Monday, August 9, 2021

প্রাবন্ধিক দেবলীনা অধিকারী -এর একটি প্রবন্ধ

 










পুরুলিয়া



পশ্চিমবঙ্গের একেবারে পশ্চিমে   লাল মাটি সবুজ টিলা রুখা মাটির জেলা হলো পুরুলিয়া। রূপ রস রঙে বরাবর জেলাতে আছে পাহাড়, নদী, জঙ্গল আর বড়

 বড় জলাশয় এর সমারোহ॥

সাথে আছে মানুষের দেশীয় শিল্প সংস্কৃতির অটুট ধারা যার প্রবাহে জেলার সুনাম অক্ষত থাকে ।

 দেওয়াল চিত্র এমনই এক লোকজ শিল্প যা মানুষের এক অকৃত্রিম মানব সম্পদের নমুনা । এ ছাড়াও বাঁকুড়া, বর্ধমান, ঝারখণ্ড তেও এ ধরণের শিল্প দেখা যায় ।  পুরুলিয়া জেলায় 

এই সব চিত্র এর নির্মাতা সাঁওতাল,ডোম, কামার,কুমোর,সরাক প্রভৃতি উপজাতি সম্প্রদায় এর লোকজন করে থাকে  নিজেদের উতসব আর পার্বণ উপলক্ষ্যে । বেশিরভাগ আল্পনার নকশা মেয়েরাই করে আঙুল দিয়ে করে ।কোনরকম প্রশিক্ষক ছাড়াই বাস্তব অভিজ্ঞতা আর প্রকৃতির সাহায্যে এরা রং তৈরি করে দেয়ালে সূক্ষ্ম ভাবে অঙ্কন করে । ফুল, লতাপাতা, পশু পাখি, দেব-দেবী ইত্যাদির ছবি ।

 এখানকার বাসিন্দারা তাদের বাড়ী সাজানোর জন্যও ছবি আঁকে বাড়ীর দেওয়ালে শখে ।সে ছবি এক এক জায়গায় একেক রকম। সাধারনত সাদা, গেরুয়া, কালো রঙ ব্যবহার করা হয় বাড়ীগুলি রঙ করতে। নানা রকমের নক্সা আঁকা হয় প্রধানত দরজার-জানালার চারপাশে। যা দেখলে সত্যিই মন মুগ্ধ হবেই । কালিপূজা, লক্ষী পূজা, বাঁদনা পরবে মেয়েরা এ ধরণের নকশা অঙ্কন করে দেয়াল গোবর দিয়ে নিকে , পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা রাখার ব্যাপার টাকেও গুরুত্ব দেয় অনেক খানি । সময়ের সাথে সাথে মানুষের কর্মব্যস্ততার জন্য কিছু রীতিনীতির অনেক বদলালেও পাহাড় জঙ্গল ঘেরা এই জেলাটিতে কিন্ত এখনো অনেক কিছুই সেই আগের মতই অপরিবর্তিত আছে। পুরুলিয়া শহর থেকে ৬০-এ জাতীয় সড়ক ধরে বাঁকুড়ার দিকে যেতে একটি জায়গা যার নাম লালপুর। এই লালপুর থেকে ডান দিকে গেলে মানবাজার যাওয়া যায়। 

আর বাম দিকে আর একটি সরু রাস্তা ধরে গাড়িতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট গেলেই যে দৃশ্য দেখা যায় তাতে আশ্চর্য হবেন  যেকোন মানুষ , জায়গার নাম হাতিমারা। পুরুলিয়া শহর থেকে মাত্র ৪৩ কিলোমিটার দূরে এটির অবস্থান। মূলত সাঁওতাল গ্রাম এটি। পেশাগতভাবে কৃষি কাজের সাথে যুক্ত, কিন্তু পুরুলিয়ায় যেহেতু কৃষি বৃষ্টি নির্ভর, তাই বেশিরভাগ সময়-ই এরা মজুরী করেন । অভাব থাকলেও তারা পরিশ্রম করে নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রাখে । অন্য জায়গার যে ছবি দেওয়ালের গায়ে আমরা দেখে থাকি, এখানের ছবি কিন্তু তার থেকে আলাদা অনেকটা ।প্রত্যেক বাড়িতে মূলত দেওয়াল জুড়ে জ্যামিতিক নক্সা আর নানা রঙ-এর সমন্বয় । মোটা কালো বর্ডারে কখনো কখনো ফুল, লতা-পাতা, ময়ূর, পাখী এ-সবও আঁকার বিষয় হয়ে উঠেছে। শুধু যে রঙ দিয়ে আঁকা তা নয়, সাথে সাথে মাটির দেওয়ালে মাটি দিয়েও রিলিফ-এ নক্সা করা হয়েছে আঁকা ছবির সাথে সঙ্গতি রেখে। এখানে রঙ হিসেবে মূলত প্রকৃতি জাত গিরিমাটি, পাতার রং,খড় পুড়িয়ে, সেরামিক যুক্ত মাটি সাথে বাজার চলতি আঠা ব্যবহার করা হয়েছে। আরও উল্লেখযোগ্য যে, একটি বাড়ীর ছবির সঙ্গে আর একটি বাড়ীর ছবির কিন্তু কোন মিল নেই। বাড়িগুলির সামগ্রিক পরিকল্পনা, বিন্যাস এবং রঙ-এর ব্যবহার সর্বোপরি তার ছবির বৈচিত্র্য দর্শককে মুগ্ধ করবেই। সাথে মানুষের সরল ব্যবহার বারবার আসতে বাধ্য করবে । এই শিল্প আর শিল্পীর সাথে যুক্ত থাকে মানুষের ভাবাবেগ, জঙ্গলমহলের.রূপ,লোককথা সংস্কৃতি ।


প্রাবন্ধিক চাঁদ রায় -এর একটি প্রবন্ধ

  লোকসংস্কৃতি ও সৌন্দর্যবিদ্যা

  


সৌন্দর্যবিদ্যা বা সৌন্দর্য বিজ্ঞানের ইংরেজি হচ্ছে ASTHETICS. Asthetics is the science dealing with the laws and principles of beauty in art and nature.  

