Thursday, November 2, 2023

বিনির সৌর খোঁজ - মনোরঞ্জন ঘোষাল || Binir Soura kojh - Monoronjon Ghosal || গল্প || ছোট গল্প || Story || Short Story || Prose || বড় গল্প

 বিনির সৌর খোঁজ

      মনোরঞ্জন ঘোষাল



ডোমস শুধু আমাকে মেরে ফেলার প্লান করেছিল এমনটা নয়। সে আমার গবেষণাকে অসম্মান করেছে। তাই আমার গবেষণাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন‍্য জেদ খানিকটা সে আমার বাড়িয়েই দিয়েছে। তার মত গবেষকদের মুখে ঝামা ঘসে দিতে আমি আবার আমার গবেষণা ভীত্তিক খোঁজ শুরু করলাম। আগে তো চাঁদের দিকে তাকিয়ে জীবের দর্শন পেয়ে ছিলাম। সেই কথা বিজ্ঞানী মহলে জানিয়ে দিয়েছি। এবারে সূর্যের দিকে একবার নজর দেব বলে মনে করছি। প্রখর আলোর জন‍্য তার দিকে তো তাকানো যায় না। তার জন‍্য এক বিশেষ ব‍্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


এদিকে মাইক্রোস্কোপিক দূরবিক্ষন যন্ত্রটি এখন আমার কাছে একটা মস্ত বড় হাতিয়ার। যেমনটি ছিল গ‍্যালিলিয়ের। তবে এটি গ‍্যালিলিওর টেলিস্কোপের থেকে অনেক উন্নত। আসলে আমি এটিতে অত‍্যাধুনিক প্রযুক্তি ব‍্যবহার করেছি। আমি এক বিশেষ প্রকার লেন্স ব‍্যবহার করেছি এই যন্ত্রে। যেটি সাধারণ লেন্সের কার্যকারিতা বহু গুণে বাড়িয়ে দিতে পারে। এই পদ্ধতি টিও আমার নিজস্ব।


এক বিশেষ সংকর লেন্স। লেন্সের কাঁচের সঙ্গে বিশেষ ধাতুর একটা শতকরা ভাগ মিশ্রিত করলে তার স্বচ্ছতার কোন পরিবর্তন ঘটে না। মানে কাঁচটি ঘোলাটে হয়ে যায় না। সেই কাঁচ দিয়ে লেন্স তৈরী করলে লেন্সের বিস্ফারিত করার ক্ষমতা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে যায়। আসলে ঐ অপদ্রব‍্যটি অর্থাৎ যেটিকে এক সামান‍্য ভাগে গলিত কাঁচে লেন্স তৈরীর সময় মেশানো হল। সেটি স্বাভাবিক কাঁচের তুলনায় অনেকটা ক্ষমতা শালী হয়ে ওঠে। সেই অপদ্রব‍্য মিশ্রিত কাঁচ দ্বারা গঠিত লেন্সের মধ‍্যে আলোর প্রতিসরণ ঘটলে তার চ‍্যুতি কোনকে বাড়িয়ে দেয় বেশ অনেকটা পরিমানে। বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর আমি এই সত‍্যটি উদ্ভাবন করতে সমর্থ হয়েছি। সেই বিশেষ ভাবে তৈরী লেন্স আমি আমার মাইক্রোস্কোপিক টেলিস্কোপে ব‍্যবহার করে অসাধারণ ফল পাচ্ছি। 


এতদিন ওই দিয়ে আমার সৌর গবেষণাকে যাচাই করার কথা মনে আসে নি। সেটিকে গাণিতিক ভাবে আমি তাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠা করেছি। পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করা হয় নি। আজ ডোমসের ওখান থেকে প্রত‍্যাবর্তন করার এক বৎসর কাল অতিবাহিত হল। সকালে আমার হাত ঘড়িটি আমাকে স্বরণ করিয়ে দিল। আমার এই ঘড়িটি এমন স্মরনীয় ঘটনা গুলিকে ওর স্মৃতিতে ধরে রাখে। আর সময় মত আমাকে মনে করিয়ে দেয়। মোবাইল ফোনেও ঐ কাজ করা যায় তবে মোবাইলের ক্ষতিকর বিকিরণের জন‍্য আমি ওটির ব‍্যবহার প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি। বদলে একটি অন‍্য যন্ত্র তৈরী করায় মনযোগ দেবো বলে মনে করে আছি। 


ডোমসের ওখানে আমি ষোলোই আগস্ট গিয়ে ছিলাম। আর ফিরেছি তেইশে আগস্ট। আজও সেই তেইশে আগস্ট। 


আজ তেইশে আগস্ট ২০১৩ সকাল দশটা। আমার অদৃশ‍্য কাঁচ ঘরটায় সৌর খোঁজে মন নিবেশ করব বলে মন স্থির করে নিলাম। সকলের দৃষ্টিকে আড়াল করে আমি আমার সাধের ল‍্যাবে প্রবেশ করলাম। সেখানে এখন অনেক কাজ করতে হবে। বিশেষ করে ক দিনের জন‍্য আমাকে টেবিলে সৌর দর্শনের যন্ত্রপাতি সব সাজিয়ে নিতে হবে। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় সব কিছু হাতের কাছেই সাজিয়ে রাখতে হবে। নইলে সময় মত সব জিনিস পত্র দরকারে পাওয়া যাবে না। আমার স্টেচিং চেয়ারের পাশে যন্ত্রপাতি সজ্জিত করতে শুরু করলাম। মাইক্রোস্কোপিক টেলিস্কোপ যন্ত্রটিকে একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করলাম। যাতে সেটি সূর্যের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমান ভাবে একই কৌনিক মাণের হারে আপনা থেকেই সরতে থাকবে। আমি তো আর সারাটা রাত আর দিন ধরে সব সময় সেই অনুবিক্ষনিক দূরবিন যন্ত্রের কাছে বসে থাকব না। মাঝে মাঝে অন‍্য কাজে সেখান থেকে সরে যেতে হতে পারে। তাই তার পর্যবেক্ষণের ছবি সে আপনা থেকেই তুলে রাখবে। আমার খোঁজের যাতে কোন রকম আসুবিধা না হয় তার পাকা পোক্ত ব‍্যবস্থা বলতে পার। এই সব জিনিস পত্র যথাযথ ভাবে সাজাতে বিকেল হয়ে গেল। সূর্য তখন দিগন্ত রেখার কাছে পৌঁছায় নি। একটি বার যন্ত্রের নলে চোখ ঠেকিয়ে তাকালাম সেই হেলে পড়া সূর্যের দিকে। ভাল দেখতে পেলাম না। লাল রঙের বড় তরঙ্গ দৈর্ঘ‍্যের আলোক রশ্মি গুলি আকাশে ছেয়ে দৃষ্টিকে অস্পষ্ট করে তুলছে। বুঝলাম তার প্রতিরোধের ব‍্যবস্থা করতে হবে। এই নিয়ে এক সময় মনযোগ দিয়ে ছিলাম। তখন এর প্রতিকার করার জন‍্য এক বিশেষ কোটেড চশমা তৈরী করে ছিলাম। আজ তার কথা মনে পড়ে গেল। সেই তৈরী করা স্পেশাল কোটেড চশমার কথা। যেটি চোখে পরে থাকলে চোখে আছড়ে পড়া উজ্জ্বল বেগ বান আলোক রশ্মিকে বাধা দেয়। ফলে চোখকে অযথা আলোর ঝাপটা সহ‍্য করতে হয় না। ঐ নীতি প্রয়োগ করলাম আমার মাইক্রোস্কোপিক টেলিস্কোপ যন্ত্রের উপরের লেন্সে। একটি লেয়ার সেই স্পেশাল কোট লাগিয়ে দিলাম তার ওপরে। ফলে অযথা অযাচিত আলোর ঝলকানি আর লেন্সের ভেতর দিয়ে যন্ত্রের ভেতরে প্রবেশ করতে পারল না। তাতে আমার দেখাতে কোন বাধা সৃষ্টি হল না। ফলে আমি আরামে বিনা বাধায় সব কিছু দেখতে পাচ্ছি। সেই জন‍্য আমার আলোক বিশ্লেষণটা অনেকটা সহজ হয়ে পড়ল।  


আলোক বিশ্লেষণ হল এক বিশেষ কৌশল। যেখানে আলোক রশ্মি গুলিকে পছন্দ মত ভাবে আলাদা করে নেওয়া যায়। আলোক রশ্মি যে কণিকার প্রবাহ তা আমরা জানি। সেই কণিকার নাম নিউটন দিয়েছিলেন ফোটন। তিনিতো আলোর কণিকা তত্ত্বের উদ্ভাবক। প্রমাণ করেছিলেন আলোকের কণিকা ধর্ম। তিনি আলো যে কণিকা সেটি বললেও সে কণিকারা যে আকার ও ভরে ভিন্ন হতে পারে তা বলেন নি। তিনি বলেছিলেন আলোর কণিকা গুলি ধর্মে অভিন্ন। 


এই কথা সত‍্য নয়। আইন্সটাইন তার সমীকরণে সেই কথা স্পষ্ট দেখিয়েছেন। তা ছাড়া সনাতনী বলবিদ‍্যার ধারণাকে বিশ্লেষণ করলেই তা জানতে পারা যায়। সাধারণ আলো আর এক্স লশ্মির কথা ভেবে দেখ? সাধারণ আলোকের তুলনায় এক্স রশ্মির ভেদন ক্ষমতা অনেক বেশি। তা হলেই বোঝ? হয় এক্স রশ্মির কণিকা গুলোর গতিবেগ সাধারণ আলোর কণার তুলনায় বেশি। নতুবা এক্স রশ্মির কণিকা গুলো সাধারণ আলোক কণিকার তুলনায় আকারে অনেকটা ছোট। তবে সম্প্রতি প‍্যারিস-জার্মানিরর এল এইচ সির গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে যে আলোর থেকে বেশি গতি সম্পন্ন কণিকা আছে। সত‍্যেন বসুর নামে সেই কণিকা কে বোসন বলে অভিহিত করা হয়েছে। অনেকে অবশ‍্য ঈশ্বর কণা বলে সেই ক্ষুদ্রতর কণাকে অভিহিত করছেন। ওই ক্ষুদ্রতর না ওর থেকেও ছোট ক্ষুদ্রতম কণিকার কথা আমি অনেক আগেই বলে ছিলাম। তার নাম দিয়েছিলাম একক কণিকা বা ইউনিট পার্টিকল। এটিও আমার এক অমোঘ ধারণা। আমার বস্তুবাদ তত্ত্বে এর উল্লেখ আছে। 


আসলে বস্তু ছাড়া যে বস্তুর সৃষ্টি হতে পারে না সেটাকেই বলা হয়েছে সেখানে। তার সঙ্গে ইউক্লিডের জ‍্যামিতির ধারণা কে জুড়ে দিয়েছি মাত্র। শক্তি আর বস্তু আদতে এক জিনিস। বস্তুর এক বিশেষ অবস্থা হল শক্তি। বস্তুকে যেমন শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। তেমন শক্তিকে বস্তুতে রূপান্তর করা যায়। আমার ল‍্যাবে আমি তা করে দেখেছি। একটা আলোক রশ্মি থেকে ভারি কণার বস্তু গঠন করেছি। আলোক রশ্মি তো একটি কণা না। অজস্র কণার একটা স্রোত। কোয়ান্টামের ধারণায় এক ঝাঁক কণিকার সমাবেশ বলতে পার। এখন থাক সে কথা।


নানা বর্ণের আলোক রশ্মি আসলে নানা প্রকারের কণিকার প্রবাহ। নিউটনই আলোক রশ্মিকে প্রীজমের মধ‍্যে দিয়ে পাঠিয়ে আলাদা করে দেখিয়ে ছিলেন। চুম্বক ঐ নানা বর্ণের আলোক রশ্মির ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই যেমন লাল বর্ণের আলোক রশ্মি চুম্বক দ্বারা বেশি আকর্ষিত হয়। কারণটা খুবই সাধারণ। এতে লোহার কণা থাকে তাই। এই ভাবে বিশেষ বিশেষ পদ্ধতিতে আলোর কণা গুলিকে আলাদা করে দিয়ে আমি আমার পছন্দ মত আলোক রশ্মি টিকে কাজের জন‍্য বেছে নেবার পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকি। একেই আলোক বিশ্লেষণ বলে থাকি। 


সন্ধ্যা হবার কিছুটা আগে যখন সূর্য অনেকটা দূরে সরে গেছে। তার থেকে নির্গত আলো বেঁকে তেরছা হয়ে ধেয়ে আসছে আমার কাছে। সে আলোর বেগ অনেক কমে গেছে। ঠিক তখনই কিছুটা আলো আমি ধরে নিলাম আমার আলোর ফাঁদ যন্ত্রে। এটি আমার তৈরী এক বিশেষ যন্ত্র। যেটিতে আলো ধরে রাখা যায়।


সকলেই জানে আলো প্রতিফলিত হয়। এবং দর্পণে তা অনেকটাই বেশি পরিমানে হয়ে থাকে। কতগুলো দর্পণকে বিশেষ কোনে স্থাপন করে তাতে আলো ফেললে। সেই আলো যদি সর্বদা এই সকল দর্পণের মধ‍্যে প্রতিফলিত হতে থাকে। তো সে আর কখনো প্রকৃতিতে মুক্ত হতে পারে না। তৈরী ঐ যন্ত্রে আটকা পড়ে থাকবে অনন্ত কাল। প্রয়োজন মত তুমি কোন একটি দর্পণকে সরিয়ে আলোকে ফাঁদ মুক্ত করে ব‍্যবহার করতে পারবে। আমি তাই করি। প্রয়োজন হলে আলো ধরে রাখি আর প্রয়োজনে সেই আলোকে কাজে ব‍্যবহার করে থাকি। আজ


দিন শেষ হবার আগে আমি কিছুটা আলো তাই ধরে নিলাম আমার আলোক ফাঁদ যন্ত্রে। এবার রাত ঘনিয়ে এল। আমি আমার অদৃশ্য কাঁচ ঘরেই সময় কাটিয়ে চলেছি। যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্র সাজিয়ে নজর দিয়ে বসে আছি। অদৃশ‍্য কাঁচ ঘর এমন কিছুই না। আলোর প্রতিফলন ধর্মকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা। 


বস্তু থেকে আলো বেরিয়ে আমাদের চোখে এসে পড়লে আমরা সেই বস্ত টিকে দেখতে পাই। সেই আলো বস্তুর নিজের দহনের আলো হতে পারে আর হতে পারে অন‍্য কোন উৎসের আলো। যা তার গায়ে প্রতিফলিত হয়ে ছোটে চলেছে । যখন বস্তু আলো প্রতিফলন করে এবং সেই আলো কারো চোখে ফিরে না আসে। তবে সেই বস্ত টিকে আর দেখা যাবে না। আমার কাঁচ ঘরের সূক্ষ্ম কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে আলো আনায়াসে ভেতরে চলে আসতে পারে প্রতিসৃত হয়ে। যৎ সামান‍্য যা কাঁচের দেয়ালে বাধা পেয়ে প্রতিফলিত হয় তা চোখে মালুম হয় না। আর ঐ প্রতিসৃত আলোক রশ্মি গুলিকে দর্পন দ্বারা বিশেষ কোনে প্রতি ফলিত করে একত্রিত করে এক বিশেষ কোনে মহাকাশে মুক্ত করে দিয়ে থাকি। ফলে আসে পাশের কেউ আমার ল‍্যাব দেখতে পায় না। উপর থেকে দেখলে আগুনের গোলা বলে মনে হয় । তাই ভয় পেয়ে উড়ন্ত কোন কিছুই এখানে উপর দিয়ে যায় না। সন্দেহের বসে অনেকে সে দৃশ‍্য দেখার পর খোঁজ করতে এসেছিল কিন্তু নীচে এসে দেখলে তারা কিছুই খুঁজে পায় নি। তবে আমার যন্ত্রটি পেলে তারা খুঁজে পাবে। আমি বাহিরে কোথাও গেলে এটিকে সঙ্গে নিয়ে যাই। নইলে আমি নেজেই আর ল‍্যাব খুঁজে পাব না। এটি এক প্রকার ডিটেক্টর। ল‍্যাবের মধ‍্যে থাকা এক বিশেষ যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে বাইরে থেকে এর অবস্থান জানতে সাহায‍্য করে। অবস্থান সূচিত হবার পর আমি কম্পাসে দিক নির্ণয় করে ল‍্যাবের ভেতরে প্রবেশ করি। ভেতরে ঢোকার পর সব কিছু দৃশ‍্যমান হয়ে পড়ে। এটি তৈরীর মেকানিজম আমি লিখছি না। তাহলে সকলে বানিয়ে আমার ল‍্যাব খুঁজে বের করবে। আমি বড় বিরক্ত বোধ করব। 


যদিও রাতে সূর্য আলো দেওয়া বন্ধ করে দেয় না। মনে করলে আমি স‍্যাটেলাইটের দ্বারা প্রতিফলিত আলোকে গ্রহণ করে কাজে লাগাতে পারি। অনেকে একটা কথা ঠিক বুঝতে পারে না। যে আকাশে সূর্যের আলো ছড়িয়ে থাকলেও আকাশ রাতে কালো থাকে কেন? আসলে আলো প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হয়ে আমাদের চোখে না আসলে আমরা উৎস বা প্রতিফলককে দেখতে পাবো না। কারণ আলোক রশ্মিকে চোখে দেখা যায় না। তাই আকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আলোক রশ্মিগুলো কোথাও প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হয়ে আমাদের চোখে আসে না। তাই কিছুই দেখা যায় না। সে যাক।


রাতে আলোর ফাঁদে থেকে আলো নিয়ে একটা আলাদা যন্ত্রে একটু নাড়াচাড়া করলাম। কোন লাভ হল না। কারণ তার সূর্যের সঙ্গে সংযোগ সূর্য থেকে অনেক আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাই তার চলার পথ আর সূর্য পর্যন্ত বিস্তৃত নেই। সেই আলো সূর্যকে প্রত‍্যক্ষ করাতে পারছে না। এবার আর প্রতিফলিত আলোকে উৎস খোঁজায় ব্রতি হলাম না। জানি সে কাজ ভষ্মে ঘি ঢালার মত হবে। আগুনও জ্বলবে না আর ঘি টুকুও নষ্ট হবে।


পরের দিন সকাল হলেই আবার বসে পড়লাম টেবিলে সৌর খোঁজের কাজে। একেবারে সকাল এখনো সৌর কিরণ এখানে এসে পড়ে নি। দেখি বড় একটি মেচলার মত সূর্য সবে উঠে আসছে উপরের দিকে। যেন মনে হয় জ্বলন্ত কয়লা। একেবারে টক টকে লাল হয়ে জ্বলছে। দেখে মনে হয় না সেটি পৃথিবীর থেকে বড়। ধীরে ধীরে তাকে কাছে টেনে এনে বড় করতে থাকলাম। ক্রমে বড় হচ্ছে একটা ঘরের মত বড় হয়ে গেল। আরো বড় করতে লাগলাম। এবার একটা গোটা গ্রামের মত হয়ে পড়ল। তখন তাতে সৌর কলঙ্ক খুঁজতে শুরু করলাম। কিচ্ছু পাওয়া গেল না। তাকে আরো বড় করতে করতে একেবারে হাতের কাছে ছুঁয়ে ফেলার মত কাছে নিয়ে চলে এলাম। এবার তার দেহে আমাদের ঘরের মত এতটুকু জায়গা দেখতে কয়েক ঘন্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এতটাই বড় করা হয়ে গেছে তার দেহটি। ভেবে দেখলাম তাহলে তো গোটা গ্রামের মত একটা অংশ স্থান পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বহু সময় লেগে যাবে! সম্পূর্ণ তার দেহের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খোঁজ করতে সারাটা জীবন লেগে যাবে! তাই তার আকার কিছুটা ছোট করে নিলাম। ছোট করতেই এক অদ্ভূত দৃশ‍্য নজরে পড়ল! 


