Sunday, December 12, 2021

Poem || You Are With You || Pavel Rahman

 You Are With You



You are not alone, you are with you

So, why are you crying that makes you weak?

You are not weak

If you think, “ I am not weak!”

You are yours best friend in the world.

“ From now, I won’t cry

My best friend is I”

By thinking this, makes you a strong man.


Poem || Namita Basu || Balance queen

 Balance queen




No end with the every begin,

It goes on round over in, 

Stone or water what ever is creating, 

It interact as a balance queen. 

So on on on is echoing with the Nature green, 

I am balance queen, I am the balance queen, 

I am the balance queen. 

গদ্য || মালের কথোপকথন || অরবিন্দ সরকার

 মালের কথোপকথন

              

           


হ্যাঁরে পচা মালের দাম যেভাবে বাড়ছে, বেঁচে থাকাটা দায়। গ্রামের মণ্ডপে পচা ও ভজা কথা বলছে বাঁশের মাচায় ব'সে। পচা বলেই চলেছে কোথায় আর যায় বল্ ভজা ? সর্বত্রই সমানে দাম বেড়েই চলেছে।


ভজা- কে বলেছে যে মালের দাম বেড়েছে? আমি আজকেই সস্তায় মাল নিয়ে এলাম।যে মালের দাম বেড়েছিল নাগালই পেতাম না।এখন ধরাছোঁয়ার মধ্যে রয়েছে। অনেক দাম কমে গেছে।এখন চুল্লুর সমান বিলেতির দাম।মালের দাম কোথায় বেড়েছে ?

পচা-- ও মালের কথা বলিনি আমি। বলেছি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের কথা!


ভজা - মদ কি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়? সবার দরকার , সবাই খায়! না খেলে কি জীবন যন্ত্রনা ভোলা যায়।

পচা -- সে খায় ঠিকই আমরা।ওতে তো পেট ভরে না, শুধু মনটা ভরে। এটা নেশার জিনিস।


ভজা - ভাত খাওয়াও তো নেশা? ও খেলেই ঘুম আসে।তার উপর যদি পচিয়ে ভাত রাখি তো পচাই মাল তৈরি হয়।

পচা - তুই বুঝতে পারছিস না।বাড়ীর মাল মানে মালকিন,এ মাল খেয়ে গেলে জীবনটাকে পয়মাল করে ছাড়বে! বলবে ভাত দেবার মুরোদ নাই এই আমার ভাতার! সারাদিন মাল গিলে আসবে আর আমার দিকে নজর নাই? পরনের কাপড়টা যে ছিঁড়ে গেছে তার ব্যবস্থা নাই? তাই ওসবে না গিয়ে অন্য কথা বল্ ।


ভজা - তুই বলছিলি মালের দাম বেড়েছে? লরিতে পরিবহনে যেসব মালামাল আসে সেগুলোর কথা বলছিলিস তো তুই? আরে আলু বেগুন পটল মূলো শাক সব্জি সবকিছুই মাল। তেমনি মদটাও মাল। বরং যত্ন সহকারে পরিবহনে এ মাল আসে।

সিনেমাওয়ালা সব মালেরা এ মাল খায়। আর শুধু শুধু আমরা যখন খায় তখন চুল্লু বলে।আর ওরা খেলে সেটা মাল হ'য়ে যায়!


পচা - মাল না খেয়েও ঐ পাড়ার নাম মালপাড়া ? মাল জাতির বাস তাই। পুলিশ এসে ঐ মালপাড়ায় আগে তল্লাশি করে মালের খোঁজে।মাল না পেয়ে সুমত্ত মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বলে এই মালটা তো বেশ বটে? তাই মাল পরিবহনে ,জাতিতে, সন্তান সন্ততিতে নাম নিয়ে বেঁচে আছে।


ভজা- চোর চুরি করে আর পুলিশ বলে বামাল সমেত ধরা পড়েছে।ওখানেও বা--মাল!

আবার চৌকিদার হেঁকে হেঁকে বলে সামাল সবে সামাল। মাল সামলাতেও আছে সা-- মাল। আবার খেলার মাঠে ভকাভগ গোল দিয়েছে সে আবার কামাল কামাল রবে বেসামাল।

হায়রে মাল! সর্বত্র বিরাজমান তুমি!


পচা- সে ঠিকই। তোর মনে আছে যখন হামাগুড়ি ছেড়ে তুই বড় হ'লি তখন সবাই বলছে যে দামাল ছেলে! এই দামাল ছেলে নিয়েই তো সব দলে দলে লড়াই।সব দলেই মাল থাকে। আমরা মাল খায় আর ওরা মালশা খায়।


ভজা - হুম এবার মালুম পেলাম।মাতাল বলে বেসামাল নই আমি।কারো পায়ে তেল মালিশ করি না? পরের মালে আমার লোভ নেই। তবে জানি বিষমদ খেয়ে ম'লে বেমালুম লাখ টাকা ঘরে ঢুকবে ! ঘরের মাল রক্ষা করা উচিত এটা ট্যারামালেও বোঝে। নামালে বোঝা শরীর হালকা হয়। তাই বাড়ি গিয়ে মাল চুকিয়ে সন্ন্যাস নেবো।খামালু আর রাখবো না। তুই ও তো পচা মাল!চল্ রুমাল ঝেড়ে ধূলো ময়লা ফেলে নিজ নিজ ঘরে ফিরি।

গদ্য || অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো || সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

 অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো



    দীপাবলি, দীপান্বিতা, শ্যামাপূজা, সিদ্ধেশ্বরী পূজা, যাই হোক না কেন আসলে আলোর উৎসব। মনের কালীমা ঘুচিয়ে আলোর সন্ধান করা। আলো আলো দাও আরও আলো।

     পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে দীপ জ্বালিয়ে যেমন তাঁদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয় তেমন এই আলোর উৎসবে প্রার্থনা করা হয় শক্তির কামনা। শক্তি মানে দুর্বলের ওপর অত্যাচার নয়, দুর্বলকে অশুভ হাতছানি থেকে মুক্ত করার জন্য শক্তির আরাধনা।

    আমরা প্রত্যেকেই মা শক্তির কাছে প্রার্থনা করি আমাদের মনে অশুভ অন্ধকার ঘুচিয়ে যেন শুভ আলোর উদয় হয়। তাই আলোর রোশনাই। এখানেই অন্ধকারের উৎস থেকে আলো উৎসারিত হোক-- এই প্রার্থনা।

  আলো আমার আলো ওগো

    আলোয় ভুবন ভরা

আলো....

গদ্য || স্বপ্নে দেখা কাশ্মীর ভূস্বর্গ || জাহির আব্বাস মল্লিক

 স্বপ্নে দেখা কাশ্মীর ভূস্বর্গ

             



 জীবনের ডাইরিতে লেখা ভালোবাসার পাপড়িগুলি উল্টাতে উল্টাতে,মনের ট্রেনে পাড়ি দিলাম আমাদের দেখা স্বপ্নের কাশ্মীর ভূস্বর্গ।

 যেখানে ছিল গাছহীন ছায়া,তুষারহীন বরফ, আগুন ছাড়া উত্তাপ,দিশাহীন লক্ষ্য, আমিহীন আমি ।

কে তুমি?এখনো রাত দিন শুধু তোমাকেই শুনি, স্বপ্নে শুধু তোমাকেই ছুঁই।

 যেদিন তুমি এসেছিলে হৃদয়ের প্লাটফর্মে,সেদিন থমকে গিয়েছিলো অতীত- বর্তমানের সমস্ত ট্রেন। থমকে গিয়েছিল নদীর স্রোত, সমুদ্রের ঢেউ, আরো কতকিছু।

  কিন্তু আজ শুন্য একলা খামার আশাবাদী,ঘরের বারান্দাটা এখন যেন শূন্য পাখির খাঁচার মতো মাকড়সার জালের কারুকার্য।পুকুরের পাড় এখনো খালি রাস্তার পাশে বসা চেয়ারটাও আজ শুন্য। ফোনের জয়ধ্বনি ও বাজে না আর। দাঁড়িয়ে থাকে না কেউ,দেখেনা কোন পূর্ণিমা।

