Monday, February 7, 2022

কবিতা || সরস্বতী পূজোর সেকাল ও একাল || নীতা কবি মুখার্জী

 সরস্বতী পূজোর সেকাল ও একাল




সরস্বতী ভারতী বিদ‍্যা দাও মা

জ্ঞান আর বুদ্ধিটা ঠিকঠাক রেখো মা

বাগদেবী নামে তোমায় সকলেই জানে যে

ছেলেবুড়ো, খোকাখুকু সক্বলে মানে যে

সরস্বতী পূজো মানে ছোটদের উদ‍্যোগ

সরস্বতী পূজো মানে চিঁড়ে-গুড় মাখা ভোগ।


ভোরবেলা উঠে পড়ে পূজো দিতে হবে যে

ইস্কুলে যেতে হবে, খিঁচুড়িটা খাবে যে

বাসন্তী শাড়ী পরে ফাংশানে গান গাই

সরস্বতী বন্দনা লিখে রেখো খাতাটায় ।


দিদিমনি শিখিয়েছেন নজরুল-গীতিটা

চলবে না ফ্লিম সং, মনে রেখো কথাটা

মনে পড়ে ছোটবেলা প্রেম-প্রেম খেলাটা

ছোট ছোট প্রেম চিঠি, আড্ডার বেলাটা।


সেইসব দিন ছিলো সরল আর সুন্দর

মাসতুতো-পিসতুতো ভাইবোনের কি কদর

হাসি-মজা গান গাওয়া সুন্দর সাবলীল

খুনসুটি, হুটোপুটি, হেসে ওঠা খিলখিল।


সেই সব দিন গুলো গেছে যেন হারিয়ে

ছন্দের গতিটাও গেছে যেন ঝিমিয়ে

এখন এসেছে এক যন্ত্র, যে বলিহারি

মোবাইলে টিপটপ ,হায়! প্রাণ ছাড়ি ছাড়ি।


নাহয় কানেতে গোঁজা তার-দুটো ঝুলছে

ধ‍্যান নেই কোনোদিকে, শুধু বসে ঢুলছে

এ কি বাবা! এ কেমন সরস্বতী পূজো রে

নির্ভেজাল আড্ডাটা সব গেল ভাঁড়ে রে!

কবিতা || তোমার ইতিহাস || নবকুমার

 তোমার ইতিহাস 

 


তুমি আমার দিকে যত কঠিন অস্ত্রই প্রয়োগ করো-
কম্পিত হবো না, বরং আরও প্রসারিত করবো বুক -

আস্তে আস্তে একদিন খালি হবে
সমস্ত অস্ত্রের ভাণ্ডার 
তখন তুমি নিজেই ধরাশায়ী --

'জল'-'জল' চিত্কার করলেও
স্রোত ঘুরিয়ে নেবে মুখ ।

এখানে অর্জুনও নেই 
পাতাল ফুঁড়ে এনে দেবে জল
আর,তুমি ভীষ্মও নও
এ ভাবেই এক আঁজলা জলের জন্য হাঁস-ফাঁস---

তখন দেখবে কেউ নেই পাশে--
পড়ে আছে মনুষ্যরক্তে লেখা 
তোমার ইতিহাস ।

কবিতা || নিঝুম রাতের কান্না || রথীন পার্থ মণ্ডল

 নিঝুম রাতের কান্না





হঠাৎ যখন ঘুম ভাঙে মাঝরাতে 

আলো জ্বালতেই দেখি হৃদয়ের গভীর থেকে 

পাখা সম্বলিত পিঁপড়েরা আলোর দিকে উড়ে যায়

যেখানে মৃত্যুর সাক্ষাৎ নিশ্চিত জানে, 

জেনে ইচ্ছে গুলো মরে যায়। 


বাথরুমের ট্যাপ থেকে জল ঝরবার শব্দ 

শুনি শুয়ে শুয়ে 

ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে যায় স্বপ্নগুলো !


