাম তখন সেই সাদা কাপড় ওয়ালা বলল কিনে খুব ভয় পেয়েছিস মনে হচ্ছে বাড়ি যেতে পারবি তো।


আমিওখুব ভয় পেয়ে গেলাম ঠকঠক করে কাঁপছি তখন পাঠাও মাটিতে থাকছে না কোন রকমে টেনে চলতে চলতে অনেক দূর আসার পর হঠাৎ একজন বলল কি গো কোথায় যাচ্ছ ।


মানুষের গলার আওয়াজ পেয়ে আমার একটু সাহস হলো আমি বললাম তুমি কে বলছো আমি ভোলা আমাকে চিনতে পারছ না অন্ধকারে আমি তোমার মুখ দেখতে পাইনি জানো এই বটগাছে কাদের ধরে একটা বুড়ি মাছ খেতে লাগল কাকা বলল ওই গাছের পেত্নী থাকে তুমি খুব জোর বেঁচে গিয়েছে ওই গাছের তলা দিয়ে রাত্রিবেলায় টানে বাঁচেনা চলো তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।


আমি বললাম এত রাতে তুমি কাঁদোর ধরে কি করছিলে ভোলা বলল আমরা তো গরিব মানুষ বাড়িতে পায়খানা বাথরুম কিছু নাই এই তাই মানে কাঁদর ধারে বসে কম্ম সারি। তাই রাত দুপুরে উঠে এখানে এসেছি বট গাছের কাছে ভুলেও যাই। না আমরা।


ভোলা বলল তা তোমার এত রাত হল কেন আমি তখন সবিস্তারে আমার ঘটনা বললাম যে শ্মশান থেকে ফিরছিল।

 শ্মশান থেকে ফিরছ তাহলে এখনো গঙ্গা চান করো নাই।

  আমি বললাম না গঙ্গা চান করা হয়নি বাড়িতে গিয়ে স্নান করে পরিষ্কার হয়ে গেছে তারপর ঢুকবো। 


 আমি ভাবলাম মানুষের বিশ্বাস মানুষের কাছেই থাক হয়তো তাই মানুষের বিশ্বাসে আঘাত দেওয়া যায় না। কিন্তু আমি ওসব বিশ্বাস করিনা আজকে অন্তত বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু নিজের চোখে দেখার পর আর আমার কিছু বলার থাকল না। সেই মেছো বাড়ি এসেও জ্বালাচ্ছে।

তোতন বললেন, আমরা আজই রাতে ধরব ব্যাটাকে।


নাটুবাবু বললেন ভয়ে ভয়ে আছি খুব।

সুমন্তবাবু বললেন, যখন ভয়ের অনুভূতি প্রথম টের পাচ্ছেন, মনে হচ্ছে বুক ধড়ফড় বেড়ে গেছে, অস্থির লাগছে, বমি বমি ভাব হচ্ছে, মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে, দেরি না করে দ্রুত ব্রিদিং রিলাক্সেশন করুন। নাক দিয়ে ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন, বুকের ভেতর সমস্ত খালি জায়গা বাতাসে ভরে ফেলুন, দমটা অল্পক্ষণ আটকে রাখুন, তারপর মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এভাবে পর পর তিনবার করুন।ভূতের ভয় থেকে বেড়িয়ে আসতে ভূত এবং ভয় নিয়ে চিন্তা করা বন্ধ করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, সত্যি ভূত বলে কিছু রয়েছে কি না? 


