Sunday, December 19, 2021

Photography || Nilanjan de


 

Photography || Amit pal

 


গদ্য || প্রতিবন্ধী || প্রদীপ কুমার লাহিড়ী

প্রতিবন্ধী



আমরা যারা শরীরের বিভিন্ন অর্গান হারিয়ে প্রতিবন্ধী জীবনের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছি আবার আমাদের মধ্যে অনেক আছেন যারা সো বাঁধা বিপত্তি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেয়ে ছেন তারই একটা চেষ্টা তুলে ধরলাম আমার লেখার মাধ্যমে l

কি কোইন্সিডেন্স !১৯৯২ এএপ্রিল বিশ্ব বছর আর ১৯৯২ এপ্রিলএ ক্যান্সারে আমার কণ্ঠনালী চিরকালের মতো হারাতে হয় l যদিও সরকার আমাদের প্রতিবন্ধী মনে করেননি,

আর ভারত বা বিশ্বের কোনো মেডিকেল হেল্প ছিলোনা, যা আমাকে কথা ফেরত পাবার উপায় বলতে পারে , অবশ্য আর্টিফিশিয়াল যান্ত্রিক সাহায্য ব্যতীত l

তাই আমাকে বহুদিন বোবাজীবন বইতে হয় নির্বাক প্রতিবন্ধী হয়ে l

মনুষ্যত্বের অসীম আশীর্বাদে আমি

 খাদ্য নালীকে মিডিয়াম হিসেবে ধরে কাজ চালানোর মতো কথা বলতে শিখি l কালক্রমে প্রায় স্বাভাবিক কথা বলা শিখে যাই l আর বহু লোককে, আমার মতো, দেশে বিদেশে শিখিয়ে আসছি , বহুবছর ধরে l

এমনকি স্পিচ থেরাপিস্টরা ও আসেন, এটার ট্রেনিং নিতে আমার প্রতিষ্টিত একটি ক্ষুদ্র সংস্থার মাধ্যমে l

 কিন্তু বাস্তবিক বিচারে একটা ভাইটাল অর্গান যখন আমার নেই তাই একদিক থেকে আমি ও প্রতিবন্ধী l

 তাই সমস্ত পৃথিবীর প্রতিবন্ধী দের জন্যে আমি মর্মবেদনা অনুভব করি l

আজকের দিনে এই কথা গুলি পাবলিকলি জানাতে পেরে মনটা খুব হালকা লাগছে আশা করি এই অপ্রচারিত একটি অবাক করার উপায় 

সহজেই রপ্ত করা যায় যদি নিজের ওপর আস্থা থাকে এত এই বিরল প্রচেষ্টা আমারি শুধু দিতে পারি সংস্থার মাধ্যমে বিনা পারিশ্রমিকে এত আমাদের অহংকার !

রম্যরচনা || তাড়ির কড়চা || অরবিন্দ সরকার

তাড়ির কড়চা

                



কান্দি থানার একেবারে শেষের গ্রাম পলশী। গ্রামের পরেই বিল তেলকর।বন্যায় বর্ষায় ফসল হয়না তবে গ্রামে বন্যার জল প্রবেশ করে না।

বছরে তখনকার দিনে একবারই ফসল হতো।আমন ধান বৃষ্টির জলে উঁচু জমিতে। বন্যায় ডুবে যাওয়া জমিতে খেসারি, মসুর, মটরশুঁটি, ইত্যাদি চাষ হতো।


জানকি মন্ডলের ছেলে তারাপদ তালগাছে তাড়ির চাষ করে।হালে বিয়ে হয়েছে জামনা নামক গ্রামে। মানুষের চৈত্র বৈশাখ মাসে কাজ থাকে না।তাই অভাব লেগেই থাকতো সেসময়। গাছের তাড়ি খেয়েই তাদের উদর পূর্ণ হতো।কচুর শাক, লতাপাতার তরকারি ইত্যাদি সহযোগে তাড়ি সেবা হতো।কেউ কেউ বিল কাঁকড়া, কাদামাছ ধরে রান্না করতো,অথবা মরাবিলে গুগলি শামুক ঝিনুক খাদ্য।


তালের গাছের মালিক কিন্তু মোড়লেরা। তাদের জমির আইলে, পুকুর পাড়ে প্রচুর তালের গাছ। মোড়লের ছেলেরা তেল মেখে চান করার সময় ওদের বাড়িতে বাড়িতে তাড়ি খেয়ে চুপিসারে নিজবাড়ি ফিরে ভাত খেয়ে ঘুম।কেউ কেউ বাড়ি ফিরতো না। মুড়ি গামছায় বেঁধে নিয়ে তাদের দিত ও তাড়ি খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে ওদের বৌয়ের সঙ্গে একটু মেশা মিশি করতো।


সেদিন তারাপদ মাঠ থেকে শামুক গুগলি এনে তার বৌকে বললো এগুলো বেছে রান্না করো। আমি গায়ের কাদা ধুয়ে চান করে পরিষ্কার হ'য়ে আসি।

চান করে গোয়াল ঘরে ঢুকে চক্ষু চড়কগাছ। হ্যাঁ গো ভাগু ! (ভাগ্যবতী নাম) বাড়িতে কে এসেছিল? তাড়ির ভাঁড় যে শুন্য।

ভাগু বললো - তুমি তো না শুনেই চান করতে দৌড়ালে? বলি কি যাদের তাড়ি তারায় খেয়েছে?

তারাপদ তাকে তারু বলেই সবাই ডাকে ? তারু পেটের খিদে তার উপর ওর নাম বলছে তাড়ি! 

একটা গরু চড়ানো পাঁচন দিয়ে পিঠে দুই সাট্ । পাঁচন দিয়ে আঘাতকে সাট্ বলে।

ভাগা শালীর বিটি শালী! কে খেয়েছে আর একবার বল্ ?

ভাগু- বললাম তো যাদের তাড়ি তারায় খেয়েছে তুমি জানকি?

এবার তারু পাঁচন নিয়ে ঘা মেরেই যায়।বলে শালি আমার নাম করছিস্ আবার আমার বাবার নাম করছিস্ জানকি? তোর একদিন কি আমার একদিন। এভাবে ভাগুকে মেরেই চলেছে।ভাগু হাত পা ছড়িয়ে উঠোনে পড়ে গেলো! পাড়াময় লোক ছুটে এসে ভাদুকে চেপে ধরে।যেন আর আঘাত না লাগে। 

এবার তারাপদ চেঁচিয়ে বললো - নষ্টা মেয়ে।সবাই মিলে তোকে চেপে ধরছে আর তুই মজা লুঠছিস্ ? পাড়ার লোকেরা তারাপদর পাঁচন কেড়ে নিয়ে সপাটে গালে চড় থাপ্পর মারতে লাগলো।

তারাপদ- তোমাদের কে ডেকেছে আমার বাড়ীতে? বেরোও বাড়ী থেকে? 

এক পড়শি বললো কেন মারছিস্ তোর বৌকে? খাওয়াবার ক্ষমতা নাই তার উপর মার।

তারাপদ- তোমরা জান ও আমার নাম বলছে আবার আমার মড়া বাবা জানকীর নাম তুলছে? স্বামীর নাম কেউ করে? না শ্বশুরের নাম করতে আছে? ওকে জিজ্ঞাসা করো।

ভাগু আধমরা হয়ে পড়ে আছে।ওকে সবাই তুলে ধরে জিজ্ঞেস করলো - মা বলতো কি হয়েছে? 

তখনই তারাপদ চেঁচিয়ে বললো বল শালী কে খেয়েছে?

ভাগু - তারস্বরে বললো , কতবার বলবো তোমাকে যে যাদের তাড়ি তারায় খেয়েছে? তুমি জান কি?

