Sunday, December 19, 2021

নিবন্ধ || বাংলা কবিতা উৎসব কোন্ পথে || তৈমুর খান

 বাংলা কবিতা উৎসব কোন্ পথে


  

     


কবিতা উৎসবগুলি এক একটি গড্ডলিকা প্রবাহ। কবিগণ উৎসবে সামিল হন, অংশগ্রহণ করেন তারপর আবার হারিয়েও যান। কবিতা নামে লেখকর্মটির তাতে কোনো উৎকর্ষতা বাড়ে না, বরং অনেকের ভিড়ে তা চুপসে যায়, হতাশ হতে পারে। কবিতার জন্য যে নিভৃতি বা স্তব্ধতা দরকার,উৎসবগুলি সেই পরিবেশ নষ্ট করে দিতে পারে। যারা মনে করেন হইচই আস্ফালন জনসমাগমে কবিতার পরিপুষ্টি লাভ হয়, তাদের ধারণা সর্বার্থেই ভুল। কবিতা উৎসবে নেই, ভিড়ে নেই, এমনকী মাইকের সামনে সরব পাঠেও নেই। কবিতার পাঠক ও লেখক উভয়কেই কবিতার জন্য একটা স্পেস দরকার হয়। যেখানে একান্ত নিজস্ব সময়ের বাতাবরণ তৈরি হয়। অন্যকারও যেন উঁকি না ঘটে। কবিতা খুবই স্পর্শকাতর শিল্প। আগে উচ্চকিত পাঠে যে আবেগ ধারণ করে একমুখী কবিতা রচিত হত, বর্তমানে প্রকৃত কবিতায় তা আর থাকে না। কবির ব্যক্তিক্ষরণের সঙ্গে সময়ের এক নিবিড় জিজ্ঞাসা সেখানে উপস্থিত হয়। কবির ব্যক্তিক্ষরণের সঙ্গে সময়ের এবং সমাজের পরিচয়টিও উঠে আসে। হৃদয়ের সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম বোধের তীব্র মোচড়ে ভেঙে যায় ধারাবাহিক বক্তব্যও। কবি নাথিংনেস্ প্রজ্ঞায়ও পৌঁছাতে পারেন। সেখানে শূন্যতার অবধারিত প্রলাপে জীবনের নশ্বর মুহূর্তগুলি পাক খায়। কবিতা পাঠে সেগুলি ধরা যায় না। অনেক সময় তা অবাঞ্ছিত মনে হতে পারে। সুতরাং কবিতা সেই শ্লোগান থেকে বেরিয়ে এসে একান্ত অনুভূতির নিরীক্ষণে ভাষাহীন ভাষার মর্মরিত বোধে জারিত হতে চায়। উৎসবের আলো ঝলমলে মঞ্চে সাজসজ্জা পরিবেষ্টিত জবরজং কবিকে দেখা গেলেও তাঁর কবিতার সঙ্গে বসতি স্থাপন করা যায় না। এই মঞ্চ তো বিয়ে বাড়ির মতো আচার অনুষ্ঠানের মঞ্চ। পাঠকও স্থূল বরযাত্রীর মতো হতে বাধ্য। তাদের আত্মিক অন্বয় এবং চেতনার সর্বস্তরের বিকাশ সম্ভব নয়।

    সারা বছর ধরেই কোথাও না কোথাও চলে কবিতা উৎসব। কবিরা বহুদূর থেকে আমন্ত্রিত হয়ে আসেন। অনেক ধৈর্য ধরে বসে থেকে একটা বা দুটো বা অধিক কবিতা পড়ার সুযোগ পান। কিন্তু সেই কবিতা পাঠ কতটা জরুরি ছিল তা ভাবেন না। শ্রোতারা তাঁর কবিতা শুনছেন কিনা সেদিকেও কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। অনেক সময় নিজের কবিতা নিজেকেই শুনে মঞ্চ ছাড়তে হয়। যতটা আড়ম্বর করে, টাকা-পয়সা খরচ করে উৎসবগুলি করা হয় এবং যেসব কবিদের আমন্ত্রণ জানানো হয় তার কোনো সদর্থক উপযোগিতা আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ কবিরা কখনো নিজেদের দীনতা স্বীকার করেন না। তাঁর যোগ্যতা কতখানি সে বিষয়ে তাঁর আত্মসমালোচনা বোধ করেন না। সর্বদা এক ধরনের অহংকারে আচ্ছন্ন থাকেন। ফলে রাজনৈতিক কারণে, কিংবা পরিচিতির কারণে বা কাব্য প্রকাশের কারণে এইসব উৎসবগুলিতে অকবিদেরও ডাক পড়ে। তখন তাঁরা নিজেকে শ্রেষ্ঠ কবি ভাবতে থাকেন। এতে তাঁর প্রতিভার অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটে। প্রতিভা কখনো অহংকারকে সহ্য করে না। সুতরাং উৎসবগুলি উৎসাহ প্রদানের বদলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় কবিকে। সব অনুষ্ঠানে ডাক পান, বহু বইও প্রকাশিত হয়েছে, পত্রিকা সম্পাদনা করেন—এমন কবিকেও আমার কবি বলে মনে হয়নি। কারণ বহু প্রসবার মতো একদিকে তিনি কবিতার মাফিয়ায় পরিণত হয়েছেন। দালাল ও ব্যবসায়ী হিসেবে সব আসনগুলিই তিনি দখল করে নিতে জানেন। কিন্তু এমনও কবি আছেন, যাঁরা কখনোই কোনো অনুষ্ঠানে ডাক পান না, থাকেন কোনো প্রান্তিক শহর বা গ্রামে। তেমন নামকরা কোনো পত্রপত্রিকায়ও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয় না। সেরকম কবিকেই আমার প্রকৃত কবি বলে মনে হয়।

        উৎসবগুলি উৎসব হিসেবেই পরিচালিত হয়। নাগরদোলার মতো তোলান পান কিছু সংখ্যক কবি। রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে তা অপব্যবহারও করেন। নিজের পছন্দের কবিদের ডাকেন (তাঁরা অকবি হলেও)। আর ভালো লিখেও কোনোদিন ডাক পান না, সারাজীবন উপেক্ষিত হতে হয়। কিন্তু শেষ জয় তাঁদেরই হয়। প্রতিটি উৎসবকেই আমার পক্ষপাতমূলক, আড়ম্বর সর্বস্ব, কবিতার ও কবির শত্রু বলে মনে হয়। দায়সারা এইসব উৎসব না হলেই ভালো। কবি তো জনতার ভিড়ে থাকতে পারেন না। উৎসবে যে জনতার মিছিল থাকে, সেখানে শুধু শ্লোগান-ই সাফল্য পায়, কবিতা নয়। আলাপচারিতার কিছুটা সুযোগ থাকে, বই আদান-প্রদান হয়, পত্রিকায় লেখার সুযোগ ঘটে, কিন্তু সেসব সুযোগে কবির বা কবিতার উৎকর্ষতা থাকে না। আলাপের পরবর্তী পর্যায়ে বিস্ময়কর বিস্মৃতি বাস করে। বইপত্রগুলি কোনো বড় কবিকে দিলেও তিনি সেগুলি পড়া তো দূরের কথা, ঘর পর্যন্ত নিয়ে আসেন না। কেউকে দিয়ে দেন, কিংবা আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেন। যেসব পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপানোর সুযোগ ঘটে বলে কবিরা মনে করেন, সেসব পত্রপত্রিকায় না লিখলেই ভালো হয়। কারণ লেখার গুণ ও মান বিচার করে সেসব পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয় না। তবে একটা বিষয় হয়, তা হলো উৎসবগুলিতে খানাপিনা ভালোই চলে। আড়ম্বরের পংক্তিতে বসে বাতেলা মারা সহজ হয়। নিজের গৌরব নিজেই প্রচার করতে পারেন কবিরা। কিছু টাকাও পাওয়া যায়।

       এবছর একটা সরকারি কবিতা উৎসবের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজেকে খুব অসহায় লেগেছে। যে উদ্যোক্তারা সরকারি আনুকূল্যে আমাকে ডেকেছিলেন, তাঁদের কারোরই দেখা পাইনি। কতকগুলি বেতনভুক কর্মচারি ২০০০ টাকার ড্রাপ লিখে দিয়ে ফাঁকা মঞ্চে কবিতা পাঠ করালেন। টাকা নেওয়ায় এবং কবিতা পাঠ করে মনে যে অসন্তোষ জন্মালো তা সহ্য করা কঠিন। অবশ্য অন্যকারও মনে তা (এমনটি) নাও হতে পারে। তবে বেসরকারি কবিতা উৎসবগুলিতে নির্বাচিত কবিদের কবিতা পাঠে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা হতে পারে। সেসব ক্ষেত্রে কিছু পজেটিভ দিক অবশ্যই আছে। কবিতা পাঠ এবং আলোচনায় অনেক দিক খুলে যেতে পারে। তবে তা খুবই নির্বাচিত এবং নির্ধারিত বিষয় হলেই ভালো হয়।

       তাহলে কি কবিতা উৎসবের দরকার নেই?