তোতন বললেন, না কি আপনি অজানা কোনো কারণে ভয় পাচ্ছেন? আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ কখনো ভূত দেখেছে কি না? ক্ষতি হলে তার কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে? উত্তরগুলো খুঁজে নিয়ে ভাবুন আদৌ ভয় পাওয়ার কোনো কারণ রয়েছে কি না।সিনেমায় ভূত, আত্মা এই বিষয়গুলোকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়। ভয়ের সিনেমা, নাটক আমাদের মধ্যে ভূত ও আত্মা সম্পর্কে ভয় তৈরির সাহায্য করে। তাই যদি এ ধরনের সিনেমা, নাটক দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন তবে এই ধরনের নাটক, সিনেমা, গল্পের বই এড়িয়ে চলুনভয়কে জয় করতে ভয়ের বিষয়টি সরাসরি মোকাবিলা করতে হয়। আপনি হয়তো ভূতের ভয়ে রাতে একা থাকতে ভয় পান, ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখেন- এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে রাতে একা থাকা শুরু করুন। ভাবুন, পৃথিবীতে কত মানুষ একা থাকে। ভূত তাদের আক্রমণ না করলে আপনাকে করবে কেন? আপনার সঙ্গে তো ভূতের বিশেষ কোনো শত্রুতা নেই। প্রথমে আলো জ্বালিয়ে একা ঘরে থাকার অভ্যাস করুন। প্রথমে কষ্ট হবে তারপরও চেষ্টা করুন। প্রথমদিন পারলে নিজেকে নিজে ধন্যবাদ দিন, ছোট পুরস্কার দিন। এভাবে একা থাকায় অভ্যস্ত হলে একা ঘরে আলো নিভিয়ে থাকার পদক্ষেপ নিন। এভাবে ধীরে ধীরে ভয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন।ভয় থেকে মনটাকে অন্য দিকে সরিয়ে দিতে গান শোনা, টিভি দেখা, গল্পের বই পড়ার মতো নিজের ভালোলাগার কাজগুলো করুন। জানালার দিকে তাকালে ভয় হলে জানালা খুলে রাখুন। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরে দেখুন। জানালার দিকে চোখ পড়লে চোখ বন্ধ না করে তাকান। কিন্তু বার বার তাকিয়ে কিছু রয়েছে কি না সেটি চেক করা থেকে বিরত থাকুন।নিজেকে বলুন যতবার শব্দ শুনে বা আওয়াজে ভয় পেয়েছি, বা বাইরে যা দেখেছি তাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছি।ভূত নিয়ে নানা আশঙ্কার কথা মনে হলে ভাবুন যা ভাবছেন তা যদি সত্যি হয় তবে কি হবে? সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে? এমন হবার আশঙ্কা কতটুকু?যখন ভয় পাচ্ছেন তখন যা ভেবে ভয় পাচ্ছেন তা কাগজে লিখে ফেলুন, লেখা শেষে কাগজ কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলুন বা পুড়িয়ে ফেলুন।ভাবুন ভূত বা আত্মা আপনার মতোই। তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কোনো প্রমাণ নেই যে ভূত কারো কখনো ক্ষতি করেছে।অনেক সময় ছোটবেলা থেকে ভূত সম্পর্কে শোনা গল্প আমাদের মনে ভূত সম্পর্কে একটি ভয়ঙ্কর ছবি তৈরি করে। এতে আমাদের মাঝে ভয় তৈরি হয়। অনেক সময় বড় হওয়ার পরও তা থেকে যায়। তাই বাচ্চাদের সঙ্গে এ ধরনের গল্প না করার চেষ্টা করুন।ভয় থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য নিজেকে যথেষ্ট সময় দিন।নিজের আগের সফলতার কথা চিন্তা করুন। মনে করুন আগে কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার পর কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, কীভাবে বের হয়ে এসেছিলেন। এটা আপনার মনোবল বাড়াতে সাহায্য করবে।নিজেকে বলুন, ‘ভয়ের কাছে পরাজিত হবো না। ভয় আসতেই পারে। এটা স্বাভাবিক। আমি জানি ভয়টা অমূলক। তাই ভয় পাবার কিছু নেই। বরং ভয় দূর করতে যা যা করা দরকার করব।’ভূত নিয়ে যেসব কমেডি সিনেমা রয়েছে সেগুলো দেখুন। ভয়ের সময় মনে করার চেষ্টা করুন ভয়ের সিনেমাগুলোতে ভূত কী কী করার চেষ্টা করে এবং প্রাণ খুলে হাসুন।কোনো বিষয় নিয়ে মজা করলে সে বিষয়ে ভয় দূর করা সম্ভব। ভূত বিষয়ে অন্যের সঙ্গে বেশি বেশি গল্প বলুন, মজা করুন।অনেক সময় ভূতের ভয়ের সঙ্গে মানসিক অসুস্থতাও যুক্ত থাকতে পারে। সেখানে ছোটখাট পরামর্শ মেনে চললেই তা দূর করা সম্ভব হবে না। তাই নিজে নিজে ভূতের ভয় দূর করতে না পারলে মনো-চিকিৎসক, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য নিন।ভূতের ভয়টা যেহেতু রাতেই হয়, তাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে শিথিল থাকতে পারেন এমন কিছু করুন। ঘুমের সময় অল্প আলো জ্বালিয়ে ঘুমান।সিলিং বা জানালায় ঝুলন্ত কিছু থাকলে তা সরিয়ে ফেলুন, যাতে রাতের বেলা এগুলো থেকে ভয় না তৈরি হয়‘ভূত আসলে কী হবে?’- এ ধরনের ভাবনা ব্যক্তির মধ্যে মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে। তাই ভবিষ্যতে যা ঘটার আশঙ্কা সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত নন তা ভাবা থেকে বিরত থাকুন।

ভূতের ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমাদের মধ্যেই লুকায়িত রয়েছে। তাই ভূতের ভয়কে জয় করুন।




ক্রমশ...


