Sunday, August 1, 2021

সুদীপ ঘোষালের উপন্যাস (তৃতীয় পর্ব)

  ইউরেকা ইউরেনাস



(৩)

গোয়েন্দা সুমন আর তোতন মহাকাশযানে চেপে বসলো। গোয়েন্দা সুমন বললো আমাদের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ফেরত দিয়ে যাবেন তো?


সাইকো বলল, আমরা কথা ও কাজে সত্যতা রাখি। 


সাইকো বলল আমাদের প্রতিটি মিনিট খুব দরকারি তাই আমরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আপনাকে এখানে পৌঁছে দেবো কথা দিচ্ছি।


মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেল ইউরেনাস।প্রচুর অক্সিজেন।হাল্কা শরীর তোতন বলল। সুমন বললেন, এ জয়ফুল প্ল্যানেট ফর গ্রীন। 


 এত মহাকাশযানের গতি দেখে গোয়েন্দা সুমন অবাক। বলল আপনাদের এখানে এত নিশ্চুপ কেন। এত চুপচাপ সব কথা বলছে।


 সাইকো বলল আমাদের এখানে মানুষ বলি না। মানুষ তো নয় এদের অন্য নাম আছে।ভার্জিন প্লানেটেরিয়ান।


 এই গ্রহে বেশিরভাগ সময় রাতে ঘুমোতে হয় এবং ঘুমিয়ে থাকার ফলে এদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশ্রাম পায় এবং পরম আয়ু বাড়ে।


কিন্তু গোয়েন্দা সুমন বলল আপনারা কি করে এত উন্নত হলেন এই সামান্য ঘন্টা জেগে থেকে। সে বলল আমাদের প্রতিটা মিনিট হচ্ছে ঘন্টার সমান।

আমরা প্রত্যেকটা মুহূর্তকে সুন্দর কাজে ব্যয় করি।


গোয়েন্দা সুমন বললেন, এই রহস্য আমাকে একটু বিশ্লেষণ করুন বলুন।


তখন সাইকো বেকাস বলল প্রায় উনিশ লক্ষ বছর ধরে এই 12 ঘন্টা বাধ্যতামূলকভাবে এই গ্রহে শারীরবৃত্তীয় বিবর্তন ঘটেছে।

আমরা উপযোগী হয়ে উঠেছি এই গ্রহে। এটা লক্ষ্য করবার মতো আমাদের যেমন দিনের বেলায় খিদে পায়। রাতে সে অনুভব খিদে করে না।


অল্প বয়সে যারা আমাদের গ্রহের ঝটপট করে কিন্তু রাত্রে 12 ঘণ্টা ঘুমিয়ে না খেয়ে কাটিয়ে দেয় কি করে এটা সম্ভব হয় একমাত্র মানবদেহে অপেক্ষাকৃত অল্প পরিমাণে যার জন্য হয়।


গোয়েন্দা সুমন ঠিক ধরেছেন এই পয়েন্টটা বললেন আমাদের মানব শরীরে ঘ্রেলিন হরমোন নিঃসরণঘটে। এটা তো আপনাদের জীবনের সঙ্গে মানবজীবনকে মিলিয়ে দিচ্ছে। সাইকোভগাস বলল, অতএব নিশ্চিত হয়ে যান। আপনাদের পরমায়ু ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। তবে শর্ত হল সবুজ গ্রহ চাই।


 তাহলে এটা কিন্তু আপনাদের গ্রহের জীবের সঙ্গে আমাদের গ্রহের জীবের হরমোন একদম মিলে যাচ্ছে।


সাইকো বিকাশ বলল দীর্ঘকালীন হরমোন নিঃসৃত অপেক্ষাকৃত অল্প পরিমাণে যার জন্য দেহে ক্ষুদ্র উদ্যোগ সামান্য হয় অন্যদিকে ওই সময় ক্ষুদ্রতম নিঃসরিত হয় এই দুটি রাসায়নিক যৌগের সমানুতা নিয়ে বিব্রত হয় না মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে ঘুমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কেননা ঘুমের দৈর্ঘ্য যখন 8 ঘন্টা থেকে কমিয়ে 5 ঘন্টা না হয় তখন দেখা যায় ক্ষুদ্র ঋণের পরিমাণ শতকরা 15 ভাগ বেড়ে গেছে অন্যদিকে ক্ষুদ্র ঋণের পরিমাণ শতকরা 15 ভাগ কমে গেছে।


সাইকো বেকাস বলল এই শরীর দীর্ঘ ঘুমের উপযুক্ত হয়ে বিবর্তিত হয়েছে বর্তমান জিভে কাজের পরিমাণ বাড়ায় ঘুমের পরিমাণ কমে গেছে প্রতিদিন 12 ঘণ্টা ঘুম মনে হয় সর্বনিম্ন পরিমাণ এর থেকে কম হলে শরীর ও মনে নানা রকম বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় ভূমি মানুষের সঞ্জীবনী সুধা সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে কার্যকর শারিরীক ও মানুষিক বন্ধু শত দুঃখ ভরা রাত্রি যখন প্রয়াত হয় তখন রাতের ঘুম থাকে এক নতুন মানুষের পরিণত করে সকল আশা উদ্দীপনা নিয়ে নতুন করে জীবন সংগ্রামে।


বন্ধু সুমন বললো তাহলে এই ঘুমের পরিমাণ পৃথিবীর মানুষের বেড়ে গেলে তাদেরও পরমায়ু আপনাদের মত বেড়ে যাবে সাহস বললো নিশ্চয়ই বাড়বে এবং এটাই একমাত্র উপায় কিন্তু একটা শর্ত আছে শর্ত হলো সবুজ গ্রহ চাই সবুজ ছাড়া মানুষের মুক্তি নাই ।


তোতন বলল তাহলে আমরা শিখলাম মানুষের বার্ধক্য ত্বরান্বিত হয় দীর্ঘকাল ধরে নিবে করলে শরীরে কার্বোহাইড্রেট মেটাবলিজম সংক্রান্ত ব্যাহত হয় দেহ কোষের মধ্যে অক্সিডেশন বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ বাড়ে তার ফলে কোশপর্দার ডিএনএর ক্ষতি হয় বহু পরীক্ষার ফলে এটা আজ প্রমাণিত হয়েছে যারা 6-7 ঘন্টা ঘুমায় তারা 4-5 ঘন্টা ঘুমায় তাদের থেকে।


সাইকো বেকাস বলল আমি শুনে খুশি হলাম সুমনের সাহায্যকারী তথনও যে এত জ্ঞানী মানুষ তা দেখে আমার ভালো লাগলো আপনারা দীর্ঘজীবী হোন।


সাইকো বেকাস বলল শুধু ক্যান্সার নয় দীর্ঘ একটানা নিদ্রা ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়া আলসার মানসিক অবসাদ কাটাতে সাহায্য করে রাত্রে সুনিদ্রা দেহের ইমিউন সিস্টেমকে সতেজ করে ক্ষতিপূরণের সাহায্য করে আমাদের অজান্তে আমাদের সমস্ত পাকস্থলীর লাইন মেরামত করে রক্তে সংক্রমণ প্রতিহত করা উপযোগী কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং মেলানিনের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে এই মেলাটোনিন দেহে ক্যান্সার রোগ প্রতিহত করবার সময় উপযোগী একটি এন্টি-অক্সিডেন্ট যেসব নারীরা কাজকর্ম করে তাদের ঘুমের সময় বারবার পরিবর্তন ঘটলে তাদের স্তনে ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা 70 গুণ বেড়ে যায়।


গোয়েন্দা সুমন বলল আপনি মানুষ মানবদেহের শরীরে মানবদেহ সম্পর্কে এত কিছু জানলেন কি করে সাহস বলল ওই যে বললাম আমরা সারা মহাবিশ্বের সমস্ত খোঁজখবর আমাদের রাখি আমরা যখন তখন কম্পিউটারের 10000 কাজ করতে পারি।


