Saturday, August 12, 2023

লটে মাছের ঝুরি' রান্নার প্রনালী || কিভাবে রান্না করবেন 'লটে মাছের ঝুরি'? || 'Lote fish recipe' Cooked by Joyiti Banerjee.


 

বিভাগ - রান্নাটাও শিল্প


কলমে - জয়তী বন্দ্যোপাধ্যায় 


লটে মাছের ঝুরি' রান্নার প্রনালী। কিভাবে রান্না করবেন 'লটে মাছের ঝুরি'। 'Lote fish recipe' Cooked by Joyiti Banerjee.



উপকরণ: লটে মাছ (500 গ্ৰাম), পেঁয়াজ বাটা (200 গ্ৰাম), আদা বাটা 1টেবিল চামচ, রসুন বাটা 1 টেবিল চামচ , পরিমাণ মতো জিরে গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো, কাঁচা লঙ্কা, ধনেপাতা,লবন, হলুদ, সরষের তেল।


প্রনালী: বাজার থেকে আনা লটে মাছ ভাল করে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন, এবার একটি পাত্রের মধ্যে লবন, হলুদ গুঁড়ো, পেঁয়াজ বাটা, আদা বাটা, রসুন বাটা, জিরে গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো, সরষের তেল দিয়ে একটি মসলার মিশ্রন তৈরী করে লটে মাছ আধাঘন্টার জন্য মেরিনেট করে রাখতে হবে।


কড়াইয়ে সরষের তেল দিয়ে, তেল গরম হয়ে আসলে সামান্য পরিমাণ পেঁয়াজ কুচি,আদা বাটা, রসুন বাটা, কাঁচা লঙ্কা বাটা, টমেটো কুচি দিতে হবে। মসলা ভাজা হয়ে আসলে সামান্য পরিমাণ লবন দিয়ে, মেরিনেট করা লটে মাছ কড়াইয়ে ছেড়ে দিয়ে কম আঁচে মাছটি ভালো করে কষাতে হবে।

( মনে রাখবেন একটি কথা লটে মাছ রান্না করার কোনো জল লাগে না,লোটে মাছ খুব নরম প্রকৃতির হয় প্রচুর পরিমাণে জল থাকে, সেই দলেই পুরো রান্নাটি তৈরী হয়ে যায়)। কষানোর সময় মাছের থেকে বেরিয়ে আসা জল ভাল করে শুকিয়ে নিন,তারপর ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিয়ে রান্নাটি নামিয়ে নিন। 

তৈরি হয়ে যাওয়া লটে মাছের ঝুরি পরিবারের সকলকে পরিবেশন করে গরম ভাতের সাথে উপভোগ করুন।



লটে মাছের উপকারীতা: লটে মাছের প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন আছে, এছাড়াও মানুষের শরীরের কোষ গঠনে সাহায্য করে, এই মাছের প্রোটিন শরীরের হরমোন, এনজাইম,অন্যান্য কেমিক্যালের সমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড মানুষের শরীরের রক্তনালী গুলি পরিস্কার রেখে হার্ট স্ট্রোকের ঝুকি কমায়, আর্থারাইটিস আক্রআন্ত রোগীর জন্য খুবই উপকারী, তাছাড়া ও কোলোন ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায়,এই মাছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন আছে,ও মানুষের শরীরের হাড়, দাঁত, পেশীর শক্তি বৃদ্ধি ও চোখের দৃষ্টি শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

Tuesday, August 8, 2023

রিলায়েন্স স্কলারশিপে আবেদন করে ২ লক্ষ টাকা পান || Reliance Foundation Scholarship 2023


 



ভারতের জনসংখ্যা প্রায় 140 কোটি বা তারমধ্যে অধিকাংশ অর্থাৎ প্রায় 60 কোটি ভারতীয় রয়েছেন যাদের বয়স 25 বছরের কম। এই সংখ্যার মধ্যে অধিকাংশ স্টুডেন্ট অর্থাভাবে পড়াশোনা করতে পারে না কিংবা উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাইনা। এইসমস্ত স্টুডেন্ট দের জন্য এক নতুন স্কলারশিপ প্রোগাম চালু করেছে দেশের একটি বড় প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন (Reliance Foundation)।

রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন দ্বারা সঞ্চালিত এই স্কলারশিপটির নাম হলো রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপ (Reliance Foundation Scholarship)। যে সমস্ত স্টুডেন্ট স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পেতে চাইছেন তারা এই স্কলারশিপের আওতায় আর্থিক সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ যে সমস্ত শিক্ষার্থীদের পরিবারের আয় অনেক কম তারা এখানে আবেদন করার সুযোগ পারেন।

এই স্কলারশিপে আবেদনের যোগ্যতা, সুযোগ-সুবিধা, আবেদন পদ্ধতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিবরণ নীচে দেওয়া হল।



বিষয় সূচীঃ-

1) রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপ ২০২৩ (Reliance Foundation Scholarship 2023)


2) রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপের লক্ষ্য (Reliance Foundation Scholarship 2023 Aims)


3) রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপের সুবিধা (Reliance Foundation Scholarship 2023 Benefits)


4) রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপের যোগ্যতা (Reliance Foundation Scholarship 2023 Eligibility)


5) রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপের আবেদন প্রক্রিয়া (Reliance Foundation Scholarship 2023 Application Process)




## রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপ ২০২৩ -


রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্নাতক শিক্ষার্থীদের জন্য 2 লক্ষ টাকা পর্যন্ত এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য 6 লক্ষ টাকা পর্যন্ত মেধা বৃত্তি ঘোষণা করেছেন। 



## রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপের লক্ষ্য -


এই স্কলারশিপ দেশের সমস্ত রাজ্যের মেধাবী স্টুডেন্টদের আর্থিক সাহায্য করবে। এই স্কলারশিপ এর মূল লক্ষ্য দেশের সমস্ত স্টুডেন্টদের শিক্ষায় সফল করতে সাহায্য করবে।



## রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপের সুবিধা -


যে কোনো শাখায় পড়াশোনার সুযোগ পাবেন।

এই স্কলারশিপে 5,000 পর্যন্ত স্নাতক স্কলার নির্বাচন করা হবে।

স্নাতক ডিগ্রি সময়ে বৃত্তির মোট পরিমাণ হবে 2 লক্ষ পর্যন্ত।

রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপে 100 জন পর্যন্ত স্নাতকোত্তর স্কলার নির্বাচিত হবে।

স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রোগ্রামের সময়ে বৃত্তির মোট পরিমাণ হবে 6 লক্ষ পর্যন্ত।


##রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপের যোগ্যতা -


আবেদনকারীকে একজন ভারতীয় নাগরিক হতে হবে।

স্নাতক বৃত্তি: শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম 60% সহ 12 তম স্ট্যান্ডার্ড পাশ এবং ভারতে একটি পূর্ণ-সময়ের স্নাতক ডিগ্রি প্রোগ্রামে যোগদান করার সুযোগ পাবেন।

স্নাতকোত্তর বৃত্তি: প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীযারা GATE পরীক্ষায় 550 – 1,000 স্কোর পেয়েছে তারা আবেদন করতে পারবে।


যে ছাত্ররা GATE-এর চেষ্টা করেনি কিন্তু তাদের স্নাতক CGPA তে 7.5 বা তার বেশি স্কোর করেছে তারাও আবেদন করার সুযোগ পাবেন।



##রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপের আবেদন প্রক্রিয়া -


সম্পূর্ণ অনলাইন মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ পাবেন। এখানে আবেদন করতে হলে আপনাকে রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন স্কলারশিপ পোর্টালের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে আবেদন করতে হবে।


 Apply Now -


Click here 🔴


Monday, August 7, 2023

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -46

 



আমি পুনরায় ছিটকে পড়লাম। এইভাবে আমি প্রায় ত্রিশ মিনিট লড়াই করলাম। আমি আর পেরে উঠতে পারলাম না। জলস্রোতের মত রক্ত বয়ে যাচ্ছে শরীরে। ক্ষত- বিক্ষতের যন্ত্রণায় আমি কাহিল হয়ে পড়লাম। ভাবলাম আমার মৃত্যু অনিবাৰ্য্য, শেষ চেষ্টাতেও আমি পেরে উঠতে পারবো না। বাঘিনীর অগ্নিশর্মা চক্ষুখানি অস্পষ্টভাবে দেখছি, সে আমাকে এবার শেষ করে দেবে। সে পুনরায় আক্রমণ করতেই কোথা হতে যে একটা গুলি বাঘিনীর মাথায় লাগলো, দ্বিতীয় শব্দ শুনতেই আমি অজ্ঞান হলাম। তারপর আমার মনে নেই।


যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম এক জমিদার বাড়ীর অন্দর মহলে শিল্প কারু কার্য্যে নির্মিত পালঙ্কের উপর শুয়ে আছি। পাশে বসে আছেন তোমার বাবা সীতাংশুবাবু ও একজন কবিরাজ। তোমাদের পরিবারের সেবা যত্নে, তোমার দাদুর আশীর্বাদে ধীরে ধীরে আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম। একমাত্র তিনিই আমাকে প্রাণ দান করেছিলেন।

সেই মুহুর্তে যদি বাঘিনীকে গুলি না ছুঁড়তেন তাহলে আমার বাঁচার কোন উপায় ছিল না। আমি যতদিন তোমাদের বাড়ীতে ছিলাম তুমি আমার মনকে জয় করেছিলে। তখন তোমার অল্প বয়স মা। ঐ বয়সে তোমার অনেকখানি আদর আপ্যায়ণ পেয়ে অতি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়েছিলাম।

তোমার শ্রদ্ধা-ভক্তিতে তুমি আমার মনকে জয় করেছিলে তোমার বাবার কাছে প্রস্তাব করেছিলাম যাতে ভবিষ্যতে তোমাকে পুত্রবধূ রূপে পেতে পারি। সীতাংশুবাবু আমার প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে ছিলেন। সেই জন্য বিয়ের কথাবার্তা পাকাপাকি করে বিদায়ের আগের দিন তোমাকে পুত্রবধূ বন্ধনে অঙ্গীকার করে বাড়ী ফিরেছিলাম। ষষ্ঠীচরণ সুস্থ অবস্থায় বাড়ীতে হাজির হয়েছিল সে খবর পেয়ে ছিলাম।

নানা ব্যাস্ততার মধ্যে দিন, মাস, বছর নদীর স্রোতের মত পেরিয়ে গেল। ব্যবসার উন্নতির জন্য শিকারী মন লুকিয়ে গেল। তোমাদের পরিবারের লোকদেরও ভুলে গেলাম। দেবীদাস বিবাহযোগ্য হলে পর তোমাদের গ্রামে অর্থাৎ চন্ডীপুরে সুশীলবাবুকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তোমাদের কোন খোঁজ খবর না পাওয়ার জন্য গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিলাম।

তাছাড়া দেবীদাস বেপথগামী হওয়ার জন্য আমি ধৈর্য্য হারা হয়েছিলাম মা। সুশীলবাবু তখন কুশল বাবুর মেয়ে চন্দার সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। তবে মা তুমি ও চন্দ্রা যেন একই মায়ের সন্তান, তোমরা যেন যমজ বোন। অপূর্ব মিল তোমাদের। সেই মুখ, সেই রূপ চেহেরা কোন কিছুর অমিল নেই মা।

এমন সময় কুশল বাবু বলে উঠলেন, আপনি ঠিক কথা বলেছেন বিয়াই মশাই। চন্দা ও রমা একই মায়ের সন্তান। ওরা যমজ বোন। তবে আমার চন্দ্রা মাকে হারিয়ে ফেললাম। কুশলবাবুর চোখ হতে জল ঝরতে শুরু করল, তিনি কেঁদে ফেললেন।

হেমন্তবাবু কুশল বাবুর হাত দুটো ধরে বললেন, আমি এর জন্য গভীরভাবে মর্মাহত। আমায় ক্ষমা করবেন, আপনার প্রতি আমার অসৎ ব্যবহারের জন্য। আপনার সম্মান আমি ক্ষুন্ন করেছি। তার জন্যও আমি অনুতপ্ত। আপনার হাতে ধরে বলছি, দেবীকেও ক্ষমা করবেন। তার শাস্তি সে হাড়ে হাড়ে পেয়েছে।

