Thursday, August 18, 2022

উপন্যাস - তান্ত্রিক পিসেমশাই ও আমরা দুজন || সুদীপ ঘোষাল || Tantrik Pisemosay oo Amra by Sudip Ghoshal || Fiction - Tantrik Pisemosay oo Amra Dujon Part -4


 



পিসেমশাই  বলছেন, নাতি বয়স বাড়লেই পাবে তিনপুরুষের পরশ...।তারপরেই হয়ত মনোজের মত হবে তার অবস্থা।মনোজ ভাবে, তখন আমার আস্তানা নদীর ধারের বাংলোয়। ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে বসেছিলাম বারান্দা। সব কিছুর  মাঝেই ঋতুজুড়ে আনন্দের পসরা সাজাতে ভোলে না প্রকৃতি।  সংসারের মাঝেও সাধু লোকের অভাব নেই।  তারা মানুষকে ভালোবাসেন বলেই জগৎ সুন্দর  আকাশ মোহময়ী, বলেন আমার মা। সব কিছুর মাঝেও সকলের আনন্দে সকলের মন মেতে ওঠে।  সকলকে নিয়ে একসাথে জীবন কাটানোর মহান আদর্শে আমার দেশই আদর্শ।সত্য শিব সুন্দরের আলো আমার দেশ থেকেই সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করুক। এইসব চিন্তা করছি এমন সময়ে  হঠাৎ আমার কানের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল সশব্দে এক গুলি। আমি অবাক। জঙ্গলের ভিতর আমার বাংলোর হদিশ কেউ জানে না নিজের লোক ছাড়া। তাহলে আমাকে গুলি করে মেরে ফেলার লোক কে?  পেশায় আমি গোয়েন্দা। শত্রুর অভাব নেই। কিন্তু আমার এই গোপন বাংলোর খবর পাঁচজন জানে। তারা সকলেই আমার নিকট আত্মীয়। আমার বৌ, ছেলে, রমেন, পিয়ু আর শ্যামল। বৌ, ছেলেকে সন্দেহ তালিকায় রাখি কি করে?  তবু...আর রমেন, পিয়ু আর শ্যামল তিনজনই আমার খুব ভাল বন্ধু। তাহলে কে?  কে? কে? এই রহস্যে মোড়া ব্যক্তি।তারপরদিন সকালে অফিসে গেলাম। হাসিমুখে সকলের সঙ্গে কথা বললাম। বুঝতে কেউ যাতে না পারে তার জন্য অনেক অভিনয় করলাম। কোন হদিস পেলাম না।খুব কঠিন এক পরীক্ষায় আমাকে সফল হতেই হবে। ছেলে, বৌ কাউকে বললাম না কথাটা।প্রায় একমাস পর বাংলোয় বসে আছি অন্ধকারে। একটা কালো মূর্তি মনে হল সামনে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে। অমাবস্যার রাতে অন্ধকারের সুযোগ নিতে চায় খুনী। আমি পাশ থেকে দেখলাম চেয়ারে বসানো বড় পুতুলটার উপর পরপর তিনটে গুলি করে খুনী পালাচ্ছে। ও বুঝতেই পারে নি আমার সাজানো নাটক। আন্দাজ করেছিলাম ঠিক। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ছুটতে লাগলাম মুখোশধারীর পিছনে পিছনে। শেষে ধরে ফেললাম বাম হাতে কলার চেপে। ডান হাতে আমার সার্ভিস রিভলবর। মুখোশ টেনে খুললাম। তাকে দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।অনেকদিন থেকে শ্যামল আর পিউয়ের একটা পরকিয়া সম্পর্ক চলছিল। পিউ শ্যামলকে পছন্দ করত না। সে বারবার সেকথা আমাকে বলেছে। পিউ বলত শ্যামল কবি । ওসব কবিত্ব আমার ভাল লাগে না। শালা ভিখারি, ভ্যাগাবন্ড। বেশ পয়সাওয়ালা এক রসিকের খোঁজে আমি আছি। দুদিন শালা আমার সঙ্গে বিছানায় শুয়েছে। একদম বিনা পয়সায়। বিয়ে করা বৌ নয় আমি। ওকে বারণ করে দিবি। আমি বলেছিলাম, ও তোকে ভালবাসে। ওরকম বলিস না। টাকাপয়সার সঙ্গে প্রেমের তুলনা করিস না।পিউ বলেছিল, আমি তোকে ভালবাসি। ওর কাছে আমি যাব না।আমি রেগে বলেছিলাম, পিউ আমার সংসার আছে। ছেলে আছে। আর শ্যামল বিয়ে করেনি আর তুই বিধবা। তোরা বিয়ে করে নে। সুখে থাকবি দুজনে।পিউ জেদ করে বলল, আমি তোকেই চাই। আর যদি না পাই আমি সব শেষ করে দেব।আমি বলেছিলাম, কি শেষ করবি।

--- আমি নিজেকে শেষ করে দেব।


তারপর হয়ত চিন্তাভাবনা পাল্টে পিউ প্ল্যান পাল্টেছিল। আমি বিষয়টা গুরুত্ব দিই নি। কিন্তু পিউ শ্যামলের পোশাক পরে ছেলের সাজে কালো কাপড় ঢাকা দিয়ে আজ আমাকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার প্ল্যান করেছিল।


একটুর জন্য আমি বেঁচে গেছি...


পিউ বলল, তাহলে আমি কাকে গুলি করে মারলাম।

আমি বললাম, সব কথা থানায় হবে। প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবি।

মনোজ ভাবে, অতি সুক্ষ্ম তরঙ্গের স্পন্দন শোনার অপেক্ষায় মৌন হয়ে  অপরূপ প্রকৃতির, কোলে আশ্রয় নিতে চাই।চাওয়া,পাওয়ার উর্ধ্ব জগতে ভাসতে ভাসতে ছাই হোক নশ্বর দেহের অহংকার।


স্থূল  পদার্থ নিয়ে পরমাণু বিজ্ঞানীরা অপেক্ষায় থাকেন না।অণু পরমাণু নিয়েই তাঁরা ব্যস্ত।তা না হলে হিমালয়ের চূড়া কিংবা জমি জায়গা নিয়েই তারা টানাটানি করতেন বেশি।

আকাশকে আমরা পৃথিবীর মানুষ, স্বার্থপরের মত খন্ড খন্ড করেছি।এটা কাটোয়ার আকাশ, ওটা দিল্লীর, ওটা রাশিয়ার আকাশ। অখন্ডতার বাণী আমরা ভুলে যাই।আকাশ চিরদিন অখন্ডই থাকে।তাকে খন্ডিত করার অকারণ অপচেষ্টা না করাই ভালো।তবু কাঁটাতার হয়,সীমানা ভাগ হয়। অদ্ভূত মূর্খতার অন্ধকারে ডুবে আছে প্রাণীকুল।আলোর অন্তরে বাদ্য বাজে, 'অনন্ত নাদ' এর ভেরী।সূক্ষ্ম তরঙ্গে মিশে যায় তার অস্তিত্ব,ভুলে যায় তার  অবস্থান। এ অনুভূতি ঝর্ণার মত,কবিতার মত,ভালোবাসার মত, নদীর প্রবাহের মত। জোর করে সে গতি পাল্টায় না। সৃষ্টির সবাই ভয়ে কাজ করি। অস্তিত্ব বিনাশের ভয়ে।পৃথিবী ঘোরে ভয়ে,তা না হলে সে ধ্বংস হবে। সূর্য তাপ দেয় ভয়ে, তা না হলে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

সৃষ্টি মানুষের প্রশ্বাস,স্থিতি মানুষের ক্ষণিক ধারণ ,প্রলয় মানুষের নিশ্বাস।আলোর অনুসন্ধানীর  ভয় নেই, তাই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই নেই।  লোভ নেই, তাই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা নেই।অকাল বার্ধক্য নেই।

 আছে শুধু আনন্দ,ছেলেমানুষি,বোকামি,সরলতা,সোজা পথে হাঁটার সোজা রাস্তা...বন্ধু, জাতপাত নির্বিশেষে অখন্ডতার অসীম ভালোলাগায়  মনসায়রে আপনি ডুব  দিতেই পারে।মনোজ জানত,অভিনবকে সবাই নার্ভলেস বয় বলেই ডাকে।



 ছোটো থেকেই সে প্রচন্ড সাহসী। নদীতে সাঁতার কাটা কিংবা উঁচু গাছ থেকে লাফিয়ে পুকুরের জলে ঝাঁপ দেওয়া তার কাছে জলভাতের মত সহজ। তার বন্ধু চিনু বলছে বন্ধুদের আড্ডায় আত্মার অবস্থানের কথা।  দ্বিতীয় স্তরে কেউ যদি দেহ ত্যাগ করেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়, তিনি সেই ফেজ-এ প্রবেশ করেন, যেখানে চৈতন্য মন থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়। মনের প্রকাশ চিন্তায়। চিন্তাই আমাদের জগৎকে তৈরি করে। এই পর্যায়ে চৈতন্য সেই জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং নিজেকে বিযুক্ত অবস্থায় দেখতে পায়। এই স্তরে আরও একটা ঘটনা ঘটে, যিনি যে ধর্মের মানুষ, যে বিশ্বাসের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন, তিনি সেই বিশ্বাস অনুযায়ী অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত হবেন। খ্রিষ্ট-বিশ্বাসী জিশুকে, কৃষ্ণ-বিশ্বাসী কৃষ্ণকে দেখতে পাবেন। স্বর্গ বা নরকের যে ধারণা তাঁরা পোষণ করে এসেছেন, তেমন স্বর্গ বা নরক তাঁদের সামনে প্রতীয়মান হবে। যিনি নাস্তিক, তাঁর কাছে এই স্তরটি একটি পাসিং ফেজ হিসেবেই থাকবে। তিনি পরবর্তী স্তরের দিকে এগিয়ে যাবেন।এই দুই স্তরের সমান্তরালে আসবে তৃতীয় স্তর। মনে রাখতে হবে, এই স্তরগুলি ‘পর পর’ ঘটে না। এগুলি সমান্তরাল। কারণ ‘সময়’ বলে কিছুই হয় না। কোনও ঘটনা আগে বা পরে ঘটে না। আমরা জীবদ্দশায় ঘটনা দিয়ে সময়ের ক্রমিকতা তৈরি করি। সেটা একেবারেই ইলিউশন। মৃত্যু-পরবর্তী তৃতীয় স্তরে এক আলোকসম্ভব অস্তিত্বের মুখোমুখি হই আমরা। এই অস্তিত্বই মহাচৈতন্য। আমরা বুঝতে পারি, আমদের আত্মা বলে যে বিষয়কে আমরা লালন করে এসেছি, তা-ও ‘আমার’ নয়। সে সেই আলোকসম্ভব মহাঅস্তিত্বেরই অংশ। আমাদের আত্মা বলে আলাদা কিছু হয় না। তা বিশ্বাত্মা। তার আমি-তুমি-সে-তাহারা ভেদ নেই। তার ক্ষয় নেই, নাশ নেই।এর একটু পরেই চলে এল নার্ভলেস বয় অভিনব। সে এসেই বসল বন্ধুদের মাঝে। বন্ধুদের বড় প্রিয় এই নার্ভলেস। সে এলেই বন্ধুদের আড্ডায় চারটে চাঁদ নেমে আসে। আলোচনা আরও জমে ওঠে। নার্ভলেস শুরু করে তার পাহাড়ে ওঠার গল্প।একবার মটর সাইকেলে ভারত ভ্রমণে বেড়িয়েছিল নার্ভলেস বয়। উত্তর ভারত ঘুরতে তার সময় লেগেছিল একমাস। সব জায়গা ঘোরা না হলেও বেশির ভাগ স্থান ঘোরা হয়েছিল। স্বামী চলে যাওয়ার পরে একদম একা হয়ে পরেছিলেন, কবিতা। মনে পরতো ফুলশয্যা,  আদর।   কি করে যে একটা একটা করে রাত, দিন পার হয়ে যায়, বোঝাই যায় না। তবু বুঝতে হয়, মেনে নিতে হয়। একটা ঘুঘু পাখি তার স্বামী মরে যাওয়ার পর থেকেই এবাড়িতে আসে। আম গাছের ডালে বসে আপন মনে কত কথা বলে। ঘুঘুর ঘু,ঘুঘুর ঘু। সবিতাদেবীর সঙ্গে পাখিটার খুব ভাব।তার মনে হয় স্বামী, ঘুঘুর রূপ ধরে আসেন। তিনি আম গাছের তলায় খুদকুড়ো ছিটিয়ে দেন। ঘুঘু পাখিটা খায় আর গলা তুলে কবিতাকে দেখে । কিছু বলতে চায়। তিনি বোঝেন। আর আপনমনেই পাখিটার সঙ্গে বকবক করেন। পুরোনো দিনের কথা বলেন। ছেলের বৌ বলে,বুড়িটা পাগলী হয়ে গেছে। প্রতিবেশীরা অতশত বোঝে না। হাসাহাসি করে। শুধু তার ছেলে বোঝে মায়ের অন্তরের কথা, ব্যথা। ঘুঘু পাখিটা সারাদিন ডেকে চলে। এবার আয়, এবার আয়। কবিতার বয়স হল আশি। একদিন সবাই দেখলো, বুড়ি ফুলশয্যার রথে শ্মশানে গেলো বোধহয় স্বামীর কাছে। ঘুঘু পাখিটা ডেকে চলেছে তখনও,, ঘুঘুর ঘু... দাদুর বাবার লাঠি। যত্ন করে তুলে রাখা আছে বাঙ্কে। কার জন্য?  বৃদ্ধ আমার জন্য। কত সুখস্মৃতি জড়িয়ে লাঠির অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। দাদামশাই লাঠি ধরে পথ চলতেন। লাঠিকে বলতেন, বাবা ভাল করে ধরে রাখিস। ফেলে দিস না এই বুড়ো বয়সে। কোমর ভেঙ্গে যাবে তাহলে। বিশ্বস্ত লাঠি তার দায়ীত্ব পালন করেছে পলে পলে। এবার তার নাতির পালা।স্মৃতিকন্ঠ গ্রামের মান্যগণ্য লোক। বংশগত একটা বিরাট আভিজাত্য তার চলনে বলনে প্রস্ফুটিত। স্বভাবতই সবাই তাকে সমীহ করে চলেন। তার একটিমাত্র পুত্র সন্তান। তার পড়াশোনার জন্য গ্রামের স্কুলে নিজের অর্থে সাজিয়ে তুলেছেন লাইব্রেরী রুম। যতরকমভাবে  স্কুলকে সাহায্য করা যায় তিনি করেন। তার ছেলের নাম রতন। স্কুলে ছেলে মেয়ে একসঙ্গেই পড়াশুনা করে। রতন পড়ে এখন ক্লাস নাইনে। আর শুভ বাবুর মেয়ে পড়ে ক্লাস সেভেনে। গ্রাম্য রাজনীতিতে রেষারেষি লেগেই আছে এই গ্রামের তিনটি পাড়ার লোকজন স্বচ্ছল। টাকা পয়সার অভাব নেই। স্মৃতিকন্ঠবাবুর পাড়ায় আভিজাত্যের লড়াই লেগেই আছে। এক বাড়িতে গাজনে একটা পাঁঠা থাকলে অন্য বাড়িতে বাঁধে দুটো। পাঁঠার ঝোল আর মদ। একদম কম্পিটিশন। প্রয়োজনে চার পাঁচটা পাঁঠা এনেও বড়লোকি দেখানোর ব্যাপারটা লেগেই থাকে। বাকি গ্রামবাসীদের ভুরিভোজ ভালোই হয়। তারা মজামারা দল। একজনকে বাহাদুরি দিয়ে তাতিয়ে দেয় তো অন্য বাবুর জেদ বেড়ে যায়। ব্যবসায়ী যারা তারা এই সুযোগটাই কাজে লাগায়। এক গানের দল হঠাৎ একদিন শুভ বাবুর নাটমন্দিরে ডেরা বাঁধল। তারা ধর্মিয় নানা গানের মধ্য দিয়ে পালাগান শোনায়। রামায়ণ, মহাভারতের ঘটনা, যীশুখ্রীষ্টের ঘটনা গান আর নাটকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে। 


মনোজ জীবনের কথা ভুলতে পারে না মরে গিয়েও। কত জীবনের কথকথা তার মনে পড়ছে তৃতীয় স্তরের আত্মা হয়ে। হয়ত কোনদিন প্রথম স্তরের আত্মা তাকে টেনে নেবে স্বর্গদ্বারে। তাদের গ্রামে

রাত বাড়লে নাট মন্দির লোকের ভিড়ে ভরে যায়। শুরু হয় নাটক। দেবতার গলায় গাঁদা ফুলের মালা।অভিনয় দেখে সকলেই মোহিত হয়ে যায়। নাটকের শেষে দেবতার গলায় থাকা মালা নিয়ে দরাদরি শুরু হয়। স্মৃতিকন্ঠ হাঁকেন, আমি মালার দাম দশ হাজার দিলাম। শুভবাবু পারিষদদল নিয়ে বসে আছেন। তিনি ভাবলেন,এ মালা আমাকেই নিতে হবে। তা না হলে মান সম্মান থাকবে না। তিনি মালার দর হাঁকলেন কুড়িহাজার টাকা।এইভাবে চলতে থাকল নীলামের খেলা। এদিকে নাটকের দলের মহিলা একজন বলছেন, আপনাদের গ্রামের লোক এত কৃপণ কেন। এই তো পাশের গ্রামে মালার দর পেয়েছি এক লক্ষ টাকা।শুনে মালার দর আরও বেড়ে গেল। এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকায় নীলামে একটা গাঁদার মালা কিনল গাধার দল।মুচকি হাসি আগত অভিনেত্রীর চোখেমুখে। তিনি সফল আপন কারবারে।এইভাবে  বেশ কয়েকদিন টাকা কামিয়ে নাটকের দল চলে যেত আরও মুরগির সন্ধানে....