বেওয়ারিশ কুকুর বিলাপে জানায় যত কষ্ট 

ট্রাকের চাকার নীচে পিষ্ট কবিতার ব্যাকুলতা

কাঁদে অসহায়, তবু জেগে থাকে বিদগ্ধ মন 

মুখ থুবড়ে নর্দমায় পড়ে অনুভূতি। 


মাঝরাতে প্রায়ই আমার ঘুম ভাঙে আজকাল।

কবিতা || শুধু একটা আধুলি || আব্দুস সাত্তার বিশ্বাস

 শুধু একটা আধুলি



আমি কে জানো

আমি একটা হকার

আমি গ্রাম, বাজার, শহর, পাড়া, ঘুরি

সাইকেলে চড়ে

প‍্যাডেল করে

মাল বেচে বেড়াই

হাঁক দিয়ে অলিগলি


আমার সাইকেলের পিছনে মাল বাঁধা থাকে

যাই তার কাছে যে ডাকে

দেখি না সে নর কি নারী, হিন্দু নাকি মুসলিম বা অন্য কোন জাতি

মাল বেচা বলে কথা আমার

রোজগার করা বলে কথা আমার

ওসব দেখলে যে চলবে না আমার

আমার পেটে যে প্রচুর খিদে, আমার খাবার চাই খালি


রোদে ঘুরে ঘুরে

শরীর যখন ক্লান্ত লাগে

ধপাস করে আমি বসে পড়ি, রাস্তার ধারে গাছতলায়


পথের ধুলো উড়ে এসে আমার গায়ে পড়ে

আমি নাক ধরি না, মুখ ঢাকি না

ওসব ভদ্রলোকদের কাজ, এসি রুমে যাঁদের বাস

আমি তো মানুষই না

আমি শালা একটা হকার

আমার দাম শুধু একটা আধুলি

কবিতা || পিঁড়ি পেতে দিক || রবীন বসু

 পিঁড়ি পেতে দিক





ফেরিঘাট স্তব্ধ আজ, পারাপার নেই


জলের বিস্তার শুধু নিয়মমাফিক


যাত্রীরা কোথায় যাবে? ঘুরপথে ঘুরবে কতক্ষণ?


নদীপাড় সমান্তরাল, তারা তো মেলে না কোথাও


সংযোগসেতু দিয়ে যদি যাওয়া যায়


পথিকের ক্লান্ত পা অবিরাম ঘোরে হয়তো


পুরনো শহর, বুঁজে যাওয়া নদী-খাল গঞ্জগ্রাম


পার হয়ে অন্বিষ্ট আশ্রয় খোঁজে;


রাতের আকাশ আর তারাদের নিচে এই যে


শব্দহীন নিস্তব্ধতা, আকুলিত উদ্দেশ্যহীন যাত্রা


সংযোগসেতু হারিয়ে হাঁসফাঁস করছে সম্পর্ক


তাকে হাত ধরে বসাবে কে? পিঁড়ি পেতে দিক সময়


জলবাতাসায় সাবেকি আপ্যায়নে ভরে উঠুক


গেরস্তের ঘরবাড়ি আর সুবিস্তৃত ফেরিঘাট-পাটাতন


শব্দময় শাশ্বত এক লৌকিক জ্যোৎস্নায় ভিজে যাক।

কবিতা || সরস্বতী পূজোয় || আশীষ কুন্ডু

 সরস্বতী পূজোয়




এবারে শনিবার সরস্বতী পুজো  

পূজোর আয়োজনে ব্যস্ত সবাই

শ্বেতগোলাপ খোঁজে বিদ্যাসুন্দর 

ছোটো মেয়েটার জন্য বাসন্তী শাড়ী

নেতার একমাত্র কন্যা! 


স্কুল খুলবে, শুক্রবার --

দেবী চরাচর ব্যাপ্ত,আকাশ নীলবসনা

মায়ের চোখে সেই ছায়া

আবার কচিকাচার মেলায় শুভ্রাবরণী !


মরমী গাঁয়ের মেঠো পথে এক বালক

নিঃস্ব হয়েছে সে অনলাইনের প্রকোপে

বাবা চলে গেছেন করোনায়

উদ্ভ্রান্ত মেঘে ঢাকা ব্যথাময় চোখ

জল শুকিয়েছে বহুদিন, 

এখন রোজগেরে মনরেগায়

সংসার জোয়াল তার কাঁধে!


বালকের মনের কথা মনেই থাকে 

সরস্বতী পূজোয় অভিমানী ছেলে

 পুষ্পাঞ্জলি দেবে না আর কোনদিন হয়তো 

দেবী বোধহয় জানেন!


