Sunday, January 9, 2022

গদ্য || জীবন কাহিনী || সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

 জীবন কাহিনী 





    অস্বীকার করার জায়গা নেই। অস্বীকার করছিও না। 

পুরোনো ভাড়া বাড়িটা ছেড়ে দেশের বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে-- দু'ভায়ে বাবার কঠিন আদেশে১৯৭৩ সালে। পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে। যেখানে একলা একলা থেকে নিজে রান্না খাওয়া করে পড়াশোনা করেছি। থেকেছি। খেলেছি। মনের মতো বন্ধুত্বও গড়েছি। দেয়াল ম্যাগাজিনের সম্পাদক হয়েছি। ফুটবলের স্টপারের জায়গায় (প্রথম( ডিভিশনে)অভিষিক্ত হয়েছি।

কিন্তু বাবার মনে যে সেই স্যাঁতসেঁতে ধারনার জায়গায় কংক্রিট গড়ে উঠেছিল-- "আমি একটি মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি- উচ্ছন্নে যাচ্ছি"। হয়তো সেই মেয়েটা আমার সমস্তকিছু গোল্লায় দিচ্ছে। তাই চুপচাপ বাড়ি ফিরছি। বাসে করে। কেননা আর কোনও মাধ্যম ছিল না তখন সেসময়। আবার কিছু বছর পরে যোগ দেয়া ভাইটাও যাচ্ছে আমার সাথে।সে পড়তো গোয়েঙ্কা কলেজে কমার্স নিয়ে আর আমি ইকনমিক অনার্সের ছাত্র হিসেবে সেন্ট পলসে। কেউ কারোর সাথে কথা বলছি না সেসময়। যেন-- নিজেদের মৃতদেহটাকে নিজেরাই বয়ে নিয়ে যাচ্ছি কোনো শয়তানের কারখানার দিকে। তাই সেসময় নীরবতা পালনের জরুরি মাধ্যম হয়েছি। আর-- সেই নীরবতাই প্রমাণ করে দিচ্ছে সেই দিকটাই। দু'জনের বিশ্বভুবন যদিও বিভিন্ন। রং চটা ফানুষের আলো ঠিকরে পড়ছে মনের গভীরে। অবশ্য সেই মেয়েটির মনে এটা কতটা রেখাপাত ঘটবে জানিনা। তবু যেতে যে হবেই। 

    বাবার হুকুম অমান্য করার সাহস ও শক্তি আমার নেই। অবশ্য কোনও দিন ছিলও না। শহরের শিক্ষা গ্রামের আদিমতায় মিশে আমাকে এবার কী রকম জঞ্জালের স্তুপে নিক্ষেপ করে সেটাই দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হবে বাকি জীবনটায় । যদিও মেয়েটি আমার জন্য বেশ কিছু দিন হয়তো এরপর মানসিক উপবাস যাপন করবে । তারপর সে নিশ্চয়ই পারবে ভুলে যেতে কঠিন বাস্তবায়নে।  কিন্তু আমি পারছি না কেন! কেন? 

    আমি একা। একা আমি। জীবনের কঠিনতম বাস্তবের মুখে এক খড়কুটো সমান যেন। হ্যাঁ,মেয়েটির সাথে প্রেম হয়েছিল ঠিকই -- তবে সে প্রেমে নগ্নতা ছিল না। বা বলা যেতে পারে মেয়েটিই নগ্ন হতে দেয়নি কোনও সময়। বরং স্থির বাস্তব শিক্ষায় শিক্ষিত করছিল আমাকে।। তবে আগুনের সামনে "ঘি"থাকলে গলবেই-- এই তত্ত্বটিই বা বাবা হয়ে অস্বীকার করেন কি করে! তাই ডেকে এনে মেয়েটির সঙ্গ ছাড়ানোর ইচ্ছা আর কী!? 

   তবু আজও মনে পড়ে সেই পুরোনো ঘর,। আর মনের মধ্যে বাসা বাঁধা চেনা জানা কিছু মানুষের বিরল অভাব। 

     সেই ড্যাম্পের ঘর একচিলতে। একদিকে বিহারী গয়লাদের খড় ভুষি রাখার গোডাউন। দু দিকের ঘরের মাঝখানে দরজা ছিল যদিও। কিন্তু সেটা এমনিই যে সেটা গলে সবকিছুই ঘরে ঢুকতো অনায়াসেই আরশোলার পরিবারদের সঙ্গে নিয়ে। দরজা বন্ধই থাকতো যদিও সবসময়ই। তারই মধ্যে একখানা তক্তোপোষ পাতা একদিকে। দুদিকে দরজা। মেঝেতে কালো কালো ছোপ -- সুন্দরী রমনীর শরীরের বিভিন্ন ধরনের কারুকাজ যেমন। একদিকে রান্নার জন্যে জনতা আর ইকমিক কুকারের আঁটোসাঁটো বিভিন্নতা। সামান্য কিছু ষ্টীলের থালা বাসন। জলের বালতি, কালো রঙের কুঁজো এককোনে বসানো। সামনে জানলা গলে চোখে পড়ে হ্যান্ড পাম্পের জলের ঢেউয়ে বাড়ির আর সকলের হাবভাব। বেশ খানিকটা দূরে বাথরুম। জলের কলের লাইনে দাঁড়িয়ে জল তোলা। ঘরের ভিতর একখানা পাখা সেই রবী ঠাকুরের আমলের (ডিসি কারেন্টের )ঝুলছে। যার হাওয়া বেশি না হলেও আওয়াজ যার মহারাজারঞ্জিত বেদুইন সমান। মেয়েটা আসতো রোজই প্রায় দুপুরে। কী জানি কেমনভাবে যে তারপর সময়টা চলে যেতো বোঝাই যেতো না। রাত ন'টার বেশ কিছু আগেই অবশ্য বিচ্ছিন্ন প্রাসাদের হাতছানি দিতো তাকে। এখন সেই ঘর অন্য কারোর দখলে ভাবতেই মনে ভীষণ কষ্ট হয়। যখনই তার পাশ দিয়ে কোথাও যাই মনে পড়ে তার নির্ভেজাল ছবি খানা। অথচ সেটাকে ত্যাগ করে এলাম কী করে বলুন তো! কিন্তু এটাই তো কালের বিধান। তাই না! কাকে বোঝাই আমার ব্যক্তিগত সঙ্কটের কথা! তারপর---!! 

