Monday, August 8, 2022

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -14


 


বিধাতার নির্মম পরিহাস মানুষের জীবনকে মরুময় করে তোলে । শত চেষ্টা করেও কোন উগ্র পুরুষাকার ভাগ্য বিড়ম্বনার করাল কবল হতে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না । আমার জীবনেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি । হারানো সলিলকে Medical Repre sentative পি . বিশ্বাসের মধ্যে খুঁজে পেলও তার প্রেমের নৈবিদ্য নতুন করে সাজালো । দিন দিন পি.বিশ্বাসের প্রতি শ্যামলী আকৃষ্ট হয়ে পড়ল । তার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে তার জীবনের শ্রেয় ও প্রিয় বলে মনে হল।


 কি যে দৈব্যগুণে কারেন্টের মতো টানত ওর দিকে বুঝতে পারত না । এমনকি অভিসারিকা হয়ে পল্টু বিশ্বাসের কুঞ্জেও তার অবাধ যাওয়া আসা শুরু হল । ঐ ভাবে কয়েক মাস তাদের গোপন প্রেমের লীলা চাপল্য একদিন শ্যামলীর বাবার চোখে ধরা পড়ল । তিনি তাকে পি.বিশ্বাসের সঙ্গে এই মেলামেশার হেতু জিজুাসা করায় শ্যামলী অকপটে সত্য ঘটনা প্রকাশ করল।

কোন মতে রাজী হলেন না তিনি একজন Medical Representative এর সাথে তার মেয়ের বিয়ে দিতে । নিজের আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য তিনি সুপাত্রের সন্ধান করতে লাগলেন । তার বাবার এই অভিসন্ধি বুঝতে পেরে ছুটে গেল পল্টুর কাছে । তাকে সকাতরে জানালো , পল্টু যদি তাকে সত্য সত্যই জীবন সাথী রূপে নির্বাচিত করতে চায় , তাহলে অবিলম্বে সে যেন কালীঘাটে কিংবা অন্যত্র দেবমন্দিরে গিয়ে শুভ কার্য সম্পন্ন করে।

 ঐ দিন কালীঘাটে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে বজায় রেখে শ্যামলী তৈরী হতে গেল বাড়ীতে । দ্রব্য সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে পরদিন পল্টুর বাসাতে এসে উপস্থিত হল । আনন্দ উল্লাসে নৈশ ভোজন করার পর কখন যে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে ছিল তা জানে না । যখন জ্ঞান ফিরল , দেখল এক বারাঙ্গনালয়ে । পল্টু বিশ্বাসের প্রবঞ্চনা চিত্র তার চোখের সম্মুখে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো । জানতে পারল পল্টু তাকে এখানে ৫০ হাজার টাকার বিক্রি করে গেছে।

এরপর থেকে তার জীবনের মেঘমুক্ত শারদ আকাশ আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ পুঞ্জীভূত হতে থাকল । এই ঘটনা বলার পর শ্যামলীদি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন । অনেক চেষ্টা করেছিলাম এই কলুষিত জীবনের পরিবেশ হতে নিজেকে মুক্ত করার । সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হলো । কিন্তু কেন জানিনা , আমি অনিচ্ছা সত্বেও যৌবন ভাসতে ভাসতে এক অন্ধকারময় পরিণামের দিকে এগিয়ে চললাম।

সেই দিনটাকে কোন মুহুর্তের জন্য ভুলতে পারিনি । শুধু দুঃখে অভিমানে মাথার চুল ছিঁড়েছি । কি ভুল করেছি আমি ! কেন বাবার কথা শুনিনি ? কেন শয়তানটাকে চিনতে পারিনি ? শ্যামলীদি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।

 ওকে কি বলে সান্ত্বনা দেব তার ভাষা পাচ্ছিলাম না । শুধু বললাম , আমিও তো তোমার দলভুক্ত হলাম দিদি । হঠাৎ মুখ দিয়ে তুমি বেরিয়ে এলো।

এরপর আমার পঙ্কিলময় জীবনের অধ্যায় হল শুরু । বিধাতার অভিশাপে এই সংসার বারবণিতা রূপে পরিগণিত হলাম । রমা নামের পরিবর্তে পদ্মা নামে আমি এই ক্লেদাক্ত জীবনের বোঝা বইতে শুরু করলাম । এক ধনী পুত্রের কন্যা হয়ে অকুণ্ঠ চিত্তে কখন যে পুরুষদের লালসার শিকার হলাম তা নিজেও বুঝতে পারিনি । ভাগ্য - বিড়ম্বনার কি নিদারুন পরিণতি !

 এবার অভিজ্ঞ পাঠকদের নিকট প্রশ্ন রাখি , যারা আমাদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন , আমাদের অন্তরে যে ব্যথা , যে অতৃপ্ত কামনা , যে নৈরাশ্য লুকিয়ে আছে , যাদের হৃদয়ের সঙ্গে আমাদের হৃদয়ের বিনিময় চলে সেই সমস্ত মধুকর পুরুষগণ আমাদের অন্তরকে উৎঘাটন করেন এর সত্য স্বরূপটি জানতে চান কি ? জানতে চান না , ক্ষণিকের অতিথি হয়ে তারা অপাতত মধুর সুখের স্পর্শ লাভ করে ধন্য হন , কিন্তু যাবার সময় এমন কি আমাদিগকে শুস্ক ফুলের মালার মতো অবজ্ঞার স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে যান । এই তো আমাদের মধুময় জীবন ।

 তবে একথা অস্বীকার করব না , আমাদের পৃষ্ঠপোষকগণের বহুমূল্য উপহার সামগ্রী জীবনের কলঙ্ককে ঢেকে দিয়েছে , বিস্মৃত করে দিয়েছে আমাদের অতীত জীবনের আভিজাত্যকে । কি এক দুর্নিবার আকর্ষণে নিত্য নতুন জীবনের আস্বাদনে তখন আমরা মত্ত হয়ে ছুটে চলেছি । তখন আমাদের জীবনের আদর্শ , নীতিবোধ ও মানবিকতা ধূলায় লুণ্ঠিত ।

  Eat drink and be merry . এটাই ছিলো আমাদের জীবনের চরম কামনা । বেশ আনন্দেই আছি । সব লজ্জা , ঘেন্না কোথায় লুকিয়ে গেছে জানি না । এখন পুরোপুরি দেহপসারিনী হয়ে গেছি , পুরুষদের সাথে আমোদ করতে কোন কষ্ট হয় না । আমার সৌরভের গন্ধে পালে পালে পুরুষেরা এসে মাতোয়ারা হচ্ছে । মাঝে মাঝে পুরুষদের কথার ছলে খিলখিল করে হেসে উঠতাম । অনেকে আভার ভীষণ অশ্লীল কথা বলত , কিন্তু বস্তীর মাসিমা আদরিনী নারীদেহের ব্যবসায় যাতে ভাঁটা না পড়ে সেই সময় বহু পুরুষের অপমান ও বাড়াবাড়ি বিনা প্রতিবাদে নীরবে সহ্য করতাম । নিজের জীবনকে পণ্য সামগ্রী বা পুরুষের ভোগ্যবস্তু রূপে বিলিয়ে দিয়েছি । গভীর চিন্তা করার সময় পেতাম না , কেন এই পথ বেছে নিলাম । 

একদিন এক বিশিষ্ট ভদ্রলোক এলেন । তার গায়ের রং ভীষণ ফর্সা , বেশ সুপুরুষ ।


পরেন দামী শার্ট ও ফুল প্যান্ট , হাতে গোটা তিন সোনার আংটি , দাড়ি - গোঁফ কামানো মসৃণ গাল ,  ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি । 

ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম , তিনি আদরি মাসীকে কি যেন বলছিলেন শুনতে পেলাম । একটু পরে ধীরে ধীরে তিনি আদরী মাসীর সঙ্গে আমার কাছে এলেন ভাবলাম নবাগতের আগমনে আমার উদ্দেশ্য অনেকটা সিদ্ধ হবে । আদরী মাসীর ইচ্ছা ভদ্রলোকটির রুচিমত আমি যেন কাজ করি । ভদ্রলোককে গৃহাভ্যন্তরে নিয়ে গিয়ে যথাযোগ্য আতিথ্যে আপ্যায়িত করলাম । কিন্তু তিনি কুরুচি পূর্ণ ভদ্রলোক ছিলেন না । আমার আপ্যায়নে বাধা দিলেন । নিজের কাজের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন ।

 ভদ্রলোক বললেন , যদি আপনি আমার প্রতি সহৃদয় হয়ে থাকেন , তাহলে আমার অনেক উপকার হবে ।

 আমি সাগ্রহে বললাম , কি করতে হবে বলুন ?

 তখন ভদ্রলোক আমার কথার উত্তর না দিয়ে আমার আপাদমস্তক সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন । মনে হল , আমি যেন তার জীবনের হারিয়ে যাওয়া প্রেমাস্পদ — যাকে তিনি যুগ যুগান্তর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছেন , এমনি তার মনোভাব । তার নীরবতায় আমি বিরক্ত হয়ে বললাম , কি মশাই , আমাকে নিয়ে আবার নতুন স্বর্গ রচনা করবেন বুঝি ? আপনার জীবনের অতৃপ্ত কামনাকে তৃপ্ত করার জন্য বুঝি এখানে এসেছেন? না। আমাকে কৌশলে এখান থেকে ছিনিয়ে নেবার জন্য এসেছেন?

 কিন্তু তার প্রসন্ন দৃষ্টি , নিষ্কলুষ মনের উদারতা করুণ চাহনি দেখে তাকে ঠক প্রবঞ্চক বলে মনে হলো না । কিন্তু তিনি আমার নিকট মনের গোপনীয়তা সম্পূর্ণ রূপে প্রকাশ করলেন না । বাধ্য হয়ে সেদিন তাকে বিদায় দিয়েছিলাম । এই উদ্দেশ্যহীন ভবঘুরে মানুষের আসঙ্গলিপ্সা আমাকে শান্তি দিতে পারেনি । ভদ্রলোক সেদিনের মতো গুপ্ত মনের রহস্য নিয়েই বিদায় নিয়েছিলেন। 

এই ঘটনার পর আমার আদরী মাসী হাজির হলেন । জন্মের কয়েক বছর পর মাকে হারিয়েছিলাম । মনে হয় ভগবান আমার দুঃখময় জীবনের কথা চিন্তা করে এই আদরী মাসীকে দিয়ে মায়ের স্থান পূরণ করছেন । তিনি কাছে এসে সস্নেহে বললেন , পদ্মা ঐ ভদ্রলোকটিকে বিদায় করে খুব অবিবেচনার কাজ করলি । ধীরে ধীরে আদরী মাসীর কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা ও গাম্ভীর্য্য দেখা দিল।

 আমি নাকি তার কামনার বাধার সৃষ্টি করলাম । ওর চড়া মেজাজ দেখে আর থাকতে না পেরে মাথা থেকে পা পর্য্যন্ত আমার জ্বলে উঠল । সমস্ত দেহটা উত্তেজনায় কেঁপে উঠলো । আর টাল সামলাতে না পেরে বলে উঠলাম , তোমার ক্ষতি হল তো আমার বাপের কি?





                             ক্রমশ...

Thursday, August 4, 2022

উপন্যাস - তান্ত্রিক পিসেমশাই ও আমরা দুজন || সুদীপ ঘোষাল || Tantrik Pisemosay oo Amra by Sudip Ghoshal || Fiction - Tantrik Pisemosay oo Amra Dujon Part -2




রতন বলে নারীপিশাচ কেমন হয়?  -্প্রাচীনতম সভ্যতা বিশ্লেষণ  করলে দেখি, কৃষিকেন্দ্রিক প্রাচীন সমাজে তাই নারীরাই ছিল অধিপতি। নব্যযুগে থেকে চলে আসা রীতি অনুযায়ী  ফসল কাটার পরে অপদেবী তার পুরুষ সঙ্গীকে বলি দিয়ে অপদেবতার পুজা করত।  এই আধিপত্য  ধর্মের প্রসার কালে এসে কমতে  শুরু করে। কৃষিকাজ যেহেতু মেয়েদের হাতে প্রথম হয়।  সেহেতু বাংলায় এই আধিপত্য বিলোপ  সহজ ছিল না। বরেন্দ্র অঞ্চলের অপদেবীর পুরুষ সঙ্গীরা আর সহজে বলি হতে চাচ্ছিল না। এ বিষয়ের   নারীদের দেশে বন্দী  উদ্ধার করে তারা।   এরা ওঝা হলো। নারীওঝা যারা বাণ মেরে মানুষকে মারতে পারত আবার তার ভালোও করতে পারত। এরা মরে গিয়ে নারীপিশাচ হয়।আমি বললাম, ফালতু সব কথা। তান্ত্রিক হয়ে আপনি অলৌকিক কিছু করে দেখান দেখি। পিসেমশায় বললেন, বেশ পাঁচমিনিট পরে তুই এখান থেকে উঠতেও পারবি না নড়তে চড়তেও পারবি না।রতন বললো, আমিও দেখবো। দুজনকেই সম্মোহন করুন।পিসেমশায় বললেন, বেশি পাকামি মারতা হ্যায়। শালা বিপদে পরেগা। তারপর পিসেমশায়  বসলেন এবং আবার সাধনা করতে শুরু করলেন। পাঁচ মিনিট পরে ঠিক আমাদের বললেন, ওঠ এবার।তারপর তাকালেন আমাদের দিকে  । আমি আর রতন চেষ্টা করলাম অনেক চেষ্টা করেও উঠতে পারলাম না। ওঠা তো দূরের কথা। নড়াচড়া করতে পারলাম না। চুপ করে বসে আছি। কথা বলতে পারছি না।  পিসেমশায় সত্যিই  নড়াচড়া করতে পারছি না আমরা চেষ্টা করছি কিন্তু পারছিনা। কি হবে পিসেমশায়। ক্ষমা করে দাও। এবার মতো ক্ষমা করে দাও। আমাদের ঠিক করে দাও। আমাদের দুজনের আর্তচিৎকারে পিসেমশায় বলল ভয় নেই আমি আছি । তারপর পিসেমশায় আবার পাঁচ মিনিট সময় সাধনা করলেন। চুপচাপ বসে থাকলেন আমাদের দিকে তাকিয়ে। তারপর 5 মিনিট পর আমাদের বললেন এবার ওঠ। রতন আর আমি এবার উঠে পড়লাম উঠে নাড়াচাড়া করে দেখলাম না সব ঠিক আছে।কি সমস্যা বললেন না জেনে কারো সঙ্গে তর্ক করতে নেই। কম জ্ঞান হলো বিপদের লক্ষণ জানবি পড়বি পড়াশোনা করবি, তারপর তর্ক করবি। মানুষকে মারণ, উচাটনের দ্বারা  অতিষ্ঠ করে দেওয়া যায়। তাকে এমনকি মেরে ফেলাও যায়। তারপর থেকে আমরা পিসেমশায় সঙ্গে তর্ক করতাম না।






 ৩
রতন বলল,পিসেমশাই তান্ত্রিকরা অনেক বছর বেঁচে থাকেন। যেমন তৈলঙ্গস্বামী,বাবা লোকনাথ সকলে অনেকবছর বেঁচে থেকেছেন। অলৌকিক কাজ করেছেন কত। কি করে সম্ভব এটা?
পিসেমশাই বললেন,ওনারা বলেন, কচ্ছপের মতো বসে থাকুন, কবুতরের মতো হাঁটুন আর কুকুরের মতো ঘুমান। এর সঙ্গে দে’হ-মন-প্রাণের অভ্যন্তরের শান্তির জন্য তিনি শ্বাস-প্রশ্বাস সং’ক্রান্ত কিছু কৌশলের চর্চা চালাতেন। এসব করেই তিনি শিখেছিলেন দী’র্ঘ জীবন লাভের সত্যিকার কৌশল। বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন পশ্চিমে মানুষের গড় জীবনকাল ৭০-৮৫ বছরের মধ্যেই থাকে। কেউ শত বছর বেঁ’চে আছেন শুনলে বেশ অবাক লাগে।অথচ এনারা চারশ পাঁচশ বছরও বাঁচেন। সংযমী আর শান্ত স্বভাবের মানুষ দীর্ঘজীবন লাভ করেন। আর অলৌকিক ঘটনা ঘটাতে সাধনার প্রয়োজন। বাবা লোকনাথ তো বাঘ, কুকুরের রূপ ধরতে পারতেন। 



