Monday, November 1, 2021
লেখক সুজিত চট্টোপাধ্যায় -এর একটি রম্য রচনা
সাবস্টিটিউট
সংস্কার সংস্কার। নিয়ম রে বাবা। বিরক্ত হলেও কিচ্ছু করার নেই। চুপচাপ মুখ বুঁজে পালন করো। হন্নে হয়ে খুঁজে বেড়াও। গোবর চাই গোবর। এক দলা টাটকা গোবর।
অলক্ষ্মী বিদায়ের মোক্ষম উপকরণ। কুলো, কলাপেটো, পিদিম, সিঁদুর সব জোগার কমপ্লিট। একা গোবর বাকি। কোথায় পাবো। দশকর্মা ভান্ডারে চাঁদের মাটিও ইজি এবালেবল, বাট, নো গোবর, আই মিন, কাউ ডাং।
কালী পুজোর রাতে অলক্ষ্মী বিদায়ের আয়োজন। প্রত্যেক বছরই হয়, মানে হয়ে আসছে। কোন অসুবিধে হয়নি। এবার গোবরে আটকেছে।
পাচ্ছিনা বললে তো চলবে না চাঁদু , যেখান থেকে পারো জোগাড় করো। এত বছরের নিয়ম , ঝপ করে ঝেড়ে ফেলে দিলেই হলো। মামদোবাজি। পূর্বপুরুষদের কাছে কি জবাব দেবো শুনি।
খাটাল নেই , গরু নেই ব্যাস। পূর্বপুরুষ যা বোঝবার বুঝুক।
বাজে কথা বলে লাভ নেই , গরু নেই , তাহলে এতো এতো দুধ কোথা থেকে আসছে শুনি।
আরে ধুৎ,, ওসব প্যাকেটের দুধ। সাদা সাদা গোলা জল। আর্টিফিশিয়াল মিল্ক , নো দুধ।
আবার বাজে বকে। চা হচ্ছে , পায়েস হচ্ছে , গেলাসে করে ঢকঢক করে খাওয়া হচ্ছে , নো দুধ?
দুধ হোক না হোক , ওতে গোবর হয়না ব্যাস।
ভারি মুশকিল, কি কথার ছিড়ি। দুধে গোবর হবে কেন ?
দুধে গোবর নয়, যে দুধ দ্যায়, সেই গোবর দ্যায়। এই দুধ যে দ্যায়, সে গোবর দ্যায় না। বোঝাতে পারলুম?
না, বুঝলুম না। বুঝতে চাই না। আমার গোবর চাই।
হবে না। খাটাল লাও, গরু লাও তারপর গোবর লাও।
ও মা , কি হবে গো,,, হায় কপাল আমার। অলক্ষ্মী বিদায়ের কি হবে গো। এতো দিনের পুজো, একটু গোবরের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে নাকি? ধম্মে সইবে? সবসময় মনের মাঝে খিচখিচ করবে , অলক্ষ্মী অলক্ষ্মী,,,,, ওগো কিছু একটা উপায় করবে তো নাকি,,,,,,,,,
উপায় আছে,,,,
আছে ? কি গো?
অনেক দিন এমন বিনয় মাখা আদুরে অথচ আকুলতা ভরা কন্ঠস্বর শোনা যায়নি। কি ভালো লাগে, কি সুন্দর। আবার নতুন করে প্রেম নিবেদন করতে ইচ্ছে করে। মন বলে , ওগো প্রিয়ে, আরও একবার মধুকন্ঠ ঝরাও। জীবন প্রেমসাগরে ডুব দিক। ওগো নির্জনতা , আবার একবার অন্তত এসো, ভুলিয়ে দাও অতীতের কর্কশ হৃদয়বিদারক জ্বালাময়ী বাণী কে।
আছে উপায় আছে।
লংকা আর পাতিলেবু। দরজার মাথায় টাঙিয়ে রাখলে , অলক্ষ্মী ঘরে ঢুকতেই পারবে না, সুতরাং তাড়াবার প্রশ্নই নেই।
ইয়ার্কি হচ্ছে না ? এসব মজা করার ব্যাপার নয়। সংস্কার, নিয়ম। কোনও বাজে ফালতু কথা শুনতে চাই না। আমার গোবর চাই ব্যাস।
মাটি দিয়ে কাজ চালাও।
মাটি? মাটি আর গোবর এক হলো ?
হ্যাঁ হলো। বিজ্ঞান সম্মত হলো।
কি করে??
শোনো , আগে মাটি , তাতে জন্মালো ঘাস। সেই ঘাস গরু খেলো। ব্যাস হয়ে গেল,,,।
কি হয়ে গেল ?
গোবর । ঘাস খেয়ে পটি, গোরুর পটি গোবর। ভেরি সিম্পল।
যুক্তি আছে বটে। ঠিকই তো। খড়, ঘাস এইসব না খেলে গোবর,,,,,, আর এইসব তো মাটিতেই জন্মায়।ঠিকই আছে।
এই প্রথম সঠিক যুক্তি দাতার উদার সার্টিফিকেট পাওয়া গেল। এতদিন নির্ঘাত বিশ্বাস ছিল, বিবাহিত পুরুষ মানেই মাথায় কাউডাং। এখন মনে হচ্ছে , দীপালোক সার্থক। মগজে লেড লাইট ঝিলিক মারছে। আহ,,,,, কি আরাম।
মাটি ? পাওয়া যায় ? সেও তো একই অবস্থা।
ঠিকই বলেছ। তবুও ওই প্রমোটারদের কৃপায় ওটা এখনো পাওয়া যায়।
এরমধ্যে প্রমোটার এলো কোথা থেকে , ওরা কি মাটি তৈরি করে ?
না না,, মাটি কি তৈরি করা যায় নাকি? পুরনো বাড়ি ভাঙছে , নতুন বাড়ি তুলছে। আগে মাটি তোলা পরে বাড়ি তোলা। তারপর টাকা তোলা। টাকা মাটি , মাটি টাকা। বলি, বুঝলে কিছু ?
বুঝে আর দরকার নেই। মাটি দিয়েই কাজ চালিয়ে নিই কি বলো ?
অবশ্যই । পূর্বপুরুষদের অত অবুঝ ভেবনা। তারা জানে, যখন যেমন , তখন তেমন । তাদের সময়ে খাটাল ছিল, গরু ছিল, খাঁটি দুধ ছিল, টাটকা গোবর ছিল। এখন সেসব ইতিহাস। এখন দুপেয়ে অঢেল গরু। শুধু শিং বাগিয়ে গুঁতোতে ওস্তাদ।চিড়িয়াখানা তে গরু রাখার চল নেই। ইস্কুলেও এখন আর গরুর রচনা লিখতে শেখায় না। গরু এখন রাজনৈতিক ইস্যু। গণধোলাই। সুতরাং চালাও পানসি। গোবেচারার মতো গোবরের বদলে মাটিই মানিয়ে নেওয়া কিংবা মেনে নেওয়াই ভালো। জয় গোমাতা।
অগত্যা,,,,,, উপায় তো নেই। সত্যিই তো , যখন যেমন তখন তেমন। মাটিতেই মানিয়ে নেওয়া ভালো।
তবে , কোনও গ্যারান্টি নেই জানো। আর কিছু দিন পরে হয়তো এও মিলবে না। সাবস্টিটিউট ভেবে রাখো। সারমেয় ডাং ইজি এবালেবল। হা হা হা হা,,,,,
ছি ছি ছি ছি,,,,,,,,,
লেখক তীর্থঙ্কর সুমিত -এর একটি রম্য রচনা
নদী কথায় ভেসে যায়......
