Saturday, September 4, 2021

অষ্টম সংখ্যার সূচিপত্র(২৯জন)

 সম্পূর্ণ সূচিপত্র




বাংলা কবিতা ও ছড়া---


তৈমুর খান, তীর্থঙ্কর সুমিত, সত্যেন্দ্রনাথ পাইন, সুব্রত মিত্র, অভিজিৎ হালদার, স্বপ্না বনিক, তাপস মাইতি,জয়িতা চট্টোপাধ্যায়, মহীতোষ গায়েন, ইমরান শাহ্, নবকুমার, আশীষ কুন্ডু, মায়া বিদ, ক্ষুদিরাম নস্কর, মিলি দাস, কাজী রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, চিরঞ্জিত ভাণ্ডারী, উদয়ন চক্রবর্তী, অমিত পাল।


বাংলা গল্প--


রানা জামান, আশীষ কুন্ডু।



বাংলা প্রবন্ধ---


রামপ্রসাদ সরকার, তৈমুর খান।




ইংরেজি কবিতা--


Soumendra Dutta Bhowmick.

Sunanda mondal



Photography----


Soura dip pal, ARISHNA SARKAR.

Sunday, August 29, 2021

Photography by ARISHNA SARKAR



 

Photography by Amit Pal



 

Poet Soumendra Dutta Bhowmick's one poems

 CRITICAL


 

Alone and alone going down to the den

Dark is the destination above the level,

Dark is the mind-blowing apprehension,

Within me the alive person is sleeping

Not apprehending the actual happening.

Suddenly who who shouts for assistance

And lamenting over his or her own tears?


 

Alone and alone I always forget my way,

Try to surpass the valued feelings.

Then the demons dance and pounce around

Always I hear their remarkable sound.

They bring me to the diabolical hell

Where the heaven is surely not found.

প্রাবন্ধিক রাম প্রসাদ সরকার -এর একটি প্রবন্ধ

 



হারিয়ে গেছে

                          

                                              

ভ্রমণ প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে ছোটদের জন‌্যে অথবা ছোটদের নিয়ে অনেক দিন কিছু লিখিনি। তাই আজ লিখতে বসে বারবার মনে হচ্ছে আমাদের ছোটবেলা আর আমাদের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিদের ছেলেবেলার মধ‌্যে কতো তফাৎ। আমরা অধিকাংশ জন্মেছিলাম, বড় হয়ে উঠেছিলাম গাছগাছালি, নদী-নালা, সোনার ফসল ভরা মাঠ, ডাহুক ডাকা দুপুর, জোনাকি জ্বলা রাত— এই রকম একটা মায়াবী পরিবেশে। ঠাকুমার কোল ঘেঁষে ভূত-পেত্নী, দৈত‌্য-দানোর গল্প শুনেছিলাম। শীতের রাতে লেপ-কাঁথার তলায় শুয়ে ঠাকুমার কাছেই শুনেছিলাম দুয়োরানি-শুয়োরানির কথা। পরীক্ষাজ ঘোড়া, রাজকুমার-রাজকুমারীর গল্প। গল্প শুনতে শুনতে উত্তেজনায়, ভয়ে, শিহরণে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম বুঝতে পারতাম না। সন্ধ‌্যেবেলায় তুলসী তলায় প্রদীপ দিতে গিয়ে মায়ের কণ্ঠে গুণগুনিয়ে ওঠা ভক্তিগীতি, শঙ্খধ্বনি, তারাভরা আকাশে সপ্তর্ষীমণ্ডলকে চিনে নেওয়া। কোনটি ধ্রুবতারা তার হদিশ করা, চাঁদের দিকে অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে চাঁদের বুড়ি সত‌্যিই চরকা কাটছে কিনা দেখা— সে এক মায়াময় জগৎ ছিল আমাদের। একটু বড় হতে খোলামাঠে খালি পায়ে ছুটে বেড়ানো, পুকুরে সাঁতার কাটা, নৌকা বওয়া, হাত ছিপ নিয়ে পুঁটি মাছ ধরা। জোড়া বঁড়শিতে যখন জোড়া পুঁটি মাছ উঠতো, তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে মাছের মুখ থেকে সযত্নে বঁড়শি খুলে মাছের মুখে ফু দিয়ে জলে ছেড়ে দেওয়া।

