Tuesday, January 2, 2024

চন্দন গড় - দেবাংশু সরকার || Chandan Gar - Debanshu sarkar || Short story || ছোট গল্প || গল্প || অনুগল্প || Story || Bengali Story

                    চন্দন গড়

                             দেবাংশু সরকার


   

       পুরানো গাড়ীটা বিক্রী করে, নতুন গাড়ীটা কেনার পর তাপসের ইচ্ছা একটা লং ড্রাইভে যাওয়ার। তবে এবার বকখালি বা দীঘা নয়। সে ভাবছে এবার দুরে কোথাও যাবে। নিজের গাড়ী তাপস নিজেই চালায়। ড্রাইভিংয়ের হাতটা তাপসের বেশ ভালো। এক্সপ্রেস ওয়েতে তাপস সাবলীল ভাবেই গাড়ি চালাতে পারে। ঘন্টার পর ঘন্টা সে গাড়ী চালায় ক্লান্তিহীন, বিরক্তিহীন ভাবে।


      যেমন ভাবনা তেমন কাজ। কয়েক দিনের মধ্যেই সে সস্ত্রীক বেরিয়ে পড়ে। সঙ্গে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তাদের স্ত্রীরাও রয়েছে। তাপসের নতুন গাড়ীটা বেশ বড়, সাত আটজন অনায়াসে বসতে পারে। 


      এবার তাদের লক্ষ্য গোয়ালিয়র এবং সেইসঙ্গে ওরছা এবং খাজুরাহো। গোয়ালিয়র দুর্গ এবং আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখা, তারপর আরো উত্তর দিকে যাওয়া। পথের মাঝে হয়তো দেখা যাবে নাম না জানা অখ্যাত কোনো দুর্গ বা রাজপ্রাসাদ।


      তাপসের সঙ্গে রয়েছে তার স্ত্রী ইরা। বাল্যবন্ধু রমেন, তার স্ত্রী শম্পা, আর এক বন্ধু বাপী, তার স্ত্রী সোমা। আরো একজন আছে তাদের সঙ্গে। অরূপ, তাপসের কলিগ।


      রমেন, বাপী, অরূপ তিনজনেই গাড়ী চালাতে পারে। কলকাতা থেকে দুরত্ব কম নয়। প্রায় বারোশো কিলোমিটারের পথ। তাপস যত ভালো, যত এনার্জেটিক ড্রাইভার হোক না কেন, এতটা রাস্তা তারপক্ষে একা গাড়ী চালানো সহজ নয়।.তাই সবাইকে পালা করে স্টিয়ারিং ধরতে হচ্ছে।


      লম্বা রাস্তা অতিক্রম করে তারা পৌছালো গোয়ালিয়র সহরে। শরীরে লম্বা জার্নির ক্লান্তি। তড়ি ঘড়ি একটা হোটেলে ঢুকে লম্বা ঘুম দিল সকলে। পরিকল্পনা মত পরের দিন বেশ সকালে গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। গোয়ালিয়র সহরটা একদিনেই ঘুরে দেখতে হবে। প্রধান আকর্ষণ গোয়ালিয়র দুর্গ।


      গোয়ালিয়র সহরটাকে দেখতে দেখতে প্রায় সন্ধ্যা নেমে এলো। আর দেরি করা যাবে না। এবারে লক্ষ্য ওরছা। অজানা পথে পাড়ি দিতে হবে। গাড়ীতে স্টার্ট দিল তাপস।


      অনেকটা পথ তারা পেরিয়ে এসেছে। আর কিছুটা গেলে পড়বে বিখ্যাত বা কুখ্যাত বেহড়ের রুক্ষ, শুষ্ক ভুমি। কাঁটা ঝোপে ভর্তি শক্ত পাথুরে লাল মাটির বেহড়। প্রাকৃতিক ক্ষয়ে কোথাও জন্মেছে টিলা, কোথাও আবার তৈরী হয়েছে ছোট খাদ।


      কিন্তু একি হলো! চলতে চলতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো তাপসের গাড়ী। কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না! গাড়ী মেরামতির প্রাথমিক পাঠটা তাপসের জানা। অন্ধকার রাস্তায় টর্চ জ্বেলে গাড়ী পরীক্ষা করলো সে। কিন্তু না কোথাও কোনো গড়বড় নেই। অথচ গাড়ী কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না! মনে হচ্ছে ইঞ্জিন ডেড হয়ে গেছে! কোথায় এসেছে তারা, সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। অজ্ঞাত কারণে কারো ফোনে লোকেশন দেখাচ্ছে না! এখন কি করবে তারা? পথের ধারে গাড়ীতে বসে কি রাত কাটাবে? অপেক্ষা করবে কখন সকাল হবে!


      ভরা আষাঢ়। কলকাতাকে এখন ভাসিয়ে দিচ্ছে বৃষ্টি। কিন্তু গোয়ালিয়রের আসে পাশে গত দুসপ্তাহ কোনো বৃষ্টি নেই। আজ হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। বৃষ্টি নামলো সঙ্গে বিদ্যুতের চমকানি। বিদ্যুতের আলোতে তাপসরা দেখতে পেল কিছু দুরে পাহাড় প্রমাণ বিশাল বড় একটা বাড়ি। বাড়িটাকে দেখতে পেয়ে যেন ধড়ে প্রাণ এলো তাপসদের। অতবড় বাড়িটা কি রাজ প্রাসাদ? নাকি কোনো প্রাচীন দুর্গ? নাকি হোটেল? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না! তবে একটা আশ্রয় পাওয়া গেল। বৃষ্টি এতক্ষণে থেমে গেছে। টর্চের আলোতে রাস্তা দেখতে দেখতে তারা এগিয়ে চললো বাড়িটার দিকে। যত তারা কাছে আসছে তত যেন বিশালাকার ধারণ করছে বাড়িটা! খুব কাছে এসে তারা বুঝতে পারলো এটা কোনো রাজ প্রাসাদ নয়, কোনো হোটেল নয়, এটা একটা সুবিশাল, সুউচ্চ প্রাচীন দুর্গ। টর্চ হাতে সবার আগে চলেছে অরূপ। পঁচিশ বছরের অবিবাহিত যুবক অরূপ, বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। মনে ভয় ডর বলে কিছু নেই। পথের ধারে কয়েকটা কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে কুকুরগুলো অরূপদের দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ অজানা অচেনা এতজন মানুষকে দেখেও চিৎকার করছে না! বেশ অবাক হয় অরূপরা।


      দুর্গের মুল ফটকের কাছে এসে গেছে তারা। খোলা ফটকের সামনে একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনের পোযাকটা কেমন যেন অদ্ভুত ধরনের! গাঢ় লাল রঙের, কিছুটা চাপকান, কিছুটা পাঞ্জাবির মত। কোমরে কোমরবন্ধ। সঙ্গে সাদা ধুতি। মাথায় লাল রঙের এক ঢাউস পাগড়ি। পায়ে নাগরা। সবার আগে আছে অরূপ, লোকটা তার দিকে তাকিয়ে বললো, "প্রণাম মহারাজ। পদার্পণ করুন।"


      বাপি অবাক হয়ে ফিসফিস করে তাপসকে প্রশ্ন করে, "কি ব্যাপার বলতো, লোকটা অরূপকে মহারাজ বলছে কেন?"


       - "মনে হয় দুর্গের মধ্যে হোটেলের ব্যাবসা চলে। হয়তো এভাবেই ওরা গেষ্টদের আপ্যায়ণ করে।"


      এরমধ্যে অরূপ বেশ জমিয়ে নিয়েছে পাগড়ি পরা লোকটার সঙ্গে। সে পাগড়ি পরা লোকটাকে বলছে - "সারাদিন ঘুরে আমরা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি মহারাজ। আমাদের একটু থাকার জায়গা দিন। একতলায় ঘর খালি আছে?"


      - "আপনি আমাকে মহারাজ বলছেন হুজুর! আমার নাম শের সিং। আমিতো আপনার সেবক। আপনার দুর্গ, আপনি যেখানে ইচ্ছা থাকবেন। হুকুম করুন মহারাজ।"


      - "আগে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করি, তারপর রেজিস্ট্রারে সই হবে।"


      শের সিং অবশ্য ততক্ষণে হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছে, "যোগীন্দার মহারাজের জন্য খাবার নিয়ে এসো। ঠান্ডা সরবত নিয়ে এসো। ভজ্জু জলদি পাংখা নিয়ে এসো।"


      রাজকীয় আপ্যায়ণ পেল অরূপরা।


      আবার শের সিং অরূপকে বললো, "মহারাজের জন্য খাস মহল অপেক্ষা করছে।"


      - "আজ আর পারছি না শের সিং। আজ রাতে আমরা এই ঘরে থাকবো। কি বড় ঘর! কুড়ি পঁচিশ জন এক সঙ্গে থাকতে পারবে, আমরাতো মাত্র সাতজন।"


      বাপী আবার ফিসফিস করে তাপসকে বললো, "পরিবেশটা গোলমেলে মনে হচ্ছে। সবাই একঘরে থাকাই ভালো।"


      তাপস মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।


      আবার বাপীর প্রশ্ন, "খাস মহলটা কি বলতো?"


      - "মনে হচ্ছে কষ্টলি রুম। হয়তো ডিলাক্স রুম। মনে হয় ধান্দা করছে আমাদের ঢোকানোর। সকালে বড়সড় বিল ধরাবে।"


      খাওয়া দাওয়া সেরে দরজা বন্ধ করে, আলাদা করে পেতে দেওয়া বিছানায় শুয়ে পড়লো তাপসরা।


      মধ্যরাত, মৃদু সারেঙ্গীর সুর ভেসে আসছে! আসছে তবলার সঙ্গতের শব্দ। ভেসে আসছে সুরেলা কন্ঠের ঠুমরি। কে গান গাইছে এতো রাতে? কে সঙ্গত করছে? ঘুম ভেঙে যায় সকলের। কেবল অরূপ অঘোরে ঘুমোচ্ছে।


      একটা প্রাচীন দুর্গের অলিন্দে অলিন্দে অনেক রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে। ঘটতে পারে অনেক অস্বাভাবিক, অবিশ্বাস্য ঘটনা। এত কাছে এসেও, সেই রহস্যের, সেই রোমাঞ্চের স্বাদ না নিয়ে কি ফেরা যায়? তাছাড়া কৌতুহল, অপার কৌতুহল জেগে উঠেছে তাপসদের মনে। এতক্ষণতো শুনশান ছিল। মনে হচ্ছিল জনমানবহীন এক শূণ্যপুরী। মাঝে মাঝে শের সিংদের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছিল। সেটাও আর নেই।


      বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো তাপসরা। বিরাট বড় দরজাটা খুললো। প্রবেশ করলো দুর্গের আরো ভেতরে। ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে উঠলো বাপীর হাতে ধরা টর্চ। চওড়া দালানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে অগুন্তি ঘর। তার উল্টো দিকে দালানের ধারে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি থাম। বেশ কিছুটা এগোনোর পর বাপীরা একটা সিঁড়ি দেখতে পেল। পায়ে পায়ে তারা উঠতে লাগলো উপরের দিকে। উঠে পড়লো দোতলায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার, বাপীর হাতের টর্চ জ্বলছে না। সম্ভবত ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে, অথবা...।


       পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে ছজনে। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বারে বারে হোঁচট খাচ্ছে। ইরা একবার ফিরে যাওয়ার কথা বলে। সোমা, শম্পা দুজনেই তাকে বাধা দেয়। সোমা, শম্পা দুজনেই এই ভয় মেশানো রোমাঞ্চটাকে উপভোগ করছে। ভেসে আসা গান আর শোনা যাচ্ছে না।


      অজানা অন্ধকার পথে চলতে চলতে আচমকাই রমেনের মাথা বেশ জোরে ঠুকে যায় একটা থামে। অনেকটা কেটে যায়। টপ টপ করে রক্ত পড়তে থাকে। দু এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়ার পর যেন কেঁপে ওঠে দুর্গটা। শোনা যেতে থাকে পায়ের শব্দ। এক নয়, দুই নয় শত শত পায়ের শব্দ। যেন কারা দুর থেকে এগিয়ে আসছে রমেনদের দিকে। অন্ধকারের মধ্যে পিছু হটতে থাকে রমেনরা। বেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে পদশব্দ। মনে হচ্ছে অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে। কারা এগিয়ে আসছে? মানুষ? নাকি প্রেত? অশরীরীদের পদশব্দ কি শুনতে পাওয়া যায়? জানা নেই তাপসদের।


      অন্ধকারের মধ্যেই তাদের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে তাপসরা। এগিয়ে আসছে অসংখ্য অবয়ব। রক্ত জবার মত রক্ত বর্ণ এবং বিস্ফারিত তাদের চোখ। কাঠিণ্যে ভরা মুখ। কারো জিব কিছুটা বেরিয়ে আছে মুখ থেকে। অধিকাংশের গলায় গভীর ক্ষতচিহ্ন।


      পিছু হটতে থাকে তাপসরা। ক্রমশ পিছু হটতে থাকে। কারণ তারা যে এগিয়ে আসছে। ক্রমশ এগিয়ে আসছে। পিছু হটতে হটতে এক সময়ে ছুটতে শুরু করে তাপসরা। কোনো কিছু দেখা যাচ্ছে না। অন্ধের মত ছুটে চলেছে। বারে বারে হোঁচট খাচ্ছে, ছিটকে পড়ছে, আঘাত পাচ্ছে, উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটছে। ছুটতে ছুটতে অনেকটা দুরে চলে এসেছে। নিচে নামার সিঁড়িটা ঠিক কোন দিকে কেউ বুঝতে পারছে না! ছুটতে ছুটতে ওদের থেকে অনেক দুরে চলে এসেছে তাপসরা। কিন্তু একি!


      আবার অন্য দিক থেকে আসছে পদশব্দ! তবে কি তাপসদের ঘিরে ফেলছে অজানা শত্রুরা? দুদিক থেকে পায়ের শব্দ আসছে। ভয়ে আতঙ্কে নির্বাক হয়ে গেছে তাপসরা। তারা বুঝতে পারছে না এবার কি করবে? কোন দিকে যাবে? আবার ভাবছে কি চায় এই অশরীরীরা? তাদের সঙ্গেতো তাপসদের কোনো শত্রুতা নেই। তাহলে তারা কেন তাপসদের ক্ষতি করতে চাইছে? নাকি অন্য কোনো বার্তা দিতে চাইছে?


      - "বাবুজী আপনারা উপরে উঠে এসেছেন! মহারাজ কোথায়?" শের সিংয়ের গলা পেয়ে ধড়ে প্রাণ এলো ছয়জনের।


      রমেন প্রশ্ন করলো - "মহারাজ কে?"


      - "মহারাজ দামোদর সিং।"


     তাপসদের মনে পড়ে শের সিং অরূপকে প্রথম থেকেই 'মহারাজ' বলে ডাকছে। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে অরূপ যে তাদের সঙ্গে নেই সেটা শের সিং বুঝতে পারলো কি করে সেটা তাপসদের বোধগম্য হচ্ছে না! অবশ্য অনেক অস্বাভাবিক ঘটনাই ঘটে চলেছে, যেগুলো তাপসদের ধারনার বাইরে! 


      কিছুটা আন্দাজ করে তাপস বললো, "মহারাজতো ঘুমোচ্ছে।"


     - "আবার রক্ত দেখে রাণী মেঘনা, রাণী যমুনার সেনারা জেগে উঠেছে। পরস্পরের দিকে এগোতে শুরু করেছে। একমাত্র মহারাজ দামোদর সিংয়ের বর্শা ওদের থামাতে পারে। আপনারা সরে আসুন। এই কক্ষের মধ্যে আশ্রয় নিন। এখানে আপনারা সম্পুর্ন নিরাপদ।" তাপসদের একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে শের সিং, "মহারাজ মহারাজ" বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়তে লাগলো।


পরদিন সকালে সূর্যের আলো মুখে পড়তে ঘুম ভাঙলো সাতজনোর। কোথায় দুর্গ? কোথায় শের সিং? আর কোথায় রাণী মেঘনা, রাণী যমুনার সেনাদল? মাটিতে শুয়ে আছে সাতজন। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষজন। কিছুদুরে দাঁড়িয়ে আছে তাপসের গাড়ীটা।


      তাপসের মুখে সব কথা শুনে চোখ কপালে ওঠে স্থানীয় বাসিন্দাদের। অবাক বিস্ময়ে তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে, "তারমানে আপনারা চন্দন গড়ে রাত কাটিয়েছেন!"