   আবার নতুন সকাল। কলেজ, শর্টহ্যান্ড ক্লাস। বিকেল হলে ঘোরাঘুরি। যদিও ইংরেজি মাধ্যম মিশনারি কলেজ। তবুও বাবার বজ্র কঠিন নিয়মে পড়ে প্যান্ট শার্ট ভুলে ধুতি পাঞ্জাবি পরে কলেজে যাওয়া। বয়সটা যদিও তখন মাত্র ষোল ছুঁই ছুঁই। একেবারে বোকা বোকা গ্রামের ছেলে। তাই রাগিং করার চেষ্টায় অনেকেই চেষ্টা করে ছিল সেসময়। যদিও সাপের মুখে পড়েও বেঁচে গেছি বলতে পারি। কিন্তু কলেজ অধ্যক্ষের কাছে নানান বাজে কথা শুনতে হয়েছে। নাহলে তিনি কলেজ থেকে বার করে দেবেন বলে হুমকিও দিয়েছেন। অজুহাত ছিল আমি নাকি বন্ধুদের সাথে বিশ্রী ব্যবহার করি এবং অশ্লীল কথা বলি। যার জন্য "বাড়িতে মা বোন নেই" (!)বলে হুমকিও দিয়েছেন। যেটা শুনে বাকি ছাত্র ছাত্রীরা অবশ্য বলেছিল-- কাকে কী বলেছেন এ্যাঁ! চলো ঐ প্রিন্সিপালের ঘর ভেঙে এখনই গুঁড়িয়ে দিই। বাধা দিয়েছি। তাই বন্ধু বান্ধবীরা পিছু হটেছে। এও হয়তো কপালে লেখা ছিল ভেবেছি। নকশাল আন্দোলনের সময় আমাকে ভুল করে কলেজ বন্ধুদের দ্বারা নকশাল সাজানো হয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারিনি। এরকম কত কিছুতেই ঐ মেয়েটা আমাকে রক্ষা করেছে মায়ের মতো। তবু সে বাড়িতে এলে --চলতো পৃথিবীর বুকে নানান আঁকিবুকি কাটা। বারবারই সেই মেয়েটির মুখে এটাও শুনেছি-- কী অসম্ভব "স্বীকারোক্তি" তোমার ! দ্যা গ্রেট। "এমন ছেলে বর্তমানে "বিরল"। তারপর, তারই হাত ধরে অবশ্য সিনেমা দেখা শুরু। সমরেশ বসুর লেখা কোনও বইয়ের নায়ক ভেবে "ভূবন সোম "দেখিয়েছেন। 

   সে সবই বন্ধ এখন। বিদ্যাসাগর মহাশয় মাতৃ আদেশে খরস্রোতা দামোদর সাঁতরে পার হয়েছিলেন। আর আমি পিতৃ আদেশে জীবনতরী পার করে চলেছি সেই কবে থেকে আজও। জানি না আর কতদিন! 

    সরকারি চাকরি পেয়েও ( বি, ই কলেজ অধ্যক্ষের পি, এ) চাকরি করিনি। সেও পিতৃ আদেশে। তারপর বিয়ে হয়েছে-- একটা নারী শরীরের তাপমাত্রা মেপে যৌনতার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে রাজি হতে হয়েছে। 

       সন্তান লাভ করেছি। কিন্তু। সেই আগের রূপ, গন্ধ আর নেই। সবই ধুলোয় মলিন। অবশ্য এর পরেও অনেক নারী শরীরের তাপমাত্রা মাপার সুযোগ ঘটেছে আমার জীবনে। সহধর্মিনী হিসেবে তার অপব্যবহার করতে দেননি যিনি সেই অসামান্যা নারী সহধর্মিনী চরিত্রবতী হলেও ছিটিয়াল এবং যৎপরোনাস্তি কুঁড়ে ও অলস মস্তিষ্কের। পাবলিক যাত্রা মঞ্চে অভিনয় করেছি চুটিয়ে (অপেশাদার)। প্রত্যেক ( প্রায় ১০০) অভিনয়েই নায়কের ভূমিকায ছিলাম অবশ্য সফল। শুধু সফল হইনি নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করা কোনও মেয়ের জীবনসঙ্গী হতে। মানে অসফল বা সফল হইনি।। 

  অবশ্য তারপর পরই আমার সমস্ত শখ আহ্লাদ এক নিমেষে উধাও। শুধু ব্যবসা, আর টাকার পেছনে দৌড়োনো এক বলিষ্ঠ যন্ত্র বনে গেলাম। আমার পুরোনো ঘরের পড়ার জায়গায় এক মন ধুলো পড়েছে ততদিনে। লেখালেখির সুযোগ নেই। তাতেই চলেছে খাতাপত্র নিয়ে কলমের কেদ্দানি। অসংখ্য লেখা বেরিয়েছে। কিন্ত কোনটাই বেশি দূর পৌঁছায় নি। কত খাবারের উচ্ছ্বিষ্ট গুলো লেগে আছে সেই ঘরের মেঝেতে। কেউ পরিষ্কার করেনি এতদিন। শুধু আমার যাত্রা পথের দিকে তাকিয়ে প্রহর গুনে গেছে তারা। গানের হারমনিয়ামটাতে, তবলায় ধুলো জমেছে। কেউ, কেউ সাফ করেনি। করবেই বা কেন! গলার কন্ঠনালীতে টান ধরার জন্যে গান বন্ধ করতে হয়েছে। গানের আসরে কত্ত জন আমন্ত্রণ জানিয়ে তাই ফেরত করেছে বোধহয়। তারপরেও সংগীতের সুর মূর্ছনায় বেশ কয়েক বছর এদিক ওদিক ঘুরেছি। তবলা (বাঁ হাতি) বাজিয়ে নামযশ কুড়িয়েছি। সেখানে এখন শুধুই বঞ্চনা আর বিদ্রুপ! অর্থাৎ "কোটা" কমপ্লিট হয়ে গেছে। সবাই তাই কেমন যেন বাঁকা বাঁকা। বাঃ, বা। কাদের জন্যে এই সততা, কাদের জন্যে এত সরলতা। কেউ বললো না -- "রাজা তোর কাপড় কোথায়"!? ছোটছেলে বারবারই বলছে-- আর কাজ করতে হবে না। কিন্তু--! 