ঘন বর্ষায় পুকুরের জল যখন টইটুম্বুর করতো তখন শোল মাছের ডিম ফুটে বাচ্চা হতো। অসংখ‌্য ছোট ছোট বাচ্চা মাছ দল বেঁধে জলে ঘুরে বেড়াতো। তাদের বাবা-মা কাছাকাছি থাকতো। বাচ্চাদের পাহারা দেবার জন‌্যে। আমরা সে সুযোগের সদ্বব‌্যবহার করতাম। বড় বঁড়শিতে ঘুরঘুরে পোকা, আরশোলা অথবা ব‌্যাঙাচি গেঁথে ছোট শোল মাছের ঝাকের মাঝে ফেলে দিতাম। বড় শোল মাছটি খপ করে সে টোপ গিলে ধরে ফেলতো। সঙ্গে সঙ্গে ছিপে টান পড়তো। তারপর মাছটিকে টেনে ডাঙায় তুলতাম। আমাদের শিশুমনে আনন্দের জোয়ার বয়ে যেত। বিকেল হলেই মাঠে ময়দানে ঘুরে বেড়ানো, রঙিন প্রজাপতির পিছনে ধাওয়া করা, গঙ্গা ফড়িংয়ের লেজে সুতো বেঁধে বাতাসে ওড়ানো, বর্ষার ভিজে ঘাসে বিরবারটি খুঁজতে যাওয়া। (শ্রদ্ধেয় সাহিত‌্যিক শ্রীরমাপদ চৌধুরীর ‘প্রথম প্রহর’ বইটিতে বিরবারটি উল্লেখ পাওয়া যায়)। ভেলভেট রঙের ছোট ছোট পোকা, কোনো কিছুর স্পর্শ পেলেই পাগুলো গুটিয়ে নেয়। সেগুলো ধরে ধরে আমরা খালি দেশলাই বাক্সে ভরে রাখতাম। ঘরে এনে মেঝেতে ছেড়ে দিতাম। কেমন গুটি গুটি পায়ে চলতো। আর যেই হাতের স্পর্শ পেতো অমনি গুটিয়ে যেত। আমরা তখন সুর করে বলতাম—

বিরবারটি চটিমটি লাল দরওয়াজা খোল দে

তেরে মামা লাড্ডু লায়া লাল দরওয়াজা খোল দে।

কিছুক্ষণ বাদে ওরা সত‌্যি সত‌্যিই চলতে শুরু করতো। আর আমরা আনন্দে ফেটে পড়তাম। এ সব নিয়ে এক ভিন্ন জগতের মানুষ ছিলাম আমরা।


।। দুই ।।

সব আনন্দ ছাপিয়ে পুজোর আনন্দ বড় হয়ে উঠতো। তখন আমাদের কতোই বা বয়স। বন্ধুরা সবাই প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। পাড়ার বারোয়ারি দুর্গা পুজো। এখনও মনে পড়ে, প্রতি বছর চৈত্রের গাজন হয়ে গেলে প্রতিমা গড়ার শিল্পী আসতো। নাম ছিল কালী পাল। পুজো মন্ডপে ঠাকুরের আটচালা আগে থেকে রাখা থাকতো। কালী পাল প্রথমে এসে খড় দিয়ে প্রতিমা বানিয়ে চলে যেত। তারপর মাস দেড়েক ওর পাত্তা পাওয়া যেত না। আমরা ছটফট করতাম, তার আগমন প্রতীক্ষায়। রথের পরপর ও আসতো। সঙ্গে করে গঙ্গার পলি মাটি নিয়ে আসতো। এবার খড়ের ওপর মাটি দিয়ে প্রতিমা মূর্তি গড়তো। তিন চার দিন লেগে যেত। অবার কালী পাল চলে যেত। এদিকে মাটির প্রতিমাগুলো শুকিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরত। আবার বিশ্বকর্মা পুজোর পরপরই ও আসতো। এবার মাটি দিয়ে প্রতিমার ফাটল মেরামত করে গোলা মাটি দিয়ে প্রতিমা মসৃণ করতো। আমরা একে দোমেটে বলতাম। এই ভাবেই প্রতিমা আমাদের চোখের সামনে আস্তে আস্তে রূপ নিত। আর আমরা উত্তেজনায় ছটফট করতাম। এ অবস্থায় প্রায় প্রতিদিন সকাল বিকেল আমরা প্রতিমা দেখে আসতাম। আর পুজোর দু’-তিন দিন আগে কালী পাল আসতো প্রতিমা রং করতে। সঙ্গে নানান সাইজের তুলি, রং, আঠা ও ছোট ছোট মাটির পাত্র। এবার আমরা আর মন্ডপ ছেড়ে নড়তাম না। আমাদের চোখের সামনে মাটির প্রতিমা রূপ নিত। ঠাকুরের চোখ আঁকার সময় কালী পাল মৌনব্রত অবলম্বন করতো। আমাদের বলতো চোখ বন্ধ করে থাকতে, ঠাকুরের চোখ আঁকা দেখতে নেই। সব ঠাকুরের চোখ আঁকা হয়ে গেলে আমাদের চোখ খুলতে বলতো। চোখ খুলে দেখতাম মৃন্ময়ী মূর্তি জগন্ময়ী হয়ে উঠেছে, সে অনুভূতি লিখে বোঝানো যাবে না। পুজোর পাঁচটা দিন কী নিষ্ঠার সঙ্গে বারোয়ারি দুর্গাপুজো হতো যা আজ কল্পনা করা যায় না। সন্ধিপুজো ও বলিদান ঘড়ির সঙ্গে পল অনুপল মিলিয়ে সঠিক সময় করা হত। পাড়ার যত ছেলেমেয়ে সবাই প্রায় আমাদের বয়সি, ভোর না ভোর হতে ফুল তুলতে যেতাম। দেখতে দেখতে পুজোর আঙিনায় রাখা ঝুড়ি ফুলে ভরে উঠতো। শিউলি, টগর, স্থলপদ্ম, গন্ধরাজ, জবা, অপরাজিতা, করবী— নানান রকমের ফুল। আমাদের তোলা ফুলেই পুজো হত।