---ওরে যাস না ওদিকে, পুকুর আছে ডুবে যাবি

----- না মা, কিছু হবে না


ছোট থেকে চিনু দুরন্ত, একরোখা ছেলে। ভয় কাকে বলে সে জানে না। এই নিয়ে তার পরিবারের চিন্তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মনোজের বন্ধু চিনু। মনোজ জানে এই চিনুর আত্মা তাকে উদ্ধার করবে মরার পরে। 

এইভাবে প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে যায় মানুষ । কত কি শেখার আছে প্রকৃতির কাছে। কিন্তু কজনে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। কিন্তু চিনু সেই শিক্ষা নিয়েছিল। গ্রামের সকলে তাকে একটা আলাদা চোখে দেখত।বেশ সম্ভ্রমের চোখে। পরিবারের সকলে জানে না, কি করে চিনু শিক্ষা পেল। প্রথাগত শিক্ষা সে পায় নি। তবু বাড়িতে দাদুর কাছে লেখাপড়া শিখেছে। বই পড়া শিখেছে। চিনু বলত, দাদু কি করে তুমি বই পড়। আমি পারি না কেন?  দাদু বলতেন, নিশ্চয় পারবি। মনে মনে  বানান করে পড়বি। দেখবি খুব তাড়াতাড়ি বইপড়া শিখে যাবি।হয়েছিল তাই। দুমাসের মধ্যে চিনু গড়গড় করে বই পড়ত।কোনো উচ্চারণ ভুল থাকত না।দুপুরবেলা হলেই চিনু বন্ধুদের নিয়ে কদতলা, বেলতলা, আমতলা, জামতলা দৌড়ে বেড়াত। কাঁচা কদ কড়মড় করে চিবিয়ে খেত। লাঠিখেলা,কবাডি সব খেলাতেই তার অদম্য উৎসাহ। গ্রামের লোকের উপকারে তার দল আগে যায়।এই দাপুটে ছেলে চিনু একদিন এক সাধুর সঙ্গে ঘরছাড়া  হল। বাড়ির সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পরলো। কিন্তু চিনুকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। একদিন গ্রামের একজন গিয়ে দেখল, সাধুর আশ্রমে সবুজ গাছ যত্নের, কাজ করছে চিনু.

 ভূত বলে কিছু হয় না জানি। তবু  ভূতের প্রতি আমার ছোট থেকেই দূর্বলতা আছে। বিশ্বাস করি। ভগবান আছেন ভূতও আছে। আমার এক বন্ধু মাঠে খেলতে গিয়ে আমাকে বললো, আমার দাদু এসেছিলেন এখনি। হয়ত তিনি মরে গেলেন। দুজনেই বন্ধুর বাড়ি গিয়ে দেখলাম কথাটা একদম সত্যি। দাদু বলেছিলেন মরার পরে তোকে একবার দেখা দেব। এই ঘটনাকে আপনি কি বলবেন বলুন? আর তাছাড়া ভূত সমাজে ভাল, মন্দ সব রকমের ভূত আছে। আমার দাদু বলতেন, একবার চাষের জমিতে জল লাগবে। টাকা পয়সার অভাবে জল দিতে পারি নি। রাতে শুয়ে ভাবছি, আমি রোগী আবার সত্তর বছরের বুড়ো। এ ঘোড়া আর ঘুরে ঘাস খাবে না।চাঁদের আলোয় বসে আছি জেগে। কি সুন্দর পৃথিবীর রঙ। সকলের যদি আহারের ব্যবস্থা থাকত তাহল দুঃখ থাকত না। আর তারজন্য চাষের জমির পরিমাণ বাড়াতে হবে। জলের ব্যবস্থা করতে হবে। এইসব ভাবছি, এমন সময়ে দরজায় টোকা। আমি বললাম, কে?


  বাইরে থেকে আওয়াজ এল, চলে আয় বাইরে।


 মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে  চলে গেলাম বাইরে, তারপর মাঠে। সে আমাকে বলল, তুই বসে থাক। এখানকার সব জমিতে জল দেব। একটু দূরে বড় পুকুর ছিল। ওই পুকুরে ভয়ে আমরা যেতাম না। দিনের বেলায় পর্যন্ত ওখানে হাসির শব্দ পেত সবাই। হি হি হি করে কারা যেন হাসত ব্যঙ্গ করে। শুনলাম ভয়ংকর হাসি। বার বার পাঁচবার। ভয় পেলাম প্রচন্ড। 

তারপর আর কিছু মনে নেই। 

পরের দিন মাঠে গিয়ে দেখি, ভালোই হয়েছে। জলে জলময় সব মাঠ। এই খরার সময় এত জল দেখে সবাই অবাক। লোকে বলল,এ তো একদম ম্যাজিক। চাষিরা বলল, এই ম্যাজিক যেন বার বার প্রতিবার হয়। 




                           ক্রমশ...

Monday, August 15, 2022

ছোট গল্প - সম্পর্ক || লেখক - অরুণোদয় ভট্টাচার্য || Short story - Somporko || Written by Arunodoy Bhattacharya


 

সম্পর্ক

                     অরুণোদয় ভট্টাচার্য


সুরঞ্জনের অতটা বিহ্বল হবার কথা নয় ।হোতও না যদি খানিকটা কাকতালীয় বা ইংরিজিতে যাকে স্ট্রেঞ্জ কোয়েনসিডেন্স বলে, সেরকম একটা না ঘটত ।নিজের ছাত্রজীবনে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ চৌকস যুবকদের সারিতেই সে ছিল ।মাঝে মাঝে নাটক আবৃত্তিতে অংশ নিয়ে প্রশংসা পেয়েছে ।অধ্যাপক-জীবনে নবীনবরণ ও শিক্ষক বিশেষের বিদায় সম্বর্ধনা সভায় অনেক বক্তৃতা দিয়েছে ।সহকর্মী ও কর্মিনীরা তাকে যথেষ্ট স্মার্টই ভাবে ।এমন কি ইতিহাসের কাকলী দত্ত একদিন বলেছিল, প্রফেসর মুখার্জী, আপনি কিন্তু ভারি ঠোঁঠকাটা ।

আসল ব্যাপারটা হল, প্রচুর উপন্যাস ও প্রেমের কবিতা পড়লেও মেয়ে-ঘটিত দুর্বলতা সুরঞ্জন কখনো অনুভব করে নি ।অনেক অল্প বয়সেই মেয়েদের কলেজে অধ্যাপকের চাকরি পেয়েছে ।প্রথম প্রথম অনেক মেয়েই ওকে যাচাই করতে চেয়েছে ক্লাসে ও ক্লাসের বাইরে ।চিঠি দিয়ে, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে, এমন কি ‘স্যার, আই লাভ ইউ!’ বলে ।কিন্তু সুরঞ্জন মোটামুটি নির্বিকার ভাব বজায় রাখতে পেরেছে ।অথচ আজ, পনের বছর অধ্যাপনার পর, ঘরে বৌ ও তার বন্ধুনিদের দল এবং কলেজে সহকর্মিনী ও অজস্র ছাত্র্রীদের সঙ্গে মেলামেশা করার পরও, সে কিনা হঠাৎ একটি ছাত্রীর একটি কথায় এমন বিস্ময়-বিহ্বল হয়ে গেল!

আর কথাটাই বা কি?অতি সাধারণ ভদ্রতা-সূচক একটা প্রশ্ন ।কিন্তু ঠিক তার আধ ঘন্টা আগে কলেজের টিচার্স রুমে যে আলোচনার সূত্রপাত করেছিল সুরঞ্জন নিজেই, সেই প্রেক্ষিতে এই সামান্য কথাটা অসামান্য, প্রায় অলৌকিক হয়ে উঠল ।

থার্ড ইয়ার অনার্স ক্লাসে একটা দুরূহ টপিক ডায়াগ্রাম এঁকে মেহনত করে বুঝিয়ে আসার পর ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নিজের চেয়ারটায় বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল সুরঞ্জন ।বাংলার তরুণ অধ্যাপক অনিকেত লাগোয়া টয়লেট থেকে হাল্কা হয়ে বেরল; ধীরে-সুস্থে এসে বসল পাশের চেয়ারটায় ।এদিক-ওদিক আরো দু’চার জন ছিল ইংরিজি, বটানি, কমার্শিয়াল ল’য়ের ।

সুরঞ্জন বলল, ‘দেখ,অনিকেত, তুমি তো নামকরা কাগজের নামকরা কবি ।ব্যথা বোঝ? ছোটখাট আক্ষেপ?’

অনিকেত বলল, ‘দেখুন আপনি এত হেঁয়ালি করছেন, তবু আধুনিক কবিতাকে দুর্বোধ্য বলেন!’ তারপর সুরঞ্জনের দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে যোগ করল, ‘কি হয়েছে দাদা? আপনাকে আবার কে দাগা দিল?’

সুরঞ্জন বলল, আচ্ছা প্রাঞ্জল করেই বলি ।আমার একটা বিশেষ আক্ষেপ আছে ।বিষয়টা সামান্য, কিন্তু প্রায়ই খোঁচা দেয় ।এত বছর কাজ করছি এই মেয়ে-কলেজে, এতো গাড়িবতীর ভিড় এখানে ।কিন্তু কেউ একদিনও লিফ্ট অফার করল না!

বিমল ভঞ্জ তার স্বভাবসিদ্ধ চ্যাংড়ামির ভঙ্গিতে লিফ্ট কথাটার কু-অর্থ করে এক চোখ বুজিয়ে বলল, এই বয়সে কলেজের মেয়েদের কাছে লিফ্ট চাও?শুনলে ঘরওয়ালি ক্যা কহেঙ্গি? মেয়েদের আজকাল দাবায়ে রাখতে পারবা না!

তন্বী পূরবী সেন এডুকেশানের অধ্যাপিকা ।ঠোঁঠে আঙুল ঠেকিয়ে বলল-সসস্!ভবানী দি শুনতে পাবে!ভবানী দি মানে ভবানী বটব্যাল, ভাইস-প্রিন্সিপাল ।চিরকুমারী ।

বিমলের মন্তব্যটাকে অগ্রাহ্য করে সুরঞ্জন তার খেদের কথাটা সম্পূর্ণ করে –‘অথচ প্রচুর পয়সাঅলা লোকের মেয়ে এখানেপড়ে ।আমার বাড়ি থেকে কলেজ, কলেজ থেকে বাড়ি যাতায়াতের পথে অন্তত ডজন খানেক ডিফারেন্ট মডেলের গাড়ি এখানকার মেয়েদের নিয়ে রোজ আনাগোনা করছে ।কলেজের সামনে এসে তারা হর্ন দিয়ে চমকে দিচ্ছে ।ধুলো উড়িয়ে পোড়া পেট্রলের ধোঁয়া নাকেমুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ।অথচ মিনিমাম ভদ্রতা করে কেউ একদিন লিফ্ট দেয় না!’

‘আমার অবস্থায় পড়লে আপনি আর লিফ্ট চাইতেন না’-পূরবী সচেতন ন্যাকামিতে চোখ বিস্ফারিত করে- ‘সেদিন এক সফিস্টিকেটেড ছাত্রী তার আদুরে ডোবারম্যানের পাশে বসিয়ে দিয়েছিল আমায় ।উঃ মা!লয়েডস্ ব্যাঙ্ক পর্যন্ত সারা রাস্তা ভয়ে কাঠ হয়ে গেছি কুকুরটার গায়ে গা ঠেকিয়ে!’

বিমলের আগের কথায় পাত্তা দেয়া হয় নি বলে এবার সে সুরঞ্জনের কাঁধে মৃদু চাপড় মেরে বলে, ‘ব্রাদার, কেন বুঝতে পারছ না, মেয়েরা তোমার রাশভারি ভাব পছন্দ করে না?’

তার খানিক পরেই, একটা সিগারেটের আধখানা শেষ করে সুরঞ্জন পথে পা বাড়িয়েছিল ।বাসস্টপে এসে হাত থেকে সিগারেটের অংশটা ফেলে দিয়ে ঠাহর করতে চেষ্টা করছিল আগতপ্রায় মিনিটা ঢাকুরিয়া-র কিনা...এমন সময় হঠাৎ শুনল-

‘প্লীজ, মে আই গিভ ইউ আ লিফ্ট,স্যার?’

হাঁ, সুরঞ্জনকেই বলছে ।তার সামনেই গাড়ির দরজা খুলে দিয়েছে!যেমন তেমন গাড়ি নয়, একেবারে ঝকঝকে জাপানি টয়োটা!

মেয়েটা নিশ্চয়ই তার কলেজের;কিন্তু ইকনমিক্সের নয়, তাহলে একটু চেনা লাগত ।

ওকে নীরব এবং কিঞ্চিৎ বিমূঢ় দেখে মেয়েটি এবার বলল, ‘আপনি বাড়ি যাবেন তো? আমি ঐ দিকেই যাব...’

ঘটনার অদ্ভুত যোগাযোগ সুরঞ্জনকে হতচকিত করে ফেলেছিল ।কিন্তু সে অনুভব করল অনেক জোড়া ছাত্রী ও পথচারীর চোখ বাসস্টপ ও ফুটপাত থেকে গাড়ির দিকে নিবদ্ধ হয়েছে কৌতূহলী হয়ে ।বিব্রত মুখে সে উঠে বসল মেয়েটির পাশে ।গাড়ি ছেড়ে দিল ।

গলা ঝেড়ে অস্বস্তি কাটিয়ে সহজ হতে চাইল সুরঞ্জন ।বলল, তুমি কোন্ ইয়ারে পড়?অনার্স আছে?

-‘ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছি এ বছর ।আমরা আগে দিল্লি ছিলাম ।ড্যাডি এক ইন্দোজাপানিজ্ কোম্পানির ডিরেক্টর ।আমি ভেবেছিলাম ইকনমিকস্ অনার্স করব ।কিন্তু এ্যাডমিশনের সময় এখানকার প্রফেসররা বললেন হিস্ট্রিতে লেটার মার্কস্ পেয়েছ,ঐটাতেই অনার্স নাও ।সো...’

মেয়েটির গলা বেশ মিষ্টি ।কথার ভঙ্গিতে অনায়াস অন্তরঙ্গতা ।সুরঞ্জন ভাবছিল কি বলবে ।মেয়েটিই আবার কথা বলল-

আপনি আমাদের ফ্রেশার্স ওয়েলকামে এ্যাড্রেস করেছিলেন ।আমি ভীষণ ইমপ্রেসড্ হয়েছিলাম...আই মীন্ অল অব আস্...

মেয়েটির সারল্যে খুশি হল সুরঞ্জন ।নিজের প্রশংসা শুনে আত্মবিশ্বাসওএকটু বাড়ল ।পূর্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটির মুখ নিরীক্ষণ করে বলল, তোমার নাম কি?

-‘শম্পা বসু ।রোল নাম্বার সেভেন্টি-নাইন ।’

ওর ফর্সা বাঁ গাল, ঈষৎ চাপা নাক, আর রক্তিম ঠোঁঠের ফাঁকে ঝকঝকে দাঁতের ঝিলিক লক্ষ করল সুরঞ্জন ।আপন মনেই ভাবল,কোঁকড়া চুলটা এই মুখশ্রীর সঙ্গে একটু বেমানান...কিন্তু ভাসাভাসা চোখ দুটো সহজেই অচেনাকে আপন করে নিতে পারে...

শম্পা বলল, স্যর, আপনি কি কোন ব্যাপারে ওরিড্?...আই মীন্ কেমন যেন এ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড্...

-‘না,না, ও কিছু নয় ।ইটস্ অলরাইট ।আমি জাস্ট ভাবছিলাম হাউ গুড ইউ আর!তোমাদের বাড়ি কোথায়,শম্পা?’

‘যোধপুর পার্ক ।আপনাকে দু’তিন দিন মিনি থেকে নামতে দেখেছি ।’

‘তাই নাকি? হ্যাঁ আমি ভবানীপুরে বিজলি সিনেমা হাউসের কাছে থাকি ।’

‘রফিক, ভবানীপুর চলো!’

সুরঞ্জন একবার ভাবল, শিখা আবার যদি কিছু মনে করে বসে এ নতুন ঘটনায় ।মজাও লাগল,ভাবে তো ভাবুক!জীবনটা বড্ড স্তিমিত, একঘেঁয়ে, ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে ।ক্লাস,টুইশান, লাইব্রেরি, খাতা দেখা আর টিভি দেখা ।ভেবেই আবার হাসি পেল ।একটা কার-লিফ্ট তার নিস্তরঙ্গ জীবনে কি ঢেউ তুলবে!...বাচ্চা মেয়ে, টিপিক্যাল বাঙালি মেয়েদের মত প্যাঁচ নেই মনে...বোধ হয় বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান...তাছাড়া শম্পা থোড়াই রোজ লিফ্ট দেবে ।ওর ইচ্ছে থাকলেও তা সম্ভব নয় ।কারণ ওর আর এস.এম.-এর রুটিনের মধ্যে অনেক ফারাক আছে ।...