সৌন্দর্য বিজ্ঞানের অপর নাম নন্দনতত্ত্ব এবং কান্তি বিদ্যালয়। এটি Philosophy (দর্শন) -এর একটি শাখা যেখানে সৌন্দর্য, শিল্প, শিল্পের স্বাদ, সৌন্দর্য--সৃষ্টি ও তার উপভোগ আলোচনা করা হয়। এটি মানুষের সংবেদনশীলতা, আবেগের মূল্য এবং অনুভূতির কথাও ব্যক্ত করে। আরও ব্যাপক অর্থে এর বিশেষজ্ঞরা সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন-- নন্দনতত্ত্ব শিল্প, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে যায় --- Nature is pleased with simplicity and nature has no dummy.প্রকৃতির মধ্যে পাওয়া যায় অকৃত্রিম সরলতার প্রকাশ। সেই পরিবেশ মনোমুগ্ধকর এবং অদ্বিতীয় আনন্দের উৎস। 

রাঢ়বঙ্গের আদিম সৌন্দর্যবোধের রীতিনীতির মধ্য দিয়েই বস্তুবাদী নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে লোকসংস্কৃতির মূলধারা যা লোকজ মানুষের সঙ্গে সঙ্গে সহ প্রকটিত ও প্রকাশিত। আসলে সৌন্দর্যবোধ তথা অনুভূতিকে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদিম ও অকৃত্রিমবোধ বলে মনে করা হয়। এটি মানুষের আবেগময় প্রতিক্রিয়া। প্রতিদিনের কাজের সঙ্গে প্রকৃতির ঘটনা গুলি ও তার শক্তির প্রকাশ কে আপন জীবনে মানুষ রপ্ত করতে শিখেছে। 

রবীন্দ্রনাথ নন্দনতত্ত্ব শব্দটি ব্যবহার করেছেন সর্বপ্রথম। Aesthetics এর বাংলা প্রতিশব্দ নন্দনতত্ত্ব বহুল প্রচলিত। Asthetics শব্দ টির উৎস গ্রিক যার অর্থ, আমি অনুভব করি। 

আধুনিক কালে সৌন্দর্য তত্ত্বকে জটিল, অপ্রাকৃত ও অবাস্তব বৈশিষ্ট্য যুক্ত মনে করা হলেও আদিকালে ছিল সহজ ও সরল। সৌন্দর্য তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে ব্যাবিলন মিশর চীন ও ভারতবর্ষে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি শব্দ Humanism বা মানবতাবাদ। সেই ঐতিহ্যের ধারা ধরে সাহিত্য সংস্কৃতি ও শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে। আর এর উৎস অবশ্যই সাধারণ মানুষ ও তার কর্মজীবনের ব্যস্ততা। 

সৌন্দর্য অনুভবের দুটি ধারা---একটি হল ভাববাদী এবং অপর টি হল বস্তুবাদী। প্রথমটির মাধ্যমে সমাজের উচ্চ শ্রেণির মানুষের পক্ষে একমাত্র সুন্দর কে উপলব্ধি করা সম্ভব। সাধারণ মানুষ কে অজ্ঞানতার অন্ধকারে রেখে তাদেরকে দমন করার প্রবণতা সর্বকালেই দেখা যায় উচ্চ শ্রেণির মানুষের মধ্যে। তাই সাধারণ মানুষ তথা লোকসমাজের ক্ষেত্রে বস্তুবাদী ধারায় মানুষের বাস্তব পরিবেশ ও জীবনের মধ্যে সৌন্দর্যানুভূতির সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটেছে।প্রকৃতপক্ষে এটা শোষক ও শোষিতের মধ্যে বিরোধের প্রতিফলন মাত্র। 

তাই আদিম অকৃত্রিম সরল সৌন্দর্য তত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় লোকজ তথা লৌকিক সংস্কৃতির মধ্যে। রাঢ়বঙ্গের লৌকিক সংস্কৃতির মধ্যেও সেই সৌন্দর্য তত্ত্বের অনুরণন সমভাবে দেখা যায়।

প্রাবন্ধিক রামপ্রসাদ সরকার -এর একটি প্রবন্ধ







সুন্দরের পূজারী



“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে

মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই.....”


কবিগুরুর এই আর্তি আমাদের সবার। কারই বা মন চায় এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে। তাই গানের মাঝেও ব‌্যাকুলতা ধ্বনিত হয়।

“এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে

মন যেতে নাহি চায়.....