দেখলাম একটা আগ্নেয়গিরি! তার জ্বলা মুখ দিয়ে অগ্নুৎপাৎ হচ্ছে। কোন লাভার নির্গমন হচ্ছে না। বড় বড় জালার মত আগুনের গোলা নির্গত হয়ে ছুটে আসছে আমাদের দিকে। কয়েকটা তো আমাকে লক্ষ‍্যঃ করে ছুটে এল! আমি ভয় পেয়ে গেলাম! দেখলাম সেগুলি ঠিক যেন আমার মাথার উপর এসে আছড়ে পড়ছে। আমি জানি ওতে আমার কোন অসুবিধা নেই। আমি আমার ল‍্যাবের চারিদিকে অদৃশ‍্য লেজার শিল্ড প্রোটেকশন চালু করে রেখেছি। বড় ধুমকেতু এসে আছড়ে পড়লেও কিছু হবে না। তবে সূর্য এসে আছড়ে পড়লে কী হবে বলতে পারবো না। হয়তো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সেটি যে হবার না তা আমি ভাল মত জানি। আর আমি তো কেবল আমার কথা ভাবি না। পার্থিব সকল জীব জগতের কথা আমাকে ভাবতে হয়। ঐ আগুনের ছুটে আসা গোলা আমার কোন ক্ষতি না করলেও পার্থিব বাকি সব কিছুর ক্ষতি করছে। মনে মনে তাই খুব ভয় পেয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে ল‍্যব থেকে বাহিরে বেরিয়ে এলাম দেখার জন‍্য। এই কথা ভেবে যে ঐ ধেয়ে আসা আগুনের গোলা গুলো আসে পাশের পরিবেশের কতটা ক্ষতি করছে। বাহিরে বেরিয়ে এসে অবাক হয়ে গেলাম! কোথায় সেই ছুটে আসা আগুনের গোলা? কোথাও কিচ্ছু তো নেই! পরিবেশের এতটুকু ক্ষতি তো কোথাও হয় নি! চারি পাশে গাছ পালা জীব জন্তু সব কিছুই বহাল তবিয়তে রয়েছে। 


বরং রৌদ্রে ঝলমল করে গাছেরা যেন খিল খিলিয়ে হাসছে। দিঘির জল হালকা সেই রোদে তাথৈ তাথৈ নৃত‍্য করছে। পানকৌড়ী মনের আনন্দে টুপ টুপ করে জলে ডুব দিচ্ছে। প্রকৃতিতে মহা সমারোহ। এতটুকু বিমুর্ষতার চিহ্ন কোথাও চোখে পড়ল না।


মনে সনন্দেহ হল! তবে কী আমি যন্ত্রে ভুল দেখলাম! আমার যন্ত্র কী সঠিক দিশা দেখাতে পারছে না?মনটা ভাবনায় ভরে গেল। সমস‍্যাটি কী খুঁজে নেবার চেষ্টা করলাম। অনেকক্ষণ ভেবে একটা আন্দাজ করলাম তবে একবার পরখ না করে একেবারে নিশ্চিত হলাম না। 


আবার গিয়ে বসলাম ল‍্যাবের ভেতরে আমার চেয়ারে। এবারে মন টাকে শান্ত করে চেয়ে দেখলাম সূর্যের দিকে তাক করে থাকা টেলিস্কোপের মুখে লাগানো স্ক্রীন টার উপর। প্রত‍্যক্ষ করলাম আবার সেই দৃশ‍্য। ঝাঁকে ঝাঁকে সেই ভাবেই আগুনের গোলাগুলো সূর্যের দেহের আগ্নের গিরির জ্বালা মুখ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসছে আমার দিকে। যেন ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র! তখনও ঠিক ভাবে আমার মাথায় আসছিল না কেন এমন দেখতে পাচ্ছি? অনেক ভাবনা চিন্তার পর বুঝতে পারলাম আসল সত‍্য টিকে! প্রত‍্যক্ষ করলাম কোয়ান্টাম তত্ত্ব! শক্তির কণা গুলো দল বেঁধে নির্গত হয় উৎস থেকে। আর এ তো সেই ঘটনা। এগুলো আলোর কণা ফোটন। আমার ম‍্যাগনিফাইং গ্লাসে সেই অতিব সূক্ষ্ম ফোটন কণা গুলিকে এত বিশাল আকারে দেখাচ্ছে। তাই আলোর কণার নিক্ষেপকে গোলা বর্ষণ বলে মনে হচ্ছে। আমার যন্ত্রে এতটাই বর্ধিত করা সম্ভব হয়েছে যে আলোর ঐ তীব্র গতিও ক‍্যামেরায় ধীর গতি সম্পন্ন মনে হচ্ছে। সিনেমার পর্দায় যেমন স্লো মোশনে ছবি দেখা যায়। এখানে তেমন সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে চলা আলোক কণাদের একটি সিধারণ কণার মত গতি শীল দেখাচ্ছে। কী আশ্চর্য! এমনটাও হতে পারে? তাহলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারিদিকে যে ইলেকট্রন গুলো প্রচণ্ড গতিতে ঘুরে বেড়ায় তাকেও তো একটি স্বাভাবিক গতিতে কেন্দ্রকের চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে থাকা কণার মত দেখাবে? পরমাণু পর্যবেক্ষণের একটা খুব ভাল দিক উন্মোচন হল আমার কাছে এই গবেষণা করতে গিয়ে। সেই নিয়ে আর এক সময় কাজে বসা যাবে। এই অভাবনীয় দৃশ‍্য সচক্ষে দেখে


একবার মনে হয়েছিল এই দৃশ‍্য আমি বৈজ্ঞানিক সমাজকে প্রত‍্যক্ষ দর্শন করাব। কিন্তু সেটি যে সম্ভব না। আমার এই ল‍্যাবরেটরী আর যন্ত্রের সেটাপ ছাড়া এই দুর্লভ দৃশ‍্য দেখা অসম্ভব। সেটি যে দ্বিতীয় কোথাও সেট করা যাবে না। আর আমার ল‍্যাবের সন্ধানও কাউকে দেওয়া যাবে না। একটা প্রমাণ স্বরূপ এই লেখাটি রাখলাম। তাতে যে যা বোঝে বুঝুক। অসত‍্য বলে মনে করে করুক। তবে কেউ কেউ সত‍্য বলে মনেও তো করতে পারে? তাদের উদ্দেশ্যে জানিয়ে রাখি আমার এই উক্তি যথার্থ সত‍্য এবং সচক্ষে দেখা বর্ণনা। এটিকে বিশ্বাস করে গবেষণায় লেগে থাকলে সাফল‍্য আসবেই।


এবার মনে এল আলোর কণা গুলো অগ্নুৎপাতের মত নির্গত হচ্ছে ঠিকই। তাবে তা সূর্যের দেহের সমগ্র তল থেকে নির্গত হচ্ছে না। তার দেহের কোথাও কোথাও টর্চ জ্বেলে রাখার মত এমন আগুনের গোলা বের করার আগ্নেয়গিরি রয়েছে। আর বাকি বেশির ভাগ অংশটাই ফাঁকা। আমাদের পৃথিবীর মাটির মত। সমগ্র পৃথিবীর বুকে কয়েকটা মাত্র আগ্নেয় গিরি আছে তাও আবার সব গুলি জ্বলন্ত নয়। বেশির ভাগ দেহ তলই ফাঁকা। তবে আমাদে দেহ তলের মত এতটা ফাঁকা নয় সূর্যের দেহ তল। তবে সমগ্র তল যেমন আগুনের গোলা বলে মনে হয়। সূর্যের সেই দেহ তল তেমনটি না। সেখানে পাহাড় পর্বত ঘর বাড়ি সব রয়েছে। বড় বড় গর্তও রয়েছে চাঁদের মত। যেখানে কোন আগ্নেয় গিরি নেই তাই আলো জ্বলে না। বাহিরে কোথাও থেকে আলো পৌঁছে গেলেও সে আলো আর ফিরে আসে না কোথাও। তাই কালো হয়েই থাকে সব সময়। এই কালো অংশ গুলো হল সৌর কলঙ্ক।আমরা এগুলো খুব একটা দেখতে পাই না। কারণ সৌর ঝড় আর সূর্যের আবর্তণ গতির জন‍্য। 


সূর্যের দেহে ঝড় বয়ে চলেছে প্রবল বেগে সর্বক্ষণ। সে ঝড় আলোর কণা গুলিকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তার দেহে সর্বত্র। তাই সে দিকে তাকালে ও সব আর দেখা যায় না। শুধু জ্বলছে সারা দেহ বলে মনে হয়। যদিও এর জন‍্য বহুলাংশে দায়ী তার আবর্তণ গতি। পৃথিবীর মত সূর্যও তার নিজের অক্ষের চারিদিকে পোঁ পোঁ করে ঘুরছে। এতটাই তার বেগ যে মুহুর্তের মধ‍্যে আগ্নেয় গিরির জ্বলা মুখ আবার ঘুরে আসছে চোখের সামনে এক পাক ঘুরে। তাই সব সময় ঐ জ্বলা মুখই আমাদের চোখে ধরা দেয়। অনেকটা চরকা বাজি মত ঘটনা বলে মনে করতে পার। চরকার মুখে আগুন জ্বেলে দিলে সে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকে। দেখে মনে হয় তার দেহের সর্বত্র দিয়েই আগুন জ্বলছে যেন। আদৌ তাই কি জ্বলে? এমন ঘোরার গতি আমাদের মনে করতে বাধ‍্য করায় তার এমন সর্ব দেহ জ্বলমান অবস্থার কথা। 


তাই সূর্যের সারা গায়ে আগুন জ্বলছে বলে দেখালেও আদৌ তার সারা গায়ে আগুন জ্বলছে না। তার দেহের বিস্তৃত জায়গা রয়েছে ফাঁকা পড়ে। সেখানে বাস করে সৌর মানব। আমাদের থেকে দীর্ঘাকায় ও সোনার মত তাদের গায়ের রং। সোনা রদ্দুরের দেশে বাস করে বলে হয়তো এমনটা হয়েছে। পরিবেশের প্রভাবে এমনটা হয়ে থাকে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেলানিজম বলে একটা ব‍্যাপার আছে। আমরা অনেকেই জানি। যেখানে এক এক ইন্ডাস্ট্রি অঞ্চলে ঐ ইন্ডাস্ট্রির জন‍্য বিশেষ পরিবেশ গড়ে ওঠে। সেই পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেবার জন‍্য জীব দেহে নানা রকম পরিবর্তন ঘটে থাকে। একেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেলানিজম বলে। সূর্যের বাসিন্দাদের ঐ রকম সোনালী গড়ন হয়েছে সোনালী রদ্দুরের জন‍্য। আর দেহের আকার বড় হবার কারণ ওদের আবর্তন গতি। যেমন আমাদের বিষুব রেখার বা তার আসে পাশের অঞ্চলে থাকা লোক গুলোর আকার বেশ বড়। ততার পর অক্ষাংশ কমার কারণে আকার কমতে থাকে। অক্ষাংশ কমতে থাকলে তার আবর্তন গতিবেগ ও কম হয়। তাই বাহিরের দিকে ছিটকে যাবার বেগও কম হয়। অর্থাৎ কেন্দ্রাতিগ বল মানুষের লম্বা হয়ে বেড়ে ওঠার পক্ষে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বল যত বেশি হবে তত তাকে খাঁটো করে দেবে। এটিকে অভিকর্ষ বলা হয়। অভিকর্ষের টান কাটিয়ে মানুষ কে বড় হতে হয়। মেরু দেশে মানুষের ওপর অভিকর্ষ টান বেশি তাই তারা লম্বা বেশি হতে পারে না। তাই বলে ঐ একটি কারণ শুধু লম্বা হবার জন‍্য দায়ী তা বলা যাবে না। অনেক কারণের মধ‍্যে এটিও একটি কারণ। না হলে গোর্খা জাতিদের বেঁটে হবার কারণ আর গাণিতিক হিসাব নিয়ে সংশয় দেখা দেবে। কারণ ঐ একই অক্ষাংশে পাহাড়ের মাথায় আর ঠিক সেই পাহাড়ের নীচের মানুষদের আকারের উল্টো পরিণতি ঘটবে কেন? সেখানে তো পাহাড়ের ওপরে বসবাসকারী গোর্খাদের লম্বা আর নীচে বসবাসকারী দের বেঁটে হবার কথা। এখানে আর একটা যে সত‍্য লুকিয়ে আছে তা বলে রাখি। তাহল অস্বাভাবিকতা। মানুষের ভর অনুযায়ী পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল তার জন‍্য বরাদ্দ আছে। সেই অঞ্চলের নীচের দিকে বা ওপরের দিকে বাস করলে তার শরীর একটা অস্বভাবিকতা অনুভব করে। ফলে সে স্বাভাবিক ছন্দে নিজেকে মেলে ধরতে পারে না। তখন তার সমস্ত চরিত্রে বৈশিষ্ট্যগত নানা পার্থক‍্য গড়ে ওঠে যেটি তাকে ঐ পরিবেশে মানিয়ে নিতে সাহায‍্য করে। এখন থাক ও কথা। কী আশ্চর্য! সূর্যের দেশে মানুষ!


সেখানে মানুষ দেখে উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। আরো ভাল করে খোঁজ করতে থাকলাম সেখানের মাটি। কী আশ্চর্য! তাল তাল সোনায় পাহাড় তৈরী করে রেখেছে সেখানে! আমরা একটু সোনার টুকরোর জন‍্য হাপিত্তেষ করে মরছি।আর সেখানের লোকে সোনা পা দিয়ে মাড়াচ্ছে। সোনার ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। সোনার বাড়ি তৈরী করে তাতে বাস করছে। আরো একটু লেন্সটি সরিয়ে নিয়ে গিয়ে দেখলাম সাদা কিসের যেন পাহাড় রয়েছে মনে হল। প্রথমে মনে হয়ে ছিল অভ্র। তার পরক্ষণেই বুঝলাম সেটি অভ্র না। সে তো হালকা ধাতু। তার তো ওখানে হাওয়ায় ভেসে বেড়ানোর কথা। তবে এটি কী? প্লাটিনাম নয় তো?



আলোর দ‍্যুতি পরীক্ষা করে দেখলাম যে ঠিক তাই। যা মনে ভেবেছিলাম!সেটি প্লাটিনামের পাহাড়। ওরে বাবা! এত বড় প্লাটিনামের পাহাড়! এ মুলুকে থাকলে না হয় এক ধামা নিয়ে ঘরে রেখে দিতাম। এখানে তো ওটি সহজে পাওয়া যায় না তাই বেশ দামি ধাতু। তার পর নজর পড়ল এক ঝকঝকে গাছের ওপর। ঠিক যেমন বড় দিনে আমাদের এখানে গাছকে সাজিয়ে বানানো হয় তেমন ঝকছে কিন্তু কোথায় বাতি লাগানো তা দেখতে পাচ্ছি না। বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে তবে বুঝলাম যে সেটি কোন সাজানো গাছ নয়। ওটি ওখানের স্বাভাবিক গাছ। আমাদের যেমন সবুজ পাতার গাছ হয় ওখানে তেমনই গাছ তবে তার পাতা সবুজ না। রোদের মত সোনালী। 


সাধারণ টেলিস্কোপে এ সব কিছুই দেখা যায় না। ওরা তো দৃষ্টিকে আলোক বলয় ছাড়িয়ে ভিতরে নিয়ে যেতে পারে না। তাই ও সব টেলিস্কোপে সূর্যকে জ্বলন্ত আগুনের গোলা বলে মনে হয়। আলোক বলয় তেমন বিশেষ কিছু নয়। অপেক্ষা কৃত ভারি আলোর কণা গুলো দেহ থেকে নির্গত হয়ে বেশি দূর পর্যন্ত ছুটে যেতে পারে না। কিছুটা দূরে গিয়ে তারা একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে অবস্থান করে সূর্যের মূল দেহকে বেষ্টন করে আবর্তন করতে থাকে। ঠিক যেমন শনির বলয়। শনির বলয় তো ঘন ধুলি কণার স্তর। যেটি তার দেহের চারি পাশে বলয়ের মত ঘুরতে থাকে। নানা ভরের ছোট ছোট কণা সেখানে ভীড় করে এমন বলয় গঠন করেছে। সূর্যের দেহের চারি পাশেও তেমন ভারি আলোর কণার স্তর ঘুরে বেড়িয়ে আলোক বলয় গঠন করে। সূর্যের দেহ থেকে নির্গত সূক্ষ্ম আলোর কণা গুলোই প্রচন্ড গতিতে ঐ আলোক বলয় ভেদ করে বাহিরে বেরিয়ে আসে। সেই সূক্ষ্ম রশ্মিকে অনুসরণ করা সাধারণ টেলিস্কোপের ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। এমন কি হাবল টেলিস্কোপেও তাকে ধরতে পারবে না। যদি পারতো তো ওদেরকে পদ্ধতি বলে দিয়ে তা প্রত‍্যক্ষ দর্শন করাতাম। 


অনেকে বলে থাকেন সূর্যের দেহে এত উত্তাপ ওখানে জীবন থাকা সম্ভব না। তাই গাছ পালা মানুষ এ সব কিচ্ছু নেই। তারা যে এত বোকার মত কথা বলে তা বলে বোঝাতে পারবো না। আগেই তো বললাম যে সূর্যের দেহে সর্বত্র আগুন জ্বলছে না। তাই যেখানে আগুন জ্বলছে না সেখানে জীব থাকতে পারে এবং আছে তা আমি প্রত‍্যক্ষ করলাম। আগুন তো অল্প কিছু জায়গাতে জ্বলছে। সেই আগুন ঝড়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেহের অন‍্যত্র। তাই সূর্যের সমগ্র দেহ জুড়ে আগুন জ্বলছে বলে মনে হয়। সেখানের উত্তাপ যতটা মনে করা হয় ঠিক ততটা নয়। তবে আমাদের এখানের থেকে সেখানের উত্তাপ অনেক বেশি। তাই বলে ঠিক ততটাও না যতটা আমরা অনুমান করি অসহ‍্য বলে। আমরা তো জানি আগুনের কাছে পাশাপাশি যতটা হাত নিয়ে যাওয়া যায় উপর থেকে ততটা কাছে হাত নিয়ে যাওয়া যায় না। ঘূর্ণনে অপ কেন্দ্রিক বলের কারণে ঐ ফোটন কণা গুলি ঘূর্ণন কেন্দ্রের বিপরীতে ছুটে চলে যায়। তাই উপরের দিকে হাত বেশি কাছে আনা যায় না। ঐ কণারা তাদের চলার পথে বাধা পছন্দ করে না। যদি কোন বাধা চলার পথে পড়ে তবে তাকে হয় বিদ্ধ করে ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। নতুবা সে নিজে তার গায়ে ধাক্কা মেরে প্রতিফলিত হয়ে অন‍্য দিকে চলে যায়। আরো একটা কথা বলতেই হয়। যে মরুতে বা মেরুতে জীবেরা বসবাস করতে পারবে বলে আমরা কখনো ভেবেছিলাম! না তো? অথচ সেখানে জীব রয়েছে। মরুতে বিষাক্ত বালি বোড়া সাপ। কাঁকড়া বিছে ইত‍্যাদিরা উষ্ণ বালির ভেতরে বেশ আরামেই থেকে যাচ্ছে। আর মেরুর প্রচন্ড ঠান্ডায় ক্রায়োজেনিক্স ছত্রাক আর শৈবাল তো রয়েইছে। সঙ্গে মানুষও রয়েছে। এস্কিমো। কেউ ভেবেছিল এ সব কথা! তবে এরা সকলে ঠিক আমাদের মত না। শিতের দেশের পাখি পেঙ্গুইন কে যেমন গরমের দেশে নিয়ে গেলে তাকে তার মত ব‍্যবস্থা নিয়েই নিয়ে যেতে হবে। তেমনই অস্ট্রিচ এমু এদেরকে বরফের দেশে নিয়ে যেতে গেলে তাদের তার মত পরিবেশ গড়ে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ শিতের পাখিকে গরমের দেশে নিয়ে গেলে তাকে শিতের পরিবেশ তৈরী করে সেখানে রাখতে হবে। আর গরমের পাখিকে শিতের দেশে নিয়ে গেলে তাকে গরমের বাঁসা বানিয়ে সেখানে রাখতে হবে। ঐ দুই পরিবেশের পাখি দুটি তাদের পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারলেও বিপরীত পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে না। তাই বলে গরমের পাখি কী মনে করতে পারে যে শীতের দেশে কোন পাখি বাস করতে পারে না? ওদের ক্ষেত্রেও তাই। সূর্যের দেশের জীবেরা তারা তাদের পরিবেশে বসবাস করায় অভ‍্যস্থ জীব থাকে। তারা গরম সহ‍্য করতে পারে। আবার আমরা অপেক্ষা কৃত ঠান্ডার ভূখণ্ডে বাস করি ওদের মত গরমে থাকতে পারবো না। তাই বলে ওখানে জীব থাকতে পারে না বলে আমাদের মনে করাটা কল্পনা। এটিকে বৈজ্ঞানিক সত‍্য বলে মেনে নেওয়া যাবে না। তবে বিজ্ঞান তো না দেখে সহজে বিশ্বাস করবে না। আমি দেখেছি ফলে সেটিই প্রমাণ এই কথা কেউ মেনে নেবে না। তাদেরকে হাতে নাতে দেখিয়ে দিয়ে প্রমাণ দিতে হবে যে আমার কথা সত‍্য। সেটি যে করা সম্ভব না তা আমি আগেই স্বীকার করেছি। তাই আমার এই নিজের সচক্ষে দেখা ও তার সম্পর্কে লেখা বিবরণ সকলে বিশ্বাস করতে চাইবে না। সে যাই হোক ওরা বিশ্বাস না করে করুক তাই বলে আমার চোখের দেখা সত‍্য তো আর মিথ‍্যা হয়ে যাবে না। আরো একটু মনযোগ দিয়ে সূর্যের দেহ তল পর্যবেক্ষণ করছি। নানান দৃশ‍্যের মাঝে