বিজলি সিনেমা এসে গেল ।সুরঞ্জনের নির্দেশ অনুসারে বাঁ দিকের গলিতে ঢুকে একটা তিনতলা বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াল ।সুরঞ্জন নামল ।শম্পাকে বলল, টপ ফ্লোরে ডান দিকের ফ্ল্যাটটা আমার ।কোন ছুটির দিনে চলে এসো, ভাল করে দিল্লির গল্প শুনব ।সো সুইট অব ইউ টু অফার মী দ্য লিফ্ট!

শম্পাও নেমে পড়েছিল গাড়ি থেকে ।বলল, ‘আসব স্যার, অব কোর্স!আয়্যাম সো হ্যাপি টুডে ।আজ আমার বার্থ ডে ।মা বলে, আজ তেমন কাজ করা উচিত, যা করলে মন ভাল থাকে ।’

হঠাৎ নীচু হয়ে সে প্রণাম করল সুরঞ্জনকে ।সুরঞ্জনও স্বতস্ফূর্ত ভাবে তাকে তুলে ধরল ।

শম্পা ওর চোখেমুখ তুলে বলল, ব্লেস্ মী স্যার!

-হ্যাঁ, আশীর্বাদ করি জীবনে সব বিষয়ে সফল হও!...তুমি এস কিন্তু ঠিক সানডে বা যে কোন হলিডেতে ।আমি বাড়িতেই থাকি ।

                        (২)

তারপর শম্পা সত্যিই এসেছে সুরঞ্জনের ফ্ল্যাটে ।একবার নয়, বারবার ।শিখাকে অসংকোচে আন্টি ডেকে ঘনিষ্ঠ আলাপ জমিয়ে নিয়েছে ।সঙ্গে নিয়ে এসেছে কখনো মিষ্টির বাক্স, কখনো নামী রেস্তোরাঁর ফিশফ্রাই, কখনো বা চকোলেট-কেক ।সুরঞ্জন বিব্রত হয়ে বলেছে, ‘তুমি সবসময়খাবার আন কেন? আমাদের কি লৌকিকতার সম্পর্ক? তাছাড়া আমরা বুড়োবুড়ি কি এত খেতে পারি? দেখছ তো বাচ্চাকাচ্চার পাট নেই, আমাদের বাড়ি বড্ড শুকনো!’

শম্পা প্রথমটা থতমত খেলেও নিরস্ত হয়নি ।বলেছে ‘আপনারা মোটেই বুড়ো নন ।তবু যদি আমার আনা খাবার খেতে আপনার আপত্তি থাকে, আমিই এখানে বসে খাব ।নাকি, আপনি আমায় খাবার জন্য দোকানে পাঠাবেন?’

প্রথম দর্শনেই মেয়েটার ওপর শিখারও বেশ মায়া পড়ে গেছে ।সেও একদিন সুরঞ্জনকে ঠেস দিয়ে বলল, ‘আমরা মা-মেয়ে ভালমন্দ খাই বলে তোমার হিংসে হচ্ছে বুঝি?’ উল্টে কাজের মেয়েটাকে দিয়ে ‘শ্রীহরি’ থেকে গরম সিঙ্গাড়া আর সন্দেশ আনিয়ে বসল শিখা ।আর শম্পা নিজের হাতে সুরঞ্জনের মুখে পুরে দিল একটা দেলখোস!

খেতে খেতে সুরঞ্জন ভাবতে লাগল...মা-মেয়ে...কথাটা তার মনের তারে অনুরণিত হতে থাকল ।

সত্যি!যে জিনিসটা ফোটার আগেই জীবন থেকে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত বলে ভাবা গিয়েছিল, শম্পাকে কাছ থেকে দেখে সেই অপত্য স্নেহ স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে ঝরে পড়ল মনের শুষ্ক কন্দরে ।ঠিক শম্পার বয়সী হোত না তাদের মেয়ে থাকলে, কারণ সুরঞ্জন-শিখার দাম্পত্য জীবনের আয়ু এখনো ষোল বছর পেরোয় নি ।কিন্তু শিখা ঠিকই বলেছে, মেয়ে মনে করতে কোন অসুবিধে নেই ।ওর সঙ্গে যোগাযোগটা যেন বিধাতার তরফ থেকে খানিকটা ক্ষতিপূরণ বা সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো!***

তাদের বিবাহিত জীবন তিন বছর নিঃসন্তান কাটার পর দুপক্ষের আত্মীয় আর বন্ধুদের অনুরোধ ও গঞ্জনায় পিষ্ট হয়ে সুরঞ্জন ও শিখা দুজনেই যথারীতি ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়েছিল ।তাতে জানা গিয়েছিল দুর্বলতাটা সুরঞ্জনেরই ।তার শুক্রকীটগুলো প্রজননে অক্ষম ।অথচ সুরঞ্জনের আকৃতি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যলক্ষণ অনেকেরই ঈর্ষার বস্তু ।

সুরঞ্জন বলেছিল, ‘তোমার দুর্ভাগ্য, শিখা, আমার সঙ্গে গাঁটছড় বেঁধেছ ।কিন্তু আমি তোমাকে বেঁধে রাখব না ।...এ আঘাতের ক্ষতিপূরণ হয় না, তবু তোমার জীবন তুমি নতুন সঙ্গী নিয়ে সুরু করতে পার। সারা জীবন মাতৃত্বের স্বাদ থেকে কেন বঞ্চিত থাকবে?’

শিখা ওর কপালে বুকে হাত বুলিয়েছে ।ইতিহাস প্রসিদ্ধ অনেক বীরপুরুষও যে পিতৃত্বের অধিকারী ছিলেন না, এ কথা উল্লেখ করেছে সান্ত্বনা হিসাবে ।শেষে বলেছে ‘তুমি তো আমায় ঠকাও নি, ভগবানই তোমায় ঠকিয়েছেন ।তোমার সমস্ত ভালবাসা প্রতিনিয়ত উজাড় করে দিয়েছ আমাকে ।এতো নিয়েছি, আর এই দুঃখটুকু ভাগ করে নিতে পারব না?’বন্ধু আর আত্মীয়দের বাচ্চা সম্পর্কে ওদের দুজনেরই হীনমন্যতা 

ছিল ।শিখা বড্ড বেশি আদর নিয়ে হামলে পড়ত; নিজের সন্তানের অভাবজনিত শূন্যতা লোকের চোখে পরিস্কার ধরা পড়ত ।তারা ভাবত করুণার পাত্রী ।ওদিকে সুরঞ্জন একটা আক্রোশ পোষন করত বাচ্চা-সমাজের প্রতি ।কেউ এসে তার ঘর নোংরা অগোছালো করলে তার বাপ-মা’র সামনেই ঝাঁঝিয়ে উঠত । একটা নার্সারি রাইম বলার জন্য সবাই যখন কোন বাচ্চাকে তোষামোদ করত, ওর গা জ্বলে যেত বিরক্তিতে ।নিজেকে বোঝাতে চেষটা করত এটা এক ধরণের বিকৃতি ।কিন্তু মানসিক ক্ষোভ তাতে শান্ত হোত না!

ক্রমে বহতা সময়ের প্রভাবে সে অনুভূতি ভোঁতা হয়ে প্রায় মিলিয়ে গেছে ।অবসর সময়টা বেহালা বাজিয়ে কেটে গেছে একরকম ।শিখারও অন্যের বাচ্চা নিয়ে আদিখ্যেতা ক্রমে নিবৃত্ত হয়েছে ।সে আছে একটা গানের স্কুল নিয়ে ।কিন্তু দুজনের মন হয়ে গেছে দ্বিধাবিভক্ত স্রোতের মত ।মাঝে বালির চড়া পড়েছে ।

                        (৩)

দু’বছরের ঘনিষ্ঠতায় শম্পা এখন সুরঞ্জনদের বাড়ি-তথা-জীবনের মূল কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে নিজেকে ।ওকে ঘিরে দু’জনের ব্যর্থ সন্তানাকাঙ্ক্ষার ফল্গুধারা প্রকাশ্য স্রোতের আকার ধারণ করেছে ।

ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে শম্পা ইকনমিকস্ নিয়েছে ।প্রায়ই সুরঞ্জনের কাছে বসে বইখাতা নিয়ে ।দাবিটা আগেই জানিয়ে দেয়—সিম্পল এ্যাণ্ড ক্লিয়ার করে বুঝিয়ে দিতে হবে ।

এখন শিখার শপিংয়েরও নিয়মিত সঙ্গিনী সে ।তার কাছে দু’এক পদ রান্নাও শিখেছে ।সিনেমা দেখতেও যায়, কখনো দুজনে, কখনো তিন জনে ।কোন কোন দিন হয়তো বা রবীন্দ্র সঙ্গীতের মহলা বসল।বেহালায় সঙ্গত করল সুরঞ্জন ।

গত পুজোর ছুটিতে শম্পার বাবা-মা-ভাই, অর্থাৎ, পুরো পরিবারের সঙ্গে সুরঞ্জনরা হাজারিবাগ কাটিয়ে এলো চার দিন ।ফটো তোলা হয়েছে অনেক ।গ্রুপ ফটো, একক ফটো, সুরঞ্জন আর শিখার সঙ্গে শম্পা ।এরকম একটা ফটো বাঁধিয়ে শিখা রেখে দিয়েছে ড্রইংরুমে ।

সপ্তাহে দু’দিন অন্তত কলেজ যাতায়াত শম্পাদের গাড়িতে করতে হয় সুরঞ্জনকে ।এ ছাড়াও মাঝেমধ্যে লিফ্ট জুটে যায় ।হয়তো আমেরিকান লাইব্রেরি থেকে জওহরলাল নেহরু রোডে পড়তেই চৌরঙ্গীর কোন সিনেমা হল থেকে ম্যাটিনি শো ফেরৎ শম্পা ওকে দেখতে পেয়ে থামল এসে পায়ের কাছে ।বলে উঠল,কাম ইন, কাকু, ইউ আর আণ্ডার এ্যারেস্ট!ইদানিং ‘কাকু’ই বলে সে ।সুরঞ্জন হাসিমুখে বলে, ‘এ যে দেখছি এস্ ফোর্টিনের বদলে এস শম্পা ।সকালে উঠে কার মুখ দেখেছিলাম!’ শম্পা জবাব দেয় ‘মনে হচ্ছে আমারই।’ দুজনেই হেসে ওঠে ।***

ওস্তাদ আমজাদ আলি খানের সরোদ ।কলামন্দির বেসমেন্ট হলে ।সুরঞ্জন দুটো টিকিট পেয়েছে ।শম্পাকে সঙ্গে নিয়ে গেছে ।বাজনা শুনতে শুনতে রাগটার আরোহ-অবরোহ জানতে চায় শম্পা ।সুরঞ্জন নীচু স্বরে বলে দেয় ।অনেকক্ষণ রেষারেষির পর সরোদী আর তবলচি যখন একই সঙ্গে সম-এ পড়ে সন্ধি করল,শম্পা জিগ্যেস করল, ‘তাল ঠিক আছে? না, তুমি যেমন আমার সাথে এ্যাডজাস্ট করে নাও, ওরাও তেমনি শো-টা ঠিক রাখছে?’ সুরঞ্জন চাপা গলায় বলে, ‘চুপ,চুপ!আমজাদ শুনতে পেলে ঘাড় ধরে বসিয়ে হাতে কাউন্ট করাবে!’...ঠুংরি স্টাইলে পেশ-করাখাম্বাজ একেবারে বিভোর হয়ে উপভোগ করছিল সুরঞ্জন ।প্রতিটি মীড়ের কাকুতি যেন খানিকটা করে অনুরাগ চলকে তুলে প্রিয়র উদ্দেশে নিবেদন...।হঠাৎ তাকে পাশ ফিরে তাকাতে হোল ।তন্ময় হয়ে সরোদ শুনতে শুনতে নিজের অজান্তে শম্পা একহাতে খামছে ধরেছে তার পাঞ্জাবির কাঁধ!...

মাঝে মাঝে শব্দ-জব্দও এনে হাজির করে শম্পা ।সমাধানের জন্য সুরঞ্জনের সাহায্য চায় ।একদিন মেলাতে গিয়ে একটা গোলমেলে কথা এসে পড়েছিল ।শম্পা পরম সারল্যভরে জিগ্যস করেছিল, ‘আসঙ্গ’ কথাটার মানে কি?সুরঞ্জন এক পলক ওর দিকে তাকিয়ে বলল,এটা তোমার আন্টি ভাল বলতে পারবে!

আজকাল প্রায়ই সুরঞ্জন অবাক হয়ে ভাবে, শম্পাকে একদিন না দেখলে কেন মনে হয়,মনের মুখশুদ্ধি হয় নি?...লোকের বাৎসল্য কি এই জিনিস?...অবশ্য নিজের সন্তান হলে যে অধিকার-জাত নিস্পৃহতা থাকে, পরের মেয়ে, পরের বোন ইত্যাদিকে আপন করে নেওয়ার মধ্য তার বদলে একটা আকর্ষক অনুভূতি থাকে ।টমাস হার্ডির নভেল ‘দ্য মেয়র অব ক্যাস্টারব্রিজ’-এ হেনচার্ড ও এলিজাবেথ-জেন-এর কথা মনে হল সুরঞ্জনের ।সেই পেয়ে হারানোর ভয়...

তারপর সেদিনের ছাত্র-ধর্মঘট...কিছু উটকো ছেলে কলেজের গেট টপকে ভিতরে ঢুকেছিল ।সুরঞ্জন স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে এসেচড়া গলায় প্রতিবাদ করেছিল ।অতর্কিতে একটা ইট এসে লাগল তার কপালে।...শম্পার গাড়িতেই সেদিন স্টিচ করে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছিল ।অনেক রাত পর্যন্ত তার ব্যাণ্ডেজ-করা মাথায় হাত বুলিয়ে তবে বাড়ি গিয়েছিল মেয়েটা ।বলে গিয়েছিল, ‘কাকু, সাতদিন কমপ্লিট রেস্ট ।খবরদার কলেজ যাবে না!’

                         (৪)

শম্পার কথা রেখেছে সুরঞ্জন ।সাত দিন ছুটির পর আজ তার কলেজ জয়েন করার কথা ।গেলেই এরিয়ার ডি.এ. বেশ কয়েক হাজার টাকা পাওয়া যাবে ।সুরঞ্জন ভেবেই রেখেছে শম্পাকে লেটেস্ট টেকনোলজি-যুক্ত দামি একটা মোবাইল ফোন দেবে আজ ।সেই সঙ্গে ওর পছন্দমত কিছু ফিল্মের ডিভিডি-ও ।

শম্পাদের মোটর এসে থামল সুরঞ্জনের বাড়ির সামনে ।কিন্তু গাড়ি থেকে বরলেন শুধু শম্পার বাবা । সুরঞ্জন আপ্যায়ন করে বসাতেই তার হাতে তুলে দিলেন একটা জমকালো বিয়ের কার্ড ।সুরঞ্জন সবিস্ময়ে তাকাতে বললেন, ‘যোগাযোগ অপ্রত্যাশিত ভাবে হঠাৎই হয়েছে ।আপনাদের আগে কিছু জানাতে পারিনি... ছেলেটি রিয়েল জেম্ ।সাতাশ বছর বয়সেই বিরাট বিজনেস এক্সিকিউটিভ ।ওরা থাকে বেঙ্গালুরু ।’

সুরঞ্জন চুপ করে রইল ।মিঃ বাসু আবার বললেন, ‘শম্পা আপনার কথা খুব শোনে ।কলকাতা ছেড়ে যেতে হবে বলে কান্নাকাটি করছে ।আজ নাকি ওদের পার্ট টু-এর রেজাল্ট বেরবে? কিছুতেই কলেজ যাবে না বলছে ।ওকে একটু বুঝিয়ে বলবেন, কেমন?...আমি চলি, অফিসের দেরি হচ্ছে...আপনি কি এখন কলেজ যাবেন? তাহলে আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যেতে পারি...’

সুরঞ্জনের কানে আর শেষ কথাগুলো ঢুকল না ।সে শুধু ভাবতে লাগল, আমি বুঝিয়ে বলব শম্পাকে,,, আমি?...আমাকে কে বোঝাবে?...

কোন জবাব না পেয়ে মিঃ বাসু কয়েক মুহূর্ত অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন অধ্যাপকের দিকে । তারপর আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগলেন ।

শিখা ধীর পায়ে ঘরে এসে ‘শুভ বিবাহ’ লেখা খামটা খুলে পড়ল । তারপর সুরঞ্জনের কাঁধে আলতো হাত রাখল ।

একটু চমকে উঠল সুরঞ্জন ।মুখ তুলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল । মুখ দিয়ে বেরল, ‘হঠাৎ এসেছিল, হঠাৎই চলে যাচ্ছে!’

শিখা বলল, ‘আমি খুব খুশি হয়েছি ।আমাদের শম্পি নিশ্চয়ই সুখী হবে!’

সুরঞ্জন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর চোখ দুটো লক্ষ্য করল ।হাঁ, সে দুটো রীতিমত সজল ।

তবে কিনা, মানুষ সুখ-দুঃখ দুটোতেই চোখের জল ফেলে!