     একমাত্র মেয়েই শুধু কাঁদে। বাবা যেন তার চির অমর রহে এই আশায়। সে তার শ্বশুরের দাঁত খিঁচুনি শুনেও বাবার জন্যে নিত্যদিন কাঁদে আর প্রার্থনা করে-- "ঈশ্বর বাবাকে বাঁচাও।" বাবা যেন সৎ হয়েই মরতে পারে। কত্ত জন - জ্ঞাতি, আত্মীয় পরিজন, আম পাবলিক কতভাবে বাবাকে চিটিং করেছে তার ইয়ত্তা নেই। তবুও বাবা অচল অটল!! তার বাবার যে সব থেকেও নেই এমন কালের যাঁতাকলে"! দেখবো এরপর নিয়তি শেষপর্যন্ত কী বলে! আর তাইতো আমি ভাবি--- বলি-- দাও ফিরিয়ে আমার পুরোনো সেই দিন গুলি।। আমার পুরোনোই বোধহয় ছিল ভালো।

নিবন্ধ || আমাদের শিক্ষার অগ্রগতিতে সমস্যা || শিবাশিস মুখোপাধ্যায়

 আমাদের শিক্ষার অগ্রগতিতে সমস্যা




দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রযুক্তি ও পুঁজির ওপর নির্ভর করে না, প্রধানত জনশক্তির পরিমাণ ও গুণমানের ওপর নির্ভর করে। জনশক্তির গুণমান বলতে আমরা বুঝি কর্মশক্তির দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা। জনশক্তির দক্ষতা স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, আবাসন সুবিধা, নিরাপদ পানীয় জল এবং স্যানিটেশনের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নির্ভর করে। এগুলি জীবনের মানের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসাবে বিবেচিত হয়। জনশক্তির উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করবে। অর্থনীতিবিদরা একে বলছেন ‘মানব পুঁজি গঠন’। মানব পুঁজি বলতে আমরা বুঝি "জনসংখ্যার দ্বারা অর্জিত জ্ঞানের অংশ এবং জনসংখ্যার জ্ঞানকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা"। সামাজিক অবকাঠামোর বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে শিক্ষা হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সুশিক্ষিত এবং সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত জনশক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, আমাদের শিক্ষাগত উন্নয়ন এখনও নিম্ন স্তরে রয়েছে। শিক্ষার অগ্রগতিতে প্রধান সমস্যাগুলি নিম্নরূপ:

তহবিলের অভাব:

পর্যাপ্ত অর্থের অভাব শিক্ষার উন্নয়নে প্রধান সমস্যা। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিক্ষার ব্যয় কমছে। অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো, বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি ও গ্রন্থাগার ইত্যাদির অভাব রয়েছে। এ কারণে কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন করা যাচ্ছে না।

ব্যয়বহুল উচ্চ শিক্ষা:

ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাগত ও কারিগরি শিক্ষা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। আইআইএম-এর মতো প্রযুক্তিগত এবং পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলির ফি কাঠামো বেশ উচ্চ। এমবিএ ক্লাসের জন্য প্রতি সেমিস্টারে লাখ লাখ টাকা। এটা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। উচ্চশিক্ষার বেসরকারীকরণ মুনাফা ক্ষুধার্ত উদ্যোক্তাদের বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করেছে। এখন দিনের উচ্চ শিক্ষা অনেক ব্যয়বহুল ব্যাপার।

ভারতীয় ভাষার প্রতি অবহেলা:

বিশেষ করে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি। তাই গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা যারা ইংরেজিতে পারদর্শী নয়, তারা ইংরেজিতে বিজ্ঞান ঠিকমতো পড়তে পারে না। ভারতীয় ভাষা এখনও বিকশিত নয়। ভারতীয় ভাষায় মানসম্মত প্রকাশনা পাওয়া যায় না।

ব্রেন ড্রেনের সমস্যা:

বুদ্ধিমান, মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা যখন দেশে উপযুক্ত চাকরি পায় না, তখন তারা চাকরির জন্য বিদেশে যেতে পছন্দ করে। তাই আমাদের দেশ ভালো মেধা থেকে বঞ্চিত। এই ঘটনাকে বলা হয় 'ব্রেন ড্রেন'।

গণ নিরক্ষরতা:

সাংবিধানিক নির্দেশনা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সত্ত্বেও আমরা শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করতে পারছি না। -এখনও মানুষ নিরক্ষর রয়ে গেছে। ভারতে নিরক্ষরদের সংখ্যা বিশ্বের মোট নিরক্ষরদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। 

সম্পদের অপচয়:

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সাধারণ শিক্ষার উপর ভিত্তি করে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। 6-14 বছর বয়সী ছাত্রদের অধিকাংশই তাদের শিক্ষা শেষ করার আগেই স্কুল ত্যাগ করে। এটি আর্থিক এবং মানব সম্পদের অপচয়ের দিকে পরিচালিত করে।

সাধারণ শিক্ষা ভিত্তিক:

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সাধারণ শিক্ষার প্রকৃতির। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়ন যথেষ্ট অসন্তোষজনক। তাই আমাদের শিক্ষা অনুৎপাদনশীল। তাই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এটি সরকারের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষার সমস্যা:

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অনেক সমস্যায় জর্জরিত। পানীয় জল, প্রস্রাব এবং বিদ্যুৎ, আসবাবপত্র এবং অধ্যয়নের উপকরণ ইত্যাদির মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধার কথা বলার জন্য বড় সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোন ভবন নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি বড় সংখ্যক বিদ্যালয় একক শিক্ষক বিদ্যালয় এবং অনেক বিদ্যালয় এমনকি শিক্ষকবিহীন। তাই ঝরে পড়ার হার খুবই বেশি এবং উদ্বেগের কারণ। উপসংহারে বলা যায়, শিক্ষার পরিমাণগত প্রসার ঘটলেও গুণগত উন্নয়নে আমরা এখনো পিছিয়ে আছি।

সম্ভাব্য সমাধান:

দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে, জীবিকা অর্জন করতে বা অতিরিক্ত আয় করতে আমাদের অনেকেই তাদের শিক্ষা এবং স্কুলে পড়া ছেড়ে দেয়। অনেক শিশু এমনকি স্কুলে যায় না, এবং তারা অন্যত্র কাজ করার জন্য স্কুল ছেড়ে দেয়। এসব কারণে সাক্ষরতার হার কম থাকে এবং অনেক শিশু সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হয়। শিক্ষায় স্থানীয় ভাষার ব্যবহার বাড়াতে হবে। কম দামের বই এবং লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনার উন্নতির পাশাপাশি অতিরিক্ত লাইব্রেরি প্রয়োজন। শিক্ষা, জনসংখ্যা শিক্ষা, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা শেখানোর হাতিয়ার হিসেবে গণিত ব্যবহার, বিজ্ঞান শিক্ষাকে শক্তিশালী করা এবং খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা এবং যোগব্যায়ামকে সমর্থন করার জন্য কাজের অভিজ্ঞতার জন্য বিধান রয়েছে। 