পুজোর পাঁচটা দিন দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে কেটে যেত বুঝতে পারতাম না। মন খারাপ হত বিজয়া দশমীর দিন। বারবার গিয়ে প্রতিমা দেখে আসতাম আমরা। সে বয়সে দুর্গা ঠাকুর বিসর্জন হয়ে যাবে ভেবে আমরা সত‌্যি সত‌্যিই কাঁদতাম আর প্রতিমার চোখেও জল দেখতাম। বয়সটা বোধহয় সেই অনুভূতিতে ভরা ছিল। প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আনন্দের জোয়ারে কিন্তু ভাঁটা পড়তো না। বাড়ি, বাড়ি গিয়ে প্রণাম করা, সেই সঙ্গে নাড়ু, মোয়া, ঘুগনী খাওয়া— সে এক ভিন্ন স্বাদের জগৎ ছিল।

পুজোর আনন্দ-আমরা যে ভাবে উপভোগ করেছি, আমাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিরা তার এক কণাও উপলব্ধি করতে পারে না, এখন বারোয়ারি পুজোয় বাহ‌্যাড়ম্বর বেশি। নিয়ম নিষ্ঠা নেই বললেই চলে। চোখের সামনে প্রতিমা গড়ে উঠত, পুজো থেকে বিসর্জন পর্যন্ত— আজকের প্রজন্মের কতজন দেখতে পায়। রঙ্গীন স্বপ্নে ভরপুর উত্তেজনা উদ্দীপনায় ছাপিয়ে যাওয়া সে সব দিনগুলো আমাদের জীবন থেকে যেমন হারিয়ে গেছে, তেমনি বর্তমান প্রজন্ম আজ সে আনন্দ থেকে বঞ্চিত।


।। তিন।।

আজকাল কেউ আর রূপকথার গল্প শুনতে চায় না। জন্মনোর পর একটু বুঝতে শিখলে সে টিভি-র পর্দায় কার্টুন দেখছে, সে সোনার পালঙ্ক খাটে শুয়ে থাকা রাজকুমারী বা দৈত‌্যরাজ অথবা পক্ষীরাজ ঘোড়ার গল্প শুনবে কেন। আজ কেউ আর কল্পনার জগতে বিচরণ করে না। সবাই বাস্তববাদী বা সম্ভাবনাময় হতে চায়। আমরা কল্পনার জগতটাকে আঁকড়ে ধরে রেখে বড় হয়েছি। হারায়নি কিছু, পেয়েছি অনেক কিছুই, অনেক বেশি। কল্পনাই কিন্তু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। বেড়ে ওঠার সহায়ক হয়। একটা তরুলতা যেমন গাছকে আঁকড়ে ধরে বেড়ে ওঠে, কচি ডগা মাথা উঁচু করে সূর্যালোককে স্পর্শ করার চেষ্টা করে তেমনি কল্পনাকে কেন্দ্র করে ছোট্ট শিশুর জগৎটা গড়ে ওঠে ভবিষ‌্যতের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বলতর করতে। কিন্তু মনের কল্পনা আজ হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে আমাদের সেই সব স্বপ্ন রঙিন দিন। যুগ পাল্টাচ্ছে সেই সঙ্গে মানসিকতা। আমরা যারা প্রৌঢ় অথবা বৃদ্ধের দল তারা হয়তো এই পরিবর্তনটাকে মেনে নিতে পারছি না। তাই নিজের অজান্তে লিখে ফেলি —