কোনো বিষয়ে যা বলতেন আমরা শুনতাম। আমরা তার ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম তার পিছনে পিছনে ঘুরতাম যদি কিছু জানা যায় যদি কিছু শেখা যায় । একবার রতন আর আমাকে নিয়ে পিসেমশাই গেছিলেন পাহাড়ি অঞ্চলে। সেখানে একটা বাড়িতে বন্ধুর বাড়িতে তিনি ঢুকেছিলেন এবং বন্ধুটার সঙ্গে তার  অনেক দিন পর দেখা। সেই বন্ধুটাও তান্ত্রিক ছিল।পিসেমশায় বললেন, এখানে এসে তোদের পাহাড়টা দেখাবো বলে এই বন্ধুর বাড়ি এলাম এই বন্ধুটা মোটেও আমাকে পছন্দ করে না আমাকে হিংসা করে। তবু বাধ্য হয়ে এলাম। খুব সাবধানে থাকবি।পাহাড়ে ঘুরতে ঘুরতে পিসেমশায় একটা সত্যি ঘটনা বললেন, গর্ভবতী মিনার বাচ্চা হবে।  সমস্যা হল এখন লকডাউন চলছে। বাইরে বেরোনো যাবে না। বেরোলেও সব হাসপাতালে করোনা রোগীর ভিড়। চিকিৎসক ডেট দিয়েছিলেন ৮ই এপ্রিল, কিন্তু তিন তারিখ রাত্রেই প্রবল শ্বাসকষ্ট শুরু হয় বছর ২৭এর গর্ভবতী মেয়েটির । তারপর ১২ ঘণ্টা ছাঁট লোহার ছোট কারবারি তাঁর স্বামী অসুস্থ মেয়েটিকে নিয়ে একের পর এক হাসপাতালে দৌড়ে বেরিয়েছেন। মুম্বইয়ের উত্তর শহরতলির নালাসোপারা থেকে মুম্বইয়ের মধ্যে ৭০ কিলোমিটারে চারটি হাসপাতাল পড়েছিল। তার একটিতেও ভর্তি করতে না পেরে পরের দিন বিকেলে  স্ত্রীকে মরতে দেখল যুবকটি। বাঁচানো যায়নি গর্ভস্থ সন্তানটিকেও। তাঁর মৃত্যুর পরেই সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন হয়ে যায় নালাসোপারার ধানেব বস্তি এলাকায়। এই মৃত্যুর খবর পেয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা ওই এলাকায় কনট্যাক্ট ট্রেসিং করতে গিয়ে পড়েছেন আর এক বিপদে। লোকজন বলতে শুরু করেছে এঁরা এনপিআরের তথ্য সংগ্রহ করতে গেছেন। একদিকে করোনার আতঙ্ক , এনপিআর-এর ভয়, অন্যদিকে হাজার পঁচিশেক বাসিন্দার খাবার ফুরিয়ে আসছে, পানীয় জলের তীব্র সঙ্কট- সব মিলিয়ে ভয়াবহ অবস্থা।মিনা মারা গেল , সে আর তাঁর স্বামী উত্তরপ্রদেশ থেকে এই বস্তিতে আট মাস আগে আসে। থাকতে শুরু করে দশ ফুট বাই দশ ফুট একটি গ্যারেজে। রাতে যখন মেয়েটির দমবন্ধ হয়ে আসতে থাকে , তাঁর স্বামী দুই আত্মীয়কে নিয়ে একটি অটোরিক্শা ভাড়া করে নিউ আয়ুশ নার্সিংহোমে যায়। করোনা ভাইরাস সন্দেহে সেখানকার ডাক্তার মেয়েটিকে ভর্তি নিতে অস্বীকার করে, তখন তাঁরা দৌড়য় সরকারি সর্বোদয় মেটারনিটি হোমে। সোখানকার ডাক্তার বলেন তাঁর চিকিৎসা করার ব্যবস্থা ওই হাসপাতালে নেই। সেখানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এঁরা যখন ৪০ কিলোমিটার দূরে কান্ডিভেলির শতাব্দী হাসপাতালে পৌঁছয়, ততক্ষণে রাত আড়াইটে বেজে গেছে। সেখানে পরীক্ষা করে দেখা যায় মেয়েটির ফুসফুসে জল জমে গেছে, তখন তাঁকে রেফার করা হয় নায়ার হাসপাতালে , যেটা আরও ৩০ কিলোমিটার দূরে। সেখানেই তাঁর গলা থেকে লালারস নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ঘন্টাখানেকের মধ্যে মেয়েটি মারা যায়। পরীক্ষার ফল আসে কোভিড-১৯ পজিটিভ। এই ঘটনার পরে ওই বস্তিতে যখনই তথ্য সংগ্রহের জন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা গিয়েছেন, তাঁরা কোনও সাহায্য পাননি। কেউ কোনও বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে এই মৃত্যুর পরে মেয়েটির স্বামী ছাড়াও আশপাশের পাঁচটি পরিবারের ৩২ জনকে স্থানীয় একটি স্কুলে কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় সাড়ে ছ হাজার মানুষের ওই বস্তিকে কন্টেইনমেন্ট জোন বলে ঘোষণা করে চারদিকে কড়া পাহারা বসানো হয়েছে, যাতে কেউ যথেচ্ছ ঢুকতে বেরতে না পারে।



                            ক্রমশ...

Wednesday, August 3, 2022

ছোট গল্প - নষ্ট মেয়ের সাত কাহন || লেখক - সুব্রত নন্দী মজুমদার || Short story - Nosto Meyer Satkahon || Written by Subrata Nandi Majumdar




 নষ্ট মেয়ের সাত কাহন 


            সুব্রত নন্দী মজুমদার 




আমি মোটেও জন্মেই নষ্ট মেয়ে হয়ে যাই নি, আমার মাও নষ্ট মেয়ে ছিল না। শুনেছি আমি খালাস হতেই আমার বাবাটা নাকি আর এক মেয়েছেলের হাত ধরে চলে গিয়েছিল কোথায়। আর ফিরে আসেনি। সেই বাপটাকে আমি কোনদিন চোখেই দেখি নি। 

রেল কলোনীর বস্তির একটা ঝুপড়িতে আমরা থাকতাম। মায়ের কাছে শুনেছি আমার বাপটা রেলস্টেশনেই কি সব কাজ করে যা রোজগার করত তাতে আমাদের দু’বেলার খাওয়া হয়ে যেত। কিন্তু বাপ রোজ সন্ধ্যেবেলা চুল্লু খেয়ে বাড়ি এসে মাকে পেটাত। আমি মায়ের পেটে এসে যাবার পর সে কিছুদিন শান্ত ছিল, তারপর আমি খালাস হতেই একদিন আরেকটা মেয়েছেলেকে নিয়ে সেই যে উধাও হয়ে গেল আর পাত্তা নেই। 

মা আগে কোন কাজ করত না। বাপের রোজগারেই আমাদের পেট চলত। বাপ চলে যেতে মা পড়ল অথৈ জলে, দেড়খানা পেটের সংস্থান চাই তো। রেল কলোনির এক বাবুর বাড়িতে মা রান্নার কাজ পেয়ে যাওয়াতে আমাদের চলে যেত। তা ছাড়া মাকে ওদের বাড়ি থেকে কিছু খাবার ও দিত। তাই পেটের ভাবনা আমাদের ছিল না। 

মা আমাকে কোলে নিয়ে বাবুদের বাড়ি যেত আর পাশে বসিয়ে নিজের কাজ করত। এমনি করে দিন চলতে লাগল বটে, কিন্তু বয়সটা তো চুপচাপ বসে থাকে না? বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমি ও গায়ে গতরে বাড়তে লাগলাম। 

কিন্তু ঐ গতরটাই হল আমার কাল। তাছাড়া আমি দেখতেও সুন্দরী, বাবুদের বাড়ির মেয়েদের মতই ফর্সা গায়ের রঙ। এই নিয়েও পাড়া পড়শিদের মধ্যে ফিসফিসানি চলত। মায়ের দিকে আঙ্গুল তুলে বলত রেল কলোনীর বাবুদের কারো সঙ্গে মা হয়তো লটর ফটর করত। তাই বাপটা পালিয়ে গেছে। আমার কিশোর বয়সে আমি যখন গায়ে গতরে লোকের চোখে পড়ার মত, তখন ঐসব কথা শুনতাম, কিন্তু ভাল করে বুঝতে পারতাম না। 

বড় হয়ে আমি বাবুদের বাড়িতে মায়ের কাজে সাহায্য করতাম। বাবু যে যখন তখন রান্নাঘরে এসে মায়ের সঙ্গে কথা বলার ছলে চেখে চেখে আমার বাড়ন্ত শরীরটাকে খেত, আমি না বুঝলেও মা সেটা বুঝতে পেরেছিল। 

বাড়ন্ত গড়নটাই আমার কাল হল। আমার বয়স সবে তেরো পেরিয়েছে। তখনি পুরন্ত আপেলের মত গোল গোল স্তন দুটো যেন গায়ের জামা ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চায়। সব বয়সের পুরুষরা জুল জুল করে আমার গোল স্তনের দিকে তাকিয়ে থাকে কেন বুঝবার মত বয়স আমার হয় নি। মা আমায় সেটা বুঝিয়ে দিল আর বাবুর বাড়িতে না যেতে বলে।  

যেদিন মা আমাকে বাবুর বাড়ি যেতে বারণ করল, সেদিনই বাড়ি ফিরে মা আমাকে প্রায় চ্যালাকাঠ দিয়ে মারতে আসে, ‘হতভাগীটা মরে গেলে আমার জ্বালা জুড়োত। একদিন না দেখেই বুড়ো হামড়া বাবুটা ছুক ছুক করতে থাকে। ইনিয়ে বিনিয়ে বলে, ‘কই গো, তোমার মেয়েকে দেখছি না আজ।‘ হতভাগী, গা টা একটু ঢাকা দিয়ে রাখবি তো?’ 

মায়ের কথা বুঝতে না পেরে আমি হা করে থাকি, তারপর নিজের বুকে হাত বুলিয়ে দেখি আপেলের মত গোলগাল বুকে স্তনবৃন্তের উপর হাত পড়তে গাটা কি রকম শির শির করে ওঠে। মা অবশ্য চ্যালা কাঠের সৎব্যবহার করে আমার বাড়ন্ত গড়নের ব্যাপারটা বোঝায় নি, কিন্তু বুঝতে আমি পারলাম পরের দিনই। 

বাবুর বাড়ি যাবার আগে সেদিন মা আমাকে পই পই করে বারণ করে গেল আমি যেন একদম বাড়ি থেকে না বেরোই। মা রোজ সকাল আটটায় বেরিয়ে যায় আর ফিরে আসে দুপুর দু’টোয়। বাড়িতে অবশ্য ঘড়ি নেই, সময় ঠিক করি আসা যাওয়া ট্রেনের হুইসেল শুনে। সেদিন মা বেরিয়ে যাবার পর আমি দরজা ভেজিয়ে ঘর গোছ গাছ করছিলাম। একটু পরে মা যেভাবে বলে গেছে রান্নার ব্যবস্থা করব। 

এমন সময় দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি বাবু মানে যাদের বাড়িতে মা কাজ করে, দাঁড়িয়ে আছেন হাসিমুখে। আমি চমকে গিয়ে মায়ের কথামত শাড়ির আঁচল ঠিক করে আমার পুরন্ত বুকদুটো ঢাকা দিই। বাবু ভেতর থেকে ছিটকিনি বন্ধ করে দিতে আমি মৃদুস্বরে বলি, ‘দরজা বন্ধ করছেন কেন?’ 

তিনি তেমনি হাসিমুখে আমার কাছে আরও এগিয়ে এসে আমার পিঠে হাত দিয়ে বলেন, ‘দুদিন যাস নি, তাই ভাবলাম দেখে আসি শরীর টরীর খারাপ হয় নি তো।‘ 

আমি আমার পিঠ থেকে তাঁর হাত সরিয়ে দেবার চেষ্টা করতে তিনি আমাকে আরো কাছে টেনে এনে গালে একটা চুমু খেয়ে বলেন, ‘আহা, ফুলের মত মেয়েটা, আর একটু যত্ন পেলে একেবারে পরীর মত দেখতে হত। ‘ 

আমি কি রকম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। বাবু আমাকে টেনে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে একেবারে আমার গা ঘেঁসে নিজে বসে একহাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরেন। আমার কি রকম অস্বস্তি হতে থাকে। তিনি বলেন, ‘ভয় কিসের? কেউ আসবে না, দরজা বন্ধ আছে।‘ বলে বাবু আমার ব্লাউজ খুলে দিয়ে আমার স্তনের চুচিতে মুখ দিয়ে কামড়ে ধরেন। আমি এই প্রথম বুঝতে পারলাম আমার বাড়ন্ত গড়নের জন্য মায়ের এত চিন্তা কেন। আমার বুকে শির শিরানি আর সেই সঙ্গে একটা ভাল লাগার অনুভূতি দেখা দিল। 

বাবু আমার সায়ার দড়ি খুলে দিতে আমি প্রথম আমার কুমারীত্ব হারালাম। যোনিতে সামান্য ব্যথা অনুভব করলেও একটা আনন্দের শির শিরানি আমার সমস্ত অঙ্গে ছড়িয়ে গেল। জোরে জোরে আমার নিঃশ্বাস পড়তে লাগল। বাবু আমার দু’টো স্তন আঁকড়ে ধরে কামড়ে খিচরে রক্ত বের করে দিলেন।  

আমি কোনমতে উঠে বসে ব্লাউসের বোতাম আটকাই। বাবু আমার পিঠে হাত দিয়ে বলেন, ‘ভয় 

পাচ্ছিস কেন, কিচ্ছু হবেনা, ‘ বলে তিনি পকেট থেকে একশ টাকা বের করে আমার হাতে দেন। তিনি বলেন, ‘রাখ, তোর যা ইচ্ছে কিনিস, মাকে কিছু বলিস না, আমি যে এসেছিলাম একথা ও না। দেখবি আমি তোকে কত কিছু দিই। মা যেন কিছু জানতে না পারে।‘  

সেদিন আমি বুঝতে পারলাম কিছু কথা আছে যা গোপন রাখতে হয়।  

কিন্তু কাউকে কি কিছু বলতে হয়? ধরা একদিন পড়ে গেলাম প্রথমে মায়ের কাছে তারপর রতনের কাছে। বাবু এর মধ্যে আরও দু’তিন দিন এসেছিলেন, আমাকে অনেক আদর আহ্লাদ করলেন, আঁচড় কামড় ও দিলেন। তারপর যাবার আগে বেশ কিছু টাকা আমার ব্লাউজের ফাঁকে বুকের মধ্যে গুঁজে দেন। মা যাতে দেখতে না পায়, আমি টাকাগুলো লুকিয়ে রাখি কুলুঙ্গিতে। মাঝে মধ্যে কিছু কিনে খাই। আমার কৈশোরুত্তীর্ণ মন এর মধ্যে খারাপ কিছু দেখতে পায় না। 

একদিন মা কুলুঙ্গিতে রাখা টাকা দেখতে পেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘এ টাকা কোথা থেকে এল?’ 