গোয়েন্দা সুমন এই ধরনের জীব দেখে অবাক ইউরিনে শেষে ঘুরতে পেয়ে অবাক তদন্ত খুশিতে মগ্ন কি করে এবার ফিরে যাবে সেই নিয়ে তারা চিন্তায় মগ্ন আমাদের সেই বৃদ্ধ ব্যক্তি খুঁজে হয়তো বেরিয়ে পড়েছেন সারা গ্রামের লোকদের নিয়ে তখন সে বলল আপনি চিন্তা করবেন না কয়েক ঘন্টার মধ্যে আপনাদের পৃথিবীতে ফিরে আসব। 



গোয়েন্দা সুমন বলল, মানুষের শরীর আর আপনাদের শরীরের মধ্যে পার্থক্য গুলো কি কি একটু বলুন।


সাইকো ভেগাস বলল, মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষে 23 জোড়া ক্রোমোজোম থাকে।


 কিন্তু আমাদের গ্রহের জীবে কম করে 523 জোড়া ক্রোমোজোম থাকে।


এই মানুষের দেহে 23 জোড়া মধ্যে 22 জোড়া ক্রোমোজোম বাকি একজোড়া কে বলা হয় সেক্স ক্রোমোজোম।

কিন্তু আমাদের মধ্যে ক্রোমোজোমের সংখ্যা অনেক বেশি সংখ্যক থাকার ফলে উন্নত অতিউন্নত লক্ষণ প্রকাশিত হয়। 


ক্রমশ...

অভিজিৎ চৌধুরীর উপন্যাস (তৃতীয় পর্ব)

 মুকুট


(৩)

মা, আমি বাবা-রে দেখছি। ভ্যানে কইর‍্যা আসতাছে। 

তর বাবা মইর‍্যা গ্যাছে। অহন আর আইব না।

আমি মুখাগ্নি করছি- তাই না মা!

আঁচল দিয়ে চোখের জল মোছে কুসুম।

‘হ’ । একখান লঞ্চ আইতাছে।

মা, চাউল তো কেউ দেয় না।

কুসুম বলে- ঘরে ঘরে চাউলের অভাব নাই। রেশন কার্ড আছে।

আমাগো নাই!

নাই।

ক্যান মা!

একজন গঙ্গাসাগর যাত্রী কুসুমের আঁচলে সুগন্ধি চাল ঢেলে দেয়।

বাবু অর্থাৎ রাজেশের জিভে জল চলে আসে।

কতোদিন ভাত খাইনি তারা।

মা, ইন্ডিয়া আমাগো দ্যাশ না!

আমাগো দ্যাশ ‘বাংলাদেশ’। কুমিল্লা জিলা। 

এবার রাজেশ বলে,

হেই যে দাদুর কাছে যাইছিলাম- ওটা কোন দ্যাশ আছিল-মা!

হেইডাও ইন্ডিয়া।

পেট পুইর‍্যা খাইতাম পারতি- না রাজেশ!

যাবা ‘মা’ দাদুর কাছে!

টেঁয়া লাগব তো!

সেই দ্যাশটার নাম কি মা!

শুনছি বিহার।

বুড়া বাবা কইছিলেন- আইবা যহন মন পুড়বো- চইল্যা আইব্যা।

তর বাপ বাঁইচ্যা ছিল তহন। মাঝির কাম জানতো আর রান্নাও জানতো।

আমরা চইল্যা আইলাম ক্যান!

পুড়া কপাল। তুর বাপে সপন দেইখত। আমাগো বাড়ি হবে, পাকা দালান। মানুষটা নেশায় নেশায় মইর‍্যা গ্যালো।

‘মুকুট’ মিষ্টি করে ডাকলেন বাবা-মশাই। 

শুভ্র কেশের বৃদ্ধ মানুষটা অপরূপ দেখতে। গলার স্বরেও যেন জাদু-মাখা।

মুকুট প্রণাম করল।

তিনি বললেন- আমি তো সেই থেকে তোমার অপেক্ষায় আছি। মহাকাশ শিখবো তোমার কাছ থেকে।

মুকুট বলল- আমি তো তেমন কিছু জানি না।

বৃদ্ধ মানুষটি মুকুটকে অবাক করে দিয়ে বললেন- তুমি তো ফোটন কণা দেখতে পাও। পাও-না!

মুকুট অবাক হয়ে গেলো। সে তো ফিজিক্সের সেই টিচার ছাড়া কাউকে তেমন বলেনি।

এই সময় একজন এসে দাঁড়ালেন। বয়স প্রায় বৃদ্ধ মানুষটির সমান।

বৃদ্ধ বললেন- কেষ্ট-দা, মুকুটের অংকের ভয়টা আপনাকে কাটাতে হবে।

মুকুট স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করে বলল- আমি এবার অংকে ‘৮৫’ পেয়েছি।

বৃদ্ধ বললেন- ‘১০০’ নয় কেন! ‘একশ’ পাওয়া খুব সোজা।

মুকুট ভাবলো, বাপ-রে, এটা কি কোন স্কুল! তাহলে ছুটি তো গেল।

এবার সেই কেষ্ট-দা বললেন- কোন ক্লাসে পড়ো মুকুট!

এবার ‘নাইন’ হল।

অ্যালজেব্রা শুরু হল। অংক আরো সোজা হয়ে গেল।

ঋত্বিক আর দেবলীনা বৃদ্ধ মানুষটিকে প্রণাম করলে তিনি বললেন- কেমন আছো? কতোদিন পরে এলে! এতোদিনে মনে পড়ল।

ঋত্বিক, দেবলীনা মুকুটকে নিয়ে যেন খুব পরম আত্মীয়ের বাড়ি এসেছে।

এবার সেই কেষ্ট-দা বললেন – কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরেও একটা বিন্দু রয়েছে।

বৃদ্ধ বললেন- ঘনত্বের কারণে রয়েছে।

লাঙল, বলদগুলি দেখা যাচ্ছে। বৃদ্ধের হাতে কাদা লাগে রয়েছে। তিনি ইঁদারায় গিয়ে সেই কাদা জল দিয়ে ধুতে লাগলেন।

কাঁসার বাটিতে মোটা দানার মুড়ি আর নারকেল এলো। তার আগে দেবলীনা, ঋত্বিক, মুকুট হাত-পা ধুয়ে নিয়েছে। ঘরটা দেখে বেশ ভালো লাগল মুকুটের। জানলা, দরজা বড় বড়। প্রচুর আলো, হাওয়া।

চন্দ্রমল্লিকা রয়েছে সামনের উঠোনে। 

মুড়ি নারকেল খেতে খেতে ওরা প্রাঙ্গনে এলো। ইজি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে হুঁকো টানছিলেন বুড়ো-বাবা।

সেই কেষ্ট-দা বলে মানুষটাও কাছের একটা চেয়ারে বসেছিলেন। মুকুটের বাবা ঋত্বিক বললেন- এবার নাকি পাট চাষ করেছেন।

বৃদ্ধ হুঁকোটা নামিয়ে রেখে বললেন- এবারও মাঠে চাষ করতে যাবে তো!

ঋত্বিক বলল- আমার ভয় কেটে গেছে।

দেবলীনা লাল পাড়ের শাড়ি পরেছে।

বলল- বাবা-মশাই, ধানসেদ্ধ করতে যাবো! 

বৃদ্ধের মুখমণ্ডলে এক অপূর্ব হাসি খেলে গেল, তিনি লক্ষ্মী-মা আমার। এখন কিছু করতে হবে না।

দাদু-ভাই আসছে জেনে তরকারিতে ফুলকপি দিতে বলেছি। আর একটা ডালনা করতে বলেছি।

পাঁচফোড়ণ ছাড়া হয়েছে কড়াই-তে, চমৎকার গন্ধ নাকে এলো মুকুটের।

কেষ্ট-দার আসল নাম কথায় কথায় জানা গেলো। বিখ্যাত বিজ্ঞানী। মহাকাশ নিয়েই চর্চা করছিলেন, তারপর একদিন এখানে আসতেই আর ফিরলেন না। ভালোবেসে ফেললেন বাবা-মশাইকে।

একটা স্কুল আছে কাছে-ই। বৃদ্ধ সেখানে অনাথ বা গরীর ছেলেদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করেছেন। নাম রেখেছেন- ‘তপোবন’।

ঋত্বিকের দিকে তাকিয়ে বললেন বৃদ্ধ, ‘এক লহমায় কেষ্ট-দা বিজ্ঞানীর চাকরি ছেড়ে আমার সঙ্গে থাকতে শুরু করলেন’।

কেষ্ট-দা, কি ভালো লেগেছিল আমার!

