Monday, September 27, 2021

লেখক তীর্থঙ্কর সুমিত -এর গদ্য

 নদী কথায় ভেসে যায় .....

             ( ১)


কত জমানো কথা ভেসে যায় নদী বুকে।কেউ খবর রাখেনা।কোনো গল্পের শেষ হয়না। শেষ হয় কথার।ওখানেই শুরু হয় নতুন গল্পের।নতুন থেকে চিরনতুন হতে হতে আটকে যায় চোখ।সেই চোখ থেকে সৃষ্টি হয় এক একটা গঙ্গা,এক একটা পদ্মা।ভালো থাকার লড়াইয়ে জলের স্রোতে ভেসে যায় অব্যাক্ত কত কথার যন্ত্রণা।হয়তো এভাবেই সৃষ্টি হয় কয়েকটা কথা, কয়েকটা চিহ্ন আর এক একটা মরুভূমি...

                                          

                 (২)


প্রতিটা দিন কেটে যায় রাতের আঁধার বুকে নিয়ে।কবিরা জন্ম দেয় হাজারো কবিতার।সময়ের সাথে সাথে সময়কে বুকে নিয়ে ফিরে আসে ঢেউ।আজকের প্রশ্ন আগামী কাল পুরনো।নতুন থেকে চিরোনতুনের সন্ধানে আমরা সকলে । কখন যেনো একের পিঠে বহু শূন্য নিয়ে ওজন বাড়াই ।নিজের অচিরেই ফাঁকা হতে হতে কখনো আবার নদীর সাথে মিশে যাই ।গঙ্গা ,পদ্মার বুকে লিখে রাখা এক একটা যন্ত্রণা কত নষ্টা মেয়েকে সতীত্ব দিয়েছে।আর আমি নতুন হতে হতে কখন যেনো ঢেউ এর সন্ধান পেয়েছি ...




           (৩)



নদীটা রোজ দেখি বয়ে যায় নিজের মতো।

হাজার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে নদী বয়ে যায় নিজের গন্তব্য স্থলে।এই গন্তব্য কোথায় আমরা কেউ জানিনা।তবুও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি তার দিকে।তার গন্তব্যের দিকে।কিছু বোঝার আগেই শত ঢেউ ভিজিয়ে দেয় আমাদের।এভাবেই কত কথা ঢেউয়ের স্রোতে হারিয়ে যায়।কত লাল সাদা হয়ে ওঠে।ফিরে আসে তোমার আমার...

নদী স্রোতে ভেসে যায়


               (৪)



বলতে বলতে বলাটাই বাকি থেকে যায়।প্রতিদিনের আশ্চর্যতা মূলত ভাবায় না কাউকে।শুধু আঙ্গুলের পরিবর্তন। কথার সাথে বিন্দু পরিবর্তন হতে হতে কখন যে বৃত্ত ছেড়ে বেড়িয়ে গেছে বহুদূর।কেউ খবর রাখেনা।খবর রাখে স্রোতস্বিনী নদী তার ঢেউ হারিয়ে চুপ করে বসে আছে।কিন্তু তা ক্ষণিকের আবার ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিয়েছে পাড়।এভাবেই নদী আমায় গল্প শোনায় প্রতিদিন।আমি ভেসে যাই নদী বুকে বহু বহুদূর ...



                (৫)



বহুদূর নয়।ঠিক যতটা দূর ভাবি ততটাও নয়।তবুও সবাই বলে অনেক অনেক দূর।কখনো কখনো আমিও তাই ভাবি। কিন্তু ভাবনার ইতি ঘটতে না ঘটতে,আবার নতুন সংগ্রামে ভেসে গেছে কত কথা ।হয়তো এইভাবেই এক একটা দিন কেটে হয় রাত্রি।আর রাতের অাঁধারে লুকিয়ে থাকে দিনের কাব্যকথা ।যে নদী বয়ে গেছে বহুদূর তার ঠিকানা আমরা কেউ রাখিনা।তবু প্রতিটা ঘরে তার বয়ে যাওয়ার স্মৃতি চিহ্ন লুকিয়ে থাকে।যে ভাবে নদী বয়ে যায় ঠিক সেভাবেই ফিরে আসে প্রতিদিনের অবাধ্য কিছু যন্ত্রণা ।তবে সব ই ক্ষণস্থায়ী ।

আর বেঁচে থাকার মানে ...

লেখক সুজিত চট্টোপাধ্যায় -এর একটি গদ্য তথা রম্য রচনা

 ঘোর কলি হে  



এখন আখের গুছোবার জমানা। ভোগকরো, আসক্তি মিটিয়ে নাও। নেতা হও। ক্ষমতা দেখাও। ল্যাং মারো। তোষামোদ করো। কেলেংকারীতে জড়িয়ে যাও। ইডি তলব করুক। দল বদলু হও। ব্রেকিং নিউজ হও। 


অনেষ্টি ইজ দ্যা বেষ্ট পলেসি। গুষ্ঠিরপিন্ডি। 

বউয়ের অচ্ছেদা, আত্মিয়ের অবহেলা, একদিন জীবন ঘড়ির টিকটিক ষ্টপ। কাঁচের গাড়িতে চিৎ হয়ে শুয়ে, মহাপ্রস্থানের পথে নিশ্চিত যাত্রা। 


মরেও কি ছাই রেহাই আছে । যে ক'টা দিন জীবিত ছিলে, তিরস্কার আর তিরস্কার। জীবন তো নয় ধিক্কারের ডাষ্টবিন। ওয়েষ্ট পেপার বক্স। ব্যর্থতার সংগ্রহশালা। সমালোচনার পাত্র। 


লাইফ টাইম পার্টনারের নিয়মিত নির্মম কথন,,,,,,,,, 

"" সারাটা জীবন শুধু ঘানি টেনে গেল। তেল বেরুলো না এক ছিটেও। বোকার হদ্দ। বুদ্ধি বলে তো ঘিলু তে কিছু ছিল না। খালি জেদ ছিল। 

কি? না , অনেষ্টি। অনেষ্টি ধুয়ে জল খাবে? দুরদুর বেঁচে থাকতে বোঝাতে পারলুম না এখন আক্ষেপ করে কি হবে। যাও, ফারনেসে ঢোকো। যতসব। 


অনেষ্টির দোহাই দিয়ে আঁটি চুষতে চুষতে লাইফ হেল হয়ে যাবে। নো রিস্ক নো গেইন। কাটমানি যদি না খেলে তবে খেলে কি, ঝিঙেপোস্তো? 