না না না যাবো না.....।”


মানুষ মাত্রেই সুন্দরের পূজারী। আমাদের চারপাশের অনেক কিছুই সুন্দর-যেমন মানবদেহ, মানবমন, গাছপালা, চন্দ্র-সূর্য, নদী-নালা, খাল-বিল, পাহাড়-সাগর। এ সবের মাঝেই তো মানুষ বেঁচে থাকতে চায়।

সুন্দরের সঠিক ব‌্যাখ‌্যা কি- যুগযুগান্ত ধরে মানুষ তার উত্তর খুঁজে চলেছে। অসুন্দরের সঙ্গে মানুষের সংঘাত বা পছন্দ-অপছন্দের প্রশ্ন জড়িত থাকলেও অনেক মানুষ অসুন্দরের মাঝে সুন্দরকে খুঁজে পায় তার নিজস্ব রুচি, ব‌্যক্তিগত বোধশক্তি বা অনুভূতির নিরিখে। তাই সুন্দরের পুজো থেমে নেই। সুন্দরের পূজারী আমরা সবাই। রাজারাজরা থেকে শুরু করে পথের ভিখারী পর্যন্ত। কেউ রূপের পূজারী, কেউ সুন্দর মনের, কেউ বা গাছপালা, নদী-নালা, পাহাড়-সাগর এ সবের বুকে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যের পূজারী। ভাবতে অবাক লাগে, রুক্ষ্মশুক্ষ্ম মরুভূমির মাঝে যখন মরুদ‌্যানের খোঁজ মেলে, তৃষ্ণার্ত পথিক মরুদ‌্যানের জলাশয়ের জলে তৃষ্ণা নিবারণ করে, জলাশয় ঘিরে খেজুর গাছের সারি- এ সৌন্দর্যের তো কোনও তুলনা হয় না। আর সুন্দরকে ভালবাসি বলেই আমরা যারা ভ্রমণার্থী- এই অপার সৌন্দর্যকে ক‌্যামেরায় বন্দী করে নিয়ে আসি।

মানুষ সুন্দরের উপাসক। বিচিত্র তার উপকরণ। যুগে যুগে মানুষ দেবতাকে আপন বলে মনে করেছে। তার পাপ-পুণ‌্যের বোঝা দেবতার পায়ে সমর্পণ করে নিজেকে ভারমুক্ত করেছে। দেবতাকে সে সুন্দরের প্রতিভূ মেনেছে বলেই তার এই আত্মনিবেদন।

এখানে ধর্মের কোনও ভেদাভেদ নেই। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-সব ধর্মের মানুষ সুন্দরের উপাসনয়া গড়ে তুলেছে মন্দির, মসজিদ, গীর্জা। সুপ্রাচীন মন্দির, মসজিদ, গীর্জার অপরূপ অলঙ্করণ-মানুষ যে সুন্দরের পূজারী তারই সাক্ষ‌্য বহন করে চলেছে। গৌতম বুদ্ধ, রামকৃষ্ণ, যীশুর ক্ষমাসুন্দর চোখ মানুষকে হিন্দোলিত করেছে বারবার, জয় করেছে মানুষের মন। জাতি ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে এঁদের পায়ে মানুষ মাথা ঠুকেছে শান্তিলাভের আশায়।

মানুষ শিল্পকর্মের মধ‌্যে সৌন্দর্যের পরশ খুঁজে পেয়েছে বলে সৃষ্টি হয়েছে কোণারক, খাজুরাহ, অজন্তা-ইলোরার মতো শিল্পসৃষ্টি। শিল্পকলার প্রতি মানুষের অনুরাগের ফলেই আমরা পেয়েছি অতীতের মাইকেলাঞ্জোলো, দ‌া-ভিঞ্চি, যামিনী রায়, বর্তমানের মকবুল ফিদা হুসেন, গণেশ পাইনের মতো শিল্পীকে।

ভালবাসা মানেই সৌন্দর্য। আর সেই সৌন্দর্যের ফলশ্রুতি হিসাবে আমরা পেয়েছি প্রেমের সমাধি তাজমহল। অপার বিস্ময়ে এই সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এই সৌন্দর্যের অপার আকর্ষণ আপনা আপনি মানুষের মনে পুজোর আসনে অধিষ্ঠিত হয়। 

চির সৌন্দর্যের উপাসক মানুষ যুগ যুগ ধরে সাহিত‌্য সৃষ্টির মাঝে সুন্দরকে খুঁজে পেয়েছে। সুন্দরের প্রতি মানুষের বাঁধনহীন ভালবাসা হৃদয় উজার করা আবেগের টানে রচিত হয়েছে রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসির মতো মহাকাব‌্য। এইসব মহাকাব‌্যের অন্তর্নিহিত রসাস্বাদনে মানুষ সুন্দরকে খুঁজে পেয়েছে। পেয়েছে সত‌্যের সন্ধান, মুক্তির স্বাদ।

কবির কল্পনায় যা ফুটে ওঠে তা কাব‌্যের রূপ নিয়ে ধরা দেয় আমাদের কাছে গীতগোবিন্দ রচয়িতা বড়ু চন্ডীদাস, সাধক রামপ্রসাদ লিখিত ও গীত রামপ্রসাদী সংগীত, শ‌্যামাসংগীত- এ সবের ছন্দ, মূর্চ্ছনা আজও মানুষকে উদাস করে তোলে। পরমেশ্বরকে এক পরম সুন্দর রূপে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে। 