আমি বেমালুম বলে দিলাম ’কই, জানি নাতো। ‘ 

মা আমার চুলের মুঠি ধরে বলেন, ‘ বল শীগগিরই, নয়তো মেরে আমি তোর হাড় মাস এক করে দেব।‘ এই কথা বলে মা আমাকে একটা হ্যাঁচকা টান দিতে আমার গায়ের আঁচল সরে গিয়ে বুকেতে বাবুর কামড় ও আঁচড়ের দাগ বেরিয়ে পড়ে। দেখে মা থ’ হয়ে যায়। গায়ের কাপড় সরিয়ে গায়ে পিঠে সব দাগ দেখে বলে, ‘ হারামজাদী, কাকে ঘরে ঢুকিয়েছিস বল।‘ 

মার খেয়ে খেয়ে আর না পেরে আমি মাকে সব বলে দিলাম। মা রেগে উনুন থেকে চ্যালাকাঠ তুলে আনে আমাকে মেরে ফেলার জন্য। কিন্তু হল উল্টোটা। মা নিজেই মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে মরে গেল। বস্তির লোক সবাই ছুটে এল। আমি কিছু বুঝতেই পারলাম না। রতন গিয়ে রেল কলোনীর সেই বাবুকে ডেকে নিয়ে এল।  

বাবু আমাকে খুব সাহায্য করলেন। মায়ের কাজ করা থেকে শেষ পর্যন্ত সব কিছুর ব্যবস্থা তিনি করে দিলেন। কাজ কম্ম শেষ হয়ে যেতে বাবু আমাকে আদর করে বলেন, ‘ কিচ্ছু ভাবিস না, আমি আছি। যখন যা দরকার হবে আমায় বলবি। আমি ও রোজ একবার তোর খোঁজ নিয়ে যাব।‘ ‘ 

তখন থেকেই আমি পুরোপুরি নষ্ট মেয়েমানুষ হয়ে গেলাম। বাবু আমাকে দখল করে নিলেন, আমাকে মানে আমার শরীরটাকে। 

ও, হ্যাঁ, রতনের কথা বলছিলাম না। ছেলেটা আমাদের পাড়ায় থাকে। ছোটবেলা থেকেই আমরা একসঙ্গে খেলাধূলা করেছি। মা চলে যাবার পর সে একদিন আমার কাছে এসে বলে, ‘স্বপ্না, ও বলতেই ভুলে গেছি, যদিও মা আমাকে হতচ্ছারী, পোড়ারমুখী এইসব নামে ডাকত, আমার একটা সুন্দর পোষাকী নাম ছিল,স্বপ্না আর মায়ের নাম ছিল সীমা। । ভুলেই গেছি সেটা। রতন এসে বলে, ‘স্বপ্না, তোকে অনেকদিন ধরে একটা কথা বলব ভাবছি। তোর মায়ের সামনে বলতে ভরসা পাই নি। এখন তো তোর মা নেই, তাই বলছি।‘   

আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কি কথা রে?’ 

সে একটা ঢোঁক গিলে বলে, ‘ বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করেছি, রেল কলোনীর সেই বাবুটা তোর বাড়িতে খুব যাতায়াত করে।‘ 

আমি ‘ ও কিছুনা’ এইরকম ভাব দেখিয়ে বলি, ‘হ্যাঁ, বাবু মায়ের খোঁজ নিতে আসত।‘ 

‘দেখ, আমি বোকা নই,’ রতন বলে, ‘সব বুঝি। তোর মা নেই, এখন তোকে রোজগার করতে হবে। শুধু একটা বাবুতে চলবে কেন, আমি তোকে অনেক বাবু জোগাড় করে দেব। প্রচুর টাকা পাবি। আমি সামান্য কমিশন নেব। ‘  

আমি বুঝলাম ধরা পড়ে গেছি, তাও বলি,’ তুই কি বলছিস আমি বুঝতে পারছি না। বাবু একটু খোঁজ খবর নিয়ে যান, এতে কি হয়েছে। ‘     

রতন বলে, ‘দেখ আমাকে এইসব বলে ভোলাতে পারবি না। আমাদের বস্তিতে আরও দু’চারজন তোর মত মেয়ে আছে আছে যারা এই ব্যবসা করে ভাল কামায়। তুই আমাকে সঙ্গে রাখলে তোর লাভ হবে। ‘

আমি ততদিনে বুঝতে পেরে গেছি যে আমি কোথাও শরীর না বেচে কাজ করতে পারব না। তাছাড়া রতনের মত কেউ থাকলে সুরক্ষাও হবে। আমি চুপ করে আছি দেখে রতন বুঝতে পারে আমি রাজি। সে উঠে চলে যাবার আগে বলে, ‘বিকেলের দিকে একটু সেজে গুজে থাকবি, আমি আসব। একটা ভাল দেখে গন্ধ কিনে দেব, গায়ে মাখবি, বাবুরা গন্ধ খুব পছন্দ করে।‘ 

আম রতনকে বলেছিলাম যে আমি রোজ একজনের বেশি বাবু নেব না। আমার শরীরটা দেখেই বাবুরা হামলে পড়ে, সেই গতরটাই আজ আমার রোজগারের উপায়। রেল কলোনীর সেই বাবু ও মাঝে মাঝে আমার জন্য শাড়ি, ব্লাউস সাবান, স্নো, পাউডার গন্ধ নিয়ে আসেন। তারপর আমার শরীরটাকে উপভোগ করে চলে যান। 

আমার নষ্ট হওয়ার পথ মসৃন হয়ে গেল। বুঝতে পেরে গেছি, আমি শুধু একা নই, এরকম অনেক মেয়েই আছে শরীর বেচে খায়। একটু সমস্যা হত যারা প্রচুর মদ খেয়ে আসত। তারা শরীরটাকে খাবলে খুবলে শেষ করে দিত। অবশ্য তারা যেমন ভোগ করত তেমনি আদায় ও করে নিতাম সেই রকম। কেউ যদি হোটেলে নিয়ে যেত, টাকা অনেক বেশি দিত। অনেকে আবার অন্ধকারে গাড়ির মধ্যে বসে কাজ সেরে নিত। বেশির ভাগই আমার ঘরে আসত। 

ভেবেছিলাম এইভাবে গতর দেখিয়ে দিন গুজরান করব, কিন্তু আমার কপালে লেখা ছিল অন্য রকম। একদিন সন্ধ্যেবেলা রতন এক শাঁসালো খদ্দের পাকড়াও করে আমাকে ডেকে তার গাড়ির কাছে নিয়ে এল। বাবুটি মনে হল প্রচুর মদ খেয়ে এসেছে। গাড়ি থেকে বেরিয়ে আমার হাত ধরে প্রথমেই আমার বুকে একটা চুমু খেয়ে নিজের আঙ্গুল থেকে একটা আংগটি খুলে আমার হাতে পরিয়ে দিয়ে বলে, ‘চল তোর ঘরে যাব।‘ 

রতন তার হাত ধরে এগিয়ে যায় আর আমি আস্তে আস্তে পেছনে আসতে থাকি। আমার ঘরের কাছাকাছি আসতে রতন হাত দেখিয়ে আমাকে থামতে বলে। আমি দাঁড়িয়ে আবছা অন্ধকারে দেখি কে একটা লোক আমার ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। রতন কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘এখানে কি চাই।‘ 

লোকটা মুখ তুলতে দেখি বয়স্ক মত লোক, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ময়লা পোষাক রতনকে বলে, ‘আমি সীমার কাছে এসেছি।‘ 

‘সীমা?’ রতন বলে, ‘সেতো নেই’। 

‘কোথায় গেছে?’ 

‘সে মারা গেছে।‘ 

শুনে লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, ‘মারা গেছে? তার কোন ছেলে বা মেয়ে নেই?’ রতন আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কি দরকার আপনার?’ 

কৌতুহলবশে আমি এগিয়ে আসি। বুড়ো লোকটা হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি ভাবলাম বুড়ো বয়সে শরীর চাখবার শখ হয়েছে । আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আপনার সীমার সঙ্গে কি দরকার ছিল? ‘ 

‘সীমার কোন ছেলে মেয়ে নেই?’ সে আবার জিজ্ঞেস করে। 

‘আমি সীমার মেয়ে,” আমি বলি।  

‘তুমি সীমার মেয়ে?’ বলে লোকটা আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। রতন গিয়ে তার মাথাটা তুলে বলে, ‘কি হয়েছে? আমি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে এক গ্লাস জল নিয়ে আসি। সেই বাবুটা গতিক বুঝে চলে যায়। আমি লোকটার চোখেমুখে জল ছিটিয়ে দিতে সে চোখ খুলে আমার হাত দুটি ধরে বলে, ‘আমি তোমার বাবা।‘    


Monday, August 1, 2022

ছোট গল্প - কবিতার দেশে || লেখক - বৈদূর্য্য সরকার || Short story - Kobitar dese || Written by Boidurya Sarkar


 


কবিতার দেশে

বৈদূর্য্য সরকার



মেট্রো স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নীলাঞ্জন । শুক্রবার সন্ধে সাড়ে সাতটা । এই সময় রিয়া ফিরবে গানের ক্লাস থাকে । এখনও রিয়া যে নিয়ম করে গানের ক্লাসে যায় সেটাই আশ্চর্য ।  নীলাঞ্জন নিজে তো পারেনি ।  স্বীকৃতি নেই, কতদিন শিল্পচর্চার উৎসাহ ধরে রাখা যায় !

নীলাঞ্জন খেয়াল করেনি – আশপাশ কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেছে । অসময়ের বৃষ্টিতে এমন হয়। সবকিছু থম মেরে থাকে । লোকজন নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলেও একজন অশক্ত চেহারার লোক সামনে এসে পড়েছে । আশ্রয় পাওয়ার ভঙ্গিতে ওর বাঁ হাতের কবজি চেপে ধরল । মুখটা চেনা ঠেকছে বলেই বিরক্তি প্রকাশ করল না নীলাঞ্জন। লক্ষ্য করল, লোকটার বুড়ো আঙুলটা কেমন যেন বিকৃত । হাতুড়ে চিকিৎসকের অস্ত্রোপচারের ফল বলে মনে হয়।

লোকটার পরনে পাজামা পাঞ্জাবি কাঁধে ঝোলা । কোথায় যাবে ? বুঝতে পারল না নীলাঞ্জন । তবে তার পক্ষে হাত ছাড়িয়ে নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না এই মুহূর্তে । ভাবল, কাছেই হয়ত বাড়ি । একটু এগিয়ে দিলে ক্ষতি কি ! রিয়ার আসতে এখনও খানিকটা দেরি আছে । অফিস থেকে বাড়ি না ফিরে একেবারে রিয়ার সাথে ফিরবে বলে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকে । দেখে সন্দেহ করার কিছু নেই, মধ্যত্রিশের ছাপোষা একটা লোকের জীবনে আর কোন গল্প বাকি থাকতে পারে ! সেই একইভাবে অফিসের কাজ, ঘর সংসার বাজার দোকান । উন্নতির আশা নেই। দেশবিদেশের গপ্পো নেই, কবিতার খাতা ফুরিয়ে গেছে । দু’চারটে বইপত্র বেরিয়েছিল বটে, তা কে আর মনে রেখেছে ! বড় প্রকাশনার দরজা খোলেনি তার জন্যে, উৎসবেও কেউ কবিতা পড়তে ডাকেনি । বিশ তিরিশ হাজার খরচ করে বই ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠিতদের অনুচর হয়নি সে । আজকাল দেখছে শিল্পসাহিত্যের জগতে পয়সাওলা লোকেদেরই কদর । অবশ্য মহিলাদের খানিক সুযোগসুবিধে আছে ।

নীলাঞ্জনের খেয়াল পড়ল, কতদূর হাঁটছে তারা ! কোথাকার রাস্তা ? ভাল ঠাওর করতে পারছে না ।  রাস্তাঘাট বেশ শুনশান । যেন ছবির মতো শহর একটা । বাড়িঘরের চেহারাও পালটেছে । তাকে দাঁড় করিয়ে বুড়ো লোকটা কোথায় যে গেল !

নীলাঞ্জন দেখল, একটা বড় নীল দরজা । এগোতে কোথা থেকে ভেসে এল – পাসওয়ার্ড ? ঘাবড়ে গিয়ে ফেসবুকের পাসওয়ার্ড বলতেই হড়াস করে খুলে গেল দরজা । 

প্যারালাল দুনিয়া । অনেকটা উন্নত । বেশ এডিট করা সব চেহারা । রাস্তাঘাট বাড়িঘরে বেশ ছিরিছাঁদ আছে । তবে খেয়াল করলে বোঝা যায়, সব একরকম । অনুকরণের দুনিয়া যেন । এখানে বেশ একটা হেমন্তের আবহাওয়া । নীলাঞ্জন বেশ খুশি মনেই ঘোরাঘুরি করছিল । লোকজন, চায়ের দোকান নেই বলে যে বিরক্ত লাগছিল না তা নয় ।  রাস্তায় সব গাড়িগুলো সটাসট চলে যাচ্ছে । বাসের দেখা পায়নি । কিন্তু যাবে কোথায় ! বের করে দেখল ফোনটাও বিগড়েছে । টাওয়ার নেই ।

একজনকে দেখে চমকে উঠল নীলাঞ্জন । কলেজের একটা ছেলে। আজকাল খুব মাতব্বর হয়েছে দেখতে পায়। সবটাই যে জনসংযোগ, ওকে দেখেই বুঝে গেছে নীলাঞ্জন । এখানে কোথায় যাচ্ছে ? ওর যাওয়ার ভঙ্গিটায় যে বেশ একটা গোপনীয়তা আছে, ভালই বুঝেছে নীলাঞ্জন । কিছু না ভেবেই ওকে ফলো করতে লাগল নীলাঞ্জন । খানিকটা গিয়ে একটা বড় সাদা বাড়ির সামনে এসে থামল । কায়দা করে ‘কবিতার দেশ’ লেখা আছে দরজার মাথায় । খানিকটা কৌতূহলবশত ঢুকে পড়ল বাড়িটায় । বোঝা যাচ্ছে, এখানে অনেক লোকের জমায়েত।

একটা মিশ্র ধ্বনির মধ্যে ঢুকে পড়েছে নীলাঞ্জন । বহু ছেলে বহু মেয়ে । যদিও অনেকের ভালই বয়স হয়েছে । তবে সবার ভাবভঙ্গিতে কচি সাজার চেষ্টা । সাজপোশাক দেখেই বোঝা যায়, সবাই বেশ বড়লোক । আড়ালে বসে সব লক্ষ্য করছিল নীলাঞ্জন । বুঝতে পারলো এ সভার আরাধ্য সরকারি কবি । সবাই তার অনুসারী । ভিড়ের মধ্যে পরিচিত মেয়েদের চোখে পড়ল । তারা এখন ওকে পাত্তা দেয় না । সবাই পুরস্কার পেয়েছে গুরুঠাকুর ধরে। শোনা যায়, আগের শাসকের হয়ে কবি লড়াই শুরু করেছিলেন । তারপর এই শাসকের জন্যে ব্যবহার করছেন তার দলবল । শেষপর্যন্ত উপহার পেয়েছেন এই কবিতার দেশ ।

তাকে সর্বদা ঘিরে থাকে একদঙ্গল মেয়ে । তাদের টানে আসে একদল ছেলে । আবার তাদের পেছনে অনেক ছেলেমেয়ে। নরক গুলজার একবারে । দেওয়ালে টাঙানো আছে বিখ্যাত সব ছবি ।

এখানে এসে নীলাঞ্জন বুঝতে পারছে, ওর দেখা সভাগুলোর মতো এখানেও যারা কবিতা পড়ার তারা পড়ছে আর বাকিরা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব খুনসুটি করছে । সে স্বগতোক্তি করল- সব জায়গায় একই অবস্থা ।

ওর পাশের ছেলেটার সাথে টুকরোটাকরা কথাবার্তা হচ্ছিল নীলাঞ্জনের । ছেলেটাকে অবশ্য একটু বিক্ষুব্ধ বলে মনে হল । কচি অবোধদের পেয়ে এখন তাদের আলো খেতে দিচ্ছে না দাদা। সে ফিসফিস করে নীলাঞ্জনকে জানালো, তারাও দলবদল করতে জানে... শিখেছে কবিবরের থেকেই ।