      - "চন্দন গড়?' পাল্টা প্রশ্ন করে বাপী।


      - "হ্যাঁ বাবু মশাই এ এক রহস্যময় দুর্গ। সাতশো বছর আগে এই দুর্গ ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরোপুরি মাটিতে মিশে গেছে। তবে কখনো কখনো রাতে জেগে ওঠে। ঐ রাতে কোনো মানুষ চন্দন গড়ে ঢুকলে আর বেঁচে ফেরে না। আপনারা কি করে বেঁচে আছেন ভেবে অবাক হচ্ছি!" বললো একজন স্থানীয় মানুষ।


     - "শের সিং নামের একজন আমাদের খুব সাহায্য করেছে।" বাপী আবার বলতে থাকে, "আমরা ভেবেছিলাম পুরানো দুর্গের ভেতর এখন হোটেল ব্যবসা চলছে। শাহী পোষাক পরা শের সিংকে আমরা হোটেলের রিসেপশনিষ্ট ভেবেছিলাম। তবে লোকটা অরূপকে বারে বারে 'মহারাজ' বলে ডাকছিল। পরে একবার বলেছিল 'মহারাজ দামোদর সিং'।"


      - "দামোদর সিং! প্রবল প্রতাপশালী মহারাজ দামোদর সিং!" বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় স্থানীয় মানুষজন।


      স্থানীয়দের মধ্যে একজন বললো, "এটা কি করে সম্ভব! মহারাজ দামোদর সিংয়ের একটা তসবির গোয়ালিয়র মিউজিয়ামে আছে। আমি দেখেছি।" অরূপের দিকে আঙুল দেখিয়ে সে বললো, "এই বাবুজীকে অবিকল দামোদর সিংয়ের মত দেখতে! দুই যুগের দূই মানুষের মধ্যে এত মিল!"  


      - "তার মানে এই বাবুজীর জন্যই আপনারা এখনও বেঁচে আছেন!" বললো আর একজন।


                              দুই 


      মালব মালভুমি, রেওয়া মালভুমির বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে মহারাজ কুন্দন সিংয়ের রাজত্ব। অত্যন্ত শক্তিশালী এবং রণ কুশলী মহারাজ কুন্দন সিং। পরিস্থিতি তাকে এমন রণ কুশলী করে তুলেছে। রাজ্যের তিন দিক থেকে ধেয়ে আসা বহিঃশত্রুর আক্রমণ সামলাতে সামলাতে মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়েন কুন্দন সিং। কখনো দাক্ষিনাত্য থেকে ধেয়ে আসে বারগিররা। কখনো হামলা চালায় বেহড়ের লুঠেরারা। কখনো আবার উত্তর থেকে আসে ম্লেচ্ছরা। তবে প্রতিবেশী পারমার, চান্দেলা বা কলচুরিদেব সঙ্গে বেশ মৈত্রীর সম্পর্ক কুন্দন সিংয়ের। পারমার, চান্দেলারা নিয়মিত নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে জড়িয়ে থাকে। কলচুরিরাও মাঝে মাঝে ঝামেলায় জড়ায়। কিন্তু কুন্দন সিংকে কেউ ঘাঁটায় না। তবে বহিঃশত্রুদের প্রতিরোধ করতে নিয়মিত অস্ত্র ধরতে হয় কুন্দন সিংকে। অহরহ লড়াই করতে করতে কুন্দন সিংয়ের ক্লান্ত শরীর আর তলোয়ার ধরতে চায় না। চায় বিশ্রাম। কিন্তু বিশ্রামের সুযোগ নেই! দক্ষিণ থেকে উত্তর তাকে ছুটে বেড়াতে হয়। রাতের পর রাত কেটে যায় ঘোড়ার পিঠে।


      শিব ভক্ত কুন্দন সিংয়ের রাজত্বের মধ্যেই রয়েছে এক বহু বছরের পুরাতন শিব মন্দির। বড় অদ্ভুত, বড় রহস্যময়, বড় জাগ্রত সেই মন্দিরের অধিষ্ঠিত দেবতা। বিরাট বড় এক শিব লিঙ্গ রয়েছে সেই মন্দিরে। হাজার বছরের পুরাতন সেই মন্দিরের বিগ্রহ থেকে সদা নির্গত হয় চন্দনের সুগন্ধ। কেউ কোনোদিন কাউকে সেই শিব লিঙ্গে চন্দনের প্রলেপ লাগাতে দেখেনি। অথচ তার উপরে রয়েছে চন্দনের গাঢ় প্রলেপ। দীর্ঘ দিন ধরে শিব লিঙ্গের উপর হাজার হাজার কলস দুধ ঢালার পরেও সেই প্রলেপ অটুট রয়েছে! একটুও ধুয়ে যায় নি! এবং ছড়িয়ে চলেছে চন্দনের সুবাস। হয়তো সেই জন্যই এই শিব লিঙ্গের নাম চন্দনেশ্বর।


      মহারাজ কুন্দন সিং নিয়মিত চন্দনেশ্বরের মন্দিরে যান। আরাধনা করেন। পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভিখারীদের দান করেন। একরাতে মহারাজ স্বপ্নে দেখলেন এক জটাজুটধারী বিশালদেহী পুরুষ ত্রিশূল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। বলছেন, "কেবল এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত তলোয়ার হাতে দৌড়ে বেড়ালে রাজ্য রক্ষা হবে না। নিজ রাজ্যকে বাঁচানোর জন্য অবিলম্বে এক দুর্গ তৈরি কর। আমার এই অমোঘ ত্রিশূল তোকে দিলাম। এই ত্রিশূল অস্ত্রাগারে রেখে দেওয়ার জন্য নয়। সব সময়ে এই ত্রিশূল সঙ্গে রাখবি। এই ত্রিশূল তোর রাজ্যকে রক্ষা করবে। তবে তোর কোনো বংশধর, এই ত্রিশূল দিয়ে তোর রাজ্য, তোর দুর্গকে ধ্বংস করবে।"


      পরের দিন ভোরেই মহারাজ কুন্দন সিং পুজো দিতে গেলেন চন্দনেশ্বর মন্দিরে। মন্দিরের চত্বরেই পেলেন ঐশ্বরিক ত্রিশূলকে। নিজ হস্তে নয়, নিজ শরীরে ধারণ করলেন অমোঘ অস্ত্রকে। কুন্দন সিংয়ের শরীরে অবস্থান করতে লাগলো ত্রিশূল। প্রয়োজনের সময়ে, যুদ্ধের সময়ে ত্রিশূলের অমোঘ শক্তি সংকর্ষিত হতে থাকে কুন্দন সিংয়ের হাতে ধরা বর্শাতে। যুদ্ধের সময়ে কুন্দন সিংয়ের নিক্ষেপ করা বর্শা শত্রু পক্ষের হাজার হাজার সেনাকে ধ্বংস করে আবার তার কাছে ফিরে আসে।


      বেশ কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় কুন্দন সিং গড়ে তোলেন এক বিশালাকার দুর্গ। প্রায় সম্পূর্ণ রাজধানীটাই ঢুকে যায় দুর্গের মধ্যে। কুন্দন সিংয়ের আরাধ্য দেবতা চন্দনেশ্বরের নামানুসারে দুর্গের নামকরণ হয় চন্দন গড়। দীর্ঘ দিন রাজত্ব করার পর কুন্দন সিং তার রাজত্ব এবং ত্রিশূলকে পুত্র শক্তি সিংয়ের হাতে অর্পণ করে, রাজ্যভার হতে অব্যাহতি নেন। মহারাজ শক্তি সিং তার বাবার মত পরাক্রমী যোদ্ধা হলেও, যুদ্ধ বিগ্রহ করে অন্য রাজ্য জয় করার বাসনা তার নেই। প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব, আত্মীয়তার মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করাতেই তার আগ্রহ বেশি। মহারাজ শক্তি সিংও দীর্ঘদিন রাজত্ব করার পর তার পুত্র দামোদর সিং সিংহাসনে বসেন।


      ছেলে দামোদরকে নিজের মত করে গড়ে তুলেছেন শক্তি সিং। দামোদর যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হলেও, মিত্রতা, সখ্যতাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দামোদর দুর্গের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চান না। মাঝে মাঝেই ঘোড়ার পিঠে চেপে বেরিয়ে পড়েন। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতে চান। প্রজাদের সঙ্গে সময় কাটাতে চান। আবার কখনো চলে যান দুর দুরান্তরে। রুক্ষ ধুসর কাঁটা ঝোপে ভরা পথ ধরে ছুটতে থাকে ঘোড়া। নিজ রাজ্যের সীমা পেরিয়ে পৌছে যান দুর দেশে।


      এমনই এক দিন ঘোড়ায় চেপে ছুটে চলেছেন দামোদর। আচমকাই পথ আটকে দাঁড়ায় একদল সেনা। কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা, মাথায় কালো পাগড়ি পরা সেনারা কোনো কথাবার্তা ছাড়াই তলোয়ার হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দামোদরের উপর। কুশলী যোদ্ধা দামোদরের তলোয়ারের আঘাতে সেনাদের হাত থেকে খসে পড়ে অস্ত্র। দামোদরের তলোয়ারের ঘায়ে উড়ে যায় এক সেনার পাগড়ি। হাওয়ায় উড়তে থাকে লম্বা চুল। শারীরিক গঠন এবং অপটু তলোয়ার চালনা দেখে দামোদর আগেই বুঝে গিয়েছিলেন যে এরা কেউ পুরুষ নয়। এরা সকলেই নারী। তাই খুব সাবধানে তলোয়ার চালনা করছিলেন।


      হাওয়ায় উড়তে থাকা লম্বা চুল দেখে দামোদর হাসতে হাসতে বললেন, "কি দরকার লড়াই করার। চোট আঘাত লাগতে পারে। ব্যাথা যন্ত্রণা হতে পারে। তখন আবার কান্নাকাটি শুরু হবে!"


      - "এই বিদেশী, কি বলতে চাইছো? আমরা দুর্বল? আমরা আঘাত লাগলে কান্নাকাটি করি? মানে আমরা ছিঁচকাদুনে?" প্রশ্ন করেন পাগড়িহীন এলোকেশী।


      - "না না, সেকথা নয়। আমি বলছি শত্রুতা ছেড়ে আমরা যদি সখ্যতা করি, মন্দ কি?"


      - "মহাশয়ের নিবাস কোথায় জানতে পারি?" আবার প্রশ্ন এলোকেশীর।


     - "আজ্ঞে, মহারাজ শক্তি সিংয়ের রাজ্যে আমার বাস।"


      - "মহারাজ শক্তি সিং! শুনেছি খুব ভালো মানুষ। যুদ্ধ বিগ্রহ একদম পছন্দ করেন না। প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর প্রতি কত ভালোবাসা তার মনে। তুমিও দেখছি তোমার রাজার মত। লড়াই ঝগড়া পছন্দ করো না। তোমার সঙ্গে সখ্যতা করা যেতে পারে।"


      - "না না, মহারাজের সঙ্গে আমার কোনো তুলনা চলে না। আমি খুব সাধারণ মানুষ। দেওয়ার মত তেমন কোনও পরিচয় আমার নেই। দেবীজীর পরিচয় কি জানতে পারি?"


      এলোকেশী বাকরুদ্ধ অবস্থায় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কন্দর্পকান্তি দামোদরের দিকে। হয়তো শুনতেই পাচ্ছেন না দামোদর কি বলছেন! তার এক সহচরী উত্তর দিলেন, "ইনি চান্দেলা রাজকন্যা মেঘনা।"


      রাজকুমার দামোদরও তখন উত্তর শোনার অবস্থায় ছিলেন না। তারও চোখ নিবদ্ধ ছিল রাজকন্যার চোখে। একেই কি বলে প্রথম দর্শনে প্রেম? ফিরে আসার আগে রাজকন্যাকে নিজের পরিচয় দিলেন রাজকুমার দামোদর। দামোদর, মহারাজ শক্তি সিংয়ের ছেলে শুনে রাজকন্যা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।


      নিয়মিত দেখা হতে থাকে। কখনো তারা ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যান বেতোয়া নদীর তীরে। কখনো আবার লাল মাটির ধুলো উড়িয়ে চলে যান বেহড়ের দিকে। নাম না জানা কোনো টিলায় বসে চলে মন দেওয়া নেওয়া।


      মহারাজ শক্তি সিং ভাবছেন রাজকুমার দামোদরের উনিশ বছর বয়স হলো। এবার বিয়ে দেওয়ার দরকার। মালব রাজ্যের, পারমার বংশীয়, পরমা সুন্দরী রাজকন্যা যমুনার সঙ্গে তার বিয়ে দিলেন। অনিচ্ছা সত্বেও, কেবল রাজ আজ্ঞা পালনের জন্য বিয়ে করতে বাধ্য হন দামোদর। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে বুন্দেলখন্ডের চান্দেল বংশীয় রাজকন্যা মেঘনার কাছে। কিছুদিনের মধ্যেই দামোদর বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসেন মেঘনাকে।


      মালবের পারমারদের সঙ্গে বুন্দেলখন্ডের চান্দেলাদের সর্বদা লড়াই লেগে থাকে। চরম শত্রুতা দুই রাজ্যের মধ্যে। মহারাজ শক্তি সিংয়ের মধ্যস্থতায় প্রকাশ্যে হানাহানি কিছুটা কমলেও, চোরা গোপ্তা হামলা দুদিক থেকেই চলছে।


      দুই চরম শত্রু রাজ বংশের দুই রাজকন্যা একই রাজ প্রাসাদে! যার পরিনতি খুব ভালো বা খুব খারাপ দুই হতে পারে। শক্তি সিংয়ের সতর্ক নজর দুই রাজ কন্যার উপর।

 

      দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। শক্তি সিংয়ের ঐশ্বরিক শক্তি এবং সিংহাসন যায় মহারাজ দামোদর সিংয়ের অধীনে। ক্ষমতা বাড়ে রাণী যমুনা এবং রাণী মেঘনার। একেতো বড় রাণী, সম্মান অনেক বেশি। সেই সঙ্গে জাতশত্রু পারমার বংশজাত কন্যা। রাণী মেঘনা একেবারেই সহ্য করতে পারেন না রাণী যমুনাকে। যতদিন শক্তি সিং রাজা ছিলেন ততদিন মেঘনা চুপচাপ ছিলেন। কিন্তু শক্তি সিং সিংহাসন ত্যাগ করার পর রাণী মেঘনা চেষ্টা করতে থাকেন রাণী যমুনার ক্ষতি করার। বুন্দেলখন্ড থেকে আসা দাসী এবং অন্যান্য অনুচরদের সঙ্গে চক্রান্তের জাল বুনতে থাকেন রাণী মেঘনা। কিন্তু রাণী যমুনা যথেষ্ট দুরত্ব বজায় রাখেন রাণী মেঘনার থেকে। নিজের মহল থেকে খুব একটা বের হন না সঙ্গীত প্রিয় রাণী যমুনা। তার মহলের এক কক্ষে গানের আসরের ব্যবস্থা করা রয়েছে। সেই কক্ষ থেকে কখনো ভেসে আসে ঠুমরি। কখনো আবার সরোদ সারেঙ্গীর যুগলবন্দি। ফলে রাণী যমুনার ক্ষতি করার কোনো সুযোগ পান না রাণী মেঘনা।


      রনথম্ভোর, ঝালর, মালব, হিলসা, উজ্জয়িনী, গোয়ালিয়র এবং বিহার, উত্তর প্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করে দিল্লী ফিরে গেছেন ইলতুতমিস। কেবল চান্দেলাদের সঙ্গে লড়াইতে জিততে পারেন নি। হারতে হয়েছে বুন্দেলখন্ডের শক্তিশালী চান্দেলাদের কাছে। ফিরে যাওয়ার আগে জয় করা কোনো কোনো অঞ্চলের শাসনভার দিয়ে গেছেন তার অন্যতম সেনাপতি শওকতের হাতে। বিচক্ষন শওকত অবশ্য বরাবর চান্দেলাদের সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। মেঘনার সঙ্গেও শওকতের বেশ ভালো আলাপ পরিচয় আছে।


      সখি, পরিচারিকা, অনুচরদের সঙ্গে যুক্তি করে এক মারাত্মক, প্রাণঘাতী, পরিকল্পনা করলেন রাণী মেঘনা। পরিকল্পনা সফল করার জন্য মহারাজকে কিছু দিনের জন্য দুর্গ থেকে দুরে রাখতে হবে। সেজন্য চান্দেলাদের সাহায্য প্রয়োজন। দুত পাঠালেন বুন্দেলখন্ডে। নিজে গোপনে দেখা করলেন শওকতের সঙ্গে। কথায় কথায় রাণী যমুনার রূপের বর্ননা করলেন শওকতের কাছে। বেশ বাড়িয়ে, রং চড়িয়ে রাণী যমুনার রূপের বর্ননা করলেন। রাণী যমুনার রূপের বর্ননা শুনে কামুক শওকত কামাতুর হয়ে ওঠে।