Sunday, August 14, 2022

উপন্যাস - পদ্মাবধূ || বিশ্বনাথ দাস || Padmabadhu by Biswanath Das || Fiction - Padmabadhu Part -15


 


ব্যাস আর যায় কোথা , আমার মুখ দিয়ে বাবা উচ্চারণ হতেই মনটাকে আর স্থির রাখতে পারলাম না । বাবার স্মৃতি আমাকে উতলা করে তুলল । এতদিন ভুলেছিলাম । বাবাকে , ভুলেছিলাম অতীতকে । কোন দিন আমর মনকে জিজ্ঞাসা করিনি , আমার অসহায় , দৈন্য পীড়িত বাবা কেমন আছেন । আমি বড় স্বার্থপর হয়ে গেছি । এ পথের যাত্রী হয়ে বাবার কথা প্রায় ভুলতে চলেছিলাম । আজ বাবার কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতেই মনটা বড় কেঁদে উঠল ।


 তাই আদরী মাসীকে তাচ্ছিল্য করে শ্যামলীদি আমার মুখপানে তাকিয়ে বলল , আয় বোস এই কাজটা শেষ করে তোর সাথে কথা বলছি ।

 দেখলাম শ্যামলীদি ওর ডায়েরীতে লিখছে , অদ্যাবধি দুটো বছর কেটে গেলো , তবুও আমার হিতৈষী বন্ধুকে পেলাম না । তবে তুমি ভেবো না বন্ধু , যেখানে যেভাবে নিজেকে আত্মগোপন করে থাক না কেন , একদিন তোমার দেখা পাবই । তোমার অন্বেষণে সর্বদাই সজাগ আছি । তোমার প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত আমার তৃষ্ণা কোনদিনই মিটবে না । আমার ক্লেদাক্ত জীবনে আমি শান্তি পাবো না । 

লেখা শেষ হতেই বলল , এই ডায়েরী লেখা দ্যাখ , আমার জীবনের জ্যোতির্ময় দেবতার অদৃশ্য সংকেত দেখতে পাবি । যার সঙ্গে আমার জীবন ছিলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত । যাকে নিয়ে আমি জীবনে একটা সুখের নীড় বাঁধতে চেয়েছিলাম । 

শ্যামলীদি আমার হাতে একটা ছবি দিলো । ওতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই আমার চোখ দুটো পদ্মফুলে আবদ্ধ ভ্রমরের মতো হয়ে গেল । ততক্ষণাৎ বলে উঠলাম , একি ! এযে আমার পূজনীয় রন্টুদা ? 

কি বললি ? শ্যামলীদি বিদ্যুৎ বেগে উত্তর দিলো ও কৌতুহলী হয়ে বলল , এই জানোয়ারটাই তোকে এই পথে নামিয়েছে ? 

আমি সম্মতি জানালাম । দন্তে দন্ত চেপে শ্যামলীদি হিংস্র পশুর মতো গর্জন করতে লাগলো । 

ওর অবস্থা দেখে মনে হল , রন্টুকে সম্মুখে পেলে সে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবে ।

 খোলা জানালা পানে তাকিয়ে শ্যামলীদি দৃঢ় কণ্ঠে বলল , প্রতিশোধ আমাকে নিতেই হবে পদ্মা । এই সব উন্মার্গগামী অধঃপতিত লোকটাকে চরম শিক্ষা দিতে হবে । নতুবা আরো বহু নারীর ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের কালো মেঘ নেমে আসবে ।

 শ্যামলীদির মুখপানে তাকিয়ে বললাম , কিন্তু ওর নাম তো পল্টু নয় দিদি ?

 সব অভিনয় ওরা নানান নামে মিশতে পারে । নানান ছদ্মবেশ ধরতে পারে । তবে বড় আফশোষ , এতো কাছে পেয়ে ওকে ধরতে পারলাম না । আফশোষে মাথার চুলগুলো ছিঁড়তে থাকল । শ্যামলীদি সখেদে বলল , ওকে কাছে পেতে আর বেশী বিলম্ব হবে নারে । সে আমার হাতের নাগালের মধ্যে আছে । তারপর - তারপর হবে আমার প্রতিশোধের পালা । শ্যামলীদি এবার শান্ত হল । ধীর ধীরে আমার কাছে এগিয়ে এসে ছবিটা ছিনিয়ে নিয়ে ডারৌতে আঁঠা দিয়ে চিটিয়ে রাখলো । শ্যামলীদির রুদ্রমূর্তি দেখে কোন কথা বলার সাহস পেলাম না । 

মনের কথা চাপা রেখে বাইরে বেরুতেই আমাকে বলল , চলে যাচ্ছিস কেন , কি প্রয়োজনে এসেছিলি বল ।

 ধীরে ধীরে শান্ত কণ্ঠে বাবার কথা বললাম । বাবার কাছে যেতে মন চাইছে দিদি।তার কতদিন বাবাকে দেখিনি । তাই চঞ্চল মনকে কোন প্রকারে শান্ত রাখতে পারছি না । আমার কথা শুনে শ্যামলীদি স্থানুর মতো হয়ে গেল । অবোধ বোনকে কিভাবে সান্ত্বনা দেবে তার ভাষা পাচ্ছে না ।

 ওকে নীরব থাকতে দেখে পুনরায় বললাম , আমার বাবাকে শুধু একটি বারের মতোও দেখতে পাবো না শ্যামলীদি ? বেদনা বিদ্ধ হয়ে হেঁট মুখে তক্তাপোষে বসে রইলাম । ক্রমশঃ চোখ ফেটে দরদর ধারায় জল বেরুতে শুরু করল । তবুও নিজেকে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে বললাম , দিদি একটিবার বাবাকে দেখার সুযোগ করে দাও । 

শ্যামলীদি বলল , সে সুযোগ হবে না পদ্মা । ক্রীতদাসের প্রথা এখানে । শুধু এইটুকু পার্থক্য ওদের মতো অনাহারে , অনিদ্রায় মরতে হয় না । কোন প্রকারে এই পিঞ্জর হতে মুক্ত বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারবি না । যেখানে যাবি ছায়ার মতো অনুসরণ করবে এখানকার পোষাগুন্ডারা । বললাম , তবে কি একটি বারও বাবাকে দেখবার সুযোগ পাবে না ? 

না । 

একি হল দিদি । এই মরুময় জীবনে কি কোনদিন শান্তির বারিধারা বইবে না ? বাবাকে এতোদিন ভুলেই ছিলাম । বাবার কথা যদি না মনে পড়তো , তার করুণ মুখখানি আয়নার মতো ভেসে না উঠতো , তাহলে তোমার কাছে ছুটে আসতাম না শ্যামলীদি । আর আর দাঁড়াইনি এখানে । বুকে পুঞ্জীভূত বেদনা নিয়ে দ্রুত গতিবেগে বাসার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং রুদ্ধদ্বার গৃহাভ্যন্তরে বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম । কতক্ষণ যে তপ্ত অশ্রু নির্ঝরের মতো চক্ষু দিয়ে বয়ে গেছিল তা আমি নিজেই বুঝতে পারিনি ।

 হঠাৎ শ্যামলীদির কণ্ঠস্বরে নিজের সম্বিৎকে ফিরে পেলাম । শ্যামলীদি বলল , তোর বাবার ব্যবস্থা করলাম পদ্মা । তবে এক শর্তে দুদিনের মধ্যে এখানে হাজির হতে হবে । ধড়মড় করে উঠে শ্যামলীদিকে জাপটে ধরে বললাম , এই পঙ্কিলময় ভোগসুখাসক্ত জীবন আকাশে তুমি আমার ধ্রুবতারা । তোমাকে লক্ষ্য করেই আমি আমার জীবনের চলার পথ বেছে দেব দিদি । তার কাঁধে বারবার মুখ ঘষতে থাকলাম ।

 একটু পর ধীরে ধীরে ওর কাঁধ হতে মুখ তুলে কথা দিলাম , যদি মরে না যাই


তাহলে এখানে এসে আমার যৌবন গাঙে আবার তরণী ভাসাবো দিদি এখানে ফিরে না এলে তোমার প্রতি কি অত্যাচার হবে তা আমার অজনা নয় । আমি অবশ্যই আসবো । এই তীর্থ স্থানই সে আমার যৌবনের উপবন আর বার্দ্ধক্যের বারানসী । চোখ দুটো ছল ছল্ করে উঠলো । 

পরদিন সকালে শ্যামলীদিকে প্রণাম করে বদ্ধ পিঞ্জর হতে মুক্ত পক্ষী বিহঙ্গমের মতো অসীম নীলাকাশে পাখা মেলে দিলাম । পুতিগন্ধময় নরকের কলুষিত পরিবেশ হতে মুক্তি পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম । আজ বড় সৌভাগ্য যে আমার বাবুকে একটিবার দেখার সুযোগ পাব । আকাশের শ্যামলীমা , পাতার মর্মর ধ্বনি , বাতাসের স্নিগ্ধতা , বিহঙ্গের কলগীতি - এতদিন আমার প্রাণে স্বর্গীয় আনন্দেয় শিহরণ আনতে পারিনি । আর আজ আমি মুক্ত প্রাণের নির্ঝর যেন এক সুউচ্চ পর্বত শৃঙ্গ হতে বেরিয়ে ছুটে চলেছি অসীম বারিধিপানে । মোড়ে এসে ট্রাম ধরে হাওড়া ষ্টেশনে এসে হাজির হলাম।

যখন চণ্ডীপুরে পৌঁছলাম , অনেকখানি বেলা গড়িয়ে গেছে । গ্রীষ্মের দাবাদাহে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে গেলাম । কিন্তু পল্লী পরিবেশে সোনালী রোদ্দুরকে স্নেহ পূর্ণ বক্ষে আলিঙ্গন করলাম । গ্রামের মোড়ে আসতেই কৌতুহলী নরনারী অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকাতে লাগলো । বিশেষ করে আমার জমকালো সাজসজ্জা ও সারা শরীরের আভিজাত্যের ছাপ দেখে ওরা আমাকে ধনাঢ্য রমনী বলে ভেবেছিলেন । সীমন্তে সিঁদুর যদি থাকতো , ভাবতো আমি কোন ধনী ব্যক্তির গৃহনী । ওদের ওভাবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছিল । 

তবে ওরা আমার রহস্যাবৃত জীবনের ইতিবৃত্ত জানলে কি দৃষ্টিতে দেখতো তা ভালো ভাবেই জানি । ওসব ভাবনাকে উপেক্ষা করে দ্রুতপদে বাড়ীর দিকে এগিয়ে চললাম । সহসা তার কণ্ঠস্বরে যেন চমকে উঠলাম । পিছু ফিরতেই দেখলাম দেবাশীষদা ডাকছেন , এতোদিন কোথায় ছিলে রমা ?

 রমা নামে আমাকে ডাকতেই আমার বলতে ইচ্ছে হলো তোমার রমার অপমৃত্যু ঘটেছে , আমি সেই রমার প্রেতাত্মা । মুহুর্তে নিজেকে বদলে গিয়ে বললাম , কেমন আছো দেবাশীষ দা ?

 দেবাশীষদা বললেন , ভালো ।

 বাবা কেমন আছেন ? 

সেই জন্যইতো তোমার খোঁজে কলকাতা গিয়েছিলাম।

 উৎকণ্ঠার সহিত জিজ্ঞাসা করলাম , বাবার কিছু হয়েছে নাকি ? 

দিন দশ বারো হলো কাকাবাবুকে পাওয়া যাচ্ছে না ।

একথা শুনে আমি যেন ব্রজাহত হয়ে পড়লাম ।

 হ্যাঁ রমা , বিশেষ করে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন বলে আমরা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে আছি । তুমি কলকাতা যাবার কয়েক মাস পরেই তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেললেন।

 ধীরে ধীরে আমার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো , মনে হলো আমি আর সেস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না ।

 দেবাশীষদা বলে চলেছেন , আমরা তাকে সুস্থ করবার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলাম , কিন্তু কোন ফল হয়নি । কেবল তোমার কথাই বারবার বলছিলেন । তোমাকে দেখার জন্য বড় ছটপট করছিলেন , তাই কাকাবাবুর বিচলিত মন দেখে তোমার খোঁজে কলকাতা গিয়েছিলাম কিন্তু পাইনি । আমরা নিরাশ হয়ে ফিরে আসার পর তার অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়ল ।

 শুধু বলেছিলেন তোমরা কেউই আমার রমাকে আনতে পারবে না । আমি নিজেই ওকে খুঁজে বের করবো । আজই আমি কলকাতা যাবো । 

কোন প্রকারে সান্ত্বনা দিয়ে রেখেছিলাম । কিন্তু কখন যে বেরিয়ে গেছেন বাড়ী হতে তা বুঝতে পারিনি । মনে হয় তোমার খোঁজে কলকাতা গেছেন । রমা , বাবাকে কি একটা পত্রও দিতে নেই ? 

কোন কথা মুখ দিয়ে বের করতে পারলাম না , শুধু মুখে কাপড় চাপা দিয়ে কাঁদছিলাম । একি করলে ঠাকুর , একথা শোনার আগে কেন আমার মৃত্যু দিলে না । গোপনে বারবার ডেকেও কোন ফল হল না । শুধু তীরবিদ্ধ পাখীর মতো যন্ত্রণায় ছটপট করতে থাকলাম।


 কি করব , কি করে বাবার দেখা পাবো । বাবার সঙ্গে দেখা করার অন্য দুস্তর বাবা ঠেলে বহু আশা নিয়ে বেে
বেড়িয়ে পড়েছিলাম । ফল যে এই হবে , আমি কল্পনা করতে পারিনি । এরপর আমার করনীয় কি – তাই ভাবছিলাম । আবার যথাস্থানে ফিরে যাবার সংকল্প নিয়ে অমাবস্যার নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে পা বাড়ালাম ।


                        ক্রমশ...

Saturday, August 13, 2022

ছোট গল্প - সুজাতা ম্যাম || লেখক - আভা সরকার মন্ডল || Short story - Sujata mam || Written by Ava sarkar mandal


 

সুজাতা ম্যাম

    আভা সরকার মন্ডল

 

 

                আমেরিকা থেকে পাঁচ বছর  পর দেশে ফিরল তিতলি। এয়ারপোর্টে পা রেখেই বুক ভরে শ্বাস নিয়ে আপন মনে বলল ---- আহ্ শান্তি !

নিলয় হাসছে--

 ----শান্তির হাওয়া বেশি করে খাও ।দু 'সপ্তাহ মাত্র ।এবার গেলে পাঁচ বছরের আগে আর আসা হবে না ।

--- তিতলির মুখ কালো হয়ে যায়।ভালো লাগে না তার আমেরিকা। নেহায়েত নিলয় তার প্রেমে হাবুডুবু আর সেও ভালবাসে নিলয় কে তাই ....

         গাড়ি থেকে বড় রাস্তায় নেমে সরু গলির ভেতর তাদের বাড়ি ।গাড়ি ভেতরে ঢুকবে না। বড়ো বড়ো দুটো ট্রলি ব্যাগ এবং হাতেও ছোটো বড়ো চারখানা ব্যাগ সহ গাড়ি থেকে নামল তারা।সবার জন্য টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে কিনতে বোঝাটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। তবু তিতলির মন ভরেনি । প্লেনে উঠতে দেবে না বলে,নিলয় ভয় না দেখালে সে আরও একটু কেনাকাটা করত!

বাবা আর ভাই গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা একহাতে নিলয় অন্য হাতে তিতলিকে জড়িয়ে নিলেন।

... রাস্তায় কষ্ট হয়নি তো মা তোদের?

----একদমই না তিতলি বলল।

... এমা! দিদি,তুই কত রোগা হয়ে গেছিস ।ভিডিও কলে তো এতটা রোগা মনে হয় না।

..... আর তুইও তো ফুটবল হয়ে গেছিস । তোকেও তো এত মোটা মনে হয় না--- তিতলি ভাইয়ের কথার জবাবে তার চুল টেনে আদর করে বলল।

ভাই আর বাবার হাতে ব্যাগগুলো ছেড়ে দিয়ে সে এগিয়ে গেল তাড়াতাড়ি । দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছে মাকে।সবাইকে ফেলে ছুটে গেল সে মায়ের দিকে।  জড়িয়ে ধরলো তাঁকে। কারো মুখে কথা নেই ।দুজনের চোখেই জল। মা, বাবা, ভাইকে ছেড়ে থাকতে হয় বলেই বিদেশ তিতলির একদম ভালো লাগে না।

 

          তিতলির শ্বশুরমশাই বেঁচে নেই। শাশুড়ি মা আমেরিকায় তাদের সঙ্গেই থাকেন।তিনিই তিতলি আর নিলয় কে পাঠিয়েছেন বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য। নিলয় তাঁর একমাত্র সন্তান।দেশে তেমন কোনো আত্মীয়-স্বজনও নেই তাঁর ।সর্বোপরি দেশের প্রতি তেমন কোনো মোহও কেন যেন তাঁর নেই । তিতলি অনেক বলাতেও তিনি রাজি হয়নি, তাদের সঙ্গে আসতে।

              একটু বিশ্রাম নিয়ে তিতলি ছুটল টিনার বাড়ি ।পাশের গলিতেই। সে আসছে জেনে টিনা শ্বশুর বাড়ি বর্ধমান থেকে ছুটে দমদম এসেছে প্রিয় বন্ধুর সাথে দেখা করতে। কালকেই চলে যাবে সে।তাই আজকেই তার সঙ্গে দেখা করা জরুরি।

টিনাদের বাড়ি ঢুকতেই ডান হাতে একটা বিশাল বটগাছ।তার চারিদিকে বাঁধানো বেদী।পাড়ার ছেলে ,মেয়ে, বউ এমনকি বুড়ো-বুড়িরাও এই বেদিতে বসে আড্ডা দিত এক সময়।বউমারা বেশিরভাগ সময় দুপুরবেলাটাকেই বেছে নিত গল্প করার জন্য।  সকালটা থাকত বয়োজ্যেষ্ঠ দের দখলে। বাজার বা মর্নিং ওয়াক সেরে থলে হাতে দু'দন্ড বসে  রাজনীতি বিষয়ক আলাপ-আলোচনা চলত তখন। বিকেল বেলায় থাকত উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের ভীড় । বিশাল গাছের চারদিকটা বাঁধানো। সবসময় সরগরম থাকত জায়গাটা। তিতলি আর টিনার কত গোপন কথার সাক্ষী এই বটগাছ !