স্ক্যান্ডেলিং ছাড়া জীবনের কোনও চার্ম নেই। সমাজে যদি প্রতিষ্ঠা চাও, কেলেংকারী তে জড়াও, ফষ্টিনষ্টি করো, জীবনের সপ্ততারে বসন্তবাহারের সুর তোলো। লাইফ ইজ বেড অব রোজ। সিলভার টনিক ইজ বেষ্ট ভিটামিন টনিক। 

গায়ে পড়া কৌতুহলী প্রতিবেশীর চোখটাটানো মধুর সম্ভাষণ ,, 

"এই চেকনাই কোথায় পেলে দাদা? বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, আয়েশি গাড়ি, ককটেল পার্টি।" 

এইতো জীবন। আহা, কি সুখ কি সুখ। ঠোঁট সরু করে চোখ বুঁজে শিস দিয়ে সেক্সি গানের সুর ভাঁজো। 


চিত্রগুপ্তের জাবদা খাতায় কি ব্ল্যাক স্পট পড়ে গেল? ,,,,,,,, ড্যাম ইওর কুসংস্কার।যতসব ফালতু গপ্পো। 


তবুও মনের মাঝে থেকে থেকেই কে যেন কু গাইছে। বিবেক কাছা ধরে টানছে। 


দূর দূর,, ওসব আবেগ। গেট লস্ট আবেগ। ওসব দূর্বল ভীরুতার ভাবনা। আমি জয়ী। আমি সম্রাট। 

আরামকেদারায় হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে স্মৃতি মন্থন করছে এ যুগের শাজাহান। 

কী ছিনু আর কী হনু ,,। 

প্রমোটারি জিন্দাবাদ। মস্তানবাজি যুগ যুগ জিও। 


অদূরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তার আগামী প্রজন্ম আরচোখে মিটিমিটি হাসছে আর মনের চাকুতে শান দিচ্ছে। বুড়ো টাঁসলেই সব আমার, সব আমার।

হায় রে,,,,, ঘোর কলি হে , ঘোর কলি,,। 


লেখিকা রোকেয়া ইসলাম -এর একটি গল্প

 কুকুরের কান্না 



 

ইদানীং বেশিরভাগ রাতেই এমন হচ্ছে পারভীনের। ভয়ংকর স্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে গেলে স্বপ্নের ভয়াবহ রেশটা থেকে যায়। দুচিন্তায় আজানা আশংকায় বুক কেঁপে কেঁপে ওঠে। 

বিছানা থেকে নেমে লাইট জ্বালাতে গিয়েও থেমে হাতটা নামিয়ে বাথরুমে ঢোকে। কমোডে বসে পড়ে থপ করে। অনেকক্ষণ ধরে জল বিয়োগ করে। 

বাথরুম থেকে বেরুতে গিয়েও বেশিনের কাছে যায়। হ্যান্ড ওয়াশ নিয়ে কলটা ছেড়ে দেয়। হাতে পানির ফোটা নিয়ে পানির কল বন্ধ করে ইচ্ছেমত ফেনা তুলে। কবজি ছাড়িয়ে কনুই অবধি ফেনা নিয়ে ঘষে ঘষে ধুয়ে ফেলে। 

বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। কাপড় শুকানোর তারে ঝুলছে তোয়ালে। হাত দুখান মুছে নেয়। 

চামড়া টান টান লাগছে। একটু লোসন বা গ্লিসারিন জাতীয় কিছু মাখতে হবে। 

আনুমানেই এতোদিনের চেনা ঘরে ঢুকে বোতল খুলে পরিমাণ মত লোসন নিয়ে হাতে মাখাতে মাখাতে আবার বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। 

এতোক্ষণ নিজেকে ব্যস্ত রাখলো। মনটা সরাতে চেষ্টা করলো। তবুও মনের ভেতরের দুচিন্তা একটুও কমে না। ভেতরের ভয় জমে শক্ত হয়ে বসে গেছে।

নিচের রাস্তার দিকে তাকাতেই ভেতরটা কেঁপে ওঠে। মিরপুর বাজারের ব্যাস্ত রাস্তা এটা। এখন সারাদিন ফাঁকা পড়ে থাকে। নেতিয়ে পড়ে থাকা রাস্তার দিকে তাকিয়ে যৌবন ফুরিয়ে যাওয়া মানুসের কথা মনে পড়ে। ডাব শুকিয়ে নারকেল হয়। মানুষের বয়স হলে অন্যরকম সৌন্দর্য ফুটে উঠে। এখন নির্জন রাস্তার অন্যরকম ধরা দিচ্ছে। 


সামনের দোকানগুলোর সাটারের খাঁজে খাঁজে পুরু ধুলোর আস্তর। দুটো টংএর দোকান নীল মোটা প্লাষ্টিকের উপরটার রঙ বোঝা যাচ্ছে না। রাস্তার লাইটের আলো পড়ে ভেতরের নীল রঙের হালকা আভাস বোঝা যাচ্ছে। 