কেষ্ট-দা হেসে বললেন- বিজ্ঞানের ফলিত রূপগুলি দেখতে পাওয়া আর মানুষের কল্যাণে তাকে ছড়িয়ে দেওয়া।

দেবলীনা বলল- বিশ্বজিৎ বাবুই ওঁকে স্টেশন থেকে নিয়ে এসেছিলেন!

কেষ্ট-দা হেসে বললেন- হ্যাঁ মা, ঠিক ধরেছ। মনের দিক থেকে পরিশ্রান্ত হয়ে যসিডি নেমেছিলাম।

পরদিন ভোরে কৃষিকাজে ঋত্বিক ও গেলো। ফিরে এসে তাবুতে বসলেন বুড়ো মানুষটা। এর আগে অনেক কিছু দেখতে পারেনি দেবলীনা আর ঋত্বিক। সেবার তারা এসেছিল দিগভ্রান্ত, দিশেহারা। আশ্রয়, খাওয়া-দাওয়া আর কিছু শ্রম-নির্ভর কাজ করেই তিনটে দিন কেটে গেছিল।

এবার তারা দেখল অনেকটা আশ্রমের মতোনই। তবে কোন প্রার্থনা, সাকার ঈশ্বর নেই। এখানে ঈশ্বর কাজ। ভিত্তি কৃষি।


ক্রমশ...

রামপ্রসাদ সরকারের একটি প্রবন্ধ

 হর্ষে বিষাদে স্মৃতিমেদুরতায় ভরা কলকাতা বইমেলা






বইমেলা মন ও আনন্দের উৎস। এটি আমাদের মনকে প্রসারিত করে; আমাদের জাতীয় জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। 

মানুষের ঞ্জানের ভাণ্ডারকে  সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপাদান হলো বই। এই প্রসঙ্গে পারস্য কবি ওমর খৈয়ামের একটি উক্তির কথা মনে পড়ে গেল। বই সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন—

“ রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে, কিন্তু একখানা বই অনন্ত যৌবনা যদি তেমন বই হয়”। 

করোনার করাল গ্রাসে তিন বছর ধরে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। আমরা পুস্তক প্রেমীরা হতাশ ও খুবই মনোকষ্টে রয়েছি। পুস্তক ব্যাবসায়ি, প্রকাশন সংস্থাগুলো হতাশা গ্রস্ত।কচিকাঁচার দল নতুন বই পাবার আনন্দ ও নতুন বইয়ের মন ভরিয়ে তোলার গন্ধ থেকে বঞ্চিত। 


কলকাতা বইমেলাকে আমরা কেউই ভুলতে পারিনা। আপামর বাঙালি মজ্জায় রক্তে রক্তে জড়িয়ে আছে। তাই তো বইমেলার সময় এলে অথবা কোনো অবসর মুহূর্তে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে, চোখ দুটি অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। স্মৃতির বীনায় বইমেলার সেইসব ফেলে আসা দিনগুলো ঝঙ্কার তোলে। 

      ||দুই||


কলকাতার প্রাণকেন্দ্রের ফুসফুস কলকাতা ময়দান আপামর বাঙালির কাছে স্মৃতিমেদুরতায় ভরা এক নস্টালজিয়ার প্রতীক। বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণ। চর্তুদশ পার্বণটি হল ‘কলকাতা বইমেলা’। কলকাতা বইমেলার একত্রিশ বছরের স্থায়ী ঠিকানা ছিল এই কলকাতা ময়দান। তারপর সে তার ঠিকানা বদলাতে বদলাতে ২০০৯-এ থিতু হয়ে বসে মিলন মেলা প্রাঙ্গণে। অবশেষে সল্টলেকে করুণাময়ীর সেন্ট্রাল পার্কে।

কলকাতা বইমেলা ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি পায়। তারপর বদলেছে তার অনেক কিছু। বদলায়নি শুধু চেনা-অচেনা বইয়ের গন্ধ। যা আজও মানুষকে মেলামুখি করে তোলে এক অমোঘ আকর্ষণে। আমিও এর ব‌্যতিক্রমী নই।

আজ বয়োপ্রান্তে এসে যখন আমার মননে জড়িয়ে থাকা বইমেলার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবি তখন নস্টালজিক হয়ে পড়ি।

বইমেলার শুরুতে প্রথম দিকের বেশ কয়েকটি বছর কর্মসূত্রে কলকাতার বাইরে থাকায় শত ইচ্ছে থাকলেও প্রতিবছর বইমেলায় আসতে পারিনি। ১৯৮০ সালে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাসের পর প্রতি বছর বইমেলায় গেছি। তখন টিকিট কেটে বইমেলায় ঢুকতে হত। টিকিট পাওয়া যেতো শিয়ালদহ ও হাওড়া স্টেশনের বিশেষ কাউন্টারে। আর মেট্রো স্টেশনগুলোয় বিশেষ করে পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশনে। কী বিরাট লাইন হতো। তাই প্রতিবারই আগেভাগে টিকিট কেটে রাখতাম। 

প্রথম প্রথম ছেলে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। তখন তাদের বাল‌্য ও কৈশোরের সন্ধিক্ষণ। বই পড়ে তারা জানতে চায় পৃথিবীটাকে, বাংলার সংস্কৃতিকে, সাহিত‌্যকে। তাই তাদের মনের খিদে মেটাতে তাদের মনোজগতের বই কিনে দিয়েছি বইমেলার স্টল থেকে— হয়তো বা নামী প্রকাশকের স্টলে ভিড়ের মধ‌্যে ঢুকে বা দীর্ঘ লাইন দিয়ে। বইগুলো হাতে নিয়ে তারা বইয়ের গন্ধ শুঁকে বইগুলো বুকে জড়িয়ে কেমন গর্বের হাসি হাসতো। তাদের সেই অনাবিল হাসি আজও আমার মানসপটে ভেসে ওঠে।

একটু বড় হতে তারা নিজেরাই বইমেলায় যাতায়াত শুরু করলো। আমি কিন্তু একা হয়ে পড়িনি। ততদিনে লেখালেখির সুবাদে বেশ কিছু পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে হৃদ‌্যতা গড়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে মেলায় ঘুরেছি, আড্ডা মেরেছি প্রচুর। একসময় ক্লান্ত হয়ে ময়দানের ফাঁকা জায়গায় বসে পড়েছি। ভ্রাম‌্যমান চা-ওয়ালার কাছ থেকে চা কিনে গলা ভিজিয়েছি, ঝালমুড়ি খেয়েছি। তখনকার দিনে আজকের মতো মেলার খাবারের স্টলের রমরমা ছিলনা।

আমাকে বেশি আকর্ষণ করতো লিটল ম‌্যাগাজিন প‌্যাভিলিয়ন। আমার পরিচিত বেশ কিছু লিটিল ম‌্যাগাজিনের সম্পাদকেরা এই প‌্যাভিলিয়নে তাদের পত্রিকা/বই সাজিয়ে বিক্রি করার সুযোগ পেতেন। তাদের টেলিব স্পেস ও চেয়ার দেওয়া হতো। পরিচিত সম্পাদকদের স্টল ঘিরে আমাদের আড্ডা বসতো। সাহিত‌্য নিয়ে আলোচনা করেছি, তর্কাতর্কি হয়েছে। আবার চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে যে যার পথ ধরেছি।

এই প্রসঙ্গে একজনের কথা খুবই মনে পড়ে। তিনি ছিলেন আমাদের মধ‌্যমণি পরম সুহৃদ ও হিতৈষী আমাদের লিটিল ম‌্যাগাজিন সম্পাদক সমিতির সম্পাদক নবকুমার শীল মহাশয়। সদা হাস‌্যোজ্জ্বল সুদীর্ঘ ও সুপুরুষ সাদামাটা নবদা (আমরা তাঁকে নবদা বলেই ডাকতাম) মেলা চলাকালীন লিটিল ম‌্যাগাজিন প‌্যাভিলিয়ন ঘুরে সবার সুবিধে অসুবিধের খোঁজ খবর নিতেন, প্রয়োজনে প্রতিকারের ব‌্যবস্থা করতেন। তাঁর আকস্মিক অকাল প্রয়াণে আমরা যারা লিটিল ম‌্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিলাম। তাঁর মৃত‌্যুর পর যতবার বইমেলায় গেছি তাঁর হাস‌্যোজ্জ্বল মুখ মানসপটে ভেসে উঠেছে।

