Thursday, December 1, 2022

ছোট গল্প - শূন্যতা || লেখক - সুব্রত নন্দী মজুমদার || Written by Sunnyta || Short story - Subrata Nandi Majumdar


 


      শূন্যতা 

         সুব্রত নন্দী মজুমদার 


                              (এক) 

মেয়ের প্রথম জন্মদিনে দক্ষিনেশ্বর কালীবাড়ি গিয়ে পূজো দেবে মেয়ের মঙ্গল কামনায়, এই কথাটা রুমেলা স্থির করে রেখেছিল অনেক দিন আগেই। আজ সেই দিন। ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁতে না ছুঁতেই রুমেলার ঘুম ভেঙ্গে গেল। এলার্ম দেওয়ার দরকার পড়ে না, এটা তাঁর বহুকালের অভ্যাস। তবু সাবধানের মার নেই, তাই ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রেখেছিল। আজ মেয়ে রুবেলার প্রথম জন্মদিন। রুমেলা স্বামী তমনীশকে তার মনের বাসনার কথাটা অনেকদিন আগে থেকেই বলে রেখেছিল যে মেয়ের প্রথম জন্মদিনে সে দক্ষিনেশ্বর কালিবাড়ীতে গিয়ে পূজো দেবে। তমনীশের যদিও দেবদ্বিজে তেমন ভক্তি নেই, কিন্তু পূজো আচ্চার ব্যাপারে রুমেলার অতিভক্তিকে সে বরাবরই মান্যতা দিয়ে এসেছে। যখনই কালীঘাট, দক্ষিনেশ্বর বা বেলুড় মঠ যেতে চেয়েছে সে তাকে নিয়ে গেছে। তাই মাথা নেড়ে সে সম্মতি জানিয়েছিল। 

আগের দিন রাত্রে শুতে যাবার আগে রুমেলা তমনীশকে কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতে সে শুধু বলেছিল, “একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে, কারণ অফিসে কাল বেলা এগারোটায় একটা জরুরী মিটিং আছে, তার আগে আমাকে পৌঁছতে হবে।“ রুমেলা বলেছিল, “ ঠিক আছে, আমরা সেভাবেই টাইম হিসাব করে বেরোব।“ 

কাজের মেয়ে অনীতাকেও রুমেলা বলেছিল সেদিন একটু আগে আগে আসতে। এলার্ম বাজার আগেই রুমেলার ঘুম ভেঙ্গে যায়। পাশে মেয়ে রুবেলা গভীর ঘুমে অচেতন। রুমেলা উঠে দেরি না করে তোয়ালে নিয়ে সোজা চলে যায় বাথরুমে। চানটান সেড়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে সে শুনতে পায় অনীতা দরজায় কড়া নাড়ছে। যাক বাঁচা গেল। 

রুমেলা প্রথমে দেখে নেয়, পূজোর সব উপাচার ঠিকমত আনা হয়েছে কি না, না হলে এখনো সময় আছে, অনীতাকে দিয়ে আনিয়ে নিতে পারবে। রুমেলা অনীতাকে বলে, “তুই প্রথমে রুবির দুধটা ফুটিয়ে রেডি করে রাখ। আমি ওকে এক্ষুনি ডেকে তুলব। মেয়ে উঠেই দুধ খাবার জন্য কাঁদতে থাকবে।“ 

তারপর রান্নার ব্যাপারে কি কি করতে বলে আবার বলে, “আমরা বেরিয়ে গেলে তুই ভাল করে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে রাখিস, আমরা সাড়ে দশটার মধ্যেই ফিরে আসব। রুমেলা তখন তমনীশকে ডাকে, “উঠে পড়, বলেছিলে না তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে। অফিসে মিটিং আছে।“ তমনীশ উঠে বাথরুমে যেতে রুমেলা মেয়েকে তুলে ভাল করে মুখহাত ধুইয়ে দুধ বিস্কুট খাওয়ায়। নজর তার সবদিকেই আছে। সে অনীতাকে ডেকে বলে, “দাদাবাবুর চা দিয়ে যা।“ 

কদিন আগে একটা শপিং মল থেকে রুমেলা মেয়ের জন্মদিনের জন্য একটা খুব সুন্দর টুকটুকে লাল রঙের জামা কিনেছিল। ওয়ার্ড্রোব থেকে সে বিয়েতে মায়ের দেওয়া লালপেড়ে গরদের শাড়িটা আর রুবেলার নতুন ফ্রক বের করে মেয়েকে নিয়ে বাথরুমে যায়। ততক্ষনে অনীতা তাকে দুধ বিস্কুট খাইয়ে দিয়েছে।  

রুবেলাকে চান করিয়ে, ড্রেস করিয়ে রুমেলা অনীতাকে বলে, “তুই একটু রুবিকে দেখ, আমি ততক্ষনে শাড়ি পরে নিচ্ছি।“ 

শাড়ি পরে রুমেলা ড্রইংরুমে এসে দেখে তমনীশ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজ পড়ছে। সে বলে, “সাতটা প্রায় বাজে, আমাদের হয়ে গেছে, তুমি তৈরি হয়ে নাও। পরে আমি দেরি করিয়ে দিয়েছি বলে দোষ দেবে না।“ তমনীশ আড়চোখে রুমেলার দিকে তাকিয়ে বলে, “ বাঃ! এই শাড়িটা পরে তোমাকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে।“ একটু হেসে রুমেলা বলে, “যাও, রেডি হয়ে নাও ।“ 

তখন ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ ,বসন্তের আগমনের বার্তা নিয়ে মন কেমন করা মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। সূর্যদেব পূব আকাশে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। তমনীশ সম্রতি গাড়ি কিনেছে, সে নিজেই গাড়ি চালায়, তার পাশে রুমেলা মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে মনের আনন্দে গুন গুন করে গাইতে লাগল ‘ আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে….’। তমনীশ মাঝে মাঝে তাকে দেখছে। 

আগের দিনের উদবেগপূর্ণ রাত্রির ভাঙ্গা ভাঙ্গা ঘুম, রাত না ফুরোতেই জেগে ওঠা আর সেই সঙ্গে প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে রুমেলার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে। মেয়ে ততক্ষনে তার কোলে ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছে।          

                                                                 (দুই) 

“এই ছেলে, অনেক বেলা হয়ে গেছে, ওঠ,” রুমেলা তাগাদা দেয় ছেলে রুবেলকে, “ আজ তোর জন্মদিন, মনে নেই দক্ষিনেশ্বর যেতে হবে। এক্ষুনি তোর বাবা এসে তাগাদা দিতে থাকবে।“ জন্মের প্রথম বছর থেকে রুমেলা নিয়ম করে প্রতি বছর ছেলেকে নিয়ে দক্ষিনেশ্বর কালীবাড়িতে যায় কালীপূজো দিতে। এবছর ছেলে পনেরো পেরিয়ে ষোলতে পড়বে। কিছুদিন বাদেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। তাই এবছর পূজোর বিশেষ আয়োজন। রুমেলা চান করে এসে ছেলেকে ঠেলে তুলে বাথরুমে পাঠায়। এখনো ওইদিন সে বিয়েতে মায়ের দেওয়া সেই লালপাড় গরদের শাড়িটা পরে। 

রুমেলার ও বয়স বেড়েছে। মাথার দু’পাশের চুলে অল্প স্বল্প রূপোলী রেখা দেখা বা চোখের নিচে সামান্য কুঞ্চন দেখা গেলে ও তার যৌবন অটুট। তমনীশ বলে,” এই শাড়িটা পরলে তোমাকে এখনো মনে হয় বিয়ের কনে। “ কৃত্রিম কোপ দেখিয়ে রুমেলা বলে, “হয়েছে, থাক। এখন যাও গাড়ি বের কর। দেরি হয়ে যাচ্ছে।“ 

ওঘর থেকে ছেলে চেঁচিয়ে ডাকে, “মাম, কোন শার্টটা পরব? আমি খুঁজে পাচ্ছি না। “ 

“জ্বালাতন করে মারল,” বলে রুমেলা ছুটে গিয়ে ছেলেকে জন্মদিনের জন্য নতুন কেনা শার্টটা বের করে দেয়। 


                                                                  (তিন) 

সামনের ট্রাফিক কন্ট্রোলে লাল আলো জ্বলে উঠতে তমনীশ তাড়াতাড়ি ব্রেক চাপে। গাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যেতে রুমেলার তন্দ্রা ভেঙ্গে যায় আর রুবেলা ও জেগে উঠে কাঁদতে থাকে। রুমেলা তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে মেয়েকে খাওয়ায় এবং নিজেও এক ঢোঁক খেয়ে তমনীশকে জিজ্ঞেস করে জল খাবে কি না। তমনীশের দিকে সে জলের বোতলটা এগিয়ে দেয়। 

রুবেলা আবার ঘুমিয়ে পড়তে রুমেলা ভাবতে থাকে এতক্ষন ধরে কি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন ও দেখছিল। পনেরো ষোল বছর পরের ঘটনা। এরকম হয় নাকি? আশ্চর্যের ব্যাপার, সেই স্বপ্ন মেয়ে রুবেলাকে নিয়ে নয়, ছেলেকে নিয়ে। সে ভাবে, তবে কি সে তার অবচেতন মনে মেয়ের বদলে সে ছেলে চাইছিল? এ কিছুতেই হতে পারে না, অসম্ভব। রুমেলা দু’হাতে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করতে থাকে মেয়েই তাদের কাছে সোনার খনি, ছেলে চাই না। তমনীশ বলে, “কি বলছ?” 

“না, কিছু না”, বলে রুমেলা মেয়েকে আরো কাছে টেনে নেয়।           

“তুমি কি কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন?” তমনীশ জিজ্ঞেস করে, “নিজের মনে কথা বলে যাচ্ছ।“ 

রুমেলা রুমাল দিয়ে মুখ মুছে বলে, “ না, তন্দ্রার মধ্যে কি সব অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিলাম।“ ততক্ষনে ওদের গাড়ি দক্ষিনেশ্বর মন্দির চত্বরে ঢুকে পড়েছে। তমনীশ পার্কিং লটে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে ওপাশের দরজা খুলে রুমেলাকে নামতে বলে। রুবেলা তখনও মায়ের কোলে ঘুমোচ্ছে। 

গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে খানিকটা এগিয়ে তমনীশ হঠাৎ দাঁড়িয়ে আঙ্গুল তুলে রুমেলাকে দেখায়, “ঐ দেখ কে যাচ্ছেন?” 

“কে যাচ্ছেন?” রুমেলা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে। 

“ তোমার মনে নেই,” তমনীশ বলে, “ যে নার্সিং হোমে রুবেলা জন্মেছিল তার মালিক পবন বাজোরিয়া। “ 

রুমেলা এবারে চিনতে পারে পবন বাজোরিয়াকে। খুব ভাল মানুষ, একেবারে নিটোল ভদ্রলোক। নিজে ডাক্তার নন, নার্সিং হোমটির মালিক। রোজ সকালে একবার এসে প্রত্যেকের কাছে গিয়ে খোঁজ নিতেন, কে কেমন আছে। রুমেলা বলে, “ হ্যাঁ এবার মনে পড়েছে। সঙ্গের ভদ্রমহিলা নিশ্চয় তাঁর স্ত্রী। তাঁর কোলে কি সুন্দর একটি ফুটফুটে বাচ্চা।“ 

“হ্যাঁ,” তমনীশ বলে, “তুমি তো জাননা, যেদিন রুবেলার জন্ম হয়, সেদিনই পবনবাবুর স্ত্রীর একটি ছেলে হয় ঐ নার্সিং হোমেই। “  

“তাই নাকি? আমিতো জানতাম না”, রুমেলা বলে। 

“ কি করে জানবে? তোমার অবস্থা তখন খুব খারাপ,” তমনীশ বলে, “যাই বল ভদ্রলোক কিন্তু খুব ভাল লোক। একটা ঘটনার কথা আমি তোমাকে বলিনি।“ 

“কি ঘটনা গো?” রুবেলা জিজ্ঞেস করে। 

“ যেদিন তোমাকে রিলিজ করে দেবে,” তমনীশ বলতে থাকে, “ তার আগের দিন রাতে তোমাদের দেখে ফিরে আসার সময় হেড নার্স সিস্টার নিবেদিতা আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন যে ওটা বিল। পরদিন সকালে আমি যেন বিলে লেখা টাকাটা পেমেন্ট করে দিই তোমাকে নিয়ে যাবার আগে। বিল দেখে তো আমার চক্ষু চরকগাছ।“ 

“ কেন, কি ছিল সেই বিলে?” রুমেলা জিজ্ঞেস করে, “ অনেক টাকার বিল বুঝি।“ 

“ অনেক মানে, আশী হাজার টাকা। আমি ভাবতেও পারিনি এত টাকার বিল হবে, “ তমনীশ বলে, “অবশ্য তোমার সিজারিয়ান হয়েছিল আর কিছু জটিলতা ছিল, যার জন্য তোমাকে নার্সিং হোমে বেশ কিছুদিন থাকতে হয়েছিল।“

রুমেলা হা করে তার স্বামীর কথা শুনতে থাকে। তমনীশ বলে, “তারপর কি হল জান? আমি বিল হাতে নিয়ে সাতপাঁচ ভাবছি। কি করে এত টাকা রাতারাতি জোগাড় করব। ব্যাঙ্কে সেই মুহূর্তে আমার বড়জোর পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। ঠিক সেই সময় পবনবাবু এসে ঢুকলেন নার্সিং হোমে। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, ‘সিস্টার আপনাকে বলেছেন আপনি আপনার স্ত্রীকে কাল সকালে নিয়ে যেতে পারেন। ‘ তারপর আমার হতভম্ব অবস্থা দেখে বলেন, ’এনি প্রব্লেম?’ আমি কি বলব।“ 

এমন সময় রুবেলা জেগে উঠে কাঁদতে থাকে। রুমেলা ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে তাকে খেতে দিলে সে শান্ত হয়। তখন রুমেলা জিজ্ঞেস করে, “ তারপর কি হল?” 

তমনীশ বলে, “ আমি তখন নিরুপায়। শেষ পর্যন্ত লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেললাম আমার সমস্যার কথা যে কিছু টাকা শর্টেজ আছে। মিস্টার পবন বাজোরিয়া তখন আমার হাত থেকে বিলটা নিয়ে বললেন,’আপনি কত দিতে পারবেন?’ আমি বললাম যে আপাততঃ হাজার পঞ্চাশের ব্যবস্থা করতে পারি। আমার কথা শুনে তিনি কয়েক সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর পকেট থেকে কলম বের করে বিলের এমাউণ্ট আশী হাজার কেটে পঞ্চাশ হাজার লিখে সই করে আমার হাতে বিলটা দিয়ে বললেন,’এবার ঠিক আছে?’ আমি কি বলব, কৃতজ্ঞতায় আমার মাথা নুয়ে এল। পবনবাবু একটু হেসে আমার পিঠ চাপড়ে বললেন,’ উইশ ইউ বোথ বেস্ট অব লাক’। বলে তিনি চলে গেলেন। “ 

তমনীশের কথা শুনে রুমেলা বলে, “ উনি তো একজন মহান ব্যক্তি। চল ওকে একবার রুবেলাকে দেখিয়ে নিয়ে আসি। তিনি নিশ্চয় খুশি হবেন।“ 

তমনীশ উৎসাহিত হয়ে বলে,” ওরা চলে যাবেন, আগে চল ওদের সঙ্গে দেখা করে আসি, তারপর মন্দিরে যাব।“ বলে সে এদিক ওদিক তাকায় কিন্তু তাঁদের দেখতে পায় না। সে বলে, “ মনে হচ্ছে ওরা চলে গেছেন। আর দেরি করে লাভ নেই, ভিড় বাড়ছে, চল মন্দিরে যাই।“ 

রুমেলার মন আনন্দে ভরপুর। সুষ্ঠুভাবে আজ পূজো দিয়ে আসতে পেরেছে। কিন্তু তার মনটা তখনো খচখচ করছে গাড়িতে বসে সেই স্বপ্নটার কথা ভেবে। সে ছেলের স্বপ্ন দেখল কেন? 