 একথাটি ভেবে দেখা দরকার। প্রকৃত কবি কে তা নির্বাচন করা খুবই মুস্কিল। জনপ্রিয় কবি এবং প্রকৃত কবির মধ্যে বিস্তর তফাত আছে। জনপ্রিয় কবি তাে আমজনতার কবি। তিনি সরাসরি বক্তব্যপ্রধান কবিতা লেখেন। তিনি হাততালি পান। তাঁর কবিতা শ্লোগান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রকৃত কবি, প্রথমত তিনি কবির কবি; তারপর ভিন্নরুচির মানুষের। তিনি আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। তথাকথিত যশ-খ্যাতির ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থান। অনুষ্ঠানে বা উৎসবে স্বাভাবিকভাবেই তিনি অনুপস্থিত হন। আর জনপ্রিয় কবি মঞ্চ আলো করে কখনো কখনো স্যুট টাই কোট পরে সেন্ট মেখে উপস্থিত থাকেন। তাঁর কবিতা আবৃত্তিযোগ্য, বিবৃতি ও বক্তব্য মানুষকে আকৃষ্ট করে। বর্তমানে যতগুলি কবিতা উৎসব হয় তার বেশিরভাগগুলিতেই এঁরা থাকেন, ডাকও পান। এঁদের কাব্যপ্রকাশও করেন অন্যান্য কবিরা। সুতরাং উৎসব কেবল তাঁদেরই উৎসবে পরিণত হয়।

      কবিতার নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই। বিচার করারও কেউ নেই। স্বাভাবিক কারণেই এই পক্ষপাত চলে আসছে। আর এঁরাই অভিজাত কবি, মেট্রো কবি, স্মার্ট কবি, পুরস্কৃত কবি হয়ে উঠছেন। অপরপ্রান্তে ভিন্নজগতের কবি হিসেবে নতুন পথের দিশারি কবি চিরদিন ব্রাত্যই থেকে যাচ্ছেন। উৎসব এখন রাজনৈতিক দলের মতোই ভিন্নমত ও ভিন্ন আদর্শে পরিচালিত একটি কর্মকাণ্ড। একজন নতুন কবিও এই অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় এভাবে ব্যক্ত করলেন:

 "সেদিন কবি সম্মেলনে

 বাঙালি সাজার উৎসবে সাজো সাজো রব…

 ষোলোআনাই বাঙালিয়ানা…

 একে একে শুরু হলো কবিদের কবিতা পাঠ।

 থেকে থেকে গর্জে উঠলো করতালি।

 আত্মশ্লাঘার তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে থেকে ঢেকুর ওঠে

 পরস্পরের পিঠ চাপড়ে এগিয়ে যায়…

 আবার আসে কবিতামঞ্চ…

 আবার আসে কবিসম্মেলন…

 আবার চলে কবিতা পাঠ…

 কিন্তু

 সবাই ঘরে ফেরে শূন্য হয়ে। শূন্য মনে।

 কেউ কবিতা নিয়ে ফেরে না…

 কেউ কবিতা হয়ে ফেরে না…"

                                     (সংগ্রাম সিংহ)

 এই অংশটিতেই ধরা পড়ে কবিতা উৎসবের ব্যর্থতা কতখানি। বাঙালি সাজের উৎসব, কবিতা পড়ার উৎসব এবং কবি হওয়ার উৎসব যে শূন্যতার দম্ভে পূর্ণ এবং অন্তঃসারশূন্য জাঁকজমকে শুধু হাততালি সর্বস্ব একটি অনুষ্ঠান তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হয়তো সেই কারণেই জীবনানন্দ দাশ কখনোই কবিতা উৎসবে যোগ দিতেন না। এখনও সেরকম অনেক কবিকেই আমরা উপস্থিত হতে দেখি না। এমনকী পুরষ্কারও প্রত্যাখ্যান করে দেন।


গল্প || বচনবাগীশ || ডঃ রমলা মুখার্জী

   বচনবাগীশ



    সুমন দুম করে উপমাকে বিয়ে করে নিয়ে এল। মীরাদেবী মনে খুব আঘাত পেলেন। কিন্তু সুমন নিচুশ্রেণীর মেয়ে উপমাকে বিয়ে করার কথা বলেনি কারণ সে জানত প্রাচীনপন্হী মীরাদেবী কখনই এই বিয়েতে মত দেবেন না।  তাই মীরাদেবীর যত রাগ গিয়ে পড়ল বৌমা উপমার ওপর।

নিচু জাত বলে উঠতে বসতে তিনি হেনস্হা করতেন উপমাকে।        

       পাঁচ বছর হয়ে গেল উপমার সন্তান আসছে না। বাক্যবাগীশ মীরাদেবী উপমাকে প্রায়ই কথা শোনাতেন। বেশি কথাবলাই ছিল মীরাদেবীর একমাত্র দোষ। সারাদিন অনর্গল কথা বলতেন তিনি। বাঁজা বলে উপমাকে অপমান করতেও ছাড়তেন না। উপমাও দু-চার কথা ইদানীং শুনিয়ে দিত, প্রায়ই অশান্তি লেগে যেত দুজনকার।

     অনেক চেষ্টা করে উপমার ছেলে হল। উপমার চাকরি বজায় রাখার জন্য আয়া রাখা হল। আয়ার সামনে পদে পদে অপমান উপমা কিছুতেই মেনে নেবে না। তাই বাক‍্যবাগীশ  মীরাদেবীর স্হান হল বৃদ্ধাশ্রম। ছেলে বড় হচ্ছে কিন্তু কথা বলতে পারছে না। ডাক্তারবাবু বললেন ছেলের সঙ্গে সবসময় কথা বলা দরকার যা নিজের জন ছাড়া অসম্ভব। সুমন মীরাদেবীকে বৃদ্ধাশ্রম থেকে বাড়িতে নিয়ে এল। 

    বাকপটু মীরাদেবীর সহায়তায় সুমনের ছেলে অনুপমের মুখে আধো আধো বোল অচিরেই ফুটল। মীরাদেবীও বকবক করার নতুন সঙ্গী পেয়ে খুব খুশি। উপমাও নিশ্চিত মনে চাকরি করতে যেতে পারল। তাদের আর আয়া রাখারও প্রয়োজন হল না, কারণ অনুপমের দেখভাল মীরাদেবী স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিলেন। কত আশার নাতি তাঁর, আর সে কিনা মানুষ হবে আয়ার কাছে! কভি নেহি!



ছোট গল্প || বকখালিতে একরাত || সামসুজ জামান

বকখালিতে একরাত

           

    

বকখালিতে সমুদ্র-কিনারে চাঁদের আলোয় সোনালীর কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল প্রভাত। সোনালী তার মাথার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিল। ফুরফুরে হাওয়া গঙ্গার জোয়ারের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে এসে মনটাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল প্রভাতের। 

একটু পরে প্রভাতকে জড়িয়ে ধরে সোনালী বলল – চল না, হটেলের রুমে ফিরে যাই। 

যাবে? ভাল লাগছে না আর এখানে? 

না,না,না, ভাল লাগবে না কেন? আমাদের কী আর এমন ভাগ্য হয়? একটু থেমে আবার যোগ করল – আসলে আমাদের তো কেউ এত ভাল বাসেনা! আমরা হলাম এঁটো পাতার জাত! 

মুখে হাত চেপে ধরে প্রভাত বলল- ছিঃ, বোলো না ! 

আরও কিছু পরে হোটেলের সি ফেসিং রুমে বসে, জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলো গায়ে মাখিয়ে সোনালীকে উপভোগ করছিল প্রভাত। মেয়েটা আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে দিতে বলছিল – তুমি এত ভাল! আমাদের কেউ এভাবে কখনও আদর করে না! শুনে খুশী হয়ে প্রভাত, সোনালীর মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে আদর করে দু-চোখের পাতায় চুমু খেল আর একবার।  

রাতটা অদ্ভুদ এক নেশার মধ্যে দিয়ে কথা দিয়ে কেটে গেল। একসময় সময় ফুরিয়ে যেতেই ককিয়ে উঠল সোনালী – বাড়ি ফিরে গিয়ে আমাকে মনে পড়বে তো? আবার আসবে তো? কবে আসবে?

-আসবনা আবার ? কী যে বল? যত তাড়াতাড়ি পারি আবার ----- কথাটা বলতে গিয়েও গলায় আটকে গিয়েছিল প্রভাতের। 

বিদায় নেবার সময় পাঁচশ টাকা সোনালির হাতে গুঁজে দিতেই চিক চিক করে উঠল ওর চোখ – বাবু, আবার কবে আসবে, বলনা? 

-এই তো সামনের মাসেই – বলেই সোনালীর চোখের ওপর থেকে চোখ সরাল প্রভাত। অনেক কষ্টে অমলাকে বুঝিয়ে, অফিসের অডিটের ঝামেলার কথা বলে একরাতের জন্যে বকখালিতে আসা। এরপর আবার আসা? পাগল নাকি! সোনালীকে সঙ্গে নিয়েই আরও এগোচ্ছিল প্রভাত। পখে পড়ে এঁটো শালপাতা, গর্ভ নিরোধকের মোড়ক। কিন্তু এসব ছাপিয়েও মনে পড়ে মেয়েটার চোখ দুটো। বড় মায়াবী সুরে সোনালী বলতে থাকে – আবার আসবে তো? বলো না কবে আসবে? 

প্রভাত আর একবার ভয়ে ভয়ে সোনালীর দিকে শেষবারের মত তাকিয়ে দেখল। মেয়েটার বড় বড় দুটো চোখ জলে ভরে উঠেছে। শুধু তাই নয়, নিজের মুখটা চেপে ধরে এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সোনালী। অদ্ভুদ এক পিছুটানকে অনেক কষ্টে উপেক্ষা করে জোরে জোরে সামনের দিকে পা ফেলল প্রভাত। কিন্তু অনেক দূর পর্যন্ত যেন তার কানে আসতে লাগল সোনালীর ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ।

গল্প || দারিদ্রের কান্না || বাহাউদ্দিন সেখ

 দারিদ্রের কান্না 




"সৃষ্টি যাহা মানবের কূলে, তব কেন গরীব ধনীর সুখ'

সহ্য করিয়া যায় তীরে তীরে নিম্ন জাতি দারিদ্র্যের দুখ"।


আজ রাহুল খুব দুশ্চিন্তায় বাড়ির ফেরার পথে। তার বাড়িতে যে তার বাবা রিক্সা চালক লোক যেখানে মাত্র দিনে তার সারা দিনে দুইশো টাকা মজুর করে। আর বাড়ির জন্য সেই টাকা দিয়ে চাল ডাল বাড়ির ফেরার পথে সন্ধ্যা বেলায় কিনে আনে। এত অনাহার আর দিন আনা দিন খাওয়া তার পরিবার, আর তার মধ্য দিয়ে প্রোজেক্টের টাকার বিষয়ে স্কুলের শিক্ষক বলে ওঠে । রাহুল তার বাবা-মাকে কি ভাবে বলবে সেই বিষয়ে ভীষন দুশ্চিন্তায়। সে নদীর ধারে বসে একা একা চিন্তিত করতে থাকে। টাকা জোগাড়ের বিষয় নিয়ে, এবং নিজে নিজে মনের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। কারণ স্কুলের প্রোজেক্টের টাকার বিষয়ে তার বাবাকে কিছুই বলতে পারবে না। তার বাবার হঠাৎ অসুস্থ ও আরোগ্য হয়ে পড়ে রয়েছে, এবং তার মা হার্ড ও ক্যান্সারের ব্যাধি বদ্ধ রোগে আক্রান্ত।