সামনের সু-উচ্চু ভবনের ফাঁক ফোকর এড়িয়ে দৃষ্টি কেড়ে নেয় আকাশ। ঝকঝকে আকাশে তাঁরার বাগান। দৃষ্টি ঘুরিয়ে পশ্চিম আকাশে চোখ পড়তেই সপ্তর্ষী মন্ডল তীর ধনূক উচিয়ে রাগী চোখে আকাশ পাহারা দিচ্ছে। 

আকাশ থেকে একেবারে নিষ্প্রাণ রাস্তায় চোখ যায়। ল্যাম্পপোষ্টে ঝুলছে নির্বাচনি পোষ্টার। একটা শুকনো কালো বেড়াল আস্তে আস্তে হেঁটে যায় কিছু দূর গিয়েই দেখে একটা কুকুর শুয়ে আছে। বেড়ালটার দিকে তাকায়। অন্যদিনের মত ধেয়ে আসে না। পাশ দিয়ে হেঁটে যায় খদ্দেরের খোঁজে বেশ্যা। বেড়ালটা একটু এগিয়ে গেলেই কুকুরটা কাঁদতে শুরু করে। কুকুরের বিলাপ করে কান্না শুনে পারভীনের বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে। 

পারভীনের দাদি বলতেন "কুকুর পরিবেশর বিরুপ অবস্থা আগেই টের পায়"।কুকুর কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ করে হে মানুষ তোমাদের সামনে ভয়ংকর বিপদ। 


ভয়ংকর বিপদ ধেয়ে আসছে বুঝতে পারছে বিশ্ববাসী। বাংলাদেশও সাথে আছে ঘোর বিপদের। অদৃশ্য শত্রু। সামান্য এক অনুবীজ। করোনা। 

চেনা জীবনযাত্রা পাল্টে গেছে। এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে প্রতিশেবক আবিস্কৃত হয়নি। প্রতিরোধ করতে হচ্ছে। 

কাজের লোকসহ বাইরের মানুষ ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। স্কুল কলেজ বন্ধ। বাসার ছোটরা বাইরে যাচ্ছে না। কিন্তু পুত্র কন্যা জামাতা দায়িত্বশীল কাজে নিয়োজিত। ওরা নিয়ম মেনেই কাজে যাচ্ছে। সারাক্ষণ মনটা কাঁটা হয়ে থাকে পারভীনের। 

সারাদিন টিভির নিউজ দেখা ছাড়াও সময় সময়ে ফেবুতে বসছে। ইনবক্স ভরে যাচ্ছে বিভিন্ন খবরে। কোনটা দেখে কোনটা দেখে না। 

এখন এই রাতে বুক ধুকপুক নিয়ে বসে আছে বারান্দায়। দেখছে মৃত এক নগরীকে। 


কুকুরটা বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে। হঠাৎ মনে হয় সামনের দুতিনটা খাবারের দোকান তো দীর্ঘদিন বন্ধ। তাহলে এই কুকুর বেড়াল খাচ্ছে কোথায়!! 

ক্ষুধায় কাঁদছে না তো! পারভীন ওঠে ডাইনিং রুমে যায়। ফ্রিজ খুলে আগামীকালের জন্য তৈরি করা রুটি থেকে গোটা চারেক রুটি বের করে কিচেনে ঢুকে যায়। 


কাজের ছুটা বুয়াকে আসতে মানা করেছে। ছোট একজন মেয়ে মুন্নী আছে। ওকে নিয়েই চলতে হচ্ছে। 


মুন্নী খুব বুদ্ধিমান। সকালেই ধরে ফেলবে গোণা রুটি থেকে চারটি রুটি কম। 

সহজে আর চারটে রুটি গড়তে চাইবে না। থাক পারভীন নিজে নাস্তা সারবে অন্যকিছু দিয়ে। যাতে মুন্নীর কষ্ট না হয় 


রুটি সেঁকে বারান্দায় নিয়ে আসে। কুকুর কলজে কাঁপানো কান্না কাঁদছে। 

তিনতলা থেকে ছুঁড়ে দেয় কুকুরের মুখের কাছে। বেড়ালটাকে দেখা যাচ্ছে না। 

কুকুর কাঁদতেই থাকে। 


এবার ভয়ে পারভীনের হাত পা কাঁপতে থাকে। একটা চেয়ার টেনে বসে গ্রীলে মাথা রাখতেই চোখে পড়ে বারান্দার টবে ফুটে আছে অজস্র সন্ধ্যা মালতি। আরে আগে তো দেখা হয়নি। গতবারের লাগানো গাছের বীজ পরে এই নতুন গাছ হয়েছে। 

আগের গাছের ফুলের রঙ ছিল গাঢ় গোলাপি। আর এবারের ফুলের রঙ হলুদ 

আবাক কান্ড!!গোলাপি ফুলের রঙ গোলাপিই তো হবে। হলুদ হলো কেন। 


নিচু হয়ে বসে হাত দিয়ে ফুলগুলোতেই হাত রাখতেই খুব হালকা সুবাস নাকে লাগে। নধর সবুজ পাতাগুলো যৌবন সংগীতে রত। দূরের ডালটাতে বেশ কয়েকটি ফুল ধরে আছে। হলুদ আর গোলাপি ছিটে নিয়ে সগৌরবে হাসছে। 

আবার কুকুরের কান্নার শব্দ কানে আসে। পারভীন ওঠে দাঁড়িতেই দেখে গ্রীলে ঝুলছে বেশ কয়েকটি আর্কিড। দুটো স্পাইকে বেগুনি ফুল আপন মহিমায় সমুজ্জল। আলকানন্দার স্বাস্থ্যবান পাতার কোরক থেকে পুষ্পের সম্ভাবনা। হাত বুলাতে বুলাতে কুকুরের দিকে চোখ যায়। 