        আজ বছর কয়েক হল তুমি উঠেছ অন্য নদীর পাড়, তবুও এই নদীতে ঢেউ উঠে চলে, হতে থাকে জোয়ার ভাটা। আর অতীতে দেখা স্বপ্নের ভূস্বর্গ আজও দেখতে ইচ্ছা করে। আজও ভিড় করে আমার হৃদয়ের কল্পনার আকাশে। কিন্তু আজ তুমি আছো আপনজনের সঙ্গে আপনার পাশে।।

নিবন্ধ || তৈমুর খান || লিটিল ম্যাগাজিনের লেখক

 লিটিল ম্যাগাজিনের লেখক



এমন একটা সময়ে আমরা উপস্থিত হয়েছি যে, প্রায় সর্বত্রই 'ফ্যালো কড়ি মাখো তেল' অবস্থা। এই কিছুদিন আগেও অন্তত সাহিত্যের ক্ষেত্রে এরকমটি ছিল না। যদিও আমার প্রথম জীবনে একটা কবিতা ছাপানোর জন্য এক লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদক দশ কপি পত্রিকা গছিয়েছিলেন। সেই বাজারে তার দাম ছিল পঞ্চাশ টাকা। পত্রিকা তো কাউকে দিতেই পারিনি, বিক্রি করার ব্যাপারটা তো আরও কঠিন ছিল। এই পঞ্চাশ টাকার জন্য আমাকে মজুর খাটতে হয়েছিল। কিন্তু সেই অবস্থার মধ্যে আর বেশিদিন থাকতে হয়নি।

      ইদানীং একটি বিষয় লক্ষ করছি, পত্রিকায় লেখা চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন কোনো সম্পাদক বা কোনো প্রকাশন। এসব যে কোনো নামকরা সংস্থা বা ব্যক্তি তা কিন্তু নন। তবে কয়েকটি ঐতিহ্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও এই পন্থা অবলম্বন করেছে। কবিতা বা গল্প-প্রবন্ধের পংক্তি সংখ্যা এবং শব্দ সংখ্যা উল্লেখ করে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। বিজ্ঞাপনের ওপর ভিত্তি করে যেকোনো লেখক লেখা পাঠালেই ইমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপ মারফত ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নাম্বার চলে আসছে এবং একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠানোর আবেদন জানাচ্ছে। কখনো কখনো এই টাকার পরিমাণটা এত বেশি যে লিখতে আসা তরুণ-তরুণীর বেশ কয়েকবার ঢোক গিলতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে: পত্রিকার দাম এবং ডাক খরচের জন্য নেওয়া হচ্ছে। কারণ পত্রিকা বা সংকলন এবং সার্টিফিকেট একইসঙ্গে পাঠানো হবে। নিরুপায় কবি-লেখকটি কখনো কখনো টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কেন হচ্ছেন তা জানি না। এই পত্রিকা বা সংকলন এবং সার্টিফিকেট তাঁর কোন কাজে লাগবে সেকথাও হয়তো চিন্তা করেন না। তাঁর সৃষ্টিকে সকলের দৃষ্টিগোচর করার আবেগ হয়তো এই কাজে তাঁকে চালিত করে। কিন্তু উক্ত পত্রিকায় বা সংকলনে লিখে কয়জনেরই বা দৃষ্টিগোচর হবেন? এই পত্রিকা বা সংকলন যাঁরা করেন তাঁরা সেই কয়জনেরই করেন, যাঁরা টাকা দেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই এইসব সংকলনের মান উন্নত হয় না। লেখা দেখেও নির্বাচন করেন না। শুধুমাত্র টাকা দিলেই এসব পত্রিকায় লেখা যায়।

     এইরকমই অবস্থা হয়েছে কলকাতার নামকরা কলেজ স্ট্রিটের বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যপূর্ণ পত্রিকারও। একবার একটা পত্রিকায় লেখা পাঠিয়ে ভেবেছি হয়তো প্রকাশিত হবে না। কিন্তু আশ্চর্য কয়েকদিন পরেই সম্পাদক ফোন করে বললেন: 'এই নাম্বারে মোবাইল রিচার্জের জন্য তিনশো টাকা ভরে দিতে হবে তবেই আপনার লেখাটি পত্রিকায় প্রকাশিত হবে।' পত্রিকার যিনি সম্পাদক তিনি একজন সাহিত্যিকও। ফোনটি পেয়ে অনেকক্ষণ থ হয়ে বসে থেকেছি। সাহিত্যজগৎ যে অন্ধকারের জগৎ, দালালের জগৎ পরবর্তী সময়ে আরও গভীরভাবে টের পেয়েছি। লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় লেখক কপি আনতে গিয়ে কয়েকটি জায়গায় তা সম্মানের সঙ্গে বিনা পয়সায় পেলেও বেশিরভাগ জায়গায় টাকা দিয়ে কিনতে হয়। দীর্ঘদিন সাহিত্যজগতে থেকেও যদি সত্যিই টাকা দিয়ে ম্যাগাজিনে লিখতে হয় এবং টাকা দিয়ে লেখক কপি কিনে নিতে হয়, তাহলে সেরকম লেখক হওয়ার কি কোনো মূল্য আছে? হয়তো অনেকেই বলবেন লিটিল ম্যাগাজিনগুলিকে প্রত্যেকের সহায়তা করা দরকার। কিন্তু একজন লেখক খুব কম করে গোটা দশেক পত্রিকায় গোটা দশেক কবিতা লিখে যদি অর্থ প্রদান করেন, তাহলে তাঁর সাংসারিক জীবনেও টানাপোড়েন আসতে পারে। সব লেখকেরই অর্থ দেবার সামর্থ্যও থাকে না। যদি সম্পাদকগণ লেখকদের সম্মান জানাতে না পারেন, পত্রিকার সৌজন্য কপি দিতে না পারেন, তাহলে আমি মনে করি পত্রিকা না করাই অনেক ভালো। কেননা মনে রাখা দরকার লিটিল ম্যাগাজিন কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নয়, সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য প্রেরণা স্বরূপ। এই প্রেরণা কি টাকা দিয়ে কেনা যায়? অথবা এই প্রেরণা কি টাকা নিয়ে বিক্রি করা যায়?

    কিন্তু বর্তমানে তাই হচ্ছে। এবছর বিজ্ঞাপন দেখে এই বিষয়টি যাচাই করার জন্যই বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ছোটখাটো দু একটা করে কবিতা পাঠাই। প্রায় সব কবিতাগুলোই সম্পাদকগণ চোখ বুজে নির্বাচন করেছেন। আর সঙ্গে সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ অথবা ই-মেইলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাম্বার পাঠিয়ে দিয়েছেন এবং টাকা পাঠাবার আবেদন জানিয়েছেন। না, আশ্চর্য হইনি; বর্তমানে প্রকাশকেরা যেমন টাকা নিয়ে কয়েক কপি বই ছাপিয়ে লেখককে গছিয়ে দিচ্ছেন, ঠিক তেমনি টাকা নিয়ে লেখা ছাপিয়ে পত্রিকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বইয়ের বা লেখার সাহিত্য মূল্য কতখানি, বা লেখার মান উন্নত কিনা, বা প্রকৃত সাহিত্যমূল্যে লেখাটির উত্তরণ ঘটেছে কিনা সে বিচার করার তাদের যেমন ক্ষমতা নেই, তেমনি দায়ও নেই। বই বা পত্রিকা প্রকাশ করাটাকেই এখন লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছেন। ফলে নিরপেক্ষ সাহিত্যবোধসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি প্রকৃত প্রতিভাবান সাহিত্যিকও হারিয়ে যাচ্ছেন গড্ডলিকা প্রবাহে। পাঠকরাও প্রকৃত সাহিত্যবিচারে অগ্রসর হচ্ছেন না। গতানুগতিক দায়সারা গোছের মন্তব্য বা মূল্যায়নে তাঁরা প্রবৃত্ত হয়েছেন। অবশ্যই এর ব্যতিক্রমও আছে, কিন্তু তা দূরবিন দিয়ে দেখতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানগুলি সাহিত্যের মূল্য দেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারাও আর বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারছেন না। কেননা তাদের কাছেও সাহিত্যচর্চাকারীরা ঝাঁকের কই। শক্তিধর অথবা দুর্বল সবই সমান বলে গণ্য হচ্ছেন। হয়তো-বা বহুদিন অপেক্ষা করার পর, হয়তো-বা মৃত্যুরও পর তাঁর মূল্যায়ন হচ্ছে। অবশ্য জীবনানন্দ দাশের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