তবে আমার কৌতুহল থেকে যাচ্ছে, চন্দ্রা ও রমা যমজ সন্তান এ কি করে সম্ভব আমাকে জানতে হবে।

কুশলবাবু চোখের জল মুছে বললেন, হ্যাঁ ওরা যমজ মেয়ে। ঘটনা হলো, সীতাংশুবাবু আমার ছোটবেলার বন্ধু ছিলেন। চন্ডীপুর মাটিতে আমাদের বাস ছিল। একই সাথে স্কুলে পড়েছিলাম। বাবার চাকুরী সুত্রে আমাদের পরিবারকে কলকাতায় আসতে হয়েছিল। কলকাতায় এসেও আমাদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল বহু দিন। কলকাতায় এসে আমার বাবা এক সময় চরম নেশায় পড়লেন রেস খেলায়। যাকে বলে এক রকম জুয়ো খেলা। আমার পড়াশুনা আর হল না, মায়ের কথা মত আমাকে কাজ কর্মের চেষ্টা করতে হলো। 
ছোট এক প্রাইভেট কারখানায় চাকুরী পেলাম। কিছু দিন পর বাবাও এক সময় চিরতরে বিদায় নিলেন। তখন আমার প্রথম সন্তানের বয়স মাত্র চার বৎসর। আমার পত্নী চির রুগী। যমজ কন্যার জন্ম দিতে গিয়ে সে বিদায় নিলো। তখন আমি ঘোর বিপদে পড়লাম। চার বৎসরের সন্তান এবং যমজ কন্যাকে কি করে মানুষ করবো।

দিবারাত্রি মাথার কোষে কোষে চিন্তা, কি করে ওদের মানুষ করবো। এই বিপদে কে আমাকে রক্ষা করবেন। কে এমন হৃদয়বান পুরুষ আছেন এই বিপদে রক্ষা করবেন! হঠাৎ আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুকে পত্র দিয়ে আমর বেদনার কথা জানালাম। তিনি পত্র পাওয়া মাত্র সস্ত্রীক আমার ব্যাথার ভুবনকে উপশম করতে ছুটে এলেন এবং আমার দুর্বিসহ যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিলেন রমাকে কোলে তুলে। রমাকে মানুষ করার দায়িত্ব স্কন্ধে নিয়ে চন্ডীপুরে হাজির হলেন।

চন্দা আমার বিবাহযোগ্যা কন্যা হলো। সুশীলবাবুর কথায় দেবীদাসের সাথে বিয়ে হলো কিন্তু শান্তি পেল না। তাকে একদিন মরতে হলো। কুশলবাবু কেঁদে ফেললেন। গরীব বলেই হেমন্তবাবু সম্পর্ক রাখলেন না। চন্দা যে জননী হয়ে ছিল তাও জানতাম । হেমন্ত বাবুর রুদ্ধদ্বারকে অতিক্রম করতে পারিনি।

সুশীলবাবু কুশল বাবুর হাত ধরে বললেন, অতীতকে এবার বিরতি দিন কুশলবাবু। আপনার ছোট মেয়ে রমাকে কাছে টেনে আশীর্বাদ করুন যাতে সে সুখী হয়।

কুশলবাবু পুনরায় চোখের জল মুছে বললেন, আয় মা আমার কাছে আয়। রমা কুশলবাবুর বুকে মুখ লুকালো। রমার বুকের ভেতরে থেকে যেন কান্নাকে ঠেলে নিয়ে এলো।

কুশল বাবু বললেন, আর কান্না নয় মা।

হেমন্তবাবু বললেন, অনেক কেঁদেছো মা। আজ তোমাকে কথা দিতে হবে, ময়নাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। ওকে মানুষ করার দায়িত্ব তোমার উপর দিলাম। আর আমাদেরও প্রতি একটু নজর রাখবে মা।

রমা হেমন্তবাবুকে প্রণাম করে বলল, বাবা আপনি আমায় আশীর্বাদ দিন আমার এই মরুময় জীবনে যেন কোন দিন আর মর্মর ধ্বনি না আসে। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, ঝঞ্ঝা বিধস্ত হয়ে আপনার চরণে স্থান পেলাম।

হেমন্তবাবুর স্নেহ ও আশীর্বাদ কোনদিন বিফল হবে না মা। তুমি নিশ্চয় সুখী হবে। জয়ন্ত তোমার বোনকে আদর করবে না?

জয়ন্তর চোখ দুটো ছল ছল করছিলো। কোন কথা না বলে সজল চোখে বলল,

আয় বোন কাছে আয়। তুই আমার চন্দা বোনের শূন্যস্থানকে পূরণ করলি। 
রমা জয় ওকে প্রজাত করতে উদ্যত হতেই জয়ন্ত বলল, ওখানে নয়, আমার বক্ষে আয়। আমার হৃদয় যন্ত্রণাকে লাঘব করি। তোর অতীতকে ভুলে যাবি বোন। তোর অদৃষ্টের নির্মম পরিঘাতকে মনে রাখবি না। নতুন জীবন শুরু কর বোন।

কুশলবাবু বললেন সান্ত্বনা দিয়ে, বিধির বিধান কেউ খন্ডন করতে পারে না মা। হঠাৎ এক সময় ময়না বেড় হতে নেমে আঁচল ধরে টান দিয়ে বলল, মা আমায় বাড়ী নিয়ে চলো, আমি এখানে থাকবো না।

রমা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, হ্যাঁ মা, এখানে তোমাকে আর রাখবো না। আজই তোমাকে বাড়ীতে নিয়ে যাবো।

হেমন্তবাবু, সুশীলবাবুকে বললেন, চলুন সুশীলবাবু, ডাকতারের অনুমতি নিয়ে আমার নাতনী ময়না, ও আমার একমাত্র বৌমাকে নিয়ে বাড়ী মুখে রওনা হবো। তবে তার সাথে আপনার উপর ভার দিলাম, আমি আমার বৌমার আগমনের আনন্দবার্তা জানিয়ে আজ রাত্রে ভোজের আয়োজন করবেন।