হঠাৎ দেখা গেল, সভা একদম শান্ত হয়ে এল । কবি স্বয়ং পড়বেন । তার আগে বেশ খানিক প্রশস্তি । পড়াটুকুর অপেক্ষা, তারপর আবার সমস্বরে উচ্ছ্বাস । যদিও নীলাঞ্জনের মনে হল – এ যেন কবিতা নয় বন্দুক থেকে গুলি ছোঁড়া । কিন্তু সেসব ভাবার অবসর নেই । নানারকম হইচইয়ের মধ্যে ছেলেটির সাথে উঠে পড়ল নীলাঞ্জন। ছেলেটা বেশ ঘোড়েল, এবার উল্টোদিকের আসরে যাবে । নীলাঞ্জনের আপত্তি নেই কিছু । তার তো যাওয়ার কোনও জায়গা নেই ।

বুঝতে পারল, একই বিল্ডিংয়ের দু’টো দিকে দু’দলের আস্তানা । নীলাঞ্জনের মনে হল, সব বিরোধিতাই প্রতিষ্ঠানের গায়ে গায়ে থাকে ।  তবে এখানে ভিড় অপেক্ষকৃত কম । কোথাও যেন একটা অশ্রুত সঙ্গীত বাজছে বলে মনে হল নীলাঞ্জনের । লোকজনের কথাবার্তায় সের’ম একটা ভঙ্গি । সমে এসে সব থমকে যাচ্ছে । ছেলেটাকে বেশ হেঁহেঁ করতে দেখল নীলাঞ্জন । 

এ হচ্ছে গোঁসাইয়ের আখড়া । কোমলরসের কারবার সব । শোনা গেল, নতুন রানি আর পুরনো রাজার বিরহকাব্য লিখে কবি নাম করেছিলেন । এখন হয়েছে সমস্যা । দুই কবি অনুগতদের নিয়ে এমন প্রশস্তি শুরু করেছে, দু’জনকেই সৌখিন দু’টো পদে বসিয়েছেন রানি। একই জায়গায় পাশাপাশি দু’টো আখড়া ।  

তবে একটা ভাল ব্যাপার, নীলাঞ্জনকে কেউ খেয়াল করেনি । এক অর্থে ভালই হয়েছে । খানিকটা আশাহত ভঙ্গিতে মন্থর পায়ে একা নীলাঞ্জন বেরিয়ে এল বাড়িটা থেকে । রাস্তায় নেমে এলোমেলো একা হাঁটতে লাগল । 

হঠাৎ ওর মনে হল, এতক্ষণ হয়ে গেছে তবু তো খিদে তেষ্টায় অনুভূতি হচ্ছে না বিশেষ । এ আবার কীর’ম জায়গা রে বাবা ! একটু পরে খেয়াল করে দেখল, শীত গরমের বিশেষ কোনও তফাত নেই এখানে । এতক্ষনে বেশ ঘাবড়ে গেছে নীলাঞ্জন । সত্যিই তো, এ কোন দুনিয়ায় এসে পড়ল ? এসে পড়লই বা কি করে ! সবই তার চেনা দুনিয়ার মতোই কিন্তু যেন একটু আলাদা । 

এখানে সবাই কি এসব নিয়েই মেতে থাকে সর্বদা ? অন্য কাজকর্ম না করে পেট চলে কেমন করে ! বাজারের অবস্থা তো এমনিতে তো ভাল নয় । চাকরিবাকরি করেই নুন আনতে পান্তা ফোরায়... না করলে কী হবে তা কল্পনা করার চেষ্টা করে দেখেনি নীলাঞ্জন । 

-চলো, আর কতক্ষণ তোমার জন্যে দাঁড়াবো !

একটা বেশ আরামদায়ক আবহাওয়ায় পার্কের বেঞ্চিতে বসে নীলাঞ্জনের একটু তন্দ্রা মতো চলে এসেছিল । ঠিক তখনই চোখ রগড়ে উঠে বসে দেখল, সেই বুড়ো কোথা থেকে হাজির হয়েছে । নীলাঞ্জন খানিকটা অভিমানের সুরে জিজ্ঞেস করল, কোথায় গেছিলেন আমাকে ফেলে ! লোকটা বৃদ্ধ ঠাকুরদার মতো মমতায় বলে উঠল, তোমার মতো ছেলেছোকরাদের জড়ো করে এনে সব জোগাড়যন্ত্র করতে দেরি হয়ে গেল । আমি একা আর কতদিক সামলাবো ! তারপরেই কথা থামিয়ে উনি তাড়া দিয়ে নীলাঞ্জনকে নিয়ে চললেন । সামনের একটা ভাঙাচোরা দরজা দিয়ে ঢুকতে যেন বদলে গেল সবকিছু ।

আকাশে মেঘ করেছে । গুমোট একটা অবস্থা । এতক্ষণের অনাহারের পর এবার শরীর যেন কিছু চাইছে । ব্যাপারটা বুঝতে পারলো, বুড়ো মানুষটা । বলল, একটু জিরিয়ে কিছু মুখে দেবে চল । ওরা গিয়ে পৌঁছোল, একটা পুরনো সরাইখানার মতো একটা জায়গায় । সেখানে বেশ ভিড় । হৈহল্লা করছে লোকজন । অনেক বেঞ্চ পাতা, সামনে লম্বা টেবিল । মাথার ওপর বিরাট একটা টিনের শেড । আবছা অন্ধকার ।

খিদের মুখে ভাত ডাল পোস্ত দিয়ে দিব্যি কাজ চলে যায় । টিনের শেডে ততক্ষণে জলতরঙ্গ বাজছে । চারদিকে গান পান মিলিয়ে যেন একটা উৎসব । নীলাঞ্জনের মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল, অনেকদিন পর । অন্ধকার চোখ সয়ে এলে নীলাঞ্জন দেখল, পরমপিতার একটা ধূসর ছবি । একদিকে নিঃশব্দে বসে আছে বাবরি বাগিয়ে একজন, একজন তিমিরে । একজন ফরসা চেহারার লোক তার দিকে হেসে বলল, আমাকে লতিয়ে ধরবে না ! আরও কত ভাঙাচোরা চেহারার লোক কত কী বলছিল, তাদের গুঞ্জন থামল যখন প্রবল দাপট নিয়ে এসে দাঁড়ালেন টলটলায়মান প্রধান কবি... বাকি সব ৎ। তার পাশে সেই বুড়ো লোকটা । আরও অনেক লোকজন । একজন আন্তর্জাতিক, একজন দার্শনিক, একজন রঘু ডাকাত, আরেকজন বসন্ত মস্তান । সবাই বেশ রোগাভোগা হলেও একরোখা চোখমুখ ।

বোঝা গেল, প্রধান খুব রেগেছে নকল কবিতার দেশের ওপর । পাশের লোকটাকে বলছে, তোমার জন্যেই আজ এতো কবি ! সেজন্যেই এতো দলাদলি গলাগলি । সবাই সমস্বরে সমর্থন করল । বুড়ো লোকটা বিড়বিড় করে বলছিল, আমার মতোই সব গরীব ঘরের ছেলে, তাই জায়গা করে দিয়েছিলাম । লিখছে, খারাপ কাজ তো কিছু করছে না ! তাতে প্রধান ধমক দিল । সেই তিমিরে বসা লোকটা বলে উঠল, কাপালিকের মতো জীবন না কাটালে লেখা হয় না । কাব্যের দাবানলে আহুতি দিতে হয় সবকিছু, সুন্দর দেখতে বাবরি বলে উঠল ।

নীলাঞ্জনের মনে হল, সে অনেকদিনের পুরনো হারানো সভায় এসে পড়েছে । এবার দল বেঁধে যাওয়া হবে রাত্রি শাসন করতে । নেতৃত্ব দিলেন প্রধান কবি । সবাই উচ্চারণ করছে বীজমন্ত্র, আমি স্বেচ্ছাচারী !

সাজানো রাজপথ দিয়ে সদর্পে যেতে লাগল উলোঝুলো দলটা । ক্রমে সেই দল কিছুটা পথ পেরিয়ে এসে থমকালো সেই সাদা বাড়ির সামনে । দৃশ্য দেখে ভেতরের লোকজনের ভয়ার্ত চিৎকার বেশ শোনা যাচ্ছে । একদল ভাঙাচোরা লোকের কলমের জোর এতদিনে বুঝেছে তারা । নীলাঞ্জনের বুকের ভেতরটা যেন বেশ শান্ত হয়ে এসেছে, ধনুকের ছিলা শেষবারের জন্যে যেমন থমকে যায় ।

তারপর উড়তে লাগল শব্দবাণ । শুরু করলেন প্রধান স্বয়ং । একে একে সবাই । তীব্র শব্দের আঘাতে কাঁপতে লাগল সাদা প্রাসাদ । চারিদিকে যেন আগুনের হলকা । সেখান থেকে নীলাঞ্জন কুড়িয়ে পেল, আধপোড়া একটা পাণ্ডুলিপি – তাতে তার নাম লেখা ।

 


ঠিক তখনই নীলাঞ্জনের ফোনটা বেজে উঠল । নীলাঞ্জন চমকে উঠে ফোনটা ধরতে একটা রিনরিনে মহিলা কণ্ঠ । তিনি জানাচ্ছেন, তেরো বছর সাত মাস ন’দিন আগে জমা দেওয়া তার পাণ্ডুলিপিটি মনোনীত হয়েছে । প্রকাশ পাবে মেলায় । তখনই নীলাঞ্জন দেখতে পেল রিয়া আসছে রাস্তা পেরিয়ে ।

তাকে কাছে আসতে দেখে দীর্ঘদিন বাদে নীলাঞ্জনের মুখে সম্মতিসূচক হাসি ফুটে উঠল । রিয়া নিশ্চিন্ত হল। ভাবল, নতুন ওষুধটা তাহলে কাজ করছে ।

Sunday, July 31, 2022

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -13


 


পাঁচ 


পরদিন রৌদ্রোজ্জ্বল প্রভাত। আমার চোখের জল তখনও শুকায়নি । সারা রাত কেঁদে কেঁদে মুখাবয়ব বিকৃত করে তুলেছিলাম । শুষ্ক পুষ্পের ন্যায় মুখের রূপলাবণ্য নষ্ট হয়ে গেছিলো । মনে মনে বিদ্রোহী হলাম , কোন মতেই আমি দেহপসারিনী হয়ে সমস্ত নারী সত্ত্বাকে বিসর্জন দিতে পারব না। 


পুরুষের অত্যাচার কোন মতেই সহ্য করতে পারবো না । সেই সময় আমি আত্মহননের কথা চিন্তা করছিলাম । জানবো কলকাতায় চাকরী করতে এসে ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছি । বাবার জন্য মনটা আরো কেঁদে উঠল ! তবুও আমি মরবো। 

ক্ষণিকের জন্য সব কিছু মায়া ত্যাগ করে লুকিয়ে গলায় ফাঁসি দিতে উদ্যত হলাম । কিন্তু আমার শুভাকাঙ্খীনী শ্যামলীদি আমাকে মৃত্যু হতে বাঁচালেন । নইলে বেশ সুযোগই পেয়েছিলাম আত্মহত্যা করার । যেই ঝুলে পড়ার চেষ্টা করেছি , কোথা হতে যে তিনি ছুটে এলেন জানতে পারিনি । ভেতরে প্রবেশ করে আমাকে ও অবস্থায় দেখে রাগে অভিমানে দারুন জোরে বাম গালে একটা চড় মেরে বললেন , মরতে চাইছিস না ? গত রাত্রে কি বললাম ? আমাদের শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তাই দেখতে হবে। 

আমি মুখ চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকি । কিছুক্ষণ পর সস্নেহে আমাকে বললেন , জানিস ? ইচ্ছে করলে আমিও মরতে পারতাম , এই বাম হাতের মধ্যমা অঙ্গুলিতে আংটিটা দেখছিস্ এটা হীরার । যখন খুশী মরতে পারতাম । কিন্তু মরব না প্রতিশোধ নেব । সেই অপেক্ষায় বেঁচে আছি । বিশ্বাসঘাতকার দন্ড পল্টু কে পেতে হবে । সহসা তার চোখ দুটো হতে যেন আগুন বেরিয়ে আসতে লাগলো। 


একটু পর নিজেকে শান্ত করে পুনরায় বলল , তুই পল্লীর মেয়ে , এতো ছলাকলা বুঝিস্ না । সকলকে বিশ্বাস করিস বলে তো রন্টুকে দাদা বলে গ্রহণ করেছিলি , আর আমি ? কলকাতা শহরের শিক্ষিতা মেয়েও পল্টুর চালাকি বুঝতে পারিনি । বুঝতে পারিনি তার বিজনেস , বুঝতে পারিনি তার শাট্য ও বিশ্বাসঘাতকতাকে । সরল অন্তঃকরণে পল্টু কে অনুসরণ করেছিলাম । এমনকি ওর জন্য দেবতুল্য বাবা ও দাদাকে ত্যাগ করতে কুণ্ঠাবোধ করিনি। 

তথাপি -শ্যামলীদিদির চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বেরুতে থাকল । রাগে অভিমানে ও উত্তেজনায় তার অধরকে দাঁত দিয়ে চেপে ধরলো । আমি আনত মুখে স্থির হয়ে বসেছিলাম । এক সময় শান্ত হবার পর বললেন , সমস্ত ঘটনা না প্রকাশ করলে বুঝতে পারবি না । হয়তো এই কাহিনী শুনে মনকে একটু হালকা করতে পারবি । আর আমিও তোর কাছে প্রকাশ করে সাময়িকভাবে শান্তি পাবো । শ্যামলীদি বলতে শুরু করলেন।

 বি.এস.সির পরীক্ষার পর বাড়ীতে বসে আড্ডা দিত শ্যামলী । একদিন আবদার করে ওর বাবা বললেন , মিছেমিছি বাড়ীতে বসে কাজ নেই । তার চেয়ে তোর দাদার চেম্বারে যোগ দিলে ওর অনেক উপকার হবে । ওকথা শুনে তার মন আনন্দে নেচে উঠলো । কারণ শ্যামলী জনসেবায় নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে পারবে বলে। 

ধীরে ধীরে চিকিৎসা বিদ্যার বহু কাজে পারদর্শীতা অর্জন করল । দাদা সুভাষবাবু ভীষণ ভালোবাসতেন ও অহংকার করে বলতেন , শেষ পর্যন্ত শ্যামলী তার মতোই একজন ডাক্তার হয়ে উঠবে । কিন্তু শ্যামলীর এম.এস.সি. পাস করার ভীষণ ইচ্ছে। 


একদিন কথার ছলে বলল , ডাক্তার হয়ে আমার কাজ নেই । এম.এস.সি. পড়ে অধ্যাপিকা হব । কাজের মধ্যে ডুকে থেকেও ভাই বোনের তর্কবিতর্ক চলত । এভাবে কয়েকটা মাস সুন্দরভাবে কেটে গেল। 

একদিন ওর দাদার অনুপস্থিতিতে চেম্বারে একজন বলিষ্ঠবান যুবকের আবির্ভাব ঘটল । তার পরিচয় তিনি একজন Medical Representative, গৌরবর্ণ চেহারা,
মুখশ্রী বেশ সুন্দর , সুঁচালো নাক , করুণ চাহনী , ভূ - গুলো যেন কোন মৃৎশিল্পী দিয়েছেন । মুখে মিষ্টি হাসি । ওর চেহারা দেখে এক অজানা আকর্ষণে ওর প্রতি হয়ে উঠেছিলো শ্যামলীদি। মনে হয়েছিলো তার হারানো প্রেমিককে যেন ওর মধ্যে খুঁজে পেলেন। চেহারার কোন পার্থক্য নেই। মনে হলো ওর যমজ ভাই যেন ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তার ডাকে চমকে উঠলো, সুভাষবাবু আছেন?

দাদা বাইরে গেছেন।

আজ ফিরবেন? 