 "চিরতরে স্বর্গ দেখিলাম ভুবনে সৃষ্টি,

তব বাঁধিলো এ দুনিয়ায় মহামারীর বৃষ্টি"।

"রুদ্ধ বদ্ধ করিল সবে লোকের কাজ,

ঘৃণ্য হয়ে রুপ দেখালি, এ মুখোশধারী সমাজ"।


অনেকদিন ধরেই স্কুল বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় কারণে পড়াশোনাটাও ঠিক মতন হয়ে ওঠেনি রাহুলের। রাহুল দশম শ্রেণীর ছাত্র, লকডাউনের স্কুল খোলার পরেও রাহুল সেইরকম স্কুল যায়নি। কারণ বিগত দুই বছর স্কুল বিদ্যালয় লকডাউনে বন্ধ থাকার কারণে পড়াশোনাটাও কোথায় যেন উঠে গেছে। তার মাথায় ছিল না পড়াশোনা বলে কিছু রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ একদিন স্কুল গিয়ে দেখা যায় যে রাহুলের স্কুলের শিক্ষক মহাশয় তাদের প্রজেক্টের বিনিময় তাদেরকে রেজাল্ট দেওয়া হবে। এবং সেই প্রজেক্টের দাম রাখা হয়েছিল 'সাড়ে সাতশো' টাকা। আর এই প্রজেক্টের টাকায় রাহুলের মাথায় বড় দুশ্চিন্তায় সম্মুখীন করে তুলেছে।


"তুলিয়াছে অর্থের কাল, শিক্ষার ব্যবসার হাল,

ক্ষণে ক্ষণে অশিক্ষার এ পথ ধরেছে মহাকাল"।


অসীম যেন তার মাথায় বড্ড বোঝা পড়েছে , এই স্কুলের প্রজেক্টের আর্থিক বিষয় নিয়ে,সে নিরুপায় হয়ে চিন্তিত ও ক্লান্তি নিয়ে বসে থাকতে থাকতে উঠে পরে আর বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু তবুও রাহুল তার মাথা থেকে সেই বিষয় নিয়ে চিন্তিত দূর করতে পারে না বা হয় না। রাহুলের বাড়ির পথ হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা নেমে এলো।রাহুল বাড়িতে এসে বারান্দায় চুপ করে বসে রইল। 

ক্ষণিক ক্ষণ পর তার মা বাড়ির দরজাটি শিকল খোলে রাহুল কে জিজ্ঞাসা করে ,,

আরে বাবা তুই এসে এখানে যে বসে আছিস! 

আমাকে তো ডাক দিতে পারতিস,,,,!

তার মা জিজ্ঞাসা করল ,,,,

 কি হয়েছে ?

 হঠাৎ এই ভাবে বসে অন্ধকার বারান্দায়, সে কিছু না বলে চুপ করে রইলো,কারণ সে জানে তার মাকে স্কুলের প্রজেক্টের ব্যাপারে বলতে পারবে না।


"ভালো-মন্দ সুখ- দুখ খুঁজি অন্ধকারে আলো,

মনে মনে দুঃখ বিষাদে সহি মা-কে দেখাই ভালো"।

"অর্থ খুঁজি বেদনা ভুলাই,করি রিক্সা চালক কাজ,

মনে মনে ভাবি চল রিক্সা চালাই আজ"।


ঘরের বারান্দা থেকে উটে গিয়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলো, আর তার মা কিছু খাবারের জন্য ডাক দিয়ে তাকে আহারের প্রস্তুত করলো। রাহুল ও তার মা আহারের শেষে তাকে জিজ্ঞাসা করলো।

 আজ কেনো সে নিশ্চুপ রয়েছে !

কিন্তু কোনো কথার তার মাকে উত্তর না দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল রাহুল।

তার পারেন দিন রাহুল স্কুলের জন্য প্রস্তুত হয়ে,কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পরে কিন্তু তার মা যাতে বুঝতে না পারে তাই স্কুলের ড্রেসেয় বেরিয়ে পড়েছিল। 

রাহুল কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেও কোনো কাজ পায়নি,

তাই সে মনে মনে ভাবল,,,,,,!

তার বাবার যে রিক্সা রয়েছে সেটি নিয়ে বেরিয়ে পড়বে, সেটি তার মায়ের চোখের আড়ালে। রাহুল বাড়িতে গিয়ে তার মাকে দেখতে না পেয়ে রিক্সাটি বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে যায়। আর প্যাসেঞ্জারের অপেক্ষায় রয়ে থাকে। এই ভাবে রিক্সাটি নিয়ে বসে রইল, কিন্তু কোন প্যাসেঞ্জার পেল না। দুপুর হয়ে ঘনিয়ে আসে দুর দুর করে। এই ভাবে তার সারাটা দিন দুশ্চিন্তায় আরো কেটে যায়। ক্ষণিক খন পর সে সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফেরার পথে কিন্তু তার মা অদূর থেকেই দেখে ফেলে।

রাহুলের মা চিন্তিত হয়ে পড়ে! 

আর মনে মনে ভাবে,এমন কোন বিষয় রয়েছে যেখানে রাহুলকে রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে তবুও স্কুলের নাম করে ফাঁকি দিয়ে এই বিষয়ে তার মা চিন্তিত হয়ে পড়ে।

 

"সুখ খুঁজতে গিয়ে পেলাম ভিক্ষার ঝুলি,

 সন্ধ্যা বেলায় রিক্সা নিয়ে কেঁদে কেঁদে গান বলি"।


কিছুক্ষণ পর রাহুল ঘরে এলো আর তার মা তাকে জিজ্ঞাসা করল।

 বলতো বাবা তোর কি হচ্ছে!

হঠাৎ তোকে অদূর থেকে আমি দেখেছি তোর বাবার রিক্সা নিয়ে কোথায় যেন গিয়েছিলিস।

একথা শুনে রাহুল ভয় পেয়ে গেল, সে কি বলে তার মাকে উত্তর দেবে কোন সাহস পায় না।

রাহুল কোন কিছু উত্তর খুঁজে না পেয়ে তার মাকে স্কুলের প্রোজেক্টের টাকার বিষয়ে বলে ফেলল, তার স্কুলের প্রোজেক্টের সাড়ে সাতশো টাকা লাগবে, তাই রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম টাকার সন্ধানে কিন্তু অবশেষে কোনো কাজ হয়নি। 

একথা বলে তার মাকে কাঁদতে কাঁদতে বলল……

সে যদি স্কুলের প্রোজেক্টের টাকা যদি না দিতে পারে তবে হয়ত সে পরীক্ষাটি দিতে পারবে না বা সে মাধ্যমিকে পাশও হতে পারবে না।

তার মা কোন কথা না বলে চুপ করে বসে রইল, কারণ তার মার কাছেও কোন উত্তর ছিল না, সে কি বলে জবাব দেবে ।

হঠাৎ তার মা একটা প্রশ্ন করে,,,, রাহুলকে 

প্রোজেক্টটা আবার কোন বিষয়, রাহুল বলে উঠল-এটা মধ্যবিত্ত পরিবারকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়। যেটি আমাদের মত মানুষ কে চিন্তিত করে ফেলে আর শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষা হরণ করে ব্যবসা চলাচল করে। আর বর্তমান সমাজে প্রজেক্ট বিষয়ের শিক্ষার নামে অশিক্ষার প্রভাব ঘটাতে থাকে ।


   "দারিদ্র্যের ধোঁয়া উঠিয়াছে সমুদ্রের সৈকত,

অর্থের অভাব জালে সৃষ্টিকারী মোরা নিম্ন জাত"।        

    "ব্যবসা করি এ শিক্ষা কুশিক্ষা ভদ্রতার তাজ,

কে শুনিয়াছে ধোঁয়াশা বুকে দারিদ্রের কান্নার আওয়াজ"।

গল্প || আন্না || রঞ্জিত মল্লিক

 আন্না 

  

     

    

    " বিহুর ও লগন ....   

    আকাশে বাতাসে ... .....

    .... .... ...

    চম্পা ফুটিছে .... ...

    তার সুবাসে ...... ... "


   গানটা এক কাস্টমারের মোবাইলে শুনেই আন্নার বুকের ভিতরটা ধরাস করে উঠল। পুরানো স্মৃতি গুলো আবার জট পাকিয়ে উঠছে। সেই সাথে অনবরত চোখ দিয়ে জল ঝরছে।


    বেশ কিছু বছর আগের কথা। আসামে বিহু উৎসব উপলক্ষ্যে রোজলিনের একটা নাচের অনুষ্ঠান ছিল। এটা ছিল বিরাট উচ্চতার একটা অনুষ্ঠান। আন্নাও প্রেজেন্ট ছিল সেখানে। অনুষ্ঠান বেশ ভালই হল। রোজি অল্পের জন্য সেকেণ্ড হল। এরপর ন্যাশনাল লেভেলের কমপিটিশন হবে দিল্লীতে।


   ফেরার পথে রোজিদের গাড়ি একটা বাঁকের কাছে টার্ন নিতেই একটা ভারী লরিকে ধাক্কা মারে। একটা প্রাণান্তকর এক্সিডেন্ট। আন্নার যদিও অল্প চোট লেগেছিল। রোজলিনের এই প্রাণনাশক এক্সিডেন্টে শরীরের নিন্মাংশ পুরো অবশ হয়ে যায়। আর চির জীবনের মত বোবা হয়ে যায় ও।


    শোকের ছায়া নেমে আসে গোমস পরিবারে। রোজি আর কোনোদিনই পায়ে ঘুঙুর পড়তে পারবে না এটা ভেবেই আন্নারও মন আর শরীর কোমাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।



           বাবা মা মারা যেতেই তামিলনাড়ু থেকে গ্রাসাচ্ছাদনের তাগিদে খুব ছোটতে কলকাতায় চলে আসে আন্না শিবলিঙ্গম রাধাচন্দন। ফুটপাতে ধোসা ইডলির স্টল থেকেই আস্তে আস্তে বিজনেসটা ডালপালা ছড়ায়।


           রোজি প্রায় আন্নার স্টল থেকে ধোসা, ইডলি খেত।একদিন বৃষ্টির দিনে রোজির পুল কার অটোর সাথে ধাক্কা লাগাতে রোজি পিছলে ম্যানহোলের ভিতরে ঢুকে যায়। জীবনে প্রথমবার এই প্রাণান্তকর এক্সিডেন্ট থেকে আন্নায় ওকে বাঁচায়। তখন থেকেই সম্পর্কের শুরু। ভালবাসার উত্থান।


            ঐ গানের তালে নেচেই রোজলিন আসামে মঞ্চ কাঁপিয়েছিল। তারপর থেকেই সব ঝাপসা লাগে আন্নার। 


                   ........... .......... ...........