কুশলবাবুর হাত দুটো ধরে কাতরস্বরে বললেন, আপনি, জয়ন্ত আমার এই ক্ষুদ্র অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আমার হৃদয়কে আনন্দ দান করবেন এই আশা রাখি। চলুন আমরা সকলে বাড়ী মুখে রওনা হই।

দেবীদাস তুমি দেরী না করে রমা ও ময়নাকে নিয়ে এসো। আমরা তোমাদের জন্য বাইরে অপেক্ষা করছি।

সকলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। রমা তখনও ময়নাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। দেবীদাস ওর কাছে গিয়ে বলল, ময়নাকে আদর করবে, আমাকে করবে না? রমা দেবীর বুকে মুখ লাকিয়ে বলল, দেবীদাস

রমার মুখে দেবীদাস ডাক শুনে ভেতর থেকে কান্নাকে যেন ঠেলে নিয়ে এলো, কিন্তু কাঁদতে পারল না। কান্নাভেজা গলায় বলে উঠল আজ এই সুমধুর ভালোবাসায় আমার ও তোমার সমস্ত গ্লানিকে মুছে দিলাম রমা। হাজার লাঞ্ছনা, যন্ত্রণা, দুঃখ, বেদনাকে অতিক্রান্ত করে আমার হৃদয় মন্দিরে স্থান পাবে আমি জানতাম। আমার ভালোবাসা ক্ষণভঙ্গুর নয়। এ ভালোবাসা শাশ্বত, চিরন্তন। সে জন্য তোমায় বলে রাখছি, তুমি আমার মানস সরোবরে পদ্ম হয়ে চিরদিন ফুটে থাকবে। আর “পদ্মাবধূ” হয়ে আমার হৃদয়ে অনন্তকাল গাঁথা থাকবে। অনন্তকাল গাঁথা থাকবে। অনন্তকাল গাঁথা থাকবে।

Sunday, July 30, 2023

জুলাই সংখ্যা 2023 || সম্পাদকীয় || July Sonkha 2023


 


বিকেলের নির্লিপ্ত রোদ্দুরে মেখে নেওয়া রক্ত স্নান প্রতিটি দেহান্তর উদ্ভাসিত করে। বেঁকে বসা হৃদয় অঙ্কুর একটু বিশ্রামের আশা রাখে। নরম কোলে বালিশ খোঁজা পাঠক বর্গ -- একটা প্রেমের খোঁজ করে। কল্পনার দর্শনে আগন্তুক নারী ফিকে হাসি দিয়ে অল্প সময়ে আরাম দেয়। প্রাণ সখীর সম্ভাষণ কিছুটা স্বস্তি দেয়। আসলে বন্ধুহীন পাঠকের জীবনে একটা সঠিক প্রীতিপূর্ণ মানুষের আগমন ঘটুক -- এটাই সাহিত্যের চাওয়া পাওয়া।


ভালোবাসার আবেশ দিয়ে সাহিত্য নিজেকে গুছিয়ে নিক। তুমি পাঠক আমি লেখক। শ্রোতার অপেক্ষা নেই। শুধু তুমি থেকো পাশে। সাহিত্যের বুলি এটুকুই। পাশে থাকুন। সাহিত্য চর্চায় মজে উঠুন। অল্প একটু স্বস্তি নিন। আমাদের ওয়ার্ল্ড সাহিত্য আড্ডা সকল লেখক পাঠককে সেই সুযোগ করে দিচ্ছে। তাই আমাদের সাথে জুড়ে থাকুন। সুস্থ থাকুন, সাহিত্যে থাকুন।

                         
                            ধন্যবাদান্তে
        ওয়ার্ল্ড সাহিত্য আড্ডা সম্পাদকীয়

চিনের কবিতা - শংকর ব্রহ্ম || Chiner Kobita - Sankar Brhama || প্রবন্ধ || নিবন্ধ || Article

চিনের কবিতা

শংকর ব্রহ্ম



              চিনা সাহিত্যের প্রধান ঐতিহ্য তার সুদীর্ঘ কালের ব্যাপ্তি ও অভিজ্ঞতা, অভিন্নতা এবং যুক্তিগ্রাহ্যতা।


      খ্রীষ্টপূর্ব ছয়শো বছর আগে চিনের যে কবিতা বা গদ্য সাহিত্য পাওয়া গেছে তা (প্রকাশের ভাষার ও ভঙ্গির ভিন্নতা ছাড়া) মূলতঃ অভিন্ন রয়ে গেছে আজও। ধ্বনির পরিবর্তে ভাবমূলক লিপি পদ্ধতি ও ব্যাকরণের সল্পতায় তা সম্ভব হয়েছে।


          চিন যুগে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে একতাবদ্ধ করার পর প্রকাশের একতার প্রচেষ্টা হান যুগে (২০৬ খ্রীস্ট পূর্ব- ২২০ খ্রীষ্টাব্দ) আরও দৃঢ়মূল হয়েছে। এই সময় তারা

বহির্জগত বিচ্যুত হওয়ায় সাহিত্যের স্থিতবস্থা থেকে গেছে। দ্বিতীয় শতাব্দীতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারে তার কিছুটা পরিবর্তন হয়।


    বিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্যের সংস্পর্শে এসে এখন অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে।


    প্রাচীন কনফুসীয় সাহিত্য এবং পাঁচ ও সাত

অক্ষরে লেখা 'শিহ্ কবিতা' (জাপানী হাইকু কবিতার মতো) এদের প্রাচীন সাহিত্যের সম্পদ।

       প্রাচীনতম যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত

চিনের কাব্য রচনা মূখ্যত রাজকর্মচারীর ব্যাপার ছিল, একমাত্র ব্যতিক্রম তাং যুগের শ্রেষ্ট এবং বিশ্বের অন্যতম কবি 'লি পো'।


কবি  তু ফু এবং লি পো দুই বন্ধু ছিলেন।


লি পো (৭০৫- ৭৬২ খ্রীষ্টাব্দ)

----------------------------------


টিয়া

----------


দল বেঁধে কুঞ্জবনে সুন্দরীরা রত্ন সাজে

মনে মনে ভাবে কত কি যে,

কুঠরীর গোপন খবরগুলি,

বলি বলি করেও বলে না,

আকুলি বিকলি করে মনে।

কিন্তু টিয়ার খাঁচা বড় বেশী কাছে এসে দেখে

কোন কথা বলার সাহস নেই বুকে।


স্তব্ধ রাতে

---------------


খাটের পায়ার কাছে কি এতো করছে চিক্ মিক্

এখনই কি তুষার পাত শুরু হয়ে গেল?