প্রেম প্রীতি ভালবাসা মানুষের মনের এক সুন্দর অনুভূতি। সুন্দরকে ভালবেসে তাকে আপন মনে করে বরণ করে নিতে মানুষ কখনও কুণ্ঠা বোধ করেনি। তাইতো বিশ্বকবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে ওঠে-

“ওহে সুন্দর মরি মরি

তোমায় কি দিয়ে বরণ করি.....।”

লেখক সুমন সাহার একটি মুক্ত গদ্য

 শেফালিকে―হেমন্ত 


মিষ্টি হাসি দেয়া একটা শীতবিকেলের মতোই― গুনগুন করে গান গেয়ে প্রেম ঘটে গেলেও আবার রটে যায়! এই নিয়া উটকো হাসাহাসি বাতাসেও ছড়িয়ে যায়। ধরো― শীতরাইতে মুঠোফোনে গান ছড়িয়ে সেই গল্প রোদ্দুরে বসে পাঠ করা যায়। জেনেছি― বিগত দিনে অল্পবয়সির এফ-এন-এফ (Fnf) নাম্বার কুয়াশা হয়ে যেতো। কুয়াশার সাথেই হাসতে হাসতে কতকিছুই মিউজিক হয়ে যায়। চলো, তারচাইতে আবারো ফিতা ঘুরাইয়া সারারাত গান শুনি আর রাঙাই মন― এবং ভুল ভুলি; চিরতরে! 


তাড়াহুড়ো করে সকাল রাস্তায় হারিয়ে গ্যাছে কত পাখি―সে কথা ভেবেই আর কি ! সময় নষ্ট করার গল্পগুলা বলে-কয়ে সময় নষ্ট করার চাইতে সময়ের ফাঁক খুঁজে শীত সকাল সাড়ে দশটার দিকটায় গাছের পাতার ফাঁকের রোদ পড়তে পড়তে আবারো সময় নষ্ট করা যেতে পারে―আর সময় নষ্ট করে আনন্দ পাইতে পারি।


কথা― কথা রাখেনি বলে সূর্য, ঘড়ি কোনটাই থেমে নাই, এখনো আমাদের শহরে কুয়াশায় ভিজে আসে শীতের সব্জি, শস্য, শেফালি...। তবুও এই শহরে কেউ-কেউ একা-একা সব্জির বাজারে হাঁটতে হাঁটতে গ্রাম― আর বাল্যকালের দিকে চলে যায়। বলে- কয়ে- লিখে হয় নাই অনেককিছুই সেটাকে পুষতে পারলেই কবিতা হইতো, হয় নাই। অবশেষে, নিজের ভালো নিজেই দেখে― একটা বাই-সাইকেল শীতভ্রমণে যাবার আগে-আগে শেফালির উদ্দেশ্যে হে'মন্ত―

' দেখাতো হবেই; কথাও হবে।'

লেখক বরুণ বিশ্বাস -এর একটি গল্প

 শিকারী


স্কুল জীবনের শেষ বছর অর্থাৎ ১৯৭৫ সাল ।পড়ি মেদিনীপুর শহরের বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠে । পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৬ এ মার্চ মাসে শুরু হবে হায়ার সেকেন্ডারির শেষ ব্যাচের পরীক্ষা । যদিও ওই বছরই শুরু হয় চলতি মাধ্যমিক পরীক্ষা । তো তখন এত সাইকেলের ব্যবস্থা ছিলো না । এতদূর আমরা হেঁটে হেঁটেই স্কুলে যেতাম ।

  কোন একদিন স্কুলে যাচ্ছি, একটু দেরি হয়ে গেছে । প্রার্থনা শুরু হয়ে শেষ হয়ে গেলো । স্কুলের পিয়ন বড় গেট বন্ধ করে ছোট গেট খুলে রেখেছেন । কেউ কেউ ফাঁক গোলে ঢুকে পড়েছে এবং মাস্টার মশাইদের চোখ এড়িয়ে নিজের ক্লাসের লাইনে পেছনে দাড়িয়ে পড়েছে । আমার আসতে এত দেরি হয়েছে যে সেই সুযোগও পেলাম না । সব ক্লাসের লাইন শেষ, শেষ লাইনের লেজটা এবার ক্লাসে ঢুকবে । আমিও বড় গেটের ছোটো গেটে মাথা গলিয়ে ঢুকেছি । সামনেই পড়ে গেলাম হেড মাস্টার মশাই শ্রী জগদীশ চন্দ্র দাসের সামনে । মাথা নিচু করে সামনে দিয়ে যেতেই ডাকলেন । এদিকে এসো । গেলাম । বললেন হাত পাতো । পাতলাম । সপাং করে চাবুকের বাড়ি । বললেন যাও । শোনো, আমি জানি তোমার বাড়ি জেলখানার ওপাশে । এখন থেকে বহুদূর । তবু কাল থেকে তাড়াতাড়ি বেরোবে ঘর থেকে । তোমাকে আমি মারতাম না । তুমি বড় ছেলে । আমি মারবো দেখো গেটের সামনে ওই ফাইভ না সিক্সে পড়ে ওই ছেলেটাকে । মহা শয়তান, বাড়ি স্কুল বাজারে । সাড়ে নটায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়ায়, তারপর এখানে । ওকে আজ পেটানো । ওকে দেখাবার জন্য তোমায় মারলাম ।

আমি গিয়ে ক্লাস রুমে ঢুকলাম । আর দরকার ফাঁক দিয়ে চেয়ে রইলাম । শুরু হল বাঁদর নাচ । যত না বেত, তার চেয়ে নাচনই বেশি ।

      সে সব দিন গেছে । আজকাল বেত হীন মাস্টার মশাই বোধহয় মানায় । মাস্টার মশাই কি শিকারী যে হাতে বেত থাকবে !