             আজ গানটা বহুদিন পরে শোনার পর একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে আন্না।


            ডাক্তার ডেরিয়ার মুখে তৃপ্তির হাসি। রোজি আবার ডান্স করতে পারবে। ডেরিয়ার সেটাই অভিমত। তবে একটা মেজর অপারেশন করতে হবে।


            টাকার দরকার। রোজির বাবা একজন সামান্য বেসরকারী চাকুরীজীবি। চিকিৎসার অত টাকা উনি জোগার করতে পারবেন না। আন্নাকেই সব করতে হবে।দুবার সম্বন্ধ ভাঙ্গার পর ওর দিদির বিয়েটা না হয় একটু পিছলো! দিদির জন্য কেনা গহনাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। এই চিকিৎসার পিছনে। 


           আসিফ করিমের মেয়ে সাইরার একটা কিডনির খুব প্রয়োজন। আন্নার সাথে গ্রুপ ম্যাচও করেছে। আন্না আসিফ করিমের মেয়ের কিডনি নষ্টের খবরটা পেপারেই পড়েছে। পড়া মাত্র আর সময় নষ্ট করেনি। করিম সাহেবের সাথে দেখা করে উনার সাথে সব কথা বলেছেন। 


            করিম সাহেব রাজী হয়েছেন। আন্নার একটা কিডনি মৃতপ্রায় মেয়েকে যেমন বাঁচাবে , তেমনি বিনিময়ে উনি রোজলিনের চিকিৎসার সব ব্যয় সারাজীবন বহনও করবেন। রোজিও তো উনার মেয়ের মত। রোজির মধ্যে উনি সাইরার শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখতে পাচ্ছেন। 


           আন্না টাকার জন্য নিজের দোকানঘরটাও বিক্রি করে দিল।দুটো প্রাণনাশক সিদ্ধান্ত ওকে নিতেই হল। তা না হলে আদরের ভালবাসা রোজলিনকে বাঁচানো যেত না। 


                  .......... .......... ............


           অপারেশন পুরো সাকসেসফুল।


           তিন বছর পর.....


           ওড়িশাতে আন্তর্জাতিক ওডিশি উৎসব। রোজলিন রবারের পা দিয়ে সুন্দর নৃত্য পরিবেশন করল। বোবা মুখে ফুটে উঠল ঘুঙুরের ছন্দ। সবাইকে চমকে দিয়ে রোজলিন নৃত্যে শেরার শিরোপা পেল। আনন্দে চোখের কোণ বেয়ে নামছে অতি ক্ষীণ কংসাবতীর শ্রাবণ পূর্ণিমার ভরা কোটাল। 


      আন্না সবটাই দেখল। আকাশের ঠিকানাতে বসে।


         কিডনি প্রতিস্থাপনের পর আন্না আর বাঁচেনি। কয়েক মাস পরেই ও চলে যায় না ফেরার দেশে। তবে রোজলিন, সাইরা সেটা মানতে পারেনা। ওদের বিশ্বাস আন্না আজও বেঁচে আছে ওদের সকলের মনের অলিন্দে। 


           আরো দুই বছর পর ......


        সেন্সাস আধিকারিকেরা সেন্সাসের ডাটা কালেকশান করতে এসে এক চরম সত্যের সন্মুখীন হল। সেন্সাস আধিকারিকদের সাথে রোজি আর সাইরার বাবার তীব্র ঝগড়া। ওদের দুজনেরই দাবি তাদের তিনটে করে সন্তান - আন্না, রোজলিন, সাইরা।


       আন্নার দিদিরও একই অভিমত। তাদের এক ভাই ,আর দুই বোন আছে ; আন্না, রোজলিন সাইরা। 

     

          সেন্সাস আধিকারিকেরা তিন পরিবারের কাছ থেকে একই তথ্য পেয়ে বেশ হতভম্ব। কিছুতেই ঐ পরিবারগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পাল্টাতে পারছেন না। বারবার বলা স্বত্তেও উনারা একই তথ্য খাড়া করতে চাইছেন। 


           সব কিছুই ঠিক আছে। শুধু পরিবারের সদস্য, সদস্যাদের নামের জায়গাতে ঐ তিন পরিবারের তিনজনের নাম বার বার উঠে আসছে। আর তা হল, আন্না শিবলিঙ্গম রাধাচন্দন, নাতালিয়া রোজলিন মারিয়া গোমস, আখতারা সাইরা মেহেবুবা।


          সেন্সাস আধিকারিক দলের একজন হেড সেদিন নিজেই এলেন সব কিছু স্বচক্ষে যাচাই করতে। রোজলিন আর সাইরার পরিবার যা বিবৃতি দিলেন তাতে উনি রিয়েলি স্পেলবাউণ্ড। 


           রোজলিনের পরিবার থেকে আন্না আর সাইরারকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। সেই রকম সাইরার পরিবারেও রোজলিন, আন্না সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। 

         

            সমস্ত ঘটনা শোনার পর আধিকারিকদের মধ্যেও একটা মারাত্মক নিস্তব্ধতা অনুভূত হল।

গল্প || মহান || রথীন পার্থ মণ্ডল

 মহান 



বজ্রপাতে ছোটভাই হঠাৎ চলে গেল। বড়দা শিবনাথ শোকে আচ্ছন্ন, বাড়ির সকলেও। বৌমা-ভাইপো-ভাইঝির চোখের জল থামছে না। এদিকে বড় বৌ কেঁদেই চলেছে। দুই ছেলে বিছানা নিয়েছে শোকে।


      আবার বিপদ--। বোন চন্দনা তার দুই মেয়েকে নিয়ে বিধবার বেশে হাজির। কান্না বিজড়িত স্বরে সে বলল- "তিন দিন আগে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় তোমার ভগ্নীপতি বিদায় নিয়েছে। তোমাদের শোক চলছে তাই জানাইনি।এখন থেকে এখানেই আমরা থাকব। বল দাদা--কি করব? আজ তাকে ফুল-জল নিবেদন করে -এখানেই চলে এলাম - আর উপায় নেই !"


     শিবনাথের চোখে জল- "হ্যাঁ, তোরা সবাই এখানেই থাক। ঈশ্বরের দয়ায় সকলে সুখে-দুঃখে একসাথে থাকব।"

গল্প || তিতলি || সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

তিতলি





    মেয়ের নাম নিয়ে খোঁজ করে অনেক কষ্টে মিলেছে--তিতলি। সে যখন জন্মায় তখনই নাকি সে বুঝিয়েছিল- সে আলাদা। সে তোতা নয়-- তিতলি- একটু কেমন! 

   বাবা মা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বড় ডাক্তার দেখিয়ে জানতে পেরেছে তাদের মেয়ের অবস্থা আর সাধারণের মতো নয়। সে অস্বাভাবিক। 

   সে কথা বলে না। ভালোভাবে কাঁদতে পারে না। কিন্তু সব বুঝতে পারে। মা তাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত তা-ও সে উপলব্ধি করে। ছোট্ট বয়েস থেকেই তার দাদার ওপর অত্যন্ত আদুরে ভালোবাসা ছিল তিতলির ---বাবা অন্ত্য প্রাণ। তবুও মা ছাড়া যেন কাউকেই চেনেনা। তাই সদাই অকারণে কেঁদে ওঠে। 

    মা নিলাদ্রি নিজেকে' পাপী" ভাবেন। কেননা মায়েরা কন্যাসন্তান কে নিজের অংশ ভেবে তার শারীরিক দিক, মানসিক দিক নিয়ে বেশি ভাবিত হয়। তাই নিজের গর্ভের ওপর দোষ দিয়ে ভাগ্য বিধাতার কাছে কঠিন প্রত্যাঘাত করতে সর্বদাই তৎপর হন। 

         বাবা, প্রতাপবাবু, নিলাদ্রি ওপর রাগে, বিতৃষ্ণায় যখন খুশি যত খুশি অশালীন কথা প্রয়োগ করেন। নিজেরও যে দোষ থাকতে পারে না ভেবে মেয়ে তিতলির যত্নের জন্যে বৌ নিলাদ্রি কে উদয় অস্ত যুদ্ধক্ষেত্র মনে করে শাসন করেন। দিগ্ বিদিক শূন্য হয়ে গায়ে হাত তোলেন। নিলাদ্রি মেয়ে তিতলির কথা ভেবে নীরবে সহ্য করে মহত্ত্ব দেখান। বাপের বাড়ির কাউকে জানতে বা জানাতে চান না। সে যেন একাই অপরাধী। এরকম সন্তান কেন এলো! সেতো সকলের মঙ্গল ই চায়। তবে তার ভাগ্যে এমন কেন? কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করেও তার কথা ফোটে না। সে স্বাভাবিক সন্তানের মতো বেড়ে ওঠে না। শুধুই অনুভবে আচরণে নিস্তব্ধ প্রকৃতির মতোই অসীম উদার মনে মায়ের কোলে কোলেই বাড়তে চায়। তার চোখের ভাষা প্রমাণ করে সে ভালোবাসার কাঙাল। সে নীরব নদীতীরের একখানা প্রদীপ। সে বোঝে সবই, বোঝাতে পারেনা। মা নিলাদ্রি কেঁদে কেঁদে শরীর খারাপ করে। মেয়ে তিতলি যে তার কত্ত আদরের। শ্বশুর, শাশুড়ি, পাড়া প্রতিবেশী প্রত্যেকেই তিতলির জন্যে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে। নিলাদ্রি ক্রমশঃ পাথর হয়ে যেতে থাকে- গর্ভের কলঙ্ক ভেবে। অথচ মায়েরা মেয়ের বেড়ে ওঠা নিয়ে কতই না স্বপ্ন দেখে। শরীরের উন্নতিতে

চমকিত হয় আনন্দিত হয়। নিলাদ্রি, অবশ্য অন্য অনেক কিছু ভাবে। এই বৃহৎ প্র কৃতির মধ্যে যে একটা বিরাট মহত্ব আছে তা মেয়ে তিতলির মধ্যে অনুভব করে। 

       গ্রামটা পাটলি। পাশে দামোদর নদ। আগের সেই খরস্রোতা আর নয় বটে, তবে চাকরি জীবী মেয়েদের মতোও নয়। শান্ত গৃহবধূ। ঘোমটা মাথায় কোলাহল, পাখির কূজন, চাষীদের বোঝাই শালতি এবং দু' পার বাঁধা বাঁশের সেতু সবই সহ্য করে সে। কেউ তার ওপর খারাপ নজর দিতে না পারে সেজন্যেই যেন দু' পাশে অসংখ্য চিতার পোড়া কাঠ।। এখানেই তিতলি আর দামোদরের মিল। 