১৯৮৩-র বইমেলা। সেদিনও সদলবলে গেছি। মেলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মেলার মূল মঞ্চে তখন বই প্রকাশ অনুষ্ঠান চলছে। মঞ্চে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের মধ‌্যে ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার কর্ণধার ও সম্পাদক অশোক কুমার সরকার মহাশয়। দর্শক ও শ্রোতার সংখ‌্যা নেহাত কম নয়। আমরাও উপস্থিত ছিলাম। বক্তৃতা মঞ্চে সংবাদপত্র জগতের কিংবদন্তি পুরুষ অশোক সরকার মঞ্চে উঠলেন, বক্তৃতা শুরু করলেন। মাঝপথে হঠাৎ ভারসাম‌্য হারিয়ে ডায়াসের ওপর লুটিয়ে পড়লেন। আমরা সবাই হতভম্ব। ডাক্তার ছুটে এলেন, অ‌্যাম্বুলেন্স এলো। ততক্ষণে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। শোকের ছায়া নেমে এলো মেলা প্রাঙ্গণ জুড়ে।

হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো মেলার বাতাস, ভারী মানুষের মন। নিঃশ্বাস নিতে সবারই কষ্ট হচ্ছিল। অশ্রু সজল চোখে আমরা মেলা প্রাঙ্গণ থেকে বিদায় নিলাম। মহীরুহ পতনের ছবি ও খবর পরের দিন সব সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে প্রকাশিত হলো। সংবাদপত্র জগত সত‌্যি একজন দরদী প্রকৃত সাংবাদিককে হারালো। 

৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭। সেদিন কোনো কারণে বইমেলায় যাওয়া হয়নি। সন্ধ‌্যে বেলায় টিভি-র পর্দায় দেখলাম বইমেলার একটা অংশ দাউদাউ করে জ্বলছে। মেলায় আগত মানুষজন দিকবিদিক জ্ঞান শূন‌্য হয়ে ছোটাছুটি করছে। দমকলের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। একজনের মৃত‌্যু ঘটে।

সেদিনের মতো মেলা পরিত‌্যক্ত হয়। আমরা বইমেলা প্রিয় মানুষ মুষড়ে পড়ি। টিভির পর্দায় বই জ্বলতে দেখে মনে হচ্ছিল যেন নিজের গায়েই আগুন লেগেছে। এমনই ছিল আমাদের বই প্রীতি।

তদানীন্তন তথ‌্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী (পরবর্তী কালে রাজ‌্যের মুখ‌্যমন্ত্রী) শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উদ‌্যোগে তিনদিনের মধ‌্যে মেলা আবার শুরু হয়।

মেলা চালু হয়ে গেলে দু’দিন পরে মেলা প্রাঙ্গণে ঘুরতে ঘুরতে পুড়ে যাওয়া অংশের ধ্বংস স্তূপের সামনে থেকে একটা পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া কয়েন কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। সেটি বেদনার স্মৃতি চিহ্ন হয়ে আজও আমার কাছে রাখা আছে। 

এখন আমি ‘দিনশেষের শেষ খেয়া’র অপেক্ষায় বসে আছি। তবুও বইমেলার আকর্ষণ আজও সমানভাবে অনুভব করি।

অবসর সময়ে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা যখন ভাবি, বইমেলা প্রাঙ্গণে কাটিয়ে আসা দিনগুলোর ছোট ছোট কোলাজ মনের ক‌্যানভাসে ভেসে ওঠে।

আমার স্বজনদের চোখ দিয়ে এখন আমি বইমেলা দেখি। আমার বই পড়ার নেশাকে, বই কেনার উচ্ছ্বাসকে তারা ব‌্যাগ ভর্তি করে এনে আমার মনোজগতে ছড়িয়ে দেয়। তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে আমার চোখে মুখে।



সুজিত রেজের একটি গদ্য

 টোকা



মাঝেমাঝে ঘরের জিনিসপত্তর একটু এদিক-ওদিক করি।


বিশেষ করে চালের টোকাটা এমন জায়গায় রাখি, যাতে আমার চোখে-চোখে থাকে।এবং জানালা দিয়ে চলনবিলের আলো এসে পড়ে।


টোকার ছিদ্রে বিশেষ ছন্দ আছে। গোধূলি আলোর সেই ছন্দে আমার এক চিলতে ঘর অপরূপ মায়াবী খেলায় অন্নপূর্ণার মন্দির হয়ে ওঠে।


আমি তখন অপলক যেমন ছোট্ট শিশু তাকিয়ে থাকে জাদুকরের রামধনু-পোশাকের দিকে।

নাচে ওই কালবোশেখি


সুমন সাহার একটি গদ্য

 বৃষ্টির দিনে রিক্সার খোঁজে―অফলাইনের দিনগুলোতে


এমন বৃষ্টি প্রায়ই আসে। চোখ বন্ধ করলেই দেখা মিলে যায়। গোপন― সবটাই। সেই বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার প্রাক্কালে ঘুরে আসা যাক―হাই স্কুল রোড়ের বৃষ্টিতে। যেখানে ভেজা-ভেজা স্মৃতি উস্কানি দেয়। আর ভিতর বাহির কেমন জানি 'আউলা' হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আউলা বানায় দেয় কেমন জানি। সেটা বলা যাচ্ছে না। তাই সেটাকে কোন ভাষার মধ্যে ফেলতে চাচ্ছি না ইচ্ছেকরেই। মনকে ১টা ঘোরে রাখা যাক।


   মনে পড়ে যায় শৈশব-কৈশোরের ইশকুল, মামা বাড়ি যাবার আনন্দ। আহা সেই বৃষ্টির দিন। বৃষ্টি ঝুম-ঝুম করে নাচতে নাচতে নামে―ভিজায়। মনে পড়ে যায় স্কুল-ড্রেস, ঘ্রাণ, সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা... বৃষ্টির ঘ্রাণ, গান। কোমল মনের কিশোর কিশোরীর কথা। চিঠি, চিঠির ভাঁজ, ভুল বানান, মুরুব্বি-স্থানীয়দের ধমক, অন্যান্য। এই মন কিছুতেই মানে না। বৃষ্টির রাত। তোমারে ৬০ সেকেন্ডের জন্যে হলেও দেখতে হবে। ছাতার ভাঁজ খুলে যায়। তোমাদের মহল্লা― রাত ৯/১০টা, ইশারা-ইঙ্গিতে জানালা ধীরে খুলে যায়। তুমি দাঁড়িয়ে। দেখা যাচ্ছে―আবছা নীল জানলার পর্দা, পিংক কালারের ড্রেসে তোমাকে। অনেক কাছে― অনেক দূরে । বৃষ্টি আর তোমারে দেখে, ভেতরে অনেক মেঘ জমিয়েই বাসায় ফিরে যাই। আধভেজা শরীর-মন ফিতা ঘুরায়ে গান শুনে। আর গানের মাঝে শুধু তোমারেই খুঁজে যাওয়া― খুঁজে পাওয়া। 

   

   ফোনালাপ অনুপস্থিত । কথা শেষ হয় না। মনে মনে চলতেই থাকে। মিনিট-ঘন্টা কোনদিকে যায়। চিঠি কাগজ বলেছিলো ' আমরা অনেক অনেক বর্ষাতে ভিজবো' ―ভিজতে পারি না। দুজন দু'দিকে হাঁটি...কই যাবো! বৃষ্টি নামলেই এই ভিজে যাওয়া শহরের রাস্তা, হলমোড়, সেই হাইস্কুলে রোড...!    

    আমিতো আর জানিনা বৃষ্টি নামলে কোথায় ভিজে তোমার হাতের আঙুল― তুমি এখন কোন শহরে থাকো?