                                                                 (চার)  

যেদিন রাতে রুমেলা এবং পবন বাজোরিয়ার স্ত্রী সেই নার্সিং হোমে প্রায় একই সঙ্গে দু’টি সন্তানের জন্ম দেন, সেদিন নার্সিং হোমের ডাক্তার অপলক বসু পেয়েছিলেন তিন লাখ টাকা আর হেড নার্স সিস্টার নিবেদিতা পঞ্চাশ হাজার টাকা যার বিনিময়ে সন্তান দু’টো বদল হয়ে গেল। রুমেলার ছেলের স্থানে এল বাজোরিয়ার মেয়ে আর পবন বাজোরিয়ার স্ত্রী জানলেন তিনি জন্ম দিয়েছেন এক পুত্র সন্তানের। 

ছোট গল্প - ছায়াজীবনের বিন্দু || লেখক - ঋভু চট্টোপাধ্যায় || Written by Rivu Chattyapadhay || Short story - Chaya Jiboner Bondhu


 


ছায়াজীবনের বিন্দু                   

 ঋভু চট্টোপাধ্যায়


 বাইরে বেরিয়েই গায়ে তাপ লাগল মনসুর চাচার।একবার আশমানের দিকে তাকিয়েও নিল, ‘হায় আল্লা, এই সকালেই এত তাপ।’একটু আগে বিছানা ছেড়ে উঠেই চালের নিচে শুকনো ডাবাগুলো একবার সরিয়ে সরিয়ে রাখল, এটা অবশ্যি ঘুম থেকে উঠে রোজের কাজ, যেদিন পানি হবে যদি কয়েকটা ফোঁটাও ডাবাতে পড়ে এই আশাতেই রাখা।তারপর ডান হাতের লাঠিটা আর একটু শক্ত করে ধরে একপা একপা করে এগিয়ে সামনে হাসমতের চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়াতেই দেখল ও তখন উনুনে পাখা করছে।চাচা এক বার গলা হেঁকারি দিয়ে বলে, ‘কি রে এত দেরি করলি কেনে?’ 

–কি যে বল চাচা, রোজার মাসে চা আর বিক্রি হচে কই? কিন্তু তুমি আজ কি মনে করে ?

-আজ আর সাহরি খেতে উঠি নাই,কাল পা ট কেটি গেছে, গল গল রক্ত, আজ আর রাখব নাই,কাল শরীর ভালো লাগলে রাখব, নইলে সেই সাতাশে।

–পায়ে হল কি?

-হুতরোতে ঘা লেগিছে রে পোতা, পাটা বাঁধার সময়।

উনোনের ধোঁয়ার মাঝেই বেঞ্চে বসতে বসতে বলে,‘সিয়াম রোজা রাখার জন্য স্ময়ং আল্লা আমাদের ফরজ করেছেন, এতে তাকওয়া লাভ হয়, তবে আমার তো বয়স বাড়ছে, আর সবগুলো পেরে উঠিনা।’ তারপর আবার বিড় বিড় করে, ‘রোজা মানে শুধুই না খেয়ে থাকা নয়, সব সময় ভালো থাকতে হবেক, নিজেকে বাঁধতে হবেক, তবে যে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছে থাকা যাবে।’ কিছুক্ষনের মধ্যে আরো কয়েকজন হাসমতের দোকানে এসে বসে, মনসুর চাচা তাদেরকেও রোজা না করবার কারণ বলে।

 দোকানে সবাই বসলেও সবাই চা পান করে না।হিন্দু পাড়া থেকে যারা এই রাস্তা দিয়ে কাজে বেরায় তারা মাঝে মাঝে এই দোকানে বসে চা পান করে।তাও হাসমত প্রতিদিন সকাল সন্ধে দোকান খোলে, গল্প করে।সাহা পাড়ার বিনোদ এসে দোকানের কাছে দাঁড়াতে যায়।উনোনে তখনও ধোঁয়া উঠছে দেখে আর না দাঁড়িয়ে চলে যায়, যাবার আগে বলে যায়, ‘এত দেরি করে উনোন জ্বালালে হবে, আমরা কাজে যাবো না।’

-রোজার মাসে সকালে এ’পাড়াতে বিক্রি নাইরে।

মনসুর চাচা চুপ করে বসে থাকে,এখন আর ভালো করে দাঁড়াতে পারে না, হাঁটা চলা করলেও সেরকম জোর নাই।বসে বসে গুন গুন করে গান গায়, কয়েক জনকে আসতে দেখেই জিজ্ঞেস করে,‘বীজ কিনলি রে পটল? কত লিছে?’

 –লাল সন্ন, সত্তর,তাও চাচা ভকতের দোকানে খুব লাইন,আমি পাশেরট থেকে নিলম, মনে খুঁত রই গেল। ভকতের দাম বেশি, কিন্তু বীজট ভালো। 

মনসুর চাচা লম্বা শ্বাস ফেলে পটলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বীজ তো হবেক পানি কই? আশমানের কুনু ম্যাগ নাই, সরকার পানি দিবেক কুনু কথা জানিস?’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,‘তুই কি আর বাজারের পানে যাবি? তইলে আমার কিলো বিশ আনতিস।’

–তুমি অত কিলো লিয়ে কি করবে চাচা, তুমার তো মোটে চার বিঘা জমি।

মনসুর হাসে, ‘জামাই ঘরে পাঠাতে হবেক রে, উখানে ভালো বীজ নাই।’

-ইবার জমি বিচি দাও চাচা, দেখবেক কে?

 মনসুর চাচা এর উত্তর না দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘পানি দিবেক কিনা সেট বল? কি শুনলি তুরা, গত বছর তো দেয় নাই,  উপরের অবস্থা ভালো লয়, অম্বুবাচির আগে বীজ না ফেললে হবেক কেনে?’

-আজ গাঁয়ের সবাই বিডিও অপিসে যাবেক বলছিলেক, জলের কথা হবে, তুমি যাবে?

-আমি!গেলেই পানি দিবেক, গেল বছরের আগের বছর তো গেছলম, দিলেক কিছু?

-বীজ ফেললে পানি না হলেও তো সেই ফের।

চাচা একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে  আস্তে আস্তে উঠে দোকানের পিছনে যায়, ফিরে সামনে এসে বলে, ‘হাসমত, তু তো ডাবা গুলান রাখিস নাই, পানি জমলে তুরই ভালো।’

-আ চাচা, তুমার বেরাম এখনো গেলেক নাই, এই ডাবার পানিতে কি হবেক? একজন শুধায়।

আরেক জন জিজ্ঞেস করে,‘চাচা এখন ক’টা ডাবা রাখলে?’ চাচা উত্তর না দিলেও পাশের থেকে হাসমত বলে ওঠে,‘অনেক কটাই হল, আমার দুকানে, মসজিদে, চাচার ঘরে, মোহরদের ঘরে।ইদগারের পাশকে একটক গোঁরেও করিছে।’

দোকানে আরো কয়েকজন ছিল, তারাও হেসে উঠে বলে, তাদের একজন বলে,‘চাচাতো ইবার ভোদার পানিও জমাইবার লগে বলবেন, অত পানি পানি করে মরবেন, ঘরে তো কেউ নাই, পানি বাঁচাইবার কথা বলেন, ঘরের কাউরে তো বাঁচাইতে পারেন নাই।’

চাচা একপা এগিয়ে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে জিজ্ঞেস করে, ‘তুই কার ব্যাটা? হাকিমের ?’ 

–হঁ, চাচা। 

-শুনরে পোতা মরা মানে তো আবার আল্লার কাছেই ফিরে যাওয়া, মালাক উল মউত, আজরাইল যেদিন ডাকবে সেদিন তো যেতে হবেই, আমি পানি রাখতে পারব, কিন্তু আখিরাতের দরজাতো বাঁধতে পারব নাই।

–সিরাজুলের কত বয়স হত চাচা?

চাচা আরেকবার যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়, ‘হিসাব তো করতে পারব নাই, মুদুনির লিখাটও মুছি গেছে, তবে মোল্লা পাড়ার আসগর ও সিরাজুল দোস্ত ছিল।’ 

–আসগর মানে মনিরুলের আব্বা,তারমানে চল্লিশ পেরায় গেছে,তুমার নাতিনট কুথাকে থাকে?

-উয়ার নানির বাড়ি, আমার কাছকে থাকলেক নাই, না উ, না উয়ার আম্মি।

মনসুর চাচা আর কিছু না বলে এক পা এক পা করে এগিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ানোর আগে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আমার বীজটা এনে দেবার কি করবি?’ 

-জলিলের বাড়ি যাও, কালকে ভগতের দোকানে বীজ কিনতে পারে নাই, ভিড় ছিল, আমার সাথে দেখা হনছিল। মনসুর চাচা জলিলের বাড়ির দিকে পা বাড়াতে আরম্ভ করে।   

 পথে একবার মসজিদে যায়, ধূপ জ্বালায়, ইমামের সাথে কথা বলে, ডাবাগুলো দেখে।‌চোখ দুটো ভিজে যায়। বাড়িটা এক্কেবারে শেষ হয়ে গেল, একমাত্র ছেলেটা একদিন কেমন হট করে মরে গেল।পতাকা লাগাতে গিয়ে ঝামেলা, একই পার্টি, তাও মাথায় মারল, শেষ।মনসুর আবার সেদিন মেয়ের বাড়িতে ছিল, একটা লাতিনের নিকার কাচের কথা হচিল, এর মাঝেই খবর এল।সে কি ভয়ানক চেহেরা, হাসপাতাল থেকে লাশটা পেল দুদিন পর, গোটা মাথা ব্যান্ডেজ বাঁধা।বুকটা ধক করে উঠেছিল।সেই কয়েকবছর আগে বিবিটা একদিন হঠাৎ করে তিনদিনের জ্বরে মরল, ছেলের নিকা দিল, পোতা হল, বেশ সুখেই চলছিল।

‘হে আল্লা আমি তো কুরান ও সুন্নাহ অনুযায়ী নেক আমল করে নামাজ, রোজা, জাকাত পালন করিছি, শুধু হজ হয় নাই,হে আল্লা, আমার পোলাটাকে দুনিয়ার ফেতনা থেকে রক্ষা কর।’

মনসুরের চোখের পানিতে মনে হয় যেন আবার কাফন ভিজে যাবে।ভালোই হয়েছে এই সময় ওর আম্মিও নেই, এটা আম্মির নসিবে সইত না। 

মনসুর চাচা এই সব ভাবতে ভাবতেই একপা একপা করে এগিয়ে জলিলের বাড়ির সামনে গিয়ে হাঁক দেয়, বীজ কেনার কথা বলে।জলিল বলে, ‘চাচা, বীজ কাল রেতে নিয়ে নিনছি, আশমানে পানির অবস্থা ভালো লয়, ধুলোর বীজ করব, নিয়াজে লাভ হবেক নাই, গত বছর নিয়াজ করে পাঁচ’ছ কিলো বীজ পচে গেল, এবার আর বীজ কেনার টাকা নাই, এখনো তো ধান বিক্রির টাকা ঢুকে নাই, কুথাকে পাবো বল?’ 

–তইলে আমি বীজট আনবো কুথাকে?

-আরে চাচা বীজের ব্যবস্থা হবেক, কিন্তু পানি, উটোতো কিনতে লাড়বে।

–সরকার দিবে নাই?

-আগের বছর থেকেই তো দিছে নাই।

–জল কিনতে হবেক, দেখি কার পাম্প লাগাবেক?

–কুথা থেকে কিনবে চাচা, মাটির জল লিতে দিছে নাই, অবস্থা ভালো লয়, কয়েক দিন দেখ পানির ব্যবস্থা হোক, বীজের ব্যবস্থাও হয়ি যাবেক। 

মনসুর চাচা আর কিছু বলে না।কথাগুলো তো সত্যি, চোখ বন্ধ করতেই মাঠের মাঝে তার আব্বা আসে, পাশে ছোট্ট মনসুর,আব্বার এক জোড়া বলদের মাঝে পাচন।পাচনে, বলদের পায়ে কাদা লাগে। মনসুরের গায়ে কাদা লাগে, মাথায় পানি পড়ে।আব্বা পানিতে ভিজে হাল চালায়, মা ধান ঝাড়ে।কুটো কুড়ায়, মায়ের পেট হয়, নতুন ভাই আসে, বোন আসে, তারা বড় হয়, আব্বার সাথে সবাই মাঠে নামে।মনসুরের দুচোখে পানি নামে।আশমানে শুখা ভাব, এই সকালেই গায়ে জ্বালা ধরে।গ্রামের অনেকেই হাসপাতালে ভরতি।হিন্দু পাড়ায় চব্বিশ পহর হল, ছোট বেলা আব্বা বলত, ‘ঐ শুন, হরিনাম হচে, ইবার পানি নামবেক।’ মনসুর আশমানের পানে তাকিয়ে পানি খুঁজত, পানি পড়ত, মাঠ জল থৈ থৈ করত, কত দিন পাড়ার রহমত, বিলাল, সাবিরদের সাথে চাষের মাঠেই সাঁতার দিত। সাবিরট আলকেউটের কামড়ে মরে গেল, ওর আম্মির সে কি কান্না, মনসুরের চোখের পানির সাথে সাবিরের আম্মির চোখের পানি এক হয়।মনসুর চাচার বুক কাঁপে, শরীরে গরম লাগে, ঘামে ভাসে খালি গা, গলায় গামছা, ঘাম মোছে। 

 চাচা জলিলের ঘর থেকে বেরোনোর পর একটা গাছের নিচে বসে।জলিল বেশি কথা বলতে পারে না, হাটে যাবার তাড়া দেখায়। মুখে বলে,‘চাচা, আজ ইমাম সাহেবের খাবার পালি ছিল, রোজা চলছে, উনি বললেন ইফতার দিয়ে দিতে।’ জলিল হাটে যায়, কিন্তু চাচা যাবে কই?একা একা হাটে যেতে সাহসে কুলায় না,ঘরের ভিতর গরম, পাখা নাই, কারেন্ট নাই, রেতে বাইরের বারান্দাতে শুতে হয়।এক ভাইয়ের পোলা জামিল, দুবেলা ভাত দেয়, চাল নেয়, চাষের ভাগ নেয়, ব্যাটার নিজের জমি নাই, বাপে দেয় নাই, গাঁয়ে গাঁয়ে ফেরি করে।জামিলের বিবি হাসিনা।আর কিছু দেয় না, সকালে এমনি মাসে ভুক লাগে তবে জানে জোর নাই,একবার ডাক্তার ঘর যেতে পারলে হত, কে নিয়ে যাবে? মনসুর চাচা একপা একপা করে এগোয়। 

–চাচা ধানের টাকা ঢুকল ? 

কথাগুলো শুনে থমকে দাঁড়ায় মনসুর, ‘ও, হিরু! আমি তো সরকারের কাছে ধান বিচি নাই, মিলে দিনছি, তাও ইবার পুরো টাকা দেয় নাই,ইয়ার থেকে মোহনকে দিলেই ভালো হত হাতে হাতে টাকা তো দিত।’

–আমিও তাই ভাবছি, কিন্তু উটো মহা ফোড়ে।গেল বছরের চাপানের টাকা দিতে পারি নাই, এবছর পুরো টাকা না মেটালে চাপান তুলতেই দিবে নাই।

–হিরু, আমার জন্য দু’বস্তা রেখে দিবি বাবা, আমার তো আর বাইরে থেকে আনার খেমতা নাই।

-সে হবে ক্ষণ, আমি পেলে তুমিও পাবে, তবে এখন ঘরে চলি যাও, গরমে বেশি ক্ষণ বাইরে থেকো না, এই দুদিন আগে এক জন গরমে মরি গেল, হাসপাতালেও নিয়ে যাওয়া গেল না।

–আর বাবা আমার কি আর নসিবে এত সুখ আছে ?

-এরকম কেন বলছ চাচা? জন্ম মৃত্যু সব তো ভগবানের দয়া, দান, তুমি আমি কেউইতো নিয়মের বাইরে নয়। শেষের কথাগুলো বলতে বলতে হিরু সামনের দিকে এগোতে আরম্ভ করতেই চাচা পিছন ডাকে,‘তুই বীজ কিনতে গেলে আমার লগে আনিস, কিলো বিশ আনতে হবে, আমি আনবার খরচ দিব।’ 

-আমি একটু বেলার দিকে যেছি, তুমাকে বলে যাবো। 

মনসুরের প্রাণ জুড়োয়।বাইরেটা দোজখের আগুনের মত, গায়ে ফোস্কা পড়ে।ছোট বেলাতে তো অতটা তাপ দেখে নাই, গরম কালে দিব্যি সব কাজ করা যেত, চাষ হত, পানি নামত।এবছর বোরোর চাষ নাই, ধানের টাকা নাই। গ্রামের কুয়োতে পানি কমছে, গেরামের পি.এইচ, এক বার জল দিছে।

হিরু  কিছু দূর গিয়ে ফিরে আসে, ‘চাচা একট কথা বলব? এবছর জমির চাষ আমি করি, অধের্ক হিসাব, কেউ কিছু বলবেক নাই।’

 চাচা শ্বাস ফেলে, ‘ভেবে দেখব, তবে জানিস তো অর্ধেকে আমার হবেক নাই, মেয়েকে প্রতি বছর টাকা দিতে হয়, জামাই যে খুব পাজি, এক্কেবারে ইবলিশ, হাসমতকে দিতে হয়, উয়ার তো জমিন নাই।’ কিছু সময় থেকে বলে, ‘তুদের পাড়ার কালি পুজো কবে?’