প্রাবন্ধিক চাঁদ রায় -এর একটি কবিতা

 ছড়া ও তার প্রকারভেদ

   


প্রখ্যাত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাঁর লেখা 'কাব্যতত্ত্ব' গ্রন্থে বলেছেন-- "মানুষের স্বভাবের মধ্যে কাব্যের সম্ভাবনা রয়েছে। ছন্দ ও সুষমা বোধ মানুষের সহজাত। " এই সহজাত স্বাভাবিক প্রবৃত্তি পরিণতি লাভ করলে নানা পরীক্ষার মাধ্যমে জন্ম নেয় কাব্য। কাব্যের শ্রেণি দুরকম---যাঁরা গভীর প্রকৃতির তাঁরা প্রকাশ করেন মহৎ বা উন্নত ক্রিয়া, প্রকাশ করেন উন্নত ও মহৎ চরিত্র। এঁদের হাতে সৃষ্টি হয়েছে প্রার্থনা ও স্তুতি। অপর পক্ষে যাঁরা লঘু প্রকৃতির তাঁরা প্রকাশ করেন লঘু চরিত্রের লঘু কার্যকলাপ। এঁদের হাতে সৃষ্টি হয়েছে ব্যঙ্গাত্মক রচনা। 

দ্বিতীয় ধারাটির মধ্যে পড়ে ছড়া। ছড়া হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত ঝংকারময় পদ্য। এটি সাহিত্যের একটি প্রাচীন শাখা। প্রখ্যাত পণ্ডিত ও সাহিত্যিক রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী সর্বপ্রথম এই অমোঘ উচ্চারণ করেছেন, "ছড়া বাংলা সাহিত্যের একটি মূল ধারা। " ছড়া হচ্ছে সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসাহিত্য। গ্রামবাংলায় এমন কেউ নেই যে, সে ছড়া জানে না বা শোনে নি। ছড়া মনে রাখাও সহজসাধ্য। দুচার লাইনের ছড়া মানুষের মনে দারুণ ভাবে প্রভাব বিস্তার করে। গ্রামের রস পিপাসু মানুষ রসের সন্ধানে ছড়ার আশ্রয় নেয়। বিশেষত মেয়েলি ছড়া সেই ভূমিকা পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। 

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্ব ও পণ্ডিত ড: আশুতোষ ভট্টাচার্য তাঁর লেখা, 'লোকসাহিত্য' গ্রন্থে ছড়াকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। ১) লৌকিক ছড়া ২) সাহিত্যিক ছড়া ৩) আধুনিক ছড়া। 

*লৌকিক ছড়া*

গ্রাম বাংলার লোকজ উপাদান থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে এমন ছড়া হল লৌকিক ছড়া। এই ছড়াতে রচয়িতার নাম জানা যায় না। কারণ এগুলি মুখে মুখে প্রচলিত ও কোথাও এর লিখিত রূপ থাকে না। লৌকিক ছড়া বিভিন্ন ধরনের হয়। যেমন ছেলে ভুলানো ছড়া, সাধারণ নীতি মূলক ছড়া (খনার বচন, প্রবচন), ধাঁধার ছড়া এবং সর্বোপরি ব্রতের ছড়া। ব্রতের ছড়া গুলি কে সাধারণত শোলোক বলা হয়)। এই সব ছড়া গুলি নিতান্তই গ্রাম্য মহিলাদের নিজস্ব সম্পদ এবং দেশজ শব্দ যুক্ত আঞ্চলিক উপভাষায় ব্যক্ত। 

*সাহিত্যিক ছড়া*

ছড়া যখন কোনো কবি বা সাহিত্যিক দ্বারা রচিত হয়ে লোকের কাছে মুদ্রিত আকারে পরিবেশিত হয় তখন তাকে সাহিত্যিক ছড়া বলা হয়। এইসব ছড়ার রসদ লোক ছড়ার মধ্যেই অন্তর্নিহিত থাকে যা সযত্নে ব্যবহার করে থাকেন সাহিত্যিক তাঁর রচনায়। তবে একথাও সত্য যে, বহু সাহিত্যিক ছড়াও লোকজীবনে প্রভাব ফেলে অর্থাৎ লোক ছড়া সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলে। 

*আধুনিক ছড়া*

বর্তমানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করবার জন্য অথবা শিক্ষা বিষয়ক কিংবা স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যেসব ছড়া সৃষ্টি করা হয় তাকে আধুনিক ছড়া বলা হয়।