“হারিয়ে গেছে ছেলেবেলার 

স্বপ্নরঙ্গীন দিন

রাজকুমার আর পক্ষীরাজে 

ফিরবে না কোনোদিন

ফুলপরীরা ঘুমিয়ে গেছে

দূষণ পরিবেশে

দিঘীর ঘাটে স্নান করতে 

আসবে না রাত শেষে

ভূতপেত্নী দৈত‌্যদানো পালিয়েছে 

সব ছেড়ে

বিজ্ঞান আজ সবার কাঁধে

ভর করেছে এসে।

ঘুমপাড়ানী মাসিপিসি

গ‌্যাছে ঘুমের দেশে

ফিরবে না আর কোনোদিনও

শব্দবাজীর দেশে।

সোনার কাঠি রূপোর কাঠি

সোনার পালঙ্ক খাট

রাজকুমারী নেই কো শুয়ে

নেই কো দৈত‌্যরাজ। 

বিজ্ঞান আজ হাতের কাছে

এনেছে সব কিছু

তারই সাথে রূপকথাকে

হারিয়েছে সব শিশু।”

লেখক ডঃ রমলা মুখার্জী -এর একটি গল্প

  মা ভূতনী



দস্যি অর্কের হঠাৎ পরিবর্তন দেখে ওর স্কুলের ম্যাডামরা তো একেবারে হতবাক। যে ছেলে মোটেই বই ছুঁতো না, একটুও পড়া বলতে পারতো না, সে কিনা সব পড়া একদম বলতে পারছে, বই নিয়ে সবসময় পড়ছে! কি আশ্চর্য কান্ড!

       অর্কের মা তমা মাসদুয়েক হল গত হয়েছেন, তার প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ কারণ বলা যায় অর্ক। অর্কের অতিরিক্ত দুরন্তপনা আর পড়াশোনা না করার জন্যে অর্কের মা খুবই চিন্তা করত। স্কুলবাসেও অর্ক অন্য বন্ধুদের পেছনে লাগত, ভীষণ দুষ্টুমি করত। ইদানিং তো ইচ্ছে করে দেরি করে ঘুম থেকে উঠত, বেশিরভাগ দিনই স্কুলবাস মিস হয়ে যেত। তাই অগত্যা তমা বাইক চড়া শিখে অর্ককে রোজ বাইকে করে স্কুলে দিয়ে আসত, আবার নিয়েও যেত। অর্কর বাবা সুমন তো অফিস নিয়েই ব্যস্ত- তার মোটেই সময় নেই। অর্কের সব দায়িত্বই তাই তমাকেই পালন করতে হত। কিন্তু অর্ক তো মোটেই পড়াশোনা করে না। তাই এবারের সেমিস্টারেও খুব খারাপ রেজাল্ট করেছে। তমাকে সেদিন অর্কর ম্যাডামরা বলেই দিয়েছেন আর অর্ককে স্কুলে রাখা যাবে না কারণ তার পড়াশোনার বুদ্ধি মাথায় না থাকলে কি হবে দুষ্টবুদ্ধিতে মগজ পুরো ঠাসা। অন্য বন্ধুদের টিফিন খেয়ে নেওয়া, বই লুকিয়ে রাখা থেকে মারামারিও করে অর্ক। অর্কর চিন্তাতেই একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল তমা। অর্ককে স্কুলে দিয়ে, স্কুলের মিটিং সেরে অসতর্ক হয়ে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিল সে। তাই দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল। একটা ইলেকট্রিক পোলে সজোরে ধাক্কা লেগে ছিটকে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হয়েছিল তমার।  