       টাকা নিয়ে সংকলন বা ম্যাগাজিন প্রকাশ করে যেমন শাশ্বত বা ব্যতিক্রমী সাহিত্যের ধারাকে উজ্জীবিত করা যায় না, বা সাহিত্যিককে প্রেরণা দেওয়াও যায় না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বর্তমানে এই প্রবাহটা এমনই জোর শক্তি ধারণ করেছে যে একে নিবারণ করার কোনো উপায় নেই। প্রকাশকদের উচিত ছিল, প্রতিভাবান সাহিত্যিকদের খুঁজে খুঁজে বের করা এবং বিনা পয়সায় তাঁদের বই প্রকাশ করা। কিন্তু সেই চলটা প্রায় উঠে গেল। এখন পত্রিকায় লিখতে গেলেও টাকা লাগে, বই প্রকাশ করতে গেলেও টাকা লাগে। আবার সেসব বই বিনা পয়সায় দিতে হয়। তরুণ লেখকদের বই ক্রয় করার মানুষ কম। কম হবেই না বা কেন, তিনি তো আর নামকরা প্রতিষ্ঠানের লেখক নন! কোনো নামকরা ম্যাগাজিনেও লিখেননি। সুতরাং তাঁকে ঘোষণা করতে হয়: 'আমি কবি! আমি লেখক! এই আমার প্রথম কাব্য!' এতে তাঁর দোষ কী! বাজার ভর্তি এত ব্যবসায়ী, এত ঠক জোচ্চোর! তিনি কার কাছেই বা দাঁড়াবেন! কেই-বা তাঁর বই প্রকাশ করবে! কেই-বা নিরপেক্ষ বিচার করবে তাঁর লেখা নিয়ে! সেই সুযোগ তাঁর সামনে যখন নেই, তখন নিজেকে নিজেই কবি বলতে বাধ্য হন। নিজেকে নিজেই লেখক হিসেবে প্রচার করেন। টাকা দিয়ে বই করেছি এই অহংকারও তাঁকে লজ্জানত হতে দেয় না।

        অবশ্য টাকা দিয়ে বই ছাপানোটির মধ্যে বাধ্যবাধকতা থাকলেও টাকা দিয়ে পত্রিকায় লেখা ছাপানোর ঘোর বিরোধিতা করছি। কেননা উক্ত পত্রিকাগুলি সাহিত্যের মূল্যমান নির্ধারণ করে না। খুব নিম্নশ্রেণির এবং নিম্নরুচির বালখিল্য লেখা নিয়ে সেগুলি প্রকাশিত হয়। কলেবরে বৃহৎ হলেও এবং প্রচ্ছদে চাকচিক্য থাকলেও, ভেতরের প্রতিটি পৃষ্ঠাকে মনে হয় লেখকরা কলুষিত করেছেন। লেখার পরিসংখ্যান এবং লেখকেরের পরিসংখ্যান দেখে অনুমান করা হয় দেশের বুদ্ধিজীবী রুচিবোধসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। যাঁরা সাহিত্যিক হন, তাঁরা ভালো পাঠকও হন। কিন্তু এই সব পত্রিকায় লেখা দেখে বোঝা যায়, যেন আমরা কয়েকশো বছর পেছনে সভ্যতার অক্ষর-পরিচয়ের যুগে ফিরে গেছি। সাম্প্রতিককালের সাহিত্যের বাঁকবদল, নতুন পথের ধারণা এঁদের একেবারেই নেই। সুতরাং এঁদের লেখা না ছাপালেও সাহিত্যের কোনো ক্ষতি হত না। বরং ছাপিয়েই সাহিত্যের স্তূপ তৈরি করা হলো। এদিকে প্রকাশক-সম্পাদকদের ব্যবসার বাজারও তৈরি হলো।

      পত্রিকায় লেখা পাঠানোর বিজ্ঞাপন দেখে লেখা না পাঠানোই উচিত বলে মনে করি। কারণ লেখা পাঠিয়ে, টাকা দিয়ে লেখা ছাপিয়ে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কয়েকবার নিজের শখ পূরণ করা যায় মাত্র। কিন্তু বারংবার এই ধারা চলতে থাকলে লেখক মানসিক রোগীতে পরিণত হবেন। সাংসারিক জীবনেও টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। অবশ্য যেসব পত্রিকায় টাকা লাগে না, সেসব পত্রিকায় লেখা দেওয়া যেতে পারে। তবে এমন কয়েকটি পত্রিকাও আছে যারা লেখা ছাপলে লেখককে সাম্মানিক প্রদান করেন। সংখ্যায় কম হলেও তাদের অস্তিত্ব এখনো বিলীন হয়ে যায়নি। লেখা যেতে পারে সেসব পত্রিকায়ও। বেশকিছু নেট ম্যাগাজিন সগৌরবে প্রকাশিত হচ্ছে, যাদের কাছে কবিকে টাকা দিতে হয় না। সেসব ম্যাগাজিনেও লেখা দেওয়া যেতে পারে। একটা কথাই শুধু বলতে চাই, টাকা দিয়ে বই কেনা ভালো, কিন্তু টাকা দিয়ে লেখা ছাপানো যে নিজেকে মূল্যহীন করা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রবন্ধ || বিপন্ন ভাষা || শিবাশিস মুখোপাধ্যায়

 বিপন্ন ভাষা 



বিশ্বজুড়ে, ভাষা মারা যাচ্ছে। যারা রয়ে গেছে তাদের অনেকেই বিলুপ্তির পথে। না, আমরা উদ্ভিদ ও প্রাণীর কথা বলছি না। আমরা ভাষা সম্পর্কে কথা বলছি। এই ভাষা গুলিকে সংরক্ষিত করার জন্যে স্বাধীনোত্তর যুগে কিছু কথা বলি-

ভাষা কেন বিপন্ন হচ্ছে?

ভাষা বিপন্ন হওয়ার পেছনে বিশ্বায়ন একটি প্রধান ফ্যাক্টর। যেহেতু ব্যবসা বৃহত্তর পরিসরে করা হয়, আঞ্চলিক ভাষাগুলি আর ততটা উপযোগী নয় এবং তাই জনপ্রিয়তা থেকে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষায় আরও প্রচলিত ভাষার আধিপত্য আরেকটি কারণ যা বিশ্বায়নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যেহেতু ভাষা যোগাযোগের একটি মাধ্যম, তাই অনেক স্কুল আর স্থানীয় ভাষা শেখায় না কারণ সেগুলিকে সাধারণ ভাষার তুলনায় কম উপযোগী বলে মনে করা হয়।

উদ্ভূত ভাষা সংরক্ষণ এবং আদিবাসী ভাষাগুলির পুনরুজ্জীবনের জন্য কী করা হচ্ছে?