প্রাবন্ধিক তৈমুর খানের -এর একটি প্রবন্ধ

 প্রেমিক বাউল অনন্তের কবি কবিরুল 




এক গূঢ় অভিমান আর তাচ্ছিল্যের হাসি রেখেই চলে গিয়েছেন কবিরুল ইসলাম(২৪ /৮/১৯৩২ —১৯ /৭ /২০১২)। পঞ্চাশের দশক থেকে নীরবে নিরবচ্ছিন্নভাবে সাহিত্য চর্চা করেছেন। বাংলা কবিতাকে তিনি গভীরভাবে ভালবেসেই প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্য বাংলা সাহিত্যের কোনও নিয়ামক পর্যৎ কবিকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেননি। সেই অভিমান কোনওদিন প্রকাশ না করলেও নীরব আর স্বগত সংলাপে কাব্যচর্চার মতো তিনি আশ্চর্য উদাসীনতায় এক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছেন ওইসব পুরস্কার আর তাঁবেদারে। গ্রামজীবন, পরিবার-পরিজন এবং বন্ধুবাৎসল্যের পরিমণ্ডলেই তিনি বসবাস করতে ভালবাসতেন। আগাগোড়া রাঙামাটি বীরভূমের বাউল পথিক হয়েই তিনি সুফি-সহজিয়া সাধনমার্গের সন্ন্যাসীপ্রতিম মানুষ। সারাজীবন তিনি আত্মখননের মধ্যে দিয়েই আত্মান্বেষণ করেছেন। নিজের সঙ্গে নিজেরই সংলাপে তুলে এনেছেন কবিতার ভাষা। নিজের রূপে নিজেকেই দেখেছেন। বহুমাত্রিক দৃশ্য, বহুমাত্রিক রূপ, বহুমাত্রিক অনুভূতির পয়গামেও একজনই রহস্যচারী সত্তার অধিকারী। তিনি কখনও নারী, কখনও অন্তরদেবতা, আসলে কবি নিজেরই পরিচয় বুঝতে চেয়েছেন। 


    কবিরুল ইসলাম জন্মেছিলেন নলহাটির কাছে হরিওকা গ্রামে। পিতা মহম্মদ ইয়াকুব হোসেন, মাতা মরিয়ম বেগম। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনো করে সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যাপক হন। ষাট দশক থেকেই লেখালেখি শুরু। “দেশ” পত্রিকাসহ ভারত ও বিদেশের বহু পত্রিকায় লিখেছেন মূলত কবিতাই। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “কুশলসংলাপ” প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। এরপর একে একে কাব্যগুলি হল : “তুমি রোদ্দুরের দিকে”, “বিবাহ বার্ষিকী”, “বিকল্প বাতাস”, “বিদায় কোন্নগর”, “তিনে তিনে চাপা চু”, “মাগো, আমার মা”, “দীঘার কবিতা”, “৩১ মার্চ ১৯৯২”, “অবলম্বন”, কবিতার জন্ম”, অনন্ত কুয়াশা”, অনূদিত কবিতা”, “আত্মখনন” এবং একটি গদ্যের বই “কবিতার ঘরবাড়ি” প্রকাশিত হয়েছে। বুদ্ধিদীপ্ত মেধাবী উচ্চারণে তাঁর কবিতার স্বর আলাদা করে চেনা যায়। বাউলের মরমিয়া সুরে হৃদয়ের বাঁশি আপনা থেকেই বেজে ওঠে। কোনও মনীষীলোকের শান্ত স্নিগ্ধ ব্যাপ্তি আত্মকথনের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। সীমাহীন অস্থিরতাকে তিনি ভাষা দিতে চান। প্রেম ও বিষাদ, স্বপ্ন ও যন্ত্রণাকে রূপান্তরের মাধুর্যে ও মিশ্রণে শিল্প করে তোলেন। সত্যসন্ধানী দার্শনিকের মতো কোনও প্রত্যয়ী শাশ্বতীর কাছে পৌছাতে চান ; কিন্তু বারবার ফিরেও আসেন নিজের কাছে — আত্মখননে –—


“পা বাড়ালে রাস্তা নেই চৌকাঠ পেরিয়ে 

হাত বাড়ালে বন্ধু নেই রাস্তার ওপারে 

রাস্তার শেষে কী আছে বন্ধুর ঠিকানা 

জানি না। জানি না।”


এক অবিমিশ্র সংশয় কবিকে তাড়া করেছে। মানবিক শুশ্রূষা আর আত্মিক শুশ্রূষা চেয়েছেন কবি। সংসারের অসংখ্য বন্ধন মাঝেও নিজেকে বাউল করে সহজিয়া আয়নায় মুখ দেখেছেন। বহুমাত্রিক জটিল প্রেক্ষিত থেকে জীবনের সৌন্দর্য খুঁজেছেন। টান টান পয়ার, মাত্রা নির্ণয়, ভাঙা-গড়ায় ছন্দ সচেতন কবি দক্ষ নাবিকের মতো তাঁর কাব্যতরণি ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন। অসম্ভব দরদি আর নরম মনের মানুষ বলেই কবিতার সঙ্গে তাঁর অন্তরের একটা যোগ ঘটেছে। মাটি-অন্ন-আকাশকে আপনার বিচরণের সীমানায় বেঁধেছেন। বীরভূম ও কবিরুল নামটি তাই আজ একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। 