উঠে বসে দেখি তা আলোর ঝিক্ মিক্

চাঁদ এসে ঘরে ঢুকে আছে,

আবার শরীর এলিয়ে দিয়ে ভাবি

ঘরে একা প্রিয়া বসে আছে।


নানকিং পানশালা বিদায়

--------------------------------------


শিমূলের তুলো বয়ে আনা দমকা বাতাস

সহসা এ পানশালা মদির গন্ধে ভরে তোলে

উ-প্রদেশের তরুণী সুরা ঢেলে বিদায় জানাতে এসে 

শহরের বন্ধুদের সাথে পানে পীড়াপীড়ি করে,

পেয়াল উজার করে তারা পান করছে যখন,

আমার বিদায় সম্ভাষণ,

আহা যাও পুবে ছোটা ওই নদীটিকে বলো,

বন্ধুর প্রেমের চেয়ে 

আরও দূরে কখনও সে যেতে পারে কিনা?


           সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট ,মানবিকতা বোধ, যুক্তিবাদ ,ব্যক্তিগত অনুভূতির সহজ প্রকাশ,অতীন্দ্রিয়তার স্পর্শ চীনা কবিতার চিরন্তন বৈশিষ্ট।


           বিখ্যাত চীনা সাহিত্যের সমালোচক

'লিউ হ্ সি এহ্'( ৪৬৫-৫২২ খ্রীষ্টাব্দ) বলেছেন,

" বৎসর ও মাস ছুটে চলে যায়, আত্মা চিরস্থায়ী নয়, শুধু লেখার মধ্য দিয়েই মানুষ তার খ্যাতিকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে পারে এবং আপন কীর্তিগুলোকে ব্যাপ্তি দিতে পারে।"


        তাই দেখা যায়, সরকারী আধিকারিক থেকে

সম্রাট , সম্রাট-প্রিয়া , প্রধান মন্ত্রী , সেনাপতি , রাজনীতিবিদ ,সন্ত  ও সাধারণ নর-নারী সকলেই কবিতা লিখেছেন।


         গ্রীক বা সংস্কৃত কাব্যে যেমন মহাকাব্য আছে চীনা কাব্যে সেরকম কিছু নেই।

শুধু পাওয়া যায় গীতি কবিতা। চীনা সাহিত্যে কাব্যের নায়ক নায়িকারা কোন দেব-দেবী নয়, মর্তের মানব-মানবী।

         বিপুল চিনা সাহিত্য সম্ভারে, দেশপ্রেম থাকলেও যুদ্ধের প্রশস্তি বা যৌনতার কোন নাম গন্ধ নেই। বাস্তব জীবনের দুঃখ কষ্টের রূপয়ণ করেই তারা চরম আনন্দ পেয়েছেন।

       চীনের আদিতম কাব্যগ্রন্থ কনফুসিয়াস ( তার চিনা নাম - কুং ফু ৎজু- জন্ম ৫৫১ খ্রী.পূঃ) সংকলিত  'শিহ্- চিং'। 

তিন হাজার কবিতা থেকে নির্বাচন করে এই গ্রন্থে তিনশ' পাঁচটি (৩০৫) সুরানুক্রমিক সাজানো হয়েছে।

এর অধিকাংশই লোকগীতিন,বাকী অংশের নাম

কুয়ো পেং বা 'দেশের হালচাল'।

          তাং যুগকে (৬১৮-৯০৭ খ্রীষ্টাব্দ) চীনা কবিতার স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই সময়ের বিখ্যাত কবিরা হলেন-লি পো (যাদুকর কবি নামে খ্যাত) , তু ফু ( ঋষি কবি নামে খ্যাত), পাই চু-য়ি মেং ,হাও জান প্রমুখ।


   তু ফু (৭১২-৭৭০ খ্রীষ্টাব্দ)

------------------------------


রাতের ভাবনা,যুদ্ধ ও শান্তি

------------------------------------


বাগান থেকে ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢোকে জ্যোৎস্নায়

চাঁদের কিরণ নাচে পাগলের মতো,

বাইরে পড়ছে শিশির ,আকাশের তারাগুলি দেখে।

জোনাকিরা এধারে ওধারে ভেসে চলে যায়

নদীচরে জলচর পাখি ডাকে তার সঙ্গীনীকে।


আর আমি?

যুদ্ধ বিদীর্ণ পৃথিবীর কথা ভেবে

অশান্তিতে ঘুমাতে পারি না।



ফুলের দিকে তাকিয়ে

--------------------------------


জীবনের চেয়ে ফুল বেশি ভালবাসি

ভেবো না ভুলেও,

কুসুম শুকিয়ে গেলে ভয়ে হীম হয়ে যাই,

চোখের পলকে আমিও জরাজীর্ণ হবো।


ফুলের পাপড়িগুলি কত না সহজে

শুকিয়ে ছড়ায় চারিদিকে,

আহা কুঁড়িগুলি আরও ধীরে বিকশিত হলে

কত না যে ভাল হতো বলো?