আমাদের অবশ্যই শিক্ষার প্রযুক্তিগত সমাধান প্রয়োজন। শিক্ষক যিনি প্রতিটি শিশুকে তার পূর্ণ সম্ভাবনায় বেড়ে উঠতে সক্ষম করার জন্য একই সময়ে আধুনিক শিক্ষার শক্তিতে বিশ্বাস নিশ্চিত করেন, তিনি বজায় রাখেন যে দরিদ্র শিশুদের সম্ভবত মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষিত করা যাবে না এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি সমান্তরাল স্কুল ব্যবস্থা প্রয়োজন। একটি শিক্ষাকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার অর্থ হল এর বহুমুখী এবং দ্বান্দ্বিক শক্তি (Versatile and dialectical power)উপলব্ধি করা। আমাদের শিক্ষাকে বহুমুখী করতে হবে আর দ্বান্দ্বিকতা হল যুক্তির পদ্ধতি যার লক্ষ্য শিক্ষাগুলি তাদের সমস্ত গতিবিধি, পরিবর্তন এবং আন্তঃসংযোগে, তাদের বিপরীত এবং পরস্পরবিরোধী দিকগুলিকে ঐক্যবদ্ধভাবে বোঝা। সবশেষে, অভিভাবকদের দায়িত্ব হল তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানো এবং প্রাক-প্রাথমিক (3-6 বছর বয়সের মধ্যে) শিক্ষা এবং যত্ন প্রদান করা।

গল্প || ঐতিহাসিক খাট || সুজিত চট্টোপাধ্যায়

 ঐতিহাসিক খাট



পয়লাবৈশাখের বাংলা ক্যালেন্ডার নাতি ভম্বল টাঙিয়ে দিলো ঠাকুমার ঘরে , ঠাকুরের সিংহাসনের পাশে। 

দুর্গাঠাকুরের ছবি আঁকা ক্যালেন্ডার । "আদিগঙ্গা বস্ত্রালয়" প্রতি বছরের মতো এবছরও দিলো। সঙ্গে এক বাস্ক সস্তা মিষ্টি । নববর্ষের প্রীতি উপহার। 

ঠাকুমা বললো ,, " দেখ তো ভম্বল , পুজো কবে? "

ঘরে নতুন ক্যালেন্ডার এলেই সবার আগে খোঁজ হবে পুজো কবে? পুজো বললেই বুঝে নিতে হবে দুর্গা পুজো।

 পুজো অনেক দেব দেবীরই হয়। কিন্তু দুর্গাপূজার ব্যপারটাই আলাদা। একটা অদ্ভুত আনন্দ হিল্লোল আকাশে বাতাসে মনে। 

লালকালিতে সার সার অন্তত চারটি দিন। ইস্কুলের দিন গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। 

" আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে "।

সত্যি কথা বলতে , বয়স যতই এগোয় মন ততই দরকচা মেরে যায় । 

অনাবিল হাস্য মুখর ডানপিটে মজা গুলো গুমড়ো মুখো হয়ে যায় ।তখনই আসে গলায় বিষাদের সুর,, 

" আজকাল সেই আগের মতো প্রাণবন্ত পুজো আর নেই। কেমন যেন দায় সারা গোছের হয়ে গেছে "

আসলে কিন্তু তা নয়। পুজোর জৌলুশ আগের চেয়ে বেড়েছে বৈ কমেনি। জৌলুশ কমেছে মনে। পাংশুটে পটলের মতো কোঁচ ধরেছে। 

তবুও ঠাকুমা বৈশাখের নতুন ক্যালেন্ডারে আশ্বিনের শারদীয়া খুঁজছে। জপের মালা সমেত হাত কপালে ঠেকিয়ে অস্ফুট উচ্চারণ দুগগা,, দুগগা,,। 

আজ থেকে উনিশ বছর আগে দুর্গা সপ্তমী তে বৈধব্য পেয়েছিলেন। তাতে কী? তাইবলে দুগগা মায়ের ওপর থেকে বিশ্বাস ভালবাসা উঠে যাবে কেন । তা অটুট আজও। 

নাতি ক্যালেন্ডার টাঙাতে টাঙাতে হেসে বলে,, 

 " কীহবে জেনে তোমার। ধুনুচি নাচবে না-কি বাদামতলা আষাঢ় সঙ্ঘের ঠাকুর দেখতে যাবে ? "

ঠাকুমা চুপ করে যায় । জম্পেশ জবাব দেওয়া যেতো কিন্তু ঠাকুমা চুপ করে থাকাই ঠিক মনে করে মুখে কুলুপ দিলো। 

নইলে অনায়াসেই বলা যেত,,, 

একটা গাড়ি কেনার যোগ্যতাও তো নেই কারো অথচ ঠাকুর্দার গাড়িটা পুরনো হয়ে যাবার অজুহাতে জলের দামে বিক্রি করতে এতটুকু লজ্জা বোধ হয়নি। 

ঐ গাড়িতে চড়ে সারারাত ধরে কত ঠাকুর দেখে বেড়িয়েছি সব্বাই মিলে। 


বাংলা ক্যালেন্ডার এখন আর তেমন করে কারুরই কোনও কাজে লাগেনা। বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীর মতো টিমটিম করছে। তবে ঠাকুমার ওটা চাই ।বিশেষ করে একাদশী পূর্ণিমার হদিস পাবার জন্যে। 

তাছাড়াও যেগুলো ব্রাত্য হয়ে যাচ্ছে শহুরে ব্যস্ততার দাপটে , ঝুলনযাত্রা , স্নানযাত্রা , রাধাষ্টমী , পঞ্চম দোল , বিপত্তারিণী ব্রত, ষষ্ঠী , ইত্যাদি। কেউ তো বলে দেবার নেই। সবাই ব্যস্ত যে যার নিজের কাজে। তাই তাকেই খোঁজ রাখতে হয়। 

কিছুই নয় , শুধু ভালো দিন গুলোতে রাধামাধবের পায়ে একটু পুজো দেওয়া। পরিবারের মঙ্গল কামনায়।যদিও ঠাকুমা জানে এ-সব কিছুই না, প্রাচীন প্রথাগত সামাজিক লোকাচার মাত্র।  