-দাঁড়াও ছুটু লোকদের মনসার পুজোট হোক, গেল বছর শুনলে নাই কেমন ঝামেলা হল, ই’বছর বলি দিছি, শালাদের মনসা আগে হোক, তারপর আমাদের কালি হবে।এবছর আমরা মনসার কুনু চাঁদা দিছি নাই চাচা।

মনসুর চাচা আবার শ্বাস ছাড়ে।হিন্দু পাড়ার মনসাটা খুব পুরানো, মনসুর চাচাও ছোট বেলাতে পুজো দেখতে যেত, কতবার ওষুধ এনেছে, এই মুসলিম পাড়ার অনেকের মনসার ওষুধে পেট হইছে, শুনেছে মনসার থানট নাকি সারায়ছে।একবার গিয়ে দেখে আসবার স্বাদ হয়, ভয়ও হয়, পায়ের জোর নাই।গেল বছর মনসার পুজোর সময় ফের ছিল, থানা পুলিশ, কত জনকে পুলিশে ধরে লিয়ে গেছিল, ই’পাড়াতে বসে বসে সব শুনিছে মনসুর।মনসার পুজোতে পার্টিও জড়ায় গেছিল।ই’পাড়াতেও জড়ায় ছে।কয়েকমাস আগে ইসমাইলের ব্যাটটকে মসজিদের থামে  সারারাত বেঁধে বিচার করলেক, ব্যাটাট অন্য পার্টির পতাকা লাগায়ছিল, কি মার মার।ইসমাইল  হাতে পায়ে ধরে,  উয়ার বিবিও পা ধরে।গ্রাম থেকে তার কাছে জরিমানা চায়, কত টাকা মনসুর চাচা জানে না, তবে অনেক টাকা, অত টাকা চোখে দেখে নাই।ইসমাইল জমি বিক্রি করে। সাইকেল, থালা বাটিও বেচে, তাও টাকা ওঠে নাই, গাঁ ছাড়া হয়। 

মনসুর আবার হাঁটতে আরম্ভ করে।একটু ফেরিঘাটের পানে যেতে হবে। পানি থাকলে কারোর কাছে পাম্পটা নিয়ে   ছড়ানো যাবে।একটু আগে করলে লেবার পাওয়া যাবে, এখন আর সাঁওতালগুলো আসতে খুঁজে না, ফিকির বানায়।আগে দল বেঁধে গাঁয়ে আসত, থাকত। একবার রোয়ার সময়, একবার কাটার সময়। চাপানটা গাঁয়ের লেবার দিয়ে হত। হিন্দু পাড়ার ঘোষেদের সাধন ঘোষ প্রতিবছর পাঁকুড় যেত, তখন ফোন ছিল না, সাঁওতাল লেবারদের গ্রামে আনবার জন্য আগে থেকে আসার ভাড়া দিয়ে আসতে হত।একবছর  ফিরে এসে কয়েকদিনের জ্বরে মারা গেল।সবাই একটু অবাক হয়ে গেছিল, কেউ বলল মশা কামড়ে দিয়েছে, কেউ বা, ‘কিছু খাইয়ে দিয়েছিল।’ চাচা শুনল ঘোষের নাকি চরিত্র মোটেই ভালো ছিল না, ওখানেও কিসব বদমাইশি করেছিল, ওরাই কিছু খাইয়ে দিয়েছিল, ঘরে ফিরে মারা গেল।তারপর থেকে কেউ আর পাঁকুড় যায় না, দু’বছর ওদের ওখান থেকে কেউ আসে নাই, আবার আসছে, তবে এখন  ফোনে বললেই হয়, যারা পারে আসে, সব কাজ করে তারপর টাকা নেয়।  এখন লেবারও কম লাগে, সব মেসিনে হয়, ঘন্টায় আড়াই হাজার দাও ধান কাটো, মিনিটে পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা দাও  ট্রাকটর চালাও।মনসুর চাচা জমির দিকে তাকায়, ফাটা জমি, মায়ের পায়ের মত, শুধু জমির বুক খুঁজে পায় না,তাও এক পা একপা করে লাঠি ধরে ধরে যায়, জমির আল ধরে বড় রাস্তা ধরে।ক্যানেলের কাছে গিয়ে অবাক হয়ে যায়, পানি কই, এ’তো ভিতরের পাথরগুলো সব গোনা যেছে, হাঁটুও ডুববে না,‘হায় আল্লা! এই সময় পয়ার উবছে পানি আসে, এখন রুখা শুখা, ভালো লাগে না।’

 এত দূর চলে আসার পর মনসুর চাচার ভয় লাগে, হেবি ভয়।চাচা, ক্যানেলের মুখে দাঁড়ায়।কেউরে নিশ্চয় পাওয়া যাবে, গাঁয়ে ছেড়ে দিতে বলবে,এই রোদে লুক কই? চাচা হাঁটার কথা ভাবে, পারে না, ক্যানেলের পারে বাঁজা আম গাছের নিচে বসে।খোলা আশমানের নিচে দাঁড়ালে গায়ে ফোস্কা পড়ে, এটাই কি দোজখ? রাসুলুল্লাহ আরাইহি ওয়া সাল্লাম।জানে হাল্কা বাতাস লাগে।চাচা গাছের গায়ে হেলান দেয়, চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসে।একটু পরেই চমকে ওঠে।হা,আল্লা চোখ লেগে গেছিল নাকি? চাচা উঠে ক্যানেলের জল চোখ মুখে ছেটায়, তারপর আস্তে আস্তে গ্রামের দিকে যেতে যাবে এমন সময় একটা ভিড় তার দিকে আসতে দেখে থমকে দাঁড়ায়।গাঁ থেকেই আসছে তো, এত লোক কুথাকে যাবেক।ভিড়টা চাচা চিনতে পারে, সবাই তার নিজের পাড়ার লোক।আরো সামনে আসতেই চাচা হাঁক দেয়, ‘আরে লিয়াকত, এই গরমে যাস কুথা?’

-চাচা তুমার সাথে এসে কথা বলব, এখন তাড়া আছে।কোমলপুরে হিন্দুরা আমাদের আল কেটে দিনছে, পানি দিলে উদের গাঁকে ঢুকি যাবেক।

–পানি কই, হুই দ্যাখ, পাথর দেখাচ্ছে।

-তুমি বীজতলা করগে যাও পানি দিবেকই, বিডিও অপিসে কথা বলিছি, না দিলে ভেঙি দিব অপিস। 

চাচা আর উত্তর দিতে পারে না।জানটা একটু জুড়াল,বাড়ির রাস্তা ধরে।

একটু বেলা হতেই গ্রামে হল্লা পড়ে।কোমলপুরের সাথে মোহনপুর গ্রামেও হিন্দুরা ক্যানেলের পানি নেবার লগে আল কাটে, তার একটু আগে ভবদিয়ার মুসলিমরা আল কাটে।বিডিও অফিস থেকে সামসের এসে খবর দেয়, খুব ঝামেলা হচে, পুলিশ এয়েছে।জল সবাই নিবেক, চাষ হবেক। চাচার কানে সব কথা আসে, চাচা তাও বসে থাকে, ট্যাঁকে টাকা গোঁজা, হাতে থলি, বীজ কিনতে হবেক।ভয় লাগে, জলের জন্য যদি গ্রাম জ্বলে, কে নেভাবে, কে জমিতে নামবে, কে বীজ ছড়াবে? গেরামের জুয়ান সব যদি গেরাম ছাড়া হয়?সেই যে বছর সিরাজুল মরল, সে বছর গাঁয়ের জোয়ানরা সব গাঁ ছাড়া ছিল, এক মাসের বেশি।চাচা আশমানের  দিকে তাকায় রুখা আশমান, ভয়ে গলা পর্যন্ত শুকিয়ে যায়, দুপুরের রোদ আরো বাড়ে, চারদিক শুখা।মনসুর চাচা বাড়ি ফিরে ভাত দিতে বলে,কেউ শোনে না, লোক নাই।একটা নাতিনকে ডাকে, ভাত দিতে বলে।লাতিন বলে, ‘কে দেবে, আম্মি নাই, আব্বাও জলের অপিস গেছে।’

-তুরা খাস নাই?

-আমাদের আম্মি ভাত রেখে ছিল, তুমি ছিলে নাই।

মনসুর চাচা লাঠি ধরে ধরেই আবার নিজের ঘরের ভিতরে যায়, তাক থেকে মুড়ি বের করে, জল ভিজেয়ে মুড়ি খায়।সারাদিন খুব ঘোরাঘুরি হয়েছে, শরীরে আর যুত নাই।ঘরের ভিতরে খুব গরম, দাওয়াতেই একটা শীতলপাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ে।চোখও লেগে যায়, কতক্ষণ লেগে ছিল, জানে শান নাই, চোখ দুটো খুলতেই দেখে  চারদিকটা কেমন যেন আঁধার পারা হয়ে গেছে।মাথার কাছকে ভাতের থালা নাই, সাঁজে ভাত খেতেও ইচ্ছে করে না।একপা একপা করে মসজিদের দিকে যায়, ইফতার কি হয়ে গেছে, হলেও বা কিছু না কিছু ঠিক খাওয়া যাবে, না হলে ইমামের ঘরেও কিছু পাওয়া যাবে।চলার পথে বিড় বিড় করে ‘জাহাবাজ জামাউ;ওয়াবতালতিল উ’রুকু; ওয়া ছাবাতাল আঝরু ইনশাআল্লাহ।’( ইফতারের মাধ্যমে পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং যদি আল্লাহ চান সাওয়াবও স্থির হলো।’)।মসজিদের কাছে আসতেই থমকে ওঠে, কে রে বাবা, এত লোক! মনসুর গিয়ে ইমামের কাছে বসে।শুধায়, ‘কি হল জি?’

-চাচা কি কবর থেকে উঠে এলে, গাঁয়ের খবর কিছুই জানো না নাকি?

মনসুর ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, ‘না গো বাবা, কিছুর খবর নাই, বয়স হয়ছে তো, জান খারাপ।’

-গাঁয়ের অনেককে পুলিশে বিডিও অফিস থেকেই তুলে লি গেছে, তুমি কিছুই জানো না?

–না গো বাবা, কত জনকে? 

-অনেক পুরুষকে, এই যারা অফিসে যায় নাই তারাই আছে।

মনসুরের আস্তে আস্তে অনেক কিছু মনে আসে।লিয়াকতরা সকালে অফিসে যাচ্ছিল। চাচা বলে, ‘ কোমলপুর আর মোহনপুরের হিন্দুরা ক্যানেলের ড্রেন কেটে নিজেদের গ্রামে পানি ঢোকাচ্ছে।তার মানে ওরাই ঝগড়া করছে?’ 

–ঐ মোহনপুর আর কোমলপুর গ্রামের সাথে কি মারামারি হইছে?

-শুধু হিন্দু গ্রামের দোষ দিয়ে কি লাভ চাচা, আমাদের গ্রামে পানি এলে সবাই পাবে, মোহনপুর কোমলপুরেও মুসলিম আছে।

–ওদের গাঁয়ে পুলিশ এয়েছিল, কয়েকজনকে খুঁজছিল, আমাদের গাঁয়েও আসতে পারেক, বাবুল, জুসিম পালাইছে। 

চাচা কথা বলে না, তবুও জোরে শ্বাস পড়ে।আজ ইফতার হয় নাই, সবাই পানি দিয়ে কোন রকমে রোজা খুলেছে। কাউরির খাবার মন নাই।

–তুমার জামিলও হাসপাতালে ভর্তি সেটো জানো ? 

চমকে ওঠে চাচা,‘কই, বৌ তো কিছু বললে নাকো?’

জামিলের তো জমি নাই, উয়ার বাপ এক ছটাক জমিও দেয় নাই, বেচারা গাঁয়ে গাঁয়ে ফিরি করে বেড়ায়।

–উয়াকে মারলেক কেনে ?

-তা তো জানি না, বিডিও অপিসে গাঁয়ের কয়েকজন ছিল তারাই হাসপাতালে নিয়ে গেছে, হাসিনা তো থাকছে গা। মনসুর চাচার সব মনে পড়ে, এই জন্য দুপুরে ভাত পায় নাই।কিন্তু একবার বলে যেতে পারত। চাচার চোখের সামনে সিরাজুলেও মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা ছবিটা চলে ভেসে আসে। কি ভয়ানক, এখনো তো উয়ার খিলালের ত্যানাগুলান মাটিতে মেশে নাই।

 চাচার হাত পা কাঁপতে আরম্ভ করে।একপা এগিয়েও মসজিদের চাতালে বসে পড়ে।কয়েকজন তাড়াতাড়ি এসে জিজ্ঞেস করে,‘চাচা, জান খারাপ লাগছে নাকি, ঘরকে যাবে?’ 

চাচা রা কাড়ে না।হাতে লাঠিটা ধরেই বসে থাকে।জামিলটা  সিরাজুল হয়ে যাবে না তো? মনসুর আল্লাহ তায়ালার কাছে দয়া রহমত চায়, দোয়া মোমিনের অস্ত্র,দীনের স্তম্ভ, আসমান ও জমিনের নুর, তার কাছে আর কোন জিনিস এর বেশি ফজিলত ও সম্মানের নেই।জামিলের বড় ব্যাটাটাও তো ছুটু, ঘরে একাই আছে, হাসপাতালেও তো হাসিনা একা, তাহলে?

চাচা কিছু সময় চুপ করে বসে থেকে লাঠি ধরেই ইমামের কাছে গিয়ে বলে,‘হুজুর গাঁ থেকে কেউকে আজকের রাতে জামিলের কাছকে যাবেক নাই?’ 

হুজুর কিছু সময় চুপ থেকে উত্তর দেয়, ‘এমন কথা কেন বলছেন চাচা? বুঝেন তো অনেক জনকে পুলিশ ধরিছে, উখানেও যেতি হবেক।’

-কিন্তু হুজুর আমার জামিলটাও যে খুব একা।

শেষের কথাগুলো বলতে বলতেই চাচা ডুকরে কেঁদে ওঠে।সবাই অবাক হয়,আশমানের পানে তাকায়, কে’জানে কতজন দোয়া করে আর কতজন আশমানের ঘরে এক টুকরো মেঘ খোঁজে।

Wednesday, November 30, 2022

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -29


 

নয়


 বিকেল বাড়ীর জানালার পাশে বসেছিল দেবীদাস। ছুটির দিন। মুকুলের সাথে সিনেমা যাবে। বাড়ী হতে ফোন করল মুকুলকে। সে সিনেমা যাবে না কারণ ওর মা অসুস্থ। তাহলে বিকেলটা কাটাবে কেমন করে চিন্তা করছিল। হঠাৎ রন্টু উপস্থিত হয়ে, দেবীকে বেরুতে বলল, দেবী রাজী।

 দুই বন্ধুতে ট্যাক্সির মধ্যে আলোচনা হলো তাদের গন্তব্য স্থান কোথায়। রন্টুর মনের অভিপ্রায় তার জানা ছিল না। তারা উপস্থিত হলো এক নিষিদ্ধ পল্লীতে, সেখানে দেহের কারবার নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা চলছে। দেবীদাসের জানায় বাইরে ছিল রন্টু এই নোংরা পরিবেশে এনে উপস্থিত করবে।

 দেবীদাস ভীষণ অপমান করল রন্টুকে। ঐ পল্লীতে কোন প্রকারে থাকতে মন চাইল না তার। সেই মাত্র ওখান হতে বেরুবার চেষ্টা করল, কোথা হতে এক ডানা কাটা পরী অর্থাৎ অপূর্ব সুন্দরী রমনী তার পথকে অবরোধ করে বলল, আমাদের কুঞ্জে যখন এসেছেন তখন ভেতরে প্রবেশ না করে চলে যাচ্ছেন কেন?