এ বার আরো একটা অদ্ভূত দৃশ‍্য দেখতে পেলাম। সেই দৃশ‍্য আমাকে কেবল অবাক করে দিল না বরং এক বিশেষ ভাবনার মধ‍্যে ঠেলে দিল। আমি ঠিক নাস্তিক না হলেও আস্তিক বলতে পারবো না। অর্থাৎ আমি ধর্মকে তেমন অবিশ্বাস না করলেও তেমন বিশ্বাস করি তা বলা যায় না। তাই এই দৃশ‍্য দেখে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম! তবে কী পুরাণ কাহিনী সব সত‍্য! তবে কী দেবতা আর অসুরেরা এখনো জীবিত? এখনো কী তাদের মধ‍্যে ঘটে চলেছে মহা সগ্রাম! এমন কথা মাথার মধ‍্যে ভীড় জমাতে থাকছে। যখন দেখলাম সেখানে রয়েছে দু প্রকার মানুষ! কাল আর সাদা যেটি সোনালী দেখায়।


এক দল কালো যারা দল বেঁধে থাকে ঐ অন্ধকার ময় কালো গহ্বরে। আর এক দল সোনালী মানুষ যারা থাকে আলোর দিকে জড়ো হয়ে। এখন বুঝতে পারলাম তাই আলো এত উজ্বল আর অন্ধকার এতটা কালো।


তাকিয়ে আছি ঐ দিকে। দেখি ঘন কালো অন্ধকারে ভিতর থেকে বিশাল দৈত্যাকার কিম্ভূত কিমাকার সব মানুষ বেরিয়ে আসছে। হাতে তাদের অস্ত্র। তারা এগিয়ে চলেছে আলোর দিকে। সেই আলোর দিকেও চলছে তোড়জোড়। আলো আর আঁধারের দুটি দল। তারা পরস্পরের শত্রু। দিন আর রাতের মত। অসুর আর দেবতাদের মত। এখনি বোধহয় বেধে যাবে যুদ্ধ যা অনন্ত কালের আলো আঁধারের বিরোধ। কেন? কিসের জন‍্য যুদ্ধ তা জানি না। বোধহয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। একে অপরকে পরাস্ত্র করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সে জগতে। তাই আঁধার আলোকে গ্রাস করতে চায় সর্বদা। আর আলো অন্ধকারকে প্রতি হত করে চলেছে সর্বদা। একজন হল ধ্বংসের প্রতীক। আর অন‍্য জন সৃষ্টির। আমি অহিংস। হিংসাকে পছন্দ করি না আর প্রশ্রয় দিই না। তাই আমার ওই যুদ্ধ দেখার আর আগ্রহ থাকলো না। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম টেলিস্কোপ থেকে।


একটি অবাঞ্ছিত - আবদুস সালাম || Ekti Obanchito - Abdus Salam || গল্প || ছোট গল্প || Story || Short Story || Prose || বড় গল্প

 একটি অবাঞ্ছিত

      আবদুস সালাম



(এক)



চুমকি হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে হাসপাতালের দিকে। রুক্ষসুক্ষ চুল। পরণে তার আধ ময়লা ছেঁড়া কাপড় 


       হিতম মাঝি ভোর ভোর বাড়ির মাচানে ধরা কয়েকটি ঝিঁঙে নিয়ে আসছিল মেলা তলার বাজারে বেচতে। তখন ও আঁধার আলোর মুখ দেখেনি।যা দুটো পয়সা পাবে তাই দিয়ে হাসান ডাক্তারের দোকানে ওষুধ নিয়ে যাবে তার অসুস্থ মেয়ের জন্য । দুদিন থেকে খুব জ্বর। শিব মন্দির তলায় তখন ও ঠিক মতো মুখ না চেনা আঁধার। একটি বেপরোয়া পিকআপ ভ্যান থেঁতলে দেয় তার ঝিঙের ঝুড়ি। বেশ লেগেছে তার কোমরে । নেশার ঘোরে ছিল। গত রাতে ভোট চাইতে এসেছিল ওরাই দিয়ে ছিলো ইংলিশ মাল। তীব্র আলো চোখে পড়ায় সে হতবম্ব হয়ে যায়।বেগতিক দেখে ড্রাইভার জোরে গাড়ি ছুটিয়ে পালায়। একাই বেচারী পড়ে আছে রাস্তায়।কেউ ওঠানোর লোক নেই।কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে কাঁদছে,আর বলছে ,"এয়া কি হুঁঙ গেলো রে চুমকি "।


            


  এই সময় মুখুজ্জে বাড়ি, হাজরা বাড়ি,ভটচাজ্ বাড়ির ছেলে মেয়েরা মর্নিং ওয়াকে বের হয়। আজ ও বেরিয়েছে।


       জমি দেখতে আসছিল হাসান ডাক্তার। একজন কে রাস্তায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে পাশে বাইক রেখে তাকে সোজা করে তোলাতে চেষ্টা করে ।হাত পায়ের রক্ত মুছিয়ে ধুয়ে দেয়। সোজা করে হাঁটানোর চেষ্টা করে। মর্নিং ওয়াকে আসা ছেলে মেয়েরা এই কান্ড দেখে মনে করে ঐ লোকটাই হয়তো আ্যক্সিডেন্টটা করেছে। এখন ব্যাটা সাধু সাজবার চেষ্টা করছে।


 হাসান ডাক্তার ওদের কে বোঝানোর চেষ্টা করছে আমার বাইকে হয়নি। একটা পিক আপ ভ্যানের এই কাজ। কিছুতেই ওর কথা শুনতে চাইছেনা । শালা ভালো মানুষ সাজছো না। দে দুই ঘা বেটার পাছায়। 


বলছি আমার বাইকে হয়নি । কিছুতেই শুনতে চাইছেনা তার কথা। বেশি কথা বললে ঠ্যাং ভেঙে দিবো ব্যাটা।


 ওমনি মারের ভয়ে বলে কি করতে হবে বলো? 


    ওরা বিধান দেয় ডাক্তার ,ওষুধ পত্র কিনতে যা খরচ হবে সব তোকেই করতে হবে। এক ঝুড়ি ঝিঙের দাম ও জরিমানা হিসেবে দিতে হবে। সব মাথা পেতে নেয়। 


ভালো মানুষি দেখাতে গিয়ে কেমন অযথা ঝঞ্ঝাটে পড়ে গেল। পালিয়ে গেলেই তো হতো। বিবেক তাকে পালিয়ে যেতে দেয়নি।অগত্যা জমি দেখা বাদ দিয়ে জঙ্গিপুর হাসপাতালে ইমার্জেন্সি বিভাগে নিয়ে আসে। কর্মরত ডাক্তারবাবু ছিঁড়ে যাওয়া জায়গা গুলো ব্যান্ডেজ বেঁধে দেয়। একটা ছবি করে নেওয়ার পরামর্শ দেয় কিছু ভাঙাচোরা হয়েছে কি না জানতে।


    হিতমের বউ খবর পেয়ে ছুটে আসে হাসপাতালে ।হাউমাউ করে কাঁদে ।"এখুন হামি এখন পূজার দিনে কি করবো রে" । 


 তুকে অততো করি বুললাম শালা মদ খ্যাঁসন্যা । তাঁও খেল্লি ।এ্যাক্ষুন হামি কি ক্যোরব্যো- রে —--!কেঁদে কেঁদে হাসপাতাল তোলপাড় করে ।


 লোকেরা মনে করে হয়তো কেউ মারা গেছে। সহানুভূতির ঢেউ আছড়ে পড়ছে হাসপাতালের বারান্দায়।


  হাসান ওষুধ এনে খাইয়ে দেয় ।তারপর বলে তোমার তেমন কিছু হয়নি ।একটু লেগেছে সব ঠিক হয়ে যাবে। ওষুধ এনে দিয়েছি । ওগুলো খাও , আর থাকো । আমি বিকেলে আসবো ।তোমার খাবার সব দিয়ে গেলাম ।ডাক্তার এক্সেরে রিপোর্ট দেখে বলে কিছু হয়নি ।বিকেলে বাড়ি চলে যাবে।



দুই)



 হাসান বিকেলে হাসপাতাল এসে জানতে পারে কোন কিছু ভাঙাচোরা হয়নি। ডাক্তার ওকে ছেড়ে দিয়েছে। হাসান হিতম কে বলে তুমি বেডে থাকো আমরা আসছি। টোটো করে তোমাকে তোমার বাড়ি পৌঁছে দিবো । হাসানের সাথে চুমকি পেছনে পেছন যায় । বিকেল গড়াতেই ম্যাকেঞ্জি পার্কে শৈলেশের ফুচকা খেতে দলে দলে ছেলে মেয়েরা আসে।  


শৈলেশ দেখতে হ্যান্ডসাম। নায়ক নায়ক ভাব।সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কে প্রাধান্য দেয়।ওর ব্যাবহার টাও খুব ভালো । যুবতী মেয়েরা লাইন দিয়ে শৈলেশের ফুচকা খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে । হাসি ,ঠাট্টা ইয়ার্কি ও করা হয় আর ফুচকা খাওয়াটা ও হয় ।


 সবাই যখন ফুচকা খাচ্ছে তখন চুমকির জিভ দিয়ে যেন জল ঝরছে ।বারবার ফুচকার স্টলের দিকে তাকায় আর হাঁটে । পেছন ফিরে হাসান দ্যাখে চুমকির চোখ মুখের অবস্থা ।


 এই চুমকি ফুচকা খাবি ? "না ডাক্তোর আমার ছোট বেটি না খেঁয়ে আছে । আজ চাল কিন্যা হয়নি তো ।তু এ্যকসোডিন টো করলি ।হামার ছ্যেইলা দুট্যা না খেঁই আছে সারাদিন। বাড়িতে এঁঠ্যা রাঁধা আছে রাইতের ।ওয়্যাই খেঁই আছে ডাক্তোর। হামাদের খুব অভাব। এদিকে বড়ো বিটিটোর জ্বর । ঝিঁঙা বিচ্যা পয়সা তে তো বিটিটোর জ্বরের ওষুধ লিত্যাম।"


       আরে না না তোর হিতম কে একটা মোটরে আ্যকসিডেন্ট করেছে। আমি ওকে পড়ে আছে দেখে ঝেড়ে ঝুড়ে দিচ্ছিলাম। "তবে ওই ছুঁড়া গিল্যান যি বুললে তুই মেরাছিস। তোকেই সব খরচ দিতে লারবে"। সব মিছে কথা।


 তোর ফুচকা খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে? খা । আমি পয়সা দিবো । না ডাক্তোর না বলে আর ফুচকার স্টলের দিকে চোখ রাখে ।ফুচকার দিকে একবার তাকায়,আর একবার হাসানের দিকে তাকায় । লজ্জা লজ্জা করছে ওর। বারবার বলাতে চুমকি ফুচকা ওয়ালার কাছে যায় । শৈলেশ কে বলে মেয়েটাকে দশ টাকার ফুচকা দাও তো। শালপাতার ঠোঙা করে চুমকির হাতে দেয় । ফুচকার মাঝখানটা ভেঙে আলু ভর্তা পুরে তেঁতুল ঘোলা জলে ডুবিয়ে শৈলেশ ঠোঙা তে দেয়। কেমন করে ফুচকা খেতে হবে চুমকি যে জানেনা ।বাড়ালা স্কুলের মেয়েদের খাওয়া দেখেছে ভেঁড়া চরাতে এসে। ফুচকা ওয়ালার কাছে যেতে সাহস হয়নি । একে তো টাকা নাই। তার উপর নোংরা কাপড়। ছেলে মেয়েরা যদি খারাপ কথা বলে । তেঁতুল ঘোলা জলে ডুবিয়ে যেই চুমকি ঠোঙাতে দিয়েছে, অমনি মুখে দিয়েছে পুরে। মশলা দেওয়া ঝাঁজ মাখানো তেতুল জল উঠে যায় তালুতে ।হাঁচিতে, কাশিতে ম্যাকেঞ্জি পার্কের ঢোকার মুখটাকে গরম করে তোলে।


    ফুচকা খাওয়া শেষ হলে ওকে নিয়ে যায় স্টাইল বাজার। ওর বাড়ির প্রয়োজনীয় চাল, ডাল ,চিনি ,বিস্কুট ,তেল ,নুন একটা ব্যাগে ভরে তুলে দেয় ওর টোটো তে ।



তিন)



ক্লাবের কয়েকজন ছেলে মিলে প্ল্যান করে আজ খেলা ভালোই হবে । বাসস্টপে ঢোকার মুখে সব জড়ো হয়।ঘোষপাড়া থেকে এসেছে সঞ্জয়, সুমিত ।হাজরা পাড়া থেকে এসেছে শুভম আর কালু ,কুন্ডু পাড়া থেকে এসেছে দেবু ,কালটু আর তাদের গোটা কয়েক সাগরেদ। মন্ডপ তলার একধারে বসে পরামর্শ করে । কি কি করতে হবে।সব লোকে ভাবছে কি ব্যাপার?এক সাথে সব মস্তান কয়টি এসে জুটেছে। কোন গন্ডোগোল তো নিশ্চয়ই হবে আজ। মন্ডপ তলার থমথমে অবস্থা ।কি যেন কি আজ হতে চলেছে।


    যেমন আসবে তেমনি শালাকে দেবো ধোলাই । জরিমানা আদায় করতেই হবে। কারোরই কোনো কথা শোনা হবে না।পরামর্শ মত সবাই প্রস্তুত। সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ টোটো এসে হাজির। বসে আছে হিতম হিতমের বৌ আর হাসান ডাক্তার । সাথে তাদের আছে একটা বড়ো ব্যাগ । তাতে এক সপ্তাহ চলার মতো চাল ডাল সবজি সাবান সার্ফ ইত্যাদি ইত্যাদি। 


হাসান ডাক্তার যেমন নেমেছে তেমনি ছুটে এসেছে ওই ছোঁড়াদের দল। ওরা খোশ মেজাজেই ছিল।আজ একটা কিছু আদায় হবেই।ছোঁড়াগুলোর চোখের সামনে দিয়ে হিতম আর হিতমেরবৌ ডাক্তার বাবু কে প্রাণ ভরে আশির্বাদ করতে করতে টোটোতে চেপে চলে গেল মন্ডলপুরের দিকে। 


###






ভাগিদার


আবদুস সালাম


১৪৮৯


 ভাবতে ভালো লাগছে এমনি করে সেদিন প্রাণে বেঁচে ছিল সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়া জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সংসার ও নিজেকে বিধ্বস্ত করে তুলেছে । সুপ্রিয়া শোভন কে ভালবেসে বিয়ে করেছিল । কলেজের অফ পিরিয়ডে নিজেকে কলেজের পেছনে লিচু বাগানের গিয়ে গল্প করা । আধো-আলো ছায়ায় ভবিষ্যতের গহণ নদীতে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখতো দুজনে । এর জন্য কতদিন যে ক্লাস ফাঁকি দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই । অন্য বন্ধুদের প্রক্সি দেওয়ার সুবাদে তাদের প্রেম অবলীলায় চলতে দোসর হয়েছিল। প্রেম যমুনায় তরী যখন উথাল পাথাল তখন কোনো বাধা আর দুজনকে বেঁধে রাখতে পারছে না ।মোহনার উদ্দেশ্যে গঙ্গা-যমুনা একই স্রোতে মিশতে শপথ গ্রহণ করেছে যেন । সমুদ্রের লোনা জল, তবুও মিশে যাওয়ার তীব্র আকুতি। বয়ে শত বাধা পেরিয়ে আবর্তিত ঘূর্ণাবর্তে ও তারা সংকল্পে অটল।


 শোভনের বাবা রাশভারী লোক। প্রথম দিকে খুব শাসন করেছে ছেলেকে । পরক্ষণে আবার সুচতুর বাবা ভবিষ্যৎ কিছু বড় রকমের প্রাপ্তির আশায় মত বদলাতে শুরু করেন। ওদের মেলামেশাতেও তেমন কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন নি ।গ্রামে আছে বিঘে ত্রিশেক জমি, পুকুর বাগান এবং রঘুনাথগঞ্জের মাদারল্যান্ড পল্লীতে প্রাসাদোপম বাড়ি । সুপ্রিয়ারা দুই বোন । দুই বোন সমান সমান ভাগ পেলেও আমার শোভন যে কিছু কম পাবে না তা তিনি ভালো ভাবে বুঝেছিলেন । এই আশাতেই রাশভারী লোকটা ছেলের প্রেমের পথের কাঁটা হননি। ফলস্বরূপ ওদের রেজিস্ট্রি ম্যারেজে না গেলে ও বি্রোধিতা করেন নি । 


    প্রেমের জল যতদিন স্বচ্ছ থাকে ততদিনই সেই প্রেম স্বর্গীয় থাকে। অন্যদিকে জল যখন ঘোলা হতে শুরু করে তখন সেই জল গলধঃকরণ করা দুষ্কর হয়ে ওঠে ।প্রেমের নদীতে তখন আর জোয়ার আসে না । নিস্তেজ নদী প্রবাহহীনতার অসুখে ভোগে। অজস্র শৈবাল দাম আস্টেপিস্টে জড়িয়ে ধরে । জন্মনেয় বহু অবাঞ্ছিত জলজের । নদী তখন আর নদী থাকে না। এমনই সুপ্রিয়ার প্রেমের নদী পঙ্কিলতার আবর্তে নিমজ্জিত হয়ে গেছে ।


     ক্রমশ শোভনের লাগামছাড়া বায়নার হাতিয়ার হতে হতে বিধবা মা গত হয়েছে। চোখের জল ছিল তার নিত্য সঙ্গী ।সংসারের অশান্তিতে সুপ্রিয়া দিনদিন পোড়া কাঠ করে ফেলেছে নিজের চেহারাকে। আজ আর সেদিনের সুপ্রিয়া নেই । শর্মিলা ঠাকুরের মতো চুল বাঁধা। অনেক ছেলেই সুপ্রিয়া কে ভালবাসার বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছিল।




  সেদিনের সুপ্রিয়া আর আজকের সুপ্রিয়ার মধ্যে অনেক তফাৎ ।শোভনের চাল চাল চলন ও আদবের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে । মদের বোতল ছাড়া একটি দিন ও চলেনা। অবাঞ্ছিত মেয়েদের পাড়ায় শুরু হয়েছে যাতায়াত। বাড়িতে এলে সুপ্রিয়ার কপালে জোটে কথায় কথায় খিস্তি, আর তার সঙ্গে যোগ হয় হস্তযোগ্য উপহার যা কোন দিন ভাবতেই পারেনি সে ।


  বাড়িতে ছোট বোন সুভাষিনী জামাই নিয়ে থাকে। ঘরজামাই হয়ে এসেছিল কার্তিক। বেশ সুখেই তারা আছে । অতোবড়ো বাড়িটি একাই ভোগ করছে।


 সুপ্রিয়া বাবার বাড়ি এসেছে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে । বাবা মা না থাকলেও নিজের বোন তো আছে।এই ভরসায় দুদিন প্রাণের জ্বালা জুড়াতে। তার চেহারা দেখে সুভাষীনী অবাক । সে তার দুর্ভাগ্যের কথা বোনকে জানায় । জানায় শোভনের দিন দিন অত্যাচারের কথা। সুভাষিনী বলে" দিদি কেন তুমি ঐ চন্ডালের কাছে আছো? এক্ষুনি তুমি চলে এসো । ওই জানোয়ারটা তোমার কি হাল করেছে দেখেছো ? একদম তুমি ওখানে যেওনা দিদি ।কোনদিন শুনবো তুমি নেই ।


    অর্ধেক বাড়িতো তোমার । একখানা ঘর নিয়ে তুমি থাকবে আর দুখানা ভাড়া দিলে দিব্যি তোমার সংসার চলে যাবে । কিসের আশায় কার জন্য তুমি পড়ে থাকবে দিদি ? সুপ্রিয়া যেন হালে পানি পেল । ছোট বোনের এই জ্ঞানগর্ভ কথা তার মনে ধরেছে ।স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়তে শুরু করেছে ।এখন নিজেকে নিয়ে ভাবার সময় এসেছে সুপ্রিয়ার। সামান্য একটু ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে আজ । হায়রে প্রেম!!!