লেখিকা স্বপ্না বনিক -এর একটি গল্প

 মহালয়ার ভোর


প্রতিটি বাঙ্গালীর জীবনে মহালয়ার ভোর নিয়ে আসে এক নতুন উন্মাদনা। সারা বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয় এই ভোরে। আবেগঘন মহালয়ার ভোরে আমরা ভেসে যাই এক অনন্ত আনন্দের দুর্বার স্রোতে। একে অপরকে ভালবাসার চিহ্ন স্বরূপ কিছু উপহার দিয়ে ধন‌্য মনে করি নিজেকে। সৌহার্দ‌্যপূর্ণ এই ভালবাসার বুঝি কোন সংজ্ঞা নেই, নেই কোন রীতিনিয়ম।

এই মহালয়ার ভোর আমার জীবনে গভীর অর্থবহ। এই দিনেই পেয়েছিলাম আমার আদরের ভাইকে। মহালয়ার ভোরে বাবার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম গঙ্গার ঘাটে। বহু নরনারীর সমাগমে সরগরম ছিল গঙ্গার ঘাট। পুরোহিতদের মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে চলে তর্পণের বিবিধ প্রক্রিয়া। বাবা তর্পণ সেরে ঘাটে ওঠার মুখে দেখেন একটি ৩/৪ বছরের শিশু হাঁপুস নয়নে কেঁদেই চলেছে। পাশে ওর মা বা আত্মীয় পরিজন কেউ নেই। বাবার বুভুক্ষু পিতৃহৃদয় কোলে তুলে নিল সেই অসহায় শিশুটিকে। কোন্‌ যাদুমন্ত্র বলে শিশুটির কান্না মুহূর্তে থেমে গিয়েছিল সেদিন। আমার মা তাকে পুত্রস্নেহে পালন করে তাকে বড় করার দায়িত্ব নিলেন।

আজ আমার সেই ছোট্ট ভাই বিখ‌্যাত শল‌্য চিকিৎসক। বিদেশে পড়াশোনা করে প্রচুর ডিগ্রীও লাভ করেছে সেই ছোট্ট ভাইয়ের জন‌্য আজ আমি গর্বিত। ওর জন্ম-বৃত্তান্ত অজ্ঞাত বলে মহালয়ার শুভ দিনটিই ওর জন্মদিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।


লেখক ইন্দ্রনীল সাধুখাঁ -এর একটি গল্প

 ড্রপলেট



বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে।আজ তেমন কোনো কাজ নেই রূপায়ণের।নিজের থ্রি বিএইচকে এর ফ্ল্যাটের ব্যালকনি তে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি উপভোগ করছে রূপায়ণ।বৃষ্টি ওর ভালই লাগে, আবার এই বৃষ্টিই সামান্য বিষণ্ণতায় ভরিয়ে দেয় ওর মনটাকে প্রতিবারই।আজও তার ব্যতিক্রম হলো না,ঘোলা আকাশের মত তার মনটাও আজ গুমোট করে আছে।একফোঁটা বারিবিন্দু তার মোলায়েম গেল বেয়ে নেমে এসে ঠোঁট স্পর্শ করলো।বৃষ্টির জলটাও আজ নোনতা লাগছে তার।রুমে ফিরে এলো সে।

ফ্ল্যাট টা ও নিজের হাতে সাজিয়েছে খুব যত্ন করে।এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে মানুষ বলতে ও শুধু একাই থাকে।মাত্র ১৫ বছর বয়সে ঘর ছেরেছিল রূপায়ণ,নিজের স্বপ্ন,নিজের ইচ্ছা গুলোকে পূরণ করার তাগিদে।কেউ সাথ দেয়নি তার,কেউ তাকে বোঝেনি,শুধু লাবণ্য ছাড়া।লাবণ্য,রূপায়ণের ছোট বেলার বন্ধু,একই স্কুলে পড়াশোনা করেছে ওরা।ওদের বন্ধুত্ব টা একটু আলাদা রকমের,ওরা দুজনেই পৃথক কিন্তু একটা জায়গাতে ওদের দারুন মিল।ওরা দুজনেই অবহেলিত।রূপায়ণ এই সমাজ,তার পরিবারের কাছে অবহেলিত আর একই ভাবে লাবণ্যও নিজের পরিবারের কাছে বিশেষ করে মায়ের কাছে অবহেলিত।লাবণ্য অনেক চেষ্টা করেছিল রূপার সাথে বন্ধুত্ব ভেঙে ফেলার,কিন্তু এই একটা মাত্র কারণের জন্য সে বারবার নিজেকে দমিয়ে দিয়েছে।লাবণ্য জানে ও ছাড়া রূপার আর কেউ নেই।আর একটা কারণেও সে রূপায়ণ কে ছেরে যেতে পারবেনা কখনোই,কারণ খুব ছোট থেকেই সে রুপাকে ভালোবাসে,কিন্তু কখনোই তাকে জানতে দেয় নি।অবশ্য একবার চেষ্টা করেছিল জানাবার,কিন্তু তাও বিফল হল।