      তমার মৃত্যুর পর থেকে অর্কের এই আকস্মিক পরিবর্তনে সুমনও কম অবাক হয়নি। অর্ক তো খুব ছোট, তার তো অনুশোচনা করার বয়স এখনও হয়নি। সবসময় অর্ক ম্রিয়মাণ হয়ে থাকে, মুখে হাসি নেই, দুরন্তপনা নেই। এ যেন অন্য অর্ক। একা থাকতে ভয় পায়, সবসময় মা’কে নাকি দেখতে পায়। খুব চিন্তায় পড়ল সুমন, অফিস কামাই হয়ে যাচ্ছে, চাকরিই না চলে যায় তার। অগত্যা আত্মীয়স্বজনদের পরামর্শে বাধ্য হয়েই সুমন অর্কের নতুন মায়ের জন্য পাপিয়াকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু কি কেলেঙ্কারী, বাড়ির চৌকাঠ যেই পাপিয়া পেরিয়েছে অমনি সে হুমড়ি খেয়ে উল্টে পড়ল। কি করে যে পড়ে গেল বোঝাই গেল না, কিন্তু অর্ক চেঁচিয়ে উঠল, “মা, মা, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল নতুন মাকে, আমি স্পষ্ট দেখলাম।” কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার অর্ক ছাড়া ব্যাপারটা আর কেউ বিশ্বাসই করল না।

     এরপরের কাহিনী আরও দুঃখের। পাপিয়াও মাঝে মধ্যে তারপর থেকে অজ্ঞান হয়ে যেতে লাগল। সেও যেন কিসের একটা ভয়ে সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে থাকে। সুমনের তো খুব মুস্কিল হল। অর্ককে দেখভাল করার জন্যই সুমন বিয়ে করল, কিন্তু লাভ তো কিছুই হলনা, উল্টে অর্কর সাথে পাপিয়াকেও দেখাশোনা করতে হচ্ছে সুমনকে- না চাকরিটা এবার আর থাকবে না সুমনের। সুমন কাছে থাকলে ওদের কোন ভয় নেই, সুমন চলে গেলেই যত ভয় ওদের গ্রাস করে।  

     অর্কের আবদারে পাপিয়া একদিন বিরিয়ানি রান্না করেছে। কিছুই তো অর্ক খেতে পারে না, পাপিয়ার তৈরি বিরিয়ানি কিন্তু অর্ক তৃপ্তি করে খেল। সেদিন স্কুল নেই, স্কুলের ফাউন্ডেশন ডে উপলক্ষে ছুটি ছিল অর্কের। অর্ককে খাইয়ে যেই বিরিয়ানি নিয়ে পাপিয়া খেতে বসেছে অমনি মুরগীর ঠ্যাংটা থালা থেকে উঠে হাওয়ায় ভেসে উঠল আর কে যেন খপ করে ধরে নিল। আবার খেতে যাবে আবার আর একটা ঠ্যাং যেই উঠেছে পাপিয়া খপ করে ঠ্যাংটা ধরে সাহস করে বলল, “কে তুমি? কি চাও? সবসময় আমায় এমন করে জ্বালাও কেন?”

- “আঁমি অঁর্কের আঁসল মাঁ। তুঁমি আঁমার ঁসংসারে ঢুঁকে পঁড়লে জোঁর কঁরে। প্রঁথম দিঁন তোঁমায় ধাঁক্কা মেঁরে ফেঁলে দিঁয়েছিলাম মঁনে আঁছে?”

- মনে আছে। তাহলে সেই ধাক্কা মারা, মাঝে মধ্যেই ছায়ামূর্তির মত ঘুরে বেড়ানো সেসবই কি তোমার কাজ?

- হ্যাঁ আঁমি। আঁমি দেঁখি, পাঁহারা দিঁঁই অঁর্ককে। পঁড়াশোনা কঁরছে কিঁনা? ঠিঁকমতো খাঁচ্ছে কিঁনা? আঁজ তুঁমি অঁর্ককে ছোঁট ছোঁট ঁমাংসগুলো দিঁলে আঁর তুঁমি বিঁরিয়ানির বঁড় বঁড় ঁমাংসের টুঁকরোগুলো নিঁলে, তাঁই আঁমি সঁহ্য কঁরতে পাঁরলাম নাঁ।

- কিন্তু এসব করে তো তুমি অর্কের ক্ষতিই করছ? দেখছ না অর্ক কেমন চুপচাপ থাকে, ভাল করে খায় না, কেবল পড়াশোনাই সব, কেমন রোগা হয়ে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছ না?

- তুঁমি ঠিঁক বঁলছো?