  দিন পনেরো ছোট বোনের কাছে থেকে গেল সুপ্রিয়া, আর নিজেকে নিজের বাড়িতে স্থিতু করার চিন্তায় বিভোর হয়ে পড়ল ।এমনও চিন্তা করতে লাগল যে বাকি জীবন শোভনের কাছে ডিভোর্স নিয়ে ছোট বোনের কাছেই কাটিয়ে দেবে।


  কার্তিকের চিন্তাভাবনা কিন্তু অন্যরকম ।সে নিজের ছাড়া কিছুই বোঝে না। প্রথম প্রথম কার্তিক ভেবেছিল দিন কয়েক থেকে আবার সে স্বামীর কাছে ফিরে যাবে । প্রথমদিকে তাই আপ্যায়নের ত্রুটি রাখেনি কার্তিক। কিন্তু যখন জানতে পারল ও আমাদের সুখের সংসারে ভাগ বসাতে এসেছে, তখন কার্তিকের মাথাটা বিগড়ে গেলো। পুরনো স্বভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করলো তার ।


     কার্তিক প্রথম যৌবনে ছিল ফাঁসিতলার এক নম্বরের গুন্ডা। এহেন কাজ নেই যা সে করেনি ।কতো লোককে যে নিজ হাতে ফাঁসির দড়ি পরিয়ে গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই । সবুজ দ্বীপের নদীর ধারে পুঁতে দিয়েছে। কথায় কথায় চেম্বার বের করে মাথায় ঠেকিয়ে ওপারে পাঠানোর হুমকি দিয়েছে । সুপ্রিয়ার মামা তথা শশাঙ্কবাবুর পোষা গুন্ডা এই কার্তিক । শশাঙ্ক ভেবেছিলো কার্তিকের সঙ্গে যদি ভাগ্নি সুভাষীনীর বিয়ে দিয়ে দিই তবে সব সময় ওকে ব্যবহার করতে পারবো । বাড়িতে সবসময়ের জন্য তৈরী থাকবে তার হাতিয়ার। রাজনীতি করতে গেলে এই সব কার্তিঁকদের বিশেষ প্রয়োজন হয় । বুথ দখল, পার্টি অফিসে ভাঙচুর চালানো ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে অকারণে এরাই প্রধান হাতিয়ার। কার্তিকের দৌলতেই শশাঙ্ক মামা হতে পেরেছিলেন চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের জামাই বলে কথা। জামাই হওয়ার সুবাদে বহু পয়সা এদিকে সেদিকে লুটে নিয়েছে । তবে এখন এইসব ছেড়ে দিয়েছে । মামা তার সাগরেদের সবাইকে কিছু না কিছু পেটের ভাত খাওয়ার মত কাজ জুটিয়ে দিয়েছে । এখানে সেখানে লাগিয়ে দিয়েছে । অনেকেই নিমকহারাম হয়ে যায়। কিন্তু মামা এ কাজ করে নি ।সব ক্যাডারদের খুশি করতে যতোটুকু পেরেছেন ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন । অনেকের ভোটে জেতার পর কিছু মনে থাকেনা। কিন্তু চালাক মামা আগামী ভোটের সময় যাতে মাটি খুঁজে না বেড়াতে হয় তার ব্যাবস্হা করে রেখেছেন।


     


    কার্তিক ও সুভাষিনী রাতের বেলায় ফিসফিস করে বলে হ্যাঁ গো শুনেছিলাম গোটা বাড়িটাই নাকি আমাদের হবে ?কিন্তু তো এখন দেখছি এটা ভাগাভাগি হবে।চোখ লাল করে সুভাষীনীকে বলে" মন খারাপ হয়েছে বাবা দু-পাঁচ দিন থাকবি খাবি- দাবি আবার যে গোহালের গরু সেই গোহালে গিয়ে উঠবি ।তা- না একেবারে পাকা পাকি ভাবে থাকার পরিকল্পনা।! কেমন মজা ! শালা নিজের বাড়ি হবে বলে কতো যত্ন করে বাড়িটাকে ঝকঝকে করে রেখেছি।


 থাম মজা দেখাচ্ছি। সাহস তো মন্দ নয়।সুভাষীনী তুমি যদি সাপোর্ট করো তোমার অবস্থা কেমন হবে তুমি বুঝতে পারছো তো?


         সুভাষিনীকে বলে , শোনো--- এই শোনো না ---। 


আরে বাবা আমি তো শুনছি । বলোনা --!


 আরে একটু কাছে এসো --- আরও কাছে---- আরও কাছে ---।


কেন এই তো একেবারেই কাছে আছি বলোনা ----। শুনছি তো ।আমি কি তোমার মতো ঠসা নাকি?


  আরে না না বলছি-- আমার দারুন একটা আইডিয়া এসেছে মাথায় ।এই বলে জোর করে সুভাষীনী কে জড়িয়ে ধরে এক্কেবারে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ওকে যদি সরিয়ে দিতে পারি তবে গোটা বাড়িটায় আমাদের হবে। শুনেই প্রথমে আঁৎকে উঠেছিল সে। হাজার নিজের মায়ের পেটের বোন তো বটে । তারপর বলল তা কেমন করে সরাবে শুনি?


বাড়ি আর সম্পত্তি পাওয়ার নেশায় বোধবুদ্ধি লোপ পেতে বসেছে কার্তিকের।


 তোমার দিদির তো জ্বর হয়েছে। ডাক্তারের কাছে গেছে ওষুধ আনতে। আনুক না ওষুধ। ওই ওষুধ ই হবে আমাদের তুরূপের তাস।ওই ওষুধের শিশিতেই সব সমস্যার সমাধান লিখা আছে প্রিয়তমা সুভাষীনী । নিশ্চয়ই কাসি যখন হয়েছে তখন শিরাপ তো অবশ্যই দিবে । ওই শিরাপের শিশিতেই দিবো বিষ মিশিয়ে! তারপরে চিন্তা করতে হবেনা।


 সমস্ত সম্পত্তি পাওয়ার আনন্দে কার্তিক সুভাষীনীকে জড়িয়ে ধরে চুমু চুমুতে ভরিয়ে দিল ।সব লাজলজ্জা কে বিসর্জন দিয়েছে কার্তিক ।


হঠাৎ তোমার ভালোবাসা উৎলে উঠেছে কেন আজ? অনেক দিন তো বিয়ে হয়েছে ।এমন করে তো একদিন ও জড়িয়ে ধরে চুমু খাওনি । কার্তিকের মন গেয়ে উঠছে "আজ কি আনন্দ আকাশে বাতাসে "-------


পরামর্শ মতো কার্তিক সুপ্রিয়ার শিরাপের শিশিতে দিল তীব্র বিশ মিশিয়ে । নিয়তির কি নিঠুর খেলা । যে এলো বাবার বাড়ি একটু বাঁচার আশায় তাকেই কি না মেরে ফেলার চক্রান্ত।হায় রে নিয়তি।


 নিয়তি ও দরজার আড়ালে মুখ টিপে টিপে হাসছে।


  ওষুধ খাচ্ছি বলে রাতের বেলা টেবিলের উপর ওষুধ রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে সুপ্রিয়া। সারাদিনের পরিশ্রান্ত শরীর । পেটে খাবার পড়াতেই চোখে নেমে এসেছে রাজ্যের ঘুম । কতোদিন যে ভালো ভাবে ঘুমাতে পারে নি ওই মাতালটার অত্যাচারে ।দরজা খোলা পেয়ে ঘরে ঢুকেছিল বিড়াল ।এক লাফে টেবিলে উঠতেই শিরাপের শিশিটা গেল মেঝেতে পড়ে । শিশি ভেঙে শিরাপ ঘরময় পড়লো ছড়িয়ে । মিষ্টি জিনিসের গন্ধ পেয়ে বিড়ালে মজা করে খেয়েছে । পিঁপড়া আরশোলারাও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বিষের দাপটে ।তারপর মিয়াঁও মিয়াঁও করে ঘরময় দাপাদাপি করতে শুরু করে ।সেই সঙ্গে মুখে গ্যাঁজলা উঠে সাঙ্গ হলো বিড়ালের ইহলীলা। 




      সুপ্রিয়া ঘুম থেকে উঠে দেখে পড়ে থাকা শিরাপের পাশে মুখে গ্যাঁজলা বেরিয়ে পড়ে আছে বিড়ালটা । ঘরের চেহারা দেখে হতবাক হয়ে গেছে সুপ্রিয়া । আঁচ করতে পেরেছে এদের অভিসন্ধি। এখানে থাকা তার মোটেই সমীচীন হবে না ।মনের যন্ত্রণাকে দমিয়ে রেখে বিছানা থেকে উঠে একেবারে থানা।


 সাতসকালে মেয়ে মানুষকে থানায় দেখে কর্তব্যরত সাহেব জিজ্ঞেস করলেন এতো ভোরে ভোরে এখানে কেন ?কোনো অঘটন ঘটেছে নাকি ? সুপ্রিয়া তখন হাউমাউ করে কেঁদে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে ফেললো সব ঘটনা।


    অন্য মানুষের কথায় হয়তো সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করতে পাঠাতেন না । কেননা এমন ঘটনা তো হামেশাই ঘটছে ।এ আবার নতুন কি?


তবে মেয়ে ছেলে বলে কথা। ডাগর মেয়ে দেখলেই তো কর্তব্য বোধ উৎলে ওঠে অনেকের ।ও সি সাহেবের দরদ ও একই ফর্মুলায় উৎলে উঠলো। পাশে ছোটবাবু ঢুলছিলেন । ঝাঁঝাঁলো গলায় ডাক দিতেই ছোট বাবু ধড়ফড় করে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠলেন।


কি আপদ মাইরী।একটু ঘুমোতে ও দিবেন না।এই তো দুঘন্টা আগে হোটেল রেড করে বাড়ি ফিরলাম ।


কি হলো বলুন? 


ছোট বাবু একটু যান তো মেয়েটার সাথে। 


গাড়ি নিতে হবে নাকি ? 


না না এই তো কাছেই।


থানার পাঁচ ছ 'টি বাড়ির পরে। 


অগত্যা বড়ো বাবুর হুকুম মেনে সুপ্রিয়ার পেছনে পেছনে হাজির হলেন কার্তিকের বাড়ি।


   ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলেন সুপ্রিয়ার বিবরণ মতো ঘটনা ।


    কার্তিকের ঘরের দরজা ঠক ঠক করে ওঠানো হলো বাবুদের।সব পাওয়ার নেশায় একটু রঙিন ও হয়েছিল দুজনে। মিষ্টি মিষ্টি রামের গন্ধ তখন ও ঘরময় ম ম করছে। পুলিশের শব্দ শুনে অগোছালো শাড়ী নিয়ে সুভাষীনী খুললো দরজা।


ছোট বাবু ওদের কিছু বোঝার আগেই দুজনের হাতে হাত কড়া পড়িয়ে টানতে টানতে নিয়ে চললো থানায়...

একটি মর্মান্তিক খুশির সংবাদ - সাইয়িদ রফিকুল হক || Ekti Mormantik Khushir Sangbad - Sayed Rofikul Haque || গল্প || ছোট গল্প || Story || Short Story || Prose || বড় গল্প

একটি মর্মান্তিক খুশির সংবাদ

         সাইয়িদ রফিকুল হক




লোহাগাড়া-বাজারে ঢুকতেই বড় পান-দোকানটিই গোবিন্দ সাহার। এটা বড় রাস্তাটার একপাশে। তাই, দোকানটা সবাই চেনে।

এখান দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করে থাকে। পানও কেনে লোকজন তার কাছ থেকে। তার ভালো ব্যবহারের জন্য প্রায় সবাই তাকে আপন ভাবে।

কাদের মেম্বার রোজ এখানে একবার-দুইবার আসবেই। নইলে, ওর পেটের ভাত হজম হবে না। সে পান কিনতে আসে না। হিন্দুর হাতের পান সে খায় না! আর হিন্দু-লোকজনকে দেখতে তার ভালোও লাগে না। তবু সে এখানে আসে! 

আর সে এখানে আসে বড়সড় একটা স্বার্থ নিয়ে। রোজ সে জিজ্ঞাসা করতে আসে গোবিন্দ সাহাকে—কবে তারা ভারতে চলে যাবেন?

গোবিন্দ সাহা এই একই প্রশ্নের একই উত্তর দিচ্ছেন আজ ত্রিশ বছর যাবৎ। তবু সন্তুষ্ট নয় কাদের মেম্বাররা।

মাঝেমাঝে সে এখানে বসে গোবিন্দ সাহার সঙ্গে নানান রকম গল্পজুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আর বলে, “হিন্দুদের আসল দেশ ভারত। এখানে থাকা মানে পরাধীন হয়ে থাকা। তারচে হিন্দুদের ভারতে চলে যাওয়াই ভালো!”

গোবিন্দ সাহা তার সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে যান না। তবে মাঝেমাঝে তার আপত্তিকর কথার দুই-চারটা উত্তর দেন। আজও মেম্বার তাকে বলেছিল, “দাদা, কবে ভারতে যাইতেছেন?”

গোবিন্দ সাহা তাকে বলেছিলেন, “কোনোদিনও যাবো না। এখানে জন্মেছি। আর এখানেই মরবো। ভারতে যাবো কোন্ দুঃখে?”

তবু তার পিছ ছাড়ে না কাদের মেম্বার। সে জোঁকের মতো লেগে থাকে গোবিন্দ সাহার পিছনে। তার এই বাড়িটা মেম্বারের খুব পছন্দের।

বাড়ির সামনে আছে কেয়ারি ফুলের বাগান। নিকানো একটা উঠোন আছে বাড়ির মাঝখানে। তিনটি ভিটায় তিনটি ঘর। আর পাশের একটি ভিটায় আছে মন্দিরের মতো বড়সড় ঠাকুরঘর। বড় সুন্দর লাগে এই বাড়িটা দেখতে! এর পিছনের দিকে আছে বিশাল একটা পুকুর! তার আবার শানবাঁধানো ঘাটও আছে! 

ওই পুকুরের শীতল জলে নামতে ইচ্ছে করে কাদেরের। তার বাপেরও বড় ইচ্ছে ছিল এই বাড়িটা কোনোভাবে হাতিয়ে নেওয়ার। দেশের ভিতরে কতবার কতরকম ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বাড়িটা হাতিয়ে নিতে পারেনি কাদেরের বাপ। তখন কাদেরের বাপের টাকাপয়সা ছিল না। তাই, সে বাড়িটা ভয়দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতো। এখন তার ছেলে কাদেরের টাকাপয়সা হয়েছে। কাদের এখন রিলিফের গম চুরি থেকে শুরু করে এমন কোনো অপকর্ম নেই―যা সে করেনি। তার টাকাপয়সা হবে না কেন? আর সেই টাকার জোরে তার এখন ক্ষমতা ও দাপট বেড়েছে।


কাদেরের বাপ একসময় দিনমজুরি করতো। সাহাদের জমিতেও কতদিন কামলা খেটেছে। তখনই সে সাহাবাড়িটা দেখে একেবারে পাগল হয়েছিল! সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে বাড়িটা হাতিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু কোনোভাবেই তা সে করতে পারেনি। 

তার তিন ছেলে আর চার মেয়ে। অতটুকু বাড়িতে জায়গা হতো না। এখন অবশ্য তার দুই ছেলে এখান থেকে সরে গেছে। আর মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। মেয়েরা বাড়ির কিংবা জমির ভাগও পায়নি। জমি থাকলে না ভাগ পাবে।

কিন্তু কাদেরের অবস্থা এখন ফিরেছে। তবু সে এই সাহাবাড়িটার উপর থেকে লোভ ছাড়তে পারেনি। মাসখানেক হলো তার বাপ মরেছে―বলতে গেলে অনাহারে। তিন ভাইয়ের একটাও বাপকে ভাত দিতো না। আর তাদের মা মরেছিল বাপের আগেই। একেবারে ভিক্ষা করে খেতো অসহায় মহিলাটা। 

সেই কাদের কেমনে-কেমনে দু্বার মেম্বারও হয়েছে! এখনও চলছে তার মেম্বারগিরি। কিছু লোক বলে―সামনেও নাকি সে হয়ে যাবে! 

সে এখন ছলে-বলে-কলে-কৌশলে গোবিন্দ সাহার বড়বাড়িটা কিনতে চায়! আসলে, যেন-তেন-প্রকারে দখল করতে চায়।

গোবিন্দ সাহা বেশি কথা বলেন না। তিনি বড় পান-দোকানটা সামলাতেই সময় পান না। তার ছোট ছেলেটা তার কাজে সাহায্য করে থাকে। আর-এক ছেলে ঢাকায় বড় চাকরি করে। তাও আবার সরকারি। মেজো ছেলেটা কাস্টম-অফিসার হয়েছে। টাকাপয়সার অভাব নেই গোবিন্দ সাহার। বড় দুই মেয়েকে আগেই বিয়ে দিয়েছেন অবস্থাসম্পন্ন ঘরে। 

বড় ছেলেকেও বিয়ে করিয়েছেন ধনীপরিবারে। মেজোটির জন্যও ভালো একটা বংশীয় মেয়ে খুঁজছেন। তার ছোটো ছেলেটা কলেজে পড়ছে। পাশাপাশি তাকে দোকান সামলাতেও সাহায্য করে থাকে। এছাড়াও তার একজন কর্মচারীও আছে। তবে সে মাঝেমাঝে আসে না।

তার বাড়িঘরের চেহারা আগের চেয়ে আরও সুন্দর হয়েছে। তাই, কাদের পাগলের মতো এখানে প্রতিদিন কয়েকবার ছুটে-ছুটে আসে। কিন্তু গোবিন্দ সাহা তার সঙ্গে দুর্বব্যহার করেন না। চুপচাপ সব সয়ে যান। তাদের সয়ে যেতে হয়। সংখ্যালঘু মানুষের অনেক জ্বালা। সবটা সবাই বোঝে না। দূর থেকে তা বোঝাও যায় না। কাছে এলে তবু কিছুটা আঁচ করা যায়।

আজ গোবিন্দ সাহার উপর ভয়ানক ক্ষেপে গেল কাদের মেম্বার। সে রেগেমেগে বলে উঠলো, “শালা, মালাউন, ভারতে যাইতে মনে চায় না কেন? এখানে থাইকে কী করবেন? বাঁচতে চাইলে ভারতে চইলে যান!”

গোবিন্দ সাহা বললেন, “তুমি কী করবে এইখানে থাইকে?”

কাদের বলে, “এইটা মুসলমানের দেশ। তাই, আমরা থাকপো এইখানে।”

গোবিন্দ সাহা আজ খুব প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন। কত আর সহ্য করা যায়! তিনি শান্তভাবেও কঠিন কয়েকটা কথা বলে ফেললেন, “এটা মুসলমানের দেশ না। মুসলমানের দেশ তো পাকিস্তান। তুমি সব বেচেটেচে পাকিস্তানে চলে যাচ্ছো না কেন? এটা হিন্দু-মুসলমান সবার দেশ।”

কাদের এই এককথায় একেবারে ঠান্ডা হয়ে যায়। একজন মুসলমান-দোকানদার এসে তাকে ধমকায় কিছুক্ষণ। বলে, “এই কামলার ব্যাটা মেম্বার হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। সামনে এরে আর ভোট দেওয়া যাবি নানে।”

কাদের এতে দমে যায়। শেষে তার আম-ছালা দুটোই না চলে যায়! ধমক খেয়ে সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। 

ওর উৎপাত দেখে বাজারের আরও কয়েকজন মুসলমান-দোকানদার এসে ও-কে আচ্ছামতো ধমকালো, ‘এই ব্যাটা রোজ-রোজ কী ফাজলামি শুরু করছিস? এই লোকটা ভারতে যাবে কেন? কওয়া লাগে তার চৌদ্দপুরুষ এইখানে থাকে। তোর জন্য সব ছেড়ে দিয়ে তিনি ভারতে চলে যাবেন?’