তারাপদ - এবার মারতে উদ্যত হ'লে সকলে তাকে জড়িয়ে ধরলো।

সকলেই বললো - তাড়ির নামের সঙ্গে তারাপদ নামের মিল নাই।আর তোমার মরাবাবা এখানে নাই।সে সগ্গে গেছে। জানো - কি? এর সঙ্গে জানকির অনেক তফাৎ।


ভাগু এবার সবার কাছে বললো আমি আর এর ভাত খাবো না! আমি বাপের বাড়ি চলে যাবো! সকলের নিষেধ অমান্য করে ভাগু বাড়ীর বাইরে বেরিয়ে এলো।

তারু তাড়াতাড়ি ওর পায়ের কাছে পড়ে বললো - আমার ভাত খাবিনা বলছিস্ ? ভাত তো দিতেই পারি না! তুই আমার কাছে সালুন খেয়েই থাক্। ভাগুর পা আর ওঠে না! চেপে ধরা আছে।

ভাগু- ছিঃ ছিঃ! তুমি স্বামী! আমার পায়ে হাত দিলে যে আমি মহাপাতকিনী হবো। ঠিক আছে আমি আর যাবো না। তোমারই থাকবো।

রম্যরচনা || অন্তরা || সুজিত চট্টোপাধ্যায়

 অন্তরা 



সেই গানটা মনে আছে , 

" তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর হাসি আর গানে ভ`রে তুলবো ,

 যত ব্যথা দুজনেই ভুলবো "

 গায়ক শ্যামল মিত্র , 

মনে আছে ? 

আচ্ছা , বলুন দেখি এখানে তুমি আর আমি বলতে কোন দু'জন কে বোঝানো হয়েছে ? নিঃসন্দেহে বলা যায় , রোমান্টিক গান সুতরাং প্রেমিক প্রেমিকার ব্যাপার। এখানে বাবা মা ভাই বোন বা অন্য কেউ না শুধুই ভালবাসার কপোত-কপোতী দের মনোভাব ব্যক্ত করা হয়েছে। 

" যত ব্যথা দুজনেই ভুলবো "

অর্থাৎ অন্য কারোর ব্যথায় ব্যথিত হবার কোনও দায় নেই। শুধুমাত্র দু'জন দু-জনের ব্যথায় ভোলিনি মলম বুলিয়ে ভুলিয়ে দেবো। দুনিয়া ভোগে যাক। 

এ-ই যে যুগলবন্দী ঘুপচি প্রেম, এর স্থায়িত্ব সম্মন্ধে কেমন যেন সন্দেহ জাগে , তাইনা ?

তুমি আমার আমি তোমার মার্কা এই একবগগা প্রেম, ভ্যানিশ হতে খুব বেশি সময় নেয় না। তুমি আমির ন্যাকামি তখন ঘোর কাটিয়ে রণংদেহী। লাগ লাগ ভেলকি লাগ ,,,,,,,,। 

এবার একঘেয়েমির পালা। সেই একঘেয়েমির দমবন্ধ দশা কাটাতে তৃতীয় কারোর উপস্থিতি চাহিদা তুঙ্গে উঠতে লেগেছে। 

সেইসময় ও-ই শ্যামল মিত্রের গান , মেশিনগান হয়ে বুকে শেল হয়ে বিধছে।  


বেশ ,, ধরা গেল ইচ্ছে হয়ে যে ছিল মনের মাঝারে সে সশরীরে এসে গেল এই ধরাতলে। এইবারে অনিবার্য ভাবেই যত প্রেম ভালবাসা ভাললাগা,,,, উউম আউম চুউম চাউম সব গিয়ে জড়ো হলো সেই নবাগতের চারপাশে। এখন তাকে ঘিরেই যাবতীয় সব। ব্যথাও সেখানে সুখও সেখানে। 

তাহলে শ্যামল মিত্রের গানের সেই গদগদ বাণী " তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর " , তার কী হবে ? 

খেলাঘর এখন তৃতীয় প্রাণীর কব্জায়। জীবনের খেলাঘর এখন রাতজাগা আঁতুড়ঘর।  

মনের লুকোনো কুঠুরি তে চাপা অনভিজ্ঞতার আক্ষেপ মাঝেমাঝেই সংলাপ হয়ে বেরিয়ে আসছে,,,, 

" দু'একজন বয়স্ক কেউ থাকলে ভালো হতো। ওরা সব জানে বোঝে কিনা। "

পুনরায় প্রমাণ হলো অভিজ্ঞতা বড়ই মহার্ঘ্য । 

জীবনে চলার পথে অপরিহার্য । ভালবাসায় না হোক স্বার্থের চাহিদায় তো বটেই । 


" জীবনের খেলাঘর হাসি আর গানে ভ`রে তুলবো।"  

হায়রে , বাস্তব বড়ই কঠিন নিষ্ঠুর। কপোত-কপোতীর মোহ ভাঙা জটিল হিসেবি মনের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে দু-একটি অতি পরিচিত অবহেলিত ভাঙ্গাচোরা মুখের ছবি ।

"দেখা হয় নাই দুই পা ফেলিয়া "

হায় ভবিতব্য ,, যারা ছিল তারা নেই। 

যে ছিলনা সে শুয়ে শুয়ে হাত-পা ছুঁড়ছে । 

অজানা ভবিষ্যৎ এর দূত কাঁদছে। 

এখন গাওয়া যেতেই পারে গানের অন্তরা,, 

" শুধু বলো তুমি কি গো জানতে 

যেতে যেতে এই পথ  

শেষ হবে কোনও মরুপ্রান্তে ? "

নিবন্ধ || বাংলা কবিতা উৎসব কোন্ পথে || তৈমুর খান

 বাংলা কবিতা উৎসব কোন্ পথে


  

     


কবিতা উৎসবগুলি এক একটি গড্ডলিকা প্রবাহ। কবিগণ উৎসবে সামিল হন, অংশগ্রহণ করেন তারপর আবার হারিয়েও যান। কবিতা নামে লেখকর্মটির তাতে কোনো উৎকর্ষতা বাড়ে না, বরং অনেকের ভিড়ে তা চুপসে যায়, হতাশ হতে পারে। কবিতার জন্য যে নিভৃতি বা স্তব্ধতা দরকার,উৎসবগুলি সেই পরিবেশ নষ্ট করে দিতে পারে। যারা মনে করেন হইচই আস্ফালন জনসমাগমে কবিতার পরিপুষ্টি লাভ হয়, তাদের ধারণা সর্বার্থেই ভুল। কবিতা উৎসবে নেই, ভিড়ে নেই, এমনকী মাইকের সামনে সরব পাঠেও নেই। কবিতার পাঠক ও লেখক উভয়কেই কবিতার জন্য একটা স্পেস দরকার হয়। যেখানে একান্ত নিজস্ব সময়ের বাতাবরণ তৈরি হয়। অন্যকারও যেন উঁকি না ঘটে। কবিতা খুবই স্পর্শকাতর শিল্প। আগে উচ্চকিত পাঠে যে আবেগ ধারণ করে একমুখী কবিতা রচিত হত, বর্তমানে প্রকৃত কবিতায় তা আর থাকে না। কবির ব্যক্তিক্ষরণের সঙ্গে সময়ের এক নিবিড় জিজ্ঞাসা সেখানে উপস্থিত হয়। কবির ব্যক্তিক্ষরণের সঙ্গে সময়ের এবং সমাজের পরিচয়টিও উঠে আসে। হৃদয়ের সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম বোধের তীব্র মোচড়ে ভেঙে যায় ধারাবাহিক বক্তব্যও। কবি নাথিংনেস্ প্রজ্ঞায়ও পৌঁছাতে পারেন। সেখানে শূন্যতার অবধারিত প্রলাপে জীবনের নশ্বর মুহূর্তগুলি পাক খায়। কবিতা পাঠে সেগুলি ধরা যায় না। অনেক সময় তা অবাঞ্ছিত মনে হতে পারে। সুতরাং কবিতা সেই শ্লোগান থেকে বেরিয়ে এসে একান্ত অনুভূতির নিরীক্ষণে ভাষাহীন ভাষার মর্মরিত বোধে জারিত হতে চায়। উৎসবের আলো ঝলমলে মঞ্চে সাজসজ্জা পরিবেষ্টিত জবরজং কবিকে দেখা গেলেও তাঁর কবিতার সঙ্গে বসতি স্থাপন করা যায় না। এই মঞ্চ তো বিয়ে বাড়ির মতো আচার অনুষ্ঠানের মঞ্চ। পাঠকও স্থূল বরযাত্রীর মতো হতে বাধ্য। তাদের আত্মিক অন্বয় এবং চেতনার সর্বস্তরের বিকাশ সম্ভব নয়।