পালন করলে কি _না করলে , কিছুই এসে যায়না তাতে। তবুও যতক্ষণ টিঁকে থাকা ততক্ষণ টিঁকিয়ে রাখা। তার সঙ্গেই বিদায় নেবে এইসব অনাহুত অলাভজনক পুরাতন সংস্কার কিংবা কুসংস্কার ।

সেদিন ঠাকুমা বললেন " ওরে ভম্বল , একটা কাজ করে দিবি বাবা " 

গলায় অনুনয়ের সুর। " এই ঘরের মেঝেতে একটা বিছানা ক`রে দিতে পারবি ? "

স্বাভাবিক ভাবেই ভম্বল অবাক। 

" মেঝেতে বিছানা ,, কেন কী করবে ? "

" আমি মেঝেতে শোবো। "

" মেঝেতে শোবে ! কেন হঠাৎ ? খাটে কি তোমার অসুবিধে হচ্ছে ? "

" না না সেকথা নয়। আবার অসুবিধে একেবারেই হচ্ছেনা এমনও নয়। বিশেষ ক`রে ওঠানামা করতে বড্ড,,, যাকগে, সেটা বড় কথা নয় । আসলে কি জানিস , চোদ্দো বছর বয়সে এবাড়িতে বউ হয়ে এসেছিলাম। এই খাটেই ফুলশয্যা হয়েছিল। শৌখিন মানুষ ছিলেন উনি। গোলাপ দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন সেই মধুযামিনী রাতের শয্যা। সেই কতদিন আগের কথা। আজও ছবির মতো চোখের সামনে যেন দেখতে পাই।

 এক এক ক`রে ছেলে মেয়েরা এলো । সব এই খাটে। 

নরম নরম কচি কচি হাত পা ছুঁড়ছে কাঁদছে ঘুমোচ্ছে। রোজ একটু একটু ক`রে বড় হয়ে যাচ্ছে। সব এই খাটে। 

উনিশ বছর আগে যখন উনি চলে গেলেন চিরকালের জন্য , ওনার শেষ শয়ন ছিল এই খাটে। কত সুখস্বপ্ন সুখস্মৃতি কত বেদনা স্বপ্নভঙ্গ চোখের জল , জন্ম থেকে মৃত্যু সবকিছুর বির্বাক সাক্ষী এই খাট । 

এবার ছুটি নেবো , ছুটি দেবো। বহুকাল ঐ

মাটি ছেড়ে এই উঁচু ঐতিহ্যশীল বনেদীয়ানায় মোড়া আভিজাত্যের অহংকারে নিজের সবটুকু নিয়ে বসে আছি। 

এবার ফিরে যেতে চাই মাটিতে অকাতরে সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে। "

ভম্বল ব্যস্ত মানুষ। কথা গুলো শুনে মুখ কুঁচকে হাত ঝাঁকিয়ে বিরক্তি দেখিয়ে বললো,, 

" আচ্ছা আচ্ছা , সে দেখা যাবে আখুন "। 


পরদিন সকালে সবাই অবাক চোখে প্রত্যক্ষ করলেন ঠাকুমার নিথর নিষ্প্রাণ দেহ স্থির হয়ে পড়ে আছে সেই খাটেরই মাঝখানে। তার শেষ ইচ্ছে পূরণ করার সুযোগই আর পাওয়া যাবে না। ঐতিহাসিক খাটে ইতিহাস হয়ে রয়ে গেলেন ঠাকুমা ।

গল্প || শেষ টার্গেট || রঞ্জিত মল্লিক

 শেষ টার্গেট




        সিঁড়ির সবকটা ধাপ এখন আর মনে থাকে না।

তাছাড়া হাজারো চিন্তার সাথে দুইকুড়ি দশ বসন্তের ক্লান্তি...

এ'দিকে ঋদ্ধিমার সাথে দেখা না করলে, মেয়েটা কষ্টও পেতে পারে। সেই জন্যই দোতলা থেকে নিচে নামা...


          ঋদ্ধিমা, বছর কুড়ির এক উড়ন্ত প্রজাপতি। এক ডাল থেকে অন্য ডালে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়। সব সময় একটা চনমনে ভাব। সপ্তাহখানেক আগে এক সাহিত্য সম্মেলনে দুজনের পরিচয়। হিরণ্ময়বাবু নামী লেখক এবং কবি। উনার বেশ কিছু বই গুণী মহলে বিশেষভাবে সমাদৃত।   


           ঋদ্ধিমার আবেগে তথা শ্রদ্ধায়, অকৃতদার হিরন্ময় সরকার কিছুটা আপ্লুত তো বটেই। তা'বলে ঋদ্ধিমা বাড়িতে চলে আসবে, আশা করেনি। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই, পদস্খলন...


        নিথর দেহটা যখন সামান্য হলেও গড়াতে গড়াতে সিঁড়ির নিচে এল', ঋদ্ধিমা পাষাণপ্রতিমা!


          কোন রকমে হিরণ্ময়বাবুকে তুলে এনে খাটে বসিয়েই বলল,"আপনার লাগেনি তো? একটু সাবধানে তো চলাফেরা করতে পারেন?"

     "না, আসলে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়েই....."

      "এবার থেকে একটু খেয়াল রাখবেন, চলুন ডাক্তারখানায়।"

       "যেতে হবে বলছ?"

       "তা নয় তো কি.....?"

       "বেশ চল তাহলে।"


             হিরণ্ময়বাবুকে টোটোতে বসিসেই ঋদ্ধিমা উনার পাশে বসল। হিরণ্ময়বাবু কিছুতেই ডাক্তার দেখাতে যাবেন না। বলে কি না তাঁর কিছুই হয়নি। উনার চেহারা দেখে উনাকে অতটা বয়স্ক বলেও মনে হয়না। চোখের চাহনিও বেশ অদ্ভুত।


            হিরণ্ময়বাবু বাঁ হাত দিয়ে ঋদ্ধিমাকে আলতো করে সাপোর্ট পাবার জন্যে ধরতেই ঋদ্ধিমা কেমন চমকে উঠল। চোখের দিকে তাকাতেই হিরণ্ময়বাবুর মুখে একটা মোলায়েম হাসির রোদ্দুর। ঋদ্ধিমা বেশ ঘাবড়ে গেছে। একটু অস্বস্তিও হচ্ছে ভিতরে ভিতরে। কিছু বলতেও পারছে না। যেটা হিরণ্ময়বাবুর ব্র্যাণ্ডেড, সৌখিন পাঞ্জাবী ও ঝলমলে হাসি সবটা শুষে নিচ্ছে ব্লটিং পেপারের মতন।  


             উনাকে দেখার পর থেকেই ঋদ্ধিমার কেমন যেন সন্দেহ হতে শুরু করে। প্রথমদিন সন্মেলনে দেখার সময়ও কেমন একটা অদ্ভুত লেগেছিল। চোখের তারায় তারায় যেন গভীর দীঘির একটা প্রতিচ্ছবি। উনি অবিবাহিত। সাহিত্যের পূজারী। বেশ নামডাকও আছে।তবে কি যেটা ভাবছে....