বিপন্ন ভাষার জন্য ডকুমেন্টেশন, সুরক্ষা এবং বিপন্ন ভাষার প্রচার সমর্থন করে। পণ্ডিতরা জানেন যে এই ভাষাগুলি পৃথিবীর মুখ থেকে অদৃশ্য হওয়ার আগে তাদের রেকর্ড এবং বিশ্লেষণ করতে হবে। যেহেতু বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভাষার লেখার ব্যবস্থা আছে, একবার এই ভাষাগুলি বিলুপ্ত হয়ে গেলে, আমাদের কাছে সেগুলি এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোনও রেকর্ড থাকবে না এবং বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যে ভাষাগুলিকে সংরক্ষণ করা যায় না, সেগুলিকে এখনও বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যারা অধ্যয়ন করতে বা পুনরুজ্জীবিত করতে চায় তাদের জন্য নথিভুক্ত করা সম্ভব। অনেক ভাষা আগামী কয়েক দশকের মধ্যে আংশিক বা সম্পূর্ণ বিলুপ্তির সম্মুখীন হবে। এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায়, ভাষাবিজ্ঞান ধীরে ধীরে ভাষাগুলিকে শুধুমাত্র অধ্যয়নের বস্তু হিসাবে বিবেচনা করা থেকে পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের দিকে সরে যাচ্ছে। সম্পর্কিত ক্রিয়াকলাপগুলির মধ্যে একটি হুমকির সম্মুখীন হয়ে ভাষার পরিস্থিতির মূল্যায়ন, এর বিপন্নতা বা মৃত্যুর কারণ অধ্যয়ন, ভাষার সক্রিয়তা, ভাষার ডকুমেন্টেশন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, তাদের পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টায় স্থানীয় ভাষাভাষীদের সাথে সরাসরি সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। ভাষার অবক্ষয় রোধে কী করা হয়েছে তা উপস্থাপন করার জন্য এবং কিছু ভাষা কেন টিকে আছে এবং অন্যদের ব্যাখ্যা করার জন্য অসংখ্য গবেষণা করা হয়েছে। ভাষা পুনরুজ্জীবনের জন্য, এইভাবে, শিক্ষা, ভাষা অর্জন, শিক্ষাবিদ্যা, ভাষা শিক্ষার পদ্ধতি, ভাষা ডকুমেন্টেশন এবং ভাষাতত্ত্বের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্র এবং শাখা থেকে জ্ঞান এবং দক্ষতার প্রয়োজন। ভাষার পুনরুজ্জীবন এমন একটি ভাষার পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত দেয় যার আর কোনো জীবিত বক্তা নেই, কিন্তু সেটিকে পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং ব্যবহারে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ভাষা রক্ষণাবেক্ষণের গবেষণা ভাষা পরিবর্তনের ধারণার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত; অতএব, এটি প্রায়শই কার্যকরী ক্ষেত্রগুলির সনাক্তকরণের মাধ্যমে পরিচালিত হয় যেখানে ভাষাটি আর ব্যবহার করা হয় না, বা যেখানে এটি ধীরে ধীরে অন্য দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। পুনরুজ্জীবনের প্রাথমিক লক্ষ্য হল ভাষাটি যারা জানেন না তাদের কাছে প্রেরণ করা এবং ভাষা ব্যবহারকারী এবং শিক্ষার্থী উভয়কেই বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এটিকে কাজে লাগাতে উৎসাহিত করা। 

 

ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া

ভাষার ডকুমেন্টেশনের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে: ডেটা সংগ্রহ করা (রেকর্ডিং, ছবি তোলা, লিখিত নথি সংগ্রহ করা ইত্যাদি), ডেটা প্রক্রিয়াকরণ (সিস্টেমেটাইজিং, ট্রান্সক্রিবিং, অনুবাদ, বিশ্লেষণ, ইত্যাদি) এবং ডেটা সংরক্ষণ (সংরক্ষণ)। এই উপাদানগুলিকে তিনটি ধারাবাহিক পদক্ষেপ হিসাবে ভাবা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথমে আমরা শব্দগুলি রেকর্ড করি, তারপরে আমরা সেগুলি অনুবাদ এবং বিশ্লেষণ করি এবং ফলাফল, উদাহরণস্বরূপ একটি শব্দ তালিকা বা একটি ছোট অভিধানের আকারে, মুদ্রণ বা বৈদ্যুতিন আকারে সংরক্ষণ করা হয়। যাইহোক, তিনটি ধাপ আরও জড়িত। ওভারল্যাপিং হতে পারে - উদাহরণস্বরূপ, কথ্য ডেটা প্রতিলিপি করা (লেখা) ডেটা সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াকরণ উভয় ক্ষেত্রেই একটি উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে, এমনকি এক ধরনের সংরক্ষণাগার হিসাবেও। তবুও, তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত হয়। উৎস/কাঁচা ডেটার একই সেট, সঠিকভাবে তৈরি করা হলে, গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন ধরণের বিশ্লেষণের জন্য একটি সম্পদ হিসাবে কাজ করতে পারে যেমন: ভাষাবিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস বা ভূগোল। গবেষকদের মধ্যে একজন সাধারণ ভাষাগত বৈশিষ্ট্যগুলি (যেমন ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য) সন্ধান করতে পারেন, অন্যজন উপাদান দ্বারা প্রতিফলিত সামাজিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহী হবেন (যেমন একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে বক্তাদের কাজ এবং ভূমিকা)। তারা বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করবে, কিন্তু ডেটার একই সেট ব্যবহার করবে। 

মানুষের পরিচয় ও সংস্কৃতি তাদের ভাষার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিটি ভাষা অনন্য। বিপন্ন ভাষার মধ্যে কী লুকিয়ে আছে তা কেউ জানে না। আমরা হয়তো কখনই সেসব সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারি না যাদের ভাষা হারিয়ে গেছে। এবং আজ আমরা যে ভাষার ক্ষতির মুখোমুখি হই সেখানে দেখতে হবে যে আমরা মানব সংস্কৃতি, মানবিক জ্ঞান এবং ভাষার প্রকৃতি সম্পর্কে কতটা শিখতে পারি।


গল্প || আমি পাহাড়িয়া মেয়ে || নীতা কবি মুখার্জী

আমি পাহাড়িয়া মেয়ে



আমি ধনিয়া। কাশ্মিরের পাহাড়িয়া অঞ্চলের একটা ছোট্ট পার্বত্য-গ্ৰামের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। বাবা রামহরিহর দাস, মা লছমী। দুটো ছোট ভাই আছে সুকুর আর মুকুর। কষ্টের স্ংসার, কোনো রকম দিনগত পাপক্ষয় করে চলে যায়। বাবা সামনের একটা টুরিষ্ট লজে কেয়ারটেকারের কাজ করে। আমি তাদের একমাত্র মেয়ে,তাতে বড় মেয়ে । তাই শত অভাবের মধ্যেও আদর সোহাগের কোনো কমই ছিলো না। বাড়ীতে অনেক গুলি ছাগল ছিল। পাহাড়ী জঙ্গলে ঘাস কেটে, পাহাড়ী ঝর্ণা থেকে জল এনে দিয়ে, হাসতে খেলতে ধীরে ধীরে শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণ করলাম। গ্ৰামের সরকারী স্কুলে কাজ চালানো মতো কিছু শিক্ষাদীক্ষাও পেটে গেল। অভাবের তাড়নায় আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। এখন মাঝে মাঝে বাবার জন্য খাবার নিয়ে টুরিষ্ট লজে দিয়ে আসি। বন্ধু-বান্ধবীরা প্রায়ই ঠাট্টার-ছলে বলে এই বেশী লজের দিকে যাস না। তুই খুব সুন্দরী হয়েছিস একেবারে কাশ্মীরের লাল আপেলের মতো। শহুরে বাবুদের প্রেমে পড়ে রাবি। আমি এসব শুনে লজ্জায় লাল হয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে একা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ওদের কথাগুলো মনে করে খুব খুশি হয়ে ভাবতাম কবে যে আসবে আমার স্বপ্নের রাজপুত্র, আপন করে, নিবিড় করে ভালোবাসবে।