কুকুর নির্বিঘ্নে রুটিগুলো মুখের কাছে টেনে নিয়ে বারান্দায় চোখ রাখে।

লেখক রানা জামান -এর একটি গল্প

 চাল




খবরটা শুনে হতভম্ভ না হলেও চিন্তিত হলো খানিকটা জুবায়ের। একে একে পাঁচ স্থান থেকে পাঁচটি মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। ওর দলের পাঁচ সদস্যের বোন ওরা। সম্ভবত ওর দলকে বাগে নেবার জন্যই এই অপহরণ। ওর দলে মোট সদস্য নয় জন। তার মানে আরো চারজনকেও যে কোন সময় অপহরণ করা হতে পারে। অপহরণের পর এখনো কোনরকম যোগাযোগ করেনি অপহরণকারীরা ওদের পরিবারের কারো সাথে। বাকি চারজনকে অপহরণ করার আগেই কিছু একটা করতে হবে যাতে দুষ্কৃতকারীদের আড্ডাস্থান সনাক্ত করা যায়।


কী করা যায়? কী করা যায়? ধারণাটা মাথায় আসতেই খুশিতে একটা লাফ দিয়ে জিভে কামড় দিয়ে গেলো দাঁড়িয়ে। টোকা মারছে মাথায় অন্যকোন ধারণা আসে কিনা। বিকল্প কোনো ধারণা আসছে না মাথায়। বুঝতে পারলো ঐ ধারণা নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে সামনে। কাঁপা হাতে স্বরের কম্পন যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করে ফোন করলো সহোদরা রেবেকাকে। রেবেকা বড়ভাই-এর কথামতো কাজ করতে হয়ে গেলো রাজি।


অস্থির হয়ে নিজ অফিসকক্ষে পায়চারি করতে লাগলো জুবায়ের। কিছুক্ষণ পর সহযোগী কামাল অফিসকক্ষে ঢুকলো একটা পোটলা হাতে।


কামাল পোটলা থেকে রেবেকার পরনের কাপড় বের করে বললো, এই কাপড়-ই রেবেকার পরনে ছিলো। ও এই কাপড় ছেড়ে নাহিদার ড্রেস পরে বেরিয়ে গেছে।


এবার টাইগারকে নিয়ে এসো। রেবেকার কাপড়গুলো শুঁকিয়ে দেই।


কামাল জুবায়েরের চালটা বুঝতে পেরে প্রশ্নটা আর করলো না।

লেখক আশীষ কুণ্ডু -এর একটি গল্প

হরেনের রোজনামচা 




হরেন ঘোষ,ওরফে হরু, গলায় সুর আছে, টিকালো নাক, রং ফর্সা,তামাটে হয়ে গেছে রোদে পুড়ে জলে ভিজে। বৈশাখের সকাল।রোদ্দুর বেশ চড়া। হালকা চালে, 'এসো হে বৈশাখ,এসো, এসো,'গাইতে গাইতে খাড়া নাকের অহংকার নিয়ে বুক চিতিয়ে চলেছে হরেন।পাড়ার বখাটেরা উপেক্ষায় হরেনকে " নাকু" বলেও ডাকে। ছাতি তার চওড়া নয়,তবু ব্যক্তিত্বে মাত্রা আনতে হাত দুটো কাঁধ থেকে দূরত্বে ছড়িয়ে চলে সে। হরেন চলেছে বাজার, ঢোলাজামায় বেশ একটা বিস্তার নিয়ে ,তখনই ছন্দপতন। একেবারে নাকের ডগায় ফাজিল চড়াইয়ের পুরীষ।অগ্নিশর্মা হয়ে পক্ষীকুলের উদ্দেশ্যে গালিটা ছিটকে বেরোনোর মুহূর্তে- হরু, নিজেকে সামলে নাক পুঁছে, চরম বিরক্তিতে রুমাল ছুঁড়ে ফেললো  নালায়। 

মুখ কুঁচকে বাড়িতে ঢুকতেই,বৌয়ের খপ্পরে- "কি হোলো পাওনাদার বুঝি?”

‘ন-নাঃ’-এখন আবার ফিরিস্তি চাইবে বোসের বেটী , কি জ্বালা',মনে মনে এইসব ভাবনার মধ্যেই আড়চোখে হরেন দেখে তনিমা নজর রাখছে। এই ভঙ্গির তাৎপর্য জানে হরেন, ভয়ে পেটের ভিতর গুড়গুড়।কোনোমতে টয়লেটে ঢুকে হাঁফ ছাড়ে। বাইরে তনিমার তর্জন গর্জন শুরু হয়েছে। ভিতরে জল চালিয়ে দেয় হরেন, আর শুনতে হবে না ফাটা কাঁসরের শব্দ - বৌয়ের ! তনিমা কিছুক্ষণ লম্ফঝম্প করতে থাকে,"খুব বাড় বেড়েছে, আমার প্রশ্নের জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করে না, ভেবেছেটা কি?' শেষে তনিমা হরুকে জব্দ করার ফন্দি এঁটে,  রান্নার গ্যাস বন্ধ করে সোজা বেডরুমে ।বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে রান্নাঘরে হরেন বোঝে , 'আজ হাঁড়ি ঠেলতে হবে,"-মনে মনে বৌকে শাপ-শাপান্ত করলেও,ডাকার ইচ্ছে হোলো না ,নিজের নাক কাটা যাবার ভয়ে। ঘরে বাইরে এই নাক কাটার আতঙ্কে দিন কাটছে তার।ছেলে তপন সকাল থেকেই  হাওয়া।তড়িঘড়ি বাসি ভাত খেয়ে কি একটা পরীক্ষা দিতে গেছে। রান্না কোনোমতে শেষ করে হরেন। 

দুপুরের খাওয়া সুখকর হোলো না। অনুরোধ করতে তনিমা এসে খেতে বসলো বটে, কিন্তু হাজারো খুঁত কাটতে লাগলো, 'নুন বেশী',  'বিস্বাদ',-। 