কাদের আর দাঁড়ায় না। আহত নেকড়ের মতো ভিতরে-ভিতরে জ্বলে উঠে লেজগুটিয়ে পালিয়ে যায়। পালানো যে তার স্বভাব।

গোবিন্দ সাহা এতে খুশি মনে সবাইকে ডবল-ডবল পান বানিয়ে খাওয়ালেন। লোকগুলো কাদেরের বিরুদ্ধে মারমুখো হওয়ায় তিনি খুশি হয়েছেন খুব।


সবাই ভাবলো, সে চলে গেছে। আর হয়তো এই ব্যাপারটা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করবে না। কিন্তু গোবিন্দ সাহা জানেন―সে একটা আস্ত পিশাচ। সে কোনোভাবেই এ-পথ ছাড়বে না। তাকে বারবার জ্বালিয়ে খাবে।

দুপুর হওয়ায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরলেন গোবিন্দ সাহা। তিনি মনখারাপ করেননি। তবু তার আনন্দ যে, আজ মুসলমান-দোকানদাররাও তার পক্ষে জোরালোভাবে কথা বলেছেন। আগেও অবশ্য তারা এব্যাপারে কাদেরকে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু কাদের তা শোনেনি। সেইজন্য সে আস্তে-আস্তে এসে গোবিন্দ সাহার দোকানে বসে তাকে বোঝাতো―ভারতে গেলে তার বিরাট লাভ।

গোবিন্দ সাহা ওর চেয়ে ভালো বোঝেন। তবু সে এ-ব্যাপারটা নিজে বোঝে না।

গোবিন্দ সাহার ছোট ছেলেটা আরও নিরীহ। সে সবসময় চুপচাপ থাকে। এসব ব্যাপারে সে কারও সঙ্গে কোনো কথা বলতে যায় না। যা করার তার বাবাই করবে। এমন একটা ভরসা আছে তার।

দুপুরের পর বাজারের প্রায় সব দোকানপাটই বন্ধ হয়ে যায়। ভিতরের দিকে কেউ-কেউ দোকান খুলে বসে থাকে। তবে এই সময় বেচাকেনা খুব কম হয়। অনেকে তাও থাকে। ওদের বাড়িঘর দূরে হওয়ায় ওরা একবারে বাড়ি ফিরবে বলে। 

গোবিন্দ সাহার বাড়ি বেশি দূরে নয়। তাই, তিনি বাড়ি গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে খানিকটা বিশ্রাম করে তবেই দোকান খোলেন।

তিনি দুপুরে ভাত খেয়ে বিশ্রাম করতে যাবেন। এমন সময় তার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো দুটি যুবক। তারা বললো, ‘দোকানটা সরকারি রাস্তায় পড়েছে―তাই, এটা ভেঙে দিতে হবে, কাকা।’

গোবিন্দ সাহা ওদের কথা শুনে হাসলেন। তারপর বললেন, “তোমাদের টাকাপয়সা দিয়ে কে পাঠিয়েছে? কাদের মেম্বার তা-ই না?”

যুবক দুটি এবার থতমত খেয়ে বলে, “না, মানে, না।” 

তারা আর-কিছু বলতে পারে না। মোটর-সাইকেলে স্টার্ট দিয়ে তাড়াতাড়ি সটকে পড়ে।

বিকালে তিনি দোকান খুলে বাজারের প্রায় সব দোকানদারকে এই ঘটনাটা জানিয়ে রাখলেন।

তার পাশের রঙের দোকানদার বললো, “ব্যাটার মেম্বারগিরি এইবারই শেষ। সামনে ভোট আর পাওয়া লাগবে না। ভোট চাইতে আসলে জুতাপেটা করে দেবো।”

গোবিন্দ সাহা কিছু বলেন না। তিনি সব শুনে মনে মনে হাসেন। কাদের মেম্বারদের তিনি খুব ভালোভাবে চেনেন। এরা হলো শকুনের বাচ্চা। একবার যেদিকে চোখ দেয় তা আর ভুলতে পারে না। ছাড়তেও পারে না। শকুনের চোখ বড় ভয়ানক।


দুপুরবেলা পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ফিরে এলো গোবিন্দ সাহার বড় পুত্রবধূ।

সে দেখতে পেয়েছে, পুকুরের ওপাড়ে বড়-হিজলগাছটার তলায় একটা লোক বসে রয়েছে। তার ভাবসাব আর চাউনি মোটেই ভালো নয়। সে ভয় পেয়েছে। 

মেয়েটা দৌড়ে এসে শ্বশুর-শাশুড়িকে সব বলেছে। 

গোবিন্দ সাহা সেখানে গিয়ে দেখলেন, কাদের মেম্বার গাছতলায় বসে রয়েছে! বিড়ি ফুঁকছে মনের আনন্দে।

তিনি অবাক হয়ে বললেন, “মেম্বার, তুমি এইখানে কেন? বাড়ি ফিরে যাও। আমার বউমা স্নান করবে এখানে।”

সে গায়ে মাখে না গোবিন্দ সাহার কথা। চুপচাপ বসে থাকে আগের মতো। একটু পরে তার এক সাগরেদ এসে বসলো সেখানে। দুটিতে মিলেমিশে গানজুড়ে দিলো।

সে হেসে বলে, “এইখানে বাতাস ভালো। তাই, বইছি, দাদা।”

গোবিন্দ সাহা সব বুঝতে পারলেন। তিনি বাড়ির ভিতরে ঢুকে বললেন, “স্নানঘরে স্নান করো, বউমা। আমি পরে দেখবো ব্যাপারটা।”

এরপর প্রায় প্রতিদিন মেম্বার পুকুরপাড়ে বসে থাকে। সে এখানে আরও লোকজন নিয়ে আড্ডা জমায়। সাহাবাড়ির বউঝিরা পুকুরে নেমে স্নান করতে পারে না। 

সবাই বুঝতে পারে, সে নতুন কোনো ফন্দি করেছে। আর এভাবে জ্বালাতন করতে থাকলে একদিন সাহারা ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু সে জানে না যে, গোবিন্দ সাহা কখনো এদেশ ছেড়ে যাবেন না। এটা তার প্রতিজ্ঞা। আর এটা তার জন্মভূমি।

হঠাৎ এক মাঝরাতে গোবিন্দ সাহার ঘরের চালে সমানতালে, একের-পর-এক ঢিল পড়তে লাগলো। আর তা প্রায় একটানা দশ-বারো মিনিট পর্যন্ত চললো। 

সাহাবাড়ির সবার ঘুম ভেঙে গেছে ঢিলের শব্দে। 

গোবিন্দ সাহা সবাইকে নিয়ে ঠাকুরঘরে ঢুকলেন। ঠাকুরের সামনে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে আর্তনাদ করলেন অনেক সময় ধরে। পরিবারের প্রায় সবাই ভেসে গেল চোখের জলে।

এরপর প্রায়ই মাঝরাতে ঢিল পড়তে লাগলো সাহাবাড়ির টিনের চালে। আর তা চলতে থাকে দীর্ঘসময় পর্যন্ত। আশেপাশের বাড়িঘর থেকে লোকজন আওয়াজ দিলে উৎপাতকারীরা পালিয়ে যায়। কাউকে চোখে দেখতে পাননি তিনি। কার নামে কার কাছে তিনি বিচার দিবেন? নিশ্চিন্তে মাঝরাতে কাদের মেম্বার তার লোক দিয়ে উৎপাত করাচ্ছে। তবু তারা এরই মধ্যে খাবার খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন, আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন।


গোবিন্দ সাহা নানাকারণে মনমরা হয়ে সেদিন সন্ধ্যায় পান-দোকানে বসে ছিলেন। তার মনটা ভালো নেই। বাড়ির বউঝিরা পুকুরে নামতে পারে না। রাতে এখনও মাঝেমাঝে ঘরের চালে ঢিল পড়তে শুরু করে। আর তা চলে প্রায় মিনিট দশেক থেকে আধঘণ্টাখানেক।

তিনি গুম হয়ে বসে ছিলেন। এমন সময় তার তিন-চারটা পরের দোকানদার দিদার বক্স দৌড়ে এসে তার দোকানের একপাশে বসে পড়লো। তারপর হাঁপাতে-হাঁপাতে বললো, “খবর শুনেছেন কিছু, দাদা?”

গোবিন্দ সাহা মনখারাপ করে বললেন, “না, দাদা। কিছু শুনিনি। কীসের খবর? কী খবর?”

সে এবার সোল্লাসে যেন বলে উঠলো, “আমাগরে কাদের মেম্বার মারা গেছে! খানিকক্ষণ আগে হাট থেকে ইজিবাইকে করে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ তিনমাথার মোড়ে ওর ইজিবাইকটা উল্টে একেবারে বাঁধের তলায় গিয়ে পড়েছে। সঙ্গে-সঙ্গে মারা গেছে সে। ঘাড়টা নাকি ভেঙে গেছে!”

খবরটা শুনে কিছুক্ষণের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান গোবিন্দ সাহা। এটা তার বিশ্বাস হতে চায় না। কিন্তু দিদার বক্স যখন পুনরায় তাকে বলেছে, সে এটা নির্ভরযোগ্য কয়েকজনের নিকট থেকে এইমাত্র শুনেছে। তখন আর এতে অবিশ্বাসের কিছু বাকি থাকে না। 

খবরটা শুনে তার দেহমন কেমন করে যেন কেঁপে উঠলো কয়েকবার! তারপর তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠলেন। কারও মৃত্যুকামনা তিনি করেননি কখনো। তিনি শুধু এই জুলুমের একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে এ কী হয়ে গেল! তিনি হতভম্বের মতো বসে রইলেন আরও কিছুক্ষণ। তবু একসময় তার কাছে হঠাৎ এই খবরটাকে মনে হলো―একটা মর্মান্তিক খুশির সংবাদ!

তিনি এবার আপনমনে ভাবতে লাগলেন―ত্রিশ বছরের এই উৎপাত আর এই জ্বালাতন আর কখনো ফিরে আসবে না তার জীবনে! কেউ কখনো তাকে ভিটেমাটি থেকে আর উচ্ছেদ করতে চাইবে না! এবার কেউ ছলে-বলে-কৌশলে তার সবকিছু গ্রাস করতে চাইবে না! আর তাকে প্রতিদিন ভারতে চলে যাওয়ার কথা বলতে আসবে না কেউ!

 

তিনি যেন সংবিৎ ফিরে পেলেন। তারপর তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে বাড়ির দিকে যেতে লাগলেন। এখনই তাকে একবার ঠাকুরঘরে ঢুকতে হবে।

তিনি বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই ভক্তিভরে কয়েকবার হাত ঠেকালেন কপালে। তারপর মনের খুশিতে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, “ঠাকুর! ঠাকুর! ঠাকুর!”




অবলাদের কথা - লিসা মাঝি || Obolader Kotha - Lisha majhi || গল্প || ছোট গল্প || Story || Short Story || Prose || বড় গল্প

             অবলাদের কথা

                        লিসা মাঝি 



দিনটা ছিল লক্ষ্মীবার অর্থাৎ বৃহস্পতিবার। তখন সবে একটা-দুটো করে তারারা আকাশের বুকে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে, নানানরঙের আবির তখনও চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, বসন্তের ঝিরিঝিরি হাওয়ার সাথে মাথা দোলাচ্ছে শিমুল, পলাশ, কামিনী, ও চম্পা। পাখিরাও সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে খাবার সংগ্রহ করে বাসায় ফিরছে। আস্তে আস্তে চাঁদ পৃথিবীর বুকে তার সমস্ত সৌন্দর্য ঢেলে দিচ্ছে, মেয়ে-বউরা তুলসি তলায় প্রদীপ দিয়ে শঙ্খধ্বনি করছে।  


এমন সময় মিত্র পরিবারের বড় কর্তা শিব কিঙ্কর মিত্র, বংশের কুলদেবী লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করছেন।


-মা মাগো তুই তো আমায় সব দিয়েছিস, তোর দয়ায় আজ বাড়ি-গাড়ি, ধন-সম্পত্তি কোনো কিছুর অভাব নেই, শুধু আমার নাতির অভাব ছিল, কিন্তু আজ দশ বছর পর অবশেষে তুই মুখ তুলে চেয়েছিস, আমার একমাত্র ছেলে কালী কিঙ্করের সন্তান আজ ভূমিষ্ঠ হতে চলেছে, মা আশীর্বাদ কর আমার যেন নাতিই হয়। 


জানিনা ঠিক, মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ নাকি অতিরিক্ত আশীর্বাদে মিত্র পরিবারে ভূমিষ্ঠ হলো এক কন্যা সন্তান, মূহুর্তের মধ্যে মিত্র বাড়ির সব আলো নিভিয়ে দেওয়ার আদেশ দিলেন সেই বাড়ির বড়ো কর্তা শিব কিঙ্কর মিত্র। না স্বয়ং বিধাতা পুরুষের ভাগ্যলিখনের জন্য ছয়দিন আর অপেক্ষা করতে হয়নি বোধকরি সেইক্ষণেই নবজাতিকার ভাগ্যলিখনের কাজ নিজ হস্তে তুলে নিয়েছিলেন মিত্র বাড়ির বড়ো কর্তা। অতঃপর সেই সদ্য প্রস্ফুটিত নবজাতিকার স্থান হয়েছিল বাড়ির এক কোণে।

 চারবছর পর বড় কর্তা নিজে সারা বাড়ি আলো দিয়ে সাজিয়ে তুললেন, এইবার মিত্র বংশে জন্ম নিল পুত্র সন্তান। আমরা যেমনভাবে গোলাপ-জুঁই খুব যত্ন করে বাগানে এনে বসাই, পরিচর্যা করি, ঠিক তেমনভাবেই বড় হতে শুরু করলো শিব কিঙ্করের একমাত্র নাতি কমল কিঙ্কর। আর অনাদর অবহেলা সত্ত্বেও বাগানে যেমনভাবে নাম না জানা গাছ বেড়ে ওঠে, ঠিক তেমনভাবেই ধীরে ধীরে কমলিনী বড় হতে শুরু করলো। কমলিনী মানে পদ্ম, অবশ্যই পঙ্কিলে পদ্ম। তবে কমলিনীর মা সাধ করে নাকি বুড়ো কর্তার উপর বিদ্রুপ করে মেয়ের নাম কমলিনী রেখেছিলেন তা কিন্তু জানা যায় না। দাদু-ঠাকুমা, মা-বাবা আর ভাই এই হল কমলিনীর পরিবার। তবে ওই বাড়িতে কমলিনীর মা ছাড়া কমলিনীকে আর কেউ ভালোবাসে না, আর তাই তার যত আবদার সব শুধু তার মায়ের কাছেই।


ছোট্টো কমলিনী গুটি গুটি পায়ে মায়ের কাছে এসে দাঁড়ালো।


-মা সবাই তো স্কুলে যাচ্ছে, আমি কি স্কুলে ভর্তি হবো না? আমি তো সব পারি অ আ, নামতা।

-হ্যাঁ কমু, তুই স্কুলে যাবি আমি তোকে ভর্তি করার ব্যবস্থা করে দেবো, আমি আজই তোর বাবার সাথে কথা বলবো। 


পান চিবোতে চিবোতে বড় গিন্নির প্রবেশ


-বলি মা-মেয়ে মিলে কি এতো কতা হচ্ছে শুনি?

-মা আসলে কুমুকে স্কুলে ভর্তি করার কথাই বলছিলাম।

-অ, তা ভালো। তবে মেয়েমানুষ নেকাপড়া শিকলেও

 তো আর ব্যাটাছেলে হবে নিকো।

-মা এখন সবারই একটু লেখাপড়া শেখা উচিত।

-অ..তাহলে যা ভালো বোঝো তাই করো। 


(দশদিন পর) 

আজকের দিনটা কমলিনীর কাছে খুব আনন্দের, কারণ আজ কমলিনী প্রথম স্কুলে যাবে। অন্য সব বাচ্চারা যেখানে স্কুল যেতে হবে বলে কাঁদে, সেখানে কমলিনী কখন স্কুলে যাবে, আর স্কুলে গিয়ে কি কি করবে, তা ভাবতে ভাবতেই রাত্রকালীন নিদ্রাসম্পন্ন করে আজ ভোর ভোর উঠে পড়েছে। 


-কমু শোন স্কুলে কিন্তু একদম লক্ষ্মী হয়ে থাকবি, সব পড়াশুনবি মন দিয়ে, স্যার-ম্যাম যা যা বলবেন তাই করবি, দুষ্টুমি করবি না। 

-আচ্ছা মা আমি মন দিয়ে সব পড়া করবো, একটুও দুষ্টুমি করবো না দেখো। 


কমলিনীর মা কমলিনীকে কোলে বসিয়ে চুমু খেয়ে বললেন--


-এইজন্যই তো বলি কমু আমার লক্ষ্মী মেয়ে। চল তোকে স্কুলে দিয়ে আসি। 

-হ্যাঁ চলো মা। 


বাদামী রঙের গেট, সেই গেট পেরিয়ে বড় বিল্ডিং, আর তার উপরেই শোভা পাচ্ছে শিশু শিক্ষা নিকেতন নামটি। সাদা-নীল ফ্রক পরা রঙিন প্রজাপতির মতো একঝাঁক ছোট্ট ছোট্ট মেয়ে গেট পেরিয়ে হুড়মুড়িয়ে স্কুলে ঢুকছে, কেউ কেউ কাঁদতে কাঁদতে আর কেউ কেউ হাসতে হাসতে। তবে কমলিনী ভীষণ খুশি, একসাথে এত মানুষ এর আগে সে কোনোদিন দেখেনি। পাখি যেমন দীর্ঘদিন ধরে খাঁচায় আটকে থাকার পর একসময় খাঁচা থেকে উড়ে গিয়ে প্রথম যেমনভাবে আকাশ দেখে, ঠিক তেমনভাবেই এত মানুষকে দেখে, স্কুল দেখে কমলিনী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, আজ সে আনন্দে আত্মহারা।


-এই সবাই লাইন করে দাঁড়াও, হাত জোড় করো, এখুনি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত শুরু হবে। 


ম্যামের ডাকে স্তম্ভিত ফিরে পায় কমলিনী। অন্যান্য বাচ্চাদের মতো সেও হাত জোড় করে গাইতে শুরু করলো। 


- জনগণমন অধিনায়ক জয় হে, ভারত ভাগ্যবিধাতা। 


এইভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশ কয়েকটি বছর। তবে কমলিনীর জগৎ বলতে শুধু স্কুল আর বাড়ি। তবে মায়ের অনুরোধে কমলিনীকে গানের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে, তার জন্য অবশ্য কমলিনীর ঠাকুমা বাড়ির সব কাজের লোক ছাড়িয়ে কমলিনী আর তার মাকে দিয়ে সব কাজ করায়। এত কিছুর মাঝেও কমলিনী মন দিয়ে পড়াশোনা করে। কমলিনী যেমন পড়াশোনায় মেধাবী, তেমন গানের গলাও ভারি সুন্দর। প্রত্যেকবার সে স্কুলে যেমন প্রথম স্থান অধিকার করে, তেমন গানেও ডিস্টিংশন বাঁধা। এইবার সে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা মাধ্যমিক দিলো, আজ তার ফলপ্রকাশ, তাই সকাল থেকেই কমলিনী আর তার মায়ের প্রত্যেকটা মূহুর্ত উৎকন্ঠার মধ্যে কাটছে। 


-মা কি হবে বলো তো? আমার না ভীষণ টেনশন হচ্ছে। আমি সত্যি ভালো রেজাল্ট করবো তো? আমার ভীষণ ভয় করছে মা। 

-ভয় পাচ্ছিস কেন মা। আমি বলছি তো তোর ভীষণ ভালো রেজাল্ট হবে। যা, বাবা, দাদু আর ঠাকুমাকে প্রণাম করে, স্কুলে যা। 

-হ্যাঁ মা এই তো এখুনি যাচ্ছি। 

-থাক থাক আর পেন্নাম করতে হবে না বাছা। বলি মেয়ের ফলপেকাশ হবে বলে কি সারা বাড়ি না খেয়ে থাকবে? যত সব আদিখ্যেতা।

-আমি তাহলে আসছি ঠাকুমা, মা আসছি। 

-হ্যাঁ মা আয় দুগ্গা দুগ্গা। 

-আমি এই স্কুলের হেডস্যার এবং আমার বলতে ভীষণ ভালো লাগছে আমাদের স্কুলের গর্ব একজন মেয়ে। কমলিনী মিত্র শুধু যে আমাদের স্কুলের গর্ব তাই নয় ও জেলারও গর্ব। এই বছর মাধ্যমিকে বর্ধমান জেলার মধ্যে ৬৭৫ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে কমলিনী মিত্র। 


পুরো স্কুল জুড়ে কমলিনীর উদ্দেশ্যে করতালি হচ্ছে, স্যার-ম্যাম থেকে শুরু করে ছাত্র-ছাত্রী সবার মুখে শুধু আজ একটাই নাম কমলিনী মিত্র। 

কমলিনী রেজাল্ট নিয়ে ছুটতে ছুটতে বাড়ি এসে, মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। 


-কি হয়েছে মা কাঁদছিস কেন? কেমন রেজাল্ট হলো? 