    প্রকৃত কবির পথ চলা তো মৃত্যুর পরই শুরু হয়। সুতরাং বেঁচে থাকাও মৃত্যুর পরেই। জীবনের প্রতিধ্বনি সীমাহীন। মাটির কায়া একদিন এই মাটিতেই বিলীন হয়ে যায়। বাউল সাধকরা বারবার একথা বলেছেন। কবিরুল যে চাবি খুঁজেছেন তা জীবনের চাবি। প্রথম জীবনের কাব্যগুলিতে জীবনরসের ভাঁড়ারের উৎসমুখে কবি পৌঁছাতে চেয়েছেন, তাই স্বাভাবিকভাবেই এসেছে সংশয় ও আত্মিক সংলাপে অগ্রসর হবার প্রেরণা। কিন্তু পরবর্তীতে এই জীবনরসায়নকে তিনি বাউল ও দর্শনে পরিমার্জন করতে চেয়েছেন। তখন এক সর্বব্যাপী নির্জনতা, আক্মবোধের সীমাহীন ক্ষেত্র কবিকে টেনে নিয়ে গেছে। অনুভূতির শব্দবাহী পর্যটনকে কবি স্বাগত জানিয়ে লিখেছেন :


“মুখের ভাষা বন্ধ যদি 

হৃদয় জেগে ওঠো।”


আত্মখননে হৃদয় তো জাগবেই। রক্ত-মাংস কাম-কলা আর শিরা-উপশিরা নয়, বাউলের দেহতত্ত্ব তো আত্মদর্শনেরই নানা রূপ। সেখানে মান-অভিমানের সঙ্গে থাকে শূন্যতা ও আকুলতা। মনের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই মনের মানুষ যে কবির ভেতরেই বাস করে, দূরে কোথাও নয়, কবির রূপেই তাঁর রূপ, কবির হাতেই তাঁর হাত, কবির কণ্ঠেই তাঁর কণ্ঠ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। “আত্মখননে” এই দর্শনই বারবার উঠে এল। কবি লিখলেন :


“গাঁইতি-শাবলে 

নিজেকে খনন করি শুধু 

হয়তো তোমাকে তা স্পর্শও করে না কিন্তু 

আমি হাতে-নাতে ধরা পড়ি 

জলের গভীর থেকে হঠাৎ যেমন মায়াবী বঁড়শিতে 

মাছ উঠে আসে 

সে-সময় তোমার অস্তিত্ব আমি এক জেদে উপেক্ষা করি 

ভুলে যাই 

কিন্তু কী আশ্চর্য তুমি হাঁটুমুড়ে 

                               আমার ভিতরে ঢুকে পড়ো।”


ঘরের মধ্যে পড়শি বসতের মতনই কবির দ্বৈত সত্তা, আলাদা হয়েও একই শরীরে ধরা দেয়। কবি কথা বললেও বুঝতে পারেন :


“আমার গলার স্বরে তোমার আওয়াজ”


এভাবেই বাউল সাধনায় যেমন এক আশ্চর্য যোগ ঘটে নিজের সঙ্গে অন্যের, মানুষের সঙ্গে মানবেরও সেই যোগ। তখনই তো Manও Human হয়ে যায়। অন্ত হয়ে যায় অনন্ত। টি এস এলিয়ট হয়তো এই কারণেই সময়কে খণ্ডিত করেননি। অতীত বা ভবিষ্যৎ বলেই তাঁর কাছে কিছু ছিল না। প্রবহমান বা শাশ্বত বর্তমান বলেই তিনি ভেবেছিলেন : “Measures time not our time, rung by the unhurried.” আর এই কারণেই কবিরুল হৃদয়কে জাগিয়ে দিয়ে লিখলেন :


“মৃত্যুর এ ঘেরাটোপ, এসো পার হই —

এসো আমরা জীবনের দিকে হাঁটি।”


এই অবিরাম, অফুরান হাঁটা । বোধে বোধান্তরে হাঁটা । আমরা আমাদের মধ্যেও এই হাঁটার শব্দ উপলব্ধি করতে পারি।



প্রাবন্ধিক রামপ্রসাদ সরকার -এর একটি প্রবন্ধ






 কলকাতার পরী ও স্মৃতিমেদুরতা


।।এক।।

আমি এখন একটি জেনেরাল ইনসিওরেন্স কোম্পানীর প্রধান কার্যালয়ের ভিজিটিং রুমে বসে আছি, আমার স্ত্রীর চিকিৎসার খরচের কিছুটা অংশের চেক পাওয়ার আশায়। ছ’তলার খোলা জানালা দিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখা যাচ্ছে। মাথার পরীটা ঘুরছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন স্থবীর থাকার পর পরীটা আবার ঘুরছে। কলকাতার পরী প্রাচীন ঐতিহ‌্যের প্রতীক। 