লি পো-র কবিতার 'যাদু বাস্তবতা' মায়াময় করে 

তুলেছে তার কাব্যকে। হৃদয় নিঙড়ানো তার সব শব্দ ব্যবহার পাঠককে আকুল করে তুলেছে।


   এর পাশাপাশি লোকায়ত সাহিত্য ধারাও অব্যাহত ছিল নিশ্চিৎ ভাবেই।

     তাং যুগের শেষ দিকে কাব্যে বিষয়বস্তুর চেয়ে, ধ্বনি উৎকর্ষের প্রাধান্য দেখা দেয়।


     বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিদেশী সাহিত্যের প্রভাবে (বিশেষ করে অনুবাদ সাহিত্য পড়ার ফলে) তাদের ঐতিহ্যবাহী চিন্তাধারায় কিছুটা চিড় ধরে। তারা তখন নতুন কাব্য ধারার মধ্য দিয়ে আপন সত্তাকে খুঁজে পেতে চাইল।


     আফিনসেবী দরিদ্র চীন দেশের উর্বর মাটিতে , মার্কসবাদ বীজ বপনের উর্বরক্ষেত্র খুঁজে পেল।

         ১৯১৯ সালের আন্দোলন মূলতঃ রাজনৈতিক হলেও, এর ফলে আধুনিক চিনা কবিতার জন্ম হলো। 


ওয়েন ই-তো ,হ্ স্ উ , চিহ্-মো , কুয়ো-মো-জো প্রমুখ চীনা কবিরা পাশ্চাত্য সাহিত্যের রোমান্টিকতার সঙ্গে পরিচিত হলেন। তাঁরা ভাষার সৌকুমার্যের উপর জোর দিলেন।

        সাম্প্রতিক কালে চিনা সাহিত্যের প্রেরণা রাজনৈতিক সাম্যবাদ প্রচারের ফলে ,কবিতা তার মূল উদ্দেশ্য থেকে অনেকটা বিচ্যুত হয়ে প্রচার সাহিত্যে পরিণত হয়েছে।


মাও ৎসে তুং (১৮৯৩-১৯৭৬ খ্রীঃ)

--------------------------------------------


তিনটি কবিতা

--------------------

১).


গিরি চূড়াগুলি

দ্রুত অশ্বে, উদ্যত চাবুক,পৃষ্ঠাসন কখনও না ছেড়ে

পিছনে তাকতে ছিল ভয়,

কারণ আকাশ মাথার উপরে দু'হাতের সামন্য

তফাৎ।


২).


গিরি চূড়াগুলি

ঝাপিয়ে চূর্ণতাকামী সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ যেন তারা,

কিংবা পূর্ণ উল্লম্ফনের ছোটা

দশ সহস্রাশ্ব যেন,সংগ্রাম সাগরে।


৩).


গিরি চূড়াগুলি

সুনীল ত্রিদিবভেদী,শীর্ষ বিন্ধু নয় অনুজ্জ্বল

আকাশ পড়ত বুঝি ভেঙে

এই স্তম্ভগুলির অভাবে।


            অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী চীন অর্থাৎ তাইওয়ানের বর্তমানের কবিতা একটি অপূর্ব রূপ নিয়েছে। ১৯৪৯ সালের আগে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তাইওয়ান জাপানীদের দখলে ছিল।

            জাপানী ভাষা ছাড়া অন্যকিছু ছাপা হতো না। এমনকি পান্ডুলিপি আকারেও কিছু পাওয়া যায়নি।

        ১৯৪৯ সালে মূল ভূখন্ডের সংস্কৃতি বহন করে কুড়ি লক্ষ চীনা সৈন্য তাইওয়ানে আসে।

         মূল ভূখন্ড থেকে তাইওয়ান এক সংকীর্ণ উপসাগর দিয়ে বিচ্ছিন্ন। তাই তাদের  মানসিকতার বিচ্ছিন্নতাও হয়তো অতলান্তিক। তাইওয়ানের কবিরা একদিকে যেমন চিনের প্রাচীন ঐতিহ্যকে ভোলেনি , অন্যদিকে তেমনি বহির্জগতের সঙ্গে নিবিড় সংযোগের ফলে নতুন ধ্যান ধারণা , আঙ্গিক গ্রহণ করে , অকল্পনীয় সৌন্দর্যময় কাব্য সৃষ্টি করেছে।

         দুই ধারার কাব্য স্রোত স্ব স্ব বর্ণবৈশিষ্টে

অভিন্ন হলেও সতন্ত্র বৈচিত্র নিয়ে বয়ে চলেছে।

কোনদিন ওতপ্রতভাবে একধারা হবে কিনা

সে প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসীত।

 

       কিছু তাইওনান কবিতা

      --------------------------------------


য়াং হুয়ান (১৯৩০-১৯৫৪ খ্রীষ্টাব্দ)

----------------------------------------


কবিতা

-------------


কবিতা অমর পুষ্প

জীবন মৃত্তিকায় উপ্ত হতে হয় তাকে,

কবিতা কাকলি ভরা পাখি

গীতিময় প্রাণবন্ত হৃদয়ে সবার।


মরি যে লজ্জায়

তুমি এলে যে কবিতা লিখি হৃদয়ে আমার,

তারা শুধু কালো অক্ষর

কবিতার বিবর্ণ নমুনা?


য়া হ্সুউয়ান (১৯৩৩ খ্রীষ্টাব্দ  - মৃত্যু জানা নেই)

--------------------------------------------------------


ঈশ্বর

----------


ঈশ্বর একা

চুপচাপ বসে গীর্জার জানলার নীচে,

কেননা বেদীটি থাকে

পুরহিতের জবর দখলে।



ফাং হ্সিন ( জন্ম - ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দ - মৃত্যু জানা নাই)

---------------------------------------------------------


খোলা টেরিফোন বুথ

----------------------------


সঙ্গীহীন জনৈক যুবক

যুবতীর হাসি যেন একমুঠো চকচকে টাকা

মেঝেতে ছড়াল টুং টাং,

আমি নই খোলা টেলিফোন বুথ

আঃ নয় কখনোই -


এমন কি প্রত্যাশার মুদ্রাটিও তাতে

ফেলা যাবে না কখনও।



হ্সিউং হুং ( জন্ম- ১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দ - মৃত্যু জানা নেই)

--------------------------------------------------------


প্রতিশ্রুতি

---------------


একদিন তোমাকে তো আর আমি লিখব না চিঠি

তখন জানবে তুমি আমি আর নেই,

যখন অনেক দেরী হয়ে যাবে সখী

আমার দরজায় এসে যদি তুমি কর করাঘাত।


মরে গিয়েও প্রাণবন্ত থেকে যাব

শুধু প্রাণটুকু মিশে যাবে পঞ্চ উপাদানে,

স্রোতশীল নদীকে বলে যার আমার বেদনা

ঝিরি ঝিরি বাতাসকে বলে যাব

তোমাকে পাঠাতে সোহাগের কথা।


কাঁপা কাঁপা বাতাস এসে ছড়াবে আমার দীর্ঘশ্বাস

আগুনের শিখায় হবে বিচ্ছুরিত আমার কামনা

তুমি তুলে নেবে তাই ,পৃথিবীতে এ দেহের রক্ত

জন্ম দেবে অজস্র সুগন্ধী গোলাপ।


-----------------------------------------------------------




       