ভাবতে ভাবতে একদিন যেন সত্যি হলো ভাবনা। বিজয় চৌধুরী নামে এক শহুরে বাবু নির্জনে ছুটি কাটাতে এলেন আমার বাবার টুরিষ্ট লজে। একদিন আমি খাবার নিয়ে যাচ্ছি, উনি গাড়ী নিয়ে বেরোচ্ছিলেন। হঠাৎ আমি তার গাড়ীর সামনে এসে পড়াতে তিনি ভীষন বিরক্ত হয়ে আমাকে এই মারি কি সেই মারি করে তেড়ে এলেন। আমিও পাহাড়িয়া গ্ৰামের সাহসী মেয়ে। ওসব চোখ রাঙ্গানির ধার না ধেরে দু-চার কথা শুনিয়ে দিলাম। ধীরে ধীরে প্রথমে রাগারাগি, তারপর চোখা, তারপর নাম জানতে চাওয়া, একটু একটু ভালো লাগা হতে হতে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের বশবর্তী হয়ে আমরা দু'জনের এতো কাছে এসে গেলাম যে একে অপরকে ছাড়া বাঁচতে পারার কথা ভাবতে পারলাম না। কিশোরীর প্রেম তো অল্পেই বিশ্বাস, অল্পেই খুশী। ঐ বয়সে মেয়েরা কিছুটা বোকা, কিছুটা আবেগপ্রবণ থাকে। হিতাহিত জ্ঞান অনেক কম। একদিন সেই বাবু জোরে হ্যাঁচকা মেরে আমাকে বুকের মধ্যে টেনে স্বপ্নালু চোখে আমার দিকে অপলক চেয়ে রইল, কিছুক্ষণ পর আমায় বিয়ে করবে? আমি তোমায় ছাড়া বাঁচতে পারব না গো। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চুপ করে রইলাম। সেদিনই সন্ধ্যায় দূরে টিলার উপরে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে গলায় মালা দিলো, সিঁদুর পরালো, ফুলশয্যাও হয়ে গেল। এভাবে প্রায় এক মাস পর তার বাবার হার্ট অ্যাটাকের খবর এলো। ও আমাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলো যে ওর সাথে আমার এখনি যাওয়া সম্ভব নয়। আমি গিয়ে সমস্ত বন্দোবস্ত করে তোমাকে নিয়ে যাবো, তোমাকে নিয়ে আলাদা এবং সম্পূর্ণ নিরালায় ঘর বাঁধবো যেখানে থাকবে শুধু তুমি আর আমি। আর কেউ না। সে জেনে গেল যে আমি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। চোখের জলে বিদায় দিলাম। বলেছিল কিছুদিন কষ্ট করে অপেক্ষা করতে। সেদিন বুঝিনি এ অপেক্ষা সীমাহীন, অন্তহীন। আজও পথের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি, কোলের খোকাকে বলি , দেখবি একদিন ঠিক এই পথে তোর বাবা আসবেন, তোকে আদর করবেন, আমাকে....


মা আর ছেলে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি পথপানে চেয়ে....



অনুগল্প || অশনি বার্তা || বিমান প্রামানিক

  অশনি বার্তা



গ্রীষ্মের রাত, তখন এগারোটা হবে হয়তো। গ্রামের ধারে রাস্তায় বসে আছি আমি আর দুই বন্ধু। ঠিক আমরা গরমের অস্বস্তির মধ্যেই,আর হঠাৎ শুনতে পেলাম সেই পতিত নির্জন বাড়ি থেকে এক মেয়ের চিৎকার। শুনেই মানিক আমাকে কান খাড়া করতে বলল, আমি মনযোগ দিতেই নিশ্চিত বুঝতে পারলাম কান্নার চিৎকার নয়। ঠিক কোনো এক মেয়ে একদল শয়তানের খপ্পরে পড়েছে। আমি ভীষণ চিৎকারে ডাক ছাড়লাম। তারপর সব নিস্তব্ধ। ঠিক মিনিট পাঁচেক পর জানালা খুলে আলো বেড়িয়ে এলো। আমরা হতবাক! আলোর রশ্মি এখানে? ঠিক তারপরেই একটা দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সাদা কাপড় ঢাকা একটা দেহ।তিনজনেই নির্বাক, কে এই মেয়ে? ওরা কারা?