(১৫)
আজকে আরো একটা সন্ধ্যা যে সন্ধ্যায় ভালোবাসার পাহাড় জমে প্রতিনিয়ত।আর ভালোলাগার বাহুল্যতায় সৃষ্টি হয় এক একটা দর্পণ।যে দর্পণে মুখ দেখতে দেখতে হারিয়ে যাই কথাদের ভিড়ে।কথার পাহাড় পাশে জমতে জমতে সৃষ্টি হয় ভালোবাসার মুখ।যে মুখে লুকিয়ে থাকে কত সৃষ্টির রসদ।তার একপাশ দিয়ে বয়ে যায় ভালোবাসার নদী।যে নদী সৃষ্টি করে আগামী কে।আর তার দিকে তাকিয়ে থাকি আমরা ...
ভবিষ্যতের কথা বলতে।
নদী কথায় ভেসে যায় .....
(১৬)
কিছু কথা বেশি না হলেও যেটুকু দরকার ঠিক সেটুকুই অভিযোগ পূর্ন।হয়ত বা কথার পাহাড় থেকে কিছু কথা সাজিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা বসে আছি।একে অপরের দিকে নানা প্রশ্ন -- বিস্তারিত আলোচনা এখানেই সৃষ্টি হয় নদী কথা।আর গল্পের গল্প সাজিয়ে নেয় উপন্যাস।এভাবেই ফিরে আসে কত চাওয়া পাওয়ার অভিমান।এই অভিমান জমতে জমতে শুরু হয় অভিনয়।
সব অভিমান ই একদিন ভেসে যায় নদিকথায়।
লেখক সত্যেন্দ্রনাথ পাইন -এর একটি গদ্য
পরিবেশ বান্ধব বাজি
এই পরিবেশবান্ধব বাজি বলতে কী বোঝায়-- এটাই তো আমার বোধগম্য নয়। কেন কিসের জন্যে এই পরিবেশবান্ধব বাজি পোড়ানো চলবে!? কী ধরনের কীভাবে পরিবেশবান্ধব বাজি বলে বাজারে স্বীকৃত হবে? যদি কোনও বাজি কারখানার মালিক পরিবেশবান্ধব স্টিকার লাগিয়ে দিয়ে বাজি বাজারে ছাড়েতাহলেই কি পরিবেশবান্ধব বলে পাশ হয়ে যাবে!? কে প্রমাণ করবে-- পরিবেশবান্ধব বাজি বলতে কী বোঝা যায়! আসলে এর দ্বারা পিছন দরজা দিয়ে অন্য নিষিদ্ধ বাজিকেই অনুপ্রাণিত করা হলো না্ তো! আপনার কী মনে হয়। কেন আতস বাজি পোড়ানো স্বীকৃতি পাবে? কোনো জায়গায় প্রশাসনিক প্রধান কিছু বেশি টাকা নিয়ে ( না না ঘুষ বলবো না;চাঁদা নিয়ে)প্রতিবন্ধকতায় আটকে থাকা বাজিকেই স্বীকৃতি দিতে আদালতের আইনকে টাটা বাই বাই করছে , নাকি বাজি পোড়ানো র ব্যাপারে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বেশি করে!?!? ভাবতেই অবাক লাগছে।
পরিবেশ দূষণ, বায়ুদূষণ করবে সব ধরণের বাজিতেই। সেখানে "পরিবেশবান্ধব" বাজি আবার কী!? মাথায় আসছে না। অতএব মানুষের মনের পরিবর্তন প্রয়োজন। যতক্ষণ না কোনও পরিবারের কেউ এই বাজি থেকে বা বাজির ধোঁয়া থেকে অসুস্থ না হচ্ছে ততক্ষণ বোধহয় সেই পরিবারের কেউই বুঝতে চাইছেন না এর পার্শ্ব বিষক্রিয়া। কেন?
মাননীয় হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পেছন দরজা দিয়ে বাজি পোড়ানো স্বীকৃতি পেল না তো! কার কী মনে হয়! কোনো সময় আধঘন্টা বা কখনো দু ঘন্টা সময় নির্ধারণ তো ছুতো মাত্র। না। চলবে না। বাজি বিক্রি নয়, বাজি তৈরির কারখানার হদিস পেলেই তৎক্ষণাৎ তার সমস্ত কিছু বাজেয়াপ্ত করা হোক। বাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষিত হোক। আমি পরিবেশবিদ নই। কিন্তু নিজস্ব জ্ঞানের ভান্ডারে যতটুকু সঞ্চিত বিদ্যা আছে তার থেকে বলছি-- পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সকলেই ভাবুন--সকলেই ভাবুন-- আওয়াজ করে আনন্দ না মনের অন্তর্ভুক্ত আনন্দই আসল আনন্দ! বাজি পোড়ানো বা ফাটানো সর্বৈব নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক।
লেখক শ্যামল চক্রবর্ত্তী -এর একটি গদ্য
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো গল্প হলেও সত্যি
সুমন : সবুজ , বাবা লোকনাথের মূর্তিটা তোর নিজের হাতে বানানো । বাহঃ বেশ সুন্দর তো ।
সবুজ: হ্যাঁ আমার নিজের হাতে বানানো।
সুমন, এত জাগ্রত ভাবতে পারবি না । তুই রনে বনে জঙ্গলে যেখানে থাকবি , কোন বিপদে পড়লে তুই বাবা লোকনাথ কে ডাকলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে । আমার কথা মিলিয়ে নিবি। এর একটা ইতিহাস আছে বলছি তাহলে শোন--
বনি : ভাই ,অনেক চেষ্টা করে কোথা থেকে তো লোকনাথ বাবা কোন ফটো পাইনি। তুই মাটি দিয়ে একটা লোকনাথ বাবার মূর্তি বানিয়ে দিবি ? আচ্ছা, আমি চেষ্টা করে দেখছি। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি সালটা ঠিক মনে নেই ।অনেক ছোট হঠাৎ করে একটা মাটির ঢেলা জোগাড় হয়ে গেল । বাবা লোকনাথের মূর্তিটা অবিকল বানিয়ে এবং সাদা অঙ্গরাজ করে ফেললাম। ওই মাটির মূর্তি টি দিয়ে সেই বছর ( সালটা ঠিক মনে নেই ) ঊনিশশে জ্যৈষ্ঠ লোকনাথ বাবার তিরোধান উদযাপন হয়েছিল। দিদি নিষ্ঠা সহকারে বাবা লোকনাথের পুজো করেছিল। পোলাও, পায়েস, নানারকম ভাজা সঙ্গে থাকে অমৃতি জিলাপি, কাচা বাদাম, আমসত্ত্ব ,সবেদা যা যা ওনার খুব প্রিয় সাধ্যমত উপাচার করা হয়েছিল।
পুজোর পর বাবা লোকনাথের মূর্তিটা ভাসান দেবে বলে, বারান্দার একপাশে রেখে দিয়েছিলাম।
পুজোর দুদিন পর হঠাৎ করে রাত্রিবেলা স্বপ্নে দেখছি, বাবা লোকনাথ কে ভাসান দিতে নিয়ে গিয়েছি এঁড়েদা (আড়িয়াদহ ) ঘাটের গঙ্গার জলে।
হাতে করে যখন গঙ্গার জলে ভাসান দিচ্ছি হাত থেকে তখনো ছাড়িনি, সামান্য ডুবিয়েছি দেখছি। যেতে চাইছে না কাঁদছে , যেন একটি ছোট শিশু।
হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
পরের দিন সকালবেলা মাকে ঘটনাটা বর্ননা করলাম। মা বললো এক্ষুনি মূর্তিটাকে আসনের স্থাপন করতে হবে।
লেখিকা মৌসুমী চন্দ্র -এর একটি গদ্য
প্রথম খোলা জানালা তোমার ছোঁয়ায়
মনের খোলাজানালা দিয়ে প্রথম হাসতে শেখা, কাতুকুতু বুড়ো, ভয় পেও না এই সব কবিতার হাত ধরে। ছোটবেলায় খুব দুষ্টুমি করলে যখন খুব মার বকা খেতাম, গুমরে কেঁদে, কখনও বার করতাম সন্দেশ,আবোলতাবোল। বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই পড়ে শিখেছিলাম জীবনের হিসাব। কাঁদুনে,ডানপিটে, বুঝিয়ে বলা,আহ্লাদী, সৎপাত্র আমার জীবনে এনেছিল খুশির সমুদ্র। আবোলতাবোলের
কার্টুনচিত্র প্রথম পেনসিল, তুলি ধরতে শিখিয়েছিল।যে কবিতা, গলা দিয়ে ছবি আঁকতে শিখিয়েছিল,সেই বাবুরাম সাপুড়ে। জীবনে প্রথম বইপ্রীতি,অঙ্কনপ্রীতি,কবিতা আবৃত্তির প্রতি ভালোবাসা জন্মানো,লেখালিখি যাঁর হাত ধরে আজ তার জন্মদিন।
একজন চিত্রশিল্পী, রম্যরচনায় সিদ্ধহস্ত,কলমের খোঁচায় গিজগিজ করা হাসির খোরাক, সেই হাসির যাদুকর, শ্রদ্ধেয় সুকুমার রায়ের আজ জন্মদিন।আমার মনের খোলা জানালায়, আজকের সামাজিক প্টভূমিতে দাঁড়িয়ে, গুরু তোমার সুর শুনতে পাচ্ছি," মশাই এখন কেন কাবু? বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব কোরো পিছে...."