--এখন কেউ আর সেভাবে গল্প গুজব করে বলে মনে হচ্ছে ‌ না---- শূন্য বটতলা দেখে তিতলি ভাবল।

 

             সে বটগাছটা পার হতে গিয়ে দেখলো মাঝ বয়সী একজন মহিলা দু পায়ে জলের বোতল আঁকড়ে, হাত দিয়ে টেনে ছিপি খোলার চেষ্টা করছে নোংরা কাপড় চোপড় চুলগুলো জটপাকানো ।সে এগিয়ে গেল। বোতলটা খুলে দেবে বলে হাত বাড়াতেই জ্বলজ্বলে চোখে তাকালেন সেই মহিলা । তাঁকে ঠিক সুস্থ বলে মনে হচ্ছে না। কি গভীর দৃষ্টি !কোথায় যেন দেখেছে একে, ভাবছিল তিতলি---- ঠিক তখনই হঠাৎ উঠে তিনি টেনে এক থাপ্পর কষালেন  তিতলির গালে।

টিনা ছুটতে ছুটতে এসেও রক্ষা করতে পারলো না তিতলি কে। সে বারান্দা থেকেই দেখেছিল তিতলি রাস্তা ছেড়ে গাছতলার দিকে এগোচ্ছে। তখনি ছুট লাগিয়েছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। ভ্যাবাচাকা মুখে দাঁড়িয়ে আছে তিতলি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই টিনা তাকে হাত ধরে টানতে টানতে  নিয়ে গেল বাড়ির ভেতর। ঘরে ঢুকে এসি চালিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল সে। এক গ্লাস জল এগিয়ে দিল তিতলির দিকে ।বিনা বাক্যব্যয়ে তিতলি ঢকঢক করে জল খেতে লাগলো।.

----- চিনতে পারলি ?.... সুজাতা ম্যামকে?

টিয়ার প্রশ্নে তিতলি বিষম খেলো জোরে। ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল মুখ থেকে ছিটকে পড়া জল।

..... সরি!সরি!সরি! কি যে বলি তোকে? ঠান্ডা হয়ে বসতো আগে----

টিনা তিতলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল ।

ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় লাগল তার । টিনার মা বাবা ভাই সবাই অফিসে। ফাঁকা বাড়ি কতদিন পরে দেখা দুই বন্ধুর। কত গল্প করবে বলে ছুটে এসেছে দুজন দুদিক থেকে।কিন্তু হাওয়া অন্য পথে বইছে। সুজাতা ম্যামের কাহিনী দিয়েই শুরু হল কথা, যিনি বদ্ধ উন্মাদ এখন।

       তিতলির মনে পরল সুজাতা ম্যামের ক্লাসে পিন পতনের শব্দ ও শোনা যেত।তার ব্যক্তিত্ব আর অন্তরভেদী দৃষ্টির গভীরতা কোনো ছাত্র-ছাত্রীকে ক্লাসে অমনোযোগী হতে দিত না। আর সঙ্গে ছিল তাঁর অতুলনীয় সৌন্দর্য ।তা যেন বশ করে রাখত সবাইকে । সুজাতা ম্যামকে ভালোবেসেই অংক ভালোবাসা তিতলির। ভীষণ ভালোবাসতেন তিনি, তিতলি ও টিনাকে।পাশের বাড়িতে থাকার সুবাদে আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হয়েছিল সেই সম্পর্ক। কোন প্রবলেম সলভ করতে না পারলে তিতলি যখন-তখন পাশের গলি থেকে ছুটে যেত সুজাতা ম্যাম এর কাছে। বাড়িতে গেলে তিনি শুধুই মা। মায়ের মতই ছিল তাঁর আদর যত্ন ভালোবাসা। তাঁর হাতে তৈরি নাড়ু খেতে পুজোর সময় গুলোতে প্রায় রোজই তারা ম্যামের বাড়ি হানা দিত। সাত বছরের ছোট্ট একটা ফুটফুটে ছেলে ছিল ম্যামের।তার গাল টিপে আদর করে তাকে মাঝে মাঝে মাঠে ঘোরাতেও নিয়ে যেত দুজনে । দুটো সিনেমার পার্শ্বচরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন ম্যাম।সেজন্য আশে পাশের লোকে তাঁকে আরও বেশি ভালো ভাবে চিনতো। এবং সবাই বিশ্বাস করত অভিনয়ের লাইনে গেলে সুজাতা ম্যাম এর নায়িকা হওয়া কেউ আটকাতে পারত না।

           ওই বটতলাতে কতদিন অংক খাতা মিলিয়েছে তিতলি আর টিনা।তিতলির চোখ ফেটে জল এল ! সেটা থাপ্পড়ের ব্যথা, না সুজাতা ম্যামের দুর্দশা--- কি কারণে,  সে নিজেও বুঝতে পারল না। সে টিনা কে বলল সব ঘটনা খুলে বলতে।

           সুজাতা ম্যাম ছিলে তাদের স্কুলের অংকের শিক্ষিকা। ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত উকিলকে,দুই বাড়ির মত নিয়েই।ফুটফুটে একটা বাচ্চাও আছে তাদের ।সুন্দর সাজানো সুখের সংসার । জিতেন বাবু প্রচন্ড ভালবাসতেন সুজাতা ম্যাম কে --- এই পর্যন্তই তিতলি জানত ।       


            পরের ঘটনা ঘটেছে তিতলি যখন আমেরিকায় ছিল। স্বামী-স্ত্রী দুজনই যেহেতু চাকরি করেন, ছেলেকে ভালো ভাবে মানুষ করার ইচ্ছেতে পাহাড়ের একটা কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করে দেন সুজাতা ম্যাম। একমাত্র ছেলে--- প্রচন্ড আদুরে ।বাবা মা দুজনেই পালা করে প্রতিমাসে তাকে দেখতে যান ।তার যেন কোনোরকম অসুবিধা না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি তাঁদের। সেবার গরমের ছুটি পড়তেই সুজাতা ম্যাম ছুটলেন ছেলের কাছে । শিলিগুড়িতে পৌঁছে গিয়ে ফোন করেছিলেন ম্যাম।পাহাড়ের পথে যেতে যেতে জানিয়েছিলেন ধ্বস নেমেছে, সেখানে দুর্যোগ চলছে। তারপর থেকেই বন্ধ তাঁর ফোন। জিতেন বাবু খবর না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠলেন। কিছু সময় পর যদিও রাস্তা খুলে গেছে কিন্তু ফোনে আর স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন নি তিনি ।   


 


          পরদিনই তিনি রওনা হয়েছিলেন পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোন হাদিস করতে পারেন নি সুজাতা ম্যামের। ছেলের হোস্টেলেও পৌঁছাননি তিনি ।থানা পুলিশ সব হলো কিন্তু সুজাতা ম্যামের কোন খবর পাওয়া গেল না। কলকাতায় ফিরে এসে জিতেন বাবু সেখানেও খোঁজাখুঁজি করলেন কিন্তু কোনো খবর পেলেন না। ছেলেকে প্রথমে কিছুই জানানো হয়নি । থানা পুলিশ আত্মীয়-স্বজন কেউ কোনো রকম খবর দিতে পারল না। উদভ্রান্তের মতন ছুটে বেড়ালেন জিতেন বাবু এদিক থেকে ওদিক। কোথা দিয়ে যেন দশ দিন কেটে গেল।


 


ঘটনার দিন সন্ধ্যায় পুলিশের কাছ থেকে একটা ফোন এলো-- ভিআইপি রোডে অচৈতন্য অবস্থায় একজন ভদ্রমহিলাকে কে বা কারা গাড়ি থেকে ফেলে দিয়ে গেছে জানিয়ে । পুলিশ তুলে নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে। তাঁর চেহারার সাথে সুজাতা ম্যামের নাকি মিল পাওয়া গেছে । জিতেন বাবু ছুটে গেলেন ।হাসপাতালের বিছানায় সারা শরীরে ক্ষত নিয়ে বেহুঁশ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন সুজাতাকে । ডাক্তারবাবু বললেন অন্তত সাত দিন ধরে অমানুষিক অত্যাচার হয়েছে তাঁর ওপর। গ্যাং রেপ। জিতেন বাবু ভেঙে পড়লেন। বোবা হয়ে বসে রইলেন বহুক্ষণ। চিকিৎসা চলতে থাকলো। তিন মাস কোমা তে থেকে সুজাতা ম্যাম এর হুশ ফিরল। তিনি বাড়ি এলেন জ্যান্ত লাশ হয়ে ।কাউকে চিনতেও পারেন না ।মাঝে মাঝে চিৎকার করেন। মুখের সামনে মিছিমিছি হাতটাকে ফোন বানিয়ে হ্যালো হ্যালো করতে থাকেন। যাকে সামনে পান চড় থাপ্পড় মারেন ।ইতিমধ্যে ছেলেকেও জানানো হয়েছে সবকিছু। তাকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে । পাহাড়ের স্কুল ছাড়িয়ে কলকাতাতেই ভর্তি করে দেয়া হয়েছে আবার। জিতেন বাবু ভাবলেন ---- ছেলেকে দেখে যদি একটু সুস্থ হয়ে ওঠে সুজাতা, কিন্তু হলো না । এক বছরে এ ভাবেই কাটল ।


ছেলেটাও মায়ের এই অবস্থা দেখে অসুস্থ হয়ে পড়ল। সুজাতা ম্যাম ছেলেকে ঘরে আটকে বাইরে থেকে শেকল টেনে দিয়ে একা একা ঘুরে বেড়ান রাস্তায় রাস্তায়। যখন খুশি ঘরে ফেরেন । কখনো কখনো ধরে আনতে হয় তাঁকে, বাইরে থেকে! দুর্বিষহ সে অবস্থা !


 


        এই ঘটনার আগে, সুজাতা ম্যামের একতলা বাড়িটা,দোতলা করার কাজ চলছিল। ছাদের ওপর আধা দেয়াল তোলা। পিলারের উপর আধা আধা রডগুলো বেরিয়ে আছে। ছাদে ছড়িয়ে আছে ইট, বালি, সিমেন্ট। প্রচন্ড রকম পরিপাটি এবং গোছানো ছিলেন সুজাতা ম্যাম। তাঁরই বাড়ির ছাদের অর্ধেক তোলা দেয়ালগুলোতে আগাছায় ভরে গেছে এখন। শ্যাওলা ধরা দেয়াল ফেটে গজিয়েছে বটের চারা-- তার শেকড় দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে আছে শক্ত জালের মত। মাঝে মাঝেই সাপ খোপ দেখা যায়।তবে সেগুলো জিতেন বাবুর মতো বিষধর নয়। তারা মিলেমিশেই থাকে সুজাতা ম্যামের সঙ্গে ! জিতেন বাবুকে মানুষ যা ভাবত তিনি আদৌ সে রকম ছিলেন না ! দুঃসময়ে তাঁকে নতুন করে চিনেছিল সকলে।


মানুষের চরিত্র বোঝা বড়ই কঠিন।এই বিপদের সময়েই জিতেন বাবু বিয়ে করে ঘরে নিয়ে এলেন নতুন বৌ।ছেলেকে পাঠিয়ে দিলেন হোস্টেলে।তিনিও নিজের বাড়ি ফেলে, পাড়া ছেড়ে অন্য জায়গায় বাড়ি ভাড়া নিলেন,সুজাতা ম্যাম কে অসহায় অবস্থার মধ্যে একা ছেড়ে ।বাড়িতে কাজের লোক অবশ্য একটা রেখে দিলেন । সে-ই সুজাতা ম্যামের দেখাশুনা করত। জিতেন বাবু মাঝে মাঝে এসে খোঁজ খবর নিতেন কিছুদিন পরে সেটাও বন্ধ করে দিলেন..


 


বাড়িটাও আর কমপ্লিট করা হয়ে ওঠেনি। ঝকঝকে বাড়িটা ভুতুড়ে বাড়ি হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেন।সামনের অত সূন্দর ফুল বাগানে একটাও ফুল নেই, শুধুই জঙ্গল। কোনদিন যে এ বাড়িতে মানুষ থাকত সেটা ভেবেই এখন বিস্মিত হয় মানুষ।


সুজাতা ম্যাম থাকেন বটে,তবে তিনি তো আর মানুষ নন---পাগলী ! অদ্ভুত ভাবে সমাজ সংসার থেকে কবে যেন তিনি ঝরে পড়েছেন। কেউ খোঁজ রাখে না তাঁর।


         সুজাতা ম্যাম এর মুখে অকাল বলিরেখা। খুব কাছের মানুষ তাকে দেখলে শুধু চিনবে তার ঐ গভীর দৃষ্টি দেখে। বাকিদের কাছে সে ভবঘুরের এক পাগলী! মাঝে মাঝে বাড়িতে ঢোকেন,না হলে এই বট তলাই তাঁর আস্তানা।


           টিনা আরও বলল,তার বাবা সেই সময়ে জিতেন বাবুর সঙ্গে হাসপাতালে দিনের পর দিন রাতের পর রাত থেকেছেন। জিতেন বাবুর চোখ ভরা ভালোবাসা নয়, ঘৃনা দেখেছেন তিনি। নিজের হাতটাও ভালোবেসে তিনি কখনও রাখেনি স্ত্রীর কপালে ।বাবাকে তিনি একবার বলেছিলেন, সুজাতা ম্যামকে ছোঁয়া তাঁর পক্ষে নাকি আর সম্ভব নয় ।বাবা অনেক বুঝিয়েছিল তাঁকে কিন্তু কিছুতেই পথে আনতে পারেন নি। ডাক্তারবাবুরা বলেছিলেন ভালোবাসা, পেলে আদর ,যত্ন আর চিকিৎসায় সেরে উঠবেন সুজাতা ম্যাম।যার ভালোবাসা পেলে হয়ত চিকিৎসারও প্রয়োজন হত না--- তার ভালোবাসা পাননি তিনি।


কাজেই ওষুধ পত্রে কোন কাজ হয়নি।




 ম্যামের বাবার বাড়ির দিকেও এমন কেউ ছিল না যে তাঁর দায়িত্ব নেবে। জিতেন বাবুর ঘৃণা আর অবহেলা সয়ে শুধু একফোঁটা ভালোবাসা আর যত্নের অভাবে শেষ হয়ে গেল একটা জীবন! পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলেন সুজাতা ম্যাম।


টিনার কথা শুনে থ হয়ে বসে রইল তিতলি ।


সে শুনেছিল বেশিরভাগ পুরুষই নাকি জন্মগতভাবে বহুগামী।সবকিছু জেনে-শুনেও তাদের নিয়েই ঘর করে অনেক মেয়েরা--- নিরুপায় হয়েই। যাতে ঘর ভেঙে না যায়, তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে তাঁরা---


নিজের জীবনের জটিলতা ছেড়ে ভাবে সন্তান দের কথা‌।


শুধু মেয়েরাই কি ঘরলোভী ? তা নিশ্চয়ই নয়।অনেক পুরুষমানুষ ও আছেন যারা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সহ্য করেন স্ত্রীদের অনৈতিক কার্যকলাপ।


কিন্তু ধর্ষণের মত ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর উল্টে ধর্ষিতার প্রতিই যে সমস্ত পুরুষের মনে সহমর্মিতার বদলে ঘৃণার উদ্রেক হয় জিতেন বাবু সেই ধরনের অমানুষ পুরুষ ছিলেন।


তিতলি অবাক হয়ে ভাবছে এই ধরনের পুরুষদের কাছে সংসারের মানে কি? তাদের ভালোবাসা কি শুধু শরীর? একদিন যাকে ভালোবেসেই ঘরে এনেছিল, সেটা তবে কি ধরনের ভালোবাসা ছিল? কিছু দুর্বৃত্ত তার, যে ভালোবাসার মানুষকে পাশবিক অত্যাচারে এভাবে ক্ষত-বিক্ষত করল, তাতে মেয়েটির কি দোষ ছিল ? স্ত্রীর প্রতি তাঁর কোন মায়া জন্মালো না ! ঘৃণা জন্মালো? সে অশুচি হয়ে গেল?


তিতলি নিজের মনকেই প্রশ্ন করল--- যে মেয়েটা অমানুষিকভাবে নির্যাতিত হলো তার সেই মুহূর্তের ভয়ংকর অবস্থার কথা স্বামী নামক পুরুষটি ভাবলো না একবার ? সাত দিন ধরে একটা মেয়ে কিভাবে ওই কুকুর গুলোর অত্যাচার সহ্য করে বেঁচে ছিল সেটা ভেবে তার চোখে এক ফোঁটা জলও এলো না ? এই বুঝি ভালোবাসা?একটা পরিপূর্ণ সংসার টুকরো টুকরো হয়ে ভেসে গেল, তার হৃদয়ে একটা আঁচড় না কেটেই ? ছেলেটার ভবিষ্যতের কথাও ভাবলো না আর !