গল্প || ইন্দিরা গাঙ্গুলি || কৃপটে বুড়ো

কৃপটে বুড়ো 





হারাধন খুঁড়োর মতোন কৃপটে বুড়ো ভূ ভারতে পাওয়া যাবে না। হারাধন খুঁড়ো রেলে চাকরি করতো। বরাবরই খুব হিসেবী লোক। হারাধনের বাবা, মা,মারা যাবার পরে একাই থাকতো হারাধন। তখন হারাধনের তিরিশ বছর বয়স ছিলো যখন হারাধনের বাবা, মা দুজনেই পথ দূঃঘটনায় মারা গিয়েছিল। পাড়ার ই একটি মেয়ের সাথে বিয়ের ঠিক হয়ে গিয়েছিল তখন হারাধনের। বাবা, মা কে নিয়ে একটা বিয়ে বাড়ি গিয়েছিল হারাধন। হারাধনের মাসির মেয়ের বিয়ে ছিলো। বিয়ে বাড়ি থেকে বাড়ি ফিরছিলো ওরা। একটা অটো করে ফিরছিলো। হঠাৎ একটা মালবাহী লড়ি ধাক্কা মারে অটোতে। পুরো অটো টাই উলটে যায়। আশেপাশের লোকজন ছুটে এসে ওদের হাসপাতালে ভর্তি করেছিলো। হারাধনের হাতে, পায়ে চোট লেগেছিল। হারাধনের বাবা স্পটে ই মারা গিয়েছিল। হারাধনের মা হাসপাতালে ভর্তি হবার ঘন্টা খানের পরে মারা গিয়েছিল। অটোর চালক ও মারা গিয়েছিল। সেই থেকে একা হারাধন। পাড়ার সেই মেয়ে টির সাথে ই বিয়ে হয়েছিলো হারাধনের। হারাধন আর মীরা সুখে শান্তিতে সংসার করছিলো। বিয়ের পরে বছর খানেক বেশ ভালো ই কেটেছিলো। কিন্তু বিধিবাম। হারাধনের কপাল টা-ই খারাপ। বিয়ের বছর খানেক পরে ই মীরা অসুস্থ হয়ে পরে। মাঝে মাঝেই মীরার জ্বর আসতো। হারাধন জ্বরের ওষুধ কিনে আনতো দোকান থেকে। ওষুধ খেয়ে সাময়িক কমতো মীরার জ্বর। কিন্তু আবার পরের দিন সকালে জ্বর আসতো। হারাধন টাকা খরচার ভয়ে ডাক্তার দেখাতো না মীরাকে। এ-ই ভাবে মীরা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো। বাধ্য হয়ে হারাধন মীরা কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো। ডাক্তার মীরাকে ভালো করে পরীক্ষা করে তিন রকম ওষুধ লিখে দিলো। হারাধনের অনেক গুলো টাকা খরচা হয়ে গেলো সেদিন। ডাক্তারের ফিস ২০০ টাকা, তার উপর ওষুধ কেনার খরচা। হারাধনের গা জ্বালা করছিলো। ডাক্তারখানা থেকে বাড়ি ফিরে হারাধন মীরা কে বলেছিলো ঃ " আজকে অনেক গুলো টাকা খরচা হয়ে গেলো। ওষুধ যেগুলো কিনেছি সবগুলো একটা করে খাওয়ার কোনো দরকার নেই। আমি ওষুধ গুলো মাঝখান থেকে ভেঙে ভেঙে দেবো। তাহলে চারদিনের ওষুধ আট দিন চলবে। " মীরা বলেছিলো ঃ " তুমি যা ভালো মনে করো । আজকে আমার জন্য তোমার অনেক টাকা খরচা হয়ে গেলো। " হারাধন মীরার এ-ই কথার কোনো উত্তর দেয় না। ওষুধ গুলো দুই ভাগ করে রাখে। মীরা স্বামীর কথা মতো ই ওষুধ খেতো। কিন্তু সবকিছুর একটা নিয়ম আছে। মীরার শরীর খারাপ হতে লাগলো দিন দিন। একদিন দূপূরে সব শেষ হয়ে গেলো। হারাধন তখন অফিসে ছিলো। বাড়ি ফিরে দেখলো মীরা ঘুমাচ্ছে। অনেক ডাকাডাকি করে ও সারা না পেয়ে পাড়ার লোকজন কে ডাকে। শেষে পাড়ার লোকেরা ই ডাক্তার ডেকে আনে। ডাক্তার দেখে বলে মীরা ঘন্টা খানের আগেই মারা গেছে। ডাক্তার এসে দেখেছিলো সামনের টেবিলের উপর টুকরো করা ওষুধ পরে আছে। হারাধনের কাছে সব কথা শুনে ডাক্তার বলেছিলো ঃ " এটা আপনি কি করেছেন? ওষুধ গুলো টুকরো করে খাইয়েছেন? যার ফলে ওনার মৃত্যু হয়েছে। " তারপর থেকে হারাধন সম্পূর্ণ একা। এখন হারাধনের অনেক বয়স হয়ে গেছে। এবার সওর বছরে পা দিলো হারাধন। রিটায়ার্ড করার পরে সব সময় বাড়িতে ই থাকে। বাড়ির সামনে একটা বাগান করেছে হারাধন। একবার পাড়ার ছেলে রা এসে হারাধনের কাছে সরস্বতী পূজোর চাঁদা চেয়েছিলো। হারাধন ওদের বলেছিলো ঃ " ওরে হা হাফাতের দল। তোরা পূজো করবি কর না। আমি কেন চাঁদা দিতে যাবো? " কালু বলেছিলো ঃ " হারাধন খুঁড়ো অন্তত দশটা টাকা দাও। বেশি দিতে হবে না। " হারাধন ওদের দিকে ঘরের কোনে রাখা মুড়ো ঝাটা ছুড়ে মেরেছিলো। ওরা ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল ওখান থেকে। ওদের মধ্যে সবচেয়ে চালাক ছিলো লালু। লালু সবাই কে বলেছিলো ঃ " ও-ই কৃপটে বুড়োর থেকে আমি টাকা বার করবো। তোরা দেখ আমি কি করি? " কালু বলেছিলো ঃ " কি করবি তুই? " লালু বলেছিলো ঃ " সেটা তোরা কালকে জানতে পারবি। " পরের দিন সকালে কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে সবাই অবাক। কাগজে পাএ চাই বিজ্ঞাপনে হারাধনের নাম দেখে সবাই অবাক হয়ে গেলো। হারাধন নিজের বিয়ের জন্য ভালো পাএী চায়। হারাধনের বাড়িতে একজন ঘটক এসে হাজির হলো। হারাধন বলেছিলো ঃ " আমি কাগজে কোনো বিজ্ঞাপন দিই নি। কেউ বদমায়েশি করেছে। " ঘটক বলেছিলো ঃ " কেউ কেন এরকম করবে? আপনি কি লজ্জা পাচ্ছেন? খুব ভালো একটা মেয়ের সন্ধান আছে আমার কাছে। " হারাধনের তখন মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে ঘটকে বিদায় করেছিলো হারাধন সেদিন। পরের দিন সন্ধে বেলায় হারাধন উনুন ধরাচ্ছিল। সেই সময় দরজায় ঠকঠক আওয়াজে দরজা খুললো হারাধন। হারাধন দেখলো একজন লোক আর একটা মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। লোক টি বলেছিলো ঃ " নমস্কার। আমি পাশের পাড়ার থেকে এসেছি। একটু কথা বলতে চাই আপনার সাথে। " হারাধন ওদের ঘরে এসে বসতে বলেছিলো। লোক টি ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসে পাশের চেয়ারে মেয়ে টি কে বসতে বলেছিলো। লোক টি একটা খবরের কাগজ দেখিয়ে বলেছিলো ঃ " আপনি কি পাএ? আমি কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে ই এসেছি। " হারাধন বলেছিলো ঃ " এ-ই বিজ্ঞাপন আমি দিই নি। কেউ আমার নামে মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়েছে। বিয়ে আমি করবো না আর। আপনারা এখন যেতে পারেন। নমস্কার। " লোক টি বলেছিলো ঃ " কিন্তু আপনার এই কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে? আমার মতে আপনার বিয়ে করাই উচিত। নইলে আপনাকে অনেকে বিরক্ত করবে। আমার মেয়ের স্বামী মারা গেছে এক বছর আগে। আপনি যদি ওকে বিয়ে করেন? " হারাধন ভাবলো সত্যি ই তো বিজ্ঞাপন থেকে বাঁচতে গেলে বিয়ে করতেই হবে। মেয়ে টি ও দেখতে বেশ ভালো। হারাধন বলেছিলো ঃ " ঠিক আছে । আমি রাজি। " লোক টি বলেছিলো ঃ " কাল রাতে একটা শুভ লগ্ন আছে। কালই মন্দিরে বিয়ে হয়ে যাবে। আমি সবকিছুই ঠিক করে রেখেছি। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। আমি মেয়ে কে নিয়ে রাতের বেলা তোমার বাড়ি চলে আসবো। তারপর একসঙ্গে মন্দিরে যাওয়া যাবে। " হারাধন কাউকে কিছু না বললেও পাড়ার মন্দিরের পুরোহিতের কাছ থেকে লালু খবর পেয়ে গেলো। পরের দিন রাতে কালু আর লালু হারাধনের বাড়ি গিয়ে কারো কান্না কাটির আওয়াজে হারাধনের ঘরে ঢুকে দেখলো হারাধনের হাত,পা দড়ি দিয়ে বাঁধা আছে খাটের সঙ্গে। দুজন লোক আলমারি খুলে টাকা বার করছে। কালু লোক দুটো কে দেখে চিৎকার করে উঠলো ঃ " এ-ই তোমরা কে? খুঁড়ো কে বেঁধে রেখেছো কেন? পালাও তাড়াতাড়ি। নইলে পুলিশ ডাকবো। " পুলিশের কথা শুনে ওরা ভয়ে ওখান থেকে পালিয়ে গেলো। লালু হারাধনের হাতে, পায়ের দড়ি খুলে দিলো। কালু বলেছিলো ঃ " হারাধন খুঁড়ো আমাকে মাপ করে দাও। আমি ই তোমাকে জব্দ করার জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম। " হারাধন বলেছিলো ঃ " তোরা আজকে আমার অনেক উপকার করলি। আমি সরস্বতী পূজোর চাঁদা দেবো। পাঁচশ টাকা নিয়ে যা। " তারপর থেকে হারাধন আর কৃপটেমী করে নি কোনো দিন ও।

গল্প || ছায়াসঙ্গী || বর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

 ছায়াসঙ্গী




বেশ কয় কাপ চা খাওয়ার পরেও রাজার মাথাটা কিন্তু এখনো ঝিমঝিম করেই যাচ্ছে ,আর হবে নাই বা কেন ? সেই কোন ভোরে ইমার্জেন্সী ডিউটি ধরেছে সারাদিন সারারাত ধরে কাজ করেই যাচ্ছে...

তবে এটা ওর নিত্য দিনের না হলেও মাসে তিন চারবার হয়ে থাকে;কি করা যায় নিম্নবিত্ত পরিবারের একমাত্র রোজগেরে মাথা, তাকে মাথার ব্যামো নিয়েও কাজ করে যেতে হবে 

-রামসিং দেখতো মেশিনের কালি দিতে লাগবে মনে হচ্ছে 

-জি দাদা বাবু

-বুঝলে রামসিং এই সকাল থেকে রাত অবধি ডিউটি টা একটু বেশি চাপ এর ;বড্ড চোখ লেগে যায় 

-তা আপনি একটু বিশ্রাম নিন না আমি বাকিটা দেখে নেব

-না থাক তুমি আমাকে আরো এক কাপ চা এনে দাও

-জি দাদাবাবু

-ভোর হতে আর বেশী নয়, আমি একটু পরে বেরিয়ে যাব অনেকটাই পথ ট্রেনে বেশ ভালোই ঘুম হয়ে যায় 

তবে কি জানো তো এই শীতের মাসগুলো রাতটা যেন কাটতে চায় না ..আর ভোরবেলা ওই ট্রেনের হাওয়ায় বড্ড শরীর ম্যাজম্যাজ করে

  

এই বলে চায়ের কাপে মুখ দিলো রাজা ,একটা বেসরকারি ছাপা কারখানায় কাজ করে, এই জয়েন করেছে কিছুদিন হলো ..কলেজ স্টুডেন্ট নিজের পড়াশুনার খরচ আর সংসারের ভাত জোগাড় করতে ওর কাজ করা ...

যথারীতি ভোরের আলো ফুটলো; রাজাও ট্রেনের টাইম দেখে বেরিয়ে গেল..

কারখানা থেকে স্টেশন বেশি দূর নয় তবে বস্তির ভিতর রাস্তা দিয়ে না গিয়ে রেললাইন ধরে গেলে একটু তাড়াতাড়ি হয়|

  ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন চারিদিক,কিছুই দেখা যাচ্ছে না |ফোনের লাইট ও চোখে ঠাওর দিচ্ছে না

রাজা বুঝতে পারছে তার পিছনে যেন আরও একজন কেউ আসছে ,হ্যাঁ খেয়াল করে দেখল আরও এক ভদ্রলোক...

 ভদ্রতার খাতিরে রাজা নিজেই জিজ্ঞাসা করে উঠলো

-কি মশাই আপনিও কি ট্রেন ধরবেন ?