         তিতলি বড় হচ্ছে। পথে ঘাটে অসংখ্য নরখাদক নজর দেয়। তিতলি বোঝে, মাকেও বোঝাতে চায়। তবুও সে একা একা দামোদরের তীরে সময় কাটায়। প্রকৃতির

নীরবতার সাথে নিজের মিল খুঁজে ফেরে। কিন্তু নরখাদক পশুরা তিতলির এই একাকীত্বে হানা দেয়। " স্পেশাল " চাইল্ড হলেও নারী সুখ ভোগ করতে চেয়ে তিতলির পাশে ঘুরঘুর করে। যেন রুদ্র মহাকালের পদতলে বসে মধু পানের অদম্য ইচ্ছা বা প্রমত্ত বাসনা। ছাগল, কুকুর, বেড়ালের মতো তাকে কামনার যৌনতায় নিবদ্ধ করতে চায়। 

    এরপর একদিন দুপুরে শীর্ণ দামোদরের চরে তিতলি একটা ছাগল বাচ্চা নিয়ে খেলা করার সময় কয়েকটা দু'পেয়ে পশু তাদের যৌন ক্ষুধা মেটাতে তাকে ধর্ষণ করে। তিতলির বয়স তখন সবে এগারো। বাক্য হীন বোবা তিতলি তীর বেঁধা হরিণের মতো যন্ত্রনায় তাকিয়ে থাকে নদীর জলে। জীবন যে তার শঙ্কিত হয়ে ওঠে আরও। বোবা চোখে মাকে আর বিধাতার কাছে ক্ষমা চেয়ে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়লো-- কেউ জানতেও পারলো না। 

    বাবা প্রতাপ যখন জানলো তখন সব সব শেষ। মা নিলাদ্রি 

নিলাদ্রি অন্তর্যামী র কাছে নীরব চোখের জলে মেয়ের অন্ত্যেষ্টি করলো। 

     সানাইয়ের বাদ্যি যেন বোবা হয়ে গেল চিরদিনের মতো। মনুষ্যত্বহীন সমাজে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের চির বিদায় নিশ্চিত হলো। 

 



গল্প || মনের ভুল || ইন্দিরা গাঙ্গুলি

 মনের ভুল 



রকিদের বাড়ি ভবানীপুরে। রকির মামাবাড়ি রাজনগরে খেজুরী গায়ে। রকির বাবা রেলে চাকরি করে। রকির মা ও সরকারি অফিসে চাকরি করে। দুজনেই খুব দায়িত্ব পূর্ণ কাজ করে যে যার অফিসে। রকি ছোট্ট বেলা থেকে বেশি ভাগ সময় ঠাকুমার কাছেই মানুষ হয়েছে। দাদু, ঠাকুমার সঙ্গে ই বেশি ভাগ সময় কাটে রকির। রকির মা মলি কাজের লোক, রান্নার লোক রেখে দিয়েছে। মলির বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাত টা বেজে যায়। রকির বাবা গগন রোজই রাত করে বাড়ি ফেরে। অফিস থেকে ফেরার সময় আনাজপাতি, মাছ, মাংস নিয়ে বাড়ি ফিরতো। একবার গরমের ছুটির সময় রকি মা'র কাছে মামাবাড়ি যাবার জন্য বায়না ধরলো। মলি বললো ঃ " আমার ও তো খুব ইচ্ছে করে রে। কতদিন যাইনি। দেখি যদি অফিস থেকে সাতদিনের ছুটি পাই। " পরের দিন অফিসে গিয়ে বসের কাছে সাতদিনের ছুটি চেয়ে একটা এপ্লিকেশন জমা দিলো মলি। মলির অফিসের বস খুশী মনে ছুটি সেংশন করে দিলো। আসলে মলি খুব একটা ছুটি নেয় না। অফিসের কাজ ও খুব ভালো ভাবে ই সামলায়। তাই মলির ছুটি পেতে কোনো অসুবিধে হলো না। গগন বললো ঃ " আমি কিন্তু যেতে পারবো না। অফিসে খুব কাজের চাপ। তাছাড়া বাবা, মা কে একা একা রেখে সবাই মিলে যাওয়া যাবে না। " কাজেই মলি আর রকি সাতদিনের জন্য রাজনগরে গেলো। ওখানে মলির বাবা, মা,দুই ভাই , তাদের বৌরা আছে। মলির বড় ভাই য়ের দুই ছেলে আর এক মেয়ে। মলির ছোট ভাই য়ের দুই ছেলে। মামাবাড়ি গেলে ওদের সঙ্গে খেলা করে , গল্প করে রকির খুব ভালো লাগতো। ভবানীপুরের বাড়িতে তো একা একা থাকতে হয়। শুধু দাদু আর ঠাকুমার সঙ্গে কাটাতে হয় সারাদিন। মলির বাবা, মার বয়স হয়েছে। মলিকে অনেক দিন পরে কাছে পেয়ে খুব খুশী ওরা। মলির বাবা বললো ঃ " জামাই বুঝি আসতে পারলো না? " মলি বললো ঃ " না বাবা ওর অফিসে অনেক কাজের চাপ। " মামাবাড়ি এসে রোজ বিকেলে রকি মামাতো ভাই, বোনের সঙ্গে ধাবার মাঠে খেলতে যেতো। মলির বড়ো ভাই য়ের বড়ো ছেলে টা একটু অন্য ধরনের ছেলে। সব সময় পড়াশোনা নিয়ে থাকে। একদিন বিকেলে রকিরা ধাবার মাঠ থেকে ফেরার সময় আকাশ কালো করে এলো। গুড় গুড় করে মেঘ ডাকছিলো। ওরা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলো। রকির মামাবাড়ির পাশেই একটা বাঁশ বাগান ছিলো। ওরা যখন বাড়ি ফিরছিলো তখন দেখলো বাঁশ বাগানে সাদা কাপড় পরে কেউ একজন মাথা নারছে। রকিরা খুব ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি ছুটে বাড়ি পৌঁছে বললো ঃ " বাঁশ বাগানে সাদা কাপড় পরে একটা ভূত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ছে। আমরা ভয়ে ভয়ে ছুটে বাড়ি এসেছি। " ওদের অবস্থা দেখে রকির বড়োমামার ছেলে হো হো করে হাসছিলো আর বলছিলো ঃ " ও রে বোকা হাঁদার দল। ভূত বলে কিছু হয় না। এখুনি সবাই চল আমার সঙ্গে। " রকিরা তখন ও ভয়ে কাঁপছে। রকির বড়োমামার ছেলে সঙ্গে সঙ্গে একটা টচ হাতে নিয়ে জোর করে সবাই কে বাঁশ বাগানে নিয়ে গেলো। বাঁশগাছের উপর আলো ফেলতেই সবাই দেখলো একটা বাঁশ গাছের উপরে একটা সাদা কাপড় পরে আছে। হাওয়ায় গাছ টা নড়লেই কাপড় টা ও নড়ছে। বড়োমামার বড়ো ছেলে গৌতম বললো ঃ " আসলে ভূত বলে কিছু ই নেই। সবই আমাদের মনের ভুল। " সেদিন গৌতম দার কথায় রকিদের ভুল ভাঙলো। সত্যি ই তো আসলে ভূত বলে কিছু ই নেই। সবই আমাদের মনের ভুল। এই ঘটনার দুই দিন পরে ই রকিরা ভবানীপুরে ফিরে গিয়েছিলো। দাদু, ঠাকুমা আর বাবা কে সবকিছু গল্প করেছিলো রকি। রকির দাদু বললো ঃ " ঠিক ই বলেছে গৌতম। সত্যি ই তো ভুত বলে কিছু ই নেই। সবটাই মনের ভুল।

গল্প || প্রাক্তন || বর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

 প্রাক্তন



বছর সাতেক পর

মুখোমুখি আবারো নীলা আর সায়ন | এই সাত বছরে দু'জনের মধ্যে বিশেষ কিছু পরিবর্তন না হলেও; নীলার সঙ্গে রয়েছে একটি ওই বছর ছয়েকের বাচ্চা আর সায়ন বাইক ছেড়ে এখন চার চাকার মালিক...

আজ এতদিন পর প্রাক্তন কে সামনে পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে না গিয়ে ;এক প্রকার যেচে সায়ন বলে উঠলো -কেমন আছো নীলা?

-ভালো আর তুমি?

-ভালো ; প্রায় সাত বছর পর আজ দেশে ফিরলাম; আমি এখন USA থাকি

-বাহ ! বিয়ে করেছো নাকি?

-না এখনো করা হয়নি ; দেশ এই কারণেই আশা!তাই এটা কি তোমার মেয়ে?

-হ্যাঁ

-খুব মিষ্টি দেখতে!! বয়স কত হলো?

-পাঁচ বছর(একটু থেমে) 

  কিন্তু একরত্তি পাকা মেয়েটি বলে উঠলো - "না আমি ছয় বছর মা মিথ্যা বলো না !!আমি এখন বড় হয়ে গেছি"


নীলা ধমক দিয়ে মেয়েকে চুপ করিয়ে দিল...

তারপরই একে অপরকে কিছু না বলেই দুজন দুজনের রাস্তায় চলে গেল ঠিক সাত বছর আগের মত নিঃশব্দে ....

নিলা বাজার থেকে ফিরে যথারীতি সংসারের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সায়ন এর কোন কথাই তার মধ্যে কোন প্রভাব ফেলেনি...

আজ নীলার বাড়িতে আত্মীয় সমাগম ,তার শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে অনেকেই আসবে আজ অনেক বছর পর সবাই একসাথে একটা আনন্দের আড্ডা ...সন্ধ্যে নামতেই একের পর এক আত্মিয়ের আগমন; আবারও সায়ন নিলা মুখোমুখি

- আমি'ত ভাবতেই পারছি না নীলা তোমাকে আমি এইভাবে এইরূপে দেখবো! এটা কি করে পসিবল? 

- কোন'টা ভাবতে পারছো না সায়ন আমি তোমার দাদার স্ত্রী এটা? 

- শেষমেস তুমি কি আর কোনো ছেলে পেলে না ?আমার দাদাকেই এভাবে ফাঁসাতে হলো, ঠকাতে হলো তোমায়!