                 হিরণ্ময়বাবু উনার পছন্দের নার্সিংহোমেই গেলেন দেখাতে। নার্সিংহোমে অনেকেই উনার বিশেষ পরিচিত। অনেকের সাথে আকারে ইঙ্গিতে কথা বলছেন। মাঝে মাঝে কথা বলতে বলতে কেমন গম্ভীরও হয়ে যাচ্ছেন। ঋদ্ধিমা সব কিছুই লক্ষ্য করছে। আর কি যেন ভাবছে।


              ওর কপালে চিন্তার ভাঁজটা দাক্ষিনাত্যের মালভূমির মতন দেখাচ্ছে। অতিরিক্ত টেনশন আর পেশীর প্রসারণে সেটা ওঠা নামা করছে। ফেরার পথে বেশ কিছু মানুষ কেমন আড়চোখে ওদের দুজনকে দেখছে। আর নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করছে। দু চারটে ছোড়া অস্পষ্ট কথা কানেও এলো। তবে ঋদ্ধিমা একেবারে নিরুত্তর।


                        ******** ***********


               তিন সপ্তাহ হয়ে গেছে। ঋদ্ধিমা আজও এলো না। হিরণ্ময়বাবুও বেশ চিন্তিত। এদিকে ঋদ্ধিমার ফোনটাও শব্দহীন হয়ে আছে। মনের মধ্যে একটা ঝড় বইছে। উনি অস্থিরভাবে বারান্দাতে পায়চারি করছেন। আর বারে ফোনের দিকে তাকাচ্ছেন। আর ভাবছেন এই বুঝি ঋদ্ধিমার ফোনটা বেজে উঠল। 

         

           বিকেলের একটু পরেই ঋদ্ধিমা হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল। মুখে একটা তৃপ্তির হাসি খেলা করছে। সাথে বেশ কয়েকজন ওর বয়সী বা ওর থেকে একটু বেশী বয়সী কিশোরী। পাশে পুলিশের এসআই। ও দু চারজন কনস্টেবল। 


             নার্সিংহোমেই উনার কুকীর্তির কিছুটা আভাস পেয়েছিল ঋদ্ধিমা। যদিও সন্দেহটা প্রথম থেকেই ছিল। তাই তো আর দেরী করেনি। খুব তাড়াতাড়ি একটা সিদ্ধান্তে চলে এসেছিল। আর এই কাজে ওকে সবচেয়ে বেশী হেল্প করেছেন ওর মেসোমশাই। যিনি একটা সময় ক্রাইম ব্রাঞ্চের ডাকাবুকো অফিসার ছিলেন। মেসোমশাইয়ের সাথে আলোচনা করেই তবে এগোনো......।


                   ........... .......... ......... 


          সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়াটা একটা নাটক ছিল। উনি যোগা করতেন। বাড়ির কাজের মেয়ের কাছে যেটুকু জানা, শরীর চর্চাও শোনা যায় নিয়মিত চালিয়ে যেতেন। তাই এইভাবে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়াটা উনার কাছে খুব একটা কঠিন নয়।আর ছল চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে নিজের নোংরা অভিসন্ধিকে চরিতার্থ করতে উনার মতন ধুরন্ধর লোক খুব কমই আছেন। 


             বহুবার এই ধরণের বহু রকম নাটক করে অনেক মেয়েকে ফাঁসিয়েছেন। এবং তাদেরকে কুপ্রস্তাবও দিয়েছেন। কখনো তাদেরকে একক বই ছাপানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে, কখনো বা তাদেরকে কাজ পাইয়ে দেবার মিথ্যে জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কুপ্রস্তাবে অনেকে সাড়াও দিয়েছেন। অনেক উঠতি লেখিকা নিজের একক বই বা সংকলন ছাপাতে আগ্রহী হয়ে উনাকে কিছু টাকা অ্যাডভান্সও দিয়েছেন। 


           নিজে সাহিত্য চর্চা করতেন বলে সাহিত্য জগতের বহু গুণী লেখক, লেখিকা, কবি, সাহিত্যিকের সাথে উনার ভালই দহরম মহরম ছিল। অনেক নামী প্রকাশনী সংস্থার সাথেও উনার বেশ খাতির ছিল। সেই পরিচিতি কাজে লাগিয়েই অনেক নিত্য নতুন মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব পাতানোটা বেশ সহজ হয়েছিল। তাদেরকে মিষ্টি মিষ্টি কথার জালে ফাঁসিয়ে নিজের শয্যাসঙ্গিনী করতেন। এই নোংরা নির্লজ্জ খেলায় বহুবার সফলও হয়েছেন। 


            বিষয়টা চার দেওয়ালের মধ্যেই আটকে ছিল। একমাত্র কাজের মেয়েটিই সব জানত। ঐ নার্সিংহোমেই বহুবার অনেক মহিলার গোপণে গর্ভপাত করা হয়। হিরণ্ময়বাবু বিকৃত মানসিকতার শিকার। যেটা বাইরে থেকে উনার নিপাট ভদ্র শরীরি পরিভাষা দেখে বোঝার উপায় নেই। কাজের মেয়ে সুরেধাকে অর্থের প্রলোভনে মুখ বন্ধ করে রাখা হয়। যদিও তা শেষ রক্ষা হল না। সত্য ঠিক প্রকাশ হল। 


         ঋদ্ধিমা ছিল উনার শেষ টার্গেট। সে এই নোংরামির অনেকটাই আভাস পেয়ে তাই দেখা করতে আসে। আর তাতেই রাঘববোয়াল ধরা পড়ে। 


           যদিও ঋদ্ধিমাকে হিরণ্ময়বাবুর এই তথাকথিত ভদ্র মুখোশটা খোলার জন্যে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। উনার বাড়িতে সেদিন এক ডায়েরি পেয়েছিল ঋদ্ধিমা। সেখানে অনেক সুন্দরী মেয়ের ঠিকানা, ছবি, নার্সিংহোমের বিল লুকানো ছিল। যা দেখে সন্দেহের শিকড় আরো গভীরভাবে মনে প্রবেশ করে। সেই সূত্র ধরেই ঋদ্ধিমা আর পিছনে তাকায়নি। এগিয়ে গিয়েছিল।