 মেয়েটির কোন কথা ভ্রূক্ষেপ না করে আগের মতো পা বাড়াতেই সে তার হাত দুটো ধরে ফেলল, এক কাপ কফি না খাইয়ে কোন মতেই যেতে দেবো না।

কোন প্রকারে সুন্দরীর কাছে নিজেকে মুক্ত করতে পারলো না দেবী। বুঝতেও পারলো নন্সা কোন যাদু মন্ত্রের ক্রিয়ায় ওর কাছে বন্দী হলো। তার সাথে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করল। কি সুন্দরভাবে পরিপাটী করে সাজানো তার কুঞ্জখানি । মধ্যিখানে বেশ বড় সড় গ্যালিচা পাতা ও তার চারিপাশে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। সেতার, তানপুরা, এসরাজ, হারমোনিয়াম, বাওয়া ও তবলা ইত্যাদি।

মেয়েটি যে একজন গায়িকা এ দৃশ্য দেখার আগে পর্যন্ত তার জানা ছিল না। বাড়ীর মধ্যে একপাশে একটা তক্তাপোষের উপর বিছানো আরামদায়ক গদি ও দুটো বালিশ। সেই তক্তাপোষে বসার জন্য অনুরোধ করল। বসে পড়ল দেবী।

মেয়েটি কলিং বেল চাপ দিতেই মাঝারি বয়েসের এক মেয়ে উপস্থিত হতেই মেয়টি তাকে বলল কফি আনতে।

দেবীদাস কোনরূপ বাধা দিতে পারল না। কিছুক্ষণের মধ্যে কফি এসে হাজির হলো। মেয়েটি তৎক্ষণাৎ তার অ্যাপায়ণের জন্য তার লোকদের নির্দেশ পাঠালো। ওর কার্যকলাপে কোনরূপ বাধা দিতে পারল না দেবী।

জানে না সে কি বশীকরণে বশীভূত হয়ে গেছে। কফির কাপে চুমু দিতেই লোকগুলো এসে হাজির হলো। সঙ্গীত চর্চার কাজে যথারীতি মনোনিবেশ করল। ওরা সকলে রেডি হয়ে মেয়েটিকে ইশারা করতেই গান শুরু হলো।

কি সুন্দর মেয়েটির কণ্ঠ, কি সুন্দর মায়া জড়ানো তার সুর, দেবীদাস ওর সুমিষ্ট কণ্ঠে অভিভূত হয়ে কতখানি যে মোহিত হয়েছিলেন তা বলতে পারব না। পরপর তিনখানি গান করলো মেয়েটি। গানকে ছোট হতেই ভালোবাসতো। তাই ভীষণ ভালো লাগলো তার।

গান চলাকালীন কত গ্লাস যে সরবৎ খেয়েছিল দেবী, তার হিসেব নেই। কিন্তু সরবতের মধ্যে যে দামী মদ ছিল তা জানতো না। গানের শেষে মেয়েটির প্রতি দেবীদাস গভীরভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছিল। সেদিন ঐ মেয়েটির কাছে কতক্ষণ ছিল মনে নেই। মনে হয় রন্টুই তাকে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়েছিল।

তবে ঐ পতিতালয়ে যাওয়ার কথা গোপন রাখতে পারেনি। অতি সহজেই মুকুলের কাছে ধরা পড়েছিল, বিশেষ করে ধরিয়ে দিয়েছিল - মুখে মদের গন্ধ ও লিপষ্টিকের দাগ। অবশ্য পরে জেনেছিল রন্টুই মুকুলকে বলেছিল গত রাত্রের কথা। তাই তাকে পরীক্ষা করার জন্য পরদিন সকালেই দেবীর বিছানার পাশে এসে হাজির হয়েছিল।

ঘুম হতে ঠিক সময়ে উঠতে পারল না দেবী। গত রাত্রের আমেজ বা কিসের নেশার ঘোরে বিছানা হতে অবসাদ ক্লান্তিতে বিছানা ত্যাগ করতে ইচ্ছে করছিল না। তার। মুকুল তাকে ঘুম হতে তুলতেই দেবীর মুখে মদের গন্ধ পেয়ে সে আকাশ থেকে পড়লো। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, তুমি মদ খেয়েছ?

বিষ্ময়াপন্ন হয়ে বলল, কি বলছো মুকুল? তুমি পাগল হলে না কি? মুকুল তখন গম্ভীর। হ্যাঁ আমি পাগল হয়েছি।

 ঠিক বুঝতে পারছি না।

 সব পারবে। জামায় কিসের দাগ?

 জামায় দাগ? কিসের? জামার দিকে তাকিয়ে দেখল, সে মিথ্যা বলেনি। কাল রাত্রে কোথায় ছিলে?

 বাড়ীতে ছিলাম।

 মিথ্যে কথা। কাল তুমি কোথায় গিয়েছিলে তার প্রমাণ তোমার ঐ মুখের গন্ধ? জামায় লিপস্টিকের দাগ। দেবীদাস তুমি এতো নীচে নেবে যাবে বিশ্বাস করতে পারছি না। তুমি উপরে মানুষের মুখোশ পরে আছো, তোমার অন্তর পাশব প্রবৃত্তিতে ভরা।

 মুকুল কথা শোন, আমি কোন অন্যায় করেছি বলে মনে হয় না। বিশ্বাস করো। আমি বুঝতে পারিনি গত রাত্রে কোন অন্যায় করেছি কি না। তুমি আমার ভালবাসার পাত্রী কোন দিন মিথ্যা বলিনি তোমায়, গত রাত্রে বন্ধুর কুপরামর্শে আমি পতিতলালয়ে গিয়ে ছিলাম। তা এখন অকপটে স্বীকার করছি। কিন্তু কোন অন্যায় -

 চুপ করো? দেবীদাস বড় ভুল করেছি একজন বিখ্যাত শিল্পপতির ছেলেকে ভালোবেসে। কারণ তোমাদের মতো সৎ আভিজাত্যে পূর্ণ ব্যক্তিদের চরিত্রের অন্তরালে যে নোংরা, আবর্জনায় পরিপূর্ণ থাকে তা তোমাকে দেখেই বুঝতে পারলাম। কি প্রয়োজন ছিলো আমার প্রতি ভালোবাসার ছলনা করে নিত্য নতুন সহচরী করতে? ছিঃ ছিঃ দেবীদাস তুমি এইভাবে ভদ্র সন্তানের পরিচয় দেবে?

 মুকুল, এতোখানি হীন মনোবৃত্তি নিয়ে আমার চরিত্রের বিচার করো না। হয়তো কোন কারণবশতঃ পদঙ্খলন হয়েছে। নিজের নীতিবোধে মানবতাকে অবমূল্যায়ণ করেছি। কিন্তু তুমি আমার অপমান করো না, ভগবানকে ভুল বুঝ না ।

 ভুল, অপমান? দেবীদাস, তোমাকে অপমান করার যোগ্যতা অর্জন করিনি। তবে আগে হতে সতর্ক হলাম একজন ঠক্, প্রতারক এবং চরিত্রহীনের সঙ্গে চিরদিনের সম্পর্ক পাতাবার আগে ঈশ্বর যে সতর্কের ইঙ্গিত দিলেন, এজন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম। আমি চললাম, আশা করি কোন দিন আর দেখা করার চেষ্টা করবে না।

Tuesday, November 29, 2022

ছোট গল্প - ভুতুড়ে ট্যাভার্ন || লেখক - বৈদূর্য্য সরকার || Written by Boidurjya Sarkar || Short story - Vuture tavarn


 


ভুতুড়ে ট্যাভার্ন

বৈদূর্য্য সরকার




'ঋতুপর্নের ফিল্মের ইন্টিরিয়ার কৈশোরে কল্পনা করে , মধ্যতিরিশে যাদের ঘরদোর জীবন হয়ে যায় স্বপন সাহা মার্কা... তারা সব এসে জোটে বন্দুক গলিতে ।'

শুনে রে রে করে ওঠে পিনাকি । সে এখনও বুঝতে চায় না, আমাদের মতো এখানকার সবার জীবনের চিত্রনাট্য লেখা শেষ হয়ে গেছে এবং তা চূড়ান্ত ফ্লপ । আমি হেসে বলি, আর তো ক’টা দিন... তারপর তাড়াতাড়ি বুঝে যাবি নিয়তির মানে কী ! আজ পিনাকির জন্মদিন । সব বড় বড় লোকের মতো সে গ্রীষ্মের জাতক । এক আধুনিক জ্যোতিষের কাছে শুনেছি, গরমকালে জন্মানো লোকেদের তাকদ অন্যদের থেকে বেশি হয় । সূর্যের তাপ ওরা ধারণ করতে পারে । সত্যি মিথ্যে জানি না, তবে এটা ঠিক পিনাকির উত্তাপ উদ্দীপনা খানিক বেশি । বড় একটা আলসেমি তাকে মানায় না, বিস্তর দৌড়ঝাঁপের কাজ । সেজন্যে দরকার যথেষ্ট ফুয়েল ফর ইন্টারন্যাল সিস্টেম। আমি অবশ্য ইদানিং ওর সাথে পাল্লা দেওয়ার অবস্থায় থাকি না মধ্যতিরিশে এসে। তাছাড়া বসারও সুযোগ হয় না বিশেষ ।

দু'বছর অবশ্য লকডাউন আর করোনাতেই কেটে যাচ্ছে । নয়তো ট্যাভার্ণে দু’পাত্তরের ব্যবস্থা হতো ।

এখন সবার অবস্থা হয়েছে আত্মহত্যাপ্রবন । আগে এ কথা পদ্যেই ব্যবহার করেছি, এখন জীবনে উঠে এসেছে । মাসের পর মাস কাজ নেই, মাইনে অনিয়মিত । তার মধ্যে নানারকম রোগ ব্যাধি আর মিডিয়ার ভীতিসঞ্চার করা খবর । রোজই নতুন নতুন তরিকায় সেই এক ভয়ের খবর তুলে ধরা । এই করেই যে কত কোটি লোকের কাজ গেছে, আরও কত যাবে... তার ঠিক নেই ।

ভোম্বলদা আড্ডায় এসে মিডিয়ার লোকেদের একহাত নেয় । তার ট্যুরিজিমের অবস্থা সঙ্কটজনক, আর প্রাইভেট টিউশান তো উঠে যাওয়ার পরিস্থিতি । পরীক্ষার ঠিক নেই যেখানে, কে পয়সা দিয়ে পড়তে আসবে । শুনলাম, ছাত্রদের বাঁশ দেওয়ার ভরপুর ঐতিহ্য ভুলে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত বাড়িতে বই দেখে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে ।    

এই দু'টো বছর যা চলছে মাথাখারাপ অবস্থা হয়েছে সবারই । তবে ভোম্বলদার একটা ব্যাপারে জ্ঞান বেশ টনটনে, ঘরে আসর বসানোর ব্যাপারে। বাইরে গিয়ে খরচ করা পোষায় না তার । জ্ঞান হওয়া ইস্তক আমি টানাটানির এই গল্প বাপমায়ের মুখে শুনতে শুনতে এমন অভ্যস্ত হয়ে গেছি, আজকাল আর আলাদা করে বিশেষ দুঃখবোধ হয় না । বাপমা তাদের পঞ্চাশ বছরের পুরনো ভ্যালুজ আর সর্বদা এই টানাটানির কীর্তন শুনিয়ে জীবনের প্রথম তিরিশ বছরের দফারফা করে ছেড়েছে । পরের তিরিশ বছরের দায়িত্ব নিয়েছে বৌ । সেই প্রাচীন কাহিনী আর সেসবের বাইরে না যাওয়া মন । দোষ দিয়েই বা কী লাভ ! অধিকাংশ মেয়েকেই দেখি – ডিজিট্যাল গ্যাজেটে অভ্যস্ত, ইউটিউব দেখে রান্না থেকে চুল বাঁধা শিখে ফেসবুক লাইভ, ফেমিনিজম চটকে তামাম ছেলেপুলের মাথা খারাপ করে... অথচ মনের মধ্যে দু’শো বছরের অন্ধকার । যদিও সেসব সরাসরি বলার উপায় নেই । বাপের পয়সায় ফুটানি করে সব হয়েছে বিপ্লবী । আর পরবর্তী জীবনে বর নামক একটি দুর্লভ গর্দভ তৈরি আছে যাবতীয় জিনিসের বোঝা বওয়ার জন্যে ।

এক সহকর্মী বলে- দ্যাখো ভাই, এসব বলে তো লাভ নেই... আমাদের কামের তাড়নাও তো আছে । মানি, তা অন্যান্য প্রবৃত্তিগুলোর থেকে অবশ্যই গুরুতর হয়ে ওঠে একটা বয়সের পর । এর টানেই জীবনের যাবতীয় আহ্লাদ আকাঙ্ক্ষা আশাকে জলাঞ্জলি দিতে হয় । ঢুকতে হয় দাম্পত্য নামক এমন একটা ব্যাপারে – যেটা দুনিয়ার কেউ খুব ভাল না বুঝলেও সবাইকেই পালন করে যেতে হয় নিয়মমাফিক ।  তাই পিনাকির যাবতীয় আত্মবিশ্বাসী কথার  একটাই উত্তর দিই , বিয়ে থা হোক... তারপর দেখবো ।  তাতে পিনাকির মতো তর্করত্ন পর্যন্ত ব্যাকফুটে গিয়ে বলে, হ্যাঁ... তখন পরিস্থিতির বিচারে কথা তো বদলে যেতেও পারে ।

আমরা লক্ষ্য করছিলাম, চারদিক কেমন যেন ফাঁকা হয়ে আসছে । আশপাশের সব জায়গায় খাঁখাঁ শূন্যতা । থেকে গেছে আমাদের মতো কিছু ব্যর্থ লোকজন । সব বাড়িতেই সিনিয়ার লেভেলে মৃত্যুমিছিল । থাকার মধ্যে অশক্ত বৃদ্ধা আর আমরা । যাদের বিয়ে হয়েছে তাদের বউ । তবে এটা বোঝা যাচ্ছিল, বাড়িতে ছেলেবেলায় দেখা স্থানাভাব ব্যাপারটার উল্টোদিকটাও খুব একটা স্বস্তির নয় ।

বন্দুক গলিতে যাওয়া আমাদের সাবেক দলেও ভাঁটার টান । একসময় ছ’আটজন মিলে যাওয়া হয়েছে । এপাড়া সেপাড়া, কাবাব পরোটা, খালাসিটোলা অশোকা সব ফুরিয়ে শেষে এই বন্দুক গলি । নাম বাহারি হলেও ক্রমশ ম্রিয়মাণ এসব অঞ্চল । সব বুড়োঝুরো লোকেরা আসে। যারা খুঁজেপেতে এখানে আসে, একটাই কারণ – শহরে সবথেকে সস্তা । একটা জিনিস লক্ষ্য করছিলাম – আমাদের যতো বয়স বাড়ছে, কথাবার্তাও যেন ফুরিয়ে আসছে । ‘যা হওয়ার তাই হবে’, এর’ম একটা ভাব দিনকে দিন বাসা বাঁধছে ।

বন্ধু তার বন্ধু আবার তার বন্ধু... এভাবে জড়ো হতো লোক । যেমন আমাদের পাড়ার বন্ধু পটলা, তার সংগঠনের বন্ধু  বোধি, তার ইউনিভার্সিটির বন্ধু ইসমাইল । পটলা ও বোধি আবার থার্ড স্ট্রিম পলিটিক্সে ভিড়েছিল । এখন অবশ্য সেসব ফরসা। পিনাকি আবার এখনকার শাসকের এককাট্টা সমর্থক, আমি বিরোধি । মুছে  যাওয়া আগের শাসক দলের নেতার দৌহিত্র ইসমাইল । সে আবার ইংরিজিতে নভেল লেখে । শুনলে কেমন আশ্চর্য লাগে । তবে ছেলেটা একেবারে মাটির মানুষ । তবে ওইটাই যা বেশি শক্ত । সে শিলঙের স্কুলে পড়ত, সেখানে শ’খানেক অ্যাফেয়ার । এখানেও কয়েকটা কেঁচেগণ্ডূষ সম্পর্ক । সেসব নিয়ে আমাদের কারোর মাথাব্যাথা নেই অবশ্য । বরং তার পড়াশোনার রেঞ্জ দেখে হীনমন্যতায় ভুগতে হয় । তবে পানশালায় কোনও কথাই দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয় না ।

‘সমবেত হাসিঠাট্টায় দিন কাটে’ – এমনটা বলতে পারলে ভাল হতো । ইদানিং পিনাকির সাথে পটলা বা ইসমাইল ছাড়া বড় একটা কেউ আসে না । ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই ।  ব্যস্ততার ভাণ করতে হয় ।

পিনাকি রোজগার যাই করুক  না কেন, পানশালায় সে কার্পণ্য করে না। তার চোখেমুখে তখন যাবতীয় দৈন্যকে কিনে নেওয়ার স্পর্ধা ফুটে ওঠে । খানিকটা অকাতরেই টাকাপয়সা ছড়ায় বেয়ারা দারোয়ানদের মধ্যে । ফলে খাতির পায় নিঃসন্দেহে । কিছু বলতে গেলে বলে, এতে তার মেজাজ শরিফ থাকে ।