    সারা বছর ধরেই কোথাও না কোথাও চলে কবিতা উৎসব। কবিরা বহুদূর থেকে আমন্ত্রিত হয়ে আসেন। অনেক ধৈর্য ধরে বসে থেকে একটা বা দুটো বা অধিক কবিতা পড়ার সুযোগ পান। কিন্তু সেই কবিতা পাঠ কতটা জরুরি ছিল তা ভাবেন না। শ্রোতারা তাঁর কবিতা শুনছেন কিনা সেদিকেও কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। অনেক সময় নিজের কবিতা নিজেকেই শুনে মঞ্চ ছাড়তে হয়। যতটা আড়ম্বর করে, টাকা-পয়সা খরচ করে উৎসবগুলি করা হয় এবং যেসব কবিদের আমন্ত্রণ জানানো হয় তার কোনো সদর্থক উপযোগিতা আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ কবিরা কখনো নিজেদের দীনতা স্বীকার করেন না। তাঁর যোগ্যতা কতখানি সে বিষয়ে তাঁর আত্মসমালোচনা বোধ করেন না। সর্বদা এক ধরনের অহংকারে আচ্ছন্ন থাকেন। ফলে রাজনৈতিক কারণে, কিংবা পরিচিতির কারণে বা কাব্য প্রকাশের কারণে এইসব উৎসবগুলিতে অকবিদেরও ডাক পড়ে। তখন তাঁরা নিজেকে শ্রেষ্ঠ কবি ভাবতে থাকেন। এতে তাঁর প্রতিভার অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটে। প্রতিভা কখনো অহংকারকে সহ্য করে না। সুতরাং উৎসবগুলি উৎসাহ প্রদানের বদলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় কবিকে। সব অনুষ্ঠানে ডাক পান, বহু বইও প্রকাশিত হয়েছে, পত্রিকা সম্পাদনা করেন—এমন কবিকেও আমার কবি বলে মনে হয়নি। কারণ বহু প্রসবার মতো একদিকে তিনি কবিতার মাফিয়ায় পরিণত হয়েছেন। দালাল ও ব্যবসায়ী হিসেবে সব আসনগুলিই তিনি দখল করে নিতে জানেন। কিন্তু এমনও কবি আছেন, যাঁরা কখনোই কোনো অনুষ্ঠানে ডাক পান না, থাকেন কোনো প্রান্তিক শহর বা গ্রামে। তেমন নামকরা কোনো পত্রপত্রিকায়ও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয় না। সেরকম কবিকেই আমার প্রকৃত কবি বলে মনে হয়।

        উৎসবগুলি উৎসব হিসেবেই পরিচালিত হয়। নাগরদোলার মতো তোলান পান কিছু সংখ্যক কবি। রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে তা অপব্যবহারও করেন। নিজের পছন্দের কবিদের ডাকেন (তাঁরা অকবি হলেও)। আর ভালো লিখেও কোনোদিন ডাক পান না, সারাজীবন উপেক্ষিত হতে হয়। কিন্তু শেষ জয় তাঁদেরই হয়। প্রতিটি উৎসবকেই আমার পক্ষপাতমূলক, আড়ম্বর সর্বস্ব, কবিতার ও কবির শত্রু বলে মনে হয়। দায়সারা এইসব উৎসব না হলেই ভালো। কবি তো জনতার ভিড়ে থাকতে পারেন না। উৎসবে যে জনতার মিছিল থাকে, সেখানে শুধু শ্লোগান-ই সাফল্য পায়, কবিতা নয়। আলাপচারিতার কিছুটা সুযোগ থাকে, বই আদান-প্রদান হয়, পত্রিকায় লেখার সুযোগ ঘটে, কিন্তু সেসব সুযোগে কবির বা কবিতার উৎকর্ষতা থাকে না। আলাপের পরবর্তী পর্যায়ে বিস্ময়কর বিস্মৃতি বাস করে। বইপত্রগুলি কোনো বড় কবিকে দিলেও তিনি সেগুলি পড়া তো দূরের কথা, ঘর পর্যন্ত নিয়ে আসেন না। কেউকে দিয়ে দেন, কিংবা আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেন। যেসব পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপানোর সুযোগ ঘটে বলে কবিরা মনে করেন, সেসব পত্রপত্রিকায় না লিখলেই ভালো হয়। কারণ লেখার গুণ ও মান বিচার করে সেসব পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয় না। তবে একটা বিষয় হয়, তা হলো উৎসবগুলিতে খানাপিনা ভালোই চলে। আড়ম্বরের পংক্তিতে বসে বাতেলা মারা সহজ হয়। নিজের গৌরব নিজেই প্রচার করতে পারেন কবিরা। কিছু টাকাও পাওয়া যায়।

       এবছর একটা সরকারি কবিতা উৎসবের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজেকে খুব অসহায় লেগেছে। যে উদ্যোক্তারা সরকারি আনুকূল্যে আমাকে ডেকেছিলেন, তাঁদের কারোরই দেখা পাইনি। কতকগুলি বেতনভুক কর্মচারি ২০০০ টাকার ড্রাপ লিখে দিয়ে ফাঁকা মঞ্চে কবিতা পাঠ করালেন। টাকা নেওয়ায় এবং কবিতা পাঠ করে মনে যে অসন্তোষ জন্মালো তা সহ্য করা কঠিন। অবশ্য অন্যকারও মনে তা (এমনটি) নাও হতে পারে। তবে বেসরকারি কবিতা উৎসবগুলিতে নির্বাচিত কবিদের কবিতা পাঠে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা হতে পারে। সেসব ক্ষেত্রে কিছু পজেটিভ দিক অবশ্যই আছে। কবিতা পাঠ এবং আলোচনায় অনেক দিক খুলে যেতে পারে। তবে তা খুবই নির্বাচিত এবং নির্ধারিত বিষয় হলেই ভালো হয়।

       তাহলে কি কবিতা উৎসবের দরকার নেই?

 একথাটি ভেবে দেখা দরকার। প্রকৃত কবি কে তা নির্বাচন করা খুবই মুস্কিল। জনপ্রিয় কবি এবং প্রকৃত কবির মধ্যে বিস্তর তফাত আছে। জনপ্রিয় কবি তাে আমজনতার কবি। তিনি সরাসরি বক্তব্যপ্রধান কবিতা লেখেন। তিনি হাততালি পান। তাঁর কবিতা শ্লোগান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রকৃত কবি, প্রথমত তিনি কবির কবি; তারপর ভিন্নরুচির মানুষের। তিনি আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। তথাকথিত যশ-খ্যাতির ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থান। অনুষ্ঠানে বা উৎসবে স্বাভাবিকভাবেই তিনি অনুপস্থিত হন। আর জনপ্রিয় কবি মঞ্চ আলো করে কখনো কখনো স্যুট টাই কোট পরে সেন্ট মেখে উপস্থিত থাকেন। তাঁর কবিতা আবৃত্তিযোগ্য, বিবৃতি ও বক্তব্য মানুষকে আকৃষ্ট করে। বর্তমানে যতগুলি কবিতা উৎসব হয় তার বেশিরভাগগুলিতেই এঁরা থাকেন, ডাকও পান। এঁদের কাব্যপ্রকাশও করেন অন্যান্য কবিরা। সুতরাং উৎসব কেবল তাঁদেরই উৎসবে পরিণত হয়।