      বুন্দেলখন্ড সামিল হলো এই চক্রান্তে। বেহড়ের লুঠেরাদের ছদ্মবেশে দামোদর সিংয়ের রাজত্বের সীমান্তে হানা দিতে শুরু করলো চান্দেল রাজ্যের সেনারা। বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে, জমির ফসল লুঠ করে, গনহত্যা চালিয়ে অস্থির করে তোলে সীমান্তের জনগনকে।


      সীমান্তের অস্থিরতা শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন মহারাজ দামোদর। হাতে তুলে নেন অস্ত্র। সেনা নিয়ে কুচ করেন। একই সঙ্গে দ্রুতগামী ঘোড়ায় চেপে রাণী মেঘনার দুত যায় শওকতের কাছে। তৈরি ছিল শওকত। সে বেশ কিছু বাছাই করা অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে ছুটে এলো অরক্ষিত চন্দনগড়ে। উদ্দেশ্য রূপবতী রাণী যমুনাকে দখল করা।


      দুর্গের খোলা দরজা দিয়ে বিনা বাধায় শওকত ঢুকে পড়ে অরক্ষিত দুর্গে। এগোতে থাকে রাণী যমুনার মহলের দিকে। রাণী যমুনার মহলে তখন বসেছে গানের আসর। ভেসে আসছে ঠুমরির সুর। সঙ্গে তবলা, সারেঙ্গীর সঙ্গত। সামান্য কিছু সেনা উপস্থিত রয়েছে দুর্গে। তারা অর্ধেক রাণী যমুনার অধীনে, অর্ধেক রাণী মেঘনার অধীনে। রাণী যমুনার অধীনে থাকা সেনারা প্রাণপণে শওকতের সেনাদের আটকানোর চেষ্টা করলেও, রাণী মেঘনার অধীনে থাকা সেনারা লড়াই থেকে বিরত থাকে। এক অসম লড়াই হচ্ছে। হতাহত, ছত্রভঙ্গ হচ্ছে লড়তে থাকা রাণী যমুনার সেনারা। প্রায় রাণী যমুনার মহলের কাছে এসে গেছে শওকত। পরাজয় অবসম্ভাবী। আর বাঁচা সম্ভব নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন রাণী যমুনা। যেটা রাজপুতানীরা নিজেদের সম্মান বাঁচাতে নিয়ে থাকেন। কলুষিত হওয়ার আগে অগ্নি সমাধি নিলেন। জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিজের শরীরটাকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেললেন। খবর পেয়ে উন্মত্ত শওকত তার সেনাদের মুখ ঘোরায় রাণী মেঘনার মহলের দিকে। আজ রাতে তার কোনো না কোনো রাণীকে চাই সজ্জা সঙ্গিনী হিসেবে। প্রতিরোধে বিরত থাকা সৈন্যরা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগেই ধর্ষিতা এবং খুব হলেন রাণী মেঘনা।


      রাণী যমুনার মহলের বেঁচে থাকা কিছু আহত সেনা নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে পাল্টা হামলার জন্য প্রস্তুত হলো। এবার তাদের লক্ষ্য শওকত নয়। কারণ মহারাজ দামোদর সিং ফিরে আসছেন শুনে অনেক আগেই শওকত দুর্গ ছেড়ে চলে গেছে। রাণী যমুনার সেনাদের লক্ষ্য দুর্গের মধ্যে থাকা বিশ্বাস ঘাতক, বেইমান সেনারা। যারা রাণী মেঘনার অঙ্গুলী হেলনে শওকতের সঙ্গে লড়াই থেকে বিরত ছিল। রাণী মেঘনার সেনারাও অস্ত্র হাতে মুখোমুখি হলো রাণী যমুনার সেনাদের। একই দুর্গের মধ্যে একই রাজার অধীনে থাকা সৈন্যরা দুভাগে ভাগ হয়ে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চলেছে!


      বহিঃশত্রুদের বিতাড়িত করে ফিরে আসছেন মহারাজ দামোদর সিং। মাঝ পথে ভগ্নদুতের মুখে দুর্গের দুরাবস্থার খবর পেলেন। রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূণ্য হয়ে হাতে তুলে নিলেন ঐশ্বরিক বর্শাকে। নিক্ষেপ করলেন দুর্গ লক্ষ্য করে। অমোঘ শক্তির অধিকারী ঐ বর্শা নিমেষের মধ্যে ধ্বংস করে দিল দুর্গকে। সব কিছু হারানোর শোকে ঘোড়ার পিঠেই প্রাণ ত্যাগ করলেন মহারাজ দামোদর সিং।


      তারপর কেটে গেছে কত শত বছর। ধ্বংস হয়েও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি চন্দন গড়। মাঝে মাঝে রাতের অন্ধকারে জেগে ওঠে। শোনা যায় সারেঙ্গীর সুর, তবলার ঠেকা, সুরেলা কন্ঠের ঠুমরি।


      ভুমিশয্যা থেকে উঠে দাঁড়ালো তাপস। এগিয়ে গেল তার গাড়ীর দিকে। ড্রাইভিং সীটে বসে চাবি লাগালো। কি আশ্চর্য প্রথম চেষ্টাতেই গাড়ির ইঞ্জিন পর্জন করতে লাগলো!



                         

রমেশের কৃপণতা - সামিমা ইয়াসমিন || Ramesher Kripanata - Samima yeasmin || Short story || ছোট গল্প || গল্প || অনুগল্প || Story || Bengali Story

 

রমেশের কৃপণতা

  সামিমা ইয়াসমিন

    




এক গ্রামে রমেশ নামে এক কৃপণ ব্যক্তি ছিল। যে তার খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে আশাক- পোশাক পর্যন্ত সবকিছুতেই কৃপণতা দেখাত। সে এতটাই কিপটে ছিল যে একটি জামা সম্পূর্ণ চিটচিটে ময়লা না হওয়া অবধি পরিষ্কার করত না। সে মনে করত খুব ঘন ঘন জামা পরিষ্কার করলে সাবান বেশি নষ্ট হবে। আবার প্রায় একমাস পর যখন সে জামা পরিষ্কার করত তখন খুব ভালো করে পরিষ্কার হতো না কারণ সে তার স্ত্রীকে কম সাবান ব্যবহার করতে বলতো। তারপর যখন ভালো করে পরিষ্কার হতো না তখন আবার সে তার স্ত্রীকেই বকত। আর তার বেচারা স্ত্রীর প্রায় বিনা সাবানে কাপড় পরিষ্কার করে করে হাত ব্যথা।


একদিন পাশের গ্রামে মেলা বসেছে। আর এটা যখন রমেশ শুনে তার মাথায় বাজ পরার মত অবস্থা। তার দুটি সন্তান আছে , একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। সে আগে থেকেই ভেবে নিয়েছে বাড়ি গিয়ে কোনোমতেই স্ত্রী ও সন্তানদের বলবে না যে পাশের গ্রামে মেলা বসেছে।


বাড়ি গিয়ে দেখে তার স্ত্রী ও সন্তানরা সেজেগুজে বসে আছে। তার স্ত্রী রমেশকে বলে-


‘ পাশের বাড়ির কমলা এসেছিল। সে বলল পাশের গ্রামে মেলা বসেছে তাই তাড়াতাড়ি মেলা চলো আর দেরি করা যাবে না। ’


রমেশ তো কোনোমতেই যাবে না কারণ তার অনেক খরচ হয়ে যাবে তাই সে বিভিন্ন রকম বাহানা বানানো শুরু করে। কিন্তু তার স্ত্রী তাকে ভালোভাবেই চিনে এবং সে তার সন্তানদের শিখিয়ে দিয়েছে যখন তার বাবা মানবে না তারা যেন কান্না শুরু করে দেয়। যখন তাদের কান্না রমেশের দ্বারা আর থামানো যায় না তখন তাকে অবশেষে মানতেই হলো মেলা যাবার জন্য।


আর মেলা গিয়ে কিছু না খেয়ে কিছু না কিনে তো আসা যায় না। তাই রমেশ যখন দেখে তার স্ত্রী ও তার ছেলে-মেয়েরা খেলনার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তখন সে কোনমতেই তাদের কাছে যায় না এবং সে লুকিয়ে যায় কিন্তু সে দেখে তার স্ত্রী ও সন্তানরা দোকান থেকে ঘুরে আসছে এবং তার ছেলে ও মেয়ের হাতে একটি করে খেলনা আছে। রমেশ তো অবাক হয়ে যায়। সে ভাবে তার স্ত্রী টাকা কোথা থেকে পেল কারণ সে তার স্ত্রীকে ফুটি করি দেয় না। তারপর তার স্ত্রীকে যখন সে জিজ্ঞেস করে-


‘ তুমি টাকা কোথায় পেলে ?’


‘ আমার বাবা যখন বেড়াতে এসেছিল তখন রনি ও ছুটকিকে হাতে পয়সা দিয়ে গিয়েছিল। ’


তারপর সামনে জিলিপির দোকান দেখতে পেয়ে ছুটকি সেখানে ছুটে যায় এবং একটি জিলিপি হাতে তুলে নেয়।


উপায় না দেখতে পেয়ে রমেশ শুধু একটাই জিলিপির দাম দিল আর কিনল না।


‘ আজকে অনেক খরচ হয়ে গেল। ’


- এই কথাটি বলে তাড়াতাড়ি করে তাদেরকে নিয়ে মেলা থেকে প্রস্থান নিল।


সকালবেলায় রমেশ চায়ের দোকানে চা খেতে গিয়েছে। সেখানে অনেক লোকজন বসে আছে এবং তারা গল্প-গুজব করছে। রমেশকে দেখে একজন বলে উঠল -


‘ কিরে তোর জামাটা দেখছি ময়লা ময়লা লাগছেে ? ’


কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল এবং রমেশ লজ্জায় পড়ে গেল। আর একজন বলে উঠল-


‘ এবার মাটি দিয়ে পরিষ্কার করবি তাহলে দেখবি একটাও পয়সা খরচ হবে না। ’


আবার সবাই হেসে উঠল। আর গ্রামের লোকেরা রমেশকে ভালোভাবেই চিনে সে কতটা কৃপণ ব্যক্তি। তারপর রমেশ চা চাইল কিন্তু তাকে চা দিল না। কারণ সে কয়েকবার চা ধারে খেয়েছে এবং সেটার পয়সা এখনো মেটাইনি।


‘ আমি ঠিক দিয়ে দেবো। এই তো কালকেই দিয়ে দিচ্ছি। ’


এটা শুনে চাওয়ালা বলে-


‘ তুই কালকে কালকে করে কত কাল পার করেছিস। আমাকে আগে ধার মেটাবি তবে চা দেবো। ’


রমেশ চলে যাওয়ার পর চায়ের দোকানে বসে থাকা এক ব্যক্তি বলে -


‘ শুনেছি তারা নাকি দু মাসে একবার মাছ ভাত খায়। সে তো উৎসবের দিনেও তার স্ত্রীকে ভালো একটা শাড়ি কিনে দেয় না , এতটাই কিপটে। ’ আর একজন বলে উঠল -


‘ তার মুদিখানা দোকানে ভালোই বিক্রি হয় এবং জিনিসপত্রের অনেক দাম নেই। কি জানি অত টাকা বাঁচিয়ে কি হবে ? মনে হয় যখন মরবে টাকাগুলো সঙ্গে করে নিয়ে কবরে যাবে। ’


এবং তারা সবাই রমেশকে নিয়ে হাসিঠাট্টা শুরু করে দিলো। ’


একদিন রমেশের বাড়িতে নিমন্ত্রণ এল জন্মদিনের পার্টির। রমেশ মনে মনে ভালো খাওয়া- দাওয়ার জন্য খুশি তো হচ্ছেই তার ওপরে কি গিফট দিবে তা নিয়ে চিন্তা শুরু হয়েছে। আর সে তো কোনোমতেই টাকা দিয়ে কোনো জিনিস কিনবে না। কারণ সে তার নিজের ছেলে-মেয়েকে কোনো জিনিস কিনে দিতে নাকচ করে। কিন্তু মনে মনে ভালো খাবার দাবারের কথা নিয়ে লোভ সামলাতে পারেনা তাই সে মনে মনে ঠিক করল ছুটকির মেলা থেকে নেওয়া পুরনো খেলনাটি তাকে দেবে। তাই সে তার স্ত্রীকে ডাকে -


‘ ছুটকির খেলনাটি দাও তো ! ’


তার স্ত্রী বলে -


‘ কেনা ছাড়া উপাই নেই। ছুটকি খেলনা ভেঙে দিয়েছে। ’


এটা শুনে রমেশ পুরো বাড়িতে হই হট্টগোল শুরু করে দিল এবং তার স্ত্রীকে বকতে শুরু করে দিল।


‘ টাকা নষ্ট করে খেলনা কেন কিনে দিয়েছিলে ? ওই টাকাতে একদিন মাছ কেনা হতো। এবার পার্টি তে কি নিয়ে যাবো ? ’


তার স্ত্রী রাগ তাঁর কমানোর জন্য জল নিয়ে এলো।অনেকক্ষণ পর রমেশের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো সে ভাবল -


‘ ওই ভাঙ্গা খেলনাটিকে একটা বড় প্যাকেটের মধ্যে প্যাক করবো তাহলে দেখে বড় গিফট মনে হবে এবং ভেতরে কী আছে তা কেউ দেখতে পাবে না। ’


সন্ধ্যার পর বেরোলো ছুটকি ও রনিকে সঙ্গে নিয়ে। সেখানে গিয়ে রমেশ বন্ধুদের বেশি বেশি করে তার গিফটি দেখায়। তা দেখে একজন বলে -


‘ কি আছে ?’


রমেশ বলে - ‘ 500 টাকায় কিনেছি দারুন খেলনা আছে। ’


তার এই কথা শুনে সবাই অবাক হয় কারণ তারা ভালো করেই জানে যে ব্যক্তি তার নিজের সন্তানদের কিছু কিনে দিতে কৃপণতা দেখায়। সে আবার পরের ছেলেকে 500 টাকা দামের খেলনা কিনে দেবে এবং সবাই গিফটির দিকে তাক নজরে থাকে।


কেক কাটার পর সবাই খাওয়া দাওয়া শুরু করে। রমেশ পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করে এবং তিনটে মিষ্টি ভরে নেয়। আর এই কাণ্ডটি করতে একজন দেখে নেয় এবং চিৎকার করে বলে -


‘ মিষ্টির চোর ! ’


রমেশ তখন তাড়াতাড়ি করে প্যাকেটটি পকেটে ভরে নেয় এবং লজ্জা পেয়ে সে বলে -


‘ যে জীবনে কোনদিন মিষ্টি খায়নি সে এই কাজটি করবে। ’


এটি বলে সে নিজেকে বাচায়।


খাওয়া-দাওয়ার পর সে সেখানে আর এক মিনিটও থাকবে না কারণ এবার সব গিফট খুলবে। রমেশ তাড়াতাড়ি করে ছুটকি ও রনিকে নিয়ে বেরোয় কিন্তু তাকে সবাই আটকে নেন।


‘ অত তাড়া কিসের , আরেকটু থাম একসঙ্গে তো সবাই বাড়ি যাব। ’


তাকে বাধ্য হয়ে থামতে হয় । সবশেষে যখন তার গিফটি খোলা হয় তাতে দেখে ভাঙ্গা খেলনা রাখা সেটা দেখে সবাই হাসতে শুরু করে। যার জন্মদিন পালন হচ্ছিল তার নাম রকি। সে খেলনাটি ডাস্টবিনে ফেলে দেয় এবং তার একটি নতুন খেলনা ছুটকিকে দেয় । কারণ রকি জানত খেলনাটি ছুটকির ছিল । সে খেলনাটি নিয়ে তাকে খেলতে অনেকবার দেখেছিল । যাইহোক অনেক রাত হওয়ার ফলে সব লোকজন নিজের নিজের বাড়ি প্রস্থান নিল।


রমেশ একদিন দোকান যাবার পথে রাস্তার ধারে ঝোপঝাড়ের পেছনে একটি কালো রংয়ের ব্যাগ কুড়িয়ে পায়। সে ব্যাগটি না খুলেই সেখান থেকে বাড়ি নিয়ে চলে আসে কিন্তু ব্যাগটিতে তালা মারা ছিল তাই রমেশ চেষ্টা করেও ব্যাগটি খুলতে পারল না । সে ভাবে ব্যাগটিতে হয়তো অনেক টাকা ভরা আছে এবং সে তার স্ত্রীকে দেখায় কিন্তু তার স্ত্রী তাকে বলে -


‘ রাস্তায় পড়ে পাওয়া জিনিস ভালো নয়। সবথেকে ভালো হবে তুমি এটা পুলিশকে দিয়ে দাও ।’