না, কোন দরকার থাকে তো বলে যেতে পারেন।

দরকার মানে , এই মাসে এই সব ঔষধগুলো বের হয়েছে । ব্যবহার করতে বলতাম। আমাদের কাজ তো বুঝতে পারছেন। 

যদি আপত্তি না থাকে আপনার শ্যাম্পলগুলো দিয়ে যান দাদাকে দেব । ভদ্রলোক কাল বিলম্ব না করে ঔষধের উপকারিতা বুঝিয়ে বললেন । ওর মধুক্ষরা বানী আমার তৃষিত প্রাণে শান্তির বারি সিঞ্চন করল। ওর কথাগুলো শুনে ওকে বিজ্ঞ বলে মনে করল। 

তার নাম ঠিকানা জানতে চাইলে পর তিনি একটা Identity Card দিলেন । ওতে লেখা পি . বিশ্বাস ও নীচে ঠিকানা । তার কাজ শেষ হবার পর বিদায় নেবার জন্য ছা ছটপট করতেই শ্যামলীর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো।

যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব ? তিনি বললেন।

স্বাচ্ছন্দে বলতে পারেন।

আপনার কোন যমজ ভাই আছে?

 না , আমার কোন ভাই বা বোন নেই । পিতা মাতার একমাত্র সন্তান আমি । কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন করলেন কেন বলুন তো?

একটু লজ্জায় পড়ল শ্যামলী । একটু আমতা আমতা করে বলল শ্যামলী , ঠিক আপনার মতো একজন লোককে দেখেছিলাম । তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম।

আচ্ছা আজ উঠি, হাতে অনেক কাজ।

অনিচ্ছা সত্বেও তাকে বিদায় সম্বৰ্দ্ধনা জানালো শ্যামলী। তিনি অদৃশ্য হবার পর শ্যামলী বিগত জীবনের ফেলে আসা দিনগুলির স্মৃতি তাকে উতলা করে তুলল । বাঁধ ভাঙ্গা জলের মতো আমার অবরুদ্ধময় প্রেমের বন্যা গতিময় হয়ে উঠল।

মনে পড়ল সলিলের কথা । সলিল আমার কলেজের ক্লাসমেট , একই সাথে পড়াশুনা করতাম । ওকে দেখতে ঠিক পি . বিশ্বাসের মতই । সলিলের ভালোবাসা আমার অজ্ঞাত অন্ধকারাচ্ছন্ন পথকে যেন আলোক বর্তিকা দেখিয়ে উদ্ভাসিত করে তুলেছিল। কিন্তু বিধাতার অমোঘ বিধানে কালবৈশাখী ঝড়ে আমাদের সুখের নীড় গেল ভেঙ্গে। আমাদের রঙীন আশা ও স্বপ্ন মলিন ধূসরে পরিণত হলো। বিবর্ণ হলো আমাদের গভীর ভালবাসার কথা। ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে সেিলর জীবন, সমাধিতে পরিণত হল। সলিলের কথা মনে আসতেই কিছুক্ষণের জন্য ঐ স্বপ্ন বিভোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। কোন কাজেই মন বসছিল না তার। ওর সদা সর্বদা মন দৌড়াতে থাকল।




                                 ক্রমশ...

Saturday, July 30, 2022

ছোট গল্প - অবশেষ সূর্যোদয় || লেখক - রানা জামান || Short story - Obosese Suryaudai || Written by Rana Zaman


 


অবশেষ সূর্যোদয়

রানা জামান




অপেক্ষার উত্তাপে আমন্ত্রিত অতিথিদের মেজাজ এখনো তপ্ত হয়নি তেমন। দুপুর দুটো বাজলেও বরপক্ষ এখনো আসেনি। পুরুষদের ক্ষিধেয় পেট চো চো করলেও উচ্ছল মেয়েদের দেখে তেমন মনে হচ্ছে না। ওরা কণেকে ঘিরে ঠাট্টা-তামাশায় মজে আছে। হাসি তামাশায় ক্ষুধা এড়ানো গেলেও তৃষ্ণা এড়ানো যায় না; বরঞ্চ গলা শুকিয়ে যায়। দু'জন তরুণী নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে পানি আনতে যাচ্ছে খাবারের কোণায়। 

কণেপক্ষের আমন্ত্রিত অতিথিদের কতক খাবার টেবিলে বসে গল্প করছে, কতক এদিকওদিক ঘুরাঘুরি করছে, কেউবা দূরে গিয়ে ধূমপান করছে। তাঁবুর বাহির থেকে দুজন যুবক ওদের পথরোধ করে দাঁড়ালো। 

এক যুবক জিজ্ঞেস করলো, বাহ! খুব সুন্দর তো! খিদা লাগছে?

একটা মেয়ে জবাব দিলো, পানি আনতে যাচ্ছি। 

অপর যুবক বললো, তোমরা কষ্ট করে এদিকে আসলা কেনো! আমদের বললেই পানি আইনা দিতাম!

অপর তরুণী বললো, আপনাদের চিনি না, জানি না! আপনাদের পানি আনতে বলবো কেনো? 

তরুণী দু'জন যুবকদ্বয়কে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। যুবক দুটো উড়ো চুমু ছুড়ে দিলো ওদের দিকে। তরুণী দু'জন দুই বোতল পানি সংগ্রহ করে অন্যদিক দিকে চলে গেলো কণের কাছে। মিনিট দশেক পরে আরো দুই তরুণী ঐপথে পানি আনতে গেলে সেই যুবক দুটো ওদের পথ আটকে বিভিন্ন ধরনের ঠাট্টা বিদ্রুপ করতে লাগলো। এক সময় যুবক দুটো ওদের ঝাপটে ধরে চুমু খেতে চাইলো। 

অদূরে দাঁড়িয়ে জনি প্রথম থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলো। জনি প্রতিবেশি হিসেবে কণেপক্ষের আমন্ত্রিত অতিথি। সে এগিয়ে গেলো ওদিকে। পরপর দুটো ঘুষি মেরে দুষ্টু যুবক দুটোকে মাটিতে ফেলে দিলো। শুরু হলো হৈচৈ। হৈচৈ শুনে অতিথিরা এদিকে দৌড়ে এলো। ঘটনা শুনে যুবকদের জিজ্ঞেস করায় ওরা জানালো যে ওরা আমন্ত্রিত অতিথি না। কোথাও বিয়ের অনুষ্ঠান হলে ওরা এভাবেই ঢুকে খেয়ে থাকে। যুবক দু'জনকে বের করে দেয়া হলো বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে। 

দুষ্টু যুবক দুটো পুলিশের সোর্স। আমাদের সমাজে পুলিশের সোর্স পুলিশের সমান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি ক্ষমতা ভোগ করে থাকে। এরা এলাকার ভালো মন্দ সকল তথ্য পুলিশকে দিয়ে থাকে। পুলিশের ভালো মন্দ সকল কাজে এরা সহায়তা করে থাকে এবং কম বা বেশি ভাগও পেয়ে থাকে। এই দুই যুবকের নাম ধরা যাক রুবেল ও মিশা। 

রুবেল ও মিশা ধুপধাপ হেঁটে চলে এলো থানায়। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার খাসকামরায় ঢুকে অলীক কান্না শুরু করে দিলো। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হায়দার কারণ জিজ্ঞেস করলে রুবেল বললো, বড় অপমান হইছি আইজকা স্যার!

সাথে সাথে মিশা বললো, জিন্দেগিতে এতোবড় অপমান হই নাই স্যার!

ওসি হায়দার মোবাইল ফোনটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ওদের জিজ্ঞেস করলেন, কী হইছে? আগে ঘটনা ক! পরে কান্দিস!

রুবেল মেয়েদের উত্যক্ত করার ঘটনা বাদ দিয়ে বললে ওসি হায়দার বললেন, দাওয়াত না পায়া বিয়া খাওয়া কবে বাদ দিবি তোরা?

মিশা বললো, একটা বিয়াতে কত মানুষ খায়! আমরা দুইজন খাইলে কি কম পড়ে?

এখন কী চাস তোরা?

আমগো সাথে ফোর্স দ্যান! ঐ বান্দির পুতরে ধইরা লইয়া আসি!

ঠিকাছে। ২০/২৫ জন সিপাই নিয়া যা। সাথে এসআই প্রতুল যাবে। ওকে আমি বইলা দিচ্ছি। 

পঁচিশ জনের একটি বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে গায়ের হলুদের অনুষ্ঠান থেকে জনি এবং ওর বড় ভাই রকিবকে তুলে নিয়ে এলো ওরা। 

থানায় এনেই জনিকে আঘাতের পর আঘাত করতে থাকলো রুবেল ও মিশা। থানার ভেতরে টানা আড়াই ঘণ্টা চললো জনির উপর অকথ্য পুলিশি নির্যাতন। এক পর্যায়ে জনির শরীর খারাপ হতে শুরু করলে সে এক গ্লাস পানি পান করতে চাইলো, পানি, পানি, পানি!

রকিবকে ধরে রেখেছিলো দুই সিপাই। ওর অনুনয়-বিনয় কান্না কারো মনে কোনো রকম রেখাপাত করলো না। জনির কাতর কণ্ঠে পানি চাওয়া শুনে রকিব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, আমার ভাইটারে আর মাইরেন না পুলিশ ভাইরা। জনি ভুল করছে। ওর পক্ষে আমি মাফ চাইতাছি। রুবেল মিশা ওরে মাফ কইরা দেও। 

রকিবের কথা শুনে মিশা খলনায়কের মতো হাসতে থাকলো। আর রুবেল জনির পেটে কষে একটা লাথি মারলো। সাথে সাথে জনির নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। 

এক সিপাই জনির বুকে বুট জুতা রেখে জনির মুখে থুতু ছিটিয়ে বললো, পানির বদ্লে থুতু খা!

ঐ থানা হাজতে জনির মৃত্যু হলো। পুলিশ রকিবকে মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ভয় দেখিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই জনির লাশটা নিতে বাধ্য করলো। ছোট ভাই-এর লাশ দাফন করার পরে পাড়ার লোকদের পরামর্শে থানায় পুলিশ হেফাজতে জনির মৃত্যু হয়েছে, এই অভিযোগে মামলা করতে এলে পুলিশ মামলা না নিয়ে উল্টো ওকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিলো থানা থেকে। তখন রকিব আদালতে চলে গেলো মামলা দায়ের করতে। আদালতের নির্দেশে থানা মামলা নিয়ে কবর থেকে জনির লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হলো। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচার করা হতে থাকলো যে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে এলে এক পর্যায়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায় জনি। তদন্ত শেষে তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ হেফাজতে জনির মৃত্যু হয়নি মর্মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেবার পরে রকিবের পক্ষে নারাজি দিলে অধিকতী তদন্তের জন্য মামলা সিআইডি-তে প্রেরণের নির্দেশ দেয়া হলো। 

শুরু হলো পুলিশের পক্ষে বিভিন্নভাবে রকিবকে হুমকি দেয়া। পুলিশের সাথে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার জন্য রকিবকে কখনো প্রলোভন কখনো বা হুমকি দিতে থাকলো পুলিশের পক্ষে ঐ দুটো সোর্স ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী বিশেষ করে সরকারপক্ষের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। এতেও না টললে রকিবকে গুম ও হত্যার হুমকি দেখাতে থাকলো। রকিবের মাকেও সরাসরি বাসায় গিয়ে কখনো বা মোবাইল ফোনে হুমকি দেখানো হতে থাকলো এইভাবে যে এক ছেলে মারা গেছে, তুমি কি আরেক ছেলেকে হারাতে চাও? সময়টা তখন ২০১৪ খৃষ্টাব্দ।

একদিন রকিবকে মা বললেন, কিরে রকিব, তোকে এতো বিষন্ন দেখাচ্ছে কেনো?

রকিব শুকনো কণ্ঠে বললো, পুলিশ বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে মামলা তুলে নেবার জন্য।

মা বললেন, আমাকেও হুমকি দিতাছে রকিব।

কী বলছো তুমি মা!

বাসায় আসছিলো। বলছে, একটা ছেলে মরছে, মামলা না তুলে নিলে তোকেও মেরে ফেলবে, অথবা গুম করে ফেলবে।

রকিব মার কাঁধে হাত রেখে বললো, আমি মামলা তুলে নিবো না মা। তুমি মামার কাছে চলে যাও। মামল শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানে আসার দরকার নাই। 

শুরু হলো মামলার তারিখ পড়া। আসামি পক্ষের আবেদন করলেই বিজ্ঞ আদালত পরবর্তী তারিখ দিয়ে দেন। বাদিপক্ষ সাক্ষী হাজির করলে আসামী পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী অসুস্থ, এই অজুহাতে মামলার পরবর্তী তারিখ পড়ে যায়। মাঝেমধ্যে রকিবের উকিল মামলা চালাতে অনীহা প্রকাশ করেন। রকিব বিরক্ত হন না। তিনি প্রতিটি তারিখেই আদালতে গিয়ে হাজির দিতে থাকেন, এডভোকেটের ফি দিতে থাকেন। এভাবে দুই বছর অতিক্রান্ত হবার পরে একদিন মামলা আপোষে মীমাংসা করার জন্য কুড়ি লক্ষ টাকা প্রদানের প্রস্তাব এলো পুলিশের পক্ষ থেকে। 

রকিব বলেন, আমার আদরের ছোট ভাইকে খুন করা হয়েছে। আমি ন্যায়বিচার চাই। টাকা দিয়ে কী করবো!

রকিব আপোষ করেন না। ভাইয়ের হত্যাকারীদের সাথে কোনো আপোষ নয়। বিচারের দাবিতে রকিব থাকেন অটল। 

মামলার তারিখ পিছায়, খরচ বাড়তে থাকে, একের পর এক তারিখ পড়ে। এরই মধ্যে আসামী পক্ষ মামলা স্থগিতের আদেশ চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। মামলার দুই আসামি প্রথম থেকেই পলাতক; যদিও ওদের থানায়, কখনো পুলিশ লাইনে দেখা যায়। আরেক আসামী জামিনে মুক্তি পেয়ে মামলার প্রাক্তন তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে থানায় বসে রকিবকে দেখিয়ে দুপুরের খাবার খায়, চা পান করে, সিগারেট ফুঁকে। 


ভাই হত্যার বিচারের দাবিতে দায়ের করা মামলায় আদালত শুনানি ও অন্যান্য কাজে গত সাড়ে ছয় বছরে রকিবকে চারশ বার আদালতে আসতে হয়েছে। রকিব একটা শুনানির তারিখও অনুপস্থিত থাকেন নি। 

দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর অসংখ্য হুমকি, ভীতি, আপোষের প্রস্তাব, বিরামহীন আদালত শুনানির পর জনি হত্যার বিচার হয়। 

জনি হত্যায় জড়িত তিন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি দুজনকে সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ প্রদান করে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত। 

রায় ঘোষণার সময় জনির মা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণা শুনে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। কান্না থামিয়ে বিজ্ঞ বিচারকের দিকে তাকিয়ে বললেন, সন্তান হত্যার পরে বিচার পেয়ে কী হবে জজ স্যার? পুলিশের দ্বারা এমন ঘটনা যেনো আর না ঘটে তা নিশ্চিত করেন!


পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারন) ২০১৩ আইনে এই মামলার বিচার নিষ্পত্তি করা হয়।

(একটি সত্য ঘটনার অনুলিখন এই গল্প)

Thursday, July 28, 2022

উপন্যাস - তান্ত্রিক পিসেমশাই ও আমরা দুজন || সুদীপ ঘোষাল || Tantrik Pisemosay oo Amra by Sudip Ghoshal || Fiction - Tantrik Pisemosay oo Amra Dujon Part -1


 


তান্ত্রিক পিসেমশাই ও আমরা দুজন 


সুদীপ ঘোষাল 



রতনেদের পাড়ার তান্ত্রিক পিসেমশায়কে দেখলে আমাদের খুব ভয় লাগে। সবসময় লাল চোখ, বাঁজখাই গলা আর কন্ঠস্বরের তীব্রতায় বুক ধরফর করে। সহজে কেউ তান্ত্রিককে ঘাঁটাতে চায় না। তবু রতন সাহস করে বলে, পিসেমশাই ভূত,পিশাচ এসব কি? পিসেমশায় ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দীতে মজা করে কথা বলেন। তিনি বললেন, ক্যা হুয়া, তোমার এসব দরকার কিউ পরতা,হ্যায়?  তুমি বাচ্চালোগকা মাফিক থাক।রতন বলে, বলুন না। শুনতে ভালোলাগে। পিসেমশায় এবার সিরিয়াস হয়ে বলেন,  শরীর মন্ত্র দ্বারা সুরক্ষিত করে তান্ত্রিকরা অপরের উপকার করতে যান।  ক্ষমতালাভের জন্য তন্ত্রে শবসাধন, পাদুকাসাধন, কর্ণপিশাচী সাধন, মধুমতী সাধন ইত্যাদি অনেক সাধনের কথা আছে। তাছাড়াও আছে ভূতপ্রেত পিশাচসাধনও।রতন বলে,পিশাচদেরও ভাগ আছে।পিসেমশায় বলেন, চোখপিশাচী, নাকপিশাচী, কর্ণপিশাচী সাধনাটা হল ভূত, প্রেত, পিশাচের উপদেবতা। এদের শক্তি বিপুল। কার মনের কি ধান্দা, এদের কৃপায় সহজেই বলে দেওয়া যায়। কানে শুনে প্রশ্নের উত্তর দেবে নির্ভুল।আমি বললাম, নাকপিশাচী কেমন?  পিসেমশায় বলেন, ওরা গন্ধশুঁকে বলে দেবে তোমার পকেটে কি আছে বা আশেপাশে আঁশটে গন্ধ পেলে ওরা চিনে নেয় গন্ধটা কিসের?  অপগন্ধ হলে ওরা সাবধান করে দেয়। বাড়িতে ভূত, পেত্নী থাকলে বলে দেয়।রতন বললো, তাহলে ওরা ভালোও হয়? পিসেমশায় উত্তর দিলেন, নিশ্চয়। মানুষের মধ্যে ভালো, মন্দ আছে। তাহলে ভূতেের মধ্যে থাকবে না কেন?  পিসেমশায়  একটু নড়ে চড়ে বসলেন। এতক্ষণ বসে ছিলেন একভাবে। এবার কণ্ঠস্বর দৃঢ় হয়ে উঠল। বলিষ্ঠতার সুরে বললেন, তন্ত্রের প্রত্যক্ষ ক্রিয়া দেখেছি জীবন বহুবার বহু সাধুসঙ্গে। এতে আমার যে ধারণা দৃঢ় ও বদ্ধমূল হয়েছে, তাতে এটুকু বুঝেছি তন্ত্রের মন্ত্র এবং তার নির্ভুল প্রয়োগে মানুষের অনেকরকম ক্ষতি করাটা যত সহজ, উপকার করা সবক্ষেত্রে তত সহজ নয়। যেমন ধর মারণ, উচাটন, বশীকরণ, বিদ্বেষণ, বগলামুখী, বগলা প্রত্যঙ্গিরা, শ্মশানকালীর কবচ ইত্যাদির সাহায্যে শত্রুর উপর ভয়ংকরভাবে প্রভাব সৃষ্টি করা যায়।অশেষ নির্যাতনের মাধ্যমে রোগগ্রস্ত করে যেমন পাঠানো যায় মৃত্যুর হিমঅন্ধকারে, তেমনি বাবা শান্তিস্বস্ত্যয়নের দ্বারা। পিসেমশাই বলেন, একটি জটিল বিষয়। ভারতবর্ষের আর্যকেন্দ্রিক অধ্যাত্ম ঐতিহ্যে এর স্থানটি নিয়ে নানা পরস্পরবিরোধী ধ্যানধারণা রয়েছে। বস্তুতঃ এর উৎস ছিল অনার্য উপাসনা পদ্ধতি ও ব্যাপকভাবে বিকেন্দ্রিত লোকাচারের মধ্যে। এর উদ্ভব প্রাক বৈদিক যুগেরও আগে এবং আর্যদের পরবর্তীকালের বৈদিক আচারবিচারে, বিশেষতঃ অথর্ববেদের সময়ে, আগম ও তন্ত্রের প্রভাব চোখে পড়ে। তন্ত্রের উদ্ভব ও বিবর্তনে সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আগ্রহ পোষণ করার সূত্রে বহু ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। ভারতবর্ষের আবহমান নিম্নবর্গীয় সমাজতত্ত্ব, আর্য-অনার্য সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব ও বৌদ্ধধর্মের সম্পূর্ণ দেহ পরিবর্তনের  পরিপ্রেক্ষিতে তন্ত্রশাস্ত্র একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তন্ত্র সম্বন্ধে ' কিছু  বলা আমার মতো আহাম্মকের  পক্ষে সম্ভব নয়। বিশাল এর কাহিনী, বিশাল এর বিস্তৃতি। সচরাচর গোপনশাস্ত্র হিসেবে গণ্য হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ আগ্রহী হলেও এ বিষয়ে কৌতূহল নিবৃত্ত করার মতো বিশেষ কিছু বই পাওয়া যায় না। কারণ অসংখ্য সাধক  বহুধাবিভক্ত চর্চা ও অভ্যাসের দৌলতে সাধারণ পাঠকের উপযুক্ত সহজ আলোচনা আমাদের ভাষায় বিরল।


এখানে মনে রাখতে হবে, এই গোপনতন্ত্রসাধনা পঞ্চদশ  শতক পর্যন্ত এক বিশেষ দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে বিদেশী  রাজশক্তি যখন মূলস্রোতের  পূজা-আরাধনা প্রকাশ্যে, সমারোহ সহকারে উদযাপন করার পথে অন্তরায় দেখা দিল তখন  বিপদগ্রস্ত ধার্মিকরা শরণ নিয়েছিল অনার্য কৌম সমাজের দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা দেবীর  আশ্রয়ে। এই সময় থেকেই তন্ত্রশাস্ত্র পূর্বতন অসংগঠিত থেকে মনীষার যোগদানের ফলে এক বিস্তৃত  মাত্রা পেয়ে ছিল।বৌদ্ধতন্ত্র ও সনাতনধর্মীয় তন্ত্রের মধ্যে বস্তুত কোনও উল্লেখযোগ্য প্রভেদ নেই। আসলে সেভাবে দেখলে তন্ত্র কোনও ধর্মীয় মতবাদ নয়, তন্ত্র এক সাধনপদ্ধতি মাত্র। মনুষ্যদেহকে এক যন্ত্রস্বরূপ বিচার করে সেই সূত্রে এক গুহ্যসাধনপদ্ধতিকেই তন্ত্র বলে। এই সাধনপদ্ধতিতে অনুগামীদের বিভিন্ন দেবীর নামে দীক্ষা নিতে হয়। বেছে নেবার মতো অসংখ্য দেবী থাকলেও আমাদের দেশে  শাক্তরা দুর্গা মন্ত্রে শিষ্যত্ব গ্রহণি  করেন। তারা, অন্নপূর্ণা, ত্রিপুরা ও ভুবনেশ্বরী মন্ত্রে দীক্ষিত শাক্তদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম।তন্ত্রসাধনার মূল স্রোতটি যে আচারপদ্ধতিকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে, তা হলো পঞ্চ ম-কার ক্রিয়া। এই পদ্ধতিটি নিয়ে আবহমানকাল ধরে নানা ধরনের পরস্পর বিরূপ মতামত প্রচলিত রয়েছে। প্রায় সোয়াশো বছর আগে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবার উপক্রমনিকা হিসেবে একটি কৈফিয়ৎ যেমন ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, .ভারত-প্রচলিত তান্ত্রিক উপাসনার প্রকৃত মর্ম ও পঞ্চ ম-কারের মূল উদ্দেশ্য আমাদের জ্ঞানে যতদূর উদ্বোধ হইয়াছে এবং ইহার আধ্যাত্মিক-তত্ত্ব যতদূর জানিতে পারা গিয়াছে,ইত্যাদি। এই ব্যাখ্যাটির প্রামাণ্যতা নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের উপর, 'আমাদের জ্ঞান' ও 'যতদূর জানিতে পারা গিয়াছে'। এ বিষয়ে সাক্ষী মানা হয়েছে 'আগমসার' নামের একটি প্রাচীন গ্রন্থের। এই গ্রন্থে প্রথম-ম, অর্থাৎ 'মদ্য' সাধন বিষয়ে বলা হয়েছে।মদ, মোহ, মাৎসর্য, কাম, ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে রেখে তান্ত্রিকরা বায়ু রূপ লিঙ্গকে ভূমিরূপ যোনীতে প্রতিস্থাপন করেন। এ খুব কঠিন সাধনা। শুধু মহিলা নিয়ে ঘুরে মদ খেয়ে তান্ত্রিক হওয়ার চেষ্টা করা বাতুলতা মাত্র। সাধু আর তান্ত্রিক হতে গেলে সংযম, সাধনা আর আসনের ত্রিবেণী সংগম হতে হবে। নারীদের দেবীজ্ঞানে পূজা করতে হয়। অকালপক্ক বির্যহীন পুরুষ এ দিকে না আসাই ভাল। পিসেমশাই বললেন, গোপন কথা কোথাও বলবি না। এসব সবসময় বলতে নেই।এটা ছটেলেপেলা নয়, মনে রাখবি। 





                                         ক্রমশ...

Wednesday, July 27, 2022

ছোট গল্প - পুনর্জন্ম || লেখক - অরুণিমা দাস || Short story - Punorjonmo || Written by Arunima Das


 

পুনর্জন্ম

   অরুণিমা দাস 



সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর পাশ ফিরতেই হাতের যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে জিনিয়া। ভয় চোখে বিছানার একপাশে শুয়ে থাকা আয়ুশের দিকে তাকায়। অঘোরে ঘুমোচ্ছে আয়ুশ। কে বলবে গত রাতে এই আয়ুশই তাকে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করেছে আর মারধোর করেছে। জিনিয়া কিছুতেই বুঝতে পারে না তার সাজগোজে স্বামীর কেনো এত অনীহা। বিয়ের পর দুমাস হয়ে গেলো একদিনের জন্যও আয়ুশ তাকে সাজগোজের কোনো জিনিস কিনে দেয়নি,উপরন্তু বলেছে ন্যাচারাল থাকো, এটাই আমার পছন্দ। ওই রুশ পাউডার গালে লাগিয়ে আর ঠোঁট লিপস্টিকে লাল করে আমার সামনে কোনোদিন আসবে না,আমি এগুলো মেনে নিতে পারবোনা কিছুতেই। এসব ভাবতে ভাবতে জিনিয়া উঠে গিয়ে আয়নার সামনে নিজেকে দেখতে লাগলো,পিঠ ঘোরাতেই আয়নায় দেখলো সুস্পষ্ট কালসিটে। ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো জিনত। আয়ুশের ঘুম ভেঙে গেলো কান্নার শব্দে, উঠে এসে জড়িয়ে ধরলো জিনিয়া কে। বললো কি হয়েছে কাঁদছো কেনো। জিনিয়া অবাক হয়ে তাকালো স্বামীর দিকে। কি অদ্ভুত তো, কাল রাতে যে মানুষটা এত হিংস্র হয়ে উঠেছিল সে আজ সকালে এরকম ভালোমানুষ! কি করে সম্ভব হয় এটা। আয়ুশকে বললো রাতের কিছু কথা মনে নেই তোমার। আয়ুশ বললো কিছু হয়েছিল নাকি রাতে। আমি তো নিশ্চিন্তে ঘুমোলাম। আর তুমি কাঁদছো কে? বলে জিনিয়ার হাত টা ধরে, জিনিয়া হাতটা সরিয়ে নেয়। আয়ুশ বললো আবার নিশ্চয়ই ভারী কাজ করে হাতে ব্যথা করছে তোমার। দাও মলম লাগিয়ে দিই। জিনিয়া বললো না থাক, আমি চা করি ব্রেকফাস্ট বানাই। রান্নাঘরে গিয়ে জিনিয়া ব্রেকফাস্ট রেডী করতে থাকে। কদিন সবকিছু ঠিক চললো, একদিন অফিস থেকে ফিরে আয়ুশ দেখে জিনিয়া সুন্দর করে সেজেছে আর গাঢ় করে লিপস্টিক লাগাচ্ছে ঠোঁটে। জিনিয়ার পেছনে এসে দাঁড়ায় আর হিসহিস করে বলে ওঠে সাজতে বারন করেছিলাম তো তোমায়, পছন্দ করি না আমি সাজগোজ করা মেয়েমানুষ দের। বলেই সব জিনিয়ার সব সাজ সরঞ্জাম ছুঁড়ে ফেলে দেয় আর মাটিতে ফেলে জিনিয়ার চুল মুঠি ধরে মারতে থাকে। কোনরকমে জিনিয়া নিজেকে বাঁচিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। আয়ুশ চুপ করে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ে। সেদিন রাতে আর আয়ুশের সাথে এক বিছানায় শোয় না জিনিয়া। ঘুম আসে না ওর চোখে, সমস্ত শরীর জুড়ে যন্ত্রণা ওর। মানসিক শান্তি টাই চলে গেছে ওর। মনে মনে ভাবে এরকম চলতে দেওয়া যাবে না আর,ঠিক করে কালকেই মামাতো দাদা সঞ্জীবকে ফোন করে সব বলবে। জিনাতের দাদা সঞ্জীব মাইন্ড রিডিং নিয়ে  পড়াশোনা করছে। হয়তো কিছুটা হলেও হেল্প করতে পারবে। রাত কেটে সকাল হবার পর আয়ুশ আবার স্বাভাবিক মানুষ, অফিস যাওয়ার সময় জিনিয়াকে বলে যায় আজ বাইরে ডিনার করতে যাবো তোমায় নিয়ে, রেডী থেকো সিম্পল ভাবে। জিনাত কিছু বলে না,চুপ থাকে। আয়ুশ বেরিয়ে যাওয়ার পর ফোন লাগায় দাদাকে, ফোনে সব শুনে সঞ্জীব বলে তুই এতদিন বলিসনি কেনো রে পাগলী? সাজগোজ নিয়ে অনেকের সমস্যা থাকে, কিন্তু কিভাবে সেই সমস্যার উৎপত্তি তার মনে সেটাই খুঁজে বের করতে হবে। হয়তো কোনো সুন্দরী মেয়ে আয়ুশকে ঠকিয়েছে, তাই হয়তো সাজগোজের ব্যাপারে ওর বিতৃষ্ণা। কিন্তু তুই যা বললি শুনে বুঝলাম এখন এটা ওর মানসিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওর প্রপার কাউন্সেলিং এর দরকার রে। আমার এক বন্ধু আছে, নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট ডা: শুভম ঘোষ, খুব ভালো মানুষ। তুই নিয়ে আয় আয়ুশকে,ওর মনের কথা জানার খুব দরকার রে।