 এই পরীর ইতিহাস জানতে হলে আমাদের পুরনো দিনে ফিরে যেতে হবে। রানী ভিক্টোরিয়ার মৃত‌্যুর পর তাঁর স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে এই সৌধটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লর্ড কার্জন। এই স্মৃতি সৌধটি নির্মাণ করতে ১৫ বছর সময় লেগেছিল ১৯০৬ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত। ১৯২১ সালে সৌধটির মাথায় প্রায় সাড়ে ছয় টন ওজনের পরীটি বসানো হয়।

 তখন পরীটি ঘুরতে ঘণ্টায় পনেরো কি.মি. বেগের বাতাসের প্রয়োজন হতো। বলবিয়ারিং প্রযুক্তির সাহায‌্যে পরীটি ঘুরতো। কালের প্রবাহে শহরের অনেক উন্নতি সাধন হয়। চারদিকে সুউচ্চ অট্টালিকা গড়ে উঠেছে, বেড়েছে বায়ুদূষণ। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে হাওয়ার বেগ। তাই এখন পরীটি ঘুরতে ঘণ্টায় কুড়ি কি.মি.-র বেশি হাওয়ার বেগের প্রয়োজন হয়। মাঝে মধ‌্যেই পরীর ঘোরা বন্ধ হয়ে যায়। সে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমার সৌভাগ‌্য আমি সেদিন কলকাতার পরীকে ঘুরতে দেখেছিলাম, সে ২০০৭ সালের কথা। 

 এই সৌধটির স্থাপত‌্যশৈলী ইতালিয় রেনেসাঁ ও মুঘল স্থাপত‌্য রীতির সংমিশ্রণ।

 ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখতে সারা বছর ধরে অসংখ‌্য মানুষের সমাগম হয়। তার প্রাচীনত্ব যেমন মানুষকে আকৃষ্ট করে, তেমনি মেমোরিয়াল চত্বরে প্রায় ৬৪ একর জমি জুড়ে নানান ধরনের বাহারী গাছ, রং বেরঙের ফুল গাছের সমারোহ সমভাবে আগত মানুষকে আনন্দ দেয়।

 এটি একটি সংগ্রহশালাও। এখানে পঁচিশটি গ‌্যালারি আছে। ব্রিটিশ আমলের বহু তৈলচিত্র ও নথিপত্র এখানে দেখতে পাওয়া যায়।

 একটি সংবাদ পত্রের প্রতিবেদনে প্রকাশ যে বাজ পড়লেই কলকাতার পরীর ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্থ হলে তার ঘোরা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৬ সালে প্রথম বার বাজে ক্ষতি হয়েছিল পরীটির। ঘুর্ণন থেমে গিয়েছিল।

 দ্বিতীয়বার ২০০৬-২০০৭-এ বাজ পড়ে আবারও সেটির ক্ষতি হয়। দুবারই প্রযুক্তির সাহায‌্যে মেরামত করা হয়। বর্তমানে যেভাবে মুহূরর্মুহু বাজ পড়ছে তাতে যে কোনও দিন ‘কলকাতার পরী’-র ক্ষতির সম্ভাবনা থেকে যায়। 


।।দুই।।

 তন্ময় হয়ে কলকাতার পরীর ঘোরা দেখেছিলাম। ভিজিটিং রুমের এক কোণায় পুরনো ফাইল পত্তর ডাঁই করা। তারই গন্ধ নাকে আসছিল। গন্ধটা খুব চেনা চেনা। ঠিক স্মরণে আনতে পারছিলাম না। গন্ধটার সঙ্গে কবে আমার পরিচিতি হয়েছিল।

 বাইরে অঝোরে বৃষ্টি নামলো। মন কেমন করা বৃষ্টি। তখনই স্মৃতির পরদায় একটা পুরনো মুখ ভেসে উঠলো। এমনি এক বর্ষণমুখর দিনে কলকাতা হাইকোর্টে পুরনো ফাইল-পত্তরের গন্ধের মাঝে চেয়ার টেবিলে মুখোমুখি বসে রঞ্জিতদা ও আমি। রঞ্জিতদা আমার বস। বি.কম, পাশ করে শিক্ষকতা ছেড়ে সবে তখন কলকাতা হাইকোর্টের ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছি। জজ সাহেবদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। জজ সাহেবদের কাছে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ইংরেজিতে নোট পাঠাতে হত। সেই নোটের ওপর তাঁরা তাঁদের নির্দেশাবলী দিতেন। সেগুলোর আবার সঠিক উত্তর তৈরি করে দিতে হত। 

 জজ সাহেবদের কাছে অফিস নোট কীভাবে লিখতে হয়, কীভাবে পেশ করতে হয় তারই তালিম দিচ্ছিলেন রঞ্জিতদা। প্রথম পরিচয়ে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে রঞ্জিতদা আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন।

 পুরনো ফাইল-পত্তরগুলোর মাঝেই বসে আমাদের কাজ। এগুলো যে কতো পুরনো কেউ বলতে পারে না। কিন্তু সেইসব ফাইল-পত্তরের মাঝে যে কতো পুরনো ইতিহাস লুকিয়ে আছে, সে কথা সবাই বলে। পুরনো ফাইলের সেই গন্ধ আজও আমার নাকে লেগে আছে।