      কবিতার নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই। বিচার করারও কেউ নেই। স্বাভাবিক কারণেই এই পক্ষপাত চলে আসছে। আর এঁরাই অভিজাত কবি, মেট্রো কবি, স্মার্ট কবি, পুরস্কৃত কবি হয়ে উঠছেন। অপরপ্রান্তে ভিন্নজগতের কবি হিসেবে নতুন পথের দিশারি কবি চিরদিন ব্রাত্যই থেকে যাচ্ছেন। উৎসব এখন রাজনৈতিক দলের মতোই ভিন্নমত ও ভিন্ন আদর্শে পরিচালিত একটি কর্মকাণ্ড। একজন নতুন কবিও এই অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় এভাবে ব্যক্ত করলেন:

 "সেদিন কবি সম্মেলনে

 বাঙালি সাজার উৎসবে সাজো সাজো রব…

 ষোলোআনাই বাঙালিয়ানা…

 একে একে শুরু হলো কবিদের কবিতা পাঠ।

 থেকে থেকে গর্জে উঠলো করতালি।

 আত্মশ্লাঘার তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে থেকে ঢেকুর ওঠে

 পরস্পরের পিঠ চাপড়ে এগিয়ে যায়…

 আবার আসে কবিতামঞ্চ…

 আবার আসে কবিসম্মেলন…

 আবার চলে কবিতা পাঠ…

 কিন্তু

 সবাই ঘরে ফেরে শূন্য হয়ে। শূন্য মনে।

 কেউ কবিতা নিয়ে ফেরে না…

 কেউ কবিতা হয়ে ফেরে না…"

                                     (সংগ্রাম সিংহ)

 এই অংশটিতেই ধরা পড়ে কবিতা উৎসবের ব্যর্থতা কতখানি। বাঙালি সাজের উৎসব, কবিতা পড়ার উৎসব এবং কবি হওয়ার উৎসব যে শূন্যতার দম্ভে পূর্ণ এবং অন্তঃসারশূন্য জাঁকজমকে শুধু হাততালি সর্বস্ব একটি অনুষ্ঠান তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হয়তো সেই কারণেই জীবনানন্দ দাশ কখনোই কবিতা উৎসবে যোগ দিতেন না। এখনও সেরকম অনেক কবিকেই আমরা উপস্থিত হতে দেখি না। এমনকী পুরষ্কারও প্রত্যাখ্যান করে দেন।


গল্প || বচনবাগীশ || ডঃ রমলা মুখার্জী

   বচনবাগীশ



    সুমন দুম করে উপমাকে বিয়ে করে নিয়ে এল। মীরাদেবী মনে খুব আঘাত পেলেন। কিন্তু সুমন নিচুশ্রেণীর মেয়ে উপমাকে বিয়ে করার কথা বলেনি কারণ সে জানত প্রাচীনপন্হী মীরাদেবী কখনই এই বিয়েতে মত দেবেন না।  তাই মীরাদেবীর যত রাগ গিয়ে পড়ল বৌমা উপমার ওপর।

নিচু জাত বলে উঠতে বসতে তিনি হেনস্হা করতেন উপমাকে।        

       পাঁচ বছর হয়ে গেল উপমার সন্তান আসছে না। বাক্যবাগীশ মীরাদেবী উপমাকে প্রায়ই কথা শোনাতেন। বেশি কথাবলাই ছিল মীরাদেবীর একমাত্র দোষ। সারাদিন অনর্গল কথা বলতেন তিনি। বাঁজা বলে উপমাকে অপমান করতেও ছাড়তেন না। উপমাও দু-চার কথা ইদানীং শুনিয়ে দিত, প্রায়ই অশান্তি লেগে যেত দুজনকার।

     অনেক চেষ্টা করে উপমার ছেলে হল। উপমার চাকরি বজায় রাখার জন্য আয়া রাখা হল। আয়ার সামনে পদে পদে অপমান উপমা কিছুতেই মেনে নেবে না। তাই বাক‍্যবাগীশ  মীরাদেবীর স্হান হল বৃদ্ধাশ্রম। ছেলে বড় হচ্ছে কিন্তু কথা বলতে পারছে না। ডাক্তারবাবু বললেন ছেলের সঙ্গে সবসময় কথা বলা দরকার যা নিজের জন ছাড়া অসম্ভব। সুমন মীরাদেবীকে বৃদ্ধাশ্রম থেকে বাড়িতে নিয়ে এল। 

    বাকপটু মীরাদেবীর সহায়তায় সুমনের ছেলে অনুপমের মুখে আধো আধো বোল অচিরেই ফুটল। মীরাদেবীও বকবক করার নতুন সঙ্গী পেয়ে খুব খুশি। উপমাও নিশ্চিত মনে চাকরি করতে যেতে পারল। তাদের আর আয়া রাখারও প্রয়োজন হল না, কারণ অনুপমের দেখভাল মীরাদেবী স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিলেন। কত আশার নাতি তাঁর, আর সে কিনা মানুষ হবে আয়ার কাছে! কভি নেহি!



ছোট গল্প || বকখালিতে একরাত || সামসুজ জামান

বকখালিতে একরাত

           

    

বকখালিতে সমুদ্র-কিনারে চাঁদের আলোয় সোনালীর কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল প্রভাত। সোনালী তার মাথার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিল। ফুরফুরে হাওয়া গঙ্গার জোয়ারের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে এসে মনটাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল প্রভাতের। 

একটু পরে প্রভাতকে জড়িয়ে ধরে সোনালী বলল – চল না, হটেলের রুমে ফিরে যাই। 

যাবে? ভাল লাগছে না আর এখানে? 

না,না,না, ভাল লাগবে না কেন? আমাদের কী আর এমন ভাগ্য হয়? একটু থেমে আবার যোগ করল – আসলে আমাদের তো কেউ এত ভাল বাসেনা! আমরা হলাম এঁটো পাতার জাত! 

মুখে হাত চেপে ধরে প্রভাত বলল- ছিঃ, বোলো না ! 

আরও কিছু পরে হোটেলের সি ফেসিং রুমে বসে, জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলো গায়ে মাখিয়ে সোনালীকে উপভোগ করছিল প্রভাত। মেয়েটা আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে দিতে বলছিল – তুমি এত ভাল! আমাদের কেউ এভাবে কখনও আদর করে না! শুনে খুশী হয়ে প্রভাত, সোনালীর মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে আদর করে দু-চোখের পাতায় চুমু খেল আর একবার।  

রাতটা অদ্ভুদ এক নেশার মধ্যে দিয়ে কথা দিয়ে কেটে গেল। একসময় সময় ফুরিয়ে যেতেই ককিয়ে উঠল সোনালী – বাড়ি ফিরে গিয়ে আমাকে মনে পড়বে তো? আবার আসবে তো? কবে আসবে?

-আসবনা আবার ? কী যে বল? যত তাড়াতাড়ি পারি আবার ----- কথাটা বলতে গিয়েও গলায় আটকে গিয়েছিল প্রভাতের। 

বিদায় নেবার সময় পাঁচশ টাকা সোনালির হাতে গুঁজে দিতেই চিক চিক করে উঠল ওর চোখ – বাবু, আবার কবে আসবে, বলনা? 

-এই তো সামনের মাসেই – বলেই সোনালীর চোখের ওপর থেকে চোখ সরাল প্রভাত। অনেক কষ্টে অমলাকে বুঝিয়ে, অফিসের অডিটের ঝামেলার কথা বলে একরাতের জন্যে বকখালিতে আসা। এরপর আবার আসা? পাগল নাকি! সোনালীকে সঙ্গে নিয়েই আরও এগোচ্ছিল প্রভাত। পখে পড়ে এঁটো শালপাতা, গর্ভ নিরোধকের মোড়ক। কিন্তু এসব ছাপিয়েও মনে পড়ে মেয়েটার চোখ দুটো। বড় মায়াবী সুরে সোনালী বলতে থাকে – আবার আসবে তো? বলো না কবে আসবে? 