শ্রদ্ধা জানাই আমার প্রিয় শিল্পীগুরু সুকুমার রায়কে তাঁর জন্মদিনে। আমার মনের জানালাটি যেভাবে খুলে দিয়েছিলে গুরু, প্রার্থনা করি তোমার জন্মদিনে তোমার সৃষ্ট শিল্ল যেন তেমনি করেই সবপ্রজন্মের মানুষের মনের জানালা খুলে দেয়।
লেখিকা রোকেয়া ইসলাম -এর একটি গদ্য
স্মৃতি বিস্মৃতির জোছনায়
মায়াবী কোমল স্নিগ্ধ রুপালি আলোতে ভরপুর এক উপগ্রহের নাম চাঁদ। সূর্যের কাছ থেকে চেয়ে চিন্তে আলো নিয়ে যখন তার মোহনীয় রুপ নিয়ে হাজির হয় পৃথিবী গ্রহের মানুষেররা তার রুপে বিমুগ্ধ হয়ে যায়। আরজুও তার ব্যাতিক্রম নয়। আরজুর ভেতর উথলে ওঠে চাঁদের সজীব ভালবাসা।
মায়ের মৃত্যুর পর চাঁদ ওর কাছে মা , মুক্তিযুদ্ধের সময় একদিন সফল অপরেশন শেষে দল নিয়ে ফিরছিল, ঘাড়ে আরিফের শরীর , পুকুরের পাশে আরিফকে শুইয়ে ক্লান্ত তৃষ্ণার্ত আরজু জলের কাছে যায়। অবরুদ্ধ কান্নাকে বুকের গভীরে চাপা দিয়ে আঁজলা ভরে জল পান করে।
আরজু বুঝতে পারে আঁজলায় টুপটাপ করে চোখের জল মিশে যাচ্ছে,
বিপ্লবীর চোখে জল মানায় না, ভেতরে একখন্ড আগুন ঢেউয়ে ভেঙে দুলছে।
দৌড়ে আরিফের পাশে এসে বসে, সরাসরি আকাশে চোখ রাখতেই আরিফ বুকের গভীরে কথা বলে ওঠে।
- তোরা হেরে গেলে আমাদের চিহ্নও খুঁজে পাবি না বন্ধু, তোদের জিততেই হবে।
দেশ স্বাধীন হবার পর আর্মি ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করে রিনাকে।
ওকে হাসপাতালে রেখে বাড়ি ফিরে বসেছিল নারকেল গাছতলায়, সেদিনও আকাশে ছিল ডগমগে চাঁদ।
বারবার চোখ আঁটকে যাচ্ছিল চাঁদের কলঙ্কে।
কি অপরুপা চাঁদ তার কি মোহনীয় আলো! অপূর্ব সৌন্দর্যে মোহিত করছে পৃথিবীবাসীকে!! কেউ তো মাথা ঘামাচ্ছে না তার কলঙ্ক নিয়ে।
তাহলে রিনা!!
রিনার চলে যাবারদিনও ছিল এমনি গহন পূর্ণিমা।
দীর্ঘকাল শহরে বসবাস করলেও বুকের গভীরে লালন করে ওর এই গ্রামে। ছুটিছুটায় দেশের বাইরে ঘোরার চেয়ে নিরিবিলি কয়েকটাদিন গ্রামে কাটাতেই বেশি পছন্দ ওর।
এবার দীর্ঘদিন পর এসেছে গ্রামের বাড়িতে, শরীরে নানাধরণের রোগ বাস করছে ওকে অতি আপন ভেবে।
গ্রামের বাড়িতে গাছতলায় বাঁধানো বেঞ্চে একা একা বসে আছে
হেমন্তের মিহি শীতল বাতাস ওকে আরাম দিচ্ছে, আর কতদিন আসতে পারবে মায়ের মত গ্রামটিতে, বাবার এই পবিত্র বাড়িতে, জানে না আরজু।
শুধু এটুকু জানে এখানে এলে ওর অতীত ওকে কাছে নেয় ভালবেসে, স্নেহে।
ওর স্কুল, খেলার মাঠ, নদী, বৃক্ষ, সব ওর চেনা আত্মার স্বজন।
অথচ জীবন যৌবনের হিরন্ময় সময়টুকু নিঃশেষ করলো শহরে। শহর ওকে কি দিলো? আর ওর কাছ থেকে শহর কতটা নিংড়ে নিলো, মনের ব্ল্যাকবোর্ডে অংকের হিসাবে জ্যামেতিক নকশায় আঁকছে।
আহা জীবন কত দ্রুত ফুরিয়ে যায়!
কয়েক বছর আগে এলেও দেখা হতো শৈশব সাথীদের সাথে, তাদের কেউ চলে গেল, কেউ রোগের সাথে মিতালি, করে মৃত্যুর সাথে কানামাছি খেলছে ।
আরজুও তো দাঁড়িয়ে আছে তেমনি কানামাছির খেলার দলে।
আজ ওর মনটা ফুরফুরে।
আকাশে ডগমগে হেমন্তী পূর্ণিমার অনন্য আলোময় চাঁদ।
ওর কাছে এসে মা আদুরে ভঙ্গিতে বসে, বাতাসে বাতাসে হাত বুলিয়ে দেয় ওর সমস্ত মুখে, ফিরে তাকাতেই আরিফ এসে দাঁড়ায় হাতে স্টেনগান। আরিফ আর আরজুর মাঝখানে রিনা দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক যেমন কলেজের বারান্দায় দাঁড়াতো।
আরজু উঠে দাঁড়াতেই তিনজন হাত ধরে হাঁটতে থাকে ধান ক্ষেতের আইল ধরে।
নারকেল গাছতলায় এসে গাছটা আঁকড়ে ধরে আরজু, চিৎকার করে ডাকতে থাকে, কেউ পিছু ফেরে না।
শুধু বাতাসে নারকেল পাতার সরসর শব্দ হয়। আকাশে চোখ রাখে। পরিপূর্ণ চাঁদটা নারকেল গাছের উপরে উঠে গেছে। চাঁদটার চারপাশ জুড়ে জলধণূ ।
দোতলায় শোবার ঘরে দক্ষিণের জানালা খুলে দিতেই , হুড়মুড়িয়ে জোছনা বিছানায় লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে।
আরজু জানালায় দাঁড়ায়।
সামনের সোনালী ক্ষেত থেকে পাকা ধানের মৃদু সঙ্গীত বাতাস মুঠো ভর্তি করে তুলে আনছে চঞ্চল কিশোরীর হাতে।
আরজুর জীবনে আর কি কেউ এসেছিল, যে জোছনা ভালবাসতো, কে সে কে?
আজকাল বিস্মৃতিও ওকে আপন করে নিয়েছে।
নিকট অতীত ভুলে গেছে, দূর অতীত মনে পড়ে।
সে কি ওর নিকট অতীত? কে কে! ?