মেজাজ নিয়েই তো হয়েছে ঝামেলা । বাল্যে সেসব নিয়ে বোধ থাকে না । কৈশোর থেকে আমরা বোধহয় নানারকমে হেজে গেছিলাম । বেশ মনে পড়ে, একটা সময় পর্যন্ত মুখে একটা অমলিন হাসি লেগে থাকতো - যা অকাতরে দেওয়া যায় । কিন্তু আজকাল খেয়াল করে দেখেছি, রেজাল্ট চাকরি মাইনে সংসার সব মিলিয়ে কপালে একটা স্থায়ী ভুরু কোঁচকানো ভাব চলে এসেছে । পিনাকির ক্ষেত্রে দেখেছি, অদ্ভুত একটা আক্রোশ জন্মেছে জগৎ সংসারের প্রতি। সেটা অবশ্য অকারণে নয়, যে কিশোরীকে সে টিনএজ থেকে স্বপ্নে দেখেছে... সেই মেয়েটি এখন জননী হলেও যোগাযোগ করে মাঝেমাঝে । তাতেই বাবুর ঘুম উড়ে যায় ।


আমাদের কৈশোরে ক্রিকেটে বেটিং জিনিসটা নিয়ে খুব হইচই শুরু হয়েছিল । তারপর নানা কাণ্ডকারখানার পর এখন দেখি বেটিং সাইট খেলার উদ্যোক্তা হয়ে বসেছে । আমরাও ড্রিম ইলেভেন খেলি পাঁচ দশ টাকার । খেলা দেখলে মনে হয় – সব স্ক্রিপ্টেড । তবু দেখি, সন্ধেবেলায় বিনোদন তো বটে । শিল্প সাহিত্য খেলাধুলা সবই আসলে বিনোদন, অন্তত তাই ভাবলেই সুবিধা । অনেক লোকে হাহুতাশ করে – বই না পড়ে ঘরের বউরা মেগাসিরিয়াল বা চ্যাট করে কেন ! মনে হয়, তার আগে গৃহকর্মের ভেতরে বিনোদন ঢোকানো ছিল । কিন্তু বিনোদনের নিয়মে যেটা কম পরিশ্রমে বেশি মজা দেয়, সেটাতেই তো মানুষ মজবে ।

‘সব জায়গাতেই অপ্রাপ্তি থেকেই আমাদের যাবতীয় পণ্ডশ্রম’... বোঝার বয়স হয়ে গেলেও আমরা বন্দুক গলিতে এসে সে কথা ভুলে যাই । সেই থেকে যাবতীয় তর্কাতর্কি রাগ মনখারাপ । ফেরার পথে আগে সামনের একটা দোকানে বিফ কাবাব খাওয়ার অভ্যেস ছিল । এখন সবাই অম্বলজনিত কারণেই হয়তো খালি পেটেই থাকতে পছন্দ করে । তাতে খরচ কমল আবার বাড়ি ফিরে কুমড়োর ঘ্যাঁট সাগ্রহে খাওয়ার মতো একটা পরিস্থিতিও তৈরি হল । মনে হয়, আমাদের আগের প্রজন্মের বাইরে খাওয়া বেড়াতে যাওয়ার অভ্যেস ছিল না বলে টাকাপয়সা খানিকটা জমেছিল। সুবিধে ছিল, তাদের নাকের ডগায় এর’ম বিপুল বিজ্ঞাপন ও ইএমআইয়ের সুবিধের কথা ঝোলানো থাকতো না।

একদিন যেমন ইসমাইল বলল, ওর একটা এক লাখের চাকরি চাই । জানি, এসব কথা দু’পাত্তরের পরেই চলে । সেজন্যে পিনাকি বলে উঠল, ওর দরকার দু’লাখ । একলাখ তো ওড়াতেই চলে যাবে । মোদ্দা কথা হল, এর’ম অনেককিছুই আমরা প্রত্যেকে চাই । কেউ কেউ পায়, বাকিদের মার্কেটের নিয়মে স্বাভাবিকভাবে হয় না । কিন্তু যখন দেখা যায়, বিরাট চাকরি করা লোকেরা এমন কিছু নিউটন আইনস্টাইন নয়... সেখান থেকেই শুরু হয় যাবতীয় অশান্তি ।

বাল্যের রেডিওতে ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই’ শুনে আমি দিব্যি কাঁদতাম । স্পষ্ট মনে আছে । পরে ভেবে দেখেছি, স্মৃতি জিনিসটা বড় বেআক্কেলে । আর আমি যে যুগের লোকে যেখানে এই গানের পৌঁছনোর কথা নয় । তবু মিস্তিরিদের নিত্য ঠোকাঠুকির ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট টিভি কিংবা মহালয়ায় জেগে ওঠা রেডিও তখনও আমাদের অবলম্বন । সেই থেকে মনের মধ্যে একটা বদ্ধমূল হীনমন্যতা চেপে বসে আছে । মনে হয়, অদ্ভুত এক পরিস্থিতির মধ্যে আমরা তখন বড় হয়েছি । এর থেকে ভাল অবস্থায় অনেকে ছিল নিশ্চিত, কম্পিউটার না হলেও ছোটবড় নানারকমের ভিডিও গেম অনেকের হাতে । এয়ারগান নামের অতি উত্তেজক জিনিস দেখে থাকলেও কেনা যায় বলে জানতাম না । দৌড় ছিল চার’ছ টাকার ক্যাপ বন্দুক ।

পরে ভেবে দেখেছি, চারপাশের লোকজনের উপহার দেওয়ার প্রবণতা বড় একটা ছিল না । অন্তত আমার ক্ষেত্রে । আসলে এদিক থেকে যের’ম, উল্টোদিক থেকেও একই রিঅ্যাকশান । পুরোটাই একটা সিস্টেম । পুজোয় সংখ্যায় বেশ কিছু জামাকাপড় হলেও অধিকাংশ এলেবেলে ধরণের । ফলে কলেজে ভর্তির পর টিউশানি ইত্যাদি করে পুজোর খরচ তোলাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল । বাড়ির লোকের ধারণা ছিল, পুজোর দিনে ঘরে বসে থাকলে ছেলের মন খারাপ । তাকে সেজন্যে বাইরে যেতে উৎসাহিত করো । কিন্তু বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে যে টাকাপয়সা লাগে এবং সবার অবস্থা একরকম হয় না...। সেটা বাড়ির গোদাগুলোর না বোঝার মতো কি ছিল, কে জানে ! 

এখন ভোম্বলদাকে দেখে মনে হয়, সবার আজকাল গরীব থেকে হঠাৎ বেমক্কা বড়লোক হওয়ার নেশা । তখন তার উল্টো মতটা চালু ছিল । যদিও জীবন সংগ্রামের নানা গালভরা নাম শুনে আজকাল সেগুলোকে প্রলাপ বলেই মনে হয় । ভোম্বলদা ফেসবুকে বিজ্ঞাপন করে কিছু লোক জোগাড় করে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে । মন্দ হয় না, নিজের ঘোরাটা উপরি । এমনিতে একা মানুষ, সময় কাটাতে কিছু একটা করতে হবে তো !

ভোম্বলদা আগের বামপন্থী সরকারের ছাত্র শাখার জেলাস্তর পর্যন্ত উঠেছিল । দু’চারটে বইপত্র পড়ে স্টিরিওটাইপ বিপ্লবী বক্তৃতা করতেও শিখেছিল । যদিও ক্যাবলা বলে তেমন কিছু বাগাতে পারেনি । ইসমাইলকে দেখার পর বুঝেছি, এই না বাগাতে পাড়া লোক দলটার সব স্তরেই ছিল । সেজন্যে তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেছে । এখনকার সরকার এক অর্থে বেশ এফিসিয়েন্ট – ফেলো কড়ি মাখো তেল ।

আমার অবশ্য কোনও কিছুতেই আজকাল তেমন ইন্টারেস্ট নেই । দুর্গাপুজো থেকে ভোট... সব ইভেন্ট তুলে দিলেই বা ক্ষতি কী – এর’ম একটা ভাব। পিনাকি বলে, তুমি কি নিহিলিস্ট হয়ে গেলে নাকি ! আমি উত্তরে বলি, আমার আর কিছুই হওয়ার নেই । সব চুকেবুকে গেছে ।

এখন সব কিছুকেই মনে হয় – নিয়তি নির্দিষ্ট । কোথাও আলাদা কিছু হওয়ার জো নেই । বললে, অনেকেই রেগে ওঠে । তাহলে পক্ষে ভোট দিলেও যা বিপক্ষেও তাই ! আমার মনে হয়, একজনের সামান্য ভোটে কি সত্যিই কিছু বদলায় ? পিনাকি যুক্তি দেয়, তোমার মতো ভাবলে কোনও দেশে কোনও কালে কোনও পরিবর্তন আসতো না । ভাবি, সেও ঠিক । বন্দুক গলিতে এসব আলোচনা করে বাড়ি ফেরার পথে বিশেষ কিছু মনে থাকে না । ইসমাইল কীসব কঠিন থিয়োরি আলোচনা করে, নানারকম বইয়ের রেফারেন্স দেয়... ভাল বুঝতে পারি না । তার দল এই দশ পনেরো বছরে একেবারে এভারেস্টের চূড়া থেকে পাতালের গভীরে গিয়ে হারিয়ে গেছে, মনে থাকে না বোধহয় নেশার ঝোঁকে। 

একদিন সে বলল, গ্রাফিক নভেল লিখবে তার জন্যে ছবি আঁকার লোকের ব্যাপারে নানা সমস্যা । তার সাথে বলল, কোন একটা বইয়ে কী পড়েছে যা পড়ার পর আর বিয়ে করা যায় না । দু’টো মিলেমিশে আমার মনে রয়ে গেল – বিয়ের কার্টুন আঁকার জন্যে লোক দরকার । মনেই শুধু থাকলো না, ফেসবুকে আপডেট দিয়ে ইসমাইলকে ট্যাগ করে টাকাপয়সার সুবন্দোবস্ত আছে... সেটা জানাতেও ভুললাম না । তারপর জানি না কী ঘটেছিল । আর আমাদের দেখা হয় না অনেকদিন ।

পিনাকির মুখে খবর পাই, সে বাড়িতে নানারকম এক্সপেরিমেন্টাল জিনিস রেঁধে খাওয়ায় । তার সাইক্লিক দাম্পত্য কলহের কাহিনী শুনি । বুঝতে পারি, নানা তত্ত্ব পড়া নভেল লেখা লোকের দাম্পত্য তো আর সাধারণ চারটে লোকের মতো হবে না । দাম্পত্য জিনিসটা এখন শুধুমাত্র সরকারি চাকরিতে বিপুল ঘুষ পাওয়া কিংবা কর্পোরেটে উন্নতি করা লোকেদের ক্ষেত্রেই সুখকর ।

কেন্দ্রীয় সরকার কেন যে একটা কঠিন নিয়ম আনছে না, কে জানে ! 'এক লাখের নীচের লোকেদের সংসার করার অধিকার কেড়ে নেওয়াই সুবিধেজনক...' আড্ডায় এসব বললে ওরা বেশ মজা পায় । যদিও সবাই জানে, সামাজিক নিয়মগুলো বড় নাছোড়বান্দা । একদম সোজা নয় । যে ব্যর্থ, কম রোজগেরে – তাকে বাতিল করে দেওয়া নয়। বরং প্রতিমুহূর্তে দগ্ধে মারা হয় । চোখের সামনে নানা উদাহরণ দেখিয়ে প্রতিদিন জীবন সম্বন্ধে একটু একটু করে বীতশ্রদ্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া ।

‘আমি সর্বোতভাবে বুঝতে পেরে গেছি – সংসার নামক প্রতিষ্ঠানটি জীবনের যাবতীয় সুখ ব্লটিং পেপার হয়ে শুষে নিচ্ছে’ । ব্লটিং পেপার কখনও না দেখলেও উপমাটা লাগাই নিয়মমাফিক । পিনাকি খানিকটা রেগে বলে, সে তোমার ম্যানেজেরিয়াল স্কিলের অভাব... নয়তো তুমি যা বলছ সেতো চরম নারীবিদ্বেষী কথা । জানি সে  লিব্যারাল, তার ব্যাপার আলাদা । বাড়িতে বৃদ্ধ বাপমা, শ্বশুরবাড়িতেও তাই...চাকরির হ্যাপা তার ওপর বউবাচ্চার দায়দায়িত্ব নিয়ে লোকজন কী করে নেচে বেড়ায়, আমি সে কথা বুঝে উঠতে পারিনি । ব্যক্তিগত বলে যেখানে কিছু লুকিয়ে রাখা যায় না। সেটাও কি পুরুষ মানুষের একটা আক্ষেপ নয় ? শুনে অনেকে বলে, কী একেবারে কেজিবির চর হে তুমি ! যেন ব্যক্তিগত ব্যাপারটা ওদের ইন্সটিটিউশানাল নিয়মে চলবে ।

আমি শেষপর্যন্ত বুঝে গেছি, প্রতিটি চরিত্রের জন্যে দুটো করে লোক দরকার । একজন কাজকর্মের শেষে পানশালায় বসে হৃদয় জোড়াবে, আরেকজন ঘরসংসার ও সামাজিক ব্যাপারে ব্যস্ত থাকবে । এই দু’জনের দেখা হয়ে গেলে কী হবে, কেউ বলতে পারে না । তখন হয়তো শুরু হবে নতুন কোনও কাহিনী ।

পিনাকি যেমন তার যাবতীয় চমকপ্রদ কথাবার্তা পজ করে ঢুকতে চলেছে জীবনের পরবর্তী দৃশ্যে - গার্হস্থ্য পর্যায়ে। ওর ব্যাচেলারস’ পার্টির পরে বন্দুক গলিতে আনাগোনার পাট চুকলো । শুনছি, এখানে সব ভেঙেচুরে নতুন করে তৈরি হবে ।

ব্যবস্থাটা বেশ অদ্ভুত ছিল – একতলায় দিশি, দোতলায় বিলিতি । আর তিনতলায় যা ইচ্ছে। বেয়ারাদের মুখে শুনেছি, মাঝরাতে একতলা থেকে মাতাল ভূত তিনতলায় উঠতে চায় । দোতলায় ততক্ষণে কারা সব মান্না দে’র গান ধরে । সেই প্রজন্মের শেষটা আমরা দেখেছিলাম । জীবনের প্রান্তে পৌঁছনো লোকেরা, যৌবনে শোনা গানগুলো বেসুরো গায় । গল্প বলে, কোথায় যেন নাচতে যেতো। এরা খানিকটা আয়নার মতো ছিল, যাদের কথা শুনে পিনাকি আমাদের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতো এবং সেসব ভারি দুঃখিত মুখে বলতো ।

যদিও সেসব কথা পিনাকিকে এখন মনে করিয়ে লাভ নেই, তার চোখে মায়া অঞ্জন লেগে আছে – স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

ছোট গল্প - লোনাজলে হাবুডুবু || লেখক - রানা জামান || Written by Rana Zaman || Short story - Lonajole Habudubu


 


লোনাজলে হাবুডুবু 

রানা জামান




ফিরে যাচ্ছে দুই ছেলে রবিউল আহমেদ ও সায়মন আহমেদ। সাথে বিদেশি স্ত্রী ও সন্তানগণ। নায়লা আহমেদ ওদের বাড়িতে ঢুকতে দেন নি। বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে দুই ছেলের কেউ আসে নি জানাজায় অংশ নিতে। এক বছর পরে এসেছে বেড়ানোর মনোভাব নিয়ে বাবার কবর জিয়ারত করতে। 

মা নায়লা আহমেদ ওদের বাড়ির ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে বললেন, আহমেদ বাড়ি এখন আর কারো বাড়ি নেই। এই বাড়ি এখন জামশেদ বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধাশ্রমে কোনো জোয়ান ছেলেমেয়ের স্থান হয় না! ওরা বৃদ্ধ হবার পর সন্তান কর্তৃক অবহেলিত হয়ে এখানে এলে আশ্রয় মিলতে পারে!

বিদেশি দুই স্ত্রী নায়লা আহমেদের কথা না বুঝে তাকিয়ে থাকলো নিজ নিজ স্বামীর দিকে; আর রবিউল আহমেদ ও সায়মন আহমেদ বিস্মিত হয়ে মার দিকে তাকিয়ে নিস্প্রাণ হাসার চেষ্টা করছে। দুই ছেলের দুই সন্তান মার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। 

রবিউল বললো, মা, তুমি ঠাট্টা করছো আমাদের সাথে।

নায়লা আহমেদ বেশ রুক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, তোদের সাথে কি আমার ঠাট্টার সম্পর্ক? 

খবর পেয়ে গ্রামের লোকজন ছুটে এসেছে জামশেদ বৃদ্ধাশ্রমের সামনে। এ বিষয়ে গ্রামের কেহই নায়লা আহমেদের সাথে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। 

সায়মন আহমেদ এগিয়ে এসে বললো, তখন আমরা কাজ থাকায় আসতে পারি নি মা। আমাদের ক্ষমা করে দাও!