শ্রাবণী মুখার্জীর একটি গল্প

    পরিণত

 


হালা রে হালা .... শালা আজব ভেলকি মাইরি ,এট্টু যে পেরেম কইরব তার যো পর্যন্ত নাই ।আজ বউ এর শরীর খারাপ ,পেশার বাইড়ছে ।তো কাল গাড়ি খারাপ গ্যারাযে দাও সারানর লাইগ্যে ।আর হালা ই দুটো খারাপ হইল্যে ই খাটন প্যাটের নাই ।বউ এর শরীর খারাপ হইল্যে রাঁধনা বন্দ গাড়ির শরীর খারাপ হইল্যে রাঁধনার আনাজ আনা বন্ধ ।লে উপাস দিয়া মর কেইনে। হালা আমার যে ক্যানে শরীর খারাপ হয় নাই কে জানে ? দিব্যি দুই তিনদিন ব্যশ আইরাম কইরা তাকিয়ায় ঠ্যাস দিইয়া চোক বন্দ কইরা শুইয়া শুইয়া স্বপন দেকতাইম । গলাপীরে একটু আইদর কইরতাম। চুকু চুকু.. ঈশ চুপ চুপ .. 


কি গো পরান খুড়ো... ? বিড়বিড় করে কি বকছো নিজের মনেই ?

আ্যাঁ কে কে ? আমি গো আমি তোমার সিধু ।

অ... তা তুই এইকেনে ক্যানে রে ? 

আইজ বুজি লেখক বাবু ফোন করছেন তরে ?

কিচু লতুন ল্যাকা দিবি নাকি ?

না গ খুড়া , আগের লেখা গুলো সাজিয়ে সজ্জিত করে পাঠিয়ে দেবো তিনি বললেই ।কিন্তু হঠাৎ লেখার কথা বললে কেন ???

না মানে তুই একেনে এই অবেলায় তাই জিগালুম আর কি হেঁহেঁ । পেকিতির মনরম দিশ্শ তে তর ত লেকা ভালো হয় ,মনটা ব্যশ ফুরফুইরে হইয়ে যায় ।লতুন লতুন উপমা যোগ কইরতে পারা যায় ..হেঁ হেঁ ..

অবাক বিস্ময়ে গালে হাত রেখে সিধু বললো বাব্বা খুড়ো সব জানো দেখছি , অনেক কিছু নতুন কথা শুনলাম তোমার মুখে কি ব্যাপার ? বলো দেকনি জলদি করে খুড়ি কি আজ কোনো ভালো রান্না করেছে নাকি ? তাই খুশিতে ডগমগ হয়ে কাব্য কথা বলতে পারলে ।

আরে না না না .. তর খুড়ির বেজায় শরীর খারাপ ছিল কাইল , আইজ আবার টো টো খান জবাব দিয়াচে সকালেই , এই ত তারে ও ডাকতার খানায় পুরে দিয়া আসচি ,গুচ্চেক টাকা খইসলো গ্যাঁইট থ্যাইকে আর খাবার ও জুটে নাই কালকের থ্যাইকে ।


হা হা হা হা হা হা , ও এবার বুঝলাম যে বর্তমান পরিস্থিতি তে তুমি এখন এইসব ভেবে মাথাটা খারাপ করে ফেলেছো তাই একাই নিজের মনে বিড়বিড় করছিলে । যাক গে চলি গো খুড়ো আমাকে একবার ডি আই অফিস যেতে হবে ।


হালা রে হালা .. গলাপীর নাইমটা শোনে নাই ত ছোকরা ? হালা কান ত লয় য্যান কুলা ।

যাই একবার গলাপীর বাড়ি থেকে ঘুইরে আসি যদি কিছু খেইতে পাওয়া যায় ,প্যাটে ছুঁচা ডন মারতাচে ।


অ এ অজগর আসছে তেড়ে , আ এ আমটি আমি খাবো পেড়ে .... দিদিমনির গলার স্বরে স্বরে শিশুরা ও সুর করে দুলে দুলে বলে যাচ্ছে । জনা পঞ্চাশ জন খুদে শিশু এখন তার সাথী । সকাল এগারোটা থেকে স্কুল চালান মিস বিশ্বাস । দুধে আলতা মেশানো গায়ের রং যেন গোলাপী আভা ঠিকরে বেরুচ্ছে , ছোটো বেলায় ঠাকুমা আদর করে তাই গোলাপী নাম রেখেছিলো । বাংলায় এম এ করার পর কোনো চাকরি পায় নি, ' স্কুল সার্ভিস কমিশন 'পরীক্ষায় একবার বসবার উপায় হয়েছিলো কিন্তু তার রেজাল্ট বার হয় নি আর পরের বার থেকে তো পরীক্ষাই বাতিল ।

পড়াশোনার সাথে সাথে গান ,নাচ ,ছবি আঁকা ,সেতার বাজানো সবেতেই সিদ্ধহস্ত ।

এই প্রাইমারী স্কুলে এখন তার বিশেষ পসার । একডাকে একটাই নাম সব শিক্ষক ও সব ক্লাসের ছাত্রছাত্রী দের মুখে মুখে ঘোরে তার বিনয়ী নম্র, ভদ্র ও সাংস্কৃতিক পরিষেবা মন্ডিত বলে ।



কয়েকটা পাখি মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলো, সূর্যদেব যেন চারধারে আগুন ঢেলে দিচ্ছে , উফ! কি গরম রে বাবা ,দুপুর বেলা যেন মাছ ভাজা করে দিচ্ছে সারা শরীর ।ঘড়িতে দেখলো দুটো বাজে ।আড়াই টা তে স্কুল ছুটি হবে গোলাপীর, দেখা তো হবে না গিয়ে কি হবে ?ভেবে রাস্তা বদল করলো পরাণ পাল ।


ঘরে ফিরে দাওয়াতেই ধপাস করে বসে পড়লো কই গ গিন্নি ? কোতায় গ্যালে ?

খেইতে দাও দিকি কিচু ,খুউব খিইদে প্যায়েচে ,নইলে ক্যঁইন্দে ফেইলব ইবার । হাতপাখা টা দাও ,উফ! বড্ড গরম পইড়েছে ,মাথার চাঁদি যেন ফাইট্যে যাইচ্চে ।

   ' কুয়ার পাইড়ে বালতি তে জল রাকা আছে তুমি এক্কেরে সিনান কইরা আইস ,আমি ভাত দিচ্চি ' বলে হেমাঙ্গিনী গামছা টা এনে সামনে নামিয়ে দিলো ।

মুখোমুখি দুইজনে খেতে বসে হেম বললো ' জানো আজ না মিত্তির বাড়িতে পুন্নিমা পুজা হবে , আমাকে যেইতে বইলেচে , আমি সন্দ্যা বেলা যাব ' , তুমার গাড়িখান কই ?

আর বইলো না গিন্নি সে ব্যটাও বিইগড়েচে , তাকেও দিইলেম নার্সিংহইমে ভরতি করায়ে ।এখন সিলাইন চইলচে ।হাঁইটে হাঁইটে পা গুলান ব্যতা কইরচে গ ।

মুখ টিপে হেম হাসি লুকাবার চেষ্টা করলো , মুখে বললো ' তা কবে ছুটি দিইবেক তারে ' ?

আমাদের সংসারে এই তিনজন বইত কেউ নাই ,সে না থাইকলে বুকটা হাপর হাপর করে ।

পরাণ হেসে বললো চিইন্তা কইরা না গিন্নি তেইমন গুইরোতর কিচু হয় নাই বুজলে, কাইল ঠিক হইয়ে যাইবা আইশা আচে ।


 মিত্তির বাড়ি থেইক্যে ফিরতে দেরি হইব বইলেচে হেমা তাইলে এই ফাঁইক্যে একবার গলাপীদের বাড়ি পানে ঢুঁ মাইরা আসি ,একটা বই হাতে বেরিয়ে গেলো সোজা রাস্তায় । গলাপী বই খুউব ভালোবাসে , একটা ত কিচু ছুঁতো চাই দেখা করার ।

' কই গ বিশবাস বাবু ' ? 'ঘরে আচেন নাকি ' ?