-না এই একটু হাঁটছি (খুব ই শান্তভাবে )

-এই ঠান্ডায় আবার মর্নিং ওয়াক যা কুয়াশা চোখে তো কিছু দেখা যাচ্ছে না ;বয়স হয়েছে মশাই শরীর খারাপ হবে বেলা করে বেরোবে 

-তুমি কারখানাতেই কাজ করো নাকি ?

-এই ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরছি

-বলতে পারো সেই রকম আমিও ডিউটিতে বেরিয়েছি


বেশ কিছুটা রাস্তা কথা বার্তার মাধ্যমে দুজনেই এগিয়ে এলো,স্টেশনের প্রায় কাছেই আছে ;রাজা একটা ট্রেনের শব্দ পেল কিন্তু বুঝতে পারল না কোন দিকের !

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঝটকা টানে ওর খেয়াল হল....

 ওর হাতটা ধরে কি যেন টেনে সরিয়ে নিল যদিও বোঝার কিছু নেই এটা সেই ভদ্রলোকের মানবিকতার কাজ

-ধন্যবাদ আপনি না থাকলে আজকে যে আমার কি হতো !!

-বলেছিলাম না আমি ও আমার ডিউটিতে আছি (ঘন কুয়াশায় হারিয়ে যেতে থাকা সেই মানুষ )

পরেরদিন রাজা কারখানায় এসে তার এই অভিজ্ঞতার কথা জানায় 

সবশুনে কিছু বয়স্ক কর্মচারী জানায় এটা হয়তো সেই "রামলাল সিং" মানে রাম সিংয়ের বাবা

 সেও কারখানায় রাম সিংয়ের মতই ফাই-ফরমাশ এর কাজ করতো | একদিন ডিউটি টাইমে রেললাইনের ওপারে যাওয়ার সময় মেলেএর ধাক্কায় প্রাণ হারায় | তবে আজও কারখানার কিছু বিপদে-আপদে কিংবা এখানকার কোন কর্মচারীর বিপদে তার উপস্থিতি ভালোভাবেই অনুভব করা যায়.....

রাজার নির্বাক, স্তব্ধ হয়ে কথাগুলো শুনে গেল.....

 তবুও যেন কিছুতেই সেই ছায়াসঙ্গী কে ভূত বলে মানতে পারছে না | 


ভূত মানেই আমরা অনেকেই বুঝি যে আমাদের ক্ষতি করবে এমন কোন আতঙ্ক তবে এই গল্পে কারখানার এক নিঃস্বার্থ বিশ্বস্ত কর্মচারী 

রামলাল সিংহ মরে গিয়েও তার দায়িত্ব কর্তব্য থেকে আজও অবসর নেয় নি।

গল্প || হুইল চেয়ার ড্যান্সার || ডঃ রমলা মুখার্জী

  হুইল চেয়ার ড্যান্সার




অনেক অভিমানের মেঘ ঘনীভূত হয়ে ঝরে পড়ল শর্মিলার দু গাল বেয়ে। সে তো পরাজয় স্বীকার করে নি, হার মানে নি, তবে তার কিসের কষ্ট! শ্যামল প্রকৃতির অবিশ্রান্ত বর্ষণ কি শর্মিলার হৃদয় নদীতে প্লাবন এনে দিল। তার যে আজ ভীষণভাবে মনে পড়ছে বিগত দিনগুলোর কথা। 

   প্রখ্যাত অর্থপেডিক্সের মেয়ে হয়েও শর্মিলা পড়াশোনায় মনযোগ দেওয়ার থেকে নৃত্যশিল্পী মায়ের নাচের দিকেই বেশি ঝুঁকেছিল। ক্রমশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল মাকেও। পরে আরও বড় বড় নৃত্যশিল্পীর কাছে নৃত্যশিক্ষা নিয়ে অনেক সাধনা করে শর্মিলা দত্ত উঠেছিল খ্যাতির চরম শিখরে। দেশে-বিদেশে, মঞ্চে, দূরদর্শণে নিয়মিত অনুষ্ঠান তার। একদিন অনুষ্ঠান শেষে বেশ রাত্রেই বাড়ি ফিরছিল শর্মিলা। সেদিনও আকাশ ফুটো হয়ে এমনই অঝোর ধারায় পড়েই চলেছিল। ঘটল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। একটা ট্রাকের সঙ্গে তাদের গাড়িটার মুখোমুখি ধাক্কা, শর্মিলার গাড়ির ড্রাইভার তো সঙ্গে সঙ্গেই মারা গিয়েছিল। শর্মিলা অনেক চিকিৎসার পর প্রাণে বাঁচলেও তার পা দুটি বাদ দিতে হয়েছিল। মেরুদণ্ডেও কিছুটা চোট লেগেছিল-তাই হুইল চেয়ারই হল শর্মিলার সর্বক্ষণের সঙ্গী। শর্মিলার বাবা ডঃ শ্যামল দত্ত নিজে বড় অর্থপেডিক্স। তাঁর এবং বিভিন্ন ডাক্তারের সুচিকিৎসায় আর মায়ের যত্নে শর্মিলা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেও তার মনের সুস্থতা এল কই? কোথায় গেল তার অগণিত স্তাবকের দল, সব যেন কর্পূরের মত উবে গেল। আর মস্ত ইঞ্জিনিয়ার সূর্য্য সেন- শর্মিলার একান্ত আপন-তার ভালবাসার জন-দুর্ঘটনার একমাস পরেই যার সঙ্গে শর্মিলার বিয়ে হত-সেই সূর্য্য মেঘের আড়ালে গা ঢাকা দিল-চলে গেল আমেরিকা। সেখানেই বিয়ে করে পাকাপাকি ভাবে রয়ে গেল।  

     শ্যামলবাবু ও তাঁর স্ত্রী মৃন্ময়ীদেবীর অদম্য চেষ্টায় শর্মিলা শারীরিকভাবে ক্রমশ বেশ সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল-কিন্তু দেখা দিল অন্য সমস্যা। হুইল চেয়ারে বসে বসে তার শরীরের পেশীগুলো আড়ষ্ট হতে থাকল। বেশ ব্যথা-বেদনা আরম্ভ হয়ে গেল। হুইল- চেয়ারে বসা রুগীদের এ এক বিরাট সমস্যা। অভিজ্ঞ শ্যামলবাবু শর্মিলাকে প্রতিদিন ব্যায়াম করানোর জন্য দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্ট রাখলেন। সুশিক্ষিত থেরাপিস্ট বিভিন্ন ব্যায়াম নিয়মিত শর্মিলাকে আস্তে আস্তে অভ্যাস করাতে লাগলেন। শর্মিলার পেশীর আড়ষ্টতা কাটলেও মনের আড়ষ্টতা কাটতে কিছুতেই চাইছে না-অতবড় একটা দুর্ঘটনা-মনমরা হয়েই সে থাকে সবসময়। মৃণ্ময়ী দেবী সব বুঝতে পারেন-বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী শর্মিলা দত্ত আজ একদম পঙ্গু, এ কি মেনে নেওয়া যায়! মৃণ্ময়ী দেবী তো মা, তাই সবসময় চিন্তা করেন মেয়ের জন্যে। ফিজিওথেরাপিস্টের মুখে তিনি শোনেন যে বিদেশে হুইল চেয়ারে বসা রুগীদের সুস্থ করা ও আনন্দ দেবার জন্যে মিউজিকের তালে তালে তাদের নিয়ে বিভিন্ন নাচের মুদ্রার প্রচলন আছে। তাতে শারীরিক অবসাদই নয় মনের অবসাদও কাটে; পেশীরও সঞ্চালন হয় ফলে ব্যথা বেদনা থেকেও বেশ রেহাই পাওয়া যায়। হুইল চেয়ারে বসা রুগীদের নিয়ে তিনি তাঁর চিন্তা-ভাবনার কথা শ্যামলবাবুকে জানালেন। শ্যামলবাবুও মহা উৎসাহে বিদেশ থেকে সি.ডি আর ইন্টারনেট থেকে নানান হুইল- চেয়ারের নৃত্য সংগ্রহ করতে থাকলেন। মৃণ্ময়ী দেবী ও ফিজিওথেরাপিস্ট অঞ্জনবাবুর চেষ্টায় সেগুলি তাঁরা শর্মিলাকে শেখাতে লাগলেন। শর্মিলাও নতুন একটা পথের সন্ধান পেয়ে যেন হাতে স্বর্গ পেল। শরীরের অসুখের থেকেও তার মনের অসুখ ক্রমশই সেরে যেতে লাগল। বাবার কাছে শর্মিলা শুনল যে ঐ হুইল চেয়ারে বসে বসে অনেকেরই বসা অংশগুলোতে দগদগে ঘা হয়ে যায়-অনেক সময় ওষুধ দিয়েও সারে না-এমন কি অপারেশন পর্যন্ত করাতে হয়। তার মাথায় যেন এক নব চেতনার উদয় হল। ভারতবর্ষের সব হুইলচেয়ারবাসীর জন্য শুরু হল তার সাধনা। মায়ের সহযোগিতায় আর অঞ্জনবাবুর সুপরামর্শে ও শিক্ষায় শর্মিলা হুইল চেয়ারে বসেই মিউজিকের তালে তালে নানান নতুন নৃত্য-ভঙ্গিমার সৃষ্টি করতে লাগল যেগুলো হুইল-চেয়ারে বসা রুগীদের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে প্রযোজ্য। ঐ চেয়ারে বসা বাবার রুগীদের নিয়ে তৈরী করল “হুইল-চেয়ার ড্যান্স গ্রুপ”-নাম দিল-“আমাদের জয়”। এখন তো শর্মিলার ঐ নাচের টিম ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে হুইল-চেয়ার ড্যান্স প্রদর্শন করে আসে।