কিন্তু সে ব্যাগটিকে কাউকে ছুঁতে দিবেনা , পুলিশকে দেওয়া তো দূরের কথা।


এই ব্যাগটির জন্য কয়েকদিন সে দোকানে যায় না সেটা চুরি হয়ে যাবে বলে। সে সবসময় সেটিকে তার কাছে রাখে , সেটিকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকে।


সে ভাবে ব্যাগটি একদিন কামারের কাছে নিয়ে যাবে তালা ভাঙার জন্য কিন্তু সে এই ভয়ে নিয়ে যায় না যে কামার হয়ত সব টাকা গুলো দেখে নেবে এবং তাকেও কিছু ভাগ দিতে হবে। তাই সে ঠিক করে এখন সে এটি লুকিয়ে রাখবে । পরে তখন ঠিক সময় হলে এটি খুলবে। ততক্ষণে এটা যার ব্যাগ সে তখন খোঁজার হাল ছেড়ে দেবে।


অনেকদিন ধরে বাড়িতে থাকার ফলে তার দোকানের গ্ৰাহকগুলো চলে যায়। আর তাদের বাড়িতে যদি কেউ কোনো কিছু নেওয়ার জন্য আসে কিংবা কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য আসে রমেশ তাকে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি থেকে বার করে দেয়। তার ওই গুপ্তধন দেখে নেবে এই ভয়ে। আর সে যখন ঘুমায় তখন নিজেকে ব্যাগটির সঙ্গে দড়িতে বেঁধে ঘুমায়। যাতে করে চোর যদি চুরি করতে আসে সেটা নিয়ে যেতে পারবে না।


অবশেষে সে ব্যাগটি খোলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং একটি হাতুড়ি নিয়ে আসে। হাতুড়িতে করে বার বার আঘাত করার ফলে তালাটি খুলে যায়। খোলার পর সে তার মাথায় হাত দেয় কারণ তাতে পুরনো জামা কাপড় ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এটার জন্য সে তার দোকান পর্যন্ত যায়নি। সে ভাবে যদি সে এটা আগে কামারের কাছে খুলে নিত তাহলে হয়তো খোলার জন্য যত টাকা লাগত তার থেকেও বেশি দোকান না যাওয়ার ফলে তার অনেক টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে এবং তার দো

কান আর ভালো ভাবে চলেও না। 


এদিকে তার এই কৃপণতার কারণেই তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়।


এ ভাবে - সুশান্ত সেন || Ea vabe - Sushanta sen || Kobita || Bengali Poems || Bengali poetry || Poems

 এ ভাবে

সুশান্ত সেন



এ ভাবে নয় ও ভাবে

এই রকম নির্দেশ প্রতিপদে।

এই রাস্তায় নয় ওই রাস্তায়

ওই যে রাস্তায় বেলফুলের গাছ

সেই রাস্তা ধরে সোজা চলে আসুন।


মানতে মানতে

নির্দেশ গুলো মানতে মানতে

কখন যে স্ব - ইচ্ছার কথা

বেমালুম ভুলে গেলাম সে আর

মনে করতে পারি না।


এখন আবার নানা রকমের মত হয়েছে।

কবিতা লেখাতেও।

যাচাই করার মানদণ্ডের কাছে

দু দন্ড যে দাড়াব তার উপায় নেই,

পেছন থেকে ঠেলা মারছে

মৌমাছির দল ,

ওরা বেরিয়েছে মধু আহরণে।


এগিয়ে চলুন এগিয়ে চলুন

সময় যে ফুরিয়ে যাবে।




তুমি - শ্যামল রক্ষিত || Tumi - Shyamal Rakhshit || Kobita || Bengali Poems || Bengali poetry || Poems

 তুমি 

শ্যামল রক্ষিত 


হে

দূরের পাখি 

তোমাকে নির্মাণ দেব 

এমন শাশ্বত সন্ধ্যা কোথায় 


আমি পলক ফিরে চেয়ে দেখি  

ক্ষণজীবন নিয়ে তুমি একা একা বসে আছ 

                                 মগজের মগডালে ৷

সেতারের তার - আনন্দ গোপাল গরাই || Setarer tar - Ananda gopal garai || Kobita || Bengali Poems || Bengali poetry || Poems

 সেতারের তার

       আনন্দ গোপাল গরাই


মনটা তোমার সেতারের তারের মতো

হাত পড়তেই কেঁপে উঠে

বেরিয়ে আসে সুর---

সে সুর কখনো হাসির

কখনো কান্নার -----অভিমানের

কখনো বা বেদনার শুধু।


থাকব না যেদিন আমি

তুলে যেতে সুর সেতারের তারে তোমার

কেউ যদি সাধে সুর

সেই তার নিয়ে

পড়বে কি মনে

সেই গান সেই সুর সেই ভালোবাসা!

সেদিন গাইবে কি গো মিলনের গান?

নাকি রুদ্ধ হয়ে যাবে কণ্ঠ

ঝরে পড়বে বেদনার বাণী

বৃষ্টির ধারার মতো

সেতারের তার হ'তে

অজান্তে তোমার!

শেষের ধারাপাত - শুভজিৎ ব্যানার্জী || Seser Dharapat - Subhajit Banerjee || Kobita || Bengali Poems || Bengali poetry || Poems

 শেষের ধারাপাত

                শুভজিৎ ব্যানার্জী



হঠাৎ করে থামতে হল মাঝে, 

চটা ওঠা স্মৃতির গ্রাম্য ধূলো;

ডাবের খোলায় তপ্ত দুপুর সাজে,

নীরব কাঁদে আলতো শপথগুলো।


রাগছে নরম আঁধার দূরের বনে,

বাঁধের ধারে পাগলী বাঁধে ঘর;

টুকরো আকাশ নীল পুকুরের কোণে,

ইচ্ছেমত লুকোয় চরাচর।


তোকে দিলাম সূর্য রাঙা ভোর, 

একটা মেঘের আকাশ আমার থাক;

ইচ্ছা হলে রাখিস খুলে দোর,

আবছায়াটা ঢেউয়ে ভেসে যাক।


পাখিগুলো আসবে নীড়ে ফিরে,

ঝিম ধরানো অশথ বটের ছায়ে;

সেদিনও কি থাকবি আমায় ঘিরে,

লালচে হাসি ভুলেও যদি যায়?


ভুলেই গেছি কিনতে কাঁচের চুড়ি, 

ঝড়ের পরে ঝরে পড়ার মত;

জলের উপর অবাধ্য সুড়সুড়ি,

আসুক আবার দিন বদলের ক্ষত।


শেষ ছিল এক শেষের ধারাপাতে, 

নামতে গিয়ে নেমেছিলাম তাই;

সব হারিয়ে সব পেয়েছির সাথে,

ঐ নদীতে আদর খুঁজতে যাই।



শীত কথা - আবদুস সালাম || Sitkotha - Abdus Salam || Kobita || Bengali Poems || Bengali poetry || Poems

 শীত কথা

আবদুস সালাম



আমরা অপেক্ষা করি একেকটা বিবর্ণ শীতের

ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট নবান্নের পিঠে পুলি ভক্ষণ করি

শীতার্ত হৃদয় মন্দের ভালো খোঁজে


পৃথিবীর সব সুখী মানুষের উচ্ছিষ্ট পড়ুক আমাদের পাতে

জুবুথুবু শীত মুখ দিয়ে বেরোয় ভাপ


রোজ আমরা লাল সূর্য দেখি সকালে

রাতের আকাশে দেখি তারার লুকোচুরি

বিছানা হীন ,বালিশ হীন ফুটপাত আমার কতো প্রিয়

নিদ্রাহীন রাতের বিছানায় নগ্ন হাঁটুর ঠকঠকানী

গোড়ালি আর ঠোঁট ফাটার শীতালী কাব্য


পৃথিবীর সব সুখের মানুষের প্রতিকূলে দিলাম ঘৃণার অক্ষর

তোমার আমার কবিতা পড়ে অনুভবের শীত কাব্য

শীতের ভোরে খক,খক দলা পাকানো সর্দি নিয়ে লিখে দিলাম আমার কাব্য কথা

সিমেন্টের বস্তার তোষক আর 

চটের বস্তার বালিশ

Sunday, November 5, 2023

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩০ || সম্পাদকীয় ও সূচিপত্র || World Sahitya Adda Sarod sonkha 1430

 




সম্পাদকীয়:-

শারদ প্রাতে নরম তুলার মেঘ, কাশে কাশে ঘন দাবদাহ, কোথাও ফ্যাকাসে আলো, কোথাও মুষলধারার অগ্নি স্নান। এমতাবস্তায় মায়ের দর্শন, মায়ের আশিষ লাভ ভাগ্যের ব্যাপার। যদি ঘরে ফিরে আসি, খাঁচার পাখি সোনার খাচায় কিংবা রুপার খাজায় বন্দী হই সেখানে শুধু দুদন্ড শান্তি দেয় সাহিত্য চর্চা। বিশেষত শারদ শুভেচ্ছার শারদ সংখ্যা গুলি। কল্পনা পিয়াসী কবি হৃদয়, আশায় ডুবে থাকা মধ্যবিত্ত পাঠক শুধু মুক্তির পথ খোঁজে যন্ত্র চালিত জীবনে থেকে পালিয়ে বাঁচার একটা নতুন আবেগ নিয়ে। এ শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ সার্বজনীন। বাঙালির আবেগ দুর্গাপূজা। দেশ দেশান্তরের আকুল আকাঙ্ক্ষা হলো শারদ উৎসব‌। মা সবার। মায়ের আশিষ সবার প্রাপ্য। সাহিত্য চর্চার অমোঘ টান নিয়ে কেটে উঠুক দুর্গা পূজার আনন্দ। ভরে উঠুক বাঙালি তথা সমগ্র ভারতবাসীর হৃদয়।


পরপর দুটি বছরের সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে ২০২৩ এর শারদ শুভেচ্ছা নিয়ে হাজির হচ্ছে আমরা- আপনাদের সকলের কাছে। তাই সকলেই এর স্বাদ নিন। সাধ মিটিয়ে আত্মসাৎ করুন প্রতিটি গল্প, প্রতিটি কবিতা। পুরাতন গ্লানিকে ছুটি দিন। সাহিত্য চর্চায় মজে উঠুন। ওয়াল সাহিত্য আড্ডা আপনাদের কাছে এক আনন্দময় মালাট। এক নতুন ভাবনার চিত্রপট। তাই একে উপলব্ধি করুন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সাহিত্যে থাকুন। ওয়ার্ল্ড সাহিত্য আড্ডা সাইট সকলের জন্য এই প্রার্থনা করে আসছে আর করে যাবে। ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে তুলুন পাতায় পাতায়, পাঠক বর্গ মশগুল হোক আমাদের সকলের প্রিয় পত্রিকা ওয়ার্ল্ড সাহিত্য আড্ডাতে। সকলকে শারদীয়া ১৪৩০ এর শুভেচ্ছা জানাচ্ছে ওয়ার্ল্ড সাহিত্য আড্ডা।



                                ধন্যবাদান্তে

          ওয়ার্ল্ড সাহিত্য আড্ডা সম্পাদকীয় 

_________________________________________________


বিজ্ঞাপন:-




_________________________________________________

বিজ্ঞাপন:-


___________________________________________________


সূচিপত্র:-



কবিতা -

অঞ্জনা ভট্টাচার্য, নিখিল মিত্র ঠাকুর, অন্তরা মন্ডল, সব্যসাচী মন্ডল, পরাগ চৌধুরী, ভুবনেশ্বর মন্ডল, অঞ্জন বল, সুশান্ত সেন, তুষার ভট্টাচার্য, প্রদীপ ভট্টাচার্য, অসীম কুমার সমাদ্দার, লালন চাঁদ, অভিজিৎ দত্ত, আনন্দ গোপাল গড়াই, মিলি দাস, বদরুদ্দোজা শেখু, গৌড় দাস, সিক্তা পাল, রুপায়ন হালদার, পাভেল রহমান, জয়ন্ত সাহা, সতু মালাকার, সোমা রায়, আব্দুস সালাম, পরাগ চৌধুরী, শুভজিৎ ব্যানার্জি, কাজল মৈত্র, পলাশ পোড়েল, রথীন পার্থ মন্ডল, দিবাকর মন্ডল, রঞ্জিত বিশ্বাস, তুষার ভট্টাচার্য, দীপঙ্কর বেরা, বীরেন্দ্রনাথ মহাপাত্র, বিজন বেপারী, দীপক বসু, বিদিশা চক্রবর্তী, রবীন প্রামানিক, জয়ন্ত কুন্ডু, উৎপলেন্দু দাস, নিখিল মিত্র ঠাকুর, আঁখি রায়, ঝুমা করাতি, সুমিত কুমার রানা, সৌহার্দ্য মুখার্জী, চিরঞ্জিত ভান্ডারী, রিঙ্কু পাল, সাদ্দাম প্রমিথিউস



প্রবন্ধ -

শংকর ব্রহ্ম, অভিজিৎ দত্ত, তন্ময় কবিরাজ




গল্প -

শাশ্বত বোস, সিদ্ধার্থ সিংহ, দেবদাস কুন্ডু, কাশফিয়া নাহিয়ান, কাজল মন্ডল, ইলা সূত্রধর, প্রীতম সরকার, তনিমা সাহা, ঝুমা দত্ত, অর্পিতা বিশ্বাস, চৈতালি ভট্টাচার্য, তপন তরফদার, সামিমা ইয়াসমিন, দেবযানী দত্ত প্রামানিক, কাহার মল্লিক, অসিত কুমার পাল, লিসা মাঝি, সাইয়িদ রফিকুল হক, আব্দুস সালাম, মনোরঞ্জন ঘোষাল, শ্রাবণী আচার্য্য, মনোজ মন্ডল, পাপিয়া চট্টোপাধ্যায়



English Poem -

Mousumi Pramanik



অনুগল্প -

অনিন্দ্য পাল, কাজল মন্ডল, পার্থপ্রতিম দাস, সুদাম কৃষ্ণ মন্ডল, সুনির্মল বসু, কাহার মল্লিক, অমিত কুমার রায়, সুপ্রিয় ঘোষ, দিলীপ পন্ডা, মধুরিমা ব্যানার্জি



মুক্ত গদ্য ও রম্যরচনা -

অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবানী বাগচী, দেবাংশু সরকার ঝুমা দত্ত, তিলোত্তমা চ্যাটার্জী



অঙ্কন ও চিত্রশিল্পী -

মৈত্রেয়ী মুখার্জি



English Story -

Bhaskar Sinha



English Article -

Saikat das

অঙ্কন শিল্প - মৈত্রেয়ী মুখার্জী || চিত্র শিল্পী - মৈত্রেয়ী মুখার্জী || Photography

 




Saturday, November 4, 2023

মাতৃরূপেণ - তিলোত্তমা চ্যাটার্জি || Matrirupeno - Tilottama Chatterjee || মুক্ত গদ্য || রম্যরচনা || Rommo rochona