নায়লা আহমেদ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখে বললেন, তোরা যেদিন তোদের বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়েও আসতে অস্বীকার করলি, সেদিনই তোদেরকে আমি মনে মনে ত্যাজ্য করে দিয়েছি। আজ আমি আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাজ্য করলাম। তোদের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক রইলো না! তোরা যা!

রবিউল আহমেদ ও সায়মন আহমেদ ধীর পায়ে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে মাইক্রোবাসে উঠলো। মাইক্রোবাস চলে যেতে থাকলে নায়লা আহমেদ তাকিয়ে থাকলেন ওদিকে। ওঁর চোখের কোলে চলে এলে এক ফোঁটা অশ্রু।তিনি চলে গেলেন এক বছর আগের অতীতে-


তখন নায়লা আহমেদ স্বামী জামশেদ আহমেদ সহ বড় ছেলে রবিউল আহমেদের সাথে অস্ট্রেলিয়া ছিলেন। পুত্র ও অস্ট্রেলিয়ান পুত্রবধূ সারাদিন বাইরে থাকে চাকরির সুবাদে। বাসায় তিন বছরের ছেলে ডেভিড দাদির কাছে থাকে; অর্থাৎ নাতি লালন-পালনের দায়িত্ব দাদা-দাদির। কোনো কাজ নেই, কথা বলার কেউ নেই,সারাদিন বাসায় থেকে হাঁপিয়ে উঠতে থাকেন জামশেদ আহমেদ। এর উপর সারা বছর পরে থাকতে হয় শীতের কাপড়।

জামশদে আহমেদ ও নায়লা আহমেদ উভয়ই সরকারি চাকরি করতেন। ছয় মাসের ব্যবধানে দু’জনই সরকারি থেকে অবসরে আসেন। জামশেদ আহমেদ অতিরিক্ত সচিব এবং নায়লা আহমেদ অধ্যাপক পদে অবসরে যান। নায়লা আহমেদর ছেলেদের কাছে গিয়ে থাকার ইচ্ছা থাকলেও জামশেদ আহমেদের ছিলো না। স্ত্রীর পীড়াপিড়িতে যেতে বাধ্য হলেন অস্ট্রেলিয়া। 

তিন মাস পেরোবার পরে একদিন জামশেদ আহমেদ স্ত্রীকে বললেন, আমি ক্রমেই হাঁপিয়ে উঠছি এখানে থেকে। দেশে ফিরে যেতে চাই। 

নায়লা আহমেদ বিস্মিত হয়ে বললেন, কী বলছো তুমি! আমার ভালোই লাগছে। নাতির সাথে খেলা করে দিন চলে যাচ্ছে বেশ।

তাহলে তুমি থাকো। আমি চলে যাই।

তা কী করে হয়! তুমি চলে যেতে চাইলে আমাকেও যেতে হবে তোমার সাথে। বুড়ো বয়সে তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না!

রবিউল আহমেদ বাবাকে মানাতে ব্যর্থ হয়ে কানাডাবাসী ছোটভাই সায়মন আহমেদকে জানালে সে ভিডিও কলে বাবাকে বোঝাতে চেষ্টা করে; ও বাবা ও মাকে অস্ট্রেলিয়া ভালো না লাগলে কানাডা চলে আসতে বলে। সেও ব্যর্থ হয়।

মাতৃভূমি টানতে থাকায় জামশেদ আহমেদ নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এক সপ্তাহ পরে চলে আসেন বাংলাদেশে।


খবরটা শুনে গ্রামের সবাই অবাক হলেও তৎক্ষণাৎ কেউ এলো না এবাড়িতে। কারঙ্কা গ্রামে এখন ওরকম চাকুরিজীবির সংখ্যা অনেক। আহমেদ বাড়ির সাথে পার্থক্য হলো: জামশেদ আহমেদের দুই ছেলে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় চাকরি করে ওখানকার সভ্যকে বিয়ে করেছে- ওরা ঐ দেশের নাগরিক হবার প্রচেষ্টায় আছে। পেয়ে যাবে অচিরেই। এই প্রবনতাই চলছে এখন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত পরিবারে। গ্রামের লোকজন যতদূর জানে: জামশেদ আহমেদ স্ত্রীসহ ঢাকার এপার্টমেন্টে থাকেন; মাঝে মাঝে ছেলেদের কাছে যান। এখন গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন; ক’দিন থেকে ফের চলে যাবেন ঢাকায়।

প্রায় কুড়ি বছর পরে নিজ গ্রামে এসেছেন জামশেদ আহমেদ। মা-বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রতিবছর আসতেন মা-বাবার সাথে একটা ঈদ করতে। বাবা মারা যাবার পরে মা যতদিন বেঁচে ছিলেন এসেছেন। বাবা মারা যাবার পরে মা জামশেদ আহমেদের সাথেই থাকতেন; তবে একটা ঈদের উছিলায় স্বামীর কবর জিয়ারত করতে মা চলে আসতেন গ্রামের বাড়িতে। এক সময় মা ইন্তেকাল করলে জামশেদ আহমেদ গ্রামে আসা বন্ধ করে দিলেন।

ঢাকার জীবন আর অস্ট্রেলিয়ার জীবনের মাঝে পার্থক্য খোঁজে না পেয়ে বাকি জীবন গ্রামে থাকার প্রত্যাশা নিয়ে এবার গ্রামে চলে এসেছেন জামশেদ আহমেদ। কুড়ি বছরে গ্রামে অনেক পরিবর্তন হয়েছে- অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে অনেক; সব রাস্তা পাকা হয়ে গেছে এবং অধিকাংশ বাড়ি পাকা হয়েছে; ঘরে ঘরে বিদ্যুৎও চলে এসেছে, যদিও সন্ধ্যার পরে লোডশেডিং হয় প্রায় দিনই। 

দু'দিন হলো জামশেদ আহমেদ এসেছেন গ্রামে। জমিজমা সব পত্তন দেয়া আছে; তাই চাষাবাদের চিন্তা আপাততঃ নেই। তিনি ভাবছেন আঙ্গিনায় শাকসব্জির আবাদ শুরু করবেন। তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ফতুয়া গায়ে চলে এলেন পুকুরঘাটে। পুকুরঘাটটা ওঁর অনেক প্রিয়। শানবাঁধানো ঘাট। উপরের পাকা বেঞ্চে বসলেন। মার্চ মাসেই বেশ গরম পড়তে শুরু করেছে। ঘামছেন জামশেদ আহমেদ। পুকুরঘাটে এসি থাকলে বেশ হতো! নিজের রসিকতায় মুচকি হাসলেন জামশেদ আহমেদ। গায়ের সুবাসে বুঝতে পারলেন নায়লা আসছেন। প্রথম জীবনের মতো রোমাঞ্চ না থাকলেও নির্ভরতা বেড়েছে অনেক।

নায়লা আহমেদ উল্টোদিকের বেঞ্চে মুখোমুখি বসে ওড়নায় মুখের ঘাম মুছে বললেন, এতো গরম! দুই দিনেই হাপিয়ে উঠেছি! এর চেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ভালো ছিলাম!

জামশেদ আহমেদ বললেন, কী যে বলো না! এরকম পরিবশে ওখানে আছে? এভাবে নিজের পুকুড়পাড়ে বসতে পারতে? ভাবছি আমি নিজ হাতে কিচেন গার্ডেন করবো। তাতে সময় কেটে যাবে বিন্দাস।

নায়লা আহমেদ বললেন, আমি কী করবো? কিভাবে আমার সময় কাটবে? ওখানে নাতিদের সাথে হৈচৈ করে দিন কেটে যেতো।

সত্যটা হলো নাতিদের গভর্নেসগিরি করে সময় কাটতো। ছেলে ছেলের-বৌ তোমার কাছে সন্তান রেখে নিশ্চিন্তে চাকরি করতে পারতো!

হয়তোবা প্রকারান্তরে তোমার কথাই সত্য। আমার খারাপ লাগতো না। সময় কেটে যেতো। এখানে কিভাবে সময় কাটবে আমার?

তুমি রান্না শুরু করে দাও। শখের রান্না। দৈনিক নতুন রেসিপি। দুই বুড়োবুড়ি খাবো কব্জি ডুবিয়ে। 


ঐদিন রাত এগারোটায় বড় রবিউল আহমেদ ভিডিও কলে এলে কান্না গিলে নায়লা আহমেদ বললেন, গ্রামে এসে বেশ ভালো লাগছে। আমি ফের রান্না শুরু করবো।...

তখন জামশেদ আহমেদ বসা ছিলেন পাশেই। জামশেদ আহমেদ দুই ছেলেকে নিজের পরিকল্পনার কথা জানালেন বেশ উচ্ছসিত কণ্ঠে।

গ্রামের ওঁর সমবয়সী গোলাম আলীকে ডেকে এনে নিজের পরিকল্পনার কথা আলোচনা করতে লাগলেন এবং পরামর্শও চাইলেন। 

গোলাম আলী বললেন, গ্রামে এখন কৃষি শ্রমিকের সংকট চলছে। শ্রমিকদের প্রায় সবাই চলে গেছে ঢাকা। ঢাকায় গিয়ে পুরুষরা রিক্সা চালাচ্ছে বা অন্য কাজ করেছে; আর মহিলারা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে বা কারো বাসায় ঠিকা ঝি-এর কাজ করছে।

জামশেদ আহমেদ বিস্মিত হয়ে বললেন, তাহলে কৃষি কাজ চলছে কিভাবে?

চাষাবাদ মেকানাইজড হয়ে গেছে। পাওয়ার টিলারে চাষ হচ্ছে, হার্ভেস্টিং মেশিনে ধান কাটা ও মাড়াই হচ্ছে।

তাহলে আর সমস্যা কী! সবাই যেভাবে চাষাবাদ করছে আমিও সেভাবে করবো! আমি তো আর ধান আবাদ করতে যাচ্ছি না! শখের সব্জি আবাদ করবো।

দু'দিন পরে জামশেদ আহমেদ তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন তখন মসজিদ থেকে মাইকে একটা ঘোষণা এলো। ঘোষণাটি এমন:

পুব পাড়ার মরহুম আব্দুল মতিনের জানানা মায়মুনা বেওয়া কিছুক্ষণ আগে ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। আজ বাদ মাগরেব ঈদগাহ মাঠে মাইয়াতের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।...

জামশেদ আহমেদ অস্ফুট স্বরে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন বলে স্মরণ করার চেষ্টা করলেন মায়মুনা বেওয়া কে। আব্দুল মতিনের চেহারা ঝাপসা মনে করতে পারলেও মায়মুনা বেগমের চেহারা মনে করতে পারলেন না। তখন ফজরের আযান শুরু হলো। 

নায়লা আহমেদ জিজ্ঞেস করলেন, কে মারা গেলো গো?

জামশেদ আহমেদ বললেন, পূর্ব পাড়ার আব্দুল মতিন ভাই-এর ওয়াইফ মায়মুনা বেগম। ফজরের নামাজ আদায় করে দেখতে যেতে হবে।

আমিও যাবো তোমার সাথে। 

জামশেদ আহমেদ ফজরের নামাজ আদায় করতে মসজিদে যান না; বাড়িতেই স্ত্রীর সাথে নামাজ আদায় করেন। তিনি ইমামতি করেন। আজকেও একইভাবে ফজরের নামাজ আদায় করে দু’জন বের হলেন মরহুম আব্দুল মতিনের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

আব্দুল মতিনের বাড়ি লোকে লোকারণ্য। জামশেদ দম্পতিকে দেখে ভেতরে যাবার পথ করে দিলো উপস্থিত লোকজন। লোকদের জিজ্ঞেস করে মায়মুনা বেগম সম্পর্কে জামশেদ দম্পতি যা জানতে পারলেন তা এরকম:

মায়মুনা বেওয়া একাই থাকতেন গ্রামের বাড়িতে। ছেলে দুটো বিয়ে করার পরে মা-বাবার ভরনপোষণ করতে পারে নি; গ্রামের কৃষিকাজে না পোষানোয় একসময় ওরা মা-বাবাকে গ্রামে রেখেই চলে গেলো ঢাকা। ছেলেরা ঢাকায় হকারি করে এবং ওদের স্ত্রীগণ পোশাক কারখানায় কাজ করে। মেয়ে দুটোর বিয়ের পরে স্বামীর অলক্ষ্যে বাবা-মাকে সাহায্যের চেষ্টা করতো। আব্দুল মতিন মারা যাবার পরে বৃদ্ধা মায়মুনা বেওয়ার শরীর সায় দিলে মাঝে মাঝে ভিক্ষায় বের হতেন। কিছুদিন যাবৎ মায়মুনা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার দেখাতে না পারায় কেউ জানতে পারে নি কী অসুখ হয়েছিলো ওঁর। ছেলেরা কখনো মাকে দেখতে আসে নি, চিকিৎসা করা দূরের কথা! 

হাঁ, মার মৃত্যু সংবাদ ওঁর সন্তানদের জানানো হয়েছে। সবাই আসছে। সেকারণে বাদ মাগরেব মাইয়াতের জানাজা রাখা হয়েছে। 

দুপুরের পরে ছেলে দুটো এসে মায়ের মৃতদেহ রাখা খাটিয়া ধরে ডুকরে কাঁদতে থাকায় জামশেদ আহমেদের খুব রাগ হলো। নায়লা আহমেদ ওঁর হাত ধরে টেনে রাখায় ওদের কিছু বলতে না পারলেও মনে মনে বললেন: এরকম কুলাঙ্গার পুত্র না থাকাই ভালো! 

রাতে জামশেদ দম্পতির মাঝে এ নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো দ্বিমতের সৃষ্টি হয়নি।

নায়লা আহমেদ: এই শ্রেনীতে আজো ছেলেগুলো মা-বাবার মর্যাদা বুঝলো না! মা-বাবার ভরণপোষণ করে না। এ নিয়ে কাউন্সেলিং করা দরকার। তাতে হয়তোবা পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হতো। 

জামশেদ আহমেদ: এটার কারণ আর্থিক। কিন্তু অমানবিক না। দেখলে না মার লাশের উপর কিভাবে কাঁদলো ওরা। 

এই ঘটনার এক সপ্তাহ পরে জামশেদ আহমেদ তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে না উঠায় নায়লা আহমেদ ভাবলেন জামশেদ আহমেদ সপ্তাহের একদিন তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন না; তবে ইশরাকের নামাজ আদায় করেন। হয়তোবা আজ সেই দিন। কিন্তু ফজরের নামাজ আদায়ে জামশেদ আহমেদ না উঠায় ভ্রু কুচকে নিজেই ওঁকে জাগানোর জন্য গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন। 

আলো জ্বেলে ফুপিয়ে উঠলেন নায়লা আহমেদ। হঠাৎ এ কী হয়ে গেলো? তিনি শেষ ঘুমে থাকা স্বামীর গায়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত হাত বুলাতে থাকলেন। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরছে মৃত জামশেদ আহমেদের গায়ে। যেনো কিছুই হয়নি এমনভাবে স্বর সংযত করে আস্তে আস্তে মৃত জামশেদ আহমেদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এভাবে হঠাৎ চলে গেলে কেনো? এখন আমি কী করবো? বড্ড স্বার্থপরের মতো কাজটা করলে তুমি জামশেদ!