প্রভাত আর একবার ভয়ে ভয়ে সোনালীর দিকে শেষবারের মত তাকিয়ে দেখল। মেয়েটার বড় বড় দুটো চোখ জলে ভরে উঠেছে। শুধু তাই নয়, নিজের মুখটা চেপে ধরে এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সোনালী। অদ্ভুদ এক পিছুটানকে অনেক কষ্টে উপেক্ষা করে জোরে জোরে সামনের দিকে পা ফেলল প্রভাত। কিন্তু অনেক দূর পর্যন্ত যেন তার কানে আসতে লাগল সোনালীর ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ।

গল্প || দারিদ্রের কান্না || বাহাউদ্দিন সেখ

 দারিদ্রের কান্না 




"সৃষ্টি যাহা মানবের কূলে, তব কেন গরীব ধনীর সুখ'

সহ্য করিয়া যায় তীরে তীরে নিম্ন জাতি দারিদ্র্যের দুখ"।


আজ রাহুল খুব দুশ্চিন্তায় বাড়ির ফেরার পথে। তার বাড়িতে যে তার বাবা রিক্সা চালক লোক যেখানে মাত্র দিনে তার সারা দিনে দুইশো টাকা মজুর করে। আর বাড়ির জন্য সেই টাকা দিয়ে চাল ডাল বাড়ির ফেরার পথে সন্ধ্যা বেলায় কিনে আনে। এত অনাহার আর দিন আনা দিন খাওয়া তার পরিবার, আর তার মধ্য দিয়ে প্রোজেক্টের টাকার বিষয়ে স্কুলের শিক্ষক বলে ওঠে । রাহুল তার বাবা-মাকে কি ভাবে বলবে সেই বিষয়ে ভীষন দুশ্চিন্তায়। সে নদীর ধারে বসে একা একা চিন্তিত করতে থাকে। টাকা জোগাড়ের বিষয় নিয়ে, এবং নিজে নিজে মনের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। কারণ স্কুলের প্রোজেক্টের টাকার বিষয়ে তার বাবাকে কিছুই বলতে পারবে না। তার বাবার হঠাৎ অসুস্থ ও আরোগ্য হয়ে পড়ে রয়েছে, এবং তার মা হার্ড ও ক্যান্সারের ব্যাধি বদ্ধ রোগে আক্রান্ত।


 "চিরতরে স্বর্গ দেখিলাম ভুবনে সৃষ্টি,

তব বাঁধিলো এ দুনিয়ায় মহামারীর বৃষ্টি"।

"রুদ্ধ বদ্ধ করিল সবে লোকের কাজ,

ঘৃণ্য হয়ে রুপ দেখালি, এ মুখোশধারী সমাজ"।


অনেকদিন ধরেই স্কুল বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় কারণে পড়াশোনাটাও ঠিক মতন হয়ে ওঠেনি রাহুলের। রাহুল দশম শ্রেণীর ছাত্র, লকডাউনের স্কুল খোলার পরেও রাহুল সেইরকম স্কুল যায়নি। কারণ বিগত দুই বছর স্কুল বিদ্যালয় লকডাউনে বন্ধ থাকার কারণে পড়াশোনাটাও কোথায় যেন উঠে গেছে। তার মাথায় ছিল না পড়াশোনা বলে কিছু রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ একদিন স্কুল গিয়ে দেখা যায় যে রাহুলের স্কুলের শিক্ষক মহাশয় তাদের প্রজেক্টের বিনিময় তাদেরকে রেজাল্ট দেওয়া হবে। এবং সেই প্রজেক্টের দাম রাখা হয়েছিল 'সাড়ে সাতশো' টাকা। আর এই প্রজেক্টের টাকায় রাহুলের মাথায় বড় দুশ্চিন্তায় সম্মুখীন করে তুলেছে।


"তুলিয়াছে অর্থের কাল, শিক্ষার ব্যবসার হাল,

ক্ষণে ক্ষণে অশিক্ষার এ পথ ধরেছে মহাকাল"।


অসীম যেন তার মাথায় বড্ড বোঝা পড়েছে , এই স্কুলের প্রজেক্টের আর্থিক বিষয় নিয়ে,সে নিরুপায় হয়ে চিন্তিত ও ক্লান্তি নিয়ে বসে থাকতে থাকতে উঠে পরে আর বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু তবুও রাহুল তার মাথা থেকে সেই বিষয় নিয়ে চিন্তিত দূর করতে পারে না বা হয় না। রাহুলের বাড়ির পথ হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা নেমে এলো।রাহুল বাড়িতে এসে বারান্দায় চুপ করে বসে রইল। 

ক্ষণিক ক্ষণ পর তার মা বাড়ির দরজাটি শিকল খোলে রাহুল কে জিজ্ঞাসা করে ,,

আরে বাবা তুই এসে এখানে যে বসে আছিস! 

আমাকে তো ডাক দিতে পারতিস,,,,!

তার মা জিজ্ঞাসা করল ,,,,

 কি হয়েছে ?

 হঠাৎ এই ভাবে বসে অন্ধকার বারান্দায়, সে কিছু না বলে চুপ করে রইলো,কারণ সে জানে তার মাকে স্কুলের প্রজেক্টের ব্যাপারে বলতে পারবে না।


"ভালো-মন্দ সুখ- দুখ খুঁজি অন্ধকারে আলো,

মনে মনে দুঃখ বিষাদে সহি মা-কে দেখাই ভালো"।

"অর্থ খুঁজি বেদনা ভুলাই,করি রিক্সা চালক কাজ,

মনে মনে ভাবি চল রিক্সা চালাই আজ"।


ঘরের বারান্দা থেকে উটে গিয়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলো, আর তার মা কিছু খাবারের জন্য ডাক দিয়ে তাকে আহারের প্রস্তুত করলো। রাহুল ও তার মা আহারের শেষে তাকে জিজ্ঞাসা করলো।

 আজ কেনো সে নিশ্চুপ রয়েছে !

কিন্তু কোনো কথার তার মাকে উত্তর না দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল রাহুল।

তার পারেন দিন রাহুল স্কুলের জন্য প্রস্তুত হয়ে,কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পরে কিন্তু তার মা যাতে বুঝতে না পারে তাই স্কুলের ড্রেসেয় বেরিয়ে পড়েছিল। 

রাহুল কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেও কোনো কাজ পায়নি,

তাই সে মনে মনে ভাবল,,,,,,!

তার বাবার যে রিক্সা রয়েছে সেটি নিয়ে বেরিয়ে পড়বে, সেটি তার মায়ের চোখের আড়ালে। রাহুল বাড়িতে গিয়ে তার মাকে দেখতে না পেয়ে রিক্সাটি বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে যায়। আর প্যাসেঞ্জারের অপেক্ষায় রয়ে থাকে। এই ভাবে রিক্সাটি নিয়ে বসে রইল, কিন্তু কোন প্যাসেঞ্জার পেল না। দুপুর হয়ে ঘনিয়ে আসে দুর দুর করে। এই ভাবে তার সারাটা দিন দুশ্চিন্তায় আরো কেটে যায়। ক্ষণিক খন পর সে সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফেরার পথে কিন্তু তার মা অদূর থেকেই দেখে ফেলে।

রাহুলের মা চিন্তিত হয়ে পড়ে! 

আর মনে মনে ভাবে,এমন কোন বিষয় রয়েছে যেখানে রাহুলকে রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে তবুও স্কুলের নাম করে ফাঁকি দিয়ে এই বিষয়ে তার মা চিন্তিত হয়ে পড়ে।

 

"সুখ খুঁজতে গিয়ে পেলাম ভিক্ষার ঝুলি,

 সন্ধ্যা বেলায় রিক্সা নিয়ে কেঁদে কেঁদে গান বলি"।


কিছুক্ষণ পর রাহুল ঘরে এলো আর তার মা তাকে জিজ্ঞাসা করল।

 বলতো বাবা তোর কি হচ্ছে!