    “আমাদের জয়” ড্যান্স গ্রুপের খ্যাতি ক্রমশ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। শর্মিলা বহু জায়গায় সম্মানিত,পুরস্কৃত হতে থাকল তার মায়ের অদম্য সহযোগিতায়, তবুও শর্মিলার মনে কালো মেঘের ছটা মাঝে মধ্যেই ঘনিয়ে আসে। সূর্য্যের তপস্যা তাঁর শেষ হয় নি। তার এখন বড় প্রয়োজন একজন প্রকৃত প্রেমিকের- সে শুধু ভালইবাসবে না- বন্ধুর মত পাশে থেকে তাকে সাহস যোগাবে, সাহচর্য্য দেবে, তার সন্তানের পিতা হবে-সেও তো নারী-মা হওয়ার জন্য তার অন্তর তাই গুমরে গুমরে কাঁদে। শর্মিলাকে শ্যামলবাবু দুজন নামকরা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন-প্রত্যেকেই বলেছেন শর্মিলার মা হওয়ার ক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় আছে। সে সন্তান উৎপাদন ও ধারণ করতে পারবে। তবুও হুইল চেয়ারে উপবিষ্টার জীবনে নতুন সূর্য্য কি আর উঠবে? শর্মিলার চিন্তার ছেদ পড়ল অসময়ে ডোর বেলের আওয়াজে। আয়া দরজা খুলে দিতেই শ্যামলবাবু একজন অচেনা যুবককে নিয়ে ঢুকলেন। শ্যামলবাবু চন্দ্রকান্তের সঙ্গে শর্মিলার পরিচয় করিয়ে দিলেন। চন্দ্রকান্তের বোন সুপর্ণার নিদারুণ এক দুর্ঘটনায় শুধু পা দুটোই খোয়া যায় নি,অভাগী সেই দুর্ঘটনায় একসঙ্গে হারিয়েছে তার বাবা-মা দুজনকেই। তাই শুধু শারীরিকই নয় মানসিক ভাবেও সুপর্ণা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চিকিৎসার খরচ যোগাড় করতে বেসরকারী অফিসের অল্প মাইনের চাকুরে চন্দ্র একেবারে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে; তবুও সে হাল ছাড়ে নি। ভাল চিকিৎসার আশাতেই সুদূর মেদিনীপুরের মহিষাদল থেকে চন্দ্র ছুটে এসেছে বোনকে নিয়ে। সব শুনে শর্মিলার সমব্যথী মন গলে গেল। শর্মিলার তো তবু মা-বাবা আছেন- সুপর্ণার তো দাদা ছাড়া আর কেউ নেই। তবে অনেক ভাগ্য করে সুপর্ণা দাদাকে পেয়েছে- চন্দ্রের মত এমন হৃদয়বান, দায়িত্বশীল ছেলে সত্যিই বিরল। শ্যামলবাবু ও শর্মিলা দুজনে মিলেই সুপর্ণাকে চিকিৎসা ও দেখাশোনা করবেন ঠিক করলেন, কিন্তু তার জন্য তো সুপর্ণাকে শ্যামলবাবুর বাড়িতে থাকতে হবে। প্রথমে সুপর্ণা কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না-কেবলই কান্নাকাটি করছিল কিন্তু শর্মিলার সুন্দর ব্যবহার ও মৃণ্ময়ী দেবীর আপ্যায়নে সুপর্ণা রাজি হল- না হয়ে তো উপায়ও ছিল না।

     নামমাত্র খরচেই শ্যামলবাবু সুপর্ণার চিকিৎসা শুরু করলেন, চন্দ্রকান্তকে তাঁর বড় ভাল লেগেছিল-গ্রামের সাদামাটা ছেলে-দয়া, মায়া,ভালবাসা, সততা সব গুণই তার মধ্যে আছে। শর্মিলা ও মৃণ্ময়ী দেবী সুপর্ণাকে মানসিক নিরাপত্তা দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকলেন। আস্তে আস্তে সুপর্ণার মানসিক আর শারীরিক উভয়দিকেই বেশ উন্নতি ঘটতে থাকল। সপ্তাহান্তে চন্দ্র একবার এসে বোনকে দেখে যায় আর অজস্র কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যায় শর্মিলাকে। শর্মিলাও চন্দ্রের সুন্দর ব্যবহার আর তার শক্তপোক্ত মেদহীন শরীরের প্রতি ক্রমশই আকৃষ্ট হয়ে পড়ছিল। এভাবেই শর্মিলার জীবনে সূর্য্য অস্ত গেলেও জ্যোৎস্না- ঝরানো চাঁদের আলোর প্রভা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। শ্যামলবাবুও একজন বিশ্বাসী সহকারী খুঁজছিলেন তাঁর নার্সিংহোমের জন্য। পরিশ্রমী, নির্লোভ চন্দ্রকান্তকেই তিনি সেই পদটি দিলেন। সুপর্ণার জন্য চন্দ্র রাজীও হয়ে গেল। মৃণ্ময়ী দেবী কিন্তু মেয়ের মনের কথা জানতে পেরে চন্দ্রকান্তের কাছে প্রস্তাব দিলেন শর্মিলার সারাজীবনের ভার নেওয়ার। চন্দ্র বলল, “আমি আপনাকে জানাতাম মাসীমা, শর্মিলা ও আমি পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসি।” শর্মিলার জীবনে অমাবস্যা কেটে পূর্ণিমার আলো ঝরে পড়ল। 

অনুগল্প || রুমী || অমিত পাল

 রুমী

                        


করালীবাবু নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসেন কুকুরটিকে৷ নাম তার রুমী৷ খাঁটি দেশী কুকুর৷ বাজার করতে গিয়ে এই কুকুরটিকে কিনে বাড়ি ফেরেন৷ দাম তিন হাজার৷


করালীবাবুর বড় মায়া পরে গিয়েছিল কুকুরটির প্রতি৷ তাই করালীবাবুর স্ত্রী রমাদেবী কুকুরটি সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেই করালীবাবু বলে ওঠেন---- 'সখের দাম লাখ টাকা৷'


হঠাৎ একদিন করালীবাবুর বাড়িতে ডাকাত পড়ে৷ কিন্তু সজাগ রুমী ডাকাতদের বাড়িতে ঢুকতেই দেয়নি৷ বাঘের মতো চেহারা হয়েছে রুমীর, দেখলেই গা ছমছম করে৷ ব্যস এরপর থেকেই করালীবাবুর স্ত্রীর কাছে রুমী সন্তনের সমান৷


বহু বছর হল করালীবাবুর ছেলে বিয়েথাওয়া করে বউ-ছেলে নিয়ে বিদেশে চলে গেছে৷ এখন এই রুমীই করালীবাবু ও রমাদেবীর একমাত্র কাছের সন্তান৷