-মা আমি পেরেছি, তোমার এতদিনের এত পরিশ্রম আমি বিফলে যেতে দিইনি। আমি জেলার মধ্যে প্রথম হয়েছি। 

কপালে স্নেহচুম্বন এঁকে দিয়ে কমলিনীর মা বললেন-


-যা কমু, বাবা, ঠাকুমা, দাদু সবাইকে গিয়ে এই খুশির সংবাদটা দিয়ে আয়।

-দেখুন এই বিয়েতে আমাদের তো কোনো আপত্তি নেই। মেয়ে দেখতে শুনতে মন্দ নয়, লেখাপড়াও জানে, গানও জানে, সংসারের সব কাজ জানে কিন্তু আমার আপত্তি বয়স নিয়ে, কমলিনীর বয়স বড্ড কম। আপনার মেয়ে প্রায় আমার ছেলের থেকে

 ১৫বছরের ছোটো, আপনার মেয়ে রাজি হবে তো? 

-সোনার আংটি আবার বাঁকা। হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক রাজি হবে। তাছাড়া মেয়েমানুষের এতো পছন্দ-অপছন্দ কীসের? আমরা যাকে দেখে দেবো কমলিনী তাকেই বিয়ে করতে বাধ্য। 


রেজাল্ট জানাতে এসে এইরকম কিছু যে তার জন্য অপেক্ষা করছে, তা একেবারেই ভাবতে পারেনি কমলিনী, কথাগুলো শুনেই মূহুর্তের মধ্যে তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।


-না আমি এই বিয়ে কিছুতেই করবো না বাবা। আমি পড়তে চাই, আরও পড়তে চাই। 

-ঠিক আছে কালী কিঙ্কর মিত্র, তাহলে আজ আমরা উঠি, আপনারা নিজেদের মধ্যে এই ব্যাপারে কথা বলে পরে না হয় জানাবেন।

-দাঁড়ান। এই ব্যাপারে আমার কথাই শেষ কথা। কালী কিঙ্কর মিত্র একবার যা সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। 

-না বাবা তুমি আমার সাথে এটা কিছুতেই করতে পারো না। বাবা আমি পড়তে চাই, প্লিজ বাবা, আমি হাত জোর করে অনুরোধ করছি। 

-তুই আমার কথার অবমাননা কিছুতেই করতে পারিস না। একবার যখন বলে দিয়েছি বিয়েটা হবে, তার মানে বিয়েটা হবেই। 

-কমু চুপ কর দিকিনি। অনেককন ধরে তোর কতা শুনছি, বাব্বা বাক্যি যেন আর কিছুতেই শেষ হয় না। এত কতার কি আছে বাবু বুঝিনে। মেয়েমানুষ আজ না হয় কাল পরের বাড়ি যেতেই হবে। 

রান্নাঘর থেকে অনেকক্ষণ ধরেই এইসকল কথা কমলিনীর মায়ের কানে আসছিলো, কিন্তু এই বাড়িতে পুরুষদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা, তাই কমলিনীর মা কমলিনীর বিয়ের কথাটা শুনেও কিছুই বলতে পারছিলেন না। তিনি সবটাই অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে দিয়ে চোখের জল ফেলেছিলেন। বোধকরি ওই চোখের জলেই কমলিনীর ভবিষ্যৎ এইবার পরিষ্কার ভাবে ধরা দিল কমলিনীর মায়ের চোখে। তিনি আঁতকে ওঠেন, এবং ছুটে যান বসার ঘরে। 

- ক্ষমা করবেন এইভাবে আপনাদের কথার মাঝে কথা বলছি বলে, আসলে আপনাদের সকলের সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল। কমু তো এই সবে মাধ্যমিক দিল, ও এখন অনেকটাই ছোটো আর দু-একবছর যদি....


পুরো কথাটা শেষ করতে পারে না কমলিনীর মা। তার আগেই কালী কিঙ্করের রক্তচক্ষু দেখে কমলিনীর মা চুপ করে যায়। 


-আমি আবারও শেষবারের মতো বলছি আমি বিয়ে করবো না আমি পড়াশোনাই করবো। বিয়েটা সারাজীবনের ব্যাপার, আর তা আমার জীবনের সাথে জড়িত, তাই আমি যদি না চাই তাহলে আমার অমতে তুমি এই বিয়ে কিছুতেই দিতে পারো না বাবা। মা চুপ করে গেলেও আজ আমি বলবো, বলবোই। আমি জানি এই বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী শুধু ছেলেরাই সব সিদ্ধান্ত নেবে কিন্তু আমি এই নিয়ম আমার ক্ষেত্রে মানি না। মেয়ে হয়েছি বলে কি আমার মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই? 


একানাগাড়ে চিৎকার করতে করতে কথাগুলো বলতে থাকে কমলিনী। শত অবহেলা, অনাদর সত্ত্বেও যে কমলিনী কোনোদিন কারোর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে একটা কথাও কাউকে কোনোদিন বলেনি, সে আজ প্রতিবাদ করছে। একটা মানুষ বোধহয় ক্রমাগত কোণথাসা হতে হতে একদিন তার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় আর তখনই বোধহয় সে প্রতিবাদ করতে শেখে। 


কমলিনীর বাবা, দাদু, কমলিনীর করা প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার বদলে, কমলিনীর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আসলে বাজ পড়ার আগে যেমন চারিদিক নিস্তব্ধ থাকে, মিত্র বাড়িতেও এখন সেইরকমই নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এই নিস্তব্ধতা ভাঙে পাত্রপক্ষের গলার আওয়াজে। 

-মিত্র মশাই আজ তাহলে আমরা আসি। আমরা আপনার বাড়ির মেয়েকে আমাদের বাড়ির বউ করে নিয়ে যেতে চাই না। আমরা মেয়েমানুষের এমন ঔদ্ধত্য কখনই বরদাস্ত করি না, তাই আমরা এই বিয়েটা ভেঙে দিলাম। 


রাগে অপমানে চোয়াল শক্ত হয়ে যায় কালী কিঙ্কর মিত্রের, চোখদুটো রক্তের মতো লাল। সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয় কমলিনীর গালে, চুলের মুটি ধরে হির হির করে টানতে টানতে চিলেকোঠার ঘরে আটকে দেয় কমলিনীকে। 


-থাক আটকে এখানে, তোকে কীভাবে সোজা করতে হয় তা আমার ভালোই জানা আছে। সবাই শুনে রাখো আজ থেকে কমলিনীর খাওয়া বন্ধ, আর কেউ যদি ওকে কোনোরকম ভাবে খাবার দেওয়ার চেষ্টা করো, তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না। 

দুইদিন এইভাবেই কেটে গেল, তৃষ্ণায়-ক্ষুধায় কমলিনী বন্ধ ঘরের মধ্যে ছটফট করতে করতে প্রায় অচেতন হয়ে গেল। ওদিকে কমলিনীর মায়েরও একই অবস্থা, বদ্ধ ঘরের মধ্যে না থাকলেও মনটাতো তার মেয়ের কাছেই বদ্ধ হয়ে আছে। মা কি কখনও সন্তানকে না খাইয়ে খেতে পারে তাই সেও দুদিন ধরে না খেয়ে আছে, আর নিস্তব্ধে চোখের জল ফেলছে এবং এই সকল কিছুর জন্য অদৃষ্টকে দায়ী করেছে। 

-আমি বলি কি কালী, তুই এইবার কমলিনীকে বদ্ধ ঘর থেকে মুক্ত করে দে, আর শাস্তি দিস না। ও তো এইবার মরে যাবে। যতই হোক ও তো আমাদের বংশেরই মেয়ে। 


পরিবারের বড় কর্তা শিব কিঙ্কর মিত্র যার দাপটে এককালে শুধু মিত্র পরিবারই নয় পুরো গ্রাম ভয় পেত, সে আজ প্রথমবার নাতনির হয়ে কথা বললো। কি জানি নাতনির উপর দয়া করে নাকি অপরাধবোধ থেকে নাতনির সপক্ষে কথা বলেছিলেন তা ঠিক বোধগম্য হয়নি। 


-মরলে মরুক, অপয়া মেয়ে একটা। বাবা তুমি একটা জিনিস কোনোদিন ভেবে দেখেছো, কমলিনী যত বড় হচ্ছে তত আমাদের বিষয় সম্পত্তি যা কিছু ছিল, আস্তে আস্তে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, দিন দিন ব্যবসায় লাভের থেকে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলছে, আর তা শুধু ওই মেয়ের জন্যই হচ্ছে। ওর বিয়ে হয়ে গেলে আমার উপর বোঝাটা একটু কম হতো, সংসারের একজনের খরচা বেঁচে যেত। তাছাড়া ওর সঙ্গে যদি রায় বাড়ির বড়ো ছেলের বিয়ে হতো, তাহলে সনাতন বাবু হয়তো আমাদের বিজনেস পার্টনার হতেন, এর ফলে আমরাও ব্যবসাটা দাঁড় করাতে পারতাম। 

হায় রে অদৃষ্ট, মেয়েরা নাকি বোঝা। একটু কিছু হলেই মেয়েরা অপয়া। বিয়ের সিদ্ধান্তটা, ঠিক অভাবের জন্য কিনা জানি না, তবে স্বভাবের জন্য তো বটেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই যুগে দাঁড়িয়েও আজও একটা মেয়েকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।  


-কালী আমি তবুও বলবো, যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। কমলিনীকে আটকে রাখলেই কি সনাতন রায় আবার তার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হবে? তার থেকে বরং ছেড়ে দে। তাছাড়া এখনও তো কমলিনীর বয়স আঠারো বছর হয়নি, তুই বরং দুইবছর পরেই বিয়ে দিস, তখন আর আমি তোকে আটকাবো না। 


দাদু শিব কিঙ্কর মিত্রের জন্যই সেইবারের মতো রেহাই পেয়েছিল কমলিনী। আসলে সিংহ যেমন বুড়ো হয়ে গেলেও সবসময়ই পশুরাজ হিসেবে মর্যাদা পায়, তেমনই শিব কিঙ্কর মিত্র বুড়ো হয়ে গেলেও এখনও তার কথার অমান্য কেউ করার সাহস পায় না। তবে কালী কিঙ্কর মিত্রের দাপটও কম নয়, তাই সে এতো সহজে দমবার পাত্র নয়, তার উপর আবার মানে আঘাত লেগেছে বলে কথা। তাই কালী কিঙ্কর ছোবল মারতে না পারলেও ফোঁস ফোঁস করেই যাচ্ছে।


 এইভাবেই কেটে গেল বেশ কিছুদিন....। আজ অনেক ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়েছে কমলিনী আর তার মা। আজ খুব তাড়াতাড়ি বাড়ির সব কাজ সেরে স্কুলে যেতে হবে। ও বলতেই তো ভুলে গেছি আজ একাদশ শ্রেণিতে কমলিনী ভর্তি হবে। 

-যা কমু এইবার তুই স্নানটা সেরে আয়। তোকে আর কিছু করতে হবে না, মোটামুটি সব কাজই হয়ে গেছে, শুধু মাছের ঝালটুকু যা বাকি। 

-ঠিক আছে মা যাচ্ছি। কিন্তু....

-কিন্তু কীসের শুনি? কি হয়েছে রে তোর, কাল থেকেই দেখতে পাচ্ছি, মুখটা কেমন যেন করে রেখেছিস, কোনো হাসি নেই মুখে। 

-মা তোমার তো ওই বালা জোড়াটুকুই শেষ সম্বল। আমার পড়াশোনার জন্য তুমি সেটাও বিক্রি করে দেবে? এমনিতেই তো তুমি বাবার বিজনেসের জন্য সব গয়নাই বিক্রি করে দিলে। তাই বলছিলাম কি বাড়ির কেউ যখন চায় না, আমি তাহলে আর পড়বো না। 

-তুই এই কথাটা বলতে পারলি কমু? তুই জানিস না আমার কত স্বপ্ন তোকে নিয়ে....তুই পড়াশোনা শিখে একদিন মস্ত বড় মানুষ হবি, বিরাট বড় চাকরি করবি। 

-আমার ভুল হয়ে গেছে মা, আর এইরকম কথা কোনোদিনও বলবো না। আমি তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করবো দেখো। তোমায় তখন আর একটুও চোখের জল ফেলতে দেবো না, তুমি তখন সবসময় হাসবে। আর মা দেখো তোমায় আমি চাকরি পেয়েই সব গয়না গড়িয়ে দেবো। 

-এই তো আমার সোনা মেয়ের মতো কথা।.....এই রে দেখলি তো তুই বকবক করতে করতে আমার কত দেরী করিয়ে দিলি, যা এইবার তাড়াতাড়ি স্নানে যা নইলে আরও দেরী হয়ে যাবে। 


কেটে গেছে বেশ কয়েকটি মাস। ঠাকুমা, বাবা-দাদু, আত্মীয় স্বজন সকলের কথা অগ্রাহ্য করে কমলিনী একাদশ শ্রেণিতে সায়েন্স বিভাগেই ভর্তি হয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিল, মেয়েমানুষের মাথায় নাকি অঙ্ক ঢুকবে না, তাই সায়েন্স নিয়ে লোক না হাসিয়ে বরং আর্টস নে। এই কথা যে কতখানি ভুল তা একদিন ঠিকই প্রমাণ করে দেবে কমলিনী। যদিও তার কাছে সায়েন্স, আর্টস, কমার্স সবই সমান। যে কোনো বিভাগেই, পড়াশোনা না করলে ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্যই শক্ত, আর পড়াশোনা করলে তা সহজ। 


সরস্বতী পুজো উপলক্ষ্যে আজ স্কুলে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। কমলিনী সহ স্কুলের সকল শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে এবার স্যার-ম্যামরাও নৃত্য এবং সঙ্গীত পরিবেশন করবেন। তাই এইবারের অনুষ্ঠানটা একটু ভিন্ন স্বাদের হতে চলেছে। 


এবারে অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে থাকছে এই বিদ্যালয়েরই দ্বাদশ শ্রেণির এক কৃতি ছাত্র অভিনন্দন চৌধুরী। 


-নমস্কার আমি অভিনন্দন চৌধুরী। এখানে উপস্থিত সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম এবং বাকিদের জানাই আমার ভালোবাসা। নলেন গুড় আর পিঠে পুলীর সনে অনেক হল শীতের মেলা, সরস্বতীর আরাধনার মধ্য দিয়ে ঘনিয়ে এলো বিদায় বেলা, সাঙ্গ হল শীতের খেলা, তাই তো শীতের যাবার পালা। বসন্তেরই আসার পালা, আর তাই কোকিলের কুহুতান নিয়ে এসেছে সেই বার্তা। এই সরস্বতী পুজোর হাত ধরেই বসন্তের সূচনা হয়। যারা একটু শীতকাতুরে তারা যেন এই সময় একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। বসন্তকাল মানেই ভোরের দিকে হালকা হালকা শীত ভাব, সকালে কোকিলের কুহু কুহু ডাকে ঘুম থেকে ওঠা। শীতে যেমন রুক্ষতা বেড়ে যায়, পাতা ঝরতে শুরু করে তেমনই বসন্তে গাছগুলোতে নতুন করে পাতা জন্মাতে শুরু করে। গাছগুলো যেন নতুন করে সেজে ওঠে, চিরসবুজ হয়ে যায়, আর তাই বসন্তকাল মানে আমার কাছে আশার আলো। এ তো গেলো শুধু সকালবেলার কথা, তবে বসন্তের বিকেলগুলোও কিন্তু কম রোমাঞ্চকর নয়। গোধূলি বেলায় সূর্য যখন অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় ঠিক সেই সময়ে প্রকৃতিতে এক নতুন রঙের সৃষ্টি হয়, নীল দিগন্তের সাথে ফুলের রঙ। আর তাই তো কবি গেয়ে ওঠেন নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগলো..


এইভাবেই অভিনন্দন চৌধুরীর মনমুগ্ধকর সঞ্চালনায় একের পর এক নৃত্য, আবৃত্তি ও সঙ্গীত পরিবেশন হতে লাগলো। আর কমলিনী মন্ত্রমুগ্ধের মতো অভিনন্দন চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে রইলো, সে এমনই মুগ্ধ হয়ে গেল যে, কোনো শব্দই তার আর কানে আসে না। আর তাই তো বারবার তার নাম অ্যানাউন্স করার পরও কমলিনীর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। 

-কমলিনী মিত্র....কমলিনী মিত্র তুমি যেখানেই থাকো, এখুনি স্টেজে চলে এসো, আমরা নাহলে অনুষ্ঠানটি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছি না। 


কমলিনীর এক বন্ধু সুচেতনার ডাকে হুঁশ ফেরে কমলিনী। সে ধীর পায়ে স্টেজের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। 

-বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে, হৃদয়ে দিয়েছো দোলা। রঙেতে রাঙিয়া রাঙাইলে মোরে, একি তব হরি খেলা। 


চোখ বন্ধ করে গান গাইতে থাকে কমলিনী। এটা তার ছোটোবেলার অভ্যাস, আসলে কমলিনী মনে করে, চোখ বন্ধ না করলে সে মন দিয়ে গান গাইতে পারে না। কিন্তু, আজ সে চোখ বন্ধ করলেও ঠিক মন দিয়ে গান গাইতে পারছে না। চোখ বন্ধ করলেও সে আজ শুধু অভিনন্দন চৌধুরীকেই দেখতে পাচ্ছে। 

গান শেষ করে আবারও ধীর পায়ে স্টেজ থেকে নেমে আসে কমলিনী। এরপরই শুরু হয় অভিনন্দন চৌধুরীর আবৃত্তি। 


-যেমন আছো তেমনি এসো, আর কোরো না সাজ। বেণী নাহয় এলিয়ে রবে, সিঁথে নাহয় বাঁকা হবে,

নাইবা হলো পত্রলেখায়, সকল কারুকাজ। 


বেশ কিছুদিন পর.....একদিন স্কুলে--


-জানিস তো সুচেতনা, আমি না বুঝতেই পারছি না ছাই, আমার যে ঠিক কি হয়েছে.....আজকাল কোনো কাজেই আমার মন লাগে না, এমনকি পড়াশোনা করতেও ইচ্ছে করে না। আচ্ছা বল নারে, কেন আমার সবসময় অভিনন্দন দা কেই দেখতে ইচ্ছে করে..কই আগে তো এমন হতো না। অভিনন্দন দা তো আমাদের স্কুলেই পড়তো। 

-কবে থেকে তোর এমন হচ্ছে কমলিনী? 

-ওই যে সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠানের দিন থেকেই। ওইদিন নীল-হলুদ পাঞ্জাবীতে খুব সুন্দর লাগছিল অভিনন্দন দাকে, তারপর স্টেজের ওই রকমারি আলোগুলো যখন অভিনন্দন দার মুখে এসে পড়ছিল, তখন খুব স্নিগ্ধ লাগছিল অভিনন্দন দাকে। 

-হুম বুঝলাম। তুই প্রেমে পড়েছিস।

-হ্যাট কি যে বলিস! 

-আমি ঠিকই বলছি, তুই যা দেরী না করে মনের কথাটা জানিয়ে দে। 

-ও বাবা আমি পারবো না। অভিনন্দন দা সামনে এলেই তো আমি লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে অবধি পারি না, বুকের মধ্যে কেমন ধুকপুকুনি বেড়ে যায়। ছাড় এসব। বলছি শোন না তুই প্লিজ এই কথাটা কাউকে বলিস না। 

-আচ্ছা ঠিক আছে কাউকে বলবো না। 


একবছর পর....


কমলিনীর এখন ঠিক শ্রীরাধিকার মতো অবস্থা, যখনই সে সাইকেলের ক্রিং ক্রিং আওয়াজ শোনে তখনই এক ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে যায়, খুঁজতে থাকে তার প্রিয়তমকে। সাইকেলের এই ক্রিং ক্রিং শব্দই যেন বাঁশির অনুরূপ। আসলে অভিনন্দনের সাথে এখন আর কমলিনীর দেখা হয় না। অভিনন্দন এখন কলেজে পড়ে আর কমলিনী উচ্চমাধ্যমিক দিলো। 


কিছু মাস পর....