কে ? বলে সদর দরজায় এসে দেখেন ধুপধুরস্ত ধপধপে সাদা ধুতি ও গিলে করা পাঞ্জাবি গায়ে, পায়ে রংওটা পাম্পশু পরে দাঁড়িয়ে পরাণ খুড়ো ।

আরে পরাণ বাবু যে .... আসুন আসুন  

তো কি মনে করে ? এতো সাজগোজ করে কোথাও যাবেন নাকি ? বিয়েবাড়ি আছে বোধহয় ?

হেঁ হেঁ .. না না .. বিয়েবাড়ি নেই ,আসলে ভাইলো ড্রেরেস ত পইরা হয় না তেমন ,তাই আর কি ..........

ও আচ্ছা বেশ বেশ , আসুন ভেতরে আসুন ।

গোলাপী... তোর মা কে চা দিতে বল ।


নীল শাড়ি তে গোলাপীর রূপ যেন হঠাৎ করে চমকে দিলো পরাণের বুক ।উছলে উঠলো কামনার তেজ ।

বহুকষ্টে নিজেকে সংযত করে 'হেঁ হেঁ আপনার মাইয়া কে একখান মাইনুষের মত মাইনুষ করেচেন বটে বিশবাস মশায় ' । 'হেন গুন নাই যে নাই '।

আপনাদের সবার আশীর্বাদ পরাণদা , আমি কি করেছি বলুন ,সবই ঈশ্বরের দান ।

ভালো পাত্রের সন্ধান পেলে বলবেন , না মানে আপনি তো বহু জায়গা ঘোরেন ,অনেক লোকের সাথে যোগাযোগ আছে , তারপর তো শুনছি নাকি রাজনীতি তে সুর চড়িয়েছেন ।তাই বললাম আর কি ।

মহুর্তের মধ্যে মুখটা পাংশু হয়ে গেলো পরাণের । হৃদস্পন্দন বেড়ে যতো জোরে জোরে ধাক্কা মারছিলো হৃদয়ে হঠাৎ যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো , তার কি তবে হার্টআটাক না কি বলে সেটা হলো ? নিজের হাতটা একবার মুখে গায়ে বুলিয়ে নিলো ,হাতের কব্জিটা টিপে ধরে নাড়িটা দেখলো টিকটিক করে চলছে কিনা ।

তারপর বললো হেঁ হেঁ ... এতো তাড়া কিসের বিশবাস বাবু ? আপনার মাইয়ার বয়স পেরিয়ে যাই নাই ত । এমন লক্কিমন্ত মাইয়া যতদিন আচে আপনার সইংসারে ততদিনই লাব বুজলেন কিনা । বলেই আড়চোখে একবার গোলাপী র চলে যাওয়াটা দেখে নিল ।আহা অপূর্ব রূপ ! যেন সগ্গের অইপসরা আইসেচে মাইটিতে নাইম্যা । 

বলি অ গলাপী তুমার লাইগ্যা একখান বই আইনেচিলাম যে 'কপলকুন্ডুলা ' খুউব ভালো বই পড়লে ভালো লাগবে লইয়া যাও দেকি ,

বলে হাঁক পাড়লেন পরাণ খুড়ো ।


গোলাপী আবার এলো যেন প্রজাপতি এসে বসলো তার হাতে , একদৃষ্টে তাকায় রইলো গোলাপীর মুখের পানে ।কখন যে গোলাপী চলে গেছে বই নিয়ে তার হুঁশ নেই ।ওমা ঠাকুরপো .. আপনার চা যে ঠান্ডা জল হয়ে গেলো খান ..আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এসে বিথীকা বললো ।

 হ বৌঠান এই যে ......


সারা রাস্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলো গলাপীর বাপের কথাগুলো । হালা রে হালা.. গোলাপীর বিয়ে দিয়ে দিলে তার কি হবে ? বইল্যে দিব গলাপীর বাপ রে যে ' 'আমি তারে বিয়া করুম, আমার ঘরের রানী করে রাইখব '

 না বাবা চারিদিকে ঢি ঢি পইড়ে যাবে ,হেমা আমার বউ টা দিনরাইত খাটে আমার জন্য , আঠার বইছর বিয়া হইচে কোল উহার খালি আজও । মনমরা হয়ে যায় দিনরাইত । এখন আবার যদি ঘরে সতীন আনি তো বেচারা মইরেই যাবে । সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরেই দেখলো হেমা রান্না করছে , কোনো কথা না বলে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে দিলো ।

  রাতে খাওয়ার অনিচ্ছা সত্বেও বসে খাবারগুলো নাড়াচাড়া করতে দেখে হেমা বললো কি হইয়েচে তুমার ? কোখন থেইক্যে দেকচি কেমন গুইম হইয়ে আচো ,বলো কি হইয়েচে ?শরীর খান ঠিইক আইচে তো ? দেকি ..কপালে হাত বাড়িয়ে দেখে বললো 'না জ্বইর তো আইসে নাই তাইলে কি ? আমাকে বল ' ।

 ব্যবসার কতা ভাবছিলম আর কিচু না বলেই পরাণ উঠে গেলো ।

রোজ একবার করে গোলাপী কে না দেখলে পরাণ থাকতে পারে না , মনটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে , সব শূন্য লাগে ,সারা পৃথিবী জনমানবহীন , অনর্থক কাজের চাপ দিশাহারা করে দেয় , অথচ যাকে ঘিরে এই রকম হয় সে হয়ত জানেই না । দুর থেকে হলেও একবার অন্তত দেখবেই ।



পড়ন্ত বিকেলে দুটো কোকিল পালা করে ডেকে চলেছে দেখে তার ও মুখ কু উ উ ডেকে উঠলো ,না না 'কু' বইলবো না সু উ উ বইলব , আজ গলাপীরে দেইখ্যে কেমনতর মউনমরা লাগল ক্যান? কিচু কি হইয়েচে ?

জিগানোর ত উপাই নাই অনেকদুর থেইক্যে দেইখলাম ত , ঠিইক আচে কাইল সরাসরি উয়াদের বাইড়ি যাইব , আইজকের রোজগার বেইশ ভালো হইয়েচে তাই প্রফুল্ল মনে সিটি বাজাতে বাজাতে ঘরে ঢুকেতেই হেমা বললো " কুথায় থাইক্য বইলত "? 

ক্যান কি হইয়েচে ? 

আরে গইটা পাড়া জুইড়ে সবাই দেকতে গেল আমি ই গেইলাম না , কখন তুমি ফিরবা হেই ভাব্ব্যা। 

আরে হইচে টা কি সেইটা ত কউ ?

ওই যে পস্টঅপিসের পাশে বিইশাস বাবু থাইকে তার হাটঅাটাক হইয়েচে পরশু , আজ খুব বাড়াবাড়ি মনে হয় বাইচবেন না । 

গাড়ির টায়ার কানের উপর ফেটে গেলে যেমন বিকট শব্দ হয় তারপর কানে শুধু ভোঁ ভোঁ করতে থাকে আর কিছু শোনা যায় না, তেমনি অবস্হায় পরাণ নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল ভাষাহীন । 

হেমা বলেই চললো ' আইজ একবছর হইল কি একটা বুকের ব্যামো হইয়েচে , একবার নাকি ভেলর না কুথায় চিকিৎসা ও করিয়েছে ।

সত্যিই ত শুদু গলাপীরে একবার চোকের দেখা দেইখ্যে ই আমার শান্তি তার আর কুনো খবর ত রাইখ্যি নাই .. মনে মনে অনুতপ্তের আগুন জ্বলে উঠলো পরানের ।

"আইজ যেইমন কইরেই হোক হসপিটালে বিশবাস বাবু কে দেকতে যাইব " বলেই জোরসে টোটোতে স্টার্ট দিলো, হসপিটালে যখন পৌঁছালো তখন সব শেষ ।


দাহ কার্য সম্পন্ন করে ওদের বাড়িতে এখন শুধু গোলাপী, ওর মা ,পরাণ আর হেমা । মেঝেতে একটা পিন পড়লেও শব্দ কানে লাগবে এমন নিস্তব্ধ নিঝুম ।

গোলাপী আভা মলিন হয়ে গেছে যেন এই কয়দিনেই , ওর মা ফ্যাকাশে মুখে শূন্য দৃষ্টিতে কোন দিকে যে তাকিয়ে আছে বোঝা যায় না ।

তবু সাহসে ভর করে বললো হেমা ' চিইনতা করেন না দিদি , যা ক্ষতি হইয়েচে সে পুরনের খেমতা কারুর নাই তবু আমারা আছি ত ,আপনাদের যখন যা দরকার বলবেন আমরা সবাই কমবেশী পাশে থাইকব ।

গলাপীর বাপ যে সম্বন্ধ টার কথা পেরাই পাকা কইরে গেচে সেটার দায় আমার বর নিবে গ ,তুমি ভাইব্যো না ' ।

কথাটা শুনেই আরো একটা ঝটকা লাগলো পরাণের বুকে , কয় কি ? গলাপীর বিয়ার সম্বন্ধ পাকা ?