- হ্যাঁ আমি ঠিক বলছি।

- তুঁমি অঁর্ককে যঁদি খুঁব ভাঁলবাস, ওঁর সঁবকিছু খুঁব ভাঁল কঁরে দেঁখভাল কঁর, ওঁকে ভাঁল ভাঁল রাঁন্না কঁরে খাঁওয়াও তোঁ আঁমি শাঁন্তি পাঁব। তুঁমি কঁথা দাঁও অঁর্ককে তুঁমি আঁরও বেঁশী কঁরে যঁত্ন কঁরবে তাঁহলে আঁমি আঁর কঁখনও তোঁমাদের জ্বাঁলাতন কঁরতে আঁসব নাঁ। আঁমি এঁখান থেঁকে নিঁশ্চিন্ত মঁনে চঁলে যাঁব। আঁমার আঁত্মা মুঁক্ত হঁয়ে হাঁওয়ায় মিঁশে যাঁবে। পঁরে আঁবার অঁন্য কোঁথাও নঁবরূপে জঁন্মলাভ কঁরবে।

- ঠিক আছে আমি কথা দিলাম দিদি তোমার ছেলে অর্ককে আমি আমার নিজের ছেলের মতই ভালবাসবো, আদর-যত্ন করব। ওকে ভাল ভাল রান্না করে খাওয়াব, ওকে পড়াবো। তুমি একদম চিন্তা কোরো না।

- প্রঁমিস

- প্রমিস

তারপরই একটা দমকা হাওয়ার ঝড় উঠল আর পাপিয়া দেখল উঠানের আমগাছের পাতাগুলো প্রচন্ড কেঁপে উঠল। বেশ কিছু কাঁচা আম উঠানে পড়ল আছড়ে। কিন্তু তারপর থেকে আর কোনদিন তমা আসে নি অর্ক বাঁ পাপিয়াকে জ্বালাতে।

     সুমন এখন নিশ্চিন্ত মনে অফিসে যেতে পারছে। পাপিয়ার আদরে অর্ক আবার আগের মত হাসছে, খেলছে, তবে পড়াশোনাও সে তার সাথে সমান তালে করছে।  

লেখক অমিত পাল -এর একটি গল্প

 অপারেশন



'বুবাই ঘুম থেকে উঠে পড়ো'- রুমকীদেবী নিজের পাঁচ বছরের ছেলেকে বলে উঠলেন৷


'আমরা আজ ডাক্তার কাকুর কাছে যাব তো মা?'- ঘুম থেকে উঠে বুবাই বলে উঠল৷


'হ্যাঁ বাবা, এখুনি৷'


আসলে বুবাই-এর হার্টে একটা ফুটো আছে৷ তাই বুবাই-এর আজ অপারেশন৷


'আজকের পর থেকে আমি কি খেলতে পারব তো মা?'


বুবাই-এর বাবা রেডি হয়েই ঘরে এলেন এবং ছেলের মুখে এই কথা শুনে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না৷ শুধু বললেন 'নিশ্চয় বাবা, আমি আর তুমি দুজনে একসাথে খেলব৷'

লেখক রানা জামান -এর একটি গল্প

 ভালোবাসার শৈল্পিকতা



এবি পজেটিভ রক্তের প্রয়োজন। রোগী শমরিতা হাসপাতালে। রিয়াজুল দেরি না করে বাইকে চড়ে চলে এলো হাসপাতালে। রক্ত দিয়ে কক্ষ থেকে বের হলে এক তরুণী এসে দাঁড়ালো ওর সামনে।


রিয়াজুল শাহেদ স্মিত হেসে বললো, নো টেনশন, ডু ফুর্তি। এবি পজেটিভ রক্ত সচরাচর পাওয়া যায় না। যখন প্রয়োজন হবে,কল দেবেন। জিরো ওয়ান সেভেন ওয়ান টেন এইট টু সিক্স জিরো ফাইভ নাইন।


তরুণীর কথা বলার অপেক্ষায় না থেকে রিয়াজুল শাহেদ বেরিয়ে এলো হাসপাতাল থেকে।


এক মাস পর একটি অপরিচিত নম্বরের ফোনকল গ্রহণ করলে ওদিক থেকে মেয়ে কণ্ঠ বললো, আপনি কি ঢাকায় আছেন? সেদিন আপনার নামটাও জানা হয়নি।


রিয়াজুল বললো, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে এর আগেও আপনার সাথে আমার কথা হয়েছে।


ঠিক ধরেছেন। মাস খানেক আগে শমরিতা হাসপাতালে রক্ত দিয়েছিলেন। আজও রক্ত লাগবে। আসবেন?