।।তিন।।

 কাজের ফাঁকে রঞ্জিতদা একদিন আমাকে বলেছিলেন, এখানে পড়ে থাকিস না। কোনও ভবিষ‌্যৎ নেই। এই আমাকেই দ‌্যাখ না— চল্লিশ বছর ধরে কলম পিষে সেই কেরাণী হয়েই আছি। শেষ বয়সে গিয়ে হয় তো অফিস সুপার হব-তাও রিটায়ারমেন্টের কয়েক বছর আগে।

 আরও বলেছিলেন, তুই যদি এখানে থাকিস তাহলে লেখ। হাইকোর্টকে নিয়ে লেখ। পুরনো ফাইল-পত্তর দেখার পারমিশন করিয়ে দেব। এইসব ফাইল পত্তরগুলোর মধ‌্যে অনেক লেখার খোরাক পাবি। তোর যখন লেখার হাত রয়েছে, দেখিস তুই একদিন বড় লেখক হবি, নাম করবি।

 রঞ্জিতদার কথা শুনে সাহিত‌্যিক শ্রদ্ধেয় মণিশঙ্কর মুখোপাধ‌্যায়ের (শঙ্কর) লেখা প্রথম উপন‌্যাস ‘কত অজানারে’ বইটির কথা মনে পড়ে গেল। স্কুল ফাইনাল পাশ করার আগেই (১৯৫৮) এই বই আমার পড়া হয়ে গিয়েছিল। বইটির পটভূমিও জানা ছিল। 

 আমার গর্ব হতো এই কথা ভেবে যে প্রথিতযশা সাহিত‌্যিক শঙ্করের প্রথম উপন‌্যাসের পটভূমি কলকাতা হাইকোর্ট, আর আমি সেখানে চাকুরি করছি।


।।চার।।

 রঞ্জিতদা, তোমার কথা আমি রাখতে পারিনি। উঁচু বেতনের মোহে, হাইকোর্টের চাকুরি ছেড়ে, কলকাতা ছেড়ে, সান্ধ‌্য কলেজে ‘ল’ পড়া ছেড়ে মফস্বলের একটি ব‌্যাঙ্কের শাখায় জয়েন করি। তুমি তো তার আগেই রিটায়ার করে গেলে। তোমার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা হয়নি।

 তোমার কথা রাখলে হাইকোর্টের পুরনো ফাইল-পত্তর ঘেঁটে গল্প-উপন‌্যাস লিখে আজ হয়তো বড় লেখক হতে পারতাম। 

(লেখকের ব‌্যক্তিগত বাস্তব উপলব্ধি)

লেখক সুমন সাহার একটি মুক্ত গদ্য

দেড় তলা বাসার ছাদে𑁋ভুলগুলোর জার্নি 


ভুলে যেতে চাইলেই ভুলে যাওয়া যায় না। ভুল হয়েই যায়। ভুলে𑁋কাউকে ছোট করে ভাবা। মনের অজান্তে, হতেও পারে, নাও হতে পারে। কাউকে ছোট ভেবে, নিজেই ছোট হয়ে আসা, ছোট কেমনে হয়, কেমন করে, ব্যাপারটা দেয়ালে ঘুষি দিয়ে নিজের হাতেই ব্যাথা। ব্যাথায় কাতরানো। আর ব্যাথাপ্রসঙ্গে, কাশফুল সাদামেঘকে ভুলে যায়। সাদামেঘ কাশফুলকে ভুলে যায়। একে অপরকে আগলে রাখবে। আগলে রাখতে পারে, অনেকেই পারলো না, পারবেও না। 


    সম্পর্কঘটিত দিকটা বিদিক হয়ে যায়। থুম মারে শালিক, কাক কাকের কাজই করছে। করবেই। নিন্দুক নিন্দাচর্চায় ব্যস্ত। অনেকের অনেক ব্যস্ততা। পৃথিবীতে কেউ বেড়াতে আসেনি। সবাই কিছু কাজ করেই যাচ্ছে। কাজ বলতে অনেক কিছুই। কোন প্রাণেরইতো অবসর নাই। একদিন দেখা গেলো অনেক করেও কাজের স্বীকৃতি নাই। না আসলেও কেউ কাজ থামাবে না। থামিয়েই লাভ কি। আনন্দ আসছে। অনেক আনন্দের অভাব টাকা বুঝে না৷ আনন্দের অভাবে যা যা হয়ে যায়। সেগুলোর একটা জার্নিতে গেলে বুঝা যাবে। যাবনে আরেকদিন...