জিনিয়া ভাবলো এমনিতেই অনেক টা দেরী হয়ে গেছে দাদাকে জানাতে তার ওপর আরও দেরী করলে হয়তো আয়ুশের সমস্যা আরও বাড়তে পারে। আয়ুশ অফিস থেকে ফিরলে জিনত বলে জানো আমার দাদা সঞ্জীব আজ কল করেছিল, আমাদের দুজনকে ডেকেছে একটা জায়গায় নিয়ে যাবে বলে। কোনো সন্দেহ না করে আয়ুশ রেডী হয়ে জিনিয়ার সাথে বেরিয়ে পড়ে। জিনিয়া আয়ুশ কে নিয়ে সোজা পৌঁছয় ডা: ঘোষের চেম্বারে, সঞ্জীব আগেই চলে গেছিলো। ওদের আসতে দেখে সঞ্জীব এগিয়ে গিয়ে ওদের নিয়ে আসে। আয়ুশ বলে এটা কোথায়। সঞ্জীব বলে আমার ওয়ার্ক প্লেস এটা। তোমরা এসো, আমি একটু কাজ সেরে নিয়ে তোমাদের ডিনারে নিয়ে যাবো। কথায় কথায় আয়ুশ কে ভুলিয়ে ডা: ঘোষের কেবিনে নিয়ে আসে সঞ্জীব। আগে থেকেই শুভম কে সব বলে রেখেছিলো সঞ্জীব। শুভম আয়ুশকে বলে বসুন আপনি, একটু আলাপ করা যাক আপনার সাথে। সঞ্জীব আর জিনিয়া কে পাশের একটা ঘরে বসতে বলে শুভম। আয়ুশ বসার পর শুভম এবার আসল কথায় আসে,জিজ্ঞেস করে কি করেন। বাড়ী কোথায় এবং পরিবারের কথা। আর এসব বলতে বলতে বলে ফেলে আপনার ওয়াইফ এত সাদা মাটা ভাবে কেনো থাকেন। সাজলে তো ওনাকে খুব ভালো লাগবে। শুভম লক্ষ্য করে সাজ গোজের কথা শুনে আয়ুশের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, টেবিলে সজোরে ঘুষি মেরে বলে আই হেট মেক আপ। প্রখর বুদ্ধি সম্পন্ন শুভম বুঝে ফেলে কিছু অতীত তো নিশ্চয় আছে আয়ুশের যার জন্য ও এতটা ঘৃনা করে সাজগোজ কে। ঘরের লাইট অফ করে দেয়, একটা হালকা মিউজিক চালিয়ে দেয়। আর ইশারায় সঞ্জীব আর জিনিয়া কে বলে কানে হেড ফোন লাগিয়ে নিতে। এরপর প্রশ্ন শুরু করে আয়ুশ কে। মনের কথা সব খুলে বলতে থাকে আয়ুশ। যখন ছোট ছিল, বয়স তখন পাঁচ ছয় হবে পড়তে যেত এক স্কুলের ম্যাডামের কাছে, একাই পড়ত। সেজে গুজে থাকতেন ম্যাডাম সব সময়। আয়ুশকে দেখেই পরম আদরে নিজের কাছে টেনে নিতেন। বাচ্চা আয়ুশ তখনো ম্যাডামের অভিসন্ধি বুঝতে পারেনি।


তারপর কিছুক্ষণ পড়াশোনা করানোর পর ঘরের দরজা জানলা সব বন্ধ করে লাউড স্পিকারে মিউজিক চালিয়ে দিয়ে শুরু হতো আয়ুশের ওপর অত্যাচার। আর বলা হতো মা বাবাকে জানালে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে। আয়ুশ অত্যন্ত যন্ত্রণা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতো। ভয়ে বাবা মাকে কিছু বলেনি। একদিন আয়ুশের প্যান্টে রক্তের দাগ দেখে ওর মা জিজ্ঞেস করে ওকে কি হয়েছে। আয়ুশ সব বলে মা কে, কিন্তু সুরাহা কিছু হয়নি কারণ ওই ম্যাডামের প্রতিপত্তি ছিল ওই এলাকায়। আয়ুশকে ওর বাবা বলেছিলেন সব চেপে যেতে।  এভাবে ক্লাস ফাইভ অবদি চলার পর আয়ুশকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই ঘটনার রেশ এতটাই গভীর যে আয়ুশের অবচেতন মনে আজও দগদগে ঘা হয়ে আছে। শুভম মিউজিক অফ করে ঘরের আলো গুলো জ্বেলে দেয়। জিনিয়া ঝর ঝর করে কেঁদে শুভম কে বলে কি নিষ্ঠুর মানুষ ছিলেন ম্যাডাম। আয়ুশের মনে এত কষ্ট কোনোদিন ও বলেনি আমায়। শুভম বলে ওর মা বাবার যে কাজ টা করা উচিত ছিল সেটা আজ আপনি করছেন জিনিয়া। এবার বুঝলেন তো আপনার স্বামী কেনো সাজগোজ করা পছন্দ করেন না। কারণ ওনার মনে তো সেই ম্যাডামের ছবি গেঁথে আছে আর সেই ছবি ওনার মনকে ক্ষত বিক্ষত করে বারংবার। আপনার স্বামী পেডোফিলিয়ার স্বীকার ছিলেন। উনি ছিলেন প্যাসিভ ভিকটিম। আর ওই ম্যাডাম এভাবে কত বাচ্চার ক্ষতি করেছেন কে জানে। জিনিয়া বললো ও ঠিক হয়ে যাবে তো। শুভম বললো আমি কিছু মেডিসিন দিচ্ছি সময় মত খাওয়াবেন আর বেশ কিছু সিটিংয়ে আমি ওনার কাউন্সেলিং করবো। সময় লাগবে, ধৈর্য্য ধরতে হবে। জিনিয়া বললো আমি সব করবো ডা: ঘোষ। ওকে আজ তাহলে আসুন, বলে প্রেসক্রিপশনটা ধরিয়ে দেন জিনিয়ার হাতে। আয়ুশ মাথা নিচু করে বসেছিল, ডা: ঘোষ বললেন যান বাড়ী যান, আপনি একদম সুস্থ আছেন। আয়ুশকে নিয়ে জিনিয়া আর সঞ্জীব বেরিয়ে পড়ে। জিনিয়া সঞ্জীব কে বলে এই ঘটনার জন্যই হয়তো আয়ুশের বিয়েতে অনীহা ছিল। এটা আমি শুনেছিলাম কিন্তু কেনো অনীহা সেটা বুঝিনি। সঞ্জীব বললো চিন্তা করিস না, সব ঠিক হবে। শুধু ওকে ওষুধ গুলো টাইম মত খাওয়াস। ডা: ঘোষের কাউন্সেলিং আর স্ত্রী জিনিয়ার আন্তরিকতায় আয়ুশ রিকভার করছিল তাড়াতাড়ি। এরপর জিনিয়া ঠিক করে আয়ুশের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ওর মা বাবার সাথে কথা বলবে। একাই গেলো ও, আয়ুশকে নিয়ে যায়নি। গ্রামে গিয়ে ওর মা বাবার সাথে কথা বলে সবটা জানতে পারে আর ওদের বলে কেনো ওরা কোনো স্টেপ নেয়নি। জিনিয়াকে ওর শ্বশুর শ্বাশুড়ি জানায় সমাজের ভয়ে ওরা কিছু করেনি। জিনিয়া বলে আপনাদের জন্য আমার বিবাহিত জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছিল,আমিও যদি সমাজের ভয় করতাম তাহলে আর আপনাদের ছেলেকে সুস্থ করতে পারতাম না। আর ম্যাডামের খবর জানতে চাইলে আয়ুশের বাবা বলেন তিনি এখানে থাকেন না আর। শ্বাশুড়ী মায়ের থেকে আয়ুশের ঘর কোনটা জেনে নিয়ে জিনিয়া যায় সেই ঘরে। আলমারি, পুরনো খাতা বই ঘেঁটে বের করে এক ডায়েরী যেখানে আয়ুশের কষ্টের কাহিনী লেখা ছিল। ডায়েরীটা নিয়ে নেয় জিনিয়া, এটা যে ডা: ঘোষ কে দিতে হবে। গ্রামের বাড়ী থেকে রাতে ফ্ল্যাটে ফেরে জিনিয়া। আয়ুশ এসে গেছিলো অফিস থেকে। ওকে খাবার খাইয়ে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় জিনিয়া। নিজেকে আজ বেশ হাল্কা লাগে ওর। এরপর রেগুলার কাউন্সেলিং,ওষুধ আর জিনিয়ার সেবায় একদম সুস্থ হয়ে ওঠে আয়ুশ। মনের ক্ষত গুলো সেরে উঠেছে ওর। একদিন সেই পুরোনো ডায়েরী টা আয়ুশের হাতে পড়ে যায়। আয়ুশ নিজের লেখা গুলো পড়ার পর ডায়েরীর শেষ কয়েকটা পাতায় জিনিয়ার লেখা পড়ে বুঝতে পারে কত ভুল করেছে সে, ছোটবেলার ঘটনা গুলোকে নিজের মনে লুকিয়ে রেখে শুধু নিজেকেই না স্ত্রী জিনিয়াকেও কষ্ট দিয়েছে। পাশের ঘরে গিয়ে জিনিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলে ক্ষমা করে দিতে তাকে। তার এই যে নতুন জীবন যে জিনিয়ার দেওয়া, তাই এখন থেকে তার ভালো মন্দ সব কিছুর ভার জিনিয়ার হাতে থাকবে। জিনিয়া খুব খুশি হয় স্বামীর পরিবর্তন দেখে। আয়ুশকে বলে সব ভুলে যাও, আজ থেকে আমরা নতুন করে সব শুরু করি চলো। আয়ুশ বলে আগামী রবিবার একটা পার্টির আয়োজন করি বাড়িতে, তোমার দাদা, ডা: ঘোষ আর আমাদের দুজনের বাবা মায়ের উপস্থিতি ,ব্যাস এই টুকুতেই আমি খুশি। জিনিয়া বললো একদম আর সব আয়োজন আমরা দুজনে মিলে করবো। রোববার দিন সন্ধে বেলায় ছোট্ট অনুষ্ঠানে হাজির ছিল সবাই আর সবার সামনে আয়ুশ জিনিয়াকে গিফট করে মেক আপ বক্স  আর বলে যার মন এত সুন্দর সে না সাজলেও সুন্দরই লাগবে, তাও এটা দিলাম মনের মত করে সেজো। জিনিয়া আয়ুশের কানে কানে বললো সাজিয়ে দিয়ো তুমি। সকলের হাসি আনন্দে ঘর ভরে উঠলো।

Tuesday, July 26, 2022

ছোট গল্প - রাজু কাকা || লেখক - সান্ত্বনা ব্যানার্জী || Short story - Raju Kaka || Written by Swantana Banerjee



রাজু কাকা

       সান্ত্বনা ব্যানার্জী



             "অ্যাই ! অ্যাই!সর, সর।উর ডাবায় মুক
দিচিস কেনে?তুর নিজের যাব খা কেনে!মুই কি 
কারো মুকের গেরাস কেরি খাই? তু কেনে খেছিস?"....রাজু কাকা এই রকম করেই অনর্গল
কথা বলে গরু গুলোর সঙ্গে।রাজু কাকা আসার পর থেকে সেজো কাকুর কাজ একটু কমে গেছে
আর মেজাজটা ও ভালো হয়েছে।এখন প্রায়ই 
বাঁশি বাজায় সন্ধের পর।তখন ইংরেজী টা কাকুর কাছে নিয়ে গেলে পরিয়ে দেয়।এখন অঙ্ক
কষতে কষতে জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখে এক মনে গোয়াল পরিষ্কার করছে রাজু কাকা।
                   প্রায় ছয় মাস হয়ে গেলো রত্নাদের
বাড়িতে এসেছে রাজু কাকা।বীরভূমের কোন এক গ্রামে বাড়ী।স্টেশনে বসেছিল আর একে তাকে কাজের জন্য অনুরোধ করছিলো।সেজো কাকুর সঙ্গে সেখানেই দেখা,আর বাড়িতে নিয়ে 
আসা।সেই থেকেই বাড়ীর বাঁধা মুনিষ রাজু কাকা। বেঁটে খাটো কালো , কিন্তু ভারি সতেজ ।
সব সময় যেন তেল মেখে আছে। তেমনি যত্ন করে গোয়ালের গরু মোষ গুলোকে।ওর নিজের মতো ই চকচকে করে ফেলেছে গরু মোষ গুলোকে।     
        বাড়িতেও যেন এক শান্তির হাওয়া। সবচেয়ে খুশি হয় রত্না ওর মায়ের জন্য।মায়ের কাজ অনেক টাই কমে গেছে।সকাল থেকে মা আর কাকীমা যেন তাঁতের মাকুর মত বাড়ীর এ প্রান্ত।থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়ায়।দক্ষিণের ঘরে চালতো উত্তরের ঘরে আলু,কুমড়ো। ভোর থেকে
ছুটোছুটি, অফিস,ইস্কুলের ভাত,তারপর জন কিষেনের রান্না,তার ওপর ধান সেদ্ধ,মুরিভাজা।
এখন এই ধান সেদ্ধ শুকনো র কাজ গুলো করে রাজুকাকা,মায়ের হাতের কাছে শাক সবজির যোগান দেয়।মা এখন একটু বিশ্রাম পায়,দুপুরে
চুল মেলে দিয়ে একটু গড়িয়ে নেয় রেডিওতে
গান শুনতে শুনতে।ভারি ভালো লাগে রত্নার।কাজ সারা হলে রাজু কাকা ও গান শোনে আর
বক বক করে মায়ের সাথে।"মেজ ঠাকরুন একট
সবুজ পারান ডিংলা আনলাম,নাককেল দিয়ে রান্ধ দিকি আজ রেতে বেশ ভালো করি,গরম 
গরম রুটি দে খাতি বড্ড ভালো নাগে।".....তোমাদের বাড়ীতে কে রান্না করে রাজু?মা জিজ্ঞেস করে।"আগে মা করতো,একুন 
বৌদিদি রান্দে,মায়ের মতন লয়।তুমার রান্না আমার খুব ভালো নাগে মেজ ঠাকরুন"।মা একটু
চুপ করে যায়,তারপর বলে .....তুমি একবার বাড়ী ঘুরে এসো না রাজু, বাড়ীর সবাই চিন্তা করছে.....।না!বাড়ী যাব নেকো।....বলেই কেমন মাথা নিচু করে চুপ করে যায়,আর উঠে গোয়ালের দিকে চলে যায়।গরু গুলোকে খাবার
দিতে দিতে বকতে থাকে নিজের মনে..... তু  বড়ো বাচাল হইছিস কেলো! নাগার ধোলোর ডাবা তে মুক দিছিস।দ্যাক তো ছেমলিকে!কি নক্কি মেয়ে, কারও ডাবাতে মুক দেয় নাকো!.......
বক বক করেই যায়। 
                     দেখতে দেখতে দুর্গাপুজো চলে এলো।গ্রামে মোট এ দুটো পুজো। পাড়ার পুজো টা। রত্নার বাড়ীর কাছেই।সারাদিন নিজেরাই ঠাকুরতলা আর বাড়ী আসা যাওয়া করে                                 
 ।কিন্তু অন্য পাড়ায় একা যাওয়ার হুকুম নেই।বিশেষ করে ছোট বোন টুকটুকি,সে তো ভালো করে হাঁটতেই শেখেনি। তো বিকেলবেলা রাজু কাকা সবাইকে নিয়ে চললোঠাকুরদেখাতে,কাঁধে চরলো টুকটুকি,বাকি সবাই হেঁটে হেঁটে।কাঁধে চরা টুকটুকির সঙ্গে একভাবে বকতে বকতে চলে রাজু কাকা....... টুকি,দেখতি পাবা,কি সোন্দর দুগ্গা মা!ইয়া তাগড়া অসুর!গণেশ দাদার পেটটি নাদা, খড় খায় গাদা গাদা!আর নক্বী ঠাকুরের চরণে ঠাঁই দ্যাবরা চোকো প্যাঁচা!সব দিকাবো তোকে। ......ঠাকুর দেখার পর সবাইকে বুড়ির চুল , পাঁপড় ভাজা কিনে দেয়,বাড়ী ফিরে সবিস্তারে গল্প করে মায়ের সঙ্গে।
             একদিন সেজো কাকুর সঙ্গে কি এক কারণে ধুন্ধুমার ঝগড়া লেগে গেল।হাত মুখ নেড়ে কাকুকে বললো রাজু কাকা........আর একদিন যদি তুমার জমি পানে যেছি,তো মুই ঢোল গোবিন্দ কম্মকার এর ব্যাটা ই নই!......বলে নিজের ঘরে ঢুকে খিল দিয়ে দিলে।
সবাই মিলে অনেক সাধ্য সাধনা করেও খিল খোলানও গেল না।কাকু ও খুব ভয় পেয়ে গেল।
কোথায় বাড়ী,ঠিকানা কিছুই ঠিকভাবে বলেনি রাজু কাকা।আসার পর থেকে কখন যেন বাড়ির ই একজন হয়ে গেছে। বাচ্চা বড়ো সবাই ভালোবেসে ফেলেছে ওকে।কত কাজ যে সারা দিন করে তার হিসেব নেই। প্রত্যেক দিন বিকেলে 
রত্নার দাদুকে মোজা জুতো পরিয়ে বেড়াতে যাওয়ার জন্য তৈরী করে দেয়,রান্নাঘরে বালতি ভরে জল তুলে দেয়,মাঠে কিষেন দের ভাত নিয়ে
যায়,কত কি! যাই হোক, শেষকালে মায়ের অনেক অনুনয় বিনয় ফেলতে না পেরে ঘর থেকে বেরোয় রাজু কাকা,মাকে বলে.....এই তুমি ডাকলে তাই আগোর খুল্লুম,মায়ের মত মনিষ্যই
রে অমান্যেই কর্তি নাই।দ্যাও ভাত দ্যাও!খিদে 
নেগেছে বেদম!সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলো!
             এর ক' দিন পরেই ঘটলো আশ্চর্য এক 
ঘটনা!দুপুর বেলা খাওয়া দাওয়া সেরে মা আর কাকীমা একটু রেডিও টা নিয়ে বসেছে,। রাজু কাকা ও মাঠ থেকে ফিরে বিরাট কলাপাতায়
প্রায় এক হাঁড়ি ভাত , ডাল তরকারি, দিয়ে মেখে,একবাটি টক এর চাখনা দিয়ে খেয়ে দাওয়ায় গামছা বিছিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে,এমন সময় সদর দরজা ঠেলে উঠোনে 
এসে দাঁড়ালো আর এক রাজু কাকা! এক চেহারা,এক মুখ!কেবল পরনে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি,, চুল বেশ পরিপাটি করে আঁচড়ানো, হাতে বড়ো সরো একটা মিষ্টির হাঁড়ি!সবাই তো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু এই নতুন রাজু কাকা তরতর করে এগিয়ে এসে বাড়ীর রাজু কাকা কে জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলো আর বলতে লাগলো.......তু কেনে এমন 
কল্লি রে ভাই!কি করে এদ্দিন নুকিয়ে রইলি!শেষ
কালে বংশের মুকে চুন কালি মাখালি!যাদের ঘরে রোজ দশ বিশ টা মুনিস খাটে ,গোয়াল ভরা গরু মোষ, সার সার ধানের মরাই,সে কিনা.......!
তার বিলাপের আর শেষ নেই!ইতি মধ্যে বাড়ীর
সবাই জড়ো হয়ে গেছে।নতুন আগন্তুক ,রাজু কাকার যমজ ভাই সাজু কাকা,বহু খোঁজ খবর
করে শেষ পর্যন্ত সন্ধান পেয়ে ভাই কে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। ক্রমশঃ জানা গেলো বীরভূম জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক গ্রামের 
বর্ধিষ্ণু পরিবারের ছেলে রাজু কাকা।একটু সরল প্রকৃতির,আর বদরাগী। বাড়ীতে রাগারাগি করে চলে এসেছিল,ভাই কে দেখে সে রাগ ও পড়ে গেলো।সবার অনুরোধে সে রাতটা ওরা রত্না দের
বাড়ীতে থেকে গেলো।রাতে অনেক রকম রান্না করে মা কাকীমা যত্ন করে খাওয়ালে চোখের জল ফেলতে ফেলতে।পর দিন দুই ভায়ে যখন চলে গেলো বাড়ীর সবার চোখে জল।যাবার
সময় টুকটুকি কে কোলে তুলে আদর করে রাজু কাকা বললে.......টুকি,আমাদের ঘর যাস কেনে,
আমার ছেমলির দুধ খাওয়াবো,সরালের মাংস রান্দি খাওয়াবো! সেজো কত্তা ,মা ঠাকরুন ছেলে
পিলে দের ন্যে যেও কেনে আমাদের গেরামে!
কলিন পুর গো কলিন পুর!.....।