প্রথমে অস্ট্রেলিয়া ফোন করে বাবার মৃত্যু সংবাদ জানালেন নায়লা আহমেদ। রবিউল আহমেদের কথা শুনে বিস্মিত হবার সাথে সাথে সেদিনের ঘটনা মনে পড়লো ওঁর: মায়মুনা বেগমকে আর্থিক কারণে ভরণপোষণ করতে না পারলেও মার মৃত্যু সংবাদ শোনার সাথে সাথে গ্রামে এসে ছেলেগুলো মার শবের উপর আছড়ে পড়ে কী কান্নাটাই কাঁদলো। আর নিজের পেটকাটা ছেলেটা কী বললো এখন? সায়মন আহমেদকে ফোন করে একই রকম কথা শুনে আর বিস্মিত হলেন না নায়লা আহমেদ।

জামশেদ আহমেদের মৃত্যু সংবাদ শুনে সকালে গ্রামের লোকজন ছুটে এলো এই বাড়িতে। সমবেদনা প্রকাশের পরে ছেলেদের জন্য লাশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে চাইলে নায়লা আহমেদ আজই জানাজা শেষে জামশেদ আহমেদের মরদেহ কবরস্থ করার অনুরোধ জানালেন।

Sunday, November 27, 2022

ছোট গল্প - অভদ্র || লেখক - সান্ত্বনা ব্যানার্জী || Written by Sawntana Banerjee || Short story - Aovdro


 

অভদ্র
 সান্ত্বনা ব্যানার্জী


      
              কি বাজে জায়গায় বাড়িটা নেওয়া হয়েছে বাবা! ঘরে বসে থেকেই যত সব বাজে
লোকের মুখ খারাপ শুনতে হয়!.....খুব বিরক্ত
গলায় বলে রিমি।অফিস যাওয়া আসার পথে
বাবা মাকে দেখাশোনার সুবিধের জন্যই এখানে
বাড়িটা নেওয়া হয়েছে সেটা ভুলে যায়।আর অবাক হয়ে দেখে যে লোকটার বিরুদ্ধে ওর এতো অভিযোগ সেই লোকটাই তরতর করে
বাবার ঘরে ঢুকে এলো!.....এই জাম কয়টা রাখেন কাকা, এই মাত্র বাজারে দেখতি পেয়ে
কিনে নিলাম।সেদিন খুঁজছিলেন না!বহুত ভালো
জেতের জাম গুলো,খুব মিষ্টি!....বলেই জামের
ঠোঙা টা বাবার সামনে নামিয়ে দিয়ে আবার তেমনই তরবর করে চলে গেলো। রাস্তার উল্টো
দিকেই ওর মনোহারী জিনিসের দোকান।বাবা
আমতা আমতা করে বলে......নারে,একটু মুখ
খারাপ করে বটে,তবে মনটা ভালো,খুব উপকার
করে,খোঁজ খবর নেয়।এটা ওটা বাজার থেকে
এনে দেয়।.....আরও রেগে যায় রিমি......তবু একটা ক্লাস নেই!ওই ধরনের লোক যখন তখন
বাড়ির মধ্যে চলে আসবে!..... গজ গজ করতে
থাকে রিমি।বাবা ওকে থামানোর চেষ্টা করে.....যাক গে, ছাড়, চা খাবি তো?তোর মা চা করছে। বিস্কুটের কৌটো টা বাড়িয়ে ধরে সামনে।
আপাতত থেমে যায় রিমি,কিন্তু মন থেকে সরাতে
পারেনা একটা চাপা অস্বস্তি।তারা শিক্ষিত পরিবার,এখানে সবাই তাদের চেনে,কত নামী দামী মানুষ বাবার কাছে আসে,গল্প করে,গান শোনে।মাঝে মাঝেই গানের আসর বসে বাড়ীতে।
এর মাঝে ওই লোকটা বড়ো বেমানান! কথায় কথায় ব কারান্ত, শ কারান্ত ওর চলতেই থাকে।
  কোনদিন বাড়ীর মধ্যেই বলে দেবে তার ঠিক নেই।না,না,একটু আধটু উপকার করে বলে এই সব লোককে বাড়ীতে আসতে দেওয়া মোটেই 
ঠিক নয়।....নে চা খা,কি।ভাবছিস এত?.....মায়ের কথায় চমক ভাঙে রিমির।চা খেতে খেতে বলে.....না গো,ওই দোকানের লোকটা ,কি মুখ খারাপ করে কথা বলে,তাকে
তোমরা এত পাত্তা দাও কেন বুঝিনা!মা বলে.....
ও অজিত? তা কি করবো বল,সামনেই থাকে,দোকান ফাঁকা থাকলে আসে,একটু চা খায়,তোর বাবার কিছু দরকার পড়লে এনে দেয়,বাড়ী থেকেও এটা ওটা এনে খাওয়ায়।এখানে কোনো খারাপ কথা বলেনা,তবে দোকানে বলে, শুনতে পাওয়া যায়।......তবে আর কি!শোনো বসে বসে।....গজ গজ করতে করতে ব্যাগ কাঁধে তুলে  বেরিয়ে পড়ে রিমি।স্টেশনের পথে হাঁটতে থাকে। বড়ো অসহায় লাগে। নিজের বাড়িতে এনে রাখার উপায় নেই,
একখানা ঘর,আর এক চিলতে বারান্দা ঘিরে ওদের দুজনের মত ছোটো করে সাজানো সংসার ওখানে......।আবার ওই পরিবেশে বাবা
মাকে রাখতেও বড়ো খারাপ লাগে,অকালে চলে যাওয়া ভাইয়ের কথা বড্ড মনে পড়ে! ও বেঁচে থাকলে বাবা মা কে এভাবে ভেসে ভেসে বেড়াতে
হতো না।তবুও এই ব্যবস্থা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।বাড়িটার পজিশন খুব ভাল,স্টেশন, ব্যাংক,পোস্ট অফিস ডাক্তার ,সব কাছাকাছি।
আর অফিস যাতায়াতের পথে দেখাশোনা ও
করা যায় সাধ্য মত।ওদের বাড়ির পজিশন
সে দিক থেকে মোটেও সুবিধের নয়।সব কিছুই
দূরে দূরে,মোটর সাইকেলে যেতে হয়।তাই বাইরের সব কাজই করতে হয় অনিন্দ্য কে।এমন
কি রিমিকে স্টেশনে দিয়ে আসা,নিয়ে আসা পর্য্যন্ত।আজ অনিন্দ্য না থাকায় ওকে স্টেশন থেকে হেঁটে হেঁটে ই আসতে হলো।ঘরে ঢুকে টেবিল থেকে জলের বোতলটা নিয়ে ঢক ঢক করে অনেক টা জল খেয়ে ফেলে রিমি। তার পরই শুরু হয়ে যায় কাজ।ব্যাগ থেকে টিফিন কৌটো নামিয়ে রাখে সিংকে,এখুনি বন্দনা এসে
পড়বে আর ঝড় এর বেগে কাজ শুরু করে দেবে।কাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে টিভিটা খুলে একটু
গা এলিয়ে দিয়ে বসে ডিভান টায়।অনিন্দ্য ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে বসে ওর পাশে।দুজনকে দু কাপ
চা দিয়ে যায় বন্দনা।এই সময় টুকু বিশ্রাম নিতে নিতে একটু টিভি দেখে দুজনে।কিন্তু দেখবেই
বা কি!একটা ভালো কোনো প্রোগ্রাম আছে! সিরিয়াল গুলো তো.... শুধু দল বাঁধা বাঁধি,চক্রান্ত,সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ,বিষ খাওয়ানো,
এই সব। একটু যা ভালো লাগে রাসমণি ,বড়ো
ভালো করছে রাসমণি আর রামকৃষ্ণ!  আর সকালের গানের অনুষ্ঠান।তাও বিজ্ঞাপনের ঘটা!ক,টা গান ই বা শোনা হয়!আট টা তেই রান্নাঘরে
ঢুকে পড়ে রিমি। রাতের রুটি আর তরকারি করে
নেয়।তারপর সকালের রান্নার যোগাড় করে রাখে।ক,দিন থেকেই বাবা মায়ের জন্য একটু
রাইস আর পনীর করে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে, হয়ে আর উটছে না।কালকে সকাল সকাল উঠে করতেই হবে।কিচেনে দেরাদুন রাইস, কাজু,কিসমিস, ঘী,গরম মশলা সব গুছিয়ে রাখে। বিনস,গাজর সরু সরু করে কেটে
ট্যাপার এ ভরে ফ্রিজে ভরে রাখে। পনীর সবজি
হালকা করে ভেজে রেখে দেয়,সকালে সুবিধে হবে।রাতের খাবার টেবিলে নিয়ে খেতে বসে দুজনে।আরও সব টুকি টাকি কাজ সেরে হাত মুখ ধুয়ে টানটান করে চুল বেঁধে মুখে ক্রিম ঘষতে থাকে রিমি।এই টুকু বিলাসিতা না করে
ও ঘুমোতে পারে না।আর সারাদিনের পর নরম
পাফ দিয়ে ওর পিঠে পাউডার মাখিয়ে দেয় অনিন্দ্য।এই আদর টুকু বড়ো উপভোগ করে
রিমি,সারাদিনের সব ক্লান্তি যেন.......,ঘুমের অতলে তলিয়ে যায় নিশ্চিন্তে!
            সকালেই আবার কাজ শুরু। নিজেদের
জন্য মাছের ঝোল ভাত করে নিয়ে বাবা মায়ের জন্য রান্না করতে লেগে যায় দ্রুত হাতে। হট পটে
ভরে নেয়,রাইস,পনীর। আগের দিন করে রাখা পায়েস আর চাটনী টাও ভরে নেয় ব্যাগে।.....
কি গো তাড়া তাড়াতাড়ি করো, ট্রেন পাবে না কিন্তু।.....মোটর সাইকেল বার করতে করতে
বলে অনিন্দ্য। সব গুছিয়ে গেট এ চাবি দিয়ে
বেরিয়ে আসে রিমি,মোটর সাইকেলের পিছনে
বসতে বসতে বলে...... দেখো,আবার সে বারের
মত আমাকে না নিয়েই স্টেশনে চলে যেও না।....
মুচকি হেসে গাড়িতে স্টার্ট দেয় অনিন্দ্য।বাড়তি
ব্যাগটা নিয়ে ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ে
রিমি,দুটো তো মাত্র স্টেশন।প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে
পাশের সরু গলি পথ টা ধরে হাঁটতে শুরু করে ও।গরম গরম রাইস আর পনীর পেয়ে বাবার
মুখটা কেমন খুশিতে ভরে উঠবে এটা ভেবেই
বড়ো আনন্দ হয় রিমির।গলির শেষ প্রান্তে এসে
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে রিমি!ওকি!বাবার বাড়ির
সামনে অত চিৎকার করছে কে!দ্রুত পা চালিয়ে
এগিয়ে যায় রিমি। দেখে পাশের বাড়ির অরুণ
বাবু চিৎকার করে বাবাকে কি যেন বলছে!
বাবা কেমন অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।মা 
ভয়ে ভয়ে বলল....দেখনা,ওই ডাবের খোলা গুলো কারা অরুণ দের নাচে ফেলে গেছে আর
ও তোর বাবাকে দোষারোপ করে শুধু শুধু অপমান করছে। চারি দিকে তাকিয়ে কেমন
হতবাক হয়ে যায় রিমি!রাস্তার দু ধারে মানুষ জন
দাঁড়িয়ে আছে পুতুলের মত!একজন প্রবীণ মানুষকে এভাবে অপমান করছে কারও কোনো
প্রতিবাদ নেই!হটাৎ সবাই অবাক হয়ে দেখে
মনোহারী দোকানের সেই মুখ খারাপ করা অজিত বীর বিক্রমে এগিয়ে আসছে!কিছু বুঝে
ওঠার আগেই বাবাকে ঘরে ঢুকিয়ে খাটের ওপর
বসিয়ে দিয়ে তার স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিমায় অরুনের ঘাড় ধরে ওরই দরজায় চেপে ধরে আর চিৎকার
করতে থাকে......আর একবার ওই বুড়ো মানুষটার ওপর হম্বি তম্বী করে দেখ,তোকে কি
করি আমি!ভেবেছিস পিতিবাদ করার কেউ নেই!শা.........।কোনো কথা না বলেই ঘরে ঢুকে
যায় অরুণ।আর হতবাক রিমিকে হাত নেড়ে
বলে অজিত......আপনি যান দিদি অপিস পানে,
নিছিন্তে,আমি আচি,কুনো ভয় নাইকো। ও কাকীমা দুকাপ চা করি দ্যান দিকি,আমি আর
কাকা খাই।......আবার গলা উচিয়ে বলে.....আর
এদিক পানে এলি ঠ্যাং খোঁড়া করি দিবো!ভেবেছো বুড়ো মানুষ কে যা খুশি বলা যায় লয়!
.....এতক্ষনে সম্বিত ফিরল রিমির। মায়ের হাতে 
খাবার দাবারের ব্যাগটা দিয়ে অস্ফুটে বলে....
সব গরম আছে,এখনই খেয়ে নাও,আর অজিত
দাদাকে দিও!

ছোট গল্প - রিকভারি স্টেজ || লেখক - ডা: অরুণিমা দাস || Written by Arunima Das || Short story - Recovery stage


 

রিকভারি স্টেজ

ডা: অরুণিমা দাস



ডা: রায় নিজের চেম্বারে বসে পেশেন্ট প্রোফাইল গুলো চেক করছিলেন। পেশায় একজন বড়ো সাইকিয়াট্রিস্ট ডা: সুশান্ত রায়। রোগীদের মানসিক স্বাস্থের প্রতি খুবই যত্নবান তিনি।খুব মন দিয়েই ফাইল গুলো দেখছিলেন।


হঠাৎ দরজায় কেউ নক করলো,


মে আই কাম ইন ডক্টর।


ফাইল থেকে মুখ তুলে দেখলেন সিস্টার অহনা চেম্বারে ঢোকার জন্য অনুমতি চাইছেন। একগাল হেসে ডা: রায় বললেন ইয়েস,প্লীজ কাম ইন অহনা।


অহনা এগিয়ে গিয়ে একটা ফাইল তুলে দেয় ডা: রায়ের হাতে, আর বলে স্যার এটা মোনালিসার ফাইল, ও এখন আগের থেকে অনেকটাই সুস্থ আছে। মেডিসিন গুলোও সময় মত খাওয়াচ্ছি। স্যার ওকে কবে নিয়ে যেতে পারবো বাড়ী, সময় এলেই নিয়ে যেতে পারবেন,বললেন ডা: রায়। বলেই চট করে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন ফাইলটাতে। হেসে বললেন অহনা ইট ওয়াস নট পসিবল উইদাউট ইউ। অহনা বলল স্যার আমি তো শুধু কেয়ার নিয়েছি ওর, আর আপনি তো ওকে অ্যাসাইলামে আনা থেকে শুরু করে প্রপার মেডিসিন আর রেগুলার কাউন্সেলিং করে রিকভারি স্টেজে নিয়ে এসেছেন। ডা: রায় হেসে বললেন এটাই তো আমার কাজ সিস্টার। আর এই কাজের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পাই আমি। একগাল হেসে অহনা বলে জানিতো স্যার,আপনি রোগীদের কতো টা ভালোবাসেন। আপনি তাহলে ফাইলটা চেক করুন স্যার, আমি একটু পরে আসছি। মোনালিসার লাঞ্চের টাইম হয়ে গেছে, বললো অহনা।


ও শিওর, প্লীজ গো। অহনা বেরিয়ে গেলো।


মোনালিসার ফাইলটা দেখতে দেখতে ডা: রায় ক্রমশঃ হারিয়ে যেতে লাগলেন অতীতের দিনে,মনে পড়ে গেলো বছর দুই আগেকার কথা। এক ঝড় বৃষ্টির দিন হসপিটাল থেকে রাউন্ড দিয়ে ফেরার সময় হঠাৎ গাড়ীর সামনে এসে পড়ে একটি মেয়ে। গাড়ির ধাক্কায় রাস্তায় পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। অত রাতে কোনো উপায়ান্তর না দেখে মেয়েটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন উনি। জ্ঞান ফিরলেও নিজের নাম বলতে পারেনি সেই মেয়েটি। কেমন একটা শূন্য দৃষ্টি আর এলোমেলো চুলে তাকিয়েছিল সে। সেই রাতে আর কিছু জিজ্ঞেস করেননি ডা: রায়। পরদিন সকালে অ্যাক্সিডেন্টের জায়গায় গিয়ে ডা: রায় কিছু লোকজনকে মেয়েটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন মেয়েটি মানসিক ভারাম্যহীন,নাম মোনালিসা,থাকে রিকশা স্ট্যান্ডের পাশের এক ঝুপড়িতে। ওর বাড়ি কোথায় আর কেনোই বা ও এভাবে রাস্তায় পড়ে থাকে এসব জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে ডা: রায় অনেক কিছু জানতে পারেন। একটি ছেলেকে ভালোবাসতো মোনালিসা, কিন্তু বাড়ির কেউ সেটা মেনে নেয়নি। পালাবার প্ল্যান করেছিল ছেলেটির সাথে। ধরা পড়ে যায় দাদার হাতে আর বেধড়ক মার খেয়ে ছেলেটির মৃত্যু হয় সেদিন। এই নৃশংস দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে মোনালিসা পাগলের মত হয়ে যায়, নিজের চুল ছিঁড়তে থাকে। দাদারা ওকে ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে আটকে রাখে। চেঁচামেচি করলেই জুটতো মারধর আর অকথ্য গালাগাল। খেতেও দিতো না ঠিক করে। একদিন দাদারাই বোনের পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসে। ওখান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ক্লাবের ছেলেরা ওকে রিকশা স্ট্যান্ডের পাশের কুঁড়েতে রেখে আসে। খাওয়াদাওয়া কিছু করেনা, সারাদিন রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে। শুনতে শুনতে ডা: রায়ের মনটা ভার হয়ে ওঠে। উনি বলেন আজ থেকে ওর চিকিৎসার দায়িত্ত্ব আমার। ওকে মেন্টাল অ্যাসাইলামে রাখবো,দেখি কতটা সুস্থ করে তুলতে পারি ওকে। সবাই বললো, চেষ্টা করে দেখুন স্যার। সেইদিন থেকে মোনালিসা কে সুস্থ,স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লড়াই শুরু করেন ডা: রায়।