হঠাৎ তোকে অদূর থেকে আমি দেখেছি তোর বাবার রিক্সা নিয়ে কোথায় যেন গিয়েছিলিস।

একথা শুনে রাহুল ভয় পেয়ে গেল, সে কি বলে তার মাকে উত্তর দেবে কোন সাহস পায় না।

রাহুল কোন কিছু উত্তর খুঁজে না পেয়ে তার মাকে স্কুলের প্রোজেক্টের টাকার বিষয়ে বলে ফেলল, তার স্কুলের প্রোজেক্টের সাড়ে সাতশো টাকা লাগবে, তাই রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম টাকার সন্ধানে কিন্তু অবশেষে কোনো কাজ হয়নি। 

একথা বলে তার মাকে কাঁদতে কাঁদতে বলল……

সে যদি স্কুলের প্রোজেক্টের টাকা যদি না দিতে পারে তবে হয়ত সে পরীক্ষাটি দিতে পারবে না বা সে মাধ্যমিকে পাশও হতে পারবে না।

তার মা কোন কথা না বলে চুপ করে বসে রইল, কারণ তার মার কাছেও কোন উত্তর ছিল না, সে কি বলে জবাব দেবে ।

হঠাৎ তার মা একটা প্রশ্ন করে,,,, রাহুলকে 

প্রোজেক্টটা আবার কোন বিষয়, রাহুল বলে উঠল-এটা মধ্যবিত্ত পরিবারকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়। যেটি আমাদের মত মানুষ কে চিন্তিত করে ফেলে আর শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষা হরণ করে ব্যবসা চলাচল করে। আর বর্তমান সমাজে প্রজেক্ট বিষয়ের শিক্ষার নামে অশিক্ষার প্রভাব ঘটাতে থাকে ।


   "দারিদ্র্যের ধোঁয়া উঠিয়াছে সমুদ্রের সৈকত,

অর্থের অভাব জালে সৃষ্টিকারী মোরা নিম্ন জাত"।        

    "ব্যবসা করি এ শিক্ষা কুশিক্ষা ভদ্রতার তাজ,

কে শুনিয়াছে ধোঁয়াশা বুকে দারিদ্রের কান্নার আওয়াজ"।

গল্প || আন্না || রঞ্জিত মল্লিক

 আন্না 

  

     

    

    " বিহুর ও লগন ....   

    আকাশে বাতাসে ... .....

    .... .... ...

    চম্পা ফুটিছে .... ...

    তার সুবাসে ...... ... "


   গানটা এক কাস্টমারের মোবাইলে শুনেই আন্নার বুকের ভিতরটা ধরাস করে উঠল। পুরানো স্মৃতি গুলো আবার জট পাকিয়ে উঠছে। সেই সাথে অনবরত চোখ দিয়ে জল ঝরছে।


    বেশ কিছু বছর আগের কথা। আসামে বিহু উৎসব উপলক্ষ্যে রোজলিনের একটা নাচের অনুষ্ঠান ছিল। এটা ছিল বিরাট উচ্চতার একটা অনুষ্ঠান। আন্নাও প্রেজেন্ট ছিল সেখানে। অনুষ্ঠান বেশ ভালই হল। রোজি অল্পের জন্য সেকেণ্ড হল। এরপর ন্যাশনাল লেভেলের কমপিটিশন হবে দিল্লীতে।


   ফেরার পথে রোজিদের গাড়ি একটা বাঁকের কাছে টার্ন নিতেই একটা ভারী লরিকে ধাক্কা মারে। একটা প্রাণান্তকর এক্সিডেন্ট। আন্নার যদিও অল্প চোট লেগেছিল। রোজলিনের এই প্রাণনাশক এক্সিডেন্টে শরীরের নিন্মাংশ পুরো অবশ হয়ে যায়। আর চির জীবনের মত বোবা হয়ে যায় ও।


    শোকের ছায়া নেমে আসে গোমস পরিবারে। রোজি আর কোনোদিনই পায়ে ঘুঙুর পড়তে পারবে না এটা ভেবেই আন্নারও মন আর শরীর কোমাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।



           বাবা মা মারা যেতেই তামিলনাড়ু থেকে গ্রাসাচ্ছাদনের তাগিদে খুব ছোটতে কলকাতায় চলে আসে আন্না শিবলিঙ্গম রাধাচন্দন। ফুটপাতে ধোসা ইডলির স্টল থেকেই আস্তে আস্তে বিজনেসটা ডালপালা ছড়ায়।


           রোজি প্রায় আন্নার স্টল থেকে ধোসা, ইডলি খেত।একদিন বৃষ্টির দিনে রোজির পুল কার অটোর সাথে ধাক্কা লাগাতে রোজি পিছলে ম্যানহোলের ভিতরে ঢুকে যায়। জীবনে প্রথমবার এই প্রাণান্তকর এক্সিডেন্ট থেকে আন্নায় ওকে বাঁচায়। তখন থেকেই সম্পর্কের শুরু। ভালবাসার উত্থান।


            ঐ গানের তালে নেচেই রোজলিন আসামে মঞ্চ কাঁপিয়েছিল। তারপর থেকেই সব ঝাপসা লাগে আন্নার। 


                   ........... .......... ...........


             আজ গানটা বহুদিন পরে শোনার পর একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে আন্না।


            ডাক্তার ডেরিয়ার মুখে তৃপ্তির হাসি। রোজি আবার ডান্স করতে পারবে। ডেরিয়ার সেটাই অভিমত। তবে একটা মেজর অপারেশন করতে হবে।


            টাকার দরকার। রোজির বাবা একজন সামান্য বেসরকারী চাকুরীজীবি। চিকিৎসার অত টাকা উনি জোগার করতে পারবেন না। আন্নাকেই সব করতে হবে।দুবার সম্বন্ধ ভাঙ্গার পর ওর দিদির বিয়েটা না হয় একটু পিছলো! দিদির জন্য কেনা গহনাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। এই চিকিৎসার পিছনে। 


           আসিফ করিমের মেয়ে সাইরার একটা কিডনির খুব প্রয়োজন। আন্নার সাথে গ্রুপ ম্যাচও করেছে। আন্না আসিফ করিমের মেয়ের কিডনি নষ্টের খবরটা পেপারেই পড়েছে। পড়া মাত্র আর সময় নষ্ট করেনি। করিম সাহেবের সাথে দেখা করে উনার সাথে সব কথা বলেছেন। 


            করিম সাহেব রাজী হয়েছেন। আন্নার একটা কিডনি মৃতপ্রায় মেয়েকে যেমন বাঁচাবে , তেমনি বিনিময়ে উনি রোজলিনের চিকিৎসার সব ব্যয় সারাজীবন বহনও করবেন। রোজিও তো উনার মেয়ের মত। রোজির মধ্যে উনি সাইরার শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখতে পাচ্ছেন। 


           আন্না টাকার জন্য নিজের দোকানঘরটাও বিক্রি করে দিল।দুটো প্রাণনাশক সিদ্ধান্ত ওকে নিতেই হল। তা না হলে আদরের ভালবাসা রোজলিনকে বাঁচানো যেত না। 


                  .......... .......... ............


           অপারেশন পুরো সাকসেসফুল।


           তিন বছর পর.....


           ওড়িশাতে আন্তর্জাতিক ওডিশি উৎসব। রোজলিন রবারের পা দিয়ে সুন্দর নৃত্য পরিবেশন করল। বোবা মুখে ফুটে উঠল ঘুঙুরের ছন্দ। সবাইকে চমকে দিয়ে রোজলিন নৃত্যে শেরার শিরোপা পেল। আনন্দে চোখের কোণ বেয়ে নামছে অতি ক্ষীণ কংসাবতীর শ্রাবণ পূর্ণিমার ভরা কোটাল। 


      আন্না সবটাই দেখল। আকাশের ঠিকানাতে বসে।


         কিডনি প্রতিস্থাপনের পর আন্না আর বাঁচেনি। কয়েক মাস পরেই ও চলে যায় না ফেরার দেশে। তবে রোজলিন, সাইরা সেটা মানতে পারেনা। ওদের বিশ্বাস আন্না আজও বেঁচে আছে ওদের সকলের মনের অলিন্দে। 


           আরো দুই বছর পর ......