এমনি পূর্ণিমায় সে উতলা হয়ে পড়তো অপরুপা জোছনা অবগাহনে।
আরজুর মাথার ভেতর সুক্ষ্ম যন্ত্রণা হয় , কিছুতেই মনে করতে পারে না কে ছিল এতোকাল ওর পাশে? সে কোথায় চলে গেল কেন চলে গেল?
বুকের ভেতরটা নদীর চরের মত ফাঁকা লাগছে,
অনেকদূরে একটা ছায়া নড়ে ওঠে। কে ও।
চিনতে পারছে না কেন ওকে?
রুপালি চরে বালির মত চিকচিক করছে তার বসন। ওর বসন অতো শুভ্র কেন?
ওকি কখনো শুভ্র রঙ পছন্দ করতো।
চাঁদটা আঁটকে আছে তালগাছের মাথায়, ছড়িয়ে পড়েছে অকাতর জোছনা।
আরজু মনের ভেতর ক্রমাগত আতিপাতি করে খুঁজছে কেউ ছিল এতোকাল ওর কাছে খুব কাছে। সেই কে? কোথায় গেল? কে সে?
দূরের ছায়াটা কার??
চাঁদটা তালগাছের উপরে উঠে গেছে। আরজু আবার তাকায় চাঁদের দিকে, প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে পড়ে,
স্নিগ্ধ আলোর চাঁদ একটু ইশারা দাও কে ছিল ওর কাছে? দূরে ও কে?
তাকে চেনাটা খুব প্রয়োজন এখন ওর।
কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না তাকে!
দুহাত দিয়ে নিজের মাথার চুল টানতে থাকে। নাহ! কিছুতেই মনে পড়ছে না কিছুতেই না!!
চাঁদকে ঢেকে দিয়েছে পলকা মেঘ,
মেঘও আস্তে আস্তে সরে আসছে চাঁদের কাছ থেকে।
দ্যূতিময় হাসিতে মেঘমুক্ত চাঁদ নীল আকাশে ভাসতে থাকে,
আরজু তাকিয়ে থাকে নিবিড় জোছনায় স্মৃতি বিস্মৃতির জাগরণে....
প্রাবন্ধিক ভানু শঙ্কর -এর একটি প্রবন্ধ
বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেঁড়ো
একটা ভুলকে ঢাকা দিতে গিয়ে আবার একটা মহাভুলের পাহাড়! এ যেন সূর্যের কাছে পৌঁছতে না পেরে হ্যারিকেন- আলোর সন্ধান করা। বা মানব বন্ধন বাজির অনুমতি দেবার মতোই ঘটনা।যদিও আমার নামের আগে পরে কোনো সেলিব্রেটি তকমা নেই একজন অতি সাধারণ জীবিত নাগরিক মাত্র আমি। তাই -- কী বলছি খুলেই বলি -- জাতির মেরুদন্ড হচ্ছে শিক্ষা। সেই শিক্ষাটাকে জলাঞ্জলি দিতেই কি কোনও বিশ্ব নিয়ামক এই বিধান দিচ্ছে! মনে হয়। ইতিপূর্বে যাঁরা মারা গেছেন তাঁরা নাকি করোনায় ভুগে আক্রান্ত ছিলেন। ভুল। ভুল। ভুল। তাঁরা হয়তো অন্য কোনো রোগে মারা গেছেন। শুধু নামকরণে কী আসে যায়! গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন সে তো সুগন্ধ দেয় সুগন্ধই দেবে। এই করোনা নামকরণটাও হয়তো চিন আবিষ্কার করেছে- হতে পারে। যেমন ঝড়ের আজকাল নতুন নতুন নামকরণ হচ্ছে। যে দেশ নাকরণ করলো ( আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে)ঝড়ের তীব্রতা তাতে কম না বেশি সেটা কি ঐ নামকরণের মধ্যে নিহিত থাকে ? সেই দেশটাই কি ঝড়ের উৎপত্তি স্থল! না। সেই রকম একটা নতুন রোগের নামকরণ করে কোনও বিশ্ব নিয়ামক সংস্থা শিক্ষাটাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে তৎপর। না হলে বার, রেষ্টুরেন্ট , বাস, ট্রেন, বাজার খোলা আর শিশুরা স্কুলে গেলেই করোনা আতঙ্ক!
আসলে, কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মানুষ নিজেদের কতৃত্ব কায়েম রাখতেই বোধহয় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এমন আঘাত করে তাকে শেষ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। কারণ তাদের মস্তিষ্কের মধ্যে জেগেছে শিক্ষিত হলে যে বিচার বিশ্লেষণ এসে আঘাত করবে মনের দরজায়। তখন মানুষ ঠিক না ভুল বুঝতে পারবে। তাই শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার কূট চক্রান্ত করে অশিক্ষিত রাখার প্রয়াস বলেই মনে হয় আমার। তাই স্কুল বন্ধ।
কেন এখনও স্কুলের দরজায় তালা!? করোনা বাড়ছে এই অজুহাত দিয়ে-- -- আবার বন্ধ বা লকডাউনের প্রস্তুতি নয়তো!? নাহলে নবম দশম শ্রেণী থেকে স্কুল খুলবে আর একদম শিশু মন আঙুল চুষবে? কে এমন বুদ্ধি যোগাচ্ছে!
ওগো মনোবিজ্ঞানীগণ ! দয়া করে ভেবে দেখুন কী মারাত্মক ক্ষতি আমাদের আমরা করছি!? স্কুল খুলুক। ক্লাস চালু হোক--। একদম স্বাভাবিক হোক সবকিছু। সরকার ভাবছে হয়তোবা আমার কত ক্ষমতা! আমার নির্দেশ ছাড়া স্কুল কলেজ বন্ধ। হ্যাঁ এতে সরকারের তৃপ্তি উৎপাদন হচ্ছে হয়তো। কিন্তু সব যে শেষের পথে! খুলে দিন স্কুল। শিশুদের বাবা মা রা আনন্দে গা না ভাসিয়ে শিক্ষা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হবার সুযোগ পাক।
যদি সত্যিই করোনা বলে কোনও রোগ থেকেও থাকে তাকে নির্মূল করতে স্কুলের দরজা বন্ধই কি যথেষ্ট মনে হয়! কী ভাবছেন নেতা নেত্রী সহ সমস্ত সরকার বাহাদুর?!
আমার মতো বেশ কিছু মানুষ জানেন-- করোনাটা কোনও রোগই নয়। এটা শুরু থেকেই ভাঁওতা। যে ডাক্তার বাবু অল্প ভিজিট নিয়ে ডাক্তারি করতেন তিনিও ঐ করোনা রোগের ভয় দেখিয়ে ভিজিট বাড়াতে পেরেছেন। হাতুড়ে ডাক্তার মাত্র ত্রিশ টাকার ভিজিট নিতেন এখন সেটা সত্তর টাকা; ভাবা যায়! কেননা করোনা আতঙ্ক! হঠাৎ কী এটা হয়!? এই রোগের নামকরণটাও হয়তো চিনই করেছে-- তাই হয়ত ভাবছি-- রোগটা চিন থেকে এসেছে। এটা সর্বৈব ভুল। ঝড়ের নামকরণ যে দেশই করুক না কেন ঝড়ের দায় কি তার!? না। সেটা যেমন সত্যি। এটাও তাই।
অতএব কাউকে বিদ্রুপ বা কারোর বিরুদ্ধে বিষোদগার না করেই বলছি-- "শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড"ভেবে শিক্ষা চালু করা হোক-- এখনই এই মুহূর্তে।
নইলে ঐ বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেঁড়ো হয়ে সবই মিথ্যে হয়ে যাবে!