        পুরুষের কাছে নারী শুধুই ভোগের বস্তু !জিতেন বাবুর হাতের স্পর্শে আবেগ থাকলে, ভালোবাসা থাকলে সুজাতা ম্যাম পাগল হয়ে যেতেন না। তাঁর দৃষ্টির গভীরতা দেখেছে,জিতেন বাবুর দূরে সরে যাওয়া । চার দেয়ালের ভেতর জিতেন বাবু কি আচরণ করতেন স্ত্রীর সঙ্গে সে কথা বাড়ির কাজের লোকেরাও বাইরে আলোচনা করত। দিনের পর দিন কাজের লোকেরাই তাঁকে খেতে দিত তাঁর সঙ্গে বসে একটা দুটো কথা বলার চেষ্টা করত।জিতেন বাবুকে ওই দুর্ঘটনার পরে কখনও তারা সুজাতা ম্যাম এর ধারে-কাছে যেতে দেখেন নি , গল্প করা তো দূরের কথা ! সে কথাও জানাল টিনা ।


তিতলি বুঝল ,বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পাননি সুজাতা ম্যাম।বাঁচার জন্য ভরসার একটা কাঁধ প্রয়োজন ছিল , ছিল শক্ত করে জড়িয়ে রাখার জন্য সবল দুটো বাহু। বিনা দোষে একটা জীবন শেষ হয়ে গেল! এই পৃথিবীর পুরুষ মানুষগুলো এতটাই স্বার্থপর? ছিঃ !


            তিতলি টিনাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদছে। সুজাতা ম্যাম বড় প্রিয় ছিল তার ।

Friday, August 12, 2022

ছোট গল্প - মোহর আলির ছায়া বেগম || লেখক - ঋভু চট্টোপাধ্যায় || Short story - Mohor alir Chaya Begam || Written by Rivu Chottopaddhay


 

মোহর আলির ছায়া বেগম

                ঋভু চট্টোপাধ্যায় 

                     


দুহাতে লুঙ্গিটা গোটাতে গোটাতে দোকানের সিঁড়িতে পাদুটো রাখতেই দিলিপ দে জিজ্ঞেস করে উঠলেন, ‘কি রে মোহর আজ এত তাড়াতাড়ি দোকানে এলি, খদ্দের নাই?’ 

–না এই যে আপনি আসবেন তার জন্যেই সব বন্ধ রেখেছি।

আগুনে ঘি পড়বার মতই দপ্ করে জ্বলে উঠলেন দিলিপ দে, ‘মুখ সামলে কথা বল, আমি যাবো তোদের ঐ বেশ্যা ঘরে?’ তারপরে দোকানির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাবু, এই সব লোককে দোকানে উঠতে দিবি না, তাহলে কিন্তু তোর দোকানে আর পা মাড়াবো না।’ 

–সে আপনার মন দিলিপদা। কিন্তু আপনারই বা এত প্রশ্নের কি আছে ?

-বটে এখন আমার এত প্রশ্নের কি আছে। বেশ আমিও দেখব কি ভাবে এই মোড়ে তোর দোকান থাকে আর কিভাবে ঐ শালার কাড্ডু ঐ সব নোংরামো করে। 

শেষের কথাগুলো বলেই দিলিপ দে একরকম ঝাঁপিয়ে দাশ কাকিমার বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মোহর সেই দিকে একবার চোখ দুটো রেখে আস্তে নিজের মনেই বলে উঠল, ‘বাল ছিঁড়বি।’ তারপর দোকানি বাবুদাকে জিজ্ঞেস করল, ‘শালার পিড়িত আবার আরম্ভ হয়ে গেছে?’ 

–হ্যাঁ হ্যাঁ, কদিন একটু বন্ধ ছিল, দাশের ছোট ছেলের বউ নাকি কি সব অপমান করেছিল।এই ব্যাটা দিলিপ বলেছিল, ‘তোমার ঘরে মুততেও আসব না।’, আবার এখন যেতে আরম্ভ করছে।শালা ঢ্যামনা লোকের কোন মান সম্মান বোধ আছে নাকি, কুকুরের অধম, রুটিনও এক্কেবারে বাঁধা।সকালে ঐ সাহার বাড়ি, জল খাবার খেয়ে দাশের বাড়ি, আর সন্ধের দিকে দে বাবুর বিধবা বউটার ঘরে বসে থাকা।

– বউ কিছু বলে না ?

-বলে হয়ত, আমরা তো আর দেখতে যায় না।এই কয়েকদিন আগে স্ট্রোক হয়েছিল।ছেলেটাও তো বাইরে কাজ করে।শুনেছি বউটাকে বাইরে বেরোতেই দেয় না।

–আরে আমার সাথে দেখা হলেই  জিজ্ঞেস করে, ‘নতুন মাল এল নাকি?’ আজ ঐ জন্যে দিলাম।তারপর জানো গেল মাসে কারা কোন অফিসারকে চিঠি করে এসেছিল। দাদা ফোন করে জানল, কয়েকজন নাকি এদের পার্টিকে বলে এই সব করিয়েছে।তার মধ্যে এই শালাও ছিল।কিন্তু তাতে দাদার কি ছেঁড়া গেল? বিরাট ঢেমনা লোক, তুমিও সাবধানে থাকবে।

-আমাকেও একবার বলেছে, ‘কাড্ডুর ওখানে যা দুটো মাল এসেছে, এক্কেবারে তরমুজ।’ আমি বলেও দিয়েছিলাম, ‘একবার ঘুরে আসুন।’ শুনে জিব বের করে বলে, ‘আমার এই ঠিক আছে।’

একটু আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে।বাইরে লোকজনও একটু কম।মোহর আলি অন্য দিনের থেকে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছে।এমনিতে প্রতিদিন সকাল মানেই দশটার কম না।আর উঠবেই বা কি করে প্রতিরাতে শুতে শুতে খুব কম করে তিনটে হয়।এই কোয়ার্টারে যত কাজ সব তো রাতেই।সকালের কাজ বলতে, এই একটু বাজার করা, একটু রান্নাতে সাহায্য করে দেওয়া, আর মেয়েগুলোর কিছু কাজ করে দেওয়া।এখানেই সময়টা মারায়।মাগীগুলোর কাজ আর শেষ হয় না, তাদের কাপড় কেচে দেওয়ার থেকে আরম্ভ করে প্রতিদিনের চাদর কাচা।কয়েকমাস আগে কাড্ডুদা একটা কাচার মেশিন কিনলেও তাতে সব কাচা হয় না।জিজ্ঞেস করলে বলে,‘কারেন্টটা কোথা থেকে আসবে?’মোহর গাল দিলেও কাচাগুলো নিয়ে বাইরে বসে।ঘরের তো অনেকগুলো চাদর।সব ভালো তবে মেয়েগুলোর কাপড় কাচতে খুব খারাপ লাগে, ঘেন্না করে।কত দিন সায়া বা প্যান্টে কত কিছু লেগে থাকে।তিনটে ঘরের বিছানার চাদরও প্রতিদিন কাচতে হয়।শালাদের কোন ইয়ে নাই, চাদরেই সব ফেলে রাখে।কোন দিন ঘরের বেগমটার কোন কিছু কাচল না, এখানে ঐ সব কাচা। কোন কোন দিন আবার  বাথরুমের ভিতর ঢুকে মাগীগুলোর পিঠের ময়লা তুলতে হয়। মোহরের এই কাজটা ভালো লাগলেও বেশি ক্ষণের সুযোগ পায় না।আবার একটু এদিক ওদিক হাত গেলেই ওরা বলে ওঠে,‘ওরে শালা, মাগনাতে পাবি নাকি?’  মোহর হাসে। বলে, ‘তোমাদের কত কাজ করে দি বল তো।’ 

–কাজ করিস মাইনে পাস।তার ওপর উপরি তো আছেই।

তবে বাজারটা বেশ কয়েকবারেই যেতে হয়। সেটা মোড় মাথার ছোট বাজার হোক বা একটু দূরে বড় বাজার। বাজারে বার বার যেতে যেতেই মোহরের সবার সাথে একটা জানা শোনা হয়ে গেছে, গল্প করে।পাড়ার লোকের সাথে দেখা হলে কথাবার্তা বলে।মোড় মাথাতে বিল্টু মাস্টারের বাড়ি।কোথাকার এক সরকারি স্কুলের মাস্টার। দেখা হলেই মোহর তার সাথে কথা বলে। দু’এক বার তার সাথে বাজার থেকে বাইকে চেপে ফিরেছে।কিছু জিজ্ঞেস না করলেও মাঝে মাঝে বলে, ‘পাড়ার মাঝে এটা ভালো দেখায় না, কিন্তু আমার কি বল। পার্টির লোক নেতা, বা সরকারি কোন লোক কেউ তো কিছু বলে না, আমার কি বল।’ মোহর অবশ্য কাড্ডুদাকে এই কথাগুলো বলে নি। 

সারাটা দিন মোহরের খুব পরিশ্রম হলেও রাতে বেরোনোর সময় সব কাস্টমারই কিছু না কিছু দিয়ে যায়।ভালো লাগা বলতে এটাই।এমনি তো কাড্ডুদা লোকটা ভালোই।মাসের প্রথমে পেমেন্ট দিয়ে দেয়।দোকান বাজার থেকেও টুকটাক ভালোই হয়।খরচাও তো কিছু নেই খাবার দাবার সবটাই ফিরি।দু’ এক গ্লাসও সন্ধের দিকে জুটে যায়।এই নিয়ে অবশ্য তার নিজের গ্রামের লোকের রাগ আছে।গ্রামে কয়েকমাস আগেই বড় মসজিদে এক সন্ধের দিকে খেপ বসেছিল।কে নাকি গাঁয়ে মোহরের কথাগুলো রটিয়ে দিয়েছিল।অবশ্য শুধু সে জন্যি নয়, তাও মোহরের কথাটা আলোচনা হল।এখন আর সবার সব কথা শুনতে ভালো লাগে না।কাছে গাঁ হলেও সপ্তাহে একবারই যায়। আব্বা আম্মি নাই, এখানে কাজ করতে ঢোকার পরে ভাই বোনেরাও আর যোগাযোগ রাখে না।শুধু  ডালিয়া বেগম তার জন্যেই সপ্তাহে একবার সকালের দিকে যেতে হয়।বিয়ের চার বছরেও ছেলে মেয়ে হয়নি বলে গাঁয়ের সবাই বলে, ডালিয়াও বলে। মোহর রাতে থাকতে পারে না। রাতে থাকবার কথা শুনলেই কাড্ডুদা রেগে যায়।বলে, ‘কাস্টমার এলে কে দেখবে আমি? তুই ভোরের আলো ফুটলে প্রতিদিন যা, বিবির পোঁদে মাথা রেখে ঘুমা, কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।আমার লক্ষ্মীরা উঠে গেলে তোর কাজ শুরু।’ সারাটা রাত জেগে এমন ভাবে সকালে যাওয়া যায়?

কথাগুলো শুনলে আবার ডালিয়া রেগে যায়।বলে, ‘তোমার আমাকে কেন ভালো লাগবে, ঐ সব বেবুশ্যে মাগীদের সঙ্গে থাকলেই তো সব পাবো।ঘরের বউকে তখন কি আর মনে লাগে?’ 

মোহর ডালিয়াকে বলতে পারে না সেই ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই।তবে মোহরের ডালিয়াকে নিয়ে খুব গর্ব।এখনো গাঁয়ে ঘরে এমন বউ সবার ঘরকে দেখা যায় না, নামটাও বেশ।কিন্তু কাড্ডুদার জায়গাতে তো কোনদিন কারোর সাথে কিছু করে নি।শুধু তাদের খোলা পিঠে ব্যাথার মলম লাগিয়ে দিয়েছে, সাবান লাগিয়ে ময়লা ঘষে পরিষ্কার করে দিয়েছে।পাঁচজনের শরীরে কার কোথায় কি আছে দেখলেও কারোর শরীরের ভিতরে ঢোকার সাহস হয় নি। বলা যায় না কাড্ডুদা জানতে পারলে মাইনের অর্ধেকটাই না কেটে নেয়।যে লোকটা থানার বড়বাবুর কাছ থেকে পয়সা নেয় তার কাছে আশ্চর্যের কিছু নেই।মুসকিল হল কাড্ডুদার বাকি কোন কথা শোনা যাচ্ছে না।কবে থেকে বলছে, ‘শালা মোহর নতুন মালের সন্ধান কর, পুরানো এই সব বুড়ি মাগীদের দিয়ে আর কত দিন চালাবো বলতো?’ 

–দাদা মাল তো আসছে।ঐ যে দুটো বৌদি আসছে, তাদের দিয়ে তো....

-ওরা তো সন্ধে বেলায় আসে।রাতের বেলাতেই তো বেশি লোক আসে।তাদের জন্যেও তো ভাবতে হবে।তুই এক কাজ কর, ঐ কুঞ্জবতি কমপ্লেক্সের তপন স্যারের বাড়িতে একবার যা।ঐ শালীকে ফোনে পাচ্ছি না।কিছু কলেজের মালের কথা বলছিল, বলবি আমি লক্ষ্মীশ্রী গেস্ট হাউসে কথা বলে রেখেছি। মালের কথা বললেই ফোন নম্বর দিয়ে দেব। আর ঐ মুচিদের বাড়ি যাচ্ছিস? ছোট বউটার সাথে কথা বল। তোর গাঁয়ে গেলেও মাথায় রাখিস। 

মোহর সব কথাগুলো শোনে।তপন স্যারের বাড়ি এর আগে কোন দিন যায় নি। শুনেছে কোন এক সরকারি ইস্কুলের মাস্টার বটে।তবে ওর বউটার হাতে অনেক মাগী।এখানকার অনকেগুলো কলেজের মেয়ে ওর হাতে।মোহর কুড়োঝোর মোড়ের মদের দোকানে অনেকবার মেয়েগুলোকে মদ কিনতে দেখেছ।শালিদের কুনু লজ্জা নাই।যা ডেরেস পরে দেখেই মোহরের টনটন করে ওঠে, পেলে চটকে খাল বানিয়ে দেবে।কয়েকদিন আগেই বাজারের একটা সব্জির দোকানে কয়েকজন বলাবলি করছিল,‘বাপেরা পড়তে পাঠায়, আর ওরা এখানে এসে ফস্টি নষ্টি করছে।’ তাতে অবশ্য মোহরের কোন দরকার নেই, দুএকটা এখানে এলে সবার সাথে ওর নিজেরও লাভ।

ঘরে ঢুকে দোকানের ব্যাগটা নামাতেই একটা ঘরের ভিতর থেকে গলা ভেসে আসে, ‘কিরে মোহর এলি? একবার এঘরে আসবি।’ মোহর বুঝতে পারে সুলেখাদি ডাকছে।এখানকার সব থেকে সুন্দরী, সেরকম দেমাক। প্রতিদিন তিনজনের বেশি কাউকে ঘরে নেয় না। রেটও বেশি।কাড্ডুদা বেশ তোয়াজ করে।চেনা কাস্টমাররা এসেই তাকে খোঁজে, না পেলে অনেকে বসেও থাকে।তবে খুব কিপটে, কিছু কিনতে দিলে সব পয়সার হিসাব নেয়। মোহর বুঝতে পারে এখন ডাকা মানেই কিছু আনতে বলবে। ইচ্ছে না থাকলেও মোহর  ঘরে ঢুকে বলে, ‘কিছু আনতে হবে নাকি?’ 

–হ্যাঁরে। মোড় মাথায় তপুদার দোকান খুলেছে? দুটো প্যাড আনতে হবে।

–প্যাড! কাড্ডুদা জানে?

-বালের বকিস না মোহর, আমার মাসিক কি কাড্ডুদাকে জিজ্ঞেস করে আসবে?

-তুমি আনতে বলছ এনে দিচ্ছি, আজ কিন্তু শনিবার। তুমি ওষুধ খেতে পারতে, আগের মাসেও ঝামেলা হয়েছিল।

সুলেখাদি শেষের কথাগুলো শুনে কিছু সময় চুপ থেকে বলে উঠল, ‘আমি  সন্ধে থেকে ওপরের  কোয়ার্টারে চলে যাবো, আজ দুটো বৌদি আসে না? ফোন করে ওদের একটু তাড়াতাড়ি আসতে বল, তাতেই ম্যানেজ হয়ে যাবে। আর কাড্ডুদাকে বলবি, আমার খুব জ্বর।’

-সে তোমরা যা খুশি করগে, আমাকে যেন কিছু না শুনতে হয়।

–তোকে কি শুনতে হবে রে বোকাচ্চোদা? কিছু কি শুনতে হয় ? গেঁড়ে বেশি ফ্যাচফ্যাচানি করিস না। 

কথাগুলো শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে পাশের কোর্য়াটার থেকে চট্টরাজ কাকুর গলা কানে এল।মোহর এবার বাইরের বাগানে বেরিয়ে আসতেই কাকু তাকে দেখে খুব রেগে বলে উঠলেন, ‘কাড্ডু কইরে?’

–দাদা তো এই সময় থাকে না।

–কতবার বলব, বাইরে একটা সব সময়ের জন্য লোক রাখ। কালও সন্ধেবেলাতে আমার কোয়ার্টারে তোদের লোক  চলে এসেছিল। আমার বাড়িতে ছেলের বৌমা আছে, নাতনীরা আছে। এরকম করে তো থাকা যাবে না।

-কিন্তু কাকা সন্ধেবেলাতে তো আমি বাইরেই ছিলাম। 

-তাহলে কি আমি মিথ্যে বলছি ? 