ফাঁকা স্কুল ঘরে প্রতিমায় শেষ তুলির টান 

চোখ শুকোয় না মায়ের

ছেলের চোখের জল এখন মায়ের চোখে, 


জীবনের প্রথম বাসন্তী শাড়ী পড়া 

শিশুকন্যার জন্য

মাকে বুকে পাষাণ রেখে

পূজো নিতেই হবে।

কবিতা || হে ফাগুন || সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

 হে ফাগুন



হে ফাগুন, হে বসন্ত ফুলে ফুলে

   রেখেছো ভরে এইক্ষন

তুমি নাকি ক্ষণিকের ধন

   তবু যেন অনির্বচনীয়

    তালে তালে মৃদু সমীরণে

     এই ফাল্গুনে। 

তোমার সাধনায় তৃপ্ত এ ধরা

 এ মাটি এ আকাশ

      দখিনা পবন

ভূবন দুয়ার খোলা আজি তাই

   রঙে রঙে পলাশে শিমুলে

     মাতিয়ে অনুক্ষণ। 


মিলন মাধুর্যে প্রেমিক যুগল

    যেন ক্লান্তি হীন সরোবর

      সদাই গীত নির্ভর

       ছন্দে দোলা

         উচ্ছ্বাসে মর্মর। 

করে আরাধন--

   যেন শেষ নাহয়

     এইক্ষণ

 এই ফাগুন আগুন

   এ দখিনা পবন। 


দূর হতে দাও ভরে

     কুসুমের ডালি

স্বর্গীয় উচ্ছ্বাসে যেন

    যায় দুয়ার খুলি।

কবিতা || শরৎ কালটা || রানা জামান

 শরৎ কালটা


 


কুকুরের ফাল্গুনে পরিবেশ দুষিত হলেও


ওরা থোড়াই কেয়ার করে


কামড়া-কামড়ি শুরু মাদির দখল নিয়ে; শাদা


মেঘ আকাশে ছন্দ তুলে নাচে হাসে


কথা নেই বার্তা নেই মাঝে মাঝে


ঝপঝপিয়ে অঝোর ধারা নেমে সারমেয়


সঙ্গমে ঘটায় ব্যাঘাত; কাছে কাশবন


থাকলে নরোম স্পর্শে হুটোপুটি


দেয়; শরৎকাল ওদের ফুলশয্যার


আবেশ; সারাবছর ওরা


এরই প্রতীক্ষায় থাকে; অথচ মানুষ


ওদের ক্রিয়া করতে দেয় না শান্তিতে


মানুষ আরো ক্ষ্যাপা হয়ে যায়।


কবিতা || অভিনয় || দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

 অভিনয়



যত সব শেখা বৃত্তের কাছে,

বাইরে উল্টো ভেতর সব রঙিন ৷

বইগুলো যত সব পেঁজা তুলো ,

অর্থ গুলো সব মরিচিকা ধান ভাঙতে শীবের গীত ৷

মিথ্যে চুরি কপটতা এগুলো তো মহাপাপ নরকের ধাপ ৷

মহাপ্রসাদে ধুয়ে যায় মনপ্রাণ,

পাওয়া যায় নূতন সুখের সন্ধান |

অনুতাপ নেই কোথাও কোনোখানে

শুধু আদায়ের অধিকার চলে

বঞনার আড়ালে ৷

নির্মম অবিচার |

পাপ বলে কোনো শব্দ নেই এদের অভিধানে ,

শুধু কেড়ে নেওয়া পকেট কে রেখে ঢেকে ৷

নিয়ত চলে মুখোশের অভি নয়,

প্রবল পৌরুষ ছত্রে ছত্রে৷

অথচ

 সত্যের চোখে চোখ রাখাটাই

হল সত্যের পরিচয় ৷

এখানেই সকল মিথ্যা দম্ভের অবসান,

কিন্তু অনুশোচনার আগুনে পুডেও যায়না মিথ্যে দম্ভের অভিমান ৷

কবিতা || নিষ্ক্রিয় ফলাফল || সুব্রত মিত্র

 নিষ্ক্রিয় ফলাফল



অমরত্বের কথা ভেবে পালানোর কথা ভাবি

ভেবে চলি অনাবিল আনন্দের প্রদীপ্ত ছবি খানি

ছুটে যেতে হবে,আবার যেতে হবে না;

হই আনন্দিত বা হই যতই অভিমানী। 


সমুদ্র মন্থনে ভোরেদের ঢেউয়ে ভাসা পাখির ঠোঁটের খড়কুটো হবো

অশ্বত্থ গাছের পাতাখানি ঝরে যাবে আজ

মিটে যায় যদি আজ আমাদের সকল কাজ,

হাওয়ারা আর কথা শুনবেনা

আর কথা বলবেনা রোদ আর মরীচিকা,

মসৃন তৈলাক্ত রোদের শরীরে বনলতার মুখখানি ভেসে আসে;