কোথায় আসতে হবে বলুন।


মগবাজার কমিউনিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।


আধা ঘন্টায় রিয়াজুল শাহেদ হাসপাতালে পৌঁছে দান করলো রক্ত। কিন্তু এবার ঐ তরুণীর দেখা পেলো না কোথাও।


ঠোঁট উল্টে রিয়াজুল চলে এলো হাসপাতাল থেকে। Unnamed শিরোনামে তরুণীর মোবাইল ফোন নম্বরটা সেভ করে রেখেছিলো বলেই পরদিন ফোনকল আসায় অসুবিধা হলো না চিনতে।


কলটা গ্রহণ করে রিয়াজুল বললো, কোন হাসপাতাল?


কোন হাসপাতাল মানে?


রক্ত দিতে কোনো হাসপাতালে যেতে হবে না? নাকি এবার আপনার বাসায়?


আরে নাহ! আজ রক্ত দেবার জন্য কল দেই নি।


তাহলে?

আপনি মানুষটা খুব ভালো। কৃতজ্ঞতা জানাতে ফোন দিলাম।


শুধু ফোনে?


কিভাবে চাচ্ছেন আপনি?


সামনাসামনি।

কোনো সমস্যা নাই। কোথায় আসবো বলুন। কোনো পার্কে?


ঢাকার পার্কগুলো তো মোবাইল প্রস্টিটিউট।


তা যা বলেছেন। কোনো হোটেলে?


হোটেল? বাংলাদেশে? দাঁতাল পুলিশ রেইড মেরে প্রসটিটিউট বানিয়ে ফেলবে! আমি পুলিশ থেকে শত মাইল দূরে থাকতে চাই!

তাহলে আমার বাসায় চলে আসুন।


রিয়াজুল শাহেদ বিস্মিত হয়ে বললো, আপনার বাসায়!


অথবা আপনার বাসায়!


বাহ! আপনি খুব স্বতঃস্ফূর্ত ডেটিং-এর ব্যাপারে!


ওয়েস্টার্ন কাল্চার এডপ্ট করতে হলে এমন তো হতেই হবে! আমার বাসার এড্রেসটা আপনার মোবাইল ফোনে টেক্সট করে দিচ্ছি। চলে আসুন। বাই।


মেয়েটির কথাগুলো তখনো কানে বাজছে রিয়াজুল শাহেদের। বাংলাদেশের মেয়েরা এতো ফৃ হয়ে গেছে? ফৃ-সেক্সের দেশে ভালোবাসা নেই, আছে শুধু জৈবিক আকর্ষণ। বাংলাদেশও কি হয়ে যাচ্ছে তেমন?


উবারে করে রিয়াজুল শাহেদ চলে এলো মেয়েটির দেয়া ঠিকানায়। অর্কিডের স্টিক দিয়ে ওকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালো মেয়েটি। ওকে বসতে বলে চলে গেলো ভেতরে। প্রায় সাথে সাথে একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা এলেন। রিয়াজুল শাহেদ দাঁড়িয়ে সালাম জানালো।


ভদ্রমহিলা ইশারায় রিয়াজুলকে বসতে বলে নিজে মুখোমুখি একটা সোফায় বসে বললেন, আমার মেয়েটা দিনের পর দিন কেমন যেনো আলাদা ধরনের হয়ে যাচ্ছে। যে দুইজনকে তুমি রক্ত দিলে ওরা কেউ আমাদের আত্মীয় না-ওর দুই বান্ধবীর আত্মীয়। যখন শুনলো রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না তখন নিজেই রক্ত সংগ্রহের দায়িত্ব নিলো। এই স্বভাবের জন্য ওর হাসবেন্ডও বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে ওর প্রতি।

কবি গোবিন্দ মোদক -এর একটি কবিতা

 প্রত্ন-কথা 



প্রতিটি তিন-পঙক্তি শেষে একবার অল্প-থামা,

তারপর আবার সনিষ্ঠ উচ্চারণ

গলার ওঠানামা... স্বরক্ষেপণ ...

স্বর-যুক্তি ... স্বর-মুক্তি ... আর বিষাদ ...

এভাবেই একসময় শেষ হয় ত্রিপদী কবিতা ...

ফুরায় একলব্যের কাহিনী ...

তখন জনপদ জুড়ে শুধুই অর্জুনের আস্ফালন। 

তবু ইতিহাস দাগ রেখে যায়।

পৃথিবীটা জানে --

প্রকৃত সত্য কোথায় প্রোথিত আছে !