- ভুল করছো তুমি ।ছেলে তো প্রচুর ছিলো তোমার দাদার মতো উচ্চ মানসিকতার আর কাউকে যে পেলাম না।  

আর রইলো পড়ে তোমার দাদাকে ফাঁসানোর কথা, আমার অমন অভিরুচি থাকলে তুমি আজ আমার মাসতুতো দেওর না, বাধ্য হয়ে আমার বর হতে সায়ন |

আর ঠকানোর কথা বলছোতো! সেতো তোমার দাদা তার ভাইয়ের থেকে চরমভাবে ঠকে যাওয়া এই আমিকে ব্যাপকভাবে জিতিয়ে দিলেন স্বেচ্ছায় আমার কপালে সিঁদুর দান করে।

-হ্যাঁ সায়ন আমি ঠকতেও জিতে গেছি। 

 

- উফ্ফ্! দাদা সবটা জেনেও যে কি করে এটা করতে পারলো! আমি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা।

- ওই যে বললাম উন্নত মানসিকতার জোরে। তোমার মতো ছেলেরা শুধু প্রেম করতে পারে ;কিন্তু দায়িত্ব নিতে পারে না। অথচ দেখ তোমারই দাদা নিজের ভাই এর প্রেমিকা ও তার অনাগত সন্তানের দায়িত্ব কিভাবে নিজের কাঁধে নিয়ে নিলেন। জান সায়ন আমার সন্তানের পরম সৌভাগ্য যে ও তোমার দাদার মতো একজন উদার ও নির্মল মানসিকতার মানুষকে বাবা হিসেবে পাবে। ওঁর পরিচয়ে বাঁচবে। 

এই সবকিছুর জন্য অবশ্য তোমার অবদান আমি কখনোই অস্বিকার করতে পারবো না |

তাই একটা ধন্যবাদ তোমারও প্রাপ্য। তোমার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম সায়ন |আর তুমি হলে আমার সেই প্রাক্তন যে জীবনে আসে ছেড়ে চলে যাবার জন্য |

যা'ই হোক এবার তুমি আসতে পারো, আশা করি তোমার সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর তুমি পেয়ে গেছো।

-কি বলছ নীলা ,সানা আমার মেয়ে ??

-থাক ওসব কথা 


তারপর কাউকে কোনো কিছু বুঝতে না দিয়ে নীলা ও সায়ন যথারীতি আবার সকলের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত ;যেন দেওর আর বৌদির মধ্যে আগে কোনো সম্পর্কই ছিল না| এই প্রথম দেখা আর সম্পর্ক বেশ ভালই জমে উঠেছে...

কিন্তু আজ নীলার সেই সাত বছর আগের কথাগুলো খুব মনে পড়ছে

সায়ন আর নীলা কলেজের একসাথে পড়তো

সম্পর্কটা শুধুমাত্র বন্ধুত্বে আটকে না থাকে প্রেম পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই গিয়েছিল যার ফলস্বরুপ নীলার সন্তান সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছিল|

বেশ কিছুদিন ধরে মাথা ঘোরা , আর বমি ভাব নিয়ে যখন এক প্রকার ফল কি হবে তা জেনে এই পরীক্ষা করেছিল ;সেই আনন্দের খবর টা সায়ন কেই প্রথম দেবার জন্য ফোন করেছিল নীলা

-সায়ন একটা সুখবর আছে, তুমি আজ আর আমার শুধুমাত্র প্রেমিক নও তুমি আমার সন্তানের বাবা সায়ন!! আমরা বাবা মা হতে চলেছি..

-এসব কি বলছ নীলা ?আমি তো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই! তুমি এক্ষুনি আমার হাত পা জড়িয়ে বাবা বানিয়ে দিতে চাইছ!!??

-মানে কি বলতে চাইছ ? এটা তো আমার একার দায়িত্ব কিছু হয়নি|

-দেখো নীলা , যত তাড়াতাড়ি পারো বাচ্চাটা নষ্ট করে দাও; আর আজকের পর থেকে আমাকে ফোন করো না !!সে বাচ্চা নষ্ট হওয়ার আগে পর্যন্ত যা যা লাগে আমি দেবো..

-নীলা ফোন কেটে দেয় এক প্রকার তার কথা সম্মতি না দিয়ে সম্পর্ক শেষ করছে সেটা বুঝিয়ে দেয় 


আজ সাত বছর সংসার করার পর ; নীলার আক্ষেপ কিছুই নেই |সে মনে করে সাত বছর আগে তার নেওয়ার দুটো ডিসিশান সম্পূর্ণ সঠিক ছিল|

গল্প || বাংলা ভাষা || সিদ্ধার্থ সিংহ

 বাংলা ভাষা




এক প্রাইমারি স্কুলের বাংলা শিক্ষককে হাইস্কুলের এক শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন, বলুন তো এই পৃথিবীতে সব থেকে কঠিন ভাষা কোনটা?

প্রাইমারি শিক্ষক বললেন, কেন? বাংলা।

--- বাংলা? আপনি বাঙালি। আপনার মাতৃভাষা বাংলা। তার উপরে আপনি বাংলা ভাষার শিক্ষক। আর আপনি কিনা বলছেন পৃথিবীর সব থেকে কঠিন ভাষা বাংলা?

--- বলছি। কারণ, বাংলা ভাষা এমন একটা ভাষা, আপনি যদি আপনার বউকে বলেন আমি ছেলেমেয়ে নিয়ে শুয়ে আছি। বউ খুশিই হবে। কিন্তু এই 'ছেলেমেয়ে' শব্দটাই আপনি যদি একটু আগুপিছু করে বলেন, আমি 'মেয়েছেলে' নিয়ে শুয়ে আছি, তা হলেই বুঝবেন বাংলা ভাষা কত কঠিন।


গল্প || করিম চাচা ও সাদ্দাম || আব্দুস সাত্তার বিশ্বাস

 করিম চাচা ও সাদ্দাম




করিম চাচার খামার পাড়ার ছেলেদের খেলার জায়গা। তিনি এদের প্রত‍্যেককে চেনেন এবং জানেন। এদের মধ্যে একজন বাদে সবাই ভালো ছেলে। করিম চাচার মতে,একে এখনই সংশোধন করা দরকার। না হলে বড় হয়ে পরে একটা গুণ্ডা, বদমাশ তৈরি হবে। মানুষ হবেনা। তার আচরণ, দেহভঙ্গিমা আর যা মনোভাব।


অতএব করিম চাচা কোন মারধর ও বকাঝকা ছাড়াই তাকে একদিন ডাকেন, সাদ্দাম!

কী, বলেন?

তোকে আমি রোজ ত্রিশ টাকা করে দেব, নিবি?

হ‍্যাঁ, নেব।

কিন্তু কেন দেব, জানিস?

না। কেন?

তুই হলি খুব ভালো ছেলে, তোকে আমার খুব ভালো লাগে। কারণ, তুই কারও সাথে ঝামেলা করিস না। আর দেখ, বাকিদের চিৎকার আর চেঁচামেচিতে আমি বাড়িতে টিকতে পারিনা। তাই, আমি ঠিক করেছি, তোকে রোজ ত্রিশ টাকা করে দেব। এই নে, আজকেরটা; আবার আগামীকাল দেব। এটা তোর ভালো ছেলে হওয়ার পুরস্কার।


পরেরদিন তিনি ওর মধ্যে একটু পরিবর্তন লক্ষ্য করেন এবং কিছু দিনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখে তিনি কী আনন্দ পান!

গল্প || হারাধনের ভূতের গপ্পো || শ্যামল চক্রবর্ত্তী

 হারাধনের ভূতের গপ্পো


        

                    


হারাধন: বলো কাকা, এই যে মাঠের পেছনে কালীবাড়ি, পেছনদিকে সেন বাবুর বাগানে, ওখানে একটি পুকুর আছে। পুকুরটা খিরকির পুকুর। আমার বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে অনেক বাজি লড়েছিল। রাত্রিবেলা এই ঘুটঘুটে অন্ধকার ওখানে একটা জাম গাছ আছে। ওই জাম গাছ থেকে যদি চারটে পাতা আনতে পারো তাহলে তোমাকে এক হাজার টাকা পুরস্কার দেব। কেউই বাজি ধরতে রাজি হয়নি।

বলছে ওরে বাবা এই ঘুটঘুটে অন্ধকার আমাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব না।

আমি বললাম আমাকে টাকা দিবি বল। আমি তোকে দেখিয়ে দিচ্ছি।

নেদো: আচ্ছা তুমি ছোটবেলায় এখানে মানুষ তুমি খুব সাহসী তুমি তো পারবে।

কাকা: অন্ধকারে ভুত সবাই ভয় পায়।ভূত একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ অতীত বা সত্তা।ভারতবর্ষে ভূত বিশ্বাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মনে গভিরভাবে বদ্ধমূল হয়ে আছে। ভূতের বিবিধ ধারণার মূলে রয়েছে হিন্দু পুরাকথার সুবিশাল ক্ষেত্র ও এর ধর্মীয় গ্রন্থাবলী, সাহিত্য ও লোককথা। ভারতে উপমহাদেশে অনেক অভিযুক্ত ভুতুড়ে স্থান রয়েছে যেমন, শশ্মান (কিংবা কবরস্থান), ভাঙ্গা দালানকোঠা, জমিদারবাড়ি বা রাজবাড়ি, দুর্গ, জঙ্গলের মাঝে বাংলাবাড়ি, চিতা দহনের ঘাট, ইত্যাদি।

নেদো: বাঙালী সংস্কৃতিতেও ভূত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে বলো। ভূত ও বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত সত্তা গ্রামবাংলার সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কাকা: রূপকথায় প্রায়ই ভূতের ধারণা ব্যবহার হয়ে থাকে এবং আধুনিককালের বাংলা সাহিত্য, চলচ্চিত্র, বেতার ও টেলিভিশন প্রোগ্রামে ভূতের উপস্থিতি যথেষ্ট পাওয়া যায়।হিন্দুধর্মে প্রেত একটি বাস্তব সত্তা। আমি অত ভয় পাই পাই না ।