রাগ হলেও বৌয়ের বাক্যবাণ সহ্য করে গেলো হরেন।পার্টির কাছে পেমেন্ট আনতে যাবার ছিলো, সেটা হোলো না। 

হরেন  অর্ডার সাপ্লায়ার। ইদানীং কারখানার একটা অর্ডার নিতে গিয়ে বড় লোকসানের সম্মুখীন হয়েছেন। দেনা হয়ে গেছে বেশ খানিকটা । পাওনাদার নাকাল করছে।  নিত্যদিনের পূজোর শেষে ঠাকুরকে আকুল হয়ে ডাকে হরেন, "দিন ফেরাও ঠাকুর, একটা লটারী না হয় পাইয়ে দাও, তাহলেই ওই রক্তচোষা বজ্জাতগুলোর মুখে টাকাটা ছুঁড়ে ফেলা যায়, দেনার দায়ে চুল বিকিয়ে যাবার জোগাড়, একটু মুখ তুলে তাকাও ঠাকুর", কিন্তু ঠাকুরের কি অত সময় আছে তার কথা শোনার !নিত্যপূজো সেরে-সকালের দিকে অর্ডার নিতে যাওয়া ,কখনও মার্কেটে- কখনও কারখানায়, বিকেলটা তাগাদায় সময় কাটে। 

সেলুনে চুল  কাটছিল হরেন। চুল বড় হলে গরমে অস্থির লাগে, তাই আসা। আর তখনই 

রাজু ঢুকলো সেলুনে, দাড়ি ট্রিম করবে। এই অঞ্চলের একছত্র অধিপতি। ধপ করে ভারী হাতটা হরেন কাঁধে রেখে বলল, " কি হরু, চুল কাটতে এসেচিস -ভাল-- তা ঘনশ্যামের

পয়সা দিচ্চিস না কেন? " সেলুনের বাইরে 

কালো কুকুরটা তখনই বুক কাঁপিয়ে ভ-ভৌ- ভৌ করে ডেকে উঠলো। 

হরেন বিপদ বুঝে তাড়াতাড়ি বলে উঠলো, "দশ পনেরো দিনের মধ্যেই দিয়ে দেবো "

--"মন্-নে থাকে যেন, না হলে- কুচ করে তোর 

নাকটা কেটে নিয়ে যাববো।"

অপমানিত হরেন বাড়ী ফিরলো আষাঢ়ে মুখ 

নিয়ে। তনিমার আজ মুড ভালো, তাই মজা 

করে বললো, " কি হোলো নাকু, মুখ হাঁড়ি কেন? "বলেই নাকটা মুলে দিলো। নাকটা বরাবরই হরেনের অহং-এর জায়গা। আর তাতেই হাত। 

রাগটা জমা ছিলোই,এবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে হরেন একেবারে স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে বলে উঠলো, " তোমার বাবা কি এই শিক্ষা দিয়েছেন? "

আগুনে ঘৃতাহুতি। হিংস্র বাঘিনী এরপরে ঝড় তুলতে যাচ্ছিলেন।তপন,তাদেরএকমাত্র ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকলো, "বাবা,আমার এইচএসের রেজাল্ট বেরিয়েছে, "ছেলের কথায় হরেনের সম্বিত ফেরে।                     "বাবা, সাইবার কাফে চলো"- -  ডাউনলোড করে দেখা গেলো তপনের প্রাপ্ত নম্বর আটানব্বই শতাংশ। কাফে থেকে বেরিয়ে, গ্রীষ্মের শুষে নেওয়া রোদ্দুরে হরেন ছেলের হাত ধরে  চলেছে। মন খুশিতে টইটম্বুর। রাস্তা শুনশান।দুপুর বারোটা।চেনা কাউকে দেখতে পাচ্ছে না হরেন,যাকে এই খবরটা দেওয়া যায় । তখনই কে যেন পিছু ডাকে, "নাকুদা গেছিলে কোথায়? "  -খুশিতে মন ভাসছে, তাই আর রাগ করলেন না, ঘুরে তাকাতেই দেখলেন পটাদাকে। পটাদাকে দেখলেই কেন  যেন মনে হয় সন্ধ্যা আসন্ন, গায়ের রং এতটাই কালো। এই সব অদ্ভুত অনুভূতি সবসময় মনে খেলা করে হরেনের। শান্ত স্বরে বলে হরেন, "ছেলের রেজাল্ট  দেখতে ",। মনে মনে হরেন চাইছে,- 'রেজাল্ট কেমন হয়েছে ' --এই প্রশ্ন উঠুক।

কিন্তু তা হোলো না, উল্টে সংক্ষিপ্ত "ওঃ" বলে কেটে পড়ে পটাদা। 

বাড়ী ফিরতে গিন্নি একেবারে গদগদ ছেলের রেজাল্ট শুনে,একটা আস্ত রসগোল্লা ছেলেকে খাইয়ে ,তাকালেন হরেনের দিকে, "তোমার তো আবার সুগার"।যাচ্চলে, সুগার, -এই খবর তো হরেনের নিজের ও অজানা । 

যতদিন যাচ্ছে রহস্যময়ী ভয়ঙ্করী হয়ে উঠছেন। সবে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলো,ছেলে সামাল দিলো, "দাও, দাও,বাবাকে মিষ্টি দাও।" 

জয়েন্টে খুব ভালো করলো ছেলে। ফলতঃ চিন্তায় পড়ে গেলেন হরেন। একে মাথায় দেনা, ছেলেকে ভর্তি করাবেন কি দিয়ে? 