        সেন্সাস আধিকারিকেরা সেন্সাসের ডাটা কালেকশান করতে এসে এক চরম সত্যের সন্মুখীন হল। সেন্সাস আধিকারিকদের সাথে রোজি আর সাইরার বাবার তীব্র ঝগড়া। ওদের দুজনেরই দাবি তাদের তিনটে করে সন্তান - আন্না, রোজলিন, সাইরা।


       আন্নার দিদিরও একই অভিমত। তাদের এক ভাই ,আর দুই বোন আছে ; আন্না, রোজলিন সাইরা। 

     

          সেন্সাস আধিকারিকেরা তিন পরিবারের কাছ থেকে একই তথ্য পেয়ে বেশ হতভম্ব। কিছুতেই ঐ পরিবারগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পাল্টাতে পারছেন না। বারবার বলা স্বত্তেও উনারা একই তথ্য খাড়া করতে চাইছেন। 


           সব কিছুই ঠিক আছে। শুধু পরিবারের সদস্য, সদস্যাদের নামের জায়গাতে ঐ তিন পরিবারের তিনজনের নাম বার বার উঠে আসছে। আর তা হল, আন্না শিবলিঙ্গম রাধাচন্দন, নাতালিয়া রোজলিন মারিয়া গোমস, আখতারা সাইরা মেহেবুবা।


          সেন্সাস আধিকারিক দলের একজন হেড সেদিন নিজেই এলেন সব কিছু স্বচক্ষে যাচাই করতে। রোজলিন আর সাইরার পরিবার যা বিবৃতি দিলেন তাতে উনি রিয়েলি স্পেলবাউণ্ড। 


           রোজলিনের পরিবার থেকে আন্না আর সাইরারকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। সেই রকম সাইরার পরিবারেও রোজলিন, আন্না সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। 

         

            সমস্ত ঘটনা শোনার পর আধিকারিকদের মধ্যেও একটা মারাত্মক নিস্তব্ধতা অনুভূত হল।

গল্প || মহান || রথীন পার্থ মণ্ডল

 মহান 



বজ্রপাতে ছোটভাই হঠাৎ চলে গেল। বড়দা শিবনাথ শোকে আচ্ছন্ন, বাড়ির সকলেও। বৌমা-ভাইপো-ভাইঝির চোখের জল থামছে না। এদিকে বড় বৌ কেঁদেই চলেছে। দুই ছেলে বিছানা নিয়েছে শোকে।


      আবার বিপদ--। বোন চন্দনা তার দুই মেয়েকে নিয়ে বিধবার বেশে হাজির। কান্না বিজড়িত স্বরে সে বলল- "তিন দিন আগে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় তোমার ভগ্নীপতি বিদায় নিয়েছে। তোমাদের শোক চলছে তাই জানাইনি।এখন থেকে এখানেই আমরা থাকব। বল দাদা--কি করব? আজ তাকে ফুল-জল নিবেদন করে -এখানেই চলে এলাম - আর উপায় নেই !"


     শিবনাথের চোখে জল- "হ্যাঁ, তোরা সবাই এখানেই থাক। ঈশ্বরের দয়ায় সকলে সুখে-দুঃখে একসাথে থাকব।"

গল্প || তিতলি || সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

তিতলি





    মেয়ের নাম নিয়ে খোঁজ করে অনেক কষ্টে মিলেছে--তিতলি। সে যখন জন্মায় তখনই নাকি সে বুঝিয়েছিল- সে আলাদা। সে তোতা নয়-- তিতলি- একটু কেমন! 

   বাবা মা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বড় ডাক্তার দেখিয়ে জানতে পেরেছে তাদের মেয়ের অবস্থা আর সাধারণের মতো নয়। সে অস্বাভাবিক। 

   সে কথা বলে না। ভালোভাবে কাঁদতে পারে না। কিন্তু সব বুঝতে পারে। মা তাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত তা-ও সে উপলব্ধি করে। ছোট্ট বয়েস থেকেই তার দাদার ওপর অত্যন্ত আদুরে ভালোবাসা ছিল তিতলির ---বাবা অন্ত্য প্রাণ। তবুও মা ছাড়া যেন কাউকেই চেনেনা। তাই সদাই অকারণে কেঁদে ওঠে। 

    মা নিলাদ্রি নিজেকে' পাপী" ভাবেন। কেননা মায়েরা কন্যাসন্তান কে নিজের অংশ ভেবে তার শারীরিক দিক, মানসিক দিক নিয়ে বেশি ভাবিত হয়। তাই নিজের গর্ভের ওপর দোষ দিয়ে ভাগ্য বিধাতার কাছে কঠিন প্রত্যাঘাত করতে সর্বদাই তৎপর হন। 

         বাবা, প্রতাপবাবু, নিলাদ্রি ওপর রাগে, বিতৃষ্ণায় যখন খুশি যত খুশি অশালীন কথা প্রয়োগ করেন। নিজেরও যে দোষ থাকতে পারে না ভেবে মেয়ে তিতলির যত্নের জন্যে বৌ নিলাদ্রি কে উদয় অস্ত যুদ্ধক্ষেত্র মনে করে শাসন করেন। দিগ্ বিদিক শূন্য হয়ে গায়ে হাত তোলেন। নিলাদ্রি মেয়ে তিতলির কথা ভেবে নীরবে সহ্য করে মহত্ত্ব দেখান। বাপের বাড়ির কাউকে জানতে বা জানাতে চান না। সে যেন একাই অপরাধী। এরকম সন্তান কেন এলো! সেতো সকলের মঙ্গল ই চায়। তবে তার ভাগ্যে এমন কেন? কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করেও তার কথা ফোটে না। সে স্বাভাবিক সন্তানের মতো বেড়ে ওঠে না। শুধুই অনুভবে আচরণে নিস্তব্ধ প্রকৃতির মতোই অসীম উদার মনে মায়ের কোলে কোলেই বাড়তে চায়। তার চোখের ভাষা প্রমাণ করে সে ভালোবাসার কাঙাল। সে নীরব নদীতীরের একখানা প্রদীপ। সে বোঝে সবই, বোঝাতে পারেনা। মা নিলাদ্রি কেঁদে কেঁদে শরীর খারাপ করে। মেয়ে তিতলি যে তার কত্ত আদরের। শ্বশুর, শাশুড়ি, পাড়া প্রতিবেশী প্রত্যেকেই তিতলির জন্যে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে। নিলাদ্রি ক্রমশঃ পাথর হয়ে যেতে থাকে- গর্ভের কলঙ্ক ভেবে। অথচ মায়েরা মেয়ের বেড়ে ওঠা নিয়ে কতই না স্বপ্ন দেখে। শরীরের উন্নতিতে

চমকিত হয় আনন্দিত হয়। নিলাদ্রি, অবশ্য অন্য অনেক কিছু ভাবে। এই বৃহৎ প্র কৃতির মধ্যে যে একটা বিরাট মহত্ব আছে তা মেয়ে তিতলির মধ্যে অনুভব করে। 

       গ্রামটা পাটলি। পাশে দামোদর নদ। আগের সেই খরস্রোতা আর নয় বটে, তবে চাকরি জীবী মেয়েদের মতোও নয়। শান্ত গৃহবধূ। ঘোমটা মাথায় কোলাহল, পাখির কূজন, চাষীদের বোঝাই শালতি এবং দু' পার বাঁধা বাঁশের সেতু সবই সহ্য করে সে। কেউ তার ওপর খারাপ নজর দিতে না পারে সেজন্যেই যেন দু' পাশে অসংখ্য চিতার পোড়া কাঠ।। এখানেই তিতলি আর দামোদরের মিল। 