–না কাকা, তা কেন হবে? হয়ত আমি সেই সময়টাতে দোকানে গিয়েছিলাম। ঠিক আছে আমি দাদাকে বলে দেব।

মোহরেরও মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে।যত সব উটকো ঝামেলা।কাড্ডুদাও এই সময় থাকে না, মাগীগুলোতো কেউ বেরোবে না, দাদা বারণও করে গেছে।মোহর কখনো কারোর সাথে খারাপ কথা বলে না, খারাপ ব্যবহার করে না। কাড্ডুদা এক্কেবারে বারণ করে দিয়ে বলেছে, ‘শোন, ব্যবসা করতে গেলে লোকাল লোকদের এক্কেবারে ঘাঁটাবি না। মনে রাখবি টাউনসিপে এই রকম একটা ব্যবসা করা খুব কিচাইন কাজ, আমি যতই টাকা ছড়াই, একটু এদিক ওদিক করলেই পিছনটা মারিয়ে যাবে।’ 

মোহর এই ব্যাপারটা ভালোই শিখে নিয়েছে, ঠিক দাদার মতই।দাদা এই ঘরের ভিতরে যতই সবাইকে খিস্তি মেরে কথা বলুক, বাইরে সবার সাথে এত ভালো ব্যবহার করে যেন ওর থেকে ভালো লোক আর কেউ নেই। মোহরও কাড্ডুদা না থাকলে এই সব ব্যাপার গুলো বেশ ভালোই সামাল দেয়।কাড্ডুদাকে আরেক জনকে কাজে নিতে বলতে হবে।ও ব্যাটা সব সময় বাইরে থাকবে, কিছুতেই ঘরের ভিতরে কোন কাজে আনা যাবে না।সব ব্যাটা বদমাইস ঘরের ভিতর এলেও আবার অন্য ধান্দা করবে। কিন্তু বিশ্বাসি লোক কোথায়, গাঁয়ের কাউকে বলবে?   না, উপরিগুলোও তো দুভাগ করতে হবে। পরে সব ভাবা যাবে। 

একটা ভাঙা ছাতা নিয়ে তপন স্যারের বাড়ির দিকে যাবার রাস্তায় পিছন থেকে তার নাম শুনে থমকে দাঁড়াতে হয়। ঘাড় ঘোরায়, দেখে কবির চাচা ডাকছে।একটা কোয়ার্টারের বাগানের কাজ করছে। মোহর কাছে যেতেই বলে, ‘তুই এই কাজ ছেড়ে কি করছিস বলতো? গাঁয়ে কিন্তু কথা হচে।তুর বউটকে সবাই বলছে।’ 

সেই সময় চাচার কথাগুলো ভালো না লাগলেও রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো মনে আসে।সত্যিই তো এই টাউনসিপে বাগানের কাজ করতেই আসা।কোথা থেকে কিভাবে যে জড়িয়ে গেল কে জানে?এখন আর বাগানের কাজ করতেও ভালো লাগে না।এই রকম পয়সাও তো নাই। 


                                                 ২

  


কয়েকমাস ধরেই কাড্ডুর মটকা গরম।কথায় কথায় রেগে যাচ্ছে। ব্যবসাটা আগের মত আর চলছে না। মোহরের প্রথম দিন গুলোর কথা মনে পড়ে। প্রতিমাসে একটা কোয়ার্টারে বাগান পরিষ্কার করত মোহর। সেখানেই যাতায়াত ছিল কাড্ডুদার।একদিন নিজের থেকে  বিভিন্ন কথা জিজ্ঞেস করে। দিনে কত রোজগার হয়, বাড়িতে কে কে আছে এই সব। সব শুনে দেখা করতে বলে। তারপরেই এই কাজে ঢুকতে বলে।মোহর প্রথমটাতে রাজি ছিল না।ঘরে কেউ নাই, কাউকে জিজ্ঞেস করবারও কিছু নেই, তাও গাঁয়ের লোক কাজের কথা শুনেই বলে,‘শেষে বেশ্যাবাড়ির কেয়ারটেকার! এটা আবার কাজ হল?’

ডালিয়াও রাজি হয় না,বলে,‘না না, এমন কাজ করতে হবে না।তার থেকে গাঁয়ে থাকো, মাঠের কাজ কর, টাউনশিপে বাগানের কাজ কর, একশ দিনের কাজ তো থাকলই।’ 

কাড্ডুদা লোভ দেখায়,‘বাগানে কত টাকা পাবি?এখানে মাইনে পাবি।প্রতিরাতে উপরি পাবি, বাবুদের পান সিগারেট এনে দিবি, বাবুরা কি টাকা ফেরত নেবে? সেই সব তো তোর। আর গাঁয়ে তুর বউ থাক, এই তো রাস্তা, একফাঁকে গিয়ে দেখে আসবি।’মোহর কাজে ঢোকে।সেই সময় সন্ধে থেকেই সারি সারি গাড়ি এসে কোয়ার্টারের সামনে ছোট্ট ফাঁকা জায়গাতে দাঁড়াতো।শনি বা রবিবার গাড়ি বাড়ত।অনেক লাল বাতি মাথার গাড়িও থাকত।মোহর গাড়িগুলো রাখার ব্যবস্থা করে দিত, সিগারেট, পান এনে দিত। বোতল কাড্ডুদা এনেই রাখত। তাও বিশেষ প্রয়োজনে রাতের দিকে তপুদার দোকানে বোতল আনতে যেতে হত। তপুদা দিনের বেলা বোতল না দিলেও অনেক রাত অবধি দোকান খোলা রাখত।তখন কাড্ডুদা ব্যবসাও চলছে রমরম করে।মোহর কাজে ঢোকার পরে ভাইবোনেরা পরিষ্কার বলে দেয়,‘এক্কেবারে বাড়ির দিকে আসবি নাই।বেশ্যা ঘরের দালাল, তুর নজর সব সময় মাগীদের দিকেই থাকবেক, আমাদেরও বউ বাচ্চা আছে।’ দাদা দিদিদের সাথে না যোগাযোগ থাকলেও মোহর ডালিয়েকে ভুলিয়ে দেয়।প্রতিদিনই গাঁয়ে যাবার সময় স্নো, পাউডার শাড়ি, ব্লাউজ, বা কোন গয়না, বা খাবার কিছু না কিছু কিনে নিয়ে  যায়।ডালিয়া খুশি হয়, শুধু বেগমকে কাছে টেনে আদর করবার সময় হাঁপিয়ে যায়। ডালিয়া বলে ওঠে, ‘তুমার জানে আর তাগদ নাই, তুমি ঐ বেশ্যা বাড়ির কেয়ারটেকার হয়েই থাকবে।’ মোহরের কথাগুলো ভালো লাগে না, জানে লাগে। কিন্তু করবার কিছু নাই। দুপুরের আগে আস্তে আস্তে কাড্ডুদার কোয়ার্টারে ফিরে আসতে হয়।ডালিয়া রাগে, বলে ওঠে,‘এই রকম ভাবে রাতের পর রাত একা ভালো লাগে না, তুমি অন্য কাজ দেখো।’

-অন্য কাজ কোথায় পাবো ?

-কেন গাঁয়ের বাকি সবাই কি করছে ? তারা কি সবাই বেশ্যা বাড়িতে কাপড় কাচার কাজ করে।তোমার অন্য ধান্দা আছে, সেটা বল। তোমাকে বললাম শুনলে ভালো না হলে আমাকে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে।

রেগে ওঠে মোহর। অন্য ধান্দা! থাকলে আরো দুতিনটে বিয়ে খুব সহজেই করতে পারত। মোল্লা পাড়ার আসমিনার এখনো নিকা হয় নাই, রাস্তায় দেখলেই কথা বলে, চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে।কয়েকমাস আগেই একটা জলসা শুনতে গিয়ে এক্কেবারে পাশেই বসে ছিল। গান শুনে এক্কেবারে গায়ে পড়ে যাচ্ছিল, বললে, ‘আমার একটা কাজ দেখে দাও না গো, খুব অসুবিধা, ভাইট পালাইছে, একা আব্বু আর পারে না।’ কাজ তো আছে, কিন্তু সে কি তুর জন্য আসমিনা। কথাগুলো বলতে পারে না। যেমন ডালিয়াকে আসমিনার কথা বলতে পারে না। তবে ডালিয়া কয়েকবার আসমিনার কথা বলেছে। মোহর অবশ্য কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে নি। আরো অনেক কিছুই তো জিজ্ঞেস করতে পারেনি, করলে এক্ষুণি ঘরে চলে আসবে।ডালিয়ার সেটাই ভালো হবে, থাক সতিনের সাথে।মোহর আস্তে আস্তে কাড্ডুর বাড়ির  দিকে পা বাড়ায়। 

                                             

                                                ৩ 


কাড্ডু এখন প্রতিদিন সন্ধেবেলা এই কোয়ার্টারে এসে যায়।কিছু দিন আগে পর্যন্ত সকালে সব কিছু দেখবার জন্য একবার আসত, আর শনি রবিবার সন্ধেবেলাটাতে থাকত।এখন প্রতি সন্ধেয় আসতে দেখে মোহরের একটু সন্দেহ হয়।এক সন্ধেয় কাড্ডুর কাছে দাঁড়াতেই দাদা বলে ওঠে, ‘দিন ভালো নয় মোহর, ব্যবসা ভালো হচ্ছে না।ঐ শালা তপন স্যারের বউ খুব বাওয়াল দিচ্ছে, কোথা থেকে নতুন নতুন মেয়ে আনছে কে জানে, রেট কম দিচ্ছে, শালা বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তার উপর চারদিকে বিউটি পার্লার গুলো তো আছেই।’

মোহর তপন স্যারের বউএর সাথে একবার দেখা করতে গেছিল।দেখে বুঝতেই পারেনি এই মাগী এত বড় ব্যবসা চালায়।কি সুন্দর বাবু বাবু বলে কথা বলে।মোহর যখন বাড়িতে পৌঁছালো তখনই স্নান করে বাগানে কাপড় মেলছিলেন। মোহরকে বাড়িতে বসিয়ে চা খাওয়ানোর পর কাজের কথা শুনে বললেন,‘বাবুরে সবই তো বুঝলাম, তুই কাড্ডুকে একবার আসতে বলিস, আমি কথা বলবো।’ 

মোহর একটু অবাক হয়।কাড্ডুদাকে ফিরে সব কথাগুলো বলতেই কাড্ডুদা উত্তর দেয়, ‘মাগী মহা ঘোরেল মাল, এক হাটে কিনে বিক্রি করে দেবে, অথচ কাউকে বুঝতেই দেবে না, তুই এক কাজ কর, মাল জোগাড় কর, আরো এক্সট্রা পাবি। বাড়ির বৌ, মেয়ে কেউ বাদ নয়, যত মাল আনবি, তুই তত মাল পাবি।’ 

মোহর এবার ছুটে বেড়াতে আরম্ভ করে। আশে পাশে অনেকগুলো গার্লস হোস্টেল আছে।মোহরে সেখানে যাওয়া আরম্ভ করে, তাদের গেটে দারোয়ানদের সাথে আলাপ করে।তার নিজের গ্রামের কয়েকজন লোককে পায়। কিন্তু সেই রকম সুবিধা করতে পারেনা। তাদের মাধ্যমে প্রতিটা হোস্টেলের কয়েকজনের সাথে কথাও হয়। আস্তে আস্তে সব দিক দেখতে পায়, ফোন নম্বর জোগাড় করে কাড্ডুদাকে দেয়।এদিকে শহরের বেশ কয়েকটা ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।কাড্ডুদার কথা মত মোহর কয়েকজনের বাড়িতে যোগাযোগ আরম্ভ করে।আরো কয়েকজন বৌদি নিয়মিত ভাবে আসতে আরম্ভ করলেও কাড্ডুদার পছন্দের কলেজের মেয়েরা আসে না। কথায় কথায় মোহরকে বলে, ‘খানকির ছেলে সেই ঝোলাবুড়িদেরকেই পেলি, এবার সারারাত তুই মারা।’ রাত নামলে  কোয়ার্টারের সামনের ভিড়টা না বাড়লে কাড্ডুদা আরো রেগে যায়। খিস্তি করে।

                                              

                                              ৪  


 মোহরের এখন কাজের খুব চাপ। অনেক জায়গা ঘুরতে হয়।এক মাস গাঁয়ে যেতেই পারে নি।মাঝে একদিন কবির চাচার সাথে দেখা হতেই চাচা অনেক কথার মাঝে বলে, ‘তুর বৌটাকে এবার সামলা, তুই তো  যাওয়া বন্ধ করেছিস, কিন্তু ও বেটি দুপুর দুপুর কোথায় বেরিয়ে যাচ্ছ, সঙ্গে ঐ মুল্লা পাড়ার আসমিনাও থাকছে।’ 

–টাকা পাঠাচ্ছি তো চাচা।

-আরে টাকাতেই কি সব হয়? 

–ঠিক আছে আজ ফুলু বেটিদের একবার ফোন করব।

মাথাটা গরম হয়ে যায় মোহরের। কাড্ডুদাকে বলতেই দাদা অবশ্য হেসে বলে, ‘ভালোই তো এবার এখানে নিয়ে চলে আয়।দুজন মিলে রোজগার করবি।তোর বউ তোর কাছেই থাকবে।’

কথাগুলো মোহরের ভালো লাগেনা। কাড্ডুদা এখন আর মানুষ নাই।প্রতিটা মেয়ের মধ্যেই ব্যাবসা দেখছে। দু’জন আগের মাসে অন্য জায়গায় চলে গেল। কাড্ডুদা তারপরের দিনেই আরো দুজন নতুন মেয়েকে নিয়ে এসে বলে, ‘বুঝলি মোহর, আমার নাম কাড্ডু মজুমদার, এখানকার ওপর থেকে নিচ সব আমার কেনা, না হলে এই টাউনশিপে এই রকম ব্যবসা করতে পারি। দুটো মাগী আমাকে বলে কিনা আরো বেশি টাকা নেবে। আমি কিছু বলিনি, সোজা রাস্তা দেখিয়ে দিলাম। এবার চরে খা।এখানে আর কোনদিন মালের অভাব হবে না রে, ব্যবস্থা করে নিয়েছি, অনেকে বসে আছে, শুধু জানতে হবে।’

 মোহর এই সব জানে, কিন্তু সত্যিই কি মালের অভাব নেই? তাহলে এমন অবস্থা কেন হচ্ছে? আশে পাশে অনেক পুজো, অনুষ্ঠান, ব্লাড ডোনেশন, সবে কাড্ডুদা আগের থেকে বেশি করে টাকা দিচ্ছে।সব পার্টি খেয়ে আছে, কোয়ার্টারে অনেকে চাঁদার নামে টাকা নিতে আসে, মোহর তাদের হাতে টাকা তুলে দেয়, সব জানে। কারোর মুখে কোন শব্দ নেই। কোন পার্টি কিছু ঝামেলা করছে সে খবর দাদার কানে খবর যেতেই বড় পার্টি অফিসে ফোন করে সব গুছিয়ে নেয়।সব ঠিক আছে কিন্তু এখানে মাল নেই।তবে দাদা কয়েকদিন আগেই বলছিল, ‘এমনি ভাবে হবে না মোহর, অন্য ব্যবস্থা করতে হবে।’ মোহর অবাক হয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিল,‘অন্য ব্যবস্থা কি?’