রাতে চোখের দুপাতা এক করতে পারেন না।তপন জেলায় প্রথম হওয়ায় কালেক্টর সংবর্ধনা দিলেন,সাথে পঞ্চাশ হাজারের চেক। ছেলেকে নিয়ে গর্বের এই মুহুর্তে, হরেনের মনে পড়ছিল, নিজের কৈশোরের কথা। সালটা 1980।মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। তখন নেট ছিলো না। পাড়ার মোড়ের দোকানে বোর্ড থেকে আনা জোড়াশ্বথতলা স্কুলের রেজাল্ট টাঙিয়েছিল পিন্টুদা। সেবার হরেন ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলো। সবাই ধন্য ধন্য করছিলো।পরের দিন বাবার বন্ধু , মৃণালকাকু কলকাতা থেকে ভীম নাগের সন্দেশ এনে খাইয়েছিলেন। সবাই বলছিলো,এ ছেলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে যায় না।কিন্তু ভাগ্য কাকে কোথায় নিয়ে যায়!শেষে প্লেন বিএসসি, আর চাকরী না পেয়ে অর্ডার সাপ্লাই।  দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তপন চমকে তাকাল, "বাবা, শরীর খারাপ নাকি! 

"নাঃ , কিছু নয়"- উত্তর হরেনের। 

বাড়িতে ফিরে দেখে, তনিমা গলদঘর্ম হয়ে বসে আছে, একটা হাত ঘটিতে ঢুকিয়ে। 

"কি, হোলো?"বলতেই রণচণ্ডী হয়ে তনিমা ঘটিসমেত হাত নিয়ে হরেনের দিকে তেড়ে আসে। "নাক ফাটাবো তোমার "

"মা ,মা" আবার পরিত্রাতার ভূমিকায় ছেলে । সাহস করে হরেন বলে, "কিন্তু  তুমি ঘটিতে হাত ঢুকিয়ে রেখেছোই বা কেন? বার করো, বক্সিং প্র্যাক্টিস করছিলে নাকি!" বারুদে আগুন লাগতে যাচ্ছিল, তপন থামালো, "মায়ের হাত ঘটিতে ফেঁসে গেছে, বুঝতে পারছো না"।

এমন সময় একটা হট্টগোল শোনা গেল বাইরে, "নাকু, বাড়িতে আছো? বাইরে এসো, -ব্যাটা হরু, --ঘোষের পো, -পয়সা আজই নেবো, না হলে তোর গুষ্টির  *** যাবো"। হরেন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে, পিছন পিছন তনিমা। দেখা গেলো পাওনাদাররা একসাথে এসেছে। পিছনে দাঁড়িয়ে রাজু-রজনীকান্ত- এর স্টাইলে। বিপদ দেখে হরেন হাত কচলাতে থাকে। রাজু কলার ধরতে গেলে, রণচণ্ডী তনিমা ওই ঘটিবদ্ধ হাত ধোনির হেলিকপ্টার শটের ঢঙে ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে আসে, "রাজু তোর একদিন কি আমার একদিন, আমার বরের গায়ে হাত"। রাজু পালাবার পথ পায় না। জনতা ছত্রভঙ্গ। আর ঘটিটাও তনিমার হস্তমুক্ত হয়ে সোজা ওপরে উঠে তালগাছের মাথায়। পাশের বাড়ির ডেঁপো ছোকরা, পকাই তাই দেখে দুহাত তুলে ছক্কার সাইন দেখিয়ে বললো," কাকিমা, পুরো ওভার বাউন্ডারি, আগে ক্রিকেট খেলতে নাকি!" এবারে তনিমা লজ্জাবতী  তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে পড়েন। এই লজ্জারুণা রূপ কতদিন দেখেনি হরেন। মনে মনে গুনগুন করে, "রূপসী দোহাই তোমার "! তবে গাওয়ার সাহস হয় না, এই যা।পরের দিন সকাল।হরেন দেখে বৌ খুব খুশী। তনিমা বলে,"দেখেছো,আজ সারাবাংলা নিউজ , তোমার ছেলেকে দুলাখ দেবে, "প্রতিভার খোঁজ" বিভাগ ঘোষণা করেছে। মনটা খুশিতে ভরে যায়। কিন্তু ছেলেটা গেলো কোথায়? 

ছেলে ফিরলো দশটা নাগাদ। একটু গম্ভীর,  আনমনা। "কোথায় গেছিলি বাবা?" হরেন তাকিয়ে থাকে, ছেলের উত্তরের অপেক্ষায়। কথা এড়িয়ে তপন বলে," বাবা,চারটের মধ্যেই রেডি হয়ে থেকো, সারাবাংলা গাড়ী পাঠাবে"। -- জমকালো অনুষ্ঠান।মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন।পিঠ চাপড়াচ্ছেন তপনের--জিজ্ঞেস করলেন, " তুমি কি করতে চাও? "তপনের সংক্ষিপ্ত উত্তর,"দেশের কাজ"! হাততালি দিচ্ছে সবাই। গর্বিত হরেনও হাততালি দিতে থাকে। গাড়ী পৌঁছে দেয় বাড়ী।রাস্তায় ছেলেটা কেন যে এত গম্ভীর হয়ে থাকলো বোঝা গেলো না।নাকে হাত বুলিয়ে মাথা উঁচু করে গাড়ী থেকে নামছে হরেন।ভাবখানা এই,মুখ্যমন্ত্রীর হাত যার ছেলের মাথায় সে অন্যকে ভয় পাবে কেন?বাড়ির সামনে বিরাট জটলা।এই একটু আগে টিভি চ্যানেলে  সবাই দেখেছে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।সবাই এমন সোনার চাঁদ ছেলেকে দেখতে চায়।  পিতা হিসাবে গর্ব অনুভব করে হরেন। 