নবম শ্রেণী থেকে নয় সব স্কুল শ্রেণীর দরজা খুলে দেয়া হোক যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখনই। এছাড়াও প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকরা বসে বসে মাইনে গুনছে আর ছেলেদের মাথা খাচ্ছে কারণ --সুধা বিলিয়ে অন্তত যারা সমাজের ক্ষতি না করেও ভালো ছিল তাদেরকে বিলাসবহুল মদ বা কারণ সুধা খাইয়ে সমাজকে দূষিত করছে। । সেটাও বন্ধ হবে তাহলে। সবকা বিকাশ সবকা সাথ।বন্দে মাতরম। জয় হিন্দ। জয় বাংলা।
লেখিকা মায়া বিদ -এর একটি নাটক
জীবিকার সন্ধানে
(দুটি চরিত্র - মদনা ও কাঙালী)
মদনা - ওরে কাঙালী, আর আপতাফ কইরে আমাদের দুর্গিকে মারিস ল্যাই ।
কাঙালী - মারবো ন্যাতো তুলে রাকবো। ছামোতেই দুর্গিপূজ্যা, কিছু ট্যাহা ধারকর্জ কইরে সিনদুর, আলতা বিকাতে তো পারো - - -
মদনা - কি কুথা কইলা গো, ইটাতো ভাইব্যা দেখি ল্যাই।
কাঙালী - সগল সুমায় লেশায় বুদ থাকলে - - - - - -
আমার হোঙাছে যত জানের পিরশানি।
ম:--, যা ক্যানে মিত্তিরিদের কাছটাতে, হাতে - পা য়ে পড়ে ব্যাগাত্তা করে কিছু ট্যাহা লিয়ে আয়।
কা: - ট্যাহা এনে দিই আর কি। ট্যাহা এনে দিলেক তুমি আবার মদ খাবেক। উটি হবেক ল্যাই দুর্গির ব্যাপ ।ইবারে আমি আলতা , সিনদুর লিয়ে গিরামে গিরামে যাবোক ।
ম: - - এ্যা বাবা - তু যে মিঁয়া মানহুষ। লুকে কি বুলবেক বুল?
কা: - - - যা বুলবে বুলবে। এখুন সগ মিঁয়ারা বাবোস্যা করেক ।আমিও করবোক। প্যাটটোতে ভাত ল্যাই আবার বুরহো বুরহো কুথা।
ম: —— আমি ও যাবোক ফেরি করতে। তু পুব গিরামে গেলে আমি পছি গিরামে যাবোক।
কা: —-— তুমার মুরোদ আমার জানা আছেক। মুরগীর দৌড় মোল্লাপাড়া ইস্তক। সুরীখানা লজরে আইলেই হলোক, ঝুপ কইরে ঢুইকে গলা ভিজাবা।
ম: —— লারে, আমাদের দুর্গি খুব কাঁদতেছিল ফুঁফাইয়ে ফুঁফাইয়ে ।আর বলছিলক মা দুর্গি এমোন ব্যাপ-মায় দিলিক একডা লতুন পিরান চোখি দেখতি পায় না, হাতে ল্যাড়া তো দূরের কুথা। কুথাটা শুনা ইস্তক কানেতে বাঁজতেছেরে।
কা: -—— সগই সমঝাছো যখুন, তখুন চলো বেড়াঙ পড়ি।
সিনদুর লিবেক গো সিনদুর,
আলতা লিবেক গো আলতা ।
ছিমতী আলতা, সিনদুর - খুকুমণি আলতা সিনদুর ।
টকটকানি অঙ, জিলিস দ্যাইখ্যা দাম দিবেক গো মা জননীরা।
।
ম: —— ভুরি সিনদুর আছেক ভুরি সিনদুর।
থান সিনদুর আছেক, থান সিনদুর ।
পূজ্যার আলতা - সিনদুর আছেক গো ।
কি:—— বুরহো গুরিব আছিক ।ঘরেতে মিঁয়াটা আছাড়ি-পিছাড়ি কাঁদতেছে।গিন্নিমারা মুখ ফিরাঙ চলে যাইয়ো না।
সিনদুর - আলতা ফিরাতে ল্যাই মা, সোয়ামীর অকল্যাণ হবেক গো।আমরা এক চিলতে সিনদুরের মর্ম বুঝি মা। জনম জনম এয়োস্ত্রী থাকবা মা।
সিনদুর ল্যাউ গো সিনদুর ।
ভ্যালা ভ্যালা সিনদুর - আলতা আছেক গো।
ম: —— সারাডা দিন টোটো কইরে ঘুইরা কয়ডা ট্যাহা হলোক রে কাঙালী?
কা: —-— তুমার ক'ট্যাহা হলোক? আমার গুটা পঁছাস ট্যাহা মতোক ।
ম: —– আমার কাছে কেহুতো কিনতে আসতেছে ল্যাই। গুটা বিশ মতোক হঙাছে।
কা: —— কয়ডা দিন যাবোক ইধার - উধার
।তুমি কি যাবেক?
ম: —— হ যাবোক, আরো বিকাতে পারলে পদে খুকিডার একডা জামা-প্যানটুল কিনহে দিবোক ।
কা: —— মা দুর্গি মুখ তুলে চেয়াছেক গো। মা তুমি আছোক গুরিবের সাথে। ভ্যালায় বেচা-কেনা হলোক ।ইবার পূজ্যাতে আমাদের দুর্গি আর কাঁদবেক ল্যাই
ম: - —- ঠিকয় বুলাছিস।আমরা বাবোস্যা করবোক। মা দুর্গির দিখানো পথেই চলবোক বুঝলি।
কা: ——. আমরা মিঁয়াটাকে মানহুষ করবোক ।গতহর খাটাঙ যে খাবোক। আলতা - সিনদুরের মান সব্বাই দিবেক।
চলো ফেরি করি —––
আলতা সিনদুর লিবেক গো ——
ছিমতী সিনদুর - আলতা, খুকুমণি সিনদুর - আলতা আছেক ।লিবেক গো পূজ্যার ডালায় দিতে সিনদুর - আলতা।
Sunday, October 31, 2021
লেখক শ্রাবণী মুখার্জী -এর একটি গল্প
বিপরীতে
সুবিকাশ ও সরমা পাশাপাশি বসে আছে গাড়ির মধ্যে কিন্তু দুজনার মুখই দুইদিকে ঘোরানো , দুজনেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছে যেন খুব মন দিয়ে ,
চোখে চোখ রেখে কথা বলছে না আর, । সুবিকাশ ভালো করেই জানে তীর লক্ষ্যভেদ করেছে , সঠিক প্রয়োগ হয়েছে ,এবার জ্বলুক সরমা ।
সরমা ও বুঝলো এতোদিন যাকে ঘিরে এই লড়াই চালিয়ে এসেছে , হয়ত সবাই সমান নয় এই ভাবনায় একটু করে উঠে দাঁড়াবার সাহস করছিলো, সেও একই।
বাইরের লোকের একটা কথাতে বিশ্বাস করে ভুল ধারণা করে তাকে ঘুরিয়ে নাক দেখানো হয়েছে।
সম্পর্কে চিড় ধরে যদি বিশ্বাস ও ভরসা না থাকে ।
সুবিকাশের সাথে সরমার বিয়ে হয়েছে মাত্র একবছর হলো , কিন্তু তারা পূর্ব পরিচিত , অনেকদিন থেকেই বিভিন্ন মহলে দেখেছে ,সেভাবে কথা না হলেও তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য একে অপরের অজানা নয় ।
সুবিকাশের ব্যাকিং কাজ থেকে শুরু করে অফিসিয়ালী সব কাজেই সরমা একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে । একসময় সুবিকাশ খুব উপকার করেছিলো সরমার তাই সরমা ও পাশে দাঁড়াবার সাহস করেছে ।যখন সরমার নুন আনতে পান্তা ফুরাতো , নিজের ঘরের অভাব ঢাকা রেখে সে সুবিকাশের সাহায্য করতো যখন যা প্রয়োজন তাই মিটিয়ে ,
সুবিকাশ ও সরমা যেমন ঝুরঝুরে ভালোবাসা দিয়ে তাদের প্রেমের বাগান তৈরী করেছিলো তাতে পুরো বাগানে নানা রঙের মেলা বিখ্যাত হবে এই আস্থা ছিলো । বিগত জীবনের সব দুঃখ হাসিমুখে ভুলতে বসেছিলো সরমা ।কিন্তু ইদানীং দেখছিলো সুবিকাশ কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে ,কথা কম বলে ,ফোন করলে ধরে না , ফোন ধরলেও অফিসে আছি বলে কেটে দেয় ।
ঈশান কোণে মেঘ ধরেছে আজ বৃষ্টি হবেই .. প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হোক ,ধুয়ে নিয়ে যাক মনের সব কালিমা। সেই সেদিনের মতো দিন যেন ফিরে আসে জীবনে ।
বারান্দায় টবে একটা পাতাবাহার গাছ লাগিয়েছিলো দুজনে মিলে , সুবিকাশ বলেছিলো এর লতানো কান্ড হলো আমার বাহু ,যে পুরো বাড়ি, সংসার বাহুবেষ্টিত করে সুরক্ষা দেবে আর তুমি হলে এর মূল , তোমার উৎস তেই এর প্রাণ সঞ্চার হবে নইলে নিস্তেজ ...বুঝলে আমার পাগলি ..বলে কাদা আঙুলেই গালটিপে একটু আদর করে দিলো ।লজ্জায় সেদিন মুখটা নামিয়ে নিয়েছিলো সরমা ।
'যাঃ..... তুমি না খুব অসভ্য ' বলে একছুটে গিয়ে দাঁড়ালো আয়নার সামনে ।
কেন এখন ওর মনে দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলছে ? এক অনন্য ভালোবাসা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গুলি কে সুন্দর আগলে রেখেছিলো । প্রবাসী বন্ধু টিই তাহলে শত্রুর কাজ করলো ? কিন্তু কেন ?