Monday, July 25, 2022

ছোট গল্প - মুক্তি || লেখক - অলভ্য ঘোষ || Short story - Mukti || Written by Allavya Ghosh


 

মুক্তি

অলভ্য ঘোষ


আমার লিঙ্গের ডগাটা দেখে পাকিস্তানি সৈন্য পোদে লাথি মেরে ছেড়ে দিয়েছিল ।ওটা ইনফেকশনে অমন হয়ে গেছে ছোটবেলায় ; তাই রক্ষে । আমার বোন হিন্দু না মুসলমান এ বিচারে ধরা পড়েনি মেয়ে হবার খেসারত দিয়েছে ট্রেন থামানো একদল মুসল….. না ; রেপিস্টদের হাতে ।অঙ্গে আলতা সিঁদুর কিছুই ছিল না বোরখা ঢাকা তবুও ।সবকিছু হরিয়েও বাংলা দেশের মুক্তির লড়াই লড়েছি আমি বন্দুক হাতে নিয়ে।শান্তি কমিটির ইমান সাহেব ঘোষণা করলো ইন্ডিয়ার দালাল । ভিটে মাটির

যারা সওদা করলো ; তারা রয়ে গেল আমি রাতের অন্ধকারে পালিয়ে এলাম ভারতে।নোংরা নালা । কলকাতার সেই গু মুত ভেসে যাওয়া নালার পাশের বসতিতে আমরা রিফিউজি নেড়িকুত্তার দল ; পিঠে তখনো লেগে রয়েছে কাঁটা তারের ঘা । বাসা নেই, চাকরি নেই, আত্মীয় বলতে শ্যামবাজারের দূর সম্পর্কের ফরিদপুরের মামা । এক বিজয়া দশমীর রাতে মনে হয়েছিল প্রতিশোধ নিই । কার ওপর জানতাম না । এখনো জানিনা । সোনাগাছির মেয়েদের লাইনে গিয়ে নাম জানতে চেয়েছি ।শ্যামলী, কাজরী, বৈশাখী । সাবিনা, রোজিনা, ফতে-মা কেউ নেই ?

এখানে তো সবারি নাম বদল হয় । অনেকটা আমার মতো গান্ডুদের দেশ বদলের মতো । এক দালাল ঠিক চটকরে বুঝেছিল, আমি বাঙ্গাল বাংলাদেশি মাগী খুঁজছি ।

– আছে; নতুন এসেছে টাটকা একটু বেশি লাগবে ।

– নাম কী ?

– বিলকিস বানু । চলবে ?

– চলবে মনে দৌড়বে ।


মনের মধ্যে একটা ছুড়ি সান দিয়ে রেখেছি ওর জন্য ।


দরজা বন্ধকরে মেয়েটার একটার পর একটা কাপড় খুলে নিচ্ছিলাম যখন শিকারি হায়েনার মতো ; তখনো আমি মেয়েটার মুখটা দেখতে পাইনি ।

 

ও দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে শুধু থরো থরো কাঁপছিল । 


ও যতো কাঁদছিল আমার শিশ্নটা ততোই মেশিন গানের মতো মুখ উঁচিয়ে নাচছিল আনন্দে ।মুখের আগে বুকটা খুলে নখ বসাতে গিয়ে একটা জড়ুল দেখলাম ।


হটাৎ থার্মোমিটারের পারদ গেল পড়ে । 


ছোটবেলায় আমার বোনকে যখন পুকুরে সাঁতার শেখাতাম কতবার ঐ জড়ুল দেখেছি ওর ছাতিতে ।জলাতঙ্ক রুগীর মতো ঘরের এক কোনে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় মেয়েটাকে আমি বলেছিলাম;

 -কে তুই ?

মুখের থেকে হাত সরিয়ে, জল ঠাসা দুটো চোখে বলেছিল :

– আমি চট্টগ্রামের ভাল ঘরের মাইয়া । পাঁকে চক্রে এইখানে এইয়ে উঠছি ।

নাম শুধলে বলল ;

– দুর্গা । এরা আমায় বিলকিস বইলে ডাকে । আমি বাইচতে চাই ।

– আমার বোনও একথা বলেছে । বাঁচা মরা কোনকিছুই তো আমাদের হাতে নেই ।

– কার হাইতে আছে ? ধম্ম ? কোন ধম্ম এমন বিধান দেয় ?

– যে ধর্মে মানুষ আর মানুষ থাকেনা ।

– ভগবান বলে কিছু নাই ?

প্রচণ্ড হাসি পেয়েছিল আমার ;

– ঐ শুয়োরের বাচ্চাটা এই পাড়ারই কোন মেয়ের সায়ার তলায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে ।

আসলি ভগবান তো ইয়াইয়া খান । এত বড় খান কি পৃথিবীতে একটাই ।

বিজয়ার বিসর্জনের ঢাক বাজছিল একটার পর একটা ঠাকুর পরছিল বাবু ঘাটের

গঙ্গায় আমাদের ইছামতীর মতো নৌকাবিহার এখানে হয় না । প্রতিমা ডুবতে গিয়ে

কেউ যদি ডুবে যায় পাহারাদার নৌকো তুলে আনে । এখানে ডুবানো হয় নিষ্ঠুরভাবে

নেচে কুদে দুর্গাকে শুধু একটা কাঠামো ভাবে ভক্তি কম । কলকাতার সব খারাপ বলবো না । এর মতো উদার সস্তা বাসস্থান ভূভারতে কোথাও নেই । আমার গান্ধী কলোনির ঝুপড়িতে বিসর্জিত দুর্গার প্রতিষ্ঠা হল । কালীঘাটে পনের টাকা খরচায় বিয়ে । মুক্তি কি হয়েছে আমাদের ?


আমার মেয়ে এখন নবম শ্রেণীর ছাত্রী । বাংলাদেশের শান্তি কমিটির সংস্কৃতিতে

নির্মিত রিফিউজি উন্নয়ন কমিটির দৌলতে দখলে জমিতে বানানো ছাদ ঢালা বাড়ির ছাদে একটা মোবাইল কানে বিদ্যা ছেড়ে বিদ্যাবালান হয়ে আমার মেয়ে ভাদ্র মাসের ছোঁক ছোঁকে নেড়িকুত্তাদের মত ছেলেদের পিট বুক খোলা জামা আর পাছা দেখায় জিন্সপরে মনোরঞ্জন করে । ক্লাস সেভেনেই বইয়ের ভেতর থেকে পাওয়া গিয়েছিল বি-এফ এর ডি ভি ডি । এই বয়সেই যৌন বিজ্ঞানের জ্ঞানে স্বয়ং বাৎস্যায়নকে পিছনে ফেলে দিয়েছে । সে জানে গর্ভধারণ-নিরোধের ওষুধ সাধারণত মাসিকের নির্দিষ্ট সময়ান্তে দীর্ঘ মেয়াদে মেয়েদের সেবন করতে হয়। পেট হবার তার কোন সম্ভাবনা নেই । রেপ হবার ও নয় । রেপ তো মতের বিরুদ্ধে হয় । আসলে এখানে ধরা পরলে ধনজ্ঞয় ; না পরলে গুরু এঞ্জয় ।


আমার মেয়েকে কোনদিন আমাদের ইতিহাস বলা হয়নি । যে টুকু বলেছি সব টুকু ঢেকে পরিমার্জিত করে । ভয়ে না লজ্জায় কিছুই জানানো হয়নি । কোন কোন সময় ভেবেছি আমি তোমার বাবা এটুকু বললেই যেমন সব বলা হয়ে যায় কেমন করে তার পৃথিবীতে জন্ম হল । অনেক দুর্গম পথ অতিক্রম করে ইন্ডিয়াতে আসা ; এ বললে কষ্টটা কী বোঝানো য়ায় না ? তারপরেই মনে হয়েছে যে কোনদিন অমৃত খায়নি তার কাছে ওটা শুধু মিষ্টি রসগোল্লার মতো । মিষ্টতা ছাড়াও অমৃতের একটা পবিত্র স্বাদ আছে যা পেলে মানুষ অমর হয় । যা আমরা কোন দিন পাবো না । তেমনি যন্ত্রণা উপোষের মতো মানুষকে সংযমী করে হিসেবী করে আবার বোধয় কিছুটা স্বার্থপর। যাই করুক ঘা খাওয়া বিবেক হয় সদা জাগ্রত । দেশ হারানোর ঘা ; জ্ঞাতি হারানোর ঘা । এই ঘা আমার মেয়ের নেই ; সে যুদ্ধ বলতে জানে বর্ডার ফিল্ম, দেশ ভাগ বলতে রিফিউজি, আর প্রেম বলতে কহনা প্যার হ্যাঁয় । হিন্দি সিনেমাতে না খেতে পাওয়া নায়িকাও ডাগর ডগর কমলা লেবুর মতো বুক আর তানপুরার মতো পাছা । বাস্তবে না খেতে পেলে সব শুকিয়ে আমসি হয়ে যাবে । এরা বাস্তবটা জানে কম । বেঁচে থাকে স্টার সোনি ম্যাক্স টিভি দেখে । যেখানে ছবিতে সিরিয়ালে শুধু দেখান হয় পরকীয়া । একাত্তরের পাকিস্তানি সৈন্যদের মতো চ্যানেল কর্তাদেরও শুধু লক্ষ মানুষের যৌন অঙ্গ ; চলছে দেদার সুড়সুড়ি । সকলেই লাফিয়ে লাফিয়ে নাচছে সংস্কৃতির বেতাল নাচ । অতি সংস্কৃতিবানেরা বি এফ বানাচ্ছে রিয়েলিটি তুলে ধরতে ব্যাকগ্রাউন্ডে রবীন্দ্র সংগীত। কোন কিছুই বলছেনা আমার মেয়েকে তার মায়ের অতীত জীবনের কথা ; তার পিসির অপর লুণ্ঠনের কথা ; তার বাবাকে রাষ্ট্রের নগ্ন করে পরীক্ষা করার কথা । আমিও কিছুই বলেনি তাকে । মুক্তিযুদ্ধ নাকি এবার পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্য পুস্তকে থাকবে । থাকলে কী আমার মেয়ে ঠিকঠাক তার ইতিহাসটা জানবে ? নাকি ক্ষতগুলো ঢেকে মজে থাকবে রাখি সাওয়ান্তের “স্বয়ংবরে ”। টিভি রোগে ভোগা ভালবাসায় গাইবে হান্ডেট পার-সেন্ট লাভ । এখানেও ধর্ম আর রাষ্ট্র শক্তির ফণা সেকুলারিজমের আড়ালে মেঘনাদের মতো সুযোগ খোঁজে । জেনারেল কাস্টে আশি শতাংশ নম্বরেও যখন সরকার মুখ ঘোরায় কার কার কম পেলেও চলে । বিভাজন চলছে চলবে অণু থেকে পরমাণু হলেও আমাদের ছাওয়ায় এটম বোমার সম্ভাবনা । আত্মা থেকে পণ্যে মনুষ্যত্বর সোপানগুলো ভেঙ্গে চুরে তচনচ করে দিলে বেঁচে থাকবে ডিজিটাল নেশাগ্রস্থ একটা জানোয়ার । যার হাত পা মাথা থাকবে শুধু থাকবে না মস্তিষ্কে মুক্তির স্বপ্ন । কয়েকটা বোতামের চাপে হোটফাদার তাকে দিয়ে দাসোচিত সব কিছু করিয়ে নেবে অনায়াসে ।


আমার কান্না পাচ্ছে; এত কথা বললেও কিছুই আমার মেয়ের কানে পৌঁছাবে না । কিছুই আমার বলা হল না । হাত পা মাথা সব কেমন যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে । পেরালাইসিস হবার আগে আর একবার শুধু আমি বলতে চাই;

” আমি মুক্তি চাই আমাকে মৃত্যু দাও। ”