লেখক তুলসী দাস বিদ -এর একটি গল্প

 গোধুলী


মাটির পথ ধরে গরু গুলো পায়ে পায়ে ধুলো উড়িয়ে বাড়ি ফিরছে। পশ্চিমদিকে আবির ছড়ালো রঙের ছটা, আকাশকে সুন্দর করে কনে সাজানোর মতো সাজিয়ে তুলেছে। দিগন্তে বলাকার ঝাঁক যেন সোনার হারের মতো উড়ে চলেছে। গালগল্প সেরে নদীর ঘাটের কাজ ফেলে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছে আটপৌরে গায়ের বধূরা। মাঝিরা নৌকাটা পাড়ের খুঁটিতে বেঁধে বাঁশের মাচায় বসে মজলিশে ব্যস্ত হয়ে পরেছে। পানকৌড়ি চখাচখি কাঁদাখোঁচারা সময় বুঝতে পেরেছে। জোনাকিদের আনাগোনা বাড়লেও সাঁঝের প্রদীপ জ্বালেনি। দূরের গাছ গাছালি ঘেরা গ্রাম ঝাপসা দেখাচ্ছে। ষাট ঊর্ধ্ব রমাকান্ত বৈকালিক ভ্রমণে আসার ব্যতিক্রম হয়নি। এই সুন্দর মধুর ক্ষণকে জীবনের সাথে মিলিয়ে নেন প্রতিদিন। অভ্যাসগত ভাবে নদীর পাড়ে সবুজ দুর্বা ঘাসের গালিচায় শরীরকে এলিয়ে দিয়ে অতীতকে রোমন্থন করতে করতে অজান্তে চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। এটাও বাস্তব সত্য নদীর পাড়ের নাতিশীতোষ্ণ ফুরফুরে হালকা বাতাস যেন মায়ের মতো স্নেহের হাত বুলিয়ে আদর করে। আচমকা কান্নার শব্দে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব কেটে গেলো। অদূরে শ্মশানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। শ্মশান সঙ্গীরা বল হরি হরিবোল বলে থেমে গেলেন।

লেখিকা স্বপ্না বনিক -এর একটি গল্প

 ঈশ্বরের দান



তিনটি দুধের শিশু আর গফুর মিঞাকে নিয়ে সাকিনা বিবির গরীবের সংসার। স্বামী গফুর মিঞা ভোরবেলায় দুটো পান্তা খেয়ে চলে যায় মাঠে। দিন ভর হাল বেয়ে সন্ধ‌্যেবেলা ফিরে আসে ঘরে। তিনটি বাচ্চাই তখন খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সাকিনা ভাতের থালা আগলে বসে থাকে মিঞার জন‌্য। মিঞা ফিরলে দুজনে একই থালায় খেয়ে শুয়ে পড়ে। মাটির মেঝেতে পাতা বিছানা। বিছানা বলতে দুটো বড় ছেড়া কাঁথা আর ছেড়া দুটো বালিশ। গফুরের মনে দীর্ঘদিন ধরে লালিত স্বপ্ন আবার ভীড় করে আসে।
তিনটে ছেলে-মেয়েকে মানুষ করতে হবে। পাঁচ বছরের আসিফকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। ছেলেটার পড়াশোনায় ভীষণ উৎসাহ। স্কুল থেকে ফিরে একটু খেয়েই পড়তে বসে আসিফ্‌। দিনের আলো থাকতেই পড়া শেষ করে রাখে সে। রাত্রিবেলায় লণ্ঠন জ্বালাবার তেল নেই। ওইটুকু ছোট ছেলে মনে মনে ভাবে কবে সে বড় হয়ে বাবার মতো রোজগার করবে। সংসারের দুঃখ ঘোচাবে। বাড়ি বাড়ি কাজ করে মা যা দুটো পয়সা আনে, তাই দিয়েই ওদের খাওয়া-পরা কোন রকমে চলে যায়। 
দেখতে দেখতে ঈদ এসে পড়ে। সারা মাস সাকিনা ও গফুর রোজা রাখে। রাত্রি বেলা কিছু খেয়ে উপোস ভাঙ্গে। ছোট্ট আসিফ্‌ দেখে বাবা-মা অভুক্ত থেকে ওদের মুখে খাবার তুলে দেয়। প্রতি রাতেই প্রার্থনা জানায় খোদার কাছে ওদের দুঃখ দূর করার জন‌্য। হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে আসিফ্‌ দেখলো পথের ধারে একটি মানিব‌্যাগ পড়ে আছে। কৌতুহলবসে আসিফ্‌ ব‌্যাগটা তুলতেই বেরিয়ে পড়লো একগুচ্ছ নোটের তাড়া। ভয়ে, উত্তেজনায় আসিফের বুক্‌ ধক্‌ করে উঠলো। ব‌্যাগটা নিয়ে ছুটে এসে মায়ের হাতে দিয়ে সব ঘটনা বললো। সাকিনা ব‌্যাগটা মাথায় ঠেকিয়ে বললো— ‘এটা ঈশ্বরের দান বাবা’।