কেন এমন ভাবে হেরে গেলো তার বিশ্বাস ?
তবে কি সুবিকাশ অন্য কাউকে............?
না না সে পারবে না জানি , তবে কি খুব অল্প সময়ে তার এতো পদোন্নতি , এতো টাকা ওর মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছে ?
এতো কম সময়ে এতো সাফল্য কিভাবে পেলো সেটা জানতেই একদিন কথায় কথায় তাদের দুজনেরই কমন বন্ধু নেপাল কে বলেছিলো সরমা ।
নেপাল বাগ ইংল্যান্ডে বাড়ি চাকরি সুত্রে এখানে এসেছে মাস ছয়েক হলো , নেপালের নজর ছিলো সরমার দিকে ,তার প্রস্তাবে রাজী হয় নি বলেই কি ?
তাকিয়ে দেখলো একবার ,বিকাশ একমনে ফোন ঘাটছে আর মুচকি মুচকি হাসছে ।
জানলার এপারে চোখ ফেরালো সরমা প্রবল বেগে বিপরীতে ছুটে চলেছে সবুজ রং ,কতো মানুষ , কতো দোকান , কতো স্মৃতি.. সবই বিপরীতে ।
স্মিত হেসে স্থির করলো তার চোখের কাজল ।
নেতাজী ইন্ডোর স্টেটিয়ামের সামনের রাস্তায় সরমা নেমে যেতেই , সুবিকাশ ড্রাইভার কে বললো 'চলো '।
পশ্চিমাকাশে হেলানো ভাস্কর তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানালো ঘাড় নেড়ে !
আজ দুজনের পথ আলাদা হয়ে গেলো চিরতরে ।
লেখক হর্ষময় মণ্ডল -এর একটি গল্প
কর্তব্য
যে ঘটনা নিজের জীবনটাকে ছারখার করে দিয়েছে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন মেয়ের জীবনে না ঘটে । এই চিন্তাটাই সব সময় মনটাকে
কুরে কুরে খায়, আর সেই ঘটনাই আজ ঘটে গেল।এতো সাবধান, উপদেশ, অনুরোধ করা
সত্তেও ঈশি মা ঈশিতার কোন কথাই শুনলো না।
পই পই করে ঈশিতা বুঝিয়েছিলো মেয়েকে,
দেখ তুই খুব বুদ্ধিমতি মেয়ে, সায়েন্স নিয়ে পড়ছিস। এবছর টুয়েলভ ভালো করে পড়ে ভালো
রেজাল্ট করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।
তোর গার্জেন তুই নিজেই। আমার চাকরি আছে,
সংসারের কাজ আছে, তাই তোকে স্কুলে, টিউশনে
পৌঁছে দিয়ে আসবো আবার সাথে করে নিয়ে
আসবো সে সময় নেই। দিনকাল যা পড়েছে তাতে
সব সময় চোখ কান খোলা রেখে চলবি নইলে
বিপদ অবসম্ভাবি। সেই বিপদেই ঘটিয়ে ফেলল
ঈশি মায়ের শত বারন সত্ত্বেও।
একদিন মেয়েকে চেপে ধরলো ঈশিতা, বললো- কি ব্যাপার রে তোর? কয়েক দিন ধরে লক্ষ্য করছি তোর কেমন যেন একটা উদাসিনতা, উড়ু উড়ু ভাব। পাঁচ বার ডাকলে তবে একটা উত্তর
পাওয়া যাচ্ছে! বল কি হয়েছে?
অনেক চাপাচাপির পর ঈশি বললো - সে একটি ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছে। এর বেশি আর কিছু বললো না। ঈশিতার মনে হলো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। ঘরকুনো গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায় ঈশিতার ও সেই রকম দশা হলো।
এই ভয়টাই পাচ্ছিল যে আমার জীবনে যা ঘটে গেছে সেই ঘটনা যেন মেয়ের জীবনে না ঘটে, একি ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।
ঈশিতার ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ে গেল
….. সায়ন্তনকে ভালোবেসে ছিল মন প্রান উজাড় করে , মা-বাবাকে সে কথাটা অকপটে জানিয়ে ছিল।বাবা মানস মা রীতা মেয়ের মুখের কথা শুনে
স্তম্ভিত হয়ে গেছলো।
এই হয়েছে বাঙালির এক দোষ ।যতোই আর্থিক
স্বচ্ছলতা থাক একটি সন্তান তার সে ছেলে হোক বা মেয়ে। যত ভালোবাসা , মায়া মমতা সব তাকে উজাড় করে দিয়ে ফেলে, ফলে সন্তানরা তাদের দুর্বলতার জায়গাটা সহজেই বুঝে ফেলে।এই
দুর্বলতার কারণে সন্তান ভুল করলেও তেমন শাসন করতে পারে না, এই ভয়ে যে যদি সন্তান
আত্মঘাতী হয়! তাহলে তারা কি নিয়ে বাঁচবে! সেই রকমই অবস্থা মানস রীতার ক্ষেত্রেও। মানস
অনেকক্ষণ চুপ দিয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করেছিল তুই কি ঐ ছেলেটিকেই বিয়ে করবি?
--- রীতা খুবই শান্ত ও ভীরু প্রকৃতির সংসারের কাজ ছাড়া কিছুই বোঝে না।এই কথা শোনার পর
কেঁদেই চলেছে।
ঈশিতার স্পষ্ট ও স্বল্প উত্তর - হ্যাঁ বাবা।
-- বেশ। ছেলেটির কি নাম, কি করে, কয় ভাই বোন? বাবা মা কি করেন বা করতেন, কোথায় থাকে এই সব খবর নিয়েছিস?