মাতৃরূপেণ 

তিলোত্তমা চ্যাটার্জি



দূরে ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে ,বাইরের মাঠে দুলতে থাকা কাশগুলোর দিকে জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিল দেবদত্তা ।এমনিতে সব গুরু চেলাদের মধ্যে সে মানিয়ে নিয়েছিল একপ্রকার, আগে ভয় পেত বালিশে মুখ চেপে কাঁদতো কয়েক রাত ...কিন্তু এখন সে সব হয় না। হয়তো জীবনের এত ওঠা পডাতে নার্ভগুলো ওর স্ট্রং হয়ে গেছে। পুজো এসে গেছে নিঃসন্দেহে, চারিদিক আলোর রোশনাইতে সেজে উঠেছে এটাও ঠিক, কিন্তু ওর জীবনে আলো আসেনি এখনো বলা ভাল ওদের জীবনে..। হঠাৎ করে দমকা হওয়ার মত পুরনো স্মৃতিগুলো ভিড় করে দাঁড়ায় চোখের সামনে। ওর জন্মটা কিন্তু আমার আপনার মতই স্বাভাবিকভাবে হয়েছিল, এমনকি দুর্গাপূজা ওর খুব ভালোই কাটতো একসময় ,ব্রাহ্মণ বাড়ির প্রথম ছেলে সন্তান হলে যা হয় অবস্থা ।ওর স্মৃতিরা কথা বলতে চায় তারা মনে করিয়ে দেয় ওদের পরিবারে মা দূর্গার আশীর্বাদে এই প্রথম পুরুষ সন্তান এসেছিল ঘর আলো করে ঠাকুরমা তাই নাম রেখেছিলেন 'দেবদত্ত'। কিন্তু জীবন তো আর ওয়াই ইজ ইকুয়াল টু এম এক্স ফলো করা সরলরেখা নয় ,সমস্যাটা ধরা পরল আদরের দেবদত্ত যখন বড় হল ।প্রকৃতির আলো বাতাসে এই মায়ার সংসারে বেড়ে ওঠা দেবদত্ত পরিষ্কার বুঝতে পারছিল পুরুষ নয় তার ভেতর থেকে ডানা মেলছে একজন নারী। ছোটবেলা থেকে তার ইনস্পিরেশন ছিল তার মা মাকে সব দিক সামলে সংসার করতে দেখে সে খুব আকৃষ্ট হতো। ঠিক যেন দশ হাতের জ্যান্ত দুর্গা ছোটবেলায় প্রায় সবাই জিজ্ঞেস করত 'তুই বড় হয়ে কি হতে চাস রে?' বহু বার ই সে নিঃসংকচে বলেছে 'মা হতে চাই মায়ের মত সব কাজ সামলাতে চাই একা।' ছোট বলে ব্যাপারটা কেউ আমল না দিলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে তার ইচ্ছেটা বদলে যায়নি বরং তার ভিত আরো মজবুত হয়েছে ।দিদিরা , ওকে নিয়ে হাসি ঠাট্টাও করেছে, দেবদত্তার মনে পড়ে সেজো দিদি বলেছিল 'ছেলে হয়ে মা হবে পাগল একটা!' ও তখন প্রতিবাদ করে বলেছিল" কেন তোমরা সবাই মা হতে পারো আর আমি পারিনা?" ছোট দিদি টিপপনি কেটে বলেছিল," সাবধান ভাই আমাদের বলেছিস ঠিক আছে আর কাউকে বলিস না গালাগাল খাবি কিন্তু।"হ্যাঁ তারপর সে গালাগালি খেয়েছিল যথেষ্টই ইভেন এখনো খেয়েই যাচ্ছে.... সমাজের কাছ থেকে। কিন্তু সেদিনের দেবদত্ত ভালোই বুঝতে পেরেছিল শরীর আর মনটা তার কিছুতেই এক নয় ;ক্রিকেট ব্যাট সে কখনো ছুঁয়েও দেখেনি এমন নয় তবে মায়ের মত করে কডাই খুন্তি ধরে রান্না করার মধ্যে সে এক অদ্ভুত টান খুঁজে পায়। দেবদত্ত বুঝতে পারে চুল ক্রমশ ঘাড় বেয়ে কাঁধের উপর ঝুঁকে পড়ছে। চামড়ায় অদ্ভুত এক লালিত ও মসৃণতা শরীরের কিছু অংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে যদিও ওর কখনোই এই কোন কিছুকে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অস্বস্তিও হয়নি এক ফোটা বরং এই সবকিছুকে তার বড্ড আপন মনে হয়েছে বারংবার ,কারণ সেই একমাত্র জানে, আদতে সে একজন 'মেয়ে 'এবং তার এই নারী সত্তা গুপ্ত রাখতে চাযনি সে সমাজের কাছেও দিব্যি মনে পড়ছে জীবনের প্রথম আদর্শ মা কেই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুভূতিটা সে প্রথম জানিয়েছিল হতভম্ব মা বলেছিলেন "নানা তুই ভুল বুঝছিস,বাবু অনেক ছেলেদের এরকম বড় বড় চুল থাকে, আচ্ছা বেশ আমি তোকে গিয়ে চুল কাটিয়ে আনবো কেমন তুই আমার ছেলে আমার একমাত্র ছেলে।" "কিন্তু মা আমার মন ..... "তার মা মুখ কঠিন করে বলেছিলেন "একটা কথাও না, বাড়ির এই মেয়েলি পরিবেশে থাকতে থাকতে তোমার এই অবস্থা। বাবাকে বলে আমি তোমায় হোস্টেলে পাঠানোর বন্দোবস্ত করছি আর যেন দ্বিতীয়বার তোমার মুখে আমি একথা না শুনি।" চোখ রাঙিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান মা। দেবদত্তের চোখের জলের সাক্ষী রইল চারটি দেওয়াল... জীবনে প্রথমবার তার নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে হচ্ছিল নির্ভেজাল 'ওর' স্থান কারোর মনে নেই কিন্তু নারী হওয়া থেকে ওকে স্বয়ং ও প্রচুর শাসন করেও আটকাতে পারেনি। সবার অলক্ষে মায়ের শাড়ি -টিপ -গয়নাই হয়ে উঠতো তার আত্মার সাজ পোশাক, এর থেকে বেশি শান্তি ও যেন পৃথিবীতে পাবে না। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না মায়ের চোখে একদিন ধরা পরল ঠিকই ও চোখে আগুন ছিল ঝড়ো হাওয়ার মতো ঘরে ঢুকে মা সপাটে একটা চড় কষিয়ে দেন তাকে,সবটা গুলিয়ে যায় তার শুধু এইটুকু মনে আছে মা চিৎকার করে বলেছিল "তোদের মত মানুষদের কি বলে জানিস? হিজরা থার্ড জেন্ডার "সেদিনের দেবদত্ত বা আজকের দেবদত্তার র মনে একটাই প্রশ্ন এই জেন্ডারের ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড ভাগ করার মালিক টা কে আর ভিত্তি টাই বা কি!" যদি উত্তরটা এখনো অজানা।ছেলের এই কুকীর্তি মার হাত হয়ে বাবার কাছে যায় সব কিছু পরিষ্কার মনে না পড়লেও ওর এটা বেশ মনে পড়ে ও বলেছিল "আমি আসলে মেয়ে তোমরা বুঝতে পারছ না" থাক এরপরের ঘটনাটা আর না বললেও হবে। সবার জানা ।চোখের কোলটা ভরে আসে জলে চোখের পাতাগুলো ভিজে যায় ।বুকে পেটে হাতে বাবার বেল্টের কালশিটে পড়ে যাওয়া দাগ গুলোর দিকে এক পলক তাকায় দেবদত্তা। জীবনের এক বীভৎসরাতের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে এরা এখনো ।১৮ বছর বয়সে দেবদত্ত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে তবে শুধু বাড়ি নয় স্কুল, খেলার মাঠ, রান্নাঘর ,ঠাকুর দালান- তার চেনা জগৎটা থেকে সে বেরিয়ে আসে; স্কুলেও তাকে কম টোন টিটকারী সহ্য করতে হয়নি। তবু কাউকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেনি, কারন সে জানতো যে বাড়িতে সে জন্মগ্রহণ করেছে খোদ সেই বাড়ির লোকেদের কাছে যখন সে অবাঞ্ছিত নিশ্চয় সমাজের কাছে সে খুব একটা গ্রহণযোগ্য হবে না ।শুরু হয় এক নতুন লড়াই একদা অভাব শব্দের অর্থ না বোঝা দেবদত্তের বেশিরভাগ দিনগুলো কেটেছিল অ-ভাবেই। এই প্রথম ও বুঝেছিল শুধুমাত্র টাকা দিয়ে হয়তো পৃথিবী চলে না নইলে টাকা দেওয়া সত্ত্বেও ও হোটেলে রুম পায়নি ,খাওয়ার পাযনি ,বৃষ্টির দিনের ছাতা আর শীতের দিনে গায়ের কম্বল কোনটাই পাযনি। দেবদত্তার খুব মনে পড়ে এক হোটেল ওয়ালা বলেছিল "মাসি টাকা নাও আশীর্বাদ দাও খাবার দিতে পারবো না।" কঠোর শাসন করে বেঁধে রাখা চোখের জল গুলোকে আটকাতে পারল না দেবদত্তা বুঝতে পারল গাল দুটো ভিজে যাচ্ছে ক্রমশ ।ঠিক আর পাঁচজন ট্রান্সজেন্ডার এর মত ওর ও ঠিকানা হল আজকের এই দোতলার ঘরটায় যেখানে ও তার নিজের গুরু ভাইদের সাথে গুরুর সাথে আছে একরকম। এরপরের জার্নিটা আমাদের সমাজের ভীষণ প্রিয়। বাকিদের মতো দেবদত্তের শুরুটা হয় ভিক্ষাবৃত্তি দিয়ে শয় শয় অসুস্থ দেবদত্তারা ভিড় জমায় তথাকথিত সুস্থ সমাজের আনন্দ অনুষ্ঠানগুলোতে তারা তালি বাজায়, ভিক্ষা চায় আর এই স্বাভাবিক আমরা নিঃসন্দেহে ওদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিই ওরা কতটা অস্বাভাবিক। দেবদত্তারা এরকম চলছিল দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার জুটে যাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু বাঁচার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিল সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে দেবদত্তার একদিন মনে হল এরকমটা বেশিদিন চলতে পারে না এরকমটা হয় না সে বা তারা তো ভগবানেরই সৃষ্টি সেই সৃষ্টিতে এতটা খাদ মিশে নেই যে তার ভয়াবহতা টা এইরকম। শুধু তাদের প্রকৃত আত্মাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এত নোংরা পথ তারা বেছে নিতে পারেনা ট্রাফিকে হাত বের করে টাকা চাওয়া ,বাচ্চা নাচানো ,অস্ত্রাব্য গালিগালাজ কখনো জীবন হতে পারে না তাই একদা স্কুল পালানো দেবদত্ত বুকে সাহস এনে সমস্ত প্রতিকূলতাকে সঙ্গি করে আজকের দেবদত্তা হয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করে ,কারণ দেবদত্ত জানে হয়তো ওর অনেক কিছু খারাপ কিন্তু মাথাটা খারাপ নয়। জীবনে আরও একটা সংগ্রামের অধ্যায় শুরু হয়। নাহ,এই সংগ্রামটা বিফলে যায়নি। স্কুল লেভেলের পর পিজি লেভেলের পড়াশুনা শেষ করে বর্তমানে সেএকজন শিক্ষিকা। খুব মনে পডে চাকরির প্রথম দিনটা। শাড়ি পরিহিত দেবদত্তাকে দেখে গোটা স্কুলের বাকিদের ভাবখানা এমন ছিল যেন পৃথিবীতে এলিয়েন দেখে ফেলেছে! অদ্ভুত সুন্দর ভাবে ওরা দেবদত্তার থেকে সোশ্যাল এবং মেন্টাল ডিসটেন্স মেন্টেন করেছিল। স্কুলে যোগদানের পর হেডমাস্টার মশায়ের ঘরে ইন্টারভিউ দিতে হতো তাতে পাস হলে তবেই সেই স্কুলে সে চাকরি করতে পারবে। পাসও করেছিল কিন্তু তার কিছু মুহূর্ত আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা ছিল চিরস্মরণীয়। যথাসময়ে এইচ এমের ঘরে অপেক্ষারত ছিল সে অ্যাসিস্ট্যান্ট এইচ এম কে তার এপয়েন্টমেন্ট লেটার টাও দেখায। উনি হতভম্ব হলেও কিছু বলেন না ।এরপর এইচ এম এলেন এবং তার উল্টো দিকে বসে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন পনেরো মিনিট পরে অ্যাসিস্ট্যান্ট বললেন" স্যার ইন্টারভিউয়ের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে" এইচ এম মহাশয় অবলীলা ক্রমে উত্তর দেন" হ্যাঁ, নতুন টিচার আসুক তারপর তো প্রশ্ন করব!" এইচএম এর উত্তর শুনে অবাক বিস্ময় প্রশ্ন করে দেবদত্তা "সো হু এম আই স্যার ?"অ্যাসিস্ট্যান্ট এইচএম বাধা দিয়ে বলেন "স্যার ..... "বিরক্তি ভরা কন্ঠে এইচএম বলে ওঠেন "কি স্যার ?রতন তুমি দেখে নাও এদের কি দাবি দাওয়া আছে মিটিয়ে তাড়াতাড়ি বিদায় কর সকাল সকাল যত রাজ্যের ঝামেলা ।"চোখমুখ লাল হয়ে উঠে দেবদত্তার। নাক থেকে গরম নিঃশ্বাস বেরতে থাকে। অ্যাসিস্ট্যান্ট এইচএম মুখ নিচু করে বলেন "স্যার ইনি আমাদের নতুন টিচার ।"নিজেকে কোনোভাবে সামলে নিজের কোয়ালিফিকেশন ও এপয়েন্টমেন্ট লেটারটা এগিয়ে দেয় ও,এইচ এম এর সামনে। উনি খুঁজে পান না তার কি করা উচিত উনি দেবদত্তার ডিটেল্স গুলো বারবার করে পড়েন একবার চশমা পরে,ও একবার চশমা খুলে। একজোড়া চোখেরও যেন বিশ্বাস হতে চায় না এইরকম অলৌকিক ঘটনা। তিনি বার কয়েক তুতলিয়ে বলেন "ইয়ে ...ম্যাডাম মানে আমি ঠিক মানে আমি আর কি ভাবতেই পারিনি যে আপনারা...." দেবদত্তা বুঝতে পারে সামনের মানুষটার কথাবার্তা অসংলগ্ন হয়ে পড়ছে ক্রমশ বেজায় অস্বস্তিতে পড়েছেন তিনি দেবদত্তা ছোট্ট করে বলে "ঠিক আছে।" কিন্তু দেবদত্তাদের লড়াইটা কখনো এইটুকু নয় সারা জীবন শিক্ষক থেকে ছাত্র সমাজে তার প্রতি যে একটা নয় একটা গালাগালি বরাদ্দ তা সে ভালো মতই জানে। শুধু জানে না এই অসম ব্যবহারের কারণ যে মানুষ মেধায় আর পাঁচজনের সমান ,বুদ্ধিতে আর পাঁচ জনের সমান ,জ্ঞান এ আর পাঁচজনের সমান, শুধু একটি দেবদত্ত ত্রুটির কারণে সে সবার কাছে অস্পৃশ্য?! সত্যি কি নিজের ভাগ্যের জন্য কেউ নিজে দায়ী হয়! জানেনা দেবদত্তা এমনকি জানতে চাযে ও না কারণ সে জানে সে তার নিজের কাছে পরিণিতা ।যেমন হাসপাতালে ,পুলিশ স্টেশনে, সমাজে দেবদত্তাদের জন্য কোন স্থান নেই ঠিক তেমনি নেই স্কুলের কমন টিচার্স রুমে কেউ রাজি হয়নি তার সাথে রুম শেয়ার করতে ।একটা বন্ধ ঘরে ভাঙা আসবাবপত্রের মাঝেই দেওয়া হয়েছে তার চেয়ার টেবিল। নাহ এখন আর কষ্ট হয় না দেবদত্তার আগে হতো খুব হতো। এখন বলা চলে সয়ে গেছে কিন্তু দেবদত্তার স্বপ্নটা আজও বাস্তবে মাটি ছুঁতে পারেনি। 'মা' সে আজ হয়ে উঠতে পারেনি। হ্যাঁ ওদের সংস্থার একটা এনজিও আছে তার খুব একটিভ সদস্য দেবদত্তা সেই এনজিওর উদ্যোগে ওরা নিজেদের সাধ্যমত একটা অনাথ আশ্রম চালায়। পৃথিবীতে যেমন অভিশপ্ত ওরা তেমনি আরো কিছু অভিশপ্ত প্রাণীর বিকাশে যাতে কোন ত্রুটি না থাকে সেই কর্মে ব্রতী ওরা। যে সকল শিশুরা তথাকথিত সভ্য সমাজে অবাঞ্ছিত, যে সকল কন্যা সন্তানদের কপালে সকাল বিকাল কিছু অবহেলায় জোটে, তাদের আপন করে নিয়েছে দেবদত্তারা ।এছাড়া শহরজোড়া রেড লাইট এরিয়া গুলোতে সভ্য সমাজের কলঙ্ক হয়ে বেড়ে ওঠা, সন্তানদের শিক্ষা থেকে খাওয়া পড়ার ভার নিয়েছে একমাত্র ওরাই আর যেসব নারী সন্তানেরা পরিবারের বোঝা হওয়ার আগে সদ্যোজাত অবস্থায় হাসপাতালে পরিতক্ত হয়ে ডাস্টবিনের পাশে পড়ে থাকে তাদের দায় তথাকথিত সভ্য সমাজ ঝেরে ফেলতে পারলেও পারেনা একমাত্র দেবদত্তারা। নিজেদের যথাসাধ্য সামর্থ্য দিয়ে ওই বাচ্চা ছেলে মেয়েগুলোর মুখে যে হাসিটুকু তারা ফোটাতে পারে সেই হাসিটা অমূল্য নিঃসন্দেহে !বাচ্চা গুলো কেউবা ওকে মাসি বলে ডাকে কেউবা মামনি এতশত লড়েও 'মা' ডাক শোনা হলো কই !আর শুনবেই বা কি করে পোড়া কপাল নিয়ে কি আর মা হওয়া যায় !কিন্তু মাতৃত্ব টা সেটা তো মিথ্যে নয় না খোদার উপর খোদকারী করতে বিশ্বাসী নয় দেবদত্তা ভগবান তাকে যেমন সৃষ্টি করেছে সেই প্রকৃত 'সে' ই মান্যতা লাভ করেছে অন্ততপক্ষে তার নিজের কাছে !জগৎ জননীর কাছে খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে সত্যিই কি শুধু মাতৃসত্ত্বা নিয়ে শারীরিক অঙ্গ নিজের মা হওয়া যায় না?!