সেদিন রূপায়ণের পনেরো বৎসরের জন্মদিন উপলক্ষে তার বাড়িতে অনেক আত্মীয় - বন্ধু উপস্থিত ছিল। লাবণ্য ও চলে এসেছিল তাড়াতাড়ি।সে রূপার ঘরে ঢুকে তার পড়ার ডেস্ক এ নিজের হাতে তৈরি করা একটা শুভেচ্ছা পত্র আর একটা চিঠি একই খামে পুরে সযত্নে রেখে দিয়েছিল আর সুন্দর করে খামের উপরে রূপায়ণের নাম লিখেছিল।রূপায়ণ তখন ঘরে ছিল না,তৈরি হচ্ছিল পাশের রুমে।সরা বাড়ি জুড়ে খুব ব্যস্ততা - কোলাহল হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল রূপার বাবার চিৎকারে।হঠাৎ করেই তিনি ঢুকে পড়েন রূপায়ণের রুমে,যেখানে রূপায়ণ ড্রেসিং টেবিলের সামনে তার মায়ের লিপস্টিক হতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আর তার ঠোঁট দুটো উজ্জ্বল লাল রঙে রঙিন হয়ে ছিল।বাবার চিৎকারে পাথর হয়ে যায় সে,পরক্ষনেই তার হাত থেকে ছিটকে পরে লিপস্টিক টা আর সঙ্গে সঙ্গেই গোটা বাড়ির লোক জড়ো হয় রুমের সামনে।সবার সামনে সেদিন দারুন অপমানিত হয়েছিল রূপায়ণ।যে ঠাকুমা তাকে এত ভালোবাসতেন তিনি সেদিন তার মুখে থুতু ছিটিয়ে বলেছিলেন, "মরার আর জায়গা পেলি না।মুখপোড়া মাগী!দুর হয়ে যা চোখের সামনে থেকে।"তার বাবা তাকে সবার সামনে জুতো পেটা করে বের করে দিয়েছিলেন বাড়ি থেকে।পরিবারের সবার কাছে নানা কথা শুনতে হয়েছিলো সেদিন তাকে।এমনকি নিজের মায়ের কাছেও ছার পায়নি সে।তার সব বন্ধুরা ঠাট্টা করেছিলো সেদিন তাকে নিয়ে।লাবণ্য শুধু সবার আড়ালে দুচোখ লাল করে কেঁদেছিল সেদিন,আর তার দেওয়া খাম টা নিয়ে রূপার সাথে বেড়িয়ে এসেছিল সে বাড়ি থেকে।সেদিন থেকেই রূপা লাবণ্যর সাথে থেকেছে লাবণ্যর মামাবাড়ীতে।লাবণ্য মামাবাড়ীতেই থাকতো ছোট থেকে,কারণ খুব ছোটবেলায় তার মা মারা যান।তারপর যদিও তার বাবা একটা বিয়ে করেছিল,কিন্তু লাবণ্য ছিল সৎ মায়ের চোখের বালি।তাই ওর দিদা ওকে নিজের কাছে রেখে মানুষ করেছেন।সেদিনের ঘটনার পরেই লাবণ্য প্রথম বুঝতে পারে যে রূপায়ণ সাধারণ নয়,ও আমাদের থেকে আলাদা,শুধু আলাদাই নয় ও আমাদের থেকে উৎকৃষ্ট।লাবণ্য বুঝেছিল যে রূপায়ণ আসলে শিবের মত অর্ধনারীশ্বর,ওর একই শরীরে নারী ও পুরুষ উভয়েরই বাস।আরো একটা জিনিস সেদিন ও বুঝেছিল,রূপায়ণের আসল পরিচয়টা হল,সে একটা উৎকৃষ্ট মানুষ।সেদিন রাতে খাম থেকে চিঠিটা বের করে নিয়ে গ্রিটিংস কার্ড শুদ্ধ খাম টা দিয়েছিল রূপার হতে।কারণ অনেক ভাবনা চিন্তার পরে সে ঠিক করেছিল কিছু কিছু কথা না বলাই ভালো,তাতে অনেক বিপত্তি এড়িয়ে যাওয়া যায়।কার্ড টা হাতে পেয়ে খুব আনন্দিত হোয়েছিল রূপায়ণ সে রাতে।সেদিনের পরে অনেক গুলো বছর কেটে গেছে ; অন ক গ্রীষ্ম এসেছে,অনেক বর্ষা চলে গেছে।আজ রূপায়ণের ৩৫তম জন্মদিন।আজকেও লাবণ্যর আসার কথা আছে এই ফ্ল্যাটে।দুবছর হয়েছে রূপায়ণ ফ্ল্যাট টা কিনেছে।বৃষ্টি তে ভেজা কাপড় ছেড়ে রেখে রূপায়ণ একটা ভালো সলোয়ার পরে সোফায় বসে আছে,তার পায়ের কাছে বিস্কুট খালি কাঁচের বোতল টা নিয়ে খেলা করছে।রূপায়ণের পোষা কুকুরটার নাম ' বিস্কুট '।আজকের বৃষ্টির আবহটা হয় তো একটু বেশীই বিষাদময়,সেটা যেন চার দেওয়াল ভেদ করে এই ঘরেও ঢুকে পড়েছে।সোফায় বসে আছে রূপায়ণ,তার হাতে ধরা বহুবছর আগের সেই খাম,জার উপর লাবণ্যর নিপুণ হাতে লেখা আছে রূপায়ণের নাম।বিষাদময় অবহাওয়ার জন্য কোয়েক ফোঁটা বৃষ্টি লবণাক্ত জল টপটপ করে খামের উপর পড়ল।রূপায়ণের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে ,সে কাঁদছে।কিন্তু কেন এই কান্না?আজ সে প্রতিষ্ঠিত,নামকরা নৃত্যশিল্পী।তাকে আর রাস্তা দিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটতে হয় না।সবাই আর তাকে নিয়ে ঠাট্টা - তামাশা করে না।কিন্তু সে জানে,এই সমাজের সিংহভাগ মানুষই আজও পিছনে পিছনে তাকে ছক্কা - হিজরা ইত্যাদি সর্বনামে সম্বোধন করে,ওর প্রতি তাদের শ্রদ্ধা,সম্মান,ভালোবাসা এসবই আসলেই মেকি।এই সমাজ এখনও তাকে তার মতো করে মেনে নিতে পারেনি।এইসব সাত - পাঁচ ভেবেই আজ সে এত ভেঙে পড়েছে।নিজের কান্নাকে নিজের থেকে লোকানোর জন্য সে একটা সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে খাম টা সোফায় ফেলে রেখে নাচ তুলতে লাগলো।নাচ করতে করতে হঠাৎ বসে পরলো মেঝেতে,তার তলপেটে আর কোমরে ভীষণ ব্যথা করছে,এতটাই তীব্র সেই ব্যথা,যে সে আর উঠে দাঁড়াতে পারলো না।ব্যথার চোটে সেখানেই অচৈতন্য হয়ে পড়ে রইলো।জ্ঞান যখন ফিরলো সে তখন নিজেকে হসপিটাল এর বেড়ে আবিষ্কার করলো।দেখলো পাশে লাবণ্য দাঁড়িয়ে,সে ই ওকে হসপিটালে এনেছে।