--- হ্যাঁ বাবা। ছেলেটির নাম সায়ন্তন, ইঞ্জিনিয়ারিং
পড়ে, লাস্ট ইয়ার। বাবা মা দুজনেই চাকরি করেন। কোন ভাই বা বোন নেই। উনাদের আর কয়েক বছর চাকরি আছে। এই দুর্গাপুরের স্টিল
টাউনসিপে কোয়ার্টারে থাকে।
কয়েক দিন পর ছেলের বাড়ি থেকে মানস ,রীতা ফিরে এসে বললো - না মা তোর ওখানে বিয়ে করা উচিত হবে না। ওরা সাধারণ ভদ্রতা টুকু পর্যন্ত জানে না। খুব টাকার গরম।অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না।
--- ঈশিতা বললো - বাবা আমি উনাদের বাড়ি গেছি,ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছি আমার তেমন মনে হয়নি। উনাদের উপরটাই ওরকম ভিতরটা খুব নরম। আমাকে তো এখন থেকেই বৌমা বৌমা বলেন। আমরা দুজনেই পড়া কমপ্লিট করি সায়ন্তন একটা চাকরি জোগাড় করুক তারপর
বিয়ে।
--- তাহলে তুই ও ছেলেটিকেই বিয়ে করবি আমাদের কোন কথা শুনবি না? ধমকের সুরে রীতা বললো।
--- খুব শান্ত ভাবে ঈশতা বললো - হ্যাঁ মা বিয়ে
আমি সায়ন্তনকেই করবো।
###
গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হতেই পালিয়ে বিয়ে করলো ঈশিতা। মাস কয়েক পরেই সন্তান সম্ভবা। সংসারের যাবতীয় কাজ ঈশিতাকেই করতে হয়, ।কারণ শ্বশুর, শ্বাশুড়ি দুজনেই চাকরি করে আর সায়ন্তন চাকরি করেনি এম টেক পড়ছে।
আদরে মানুষ ঈশিতা, সংসারের কাজ কাকে বলে জানতোই না। সেই ঈশিতা ভরা পেটে সংসার ঠেলে যাচ্ছে। অরুচি সব খাবারই, কিছুই খেতে পারছেনা। এই রকম অবস্থাতেই সংসারের সব কাজ মায় রান্না বান্না পর্যন্ত। কেউ কুটো কেটে দুটো করে না। সবাই সব সময় বসে বসে অর্ডার করে যায় এটা চাই ওটা দাও।অথচ এই ঈশিতা
যখন এই সংসারে আসেনি তখন সবাই সব করে খেয়েছে। ঈশিতার এই অবস্থাতেও কারো কোন মায়া দয়া নেই। কোন ডাক্তার দেখায়নি, ঈশিতা নিজে গিয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে আসে। ডাক্তারবাবু বাড়তি ওষুধ লিখে দিয়ে বলে বাইরে থেকে কিনে নিতে। কিন্তু এরা কোন ওষুধ কিনে দেয়না।কিছুই যে খেতে পারে না
তাতেও কোন মাথাব্যথা নেই, কি খাবার হলে খেতে পারবে তার খর্ব কেউ নেয় না। এতো নিষ্ঠুর। এখন বুঝতে পারে বাবা মা ইনাদের ঠিক চিনে ছিলেন।
একদিন এক ঘটনা ঘটলো।পেটের সন্তান তখন সাত মাসের তখন চা নিয়ে ট্রে তে করে ঈশিতা ড্রয়িংরুমে আসছে, আর ওরা তিনজন মিলে টিভি দেখছে। হঠাৎ করে ঈশিতার মাথাটা ঘুরে গিয়ে
পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো।কাপ, প্লেট সব ভেঙ্গে গেল।যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আস্তে আস্তে মনে করার চেষ্টা করলো। মনে পড়লো।
দেখলো যেখানে পড়েছিল সেখানেই পড়ে আছে
কেউ মুখে চোখে এক ফোঁটা জল ও দেয়নি, তুলে বিছানায় নিয়ে যাওয়া ডাক্তার দেখানো তো দূরের
কথা। ভাঙ্গা কাপ প্লেট গুলিও তেমনি পড়ে আছে।
দেওয়াল ঘড়িতে দেখলো রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, এই সুযোগে এখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কোথায় পালাবে?
যাবার জায়গা বলতে তো বাপের বাড়ি। বাবা মা ছাড়া আশ্রয় দেবার আর কেউ নেই। বাবা মা কি ক্ষমা করে দেবে! আজ বছর খানেক তাদের সাথে কোন যোগাযোগ নেই।তারা কেমন আছে! আদৌ
বাড়িতে আছে কিনা কিছুই জানে না। মেনে নেবে
কিনা তাও জানে না। অনেক দ্বন্দ্ব আসছে মনে তবুও যেতে হবে, এখান থেকে মুক্তি চাই।
ঈশিতার বাবা মা ঈশিতাকে ক্ষমা করে দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে ছিল এই ভেবে যে তাদের মেয়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাদের কোলে ফিরে এসেছে। মেয়ের অবস্থা দেখে রীতা খুব কেঁদে ছিল।
তারপর ঈশির জন্ম হলো। ঈশির বয়স যখন বছর খানেক তখন চাকরির জন্য কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলো।মাস ছয়েকের মধ্যেই চাকরি পেয়ে গেলো।
কিন্তু বাবা মায়ের শত অনুরোধের ও বিয়ে করলো না।
সেই একি ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেবে না। মেয়েকে বুঝিয়ে কোন লাভ নেই। ছেলেটির বাড়িতে যাবে তাদের বোঝাতে। তাতে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে বলতে হবে মেয়ের এইচ আই ভি
পজেটিভ। জীবন আর বেশি দিন নেই। সে নিজে
বাঁচবেনা বলে প্রতিজ্ঞা করেছে কাউকে বাঁচতে দেবে না।তার এই মারন রোগের বীজ গেঁথে দেবে
বহু মানুষের মধ্যে। বলুন এ সব জেনে আপনার ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন? দরকার হলে আরো নিচে নামবে, আরো কারণ মেয়েকে সুস্থ জীবন
দিতে হবে, সর্বোপরি সে যে মা।
লেখক অমিত পাল -এর একটি গল্প
স্বপ্নের সাইকেল
ঐ তো সুনীলের সাইকেলটির মতোই দেখতে সাইকেলটা৷ 'এটা কি আমার জন্য বাবা?'
'হ্যাঁ বাবা এটি তোমার সাইকেল'৷ আজই কিনে আনলাম৷ যাও বাবা সাইকেল নিয়ে একটু ঘুরে এসো৷
থ্যাঙ্কইউ বাবা৷ আমি এখনই ঘুরতে যাচ্ছি৷ টা-টা বাবা, টা-টা মা৷
ছুটছে জোড়ে, আরও জোড়ে৷ হ্যাঁ পৌঁছে গেছি বন্ধুদের কাছে৷
'নীলাভ, এই নীলাভ'-- কয়েকবার লাবণ্যের ডাকাডাকিতেই ঘুম ভেঙে যাই নীলাভোর৷ সে ক্লাসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ আসলে অনেকটা পথ তাকে পা'এ হেঁটেই আসতে হয়৷ তাই সে ক্লান্ত হয়ে ক্লাসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল৷
লেখক রঞ্জিত মল্লিক -এর একটি গল্প
দাগ
কলেজ থেকে বেরিয়ে একটা ফলের দোকানে এল রিনি । কিছু ফল কিনবে ঠাকুরের জন্য ।পছন্দমতাে কিছু ফল,কিনে স্কুটির পাশে আসতেই একটা বাচ্চা মেয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল। গায়ের রঙ কালাে, রুগ্ন চেহারা,
মাথায় রুক্ষ চুল, পরণে ময়লা ছেড়া কাপড় রিনিকে
বলল, " পাঁচটা টাকা দাও না গাে দিদি ! কাল থেকে কিছু খাইনি।" ....