                          (2)

"শুভ ষষ্ঠী অম্বিকা মা কেমন আছো তোমরা?" ফোনের ওপার থেকে কাকিমার গলা শুনতে পেয়ে খুশি হল অম্বিকা বলল "শুভ ষষ্ঠী কাকিমা। আমরা ভালোই আছি, আপনি কেমন আছেন?" "এইতো চলে যাচ্ছে মা বুঝতেই পারছ বয়স হচ্ছে" কাকিমাকে কথা বাড়াতে না দিয়ে অম্বিকা প্রশ্ন করে "কাকিমা, আপনার আর কাকাবাবুর পূজোর জামা কাপড় পছন্দ হয়েছে তো?"-"খুব হয়েছে মা,তোমার আর বাবুর কেনাকাটা শেষ তো ?"অম্বিকা মৃদুস্বরে বলে "হ্যাঁ এই শেষ হল।" খানিক বিরতি দেন কাকিমা তারপরেই শুরু করেন "পূজো মানেই তো বোঝো মা বাড়ি ভর্তি লোকজন নাতি-নাতনিদের ভিড় হই হই রই রই... তোমার কাকু তো প্রায়ই বলে বাবুর একটা কিছু দেখে যেতে পারলে..." অম্বিকা বুঝতে পারে প্রসঙ্গ পাল্টে যাচ্ছে ফোনের ওপার থেকে কাকিমার গলার স্বর ভেসেআসে "কিছু মনে করো না মা দেখতে দেখতে ছয বছর তো হয়ে গেল আমাদের ছোটু বাবুর থেকে কত ছোট্ট বল ওরও দুটো ছেলে মেয়ে হয়ে গেল তোমরা কিন্তু ভাবো মা" অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দেয় অম্বিকা,"মানে, আপনি কি বলতে চাইছেন কাকিমা?" কাকিমা অনেকটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন "বাছা, এবার ঠাকুর ঠাকুর করে তোমরা নিয়ে নাও ।"অম্বিকা জিজ্ঞেস করে" কি বলছেন কাকিমা ?শোনা যাচ্ছে না" ফোনের এ প্রান্ত থেকে কাকিমা বলে" বাচ্চা নেওয়ার কথা বলছি মা" পুনরায় অম্বিকা বলে "কিছু শোনা যাচ্ছে না কি নিতে বলছেন ?"কাকিমার তীব্র চিৎকার অম্বিকার কানের পর্দা বিদীর্ণ করে দেয় "বাচ্চার কথা বলছি শুনতে পারছো বাচ্চা... "অম্বিকা বলে, "না কাকিমা নট ভেরি ক্লিয়ার নেটওয়ার্কের খুব সমস্যা এখন আমি রাখি কেমন!" কথাটা বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে ফোনটা কেটে দেয় অম্বিকা। কথাগুলো অম্বিকা শুনতে পেয়েছিল ভালোভাবেই কিন্তু 6বছর ধরে যেখানে হোক দেখা হলেই এরকম হাজার জন কাকিমাকে নিত্যনতুন কৈফিয়ত দিতে দিতে একপ্রকার ক্লান্ত সে আর ওগলি দিয়ে হাঁটতে ইচ্ছে করে না তার। ষষ্ঠীর বিকেলটা কেন কে জানে মেঘলা গুমোট,ঠিক অম্বিকার মনের মতই। সাকসেসের মোড়া জীবনে এই এক অপূর্ণতা। পর্দার আলোর ঝলকানি লাইট ক্যামেরা অ্যাকশনের মাঝে নিজের নারীত্বকে যেন কেমন হারিয়ে ফেলেছেও ।এই গোটা 6 বছরের দাম্পত্যে একবারও ও এই বিষয়টা নিয়ে ভাবেনি এমনটা নয়। প্রথমদিকে প্রায়ই এই ভাবনাটা আসত কিন্তু কাজের আড়ালে এই অপ্রয়োজনীয় ভাবনা চিন্তাগুলো চাপা পড়ে গিয়েছিল একবার রনজিতকে আবেগের বশে বলেও ফেলেছিল কিন্তু ওর খালি এই কাজ আর ও কাজ নয় সে কাজ। পুরোদস্তুর একটা কাজের মানুষ রনজিত। এর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের এক অ প্রিয় স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে অম্বিকা চিন্তার ভাঁজ পরে কপালে নিমিষে সমগ্র মুখটা জুড়ে যেন এক গভীর অন্ধকার ছেয়ে যায় তার। অভিনেত্রী অম্বিকা সেনের জাঁকজমকের আড়ালে এই অবসাদগ্রস্ত নারীকে চেনে না বাকি পৃথিবীটা ,কষ্টটাকে বাড়তে দেয় না অম্বিকা। চোখ পরে দেয়ালে বাঁধানো দম্পতির ছবিগুলোর দিকে, ওদের বিয়ের ফটো। রনজিত কে বিয়ে করে একপ্রকার খুশি অম্বিকা। রনজিত আর ও কলেজ ফ্রেন্ড দুজনেরই একসাথে পড়াশোনা প্রায় একই পথে হেঁটে আজ সাকসেসফুল ডিরেক্টর এবং অম্বিকা তারই গ্ল্যামারাস হিরোইন দুজনেই পছন্দ করে বিয়ে করলেও দু বাড়ি থেকে বাধা দেয়নি কেউ, মিচকি হাসে অম্বিকা। এমনিতে তারা সুখী পরিবারই... একটা খুঁত ছাড়া ।এই এতদিনের অনেক রংবেরঙের মুহূর্তরা ভিড় জমায় অম্বিকার মনের ক্যানভাসে হঠাৎই ডোর বেল শুনে প্রথমটা চমকে গিয়ে পরে বুঝতে পারে রন টেক্সট করেছিল আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবে দরজা খুলে অফিস ব্যাগ আর বিয়ারের বোতলটা হাতে নিয়ে ঢুকলো রনজিত ।কম বয়সে সুন্দর সুন্দর ফিল্ম বানিয়ে তার নামটা যথেষ্টই পরিচিত। ওকে চেঞ্জ করতে বলে কিচেনে ডিনার সার্ভ করতে গেল অম্বিকা ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে নটা ,হঠাৎই পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরে রন, কানের কাছে মুখ এনে বলে "কি ব্যাপার ম্যাডাম মুড অফ নাকি?" যদিও স্পর্শটা চেনা তবুও অস্বস্তি হচ্ছিল অম্বিকার। রণকে আলতো করে সরিয়ে বলল "না তো "ডাইনিং টেবিলের খাওয়ার সাজিয়ে দেয় অম্বিকা। রনজিত যেন শান্তি পেল না ফের এক দফা জিজ্ঞেস করল "না সব ঠিক মোটেই নেই বলোই না আমাকে ।"এই হচ্ছে রণর এক স্বভাব খুঁচিয়ে ঘা না করা অব্দি শান্তি নেই, খেতে খেতে হেসে ফেলল অম্বিকা। মনে মনে ঠিক করল আজ একবার বলতেই হবে মনের কথাটা। খানিকটাই ইতস্তত করে বলল "রন কাকিমা ফোন করেছিলেন ।"রন খেতে খেতে বলল "কোন কাকিমা ?"অম্বিকা মনে করানোর চেষ্টা করল "ওই যে যাদের সোনার দোকান আছে।" রণ মুখ তুলে বলল "ও রুনু কাকিমা তো কি বলছে? সব খবরা খবর ঠিকঠাক তো?" অম্বিকা মুখ নিচু করে বলে চলে" হ্যাঁ, এইসবই ভালো মন্দ কথা হচ্ছিল আর... ।"থমকে গেল অম্বিকা। রনজিত মাথা নেড়ে বলল "আর কি?" অম্বিকা মুখ নিচু করে উত্তর দিল আমাদের প্যারেন্ট হুডের ব্যাপারে বলছিলেন" রনজিত তোয়াক্কা না করে বলল" এ আর নতুন কি ছয বছর ধরেই চলছে। এসব লোকের কথা গুলি মারো। কাজ কম্ম নেই" বিড়বিড় করে রন চোখ তুলে অম্বিকা বলে "আমি বুঝি রন বাট উই শুড কনসারন আবাউট আওয়ার ফার্স্ট ইস্যু। সিরিয়াসলি ...." অম্বিকার সিরিয়াস কথাটা শুনে মুখ গম্ভীর হয়ে যায় রনজিতের ।ডিনারের বাকি পর্ব টা চলেছিল নিঃশব্দে ডিনার শেষে বাসনপত্র গোছাতে ব্যস্ত হয়ে যায় অম্বিকা। ও এক প্রকার জানত এরকমই করবে রণ নতুন কিছু নয় তাও কেন জানিনা অম্বিকার হাল ছাড়তে ইচ্ছে করলো না । বিযার ভরা একটা গ্লাস বাড়িয়ে দেয় রন ওর দিকে ওর থেকে গ্লাসটা নেয় অম্বিকা কথা না বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে "কিছু ভাবলে?" দূরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গম্ভীর ভাবে বলে ওঠে রন "তুমি সিরিয়াসলি এসব ভাবছো ?তোমার সময় নষ্ট করা ঠিক হবে? কাজের ক্ষতি করা ঠিক হবে? আর ব্যাপারটা তো একদিনের নয় সারা জীবনের শুধু বাচ্চা জন্ম দিলেই তো হবে না তাকে বড়ও করতে হবে এত সময় কার আছে! অনেক কষ্টের পর আজ তুমি এত সুন্দর একটা ফিগার পেয়েছো নষ্ট করে দিতে চাও নাকি? অম্বিকা মাথা নেড়ে বলে" তুমি ওভাবে কেন দেখছো ব্যাপারটা আবার ওয়ার্কআউট করে ফিগার পেয়ে যাওয়া যাবে বাট..." বাধা দিয়ে বলে রনজিত "তুমি যদি আমায় জিজ্ঞেস করো দেন মাই আনসার ইজ নো। আমি এই মুহূর্তে এত বড় ক্ষতি করতে পারবো না আমার ক্যারিয়ারের ।"অম্বিকা বিরক্ত হয়ে বলে "ক্ষতি কেন বলছ তুমি এটাকে? পৃথিবীতে সবাই কি ভুল করে যাচ্ছে ?"রনজিত ধমকে ওঠে" রিয়েলি আমি ভাবতে পারছি না তুমি এটা বলছো। without any family support এই লাইনে সাকসেস পেতে অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয় আর জীবন তো পালিয়ে যাচ্ছে না প্লিজ এসব সিলি কথাবার্তা আমায় বলতে এসো না।" অম্বিকা তাও বলে "কিন্তু..." বাধা দিয়ে গর্জে ওঠে রণজিৎ"কোন কিন্তু না আমার স্ক্রিপ্ট রেডি হয়ে গেছে পুজোর শেষে তোমার শুটিং শুরু that's it ।Figureএর প্রতি খেয়াল রাখো আর এসব নিয়ে কোনো কথা বলোনা, গুড নাইট ।"বলেই বেডরুমে চলে গেল রনজিত অম্বিকার বড় হতাশ লাগে বুকেরভিতরটা শূন্য হয়ে ওঠে, ঘোরের বসে কিছুক্ষণ পর অম্বিকা ও বেডরুমে এসে পৌঁছল ।এতক্ষণে রনজিত ঘুমিয়ে পড়েছে উল্টো দিকে ফিরে চোখ বোজেও চোখের পর্দা জুড়ে বুবাইয়ের হাসিটা ফুটে ওঠে। বুবাই ?বুবাই ওর ছোট বোন আরতির একমাত্র ছেলে কি প্রাণবন্ত ও! চোখের সামনে ভেসে ওঠে তিন বছরের ছেলেটা কেমন মার দিকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে আরতিকে কোলটা ভরে ওঠে ওর আর অম্বিকার কোলজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয় শূন্যতা... চোখের কোনটা ভরে ওঠে অম্বিকার কষ্ট হয় ওর ফুপিয়ে কেঁদে উঠতে চায় কিন্তু পারেনা দম বন্ধ হয়ে আসে ;লাইট ক্যামেরা একশন অটোগ্রাফের মাঝে এই মাতৃ সত্তা কোথায় চাপা পড়েছিল কে জানে!

                          

অষ্টমীর সকালবেলাটা ভারী সুন্দর কাটলো অম্বিকার। একটা মিঠে বাতাস এত দিনের সমস্ত গ্লানি কে মুছে দেয় বেলা গড়াতেই স্নান করে দারুন সাজ দিয়ে রনর হাত ধরে আবাসনের পূজোয় হাসি হাসি মুখ করে অঞ্জলিও দিতে গেল ফিরে একই সাথে লুচি তরকারি খায় ও আর রন। অম্বিকা ভালই বুঝতে পেরেছে আজ পতি দেবতা খুব রোমান্টিক মুডে আছে কাছাকাছি এসে ঘাড দুলিয়ে প্রশ্ন করল "এই যে অঞ্জলি দিলে মন্ত্র গুলোর মানে জানো?" লুচি মুখে পুরতে পুরতে বলল রনজিত "ওই সামথিং সামথিং ।"অম্বিকা পুনরায় বলে উঠছে" এই যে বললে ধনং দেহি পুত্রাং দেহি তুমি ইন্টারেস্টটেড নও ?"রনজিত বেপরোয়া ভাবে বলল "নো ওয়ে ।"অম্বিকা বলল "বাট আই এম সো ইন্টারেস্টেড। "রনজিত বলে "অম্বিকা আবার "বাধা দিয়ে অম্বিকা বলে "আই হ্যাভ এ সারপ্রাইজ ফর ইউ "কৌতুহলী হয় রনজিত অম্বিকা রনজিতের ঘাড় জড়িয়ে বলে ওঠে "উই আর গোয়িং টু বি প্যারেন্টস ।"কাল সকাল থেকে ধরতে পেরেছিল অম্বিকা ব্রেকফাস্টের পর থেকেই মাথাটা ঘোরাচ্ছিল বারবার ,তারপর ঘনঘন বমি শরীরটাকে বেশ দুর্বল করে দেয় যে কারণে বিকেলে ঠাকুর দেখতে পারেনি বন্ধুদের সাথে। সিউরিটিটা পেল আজ সকালে নেপথ্যের কারণটা সে ,নিজেই ইচ্ছে করে ওসিপিটা ইনটেক করেনিও। ব্যাপারটা বুঝতে বেশ খানিকটা সময় নেয় রনজিত স্পাইনাল কর্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা কিছু বয়ে যায় তার। দ্রুত নিজেকে সামলে উঠে রনজিৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে অম্বিকার দুটো গাল ধরে বলে "নো প্রবলেম পুজোটা গেলে ডক্টরের কাছে গিয়ে এবরশন করিয়ে নিও। এ আর নতুন কি !আগেও তো হয়েছে "বাধা দিয়ে ওঠে অম্বিকা "রন" হঠাৎই কঠিন হয়ে রনজিত বলে "এইবারের আমাদের প্রজেক্টটা কোটির কিন্তু। ঠিক আছে mind it আগের বারের ঘটনা মনে আছে তো?" কথা শুনিযে বেডরুমের দিকে হেঁটে যায় রনজিত। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, প্রায় পাথরের মূর্তি হয়ে যায় অম্বিকার শরীরটা চোখ দিয়ে নেমে আসে অবিশ্রান্ত জল ধারা হ্যাঁ মনে তার সবই আছে চার বছর আগের একটা ভয়ংকর ঘটনা শুধু সে এখন আর মনে করতে চায় না....