কুথায় ? কাইর সইঙ্গে ? কবে হইল ?

এসব ভাইব্যার সময় একন লয় মনে পড়ত্ই চল রে হেমা, ইবার আমরা যাই ।বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে হেমাও অনুসরণ করলো ।

শ্রাদ্ধ শান্তি সব কিছু ভালো ভাবে মিটে গেছে , গোলাপী ও তার স্কুলে আসছে আজ দুদিন তাই হেমা আর ও বাড়িতে গেলো না ,পরাণের হাতে একটা রঙীন বাক্স দিয়ে বললো আইজ তুমি একলাই যাও গলাপীদের ঘর, ইটাতে একটা ভালো শাড়ি আচে কাল যখন পাত্তের ঘর থেইক্যে আশীব্বাদ কইরতে আসবে তখন যেন এই শাড়িখান পরে ..গলাপীর মারে কইয়ে দিও ।

'কাইল আশীব্বাদে পইরবে আমাদের উপহার ' কথাটা মন থেকে মেনে নিতে না পারলেও মুখে কিছু না বলে পরাণ প্যাকেট টা নিয়ে বেরিয়ে গেলো ।


যথা সময়ে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে গোলাপীর সিঁথি সিন্দূরে রাঙালো বিবেক । মা বাবার একমাত্র ছেলে ইন্দাস ব্লকের প্রধান আধিকারিক , দেখতে খুব সুন্দর । লাল বেনারসী ,লাল সিন্দূর পরে যখন গোলাপী পরাণের সামনে এলো প্রণাম করতে বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে গেলো , তবু নিজেকে সংযত রেখে হাত বাড়িয়ে গোলাপী কে প্রণাম করতে আটকে দিলো --"তুমি আমার অতি প্রিয় , খুব কাইছের জন ,আমার জাত নীচু তুমি আমারে পেন্নাম কইরলে পাতক হইব যে " ।

এতোদিন পর গোলাপী পরাণের চোখে চোখ রেখে একটা প্রশ্ন করলো " আপনি মনে মনে আমাকে ভালোবাসতেন , তাহলে আমার বিয়ের সমস্ত আয়োজন নিজের হাতে ,নিজের টাকায় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কেন করলেন "? 

এখন পরানের চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো, আর গোলাপীরে দেকতে পাচ্চি না , মুখে যেন হাজার চাবি তালা ঝুইলে গেল কুনো কতা বাইর হচ্ছে না, মাইয়্যারা সইব বুজতে পারে ?

শুধু একটুক্ষণ ইতস্ততঃ করে দুরে সরে গেলো পরাণ। 


কনকাঞ্জলি দিয়ে গাড়িতে যখন বসলো নববধূ সাজে স্বামীর পাশে তখন গাড়ির সামনে হাজির হলো পরাণ ।গোলাপীর হাতে একটা রঙীন খাম দিয়ে বললো এতে জীবনের বাস্তবায়ন খুইজে পাইবে তুমি ।মন দিয়ে সংসার করো । গোলাপী রাস্তায় যেতে যেতেই খাম খুলতেই একটি চিঠি বের হলো । হাতে নিয়ে খুলে দেখলো লেখা আছে ---- , ভালোবাইসার অনেক রূপ ভালোবাইসার ফসল খুব মিষ্টি , স্বার্থান্বেষী মানুষরা বুইজবে না ,বাকীরা বুজে ...........ভাইলো থাইক্য।। 



গোবিন্দ ব্যানার্জীর একটি গল্প

 দুলে চলে অবিশ্রাম


রোজদিন ঠিকঠিক সন্ধ্যা আসেনা। যেমন ছাদতারারা দুলতে দুলতে নেমে এলেই কান্না আগলে থাকে বুক, তেমনি... মাঝেমাঝে ডাক শোনা যায়...

তখন হাওয়ারা এসে বসে থাকে আলস্যে। একটা সুদূর বিমান কেবল চেয়ে থাকে যাত্রীর অপেক্ষায়। এই সময়গুলোর উপর একটা সুরের আচ্ছাদন উড়ে বেড়ায়... অথচ গানটা কিছুতেই শরীর মেলে দিতে চায়না। অস্পষ্ট ছোটোবেলার মত দু'একটা শব্দ ঝিলকিয়ে ওঠে... 


প্রতিটা দিনের গায়ে এখন হাত বুলোই রোজ। যাদের ছুঁয়ে দিতে পারিনি বলে পায়াচারি করি, লিখে রাখি হারিয়ে যাওয়া চেহারার বিবরণ... কোনোকোনো দিন 

তাদের সাথে দেখা করতে যাই চেনা রাস্তাগুলোকে ছেড়ে। নতুন ক'রে মাটির গন্ধ পাই। শিকড়গুলো এঁকে রাখি চোখের ফাঁকা জায়গায়...


ভোর ভোর আলোয় কবে যেন উড়ে গেছে পাহাড়ী দোয়েলের ঝাঁক। দিনটার গায়ে দাগ দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। পোশাকগুলোর মনে থাকে সব। যখন ভুলগুলো লুকিয়ে রাখতে যাই... এক একটা দিন এমন বাচালতা দেখায়...বাহাদুর...


গুছিয়ে তুলে রাখতে গিয়ে দেখি... ফুরিয়ে যাচ্ছে

সঞ্চয়। মূকাভিনয় শেষ হয়ে আসছে... তাও... বসে

আছি সবগুলো দর্শকাসন জাপটে ধ'রে। আলো ফেলে ফেলে কারা খুঁজে চলেছে বিফল চরিত্রগুলো।

লাইটম্যান... আমি এখানে... অভিনয় এখনও শেষ হয়নি... প্রম্পটার ঘুমিয়ে পড়লেই আমি মঞ্চের আলো নিভিয়ে দেবো...

স্বপ্না বনিকের একটি গল্প

 স্বার্থপর পৃথিবী


বাবাকে দাহ করে শশ্মান থেকে ফেরার পথে মিতালী ভাবলো এবার সে কি করবে? বাবার পেনসনের টাকা কটাতেই ওদের সংসার চলতো। মিতালীও দুটো বাচ্চাকে পড়াতো। ওর হাতখরচটা উঠে আসতো। একা নিঃসঙ্গ তরুণী মেয়ে বাড়িতে কি করে থাকবে? এবার বাবাও চলে গেল, Family Pension তো আরও কমে যাবে। মিতালী আর ভাবতে পারছেনা।

পাশের বাড়ির কাকিমা-জেঠিমারা ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কিন্তু রাত হলেই তো যে যার বাড়ি চলে যাবে। রাত্রিতে কি করে থাকবে মিতালী? দু’চোখ ভরে নেমে আসে অশ্রুর বন‌্যা। সবাই মিলে মিতালীর বাবার শ্রাদ্ধ সমাধা করে দিলো। মিতালীর এক মামা বর্ধমান থাকে। ছোটবেলায় মিতালীকে খুব ভালবাসতো। এই দুঃসময়ে মামার কথা মনে পড়লো, অনেক চেষ্টা করে মামার ফোন নং জোগাড় করে মামাকে ফোন করলো। কিন্তু মামা কোন আগ্রহ দেখাল না। দশ দিনের মাথা মিতালী মামার কাছ থেকে ৫০০ টাকার Money Order অর্ডার পেলো।

অনেক ভেবে মিতালী বর্ধমান যাওয়া ঠিক করলো কিন্তু সেখানে পৌঁছে মিতালী অবাক হয়ে গেল। মামী ওকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। মামাতো বোন রিন্ধি ওর বাবাকে বললো— ‘কাজের এই মেয়েটাকে কোথা থেকে আনলে বাবা? ভালোই হয়েছে, মায়ের খাটুনী কিছুটা কমবে।’ মিতালীর বাবা আজ নেই বলে ওকে এখানে আসতে হলো। মামা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো— ‘ও তো মিনিদির মেয়ে। ওর বাবা মারা গেছে, তাই এখানে থাকতে এসেছে।’ মিতালীর চোখ জলে ঝাপসা হয়ে এলো। মামার বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তার ধারে একটা পাথরের ওপর বসে পড়লো। এখন মিতালী কি করবে? কোথায় যাবে? ও কি আত্মহননের পথ বেছে নেবে? কে দেবে এর উত্তর?