         তিতলি বড় হচ্ছে। পথে ঘাটে অসংখ্য নরখাদক নজর দেয়। তিতলি বোঝে, মাকেও বোঝাতে চায়। তবুও সে একা একা দামোদরের তীরে সময় কাটায়। প্রকৃতির

নীরবতার সাথে নিজের মিল খুঁজে ফেরে। কিন্তু নরখাদক পশুরা তিতলির এই একাকীত্বে হানা দেয়। " স্পেশাল " চাইল্ড হলেও নারী সুখ ভোগ করতে চেয়ে তিতলির পাশে ঘুরঘুর করে। যেন রুদ্র মহাকালের পদতলে বসে মধু পানের অদম্য ইচ্ছা বা প্রমত্ত বাসনা। ছাগল, কুকুর, বেড়ালের মতো তাকে কামনার যৌনতায় নিবদ্ধ করতে চায়। 

    এরপর একদিন দুপুরে শীর্ণ দামোদরের চরে তিতলি একটা ছাগল বাচ্চা নিয়ে খেলা করার সময় কয়েকটা দু'পেয়ে পশু তাদের যৌন ক্ষুধা মেটাতে তাকে ধর্ষণ করে। তিতলির বয়স তখন সবে এগারো। বাক্য হীন বোবা তিতলি তীর বেঁধা হরিণের মতো যন্ত্রনায় তাকিয়ে থাকে নদীর জলে। জীবন যে তার শঙ্কিত হয়ে ওঠে আরও। বোবা চোখে মাকে আর বিধাতার কাছে ক্ষমা চেয়ে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়লো-- কেউ জানতেও পারলো না। 

    বাবা প্রতাপ যখন জানলো তখন সব সব শেষ। মা নিলাদ্রি 

নিলাদ্রি অন্তর্যামী র কাছে নীরব চোখের জলে মেয়ের অন্ত্যেষ্টি করলো। 

     সানাইয়ের বাদ্যি যেন বোবা হয়ে গেল চিরদিনের মতো। মনুষ্যত্বহীন সমাজে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের চির বিদায় নিশ্চিত হলো। 

 



গল্প || মনের ভুল || ইন্দিরা গাঙ্গুলি

 মনের ভুল 



রকিদের বাড়ি ভবানীপুরে। রকির মামাবাড়ি রাজনগরে খেজুরী গায়ে। রকির বাবা রেলে চাকরি করে। রকির মা ও সরকারি অফিসে চাকরি করে। দুজনেই খুব দায়িত্ব পূর্ণ কাজ করে যে যার অফিসে। রকি ছোট্ট বেলা থেকে বেশি ভাগ সময় ঠাকুমার কাছেই মানুষ হয়েছে। দাদু, ঠাকুমার সঙ্গে ই বেশি ভাগ সময় কাটে রকির। রকির মা মলি কাজের লোক, রান্নার লোক রেখে দিয়েছে। মলির বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাত টা বেজে যায়। রকির বাবা গগন রোজই রাত করে বাড়ি ফেরে। অফিস থেকে ফেরার সময় আনাজপাতি, মাছ, মাংস নিয়ে বাড়ি ফিরতো। একবার গরমের ছুটির সময় রকি মা'র কাছে মামাবাড়ি যাবার জন্য বায়না ধরলো। মলি বললো ঃ " আমার ও তো খুব ইচ্ছে করে রে। কতদিন যাইনি। দেখি যদি অফিস থেকে সাতদিনের ছুটি পাই। " পরের দিন অফিসে গিয়ে বসের কাছে সাতদিনের ছুটি চেয়ে একটা এপ্লিকেশন জমা দিলো মলি। মলির অফিসের বস খুশী মনে ছুটি সেংশন করে দিলো। আসলে মলি খুব একটা ছুটি নেয় না। অফিসের কাজ ও খুব ভালো ভাবে ই সামলায়। তাই মলির ছুটি পেতে কোনো অসুবিধে হলো না। গগন বললো ঃ " আমি কিন্তু যেতে পারবো না। অফিসে খুব কাজের চাপ। তাছাড়া বাবা, মা কে একা একা রেখে সবাই মিলে যাওয়া যাবে না। " কাজেই মলি আর রকি সাতদিনের জন্য রাজনগরে গেলো। ওখানে মলির বাবা, মা,দুই ভাই , তাদের বৌরা আছে। মলির বড় ভাই য়ের দুই ছেলে আর এক মেয়ে। মলির ছোট ভাই য়ের দুই ছেলে। মামাবাড়ি গেলে ওদের সঙ্গে খেলা করে , গল্প করে রকির খুব ভালো লাগতো। ভবানীপুরের বাড়িতে তো একা একা থাকতে হয়। শুধু দাদু আর ঠাকুমার সঙ্গে কাটাতে হয় সারাদিন। মলির বাবা, মার বয়স হয়েছে। মলিকে অনেক দিন পরে কাছে পেয়ে খুব খুশী ওরা। মলির বাবা বললো ঃ " জামাই বুঝি আসতে পারলো না? " মলি বললো ঃ " না বাবা ওর অফিসে অনেক কাজের চাপ। " মামাবাড়ি এসে রোজ বিকেলে রকি মামাতো ভাই, বোনের সঙ্গে ধাবার মাঠে খেলতে যেতো। মলির বড়ো ভাই য়ের বড়ো ছেলে টা একটু অন্য ধরনের ছেলে। সব সময় পড়াশোনা নিয়ে থাকে। একদিন বিকেলে রকিরা ধাবার মাঠ থেকে ফেরার সময় আকাশ কালো করে এলো। গুড় গুড় করে মেঘ ডাকছিলো। ওরা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলো। রকির মামাবাড়ির পাশেই একটা বাঁশ বাগান ছিলো। ওরা যখন বাড়ি ফিরছিলো তখন দেখলো বাঁশ বাগানে সাদা কাপড় পরে কেউ একজন মাথা নারছে। রকিরা খুব ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি ছুটে বাড়ি পৌঁছে বললো ঃ " বাঁশ বাগানে সাদা কাপড় পরে একটা ভূত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ছে। আমরা ভয়ে ভয়ে ছুটে বাড়ি এসেছি। " ওদের অবস্থা দেখে রকির বড়োমামার ছেলে হো হো করে হাসছিলো আর বলছিলো ঃ " ও রে বোকা হাঁদার দল। ভূত বলে কিছু হয় না। এখুনি সবাই চল আমার সঙ্গে। " রকিরা তখন ও ভয়ে কাঁপছে। রকির বড়োমামার ছেলে সঙ্গে সঙ্গে একটা টচ হাতে নিয়ে জোর করে সবাই কে বাঁশ বাগানে নিয়ে গেলো। বাঁশগাছের উপর আলো ফেলতেই সবাই দেখলো একটা বাঁশ গাছের উপরে একটা সাদা কাপড় পরে আছে। হাওয়ায় গাছ টা নড়লেই কাপড় টা ও নড়ছে। বড়োমামার বড়ো ছেলে গৌতম বললো ঃ " আসলে ভূত বলে কিছু ই নেই। সবই আমাদের মনের ভুল। " সেদিন গৌতম দার কথায় রকিদের ভুল ভাঙলো। সত্যি ই তো আসলে ভূত বলে কিছু ই নেই। সবই আমাদের মনের ভুল। এই ঘটনার দুই দিন পরে ই রকিরা ভবানীপুরে ফিরে গিয়েছিলো। দাদু, ঠাকুমা আর বাবা কে সবকিছু গল্প করেছিলো রকি। রকির দাদু বললো ঃ " ঠিক ই বলেছে গৌতম। সত্যি ই তো ভুত বলে কিছু ই নেই। সবটাই মনের ভুল।