কবি ও অকবি - দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায় || Kobi oo Okobi - Darpana Gangapadhyay || Short Story || ছোটগল্প

 কবি ও অকবি

দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়



হিপ্রোটিজম বোঝো ? হিপ্রোটিজম করে করে মানুষকে কিভাবে মেরে ফেলা যায় । আজ তোমাদের তারই এক কাহিনী শোনাবো ‌। বধির


 করে দেওয়া যায় অনায়াসে।


পাড়ায় জগা আর সোমেন দুই ভাই খেলা করে। হাজার বন্ধু বান্ধব, জগা সবার সঙ্গে মেশে,

সোমেন সব সময় বন্ধুদের বলে ওর সাথে বেশি খেলার দরকার নেই ও ভালো ছেলে না।  

 নম্বর আমি ক্লাসে বেশি পাই সুতরাং আমি ভালো--- তোমরা আমার সঙ্গে মেশো আমার সঙ্গে খেলো ওর সাথে না, --- এভাবে বন্ধুদের থেকে আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে জগা ।

সব বন্ধুরাই জগাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা তামাশা করে সকলেই অ্যাভয়েড করে এভাবে জগা মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ।

বাড়িতেও সবাই জগা যেহেতু বড় ছেলে বাবা রিটায়ারের পর জগার ওপরই সব দায়িত্ব পড়ে।

ছোট বলে সোমেন গা বাঁচিয়ে বাড়ির বাইরে দূরে পড়াশোনার জন্য চলে যায়।

একদল টিউশনি এবং কোচিং এ পড়িয়ে বোনেদের পড়াশোনার দায়িত্ব বড় বোনের বিয়ের দায়িত্ব সব গ্রহণ করার পরেও নিজের লেখাপড়া পাশাপাশি চালিয়ে যায় ।

তার সঙ্গে নিজের লেখা লিখি ও চালিয়ে যায়। কলকাতার বিভিন্ন বড় বড় জায়গায় সে কবিতা পাঠে ডাক পায় ।

বড় বড় পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হয়। 

এভাবে বেশ কিছু বছর চলে যাওয়ার পর সে এমএ পাস করে বিএড করে এবং চেষ্টা করে পিএইচডি করার 

এসময় সে অনেক ইমপ্রুভ করে ফেলে নিজেকে কিন্তু ইহার ভাগ্য সহায় হয় না। কোন ভালো চাকরি জোটে না। সেই কোচিং এ পড়িয়েই বউ বাচ্চার দায়িত্ব পালন করতে হয়।

 এভাবে তার ছেলেপুলেরাও বড় হয়ে যায় সে অনেক লেখালেখি করে যায় ,পত্রিকা চালিয়ে যায় ।

কিন্তু আর যোগাযোগ কারো সঙ্গে রাখতে পারে না ,অনেক চাপ থাকে তার সংসারের জোয়াল টানার।

 রিটায়ারমেন্টের পর অসুস্থ হয়ে পড়ে মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে তার ফলে সে বাড়িতে বসে এবার লেখালেখি করার কথা ভাবছে যখন তখন এক অকবি তাকে বিভৎস ভাবে হিপ্রোটিজম করতে থাকে। প্রতিদিন সে তার কবিতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করে এবং বলতে থাকে সে কবিতার হোল টাইমার সে বড়লোকের বকে যাওয়া ছেলে। বাবার পয়সায় বসে বসে খায় আর কবিতার দালালি করে। কিন্তু এই জগার পেছনে পড়ে যায়।


দিনের পর দিন সে প্রচার করতে থাকে যে সেই বিখ্যাত কবি তার ভীষণ নাম ডাক এবং সে খুব বড় বিখ্যাত কিন্তু তোমাকে কেউই চেনে না অথচ প্রতিদিন তাহলে বিখ্যাত কবি জগারবাড়ি কি করে ?

এখনো জগা একটি পত্রিকা চালায় এবং বেশ কিছু ভূমিকা লেখা ,পুস্তক সমালোচনা করা, প্রুফ দেখা ,নিজস্ব কাব্যগ্রন্থ লেখা চালিয়ে যায়।


এই অকবি তার কিছু দালাল


 দিয়ে সে নিজেকে বড় প্রমাণ করার চেষ্টা করে ,তারাও তার আশেপাশে ঘোরে এবং বলে হ্যাঁ উনি বড় কবি উনি খেতে পারেন না ও কষ্টে থাকেন আসলে সব মিথ্যে ! ভাওতাবাজি।

 দূরের লোকজন এসব কায়দা কানুন বুঝতে পারেনা তারা ভাবে হয়তো ছেলেটি খুব অভাবী 

কেন অভাব ?

 একটা সুস্থ সবল ছেলে কেন কিছু কাজ করতে পারে না ? যা থেকে তার পয়সা রোজগার হয় এবং নিজের সংসার টা চালাতে পারে। আসলে না, সে নিজেই গলাবাজি করে চিৎকার করে সবার সামনে,--- আমি বড় কবি ,আমি বড় কবি, বলে চিৎকার করে এবং বিখ্যাত, বিখ্যাত ,বলে চিৎকার করে--- জ্ঞানী গুণী এবং চেনা পরিচিত মানুষেরা ওর চিৎকারে চুপ হয়ে যায় ,মনে মনে সব বুঝলেও প্রকাশ্যে সেটা বলেনা ,কিন্তু অজ্ঞানী মানুষেরা ওকেই বড় করে তোলে ,দিনের পর দিন চলতে থাকে এইরকম অত্যাচার জগার ওপর ,---ফলে জগা বধির হয়ে যায়।

জগার লেখা কবিতার কোন সমালোচনা হয় না ,কেউ পড়ে না ,কেউ পাঠ করে না ,কোন আলোচনা হয় না।