অঞ্জলি দে নন্দীর একটি গল্প

 চেনা এক বৈজ্ঞানিকের বংশ পরিচয়



দু ভাই। দুজনের দুটি বিরাট ব্যবসা। বিশাল এক তিনতলা বাড়ি। বড় ভায়ের বউ খুব ধনীর কন্যা ছিল। খুব ভালো গান গাইতে পারত। এর চার ছেলে। খুব সুন্দর দেখতে। লেখাপড়ায়ও খুব ভালো। বিয়ে পাশ করে বড়টি বাবার ব্যবসায় বসে। পরে বিয়েও হয়। মেজোটি বি. এস. সি. পাস করে সরকারী চাকরী করে। বিয়ে করে বউকে নিয়ে কর্মস্থলে ভাড়া বাড়ীতে বউকে নিয়ে থাকে। বাবার বাড়ি থেকে অনেক দূরে, তাই মাঝে মধ্যে বাবার বাড়ি আসে। সেজোটি মেজোর বাড়ি থেকে এম. এস. সি. পড়তে পড়তে মেজো দাদার সঙ্গে ঝগড়া হয় আর তখন গলায় দড়ি দিয়ে মরে। ছোট ছেলেটি বাবার বাড়ির কাছেই নিজস্ব ব্যবসা করে। বিয়ে করে বাবার বাড়ির কাছেই বউকে নিয়ে আলাদা থাকে। তবে বাবার পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে। ছোট ভায়ের বউ গরীব পরিবারের মেয়ে ছিল। এর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েটি নার্ভের রোগী। এবনর্মাল। ছেলেটি আঁকা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাস। আর একটি প্রকাশকের অধীনে আঁকার শিল্পী হিসেবে কাজ করে। বাড়িতে থাকে না। কর্মস্থলে বউকে নিয়ে থাকে। বাবার বাড়ি থেকে বহু দূরে। মেয়েটিকে নিয়ে মা ও বাবা খুব দুঃখী। অপ্রকৃতিস্থ তো। এই মহিলার সঙ্গে তার বড় ভাসুরের অবৈধ সম্পর্ক। তাই বড় জা - এর সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করে। ভাসুরও তো ওরই। বর গো বেচারা। না পারে বড় দাদাকে কিছু বলতে, না পারে নিজের স্ত্রীকে কিছু বলতে। চোখের সামনে স্বামীর সঙ্গে ছোট জা-এর দৈহিক মিলনের দৃশ্য দেখে দেখে দেখে ও পাগলিনী হল। তবে দেওর সহ্য করেও পাগল হয়ে যায় নি। সে ও তো পত্নীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক রেখেছে। বৌটি ভাসুর ও পতি দুজনকেই তৃপ্ত করে। বড় জা পাগলিনী হয়ে রাস্তায় ভিক্ষা করে খায়। রাস্তায়ই শোয়। এদিকে দুশ্চরিত্রা ঠাকুমার এক নাতী হল। বাবা তো নিজের হাতে তাকে আঁকা শেখায়। মা খুব ঠাকুর ভক্ত। শাশুড়ি এতো খারাপ চরিত্রের তবুও কখনও তার মুখে একটিও কুকথা বের হয় না। ছেলেও তার মাকে কিছুই বলে না। আসলে ওরা তো কেউই আর এক সংসারে থাকে না। দূরেই যখন থাকে তখন আর দরকার কি ওসব কথায় থাকার। নাতীটি পড়ালেখাতে খুব ভালো। ফিজিক্সে এম. এস. সি. পাস করে সে রাশিয়ায় গবেষণা করে। পি. এইচ. ডি. করার পর ও বিয়ে করল। এরপর পোষ্ট ডক্টরেট করল। তারপর সায়েন্টিস্ট হল। 

অমিত পালের একটি কবিতা

 আন্দোলন চলুক

                            


তোরা তো মরেই আছিস, সবকিছুর আড়ালে

মৃত মন আর জীবিত শরীর---- ব্যস এটুকু!

এর থেকে ভালো হাঁড়ি কাঠে গলা দেওয়া৷


চুপ করে থাকা মৃত প্রায় নপুংসক----

তোদের মরতে ভয় কীসের?

রাস্তায় নাম৷ পুরাতন বিষ উপড়ে ফেল৷

রক্ত ঝড়ুক তোর,

বুঝবি তোর পিছনের সারিটা অসীম৷


ভেঙে ফেল বেকারত্ব৷ গিলতে দিস না ওদের৷

ঘুমন্ত শিশুরাও জেগে ওঠে----

সেই মত জেগে ওঠ৷ চিৎকার কর৷

শুধু দেখিস আন্দোলন স্তব্ধ না হয়।       

স্বাগতা দাশগুপ্তর একটি কবিতা

 অতীত


অতীত শুধুই অতীত হলে

মধুর স্মৃতি কোথায় পেতিস!

বর্তমানের পানসি চড়ে 

অভিজ্ঞতার বৈঠা ফেলিস!

জীবন স্রোতে বিপদ আপদ 

সাবধানে যে কাটিয়ে চলিস

সে সব সময় অতীত এসে

দেখায় সঠিক পথের হদিস।

অতীত শেখায় চলতে

ক্ষমার আলোয় সকল বিবাদ ভুলতে।

বর্তমানই হয় যে অতীত, একটি পলক পড়লে পরে 

ভবিষ্যৎ দাঁড়ায় হেসে বর্তমানের সাজটি ধরে।

ইউসুফ মোল্লার একটি কবিতা

 স্মৃতি


চুড়ুইপাখি থাকতো চিলেকোঠার ফোকরে।

আজ আর চিলেকোঠার ফোকর নেই,

এসি-র শীতল হাওয়া বেরিয়ে যাওয়ার ভয়ে!

তাই চুড়ুইপাখির কুড়িয়ে আনা খড়কুটো দেখি না,

যেভাবে দেখি না তোমার কেশের বাহার।

গাঁদাফুলের আর বাগান করি না,

তোমার মাথায় গোঁজা হয় না বলে।

 শিশুদের আর ছোটাছুটি কোলাকুলি দেখি না,

বৃষ্টির দিনে মাঠের মাঝে ফুটবল নিয়ে।

সব শিশু বাড়ি ফেরে, পড়ে থাকে শূন্য মাঠ।

কাদাখোঁচা পাখি খাবার খোঁজে;বিফল হয়ে বাড়ি ফেরে,

যেভাবে আমিও খুঁজেছি তোমাকে মাঠে-ঘাটে।

কোথাও দেখি না এসব; হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে।

কৌশিক বড়ালের একটি কবিতা

 বেঁচে থাকা



আমরা যা কিছু ভেবেছি এতোদিন,

সবকিছু ছিল মিথ্যা।


এতো এতো এতো

চাহিদা...


টিভি - ফ্রিজ - ফ্ল্যাটবাড়ি

KFC - Maggi - Pizza


শপিংমল - বডিস্প্রে

জিন্স - লেহেঙ্গা - কুর্তা।


সাধারণ

'অন্ন - বস্ত্র - বাসস্থান - চিকিৎসা'।

এইটুকুই আসলে সত্যি।

বাকি সব কিছু মিথ্যা।