প্রেত একটি রূপ-আকৃতি - একটি শরীর যা শুধু বায়ূ ও আকাশের সমন্বয়ে গঠিত। হিন্দু ধর্মমতে সাধারণ পার্থিব শরীর এ দুটি ছাড়াও আরও তিনটি পদার্থ জল, অগ্নি ও পৃথ্বী বা মাটি দিয়ে সৃষ্ট। বিশ্বাস করা হয় পূর্বজীবনের কর্মফল অনুযায়ী এরকম আরও অনেক শরীর আছে ।একটি থেকে তিনটি পদার্থের অনুপস্থিতিতে ঔ‌ জিবাত্মা পুনর্জন্মগ্রহণ করে। একটি আত্মা পুনর্জন্ম ও পুনর্মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ। অনিত্য রূপে আত্মা শুদ্ধ এবং এর অস্তিত্ব দেবতুল্য তবে তা কায়িক জন্মের শেষরূপে। এই পদার্থের অনুপস্থিতির কারণেই প্রেতরা কিছুই হজম করতে পারে না আর তাই ক্ষুধার্ত রয়ে যায়। প্রেতরা মানুষের কাছে অদৃশ্য যদিও কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে নির্দিষ্ট কিছু মানসিক অবস্থায় এদের দেখতে পাওয়া যায়। তারা অনেকটা মানুষের মত দেখতে তবে সঙ্কুচিত ত্বক, সরু অঙ্গ, অতিশয় ফোলা পেট ও লম্বা গলা বিশিষ্ট। প্রেতরা স্বভাবতই আবর্জনাময় ও পরিত্যাক্ত স্থানে বাস করে এবং নিজেদের পূর্বজন্মের কর্ম অনুযায়ী বিবিধ অবস্থায় থাকে। ক্ষুধার সাথে সাথে অসহনীয় উষ্ণতা ও শীতের পীড়াভোগ করে।

নেদো: কাকা ,পেত্নী হলো নারী ভূত যারা বেঁচে থাকতে কিছু অতৃপ্ত আশা ছিল , অবিবাহিতভাবে মৃত্যু হয়েছে তারাই তাই না? পেত্নী শব্দটি সংস্কৃত প্রেত্নী শব্দ থেকে এসেছে (পুরুষবাচক শব্দ প্রেত)। এসব ভূত সাধারনত যে কোন আকৃতি ধারণ করতে পারে, এমনকি পুরুষের আকারও ধারণ করতে পারে? এসব ভূত সাধারনত বেঁচে থাকে। মৃত্যুর পর অভিশপ্ত হয়ে পৃথিবীতে বিচরণ করে।

কাকা : পেত্নীরা সাধারনত ভীষণ বদমেজাজী হয়ে থাকে এবং কাউকে আক্রমণের পূর্ব পর্যন্ত স্পষ্টতই মানুষের আকৃতিতে থাকে। পেত্নীদের আকৃতিতে একটিই সমস্যা রয়েছে, তা হলো তাদের পাগুলো পিছনের দিকে ঘোরানো।তাদেরকে চেনার একটিই উপায় আছে এবং সেটা হলো তাদের পা দেখে।যদিও এরা সাধারণ নারীর বেশ ধরে থাকতে পারে কিন্তু তারপরও তাদের পা গুলো পেছনের দিকে ঘোরানো থাকে অর্থাৎ মানুষের বেশ ধরে থাকা অবস্থাতেও তাদের পায়ের আঙুলগুলো পেছনের দিকে এবং পায়ের পাতা সামনের দিকে ঘোরানো থাকে।

নেদো: কাকা যা বলছ শুনলেই ভয় লাগে। শাকচুন্নির সম্বন্ধে কিছু বল।

কাকা:শাকচুন্নি শব্দটি সংস্কৃত শব্দ শঙ্খচূর্ণী থেকে এসেছে। এটা হলো বিবাহিত মহিলাদের ভূত যারা বিশেষভাবে তৈরি বাঙ্গালি শুভ্র পোশাক পরিধান করে এবং হাতে শঙ্খ বা শাঁখাপরিধান করে। শাঁখা হলো বাঙ্গালি বিবাহিত হিন্দু মহিলাদের প্রতীক। শাকচুন্নিরা সাধারনত ধনী বিবাহিত মহিলাদের ভেতর ভর করে বা আক্রমণ করে যাতে করে তারা নিজেরা সেই মহিলার মত জীবন যাপন করতে পারে ও বিবাহিত জীবন উপভোগ করতে পারে। লোকগাঁথা অনুসারে তারা শেওড়া গাছে বসবাস করে।

নেদো: আচ্ছা আমি একটা বইতে পড়েছি কাকা,

চোরাচুন্নি অত্যন্ত দুষ্ট ভূত। এরা মানুষের অনিষ্ট করে থাকে। সাধারনত কোন চোর মৃত্যুবরণ করলে চোরাচুন্নিতে পরিনত হয়। পূর্ণিমা রাতে এরা বের হয় এবং মানুষের বাড়িতে ঢুকে পড়ে অনিষ্ট সাধন করে। এদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বাড়িতে গঙ্গাজলের ( গঙ্গা জলকে পবিত্র) জল ব্যবস্থা করা হয়।

তাছাড়া এ ধরনের ভূত সচরাচর দেখা যায় না। পেঁচাপেঁচি ভূত ধারনাটি পেঁচা থেকে এসছে এর স্ত্রী বাচক হলো পেঁচি। এরা জোড়া ধরে শিকার করে থাকে। বাংলার বিভিন্ন জঙ্গলে এদের দেখা যায় বলে বিশ্বাস করা হয়। এরা সাধারনত জঙ্গলে দুর্ভাগা ভ্রমণকারীদের পিছু নেয় এবং সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় ভ্রমণকারীকে আক্রমণ করে মেরে ফেলে ও এরা শিকারের মাংস ছিড়ে ছিড়ে খায়।

বুড়ো: কাকা, তোমরা কি গল্প করছো ?

কাকা: নেদো ভূতের গল্প শুনতে চাইছে সত্যি ভূতের গল্প আমাদের বাড়ির সামনে যে খ্যাতির পুকুর আছে বিভিন্ন ভূত সম্বন্ধে আলোচনা করছি।

বুড়ো: তুমি মেছো ভূতের নাম শুনেছো। এ ধরনের ভূতেরা মাছ খেতে পছন্দ করে। মেছো শব্দটি বাংলা মাছ থেকে এসেছে। মেছো ভূত সাধারনত গ্রামের কোন পুকুর পাড়ে বা লেকের ধারে যেখানে বেশি মাছ পাওয়া যায় সেখানে বসবাস করে। মাঝে মাঝে তারা রান্নাঘর বা জেলেদের নৌকা থেকেও মাছ চুরি করে খায়। বাজার থেকে কেউ মাছ কিনে গাঁয়ের রাস্তা দিয়ে ফিরলে এটি তার পিছু নেয় এবং নির্জন বাঁশঝাঁড়ে বা বিলের ধারে ভয় দেখিয়ে আক্রমণ করে মাছ ছিনিয়ে নেয়।' দেও ' 1 ধরনের ভূত পুকুর-ডোবা,নদী এবং বিভিন্ন জলাশয়ে বসবাস করে। এরা লোকজনকে জলে ফেলে ডুবিয়ে মারে বলে বিশ্বাস করা হয়। জলাশয়ে স্নান করতে আসা মানুষদের একা পেলে এরা নিচ থেকে তাদের পা টেনে ধরে পানির গভীরে নিয়ে যায়।এতে করে সেই ব্যক্তি শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়।

কাকা :নিশি ভূতদের মধ্যে অন্যতম ভয়ংকর হলো নিশি। অন্যান্য ভূত সাধারণত নির্জন এলাকায় মানুষকে একা পেলে আক্রমণ করে, কিন্তু নিশি গভীর রাতে শিকারকে তার প্রিয় মানুষের কন্ঠে নাম ধরে ডাকে এবং বাইরে বের করে নিয়ে যায়। নিশির ডাকে সারা দিয়ে মানুষ সম্মোহিত হয়ে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে, আর কখনো ফিরে আসে না। মনে করা হয় তারা নিজেরাও নিশিতে পরিনত হয়। কিছু কিছু তান্ত্রিক অন্যের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নিশি পুষে থাকে। লোককাহিনী অনুসারে নিশিরা কোন মানুষকে দুবারের বেশি ডাকতে পারে না। তাই কারো উচিত রাতে কেউ তিনবার ডাকলেই ঘর থেকে বের হওয়া এতে করে নিশির আক্রমণের ভয় থাকে না।

বাবু : কাকা তোমারি ছোট ভাইপো নেদো, ও ভুতের ভীষণ ভয় পায়। তুমি ওকে ভূতের গল্প শোনাচ্ছো।

নেদো: কাকা আমিতো ভয় পাই তোমার বড় ভাই ভূষণ ভূতের ভয় পায়। আমার কথা বলছো তো।

তুমি আরেকটা ভূতের কথা বলিস না। মামদোভুত ।হিন্দু বিশ্বাস মতে, এক বিশেষ সম্প্রদায় ব্যক্তিদের আত্মা। এদের শরীরের গঠন অনেকটা শুক্রাণুর মতো অর্থাৎ এদের কোমরের নিচ থেকে ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে গেছে। এদের কোন পা নেই এবং এরা বাতাসে ভেসে থাকে।এদের কারোর মাথায় টুপি এবং লম্বা লম্বা দাড়ি দেখতে পাওয়া যায়।এরা সাধারণত কবরস্থানের আশে-পাশে থাকা বড় ও ঘন গাছ-পালায় বসবাস করে এবং সেখান দিয়ে কেউ গেলে এরা তাদের বিভিন্ন ভাবে ভয় দেখায় বলে লোককথা প্রচলিত রয়েছে।

বাবু : আরেকটা ভূতের কথা বলে না কাকা গেছোভূত। গেছো ভূত গাছে বসবাস করে। গেছো শব্দটি গাছ (বৃক্ষ) শব্দ থেকে এসেছে।লোকগাঁথা অনুসারে যেসব মানুষ গাছের ডালে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে তাদের আত্মা সেই গাছের মধ্যেই থেকে যায় এবং গেছো ভূতে পরিণত হয়।তবে তারা বিভিন্ন গাছেই বসবাস করে থাকে।বড় ও ঝোপালো গাছপালা এদের প্রিয় আশ্রয়স্থল।এরা বিভিন্ন ভাবে মানুষকে ভয় দেখায়।এদের মধ্যে অতি প্রচলিত ধরণটি হচ্ছে, রাতে যখন কোন ব্যক্তি একা পথ দিয়ে হেটে যায় তখন এরা গাছে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলিয়ে থাকে ফলে সেই ব্যক্তিটি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।কারো কারো অভিমত অনুসারে এদের শরীরের গঠন অনেকটা বানরের মতো এবং এরা তালগাছে থাকে। এরা তালগাছ থেকে এমন ভাবে নিচে নেমে আসে যেমন করে টিকটিকি দেওয়ালে চলাফেরা করে অর্থাৎ মাথা নিচের দিকে ও পা উপরের দিকে রেখে গাছ বেয়ে নেমে আসে।