           নিজে সাইকোলজির একজন কৃতি ছাত্রী হওয়াতে কাজ কিছুটা সহজও হয়েছিল। হিরণ্ময়বাবুর মনটা ঠিক পড়ে ফেলেছিল। কারণ ঋদ্ধির মনে একটা কথা বার বার রেখাপাত করেছে, তা হল একটা মানুষ কি করে এত ভদ্র সভ্য হয়ে থাকতে পারে। আর সেই জন্যেই.....।


                হাতেনাতে ধরা পড়ে মুখোশ খুলে যেতেই হিরণ্ময়বাবু বেশ অস্বস্তিতে। উনি ভাবতেও পারেন নি উনার নতুন এবং শেষ টার্গেট এইভাবে ব্যর্থ হয়ে উনাকেই উল্টে ছোবল মারবে। 


           বিকেল ফুরিয়ে বেশ অনেক্ষণ হল সন্ধ্যে নেমেছে। গাঢ় আঁধারে হিরণ্ময়বাবুর মুখটা ডুবে আরো ভয়ঙ্কর, রোমহর্ষক দেখাচ্ছে। উনাকে পুলিশের গাড়িতে তোলা হলে, ঋদ্ধিমার সাথে আসা মেয়েগুলো জ্বলন্ত দৃষ্টিতে উনার দিকে তাকিয়ে তিরষ্কার আর অভিশাপ বর্ষণ করল। 


          ওদের মুখেও একটা যুদ্ধজয়ের নিষ্পাপ হাসি। আজ ঋদ্ধির জন্যেই ওরা সবাই ন্যায় বিচার পেল। সকলে সমস্বরে ঋদ্ধির নামে জয়ধ্বনি দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। 

অনুগল্প || সময় || রথীন পার্থ মণ্ডল

 সময়



"ডার্লিং, এই দেখো তোমার জন্য কি এনেছি ! একটা বিদেশী হাতঘড়ি ! এর দাম কত জানো? ত্রিশ হাজার টাকা। আজ আমাদের দশম বিবাহবার্ষিকীতে এটা তোমার গিফট।" ঘড়িটা হাতে নিয়ে মধুজা চয়নের দিকে তাকিয়ে মনে মনে শুধু বলে, " ঘড়িটা না দিয়ে যদি একটু সময় দিতে..."

গল্প || লাস্ট প্রশ্ন || সিদ্ধার্থ সিংহ

 লাস্ট প্রশ্ন




বাড়ি ঢুকতেই বউ বলল, তুমি যে কৌন বনেগা ক্রোড়পতিতে গিয়েছিলে কেমন হল?

স্বামী বলল, অমিতাভ বচ্চন আমাকে একটা প্রশ্ন করেছিল। লাস্ট প্রশ্ন। সাত কোটি টাকার।

--- কী প্রশ্ন?

--- জিজ্ঞেস করেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে খতরনাক মহিলার নাম কী? আমি সাত কোটি টাকার মুখে লাথি মেরে চলে এসেছি। তাও তোমার নাম বলিনি।

গল্প || দীপ নিভে যায় || আশীষ কুন্ডু

 দীপ নিভে যায় 




অনেক দিন পর একা ট্রেনে চেপে বসেছে দীপ। 

অসুস্থতার পর এই প্রথম। ছাড়তে চাইছিলো না দীপকে একা একা, মিত্রা,অত্যন্ত চাপে থাকা অর্ধাঙ্গিনী। 

ট্রেন চলছে, হাওড়ামুখী। পৃথিবী দৃশ্যতঃ ছুটন্ত। সব পিছিয়ে যাচ্ছে যেন অতীতের পথে। গোলমাল একটা দরজার মুখে খড়গপুর পেরিয়ে ।একটা লোক বিনা রিজার্ভেশনে উঠেছে, টিটি ধমকাচ্ছে তাকে।লোকটা চেনা মনে হচ্ছিল। মনে পড়ছে না, খুব চেনা, খুব কাছের মানুষ মনে হচ্ছে। 

দীপ টিটিকে বললো, " ছেড়ে দিন না ওকে, গরীব মানুষ মনে হচ্ছে। " টিটি রেগে গিয়ে বললো, "নিজের চরকায় তেল দিন।"

মাথা গরম হয়ে গেল দীপের, "এরকম ভাবে

কথা বলছেন কেন? "

--" এই যে মশায়, সরকারী কাজে হস্তক্ষেপের ফল জানেন। " টিটিকে উদ্ধত মনে হয় দীপের। 

মাথা ঝিম ঝিম করছে দীপের। তবু একটা শেষ চেষ্টা হিসাবে দীপ বলে, "আপনি-- একটা

গরীব মানুষকে , --একটু ছেড়ে দিতে পারছেন

না,! "

এবার টিটি কার্যতঃ দীপকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে

দেয়। দীপ চোখে অন্ধকার দেখে। জিভ শুকনো লাগে। লোকটা সামনে। ভীষণ শ্বাসকষ্ট হচ্ছে দীপের।অসাড় হয়ে আসছে অস্তিত্ব। লোকটা হাত বাড়িয়ে ধরে, --বলে,-- "আমার হাত ধরো কোনো কষ্ট থাকবে না !"

হাত বাড়িয়ে দেয় দীপ। ------

দীপের পার্থিব শরীরটা শোয়ানো বাড়ির উঠোনে। দুটো জ্যোতি বলয় অলক্ষে শূন্যে মিলায়। 



কবিতা || বাধ্যতা || আবদুস সালাম

 বাধ্যতা




তরুণ ঘাসেরা স্নান সেরে নিলে কথোপকথনের শুরু

অপেক্ষার প্রান্তরে বুড়ি ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা ঢেউ এ ঢেউ এ বাধ্যতার রঙ্গমঞ্চ


রান্নাঘরের ফুসফুসে অনুভবহীন নাব্যতা

পিরিতির ফাগে মোহময় উষ্ণ সোহাগ চিকন গালের টোলে নিঃস্বতা লুকানো


ভালোবাসার দীঘল ক্ষণে জমে উত্তুরে হাওয়ার রুক্ষঘুম

আকাশ-পাতাল ভেবে ভেবে সুখ-দুঃখের এলোমেলো সংলাপ

বিশ্বাসের অলিন্দে উঁকি মারে ঔপনিবেশিক কুয়াশা


আলোর সীমানা জুড়ে ডানা ঝাপটায় জোয়ারের শান্ত উচ্চারণ

সুগন্ধি বাতাসে নিচে উঠে ময়ূরী

নতুন জলের ছোঁয়ায় নেচে উঠছে গর্ভবতী ঢেউ

কবিতা || সাজবো আমি শিম্পাঞ্জি || শ্যামল চক্রবর্ত্তী

 সাজবো আমি শিম্পাঞ্জি 




বেকার আমি ভাই,

চাকুরী খুঁজি তাই

 খবর পেলাম বিজ্ঞাপনে,

সাজদে হবে শিম্পাঞ্জি,

  কষ্ট কিছুই নেই।

চাকরি আছে এমে পাশে।

দেখবে আমার টিকিট কেটে

বাঁদর কিন্তু নয়।

হঠাৎ করে দেখতে এলো

বিজ্ঞ মহাশয়।

অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,

শেষে কিনা জন্তু হোলি ভাই?