-তাহলে ওই কথাই রইলো মিত্র মশাই, আগামী পড়শু আমার ছেলের সাথে কমলিনীর বিবাহ হবে। 


এবার আর কমলিনী কোনোভাবেই তার বিয়ে ভাঙতে পারলো না। এমনকি কমলিনীর মাও পাত্রের সরকারী চাকরী আছে বলে আর আপত্তি জানালেন না। বোধকরি তিনিও ভেবেছিলেন মেয়েমানুষকে রান্নাঘরেই মানায়। কমলিনী দৌড়ে গেল অভিনন্দনের কাছে, বোধহয় সে একবার তার স্বপ্ন পূরণের জন্য শেষ চেষ্টাটুকু করতে চেয়েছিল। 


-কীরে কমলিনী কেমন আছিস? শুনলাম তোর নাকি বিয়ে? মেয়েদের জীবন কিন্তু সত্যিই সুখের, চাকরি করার কোনো দরকারই পড়ে না।  


কমলিনী সেই মূহুর্তে বুঝে গিয়েছিল, পৃথিবীর সকল পুরুষই এক। এরা কখনই নারীদের মনের গভীরতাকে আবিষ্কার করতে পারেনি। এরপর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল কমলিনীর। অষ্টমঙ্গলায় সে বাপের বাড়ি এসে তার মাকে বলেছিল-


-গোটা পুরুষজাতির পৌরুষত্ব বোধহয় নারীদের গায়ে হাত তোলাতেই বজায় থাকে। 


উত্তরে তার মা তাকে বলেছিল- মানিয়ে নে মা। এই মানিয়ে নিতে নিতেই বিয়ের একবছরের মধ্যেই কমলিনীর প্রাণ বায়ু ফুরিয়ে গিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত কমলিনী মরিয়া বাঁচিয়াছিল। যুগের পর যুগ কেটে যায় কিন্তু কমলিনীদের কথা কেউ জানতে চা

য় না, কেউ বুঝতে চায় না, তাই এইসকল কথা ডায়েরি বন্ধ হয়েই থেকে যায়। তাই আজ আমি নিজেই জানাতে এলাম। নমস্কার আমি কমলিনী।

সম্পর্কের ভাঙাগড়া - অসিত কুমার পাল || Somporker vanga gora - Asit Kumar pal || গল্প || ছোট গল্প || Story || Short Story || Prose || বড় গল্প

সম্পর্কের ভাঙাগড়া

               অসিত কুমার পাল



 রাধিকা আর নবীনের বিবাহ বিচ্ছেদের মামলার রায়ের কাগজপত্র আজ পাওয়া গেছে । সেগুলো হাতে নিয়ে দুজনে একসঙ্গেই আদালত থেকে বেরিয়ে এল । দুজনেরই হাসিমুখ দেখে নিজের নিজের আত্মীয় বন্ধুদের মুখেও হাসি দেখা দিল।

 চার বছরের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে আজ আদালতে তাদের বিচ্ছেদ মঞ্জুর হয়েছে .

দশ বছর আগে ওদের বিয়ে হয়েছিল কিন্তু ছ বছরের বেশি তারা একত্রে থাকতে পারে নি , শেষ চার বছর তো মামলা লড়তে লড়তেই কেটেছে ।


  বিয়ের সময়ে রাধিকার বাবা পণ বাবদ যে সব জিনিসপত্র দিয়েছিল তার একটা তালিকা রাধিকার হাতে ধরা আছে । নবীনের বাড়িতে গিয়ে তালিকা মিলিয়ে সেগুলো ফেরত নিতে হবে । তেমনই নবীনের হাতে ছিল সেসব গহনার তালিকা যেগুলো বিয়ের পরে নবীন রাধিকাকে দিয়েছিল । সেগুলোও তো ফেরত নিতে হবে ।


এছাড়াও আদালতের আদেশ অনুযায়ী নবীনকে খোরপোষ বাবদ রাধিকাকে এক কালীন দশ লাখ টাকা দিতে হবে । রাধিকা নবীনের সাথে একই অটোরিক্সায় চেপে নবীনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল কারণ তাকে পনের জিনিসপত্রগুলো চিনে নিতে হবে । চার বছর পরে রাধিকা স্বশুর বাড়িতে যাচ্ছে , সম্ববত শেষ বারের মত ।


 আত্মীয় বন্ধুরা যে যার বাড়িতে ফিরে গেছে , কেবল নবীন রাধিকা আর রাধিকার মা থেকে গেছে । এখন থেকে নবীন তার ঘরে একাই থাকবে কারণ তার বাবা মা ভাই গ্রামের বাড়িতেই থাকে ।


আদালতের রায় অনুযায়ী নবীন আর রাধিকার একমাত্র সাত বছর বয়সী ছেলে সাবালক না হওয়া পর্যন্ত তার মায়ের তত্বাবধানে থাকবে । নবীন মাসে একদিন তাকে দেখতে যেতে পারবে ।


নবীনের বাড়িতে প্রবেশ করা মাত্র রাধিকার পুরানো দিনের নানা কথা মনে পড়ল । সে কত পরিশ্রম করে ঘর সাজিয়ে তুলেছিল ।

প্রতিটি জিনিসের সাথে তার স্মৃতি জড়িয়ে আছে । ঘরের প্রতিটি ইট তার চেনা । এই ঘর তার স্বপ্নের ঘর ছিল । নবীন খুশিমনে তার স্বপ্নকে রূপ দিয়েছিল ।


নবীন ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোফার উপরে বসে পড়ল। রাধিকাকে বলল - তুমি যা চাও সব নিয়ে যাও । রাধিকা অন্য দৃষ্টি দিয়ে নবীনের দিকে তাকাল , তার মনে হল গত চার বছরে নবীন অনেক বদলে গেছে । তার চুলে পাক ধরেছে, শরীর ও অনেকটা ভেঙে গেছ, দেহের ঔজ্বল্য হারিয়ে গেছে ।


 পণে র জিনিসপত্র যে ঘরে রাখা আছে রাধিকা সেদিকে এগিয়ে গেল । বেশিরভাগ জিনিসই পুরানো ধাঁচের বলে সেগুলো অচল জিনিসপত্রের সাথে গুদাম ঘরেই রেখে দেওয়া হয়েছিল । অবশ্য পণ হিসাবে তেমন কিছু জিনিস দেওয়া হয়নি । ওরা প্রেম করেই বিয়ে করেছিল , দুই পরিবার বাধ্য হয়েই ওদের বিয়েটা দিয়েছিল । কিন্তু তাতেই বোধ হয় কারো কুনজর পড়েছিল । অনেকেই চায় এ ধরনের বিয়ে ভেঙে যাক ।


 একবার নবীন মদ্যপান করে মাতাল হয়ে পড়েছিল , একটা কারনে রেগে গিয়ে রাধিকার গায়ে হাত তুলেছিল । আর তাতেই রাধিকা ক্রুদ্ধ হয়ে নবীনের বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল ।

এরপরে সমস্যা মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছিল , একদিকে নবীনের দাদা বৌদি আর অন্য দিকে রাধিকার মা তাতে সামিল হয়েছিল । কিন্তু নবীন তাকে ফিরিয়ে আনতে যায়নি , রাধিকাও ফিরে আসেনি । শেষ পর্যন্ত নবীন আদালতে গিয়েছিল যার অন্তিম পরিণতি এই ডিভোর্স ।


 রাধিকার মা বলল - তোর জিনিসপত্র সব কোথায় ? মাতালটা বিক্রি করে দেয়নি তো ? নবীন মাতাল বলা টা রাধিকার ভাল লাগেনি । সে রেগে উঠে বলল - তুমি চুপ করে থাক ।

এর পরে সে গুদাম ঘর থেকে তালিকা মিলিয়ে নিজের জিনিসপত্র খুঁজে বের করল । বাকি কিছু জিনিস অন্য ঘরে আছে । রাধিকা কেবল নিজের জিনিসপত্র বেছে নিল , নবীনের জিনিসপত্র ছুঁয়েও দেখল না । তার পরে নবীনের দেওয়া গহনাগুলো যে ব্যাগে ছিল সেটা নবীনের হাতে ধরিয়ে দিল । নবীন সেটা আবার রাধিকার হতে দিয়ে বলল - রেখে দাও ।


 আমার তো কোন কাজে লাগবে না , বরং দরকারে তোমার কাজে লাগবে । ঘনাগুলোরর দাম কম করেও পনেরো লাখ হবে । রাধিকা বলল - আমি রাখব কেন ? আদালতে তো তোমার উকিল বারবার গহনা গহনা বলে চিৎকার করছিল ।


নবীন বলল - আদালতের কথা আদালতেই মিটে গেছে । তোমার উকিল ও তো আমাকে দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জানোয়ার বলে প্রমাণ করে দিয়েছে । এবার রাধিকার মা নাক গলাল - কোন দরকার নেই । এমনকি খোরপোষের দশ লাখ টাকাও দিতে হবে না ।


 নবীন জোর গলায় বলল - কেন ?

রাধিকা অন্য দিকে মুখ করে বলল - এমনিই ।

 নবীন বলল - তোমার বয়স বেশি নয় , এখনো বহুদিন বাঁচবে । ওগুলো নিয়ে নেওয়াই ভাল । নবীনের চোখ জলে ভরে গিয়েছিল সেটা লুকোতে নবীন অন্য ঘরে চলে গেল । রাধিকার মা ফোন করে একটা গাড়ি ডাকার জন্য ব্যস্ত ছিল । রাধিকা এই সুযোগে নবীনের পিছনে পিছনে গেল ।


দুজনেই কাঁদছিল আর সেই কান্না চাপার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল । রাধিকা নবীনকে কখনো কাঁদতে দেখেনি । আজ প্রথমবার তাকে কাঁদতে দেখে তার মন নরম হয়ে গেল । কিন্তু তার মনোভাব প্রকাশ করল না । কেবল শান্তভাবে বলল - আমার কথা এত যদি ভাব তাহলে ডিভোর্স দিলে কেন ?


 নবীন বলল - আমি নয় তুমিই ডিভোর্স দিয়েছ ।

রাধিকা বলল - তুমিও তো দরখাস্তের সই করেছিলে । 

- তুমি একবার ক্ষমা চাইতে পারতে তো ?

- তুমি তো সে সুযোগ দাওনি । ফোন করলে কেটে দিতে ।

- বাড়িতে চলে আসতে পারতে ।

- সাহস হয় নি ।


 এই সময়ে রাধিকার মা এসে তার হাত ধরে বাইরে নিয়ে যেতে যেতে বলল - এখন কান্নাকাটি করে লাভ কি । সম্পর্ক তো শেষ হয়ে গেছে ।

 তারা দুজনে বারান্দায় রাখা সোফায় বসে গাড়ির অপেক্ষা করতে লাগল ।


রাধিকার বুক ফেটে যাচ্ছিল । সে একমনে সোফার দিকে তাকিয়ে থাকল । দুজনেই অনেকদিন ধরে সংসার খরচ বাঁচিয়ে নানা দোকান ঘুরে সোফা টি পছন্দ করেছিল ।

এর পর তার দৃষ্টি পড়ল উঠানের একপাশে তুলসী মঞ্চের শুকনো গাছটির উপরে । সে অনেক যত্নে গাছটি বাঁচিয়ে রেখেছিল ।


 অস্থিরতা নিয়ে সে সোফা থেকে উঠে আবার নবীনের ঘরে গিয়ে ঢুকল । মা ডাকলেও রাধিকা সাড়া দিল না । নবীন তার বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল । রাধিকার মায়া হল , কিন্তু সবকিছু তো শেষ ই হয়ে গেছে । সে ঘরের এদিকে ওদিকে চোখ বোলাল । পুরো ঘরটা অগোছালো হয়ে আছে । কোণের দিকে মাকরসা জাল বুনেছে । অথচ সে মাকড়সা কে কত ভয় পেত ।


এর পর তার নজর গেল দেওয়ালে টাঙানো ছবি গুলোর দিকে যাতে নবীনকে জড়িয়ে ধরে রাধিকাকে হাসতে দেখা যাচ্ছে । সেসব দিনগুলো কত সুখের ছিল । মা আবার এসে রাধিকার হাত ধরে বাইরে নিয়ে গেল । বাইরে গাড়ি এসে গেল । মালপত্র গাড়িতে তোলা হল । কিন্তু রাধিকা শূন্য মন নিয়ে বসেই রইল । গাড়ির শব্দ পেয়ে নবীন বাইরে এল । হঠাৎ সে কান ধরে রাধিকার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে বলল - আমাকে ক্ষমা কর । তুমি যেও না ।


 রাধিকা বোধ হয় এই কথাগুলো শোনার অপেক্ষাতেই ছিল । তার মনের সমস্ত বাধা দুর হয়ে গেল । রাধিকা তার হাতে ধরা আদালতের রাতের কপি ছিঁড়ে ফেলল ।

আর মা কিছু বলার আগেই সে নবীনকে বুকে জড়িয়ে ধরল । দুজনেই সমান ভাবে কেঁদে যাচ্ছিল ।


দূরে দাঁড়িয়ে রাধিকার মা সবকিছু বুঝতে পারল আদালতের রায়ের থেকে মানুষের মনের রায়ের মুল্য অনেক বেশি । তারা সেটা আগে বুঝতে পারেনি । ক্ষমা চাইলেই যদি ভাঙ্গা সম্পর্ক জুড়ে যায় তাহলে ক্ষমা চাওয়াটাই ভাল ।

ঝুলন্ত তার - কাহার মল্লিক || Jhulanta Tar - Kahar Mallik || গল্প || ছোট গল্প || Story || Short Story || Prose || বড় গল্প

 ঝুলন্ত তার

            কাহার মল্লিক



মেঘু, সিটু দুজনের কেউই পেশাদার চোর নয়; বলা যেতে পারে মজাদার চোর। চুরি করে মজা পায় বলেই তারা চুরি করে। আর যত মজা পায়, ততই তারা চুরি করার আকাঙ্ক্ষাকে দমন করতে পারে না বরং চুরির প্রতি আগ্রহ তাদের বেড়েই চলে। এটা একধরনের মানসিক ডিজঅর্ডার, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ক্লেপ্টোম্যানিয়া বলা হয়। তারা খেয়ালিপনায় চুরি করতে গিয়ে মালিককে নাজেহাল করে ছাড়ে আবার কখনো চুরি করা বস্তু মালিকের বাড়িতে পৌঁছে দেয়।এই আজগুবি চোর দ্বয় ছিচকে চোরের মতোই অপরের জিনিস চুরি করেছে কম আর ইন্টাটেনমেন্ট বা আমোদপ্রমোদ মেতে উঠেছে বেশি।


মেঘু, মাঝারি গড়নের, বাবরি চুল, বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের মতো। সিটু, শীর্ণকায়, বদমাইয়েশি বিদ্যায় তুখোড়। ইয়ার্কি, মশকারি, বাঁদরামি, ইতরামি, ফাজলামি, লোকঠকানো ইত্যাদি কাজে তাদের জুড়ি মেলা ভার।এদের গুরু হলেন হাদু, ষাটোর্ধ্ব, পাতলাগোছের মানুষটির বিদঘুটে চেহারা। ভাত খায় কম, মদ খায় বেশি।গ্রীষ্মের দাবদাহে ফাটা মাঠের মতোই তার চামড়া ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। তার গোটা দেহের হাড়গুলো ক্ষুধার্ত মানুষের মতো দাঁতমুখ বের করে আছে।একটি বাক্যে হাদুর বর্ণনা দিতে গেলে বলতে হবে, একটি নরকঙ্কাল, যার মাথাভর্তি ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, মুখমণ্ডল ভরা দাড়িগোফ, গায়ে ধুলোমাখা তেল চিটচিটে আজানুলম্বিত এক আলখাল্লা। তার একটি বিশেষত্ব হল, পৃথিবীর হেন কোনো ঘটনা নেই বা হেন কোনো খবর নেই যে; সে টের পায় না। লোকে বলে হাদু মাতাল, কিন্তু কেউ তাকে একবারও মাতলামি করতে দেখেনি, এমনকি মদের দোকানের ধারেকাছেও দেখেনি।অথচ বাড়িতে বসে বসে চেলা মেঘু, সিটুদের নিয়ে বোতলের পর বোতল মদ পান করেছে।অনেকে গোপনসূত্রে জেনেছে, হাদুর বাড়িতে নাকি মদ তৈরি হয় বা চোরাপথে মদ আসে।তাই তাকে নিয়ে দুই লাইনের একটা ছড়াও তৈরি হয়।

                                     হাদুর বাড়ি, মদের হাড়ি।

                                     হাদু মদ খায় কাড়িকাড়ি।

কিন্তু কেউ কোনোভাবেই হাদুর বাড়িতে মদতো দূরের কথা, মদের হাড়িটিরই কোনোরকম হদিশ পায়নি।


মেঘু গ্রামে ‘কপাল কাটা’ আর সিটু ‘দাঁত ভাঙা’ নামে পরিচিত। এই মানুষদুটির মনে যা আসে তা-ই করে। তরুণদের সাথে কবাডি খেলায় দুই জনে দুই দলের হয়ে নেমে পড়ে।সিটু মেঘুকে ধরতে গিয়ে মেঘুর উপরে পড়ে, তখন সিটুর ওপর চোয়ালের একটি দাঁত ভেঙে মেঘুর কপালে ঢুকে যায়।তবুও মেঘু টের পায় না, ব্যাপকহারে রক্তক্ষরণ হলে, তার দলের একজন দাঁতটিকে টেনে বার করে।তখন মেঘু কপালের কাটা জায়গাটিতে টাইট করে গামছা বেঁধে, এর থেকে মারাত্মক একটি ঘটনার কথা শোনায়।কোনো এক জায়গায় কবাডি খেলায় একজন ধরতে গিয়ে তার মাথার ঢুসে বাইশ ইঞ্চির কাঁসার একটি বালতি দুমড়ে যায়, অথচ তার মাথার কিছুই হয়নি।আর সিটু শোনায়, সে একজায়গায় চুরি করতে গিয়ে একটা মোটা লোহার তালাকে দাঁতে টেনে খুলে দিয়েছিল, সেই কথা।


মানুষ যখন নিজের খোশখেয়ালে কাজ করে, তখন যেকোনো কাজেই তার ভয়ডর থাকে না। এরা চুরির সাথে মালিককেও নাকানিচুবানি খাওয়ায়।রাতটি ছিল কনকনে শীতের। চাঁদ ডুবুডুবু। মালিক তার জমির এককোণে অস্থায়ী একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরের ভিতরে লেপ-কম্বল জড়িয়ে শুয়ে থেকে, তার গচ্ছিত ধান পাহারা দিচ্ছিল।একসময় তার গভীর ঘুম আসে। আর এদিকে মেঘু, সিটুও আসে। মেঘু মালিকের ঘুমন্ত অবস্থার ফায়দা তুলতে গচ্ছিত ধানের শিষ কেটে কেটে বস্তা বন্দি করতে থাকে।আর এক ফন্দি এটে সিটু বলে, “ দেখবি শালার সারাজীবনের মতোন আগলদারি বার করে দিবো।“ লেপ-কম্বল সহ ঘুমন্ত মালিককে তারা দুজনে পাঁজাকোলা করে ধরে নিয়ে গিয়ে পুকুরের জলে ফেলে দেয়।তারপর ধানের শিষ ভর্তি বস্তা নিয়ে ফুড়ুৎ করে দৌড় দেয়।


ঘুটঘুটে অন্ধকার এক রাত্রিতে মেঘু, সিটু কয়েকজন সাঙ্গোপাঙ্গকে নিয়ে পেঁয়াজ চুরি করতে যায় ডহরের মাঠে। ডহরের মাঠে শুধু সারি সারি পেঁয়াজের ডাঙা।এই মাঠে হাদুরও একটি ডাঙা আছে বলেই কাউকে পেঁয়াজের ডাঙা পাহারা দিতে হয় না। ঘোরান্ধকারে তারা বস্তার বস্তা পেঁয়াজ তুলে নিয়ে চলে আসে।সকাল হলে হাদুর কানে খবর আসে, তার ডাঙারও পেঁয়াজ চুরি হয়েছে।হাদু নিশ্চিন্তে থাকে।মেঘু, সিটু ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গদের চুরি করা সমস্ত পেঁয়াজ পরের রাতে বস্তাবন্দি হয়ে হাদুর বাড়িতে পৌঁছে যায়।হাদু পেঁয়াজ তুলতে বেঁচে যায় এবং তার ডাঙা থেকে উৎপাদিত পেঁয়াজের থেকে প্রায় দুই গুণ বেশি পায়।