কাকা: আর একটা ভয়ঙ্কর ভূত ব্রহ্মদৈত্য।সবচেয়ে জনপ্রিয় সাধারনত কারো ক্ষতি করে না। এ ধরনের ভূতরা হলো ব্রাহ্মণের ভূত। সাধারনত এরা ধূতি ও পৈতা পরিহিত অবস্থায় বিচরণ করে। এদেরকে পবিত্র ভূত হিসেবে গণ্য করা হয়। তারা অত্যন্ত দয়ালু ও মানুষকে অনেক উপকার করে থাকে।

কাকা : এবার একটা ভূতের গল্প করবো সেটা আলেয়া

একদিন রাত দুটোর সময় আমাদের কাঞ্চন তলা থেকে হেঁটে হেঁটে আসছি। আর ঐ চটকার পোল । যেখানে প্রচুর গরু-মোষ থাকে ওইখানে খাটাল। প্রচুর গোবর আছে । দপ দপ দপ আগুন জ্বলছে।

নিশুতি রাত কেউ নেই অন্ধকার ঘুরঘুর করছে। আমার তো ভয় ডর নেই। আমি এগিয়ে গিয়ে ওর ধরতে যাচ্ছি আর দেখছি আবার এগিয়ে যাচ্ছে। এগুলো সচরাচর অন্ধকারে জলাভূমিতে বা খোলা প্রান্তরে আলেয়া দেখা যায়। মাটি হতে একটু উঁচুতে আগুনের শিখা জ্বলতে থাকে। আবার ধরতে যাচ্ছি আবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । এগুলোকে আলিয়া ভূত বলে ।

তবে লোককথায় একে ভৌতিক আখ্যা দেওয়া হলেও বিজ্ঞানীরা মনে করে গাছপালা পচনের ফলে যে মার্শ গ্যাসের সৃষ্টি হয় তা থেকে আলেয়া এর উৎপত্তি। সুতরাং বুঝতে পারছিস আলিয়া ভূত কি ।

নেদে: তুমি কাকা যাই বলো অন্ধকারে ঘুটঘুটে, বিজ্ঞান টিজ্ঞান যাই বলো । লোকে আঁতকে উঠবে। ফলে জেলেরা ভুল বুঝে সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে মৃত্যুবরণ করে। শুনেছি নাকি বাচ্চা একদম কচি বাচ্চারা মারা গেলে নাকি হয়।

বাবু: বাঘের আক্রমণে মৃত্যু হলে বেঘোভূত হয়, করা হয়। সাধারনত সুন্দরবন এলাকায় এধরনের ভূতের কথা বেশি প্রচলিত কারণ বাঘের অভাশ্রম হলো সুন্দরবন। এসব ভুতেরা জঙ্গলে মধু সংগ্রহ করতে আসা গ্রামবাসীদের ভয় দেখায় এবং বাঘের সন্নিকটে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে এরা গ্রামবাসীদের ভয় দেখানোর জন্য বাঘের স্বরে ডাকে।

কাকা :কন্ধকাটা ভূতেরা মাথাবিহীন হয়ে থাকে। সচরাচর এরা হলো সেইসব লোকের আত্মা যাদের মৃত্যুর সময় মাথা কেটে গেছে যেমন, রেল দুর্ঘটনা বা অন্য কোন দুর্ঘটনা। এ শ্রেণীর ভূতেরা সবসময় তাদের হারানো মাথা খুঁজে বেড়ায় এবং অন্য মানুষকে আক্রমণ করে তাদের দাসে পরিণত করে ও তার মাথা খুঁজার কাজে নিয়োগ করে।

আমার একটা পরিচিত ভুতের কথা বলছি- কানাভুলো এ শ্রেণীর ভূতেরা পথিকের গন্তব্য ভুলিয়ে দিয়ে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয় এবং অচেনা স্থানে নিয়ে আসে। মাঝে মাঝে মানুষ একই রাস্তায় বারবার ঘোরপাক খেতে থাকে। ভূতরা কোন নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌচ্ছার পর তার শিকারকে মেরে ফেলে। এক্ষেত্রে শিকার তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এধরনের ভূতদের রাতে গ্রামের মাঠের ধারে পথের মধ্যে দেখা যায়। শিকার সবসময় একাকী থাকে বা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তোর বাবার বাড়ি শিকার হয়েছিল এই গল্প ও তোকে আমি।

নেদো: আরেকটা ভূতের কথা বললে না কাকা, ডাইনি ভূত। ডাইনী মূলত কোন আত্মা নয়, এরা জীবিত নারী। বাংলা লোকসাহিত্যে সাধারনত বৃদ্ধ মহিলা যারা কালো জাদু বা ডাকিনীবিদ্যাতে পারদর্শী তাদেরকেই ডাইনি বলা হয়ে থাকে। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, ডাইনীরা গ্রামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের ধরে নিয়ে তাদের হত্যা করে এবং তাদের হাড়, মাংস ও রক্ত খেয়ে বহু বছর বেঁচে থাকে।

বাবু: কাকা ভাই আর একটা ভূতের নাম শুনলে পিলে চমকে যাবে। ডাইনি বুড়িদের ।অনুগতশ্রেণির ভূত। পাতিহাঁস খেতে খুব ভালোবাসে এরা। থাকে পুকুর বা দিঘীর ধারে কোনো তাল বা নারিকেল গাছে। রাতদুপুরে মেয়েলোকের বেশে ঘুরে বেড়ানো এদের অন্যতম অভ্যাস।

নেদো :কাকা এত একটা ভূতের সম্বন্ধে বলে এবার আসল গল্পে আসো।

কাকা: তোকে যেটা বলছিলাম খিরখির পুকুরের গল্পটা। অন্ধকারে বন্ধুদের সঙ্গে আমার বাজি হয়েছে তো। ভুলে কোন টর্চ ,লাইট, কোন লোহা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। যাই হোক আমি তো সাড়ে বারোটা নাগাদ আমি একা একা গেলাম ওখানে। ওখানে যে জাম গাছটা আছে। দূরে দেখি। একটা বুড়ি , পেত্নী ভুতের কথা বললাম। আগেই বলেছি। দেখি মাথায় পুরো ঘোমটা দেওয়া। সাদা রঙের শাড়ি লাল পাড়। দেখি পা দোলাচ্ছে জাম গাছে। আমি এত সাহসী, আমার গাটা ছমছম করছিল। আরো এগিয়ে গেছি কি আবার হাতছানি দিয়ে ডাকছে। গোড়ালি দুটোও উল্টানো। আমার মত লোক এত সাহসী আমি পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেছি।


ভুত ভুত ভুত ভেতরটা আমার হারিম হলো।

টক ঠক করে কাঁপছিলাম সাহস আমার কোথায়।

তোরা হলে আঁতকে মরবি, ঘুটঘুটে অন্ধকারে।

নিদো তোকে কি বলবো, ভূত আছে না নেই।

অনুভূতি অন্ধকারে মিলবে এক শিহরণ ভীতি।


Prose || THE GODDESS KAUSHIKI || Kunal Roy

 THE GODDESS KAUSHIKI




The demons Shumbh and Nishumbh sought blessings from the creator Brahma. They desired to get themselves killed by a woman with divine powers. They never thought that a woman would be responsible for their death. They always believed in belittling the woman power. However, their pride and arrogance aided them to snatch the Heavens from the Gods! Being tormented they began worship the Adi Shakti, the divine consort of Lord Shiva. This simply enraged Parvati and she gave birth to Goddess Kaushiki from her kosh( cell),the fundamental unit of life.

  Kaushiki rode on a lion and settled at Vidhayas. The ministers of the demon king Shumbh were attracted by the heavenly beauty of the Goddess and described her before Shumbh. And Shumbh was betwitched by her elegance, expressed his intense desire to wed her and sent Sugriva with his proposal to Kaushiki. But the Goddess told him, "Out of childhood innocence, I have promised to marry that person who would defeat me in the battle". Sugriva warned her but in vain. Listening to Sugriva, Shumbh's wrath burst forth. He desired to send Dhumrolochan, his minister to bring the Goddess before him. And instructed him that if she denied than he ought to execute the matter by either killing or dragging by her hair to his court. If any one intervened in the whole matter, one should deserve nothing but death! As soon as Dhumrolochan went to fetch the Goddess, he was reduced to ashes! The dismal news reached the demon king Shumbh. He sent Chanda and Munda to complete the task which Dhumrolochan failed to do! Unfortunately, this further enraged her and the four handed black Goddess emerged from her third eye. A severe battle ensued between the Goddess Kali, Ruru and Chanda Munda. Kali killed Ruru followed by Chanda and Munda. She beheaded both of them and brought their heads before the Goddess who blessed her to be known as Devi Chamunda in the whole world. On the other hand, Devi Chandamari who was born off the unkempt hair of Devi Kali killed the monster Mahesh Poundrok! This further paved the path for the monster Raktabij plunge into the battle field. At the very outset it was quite difficult for the Goddesses to kill him as he had the blessings of Lord Shiva. Noticing the faces of the Gods in the heaven, Kaushiki advised Devi Kali to spread her tongue to such an extent so that not a single drop of blood fell on the ground. Kali followed the advice and finally Raktabij was killed by Kali. But her lust for blood didnot abate! She turned into a blood thirty woman. She even wanted to drink the blood of the Goddess's 'sixty four Yoginis'! They wanted a protection from Kaushiki, but she was once more into a deep penance! Kali ran helter-skelter and the whole creation seemed to have been engulfed by her. The Gods made a plea to the Lord Shiva to douse her flames of anger and save the whole creation! The Lord intervened, Kali landed her right foot on His chest and out of shame, darted out her tongue. She sought pardon from the Lord and united again! 

  On the other side, Shumbh and Nishumbh prepared themselves for the battle with Kaushiki and her troupe! Both went to the battle field. Nishumbh went forth and after a severe battle was killed by the Goddess. Later Kaushiki summoned her 'asta matrikas' who were actually her different manifestations! Seeing all these Shumbh blamed Kaushiki for seeking their help to kill him. The Goddess smiled and said, " O , the demon Shumbh, they are all my powers of variety. Look they all are merging in me". This astounded Shumbh as he stood with a gaping mouth. The demon and the Goddess fought on the land and sky. After all his powers failed against Kaushiki, she killed him with the divine trident! The battle ended and peace was restored! Later Kaushiki took the form of Devi Matangi before being Parvati once more for the Kailash! They were answered for belittling the woman power which is the primary source of this entire creative process! There would have been no light, no rhythm, no sound and no vibration in her absence! Time to realise the truth before it becomes too late and we need to count a heavy cost!