ভেসে আসে তার গালের কালো তিল । 


সনাক্ত শৈশব প্রদীপ হয়ে জ্বলে

আত্মহারার মাঝে বিষাদের সুর ভ্রমণ;

তোমার যে সেই আমি

নই আজ একটুও দামি,

শুষ্ক আবহের মাঝে আমি যেন একটা মরা গাছ

তোমার প্রত্যাশার কাছে এই সরল সন্ধিক্ষণ এক নিষ্ক্রিয় ফলাফল।

কবিতা || নির্ঘুম রাত || সৌমেন্দ্র দত্ত ভৌমিক

 নির্ঘুম রাত





নির্ঘুম রাত্তিরে বাচাল স্বপ্নেরা বেড়ায় ঘুরে

       অবৈধ অশালীন চাবুক হাতে।

দুই রক্তচক্ষু দিয়ে ওদের ভষ্ম করতে চাইলেও


        সরে না ওরা এক পাও।


এ কোন্ সামন্ততান্ত্রিক নিয়মকানুন!


এ কোন অগোছালো হবু আগুন!


সাঁতরে সাঁতরে সাঁতরে পার হলেও রাত


অকথ্য অবাধ্য স্বপ্নদের হাতে আমার বিধিলিপি


             নিখুঁত সুচারু অঙ্কিত


জেনেবুঝে গুহার ভেতর রাস্তা দেখেই ভাবি


              ভীষণ ভীষণ শঙ্কিত।


মরণপণ সমরে গেঁড়ি গুগলী শামুকেরা


অতি চতুর, ধূর্ত, মুখর,


ওদের স্পর্শ এড়ানো খুব অসহজ-


কেননা নির্ঘুম রাত্তিরে বাচাল স্বপ্নেরা


           অনাবাসী দোসর।

কবিতা || প্ল্যানচেটে বুদ্ধি || অরবিন্দ সরকার

 প্ল্যানচেটে বুদ্ধি

         



বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে দেবীর আসনে সরস্বতী,

          জ্ঞান তার পেটে ভরা,

প্লানচেটে ইতিহাস স্থান কাল পাত্র বদল,

          মহীয়সীর চুরি করা।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সেক্সপিয়রের সখ্যতা,

             ধরাকে বদলে সরা,

ঋষি অরবিন্দর পন্ডিচেরীতে দেহত্যাগ,

           পরনে কৌপিন পরা।

আলিপুর জেলে তাঁরে ফাঁসির কাষ্ঠে,

           শহীদ, উক্তি মনগড়া,

তাঁর স্মৃতিতে মনুমেন্ট! কিসের বিজয়?

             শহীদ মিনার ছাড়া।

গান্ধীজির অনশন ভঙ্গ ফলের রসে,

            রবিঠাকুর দেন নাড়া,

লিক্ করা বুদ্ধি বেচে,রচে নব্য ইতিহাস,

            বাঙালীরা হতচ্ছাড়া।

সহজ পথ্য গলাধঃকরণে হজমি বড়ি,

            প্রতিবাদী ভাষা হারা,

বিরুদ্ধারণে নকশাল, হাততালিতে বহাল,

           উচ্চপদে হারু আত্মহারা।

কবিতা || বকুল-কথা || মহীতোষ গায়েন

 বকুল-কথা



বকুল ফুল বকুল ফুল প্রিয় বকুল ফুল

বকুল ফুল বকুল ফুল প্রাণ যে আকূল,

বকুল ফুল দেখতাম খোঁপায় রোজ রোজ

কেন আর বকুলের পাওয়া যায় না খোঁজ।


বকুল ফুল বকুল ফুল হৃদয় ভরা হাসি

সকাল থেকে সন্ধ্যা শুধুই ভালোবাসি,

বকুল ফুল বকুল ফুল মন বাগানের সুখ

পাই না দেখা আর সেই মিষ্টি হাসির মুখ।


বকুল ফুল বকুল ফুল আকাশ ভরা তারা

প্রেম বিহনে উদাসী যন থমকে গতিধারা,

বকুল ফুল বকুল ফুল হিংসা বিভেদ যাক

সুখ শান্তি স্বপ্ন সবাই আবার ফিরে পাক।