প্রথম প্রথম একটা ঘরে বেঁধে রাখা হতো মোনালিসা কে। ইলেকট্রিক শক থেরাপি থেকে শুরু করে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি সব কিছু চলতো। আর সাথে অ্যান্টি সাইকিয়াট্রিক মেডিসিন এবং সিস্টার অহনার রুটিন কেয়ার। এই সব কিছুর সম্মিলিত প্রয়াসে আজ মোনালিসার হাত পায়ের বাঁধন খুলে গেছে, মুক্ত বাতাসে প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে সক্ষম। সময় ওর মধ্যে অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। কঠিন বাস্তবের প্রেক্ষাপট তার মানসিক কাঠিন্য আরো সুদৃঢ় করে তুলেছে। আত্মনির্ভর হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় সে। আর যাইহোক,বাড়িতে কোনোভাবেই ফিরতে রাজি নয় মোনালিসা। বাড়ির লোকেদের নির্মম অত্যাচার কিছুতেই ভোলেনি সে। সিস্টার অহনা ঠিক করেছে মোনালিসা কে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবে,অনাথ জীবনে বোনের অভাব দূর হবে। ডা: রায় ও পারমিশন দিয়েছেন। মোনালিসাও অহনাকে দিদির মতোই ভালোবাসে।

স্মৃতির পাতা থেকে চোখ তুলে মোনালিসার ফাইলে নতুন মেডিসিন গুলো লিখতে লাগলেন ডা: রায়। কল করে অহনাকে ডাকলেন তিনি। অহনা এলে বললেন জাস্ট দুটো মেডিসিন দেওয়া আছে, লো ডোজ, উদ্বেগ কমাবে আর মন শান্ত রাখবে। এগুলোই এখন থেকে খাবে মোনালিসা। আর ওষুধের থেকেও ওর দরকার এখন ভালোবাসা,সহমর্মিতা যেটা ওকে রিকভারি স্টেজ থেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেবে। অহনা বলল আমি সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো স্যার। ডা: রায় বললেন আমি জানি আপনিই পারবেন একমাত্র,তাই আপনাকে পারমিশন দিয়েছি। ফর্মালিটি গুলো পূরণ করে আপনি আগামী সপ্তাহেই আপনার নতুন বোনকে নিজের বাড়ী নিয়ে যেতে পারবেন। অহনা ধন্যবাদ জানিয়ে একছুটে মোনালিসার কেবিনে গিয়ে বললো আমার সাথে যাবি তো নাকি। ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে মোনালিসা বললো হ্যা দিদি, তোমার আর ডা: রায়ের হাতেই আমার পুনর্জন্ম হয়েছে, নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজে পেয়েছি আমি। তোমাদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমার সাথেই থাকবো আমি। কোথাও যাবো না তোমায় ছেড়ে।কেবিনে ঢুকতে গিয়েও ঢুকলেন না ডা: রায়। দিদি আর বোনের ভালোবাসার কথোপকথন তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে লাগলেন ও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন এই বন্ধন যেনো অটুট থাকে চিরকাল আর মোনালিসার নতুন জীবন যেনো সবসময় খুশি আর আনন্দে ভরপুর থাকে। কোনো দুঃখ যেনো ওর মনকে ছুঁতে না পারে কোনোদিন। কেবিনের দরজা বন্ধ করে ডা: রায় হাঁটা দিলেন অন্য পেশেন্ট গুলো দেখবেন বলে। আরও কেউ হয়তো রিকভারি স্টেজ থেকে সুস্থ জীবনে পৌঁছনোর জন্য অপেক্ষা করছে যে দুটোর মধ্যে একটা অদৃশ্য সেতুবন্ধন গড়ে দিতেই তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকেন।



Friday, November 25, 2022

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -28


 


দেবীদাসের সাক্ষাৎ ডায়েরীতে ভদ্রলোকের নামতো নেই-ই, এই প্রথম দেখল ভদ্রলোককে। তবে কি তার বাবার সাথে পরিচয় আছে! হতে পারে, বাবার সাথে বহুজনের পরিচয় আছে যেহেতু তিনি একজন বিগ ইন্ডাষ্ট্রিয়ালিষ্ট।


 ওর পরিচয় জানতে চাইলে পর প্রথম প্রশ্নের উত্তর চাইলেন ড্রাইভার। উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করলে দেবী রায়, বাবাকে আপনি চেনেন? না। কিন্তু আপনার সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনে ফেলেছি। আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছি।

 ব্যাকগ্রাউন্ডের তথ্য? চমকে উঠলাম ওর কথা শুনে। দেবীদাসের অতীত নোংরামীতে পরিপূর্ণ তার অজানা নয় ।

 মুকুলকে জানতেন ?

 মুকুল অর্থাৎ মুকুল বক্সী এই শহরের খ্যাতনামা এ্যাডভোকেট তারাপদ বক্সীর একমাত্র আদুরে কন্যা। কি মনে পড়েছে?

 ট্যারা চোখে তাকিয়ে পুনরায় বলতে শুরু করলেন, গভীর ভালোবেসে কেনই বা আপনাকে ত্যাগ করল।

 অন্তর্যামী ভদ্রলোকের কথা গুলো শুনেই ঘামতে শুরু করলো। ও মনে মনে চিন্তা করতে থাকলো মুকুলের কথা কোন দিন কোন মুহুর্তের জন্য ভুলতে পারেনি সে। ওর সাথে কি করে ভালোবাসা হয়েছিলো তা আজ অবধি মনে আছে। সে একজন এমন স্মার্ট মেয়ে ছিলো যে কোন ইয়ং ছেলে ওর কাছে ঘেঁসতে পারতো না। মেলামেশা তো দূরের কথা, ওর সংস্পর্শে আসা ছিলো অত্যন্ত দুঃসাধ্য। বিখ্যাত ধনী ব্যবসায়ী রতন মজুমদারের একমাত্র ছেলে স্বপন তাদের পাঁচ বন্ধুর সাথে চ্যালেঞ্জ করেছিলো, যদি মুকুলকে কেউ নিজেদের আয়ত্বে অর্থাৎ ওর সাথে প্রণয় লীলা শুরু করতে পারে, তাকে পরীক্ষার পর পুরী নিয়ে যাবে। যাতায়াতের ভাড়া ও অন্যান্য যাবতীয় খরচা সে বহন করবে।

 ধীরে ধীরে শুরু হলো প্রতিযোগিতা। কেউ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে পারল না। এবার দেবীর পালা। একে যে জয়ী হতে পারবে এর কোন গ্যারেন্টি নেই। তবুও প্রতিযোগিতায় সামিল হতে হলো কারণ ওদের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে হবে।

 কিন্তু প্রতিযোগিতায় সে যখন সামিল হচ্ছে তাকে পরাজিত হলে চলবে না। তিন দিন পর পাড়ারই এক মস্তান বাচ্চুদার কাছে শলা পরামর্শ করে তাকে পথ বাতলে দিলো। অবশ্য কার্য হাসিল হলে পর সেলামী স্বরূপ কিছু টাকা ওকে বকশিশ দিতে হবে।

সেদিন বিকেল। সূর্যের রক্তিম আভা ম্লান হতে চলেছে। শহরের এক কোণে থালার মতো সূর্যটা সারাদিন ক্লান্তির অবসাদে তাড়াতাড়ি বিদায় নেবার জন্য ব্যস্ত। মুকুল তার প্রিয় আদুরে সাদা ধবধবে এ্যালসিসিয়ান ডগটা নিয়ে নিজের বাড়ীর অভিমুখে দ্রুত পা বাড়িয়েছে। প্রতিদিন স্কুল হতে বাড়ীতে ফেরার কিছু পরেই নিকট পার্কে। বেড়াতে আসে। ওর নিত্য অভ্যাস বেড়ানো। আজকের মতো অন্য দিন এতো লেট করে না বাড়ী ফিরতে। একটু পরে শহরের বুকে অন্ধকার নেমে আসবে। তাই দ্রুত গতিতে পা দুটো চালাচ্ছিল। পথি মধ্যে দুর্ধর্ষ বেশ লম্বা চওড়া লোকটা আটক করবে কল্পনা করেনি। একটু দূরে একটা কালো রঙের এ্যামবাসাডার দাঁড়িয়ে ছিল।

লোকটা মুকুলের পথ রোধ করে বলল, এই রকম মেয়েটিকেই নিশিবন্ধু করতে চাইছিলাম। কোন ভয় নেই ডারলিং, মাত্র কয়েক ঘন্টা থাকবে কাছে, তারপর এইখানেই পৌঁছে দেবো। ফুটফুটে জ্যোৎস্নার ন্যায় এক সুন্দরী রাজকন্যাকে কি সহজে কেউ ছাড়তে চায় ? হাতে বেশী সময় নেই, ভদ্রমেয়ের মতো চটপট ট্যাক্সিতে উঠে পড়ো, নতুবা -

মুকুল ভয়ে কাঁপতে থাকল। মুখ দিয়ে কোন কথা বের করতে পারল না। চোখের সামনে ভেসে উঠল গতকাল পেপারের মধ্যখানের পৃষ্ঠা। বড় বড় হরফে লেখা ছিল, “এই বর্তমান যুগে কি নারী ধর্ষণের পালা কমবে না? গতকাল অমুক জায়গায় অমুক এক গলির মধ্যে এক আঠার / উনিশ বৎসরের অবিবাহিত মেয়েকে একা পেয়ে তার উপর পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে, ফলে সেই মেয়েটির অবস্থা এমন শোচনীয় যে,...

মুকুল চিৎকার করে উঠে। মুকুল চিৎকার করে উঠতেই লোকটা মুকুলের মুখটাতে রূমাল চাপা দিয়ে ট্যাক্সির ভেতরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করল, ঠিক সেই সময় মটর সাইকেলে চড়ে বীর পুরুষের মতো ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলো দেবীদাস। হাতে রিভলভার, অবশ্য ওটা নকল। রিভলভারটা হাতে শক্ত করে ধরে নবাবী কায়দায় বেশ গম্ভীর গলায় বলল, ওকে ছেড়ে দিন বন্ধু, নতুবা ছয়টা গুলি বুকের মধ্যে ভেদ করবে। আমার গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট কোনদিন হয়নি।

লোকটা ভদ্র সন্তানের মতো ছেড়ে দিল। মুকুল মুক্তি পেয়ে দেবীর কাছে এসে হাঁপাতে শুরু করল। সত্যিই একটা রোমান্টিক ঘটনা ঘটে গেল যেন। লোকটা ভয় পেয়ে নিমেষের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। অর্থাৎ দেবীদাসের কথা মত কাজ করল। এবার না জানার কোন প্রশ্নই উঠে না। বন্ধুদের কাছে প্রতিযোগিতায় জিততে গিয়ে সে সত্যিই মুকুলের প্রেমে পড়বে দেবী, মনে হয় জীবন অভিধানে কোন জায়গাতে লেখাছিল বলে মনে হয় না। ভালোবাসা যে কি জিনিষ জানতো না অনেক সাহিত্যিকের প্রেমের গল্প / উপন্যাস পড়েছে সে, তখন হয়তো বই এর মধ্যে নায়ক / নায়িকার প্রেমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনুভূতি বা শিহরণ জানত না সত্য কিন্তু বাস্তবে যে এর মূল্য বা তাৎপর্য কতখানি তা প্রেমে না পড়লে বোঝা যায় না। বিশেষ করে ঐ ঘটনা ঘটে যাওয়ার কয়েকদিন পরে যখন দেবীদাসের জন্ম দিনে মুকুলের বাবা নিমন্ত্রিত হয়ে এসে ছিলেন তাদের বাড়ী, সাথে মুকুল ও ছিল। সে কখনো জানতো না মুকুলের বাবা ছিলেন তার বাবার হিতৈষী বন্ধু।

দিন কয়েক পর বন্ধু মহলে তুমুল আলোড়নের সৃষ্টি হলো। তার বলার প্রয়োজন হলো না মুকুল তার আয়ত্বে এসেছে কিনা। তার সাফল্যের পুরস্কার স্বরূপ চাইল সকলে মিলে একদিন পিকনিকে যাবে এবং মুকুলও তাদের সাথে যোগ দেবে। পিকনিক হতে ফেরার সময় তারা তার বুদ্ধির তারিফ করল এবং দেবীকে বিজয়ী সম্মানে ভূষিত করল।

এরপর তাদের প্রণয়লীলা বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলল। তাদের ভাব ভালোবাসার লীলা কিভাবে নিজেদের মধ্যে বিস্তার করতে হয় কেউ জানিয়ে দিলো না। তারা দুই লীলা সহচরী যত্র তত্র একই সঙ্গে যাওয়া আসা ও প্রকাশ্যে দিবালোকে তারা ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতো। এমন কি উভয়ে স্থির করেছিলো, পড়াশেষে হলে তারা দুজনে কপোত কপোতীর ন্যায় সুখের নীড় বাঁধবে।

অবশ্য বন্ধু মহলে এই গুঞ্জন অনেক আগেই উঠেছিল। এইভাবে আননন্দ উল্লাসে পর পর তিন বছর কেটে গেলো। কখন যে দিন গুলো নদীর স্রোতের মত পেরিয়ে যাচ্ছিল জানতেই পারল না। বন্ধুদের মধ্যে অনেককে ত্যাগ করতে হল দেবীদাসকে। নিজের জীবনের লক্ষ্যকে অনুসরণ করে ভিন্ন ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। সে ও মুকুল একই পথের যাত্রী, ক্রমান্বয়ে এগিয়ে চলেছে তাদের জীবন সঙ্গী নির্বাচনের অন্তিম লগ্নের দিকে।

কিন্তু কোনদিন কল্পনা করেনি দেবী, তারা দুজনে যে প্রেমের প্রদীপ জ্বালিয়ে ছিল। তা ঝটিকাঘাতে শেষ স্নিগ্ধ দীপশিখা একদিন হঠাৎ নিভে যাবে। কোন দিন বন্ধু মহলে। কেউ কল্পনা করতে পারেনি মুকুল ও দেবীর মধ্যে প্রেমের বন্ধন রজ্জু একদিন ছিন্ন হয়ে যাবে। শুধু ওরা কেন, যে কেউ তাদের প্রণয় ইতিহাস শুনে থাকলে বিশ্বাস করবে না। তাদের বিচ্ছেদকে। কারণ অবশ্য ছিল একথা অস্বীকার করা যায় না। প্রেমের খেলায় পরাজিত তো হল, কিন্তু পরাজিতের যে এতো জ্বালা তা তার জানা ছিল না।

বানবিদ্ধ পক্ষীর ন্যায় ছটপট করতে থাকল মুকুলের সাথে বিচ্ছেদের পর। সমস্ত শরীরের দংশনের জ্বালা অনুভব করতে লাগলো। অতীত কাহিনী তার স্মৃতিপটে ভেসে যেতে লাগলো। সেই বিকাল, সেই পার্ক, সিনেমা ও পাশাপাশি বসে গল্প করা। কিন্তু কেন এমন হলো ?

 তবে কি দেবীদাস বন্ধুর সাথে হাত মিলিয়ে বারাঙ্গনালয়ে হাজির হয়েছিল বলে ? তাই যদি হয় ও জন্য মুকুলই দায়ী, হ্যাঁ-হ্যাঁ দেবী কর্কশ কণ্ঠে বলবে, এর জন্য মুকুলই দায়ী। কেন সে তার প্রতি অবিচার করল। সে তো তার কাছে স্বীকারই করেছিল ভুলবশতঃ এক চরিত্রহীন লম্পট বন্ধুর পাল্লায় পড়ে পতিতালয়ে উপস্থিত হয়েছিল। কিন্তু ওর পরে দ্বিতীয় বার সে স্থানে যাবার চেষ্টা করেনি। তবে কি সুমন্তই তার প্রতিদ্বন্দী হয়ে দাঁড়াল ?

 দেবী সেদিন মুকুলের কাছে অপমানিত হয়ে ফিরে আসছিল, সেদিন সুমন্তকে দেখেছিল ওদের বাড়ীতে। না-না সে অত্যন্ত ভালো ছেলে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না। এ ভুল ধারণা। দেবীদাসের ও মুকুলের বিচ্ছেদের জন্য কেউ দায়ী নয়। এমন কি তার লম্পট বন্ধু রন্টুকেও দায়ী করে না। দায়ী তার ভাগ্য। নইলে কেনই বা রন্টুর সাথে পতিতালয়ে হাজির হবে সে। সেদিনের ঘটনা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।