-এই শহরের চারদিক অনেক বিউটি পার্লার হয়েছে।বাইরে টাটকা মেয়ে ঘুরছে।এদের ধরলে মাল আর মাল।মোড় মাথার ওষুধের দোকানের বাবুদা বলছিল, পিলের নাকি এখন দারুন বিক্রি বেড়েছে।আর এই কলেজের মালগুলোর খরচাও খুব।এত টাকা কিভাবে আসবে বলতো? সব কামাচ্ছে।তুই একটা ভেড়া।একটাও ভালো মাল আনতে পারিস না।লোকে কত আর এই ধ্যাবড়া মাগীগুলোর জন্য আসবে বলতো? আমার ব্যবস্থা আমাকেই করতে হবে। 

মোহর একভাবে সব কথা শুনে যাচ্ছিল।কি বলবে? মনে হচ্ছে আবার সেই বাগানের কাজেই ফিরে যেতে হবে।গাঁয়ে যেতে হবে একবার।অনেকদিন ডালিয়াকে চটকানো হয় নি, আসমিনার কাছেও যেতে হবে, ওর আব্বার শরীরটাও ভালো নেই।তাছাড়া কবির চাচার কথাগুলোও শুনতে হবে।

কাড্ডুদাকে একবার ছুটির জন্য বলতে যাবে এমন সময় কাড্ডুদা মোহরের দিকে তাকিয়ে বলে,‘এই শোন তোদের গাঁ থেকে দুটো মাল ঐ তপনার বউ এর খাতায় নাম তুলেছে, এক্কেবারে নতুন মাল।দুপুর দুপুর বিউটি পার্লারে যায়। খুব চলছে এখন।তুই একটু এখানে আনা যায় কিনা দেখ। ’ 

–না দাদা, গাঁয়ের কাউকে কিছু বলিনা, একেই আমাকে লিয়ে সব কত কি কথা বলে। 

-আরে মাল ফেললে কোন মাল কোন কথা বলে না। তুইও গাঁয়ে মাল ছড়া, দেখবি সব শালা চুপ হয়ে গেছে। নে ফটো দুটো দ্যাখ।  

                                           ৫ 


দিন দুপুরে এ’পাড়াতে এর আগে এত পুলিশ কখনও আসেনি।পাড়ার লোকেও সব বাইরে বেরিয়ে দেখছে। কাড্ডুর কোয়ার্টার থেকে লাইন দিয়ে মুখ ঢেকে সব মেয়ে বেরোচ্ছে।কাড্ডুকে একটা বড় জিপে তুলেছে, পাশে আরেক ভদ্রমহিলাও আছেন।এপাড়াতে এই মহিলাকে কয়েকজন চেনে। তাদের থেকে সবাই জানতে পারে। ‘ইনি  এখানকার এক সরকারি স্কুলের তপন মাস্টারের বউ।’ 

শুধু ধরা পড়েনি মোহর আলি।কয়েকমাস আগেই ও কাজ ছেড়ে এখন গাঁয়ে থাকে।ডালিয়াকে ছেড়ে এখন অন্য আরেকজনকে নিকা করেছে। নাম রেশমা।আশমিনার আব্বু মারা যাওয়ার পর এখন তাকে আর গাঁয়ে থাকতে দেয় না, গাঁয়ে থাকে না ডালিয়াও। মোহর প্রতিদিন সকালে টাউনশিপে কোয়ার্টারে বাগানে কাজ করতে এসে কাড্ডুদার বন্ধ হয়ে থাকা কোয়ার্টারের পাশ দিয়ে বার বার পেরিয়ে গেলেও ঘাড় তুলে তাকায় না।ভয় লাগে যদি কাড্ডুদা বুঝে ফেলে বিল্টু মাস্টারের চিঠির মাধ্যমে উপর মহলের সবাই সব কিছু জানতে পারলেও আসল কলকাঠি তো মোহর আলির হাতেই ছিল।অবশ্য কাড্ডুও কোন দোষ নেই।ও কি করে জানবে ছবি দুটো ডালিয়া, আর আসমিনার ছিল। 


উপন্যাস - তান্ত্রিক পিসেমশাই ও আমরা দুজন || সুদীপ ঘোষাল || Tantrik Pisemosay oo Amra by Sudip Ghoshal || Fiction - Tantrik Pisemosay oo Amra Dujon Part -3


 



পিসেমশাই বললেন, এই লকডাউনে রাতের কলকাতায় হেনস্থার শিকার এক রুপান্তরকামী। অভিযোগ, একা পেয়ে কেরোসিন ঢেলে দেওয়া হয়েছে তাঁর গায়ে। পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আক্রান্ত। ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্তে নেমে এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে ফুলবাগান থানার পুলিশ।কাঁকুড়গাছির সেকেন্ড লেনের বাসিন্দা বছর ২০–এর ওই রুপান্তরকামী শুক্রবার রাতে ওষুধ কেনার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। সেই সময় এলাকাতেই আড্ডা দিচ্ছিল কয়েকজন যুবক। অভিযোগ, রুপান্তরকামীকে দেখতেই কটুক্তি শুরু করে তারা। এরপর আচমকা পিছন দিক থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে ওই যুবকেরা কেরোসিন ছুঁড়ে দেয় বলে অভিযোগ। এমনকী সেই সঙ্গে লাগাতার তাঁকে পুড়িয়ে মারার হুমকিও দেয় বলে জানা গিয়েছে। এরপর বাড়ি ফিরে গোটা ঘটনাটি জানানোর পর পরিবারের সঙ্গে ফুলবাগান থানার দ্বারস্থ হন তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। মেরে দিল রূপান্তরকামিকে নির্মমভাবে পুড়িয়ে।এলাকার কয়েকজন যুবকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে ফুলবাগান থানা। শুক্রবার রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় এক যুবককে। যুবক সব দোষ স্বীকার করে তারা হয়তো ভবিষ্যতে ফাসি হবে কিন্তু মিনার কি হলো সংসার ভেসে গেল সে তার গর্ভস্থ সন্তানকে নিয়ে আজ মৃত্যুর কোলে। মিনার অতৃপ্ত আত্মা ঘুরেফিরে বেড়াতে লাগলো। আর সেই রূপান্তরকামী রাস্তায় ঘুরে ফিরে বেড়াতে লাগলো তাদের দেখা হল দুজনের তারা ঠিক করল এদের সর্বনাশ করবে।রূপান্তরকামী বলল আমাকে যে হত্যা করেছে তাদের সংসারের সবকটাকে আমি একা একা মারব আর এই মিনার আত্মা বলল আমাকে যে পুড়িয়ে মেরেছে একজন ধরা পড়েছে কিন্তু আরও পাঁচজন ছিল সবকটাকে আমি মারবো ।তারা কিন্তু কথা রেখেছিলো। পিসেমশায়,মানে তান্ত্রিক বললেন, প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী,   ভূত হল মৃত ব্যক্তির আত্মা যা জীবিত ব্যক্তিদের সামনে দৃশ্য, আকার গ্রহণ বা অন্য কোনো উপায়ে আত্মপ্রকাশ গল্প প্রায়শই শোনা যায়। এই সকল বিবরণীতে ভূতকে নানাভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: কখন অদৃশ্য বা অস্বচ্ছ বায়বীয় সত্ত্বায়, কখনও বা বাস্তবসম্মত সপ্রাণ মানুষ বা জীবের আকারে। প্রেতাত্মার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে ভবিষ্যদ্বাণী করার বিদ্যাকে  কালা জাদু বলা হয়ে থাকে।প্রাক-শিক্ষিত সংস্কৃতিগুলোর  মধ্যে ভূতের প্রথম বিবরণ পাওয়া যায়। সেযুগে কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রথা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, ভূত-তাড়ানো অনুষ্ঠান ও জাদু অনুষ্ঠান আয়োজিত হত মৃতের আত্মাকে তুষ্ট করার জন্য। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ভূতেরা একা থাকে, তারা নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, জীবদ্দশায় যেসকল বস্তু বা ব্যক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল সেগুলিকে বা তাদের তাড়া করে ফেরে। তবে ভূত বাহিনী,এমনকি ভৌতিক জীবজন্তুর কথাও শোনা যায়।মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আত্মা দেহত্যাগ করে। জীবাত্মা অবিনশ্বর। তবে কখনো কখনো জীবিত সামনে আকার ধারন করে। এটি পূরাণভিত্তিক একটি আধিভৌতিক বা অতিলৌকিক জনবিশ্বাস। প্রেতাত্মা বলতে মৃত ব্যক্তির প্রেরিত আত্মাকে বোঝায় ।সাধারণের বিশ্বাস কোনো ব্যক্তির যদি খুন বা অপমৃত্যু হয় তবে মৃত্যুর পরে তার হত্যার প্রতিশোধের জন্য প্রেতাত্মা প্রেরিত হয় । বিভিন্ন ধরনের কাহিনী ও রয়েছে এ সম্পর্কে । বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে ভূতের অস্তিত্ব বিশ্বাস করা হয়। আবার কিছু ধর্মে করা হয় না, যেমন ইসলাম বা ইহুদী ধর্মে। এসব ধর্মাবলম্বীদের মতে মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মা চিরস্থায়ীভাবে পরলোকগমন করে আর ইহলোকে ফিরে আসে না। মিনার  খুনিরা একটা বাড়ি ভাড়া করে বাসায় এল মালপত্তর নিয়ে। তারা বড়লোকের ছেলে। ফুর্তি করে আর ধর্ষণ করে মারে মেয়েদের। পিসেমশায় বলছেন গল্প।তারা  নাকি পুরনো বাড়ি কিনে রিনোভেট করে বাস করছেন,অথবা নতুন ফ্ল্যাটে মুভ করেছেন। যা-ই করে থাকুন, মোদ্দা কথায়, নতুন বাসস্থানটিতে এসে স্বস্তি পাচ্ছেন না কিছুতেই। কেন জানা নেই, বার বার মনে হচ্ছে কোথাও একটা ছন্দপতন রয়েছে। তালে মিলছে না সব কিছু। প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ব্যাপারটা মোটেই অবহেলা করার মতো নয়। আপনার আবাসটিতে ‘তেনা’দের আনাগোনা থাকতেই পারে।ভূতে বিশ্বাস করুন বা না-করুন, এমন কিছু অস্বস্তি রয়েছে, যার সর্বদা চটজলদি ব্যাখ্যা হয় না। তেমন কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করেছেন জন এল টেনি-র মতো খ্যাতনামা অতিলৌকিক বিশেষজ্ঞ। টেনি জানাচ্ছেন, কয়েকটি বিশেষ দিকে নজর রাখাটা জরুরি এমন ক্ষেত্রে। তাঁর বক্তব্য থেকে পাঁচটি বিষয় তুলে দেওয়া হল—হঠাৎই আপনার মনে হল, পিছন থেকে কেউ আপনার কাঁধ বা পিঠ স্পর্শ করল। ফিরে দেখলেন, কেউ নেই। তন্ত্রমতে, এমন ক্ষেত্রে সাবধান। স্পর্শকারী রক্তমাংসের জীব না-ও হতে পারেন। যদি মনে হয় ঘরের আসবাবপত্র নিজে থেকেই স্থান পরিবর্তন করছে, তা হলে খামোখা ভয় পাবেন না। তিনি জানাচ্ছেন, এমন ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভৌতিক না-ও হতে পারে। নিজেই হয়তো সরিয়েছেন সেন্টার টেবল  তার পরে ভুলে গিয়েছে। কিন্তু যদি খাটখানাই টোটাল ঘুরে যায় অথবা চেয়ার উল্টো হয়ে বিরাজ করে, তবে ভাবার অবকাশ রয়েছে।আবার নতুন বাসায় পা রেখে যদি শোনো সেখানে কেউ আগে মারা গিয়েছেন অথবা যে জমিতে বাড়ি করেছে কেউ সেটি আগে কবরখানা ছিল, তা হলে ভয় আছে।  পুত্রহারা গৌতমীকে তথাগত বলেছিলেন এমন কোনও বাড়ি থেকে একমুঠো সরষে নিয়ে আসতে, যেখানে মৃত্যু বা শোক প্রবেশ করেনি। তার বক্তব্যও একই প্রকারের। মৃত্যু একটা সাধারণ বিষয়। তা কোথাও ঘটে থাকলেই যে প্রেত কিলবিল করবে তার কোন কথা নেই। 


পিসেমশাই  আজ নতুন একটা গল্প শুরু করলেন। সেদিন ছিল ভীষণ কুয়াশা। শীতকালের পৌষ মাসের সকাল। যথারীতি ভোর পাঁচটার ট্রেন ধরে হাওড়া যাবে বলে লাইন পার হচ্ছিল মনোজ। আর ঠিক সেই সময়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসছিল গ্যালোপিং ট্রেন। তাকে পিষে দিয়ে চলে গেল নিমেষে।একটু পরেই মনোজের শরীর বেশ হালকা লাগছে। সে আস্তে আস্তে উপরে উঠতে শুরু করলো। কিন্তু দেখলো সে হাওয়ায় ভাসছে কেন? আর তার শরীরটা পড়ে আছে লাইনের উপর।শরীর ছাড়া হয়ে মনোজ বেশ উপরে উঠে উড়ে উড়ে বেড়াতে লাগল। তারপর দুপুর গড়িয়ে রাত নামলো রাতে আরো অনেকে শরীর ছাড়া। শরীর ছাড়া আত্মা উড়ে উড়ে বেড়াতে বেড়াতে তার কাছে এলো। সকলের সাথে পরিচয় হলো। সে দেখল সে একা নয় তাদের একটা দল আছে। মনোজের আত্মা দেখছে,  আজ সুপার মার্কেটের পুরো গাছগাছালির আড়াল ঘিরে শুরু হয়েছে পৌষ পিঠের মেলা। এই মেলার সামনের পাড়ায় বস্তি এলাকায় কিছু গরীব সংসারের আবাস। তারা সুপার মার্কেটের সামনে থাকে এই নিয়ে তাদের গর্বের শেষ নেই। কারণ এই মার্কেট জুড়ে অনুষ্ঠিত হয় মেলা,সার্কাস আর বাজার। আর সেখানে কাজ করে তাদের ভালমন্দ খাবার জুটে যায়। শুধু বর্ষাকালে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। তখন ঝড়ে ডালপালা ভাঙ্গে আর সেই ডালপালা নিয়ে এসে তারা বাড়িতে ফুটিয়ে নেয় দুমুঠো চাল। পুকুরের গেঁড়ি, গুগুলি তখন তাদের একমাত্র ভরসা। শরীরবিহীন মনোজ দেখছে,  আজ পৌষ পিঠের মেলা। দুটি বছর দশেকের শিশু চলে এসেছে মেলায়। তাদের টাকা পয়সা নেই। ঘুরে বেড়ায় উল্লাসে। তারপর বেলা বাড়ে আর তাদের খিদে বাড়ে সমানুপাতিক হারে। খিদে নেই ওদের যারা ঘুরে ঘুরে পিঠে খায়। ফেলে দেয় অর্ধভুক্ত পিঠের শালপাতার থালা। ডাষ্টবিন ভরে  যায় খাবারসহ শালপাতায়। শিশু দুটি লোভাতুর হয়ে ওঠে। পাশে আলো মুখে একজন মহিলা এগিয়ে আসে। সে বলে, তোদের বাড়ি কোথায়। শিশু দুটি দেখিয়ে দেয় তাদের পাড়া। মহিলা বলে, আমাকে তোদের বাড়ি নিয়ে যাবি?  শিশু দুটি হাত ধরে নিয়ে আসে তাকে। পথে হাঁটতে হাঁটতে মহিলাটি বল, আমি তোদের দিদি। আমাকে দিদি বলে ডাকবি।বাড়িতে নিয়ে গিয়ে শিশু দুটি বলে, মা মা দেখ দিদি এসেছে আমাদের বাড়ি। মা তো অবাক। তারপর জানতে পারে সব। পেতে দেয় তালপাতার চটাই। একগ্লাস জল খেয়ে দিদি ব্যাগ থেকে বের করে পিঠের প্যাকেট। সকলে একসাথে বসে খায়।দিদি বলে শিশু দুটির মা কে,  আমার ছেলেপুলে হয় নি। তোমার বাচ্চাদের দেখে চলে এলাম তোমাকে দেখতে। জানো ভগবান, সকলকে সবকিছু দেয় না। তোমাকে যেমন টাকা পয়সা দেয় নি আর আমাকে আবার সন্তান দেয় নি। তোমার পুত্রসন্তানদের আমি আজ থেকে দেখাশোনা করব। তুমি অনুমতি দাও    ।


 ৬


মনোজ মরে গিয়েও পৃথিবীর মায়া ছাড়তে পারে নি। আকাশে ওড়ে আর মানুষের সুখ দূঃখ দেখে। হাওয়াতে ভেসে চলেছেন সুদর্শন বাবু । ফুরফুরে মেজাজে তার নিত্য আসা যাওয়া   কলেজের পথে ।একজন ছাত্রী তার নিত্য সাথী । ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা, কলিগরা অন্য চোখে দেখে । বাঙালি একটি যন্ত্র প্রথম আবিষ্কার করে ।সেটি হলো ষড়যন্ত্র । হাসতে হাসতে বলেন কলিগদের ।উত্তরে তারা বলেন ,সত্য উদ্ঘাটিত হোক । বেশ কয়েক মাস পরে একদিন কলেজ ছুটির পর পিছু পিছু কলিগরা তাদের অনুসরণ করলো । সুদর্শন বাবু ছাত্রীদের নিয়ে ঘরে ঢুকলেন কলেজ ছুটির পরে। কলিগরা বাইরে থেকে দেখলো শিক্ষক ও ছাত্রীরা পড়াশুনোয় ব্যস্ত।  তারা শিক্ষার  আলোর সাধনায় নিবিষ্ট ।অব্শ্য সঠিক সময়ে ছাত্রীটির অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য কলেজের সকল অধ্যাপকদের  পুরস্কৃত করা হলো । মনোজের দাদু বলতেন, প্রথম স্তরে মৃত্যুর পরে আমাদের দেহ থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হই। এবং দেহের কিছুটা উপরে ভাসমান অবস্থায় বিরাজ করি। এই অবস্থায় এই বোধ জন্মায় যে, আমাদের দেহ আর ‘আমি’ এক জিনিস নয়। কোনো দুর্ঘটনায় চৈতন্য হারিয়ে অথবা কোনও কোনও অনেকই এই অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হয়েছেন। এই জাতীয় অভিজ্ঞতা সব সময়েই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় না।এখন মনোজ দেখছে সত্যি তাই। মনোজের দাদুর বাবার লাঠি। যত্ন করে তুলে রাখা আছে বাঙ্কে। কার জন্য?  বৃদ্ধ আমার জন্য। কত সুখস্মৃতি জড়িয়ে লাঠির অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। দাদামশাই লাঠি ধরে পথ চলতেন। লাঠিকে বলতেন, বাবা ভাল করে ধরে রাখিস। ফেলে দিস না এই বুড়ো বয়সে। কোমর ভেঙ্গে যাবে তাহলে। বিশ্বস্ত লাঠি তার দায়ীত্ব পালন করেছে পলে পলে। এবার তার নাতির পালা। পিসেমশাই মজার হিন্দী বললেন, লে আও চায়ে। তারপর গল্প হবে। 



                     ক্রমশ...