ডাক্তারের সাথে কথা বলে লাবণ্য জানতে পারে,বহুবছর ধরে নিয়মিত ড্রিঙ্ক করার জন্য রূপা প্যানক্রিয়েটিস ডিস অর্ডার এ গুরুতর ভাবে আক্রান্ত হয়েছে।অবস্থা খুবই খারাপ।প্রায় এক সপ্তাহ হসপিটালে কাটানোর পর যেদিন রূপা বাড়ি ফিরলো সেদিন রাতেই আবার প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছট্ফট্ করতে করতে নিজের ফ্ল্যাটে সে তার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল।

সমাজের কাছে - পরিজনদের কাছে লাঞ্ছনা শুনে,প্রতিনিয়ত তাদের কাছে নতুন করে অপমানিত হতে হতে মানুষটা নিজের কাছেই অবহেলিত হতে শুরু করে আর এইসবের থেকে একটু শান্তি পাওয়ার আসায় নেশা করা শুরু করে,এটা না বুঝেই যে,একটু শান্তি পাওয়ার জন্য সে যে জিনিসটাকে কাছে টেনেছে সেটাই একদিন তাকে চিরজীবনের জন্য শান্তি প্রদান করবে,অন্য কারোর শান্তি ছিনিয়ে নিয়ে।


                   

কবি সুজিত রেজ -এর একটি কবিতা

 সন্তাপ



এই যে এত ভয়, শরীর-দেহ-মন, কচুকাটা 

নিত্য, ঠাকুরঘরে পঞ্চপ্রদীপ---তেল-ঘি, সলতের পর সলতে...


উপরেও যা পাবো নীচেও পাবো তা--- তবুও পটাপট কাঠি জ্বেলে,বল্কল সন্ন্যাসীর মতো দেখি

জন্ম একটা মুখোশ,মৃত্যুতে তা পোড়ে,

                            মাঝের সময়টুকু ছাগসঙ্গীত।


এই সবকিছু জেনেও লাট্টু-লেত্তি ঘুরিয়েই চলি।

বকলমে প্যাঁচ-পয়জার খিঁচে-খিঁচে মগডালে উঠে বসতে চাই।


ঠিকানা আমার লেখা হয়নি আজও 

                            বজ্রমেঘে পড়ছি তার রূপ।

খোসার কষ্ট অভিমান স্যাঁতলে ধ্রুবপদ রচনা করা ভুলে যাচ্ছি ক্রমশ। বুঝতে পারছি,

চলনবিলের নৈর্ঋত কোণে বসে থাকার দিন ফুরিয়ে এল আমার।

কবি রানা জামান -এর একটি কবিতা

 উড়াতে চাচ্ছি ছাই

 


পুস্পসম সবকিছু ভালো লাগে বেশ

পাথর পেলেই ইচ্ছে করে গুড়ো করে ফেলি

প্যাঁচার ভোঁতা নাক লম্বা করি মনে মনে

পেছনে লেজের অভাব বোধ করি মাঝে মাঝে



উড়াতে চাচ্ছি ছাই

আয়ত্বে কিছুই নাই

খুলছি জটিল গেড়ো

পাচ্ছি না কিছু টেরও


নটে গাছ মুড়িয়ে বানাবো চাঁদে উঠার সিঁড়ি

ভেজাল এড়াতে পান্তাভাত খাবো সারাবেলা

দৃষ্টি শিকলাবদ্ধ করার প্রচেষ্টায় আছি।

কবি রফিকুল রবি -এর একটি কবিতা

 অস্পৃশ্য ভালোবাসা



আমি তাকালেই দৃষ্টির সীমানা হয় নীল, 

আকাশ হয় কালো। চলে রং বদলের খেলা। তোমার দিকে তাকালেও তুমি হবে বিবর্ণ!