রিনি ব্যাগ থেকে পাঁচটা টাকা বের করে মেয়েটির হাতে দিতেই মেয়েটি হাত বাড়িয়ে নিল। আর সেই সময় রিনি লক্ষ্য করল মেয়েটির রুগণ হাতে ঝলমল করছে উল্কিতে লেখা নাম "রাani" মানে "রাণী"। রিনির "R", অনিকেতের "ani"। বাংলা, ইংলিশ দুই অক্ষর মিলে মিশে তৈরী হয়েছিল।
নামটা দেখেই রিনির বুকটা ধরাস করে উঠল। মেয়েটিকে আর দেখা যায়নি। টাকা নিয়েই চলে গেছে। মেয়েটি ওর বিশেষ পরিচিত বলেই মনে হল। হাতের উল্কি সেটাই প্রমাণ করে। চোখ দুটো যেন কত কালের চেনা।
বাড়িতে এসেই অনিকেতকে ফোনে ধরল। ও অফিসের কাজে ব্যস্ত। ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। মিটিং চলছে। সপ্তাহ শেষ হতে এখনও দু তিন দিন বাকি। অনিকেত উইক এণ্ডে একবার করে আসে। তবে কাজের গতি বুঝে।অনেক সময় সনি, রবিবার অফিস করতে হয়।
মেয়েটির চিন্তায় সারা রাত ঘুম হয়নি। কোন কিছু ভাল লাগছে না। রাতে কিছু খাবে না ঠিক করেছে। শ্বাশুড়ির গলা শুনল," বৌমা, শরীর খারাপ না কি?"
"হ্যাঁ মা, আজ শরীরটা ভাল নেই।"
"কেন কি হয়েছে? ডাক্তার ডাকব?"
"না, তেমন কিছু নয়। একটু ঘুমালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।"
শ্বাশুড়ি মার মুখে ডাক্তারের কথা শুনে রিনির আর এক ডাক্তারের কথা সব কিছু মনে পড়ে গেল। রাতে ঘুম আসছে না ঠিকমত। ডাক্তারের ঠিকানাটাও নেই। তবে উনার নার্সিং হোমে গেলে উনার খোঁজ পেতে পারে।
সকালে ঘুম ভাঙতেই শ্বাশুড়িমাকে এক অজুহাত দেখিয়ে বেরিয়ে পড়ল ডাক্তারের খোঁজে।
তিনদিন কেটে গেছে। রিনি বুধবার সকালে ডাক্তারের খোঁজে বেরিয়ে তারপর ঘরে এসে দুপুরে আর একবার বেরিয়ে সেই যে গেল আর ফেরেনি। অনিকেত এই সপ্তাহে বাড়ি আসেনি। কাজের চাপ। শ্বাশুড়ি মাও বেশ চিন্তিত। তবে পুলিশে ডায়েরী করার কথাটা মাথায় আসেনি। এর আগেও একবার এই রকম করেছিল। সেবার চারদিন পরে ফিরেছিল। তখন অনিকেতের সাথে মনোমালিন্য ছিল।
চার দিন পরে রিনি ফিরল। রিনির সাথে পুলিশের বড় অফিসার আছেন। আর কিছু ফোর্স সিভিল ড্রেসে। অনিকেত সব শুনে দুদিন আগেই অফিস থেকে ফিরে এসেছে। ও বেশ চিন্তিত।
অনিকেত কিছু বলার আগেই পুলিশ অফিসার নিজের পরিচয় দিয়ে অনিকেতকে অ্যারেষ্ট করল। শ্বাশুড়িমা সব দেখে প্রায় জ্ঞান হারাবার উপক্রম। পাড়া প্রতিবেশীরাও বেশ ঘাবড়ে গেছে। রিনির এই ধরণের কাণ্ড কারখানা দেখে। কি এমন ঘটল যে বাড়িতে পুলিশ ডাকতে হল।
কেসটা চলতে আটটা বছর লাগল। কেসে অনিকেতের দোষ প্রমাণিত হয়েছে। ও এখন জেলে আছে।
ইতিমধ্যে রাণীও অনেক বড় হয়েছে। ও এখন আর ভিক্ষে করেনা। রীতিমত পড়াশোনা করে। রাণীর উল্কির দাগটা হয়ত একদিন প্লাসটিক সার্জারি করে মুছে যেতেও পারে, কিন্তু অনিকেতের অপরাধ সমাজে যে ক্ষত সৃষ্টি করল; সেই দাগ কোনোদিন মুছবে না।
অনিকেত একজন গাইনোকোলজিস্ট। ওর বন্ধুর নার্সিং হোম আছে। সেখানে ও পরিষেবা দিত। ঐ নার্সিং হোমে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে এক চক্র কাজ করত। যদি ফিমেল চাইল্ড হত, জন্মদান করার পর তাদেরকে একটু বড় করে বিক্রি করে দেওয়া হত এক শ্রেণীর দালালের কাছে। মাঝে মাঝে মেল চাইল্ডকেও বিক্রি করা হত। একটু বড় হবার পর। আর এই সমস্ত চক্রের মূল পাণ্ডা ছিল অনিকেত।
দালালরা ঐ সব বাচ্চাকে দিয়ে ভিক্ষে করাত। আর নানান অবৈধ কাজ করাত। যেমন চুরি, পকেটমারি। ঐ সব দুঃস্থ বাচ্চাদের কিডনিও বিক্রি করা হত। কিডনি চক্রের মূল পাণ্ডার সাথে অনিকেতের যোগাযোগ ছিল। সেখান থেকে ভাল কমিশন আদায় করত। বন্ধুর নার্সিং হোমে গোপণে চলত কিডনি সংক্রান্ত অবৈধ কাজ কারবার। পুলিশ প্রশাসনের আড়ালেই চলত এই সমস্ত কারবার।
আর অনেক পরিবার ফিমেল চাইল্ড নিতে চাইত না। তাদের কাছে পুত্র সন্তান মানে পরিবারের বংশ রক্ষায় ছিল শেষ কথা। নার্সিং হোমের সাথে পরিবারের প্রধান কর্তা বা কর্তাদের একটা গোপণ যোগাযোগ থাকত। মেয়ে বাচ্চা জন্মানোর সাথে সাথেই পরিবারকে জানানো হলে, পরিবারের প্রধান কর্তা ব্যক্তিরা এটা বলেই পরিবারকে স্বান্ত্বনা দিতেন যে, তাদের বাচ্চা ডেলিভারীর সময় মারা গেছে।
রাণী খুব মিষ্টি একটা বাচ্চা ছিল। যেটা অনিকেতের ভীষণ প্রিয় ছিল। বাচ্চাগুলো একটা আশ্রমে রেখে বড় করা হত। অনিকেত রাণীকে দত্তক নিতে চেয়েছিল। কারণ রিনির মা হবার সম্ভাবনা নেই।
কিন্তু বিপদ হতে পারে বুঝে দত্তক নেয়নি। কিন্তু এক ডাক্তার কেন জানিনা ওদের দুজনের নামের আদলে বাচ্চাটার নাম রেখেছিল রাণী। তিনি উল্কিও করেছিলেন।
অনিকেত রাণীকে ভীষণ ভালবাসত। মাঝে মাঝে ওর জন্যে খাবার এনে খাওয়াত।জামা কাপড় কিনে দিত।
ঐ ডাক্তারই সব জানত। রিনি ধীরে ধীরে সব প্রমাণ জোগার করে ঐ ডাক্তার আর অনিকেতকে ধরিয়ে দেয়। রিনির এই দুসাহসিক কাজে ওকে ওর কাকা খুব সাহায্য করেন। কাকা ক্রাইম ব্রাঞ্চের একজন অফিসার ছিলেন।
অনিকেত আর রিনির সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পরে অনিকেত অন্য অনেক মেয়ে, নার্সের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। ওরা অনিকেতকে টাকার জন্যে ব্ল্যাকমেল করতে থাকে। তাছাড়া অনিকেতের নিজেরও টাকার প্রতি একটা আলাদা মোহ ছিল। ও রেস আর জুয়োতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। তারপর ধীরে ধীরে ওর অধঃপতন হতে শুরু করে।
রাণীর উল্কিটাই জোরাল প্রমাণ হিসেবে কাজ করল।
রাণী এখন রিনির কাছেই থাকে। ক্লাস নাইনে পড়ছে। রাণী রিনিকে "মা" বলে ডাকে। দুটোতে বেশ জমেছে। রাণীকে পেয়ে রিনি পুরানো অতীত ভুলে জীবনটা নতুন করে শুরু করেছে।
মা মেয়ের হাসি ঠাট্টাতে বাড়িটা নতুন করে ঝলমল করে উঠছে।