পরের দুদিন ছেলে সকালে বেরিয়ে যায় , সন্ধ্যাবেলা মুখ শুকিয়ে ফেরে।জিজ্ঞাসা করলে বলে ,"ফর্ম ভরছিলাম।" তৃতীয় দিন , ছেলের বিছানার পাশে একটা নোট , লেখা,  " বাবা, তোমার আশা পূর্ণ করতে পারলাম না,আমি দেশের কাজে যাচ্ছি। আমি জানি তোমার অনেক দেনা। আমি ইনজিনিয়ারিং পড়লে তোমার দেনা বাড়তো। আমি সেটা সহ্য করতে পারবো না। তাই  মিলিটারি ট্রেনিং নিতে যাচ্ছি। দেশের সেবা সব থেকে সেরা।আমার পাওয়া টাকাগুলো তুমি নিও।টাকা বালিশের তলায় পাবে কিছুটা দেনা শোধ করো। না নিলে খুব দুঃখ পাবো।বাকিটা আমি শোধ করে দেবো ধীরে ধীরে। তুমি ও মা আমার প্রণাম নিও।আমি পোস্টিং পেলে জানাব, তার আগে খোঁজ কোরো না। "

ইতি, তপু। 

চোখে শূন্যতা-হরেনের! সামনে তনিমা কাঁদছে-ভগবানকে দোষ দেবে,না ধন্যবাদ দেবে, বুজতে পারছে না । হাতজোড় করে শূন্যের দিকে নমস্কার জানালো-- বোধহয় ছেলের উদ্দেশ্যেই হবে। 


কবি তাপস মাইতি -এর একটি কবিতা

 যে পথে

       



যে পথে হাঁটি আর এখানেই 

নিরুপম চুল 

বকের পাখনার মতো ওড়ে নিরুপমার ----

সে আমার বন্ধু ।

তারপর দুপুরের হ্রেষা রোদে 

তার ছবি এবং বোকাটে দেহ , 

মরা মেঘের ভেতর উড়তে উড়তে 

আমাকে ছোঁয় । যেখানে সুরভিত চোখ 

তার মাগুর মাছের মতো আমাকে দেখে 

আর নীলাভ শূন্যে হাসে , 

খিল খিল বাদামি ঠোঁটে ।

আমি তো পথে , তাই 

সে আজ আমার দিকে 

ভীমরুলের চোখ করে 

তার রঙিন মনের ডানা ঝাপটায় ।

কবি বন্যা গুপ্ত -এর একটি কবিতা

 আলোকবর্তিকা



মন ভিজে আছে বদ্ধ জীবনের

দায়বদ্ধতার বহনে।

হাত বাড়িয়ে আছে মনের বাহুমূল

পথের মরূদ্বানে।

দিগন্তের পটরেখা বলাকার মাঝে

ছায়া যুদ্ধ।

অবসরের কলোরব কিন্তু জীবনে ভরা

মলমাসের সমারোহ।

স্বপ্ন বোঝাই বিগত দিনের ছবিগুলো...

পাখনা মেলে ইচ্ছে ডানা অহংকারের

স্রোতে ভাসে একান্তে।

একলা খুশীর অভিযানে পাহাড়ী ঝর্ণা 

দুরন্ত বর্ষার উচ্ছ্বলতায়...

কখনো সমুদ্রের নাবিক হয়ে অজানার সন্ধান

এর মাঝে বাস্তবের অনুপ্রাসে আশার প্রদীপদানি হৃদয়ে প্রতীক্ষার তিতিক্ষায়....

কবি আবদুস সালাম -এর একটি কবিতা

 অলক্ষুণে



সম্পর্কের উঠোন আজ স্যাঁতস্যেঁতে

বিবর্ণ ঢেউ উঁকি মারে জলের ছায়ায় অসমতল স্নেহগুলো ভেজালের বারান্দায় সেঁকে নেয় ভরসা


সময়ের শ্যাওলা জমেছে নিস্তব্ধতার ঘাটে

পিচ্ছিল উপত্যকায় শুনি মৃত্যুর পদধ্বনি ব্যর্থ দহন চিত্র খুঁজে পায় খাজুরাহের গায়ে নৈরাশ্যের চরে বাসা বেঁধেছে ডাহুক


নৈঃশব্দের চিল উড়ে চলেছে স্যাঁতস্যাঁতে আকাশে

প্রচ্ছদহীন অলক্ষুণে বারান্দায় জমা হয় নৃশংস অন্ধকার

কবি তুলসীদাস বিদ -এর একটি কবিতা

 ফিরে দেখো

   