আমি বৃষ্টি ছুঁলে হয় বরফ, 

রোদে দাঁড়ালে ঘনিয়ে আসে আঁধার, চাঁদ ধরতে গেলেই দেখায় কলংক-

আমি ধরলেই তোমার তুমি হবে

অন্ধকার!


আমি হাঁটলে মাটি পুড়ে হয় ঝামা, নদীর কূলে বসলেই ভেঙে যায়, ভেঙে যায়.. পাড়। 

তোমায় নিয়ে হাঁটবো কেমনে খসখসে রাস্তায়,

কোথাও তোমায় নিয়ে বসবো কোন ভরশায়! 

আমি হাত ধরলেই ভেসে যাবে, হারিয়ে যাবে তুমি জীবনের দুঃখ মোহনায়। 


আমার নিশ্বাসে দগ্ধ হয় বাতাস, আমার স্পর্শে সব পুড়ে হয় ছাঁই। তাই, চাইনা তোমায় দগ্ধ করতে, তোমাকে পোড়াতে, 

চাইনা তোমায় দৃষ্টির সীমানায় আনতে!

তুমি দূরে থাকো, আমার স্পর্শের বাইরে থাকো-

মহাকাল আমি তোমায় ভালোবেসে যাবো

 অন্ধ চোখে!

কবি সৌরদীপ দত্ত -এর একটি কবিতা

 দেশ মাতৃকার টান


ঐ যে সৈনিকটি দেখছেন, 

খাঁকি পোষাক পরা

 কাঁধে দেশ রক্ষার ভার

তবু মেরুদন্ড সিধে মাথা উঁচু

চোখে একটুকরো জল ।


মা বাবাকে প্রণাম করে ,

জড়িয়ে ধরলো মা-কে,

আবেগে ভেসে গেলো, মা বললো - 

তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস....

যদিও তাদের অজানা নয় যে ,

এ মায়ার বন্ধন কাটিয়ে,

 তাকে যেতে হবে দূরে,অনেক দূরে....


সীমান্তে থাকতে হবে সদা সজাগ হয়ে,

হতে হবে শত্রুর মুখোমুখি

পাশবিক পরিশ্রম করতে হবে,

এ দেহের উপর দিয়ে অনেক 

ঝড় , ভূমিকম্প, সাইক্লোন 

বয়ে যাবে।


অনেক মাস পরে বাড়ি ফিরলে

দেখা যাবে তার মন ও শরীরের 

অনেক ধোয়া - মোছা হয়েছে,

কিংবা হয়তো অঙ্গহানি।

কোনো কোনো সময় তো শেষ দেখাও,

হয়না, সাদা কাপড়ে মোড়া,

ডেডবডি আসে বাড়িতে,

কখনও কখনও তো দেহও অমিল হয় ।


এভাবেই দেশরক্ষায় শহীদ হয়েছে,

কত লক্ষ লক্ষ প্রাণ, আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে

সম্মান জানানো হয় শহীদদের

কিন্তু যে একবার চলে যায় সে যে আর ফেরে না,

মায়ের শূন্য কোল যে শূন্যই থেকে যায়।


এ কেমন টান !

মায়ের বুক থেকে ছেলে চলে যায় -

দেশরক্ষার ভার নিতে,

হাতে তুলে নেয় আগ্নেয়াস্ত্র,

এ এক বিপুল আকর্ষণ

উপেক্ষা করা যায় না এ টান,

এ যে দেশমাতৃকার প্রতি

বীর সন্তানের টান ।


কবি প্রণব দাস -এর একটি কবিতা

 গোঁজামিল

          

জীবনের কিছু অতীতের ব্যাখ্যা হয় না

ঠিক যেন মরীচিকারা অংক কষতে করেছে ভুল

মেলাতে গেলেই ‌বিয়োগ চিহ্নে দাগ পড়ে‌ যোগ হয়ে যায়।


আসলে শিমুল তুলোও‌‌ মনপাথর

গলাতে পারেনি সকলের

তাই অংক বারবার পড়ছে ভেঙে।


চেষ্টার গতিতে গোনা মাথার চুল

আরো এক গোঁজামিলের সূএ।

কবি মিলি দাস -এর একটি কবিতা

 দোষ করেছ


হঠাৎ কেন অন্ধকারে ভয় পেয়েছ

মানুষ তুমি মানুষ হয়ে দোষ করেছ?

সমুদ্রে আর জঙ্গলেতে বেশ মিলেছ

বিনা স্নানে আঁশটে গন্ধ তাও মেখেছ।


ছোবল দেবে জেনেও তুমি রাত জেগেছ

পরস্পরের আলিঙ্গনে বিষ ঢেলেছ

ঘুমন্ত সেই আলগা বুকে ঘুমিয়েছ

হঠাৎ কেন অন্ধকারে ভয় পেয়েছ?


শরৎ ভোরে শিশির পায়ে পথ হেঁটেছ

বিষন্নতার স্বপ্ন জুড়ে জাল বুনেছো

নীলচে ঘাসের ফুলের বনে তাও খুঁজেছ

এত কিছু করেও তুমি দোষ করেছ?