প্রত্যেক রাতের মতো, সে রাতেও সড়োদাদু বাঁশের খাঁচা দিয়ে একটি পুকুরে কাঁকড়া ধর ছিল। সড়ো মাল, পাতলাগোছের থুত্থুড়ে বুড়ো। ঐ পুকুরেই মাছ চুরি করতে আসে, মেঘু ও সিটু। রাতের গাঢ় অন্ধকারে তারা পুকুরপাড়ে কারো উপস্থিতির টের পায়। তখন মেঘু নির্ভয়ে জিজ্ঞেস করে, “কে গো তুমি?” সঙ্গে সঙ্গে সড়োদাদু উত্তর দেয়, “ওগো সড়ো।“ তখন তারা পিছনের দিকে সরতে থাকে আর সড়োদাদু তাদের দিকে এগিয়ে যায়, বিড়ির আগুনের জন্য। আবার মেঘু জিজ্ঞেস করে, “কে গো তুমি?” সড়োদাদু একই উত্তর দেয়, “ওগো সড়ো।“ তারা দুজনে পিছনের দিকে সরতে সরতে একদম পুকুরের ধারে চলে আসে, আর এক পা পিছনে দিলেই জলে পড়বে, সেই মুহূর্তে মেঘু আবারও জিজ্ঞেস করে, “ওগো আর সরা হবে না, ঠিক করে বলো , কে তুমি?” তখন সড়োদাদু স্পষ্টভাবে ও একটু জোর দিয়ে বলে, “ ওগো আমি সড়ো মাল, কাঁকড়া ধরছি।“ তখন তারা বুঝতে পারে, পাশের গ্রামের সড়োদাদু, পুকুরে কাঁকড়া ধরতে এসেছে। তখন সিটু সড়োদাদুর দুই হাত ধরে আর মেঘু দুই পা ধরে, তাকে দুলিয়ে দুলিয়ে পুকুরের জলে নিক্ষেপ করে।তারপর তারা কাঁকড়াসহ বাঁশের খাঁচাটি নিয়ে দৌড় দেয়।


মানুষ আপন মর্জিমাফিক চললে তার বিভিন্নরকরের প্রবৃত্তির প্রকাশ ঘটে।মেঘু, সিটুর, মরার বাড়ি থেকে চাল নিয়ে বিড়ি কিনতে বিবেকে বাঁধেনি।তারা রোজা (উপোস) থাকার নামে ভন্ডামি করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি‌। হাটে-বাজারে গিয়ে ডজন ডজন কলা গিলেছে। সেইসময় গ্রামের কেউ দেখে তাদেরকে রোজা থাকার কথা স্মরণ করালে হাতের কলা ফেলে দিয়ে পাক্কা ইমানদার ব্যক্তিদের মতো বলেছে; “আস্তাগফিরুল্লাহ (আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা), ভাই আমরা ভুলে গেছিলাম, আর ভুল হবে না।“ তবে তাদের আজগুবি উদ্ভট কান্ড এখানেই শেষ নয়। কত লোকের যে তারা তাড়ি চুরি করেছে, হাঁড়ি ভেঙেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।কত লোকের কত হাঁস, মুরগি, ছাগলকে মরার অজুহাত দেখিয়ে জবাই করেছে তার কোনো হিসেব নেই।কত ছেলেকে ছলে, কৌশলে তাড়ি ও ছড়ির বাড়ি খাইয়েছে তারও কোনো হিসেব নেই। ছোটো ছোটো ছেলেদের তাল বা খেজুর খাওয়ানোর কথা বলে, মাঠে নিয়ে গিয়ে তাদের তাড়ি খাইয়েছে। কিছু ছেলে স্বেচ্ছায় খেয়েছে আর কিছু ছেলে তাড়ির প্রতি অনীহা প্রকাশ করেছে। তাড়ি খেতে অনিচ্ছুক ছেলেদের সিটু বলেছে, “ দ্যাখ, তোরা যদি তাড়ি না খাস, তাহলে তোদের বাবাদের বলবো, তোরা তাড়ি খেয়েছি। আর তখন তোরা তোদের বাবার কাছে রামধোলাই খাবি।“ তখন তাড়ি-পায়ী ছেলেগুলো সিটুর পক্ষাবলম্বন করেছে‌। অগত্যায় পড়ে ও রামধোলাইয়ের ভয়ে নিরীহ ছেলেগুলো তাড়ি পান করেছে। অবশেষে এই ধূর্ত দ্বয়ের পাল্লায় পড়ে ছেলেগুলো, সবাই বাবা-মার হাতে বেধড়ক মার খেয়েছে।


মেঘু, সিটু চুরির কাজে মজা পেতে পেতে, চুরি করার পরিণতি যে ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা তারা ভুলে গেছে‌।হাদু তার দুই চেলাকে নিয়ে এক অন্ধকার রাতে বিদ্যুতের তার কাটতে যায়।তাদের কাটতে আসা বিদ্যুতের তারটি দীর্ঘদিন ধরেই অনেকটা ঝুলে থাকায় সেদিকে মানুষজন যায় না বললেই চলে‌। একদিন একজন ঝুলন্ত তারটির নীচ দিয়ে একটি ভেজা ধানের বোঝা নিয়ে যেতে বিরাট শক খায়। কিন্তু মূর্খদের নাকি সাহস বেশি। পরিণামের কথা না ভেবে, সিটু গুরুর কথায় খট খট করে একটি ধারালো অস্ত্র হাতে নিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির ডগায় উঠে যায় আর তার পিছু পিছু মেঘুও অনেকটা উঠে কিন্তু ধড়াম পড়ে যায়। শুকনো-শক্ত জমিতে হাঁটু গেড়ে পড়ায়, তার দুই পায়েরই হাড়গোড় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সিটু ধারালো অস্ত্রটি দিয়ে তার কাটতে গেলেই শক লাগে, আর সঙ্গে সঙ্গে তার ছিঁড়ে নিয়ে পড়লেই তার মৃত্যু হয়। তখন হাদু মেঘুকে তার গোপন ডেরায় চালান করে দেয়। সকালে হাদুর চেলারা রটিয়ে দেয়, “ দাঁত ভাঙা সিটু রাতে মাঠে পায়খানা ফিরতে গিয়ে ঝুলে থাকা তারটির শক 

খেয়ে মারা গেছে।"

Wednesday, November 1, 2023

নষ্টা - দেবযানি দত্ত প্রামাণিক || Nasta - Debjani Dutta Pramanik || গল্প || ছোট গল্প || Story || Short Story || Prose || বড় গল্প

 নষ্টা 

দেবযানি দত্ত প্রামাণিক


ছোটবেলা থেকেই খুব জেদী মেয়ে মিমি। পড়াশুনায় মোটামুটি, কিন্তু দেখতে অপুর্ব সুন্দরী। খুব ভালো নাচতেও পারে মিমি। ওর বাবা বিরাট অফিসার, একটি মাল্টি ন্যাশনাল এর ডিরেক্টর , কিন্তু প্রচুর কাজের চাপ আর প্রায়শই টুরে যান। ওর মা ও সরকারী অফিসার, বিডিও, ওনার ও খুব কাজের চাপ। তারপর আবার তিন বছর অন্তর পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বদলি হন। ও মোটামুটি ওর ঠামির কাছেই মানুষ। বাবা মা কাছে না থাকায় ওর ঠামি ওকে মাত্রাধিক আদর দিতেন ,তাইতে ও বেশ বখেই গিয়েছিল। বাড়িতেই প্রচুর কাজের লোক, তাই মিমি কে কিছুই প্রায় করতে হত না। সাজগোজ, নাচ, আড্ডা আর ঘুরে বেড়ানো, এই নিয়েই মেতে থাকত ও।দেখতে খুব সুন্দর হওয়াতে আর হাতে প্রচুর টাকা থাকাতে ওর অল্প বয়স থেকেই প্রচুর স্তাবক জুটে গিয়েছিল। তারা ওর যা নয় তাই প্রশংসা করত। নিজেকে ভীষণ কিছু ভাবত মিমি। ওর ধারণায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেয়ে ছিল ও।


মিমির মা কিন্তু বুঝতে পারতেন যে ওনাদের কোথায় ভুল হচ্ছে। কিন্তু মিমি তো ওনার কাছে সব সময় থাকতই না। প্রত্যেক ছুটিতে ও গিয়ে মার কাছে থাকত। একমাত্র ওই ছুটিতে মায়ের কাছে গেলেই উনি বকে ঝকে, বুঝিয়ে, আদর করে, ওকে এই ধরাধাম এ ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করতেন। যত্ন করে ওকে পড়ানো, নানা রকমের ভালো গল্প বলা, উদাহরণ দিয়ে বোঝানো, সব চেষ্টাই করতেন। ছোটবেলায় অত না বুঝলেও একটু বড় হতেই মিমির আর মায়ের কাছে যেতে ভালো লাগত না। পড়াশুনা , টিউশন, নাচের ক্লাস, ফাংশন, ইত্যাদি নানা ছুতোয় ও কলকাতায় থেকে যেত। বেগতিক দেখে ওর মা বাধ্য হয়ে ছুটি নিয়ে আসতে লাগলেন, কিন্তু সে তো মাত্র কয়েক দিনের জন্য, ওনার অফিসে তো আর স্কুলের মত ভ্যাকেশন নেই। মা এলে, সেই সময় টা কোনরকমে লক্ষ্মী মেয়ের অভিনয় করে কাটিয়ে দিত মিমি। ওর মা ওর বাবা কেও বলতেন মিমির কথা কিন্তু ও যে একমাত্র মেয়ে ! ওর বাবা ও নিজের ওকে সঙ্গ না দিতে পারার আত্মগ্লানি তে, খুব মাথায় তুলতেন ওকে। বাবা আর মা কদাচিত কলকাতায় একসাথে হতেন, তখন মা ওনাকে বোঝাবার চেষ্টা করতেন কিন্তু উনি আমল করতেন না, মেয়েকে একটু বেশিই প্রশ্রয় দিতেন। ঠামির সাথেও এই নিয়ে খুব ঝামেলা লাগতো মায়ের। মিমি কিন্তু এই সব থেকেই ফায়দা লোটার চেষ্টা করত সব সময়।


মাত্র সতেরো বছর বয়েসেই মিমি এক বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলের সাথে প্রেম করে পালাল।সেই ছেলেটি ওর সব হ্যা তে হ্যা মেলাত,তাই মিমির ওকে খুব পছন্দ হলো। ছেলেটি মিমিকে বোম্বে তে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ করে দাওয়ার ও ব্যবস্থা করে দেবে বলেছিল। তাই মিমি ওর ফাঁদে পড়ে গেলো ।সেই ছেলেটি বিয়ে না করেই ওকে দার্জিলিং নিয়ে গেলো, নিভৃতে প্রেম করার নাম করে। সেখানে তাদের একটি বাংলো ছিলো। সেখানে চুটিয়ে মিমি কে ভোগ করে একদিন ওকে বোম্বের এক মেয়ে পাচারকারী চক্রের হাতে বিক্রি করে দিলো। মিমি সিনেমায় চান্স পাবে ভেবে লাফাতে লাফাতে বোম্বে গেলো। ট্রেনে ওকে বোরখা পড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। বোম্বে তে নেমে কিন্তু মিমি খুব বিপদে পড়লো। ওকে কিছু খাইয়ে অজ্ঞান করে একটি পতিতালয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। মিমি খুব ছোটবেলায় বখে গেলেও, বেশি আদরে মানুষ হওয়াতে ওর পৃথিবীর বাস্তব সম্পর্কে কোনো ধারণা বা অভিজ্ঞতা ছিলো না। ও একদম অসহায় হয়ে পড়ল।


মিমির পালিয়ে যাবার পরে ওর বাবা ও মা পাগলের মত ওর খোঁজ করতে লাগলেন। ওনাদের একমাত্র মেয়ে কে ওনারা স্বাভাবিক ভাবেই খুব ভালবাসতেন। দিকে দিকে পুলিশ স্টেশনে ওর ছবি পাঠালেন। বদনামের ভয় টিভি তে অথবা কাগজে দিতে পারলেন না। ওর ঠামি দুঃখে কষ্টে বিছানা নিলেন, হয়ত উনি নিজেও কিছুটা হলেও নিজের ভুল বুঝতে পারছিলেন । এভাবে বেশ কিছুদিন যাবার পর ওর মা মিমির দার্জিলিং যাবার খবর পেলেন। বাবা মা দুজনেই তখনই দার্জিলিং এ চলে গেলেন। অনেক খোঁজা খুঁজির পর, ওপর মহলে যোগাযোগের পর জানতে পারলেন যে ওকে বোম্বে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওনারা সঙ্গে সঙ্গে বোম্বে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করলেন। পরের দিনই প্লেনে করে ওরা দুজন বোম্বে চলে গেলেন। যে ভাবে হোক মিমিকে নিয়ে আসতেই হবে।

এইদিকে মিমি তখন একদম বন্দী । ওকে পতিতা পল্লীতে আটকে রাখা হয়েছে। ওর সুন্দর চেহারার জন্য ওর প্রচুর দাম পাওয়া গেছে। খুব দামী দামী মক্কেলদের কাছে রক্ষী সমেত ওকে পাঠানো হচ্ছে। নানা রকম ভাবে ওদের মনোরঞ্জন করতে হচ্ছে ওকে। রীতিমত ট্রেনিং নিতে হচ্ছে। এখানে ওর জেদ কোনো কাজ করছেনা। ওদের প্রত্যেকটি কথা ওকে শুনতে হচ্ছে নয়ত তুমুল ভাবে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে।এই সময় আশ্চর্য ভাবে ওর বারবার মায়ের কথা মনে পড়ছিলো।খালি মনে হচ্ছিল যদি ও ছোটবেলায় মায়ের কথা মানত তাহলে আজ ওর এই দশা হত না। ও শুধু কাঁদছিলো আর কিছুই করতে পারছিল না। আস্তে আস্তে ও ছাড়া পাবার, বা পালাবার সব আশা ছেড়ে দিচ্ছিল। সিনেমা অভিনয়ের ভুত ও মাথা থেকে নেবে গেছিলো পুরোদমে।


এইদিকে মিমির ছবি নিয়ে, পুলিশের সাথে ওর বাবা মা নানা জায়গায় ওকে খুঁজছিলেন। একদিন ওরা খবর পেলেন যে অমুক পতিতাপল্লি তে একটি নতুন মেয়ে এসেছে যে মিমির মত দেখতে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সাথে নিয়ে ওর বাবা মা ওখানে গেলেন। অনেক ঝামেলার পর মিমি কে পাওয়া গেলো। মাকে দেখেই ও ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো। ওর অবস্থা দেখে ওর বাবা মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মিমি ও আনন্দে, কষ্টে, শান্তি তে অজ্ঞান হয়ে গেলো। মিমি কে উদ্ধার করেই ওর বাবা মা তড়িঘড়ি প্লেনে করে ওকে কলকাতায় নিয়ে চলে এলেন। এর মাঝে জ্ঞান ফিরে কিন্তু মিমি একদম চুপ হয়ে গেলো।ওর ভুল ও বুঝতে পেরেছে, খুব অপরাধবোধে ভুগতে লাগল। ওর বাবা মাও খুব অনুতপ্ত। ওনারা যদি প্রথম থেকেই একটু শক্ত হাতে ওকে মানুষ করতেন তাহলে ওনাদের আজ এই দিন দেখতে হত না। তত দিনে ওর ঠামিও মারা গেছেন। ধীরে ধীরে মিমি নিজেকে একদম গুটিয়ে নিল। ও সব কিছু থেকে নিজের আসক্তি হারাল।কলকাতায় ফিরে এসে কিছুদিন পরই ও একটি মহিলা আশ্রমে যোগদান করল। ততদিনে ও আঠেরো হয়েছে তাই ওর বাবা মা অনেক চেষ্টা করেও ওকে ফেরাতে পারলেন না। ওনারা অনেক কান্না কাটি করলেন কিন্তু মিমি কিছুতেই ফিরলো না। ও আবার আগের মত জেদ ধরে রইল।


আশ্রমে যোগদান করার কিছুদিন পরই ওই আশ্রম থেকে বদলি নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো মিমি। চিঠি লিখে রেখে গেলো যে ওনারা যেনো ওকে না খোঁজেন, তাহলে ও আত্মহত্যা করবে। বুকে পাথর চেপে একমাত্র মেয়ে কে মৃত মনে করেই থাকতে লাগল ওর বাবা মা। এদিকে, মিমি সুদূর ইউ পি তে ওই আশ্রমের একটি অন্য শাখা তে চলে গেল। সবাই কে অনুরোধ করে গেলো যে কেউ যেন ওর ঠিকানা কাউকে না জানায়। ওর বাবা মা কে ও না। ওখানে গিয়ে কিছুদিন পর মিমি একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিল। এই জন্যই ও বাবা মার থেকে দূরে পালিয়ে গিয়েছিল। ওর মায়ের ছোটবেলার কথাগুলো মনে করে করে ও সম্পূর্ন মনের মত করে ওর মেয়েকে মানুষ করতে লাগলো। ওর করা ভুল গুলো যেন কোনো ভাবেই ওর মেয়ে না করে, আপ্রাণ তাই চেষ্টা করে যেতে লাগল। ওর কাছে ওর বাবা মায়ের খবর আসত, ওর আশ্রমের কলকাতা শাখা থেকে, কিন্তু ওদের কোনো খবর ওর বাবা মা পেতেন না। এই রকম করে মেয়ের আঠেরো বছর হলো। এই বার মিমি ওর মেয়েকে কাছে বসিয়ে আদর করে সব কথা বললো। কিছু গোপন করল না। ওর বাবা যে কে সেটাও সঠিক জানে না, সেটাও মেয়েকে বলল। সব বলার পর মিমি ভয়ে ভয়ে মেয়ের দিকে তাকালো, ও যদি ওকে ঘেন্না করে। কিন্তু ভগবানের অনেক আশীর্বাদে ওর মেয়ে সব কিছু শুনে মা কে জড়িয়ে ধরল। ভাগ্যিস নিষ্ঠা, ওর মেয়ে , ওর মত হয়নি। খুশিতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললো মিমি।


মেয়ের ছুটি পড়লে, আশ্রমে সব জানিয়ে মেয়ে কে নিয়ে কলকাতায় চললো মিমি। দুজনেই চুপ চাপ, অচেনা, অজানা ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল ওরা। পরদিন হাওড়ায় পৌঁছলে, ট্রেন থেকে নেমেই সোজা ট্যাক্সি নিয়ে ওদের বাড়িতে গেলো মিমি। দরজা খুলে দিল যে মাসি, তাকে বললো " মা কে বলো যে মিমি এসেছে" । সন্দেহজনক দৃষ্টি তে ওর দিকে তাকিয়ে মহিলা টি ভেতরে চলে গেল। একটু পরেই মা এলেন দরজায়। ওকে দেখে ওর মা আর থাকতে পারলেন না, এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন ওকে। দুজনেই কেঁদে ফেলল । নিঃশব্দে কিছুক্ষণ একে অন্যের আবেশ নিয়ে,আস্তে আস্তে সরে দাড়ালো মিমি। " মা, এই দেখো আমার মেয়ে নিষ্ঠা। ওকে আমি একদম তোমার মত করে মানুষ করেছি মা। ওকে তোমরা গ্রহণ করো। তোমাদের ইচ্ছে মত আমি যা হতে পারিনি, ওকে সেই ভাবেই মানুষ করেছি "বলে উঠল মিমি। ততক্ষণে ওর বাবা ও এসে গেলেন। ওদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। সব কথা শুনে উনি ও কেঁদে ফেললেন । আজ অনেকদিন পর ওনারা এক সাথে খেলেন , হৈ হৈ করে সময় কাটল ওদের। নিষ্ঠা কে দেখে ওনারা খুব খুশি। সত্যিই মিমি কে যে রকম ভাবে তৈরি করতে চেয়েছিলেন ওনারা, নিষ্ঠা ঠিক সেই রকমই হয়েছে। সুন্দরী, বিদুষী, নম্র ভদ্র। " বাবা, মা দেখো নিষ্ঠা সত্যিই খুব ভাল মেয়ে , ওকে একদম তোমাদের মত করে তৈরি করো। ও কিন্তু নষ্টা না আমার মত, সত্যিই নিষ্ঠা। ওকে তোমাদের কাছে রেখে আমি আবার বিদায় নেব। " বলে উঠল মিমি। হা, হা করে উঠলেন বাবা মা। " আমাকে বাধা দিও না দয়া করে। আমি তো তোমাদের ঠিকানা জানি, মাঝে মাঝেই চলে আসব। আমার নিষ্ঠা কেও দেখে যাবো। তোমরা আমাকে বিদায় দাও। আমি এবার ঈশ্বর সেবায় নিজেকে সমর্পণ করতে চাই ।"অনুরোধ করল মিমি। সবাই মিলে অনেক কান্নাকাটি করল। কিন্তু মিমি কে কিছুতেই আটকানো গেল না, ওর জেদ এর সাথে কেউ কোনোদিন পারেনি। সবার থেকে বিদায় নিয়ে ট্যাক্সি করে স্টেশনের দিকে রওনা দিল মিমি। আজ ও খুব খুশি, ওর চোখে জল কিন্তু মনে শান্তি।