কবি জয়তী দেওঘরিয়ার -এর একটি কবিতা

 প্রতীক্ষা



এ কোন্ বিশ্ব

দেখে জাগে সংশয়!

সারা দেহ ধূলি-ধূসরিত।

তোমার ঐ অপরূপ রূপ 

কে করিল হরণ,কালিমালিপ্ত?

কে সেই হানাদার-বর্বর!

তুমি কি করেছো তারে ক্ষমা?

নিজ শক্তি আস্ফালনে লিপ্ত সারাক্ষণ। 

'আমিই শ্রেষ্ঠ, আমিই বীর'--

প্রমাণ করতেই ব্যস্ত। 

এ ভাবে চলতে চলতে

একদিন লুপ্ত হবেই

তোমার বুক থেকে

আস্ফালনকারীর অস্তিত্ব। 

ভয়ঙ্করের কলোমেঘ

সরে যাবে একদিন, 

সুন্দর সুষমায় পূর্ণ হবে এ বিশ্ব,

তারই প্রতীক্ষায়।

কবি স্বপ্না বনিক -এর একটি কবিতা

 তুমি তো এলে না

           


অনেক বসন্ত কেটে গেছে

শরতের মিঠে হাওয়াই এসেছে, 

তুমি তো এলে না প্রিয়

দেখা তো দিলে না আমায়। 


দীর্ঘ প্রতিক্ষায় বয়ে যায় বেলা

আর কেন লুকোচুরি খেলা

এখনও বাজে বাঁশরী

হৃদয়ে বৃথাই খুঁজে মরি। 


শুনেছি জলে স্থলে আকাশে

সূর্যালোকে অনন্ত মহাকাশে

তোমার পরিক্রমণ দশ- দিগন্তে

দেখা দিও প্রিয় জীবনের অন্তে। 


জানি তুমি আছো জীবন তরঙ্গে

সুখে দুখে আমারই সঙ্গে, 

আমারে ছেড়ো না প্রিয় কভু

সংসারের সকল কাজে থেকো প্রভু। 

কবি সুনন্দ মন্ডল -এর একটি কবিতা

 অনুরাগের আঁচল

          


একান্ত অনুরাগ

ভালোবেসে জীবন কাটানো

প্রেমিক সত্তা

প্রেমিকার আঁচল ধরে ঘোরে।


অন্যদিকে প্রেমিকা

সুখের আশায়

নিজের পরিবার ছেড়ে

প্রেমিকের পরিবারকে আঁচলে জড়িয়ে রাখে।


কবি অভিজিৎ হালদার -এর একটি কবিতা

 বর্ষণ



প্রকৃতির মাঝে চলতে চলতে

            পাখিদের গান শুনতে শুনতে

ফসলের খেত দেখতে দেখতে

            হঠাৎ কখনো জানতে পারিনি!

আকাশের কোণে গভীর মেঘ

            ধীরে ধীরে কালো হতে লেগেছে,

চারিদিকে অন্ধকার হয়ে এসেছে

মনে হয় এখনই গভীর ‌‌বর্ষণ

            আকাশ হতে নেমে আসছে।

শান্ত প্রকৃতির বুক থেকে

            ঝরতে চলেছে গভীর বর্ষণ 

ঠিক এই মূহুর্তে ভেসে আসছে 

দূরে দূরান্তের পশুদের আর্তনাদ

           শুরু হতে লাগলো গভীর বর্ষণ

থেকে থেকে বিদ্যুতের চমকানি ,

           উত্তরের জানালাটার দীর্ঘ শব্দ;

           বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি

এখনও ভেসে আসছে আর্তনাদ!

ধীরে ধীরে বর্ষণ কমতে চলেছে

একটু পরে বুঝি থেমে যাবে।

উত্তরের জানালা দিয়ে শীতল হাওয়া

          প্রবেশ করছে কপাটের ফাঁক দিয়ে।

ঠিক এই মূহুর্তে বর্ষণ পুরো কমে এসেছে

বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করেছি

চারিদিকে জল আর জল

সমস্ত চাষের খেত জলে ডুবে গেছে।

          বনের পশুরা একহাঁটু জলে

          দাঁড়িয়ে আছে প্রচুর কষ্টে।

          প্রচুর ফসলের কি হয়েছে হয়েছে-

          চেয়ে আছি, কিছু করার নেই

          এটাই প্রকৃতির রীতিনীতি

যেটা চলে আসছে পৃথিবীর সৃষ্টি থেকেই।।