বাঙালিরা ফিরে দেখো

         বাংলার কত রূপ।

দেখে দেখে মনে রেখো

       বাঙালিরা নিশ্চুপ।

বদলের পালা গান

            উল্টিয়ে বদলা।

হাড়ে হাড়ে বুঝে যান

      বহুরূপী বাংলা।

ভুলে গেলে চলবে না

         অতীতের কটা দিন।

বাঙালিরা মানবে না

           বড় ছোট অতিদীন।

জবাবের ভাষা গুলো

   বড় এলোমেলো।

খড় কুটো দিয়ে জ্বালো

         গরিবের চুলো ।

ঝাঁটা মারো বড় মুখে

         বেকারীরা বাংলার।

অপমানে মুখ ঢেকে

             ধূলো মুছো চশমার।

বাংলার রাজ রাণী

          মিথ্যার মাষ্টার।

শ্রী ময় বাংলার

           কালিমাখা গৌরব।

চট্কানো ফুলের

           থাকে নাকি সৌরভ।

বাঙালিরা ফিরে দেখো

           চোখ খুলে বারবার।

যত দেখো ততো শেখো

      কত শ্রী বাংলার।। ফিরে দেখো

   তুলসীদাস বিদ


বাঙালিরা ফিরে দেখো

         বাংলার কত রূপ।

দেখে দেখে মনে রেখো

       বাঙালিরা নিশ্চুপ।

বদলের পালা গান

            উল্টিয়ে বদলা।

হাড়ে হাড়ে বুঝে যান

      বহুরূপী বাংলা।

ভুলে গেলে চলবে না

         অতীতের কটা দিন।

বাঙালিরা মানবে না

           বড় ছোট অতিদীন।

জবাবের ভাষা গুলো

   বড় এলোমেলো।

খড় কুটো দিয়ে জ্বালো

         গরিবের চুলো ।

ঝাঁটা মারো বড় মুখে

         বেকারীরা বাংলার।

অপমানে মুখ ঢেকে

             ধূলো মুছো চশমার।

বাংলার রাজ রাণী

          মিথ্যার মাষ্টার।

শ্রী ময় বাংলার

           কালিমাখা গৌরব।

চট্কানো ফুলের

           থাকে নাকি সৌরভ।

বাঙালিরা ফিরে দেখো

           চোখ খুলে বারবার।

যত দেখো ততো শেখো

      কত শ্রী বাংলার।।

কবি নবকুমার -এর একটি কবিতা

 ঘরের পর্দাটা দুলছে 



ঘরের পর্দাটা দুলছে---

পর্দার ওপারে কে আছে জানি না -

কোন আওয়াজও পাচ্ছি না ।


আমি দাঁড়িয়ে আছি দরোজার সামনে

একটা শালগাছের ছায়ায় 

আমার চারদিকে বেষ্টন ক'টি বাচ্চা শশক ।


একেকবার মনে হচ্ছে পর্দাটা একটু ফাঁক করে দেখি

আবার থমকে যাই ।

যাকে চেয়েছি যদি না পাই !

তাহলে এক কালো আকাশ বুকে নিয়ে 

হেঁটে যেতে হবে সারাটা জীবন ।


এখন তো চলছে ভাঙনের পালা -

রাষ্ট্র ভাঙছে,যৌথ পরিবার কবেই ছত্রাখান

ভাঙছে সমাজ ,মানুষের আচরণ,মানবিকতা 

সব--সব---

যদি সেও ভেঙে যায় অস্বাভাবিক নয় ।


তবু যে যেখানে আছে থাক

যেমনটি স্থির আমার মনে 

একথা ভেবেই সময় পেরিয়ে যাবে দু'দিনের জীবনে--

Sunday, September 26, 2021

কবি মহীতোষ গায়েন -এর একটি কবিতা

 সম্পর্ক



বয়স যত বাড়ছে বুকের উপরের পাথর

সরে যাচ্ছে,সরছে মাটি,গাছ,লতাপাতা;

আলোকবর্ষ দূরত্বে চলে যাচ্ছে সম্পর্ক।


সব সূত্র,রীতিনীতি,বোঝাপড়া ব‍্যবধানের

হিমশৈলে ধাক্কা খেয়ে সংসার-সমুদ্রে ডুবে

যাওয়ার আগেই একবার সতর্ক হয়ে যাও।


বয়স বাড়ছে লাউ ডগার মত,উপত্যকায়

বাসা বাঁধছে কামনা বাসনার ক্ষয়িষ্ণু বীজ,

সম্পর্কের সলতেগুলো পাকাচ্ছে তালগোল।

 

আকাশে চাঁদ উঠেছে,সমস্ত তারা,নক্ষত্র

সম্পর্কের ফাটল দিয়ে ঢুকে দখল নিতে

তৎপর,জীবনের রণক্ষেত্রে যুদ্ধের আবহ।


ভোরের সূর্য ঢেকে যাচ্ছে বিভেদের মেঘে;

জীবনের গাছে বাহারি ফুল,প্রচণ্ড ঝড়ের

পূর্বাভাস,শেষ হওয়ার আগে এসো আরো

একবার সম্পর্কের সাতপাকে বাঁধা পড়ি।

কবি চিরঞ্জিত ভাণ্ডারী -এর একটি কবিতা

 হোক না পথ কঠিন




নৌকা চলে হেলে দুলে শ্রাবণ নদীর জলে

গান জুড়েছে ময়না টিয়ে সুরের তালে তালে।

আমন ধানে ক্ষেত ভরেছে শরৎ মেঘের ভেলা

খেলতে পুতুল উঠোন মাঝে দুপুর হলো বেলা।

আমরা কি সব পুতুল জীবন খেলছি সুতোর টানে

হাজার স্বপ্ন বুকের মাঝে চেয়ে আশার পানে।

বাঁচতে হবে বাঁচতে হবে হোক না পথ কঠিন

জীবন নৌকা বাইতে বাইতে করবো জীবন রঙিন।

কবি ইমরান শাহ্ -এর একটি কবিতা

 নীলকন্ঠ



স্মৃতির দেয়ালজুড়ে চৌমুখী বাতাস বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছে অবিরত

এখন আকাশ আর শাদা হয় না কেন যেন!


শরীরসমাজ বয়ে বেড়াই আকাশলীনা পথ ধরে, কিনারা পাইনি

অক্টোপাসের মায়াবি থাবা এড়াতে পারি না সমগ্রঃ বলপ্রয়োগে।


সে যদি মিলে যায় হৃদপিণ্ড কেটে অর্ঘ্য দেবো

তবু তারে চাই, সবকিছুর বিনিময় আমৃত্যু; কিভাবে পাবো?


শ্বেতহস্তী পুষবো মনের অন্দরে তেমন গোয়ালী নই হয়তো

তাই বিড়াল পুষি, তার কাছে কিছু শিখবো বোলে। 


অমৃতের স্বাদ ভুলে গেছি, গতশোচনা করে যাই শুধু;

আমরণ তাই গিলে চলেছি বিষ ভরা আহান-রস।


 না-হয় ধরণী তুমি দ্বিধা হও, নতুবা মুক্তি দাও

এমন সোনার মনুষ্য জীবন বাঁচাতে বাতলে দাও পথ।