                                 (3)

ডক্টর অয়ন্তিকা বোসের ওয়েটিং রুমে ক্রমে ঘামতে শুরু করে অম্বিকা বিগত কিছুদিনের স্মৃতি হাতরে ।পূজোর বাকি দিনগুলো কেটেছিল চোখের জল আর মানসিক ঘাত প্রত্যাখাতে আরেকবার মানসিক ঝড় সহ্য করার পর অভিনেত্রী অম্বিকা সেন ভালোভাবেই বুঝে গেছে নিজের glamour আর ট্যালেন্ট দিয়ে পৃথিবী এদিক ওদিক করে ফেললেও 'মা' সে হতে পারবে না। বলা ভালো মা হওয়া তাকে মানায় না। সময় নেই তার হাতে নষ্ট করার মত ,এজন্য সে প্রস্তুত। লোকসান হতে পারে এমন কোন বস্তুকে তাদের পৃথিবীতে আসতে দেওয়ার সব সব পথ বন্ধ করতে তাদের মত লাভ লোভী বড়লোকেরা সিদ্ধ হস্ত। কিছুক্ষণ পরে তার ডাক এলো, ডক্টর অয়ন্তিকার সামনে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে সমস্ত কথা গুছিয়ে নিল ও।ডক্টর বললেন "বলুন ম্যাডাম" অম্বিকা বলল "উই নিড টার্মিনেশন ডক্টর। "ডক্টর অবাক হয়ে বললেন "ওয়ান্স মোর ?"মাথা নেডে শায় দেয় ও।ডক্টর মাথা নিচু করে বলেন I dont know why are you want this once more? It is equally injurious to urself। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড টেল মি ফ্র্যাঙ্কলি হোয়াট ইজ দা প্রবলেম?"একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মাথা নাডে অম্বিকা বলে, "নো উই হ্যাভ নট সাফিসিয়েন্ট টাইম।" হতাশ সুরে ডক্টর বলেন,"প্লিজইট ইজ নট এনাফ রিজন ফর দিস গ্রেট লস ।"বেঁধে রাখা কান্না গুলো বেরিয়ে আসতে চায় উত্তেজিত হয়ে অম্বিকা বলে "নো নেভার আমি মা হতে চাই না পারব না কোনদিনও। পারবোনা" কিছু সেকেন্ডের মধ্যে ডক্টর অয়ন্তিকা আর অভিনেত্রী অম্বিকা সেন কে চমকে দিয়ে তৃতীয় একটি কণ্ঠস্বর বলে ওঠে" কেন পারবে না !"চমকে উঠল অম্বিকা। সামনে তাকিয়ে আরো অবাক হল ডক্টর এর মুখে একটা স্নান হাসি। অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করলে অম্বিকা,"আই এম সরি হু ইজ দিস?" তৃতীয় মানুষটি কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল ডক্টর বাধা দিয়ে বললেন "ও দেবদত্তা টিচার আর আমাদের এনজিওর ফরমার মেম্বার ।"অম্বিকা জিজ্ঞাসা করে জানতে চায় "ওকে বাট উনি আমাদের কথার মাঝে ইন্টারফেয়ার করছেন কেন?" ডক্টর অয়ন্তিকা বললেন "বিকজ আই কলড অনলি ফর ইউ ইউনিড হার নট মি ।আপনি লাস্ট যখন অ্যাপোয়েন্টমেন্ট কলটা করলেন তখনই বুঝেছিলাম সামথিং ইজ রং দেয়ার আপনারা কথা বলুন ও বলা হলো না উনি একজন খুব ভালো কাউন্সিলার আসলে এত গুণ কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি!" হাসতে হাসতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ডঃ অয়ন্তিকা খানিকটা হতভম্ব হয়ে যায় অম্বিকা। ঘরের গুমোট নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথমে কথা বলেন অপর মানুষ টা "হাই আমি দেবদত্তা আপনি আমায় না চিনলেও আমি বা আমরা আপনাকে ভালোভাবেই চিনি ।" এটা অস্বাভাবিক কিছু না তাই চুপ করে রইলো অম্বিকা পুনরায় দেবদত্তা বলে উঠল "আই নো দিস ইজ নট ইওর first issue i know everything ,কথা বলুন কোনো ক্ষতি হবে না ।আপনার জীবনের আল্টিমাম টা আপনি ঠিক করবেন আমরা কেউ করব না কিন্তু।" অবাক হয় অম্বিকা। সবার আড়ালে থাকা সত্যিটা এই মানুষটা জেনে ফেলেছে তাও ভাবনাটাকে উড়িয়ে দেয় ও ;বরং একা ঘরে একজন ট্রান্সজেন্ডার এর সাথে বসে থাকতে বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে ওর ।উনি পুনরায় বলেন "জীবনটা না খানিকটা দৌড় প্রতিযোগিতার মত যাত্রাপথ বাড়তে বাড়তেই এক একটা হার্ডেলস এসে যায় আর আমরা বাইরে থেকে খালি চিযার আপ করি যাতে লড়াইটা লড়তে সহজ লাগে। এবার আপনি বলতে পারেন তাহলে আমরা যারা জ্ঞান দিচ্ছি তারা কি দৌড়াচ্ছে না?অবশ্যই দৌড়াছি। যখন কমিউনিকেশন হচ্ছে আমাদের মধ্যে আমরা তখন একটু রেস্ট করে নিচ্ছি ,সো প্লিজ কথা বলুন।" অম্বিকা বেপরোয়া ভাবে উত্তর দেয় "ইট ইজ মাই চয়েস।" প্রশ্ন করে দেবদত্তা" only yours?" অম্বিকা আমতা আমতা করে বলে,"আই মিন আওয়ার চয়েস ।"দেব দত্তা প্রশ্ন করে," যদি জিজ্ঞেস করি কেন খুব ভুল করব না হয়তো ।"অম্বিকা উত্তর দেয়,"আমাদের অত সময় নেই একটা ভুল হয়ে গেছে তো তার সংশোধনটাই তো চেয়েছি শুধু" দেবদত্তা ঘাড় নেড়ে বলে" বেশ, তা বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি কেন ?আদৌ ভুল নাকি..."ওকে থামিয়ে দেয় অম্বিকা," না আর কিছু নয় মানুষ তো, ভুল তো হতেই পারে ।"একটা অজানা ব্যথা হাতছানি দেয় অম্বিকার ,তবুও সত্যিটা এড়িয়ে যায়। দেবদত্তা বাঁকা হাসি হেসে বলে "মা দূর্গা কে দশভূজা কেন বলা হয় জানো? হ্যাঁ।তুমি করেই বলছি। বয়সে তুমি আমার থেকে ছোটই হবে। মা দুর্গা ঘর আর বাইর সমানভাবে সামলাতে পারেন। তিনি একাধারে যেমন অন্নপূর্ণা তেমনি দানব দলনি তিনি যেমন যোগীনি তেমনি জগপ্রসবিণী। আর তুমি তো সেই মায়ের জাত তুমি পারবে না কেন ?দেখো আমায় তো তুমি দিদি ভাবতে পারবে না জানি ।যদি জীবনের একটা অদ্ভুত মানুষ মনে কর তবে বাচ্চাটাকে পৃথিবীর আলো দেখতে দাও যদি লালন পালন করতে পারবে না তবে আমাদের এনজিওর সাথে যোগাযোগ করো। আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করব তাকে বড় করার ফ্রি অফ কষ্ট ,তোমাদের পরিচয় ই সে বড় হবে ।বড় হলে তোমাদের কাছে ফিরে যাবে আমাদের এনজিওয়ে এরকম অনেক বাচ্চারা রয়েছে ।"কান লাল হয়ে যায় অম্বিকার ও বিরক্ত হয়ে বলে "আই থিংক আই নিড নো মোর কাউন্সিলিং আওয়ার ডিসিশন হ্যাজ মেড অলরেডি।"

বিগত চার পাঁচ দিন ধরে খালি দেবদত্তার কথাগুলোই কানে বেজেছে কাজের ফাঁকে, ভদ্রমহিলার কথাগুলোএ সম্মোহনী শক্তি রয়েছে। দ্রুত ভাবনা টা ভেবে থমকালো ও হ্যাঁ,'ভদ্রমহিলাই' তো উনি। অন্ততপক্ষে অম্বিকার চোখে। ওনার কথায় চার্জড হয়ে রণকে একবার বলার চেষ্টা করেছে যে বাচ্চাটাকে পালন করার ব্যবস্থা যদি ও করতে পারে কাজের ক্ষতি না করে তাহলেও কি সমস্যা হবে ?নিঃসন্দেহে উত্তর দিয়েছে" হ্যাঁ হবে" এবং ধমকে গেছে এই 11 দিনের ট্যুর থেকে ফিরে এসে যেন শুনতে পায় কাজটা হয়ে গেছে। তবে গত চার পাঁচ দিনে অম্বিকা কিছুই করতে পারেনি বাড়িতে মেডিসিন গুলো কেনাই আছে ;কিন্তু কিছু যেন ওকে বারবার টেনে আনছে কিন্তু এটা যে কিসের টান ও জানে না। নাহ, অত সাত পাঁচ ভেবে কাজ নেই হাতে আর মাত্র ৭ দিন। এর মধ্যে তাকে পারতেই হবে নইলে অনেক বড় লস হয়ে যাবে।খোলা চুল কাঁধের উপর গুটিয়ে নিয়ে মেডিসিন টা খুলে হাতে নেয়ও। জলের গ্লাসে চুমুক দিতে যাবে এমন সময় ডোর বেল বাজলো যেটা বাজার কথা ছিল না । আই হোলে চোখ না রেখেই দরজা খুলে বলল "কে?" আগন্তুক উত্তর দিল "আমি ।সমাজের থার্ড জেন্ডার রিপ্রেজেন্টেটিভ চিনতে পারছ না?" চিনতে পেরেই সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায় ওর। আরে ওই মহিলা ওর ঠিকানা পেল কিভাবে? দেবদত্তা বলে উঠলো" ভিতরে ডাকবে না?" অম্বিকা বুঝতে পারলো না ওর কি করা উচিত। দেবদত্তা অযাচিতভাবেই ওর ঘরে ঢুকে আসে। কিংকর্ত্য বিমুরের মতো দরজা বন্ধ করে দেয় অম্বিকা। মনে মনে শক্তি সঞ্চয় করে কঠিন হয় ও বলে "আপনি আবার চলে এসেছেন আপনাদের এনজিও-র অ্যাডভার্টাইজমেন্ট করতে?" হাসে দেবদত্তা বলে "সে তুমি যাই বলো না কেন আমি কিন্তু সবটা বুঝে ফেলেছি ।"থতমতো খেয়ে অম্বিকা বলে "ক কি কি বুঝেছেন আপনি?" দেবদত্তা ব্যাখ্যা করে বলে "এই যে তুমি এবরশন করার অভিনয় করছো ।" "অভিনয় করছি মানে?" অম্বিকার চোখে মুখে অবিশ্বাস তাকে আশ্বাস দিয়ে বলে "হুম, আসলে তুমি ভীষণভাবে মা হতে চাইছো কিন্তু পরিস্থিতির কাছে হেরে যাচ্ছ। না, এখনো তো হারনি ।"চিৎকার করে ওঠে অম্বিকা," কি আজেবাজে কথা বলছেন আপনি ?আমি মোটেই মা হতে চাই না ।আমার জীবনে আমার কাজের থেকে দামি আর কিছুই নেই। আমি তো আগেও বলেছি এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।" কথাটা থামা মাত্রই দেবদত্তা বলে "তাই বুঝি যে এত মা হতে না চায় সে চার দিন সময় নষ্ট করবে কেন ?(খানিক থেমে) ভগবান তো সবাইকে সব দেয় না তোমায় বারবার সুযোগ দিচ্ছেন ।কিন্তু তুমি অলরেডি অনেক পাপ করে ফেলেছ আর পাপের বোঝা বাড়িও না। অন্তরের ডাকে সাড়া দাও ,দেখবে সব প্রতিকূলতা দূরে চলে গেছে।" অম্বিকা স্তব্ধ হয়ে যায়। সে ভালোই বুঝতে পারছে সে সম্পূর্ণরূপে হেরে যাচ্ছে, শাসন করে রাখা চোখের জল গুলো বাঁধ ভেঙে দৌড়ে বেরিয়ে পড়ছে, নিঃশ্বাস এর গতিবেগ বাড়ছে ক্রমশ, কণ্ঠস্বরকে গ্রাস করেছে দলা পাকানো কষ্টেরা। দুহাতে মুখ ঢেকে ফ্লোরেই বসে পড়ে ও। কতক্ষণ এই অবস্থায় ছিল জানিনা কিছুক্ষণ পরেই একটা অচেনা অজানা স্পর্শ ওর চোখের জল মোছার চেষ্টা করে। চোখ খুলে দেখতে পায় দেবদত্তা। হাসছেও বলছে "এখন ভাবতে পারো জ্যোতিষ বিদ্যাটাও শুরু করলাম নাকি? না আসলে সার্বিকভাবে সুস্থ মানুষদের নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বুঝতে পারি অসুস্থতা টা কোথায়! চোখ মোছো।" দেবদত্তার দুটো হাত সরিয়ে কান্না ভেজা গলায় অম্বিকা বলে" প্লিজ চলে যান একা থাকতে দিন আমায় ,আমার কষ্টটা আপনারা কেউ বুঝতে পারবেন না আমি মা হওয়ার যোগ্য নই। যে মা নিজে হাতে তার সন্তানের গলা টিপে মেরে ফেলে শুধু নিজের স্বার্থে সে কি আর মা হতে পারে!" শেষের কথাগুলো যেন নিভে আসে ওর।ফোপাতে শুরু করেছে মেয়েটা, ও কিছু বোঝার আগে ওকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে দেবদত্তা বলে "মানছি তোমার বুকে অনেক কষ্ট আছে কিন্তু চোখ মেলে দেখো ভগবান তোমার থেকেও অভাগী হিসেবে আমাকে পাঠিয়েছেন তোমার জীবনে। তোমার হারানোর যন্ত্রণা আছে আর আমার আছে না পাওয়ার বেদনা... সাথে আরো অনেক কিছু তোমার তো মানুষ হিসেবে একটা আইডেন্টিটি আছে তুমি সুস্থ তোমার জেন্ডার স্পেসিফাইড আমার কি আছে বলো তো ?"তারও গলায় কান্নার আভাস প্রথমে খানিকটা অস্বস্তি হলেও খানিক পরে অম্বিকা বুঝতে পারে এ স্পর্শের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাতৃত্ব আছে অন্য কোন অনুভূতি এখানে ভাবনারও অতীত। মনে হলো এই প্রথম একটা খুব নিরাপদ আশ্রয় খুজে পেয়েছে সে। অভিনেত্রীর হাসির আড়ালে থাকা মানুষ অম্বিকার খুব উগরে দিতে ইচ্ছে করে এতদিনের চাপা রাখা সমস্ত কষ্টগুলো ।নাহ ,আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না অম্বিকা বহতা নদীর মতো কল কল করে বলে ফেলে জীবনের যতটুকু সত্যি সবটা এক মনে শোনার পর দেবদত্তা অবাক হয়ে বলল "শুধু মেটেরিয়ালিস্টিক সুখের জন্য তোমরা এরকম ইন্টারনাল সুখের বলিদান দিয়ে দিতে পারো এত অনায়াসে?" দেবদত্তার হাত দুটো ধরে বলে অম্বিকা," বিশ্বাস করুন এবারটা আমি চাইনা কিন্তু রনজিত কিছুতেই শুনতে রাজি হচ্ছে না ।ওর খালি এ প্রজেক্ট আর ওই প্রজেক্ট।" দেবদত্তা পাল্টা বলে," প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড এটা আমার কথা বলার স্পেস নয় বাট আই মাস্ট সে, একজন পুরুষের ইচ্ছার জন্য নিজের নারীত্বকে শেষ করে দিতে কষ্ট হয় না ?আর যে শরীরের ডিফর্মিটির কথা বলছ সেই নারী শরীরের কৃতিত্বটা কোথায় বলতো !সব শরীরের একমাত্র ঠিকানা তো আমাদের সবার জানা। পুড়ে গেলে সবই এক মুঠো ছাই ছাড়া আর কি !এ পৃথিবীতে সব কিছু রিভারসিবল সমস্যার সমাধান সম্ভব কিন্তু ইররিভারসিবল সমস্যাগুলো সমাধান শত টাকা খরচ করলেও পাবে না ।(খানিকটা সময় নিয়ে) অনেক তো হলো অন্যের জন্য বাঁচা। এবার একটু নিজের জন্য বাঁচো না, শুধু নিজেকে খুশি করতে বাচো। ভগবানের ইচ্ছায় যে আসছে তাকে জীবনের সবথেকে বড় গর্ব করে বাঁচো জানবে কোটি টাকা খরচ করলেও এই রত্ন পাবে না।" অম্বিকার মুখ থেকে গোঙ্গানি বেরিয়ে আসে" না যোগ্য নই আমি। কিছুতেই যোগ্য নই আমি আমার সন্তানকে ..... "কান্নারা ঢেকে দেয় বাকি সমস্ত না বলা কথা ।অম্বিকার হাত দুটো শক্ত করে ধরে দেবদত্তা বলে "মানুষ তো ভুল তো হতেই পারে। কিন্তু একবার পাপ করেছো বলে বারবার কেন পাপ করবে ?যখন ভগবান তোমায় নিজে থেকে প্রায়শ্চিত্তির সুযোগ করে দিচ্ছেন তুমি ঠিক পারবে তোমার এই অন্যায় বোধটাই তোমাকে শক্তি দেবে। হ্যাঁ তুমি হয়তো অনেকটা সময়ের জন্য শরীরটাকে হারিয়ে ফেলবে কিন্তু ভগবান প্রদত্ত ক্ষমতাকে অনুভব করতে পারবে, হ্যাঁ হয়তো সৌন্দর্য কিছুটা ফিকে হবে কিন্তু তোমার চোখ মুখ জুড়ে ফুটে উঠবে মাতৃত্বের আভা ।এখন বল কেজিখানেক চর্বি একগাদা স্টিচ বা আর সমাজের ট্রোলিঙএরকম আরো হাজারটা প্রতিকূলতাকে মেনে নিতে তুমি প্রস্তুত তো?" কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরটা নিস্তব্ধতায় ঢেকে যায় .....    