মুখ ঢেকেদে শিক্ষাতে এ,

মূল্য শিক্ষার কই?

শিক্ষা দেবে জন্তু কত,

 বন্দি খাঁচায় তুই।

দেশ চালাবে শিম্পাঞ্জি।

মুচকি হাসে পক্ষী পশু,

 করলি স্বাধীন ভাই।

আবাস মোদের মুক্ত জগত,

  চিড়িয়াখানায় তুই।

কবিতা || রুবাই || সব্যসাচী মজুমদার

 রুবাই




নানকের চাঁদে পোড়া নবীন কিশোর

রেখেছে কাবিন সুর---এও নিবি, চোর?

যদিও দেওয়ানা একা কূহক ইতর


তবে যদি অন্ধ শুয়ে গ্রামের দোঁয়াশে

তুই ভুলে যাবি ধুলো হেমন্তের মাসে

--এ দেন মোহর নিস পাগল নিঃশ্বাসে


সমাধী নীলিমা হলো অঙ্গে লাগে ছুরি

আয় তবে মাঠে মাঠে ঋতু হয়ে ঘুরি

মিলাদে রুবাই হবে ভেলুয়া সুন্দরী


সুন্দরীর মাটি ভাঙে কামট হারায়

মধুর ঈষতে মানচিত্র মুছে যায়

পশুর মতন ঘুরি নদী ভরসায়


এরপরে গানে লিখবো তুই মন্ত্রনয়


নানকের চাঁদে লাগে কিশোরের ক্ষয়


কবিতা || পিতৃদেবতা || বিমান প্রামানিক

 পিতৃদেবতা


 


বাবা আমাদের সবার প্রিয় দেবতার সমান,

কখনও যেন তাঁকে না করি অপমান। 

বাবার সাথে জগতে কারও হয় না তুলনা, 

বাবার মত অতি আপন কাউকে পাবো না। 


জীবনের প্রতি ক্ষণে থাকে বাবার আশীর্বাদ, 

তাঁকে করলে অবহেলা জীবন বরবাদ। 

বাবা শুধুই থাকেন আমাদের মুখটি চেয়ে,

আমরাও যেন ধন্য ধরায় তাঁকেই পেয়ে।


আমাদের যত কিছু চাওয়া পাওয়া করতে পুরণ,

সর্বস্ব নিজের সুখ বিলিয়ে দেন সারাজীবন। 

'বাবা' জাতি এমনই হয় জেনে রেখো সবাই,

আবারও বলি বাবা শুধু আমাদের মঙ্গল কামনায়। 


আমাদের পরিচয় যেমন বাবাকে জড়িয়ে আছে,

আমাদের নিয়েই যত স্বপ্ন ভাসে তাঁর চোখে। 

শত অভাব চেপে রেখে মিটিয়েছেন যত আবদার,

চিন্তায় চিন্তায় বিনিদ্রায় কত রাত কাটে বাবার। 


কাজের চাপে সব ভুলেও হাসি মুখে ফেরেন বাড়ি,

ভাবেন-'সন্তানদের সুখের জন্য যতই হোক কাজটি ভারী।' 

আমরা বাবার কষ্টের দিনগুলি যেন কখনও না ভুলি,

তাঁর আশীর্বাদ নিয়েই যেন কর্ম পথে এগিয়ে চলি।

কবিতা || মুখোশ || অভিজিৎ দত্ত

 মুখোশ 




অসৎ, নীতিবর্জিত মানুষজন 

আজও আছে সমাজে

আমাদের চারপাশে মুখোশ পরে

যখনই মুখোশ যায় সরে

আসল মুখগুলো বেরিয়ে পড়ে।


চারিদিকে শোষণ,বঞ্চনা,দূর্নীতি

প্রকৃত মানুষের খুবই অভাব 

প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছি।

গোড়াতেই গলদ আমাদের দেশে

শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি লেগেই আছে।


আমরা যদি হতাম আন্তরিক 

শিশুদের প্রকৃত মানুষ করতে

পাঠ্যপুস্তকগুলি সব তৈরী করতাম

নীত আর আদর্শ দিয়ে।


মহাপুরুষ,স্বাধীনতাসংগ্রামী

কে না জন্মেছে আমাদের দেশে

এদের জীবনকথা কেন

জানবেনা আমাদের শিক্ষাথী'রা

দেশ যাদের সংগ্রামে উজ্জ্বল হয়েছে।


আমরা যদি স্বাধীন হয়ে

নিজের দেশকে ভালো না করি

তবে মিথ্যে এই স্বাধীনতা

এ নিয়ে ভাবতে 

সকলকে অনুরোধ করি।

কবিতা || করবো নাকো বারণ || ফরমান সেখ

 করবো নাকো বারণ

        


বিশাল তোমার ঘর- দালানে
      কাটছে মহাসুখে,
ধুঁকছে আমার হৃদয় খানি
    করছে জ্বালা বুকে!

মনোনান্দে তোমার মুখে
   ফুটছে অমল হাসি,
আমার তখন গহীন হৃদে
  বাজছে দুঃখের বাঁশি!

পরীর মতো রাস্তা-ঘাটে     ঘুরছো যখন তুমি,
কাঁপছে আমার বুঁকের পাঁজর
    নড়ছে হৃদয় ভূমি।

সারাবেলা বাড়ির পাশে
    মাতছো যখন রণে,
কাঁটার মতন কঠিন জ্বালা
    বিঁধছে আমার মনে!

আমার মনে ব্যথা দিয়ে
     হও যদি গো সুখী,
করবো নাকো কোনো বারণ
       হই যদিও দুখী!