 এদিকে অকবি নিজের মনের কথা বানিয়ে গুছিয়ে সাজিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে পয়সা দিয়ে অন্য বাচিক শিল্পী দিয়েও তা বলাতে থাকে--- ফলে ক্রমশ বিখ্যাত হয়ে উঠতে থাকে ।

এভাবে কত কত সত্য রহস্য চাপা পড়ে যায় কে জানে।।

পুতুলের অন্নপ্রাশন - সান্ত্বনা ব্যানার্জী || Putuler Onnoprasan - Santwana Banerjee || Short Story || ছোটগল্প|

    পুতুলের অন্নপ্রাশন

                সান্ত্বনা ব্যানার্জী


 

   "আরে অনু দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? এসো 

এসো, হারিয়ে যাবে কিন্তু!" বলতে বলতে ওর হাতটা ধরে হাঁটতে থাকে তপতী। এই প্রথম কলকাতায় দুর্গাঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে অনু

বন্ধুদের সঙ্গে। ওরে বাপরে!কি সুন্দর!!! যেমন

প্যান্ডেল, তেমন লাইট, তেমন থিম! আলোয় আলোয় একেবারে ইন্দ্রপুরী। তার ওপর কি নেই!

নানা রকমের খাবারের স্টল, সেরামিকের বাসন,

ঘর সাজানোর রকমারি শোপিস, পোশাক , সাজের জিনিস কত কি!গ্রামেই জন্ম কর্ম, শহরের সঙ্গে এভাবে মেশার সুযোগ এই প্রথম।

তাই যা দেখে তাই দেখেই অবাক হয়ে হাঁ করে

দাঁড়িয়ে পড়ে অনু।

             ছেলের চাকরির সূত্রে মাস ছয়েক কলকাতায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে এসেছে,আর পার্কে

হাঁটতে গিয়ে কয়েকজন বন্ধু পেয়েছে। নিজের

ভাগ্যকে কুর্নিশ জানায় অনু। ওর মত সাধারণ

গ্রামের মেয়েকে ওরা খুব অল্প দিনেই বড়ো আপন করে নিয়েছে। সামান্য একটু খালি গলায় গান যে ওদের এত ভালো লাগবে কে জানতো!ওদের আগ্রহেই পার্কে, কারও না কারও বাড়ীতে গান,কবিতার আসর বসে যায়। তপতী, সুমনা তো ওকে ছাড়া কোথাও যায় না। ওদের দৌলতে বেশ কয়েকটা ভালো সিনেমা, থিয়েটার, দেখে ফেলেছে অনু। এই দলে ক ' দিন

পর যুক্ত হলো পর্না। ভারি সুন্দর দেখতে। খোদ

কলকাতায় জন্ম, পড়াশোনা, গ্রাম দেখেনি সে ভাবে। কথাবার্তা সাজসজ্জা সব কিছুই কেতাদুরস্ত, একেবারেই অন্যরকম। কনভেন্টে

পড়া মেয়ে, বিলেত ফেরত হাজব্যান্ড, কথার মধ্যে বেশির ভাগই ইংরেজী শব্দ। কিন্তু আশ্চর্য

বন্ধুত্ব হতে একটুও সময় লাগলো না। খুব হাসিখুশি সহজ সরল। আর একটা অভিনব 

অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ পেয়ে গেলো, পুতুলের অন্নপ্রাশন। অবাক হয়ে যায় অনু। তপতী হেসে

বলে," আরে পর্নার এক মেয়ে আর একটি পুতুল

ছেলে। তাকে উপলক্ষ্য করে একটু গেট টুগেদার

এই আর কি"। 

              অন্নপ্রাশন বাড়ীতে এসে তো অবাক! এলাহি আয়োজন। সঙ্গে সত্য নারায়ণ পুজো। পুজোর পর মানব শিশুর মতোই ধুতি, পাঞ্জাবী,

মালা চন্দন টোপর পরে সুসজ্জিত পুতুল ছেলের

অন্নপ্রাশন হলো মহা সমারোহে। আসন পেতে ,পঞ্চব্যঞ্জন কাঁসার থালা বাটিতে সাজিয়ে,

ছেলেকে বসিয়ে , ধান দূর্বা উলু শঙ্খধ্বনি সহযোগে আশীর্বাদ, পুতুল পুত্র কোলে নিয়ে স্বামী স্ত্রীর আনন্দে মাখা রাঙা মুখ, ফটো তোলা,

কিছুই বাদ গেলনা!তার পর রীতিমত ক্যাটারার

দিয়ে ভোজবাড়ীর মতোই খাওয়া দাওয়া!

                   বাড়ী ফিরে কি এক ঘোরের মধ্যে থাকে অনু। একটা পুতুল নিয়ে ওদের এই আনন্দ

আয়োজনে তো কোনো খামতি নেই! এমন কি আনন্দ খুশী তে ওরা যে ভরপুর হয়েছিল সে তো

মিথ্যে নয়! পুতুল সন্তান নিয়ে যদি ওরা এত আনন্দ পায় তবে মানব সন্তান নিয়ে তো আনন্দের বন্যা বয়ে যাবে!

              হঠাৎই অনুর চোখ আলোয় ঝলমল করে ওঠে! চোখের সামনে ভেসে ওঠে গত মাসে

ছেলে বৌমার সঙ্গে দেখে আসা অনাথ আশ্রমটি।

ছোটো ছোটো মলিন মুখের শিশু গুলি যেন চেয়ে

আছে স্থির চোখে অনুর দিকে! তাড়াতাড়ি সেলাই মেশিনটা টেনে নিয়ে জড়ো করে রাখা ছিট গুলো নিয়ে বসে পড়ে অনু। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে বৌমা রূপসা,"কি হলো মা, এখন আবার সেলাই মেশিন নিয়ে বসলে যে!"ছোট ছোট জামা প্যান্ট তৈরী করার জন্য কাঁচি নিয়ে ছিট কাটতে কাটতে বলে অনু,"আজ একবার আমায় বাজার নিয়ে যাবি তো রূপসা, অনেক জামা, প্যান্ট, বিস্কুট লজেন্স, মিষ্টি কিনতে হবে, অনেক...!"