                                (4)

"নাহ," প্রায় চিৎকার করে আঁতকে ওঠে অম্বিকা ধরফিয়ে উঠে বুঝতে পারে স্বপ্নই দেখছিল সে।হৃদ স্পন্দনের গতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। চার বছর আগের এক বীভৎস স্মৃতি হানাদায় ওর ভোরের স্বপ্নে আপাতত সে কলকাতার একটা বেসরকারি হাসপাতালে এডমিটেড। হ্যাঁ দেখতে দেখতে নয় মাস কেটে গিয়েছে যেহেতু প্ল্যানড ডেলিভারি তাই আগে থেকেই অ্যাডমিটেড হয়েছে ও। এর মধ্যে এত পরিবর্তন ঘটে গেছে অম্বিকার জীবনে যে শরীরের পরিবর্তন তার কাছে নস্যি । চোখ বুজলো ও দেখতে পেল চার বছর আগেও ভগবান ওকে এমনই সৌভাগ্য দিয়েছিল কিন্তু সেই সময় অম্বিকার কেরিয়ার তুঙ্গে জীবনে প্রথমবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতার সাথে স্ক্রিন শেয়ার করার সুযোগটা এসেছিল তখনই ।সারা জীবন লাভের অংক গুনে সেবার রণজিৎ দেরি করেনি এত বড় লাভ লুফে নিতে ।হ্যাঁ ওদের জীবনের প্রথম একটা বিগ বাজেটের সুপারহিট সিনেমা তারা বানিয়েছিল ঠিকই; রনজিতের কথা অনুযায়ী ছোট্ট একটা সেক্রিফাইসের বদলে। এমনকি অম্বিকা আপত্তি জানায়নি একবারও পরিষ্কার মনে পড়ে দিনটা অম্বিকা। ওদের জীবনের প্রথম দেবদত্ত উপহারকে,ওদের দু মাসের ভ্রুণটাকে ..... কান্নায় চোখটা ভরে আসে অম্বিকার, রক্তে ভরে গিয়েছিল সেদিন সবকিছু এত রক্ত সে এ জীবনে কখনো দেখেনি। কষ্ট হয়েছিল তখন ও ,কিন্তু পরবর্তীকালের লাইট ক্যামেরা একশন আর হাততালির শব্দে কোথাও যেন চাপা পড়ে গিয়েছিল তারা ,আর সহ্য করতে পারে না অম্বিকা। ভয় লাগে ওর কিন্তু একটা ব্যাপারে সে নিশ্চিত মা হওয়ার যোগ্য সে নয় কিন্তু তা সত্ত্বেও এই লড়াইটা লড়তে চেয়েছিল ও। দেখতে চেয়েছিল মুখোশের আড়ালে থাকা আসল চেহারা গুলো। হ্যাঁ চার গুণ বেড়ে যাওয়া ওজনের সাথে সাথে অনেকগুণ মানসিক আঘাত পেয়েছে অম্বিকা তার অর্ধেকটা যদি সমাজের কাছ থেকে হয় ,তবে বাকি ৫০ শতাংশ শুধু রনজিতের কাছ থেকে। ১১ দিনের ট্যুর সেরে এসেও যখন ও জানতে পেরেছিল কাজ হয়নি, প্রচুর ধমক দিয়েছিল চোখ রাঙিয়েছিল কোন কিছুতে কাজ না হলে শেষে তো মারতেও এসেছিল। কিন্তু পারেনি অম্বিকা strong থেকেছে ও স্রেফ জানিয়ে দিয়েছে সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে মা হিসেবে সে সবকিছু করতে পারে যদি ওদের সো কলড সুখী বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বের হতে হয় ,তাতেও ও রাজি।শেষমেশ অনেক যুদ্ধ ঝগড়ার পর ওই পথটাই খোলা ছিল তার কাছে আর সত্যি বলতে এত শক্তি ও পেয়েছে শুধু দেবদত্তার কাছ থেকে। হ্যাঁ এই লড়াইটাতে একমাত্র দেবদত্তাই ছিল তার একমাত্র সঙ্গিনী ও পুরো যাত্রাপথে ওকে বারবার চিযার আপ করে গেছে ।তবে বাকিরাও ছিল বটে, অম্বিকার জন্য পৃথিবীর সব থেকে খারাপ বিশেষণ বেছে দেওয়ার দায়িত্বই নিয়েছিল বাকি চেনা পৃথিবীটা ।তবে ওসব অম্বিকা আর ধরে না, দেবদত্তার কাছ থেকে শিখেছে সে অনেক কিছু। সব নেগেটিভিটি কে মুহূর্তে পজিটিভিটিতে পরিণত করে দেওয়ার অদ্ভুত একটা ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা আছে ওর। সত্যি নেহাত কম ঝড় একা সামলে যাচ্ছে না ওই মানুষটা! জীবনের নানান জানা-অজানা গল্প শুনেছে ও দেবদত্তার মুখে। একবার জিজ্ঞেস করেছিল "তুমি তো এখন প্রতিষ্ঠিত সমাজ তবুও সম্মান দেয় না তোমায়?" দেব দত্তা বলেছিল" দেয তো শুধু আমার পদটাকে ,কিন্তু হাজার মানুষের ভিড়ে যখন হাটি আমরা বড় একা জানো কেউ আমাদের পাশে ঘেষতে চায় না..." সেইদিন একমাত্র সেই দিন দেবদত্তার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠেছিল ।অম্বিকা হয়তো একটু হলেও বুঝতে পেরেছিল দেবদত্তার অসহায়তাটা, সংগ্রাম থেকে সাফল্যটা মনে করে মনটা হালকা হয়ে যায় অম্বিকার, নিজের জন্য আর কষ্ট হয় না। অম্বিকা যে দেবদত্তার জন্য কিছু টি ভাবেনি তা নয় যে মানুষটা সমাজে এতটা অগৃহীত কোনদিনও তার মত স্টার এর জীবনে এতটা গৃহীত হয়ে যাবে কোনদিনও কল্পনাও করেনি সে। ঋণ তো নেহাত কম হলো না এ জীবনে দেবদত্তার কাছে শোধ করার কথাও ভাবছিলই হঠাৎ পেটে যন্ত্রণা হতে শুরু করে সহ্য করতে পারে না চোখ বুজে ফেলে ও।

                                  (5)

রাস্তাটা ক্রস করতে করতে মনে মনে দু'চারটে গালি দেয় নিজেকে দেবদত্তা ।আজকের দিনটাতেই অন্য সব কাজ করতে গিয়ে বড্ড দেরি করে ফেলেছে ও। ডক্টর অয়ন্তিকার হসপিটাল থেকে ঘন্টাখানেক আগে ফোন এসেছিল অম্বিকার লেবার পেইন শুরু হয়েছে জানতে পেরেই বেরিয়ে পড়েছিল সে কিন্তু আর কাজটা এতটা দূরে পড়ে গিয়েছিল যে আসতে দেরি হয়ে গেল ।ও হাসপাতালের গেট খুলে ঢুকতেই কিছু মানুষ নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করা শুরু করে দিল এসবে অভ্যস্ত ও। কোন এক নার্স বিড়বিড় করে বলে উঠলো "আর পারা যায় না বাবা। বাচ্চা হওয়ার আগে এসে পৌঁছে যায় কাজ নেই যত্তসব" এই হসপিটালটা নতুন, ডক্টর অয়ন্তিকা বোস এর পুরনো হসপিটালে প্রায় সবাই চেনে দেবদত্তা কে এরা চেনেনা কি আর করা যাবে !কাউন্টারে গিয়ে ডাক্তার অয়ন্তিকার খোঁজ নেয় দেবদত্তা। ডাক্তারের অ্যাসিস্ট্যান্ট দেবদত্তার নাম শুনে তাকে নির্দিষ্ট রুমে পাঠানোর নির্দেশ দেন। লিফটে উঠেই দেবদত্তা বুঝতে পারে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের গতি ওঠানামা করছে গায়ের রোম গুলো খাড়া হয়ে গেল কিনা বুঝা গেল না! পুরো atmosphere ta এমন যেন বহুদিন ধরে প্রিপেয়ার করা এক্সাম এর রেজাল্ট আজকে। লিফট থেকে নেমেই ন নম্বর ঘরটায় প্রায় দৌড়ে ঢুকে ডাক্তার অয়ন্তিকার দেখা পেলো দেবদত্তা। ডাক্তারের গাল ভর্তি হাসি তিনি দেবদত্তাকে দেখে বললেন "এবরশন টু ডেলিভারি ইট ইস এ ম্যাজিকাল মেকানিজম যার ক্যাটালিস্টটা হলেন ইউ মিস দেবদত্তা ব্যানার্জি ।"জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় দেবদত্তা, ডাক্তার অয়ন্তিকা তার কাঁধ দুটো ঝাঁকিয়ে বলে "মেয়ে হয়েছে দেবদত্তা কংগ্রাচুলেশন।"আনন্দ টাকে আর ধরে রাখতে পারে না দেবদত্তা আবেগের বসে কথা জড়িয়ে যায় "কই আর অম্বিকা কেমন আছে ?"সম্মতি জানিয়ে ডাক্তার বলে "মাদার এন্ড চাইল্ড বোথ আর সেফ এন্ড নরমাল। তোমরা কথা বলো কেমন আমি আসি "বাইরে থেকে দরজাটা ভিজিয়ে চলে যান ডাক্তার অয়ন্তিকা। ঘরের ভিতরে ও খানিকটা এগোতেই দেখতে পেল সদ্য মা হওয়া অম্বিকা তার সদ্যোজাতকে আগলে রেখেছে সস্নেহে। দুচোখ ভরে গেল দেবদত্তার ।না পূজো চলে গেছে ন দশ মাস হলেও কোথা থেকে যেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পাঠ করা মহিষাসুর মর্দিনী ভেসে আসছে। এই হসপিটালের লাগোয়া একটা এসাইলাম আছে জানে দেবদত্তা। নিশ্চয়ই সেখানকার ই কোন এক বাসিন্দা অসময় মহিষাসুর মর্দিনী শুনছে এই সময় ভেসে আসা মন্ত্র মেশানো গানের সুর ছাড়া ঘর জুড়ে আছে শুধুই নিস্তব্ধতা ।কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে দেবদত্তা ,অম্বিকা আর ও নারী সন্তানের দিকে। অম্বিকা আর তার কন্যা সন্তান যে কোন অকালবোধনের শুভ সূচনা করছে তা জানেনা দেবদত্তা। অম্বিকা হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে ,বেডের পাশে থাকা টুল টায বসে জিজ্ঞেস করে দেবদত্তা "কেমন আছো?" অম্বিকা মৃদু হেসে বলে "বেশ ভালো আছি।" খানিকটা উঠে বসার চেষ্টা করে অম্বিকা তাকে বাধা দেয় দেবদত্তা কিন্তু অম্বিকা শোনে না বলে "আমি ঠিক আছি পারব ।"একটা গভীর শ্বাস নেয় ও ।দেবদত্তা মাথানেডে বলে ,"আর বোলো না আমি এমন একটা কাজে আটকে গেছিলাম .... " অম্বিকা বাধা দিয়ে বলে" চুপ একদম চুপ, এতদিন অনেক জ্ঞান দিয়েছো। এবার আমি বলব তুমি শুনবে।" হতভম্ব হযে বসে থাকে দেবদত্তা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অম্বিকা বলে "তো এট লাস্ট আমরাই জিতলাম তাহলে ,এই এত বড় সোসাইটির বস্তা বস্তা প্রতিকূলতাকে পেরনো গেল তাহলে !এবার কিন্তু আমার একটা আবদার আছে।" অবাক হয়ে দেবদত্তা বলে "আমার কাছে? আমি তোমায় কি বা দিতে পারি আচ্ছা বলো সাধ্যমত চেষ্টা করব "মাথা নেড়ে অম্বিকা বলে "দেবে না অনেক দিয়েছো এবার নেবে।" জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকায় দেবদত্তা,ওকে আশ্বস্ত করে অম্বিকা বলে "হ্যাঁ নেবে এই যে আমার কোলের এই সদ্যজাত সদস্যটিকে মানুষ করার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। আজ থেকে তুমি হবে ওর মা ।নাও ওকে কোলে নাও "যেন আকাশ ভেঙে পড়ে দেবদত্তার মাথার উপর আকস্মিক কথার চোটে সদ্যোজাতকে কোলে নিতে ও ভুলে গেল সে। মস্তিষ্ক হাতরে কয়েকটা এলোপাথাড়ি কথা বলে ফেলে "আমি আমি মা কি করে হতে পারি ?হ্যাঁ আমি নিজেকে মেয়ে বলে মনে করি ঠিকই কিন্তু আমি মা কি করে হব ?সম্পূর্ণ মেয়ে তো আমি নই। "অম্বিকা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে "কে বলল তোমায় uterus আর ওভারি ছাড়া মা হওয়া যায় না !মাদারহুড ইজ এন ইমোশন। দিস ইজ নট কানেক্টেড উইথ দিস আরথি বডি। এনি ওয়ান ক্যান মাদার বি দে আর মেল অর ফিমেল.... আর জন্ম দিলেই কি খালি মা হওয়া যায় নাকি! অনুভূতি টাই আসল সত্যি ।"বেশি কিছু বলা হলো না দেবদত্তার, আজ এই মাতৃমূর্তির সামনে ওর সমস্ত জ্ঞান মূহমান। খানিক থেমে অম্বিকা আবার বলে " আমি চাই এই নতুন প্রাণটি মানুষের মত মানুষ হোক আর সেই দায়িত্ব তোমার থেকে ভালো কে পালন করবে বলো? আমি কিন্তু না শুনবো না।" কান্না পায়ে দেবদত্তার। কিন্তু কাঁদতে পারেনা বলে তাহলে "তোমার এত সেক্রিফাইস এর কি হবে ?তুমি যে সবকিছু হারিয়ে ফেলেছ এত কষ্টের ফল তুমি আমায় দিও না।" মাথা নেড়ে হেসে বলে অম্বিকা,"ওই যে তুমি বলেছিলে না শুধু নিজের জন্য বাঁচতে শেখা প্রয়োজন তাই এত বড় লড়াইটা লড়লাম ।আর যা হারিয়েছি তা কোনদিনও আমার ছিলই না অনেক কিছুই আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে, গেছে আমি ভীষণ স্বার্থপর জানো শুধু নিজের জন্যই করলাম একমাত্র নিজের জন্য। আর সত্যি বলতে আমাদের এত ব্যস্ত সিডিউলে নিজের জন্যই সময় হয় না অন্যের জন্য কি করে হবে !এর থেকে বরং ও তোমার কাছে মানুষ হলে আমি চোখ বুজে নিশ্চিন্ত হব।" খানিক থেমে আবার বলে অম্বিকা "যেদিন না ওর বোঝার ক্ষমতা হবে আমরা সেদিন ওকে সবটা বলব আমি চাইনা কেউ অন্ধকারে থাকুক। মনের এই অন্ধকার গুলো ব্ল্যাক হোল হয়ে সমস্ত আলোকে গ্রাস করে নেয় ।ওকে মানুষের মতো মানুষ কোর কেমন! ও যেন এই দুই মায়ের সেক্রিফাইসটা বুঝতে পারে ।"কাপড়ে মোড়া সদ্যোজাতকে দেবদত্তার দিকে এগিয়ে দেয় অম্বিকা। মন্ত্র চালিতের মত সদ্যোজাতকে দুহাতে তুলে নেয় দেবদত্তা দুই মায়ের চোখের কোল জলে ভরে যায় ,গাল প্লাবিত হয় আর হাসি ফুটে ওঠে সদ্যজাত উমার ঠোঁটে। এখনো মহিষাসুরমর্দিনী টা ভেসে আসছে শোনা যাচ্ছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মন্ত্র পাঠ" যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থতা নমস্তাস্যই নমস্তাস্যই নমস্তাস্যই নমো: নমো:....."